পর্ব :75
ক্ষমতা, অস্ত্র,কালো টাকা,গোপন নেটওয়ার্ক।
রাষ্ট্র ধ্বংস করার মতো তথ্য। সবকিছুর চাবি যেন ওই এক মেয়ের অস্তিত্বের সঙ্গে বাঁধা। লরেঞ্জো নিচু স্বরে বললো—
— “Quei file… saranno miei.”
(“ওই ফাইলগুলো… আমার হবে।”)
তার কণ্ঠে এমন নিশ্চিততা ছিল, যেন সে ইতোমধ্যেই সবকিছু নিজের করে ফেলেছে। কিন্তু ঠিক তখনই পাশে দাঁড়ানো লোকটা দ্বিধাভরা কণ্ঠে বললো
— “Don… c’è un problema.”
(“ডন… একটা সমস্যা আছে।”)
লরেঞ্জোর চোখ ধীরে তার দিকে ঘুরলো। সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যেটা দেখে লোকটার কপালে ঠান্ডা ঘাম জমে গেল।
— “Parla.”
(“বল।”)
— “Sappiamo solo che è viva… ma non sappiamo dove sia… né con chi.”
(“আমরা শুধু জানি সে বেঁচে আছে… কিন্তু কোথায় আছে, কার সঙ্গে আছে— কিছুই জানা যায়নি।”)
— “Ogni volta che proviamo ad avvicinarci… troviamo solo morte.”
(“প্রতিবার আমরা তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি… শুধু মৃত্যু পেয়েছি।”)
ঘর নিস্তব্ধ। লরেঞ্জো ধীরে ধীরে মাথা কাত করলো।
— “Chi è lui?”
(“সে কে?”)
লোকটা গলা শুকিয়ে আসা স্বরে বললো—
— “Non lo sappiamo… ma chiunque sia…”
(“আমরা জানি না… কিন্তু সে যেই হোক…”)
— “Sta proteggendo quella ragazza come se fosse l’ultima cosa sacra rimasta in questo mondo.”
(“সে মেয়েটাকে এমনভাবে রক্ষা করছে, যেন এই পৃথিবীতে সেটাই তার শেষ পবিত্র জিনিস।”)
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর লরেঞ্জো হাসলো।
ধীরে। ভয়ংকরভাবে।
— “Allora uccideremo anche il suo Dio.”
(“তাহলে আমরা তার ঈশ্বরকেও হত্যা করবো।”)
কিন্তু তারা জানত না যে মানুষটার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে যাচ্ছে তারা… সে কোনো সাধারণ রক্ষাকর্তা নয়।
সে এমন এক অন্ধকার যার সামনে ইতালিয়ান মাফিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর নামগুলোও একদিন নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবে কিরিস।একটা নাম, যেটা এখনো তাদের টেবিলে পুরোপুরি উচ্চারিত হয়নি… কিন্তু খুব শীঘ্রই
সেই নামটাই তাদের সাম্রাজ্যের শেষ আতঙ্ক হয়ে উঠবে।
ঘটনা ঘুরিয়া আবার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, ঢাকার ভিতরে গড়ে উঠা রায় চৌধুরী নিবাসের গার্ডেনের সামনের টেরিস, মার্ক আর কিরিস এখনো বসে আছে মার্কের বয়স এই ৪০-৪৫ হবে, দেখতে গেলে লিসির বাবার বয়সী। মার্ক এক নজরে তাকিয়ে আছে লিসির মুখে, এই মেয়েটা যেন কিছুদিন আগেই তার বাবা মায়ের সঙ্গে ছিলো। স্মৃতির পাতায় ধাক্কা লাগল মার্ককের, সেদিন তার কথা খুব করে মনে পড়ছে এখন নিজের মস্তিষ্ককে থামাতে পারছে না সেই ঘটনার কল্পনা করা থেকে সে মর্মান্তিক ঘটনাকে বারবার তারে চঞ্চল মস্তিষ্ক দৌড়াচ্ছে।
.....................
সেদিনের সকালটা ছিল অদ্ভুত শান্ত। আকাশজুড়ে ছিল নরম রোদ, হালকা বাতাসে কাশফুল দুলছিল পথের ধারে, আর দূরে কোথাও গ্রামের মসজিদ থেকে ভেসে আসছিল আসরের আগের মৃদু আজান। একটা সাধারণ দিনের মতোই লাগছিল সবকিছু। কিন্তু মানুষ কখনো বুঝতে পারে না কোন সকাল তার জীবনের শেষ সকাল হয়ে উঠবে। আবাস খান গাড়ি চালাচ্ছিল। তার পাশে বসে ছিল আমেনা। পিছনের সিটে ছোট্ট লিসি জানালার বাইরে মুখ বের করে মুগ্ধ চোখে চারপাশ দেখছিল।
আজ তারা গ্রামের দিকে যাচ্ছে। পাঁচ বছর। পুরো পাঁচ বছর লেগেছিল তাদের সম্পর্কটা পরিবারকে মানাতে।
লড়াই… অভিমান… সম্পর্ক ভাঙা…
অসংখ্য অপমানের পর অবশেষে দুই পরিবার মাথা নত করেছিল তাদের ভালোবাসার সামনে। আমেনা মা মির্জা বেগম আর আবাসের বাবা আকবর খান তাদের সম্পর্ক মেনে নিয়েছে।
আজ আমেনা খুশি। ভীষণ খুশি। মায়ের সঙ্গে দেখা হবে।
নিজের মানুষদের সঙ্গে আবার সম্পর্ক জোড়া লাগবে।
সে হেসে বলছিল
— “জানো আবাস… মা আজ আমাকে দেখে কাঁদবে।”
আবাস তাকিয়ে মৃদু হেসেছিল। এই মানুষটাকে বাইরে থেকে দেখলে কেউ কখনো বুঝতে পারত না তার ভেতরে কতটা অন্ধকার লুকিয়ে আছে। সাধারণ চাকরিজীবী।
শান্ত স্বভাবের মানুষ। চোখে চশমা, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
কিন্তু এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ছদ্মবেশ। কারণ আবাস খান শুধু একজন মানুষ ছিল না। সে ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে ভয়ংকর ডিটেকটিভ।
একটা জীবন্ত আর্কাইভ। মাফিয়া জগতের প্রতিটা গোপন রুট,কালো টাকার হিসাব, অস্ত্র পাচারের মানচিত্র,
কারা কাকে হত্যা করেছে, কারা কাকে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সবকিছুর তথ্য ছিল তার কাছে। এমনকি পৃথিবীর বড় বড় মাফিয়া পরিবারও ভয় পেত তাকে।
কারণ বন্দুকের গুলি এড়িয়ে বাঁচা যায়…
কিন্তু তথ্য?
তথ্য একবার ভুল হাতে চলে গেলে পুরো সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আর এই ভয়ংকর সত্যটা জানত মাত্র একজন মানুষ। মার্ক ফেরেডো। আবাসের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। বাবা আস্ট্রেলিয়ান আর মা বাংলাদেশি যার জন্য মার্ক ইংরেজি আর বাংলা দুইটা ভাষাই পানির মতো বলতে পারে। গাড়ির ভেতরে তখনও হাসির আবহ।
লিসি ছোট্ট হাতে বাবার কাঁধ নাড়িয়ে বলছিল
— “আব্বু, আমরা আর কতক্ষণে পৌঁছাবো?”
আবাস আয়নায় মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছিল।
মুখে হাসি রেখেও বলে —“ এই তো আমার doll princess আর একটু, প্রথমে তোমার নানু বাড়ি যাবো তারপর তোমার দাদু বাড়ি। ”
ছোট লিসি আনন্দে নেচে উঠে বলে —“ ইয়ে আজকে প্রথম বার নানু দাদুকে দেখবো বাবা ”
কিন্তু ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠলো।
স্ক্রিনের নামটা দেখেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এলো — “Abas… RUN!”
মাত্র একটা শব্দ কিন্তু সেই এক শব্দই যথেষ্ট ছিল।
আবাসের চোখ মুহূর্তে বদলে গেল। তার অভিজ্ঞতা বুঝে ফেলেছিল শেষ এসে গেছে। সে ধীরে চারপাশে তাকালো।
পিছনে একটা কালো ট্রাক। ডানপাশে আরেকটা।
সামনের মোড়েও অস্বাভাবিক নড়াচড়া। তার বুকের ভেতর তখন হঠাৎ ভয় নয় অদ্ভুত এক শূন্যতা জন্ম নিল।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল… তাদের আর সময় নেই।
আমেনা তার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো — “কি হয়েছে?”
আভাস কয়েক সেকেন্ড চুপ রইলো। তারপর ধীরে গাড়িটা চার রাস্তার মোড়ে থামালো। সেই মুহূর্তে সময় যেন ধীর হয়ে গেল। সে পিছনে ফিরে ছোট্ট লিসিকে বুকের ভেতর টেনে নিল। এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, যেন নিজের শরীরের ভেতর লুকিয়ে ফেলতে চায় মেয়েটাকে।
তার হাত কাঁপছিল। কিন্তু মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করছিল সে— “ My doll princess … ভয় পাবে না, ঠিক আছে? ভালোভাবে থাকবে, সবসময় খুশি থাকবে, আমরা তোমার সাথে সবসময় আছি সোনা ”
ছোট্ট লিসি কিছুই বুঝতে পারছিল না। আবাস মেয়ের কপালে চুমু খেল। তারপর আমেনার দিকে তাকালো।
সেই দৃষ্টিতে হাজারটা অপূর্ণ জীবন জমে ছিল। সে ধীরে ঝুঁকে আমেনার কপাল ছুঁয়ে দিল ঠোঁটে। আমেনাকে সে কলেজে প্রথম দেখে প্রেমে পরেছিলো, তাকে প্রপোজ করলে আমেনা রাজি হয়, দুইটা বছর তারা প্রেম করে, কিন্তু বিয়ে কথা বাড়ি যানাতে সবাই নারাজ, কেউ রাজি হয়নি যার জন্য তারা পালিয়ে যায়। একটা ছোট সংসার গড়ে তোলে, আমেনা বিশন সুন্দরী ছিলো আবাসও দেখতে মাশাল্লাহ, যার জন্য তাদের কোল আলো করে পূর্নিমার রাতে লিসির জন্ম হয়, আদর করে নিজের পছন্দের ঠিক করে রাখা নামটা রাখে ' লিসি শার্মা ' আবাস তার নিজের মেয়েকে কোল জুড়ে রাখে। ৫ বছরের সম্পর্ক তাদের আমেনা কখনো আবাসের কোনো কিছু নিয়ে নারাজ হয়নি সবটা হাসিমুখে মেনে নিয়েছে। আবাস আমেনার মুখ পানে চেনে আছে তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল — “ক্ষমা করো… তোমাকে সুখে রাখতে পারলাম না…”
আমেনা তখনও হাসছিল অদ্ভুত শান্ত একটা হাসি।
চোখে পানি থাকলেও সেখানে অভিযোগ ছিল না।
শুধু ভালোবাসা ছিল। সে আলতো করে আবাসের মুখ ছুঁয়ে বললো — “আরে পাগল… ভালোবেসেছো তুমি। এক মুহূর্তের জন্য হলেও যে সুখ তুমি আমাকে দিয়েছো… সেটা আমার পুরো জীবনের জন্য যথেষ্ট।”
আবাসের চোখ ভিজে উঠলো আমেনাকে আঁকড়ে ধরলো নিজের বুকে, দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে আছে চোখে ভালোবাসার পানির বিন্দু ঠিক তখনই চারদিক থেকে চারটা বিশাল ট্রাক ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এলো। সবকিছু পরিকল্পিত নিখুঁত। পালানোর কোনো পথ নেই।
আবাস শেষ শক্তিটুকু দিয়ে লিসিকে গাড়ির বাইরে ছুঁড়ে দিল রাস্তার পাশের নির্মাণাধীন বালুর ঢিবির দিকে।
ছোট্ট শরীরটা বালুর ওপর গিয়ে পড়ে কেঁদে উঠলো।
তার ছোট্ট হাতে ব্যথা লেগেছিল হাঁটু ছড়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সে কিছুই বুঝে ওঠার আগেই পৃথিবী কেঁপে উঠলো।
বিকট বিস্ফোরণ, আগুন, ধোঁয়া, লোহার টুকরো।
মানুষের চিৎকার। চারটা ট্রাক একসঙ্গে ছোট্ট গাড়িটার ওপর উঠে গেল এক মুহূর্তে সব শেষ। যে গাড়ির ভেতর কিছুক্ষণ আগেও হাসি ছিল… স্বপ্ন ছিল… ভবিষ্যৎ ছিল…
সেই গাড়িটা এখন আগুনে পুড়ে যাওয়া এক বিকৃত লোহার স্তূপ। চারপাশে মানুষ দৌড়াচ্ছিল কেউ পানি আনছিল কেউ চিৎকার করছিল আর দূরে বালুর ওপর বসে ছোট্ট লিসি কাঁদছিল সে শুধু আগুন দেখছিল আর বারবার বলছিল—
— “ mama,, mam.mam..…?”
— “ papa.. Papa..pa.pa …?”
কিন্তু সেদিন আগুনের ভেতর থেকে আর কেউ ফিরে আসেনি।
বিস্ফোরণের সেই ভয়ংকর শব্দটার পর চারপাশ যেন মুহূর্তেই নরকে পরিণত হয়েছিল আগুন জ্বলছিল।
মানুষ দৌড়াচ্ছিল কেউ চিৎকার করছিল, কেউ পানি আনছিল, কেউ মোবাইলে ভিডিও করছিল কিন্তু সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেও একটা ছোট্ট শরীর নিথর হয়ে পড়ে ছিল বালুর ঢিবির পাশে, লিসি। তার ছোট্ট কপালটা কেটে রক্ত নেমে এসেছে। চোখ দুটো আধখোলা। ভয় আর কান্নার ধাক্কায় সে অজ্ঞান হয়ে গেছে। ঠিক তখনই কালো গাড়িটা হঠাৎ ব্রেক কষে থামলো রাস্তার পাশে। মার্ক ফেরেডো। গাড়ি থেকে নামতেই তার চোখ পড়ে আগুনে জ্বলতে থাকা গাড়িটার দিকে। আর মাত্র এক সেকেন্ড…
এক সেকেন্ডেই যেন তার পুরো পৃথিবীটা থেমে গেল।
তার বুকের ভেতর কেউ যেন নিষ্ঠুরভাবে কিছু ছিঁড়ে ফেললো।
— “ABAAAAAAAAS!!”
চিৎকারটা বের হয়েছিল, কিন্তু সেই চিৎকারে আর কোনো মানুষকে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা ছিল না।
মার্ক দৌড়ে আগুনের দিকে এগোতে গিয়েও থেমে গেল।
অসম্ভব সব শেষ হয়ে গেছে। তার কাঁধ কাঁপছিল।
শ্বাস ভারী হয়ে উঠছিল তার বড্ড ইচ্ছে করছিল হাউমাউ করে কাঁদতে। এমনভাবে কাঁদতে, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সব যন্ত্রণা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু সে পারছিল না। কারণ পুরুষ মানুষদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় কান্না লুকিয়ে রাখতে হয়। ব্যথা গিলে ফেলতে হয়। কিন্তু কিছু কিছু শোক আছে, যেগুলো মানুষের সমস্ত শেখানো শক্তিকে ভেঙে দেয়।
আর আজ… মার্ক ভেঙে গিয়েছিল। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো রাস্তায়। তারপর সত্যিই একটা শিশুর মতো কেঁদে উঠলো। অসংযত, অসহায়,ভাঙা। কারণ আভাস শুধু তার বন্ধু ছিল না। নিজের রক্তের সম্পর্কের থেকেও কাছের ছিল মানুষটা। আর আমেনা… সে ছিল তার নিজের বোনের মতো। তার পরিবারের অংশ। কিছুক্ষণ আগেও যারা হাসছিল… স্বপ্ন দেখছিল… ভবিষ্যতের কথা বলছিল… তারা এখন আগুনের ভেতর ছাই হয়ে যাচ্ছে।
আর সে… সে কিছুই করতে পারলো না। কিছুই না।তারপরই হঠাৎ তার চোখ পড়লো বালুর ঢিবির পাশে পড়ে থাকা ছোট্ট শরীরটার দিকে লিসি। মার্ক দৌড়ে গিয়ে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিল। ছোট্ট শরীরটা কাঁপছিল।
মুখে ধুলো লেগে আছে। চোখ বন্ধ। মার্ক তাকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরলো। তার গলা কেঁপে উঠলো
— “তুই বাঁচবি মা… তুই বাঁচতেই হবে…”
কারণ এই ছোট্ট প্রাণটাই এখন আভাস আর আমেনার ভালোবাসার শেষ অস্তিত্ব। তাদের শেষ চিহ্ন শেষ নিঃশ্বাস। মার্ক দেরি করেনি। সে লিসিকে নিয়ে পাশের হাসপাতালে ছুটে যায়। হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে তার হাত তখনও কাঁপছিল। ডাক্তারেরা ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে ভেতরে চলে গেলে সে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করলো। তারপর ফোন বের করলো।
ওপাশে কল রিসিভ হতেই ভাঙা গলায় বললো—
— “মির্জা বেগম বলছেন …”
কথাটা বলতেই তার গলা আটকে গেল। কিছু সেকেন্ড পর সে কোনোমতে বললো
— “এক্সিডেন্ট হয়েছে…”
ওপাশে নীরবতা। তারপর একটা অসহায় মায়ের কাঁপা কণ্ঠ — “আমার মেয়ে…?”
মার্ক চোখ বন্ধ করলো তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।
— “ওরা… আর নেই…শুধু তাদের একমাত্র মেয়ে বেঁচে আছে এখন হাসপাতালে। আমি ঠিকানা দিচ্ছি চলে আসেন।”
সেদিন রাতেই একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাছে লিসি মারা গেছে। পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেছে। এটাই বিশ্বাস করানো হয়েছিল সবাইকে।
কারণ সত্যিটা বেঁচে থাকলে, মেয়েটা কখনো বাঁচতে পারত না। তাই তার অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয়েছিল।
ফাইল থেকে। নেটওয়ার্ক থেকে। স্মৃতি থেকে। দুনিয়ার কাছে লিসি মৃত।
কিন্তু আজ… এত বছর পর সেই মেয়েটাই আবার জীবন্ত হয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। মার্কের চোখের সামনে সেই একই চোখ, একই মুখ, একই হাসি। তার চোখ ভিজে উঠলো।
কল্পনার ভেতর থেকে বাস্তবে ফিরতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো তার। সে ধীরে সামনে তাকালো। কিরিস তখন নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিরিস সব বুঝে গিয়েছিল। সে ধীরে মার্কের কাঁধে হাত রাখলো।
তার কণ্ঠ সবসময়কার মতোই শান্ত গভীর।
— “চিন্তা করো না, Mark… কিছু ভালোবাসা এত সহজে শেষ হয় না।”
মার্ক চুপ করে রইলো। কিরিস জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে বললো — “ওরা মারা যায়নি… ওরা লিসির ভেতর এখনও বেঁচে আছে।”
কিছু সেকেন্ড থেমে সে আবার বললো
— “আর যতদিন আমি আছি… কেউ ওদের শেষ অস্তিত্বের দিকে চোখ তুলেও তাকাতে পারবে না।”
ঘরের বাতাস নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারণ মার্ক জানত
কিরিস কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না।সে যা বলে…
তা ঘটিয়েই ছাড়ে। স্মৃতির ভারী অন্ধকার থেকে নিজেকে টেনে তুলতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো মার্কের।
চোখের কোণের জলটা আঙুলের পিঠে মুছে নিতেই কিরিস ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো তার মুখে আবার সেই পরিচিত স্থিরতা যেন কিছুই হয়নি। যেন কয়েক মুহূর্ত আগেও এই জায়গায় অতীতের রক্তাক্ত ইতিহাস ভেসে বেড়াচ্ছিল না। সে শার্টের শার নাম্বার বোতাম লাগাতে লাগাতে শান্ত গলায় বললো— “চলো নিচে।”
মার্ক ভ্রু কুঁচকালো। কিরিস ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি টেনে বাইরে তাকালো। গার্ডেনে আলো ঝলমল করছে।
মেহেদির অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে চারপাশে হাসির শব্দ।
গানের সুর মেয়েদের চুড়ির টুংটাং আওয়াজ। আর সেই ভিড়ের মাঝেই ঢুকে পড়েছে কয়েকটা মুখ যাদের চোখে আনন্দ নেই। শুধু শিকারির ক্ষুধা আছে। কিরিস নিচু স্বরে বললো — “দেখছো ওদের?”
মার্কের চোখ মুহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেল। সে বুঝে গেছে।
ইতালিয়ানদের লোক। নরকের দূতেরা অবশেষে দরজায় এসে পৌঁছেছে। কিরিস ধীরে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললো — “মনে হচ্ছে… নরকের হাওয়া খেতে চলে এসেছে।”
তার কণ্ঠে এমন এক ভয়ংকর শান্তি ছিল, যেটা সাধারণ মানুষ বুঝবে না। কারণ কিরিস যত শান্ত থাকে…
মৃত্যু তত কাছে চলে আসে। নিচে নামতেই উৎসবের উষ্ণতা যেন মুহূর্তের জন্য চারপাশ ঢেকে দিল। গানের তালে মেয়েরা হাসছে। মেহেদির গন্ধ বাতাসে মিশে আছে।
রঙিন আলোয় পুরো গার্ডেনটা স্বপ্নের মতো লাগছে।
আর ঠিক সেই স্বপ্নের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা বিষাক্ত ছায়া। কিরিস একবারও সরাসরি তাদের দিকে তাকালো না। শুধু হাতের আঙুল সামান্য নাড়ালো। ইশারা এক সেকেন্ড। রিহান বুঝে গেল। কাবির বুঝে গেল। ইশানও। চারজনের চোখে একইসঙ্গে হিমশীতল ভাব নেমে এলো। কারণ তারা জানে এই ইশারার মানে কী।
“সরিয়ে ফেলো।”
কিন্তু এমনভাবে…
যেন উৎসবের হাসিতে এক ফোঁটা আঁচড়ও না পড়ে।
স্বাভাবিক মুখ রেখে অস্বাভাবিক কাজ করতে হবে।
এই শিক্ষাটা তারা কিরিসের কাছ থেকেই পেয়েছে।
রিহান হেসে এক লোকের কাঁধে হাত রাখলো
— “Brother, come… drinks side ওদিকে।”
লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাবির আর ইশান খুব স্বাভাবিকভাবে তাকে ভিড় থেকে আলাদা করে নিয়ে গেল। একজন, তারপর আরেকজন,তারপর আরেকজন। গার্ডেনের পেছনের মার্বেল সাজানো করিডোরটা আলো-আঁধারিতে প্রায় ফাঁকা। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না। শুধু মাঝে মাঝে চাপা গোঙানির শব্দ ভেসে আসে। একজনের মুখ মার্বেলের দেয়ালে এমনভাবে চেপে ধরা হলো যে দাঁত ভেঙে রক্ত গড়িয়ে পড়লো। আরেকজনের গলা পেছন থেকে টেনে ধরা
এত নিখুঁতভাবে, যেন সে চিৎকার করার সুযোগই না পায়। ইশান ঠান্ডা চোখে লোকটার হাত ভেঙে দিল।
একটা হাড় ভাঙার শব্দ হলো। কিন্তু সামনে মেহেদির গানের শব্দে সেটা চাপা পড়ে গেল ভয়ংকর, নিখুঁত, নীরব। ঠিক কিরিসের মতো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনজন মাটিতে পড়ে ছিল। নড়ছে না শুধু একজন বেঁচে ছিল। ইচ্ছাকৃতভাবে। কারণ কিরিস কখনো পুরো ঝাঁক মারে না। একটা শিকারকে বাঁচিয়ে রাখে ভয় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। লোকটার ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে।
চোখে আতঙ্ক। সে কাঁপা গলায় বললো
— “W-we were just ordered to watch the girl…”
কিরিস তখন ধীরে ধীরে সামনে এলো। তার শার্টের হাতা গোটানো। চোখে কোনো রাগ নেই। শুধু ভয়ংকর স্থিরতা।
সে লোকটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। তারপর খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো
— “লিসির পেছনে কেন?”
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে বললো
— “T-the files…”
কিরিস কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর ধীরে মাথা কাত করলো।
— “ভুল।”
লোকটা থমকে গেল। কিরিস ঠোঁটের কোণে হাসলো।
— “তোমাদের সবচেয়ে বড় ভুল জানো কী?”
সে লোকটার কলার চেপে কাছে টেনে আনলো।
তার কণ্ঠ এবার ফিসফিসের মতো নিচু। কিন্তু সেই নিচু স্বরটাই মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর লাগছিল।
— “তোমরা ফাইলের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে ভুলে গেছো…ওটা কোনো ফাইল না।.... ওটা…”
তার চোখ ধীরে গার্ডেনের দিকে ঘুরলো। যেখানে লিসি হাসছে।
“…আমার। আমার লিসি। আমার বউ, আমার জীবন ”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর লোকটা হঠাৎ সুযোগ বুঝে কিরিসকে ধাক্কা দিয়ে উঠে দৌড় দিল। সোজা গার্ডেনের দিকে। লিসির দিকে মার্ক চমকে উঠলো
— “KIRIS!”
কিন্তু…
কিরিস নড়লো না। সে শুধু স্থির চোখে লোকটার দৌড়ানো দেখছিল। তারপর ধীরে নিজের কব্জির ঘড়িটা ঠিক করলো। আর ঠিক পরের সেকেন্ডেই
“ঠাস!” সাইলেন্স লাগানো বন্দুক যার জন্য বাড়তি শব্দ হলো না শুধু গুলির শব্দ। লোকটার শরীর মাঝপথে থেমে গেল। তার কপালের মাঝখান দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। সে ধীরে মাটিতে পড়ে গেল। পুরো গার্ডেনে তখনও গান বাজছে। কেউ কিছু বুঝতেই পারেনি।
দূরের ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে স্নাইপার গান নামালো একজন লোক । কিরিস ধীরে মৃতদেহটার দিকে তাকালো তারপর নিচু স্বরে বললো
— “আমি বলেছিলাম না, Mark…আমার সামনে দিয়ে কেউ ওর দিকে হাত বাড়াতে পারে না।”
তার চোখে তখন এমন এক অন্ধকার নেমে এসেছিল
যেটা দেখে মনে হচ্ছিল, আজ রাতের পর ইতালিয়ান মাফিয়া বুঝবে তারা ভুল দরজায় কড়া নেড়েছে।
তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে লিসি লাশটা থেকে একটু দূরে। মেহেদির গাঢ় রঙে রাঙানো দুই হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে লিসি। চুড়িগুলো টুংটাং শব্দ করছে হালকা নড়াচড়ায়। মুখে সেই চিরচেনা প্রাণবন্ত হাসি। চারপাশে মেয়েদের হৈচৈ, গানের তালে নাচ, আলোয় ঝলমল করা সন্ধ্যা সব মিলিয়ে যেন স্বপ্নের মতো একটা মুহূর্ত। লিসি ঠোঁট ফুলিয়ে হাত দুটো বাতাসে নাড়ছিল।
— “উফফ… শুকাতেই চাচ্ছে না!”
তার পাশেই আরোবি হেসে উঠলো। ঠিক তখনই পেছনের দিক থেকে খুব অস্বাভাবিক একটা শব্দ এলো। কিছুক্ষন আগেই পিছন দিক থেকে কিছু ভারী জিনিস পড়ে যাওয়ার মতো। লিসির ভ্রু কুঁচকে গেল। স্বাভাবিকভাবেই সে মাথা ঘুরাতে নিল কিন্তু তার আগেই…
এক জোড়া শক্ত বাহু পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
হঠাৎ স্পর্শে লিসি সামান্য চমকে উঠলো। কিরিস।
তার বুকের শক্ত উষ্ণতা মুহূর্তেই লিসিকে ঢেকে ফেললো।
সে পেছন থেকে লিসির দুই হাতের ফাঁকে নিজের হাত রেখে ধীরে তাকে থামিয়ে দিল। তারপর মাথা নিচু করে লিসির ঘাড়ের কাছে মুখ আনলো। তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা লিসির কানের পাশে ছুঁয়ে গেল। গভীর, নিচু, অদ্ভুত শান্ত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো
— “Sweetheart… আমি যখন তোমার সঙ্গে থাকবো…কখনো পেছনে তাকাবে না। ”
লিসি হতভম্ব হয়ে চোখ পিটপিট করলো।
কিরিস আরো কাছে ঝুঁকল।তার কণ্ঠ এবার ফিসফিসের থেকেও নিচু
— “তোমার পেছনে যদি পুরো দুনিয়াটাও ধ্বংস হয়ে যায়… মানুষ মরে পড়ে থাকে… চারপাশ রক্তে ভেসে যায়… তবুও তুমি পেছনে তাকাবে না।”
লিসির নিঃশ্বাস আটকে গেল কিরিস ধীরে তার কানের পাশে বললো
— “কেউ তোমার নাম ধরে ডাকলেও না… তুমি শুধু একটাই আওয়াজের দিকে ফিরবে।”
সে থামলো। তারপর খুব আস্তে বললো
— “তোমার পুরুষের আওয়াজ।”
লিসি এবার একটু কাঁপা গলায় বললো
— “মানে…?”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হালকা হাসলো। কিন্তু সেই হাসির গভীরে কী ভয়ংকর অন্ধকার লুকিয়ে আছে, সেটা লিসি বুঝতে পারলো না। সে শুধু লিসির হাত দুটো আরো উঁচু করে ধরে সামনে ঠেলে নিয়ে যেতে লাগলো।
— “মানে হচ্ছে… তোমার কাজ শুধু সামনে হাঁটা। পেছনের সবকিছু সামলানোর জন্য আমি আছি।”
কথাগুলো বলার ভঙ্গিটা এতটাই স্বাভাবিক ছিল, যেন সে কোনো সাধারণ কথা বলছে। যেন কয়েক সেকেন্ড আগেই তাদের পেছনে একটা মৃতদেহ মাটিতে পড়ে যায়নি।
লিসি মুখ বাঁকিয়ে বললো
— “আচ্ছা ঠিক আছে, কিন্তু হাত দুটো ব্যথা হয়ে যাচ্ছে!”
কিরিস এবার সত্যি হেসে ফেললো। তারপর ঠোঁট টিপে বললো — “মেহেদি দিয়েছো, চুপচাপ বসে থাকবে। নড়াচড়া কম।”
সে ধীরে লিসিকে সবার মাঝখানে এনে বসিয়ে দিল আরোবিদের পাশে। আরোবি সাথে সাথে বললো
— “ লিসি , হাত নামিয়েন না কিন্তু!”
লিসি বিরক্ত মুখে বললো
— “ আরে এমনি সিম্পল ডিজাইন দিলে এতো কষ্ট করা লাগতো না, কিন্তু এই যে আমার ওনি ব্রাইডাল ডিজাইন দিতে বলেছে ”
কিরিস লিসির কথায় মুচকি হাসলো বলে উঠলো —“ তোমারই তো ওনি আর কার হবে হুম ”
নাও পাশে থাকা বোন কয়টার তো হাসি বন্ধ হচ্ছে না কিরিসের কথায় হাসছে ঠোঁট চেপে। লিসি এবার কিরিসের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে —
“ উফ.... তোমরা কেউ আমাকে একটু খাইয়ে দাও আগে!”
কিরিস ভ্রু তুললো — “খিদে পেয়েছে?”
লিসির চোখ চকচক করে উঠলো — “অনেক।”
এই একটা জায়গায় মেয়েটা একদম বাচ্চা। খাবারের কথা আসলেই তার সমস্ত মনোযোগ সেদিকে চলে যায়।
কিরিসের মতো খুঁতখুঁতে নয় সে। বরং খেতে ভীষণ ভালোবাসে। দিনের যেকোনো সময় তাকে জিজ্ঞেস করা হলে সে খেতে রাজি। কিরিস নিচু হয়ে তার কপালের সামনে ঝুলে থাকা চুল সরিয়ে দিল। তারপর শান্ত গলায় বললো — “ঠিক আছে, আমি তোমার জন্য pastry cake এনে দিচ্ছি।”
লিসির মুখ সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে গেল
— “সত্যি?”
কিরিস মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
তারপর একবার পেছনে তাকালো। দূরে অন্ধকার কোণায় পড়ে থাকা মৃতদেহটা ইতোমধ্যেই সরিয়ে ফেলা হচ্ছে রক্তের দাগও মুছে গেছে। যেন কিছুই ঘটেনি।
কিরিস আবার সামনে তাকালো। সামনে বসে থাকা মেয়েটা তখন আরোবিদের সঙ্গে হেসে কথা বলছে।
হাতে মেহেদি চোখে আলো। আর কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। কারণ পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকারের মাঝেও এই মেয়েটার হাসিটাই ছিল তার কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক দুর্বলতা।
রাতটা তখনও উৎসবের রঙে ভরা। গার্ডেনে আলো ঝলমল করছে, মেহেদির গন্ধ আর ফুলের সুবাসে পুরো পরিবেশটা যেন নরম স্বপ্নের মতো। লিসি একপাশে বসে আছে, হাতে এখনও হালকা মেহেদির আভা। চোখদুটো উজ্জ্বল, আর মুখে সেই চিরচেনা বাচ্চা বাচ্চা এক্সাইটমেন্ট — “কেকটা কোথায় গেল?”
ঠিক তখনই কিরিস ফিরে এলো। হাতে ছোট একটা সাদা বক্স। একদম শান্ত ভঙ্গিতে হাঁটছে, যেন এই ভিড়, এই আলো, এই হাসি সবকিছুর মাঝেও তার পৃথিবীটা শুধু একটা মানুষকেই ঘিরে। লিসি সাথে সাথে উঠে দাঁড়াতে নিল — “আসছে! আসছে!”
কিন্তু কিরিস চোখ কুঁচকে হালকা ইশারা করলো
— “বসো।”
লিসি আবার ধপ করে বসে পড়লো, মুখ ফুলিয়ে
— “সবসময় বসিয়ে দেন কেন?”
কিরিস কিছু বললো না শুধু সামনে এসে ধীরে বক্সটা খুললো ভেতরে ছোট্ট একটা কেক উপরটা সাদা ক্রিমে ঢাকা, পাশে ছোট ছোট গোলাপের মতো সাজানো।
লিসির চোখ একদম জ্বলে উঠলো।
— “ওয়াও…”
আরোবি পাশ থেকে হেসে বললো—
— “ লিসি তুই তো একদম বাচ্চা হয়ে যাচ্ছিস!”
লিসি কাঁধ নাচিয়ে বললো
— “আমি তো বাচ্চাই!”
কিরিস হালকা মাথা নেড়ে একটা প্লেট বের করলো।
একটা ছোট টুকরো কেটে চামচে তুলে লিসির দিকে ধরলো। লিসি সাথে সাথে মুখ বড় করে এগিয়ে এলো
— “দাও দাও!”
কিন্তু কিরিস থামলো চোখ সরু করে বললো
— “ধীরে।”
লিসি চোখ ঘুরিয়ে নাটকীয়ভাবে বললো
— “আমি তো ধীরে খাই!”
কিরিস কিছু না বলে চামচটা তার মুখের কাছে নিয়ে গেল। লিসি কেক খাওয়ার সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেললো — “হুমমম… অসাধারণ!”
তারপর আবার একটা বড় কামড় দিতে চায় কিন্তু কিরিস হালকা করে তার কপালে টোকা দিল।
— “ছোট ছোট কামড়।”
লিসি বিরক্ত মুখে বললো
— “ আপনি সবসময় নিয়ম বানান কেন? ছোট ছোটকরে খেলে আমার খিদে মিটবে না ”
কিরিস এবার একটু বাঁকা হাসি দিল
— “কারণ তুমি নিয়ম মানো না, তাই বানাতে হয় ”
এই কথা শুনে চারপাশে সবাই হেসে ফেললো।
আরোবি ফিসফিস করে বললো
— “এই সিনটা না ভিডিও করলে পাপ হয়ে যাবে!”
ঠিক তখনই কেউ ফোন বের করে ফেললো।
লিসি চোখ বড় করে বললো
— “এই! আমাকে না বলে ভিডিও কেন?”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে ধীরে বললো
— “ক্যামেরা তো এমনিতেই তোমাকে ভালোবাসে।”
লিসি থমকে তাকালো তার দিকে।
— “মানে?”
কিরিস খুব স্বাভাবিকভাবে কেকের আরেকটা টুকরো খাইয়ে দিয়ে বললো — “কারণ তুমি সবসময়ই… সিন হয়ে যাও।”
লিসি এক সেকেন্ড চুপ তারপর হঠাৎ লজ্জা পেয়ে মুখ ঢেকে ফেললো—
— “উফফ আপনি না…”
আর চারপাশে সবাই হাসিতে ফেটে পড়লো। কিরিস শুধু তাকিয়ে রইলো। তার চোখে কোনো হাসির শব্দ নেই—
শুধু শান্ত একটা দৃষ্টি যেন এই ভিড়, এই আলো, এই হাসির মাঝেও তার পুরো পৃথিবীটা একটাই জায়গায় থেমে আছে। লিসির ওই ছোট্ট হাসিটায়। গার্ডেনটা তখন পুরোপুরি উৎসবের রঙে ভাসছে। একদিকে মেয়েরা মেহেদির নকশা দেখিয়ে হাসাহাসি করছে, অন্যদিকে ছেলেদের একটা আলাদা দল বসে গেছে চেয়ার টেনে
যেন বিয়ে না, এটা তাদের “লাইফ অ্যাসেম্বলি মিটিং” চলছে।

0 Comments