পর্ব :73
লিসি সবার মাঝে নরম ভঙ্গিতে বসে আছে। চারপাশে হাসি-আড্ডার মিষ্টি গুঞ্জন, আর তার মাঝেই মির্জা বেগম স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে লিসির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন।
—“তোকে কি বলবো বল… আমার নাতনি নাকি পুতাবউ, হ্যাঁ?”
লিসি ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি টেনে মাথা একটু নিচু করে বলল —“যেটা ভালো লাগে…”
এই সরল উত্তর শুনে আশেপাশে থাকা সবাই হেসে উঠল, আর মির্জা বেগমের চোখে যেন আরও মায়া জমে উঠল।
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে সুপ্রিয়ার ডাক ভেসে এলো
—“লিসি, এদিকে আয় তো মা!”
লিসি ধীরে উঠে দাঁড়াল, শাড়ির আঁচলটা সামলে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তার পিছু পিছু আরোবি-ও দৌড়ে এলো। হঠাৎ করে আরোবি হালকা ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল
—“ওই বড়ভাবি, কই যাও এই?”
লিসি ভ্রু তুলেই মুচকি হেসে তাকাল—
—“কি হয়েছে আমার ননদিনী?”
আরোবি তাড়াতাড়ি ফোন বের করে একটা ভিডিও চালিয়ে লিসির সামনে ধরল। ভিডিওতে এক ঝলমলে ডান্স পারফরম্যান্স চলছে।
—“লিসি সোনা, এটা তুই নাচবি ঠিক আছে? সঙ্গে তো ভাইয়া আছেই!”
লিসির গাল হালকা লাল হয়ে উঠল। একটু লজ্জা মিশ্রিত হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল
—“পাগল তুই! ভাইয়া আর এই গানে… এইভাবে আমার সাথে ডান্স করবে নাহ…”
ওদের এই কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ করে পেছন থেকে একসাথে কয়েকটা চঞ্চল কণ্ঠ ভেসে এলো
—“ভাবি… ভাবি… কোথায় তুমি?”
হিয়া, জারা, সুরভী—সবাই একসাথে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে। চোখে-মুখে দুষ্টুমি আর উচ্ছ্বাস।
—“ভাবি, আজকে কিন্তু তোমাকে ছাড়া কিছু হবে না!”
—“আমরা কিন্তু স্পেশাল কিছু খাবো তোমার হাতের!”
—“হ্যাঁ, ভাবি প্লিজ…”
রান্নাঘরের ভেতরে সুপ্রিয়া তখন একটা বিশেষ পদ রান্না করছিলেন। লিসিকে দেখে মুচকি হেসে বললেন—
—“এইটা একটু নাড় তো মা, আমি আরেকটা কাজটা দেখে আসি।”
লিসি বিনা দ্বিধায় হাঁড়িটা হাতে নিয়ে নরম হাতে নাড়তে লাগল। পাশে নুসরাতও দাঁড়িয়ে সাহায্য করছে—কখনো মসলা এগিয়ে দিচ্ছে, কখনো প্লেট গুছিয়ে রাখছে।
এই সময় আবার কাজিনদের বায়না শুরু হলো—
—“না না, আমরা এইটা না… আমরা ভাবির হাতের আলাদা কিছু খাবো!”
—“হ্যাঁ ভাবি, তুমি নিজে বানাবে!”
লিসি একটু অবাক হয়ে সবার দিকে তাকাল, তারপর মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বলল
—“আচ্ছা ঠিক আছে… কি খেতে চাও বলো?”
সাথে সাথে সবাই উচ্ছ্বাসে একসাথে বলে উঠল—
—“যা বানাও, সেটাই খাবো!”
লিসির চোখে তখন এক অন্যরকম কোমল আনন্দ ঝিলিক দিচ্ছে। সে আঁচলটা ঠিক করে গুছিয়ে নিল, তারপর ধীরে ধীরে হাতা গুটিয়ে কাজে লেগে গেল। রান্নাঘর ভরে উঠল হাসি, গল্প আর মিষ্টি উষ্ণতায়—
যেখানে এক নতুন সম্পর্ক, এক নতুন ‘ভাবি’—নিজের আপন জায়গাটা নীরবে, সুন্দরভাবে গড়ে নিচ্ছে।রান্নাঘরের ভেতর তখন এক অদ্ভুত উষ্ণতা। লিসি সবার বায়না শুনে একটু ভেবে নিল, তারপর হালকা হেসে বলল—“আচ্ছা, আমি এমন কিছু বানাই যেটা সবাই মিলে খেতে পারবে।”
সে দ্রুত হাতে কাজ শুরু করল ময়দা, সবজি, মসলা… সবকিছু নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়ে এমন একটা নাস্তা বানাতে লাগল, যেটা সহজ, কিন্তু স্বাদে ভরপুর সবাই মিলে বসে খাওয়ার মতো। এদিকে কাজিনরা যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল।
সুরভী —“লিসি , তুই রান্না কর… আমরা ততক্ষণ ডান্স প্র্যাকটিস করে আসি!”
হিয়া —“হ্যাঁ, পরে কিন্তু তোকেও ধরবো!”
হাসাহাসি করতে করতেই সবাই রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। মুহূর্তেই রান্নাঘরটা শান্ত হয়ে গেল। লিসি একা দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু সেই একাকীত্বেও তার ভেতরে ছিল একরাশ শান্তি। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে, চুলটা কানে গুঁজে নিয়ে সে মন দিয়ে রান্না করতে লাগল। কখনো চুলার আগুন কমাচ্ছে, কখনো মসলা মিশিয়ে স্বাদ ঠিক করছে—পুরোটা যেন নিজের একটা ছোট জগৎ।
ঠিক তখনই বাড়ির বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
কিছুক্ষণ পরেই ড্রইংরুমে প্রবেশ করল সুপ্রিয়ার বোন পাপড়ি আর তার মেয়ে অনু। সুপ্রিয়া তাদের দেখেই খুশিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল
—“আরে পাপড়ি! তুই এসেছিস?”
দুজন বোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। পাপড়ি হাসতে হাসতেই বলল —“এইতো, ভাবলাম বিয়ের বাড়ি… না এসে পারি নাকি! আমার ছোট বোনপোর বিয়ে আসতে হবেই। ”
সুপ্রিয়া চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল
—“অভি কোথায়?”
পাপড়ি হালকা স্বাভাবিক গলায় বলল
—“ও কাজে আছে। বিয়েতে আসবে। আমি আর অনু আগে চলে এলাম।”
কিছুক্ষণ গল্প করার পর পাপড়ির চোখ হঠাৎ রান্নাঘরের দিকে গেল। সে খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
রান্নাঘরের ভেতরে লিসি শাড়ি পরে, আঁচল গুঁজে, একদম নতুন বউয়ের মতো মন দিয়ে রান্না করছে।
দৃশ্যটা যেন চোখে লেগে রইল। পাপড়ি একটু ভ্রু কুঁচকে, অবাক গলায় বলল—
—“আপা… লিসি এমন লাগছে কেন? একদম নতুন বউয়ের মতো…”
সুপ্রিয়া একটু থামল। তারপর মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। সে ধীরে ধীরে পুরো ঘটনা বলতে শুরু করল।
প্রতিটা কথা শুনতে শুনতে পাপড়ি আর অনুর চোখ বড় হয়ে গেল। বিস্ময়, অবাক হওয়া… আর তার সঙ্গে মিশে থাকা অদ্ভুত এক আনন্দ।
—“কি বলছিস আপা… সত্যি?” —পাপড়ির গলায় স্পষ্ট চমক।
অনুও অবাক হয়ে বলল
—“মানে… লিসি আপু আর ভাইয়া…!”
সুপ্রিয়া হালকা মাথা নেড়ে হেসে বলল
—“হ্যাঁ… সবই হয়ে গেছে। সময় মতো তোদের জানানো যায়নি।”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল পাপড়ি। তারপর তার মুখে ধীরে ধীরে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
—“আসলে… ভালোই হয়েছে আপা। লিসির মতো মেয়ে এই বাড়ির বউ হওয়াটাই ঠিক।”
অনুও খুশি হয়ে মাথা নেড়ে বলল—
—“হ্যাঁ, ওকে একদম পারফেক্ট লাগছে। ওহ আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না ও আমার বড় ভাবি ”
রান্নাঘরের দিকে আবার তাকাল তারা। লিসি তখনও নিজের মতো করে রান্না করছে কিছুই জানে না, বাইরে তার নতুন পরিচয় নিয়ে কতটা আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই মুহূর্তে, বাড়িটার ভেতরে যেন আরও গভীরভাবে গেঁথে গেল লিসি এখন শুধু এই পরিবারের অতিথি না… সে এই বাড়িরই একজন। ড্রইংরুমের সেই বিস্ময় আর আনন্দ ধীরে ধীরে এক মিষ্টি উত্তেজনায় বদলে গেল। পাপড়ি আর অনু একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে উঠল, যেন তারা হঠাৎ করে একটা সুন্দর গোপন রহস্যের অংশ হয়ে গেছে। পাপড়ি আর বসে থাকতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে বলল
—“চল তো, দেখি আমাদের নতুন বউটা কি করছে…”
সুপ্রিয়া মৃদু হেসে কিছু বলল না, শুধু তাকিয়ে রইল। অনু প্রায় দৌড়েই পাপড়ির সাথে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘরের দরজার কাছে এসে তারা থমকে দাঁড়াল। ভেতরের দৃশ্যটা যেন কোনো ছবির মতো—
চুলার হালকা আগুনে ভাজা হচ্ছে গরম গরম কিছু, মসলার ঘ্রাণে ভরে গেছে চারপাশ। লিসি একদম মন দিয়ে কাজ করছে। তার লম্বা চুলটা একটা বড় করে খোপা করে রাখা, শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে রাখা… কপালে হালকা ঘাম জমেছে, কিন্তু মুখে সেই শান্ত, মায়াময় একাগ্রতা। পাপড়ির চোখে অদ্ভুত এক কোমলতা নেমে এলো। সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে নরম গলায় বলল —“এই যে… আমাদের নতুন বউ…”
লিসি চমকে ঘুরে দাঁড়াল। হঠাৎ করে অপরিচিত মুখ দেখে একটু থেমে গেল কিন্তু ভালো করে দেখতেই চেনতে পারি অভি মা, কিরিসের খালাম্মা আর লিসির এখন খালা শাশুড়ি তারপর ভদ্রভাবে মাথা নিচু করল।
—“আসসালামু আলাইকুম…”
পাপড়ি এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রাখল
—“ওয়ালাইকুম আসসালাম… এত লজ্জা কিসের হ্যাঁ?”
অনু পাশে দাঁড়িয়ে মিষ্টি হেসে বলল
—“লিসি আপু, তুমি তো একদম সিনেমার বউয়ের মতো লাগছো!”
লিসির গাল হালকা লাল হয়ে উঠল। সে একটু অপ্রস্তুত হেসে বল —“না… আসলে সবাই খেতে চাইছিল, তাই…”
পাপড়ি চারপাশে তাকিয়ে হাঁড়ির ঢাকনা একটু তুলে দেখল। গরম ভাপ উঠতেই সে অবাক হয়ে বলল
—“ওহ! এটা তো দারুণ লাগছে… সব একাই বানাচ্ছিস?”
লিসি মাথা নাড়ল
—“হুম… ওরা বলল আমার হাতের কিছু খাবে…”
ঠিক তখনই সুপ্রিয়াও ভেতরে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখে স্পষ্ট গর্ব।
—“দেখছিস তো? বলেছিলাম না, মেয়েটা একদম ঘর সামলাতে জানে।”
পাপড়ি মুচকি হেসে বলল
—“আপা, তুমি তো সত্যি রত্ন পেয়ে গেছো।”
এই কথায় লিসি আরও লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। এদিকে বাইরে থেকে হইচইয়ের শব্দ ভেসে এলো—
জারা —“লিসি … হয়ে গেছে?”
রিহান —“আমরা কিন্তু আর অপেক্ষা করতে পারছি না!”
কাজিনরা ডান্স প্র্যাকটিস শেষ করে দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে আসছে। অনু হেসে বলল—
—“এই তো, ফ্যান ক্লাব চলে আসছে!”
মুহূর্তের মধ্যে রান্নাঘর আবার জমজমাট হয়ে উঠল। সবাই একসাথে ঢুকে লিসিকে ঘিরে ধরল।
ইশান —“ এই লিসি , আগে আমাকে দে!”
জারা —“না না, আমি আগে!”
কাবির —“এইটা আমার!”
লিসি একটু হেসে বলল —“আচ্ছা আচ্ছা, সবাই পাবে… একটু দাঁড়াও তো!”
সে প্লেটে করে একে একে সবাইকে দিতে লাগল। গরম গরম নাস্তার গন্ধে সবাই প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছে। প্রথম কামড় দিতেই
অনু —“ওয়াও!”
কাবির —“ এটা তো অসাধারণ!”
ইশান —“আমি তো আর বাইরে কিছু খাবো না, শুধু তোর হাতেরই খাবো!”
হাসির রোল পড়ে গেল চারপাশে। পাপড়ি আর সুপ্রিয়া দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে। তাদের চোখে তৃপ্তি এই মেয়েটা কত সহজেই সবার মন জিতে নিচ্ছে। রান্নাঘর ভরে আছে গরম গরম চিকেন-ভেজিটেবল কাটলেট-এর দারুণ ঘ্রাণে। লিসি একে একে সোনালি করে ভাজা কাটলেটগুলো টিস্যু পেপারের উপর তুলে প্লেটে সাজাচ্ছে বাইরে মচমচে, ভেতরে নরম আর জুসি। পাশে হালকা টক-মিষ্টি সসও বানিয়ে রেখেছে। কাজিনরা তো খেয়ে প্রায় পাগল—
আরোবি —“ ওরে আমার লিসি , এটা তো একদম রেস্টুরেন্ট লেভেল!”
কাবির —“না রে, রেস্টুরেন্ট না… এটা ভাবি স্পেশাল!”
রিহান —“আমরা কিন্তু এখন থেকে ডেইলি এইটাই খাবো!”
হাসি-আড্ডায় জমে উঠেছে পুরো পরিবেশ। ঠিক তখনই আরোবি চোখ বড় করে দরজার দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল —“গার্লস… টার্গেট এসে গেছে!”
সবাই একসাথে ঘুরে তাকাল। কিরিস দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নেভি ব্লু রঙের শার্ট, হাতা হালকা গোটানো, চোখে সেই চিরচেনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি… কিন্তু মুখে ক্লান্তির ছাপ, বোঝাই যাচ্ছে কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সে একবার চারপাশে তাকিয়ে আবার ফোনে কিছু চেক করতে লাগল।
নুসরাত হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল
—“এই দেখ, ভাইয়া আবার কাজে ডুবে গেছে!”
জারা ফিসফিস করে
—“এইভাবে হলে তো খাওয়ানোই যাবে না…”
আরোবি দুষ্টু হেসে বলল
—“চিন্তা করিস না… আজকে ভাইয়াকে না খাইয়ে ছাড়ছি না!”
ওরা সবাই মিলে কিরিসের দিকে এগিয়ে গেল।
আরোবি —“ভাইয়া…”
—“কি?” (চোখ না তুলেই)
—“তুমি জানো আজকে কি হয়েছে?”
—“হুম?”
—“তোমার বউ কিন্তু আজকে নিজের হাতে রান্না করেছে…”
কিরিসের আঙুল থেমে গেল ফোনের স্ক্রিনে। ধীরে চোখ তুলল।
—“তাই?”
সুরভী নাটকীয়ভাবে বলল—
—“শুধু রান্না না… আমাদের জন্য স্পেশাল কাটলেট বানিয়েছে!”
হিয়া যোগ করল
—“আর তুমি না খেলে কিন্তু আমরা খুব কষ্ট পাবো…”
কিরিস ঠাণ্ডা গলায় বলল—
—“তোরা খা। আমি পরে—”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরোবি সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাত দুটো বুকের সামনে গুটিয়ে বলল—
—“নো, আজকে ‘পরে’ বলে কিছু নেই। আজকে এখনই খেতে হবে।”
নুসরাত হেসে বলল —“না হলে ভাবির অপমান হবে কিন্তু…”
এই কথাটা শুনেই কিরিসের চোখ হালকা সরু হলো। এক সেকেন্ডের জন্য চুপ রইল। তারপর ধীরে ফোনটা পকেটে রেখে বলল —“কোথায়?”
সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল
—“ইয়েসস!”
ওরা প্রায় টেনে নিয়ে গেল কিরিসকে রান্নাঘরের ভেতরে।
লিসি তখন সবার জন্য প্লেট সাজাচ্ছিল। হঠাৎ করে কিরিসকে সামনে দেখে সে থমকে গেল। হাতের প্লেটটা হালকা কেঁপে উঠল। কিরিস সরাসরি তার সামনে এসে দাঁড়াল। চারপাশে হালকা চুপচাপ। আরোবি ফিসফিস করে বলল —“ ওই মেরি জান, তোর হাসবেন্ড কে এবার নিজের হাতে খাওয়াও…”
লিসি একদম লজ্জায় লাল হয়ে গেল —“না… আমি… মানে…”
কিরিস চোখ না সরিয়েই বলল —“দাও।”
লিসি ধীরে একটা কাটলেট তুলে প্লেটে রাখল, তারপর এগিয়ে দিল। কিরিস প্লেটটা নিল না। বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল
—“তুমি খাওয়াও।”
মুহূর্তেই চারপাশে চাপা চিৎকার —“ওহহহ!”
ইশান কাবিরকে ধাক্কা দিয়ে বলে —“রোমান্স শুরু!”
লিসির হাত কেঁপে উঠল। তবুও সে ধীরে কাটলেটটা তুলে কিরিসের দিকে এগিয়ে দিল। কিরিস তার হাতের দিকেই তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরে এক কামড় নিল। এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড সবাই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে কিরিস চুপচাপ চিবিয়ে, তারপর ধীরে বলল
—“ভালো।”
শুধু একটা শব্দ। কিন্তু তার গলার স্বরটা ছিল আলাদা নরম, গভীর… যেন শুধুই লিসির জন্য। লিসির চোখ নিচু, কিন্তু ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠেছে।
আর চারপাশে কাজিনরা আবার হইচই শুরু করে দিল
আরোবি —“এই তো! ভাইয়া approve করে দিয়েছে!”
রিহান —“ভাবি officially জিতে গেছে!”
হাসি, টিজিং, আনন্দে ভরে উঠল পুরো রান্নাঘর।
আর সেই কোলাহলের মাঝেই কিরিস এক মুহূর্তের জন্য লিসির দিকে তাকিয়ে রইল…যেন নিঃশব্দে বলছে “এটা শুধু খাবার না… এটা আমার মানুষটার ছোঁয়া।”
কাটলেটের হইচই ধীরে ধীরে হাসি-ঠাট্টার রেশ হয়ে মিলিয়ে গেল, কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস থামল না। বরং একটু পরেই আবার নতুন করে জমে উঠল পুরো বাড়ি।
বিকেলের আলো তখন নরম হয়ে উঠছে। বাড়ির প্রবেশ করতেই সামনে পড়ে বিশাল এক হলরুম। মার্বেল ফ্লোর, তার ওপর ঝকঝকে প্রতিফলন… মাথার ওপর বড় ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি, যার আলো নরমভাবে ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। দেয়ালে মিনিমাল কিন্তু এলিগ্যান্ট ডিজাইন—হালকা গোল্ডেন টোনে কাজ করা প্যানেল, মাঝে মাঝে বড় বড় আর্ট ফ্রেম। এই হলরুমটাই যেন পুরো বাড়ির প্রাণ যেখানে অতিথিরা বসে, গল্প হয়, হাসির শব্দ ভেসে বেড়ায়। হলের এক পাশে উঠে গেছে একটা সুন্দর সিঁড়ি কার্ভ করা ডিজাইন, রেলিংয়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ… সিঁড়ির ধাপগুলো সাদা মার্বেলের, মাঝে হালকা গোল্ডেন লাইনিং। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে যায় ব্যক্তিগত ফ্লোরে আর সেই দিকেই কিরিসের রুম। কিন্তু সিঁড়ির ঠিক নিচেই আছে একটা আলাদা আকর্ষণ ফাঁকা জায়গাটাকে খুব সুন্দর করে ব্যবহার করা হয়েছে। ওখানে একটা ছোট, কিন্তু একদম নিখুঁত ডিজাইনের ঘর। গ্লাস ডোর, ভেতরে নরম আলো… একটা আরামদায়ক সোফা সেট, পাশে বুকশেলফ, আর দেয়ালে কাঠের কাজ যেন ছোট্ট একটা প্রাইভেট লাউঞ্জ বা রিডিং কর্নার। কখনো একা বসে ভাবার জায়গা, কখনো গোপন আলাপের। এই ছোট ঘরটার পাশেই আরেকটা দরজা যেটা সাধারণত অল্প খোলা থাকে। দরজাটা পেরোলেই খুলে যায় আরেকটা বিশাল স্পেস। এটা একটা ইনডোর হল যেন বাড়ির ভেতরেই আরেকটা অনুষ্ঠান মঞ্চ। উঁচু সিলিং, সাউন্ড সিস্টেম সেট করা, লাইটিং এমনভাবে লাগানো যে কোনো সময় ছোটখাটো অনুষ্ঠান, নাচ-গান, পার্টি সবকিছু সহজেই করা যায়। দেয়ালজুড়ে সফট টেক্সচার, হালকা অফ-হোয়াইট আর গোল্ডেনের কম্বিনেশন… এক পাশে ছোট স্টেজের মতো উঁচু জায়গা, সামনে খালি স্পেস পারফরম্যান্সের জন্য পারফেক্ট। মেঝেতে পালিশ করা কাঠের ফিনিশ যাতে আলো পড়লে ঝিলিক দেয়। কোণায় কোণায় সাজানো ডেকোর ফুল, লাইট, আর আর্ট পিস। এই হলটা এমনভাবে ডিজাইন করা বাইরের গার্ডেনে না গিয়েও, ঘরের ভেতরেই এক জমজমাট অনুষ্ঠান করা যায়। আর এই পুরো জায়গাটার সাথে এক অদৃশ্য সংযোগ আছে কিরিসের রুমের উপরে তার ঘর, নিচে এই হল যেন সে চাইলে এক নজরেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সব মিলিয়ে এই বাড়ির প্রতিটা কোণায় শুধু সৌন্দর্য না একটা ক্ষমতা, একটা উপস্থিতি, আর এক ধরনের নিঃশব্দ রাজত্বের ছাপ লুকিয়ে আছে…
যেটা পুরোপুরি মানায় কিরিসের মতো একজন মানুষের সাথে। আর সত্যি বলতে এই পুরো বাড়িটা তার মতেই বানানো পুরো ডিজাইনটা। মেয়েরা তো ঘরের ভিতরেই সেই বিশাল হলরুমে প্যাকটিস করছে। কোনো অনুষ্ঠানের জন্য নাচ-গানের প্রস্তুতি এখানেই নেওয়া হয়। আর এই পুরো জায়গার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাজিনদের পুরো দল।
—“ওকে, ফাইনাল টাইম! সবাই পজিশনে দাঁড়া!” —নুসরাত হাততালি দিয়ে বলল।
ছেলে-মেয়ে সবাই মিলে লাইনে দাঁড়াল। আরোবি ফোনে ভিডিওটা চালিয়ে দিল —“এই স্টেপটা আবার কর… লিসি, তুই এখানে আস!”
লিসি একটু ইতস্তত করলেও ওরা টেনে নিয়ে এল মাঝখানে।
—“ আজকে কিন্তু ছাড়বো না!”
মিউজিক শুরু হতেই সবাই একসাথে নাচতে লাগল।
হাসি, ভুল স্টেপ, ঠোকাঠুকি সব মিলিয়ে একেবারে জমজমাট পরিবেশ। লিসিও ধীরে ধীরে গা ছেড়ে দিল। প্রথমে লাজুক, তারপর একটু স্বাভাবিক… তার শাড়ির আঁচল উড়ে উঠছে হালকা, পায়ের নূপুরের শব্দ মিশে যাচ্ছে মিউজিকের সাথে। হঠাৎ করে জারা হেসে উঠল
—“এই হিয়া! তুই আবার উল্টা দিকেই ঘুরলি!”
সবাই হেসে উঠল কাবির পাশ থেকে বলল
—“এইভাবে হলে আজকে অনুষ্ঠান না, কমেডি শো হবে!”
আরোবি চোখ পাকিয়ে
—“চুপ! তুই নিজের স্টেপ ঠিক কর আগে! তোর বিয়ে আর নিজে যদি গাধার মতো নাচ করিস তাহলে কেমন লাগবে। ”
কাবির সোজা হয়ে বলে —“ ওই কাকে গাধা বলছিস আমি সালমান খানের মতো এন্ট্রি নেবো, সাজানজি ঘার আয়ে গানে, কি বলিস ব্রো ”
রিহান আর ইশান একসাথে —“ ঠিক ঠিক ”
এইভাবে হাসতে-হাসতে, ঠাট্টা করতে করতে চলল রিহার্সাল। কখনো সিরিয়াস, কখনো একদম পাগলামি
কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট সবাই একসাথে, এক আনন্দে মিশে গেছে। ছেলে একটু পরে ওখান থেকে চলে আসে গার্ডেনে। এদিকে বাড়ির গার্ডেনে একদম আলাদা দৃশ্য। সেখানে ছেলেদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। লাইটিং সেট করা হচ্ছে, চেয়ার-টেবিল সাজানো, ডেকোরেশনের শেষ কাজ চলছে। কেউ ফুল ঠিক করছে, কেউ সাউন্ড সিস্টেম চেক করছে। সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিরিস চোখে সেই কন্ট্রোলিং দৃষ্টি প্রতিটা ডিটেইল তার নজরে।
—“এই লাইটটা একটু ডানদিকে… হ্যাঁ, এভাবে।”
—“সাউন্ড ক্লিয়ার না, আবার চেক করো।”
তার কণ্ঠে কোনো বাড়তি জোর নেই, কিন্তু কথাগুলো এমনভাবে বেরোয় কেউ অবহেলা করার সাহস পায় না।
কাবির কাছে এসে হালকা হাসি দিয়ে বলল—
—“ভাই, তুই তো পুরো ইভেন্ট ম্যানেজার হয়ে গেছিস!”
কিরিস একবার তাকাল—
—“কাজটা ঠিকমতো হলে বাকিটা নিজে থেকেই ঠিক থাকবে।”
মার্কও পাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে, মাঝে মাঝে নির্দেশ দিচ্ছে। গার্ডেনের ওপরে তখন লাইটগুলো একে একে জ্বলতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার আগের সেই মুহূর্ত—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছে এক বড় আয়োজনের জন্য।
অন্যদিকে, ঘরের ভেতরে আবার এক নতুন ব্যস্ততা।
—“ওহ মাই গড! সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে!” —সুরভী চেঁচিয়ে উঠল।
—“চল চল! সবাই রেডি হতে হবে!”
মেয়েরা একসাথে দৌড়ে যার যার রুমে ছুটে গেল।
ঘরের ভেতর মুহূর্তেই বদলে গেল পরিবেশ মেকআপ বক্স খোলা, শাড়ি বিছানো, গয়না সাজানো… আরোবি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে —“লিসি, তুই আগে রেডি হ! আজকে কিন্তু তোকে একদম আলাদা লাগতে হবে!”
হিয়া যোগ করল —“হ্যাঁ, আজকে ভাইয়ার চোখ সরবে না!”
সবাই আবার হেসে উঠল। লিসি একটু লজ্জা পেয়ে মৃদু হেসে বলল —“তোরা না…”
সবাই যখন সাজগোজে ব্যস্ত ঘর ভরা আলোর ঝিলিক, হাসির টুকরো শব্দ আর শাড়ির খসখস আওয়াজে পুরো পরিবেশ যেন উৎসবের রঙে রঙিন ঠিক তখনই দরজার কাছে হালকা টোকা। কিরিসের গম্ভীর, স্বাভাবিক কণ্ঠ ভেসে আসে
— “লিসি, আমার শার্টটা কোথায় রেখেছো?”
লিসি আয়নার সামনে বসে ছিল। ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিরিস। শরীরজুড়ে হালকা ঘাম, যেন তাড়াহুড়োর মধ্যে এসেছে।
ঘরে থাকা কাজিনরা হঠাৎ করেই চুপ হয়ে যায়, পরিবেশে একটা চাপা কৌতূহল। লিসি ভুরু কুঁচকে, খানিকটা বিরক্ত গলায় বলে
— “আপনি ঘরে না গিয়ে এখানে এসে জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
কিরিস একদম সরাসরি, কোনো ভণিতা ছাড়াই
— “তাহলে ঘরে আসো। আমি শাওয়ার নেবো… দ্রুত শার্টটা দাও।”
কথা শেষ করেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। ঘুরে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। লিসি কিছুক্ষণ একইভাবে বসে থাকে। তার মুখে অস্বস্তি আর লজ্জার মিশ্র ছাপ।
ঠিক তখনই আরোবি, চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে মুচকি হেসে বলে
— “লিসি, তুই যা। না হলে আবার ভাইয়া রাগ করবে। আর ওখান থেকেই সেজে আসিস, ওকে?”
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে যোগ করে, চোখ টিপে
— “হুম, ঘরে গিয়ে একটু রোমাঞ্চ করো না!”
লিসি উঠে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে গিয়ে থেমে যায়। বিরক্তিতে আর লজ্জায় গলা নরম হয়ে আসে
— “আল্লাহ গো! তোমরা একটু এসব কথা বন্ধ করো তো!”
সুরভী হেসে ফেলে, ঠাট্টার সুরে
— “করবো না ভাবি…”
লিসি আর কিছু বলে না। শুধু একচিলতে অসহায় হাসি হেসে বেরিয়ে যায়। সে ভালো করেই জানে এদের থামানো অসম্ভব। ওদিকে সুরভী হঠাৎ জরাকে ধমক দিয়ে বলে
— “এই! এক জায়গায় দাঁড়াতে পারিস না? শাড়ির কুচিটা ধরতে দে!”
জারা বিরক্ত হয়ে গজগজ করে
— “আরে আমি এসব পরি না! এই বালের ভাইরা সব বিয়ে করবে, তোরা শাড়ি পরবি আর আমাকেও পরতে হবে… বাল!”
সুরভী চোখ রাঙিয়ে
— “এই ‘বাল’ বলা বন্ধ কর! না হলে আজকে কিন্তু তোর খবর আছে!”
জারা সঙ্গে সঙ্গে চুপ মেরে যায়। বড় বোনের কথা সে ঠিকই শোনে। আরোবি আর হিয়া তখন নিজেদের শাড়ি পরতে ব্যস্ত কেউ আঁচল ঠিক করছে, কেউ কানের দুল পরছে। আজ মেহেদীর অনুষ্ঠান তাই সবাই হালকা কচি পাতার রঙের শাড়ি বেছে নিয়েছে। নরম সিল্ক আর জর্জেটের কাপড় শরীরের সাথে মোলায়েমভাবে লেগে আছে, হালকা বাতাসে দুলে উঠছে আঁচল। ঘরের ভেতর যেন একসাথে মিশে গেছে সৌন্দর্য, হাসি আর উৎসবের উচ্ছ্বাস আর তার মাঝেই লিসি, নীরবে পা বাড়ায় কিরিসের ঘরের দিকে… যেখানে অপেক্ষা করছে এক অন্যরকম মুহূর্ত।
অন্যদিকে, লিসি ধীরে দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢোকে।
ঘরটা শান্ত। শুধু বাথরুম থেকে ভেসে আসছে পানির মৃদু শব্দ। কিরিস নিজের ঘামে ভেজা শার্টটা বেডের পাশে ফেলে রেখে গোসল করতে ঢুকেছে। লিসি একটুখানি হাফ ছেড়ে শার্টটা হাতে তুলে নেয়। নরম কাপড়টা ভেজা, কিরিসের শরীরের গন্ধ লেগে আছে তাতে। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে পাশের বাস্কেটের ভেতরে রেখে দেয়।
নরম গলায় নিজের সাথেই বলে
— “এখানেই থাকুক… সকালে ধুয়ে পরিষ্কার করে দেবো।”
তারপর ধীরে পা বাড়ায় ড্রেসিংরুমের দিকে।
ড্রেসিংরুমে ঢুকতেই সারি সারি সাজানো শার্ট রঙ, ডিজাইন, সবকিছুতেই কিরিসের পরিপাটি রুচির ছাপ।
লিসি একটু দেখে, হাত বাড়িয়ে একটা সাদা শার্ট বের করে। তার সাথে নেয় একটা কালো প্যান্ট। নীরবে এসে বেডের পাশে সুন্দর করে রেখে দেয়। আবার ফিরে যায় ড্রেসিংরুমে। আজ মেহেদীর অনুষ্ঠান তার জন্য কেনা শাড়িটা তুলে নেয়। নিজে নিজেই ব্লাউজ আর শাড়ি পরে নেয়। ব্লাউজের পেছনের নিচের ফিতাগুলো না বেঁধে সেভাবেই খোলা রেখে দেয়। বাইরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চুলগুলো ধীরে ধীরে আঁচড়ে সামনে এনে বেণী করতে থাকে আঙুলের ফাঁকে কালো চুলগুলো নরমভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে এখনও কোনো গয়না পরেনি সে।
একটা সাদামাটা, অথচ অপার্থিব সৌন্দর্য ফুটে উঠছে তার মাঝে। ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলে যায়।
কিরিস বেরিয়ে আসে শুধু কোমড়ে টাওয়াল জড়ানো, ভেজা চুল থেকে পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে কাঁধ বেয়ে।
সে এসে বেডের ওপর রাখা শার্ট আর প্যান্ট পরে নেয়।
লিসি নিজের কাজেই ব্যস্ত, আয়নার দিকে তাকিয়ে চুল ঠিক করছে। কিরিস শার্টের বোতাম এখনো লাগায়নি।
হঠাৎ তার চোখ পড়ে লিসির পিঠে ব্লাউজের নিচের খোলা ফিতা… কোমল পিঠের একাংশ উন্মুক্ত…
অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে। ঘরটা যেন হঠাৎ বদলে যায় কিরিসের কাছে। এই ঘর যেখানে এতদিন শুধু তার একার উপস্থিতি ছিল, আজ সেখানে এক নারীর ছোঁয়া…
তার নিজের মানুষ… তার শখের নারী… চারপাশে লিসির উপস্থিতির এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে। কিরিস ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে পদক্ষেপে কোনো শব্দ নেই।
হঠাৎই লিসির পেছনে এসে দাঁড়ায়। নিজের ঠান্ডা আঙুল দিয়ে আলতো করে ফিতাগুলো ধরে বাঁধতে শুরু করে।
ঠান্ডা ছোঁয়ায় লিসি কেঁপে ওঠে। আয়নার দিকে তাকাতেই দেখতে পায় কিরিস তার পেছনে দাঁড়িয়ে।
লিসি একটু নড়ে উঠে বলে
— “আমি… আমি বাঁধতে পারবো…”
কিরিস নরম কিন্তু দৃঢ় গলায়
— “চুপ করে থাকো, সোনা বউজান… তোমাকে একটু ছুঁতে দাও…”
লিসির গাল হালকা লাল হয়ে ওঠে। মৃদু প্রতিবাদের সুরে বলে — “আপনি… শুধু কি আমাকে ছোঁয়ার বাহানাই খোঁজেন?”
কিরিস কোনো উত্তর দেয় না নীরবে ফিতা বাঁধা শেষ করে। তারপর দু’হাত দিয়ে লিসির কাঁধ ধরে ধীরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়।
এক মুহূর্ত…
কিরিস শুধু তাকিয়ে থাকে। কোনো সাজ নেই, কোনো গয়না নেই তবুও এত সুন্দর… এত নির্মল…
হঠাৎ করেই তাকে টেনে নেয় নিজের বুকের কাছে।
কিরিসের শার্টের বোতাম খোলা তার উষ্ণ বুকের সাথে লিসির মুখ ছুঁয়ে যায়। ঠান্ডা-গরম মিশ্র এক অদ্ভুত অনুভূতিতে লিসির শরীর কেঁপে ওঠে। লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে যায় মুহূর্তেই। লিসি একটু সরে যেতে চাইলে
কিরিস তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
শান্ত, ক্লান্ত কণ্ঠে বলে
— “আর নড়ো না… এভাবেই থাকো… আমি ক্লান্ত… একটু এভাবেই থাকতে দাও…”
লিসি আর কিছু বলে না। ধীরে ধীরে নিজের দু’হাত তুলে কিরিসকে জড়িয়ে ধরে। একটা নিঃশব্দ, গভীর মুহূর্ত
যেখানে কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো অস্থিরতা নেই…
শুধু এক স্বামীর নিঃশর্ত ভালোবাসা, আর এক স্ত্রীর নীরব মেনে নেওয়া অনুভব। কিছুক্ষণ পর কিরিস নিজেই আলতো করে তাকে ছেড়ে দেয়। শার্টের বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে দরজার দিকে এগোয়। বেরিয়ে যেতে যেতে পিছন ফিরে না তাকিয়েই বলে
— “গুছিয়ে নিচে আসো, বউজান… তোমাকে দেখার অপেক্ষায় আছি…”
তারপর ধীরে ধীরে নিচে নেমে যায়। ঘরে একা দাঁড়িয়ে থাকে লিসি আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে…
মনে হয় সে সত্যিই বদলে গেছে। যাকে এতদিন দূরে রাখার কথা ছিল, আজ তাকেই সে নিজের অজান্তেই সবচেয়ে কাছে টেনে নিচ্ছে। তার ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে নতুন, নরম, লাজুক… একটা সত্যিকারের “বউ” হওয়ার অনুভূতি… লিসি কিছুক্ষণ আয়নার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার নিজের প্রতিচ্ছবিটা আজ যেন নতুন লাগে চোখে লাজুক এক আলো, ঠোঁটে অজান্তে ফুটে থাকা নরম হাসি।

0 Comments