তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :76

কাবির হেসে বললো
— “ভাই, এই আমার বিয়েতে কাজের চেয়ে খাওয়া-দাওয়া বেশি সিরিয়াস মনে হচ্ছে!”
রিহান চামচ ঘুরাতে ঘুরাতে জবাব দিলো
— “তুই খাওয়া দেখছিস, আমি দেখছি আজকে কার ভাগ্যে মার খাওয়া আছে!”
ইশান হেসে বললো — “মানে?”
কাবির চোখ কুঁচকে কিরিসের দিকে ইশারা করলো
— “ওই যে বস বসে আছে… আজকে কেউ ভুল করে লিসির দিকে চোখ দিলেই বুঝবি লাইফ আপডেট শেষ।”
সবাই একসাথে হেসে উঠলো। কিন্তু হাসির মাঝেও একটা বিষয় স্পষ্ট এই জায়গার কেন্দ্রবিন্দু কিরিস। সে এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে, হাত পকেটে। চোখ চারপাশে ঘুরছে না, তবুও যেন সবকিছু তার নজরের ভেতরেই আছে।
আর ঠিক তার কাছেই লিসি। লিসি একহাতে মেহেদী শুকিয়ে গেছে তাই সেগুলো সাবধানে তুলে কিরিসের কাছ থেকে কেক নিয়ে নেয়, কিরিসের দেওয়া ছোট ছোট বাইট লিসির জন্য যথেষ্ট নয়। লিসি কেক হাতে আরোবিদের সঙ্গে বকবক করছে, হঠাৎ হঠাৎ হেসে উঠছে, আবার বাচ্চার মতো রাগও করছে। মার্ক দূরে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। তার চোখ লিসির ওপর স্থির।
মুখে কোনো শব্দ নেই শুধু একটা শান্ত উপলব্ধি।
এই মেয়েটা বেঁচে আছে এটাই যথেষ্ট ছিল।
সে নিজের জীবনে বহু মৃত্যু দেখেছে, বহু পরিবার ধ্বংস হতে দেখেছে। নিজের চোখের সামনে ভেঙে গেছে সম্পর্ক, বিশ্বাস, মানুষ। লিসির বাবা-মা… আবাস আর আমেনা… সব স্মৃতি এক মুহূর্তে ভেসে উঠলো তার মাথায়। মার্ক চোখ নামিয়ে নিল একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
তারপর ধীরে মাথা তুললো লিসির দিকে আবার তাকালো মেয়েটা হাসছে। মাথা কাত করে কিছু বলছে, আর কিরিস পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে শুনছে। মার্কের ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি ফুটে উঠলো। সে নিজের মনে ভাবলো—
“আমি হয়তো অনেক কিছু বাঁচাতে পারিনি… কিন্তু অন্তত… ওকে সঠিক হাতে তুলে দিতে পেরেছি।”
তার চোখে কোনো আফসোস নেই, নেই কোনো অভিযোগও,শুধু একটাই শান্তি। লিসির দিকে তাকিয়ে থাকা মানে এখন আর অতীতের ব্যথা না এটা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। ঠিক তখনই লিসি হঠাৎ কাবিরের কথা শুনে হেসে উঠলো, আর প্রায় কেক ফেলে দিতে যাচ্ছিল।
কিরিস সাথে সাথে তার হাত ধরে ফেললো।
— “সাবধানে।”
লিসি মুখ বাঁকিয়ে বললো
— “সবসময় সাবধানে সাবধানে কেন!”
কিরিস খুব শান্ত গলায় জবাব দিলো
— “কারণ তুমি আমার।”
এই একটা লাইনেই লিসি থেমে গেল। আর দূরে দাঁড়িয়ে মার্ক চোখ নামিয়ে আবার আকাশের দিকে তাকালো।
তার মনে কোনো যুদ্ধ নেই এখন। শুধু একটাই ভাবনা—
“হ্যাঁ… এই মেয়েটার জন্য কিরিসই ঠিক মানুষ।”
গার্ডেনের এক কোণে ছেলেদের আড্ডা তখন পুরো জমে উঠেছে। কাবির একটা প্লেট হাতে নিয়ে বললো
— “আমি আজকে বুঝছি, বিয়ের আসল কাজ হচ্ছে খাওয়া… বাকি সব তো শো-অফ!”
ইশান সাথে সাথে হেসে উঠলো
— “তুই না খেলে তো মনে হয় তোর বিয়েও কেউ করবে না!”
কাবির মুখ ঘুরিয়ে —“ তাহলে কার বিয়ের খাবার খাচ্ছিস তুই, এটা কিন্তু আমার বিয়ের মেহেদীর অনুষ্ঠান ”
ইশান কাবিরের কথায় দাঁত কেলিয়ে হেসে দেয় , রিহান চামচ ঘুরাতে ঘুরাতে বললো
— “আমার একটা ভয় আছে।”
দুইজন একসাথে — “কি ভয়?”
রিহান চোখ কুঁচকে বললো
— “যে যেভাবে কিরিস ভাই বসে আছে, মনে হচ্ছে আজকে বিয়ের পর পার্টির চেয়ে বেশি ইনভেস্টিগেশন হবে!”
কাবির সাথে সাথে হাত তুলে বললো
— “আমি আগে থেকেই বলছি, আমি নির্দোষ!”
ইশান হাসতে হাসতে বললো
— “তোর নির্দোষ হওয়ার প্রমাণ কে দেবে?”
কাবির নাটক করে বললো
— “আমি নিজেই সাক্ষী, আমি নিজেই আসামি!”
ঠিক তখনই দূর থেকে লিসি হাসতে হাসতে কেক খাচ্ছে।
কাবির ফিসফিস করে বললো
— “দেখ, ওদিকে ভাইয়ের বউ হাসছে… আর আমরা এখানে লাইফ বাঁচানোর প্ল্যান করছি।”
রিহান মাথা নেড়ে বললো—
— “ভাইয়ের বউ না, ভাইয়ের লাইভ, ওর গোটা দুনিয়া বসে আছে ওখানে !”
সবকয়টা একসাথে হেসে উঠলো ইশান হঠাৎ বললো
— “আচ্ছা সত্যি বল তো… কিরিস ভাইয়ের সামনে কেউ প্রেম করলে কি লাইসেন্স লাগে?”
কাবির সাথে সাথে উত্তর দিলো
— “লাইসেন্স না, ডেথ সার্টিফিকেট লাগে!”
ঠিক তখনই পেছন থেকে হালকা কাশি শোনা গেল।
সবাই একসাথে ঘুরে তাকালো কিরিস দাঁড়িয়ে আছে।
চুপচাপ হাতে গ্লাস এক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর কাবির আস্তে বললো — “ভাই আমরা তো শুধু কালচারাল ডিসকাশন করছিলাম…”
কিরিস একদম শান্ত গলায় বললো
— “ডিসকাশন শেষ।”
সবাই সাথে সাথে সোজা হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই কিরিস পাশ ফিরে লিসির দিকে তাকালো। তার ঠোঁটে সামান্য হাসি। আর কাজিনরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলো
— “বাঁচা গেল আজকে…”
রাত তখন অনেকটাই গভীর।
রায় চৌধুরী বাড়ির চারপাশে উৎসবের সেই কোলাহল ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এসেছে। পাড়ার মানুষজন, দূরের অতিথিরা একে একে নিজেদের বাড়ি ফিরে গেছে। শুধু বাড়ির আপন মানুষগুলো এখনো জেগে আছে কারো হাতে চায়ের কাপ, কেউ সোফায় আধশোয়া হয়ে গল্প করছে, কেউ আবার সারাদিনের হাসি-ঠাট্টার ক্লান্তি নিয়ে বসে আছে হলরুমের নরম আলোয়।পুরো হলঘরে এখন মেহেদির মিষ্টি গন্ধ। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ফুলের পাপড়ি, কুশন, আর কিছু খালি মেহেদির কোন।
মেয়েরা নিজেদের হাতের মেহেদির রং নিয়ে ব্যস্ত।
— “উফফ! আমারটা এত হালকা কেন?”
— “আরে লিসির হাতটা দেখ! একদম রক্ত লাল!”
— “এই যে প্রমাণ! ভাইয়া তোকে ভয়ানক ভালোবাসে!”
কথাটা বলতেই সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।
লিসি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। তার নরম সাদা হাতে গাঢ় লাল মেহেদির রং যেন আরো বেশি ফুটে উঠেছে। শাড়ির আঁচলটা আলতো করে টেনে হাতে ঢাকার চেষ্টা করতেই আরোবি এসে আবার হাত টেনে বের করে দিল।
— “লুকিয়ে লাভ নাই লিসি! এত গাঢ় রং মানেই লাভ ডেঞ্জারাস!”
আরেক দফা হাসির শব্দ উঠলো। এদিকে ছেলেরা বসে বসে সব দেখছিল। হঠাৎ ইশান কোথা থেকে তিন-চারটা মেহেদির কোন হাতে নিয়ে এসে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো— “শুনেন সবাই! এত অন্যায় চলবে না। শুধু মেয়েদের হাতে মেহেদি হবে আর আমরা শুকনা হাতে ঘুরবো?”
কাবির সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে বললো
— “হ্যাঁ ঠিক! লিসি, আমাদের হাতেও মেহেদি দিয়ে দাও।”
লিসি অবাক হয়ে তাকালো— “আমি?”
— “হুম তুই, তুই তো বলেছিলে দিয়ে দিবি পরে ”
ইশান এসে মেঝেতে তার সামনে বসে পড়লো।
— “আজ তুই অফিসিয়ালি এই বাড়ির মেহেদি আর্টিস্ট।”
সবাই আবার হেসে উঠলো। লিসি শেষ পর্যন্ত হার মেনে নিচে পাতা কুশনের উপর বসে পড়লো। তার সামনে কাবির হাত বাড়িয়ে দিল।
— “প্রথমে বরের হাত। সম্মানটা বুঝো।”
— “আহা! নাটক কম কর।”
জারা কুশন ছুঁড়ে মারলো ওর দিকে। লিসি হালকা হেসে কাবিরের হাতে মেহেদি আঁকতে শুরু করলো। তার পাতলা আঙুলগুলো খুব যত্ন করে ডিজাইন টানছে। চারপাশে বসে সবাই সেই দৃশ্য দেখছে কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে।
ঠিক তখনই—
হলরুমের বড় দরজাটা ধীরে খুললো। এক মুহূর্তেই যেন চারপাশের শব্দ একটু থেমে গেল। কিরিস ভিতরে ঢুকলো। সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, চুলগুলো এলোমেলো, বুকের উপরের দুই-তিনটা বোতাম খোলা। মনে হচ্ছে বাইরে কারো সাথে কথা বলে বা কাজ সেরে এখনই ফিরেছে। ক্লান্ত দেখালেও তার সেই ভয়ংকর সুন্দর উপস্থিতি পুরো হলরুমটাকে আবার নতুন করে চুপ করিয়ে দিল। কিছু মেয়েরা তো তাকিয়েই রইলো।
কিরিস ধীরে ধীরে সবার দিকে একবার তাকিয়ে সোজা গিয়ে লিসির সামনের চেয়ারে বসে পড়লো। একদম রাজাদের মতো গম্ভীর স্বরে বললো
— “কোনটা খালি আছে?”
ইশান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে একটা মেহেদির কোন এগিয়ে দিল। কিরিস সেটা হাতে নিয়ে আবার লিসির দিকে তাকালো। দেখলো, লিসি খুব মন দিয়ে কাবিরের হাতে মেহেদি দিচ্ছে। সাথে সাথে তার চোখ দুটো সরু হয়ে এলো। কাবির সেটা বুঝে ইচ্ছে করেই নাটক শুরু করলো— “আরে ভাই! তোর বউকে একটু ছাড় দে।”
তারপর নিজের হাতটা আরো সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বললো — “তোর ছোট ভাইয়ের হাতে ডিজাইন শেষ করতে দে আগে।”
সবাই হাসতে শুরু করলো, কিরিস ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বললো—
— “শেষ?”
— “না না, অনেক বাকি!”
কাবির দুষ্টু হেসে বললো। কিরিস এবার সোফায় হেলান দিয়ে বসলো। তারপর একদম স্বাভাবিক গলায় বললো—
— “মা।”
সুপ্রিয়া পাশ থেকে তাকালেন।
— “কি রে?”
— “কফি।”
কাবির সাথে সাথে বলে উঠলো—
— “মা! ভাইয়াকে স্ট্রং কফি বানিয়ে দাও। মানুষটার জেলাসি কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাচ্ছে।”
এইবার পুরো হলরুম হেসে উঠলো। সুপ্রিয়া মাথা নেড়ে হেসে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
আর কিরিস?
সে একদৃষ্টিতে শুধু লিসির দিকেই তাকিয়ে আছে।
লিসি মাথা নিচু করে মেহেদি দিচ্ছে ঠিকই…
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসিটা কিছুতেই লুকানো যাচ্ছে না।
কাবির,ইশান আর রিহানের হাতে মেহেদি দিতে দিতেই প্রায় আধাঘণ্টা কেটে গেল। লিসি এত সুন্দর করে ডিজাইন করেছে যে ছেলেগুলো নিজেদের হাত নিয়েই পাগল হয়ে গেছে। ইশান তো হাত উঁচু করে সবার সামনে ঘুরেই বলছে
— “দেখছো? আমি এখন অফিসিয়ালি হ্যান্ডসাম!”
কাবির সাথে সাথে বললো
— “চুপ কর! তোর হাত দেখে মনে হচ্ছে টমেটো সস পড়ে গেছে!”
আবারও হাসির রোল উঠলো চারপাশে। কিন্তু লিসির চোখে তখন অন্যরকম দুষ্টুমি। চুপচাপ একটা নতুন মেহেদির কোন হাতে নিলো সে।
তারপর…
সোজা গিয়ে বসলো কিরিসের সামনে। মুহূর্তেই পুরো হলরুম নিস্তব্ধ। সব কাজিন একসাথে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। জারা তো ইশানের হাত চেপে ধরে ফিসফিস করলো — “না না… এটা ইতিহাস হতে যাচ্ছে!”
বড়রাও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। সুপ্রিয়া, প্রিয়া, সাবেনা, কাবেনা, মির্জা বেগম, আনোয়ার, আনারুল সবার চোখ এখন ওদের দুজনের দিকে। লিসি ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হেসে বললো — “হাত দিন।”
কিরিস ভুরু কুঁচকে তাকালো হাতে থাকা কফির কাপটা পাশে রাখলো — “কি করবে হাত নিয়ে?”
লিসি একদম নিরীহ মুখ করে বললো — “মেহেদি দিবো।”
এক সেকেন্ড,দুই সেকেন্ড। তারপর পুরো হলরুম ফেটে পড়লো হাসিতে!
রিহান — “কিরিস আর মেহেদি?”
আরোবি— “ইয়া আল্লাহ! এই দৃশ্য দেখার জন্যই বোধহয় বেঁচে ছিলাম!”
সুরভী — “ভাই জন্মের পর থেকে নিজের হাতে ঘড়ি ছাড়া কিছু পরছে?”
ইশান তো সোফা থেকে গড়িয়েই পড়লো হাসতে হাসতে।
কিরিস ঠান্ডা চোখে সবার দিকে তাকালেও তার চোখের কোণে চাপা হাসি লুকানো যাচ্ছে না। সে আবার লিসির দিকে তাকালো।
— “আমি মেহেদি দিবো না।”
লিসি সাথে সাথে ভুরু তুললো।
— “কেন?”
— “ভালো লাগে না।”
— “আমার লাগে।”
— “তোমার হাতে ভালো লাগে। আমার হাতে না।”
— “আচ্ছা?”
লিসি আরো কাছে ঝুঁকে এল।
— “তাহলে একটা জিনিস দেখুন।”
সে ধীরে নিজের ডান হাতটা সামনে ধরলো। সবার চোখ এবার তার হাতের দিকে গেল। তার তালুর সুন্দর ডিজাইনের একপাশে বাঁকা অর্ধেক চাঁদের মতো একটা নকশা আঁকা। লিসি মুচকি হেসে বললো
— “দেখতে পাচ্ছেন?”
কিরিস চুপ।
— “এর অর্ধেকটা আমি আপনার হাতে আঁকার জন্যই খালি রেখেছি।”
নাও আরেক দফা চিৎকার, হাসি, বাঁশি!
— “উফফফ ভাবি!”
— “রোমান্স দেখো!”
— “কিরিস ভাই শেষ!”
হিয়া তো কুশন জড়িয়ে লাফাচ্ছে।
আর কিরিস?
সে কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টিতে শুধু লিসির দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর… খুব ধীরে ঠোঁটের কোণে সেই ভয়ংকর সুন্দর মুচকি হাসিটা ফুটে উঠলো। যে হাসি দেখলে সত্যি বুক কেঁপে ওঠে। ইশান নাটকীয় গলায় বললো—
— “গেলো… ভাই তো খুশ হো গেয়া!”
কাবির মাথা নাড়িয়ে বললো
— “ লিসি , তুই অসম্ভব জিনিসও সম্ভব করতে পারিস ।”
কিরিস এবার আর কিছু না বলে ধীরে নিজের হাতটা এগিয়ে দিলো। পুরো হলরুম একসাথে—
— “ওহহহহহহ!!!”
সত্যি যেন সবাই বিশ্বাসই করতে পারছে না। রায় চৌধুরী বাড়ির সবচেয়ে গম্ভীর, রাগী, ভয়ংকর মানুষটা শেষমেশ মেহেদি দিতে বসেছে। তাও কার জন্য? শুধু লিসির জন্য।
লিসি মুচকি হেসে খুব যত্ন করে তার হাতে ডিজাইন আঁকতে শুরু করলো। কিরিসের চোখ পুরো সময় শুধু তার মুখের উপরেই আটকে। আর সেই দৃশ্যটা দেখে সুপ্রিয়া গর্বভরা হাসি দিয়ে বললেন
— “দেখছো? রায় চৌধুরী বাড়ির বড় বউমার পাওয়ার কাকে বলে?”
প্রিয়া সাথে সাথে হেসে বললো
— “না ভাবি, এটা পাওয়ার না… এটা জাদু!”
চারপাশ আবার হাসিতে ভরে উঠলো।
আর মাঝখানে বসে থাকা কিরিস আর লিসিকে দেখে মনে হচ্ছিল এই রাতটা হয়তো ওদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটা হয়ে থাকবে।
হলরুমের আলো তখন অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে।
বাইরে গভীর রাতের হালকা বাতাস জানালার পর্দাগুলো দুলিয়ে দিচ্ছে। চারদিকে ফুল আর মেহেদির মিশ্র গন্ধ এক অদ্ভুত কোমলতা ছড়িয়ে আছে পরিবেশে। দূরে কেউ আস্তে ভলিউমে গান চালিয়েছে, শব্দ এতটাই মৃদু যে ঠিক শোনা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। মাঝখানে বসে আছে লিসি আর কিরিস। চারপাশে এত মানুষ, এত হাসি, এত গল্প… তবুও যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীটা শুধু ওদের দুজনকে ঘিরেই থেমে আছে। লিসি খুব মন দিয়ে কিরিসের হাতে মেহেদি আঁকছে। তার পাতলা আঙুলগুলো ধীরে ধীরে নকশা টানছে, যেন প্রতিটা রেখার ভেতরে লুকিয়ে আছে না বলা কোনো অনুভূতি।
হালকা বাতাসে তার কপালের সামনের চুলগুলো বারবার মুখের উপর এসে পড়ছে। সে এক হাতে সরানোর চেষ্টা করতেই কিরিস খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দিলো এত ছোট একটা স্পর্শ। কিন্তু লিসির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।
তার আঙুল থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। কিরিস তখন তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে সেই হালকা মুচকি হাসি। যে হাসি খুব কম মানুষ দেখে। যে হাসি ভয়ংকর মানুষটার ভিতরে লুকিয়ে থাকা অদ্ভুত কোমলতাকে প্রকাশ করে। আর সেই হাসিটাই আজ লিসির হৃদয়ে কোথাও গভীরভাবে গিয়ে লাগছে।
সে দ্রুত আবার মেহেদির দিকে মন দিলো। নিজের অনুভূতিগুলো লুকাতে চাইলো। কারণ এই মানুষটার সামনে এলেই কেন যেন তার বুকের ভেতরটা এত অচেনা হয়ে যায়…
মনে হয় কেউ খুব নিঃশব্দে তার সমস্ত পৃথিবীটা নিজের করে নিচ্ছে। চারপাশে কাজিনদের হাসাহাসি চলছে, কিন্তু ওদের দুজনের মাঝখানে যেন অন্য এক নীরবতা।
যে নীরবতায় শব্দের প্রয়োজন হয় না। কিছুক্ষণ পরে লিসি একটু ঘুরে বসল। মেহেদির কোনটা ঠিক করে ধরে কিরিসের হাতের একপাশে কিছু লিখতে শুরু করলো।
কিরিস ভুরু তুলে তাকালো।
— “কি লিখছো?”
লিসি কিছু বললো না। শুধু খুব মন দিয়ে অক্ষরগুলো ঠিক করলো। তারপর ধীরে হাতটা সামনে ধরলো।
কালচে সবুজ মেহেদির উপর সুন্দর করে লেখা—
“ My Wife Lisi ”
এক মুহূর্তের জন্য কিরিস স্থির হয়ে গেল। তার চোখ সেই লেখার উপর থেমে রইলো।
তারপর…
খুব ধীরে ঠোঁটের কোণে আবার সেই মুচকি হাসিটা ফুটে উঠলো। কিন্তু এবার হাসিটার ভিতরে অন্যরকম কিছু ছিল। অদ্ভুত এক তৃপ্তি। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিসটা সে পেয়েছে। কারণ একটা মেয়ে…
তার স্ত্রী…
সব মানুষের সামনে তাকে নিজের বলে লিখে দিয়েছে।
এত সহজ একটা কথা। তবুও একজন ভালোবাসায় পাগল মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় সুখ আর কি হতে পারে? ইশান সাথে সাথে নাটকীয় গলায় বললো
— “ভাইয়া তো পুরো বউয়ের আঁচলে বন্দি!”
কাবির যোগ করলো
— “রায় চৌধুরী সাম্রাজ্যের ডন শেষমেশ ভাবির হাতে অফিশিয়ালি কিডন্যাপ!”
পুরো হলরুম আবার হাসিতে ভরে উঠলো।
কিন্তু লিসি এবার গা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে বসল।
তারপর নিজের হাতটা সামনে তুলে বললো
— “আমার হাতেও তো উনি লিখে দিয়েছেন।”
সবাই তাকালো। তার হাতের মেহেদির মাঝে সত্যিই লেখা— “ My Husband Kiris ”
লিসি ঠোঁট ফুলিয়ে বললো
— “তাহলে শুধু ওনার হাতেই থাকবে কেন? আমি কি একা বিয়ে করেছি নাকি?”
এক সেকেন্ড নীরবতা তারপর—
নুসরাত — “ঠিক কথা!”
আরোবি — “নারী-পুরুষ সমান অধিকার!”
জারা — “ লিসি for the win!”
হাসির রোল পড়ে গেল চারদিকে। সুপ্রিয়া হাসতে হাসতে মাথা নাড়লেন। জারা কুশন দিয়ে ইশানকে মারলো।
আর কিরিস? সে কিছুই বলছে না। শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লিসির মুখের দিকে। তার চোখে সেই দৃষ্টি যেখানে ভয় নেই, রাগ নেই, ক্ষমতার অহংকার নেই।
শুধু গভীর, নিঃশব্দ ভালোবাসা। যে ভালোবাসা শব্দ করে না। শুধু মানুষটার চারপাশে ছায়ার মতো জড়িয়ে থাকে।
লিসি হঠাৎ অনুভব করলো এই মানুষটা তাকে শুধু ভালোবাসে না… সে যেন তাকে নিজের অস্তিত্বের অংশ করে ফেলেছে। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো আজ প্রথমবার সেই অনুভূতিটা ভয় লাগছে না তার।
বরং মনে হচ্ছে কেউ যদি এভাবে সারাজীবন নিজের করে রাখে, তাহলে হয়তো হারিয়ে যেতেও ভালো লাগে।
কিছুক্ষণ পরে রাতের ভোজ শেষ হতে হতে প্রায় সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এক এক করে বাড়ির বড়রা নিজেদের কক্ষে চলে গেছেন। নিচতলার বিশাল হলরুম, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও হাসি-আড্ডার ঢেউ উঠছিল, এখন অনেকটাই নীরব। শুধু দূরে কোথাও থালাবাসন গুছানোর ক্ষীণ শব্দ, আর মাঝে মাঝে রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। কিন্তু রায় চৌধুরী বাড়ির ছেলে- মেয়েদের ঘুম নামক বস্তুটির সাথে যেন আজীবনের শত্রুতা।
রাত যত গভীর হয়, ওদের প্রাণ যেন তত জেগে ওঠে।
ইশান হঠাৎ হাততালি দিয়ে উঠলো
— “চলো ছাদে! এমন পূর্ণিমা রাতে ঘুমানো পাপ!”
ব্যস, আর কে পায়! সবাই কুশন, চিপস, কোল্ড ড্রিংকস নিয়ে দৌড় লাগালো ছাদের দিকে। লিসিকেও টেনে নিয়ে গেল আরোবি । ছাদের উপর হালকা শীতল বাতাস বইছে। পূর্ণিমার চাঁদ যেন সাদা রূপার থালার মতো ঝুলে আছে আকাশের মাঝখানে। দূরের শহর নিস্তব্ধ, শুধু মাঝেমধ্যে কোনো গাড়ির ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে।
সবাই গোল হয়ে বসে গল্প করছে। কেউ পুরনো ঘটনা বলছে, কেউ একে অপরকে খোঁচাচ্ছে।
কেবল একজন নেই,....কিরিস। লিসি একবার চারপাশে তাকিয়েও কিছু বললো না। তবুও অদ্ভুতভাবে তার চোখ যেন কাউকে খুঁজে ফিরছে।
সময় গড়িয়ে আরো গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা প্রায় দুইটা ঊনচল্লিশ ছুঁইছুঁই।
ঠিক তখনই খুব মৃদু একটা শব্দ ভেসে এলো বাতাসে।
টুং…
টাং…
গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়ার কোমল ধ্বনি।
সবাই একসাথে থেমে গেল। ইশান ভুরু কুঁচকে বললো
— “এত রাতে আবার কে গিটার বাজাচ্ছে?”
রিহান সাথে সাথে ফিসফিস করলো—
— “ভূত না তো?”
— “তোর ভূত !”
কাবির নাটকীয় মুখ করে বলতেই সবাই হেসে উঠলো।
কিন্তু শব্দটা আবার ভেসে এলো। এবার একটু স্পষ্ট।
টুং…
টাং…
সুরগুলো এমন অদ্ভুত কোমল যে মনে হচ্ছে রাতের নীরবতা নিজেই যেন সুর হয়ে উঠেছে। সবাই কৌতূহলী হয়ে ছাদের রেলিংয়ের কাছে গিয়ে নিচের দিকে তাকালো। আর তারপর কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন কারো মুখে আর কোনো শব্দ রইলো না। রায় চৌধুরী বাড়ির বিশাল গার্ডেনটা পূর্ণিমার আলোয় রূপকথার মতো লাগছে। শিশিরভেজা ঘাসগুলো রুপালি আভা ছড়াচ্ছে। সারি সারি টিউলিপ ফুল চাঁদের আলোয় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে— লাল, সাদা, গোলাপি, বেগুনি… যেন নিঃশব্দে ফুটে থাকা স্বপ্ন। আর সেই টিউলিপের মাঝখানে বসে আছে কিরিস। টিউলিপ বাগানের মালিক।
কালো পোশাকে মোড়া দীর্ঘদেহী মানুষটা সাদা চাঁদের আলোয় যেন আরো রহস্যময় হয়ে উঠেছে। মাথা সামান্য নিচু, হাতে গিটার। দীর্ঘ আঙুলগুলো ধীরে ধীরে তার ছুঁয়ে সুর মিলাচ্ছে। তার চারপাশে ফুটে থাকা টিউলিপগুলো পর্যন্ত যেন স্থির হয়ে তাকে দেখছে। লিসির বুকটা কেমন অদ্ভুতভাবে ধক করে উঠলো। এমন দৃশ্য সে আগে কখনো দেখেনি। ভয়ংকর, রাগী, নির্মম মানুষটা…
এই গভীর রাতে ফুলের বাগানের মাঝখানে বসে গিটার বাজাচ্ছে। আর সেই দৃশ্যটা এত অস্বাভাবিক সুন্দর যে চোখ সরানো যায় না। আরোবি হঠাৎ পাশে থেকে মুগ্ধ গলায় বলে উঠলো—
— “অবশেষে…”
লিসি তাকালো ওর দিকে। আরোবি মুচকি হেসে বললো—
— “কতদিন পরে আবার ভাইয়ার গান শুনবো রে…”
লিসি অবাক হয়ে বললো—
— “মানে?”
সুরভী হালকা হেসে রেলিংয়ে ভর দিল
— “আরে, ভাইয়া যখন বাড়িতে থাকতো… মাঝে মাঝে এমন মধ্যরাতে হঠাৎ গিটার নিয়ে বসে যেত।”
জারা যোগ করলো
— “আমরা তো ঘুম থেকে উঠে চুপচাপ দাঁড়িয়ে গান শুনতাম।”
ইশান নাটকীয় মুখে বললো
— “কিরিস ভাইয়া কিন্তু ভয়ংকর গান গায়। একদম হার্টে গিয়ে লাগে।”
নিচে কিরিস তখনো গিটারের তারে ধীরে ধীরে আঙুল ছুঁইয়ে চলেছে। মনে হচ্ছে সে কারো জন্য সুর সাজাচ্ছে।
রাতের বাতাস তার এলোমেলো চুল উড়িয়ে দিচ্ছে।
পূর্ণিমার আলো এসে পড়েছে তার তীক্ষ্ণ মুখাবয়বে।
আর লিসি?
সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে মানুষটা যেন কোনো গল্পের চরিত্র। বাস্তবের কেউ না।
যে মানুষকে সবাই ভয় পায়… যার এক দৃষ্টিতে মানুষ কেঁপে ওঠে…
সেই মানুষটাই এখন চাঁদের নিচে বসে এমনভাবে গিটার ছুঁয়ে আছে, যেন তার বুকের ভেতরেও কোনো না বলা কবিতা লুকিয়ে আছে।
লিসির অদ্ভুতভাবে মনে হলো—
কিছু মানুষকে দূর থেকে দেখলে বোঝা যায় না তারা কত গভীর। কিরিস ঠিক পূর্ণিমার রাতের মতো। দূর থেকে শুধু আলো দেখা যায়। কাছে গেলে বোঝা যায় সেই আলোর মাঝেও কত নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে থাকে।
নিচে টিউলিপ বাগানের মাঝখানে বসে থাকা কিরিস ধীরে ধীরে গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়ালো।
টুং…
রাতের নিস্তব্ধতা যেন সেই সুরের কাছে মাথা নত করলো।
পূর্ণিমার আলোয় চারপাশ এতটাই নির্মল লাগছিল, যেন পৃথিবী থেকে সমস্ত কোলাহল মুছে গিয়ে শুধু এই রাতটুকুই বেঁচে আছে। তারপর কিরিস গাইতে শুরু করলো। গভীর, কর্কশ অথচ আশ্চর্য মাদকতা মেশানো কণ্ঠ। যে কণ্ঠে নিঃসঙ্গতা আছে… অপেক্ষা আছে…
অদৃশ্য কোনো ব্যথার দীর্ঘশ্বাস আছে।
— “❝একাকি মন আজ নিরবে
বিবাগী তোমার অনুভবে…
ফেরারি প্রেম খুঁজে ঠিকানা
আকাশে মেঘ মানে বোঝ কিনা…❞”
ছাদের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সবাই মুহূর্তেই নিশ্চুপ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল এই গান শোনার জন্যই বুঝি রাত এত গভীর হয়েছিল। কিরিসের চোখ আধো নত।
আঙুলগুলো ধীরে ধীরে গিটারের তারে সুর তুলছে। তার চারপাশে ফুটে থাকা টিউলিপগুলো পর্যন্ত যেন সেই সুরে স্থির হয়ে আছে।
— “❝বিরহ নীলে নীলে বাঁধে বাসা
অজানা ব্যথায়…
অধরা তারাগুলি কাঁদে বেদনায়…
খেয়ালি তুমি কোথায়…❞”
লিসির বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠলো।
সে জানতো না একজন মানুষের কণ্ঠ এত গভীর হতে পারে। মনে হচ্ছিল প্রতিটা শব্দ কিরিস গাইছে না…
নিজের ভেতর থেকে টেনে বের করছে। হঠাৎ হালকা দমকা বাতাস এলো। কিছুক্ষণ আগেই লিসি নিজের হাঁটু ছোঁয়া দীর্ঘ বেণী খুলে দিয়েছিল। এখন সেই ঘন কালো চুলগুলো বাতাসে উড়ে এলোমেলো হয়ে তার মুখ, কাঁধ, গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। পূর্ণিমার আলো এসে পড়েছে তার মুখের উপর। শাড়ির আঁচল বাতাসে দুলছে। তার বড় বড় চোখদুটো স্থির হয়ে আছে শুধু কিরিসের উপর।
মনে হচ্ছিলো সে গান শুনছে না, সে ডুবে যাচ্ছে। আরোবি একবার লিসির দিকে তাকালো। তারপর নিচে কিরিসের দিকে। আর অদ্ভুতভাবে তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠলো। দৃশ্যটা এমন ছিল যেন—
এক রহস্যময় পুরুষ, রাতের চাঁদের নিচে বসে তার সমস্ত নিঃসঙ্গতা সুরে বেঁধে এক পরীকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করছে।
চারপাশে শুধু টিউলিপের গন্ধ। পূর্ণিমার রুপালি আলো।
আর এক মানুষের কণ্ঠে লুকিয়ে থাকা গভীর প্রেম।
কিরিস তখনো গাইছে—
“একাকি মন আজ নিরবে…”
তার চোখ একবার ধীরে উপরে উঠলো। সোজা গিয়ে থামলো লিসির উপর। মুহূর্তটা এত ক্ষণস্থায়ী ছিল…
তবুও লিসির মনে হলো এই গানটা সে সবার জন্য গাইছে না। শুধু তার জন্য। শুধু তাকে শুনানোর জন্যই এই মধ্যরাতে একজন মানুষ সমস্ত নীরবতাকে সুর বানিয়ে বসে আছে। লিসির বুকের ভিতরে কেমন অদ্ভুত এক আলোড়ন উঠলো। রবীন্দ্রনাথ হয়তো এমন রাত দেখেই লিখেছিলেন—“ মানুষের হৃদয় কখনো কখনো ভাষা হারিয়ে ফেলে, শুধু অনুভূতি হয়ে বেঁচে থাকে। ”
গভীর রাত আরো গভীর হয়েছে। টিউলিপ বাগানের সেই সুর, পূর্ণিমার আলো, গিটারের মাদকতা সবকিছু যেন এখনো বাতাসে ভাসছে। কিন্তু ধীরে ধীরে বাড়িটা সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। কাজিনরা হাসতে হাসতে নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়েছে। করিডোরের আলোও অনেকটাই ম্লান।
শুধু কোথাও কোথাও রাত জেগে থাকা নীরবতা। লিসি ধীরে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো। ঘরটা আধো অন্ধকার।
বারান্দার কাঁচের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে মেঝেতে রুপালি রেখা এঁকে দিয়েছে। কিরিস তখন শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। গিটারের সুরের রেশ যেন এখনো তার আঙুলে লেগে আছে। এলোমেলো চুল, ক্লান্ত অথচ স্থির মুখ, বুকের উপর ছায়া-আলো মিলিয়ে তাকে আরো ভয়ংকর সুন্দর লাগছে। লিসি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইলো। আজ মানুষটাকে তার অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে যে মানুষটাকে সবাই ভয় পায়, তার ভেতরেও এক সমুদ্র নরম অনুভূতি লুকিয়ে আছে।
কিরিস পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো লিসি চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
— “কি?”
তার গলা নিচু, ভারী লিসি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
চোখে এখনো সেই মুগ্ধতা লেগে আছে। তারপর খুব শান্ত গলায় বললো — “আমি যদি কখনো অনেক দিনের জন্য ঘুমিয়ে যাই…”
কিরিসের ভুরু সাথে সাথে কুঁচকে গেল। লিসি হালকা হেসে আবার বললো—
— “তাহলে আমাকে এসে প্রতিদিন এমন সুন্দর সুরে গান শুনাবেন?”
এক মুহূর্ত। ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো।
কিরিস ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। চোখদুটো তীক্ষ্ণ হয়ে গেছে।
— “অনেক দিনের জন্য ঘুমাবে মানে?”
তার গলায় স্পষ্ট অসন্তোষ। লিসি একটু থমকালো।
কিরিস আরো কাছে এসে নিচু স্বরে বললো
— “এমন কথা আবার বলবে না।”
সেই কণ্ঠে রাগ ছিল কিন্তু রাগের নিচে ভয়ও ছিল।
অদ্ভুত এক অধিকার। যেন এই মানুষটা পৃথিবীর সবকিছুর সাথে যুদ্ধ করতে পারবে…
কিন্তু লিসিকে হারানোর কথা সহ্য করতে পারবে না।
লিসির বুকটা কেমন নরম হয়ে গেল। সে কিছু বলার আগেই হঠাৎ কিরিস তাকে কোলে তুলে নিলো।
— “আহ!”
লিসি চমকে তার কাঁধ আঁকড়ে ধরলো।
কিরিস কোনো উত্তর দিলো না। সোজা গিয়ে তাকে বিছানার উপর শুইয়ে দিলো। তারপর ধীরে নিজের শার্ট খুলে পাশে ফেললো। চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার খালি বুকের উপর। তীক্ষ্ণ পেশিগুলো আধো অন্ধকারে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। লিসির বুকের ভিতরটা আবার কেঁপে উঠলো কিরিস ঝুঁকে এলো তার দিকে।