তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :71

সে এক মুহূর্ত থেমে চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে পুনরায় বললো— “আপনারা অবগত আছেন—আমাদের প্রিয় কাবিরের বিবাহের আয়োজন অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়েছে। সেই কারণে নৃত্যের প্রস্তুতি বা অনুশীলনের পর্যাপ্ত সুযোগ আমাদের মেলেনি। তবে… আগামীকাল—হবে প্রকৃত উৎসব! ধুমধাড়াক্কা নৃত্য, প্রাণবন্ত সঙ্গীত, এবং সীমাহীন উল্লাসে ভরপুর এক সন্ধ্যা!”
চারপাশে সঙ্গে সঙ্গে সম্মতির গুঞ্জন উঠিল—
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ!”
“কালকেই হবে আসল মজা!”
এবং ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিকতার আবরণ খুলিয়া পরিবেশটি রূপ নিল এক স্বতঃস্ফূর্ত, স্নিগ্ধ মিলনমেলায়।
বৃহৎ গার্ডেনের এক প্রান্তে মেয়েরা নিজেদের মধ্যে বৃত্তাকারে বসিয়া গল্পে মগ্ন—হাসি, খুনসুটি, আর ফিসফিসানো গোপন আলাপচারিতায় তাদের জগৎ যেন আলাদা এক রঙ ধারণ করেছে। অপর প্রান্তে ছেলেদের আসর—সেখানে কোলাহল কিছুটা উচ্চ, রসিকতা কিছুটা প্রখর। কাবির, রিহান, ইশান—সকলেই প্রাণখুলে হাসতেছে। এই বৃত্তের মধ্যমণি হয়ে বসে আছে কিরিস।
সে কখনো অল্পস্বরে কিছু বলিতেছে, কখনো হালকা রসিকতা ছুঁড়িয়া দিতেছে—যাতে সবাই হো হো করে হেসে উঠতেছে। আবার হঠাৎ করে তার মুখমণ্ডল কঠোর হয়ে উঠতেছে, দৃষ্টি গম্ভীর—যেন কোনো গভীর চিন্তায় নিমগ্ন।
এই বৈপরীত্যই যেন তাহার প্রকৃত সত্তা। একটি মুহূর্তে, সকল কোলাহলের মাঝেও সে নিজেকে সামান্য বিচ্ছিন্ন করিয়া লইল। দৃষ্টি সরাইল দূরে, আর মনে মনে ধীরে উচ্চারণ করিল—
“I am a very serious person… but I find peace in this family… and in these brothers…”
তার চোখে তখন এক ক্ষীণ কোমলতা—যাহা সে সাধারণত প্রকাশ করে না। অন্যদিকে, গার্ডেনের আরেক প্রান্তে চায়ের সুবাস ভাসিয়া বেড়াইতেছে। কয়েকজন প্রবীণ আত্মীয় শান্তভাবে চুমুক দিতে দিতে অতীতের স্মৃতিচারণায় মগ্ন। ছোটরা নিজেদের মতো খেলায় ব্যস্ত—হাসি আর চিৎকারে তাদের ছোট্ট জগৎ সরব। বড়রা একদিকে, ছোটরা অন্যদিকে, আর মাঝখানে এক সুরেলা মেলবন্ধন যেন এক সম্পূর্ণ, পরিপূর্ণ পরিবারের প্রতিচ্ছবি। চারপাশে আলো, হাসি, আলাপ, আর হৃদয়ের উষ্ণতায় গঠিত এক অপূর্ব পরিবেশ যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত নিঃশব্দে রচনা করিতেছে এক স্মরণীয় অধ্যায়…।
কয়েক ঘন্টা পরে মার্ক গার্ডেনে ঢোকে সঙ্গে অফিসের কিছু লোকও আছে। কিরিস আজকে অফিসে যায়নি আর তাছাড়া এখন রাতে ইমার্জেন্সি ছাড়া আসার কথা না। আনোয়ার আর আনারুল ওদের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। কিছু বলতে চেয়েও বললেন না কারণ কিরিস আছে।তাই তারা আবার নিজেদের মতো কথায় ব্যস্ত হয়ে পরলেন। কিরিস তখন ছেলেদের সাথে বসে আছে ওরা কথা বলছে আর কিরিস শুনছে। মার্ক দ্রুত হেঁটে এসে কিরিসের কানে কিছু বলল খুব নিচু স্বরে, কিন্তু কথাটা শেষ হতেই কিরিসের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
শান্ত… থেকে একদম ঠান্ডা, তীক্ষ্ণ।
—“কোথায়?”
তার গলা নিচু, কিন্তু ভেতরে চাপা আগুন। মার্ক ইশারা করল একটু দূরের দিকে একটা আলাদা কর্নার, যেখানে দুইজন লোক দাঁড়িয়ে ফাইল আর ফোন নিয়ে অপেক্ষা করছে। কিরিস ধীরে ধীরে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল।
—“বলো। ”
লোকটা একটু ইতস্তত করে ফাইলটা বাড়িয়ে দিল,
—“স্যার… এই ডিলটা নিয়ে একটু সমস্যা হয়েছে—”
—“সমস্যা?”
কিরিস শব্দটা যেন ছুঁড়ে মারল।
—“জি… ক্লায়েন্ট লাস্ট মোমেন্টে—”
ফাইলটা কিরিসের হাতে ছিল।
হঠাৎই—
ধপাস!
সে ফাইলটা সোজা টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলল।
চারপাশে যারা ছিল, সবাই থেমে তাকাল। কিরিস এবার সামনে ঝুঁকে এল তার চোয়াল শক্ত, কপালের শিরা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
—“আমি কি তোমাদের বাচ্চাদের মতো কাজ শিখাচ্ছি?”
লোকটা কাঁপা গলায়,
—“স্যার, আমি—”
—“চুপ!”
একটা শব্দ। কিন্তু যেন পুরো জায়গাটা কেটে দিল।
কিরিস হাত তুলে আরেকটা ফাইল ধরে টেবিলে ছুঁড়ে মারল,
—“ডিল ফাইনাল হওয়ার আগে চেক করাটা তোমার কাজ না?”
—“স্যার, টাইম ছিল না—”
—“টাইম ছিল না?”
তার ঠোঁটে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠল,
—“তাহলে এখন সময় আছে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বাজে অজুহাত দেওয়ার?”
লোকটা একদম চুপ। কিরিস এবার এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, —“এই প্রজেক্টটা যদি আজ রাতের মধ্যে ঠিক না হয়—”
এক সেকেন্ড থামল,
—“তাহলে কাল থেকে তোমার জায়গায় অন্য কেউ থাকবে।”
নিচু গলা… কিন্তু স্পষ্ট হুমকি চারপাশে নিস্তব্ধতা।
কেউ কিছু বলছে না কারণ সবাই জানে, এটা কিরিসের স্বাভাবিক রূপ। লিসি একটু দূর থেকে সব দেখছিল।
তার বুক কাঁপছে এই রূপটা সে আগে দেখেনি এতটা তীব্র, এতটা নিয়ন্ত্রণে থাকা রাগ…
কিরিসের হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে চোখে সেই ভয়ংকর স্থিরতা একদম অন্য মানুষ। কিছুক্ষণ পর কিরিস হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল। আর এক সেকেন্ডও সেখানে থাকল না সোজা গার্ডেনের এক কোণের অন্ধকার দিকটায় চলে গেল। মার্ক সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে গেল।
কিছু না বলে হাতে একটা ঠান্ডা ওয়াইনের গ্লাস ধরিয়ে দিল। কিরিস সেটা নিয়ে এক চুমুক খেল। তারপর পকেট থেকে সিগারেট বের করল, জ্বালাল। কিরিস সিগারেটে একটা লম্বা টান দিলো, যেন নিজের রাগগুলো সে এই ধোঁয়ার মাঝে বের করে দিতে চাচ্ছে। ধোঁয়া ধীরে ধীরে বাতাসে মিশে গেল। তার চোখ এখনও কঠিন রাগ পুরোপুরি যায়নি, শুধু চেপে আছে।
কিরিস চুপচাপ ওখানে দাঁড়িয়ে আছে পাশে মার্ক মাথা নিচু করে আছে।কিরিস এতো বড় ব্যবসা সামলায় তার মাঝে সবকিছু নিয়ন্ত্রিত আর নিয়ন্ত্রণ যখন কেউ অমান্য করে কিংবা ভঙ্গ করে তখন একজন স্বাভাবিক মানুষের মাথাও গরম হয়ে যায় সেখানে তার মতন একজন রাগী মানুষ ঠিক কোন পর্যায়ে রাগী হতে পারে সেটা ভাবনা করা অনেকটা এক সমুদ্রের মাঝে এক ফোঁটা পানি ঢালার মত যার গণনা কখনো এ করা যায় না। চারপাশ নিস্তব্ধ সবাই বসে একটু ঠান্ডা শরবত খেতে ব্যস্ত তখন ইশান লিসিকে ইশারা করে কিরিস কেউ এক গ্লাস শরবত দিতে বলে। লিসি একটু ভেবে মনে একটু সাহস যুগায় ভিতরে ভয়টা টাকে একটু কম করে কিরিসের দিকে তাকায়, দেখে সে সিগারেট খাচ্ছে দূর থেকে ধোঁয়া উঠছে তাই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তাই সে ভেবে পুদিনা দেওয়া এক গ্লাস শরবত তুলে নেয় ধীরে এগিয়ে যায় কিরিসের দিকে।
লিসি আস্তে আস্তে সেই দিকটায় এগিয়ে এল তার হাতে একটা গ্লাস পুদিনার শরবত। সে কয়েক কদম দূরে থেমে গেল। কিরিস দেয়ালের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে,
হাতে সিগারেট… অন্য হাতে গ্লাস… চোখ দূরে কোথাও। মার্কও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। লিসির একটু ভয় লাগছে। কিন্তু তবুও সে সাহস করে এগিয়ে গেল।
—“এইটা… নিন…”
তার গলা খুব আস্তে। কিরিস চোখ ঘুরিয়ে তাকাল।
লিসি গ্লাসটা এগিয়ে দিল —“শরবত… পুদিনা দেওয়া…”
কিরিস ভ্রু কুঁচকে —“কেন?”
লিসি একটু থেমে বলল —“ওই… যাতে… গন্ধটা না থাকে…”
সে সরাসরি বলল না কিন্তু বোঝা গেল। কিরিস কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে সিগারেটটা নিভিয়ে পাশে ফেলে দিল। ওয়াইনের গ্লাসটা নামিয়ে মার্কের দিকে দিলো মার্ক গ্লাসটা ধরে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপর ধীরে লিসির দিকে তাকালো একহাত বাড়িয়ে শরবতটা নিল। এক চুমুক খেল। কিরিস দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, হাতে পুদিনার শরবতের গ্লাস। এক চুমুক নিয়ে সে চোখ নামিয়ে গ্লাসটার দিকে তাকাল… তারপর ধীরে লিসির দিকে। লিসি একটু দূরে দাঁড়িয়ে, স্পষ্টই নার্ভাস। কিরিস ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানল
—“পুদিনা?”
লিসি চোখ নামিয়ে বলল —“হ্যাঁ…”
—“হঠাৎ এত খেয়াল?”
লিসি একটু থেমে, তারপর খুব আস্তে বলল
—“যেন… গন্ধ না থাকে।”
কিরিস ভ্রু তুলল —“কিসের গন্ধ?”
লিসি লজ্জায় গাল লাল করে ফেলল —“আপনি বুঝেন না?”
কিরিস এবার পুরোপুরি তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
—“না। তুমি বলো।”
লিসি একটু রাগ দেখানোর ভান করে বলল।—“ওয়াইন আর… ওইটা—”
কিরিস হালকা হেসে উঠল —“সিগারেট?”
লিসি মুখ ঘুরিয়ে নিল —“হুম।”
কিরিস এক পা এগিয়ে এল —“তাহলে… প্ল্যান ছিল?”
লিসি চোখ বড় করে তাকাল —“কীসের প্ল্যান?!”
কিরিস নিচু গলায়, একটু ঝুঁকে —“আমাকে কিস করার।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে বলল —“আপনি একদম—! আমি তো—”
কথা শেষ করতে পারল না।।কিরিস তার হাতটা ধরে নিজের দিকে টেনে নিল।
—“মিথ্যে বলো না।”
লিসি হালকা ধাক্কা দিল —“আমি কিছু ভাবিনি!”
—“হুম… তাই নাকি?”
তার গলায় মজা, কিন্তু চোখে অন্য কিছু।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে মার্ক পুরো দৃশ্যটা দেখছিল।
কিছুক্ষণ আগেই যে মানুষটা রাগে ফাইল ছুঁড়ে মারছিল, রাগে তার শীরার রগ ফুলে উঠে ছিলো এখন সেই একই মানুষ… একদম শান্ত, ঠান্ডা, আর… অন্যরকম। মার্ক নিজের অজান্তেই মুচকি হেসে ফেলল।।কিরিস চোখের কোণ দিয়ে সেটা খেয়াল করল। একটা ছোট্ট হাতের ইশারা—
“Go.”
কোনো কথা না। মার্ক মাথা নেড়ে চুপচাপ সরে গেল।
এখন চারপাশে শুধু তারা দুজন। হালকা বাতাস, দূরের মিউজিক, আর নরম আলো। কিরিস আবার লিসির দিকে তাকাল।
—“এত ভয় পেয়েছিলে?”
লিসি আস্তে বলল —“ওভাবে… আপনাকে আগে দেখিনি।”
কিরিস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর খুব ধীরে বলল —“সবাই দেখে না।”
লিসি তাকাল। কিরিস এক পা এগিয়ে এসে তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। লিসি প্রথমে একটু থমকাল তারপর ধীরে ধীরে স্থির হয়ে গেল। কিরিস তার কানের কাছে খুব নিচু গলায় বলল,
—“তোমার জন্য আলাদা।”
লিসির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কিরিস একটু সরে এসে তার মুখের দিকে তাকাল।
—“এখন গন্ধ নেই তো?”
লিসি চোখ বড় করে তাকাল —“আপনি না—!”
কিরিস হালকা হেসে,
—“চেক করে দেখি?”
লিসি কিছু বলার আগেই সে হালকা করে ঝুঁকে এল।
লিসি চোখ বন্ধ করে ফেলল অজান্তেই… আর মুহূর্তটা—
নরম, ধীরে, একদম আলাদা হয়ে রইল। গার্ডেনের নিরিবিলি কোণায় মুহূর্তটা যেন থমকে ছিল হালকা বাতাস, দূরের সুর, আর দুজন মানুষের নিঃশব্দ টান।
কিরিস ধীরে লিসির মুখের দিকে ঝুঁকল। তার দৃষ্টি গাঢ়, স্থির—যেন বহুদিনের দমিয়ে রাখা অনুভূতির একান্ত প্রকাশ। লিসির বুকের ভেতর ধ্বনি উঠছে দ্রুততর ছন্দে।
তার চোখ অজান্তেই বন্ধ হয়ে এলো। পরের মুহূর্তে কিরিসের ঠোঁট ছুঁয়ে গেল তার ঠোঁট। কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো অস্থিরতা নেই বরং এক গভীর, নিয়ন্ত্রিত আবেগ, যেখানে অধিকার আছে, আকর্ষণ আছে, আর এক অদ্ভুত কোমলতা মিশে আছে। লিসির আঙুলগুলো অজান্তেই কিরিসের শার্ট আঁকড়ে ধরল। সময়ের হিসাব যেন মিলিয়ে গেল সেই স্পর্শে। কিরিস সামান্য আরেকটু কাছে টানল তাকে যেন এই ক্ষণটুকুকে আরও স্থির করে রাখতে চায়। কিন্তু হঠাৎই লিসি সরে গেল। তার নিঃশ্বাস ভারী, চোখে স্পষ্ট অস্থিরতা। সে দু’হাতে কিরিসের বুকে হালকা ধাক্কা দিল—
—“ আর না… না… গন্ধ খাচ্ছে না..... আমি...। ”
কথাগুলো সম্পূর্ণ হলো না, তবুও অর্থ স্পষ্ট। পরের মুহূর্তেই সে ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে চলে গেল আলো আর মানুষের ভিড়ের দিকে যেখানে শব্দ আছে, নিরাপত্তা আছে, আর নিজের অস্থিরতাকে লুকোনোর সুযোগ আছে। কিরিস স্থির দাঁড়িয়ে রইল একদম নড়ল না।
তার চোখ সেই দিকেই স্থির, যেখানে লিসি মিলিয়ে গেল মানুষের ভিড়ে ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য এক রেখা না হাসি, না বিস্ময় বরং এক গভীর অনুভবের ছায়া। সে ধীরে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। মনে মনে যেন ছুঁয়ে দেখল সেই স্পর্শ লিসির কাঁপা নিঃশ্বাস, তার অস্থিরতা, তার সরে যাওয়ার ভঙ্গি… সবকিছু। তারপর খুব আস্তে, নিজের কাছেই স্বীকারের মতো—
“ তোমাকে চাই বউজান শুধু তোমাকে চাই …”
তার দৃষ্টি আবার ভিড়ের দিকে উঠল কিন্তু এবার সেই দৃষ্টিতে একধরনের নিশ্চয়তা যেন সে জানে এই দূরত্ব, এই সরে যাওয়া সবই সাময়িক আর যা শুরু হয়েছে তা আর থামার নয়।
রাত অনেকটাই গভীর হয়েছে।
তবুও গার্ডেন এখনো পুরো ফাঁকা না—আলোর মালাগুলো নরম হয়ে জ্বলছে, হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে, আর চারদিকে একটা ক্লান্ত কিন্তু তৃপ্ত পরিবেশ ছড়িয়ে আছে। সবার খাওয়া-দাওয়া শেষ, এখন শুধু বসে বসে গল্প, হাসি, আর দিনের স্মৃতি নিয়ে ছোট ছোট কথা।
একপাশে মেয়েরা গোল হয়ে বসে আছে নুসরাত, হিয়া, জারা, আরোবি… আর তাদের মাঝখানে লিসি।
শুরুতে সে-ও হাসছিল, কথা বলছিল… কিন্তু ধীরে ধীরে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কথার মাঝেই কয়েকবার হালকা হাই তুললো সে। আরোবি খেয়াল করলো, মুচকি হেসে বললো— “লিসি, ঘুম পাচ্ছে নাকি?”
লিসি আধো ঘুমের গলায় বললো— “না… না… ঠিক আছি…”
কিন্তু কথাটা শেষ হতেই সে একটু কাত হয়ে আরোবির কাঁধে মাথা রেখে দিল। কিছুক্ষণ পরই তার নিঃশ্বাস ধীর হয়ে গেল… সে ঘুমিয়ে পড়েছে। আরোবি একবার নিচে তাকিয়ে নরম করে হাসলো। ওকে ডাকলো না, সরালও না—বরং নিজের কাঁধটা একটু ঠিক করে নিল যেন লিসি আরাম করে ঘুমাতে পারে। সে আবার গল্পে মিশে গেল, কিন্তু মাঝেমাঝেই একবার তাকিয়ে দেখছে—লিসি ঠিক আছে তো। অন্যদিকে ছেলেদের আড্ডাও এখন অনেকটাই শান্ত। কাবির, রিহান, ইশান—সবাই ক্লান্ত, তবুও হালকা কথাবার্তা চলছে। কিরিসও তাদের সঙ্গে বসে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
চারপাশে একবার চোখ বুলালো—সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। কারো কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, ডেকোরেশন ঠিক আছে কিনা, আলো, বসার জায়গা—সব সে নিজের মতো খেয়াল করলো।
এরপর একটু দূরে গিয়ে ডেকোরেশন ম্যানেজারের সাথে নিচু গলায় কথা বলতে লাগলো—
“কালকের সেটআপটা আরো ক্লিয়ার চাই… লাইটিং একটু সফট, আর স্টেজটা একটু এক্সপ্যান্ড করো।”
তার কণ্ঠে সেই স্বাভাবিক দৃঢ়তা—সবকিছু নিখুঁত চাই তার।
কথা শেষ করে ফিরে আসার সময় হঠাৎ তার দৃষ্টি থেমে গেল।
মেয়েদের ভিড়ের মাঝে…
আরোবির কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে লিসি।
একটা মুহূর্তের জন্য কিরিস স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
চারপাশের সব শব্দ যেন দূরে সরে গেল।
তার চোখে তখন এক অদ্ভুত কোমলতা—গভীর, নিঃশব্দ, কিন্তু প্রবল।সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। আরোবি তাকিয়ে মুচকি হেসে খুব আস্তে বললো— “ঘুমিয়ে গেছে…”
কিরিস কোনো উত্তর দিল না। কিরিস শুধু ধীরে লিসির দুকে এগিয়ে গেলো। লিসিকে কোলে নেওয়ার মুহূর্তটা যেন হঠাৎ করেই সময়কে ধীর করে দিল। কিরিস ধীরে এগিয়ে এলো—একদম শব্দহীন, স্থির পায়ে। তার চোখ তখন আর কোথাও নেই… শুধু লিসির উপর নিবদ্ধ। আরোবির কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সে—মুখটা শান্ত, নিঃশ্বাস ধীর, যেন বাইরের পৃথিবীর সাথে তার কোনো যোগাযোগই নেই। এক মুহূর্ত কিরিস দাঁড়িয়ে রইলো। তার দৃষ্টি নরম হলো—অদ্ভুতভাবে, যেটা কেউ খুব একটা দেখে না। তারপর খুব ধীরে… সে নিচু হলো।
প্রথমে এক হাত এগিয়ে এনে লিসির পিঠের নিচে রাখলো মজবুত, কিন্তু স্পর্শে একদম কোমল। অন্য হাতটা আলতো করে তার হাঁটুর নিচ দিয়ে গেল। পুরোটা এত নিখুঁতভাবে, এত সাবধানে—যেন সামান্য ভুল হলেই এই শান্ত ঘুম ভেঙে যাবে। অত্যন্ত যত্নে, যেন কাঁচের কোনো ভঙ্গুর জিনিস… ঠিক তেমন করে তারপর একটুখানি শক্তি প্রয়োগ করে… সে লিসিকে তুলে নিল। একদম শিশুর মতো। লিসির শরীর হালকা দুলে উঠলো, শাড়ির আঁচল নরম করে সরে গেল, নুপুরে হালকা ঝুনঝুন শব্দ হলো—আর ঠিক সেই মুহূর্তে লিসি একটু নড়লো। তার চোখের পাতা কাঁপলো… আধখোলা দৃষ্টিতে সামনে তাকালো।
কিরিস। এক সেকেন্ড—শুধু এক সেকেন্ডের জন্য তাদের চোখ মিললো। সেই দৃষ্টিতে প্রশ্ন ছিল না, ভয় ছিল না ছিল নিঃশব্দ চিনে নেওয়া…
“এটা সে-ই…”
লিসির আঙুলগুলো অজান্তেই কিরিসের শার্টের কাপড়টা আলতো করে আঁকড়ে ধরলো। তারপর ধীরে ধীরে… সে নিজের মাথাটা আরও গাঢ়ভাবে কিরিসের বুকে এলিয়ে দিল। নিঃশ্বাসটা বদলে গেল—আরও গভীর, আরও নিশ্চিন্ত। সে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।
এবার আর কোনো দ্বিধা নেই… কোনো অস্থিরতা নেই। যেন তার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত ভরসা এসে থেমেছে এই এক বুকের ভেতর। কিরিসের বুকের ভেতরেও কিছু একটা বদলে গেল। তার বাহুর চাপ একটু শক্ত হলো রক্ষা করার মতো, আগলে রাখার মতো। তার চোয়াল শক্ত, মুখ গম্ভীর—কিন্তু চোখে সেই তীব্র, গভীর অনুভূতি… যেটা ভাষায় বলা যায় না। চারপাশে আলো জ্বলছে, মানুষজন আছে, হাসির শব্দ ভাসছে কিন্তু এই মুহূর্তে, তাদের দু’জনের চারপাশে যেন এক আলাদা নীরবতা তৈরি হয়েছে। কিরিস ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
লিসি তার কোলে একদম ফিট হয়ে আছে, মাথা তার বুকে, নুপুরের মৃদু শব্দ এখনও থেমে থেমে শোনা যাচ্ছে।
সে হাঁটতে শুরু করলো—প্রতিটি পদক্ষেপ মেপে, সচেতনভাবে। যেন তার একটুখানি অসাবধানতায়ও এই ঘুম, এই শান্তি ভেঙে যেতে পারে।এই দৃশ্যটা শুধু কোলে নেওয়া নয় এটা ছিল অধিকার, সুরক্ষা, আর এক নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি। একজন কঠোর, ভয়ংকর মানুষ—
তার সমস্ত কঠিনতা সরিয়ে, একজন মেয়েকে এমনভাবে আগলে রেখেছে… যেন পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে ছুঁতে পারবে না।
লিসিকে কোলে নিয়ে কিরিস যখন ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো, তখন চারপাশে থাকা কাজিনদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। কাবির প্রথমেই নিচু গলায় বললো—
“এই দেখ… আমাদের ভাইটা অফিশিয়ালি ‘বেবি কেয়ার স্পেশালিস্ট’ হয়ে গেছে!”
রিহান মুখ চেপে হাসতে হাসতে—
“চুপ! আস্তে বল… না হলে এই স্পেশালিস্ট আমাদেরকেই ট্রিটমেন্ট দিয়ে দিবে!”
ইশান ভ্রু তুলে কিরিসের দিকে তাকিয়ে নাটকীয় গলায় বললো— “ওহহ… এই সেই মানুষ, যে একসময় বলতো—‘আমি এসব ইমোশনাল জিনিসে নেই!’”
পাশ থেকে রিহান ঠোঁট বাঁকিয়ে যোগ করলো—
“Boss কে দেখলে এখন মনে হচ্ছে—‘Dangerous Mafia’ না, ‘Loving Husband of the Year’!”
সবাই একসাথে হাসি চাপতে গিয়ে কষ্টে পড়ে গেল।
আরোবি একটু সামনে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বললো— “এই লিসিকে যদি এখন কেউ জাগিয়ে বলে—‘তোর বর তোকে কোলে করে ঘুরাচ্ছে’, ও নিজেই বলবে—‘স্বপ্ন দেখছি, disturb করিস না!’”
নুসরাত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো—
“না রে, আমি হলে ইচ্ছে করেই ঘুমের ভান করে থাকতাম… এমন সার্ভিস কে ছাড়ে!”
জারা হেসে বললো—
“একদম! আমাদের ভাগ্যে তো কেউ এক গ্লাস পানি এনে দেয় না… আর দেখ, ভাবিকে পুরো রাজকুমারীর মতো নিয়ে যাচ্ছে!”
এই কথায় আবার এক দফা চাপা হাসি ছড়িয়ে পড়লো।
কাবির আবার মজা করে বলে—
“ভাইরে… কাল থেকে কিন্তু আমরা সবাই লাইনে দাঁড়াবো কোলে নেওয়ার ট্রেনিং নিতে!”
রিহান সাথে সাথে— “তুই আগে হালকা ওজনের কাউকে খুঁজ… না হলে কোলে নেওয়ার আগেই নিজেই পড়ে যাবি!”
সবাই আবার হেসে উঠলো। এইসব হাসাহাসির মাঝেও কিরিস একবারও কিছু বললো না।।সে শুধু নিজের মতো করে লিসিকে শক্ত করে, কিন্তু খুব যত্নে ধরে রেখেছে।
আর ওদের এই হাসি, খুনসুটি, মজা পুরো রাতটাকে আরও জীবন্ত, আরও আপন করে তুললো।
কিরিস ধীরে ধীরে লিসিকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। দরজাটা পায়ের আঙুল দিয়ে আলতো ঠেলে বন্ধ করতেই বাইরের কোলাহল এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল ঘরের ভেতর শুধু নীরবতা। বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে সে খুব যত্নে লিসিকে শুইয়ে দিল। মাথার নিচে বালিশটা ঠিক করে দিল, শাড়ির ভাঁজ যেন অগোছালো না হয় সেটাও আলতো হাতে গুছিয়ে দিল। লিসি একবার হালকা নড়লো, কিন্তু ঘুম ভাঙলো না বরং আরও গভীর হলো।
এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো কিরিস। তার চোখে সেই একই তীব্র, নীরব দৃষ্টি যেন এই দৃশ্যটা সে মনে গেঁথে রাখতে চাইছে। তারপর ধীরে সরে এসে ল্যাপটপটা খুললো।
কিছু জরুরি কাজ মেইল, কয়েকটা নির্দেশ, কিছু হিসাব… তার আঙুলগুলো দ্রুত চলছিল, মুখটা আবার আগের মতোই গম্ভীর হয়ে উঠেছে। যেন কয়েক মুহূর্ত আগের সেই কোমল মানুষটা আর এই কঠিন মানুষটা দু’জন আলাদা। কাজ শেষ করে সে ল্যাপটপটা বন্ধ করলো। এরপর বাথরুমে ঢুকে একটা ফ্রেশ শাওয়ার নিল জল পড়ার শব্দে যেন দিনের ক্লান্তি ধুয়ে গেল। বাইরে এসে টাওয়েল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে আলমারি থেকে একটা ট্রাউজার পরে নিল খালি গা। ঘরটা তখন নরম আলোয় ভাসছে। কিরিস ধীরে এসে বিছানার পাশে দাঁড়ালো। লিসি তখনো একইভাবে ঘুমিয়ে—মুখে একদম শান্ত একটা ছায়া, নিঃশ্বাস ধীর। সে বিছানায় উঠে পাশে শুয়ে পড়লো।
একটু তাকিয়ে রইলো… তারপর ধীরে, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, লিসির দিকে হাত বাড়িয়ে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। লিসির শরীর হালকা নড়লো। আধো ঘুমে সে যেন একটু সরে যেতে চাইল অচেতন অভ্যাসে।
কিন্তু কিরিসের বাহুর বাঁধন ছিল দৃঢ়, তবুও কোমল।
সে তাকে আরও কাছে টেনে নিল এমনভাবে, যেন তাকে ছাড়া তার রাত অসম্পূর্ণ। লিসি শেষমেশ আর সরে যেতে পারলো না। বরং অজান্তেই তার বুকের কাছে গা এলিয়ে দিল নিশ্চিন্ত, অবচেতন বিশ্বাসে। কিরিসের হাত তার চারপাশে জড়িয়ে রইলো। ঘরের নীরবতায় শুধু দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে গেল ধীরে, গভীরভাবে। এইভাবে… একে অপরের খুব কাছে, খুব আপন হয়ে কখন যে রাতটা কেটে গেল, কেউ টেরই পেল না।
সকালটা ধীরে ধীরে পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।
জানালার ফাঁক দিয়ে আসা রোদের নরম আলো বিছানার একপাশে এসে পড়েছে সেই আলোয় লিসির মুখটা যেন আরও কোমল, আরও শান্ত লাগছে।
সে এখনো ঘুমিয়ে আছে। কিরিসের বাহুর ভেতর একদম কাছে, একদম নিশ্চিন্ত। কিরিসের ঘুম ভাঙলো প্রথমে।
চোখ খুলে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলো… তারপর ধীরে নিচে তাকালো লিসি। তার বুকের সাথে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে, নিঃশ্বাসটা ধীর, ঠোঁটে হালকা একটা নির্ভার ছায়া।কিরিসের দৃষ্টি এক মুহূর্তে বদলে গেল। গভীর… স্থির… আর অদ্ভুত নরম। সে একটু নড়তে গিয়েও থেমে গেল যেন তার সামান্য নড়াচড়াতেই এই শান্ত ঘুম ভেঙে যেতে পারে। ধীরে ধীরে সে তার এক হাত সরিয়ে লিসির চুলগুলো কানের পাশ থেকে আলতো করে সরিয়ে দিল।
তার আঙুলের স্পর্শে লিসি হালকা কেঁপে উঠলো… চোখের পাতা নড়লো কিরিস স্থির হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর লিসির চোখ ধীরে ধীরে খুললো।
প্রথমে সবকিছু ঝাপসা… তারপর স্পষ্ট। আর ঠিক সামনে কিরিস। তাদের চোখ এক মুহূর্তে আটকে গেল। লিসির চোখে প্রথমে বিস্ময়… তারপর লজ্জা… তারপর এক অদ্ভুত অস্বস্তি—সে বুঝতে পারলো, সে কিরিসের খুব কাছে… খুব বেশি কাছে। সে হঠাৎ সরে যেতে চাইল।
কিন্তু কিরিসের হাত এখনো তার চারপাশে।
সে থেমে গেল। কিরিস ধীরে, নিচু গলায় বললো—
“এত তাড়াহুড়ো কেন?”
লিসি কিছু বললো না। চোখ নামিয়ে ফেললো।
তার গাল হালকা লাল হয়ে উঠেছে। কিরিস একটু ঝুঁকে এলো—তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, কিন্তু কণ্ঠ নরম—
“কাল রাতে তো বেশ শান্ত ছিলে…”
লিসি এবার হালকা রেগে তাকালো—
“আমি… আমি ঘুমিয়ে ছিলাম!”
কিরিসের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো
— “জানি।”
একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। লিসি আবার সরে যাওয়ার চেষ্টা করলো এবার কিরিস ধীরে তার হাত ছেড়ে দিল। লিসি তাড়াতাড়ি উঠে বসে পড়লো। চুল ঠিক করতে লাগলো, চোখে-মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি আর লজ্জা।
কিরিস বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ওকে দেখছিল একদম চুপচাপ। তার দৃষ্টিটা এমন যেন সে কিছু না বলেও অনেক কিছু বলে দিচ্ছে। লিসি সেটা টের পেয়ে আরও অস্থির হয়ে গেল।
“আমি… ফ্রেশ হয়ে আসি…” —বলেই প্রায় তাড়াহুড়ো করে উঠে বাথরুমের দিকে চলে গেল।দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা ঘরে হালকা প্রতিধ্বনি তুললো। কিরিস তখনো বসে আছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হালকা করে নিঃশ্বাস ফেললো… তারপর খুব আস্তে, নিজের মনেই বললো— “Interesting…”
তার চোখে তখন এক ঝলক কৌতূহল… আর একদম সূক্ষ্ম একটা হাসি। বাথরুমের ভেতরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লিসি নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
তার গাল এখনো লাল। সে নিজের প্রতিচ্ছবিকে ফিসফিস করে বললো—
“কি হচ্ছে আমার সাথে…”
তার বুকের ভেতরটা আবার হালকা কেঁপে উঠলো। বাইরে সকাল আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে… আর তাদের দু’জনের মাঝের অদ্ভুত সম্পর্কটা আরও একটু জটিল, আরও একটু গভীর হয়ে উঠছে…।

কিছুক্ষণ পর.....
লিসি ওয়াশরুমে আছে কিরিস বেড থেকে চুপচাপ উঠে বসে, তারপর সোজা ব্যালকনিতে চলে যায়। বাইরের সকালের হালকা ঠান্ডা বাতাসটা এসে গায়ে লাগে। কিরিস দু’হাত রেলিংয়ে রেখে নিচের দিকে তাকায়। শহরটা এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, কিন্তু দিনের শুরুটা টের পাওয়া যাচ্ছে একটা গভীর শ্বাস নেয় সে।
তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ভেতরে ঢুকে সরাসরি রুম থেকে বের হয়ে যায় গন্তব্য একটাই—জিম।
অনেকদিন হলো নিজের শরীরটাকে ঠিকমতো সময় দেওয়া হয়নি… আজ আর বাদ যাবে না। কিরিস আর কিছু না ভেবে নিচে নেমে জিম ঘরে দিকে চলে যায়। ঘরটা এখন পুরো ফাঁকা। একটু পরেই ওয়াশরুমের দরজা খুলে লিসি বের হয় মুখে একদম ফ্রেশ একটা কোমলতা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে চুল আচড়াতে থাকে। লিসি এখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। চুলগুলো ধীরে ধীরে মন দিয়ে আচড়াচ্ছে।
ঠিক তখনই—
টক টক…
দরজায় নক পড়ে। লিসি একটু চমকে উঠে, তারপর বল—“আসো…”
দরজা খুলে আরোবি মুখটা বের করে, চোখে দুষ্টু হাসি।
—“এই যে ম্যাডাম, খুব রেডি হচ্ছো নাকি?”
লিসি হেসে ফেলে—
—“কি হলো আবার?”
আরোবি ভেতরে ঢুকে বিছানায় বসে পড়ে, একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে—
—“বড় আম্মু তোকে ডাকছে। বলেছে শাড়ি পরে নিচে নামতে।”
লিসি ভ্রু কুঁচকে তাকায়—
—“এখনই?”
—“হুম! নিচে নাকি পাড়ার অনেক মানুষ এসেছে, বিশেষ করে এলাকার বয়স্ক আন্টি-আঙ্কেলরা…”
আরোবি হেসে ফেলে—
—“তোকে দেখলেই তো প্রশ্নের বন্যা বইয়ে দেবে! এসব বয়স্ক মানুষদের আর কাজ কী বল?”
লিসিও হালকা হেসে মাথা নাড়ে—
—“ঠিক আছে, তুই যা। আমি ঘরটা গুছিয়ে শাড়ি পরে আসছি।”
আরোবি —“দেখি কেমন বউ সাজিস! আর দ্রুত আসিস বরকে পেয়ে বোন কে ভুলে গেছে ”
বলে আরোবি বের হয়ে যায়। লিসি মুচকি হাসে
লিসি ড্রেসিংরুমের দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলে শাড়ির সেকশনের দিকে যায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ আটকে যায় সারি সারি শাড়ি, নানা রঙ, নানা ডিজাইন… সব যেন ওর জন্যই সাজানো। সে হাত বাড়িয়ে একটা শাড়ি নিতে যাবে, ঠিক তখনই চোখে পড়ে পাশে ছোট্ট একটা চিরকুট আটকানো। লিসি কৌতূহল নিয়ে সেটা খুলে পড়ে— “কটন শাড়ি পরো।”
এক মুহূর্ত থেমে যায় সে। ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে ওঠে। কে দিয়েছে, সেটা বুঝতে তার একটুও বাকি থাকে না।