পর্ব :74
ধীরে ধীরে সে নিজের সাজটা সম্পূর্ণ করতে শুরু করে।
ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট গয়নার বক্সটা খুলে
একটা সূক্ষ্ম, টানা হার তুলে নেয় যেটা গলার সাথে মিশে থাকে, অতিরিক্ত কিছু নয়, তবুও তার সৌন্দর্যকে নিঃশব্দে বাড়িয়ে দেয়। সাবধানে সেটা গলায় পরে নেয়।
তারপর কানে পরে দুটো ঝুমকো ঝুমকোগুলো হালকা নড়লেই টুনটুন করে ওঠে, যেন তার প্রতিটি নড়াচড়ার সাথে একটুখানি সুর জড়িয়ে আছে। হাতের দিকে তাকায় লিসি। তার কবজিতে আগেই আছে কিরিসের দেওয়া সেই চুড়ি যার মধ্যে একরকম ব্যক্তিগত ছোঁয়া, একান্ত অধিকার মিশে আছে। তার পাশেই পরে সুপ্রিয়ার দেওয়া পারিবারিক চুড়ি যেটা শুধু গয়না না, এই বাড়ির সাথে তার সম্পর্কের এক নীরব স্বীকৃতি। দুটো চুড়ি একসাথে যেন তার জীবনের দুই দিক একটা ভালোবাসা, আরেকটা গ্রহণযোগ্যতা আর কোনো বাড়তি চুড়ি পরে না সে।
সরলতার মাঝেই আজ তার সৌন্দর্য পূর্ণ। তারপর শাড়িটা আরেকবার ঠিক করে নেয় আঁচলটা সুন্দর করে গুছিয়ে কাঁধে ফেলে, কুচিগুলো ঠিকঠাক করে নেয় যত্ন নিয়ে সবশেষে আয়নায় একবার নিজেকে দেখে চোখে হালকা লাজ, মুখে প্রশান্তি… একদম পরিপাটি, শান্ত অথচ মোহময়ী এক রূপ তারপর ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। পায়ের নুপুরের ক্ষীণ শব্দে নীরব ঘরটা আবার একটু জেগে ওঠে আর লিসি সোজা মেয়েদের ঘরের দিকে চলে যায়, যেখানে অপেক্ষা করছে হাসি, ঠাট্টা আর মেহেদীর উৎসবের রঙিন মুহূর্ত।
মেয়েরা সবাই একরকম কচি পাতার রঙের শাড়িতে সাজানো নরম সিল্ক আর জর্জেটের মিশেলে হালকা, দুলে ওঠা সৌন্দর্য। কেউ আঁচল ঠিক করছে, কেউ শেষবারের মতো কানের দুল ছুঁয়ে দেখছে সবাই প্রস্তুত।
“চলো চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে!”—আরোবি তাড়া দেয়।
হিয়া হেসে বলে—“নিচে তো ছেলেরা আগেই বসে গেছে, এখন গেলে সবাই তাকিয়ে থাকবে!”
হালকা হাসি-ঠাট্টার মাঝেই সবাই একসাথে নেমে যায় গার্ডেনের দিকে। নিচে নামতেই যেন অন্য এক জগৎ
চারপাশে ফেয়ারি লাইট ঝুলছে, গাছের ডালে ডালে ছোট ছোট বাতি জ্বলছে। মাঝখানে মেহেদীর স্টেজ, ফুল দিয়ে সাজানো গাঁদা, রজনীগন্ধা আর গোলাপের মিশ্র গন্ধে বাতাস ভরে আছে। হালকা সঙ্গীত বাজছে, টেবিলের ওপর নানান রঙের মেহেদীর কোণ সাজানো।
ছেলেরা ইতিমধ্যেই সেখানে কেউ সোফায় বসে, কেউ দাঁড়িয়ে গল্পে মশগুল। মেয়েরা একসাথে ঢুকতেই কয়েকজন ছেলের চোখ ঘুরে যায় সেদিকে।
কাবির হেসে বলে — “ওহো! আজ তো পুরো গার্ডেনটাই সবুজে ভরে গেছে!”
ইশান সাথে সাথে বলে—
— “সবাই একরকম শাড়ি পরে এসেছে, বুঝতেছি না কার দিকে তাকাবো!”
জারা চোখ রাঙিয়ে — “তোর দিকে কেউ তাকাতে বলছে নাকি?”
সবাই হেসে ওঠে। হিয়া চুপিচুপি লিসির কানে বলে
— “দেখ, ভাইয়া কোথায় তাকিয়ে আছে…”
লিসি চোখ তুলে তাকাতেই দেখে, কিরিস একটু দূরে দাঁড়িয়ে… চারপাশে মানুষ থাকলেও তার দৃষ্টি একদম স্থির সোজা লিসির দিকে। সেই দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, গভীর…
যেন পুরো ভিড়ের মাঝেও সে শুধু একজনকেই দেখছে।
লিসি হালকা অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। ওদিকে বড়রা নিজেদের মতো করে বসে গল্প করছে কেউ পুরনো দিনের স্মৃতি বলছে, কেউ বিয়ের আয়োজন নিয়ে আলোচনা করছে। সুপ্রিয়া হাসতে হাসতে এক আন্টিকে বলছে — “আমাদের সময় এমন করে মেহেদী হত নাকি? এখনকার বাচ্চাদের দেখেন!”
একপাশে আবার ছোটরা দৌড়াদৌড়ি করছে,
কারো হাতে জুস, কেউ আবার মেহেদী লাগানোর জন্য আগ্রহে বসে পড়েছে। মাঝে মাঝে কারো ডাক—
“এই, এখানে বসো!”
“মেহেদী লাগাবে কে আগে?”
“ছেলেরা দূরে থাকো, এটা মেয়েদের সাইড!”
কিন্তু ছেলেরা কি আর শোনে!
কাবির এসে বলে—
— “আমরাও মেহেদী লাগাবো!”
আরোবি হেসে
— “তোমাদের হাতে না, কপালে লাগাবো!”
আবার হাসির রোল পড়ে।
কাবির হাত গুটিয়ে বলে —“ আমার বিয়ে আর আমি মেহেদী লাগাবো না, এটা কেমন কথা! ”
রিহান ও এবার কাবিরের সাথে যোগ দিয়ে বলে —“ এটা তো ঠিক না, যার জন্য কলা খেতে পারছো তাকেই কলা দেবে না, খোসা দেবে! ”
লিসি এদের কথায় মুচকি হেসে বলে — “ আচ্ছা রাতে শেষে আমি তোমাদের সবার সাথে মেহেদী দিয়ে দিবো ঠিক আছে ভাইয়া ”
লিসির কথায় ইশান কাবির রিহান ওর দিকে মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে —“ তুই হলি আমাদের আসল বোন ”
এরপর কাবির জিহ্বায় কামোড় দিয়ে বলে —“ সরি এখন আর বোন নেই, এখন তো আমার বড় ভাবি ”
তখন সব কাজিনরা একসাথে লিসির দিকে তাকিয়ে জোরে বলে উঠে — “ ওহ্ ভাবি.... ”
লিসি নিজের মাথায় হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করছে। এদের নিয়ে আর পারলো না লিসি, সবাই কত বড় কিন্তু বাচ্চাদের মতো ব্যবহার। এইসব ছোট ছোট খুনসুটি, হাসি, ঠাট্টা সব মিলিয়ে পুরো গার্ডেন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। আলো, গান, মানুষের কোলাহল, আর তার মাঝখানে লিসি ধীরে একপাশে বসে।। গার্ডেনের পুরো পরিবেশ তখন একদম জমে উঠেছে। চারপাশে আলো ঝলমল করছে, হালকা বাতাসে ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ গল্প করছে, কেউ আবার মেহেদী লাগিয়ে হাত নাড়তে না পেরে বিরক্ত মুখে বসে আছে। এই সময় ইশান হাতে জুস নিয়ে এসে জারার পাশে বসতেই জারা মুখ বাঁকিয়ে বলে
— “এই! দূরে বসো, আমার শাড়িতে কিছু ফেললে কিন্তু মেরে ফেলবো।”
ইশান নাটকীয় মুখ করে—
— “দেখছো? নিজের হবু বরকে পর্যন্ত সহ্য হয় না এদের!”
নুসরাত সাথে সাথে বলে—
— “ হবু বর না, তুমি একটা চলমান বিপদ।”
সবাই হেসে ওঠে। হিয়া হঠাৎ কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলে — “আজকে তোকে ভালোই লাগছে।”
কাবির চুলে হাত বুলিয়ে — “জানি। যতই হোক আমার বিয়ের মেহেদীর অনুষ্ঠান ”
হিয়া গম্ভীর মুখে — “আমি বলছিলাম শার্টটা ভালো লাগছে।”
চারপাশে আবারও হাসির রোল পড়ে। আরোবি এদিকে এক প্লেট ফুচকা নিয়ে বসেছিল। রিহান হঠাৎ এসে একটা তুলে মুখে দিতেই আরোবি চোখ বড় বড় করে
— “এই! এটা আমার!”
রিহান নির্লজ্জের মতো — “তোমার জিনিস তো এমনিতেও আমার। তোর ভাই হয় না আমি, ”
নুসরাতকে বসে থাকতে দেখে রিহান গালে টুস করে চুমু খেয়ে বলে —“ বাহ নাইস সাদ, ফুচকা সঙ্গে বউয়ের গালের চুমু ”
নুসরাত দ্রুত গাল মুছে লজ্জায় তাকিয়ে বলে — “আস্তে কথা বলো! বড়রা আছে!”
রিহান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে— “বড়রা নিজেরাই নিজেদের গল্পে ব্যস্ত।”
কিছুক্ষণ পরেই স্টেজের সামনে মাইক থেকে হালকা সাউন্ড আসে সবাই তাকায় সামনে। ইশান আর রিহান স্টেজে উঠে গেছে দুজনের হাতেই মাইক। পিছনে ফেয়ারি লাইটের আলো পড়ে তাদের ওপর, পুরো পরিবেশ আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। রিহান মাইক ঠিক করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে — “অ্যাটেনশন প্লিজ!”
সাথে সাথে নিচ থেকে কাবির চিৎকার দেয় — “ভাষণ ছোট রাখিস!”
সবাই হেসে ওঠে ইশান মুচকি হেসে বলে
— “আজকের এই সুন্দর সন্ধ্যায় উপস্থিত সম্মানিত বড়রা, বিরক্তিকর কাজিনরা এবং বিশেষ করে যারা আজকে অতিরিক্ত সুন্দর হয়ে এসেছে…”
এতটুকু বলতেই নিচে মেয়েদের দিক থেকে “উউউ” শব্দ ওঠে। ইশান নাটকীয়ভাবে বুকের ওপর হাত রেখে
— “আপনাদের সবাইকে স্বাগতম আমাদের মেহেদী নাইটে!”
তালি পড়ে চারপাশে রিহান এবার বলে—
— “আজকে কোনো টেনশন নাই, কোনো সিরিয়াসনেস নাই। আজকে শুধু আনন্দ হবে, নাচ হবে, গান হবে… আর কিছু মানুষকে আজকে আমরা জোর করে নাচাবোও।”
কাবির সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে — “আমি আগেই বলে দিচ্ছি, আমার কোমর ভালো না!”
জারা চিৎকার দিয়ে—
— “মিথ্যুক! বাসায় আয়নার সামনে সবচেয়ে বেশি তুই নাচিস!”
আরোবি নাটকীয় সুরে বলে —“ এসেছে.... বিয়ে করবে কিন্তু নাচ করবে না, আরে ওইদিকে তোর বউ তিশা সব অনুষ্ঠানে নেচে ফাটিয়ে দিচ্ছে ”
আবারও হাসির শব্দে গার্ডেন ভরে যায় ইশান এবার একটু শান্ত গলায় বলে
— “বিয়ে মানে শুধু দুইজন মানুষের সম্পর্ক না… দুইটা পরিবার, অনেকগুলো হাসি, অনেক স্মৃতি একসাথে জড়িয়ে যাওয়া। তাই আজকের রাতটা সবাই মন খুলে উপভোগ করবেন।”
রিহান হেসে মাইক তুলে ধরে—
— “এবং এখন… শুরু হতে যাচ্ছে আসল ঝামেলা!”
পিছনে হঠাৎ মিউজিক বেজে ওঠে চারপাশে শিস, তালি, চিৎকার।সবাই উত্তেজনায় তাকিয়ে আছে স্টেজের দিকে মেয়েরা নিজেদের শাড়ি ঠিক করে বসে, ছেলেরা সামনে এগিয়ে আসে বড়রাও হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। আর ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় মেহেদী রাতের প্রথম নাচ…
উৎসবের আসল উচ্ছ্বাস। স্টেজের আলো একটু কমিয়ে দেওয়া হয় চারপাশের ফেয়ারি লাইটগুলো আরও ঝলমল করে ওঠে। মিউজিকের প্রথম বিট বাজতেই সবাই উত্তেজনায় চিৎকার করে ওঠে।
“Mehndi laga ke rakhna…
Doli saja ke rakhna…”
গানের সাথে সাথে মেয়েরা একসাথে স্টেজে উঠে আসে।
সবুজ শাড়িগুলো আলোয় চকচক করছে, আঁচল উড়ছে হালকা বাতাসে। নুসরাত, হিয়া, আরোবি, সুরভী, জারা সবাই তাল মিলিয়ে নাচ শুরু করে। ঠিক তখনই ছেলেরাও একে একে যোগ দেয়। কাবির স্টাইল মেরে এসে দাঁড়ায় মাঝখানে, আর রিহান তার পাশে এসে বলে
— “আজকে স্টেজ আগুন লাগবে!”
“Lene tujhe o gori…
Aayenge tere sajna…”
তালের সাথে সাথে পুরো গার্ডেন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।
মেয়েদের হাতের নড়াচড়া, কোমরের দুলুনি, ছেলেদের ফান আর এনার্জি সব মিলিয়ে একদম জমে যায় পরিবেশ। নুসরাত নাচতে নাচতে রিহানের দিকে তাকিয়ে চোখ ঘুরাতেই রিহান নাটকীয়ভাবে বুক চেপে ধরে—
— “হায় আল্লাহ, এই চোখের মায়া!”
হিয়া হেসে ফেলে নাচের মাঝেই। ইশান আবার জারার সামনে গিয়ে নাচতে শুরু করতেই জারা বিরক্ত মুখে—
— “দূরে যা! তোরে দেখে আমার স্টেপ ভুল হচ্ছে!”
ইশান — “আমি এত হ্যান্ডসাম যে কনসেন্ট্রেশন নষ্ট হয়ে যায়, এটা আমার দোষ না।”
নিচে বসে থাকা সবাই হেসে ওঠে। একপাশে দাঁড়িয়ে কিরিস চুপচাপ তাকিয়ে আছে। চারপাশের কোলাহলের মাঝেও তার চোখ বারবার গিয়ে থামছে লিসির ওপর।
লিসি আজকে আর নাচছে না বসে আসে সামনের সারিতে, তবে মাঝেমধ্যে অজান্তেই চোখ চলে যাচ্ছে কিরিসের দিকে। আর সেই চোখাচোখির মাঝে কেমন এক নরম, লাজুক অনুভূতি লুকিয়ে আছে।।গান শেষ হতেই পুরো গার্ডেন তালি আর শিসে ভরে যায়।
— “ওয়াহহহ!”
— “আরেকটা! আরেকটা!”
রিহান হাঁপাতে হাঁপাতে বলে—
— “আগে পানি দাও, তারপর নাচবো!”
হালকা খুনসুটি আবার শুরু হয়ে যায়। জারা সোফায় বসতেই ইশান পাশে এসে — “তুমি আমার সাথে নাচতে গিয়ে ইচ্ছা করে বারবার তাকাচ্ছিলে।”
জারা সঙ্গে সঙ্গে কুশন ছুঁড়ে মারে — “স্বপ্ন দেখছিস?”
আরোবি হাসতে হাসতে বলে—
— “আজকে সবাই প্রেমে পড়েছে মনে হয়!”
ইশান কুশন টা বুকে জড়িয়ে ধরে বলে —“ আরে চিন্তা করিস না আমাদের বিয়েতে আমি তোকে মোটরসাইকেল করে নিয়ে যাবো ”
জারা—“ মুখ বন্ধ রাখ ”
ঠিক তখনই গার্ডেনের একপাশ দিয়ে কয়েকজন মেহেদী আর্টিস্ট ঢুকে আসে সাথে সাথে মেয়েদের মাঝে হালকা উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়।
— “চলো চলো, আগে বসতে হবে!”
— “আমি ফুল হ্যান্ড ডিজাইন করবো!”
— “আমারটা আগে!”
মাঝখানে বড় বড় কুশন আর নিচু টেবিল সাজানো ছিল।
মেয়েরা একে একে গিয়ে বসে পড়ে। কেউ হাত এগিয়ে দিচ্ছে, কেউ ডিজাইন বেছে নিচ্ছে। লিসিও ধীরে গিয়ে একপাশে বসে হাত বাড়িয়ে দেয় তার শাড়ির আঁচলটা পাশে গড়িয়ে পড়ে আছে, হাতে থাকা চুড়িগুলো আলোয় চিকচিক করছে। ছেলেরা একটু দূরে সোফায় বসে সব দেখছে। কাবির মাথা নাড়িয়ে বলে
— “এই জিনিস বুঝি না। হাতে এত কিছু এঁকে কী লাভ?”
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে — “তোমাদের মতো ছেলেরা বুঝবেও না।”
রিহান মুচকি হেসে — “আমাদের নাম লুকিয়ে লিখে দেয় বলেই তো এত আগ্রহ।”
আরোবি সাথে সাথে—
— “তোমার নাম কেউ লিখবে না, ভয় পেও না।”
আবারও হাসির শব্দ। রিহান attitude নিয়ে বলে —“ বিয়ে করেছি কি ফাও,আমার বউ আছে, ওই মেহেদী ওয়ালি মেডাম আমার বউটার হাতে আমার নাম বড় করে লেখে দিবে ”
নুসরাত চুপ করে আছে লজ্জায় বড়রাও আছে আশপাশের যার জন্য কিছু বলতেও পারছে না।
ওদিকে বড়রাও সব দেখছে হাসিমুখে। সুপ্রিয়া ধীরে চা হাতে বসে বলেন — “এই বয়সের আনন্দটাই আলাদা।”
একজন আন্টি হেসে — “দেখেন না, এদের দেখে আমাদের সময় মনে পড়ে যাচ্ছে।”
গার্ডেন তখন পুরোপুরি উৎসবের রঙে ডুবে গেছে
হাসি, গান, মেহেদীর গন্ধ, আলো আর প্রিয় মানুষদের উষ্ণতায় ভরা এক সুন্দর পারিবারিক সন্ধ্যা। মেহেদীর আসর তখন পুরোপুরি জমে উঠেছে। নিচু গোল টেবিল ঘিরে মেয়েরা বসে আছে কারও হাতে ইতিমধ্যে নকশা আঁকা শুরু হয়ে গেছে, কারও হাতে এখনও কাঁচা মেহেদীর গন্ধ মিশে আছে। চারপাশে আলো ঝলমল করছে, হালকা সুরে গান বাজছে, আর সেই সুরের ফাঁকে ফাঁকে ভেসে আসছে হাসির শব্দ লিসি একপাশে শান্ত হয়ে বসে ছিল। তার সামনে মেহেদী আর্টিস্ট হাত ধরে নকশা আঁকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক তখনই কিরিস ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। এইদিকে আসছিলো এইসব দেখতে
তার উপস্থিতি এমনিতেই চারপাশের পরিবেশ বদলে দেয়। কিছু কাজিন মুখ চেপে হাসে, কেউ আবার একে অপরকে কনুই মারে, কিরিস এসে লিসির পাশে দাঁড়ায়।
একবার নিচু হয়ে তার খালি হাতদুটোর দিকে তাকায় ফর্সা, কোমল, নিঃশব্দে অপেক্ষমাণ। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে — “হাতদুটো একদম বউয়ের মতো করে সাজিয়ে দাও… পুরো ব্রাইডাল স্টাইলে।”
কথাটা শুনে কয়েকজন কাজিন একসাথে “উউউ…” করে ওঠে। লিসির গাল সঙ্গে সঙ্গে লাল হয়ে যায়।
সে মাথা নিচু করে ফেলে। কিন্তু কিরিসের চোখে তখন অন্যরকম অনুভূতি। সেই দিনের কথা তার মনে পড়ে
যেদিন লিসিকে নিজের করে এনেছিল। সবকিছু এত হঠাৎ, এত অস্থিরতার মাঝে হয়েছিল যে এই মেয়েটা নিজের বিয়ের স্বপ্নের ছোট ছোট জিনিসগুলোও উপভোগ করতে পারেনি। না ছিল শান্তভাবে সাজা,
না ছিল বান্ধবীদের সঙ্গে মেহেদী রাত, না ছিল হাতে ভরা গাঢ় রঙের নকশা। তার হাত দুটো সেদিন খালি ছিল।
আজ সেই শূন্যতাটা নিজের মতো করে পূরণ করতে চাইছে কিরিস। মেহেদী আর্টিস্ট মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে
— “ম্যাডাম, নাম লিখবো? কার নাম লিখবো? মানে আপনার হাসবেন্ড এর নাম কী? ”
প্রশ্নটা শুনে লিসির বুকের ভেতর হালকা ধাক্কার মতো লাগে। চারপাশের সবাই যেন এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। লিসি ধীরে চোখ তুলে একবার কিরিসের দিকে তাকায়। লোকটা তখনও তার দিকেই তাকিয়ে আছে গভীর, স্থির, নিঃশব্দ এক দৃষ্টিতে।
লিসির ঠোঁট কেঁপে ওঠে সামান্য। তারপর খুব আস্তে, লাজুক স্বরে বলে—
— “কিরিস…”
নিজের স্বামীর নাম মুখে উচ্চারণ করতেই কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে তার ভেতরে। শব্দটা যেন শুধু একটা নাম নয় একটা সম্পর্ক, একটা অধিকার, একটা নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ। কিরিসের চোখে মুহূর্তের জন্য নরম এক আলো জ্বলে ওঠে। মেহেদী আর্টিস্ট হাসিমুখে মাথা নেড়ে সুন্দর করে নামটা নকশার ভেতরে লুকিয়ে লিখে দিতে শুরু করে। মেহেদীর সরু রেখাগুলো ধীরে ধীরে লিসির হাত ভরিয়ে তোলে ফুল, লতা, জটিল নকশা…
কবজি পেরিয়ে কনুই পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় সূক্ষ্ম কারুকাজ।
ঠিক তখনই লিসির চোখ গিয়ে থামে একটা বিশেষ ডিজাইনের ওপর।সে কিছুক্ষণ নীরবে সেটা দেখে।
তারপর নিচু গলায় বলে — “এই ডিজাইনটা দিবেন… ডান হাতে।”
আর্টিস্ট ডিজাইনটা দেখে একটু মুগ্ধ হয়। এটা সাধারণ নকশা নয় দুইটা হাত পাশাপাশি রাখলে তবেই পুরো নকশাটা সম্পূর্ণ হয়। অর্ধেক এক হাতে, বাকি অর্ধেক অন্য হাতে। একটা অসম্পূর্ণ শিল্প, যেটা পূর্ণতা পায় শুধুমাত্র অন্য আরেকজনের স্পর্শে। মেহেদী আর্টিস্ট প্রশ্নভরা চোখে তাকালেও কিছু বলে না। শুধু নকশাটা আঁকতে শুরু করে। লিসি চুপচাপ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বুকের ভেতরে কেমন নরম ঢেউ খেলে যায়। কার হাতে থাকবে বাকি অর্ধেকটা?
সে কি নিজেও জানে? নাকি অজান্তেই নিজের মনের গোপন আকাঙ্ক্ষা এঁকে ফেলছে হাতে? কিরিস একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল পুরো সময়টা। তার চোখে অদ্ভুত গভীরতা।
সে বুঝতে পারে লিসি ধীরে ধীরে তার জীবনের ভেতর শুধু “উপস্থিত” থাকছে না… নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে।
একটা সম্পর্ক কখনো জোর করে সম্পূর্ণ হয় না।
ধীরে ধীরে, অনুভূতির স্তর পেরিয়ে, বিশ্বাস আর নীরব মায়ার ভেতর দিয়ে পূর্ণতা পায়। আর আজ লিসির হাতের সেই অসম্পূর্ণ মেহেদীর নকশা যেন ঠিক সেই কথাটাই বলছে দু’টি অর্ধেক…যারা আলাদা থেকে সুন্দর,
কিন্তু একসাথে হলে তবেই সম্পূর্ণ।
মেহেদীর গন্ধে চারপাশ ভরে আছে। মেয়েরা গোল হয়ে বসে হাতে নকশা আঁকাচ্ছে, কেউ শুকানোর জন্য ফুঁ দিচ্ছে, কেউ আবার নিজেদের ডিজাইন দেখিয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে। লিসি শান্ত হয়ে বসে আছে একপাশে।
তার দুই হাত ভরা জটিল নকশায় কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত মেহেদীর গাঢ় সবুজ রঙ ছড়িয়ে আছে। মাঝে লুকিয়ে আছে “কিরিস” নামটা। ওদিকে ছেলেরা সোফায় আধশোয়া হয়ে গল্প করছে। হঠাৎ ইশান মাইকের দিকে তাকিয়ে বলে — “আচ্ছা… আজকে এত কিছু হলো, কিন্তু আসল জিনিসটাই তো বাকি।”
রিহান সাথে সাথে নাটকীয়ভাবে — “হ্যাঁ! আজকে একটা ঐতিহাসিক রাত!”
কাবির ভুরু তুলে — “জাতি আজকে যা শুনতে চায়…”
সবাই একসাথে কিরিসের দিকে তাকায়। কিরিস তখন ফোনে কারও একটা মেসেজ দেখছিল। মাথা তুলতেই দেখে সবগুলোর চোখ তার দিকে। কিরিস ভ্রু কুঁচকে—
— “কি?”
ইশান দাঁত বের করে হেসে — “ভাই… একটা গান।”
কিরিস এমনভাবে তাকায় যেন কেউ তাকে যুদ্ধ করতে বলেছে — “আমার তো খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই। আমাকে কি কুত্তায় কামড়েছে যে এখন গান গাইবো?”
কথাটা শুনে পুরো গার্ডেন হেসে ওঠে। রিহান সোফা থেকে উঠে এসে কিরিসের পাশে বসে পড়ে
— “এই কথা আমরা মানি না। আজকে গান গাইতেই হবে।”
কিরিস বিরক্ত মুখে — “তোদের কি আর কোনো কাজ নাই?”
কাবির নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরে
— “দেখছো? এত নিষ্ঠুর একটা বড় ভাই নিয়ে আমরা বড় হয়েছি!”
জারা দূর থেকে চিৎকার দেয়
— “ড্রামা কম কর!”
ইশান এবার কিরিসের কাঁধে হাত রেখে—
— “ভাই… প্লিজ। আজকে মুডটাই আলাদা। তোর গলায় গান শুনলে পুরো অনুষ্ঠান জমে যাবে।”
কিরিস শুকনো গলায়
— “আমার গলা শুনে মানুষ অনুষ্ঠান ছেড়ে পালাবে।”
রিহান হেসে — “মিথ্যা কথা। স্কুলে গান গেলে মেয়েরা হা করে থাকতো ।”
কাবির সাথে সাথে—
— “হ্যাঁ, আর আমরা তো ভাবতাম ভাইয়া হিরো!”
কিরিস ঠান্ডা চোখে তাকায়
— “তোরা এখনো অনেক বেশি কথা বলিস।”
কিন্তু ওরা ছাড়ার পাত্র না। রিহান হঠাৎ পিছন থেকে কিরিসকে জড়িয়ে ধরে — “ভাইইই… একটা গান!”
ইশানও এসে অন্যপাশে ধরে — “শুধু একটা!”
কাবির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে নাটকীয়ভাবে হাত জোড় করে — “আমাদের ছোট্ট ইচ্ছাটা পূরণ করুন, বড়ভাই মহাশয়! আজ তোর একমাত্র ছোট ভাই এর বিয়ের মেহেদীর অনুষ্ঠান একটা গান গা প্লিজ ”
চারপাশে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ছে। বড়রাও হাসিমুখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সুপ্রিয়া মাথা নাড়িয়ে বলেন— “বড় হয়ে গেছে সবাই, কিন্তু ভাইদের আদরটা একটুও বদলায়নি।”
কিরিস বিরক্ত দেখানোর চেষ্টা করলেও ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি চলে আসে। এত বড়, গম্ভীর, ভয়ংকর ব্যক্তিত্বের মানুষটা নিজের ভাইদের সামনে এসে কেমন যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়। ওদের আবদার, জেদ, জড়িয়ে ধরা সবকিছু নীরবে মেনে নেয়। লিসি দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার বুকের ভেতর কেমন নরম উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। এই মানুষটাকে সবাই ভয় পায়, সম্মান করে কিন্তু তার ভাইদের সামনে সে শুধু “কিরিস ভাইয়া”। যার কাছে ওরা এখনো আদর চাওয়া ছোট ভাই। শেষমেশ কিরিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—ল
— “আচ্ছা, একটাই গান। তারপর কেউ আর বিরক্ত করবি না।”
সাথে সাথে চারপাশে চিৎকার পড়ে যায়।
— “ইয়েসসস!”
— “ভাই রাজি!”
— “আজকে আগুন লাগবে!”
রিহান দৌড়ে গিয়ে মাইক হাতে তুলে দেয় কিরিসের দিকে। কিরিস মাইকটা হাতে নেয়, একবার চারপাশে তাকায়… তারপর চোখ গিয়ে থামে লিসির ওপর।
লিসি তখনও মেহেদী লাগানো হাত দুটো সামলে বসে আছে। দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে যায়।
আর সেই দৃষ্টির ভেতরেই যেন অদৃশ্যভাবে শুরু হয়ে যায় আরেকটা গল্প… যেটা এবার সুরে ভেসে উঠবে।
গার্ডেনের চারপাশে তখন নরম আলো জ্বলছে।
রাত ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে, অথচ মানুষের কোলাহল, হাসির শব্দ আর মেহেদীর গন্ধে পরিবেশ এখনও জীবন্ত।
স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কিরিস তার হাতে মাইক। কালো প্যান্ট, সাদা শার্ট উপরের দুটো বোতাম খোলা, ভেজা চুলগুলো এখনও পুরো শুকোয়নি।
চারপাশে সবাই উচ্ছ্বসিত, কিন্তু সে যেন অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। মিউজিক ধীরে ধীরে বাজতে শুরু করে।
কিরিস চোখ নামিয়ে এক মুহূর্ত চুপ থাকে।
তারপর গম্ভীর, গভীর কণ্ঠে গান শুরু হয়—
“Aashiyana Mera
Saath Tere Hai Na
Dhundte Teri Gali
Mujhko Ghar Mila
Aab-o-daana Mera
Haath Tere Hai Na
Dhundte Tera Khuda
Mujhko Rab Mila
পুরো গার্ডেন যেন থমকে যায়।
তার কণ্ঠে কোনো জোর করে গাওয়া সুর নেই বরং এক অদ্ভুত ভারী আবেগ, যেন বহুদিন বুকের গভীরে আটকে থাকা অনুভূতিগুলো শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসছে।
আর গান গাইতে গাইতেই ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি গিয়ে থামে লিসির ওপর। লিসি তখন মেহেদী লাগানো হাত দুটো সামলে বসে আছে। চারপাশে এত মানুষ, এত আলো তবুও সেই মুহূর্তে যেন পুরো পৃথিবী নিঃশব্দ হয়ে যায়।
দু’জনের চোখ একসূত্রে বাঁধা পড়ে।
রবীন্দ্রনাথ হয়তো এমন দৃষ্টিকে বলতেন—
“নীরবতার অন্তর্লিখিত উচ্চারণ।”
আর নজরুল হয়তো লিখতেন—
“এ কোন আগুন, যে দহন দেয় না—তবু অন্তর ভস্ম করে।”
কিরিসের চোখে আজ কোনো কঠোরতা নেই।
সেই মানুষ, যার দৃষ্টিতে সাধারণত সবাই ভয় খুঁজে পায়,
আজ তার চোখে এক গভীর ক্লান্ত ভালোবাসা। যেন বহু যুদ্ধ শেষে সে হঠাৎ একটুখানি আশ্রয় পেয়েছে। লিসির বুকের ভেতর কাঁপন ওঠে। সে বুঝতে পারে এই মানুষটা ভালোবাসা প্রকাশ করতে জানে না, কিন্তু তার প্রতিটি চাহনি, প্রতিটি নীরবতা… অদ্ভুত গভীরভাবে “তোমাকে চাই” বলে।
সে ধীরে ধীরে লিসির দিকে তাকিয়ে আবার গাইলো—
Tu Jo Mila…
Lo Ho Gaya Main Kaabil
Tu Jo Mila…
Toh Ho Gaya Sab Haasil
Mushkil Sahi Aasan Hui Manzil…” 
গান চলতে থাকে। লিসির হাতে আঁকা অসম্পূর্ণ মেহেদীর নকশা তখন ধীরে শুকিয়ে আসছে। অর্ধেক এক হাতে, অর্ধেক আরেক অজানা হাতে সম্পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায়।
আর কিরিসের দৃষ্টি যেন নিঃশব্দে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে—
“তোমার প্রতিটি অসম্পূর্ণতা আমি পূর্ণ করবো।”
সেই দৃষ্টিতে কামনা ছিল না ছিল অধিকার। ছিল ভয়ংকর রকমের রক্ষার প্রতিজ্ঞা। যে প্রতিজ্ঞা পুরুষেরা মুখে বলে না জীবন দিয়ে প্রমাণ করে। গান শেষ হতেই চারপাশ তালি আর উল্লাসে ভরে ওঠে। কিন্তু কিরিসের মুখে কোনো বিশেষ পরিবর্তন আসে না। সে শুধু একবার মাথা ঝুঁকিয়ে মাইকটা নামিয়ে রাখে। রিহান চিৎকার দেয়—
— “ভাইয়া আগুন লাগিয়ে দিলো!”
কাবির — “এই লোক এত ভালো গান গায়, বিশ্বাসই হয় না!”
সবাই হাসছে, উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে। মেয়েরা লিসিকে নিয়ে এবার ঠাট্টা করছে এই গানটা নাকি তাকে নিয়ে, আরোবি হেসে বলে —“ আহা " তুজো মিলা " ভাইয়া তোকে পেয়েই গানের লাইনটাও বানিয়ে দিললো ”
সুরভী —“ মনে হচ্ছে একদম ভিলেন তার নারীর জন্য গানটা গাইলো ”
নুসরাত —“ কনফিউশান! হিরো না কেন ”
জারা—“ কোন অ্যাঙ্গেলে ভাইয়াকে হিরো মনে হয় শালা নিজে বেঁচে বাপের নাম, ও একদম ভিলেন নাম্বার 1”
হিয়া হেসে —“ হুম আর এই ভিলেন ভালোবেসে ফেলেছে এই লিসিকে... সাবধান ভিলেনের ভালোবাসা মারাত্মক লিসি ”
লিসি কি বলবে আগে তো বলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না এক এক জন এক এক রকম মতবাদ দিচ্ছে সে শুধু শুনেই যাচ্ছে কিন্তু এই কথাগুলো বিরক্তিকর নয় বড্ড ভালোলাগার কিন্তু এই এত কথা আলাপ আলোচনা পাশে ভাইদের খুনসুটির মধ্যে কেউ খেয়াল করলো না কিরিস নেই। কিরিস ধীরে ধীরে ভিড়ের মাঝখান থেকে সরে যায়। কেউ খেয়ালও করে না কখন সে গার্ডেন ছেড়ে ভেতরে ঢুকে গেছে। সিঁড়ি পেরিয়ে সে উঠে যায় বাড়ির টেরিসে উপরে রাত অনেক বেশি নিঃশব্দ। দূরে শহরের আলো জ্বলছে। হালকা বাতাসে তার শার্ট উড়ছে সামান্য।
কিরিস পকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন ধরায়।
ধোঁয়ার ধূসর রেখা ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারে মিশে যেতে থাকে। তার মুখ আবার আগের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে। কয়েক মিনিট আগেও যে মানুষটা গান গাইছিল
এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে, অনুভূতি নামক জিনিসটা তার ভেতর কখনো ছিলই না। ঠিক তখনই পেছনে পায়ের শব্দ মার্ক এসে দাঁড়ায়।
— “Boss.”
কিরিস ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীর, ভয়ংকর শান্ত কণ্ঠে বলে—
— “ওই গাড়িগুলো দেখেছো?”
মার্ক ভ্রু কুঁচকে নিচের রাস্তায় তাকায়। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে কয়েকটা কালো গাড়ি অনেকক্ষণ ধরেই স্থির দাঁড়িয়ে আছে না নড়ছে, না যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে গাড়িগুলোকে মৃত জন্তুর মতো লাগছে নিঃশব্দ, অথচ অপেক্ষমাণ। মার্কের চোখ সরু হয়ে আসে।
— “লোক বসানো আছে?”
কিরিস ধীরে মাথা নাড়ে তার চোখে তখন এমন ঠান্ডা ভাব, যেন মানুষের জীবন-মৃত্যু তার কাছে কেবল হিসাবের অঙ্ক।
— “দুই ঘণ্টা ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
এটা কাকতালীয় না।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর কিরিস সিগারেটের ছাই ফেলে নিচু গলায় বলে—
— “লিসিকে নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে গুঞ্জন শুরু হয়েছে?”
মার্ক এবার পুরোপুরি গম্ভীর হয়ে যায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে — “শুধু গুঞ্জন না, Boss… এখন ও একটা ‘Target File’.”
রাতের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। মার্ক ধীরে বলে— “আভাস খানের মেয়ে… এই পরিচয়টাই এখন পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় লোভ। শুধু ইতালিয়ান মাফিয়াই না… রাশিয়ান সিন্ডিকেট, তুর্কি কার্টেল, ব্রাতভা, ইয়াকুজা সবাই নড়েচড়ে বসেছে। কারণ মেয়েটার কাছে যে প্রোফাইলগুলো আছে… ওগুলো হাতে এলে পৃথিবীর অর্ধেক আন্ডারওয়ার্ল্ড সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।”
কিরিস চুপ তার মুখে কোনো বিস্ময় নেই। মার্ক ধীরে বলে — “এখন লিসি মানুষ না, Boss… সে একটা গুপ্তধন। আর পুরো পৃথিবীর নরপিশাচগুলো সেই গুপ্তধনের খোঁজে নেমেছে।”
কিরিস ধীরে টেরিসের পাশের ঘরটাই যায় মার্কও চুপচাপ যায়। মার্কের হাতে তখনও কালো ফাইলটা ধরা। ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে মাত্র এক কোণে অন্য সবটা ডুবে আছে ধূসর অন্ধকারে। বিশাল কাঁচের জানালার ওপারে রাতের শহরটা ঝলমল করলেও এই ঘরের বাতাসে যেন জমাট বেঁধে আছে মৃত্যুর গন্ধ। কিরিস চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল জানালার সামনে। দীর্ঘদেহী ছায়ামূর্তিটা দেখে মনে হচ্ছিল, মানুষ নয় রাতের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো অভিশাপ। তার হাতে অর্ধেক জ্বলা সিগারেট। ধোঁয়ার সরু রেখা উপরে উঠছিল, আর তার সঙ্গে যেন উঠছিল অশুভ কোনো সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস। হঠাৎ সে ধীরে মাথা ঘুরালো।
চোখ দুটো স্থির অস্বাভাবিক স্থির। যে চোখে রাগ নেই…
চিৎকার নেই… কিন্তু আছে এমন এক হিমশীতল নিষ্ঠুরতা, যেটা মানুষের শরীরের রক্ত জমিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তার গভীর, কর্কশ কণ্ঠ ভেসে উঠলো
— “Mark…”
মার্ক সোজা হয়ে দাঁড়ালো। বছরের পর বছর কিরিসের সঙ্গে থেকেও আজও এই মানুষটার কণ্ঠ শুনলে তার বুকের ভেতর চাপা আতঙ্ক জন্মায়।
— “জি, Boss।”
কিরিস ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো।
তার প্রতিটা পদক্ষেপে যেন ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল — “লিসিকে নিয়ে কি আগের ছাড়া একটু বেশি গুঞ্জন চলছে?”
মার্ক কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলো। তারপর নিচু গলায় বললো — “হ্যাঁ, Boss… খবর ছড়িয়ে গেছে।”
নিস্তব্ধতা এমন এক নীরবতা, যেখানে দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির শব্দটাও অস্বাভাবিক লাগছিল। তারপর… কিরিস হাসলো। না, ওটা মানুষের হাসি ছিল না। ওটা ছিল এমন এক অন্ধকার সন্তুষ্টির রেখা, যেটা কেবল নৃশংস শিকারির ঠোঁটে মানায়। সে ধীরে ফাইলটা খুললো।
ফাইলের প্রথম পাতায় ভেসে উঠলো একটি নাম
— “আভাস খান।”
আর ঠিক তার নিচে—
“Daughter : Classified.”
মার্ক অনুভব করলো, ঘরের তাপমাত্রা যেন হঠাৎ কয়েক ডিগ্রি নেমে গেছে। কিরিস নিচু স্বরে বললো
— “তো… শেষ পর্যন্ত খবরটা ওদের কানে পৌঁছেছে।”
তার কণ্ঠে ভয় ছিল না। উত্তেজনা ছিল না। বরং ছিল এমন এক ভয়ংকর স্থিরতা, যেটা যুদ্ধ শুরুর আগের মুহূর্তে মৃত্যুর দেবতার মধ্যে দেখা যায়। ইতালিয়ান মাফিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর পরিবার যাদের নাম শুনলে ইউরোপের আন্ডারওয়ার্ল্ড পর্যন্ত নীরব হয়ে যায় তারা এবার হাত দিয়েছে এই ফাইলে। কিন্তু শুধু ইতালি নয়…
পৃথিবীর প্রতিটা অন্ধকার সাম্রাজ্য এখন এক নামের পেছনে উন্মাদ আভাস খানের একমাত্র মেয়ে।
ক্ষমতা… গোপন প্রোফাইল… অপরাধ জগতের অদৃশ্য মানচিত্র… এমন সব তথ্য লুকিয়ে আছে সেই মেয়েটার অস্তিত্বের সঙ্গে, যার জন্য আজ গোটা আন্ডারওয়ার্ল্ড ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ছুটছে। সে এখন কোনো সাধারণ মেয়ে নয়। সে এখন একটা জীবন্ত গুপ্তধন। একটা এমন গুপ্তধন, যার জন্য সাম্রাজ্য ধ্বংস হতে পারে। দেশ জ্বলে যেতে পারে। শত শত লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে পারে।
কিন্তু… প্রতিটা গুপ্তধনের জন্য সৃষ্টিকর্তা একজন রক্ষাকর্তা পাঠান। আর তাকে রক্ষা করার জন্য যে মানুষটা এসেছে… সে মানুষ নয়। সে মাফিয়া জগতের সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন কিরিস।
একটা নাম যেটা উচ্চারণ করার আগে পর্যন্ত দুনিয়ার বড় বড় ডনরা বুক ফুলিয়ে কথা বলে… আর উচ্চারণ করার পরে নিঃশব্দে নিজের নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেয়। কারণ তারা জানে কিরিস রেগে গেলে মানুষ মারে না।
সে অস্তিত্ব মুছে দেয়। তার জীবন কোনো আবেগে চলে না। তার প্রতিটা শ্বাস হিসাব করে ফেলা। প্রতিটা সিদ্ধান্ত মৃত্যুর মতো নিখুঁত। সে এতটাই ঠান্ডা… যদি তার সামনে পুরো পৃথিবী জ্বলে যায় তার চোখের পাতা কাঁপবে না।
যদি তার শহর রক্তে ভেসে যায় তার মুখের অভিব্যক্তি বদলাবে না।
এমনকি… যদি তার শত্রুরা তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকেও হত্যা করে ফেলে… তবুও সে কাঁদবে না।
কারণ কিরিসের অনুভূতি চোখে প্রকাশ পায় না। প্রকাশ পায় তার প্রতিশোধে। আর সেই প্রতিশোধ এতটাই নৃশংস হয়… যে মৃত্যুকেও তখন দয়া মনে হয়। সে যখন কারো গায়ে হাত দেয় তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না। চিৎকার আর চিৎকার থাকে না। রক্ত আর রক্ত থাকে না। সবকিছু পরিণত হয় এক ভয়ংকর উদাহরণে। একটা এমন উদাহরণ… যেটা দেখে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে নিষ্ঠুর খুনিরাও রাতের ঘুম হারিয়ে ফেলে। কারণ কিরিস কোনো পশু নয়। পশুরও ক্ষুধা থাকে… ক্লান্তি থাকে… কখনো কখনো মায়াও থাকে। কিন্তু কিরিস? সে এমন এক অন্ধকার, যেখানে মানবতা বহু আগেই আত্মহত্যা করেছে। মার্ক নিচু স্বরে বললো
— “Boss… তাহলে কি আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেব?”
কিরিস ধীরে চোখ তুললো। তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই ভয়ংকর হাসি ফুটে উঠলো।
— “No, Mark…”
সে টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকলো। একবার দু’বার।
তারপর নিচু, হিমশীতল স্বরে বললো
— “ওরা যুদ্ধ শুরু করেনি… ওরা নিজেদের কবর খোঁড়া শুরু করেছে।”
কিরিস ঘার ঘুড়িয়ে বাঁদিকে গার্ডেনের দিকে তাকায় জ্বল জ্বল করছে গার্ডেনটা ছোট ছোট লাইটে মেয়েরা হেসে খেলে বসে আছে আর কিরিসের দুটি আঁখি আটকে গেছে এক নিষ্পাপ মুখের উপর মাধুর্যে ভরা হাসি তার, তার হাসির ক্ষীণ ক্ষীন আওয়াজগুলো যেন কোন গানের সুর মুগ্ধতার সঙ্গে তাকিয়ে আছে তার মুখের পানে কতটা যত্নে গুছিয়ে রাখার তাকে। কিন্তু সে কি জানে তাকে একজন ঠিক কতটা সুন্দর যত্নে গুছিয়ে রেখেছে তার ইচ্ছা গুলোকে নিজের মতো করে দিয়েছে মনের ভিতর অন্তক্ষরা খেলছে তার। কিরিস লিসিকে ভালোবাসে এ কথাটা বলা ভুল। ভালোবাসা শব্দটা খুব ছোট। খুব সাধারণ খুব সীমিত। কিরিস লিসিকে এমনভাবে নিজের ভেতর ধারণ করেছে, যেন তার অস্তিত্বের প্রতিটা শিরা-উপশিরায় মেয়েটার নাম রক্ত হয়ে প্রবাহিত হয়।
তবুও বিস্ময়ের বিষয় কী জানো? সে কখনো তাকে শেকলে বাঁধেনি। কখনো তার ডানার উপর নিজের অধিকার চাপিয়ে দেয়নি। কখনো তাকে চার দেয়ালের ভেতর লুকিয়ে রেখে নিজের নিরাপত্তার অহংকারে তৃপ্ত হয়নি। অন্য কেউ হলে হয়তো করত। এত ক্ষমতা…
এত ভয়ংকর প্রভাব… এতটা অধিকারবোধ এসব একসঙ্গে পেলে অধিকাংশ পুরুষই তার প্রিয় নারীকে পৃথিবীর চোখ থেকে আড়াল করে রাখতে চাইত।
কারণ ভয় জন্মাত।
হারিয়ে ফেলার ভয়।
ছিনিয়ে নেওয়ার ভয়।
অথবা অন্য কারো দৃষ্টিতে তাকে দেখে ফেলার ভয়।
কিন্তু কিরিস ভিন্ন।
সে জানে খাঁচায় বন্দি পাখি বাঁচে ঠিকই, কিন্তু তার চোখের ভেতর আকাশের জন্য এক ধরনের নীরব মৃত্যু জমতে থাকে। খোলা নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে পাখিটার বুকের ভেতর প্রতিদিন এক অদ্ভুত ছটফটানি জন্ম নেয়। তার মনে হয়—
“কবে আমি উড়ব?”
“কবে আমি ডানা মেলে বাতাস ছুঁব?”
“কবে এই বন্দিত্বের সীমা পেরিয়ে আমি নিজের আকাশে ফিরব?”
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ঠিক সেই মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিটাও দিনের শেষে সূর্যাস্তের অপেক্ষা করে।
সন্ধ্যার কোমল আলো নামার অপেক্ষা করে। কারণ তার বুকের ভেতরও তখন একটাই আকুলতা জন্মায়—
“ফিরতে হবে।”
“নিজের ঠিকানায় ফিরতে হবে।”
“যে আশ্রয়ে শান্তি আছে, সেখানে ফিরতে হবে।”
দুই পাখিই একই।
শুধু তাদের অবস্থান বদলে যায়। একজন মুক্তি চায়
আরেকজন ফিরে আসার কারণ খোঁজে। কিরিস এই সত্যটা খুব গভীরভাবে বোঝে। তাই সে লিসিকে কখনো আটকে রাখেনি। লিসি যা ভালোবেসেছে, সে তাই করতে দিয়েছে। যেখানে তার মন চেয়েছে, সেখানে তাকে উড়তে দিয়েছে। তার হাসি, তার ইচ্ছা, তার স্বাধীনতাকে কখনো নিজের ক্ষমতার দেয়ালে বন্দি করেনি। কারণ সে জানে ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে ফিরে আসাটা কখনো বাধ্যবাধকতা হয় না। ফিরে আসাটা অভ্যাস হয়ে যায়।
শ্বাস নেওয়ার মতো স্বাভাবিক হয়ে যায়। যেমন এক জটিল অঙ্কের শেষ ফলাফল, হাজার পথ ঘুরেও শেষে মিলে যায়। ঠিক তেমনি, লিসির সমস্ত পথ শেষমেশ এসে কিরিসের কাছেই থামবে। এটা কিরিসের আশা নয়।
এটা তার আত্মবিশ্বাসও নয়। এটা যেন এক নীরব নিশ্চিত সত্য যেটা শব্দ ছাড়াই অনুভব করা যায়।
কারণ সে লিসিকে বেঁধে রাখেনি… সে এমনভাবে আগলে রেখেছে, যেন পৃথিবীর সমস্ত মুক্তির মাঝেও মেয়েটা তার কাছেই শান্তি খুঁজে পায়। তবুও ভুল বোঝার সুযোগ নেই।
কিরিসের ভেতরে ভয়ংকর এক অধিকারবোধ আছে।
তার ভালোবাসার গভীরে এক আদিম possessive লুকিয়ে আছে। লিসি তার। তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সত্য। তার অন্ধকার পৃথিবীর একমাত্র কোমল আলো। তার বিশৃঙ্খল অস্তিত্বের একমাত্র প্রশান্তি। তাই পৃথিবীর কোনো পুরুষের দৃষ্টি, কোনো স্পর্শ, কোনো লোভ সে সহজভাবে নেয় না। কারণ বীরেরা তাদের প্রিয় জিনিসকে অবহেলায় ছেড়ে দেয় না। তারা শুধু এতটাই শক্তিশালী হয় যে, শেকল ছাড়া পাহারা দিতে পারে।
কিরিসও তাই করেছে। সে লিসিকে মুক্ত রেখেছে
কিন্তু সেই মুক্ত আকাশের প্রতিটা পথের শেষে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজেই। একজন বীরবাহু পুরুষের মতো।
যার নারীকে পৃথিবী ছুঁতে পারবে, কিন্তু অর্জন করতে হলে সবার আগে তাকে অতিক্রম করতে হবে। আর কিরিসকে অতিক্রম করা সেটা কোনো মানুষের সাধ্যের বিষয় নয়।
তাই সব পরিশেষে কিরিসের এই একটাই উক্তি আছে। সে বলতে চাই তার মন থেকে আকুল হয়ে
— “বন্দি পাখি আজীবন মুক্ত আকাশের স্বপ্ন দেখিয়া কাটায়, আর মুক্ত পাখি দিনশেষে ফিরিয়া আসে তাহার আপন নীড়ে। আমি কখনো লিসির ডানায় শৃঙ্খল পরায়নি, কারণ আমি জানি— প্রেমের সর্বশ্রেষ্ঠ অধিকার বন্দিত্বে নহে, বরং এমন এক আশ্রয়ে, যাহার মায়া সহস্র দিগন্তের আহ্বানকেও ম্লান করিয়া দেয়।
তাই লিসির প্রত্যাবর্তন আমার নিকট কোনো বাধ্যতা ছিল না; ইহা ছিল আমার হৃদয়ের স্বভাব, ঠিক যেমন সন্ধ্যা নামিলে ক্লান্ত পাখি অবশেষে ফিরিয়া আসে তাহার সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানায়।”
ভাবনার জগতের দরজায় হালকা টোকা পড়তে ফিরে আসে বাস্তবে কিন্তু ওই যে তার খোলা আকাশে বেড়ানো পাখিটা তার খাচায় এসে মিষ্টি করে হাসছে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে আর কি চাই আর পুরুষের জীবনে তার শখের নারীর এমন করে পাওয়া। সব পুরুষই চায় তার শখের নারীকে কয়জনি বা পাই তাহাকে কারণ গোছানো সবার দ্বারা সম্ভব হয় না। অনেক পুরুষই শখের নারীকে বন্দীর তে ভালোবাসে আর হাজারি নয় বড় কটিতে এমন একজন পুরুষ আছে যেটা শখের নাইকের মুক্ত আকাশে ছেড়ে দিয়ে ভালোবাসে। আমাদের সমাজে এই হাজারে থাকা পুরুষগুলো প্রতি নিতান্তই দেখতে পাওয়া যায় কিন্তু এই খুঁটিতে থাকা পুরুষ গুলো দেখা কয়জন নারীর ভাগ্যে মেলে। কিরিস বসে আছে ভাবনার মনের ঘরে, মার্ক জানে তার কি করতে হবে সে পাশে থাকা ওয়াইনের বোতল থেকে সাবধানে ওয়াইন ঢালছে। কিরিস উঠে আবার টেরিসে আসে। টেরিসের মৃদু মৃদু হাওয়ায় দোলা দিচ্ছে তার চুলের আগা, চুপচাপ পাশে থাকা চেয়ারে বসে পড়ে সে মার্ক সাবধানতার সঙ্গে ওয়াইন সার্ভ করে পাশে সেও দাঁড়িয়ে আছে। কিরিস একটা চেয়ার টেনে মার্ককে বসার অনুমতি দিল, মার্ক আর সে চুপচাপ বসে গার্ডেনের দিকে তাকিয়ে আছে।
অন্য দিকে
বাংলাদেশ থেকে ইতালির রোম প্রায় ৭,৩০০ কিলোমিটার দূরে।
রোম মধ্যরাত।
শহরের অভিজাত অংশের বহু নিচে, মাটির তলদেশে নির্মিত এক গোপন প্রাসাদসদৃশ অন্ধকার কক্ষ।
দেয়ালজুড়ে কালো মার্বেল। বাতাসে সিগারের ধোঁয়া আর পুরনো রক্তের ধাতব গন্ধ। বিশাল গোল টেবিলের চারপাশে বসে আছে ইতালিয়ান আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে ভয়ংকর মুখগুলো। যাদের এক ইশারায় সরকার বদলে যায়, শহর জ্বলে ওঠে, মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু আজ…
তাদের চোখে অন্যরকম অস্থিরতা। টেবিলের শীর্ষে বসে থাকা মানুষটা ধীরে ধীরে ওয়াইনের গ্লাস নামিয়ে রাখলো।
কালো স্যুটে মোড়া দীর্ঘদেহী মানুষটা যেন জীবন্ত মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি। ডন লরেঞ্জো দে ভিটো। ইতালিয়ান মাফিয়ার সেই নাম, যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস মৃত্যুকেও দু’বার ভাবায়। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক বিকৃত হাসি ফুটে উঠলো।
— “Quella ragazza… è viva?”
(“মেয়েটা… বেঁচে আছে?”)
ঘরের ভেতর চাপা নীরবতা। একজন নিচু স্বরে বললো—
— “Sì, Don… le informazioni sono confermate.”
(“জি, ডন… খবর নিশ্চিত।”)
লরেঞ্জোর চোখ দুটো সরু হয়ে এলো। সে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। তার কণ্ঠে তখন এমন এক অদ্ভুত উন্মাদনা, যেন বহু বছর মৃত কোনো শিকার হঠাৎ আবার জীবিত হয়ে ফিরে এসেছে।
— “Impossibile…”
(“অসম্ভব…”)
তারপর হঠাৎ সে হেসে উঠলো।ভয়ংকর শীতল,অমানুষিক।
— “Io stesso ho premuto il grilletto…”
(“আমি নিজ হাতে ট্রিগার টেনেছিলাম…”)
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। লরেঞ্জো ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বললো
— “Come può sopravvivere una ragazza morta?”
(“যে মেয়েকে মৃত করা হয়েছিল, সে কীভাবে বেঁচে থাকতে পারে?”)
তার চোখে তখন উন্মাদ লোভের ঝলক। কারণ মেয়েটা শুধু একজন মানুষ নয়। সে এমন এক জীবন্ত চাবিকাঠি যার হাতে লুকিয়ে আছে আভাস খানের সাম্রাজ্যের সমস্ত গোপন দরজা। সেই ফাইলগুলো… যেগুলোর জন্য পৃথিবীর প্রতিটা মাফিয়া পরিবার আজ পাগল হয়ে আছে।

0 Comments