তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :72

কিন্তু পরক্ষণেই সে মাথা একটু কাত করে—
—“অত সহজে কথা শুনবো নাকি?”
নিজের মতো করেই একটা শাড়ি বের করে সুতি, কিন্তু একদম সাধারণ না… একটু চকচকে, একটু আলাদা।
সেটাই পরে নেয়। কিছুক্ষণ পর লিসি ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। নিচে একেবারে বিয়েবাড়ির আমেজ।
ড্রয়িংরুমে বসে আছেন কয়েকজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোক। মাঝখানে মির্জা বেগম গম্ভীরভাবে গল্প করছেন, পাশে সুপ্রিয়া, প্রিয়া, সাবেনা, মাবেনা—সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত, কিন্তু কথাবার্তার সুরটা পুরো ঘর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। একপাশে কাজিনরা গোল হয়ে বসে নিজেদের দুনিয়ায় মশগুল—হাসি, ঠাট্টা, খুনসুটি।
আর চারপাশে কয়েকজন ডেকোরেটর ঘুরে ঘুরে বাড়িটা সাজাচ্ছে—ফুল লাগাচ্ছে দেয়ালে, গেটের পাশে… যদিও বেশিরভাগই প্লাস্টিকের, তবুও দেখতে খারাপ লাগছে না।
এই পুরো কোলাহলের মাঝেই লিসি ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ায়। তার উপস্থিতিতে যেন এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের শব্দটা একটু থেমে যায়… তারপর আবার সব আগের মতো চলতে থাকে। কিন্তু কয়েকটা চোখ
ঠিকই ঘুরে আসে তার দিকে। লিসি ধীর পায়ে নিচে নামতেই সুপ্রিয়ার দৃষ্টি গিয়ে থামে তার উপর। মুহূর্তের জন্য চোখে এক ধরনের তৃপ্তির ছায়া খেলে যায়, তারপর তিনি পাশে বসা সবাইকে উদ্দেশ্য করে স্পষ্ট স্বরে বলেন—
—“এই যে, আমাদের বড় বউমা… দেখুন তো সবাই।”
কথাটা বলার ভঙ্গিতে গর্ব স্পষ্ট। আশেপাশে বসে থাকা বয়স্ক মহিলারা ও ভদ্রলোকরা একসাথে তাকিয়ে পড়ে লিসির দিকে। কেউ মৃদু হেসে ওঠে, কেউ চোখে মুগ্ধতার রেখা টেনে তাকে নিরীক্ষণ করে। লিসি স্বভাবসুলভ ভদ্রতায় মাথা একটু নত করে, শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
ওদিকে কাজিনরা একপাশে নিজেদের আসরে ব্যস্ত হাসি, গল্প, খুনসুটি তাদের আলাদা এক জগৎ যেন লিসিও তাদের সঙ্গে গিয়ে বসে পরে আর গল্পের রাজ্যে হারিয়ে যায়।
সময় গড়িয়ে যায়। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ডেকোরেশনকারীরা তাদের কাজ শেষ করে একে একে বেরিয়ে যায়। ঘরটা এখন সাজানো দেয়ালের কোণে কোণে ফুল, দরজার ধারে হালকা অলংকরণ, সব মিলিয়ে বিয়েবাড়ির আবহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এদিকে ছেলেরা ধীরে ধীরে সরে গেছে জিমরুমের দিকে।কিরিস যেখানে, সেখানেই যেন তাদের পরবর্তী আড্ডার আসর।
ঘরের ভেতর এখন মূলত মেয়েদেরই আধিপত্য। একপাশে বসে তারা চা খাচ্ছে, হালকা গল্পে মেতে উঠেছে। ঠিক তখনই জারা হঠাৎ জানালার দিকটায় চোখ রেখে ভ্রু কুঁচকে বলে—
—“এইটা দেখেছো? ফুলটা কেমন ঝুলে পড়েছে!”
সবাই একসাথে তাকায়।
জানালার পাশের দেয়ালে লাগানো একটা ফুলের সাজ সত্যিই একটু নিচের দিকে হেলে আছে—মনে হচ্ছে ঠিকমতো বসানো হয়নি, কিংবা আলগা হয়ে গেছে।
সুরভী এগিয়ে গিয়ে একটু দেখে বলে
—“হয়তো ঠিকভাবে লাগাতে পারেনি… তাই খুলে গেছে।”
নুসরাত একটু বিরক্ত গলায় বলে
—“এত টাকা নেয়, আর কাজের এই অবস্থা!”
কয়েকজন একসাথে আলোচনা শুরু করে কে গিয়ে ঠিক করবে, কিভাবে করবে… কিন্তু কেউই এগিয়ে আসছে না।
লিসি এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল। এবার ধীর কণ্ঠে বলে —“আচ্ছা, আমি ঠিক করে দিচ্ছি… তবে আগে একটা চেয়ার বা একটু উঁচু কিছু নিয়ে আসো, যাতে হাতে পৌঁছায়।”
তার গলায় কোনো অহংকার নেই, আবার দ্বিধাও নেই শান্ত, স্থির। মেয়েরা এবার জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কেউ চারপাশে তাকাচ্ছে চেয়ার খুঁজে, কেউ আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে কিভাবে ঠিক করা যায় বিষয়টা।
ঘরের ভেতর তখন এক অদ্ভুত ব্যস্ততা— কেউ চা হাতে, কেউ কথায়, কেউ কাজের চিন্তায়… আর সেই মাঝখানে একটা ছোট্ট ঝুলে পড়া ফুল যেন সবার মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। ঘরের ভেতর মেয়েদের হালকা কোলাহল চলছেই কে চেয়ার আনবে, কে ধরবে, কে উঠবে—এই নিয়ে ছোটখাটো আলোচনা। ঠিক তখনই জিমরুমের দিক থেকে একসাথে কয়েকজন ছেলের পায়ের শব্দ ভেসে আসে। মুহূর্তের মধ্যেই তারা ভেতরে ঢুকে পড়ে।
সবার সামনে কিরিস। জিম শেষ করে এসেছে—গায়ে কোনো কাপড় নেই পরণে শুধু টাওয়াজ কাঁধে শুধু একটা তোয়ালে আলগোছে ঝুলছে। শরীরটা যেন নিখুঁত ভাস্কর্যের মতো গড়া—প্রতিটি পেশী স্পষ্ট, টানটান। বুকের পেশীগুলো প্রশস্ত, দৃঢ়; বাহুগুলো শক্ত, শিরাগুলো হালকা ফুলে আছে, যেন ভেতরের শক্তির আভাস দিচ্ছে। পেটের ওপর স্পষ্ট ছয় ভাগের রেখা—অভ্যাস আর নিয়ন্ত্রণের নিঃশব্দ প্রমাণ। ঘামের হালকা আভা তার ত্বককে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। তার উপস্থিতি ঘরের ভেতরের স্বাভাবিক গতি এক মুহূর্তে থামিয়ে দেয়।
ইশান ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করে—
—“কী হয়েছে এখানে? সবাই জানালার পাশে ভিড় করে আছো কেন?”
আরোবি একটু হাসি চেপে উত্তর দেয়—
—“ওই ফুলটা খুলে গেছে, ঠিক করার প্ল্যান হচ্ছে।”
কিরিস একবার চোখ তুলে তাকায়—ঝুলে থাকা ফুল, আর তার নিচে দাঁড়িয়ে লিসি এক সেকেন্ডও নষ্ট করে না।
কারো কিছু বোঝার আগেই সে সামনে এগিয়ে আসে।
তারপর একদম সহজ ভঙ্গিতে, যেন এটাই স্বাভাবিক লিসির কোমরের কাছে হাত রেখে তাকে তুলে নেয়।
এতটাই হালকাভাবে তোলে, যেন তার কোনো ওজনই নেই। চারপাশে হালকা একটা স্তব্ধতা নেমে আসে।
লিসি হকচকিয়ে যায়, চোখ বড় হয়ে ওঠে—
—“আরে… কী করছেন ! নামান.... আরে পড়ে যাবে.. —”
তার কণ্ঠে দ্বিধা, লজ্জা, অপ্রস্তুতি সব একসাথে মিশে আছে। কিরিসের মুখে কোনো ভাবান্তর নেই শান্ত, স্থির গলায় শুধু বলে —“ঠিক করো।”
একটা শব্দ, অথচ ভেতরে অদ্ভুত কর্তৃত্ব। লিসি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার দিকে, তারপর নিজেকে সামলে নেয়। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ফুলটার দিকে যায়, সেটাকে ঠিক জায়গায় বসাতে শুরু করে। ওদিকে চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে গেছে। সুরভী হালকা গলায় হিয়ার কানে কানে বলে —“ওজনই নেই দেখছি, একদম পুতুল!”
আরোবি চাপা হেসে ফেলে—
—“না হলে কি! কিরিস ভাইয়ের শক্তি তো দেখছিসই।”
ছেলেদের দিক থেকেও ঠাট্টা আসে—
কাবির —“ভাই, জিমের রেজাল্ট তো হাতেনাতে দেখা যাচ্ছে!”
রিহান —“ডাম্বেল লাগবে না, সরাসরি বউমাকেই তুলছো!”
ঘরের ভেতর হাসির রোল ওঠে। কিন্তু সেই হাসির মাঝেও কিরিস একদম স্থির তার দৃষ্টি শুধু লিসির ওপর।
আর লিসি উঁচুতে ভেসে থাকা অবস্থায়, লজ্জা আর অদ্ভুত এক অনুভূতির ভেতর দিয়ে, ধীরে ধীরে ফুলটা ঠিক করে দেয়… যেন মুহূর্তটা অস্বাভাবিক হলেও, কোথাও গিয়ে খুব স্বাভাবিক। লিসি সতর্কভাবে হাত বাড়িয়ে ফুলটা ঠিক করার চেষ্টা করছে। উঁচুতে থাকার কারণে তার শরীরটা সামান্য টানটান হয়ে আছে। হাত তুলতেই শাড়ির আঁচল আর ভাঁজ একটু সরে গিয়ে তার কোমর আর পেটের একাংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে অপ্রস্তুত, স্বাভাবিক, অথচ চোখে পড়ার মতো কোমল এক দৃশ্য।
কিরিস তাকে ধরে রেখেছে অবলীলায় দৃঢ় কিন্তু নিয়ন্ত্রিত গ্রিপে। লিসি একটু নড়তেই কিরিস তাকে সামান্য উপরে ঠেলে ধরে সে নড়াচড়ায় হালকা একটা দুলুনি তৈরি হয়।
এই অপ্রত্যাশিত কাছাকাছির মুহূর্তে কিরিসের মুখের ঠোঁট অনিচ্ছাকৃতভাবেই ছুঁয়ে যায় লিসির কোমরের কাছে। লিসি মুহূর্তেই শিউরে ওঠে। তার পুরো শরীর কেঁপে ওঠে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে চোখ বড় হয়ে যায়, ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে।
—“ ভাইয়া…!”
কণ্ঠটা খুব নিচু, কিন্তু তাতে স্পষ্ট লজ্জা আর অস্বস্তির মিশ্রণ কিরিস এক সেকেন্ড থামে।।তার চোখে হালকা এক অচেনা দৃষ্টি গভীর, স্থির, যেন কিছু অনুভব করছে, কিন্তু প্রকাশ করছে না। পরক্ষণেই কিরিস ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজের মুখটা লিসির উন্মুক্ত পেটের অংশে ডুবিয়ে দেয় সঙ্গে তার হাতের চাপ একটু দৃঢ় হয়ে ওঠে, লিসিকে আরও স্থিরভাবে ধরে রাখে, যেন সে পড়ে না যায়। কিরিসের এমন বেসামাল ছোঁয়ায় লিসি হৃদয়ে এমন ঝড় উঠে যায় এলোমেলো করে দিচ্ছে কিরিসের এমন ছোয়া। কিন্তু এখানে লিসি না পারছে চিৎকার করতে না পারছে কিরিসকে বারণ করতে কারণ সবাই দাঁড়িয়ে আছ। এরজন্য লিসি দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়, কাঁপা হাতে ফুলটা ঠিক করে বসিয়ে দেয়। ওদিকে আশপাশের পরিবেশটা বদলে গেছে। মেয়েরা আর ছেলেরা যারা কিছুক্ষণ আগেও ঠাট্টা করছিল এখন অদ্ভুতভাবে একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ সরাসরি কিছু বলছে না, কিন্তু তাদের চোখে মিশে আছে মুচকি হাসি, কৌতূহল, আর নিঃশব্দ খুনসুটি। কিছু মুহূর্ত যেন ভারী হয়ে থাকে।
লিসি ফুলটা ঠিক করে শেষ করেই নিচু গলায় বলে ওঠে —“হয়ে গেছে… এখন নামান আমাকে।”
কিন্তু কিরিস যেন শুনেও শুনল না। লিসিকে উঁচু থেকে নিচে তো নামাই কিন্তু একেবারে না। লিসিকে তার শক্ত বাহু দিয়ে আঁটকে রেখেছে। লিসি কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। লিসি নড়েচড়ে উঠছে কিন্তু কিরিস এখনও লিসিকে আগের মতোই নিজের বাহুতে ধরে রেখেছে একদম আঁষ্টেপৃষ্ঠে, যেন সত্যিই কোনো পুতুলকে ধরে আছে। লিসির পা মেঝেতে ছোঁয়াই পাচ্ছে না, সে হালকা ছটফট করে ওঠে—
—“ ভাইয়া! নামান বলছি…”
কিরিস এবার নিচের দিকে তাকায়, ঠোঁটের কোণে অল্প একরকম দুষ্টু রেখা —“এত তাড়া কেন?”
লিসি চোখ বড় করে তাকায় —“সবাই দেখছে!”
—“দেখুক।”
শান্ত, নির্লিপ্ত উত্তর। চারপাশে তখন সত্যিই সবাই তাকিয়ে কেউ চাপা হাসছে, কেউ চোখে চোখে ইশারা করছে। লিসি অস্বস্তিতে গাল লাল করে ফেলে—
—“নামাও… না হলে কিন্তু—”
—“কিন্তু কী?”
কিরিস একটু ঝুঁকে আসে, কণ্ঠে নিচু স্বর। লিসি থেমে যায়। কথাগুলো গুছিয়ে উঠতে পারে না। এক মুহূর্ত নীরব থেকে কিরিস হঠাৎ বলে
—“কটন শাড়ি পরোনি কেন?”
প্রশ্নটা হঠাৎ, কিন্তু স্পষ্ট। লিসি ভ্রু কুঁচকে তাকায়—
—“ভালো লাগেনি, তাই পরিনি।”
—“এখনই পরে আসো।”
—“পরবো না।”
লিসির গলায় জেদ স্পষ্ট। কিরিসের চোখে এক ঝলক কঠোরতা খেলে যায়—
—“বলেছি, পরবে।”
লিসি এবার মুখ ঘুরিয়ে নেয়—
—“আমি যা ভালো লাগে তাই পরবো।”
এই ছোট্ট কথার লড়াইয়ের মাঝেই কিরিসের শরীরের উষ্ণতা, তার খুব কাছে থাকার অনুভূতি, আর তার স্বাভাবিক পুরুষালি উপস্থিতি সব মিলিয়ে লিসির ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠছে। সে বারবার নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কিরিসের এতটা কাছাকাছি থাকা তাকে আরও অস্থির করে তুলছে। জিম করায় গায়ের ঘামের নিজস্ব একটা ঘ্রাণ বের হচ্ছে কিরিসের শরীর থেকে যেটা সম্পূর্ণ কিরিসের নিজস্ব দেহের সুবাস। লিসি কিরিসের গায়ে হাতও দিতে পারছেনা কারণ কিরিস খালি গায়ে আছে। লিসি নিজেকে সামলাচ্ছে। আর এইদিকে কিরিস আর কোনো কথা না বলে হঠাৎ করে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নেয়। তারপর একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেন এটাই তার স্বভাব লিসিকে বাহুতে জড়িয়ে নিয়েই সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটা শুরু করে। কিরিস এবার তাকে কোলে নেয়নি শুধু সামনে থেকে একহাত পিঠের চারপাশে আরেক হাত কোমড়ের নিচের দিকে চারপাশে ধরে রেখেছে। কিরিসের এমন কাজে লিসি ছটফট করছে নামার জন্য কিন্তু কিরিসের মতো শক্তিশালী পুরুষের কাজে লিসির শক্তি তুচ্ছ মনে হচ্ছে সে চেয়েও কিরিসের হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। লিসি আর না পেরে বলে
—“ ভাইয়! কী করছেন নামান......... !”
লিসি ফিসফিস করে বলে ওঠে, প্রায় অনুনয়ের সুরে।
কিন্তু কিরিস থামে না। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। লিসির অবস্থা তখন একেবারে লজ্জায় মরি মরি সে নিচের দিকে তাকাতেও পারছে না, আবার কারো চোখের দিকেও না। ওদিকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই মুচকি হাসছে। কেউ ফিসফিস করে বলে—
—“আহা… কী সুন্দর জুটি!”
আরেকজন হেসে ওঠে—
—“একদম পুতুলের মতো দেখাচ্ছে মেয়েটাকে…”
এই হাসি-ঠাট্টার মাঝেই কিরিস নির্লিপ্ত, স্থির পায়ে উপরে উঠে যায় আর তার বাহুতে ধরা লিসি, লজ্জা, অস্বস্তি আর এক অদ্ভুত অচেনা অনুভূতির ভেতর ডুবে যায়… যেন মুহূর্তটা তাকে পুরোপুরি নিজের ভেতরে টেনে নিচ্ছে।
সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই করিডোরটা তুলনামূলক নির্জন নিচের কোলাহল এখানে এসে মৃদু হয়ে গেছে।
কিরিস থামে না। সোজা নিজের রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়, একহাতে দরজা ঠেলে খুলে ভেতরে ঢোকে
আর তারপর ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। ঘরের ভেতর হালকা নিস্তব্ধতা। লিসি তখনও তার কোলে মুখ লাল, শ্বাস কিছুটা অগোছালো, চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি আর অভিমান মেশানো একরাশ লজ্জা।
—“এখন নামাবে?”
সে নিচু স্বরে বলে, এবার আর আগের মতো জোর নেই কণ্ঠে। কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে তাকে নামিয়ে দেয় মেঝেতে। লিসি মাটিতে পা দিতেই দ্রুত একপাশে সরে যায়, আঁচলটা ঠিক করে নেয়, যেন নিজেকে গুছিয়ে নিতে চাইছে। কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলে না বাতাসে অদ্ভুত একটা টানটান নীরবতা। তারপর কিরিস ধীরে বলে ওঠে—“আমি যা বলি, সেটা অকারণে বলি না।”
লিসি তাকায় না তার দিকে। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, পর্দার কোণা আঙুলে পেঁচাতে থাকে।
—“সব কথাই শুনতে হবে— এমন তো না…”
তার কণ্ঠে নরম জেদ। কিরিস এক পা এগিয়ে আসে।
—“তুমি বুঝো না।”
—“কি বুঝবো?”
লিসি এবার ঘুরে তাকায়, চোখে হালকা প্রশ্ন, হালকা অভিমান। কিরিস কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তার চোখে সেই চেনা কঠিনতা নেই বরং গভীর, চাপা কিছু একটা।
—“সবাইয়ের সামনে…”
সে থেমে যায়, তারপর ধীরে বলে—
—“আমি চাই না কেউ তোমাকে ওইভাবে দেখুক। শাড়ির কুচি খুলে যাওয়ার মতো আর আমি তোমাকে ওই অবস্থায় ওখানে দাঁড় করিয়ে দিবো! ”
লিসি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি —“তাই বলে শাড়ি পর্যন্ত ঠিক করে দিবে?”
কিরিস এবার একটু কাছে আসে কণ্ঠটা নিচু, কিন্তু স্থির
—“যদি দরকার হয়, তাও করবো।”
এই সরল অথচ দৃঢ় উত্তরে লিসি থেমে যায়।
তার চোখে এক ঝলক অন্যরকম অনুভূতি খেলে যায়
কথা খুঁজে পায় না।ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নামে।
দূরে কোথাও নিচের হাসির শব্দ ভেসে আসছে…
আর এই ঘরে দু’জন মানুষের মাঝখানে জমে উঠছে এক অদ্ভুত, নীরব টান যেখানে জেদ আছে, অধিকার আছে…
আর অপ্রকাশিত কিছু অনুভূতির ভার।
ঘরের ভেতরের নীরবতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। লিসি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, নিজের আঁচলটা ঠিক করতে ব্যস্ত—কিন্তু চোখে-মুখে এখনো সেই অস্বস্তি, লজ্জা আর হালকা জেদের ছাপ স্পষ্ট। পেছন থেকে কিরিসের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে—
—“ওই শাড়িটা খুলে ফেলো। কটন শাড়ি পরবে।”
লিসি থেমে যায়। আয়নার ভেতর দিয়েই কিরিসের দিকে তাকায়। —“আমি বলেছি না, এটা-ই ভালো লাগছে।”
কিরিস ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
—“আমি যা বলি, সেটা কারণ ছাড়াই বলি না।”
—“সবকিছুতেই কারণ জানতে হবে নাকি?”
লিসির গলায় এবার স্পষ্ট বিরক্তি।
কিরিস একদম কাছে এসে দাঁড়ায়।
—“তোমাকে নিয়ে—হ্যাঁ।”
এই সোজাসাপ্টা উত্তরটা লিসিকে এক মুহূর্তের জন্য চুপ করিয়ে দেয়। কিন্তু সে হার মানার মানুষ না—
—“আমি শাড়ি বদলাবো না।”
কিরিস কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুব শান্ত গলায় বলে—
—“না বদলালে… আমাকে নিজেই করতে হবে।”
কথাটা হালকা হলেও ভেতরে চাপা কঠোরতা স্পষ্ট।
লিসি চোখ বড় করে তাকায়—
—“আপনি..... —!”
সে দ্রুত আঁচলটা আরো জড়িয়ে নেয় নিজের গায়ে, যেন আগেই নিজেকে সামলে রাখতে চায়।
—“এইসব করবেন না … ।”
কিরিস থামে না। তার দৃষ্টি স্থির, নিয়ন্ত্রিত। কিরিস হাত বারিয়ে কেবল লিসির আঁচল ধরতে যাবে তখন এই অবস্থায় লিসি একটু থেমে, নিজের স্বর নরম করে ফেলে—“আচ্ছা… ঠিক আছে। আমি বদলে ফেলবো।”
কিরিস ভ্রু তোলে—
—“নিশ্চিত?”
লিসি হালকা বিরক্ত হয়ে বলে—
—“হ্যাঁ, বললাম তো! কিন্তু একটা শর্ত আছে—”
—“কি?”
কিরিস আগ্রহহীন স্বরে জিজ্ঞেস করে।
—“ আপনি আর কোনো ঝামেলা করবেন না।”
কিরিস কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর খুব সংক্ষিপ্তভাবে বলে —“ঠিক আছে।”
এরপর আর কিছু না বলে সে ঘুরে ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ভেতর থেকে পানির শব্দ শোনা যায়। এদিকে লিসি গভীর শ্বাস নেয় যেন এতক্ষণ নিজের ভেতরে জমে থাকা টানটা একটু ছাড়ে। তারপর আলমারির দিকে যায়। আবার সেই সারি সারি শাড়ি… সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর অবশেষে একটা হালকা, সাদামাটা কটন শাড়ি বের করে।
ধীরে ধীরে সেটা পরে নেয় কোনো বাড়তি সাজ নেই
কিন্তু তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য যেন আরও কোমল হয়ে ফুটে ওঠে। সব ঠিক করে নিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিজেকে কিছুক্ষণ দেখে চোখে অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি। জেদ আছে, লজ্জা আছে… কিন্তু কোথাও যেন কিরিসের কথার প্রভাবও অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের ভেতরের পানির শব্দ থেমে যায়…
ওয়াশরুমের দরজা ধীরে খুলে যায়। কিরিস বেরিয়ে আসে—সম্পূর্ণ তৈরি, ভেজা চুলগুলো পেছনে আঁচড়ানো, শরীর থেকে এখনো হালকা সাবানের গন্ধ ভেসে আসছে। কালো শার্ট, হাতা একটু গোটানো—স্বাভাবিক, কিন্তু তার উপস্থিতি সবসময়কার মতোই তীক্ষ্ণ। বের হয়েই তার দৃষ্টি গিয়ে থামে লিসির উপর। লিসি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো খোপা করছে। কটন শাড়িটা তাকে অন্যরকম কোমলতা দিয়েছে। খুব সাদামাটা, তবু অদ্ভুতভাবে মানিয়ে গেছে তার সাথে। কানে ছোট দুল, গলায় মোটা সোনার চেইন একদম পরিপাটি, শান্ত এক সৌন্দর্য।
কিরিস কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে। তার দৃষ্টিটা এবার আগের মতো কঠিন না বরং গভীর, স্থির… যেন দেখেই যাচ্ছে।লিসি আয়নায় তার চোখের দৃষ্টি টের পেয়ে একটু থামে।
—“কি হয়েছে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন ?”
হালকা বিরক্তি, কিন্তু ভেতরে লজ্জা লুকোনো। কিরিস ধীরে এগিয়ে আসে
—“এবার ঠিক আছে।”
—“মানে?”
লিসি ঘুরে দাঁড়ায়।
—“এইটাই পরা উচিত ছিল।”
তার স্বর শান্ত, কিন্তু ভেতরে চাপা সন্তুষ্টি। লিসি ঠোঁট বাঁকায়—
—“সবসময় আপনার কথা শুনতে হবে নাকি?”
—“না… কিন্তু এই ব্যাপারে শুনবে।”
কিরিসের উত্তর একদম সরাসরি।
—“জেদি!”
লিসি মুখ ফিরিয়ে নেয়।
—“আপনিও কম না।”
কিরিস ঠান্ডা স্বরে বলে। একটু নীরবতা নামে। তারপর হঠাৎ কিরিস নিচু স্বরে বলে
—“একটা জিনিস চাই।”
লিসি ভ্রু কুঁচকে তাকায় —“কি?”
কিরিস আরেকটু কাছে আসে, স্বর আরও নরম
—“আগের মতো… আরেকবার।”
লিসি বুঝতে পেরে এক ঝটকায় পিছিয়ে যায়—
—“ এই না ভাইয়া ! না—”
তার গাল লাল হয়ে ওঠে মুহূর্তেই। কিন্তু কিরিস নরম সুরে বলে —“প্লিজ।”
অদ্ভুতভাবে শান্ত, কিন্তু অনুরোধ মেশানো।
—“না, হবে না।”
লিসি মুখ ঘুরিয়ে নেয়, স্পষ্ট লজ্জা। কিরিস কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে বলে—
—“একবারই।”
লিসি চুপ। তার শ্বাস একটু ভারী হয়ে আসে। হাত দিয়ে আঁচলটা আরও জড়িয়ে ধরে।
—“কেউ দেখবে…”
খুব নিচু স্বর।
—“কেউ দেখবে না। আমার ঘরে কে আসবে। আর আমার বউ আমি যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে আদর করবো। ”
কিরিস আশ্বাসের মতো বলে। কয়েক সেকেন্ড কেটে যায়।
শেষমেশ লিসি চোখ নামিয়ে ফেলে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে। কিরিসের মুখে এমন মিষ্টি অনুরোধ মারাত্মক। যে পুরুষ রাগ ছাড়া কিছু বুঝে না এখন সে এমন আবদার করছে, লিসি কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে কিরিস আবদার মেশানো চোখে লিসির দিকে তাকিয়ে আছে। লিসি নিজের লজ্জাটা চেপে আস্তে বলে উঠে
—“…শুধু একবার।”
লিসি কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর ধীরে শাড়ির আঁচলটা নিজের পেটের উপর থেকে সরিয়ে নেয় চোখ নামানো, নিঃশ্বাস একটু ভারী। তার ভঙ্গিতে লজ্জা আছে, কিন্তু কোথাও একরকম নীরব সম্মতিও লুকিয়ে। কিরিস এক পা এগিয়ে আসে হাঁটু ভাজ করে নিচে বসে লিসির উন্মুক্ত পেটের কাছে মুখ নিয়ে আসে। লিসি চোখ বন্ধ করে ফেলে। মুহূর্তটা খুব কাছে এসে থামে তার উপস্থিতি, তার উষ্ণতা সবকিছু মিলিয়ে লিসির শরীর হালকা কেঁপে ওঠে। কিরিসের সদ্য গোসল করা ভিজে চুলগুলোর পানির ছোঁয়া যখন লিসির ত্বকে লাগে লিসি নিজের ভিতরের বেসামাল অবস্থা টা সামলানোর চেষ্টা করতে থাকে কিন্তু এমন উন্মাতাল পুরুষের ভালোবাসা সামলানো লিসির মতো কিশোরী বড্ড বেসামাল খাচ্ছে।
লিসি অজান্তেই কিরিসের চুলের কাছে হাত তুলে ধরে আঁকড়ে ধরে যেন নিজেকে সামলে রাখছে। কিছু সময় যেন থেমে থাকে। কিরিস নিজের তৃষ্ণা মিটিয়ে লিসির কোমড় আঁকড়ে জড়িয়ে মাথা লিসির পেটের সঙ্গে লাগিয়ে কিছুক্ষণ থাকে।
তারপর লিসির দিকে তাকায় তার ছোঁয়ায় এলোমেলো হয়ে যাওয়া লিসিকে দেখে মনের অজান্তেই মুচকি হাসি ফুটে উঠে তার ঠোঁটে। লিসি এখনও চোখ বন্ধ করে আছে। কিরিস নিজে থেকেই সরে আসার আগে একবার লিসির উন্মুক্ত পেটের অংশে দিকে তাকায় নাভির পাশের তিলটা মারাত্মক, যেটা কিরিসকে বেশন ভাবে মুগ্ধ করেছে। কিরিস এবার উঠে দাঁড়ায় অনুভব হালকা হতেই
লিসি তাড়াতাড়ি আঁচলটা আবার গুছিয়ে নেয়, মুখটা লাল হয়ে গেছে। সে এক পা পিছিয়ে যায়—
—“আমি… আমি নিচে যাচ্ছি…”
কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতেই কিরিস তার হাতটা ধরে ফেলে।
—“একটু দাঁড়াও।”
লিসি থেমে যায়, তাকায় তার দিকে চোখে প্রশ্ন, লজ্জা, অস্থিরতা সব মিলেমিশে। কিরিস এবার কিছু না বলে আলমারির দিকে এগিয়ে যায়। একটা ছোট বাক্স বের করে। ধীরে ফিরে এসে সেটা লিসির সামনে খুলে ধরে।
ভেতরে একটা সূক্ষ্ম নাকফুল, আর একজোড়া সোনার চুড়ি। খুব ভারী না, কিন্তু নকশায় নিখুঁত নরম আলোয় ঝলমল করছে। লিসি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে
—“এগুলো…?”
কিরিস শান্ত গলায় বলে —“তোমার জন্য।”
লিসি কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তার চোখে মৃদু বিস্ময়, আর কোথাও একটা অদ্ভুত স্পর্শ পাওয়া অনুভূতি।
—“ আমার তো অনেক গহনা আছে, সবাই মিলে আর আপনি যা দিয়েছেন তাই আমি কবে পরে শেষ করবো তাই জানি না। আর এখন এইগুলো...... আমি কখম পরবো। ”
কিরিসের উত্তর সংক্ষিপ্ত, কিন্তু দৃঢ়—
—“ সবসময়। আমার বউ তুমি দেখে যেন মানুষ বুঝতে পারে তুমি জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরীর নারী। ”
লিসি হালকা হাসে—লজ্জা মেশানো। লিসি বাক্স টা হাতে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে বাক্সটা বন্ধ করে রাখে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাতে নাকফুলটা তুলে নেয় পরতে যাবে, কিন্তু থেমে যায়।
—“এটা… ঠিকভাবে পরতে পারবো তো?”
তার গলায় হালকা দ্বিধা। তারপরেও পরার চেষ্টা করে, অনেকদিন নাকে কিছু দেওয়া না যার জন্য এখন এই নাকফুল পরতে গিয়ে লিসির একটু হলেও ব্যথা পাচ্ছে। কিন্তু তারপরেও পরতে পারছে না লিসির এমন অবস্থা দেখে কিরিস পেছন থেকে এগিয়ে আসে
—“দাও।”
লিসি চুপচাপ নাকফুলটা তার হাতে দেয়। কিরিস খুব সাবধানে, মনোযোগ দিয়ে নাকফুলটা পরিয়ে দেয় তাকে। তার আঙুলের ছোঁয়ায় লিসি হালকা কেঁপে ওঠে, কিন্তু চুপ করে থাকে। কিরিস সাবধানের সাথে পরাতে থাকে —
“ ব্যথা লাগছে না তো? ”
লিসি হালকা সুরে বলে —“ না। ”
অবশেষে নাকফুলটা পরা শেষ হতেই লিসি আয়নায় নিজেকে দেখে থেমে যায়। একটু অন্যরকম লাগছে নিজেকে আরও পরিপূর্ণ, আরও গৃহিণীসুলভ।
কিরিস ধীরে বলে —“চুড়ি দুইটাও পরো …”
কিরিস তার দিকে তাকায়। লিসি মৃদু স্বরে, চোখ নামিয়ে—“যখন নাকফুল পরিয়ে দিলেন… চুড়িদুইটাও পরিয়ে দিন।”
কিরিসের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। সে বাক্স থেকে চুড়িগুলো তুলে নেয়। একটা একটা করে, ধীরে—
লিসির হাতে পরিয়ে দেয়। চুড়ির মৃদু টুংটাং শব্দে ঘরটা যেন আরও নরম হয়ে ওঠে। সবশেষে লিসি আবার আয়নার সামনে দাঁড়ায়। কটন শাড়ি, খোপা করা চুল, ছোট দুল, নাকে নাকফুল, হাতে সোনার চুড়ি একদম পূর্ণতা পাওয়া এক “বউ”। কিরিস কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তার দৃষ্টিতে এবার কোনো কড়া ভাব নেই শুধু গভীর, নিঃশব্দ মুগ্ধতা। সে ধীরে এগিয়ে এসে লিসির কোমড় জরিয়ে নিজের কাছে টেনে আনে মাথাটা হালকা নিচে করে লিসির কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
—“আমার বউজান ।”
নরম, কিন্তু দৃঢ় স্বর। লিসির মুখে সাথে সাথে লাজুক হাসি ফুটে ওঠে। চোখে ঝিলিক খুশি, তৃপ্তি, আর একরাশ মিষ্টি লজ্জা। সে আর কিছু না বলে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় —“আমি নিচে যাচ্ছি…”
তার কণ্ঠে আনন্দ লুকানো যাচ্ছে না। দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়, তারপর একবার পেছনে তাকায়—
চোখে সেই মিষ্টি ঝিলিক রেখে। তারপর নিচে নেমে যায়।
আর কিরিস ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকে একা। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি যেন এই মুহূর্তটাই যথেষ্ট।
নিচে নামতেই লিসিকে ঘিরে যেন আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় ঘরটা। সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়াতেই সবার চোখ ঘুরে আসে তার দিকে। কটন শাড়িতে, খোপা করা চুলে, নাকে ছোট্ট নাকফুল আর হাতে সোনার চুড়ির মৃদু শব্দ তার সঙ্গে আবার কিরিসের দেওয়া নুপুরের শব্দ একদম অন্যরকম লাগছে তাকে। সুপ্রিয়া প্রথমেই খেয়াল করেন। চোখে মৃদু বিস্ময়, তারপর ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি—
—“এই তো… এখন ঠিক বউয়ের মতো লাগছে।”
মির্জা বেগম মাথা নেড়ে বলেন—
—“মাশাল্লাহ… কী সুন্দর!”
পাশের কয়েকজন বয়স্ক মহিলা এগিয়ে আসে কেউ তার গাল ছুঁয়ে দেখে, কেউ মাথায় হাত রাখে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে।
—“বাবা, তোমার নাম কী?”
—“কোথাকার মেয়ে?”
—“কতদিন হলো বিয়ে হয়েছে?”
প্রশ্নের পর প্রশ্ন লিসি প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, তারপর ধীরে ধীরে হাসিমুখে উত্তর দিতে শুরু করে।
তার গলার স্বর নরম, ভদ্র যে শুনছে, সেই মুগ্ধ হচ্ছে।
ওদিকে কাজিনরা একপাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে সুরভী মুচকি হেসে বলে—
—“দেখেছিস? একদম চেঞ্জ হয়ে গেছে!”
জারা মাথা নেড়ে—
—“হুম… কিরিস ভাইয়ের টাচ আছে পুরো ব্যাপারে!”
আরোবি হালকা হেসে যোগ করে—
—“ভাইয়া না থাকলেও প্রভাব ঠিকই আছে।”
সবাই চাপা হেসে ওঠে। লিসি এইসব শুনে লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসিটা লুকাতে পারে না। চা আবার পরিবেশন হচ্ছে। কেউ কাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে, কেউ মিষ্টি এগিয়ে দিচ্ছে। এই ভিড়ের মাঝেও লিসির হাতের চুড়িগুলো টুংটাং শব্দ করে ওঠে, আর সে অজান্তেই একবার নিজের নাকফুলটা ছুঁয়ে দেখে। মুহূর্তটা যেন তার নিজের কাছেই নতুন। উপরে কিরিস জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিচের দৃশ্যটা দেখছে।
তার চোখ সরাসরি লিসির উপর। নিচে হাসি, গল্প, ভিড়
আর সেই ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তার “বউ”।
কিরিসের ঠোঁটের কোণে আবার সেই অল্প হাসি ফুটে ওঠে।