পর্ব :70
গাড়িটা ধীরে ধীরে বাড়ির গেটের সামনে এসে থামল।
সন্ধ্যার আলো পুরোপুরি নেমে গেছে—বাড়িটা ঝলমলে লাইটে ভরে উঠেছে, ভেতর থেকে হাসির শব্দ, গানের আওয়াজ ভেসে আসছে। কিরিস ইঞ্জিন বন্ধ করতেই কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। লিসি জানালার বাইরে তাকিয়ে আস্তে বলল —“আজকের দিনটা… খারাপ ছিল না।”
কিরিস হালকা ঘুরে তাকাল,
—“বলেছিলাম তো।”
লিসি ঠোঁট চেপে ছোট্ট হাসি দিল। দুজনে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো। ঠিক তখনই কাবির, রিহান, ইশান একসাথে এগিয়ে এল।
—“এইইই! অবশেষে হাজির!”
কাবির হাত গুটিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
—“তোদের আসতে এত দেরি হলো কেন হ্যা?”
রিহান মুচকি হেসে,
—“আমরা তো ভাবছিলাম, তোরা আর ফিরবিই না!”
লিসি চুপচাপ নামল—কিছু বলল না, শুধু একবার চোখ ঘুরাল। ইশান ঠোঁট টিপে হাসতে হাসতে বলল
—“ নতুন বউকে কে নিয়ে ঘুরছে, একটু তো দেরি হবেই। ”
কিরিস তখন শান্ত গলায় উত্তর দিলো
—“আরে বাচ্চা নিয়ে ঘুরলে তো দেরি হবেই, তাই না?”
এক সেকেন্ডের জন্য চারপাশ চুপ। তারপর লিসি চোখ রাঙিয়ে তাকাল —“কাকে বাচ্চা বলছো?”
ইয়াবি দুই হাত তুলে —“আমি কিছু বলিনি ভাবি! আমি তো শুধু—”
কাবির হেসে উঠল,
—“ধরা খাইছিস!”
কিরিস একবার শুধু তাকাল ইয়াবি সঙ্গে সঙ্গে চুপ। কিরিস সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে লিসির দিকে তাকিয়ে বলে —“ তোমাকে বললাম, আর একটু রাগ কম করো রমনী ”
লিসি কিরিসের দিকে এখনো তাকিয়ে আছে। আর ছেলেরা হাসছে একসাথে সামনে দিকে যেতে থাকে আর লিসিকে দেখে কাবির হেসে বলে — “ ওই লিসি,ভাবি, রমনী তিনটা একসাথে ভাইয়ের বউ আসো "
লিসি হাফ ছেড়ে দিয়ে বলে —“ আল্লাহ আবার তোমরা শুরু করলে, ”
বলে লিসিও ভিতরে দিকে যায় মেয়েদের মাঝে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরে। একটু পরে মার্ক আর বডিগার্ডরা এসে ব্যাগগুলো নামিয়ে রাখছে। কিরিস সোজা এগিয়ে গিয়ে গহনাগুলোর বক্সগুলো তুলে নিল। তারপর সুপ্রিয়ার সামনে গিয়ে খুব শান্তভাবে এগুলো তার হাতে দিল।
—“সব রেডি।”
সুপ্রিয়া বক্স খুলে একে একে দেখলেন মুকুট, বালা, নেকলেস… সব নিখুঁত। প্রিয়া, মির্জা বেগম, সাবেনা আর মাবেনা সবাই গহনা গুলো দেখে সন্তুষ্ট হলেন। মির্জা বেগম সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন —“ভালো হয়েছে।”
কিরিস এরপর খুব গুছিয়ে বলতে লাগল,
—“এইগুলো কাল সকালে আবার চেক করাবা। শাড়িগুলো আলাদা করে রাখবা—যেগুলো হলুদে লাগবে সেগুলো আলাদা। আর যেগুলো সন্ধ্যার ফাংশনে, সেগুলো প্রেস করে রেডি রাখতে বলবে। ”
সবাই চুপচাপ শুনছে তার কথায় এমন একটা নিয়ন্ত্রণ, যেন পুরো আয়োজনটাই তার হাতে। ঠিক তখনই মার্ক আবার ঢুকল হাতে আরও কয়েকটা ব্যাগ। সবাই একটু অবাক হলো কারণ কেনাকাটার সময় এইরকম ব্যাগ তারা দেখেনি। আরোবি একটু ভেবে বললো
—“এইগুলো আবার কী?”
মার্ক হালকা হাসি দিয়ে বলল —“বসের অর্ডার।”
সে একে একে সবাইকে একটা করে ব্যাগ ধরিয়ে দিতে লাগল। সুরভী, লিজা, আরোবি—সবাই অবাক হয়ে ব্যাগ খুলতে লাগল। ভেতরে ছোট ছোট বক্স। খুলতেই সোনার সুন্দর নেকলেস, প্রতিটাতে নাম খোদাই করা।
—“ওমাইগড!”
—“এটা তো আমার নাম!”
মেয়েরা একদম খুশিতে লাফিয়ে উঠল। কিরিস শান্ত গলায় বলল,
—“বোনদের জন্য। ছোট করে কিছু।”
তারপর যোগ করল,
—“মা আর ফুফুদের জন্যও আছে।”
ছেলেরা মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাবির নাটকীয়ভাবে বলল
—“ওয়াও! আমাদের কিছু না দিয়ে মেয়েদের আগে দিচ্ছিস! স্বার্থপর!”
রিহান মাথা নাড়িয়ে —“হ্যাঁ ভাই, আমরা কি পর?”
ঠিক তখনই ঈশান হেসে বলল
—“এইজন্যই বলে লেডিস ফার্স্ট। আমাদের জন্যও নিশ্চয়ই কিছু এনেছে, তাই না?”
কিরিস একবার তাদের দিকে তাকাল তারপর শান্তভাবে বলল —“তোদের ব্যাগটা খুলে দেখ।”
সবাই একসাথে নিজেদের ব্যাগ খুলল। এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড…
—“এইটা কি?!”
ভেতরে চকচকে বক্স খুলতেই Rolex ঘড়ি।
—“ওহহহহ!”
—“ভাই! এটা তো…!”
কাবির প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল,
—“এইজন্যই বলে বড়লোক ভাই!”
রিহান হেসে —“আমাদের লাইফ সেট!”
সবাই খুশিতে মেতে উঠল। কিরিস হাত তুলে একটু থামাল —“যার যা আছে, নিয়ে নাও। আর দ্রুত রেডি হও—সন্ধ্যার অনুষ্ঠান আছে।”
তার গলায় আবার সেই সিরিয়াস টোন ফিরে এসেছে।
সবাই মাথা নাড়িয়ে ছুটে গেল। কিরিস সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। লিসি একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল—
চোখে হালকা মুগ্ধতা সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
কিরিস একবার শুধু তাকাল তার দিকে কিছু না বলেই উপরে উঠে গেল।
বাড়ির ভেতরটা যেন মুহূর্তেই বদলে গেল।
একটু আগেও সবাই ক্লান্ত—হাঁপিয়ে পড়া, এলোমেলো।
কিন্তু এখন? হাসি, দৌড়ঝাঁপ, সাজগোজের ব্যস্ততা—সবাই যেন নতুন এনার্জি পেয়ে গেছে।
—“আমি আগে যাবো!”
—“এইটা আমার!”
—“আরো তাড়াতাড়ি কর!”
এক এক করে সবাই নিজেদের রুমে ছুটে গেল অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হতে। লিসি নিচেই রয়ে গেল।
সুপ্রিয়া আর মির্জা বেগম তাকে পাশে বসিয়ে রেখেছেন।
মির্জা বেগম হালকা হেসে বললেন
—“এই বাড়ির নিয়ম আছে মা… এমন অনুষ্ঠানে বড় বৌমাকে কিছু না কিছু রান্না করে সবার মুখে তুলে দিতে হয়।”
লিসি একটু থমকে গেল —“আমি… কি রান্না করবো?”
সুপ্রিয়া তার দিকে মায়াভরা চোখে তাকিয়ে বললেন
—“ তোকে কিছু ভাবতে হবে না। আমি রান্না করে দেবো… তুমি শুধু আমার পাশে থেকে একটু নেড়েচেড়ে দিবে, যেন মনে হয় তুমি আছো।”
তারপর হালকা মুচকি হেসে যোগ করলেন,
—“ চিন্তা করতে হবে না, এখনো তো তোমার শাশুড়ি মা বেঁচে আছে… এত তাড়াতাড়ি সব দায়িত্ব নিতে হবে না।”
লিসির মুখে ছোট্ট লাজুক হাসি ফুটে উঠল,
—“হুম আম্মু…”
লিসিকে আরো কিছু কথা বলে দিলো বড়রা সবাই মিলে লিসি বসে বসে শুনছে।
এদিকে—
কিরিস নিজের রুমে গিয়ে খুব দ্রুত রেডি হয়ে নিল।
সিম্পল… কিন্তু ভয়ংকর সুন্দর। হালকা রঙের পরিপাটি শার্ট, ফিটেড প্যান্ট, হাতে ঘড়ি… চোখে তার সেই চেনা চশমা—যা তাকে আরও শার্প, আরও ডেঞ্জারাস লুক দিচ্ছে। নিচে নামতেই কয়েকজন কাজের লোক পর্যন্ত থেমে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু কিরিস?
একবারও কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা বেরিয়ে গেল গার্ডেনের দিকে। গার্ডেনটা পুরো আলোয় ভরে গেছে।
ফেয়ারি লাইট, ফুলের ডেকোরেশন, স্টেজ, বসার জায়গা—সব একদম নিখুঁত। আনারুল আর ফুফুর জামাইরা দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। কিরিস গিয়ে একদম ঠান্ডা মাথায় চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
—“এই লাইটটা একটু নিচে নামাও।”
—“ওই টেবিলটা সোজা করো।”
—“স্টেজের সামনে স্পেসটা ক্লিয়ার রাখো।”
তার প্রতিটা কথা—স্পষ্ট, হিসেবি। আনারুল বলল
—“সব ঠিক আছে কিরিস।”
কিরিস একবার চারপাশে তাকাল,
—“আরো ভালো করা যায়।”
কারণ এটা শুধু অনুষ্ঠান না… তার ছোট ভাইয়ের বিয়ে।
কোনো কমতি সে রাখতে রাজি না।
এইদিকে লিসিকে সব কাজ বুঝিয়ে দিয়ে সুপ্রিয়া হেসে বললেন —“এবার যাও, রেডি হয়ে নাও।”
লিসি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার সময় মেয়েরা একে একে গুছিয়ে নামতে থাকে। লিসি এখন গুছাতে যেতে দেখে আরোবি মাথায় হাত দিয়ে বলে —“ হায় আল্লাহ তুই এখনো কিছু করিস নি ”
সুরভী —“ আরে বড় আম্মুরা মিলে ওকে কি বলছিলো তাই মনে হয় ”
নুসরাত —“ লিসি দ্রুত গুছিয়ে আসো আমরা নিচে আছি। ”
জারা মুখে বিরক্তি নিয়ে বলে —“ দুর বাল এই শাড়ি আমি সামলাতে পারছি না ”
তখন পিছন থেকে হিয়া ওকে ধরে বলে —“ আমি আছি তে আর নাহলে ইশান ভাইয়া ”
এই কথায় সবাই হেসে উঠে জারা মুখ বাঁকিয়ে বলে —“ ওর কথা বলবি না, নিজেকে এখনো সামলাতে পারে নাহ, আবার আমার শাড়ি সামলে দেবে, ”
আরোবি এর মধ্যে হাত উঁচু করে বলে —“ আচ্ছা তোরা নিচে যা আমি লিসিকে নিয়ে আসছি ”
এই কথায় মেয়েরা নিচে নেমে গেলো আর লিসি আরোবি উপরে চলে গেলো। আরোবি কিরিসের ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে —“ জানিস লিসি কিরিস ভাইয়ার ঘরটা পাওয়ার স্বপ্ন কত মেয়ের কিন্তু এখন সেই ঘরের মালকিন তুই, ”
লিসি —“ আচ্ছা তাহলে এতো মেয়ে থাকতে আমি কেন ”
আরোবি হেসে বলে —“ কারণ তুমি আমার ভাইয়ের নজর কেড়েছো আবার দিলভি চুরালিয়া,আরে তুই বাইরে মেয়েদের কথা বাদ দে আমরা বোনেরাও ভাইয়ার ঘরটা পছন্দ করি। কি সুন্দর কি বড়! ”
কথা বলতে বলতে ওরা ঘরের ভিতরে চলে আসে আরোবি একটু ন্যাকামি করে বলে —“ তাহলে ঘরের মালকিন আমি একটু এখানে বসতে পারি ”
লিসি ও একটু হেসে বলে —“ হুম বসুন আমি ফ্রেশ হয়ে আসি ”
কথাটা বলে লিসি হালকা হেসে বাথরুমের দিকে চলে গেল। এইদিকে আরোবি খেয়াল করে বেডের উপর।
বেডের ওপর সুন্দর করে সাজানো একটা শাড়ি, সঙ্গে ম্যাচিং গহনা… সবকিছু এত নিখুঁতভাবে রাখা যে বুঝতে বাকি থাকে না—এটা কার কাজ। লিসি বাথরুম থেকে বের হয়ে আসতেই আরোবি এক নজর দেখেই ঠোঁট কামড়ে হেসে উঠলো—
“উফফ… লিসি! ভাইয়া তো দেখি পুরো ফুল সেট রেডি করে রেখে গেছে! তুমি শুধু এসে পরলেই হলো!”
লিসির গাল সাথে সাথেই লাল হয়ে গেল। সে একটু অপ্রস্তুত গলায় বললো — “কি যে বলিস না…”
আরোবি এগিয়ে গিয়ে শাড়িটা তুলে ধরে চোখ টিপে বললো— “আমি না থাকলে তোর লাইফটা কত বোরিং হতো ভাবতে পারিস? এমন রোমান্টিক ভাইয়া পেয়ে গেছিস—আর তুই এখনো ‘কি যে বলিস’ মোডে!”
লিসি এবার একটু হেসে ফেললো— “চুপ কর, বেশি জানিস! রোমান্টিক! ওনি যা রাগী। অবশ্য এখনে কিছু বলিনি ”
আরোবি হেসে বলে —” আরে তোকে বলবেও না ”
দুজনেই হেসে উঠে শাড়ি-গহনাগুলো গুছাতে শুরু করলো। আরোবি মাঝেমাঝে ইচ্ছে করে গহনা এলোমেলো করে দিচ্ছে, আবার নিজেই ঠিক করছে—
“উফফ, এত গহনা! আমি হলে অর্ধেক পড়ে পালিয়ে যেতাম!”
লিসি মজা করে বললো—
“তুই পড়লে গহনাগুলোই পালিয়ে যেত!”
এই কথায় আরোবি নাটকীয় মুখ করে বললো—
“ওহ হ্যালো! আমি কিন্তু কম সুন্দর না, বুঝলি!”
দুজনেই আবার হেসে উঠলো।
সব গুছানো হয়ে গেলে, লিসি শাড়িটা পরে নিলো সঙ্গে গহনাগুলোও, কানে বড় ঝুমকা তার সাথে টানা হাতে সুপ্রিয়ার দেওয়া সেই বালা দুটো গলায় ছোট্ট একটা নেকলেস,চুলগুলো খোলা কিন্তু সামনের চুলগুলো পিছনে নিয়ে সুন্দর করে একটা ছোট ক্লিপ মেরেছে। সব মিলিয়ে একদম পরিপূর্ণ।
লিসি হঠাৎ আলমারির ড্রয়ার খুলে একটা অপূর্ব নুপুর বের করলো। নরম ঝুনঝুন শব্দ যেন ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়লো। আরোবি একটু থেমে মুচকি হেসে বললো—
“এইটা… ভাইয়া নিজে দিয়েছিল, তাই না?”
লিসির চোখে মুহূর্তের জন্য এক অন্যরকম আলো ঝিলিক দিয়ে উঠলো। সে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
লিসি নুপুর পরে নিলো। হালকা করে শাড়িটা পায়ের কাছ থেকে উচু করে দেখলো, আর লিসি পায়ে নুপুর দেখে আরোবি হেসে বলে — “এখন পারফেক্ট… একদম ভাইয়ার কুইন।”
লিসি চুপচাপ তাকিয়ে রইলো, ঠোঁটের কোণে নরম হাসি।
সব শেষে দুজনেই নিজেদের ঠিকঠাক করে নিলো—শাড়ির ভাঁজ, চুল, গহনা… সবকিছু একদম পরিপাটি।
দরজার দিকে এগোতে এগোতে আরোবি হঠাৎ ফিসফিস করে বললো—
“লিসি… নিচে গেলে কিন্তু ভাইয়া তোকে দেখেই হার্টবিট মিস করবে!”
লিসি লজ্জা পেয়ে হালকা করে ধাক্কা দিল—
“চুপ! কেউ শুনে ফেলবে!”
আরোবি হেসে বললো—
“শুনলে ভালোই—সবাই জানুক আমাদের লিসি কত সুন্দর!”
দুজনের হাসির শব্দে ঘরটা আবার ভরে উঠলো…
তারপর ধীরে ধীরে তারা নিচে নামতে লাগলো—একসাথে, পরিপাটি, আর অদ্ভুত এক মিষ্টি উত্তেজনা নিয়ে…।
লিসি ঠিক সামনের দিকেই এগোতে যাচ্ছিল, এমন সময় হঠাৎ আরোবি তার হাতটা টেনে ধরে থামিয়ে দিল।
“এই এই… ওইদিকে না,” চোখ টিপে ফিসফিস করে বললো সে,
“পেছনের সিঁড়ি দিয়ে সরাসরি গার্ডেনে নামবো—চল।”
লিসি একটু অবাক হয়ে তাকালো—
“পিছনের আবার?… আচ্ছা, চলো তাহলে।”
দুজন ঘুরে গেল অন্যদিকে।
রায় চৌধুরীদের এই বাড়িটা আসলে শুধু একটা বাড়ি না—একটা রাজকীয় প্রাসাদ বললেই ঠিক হয়। সামনে নিচে যে বড় হলরুম, আর দ্বিতীয় তালার বারান্দার শেষ দিক থেকে লম্বা খোলা বারান্দা সোজা এগিয়ে গেছে। সেই বারান্দা পেরিয়ে তারা ঢুকলো এক বিস্তৃত করিডোরে—দুই পাশে উঁচু খোদাই করা দেওয়াল, দেয়ালে ঝুলছে পুরনো জমিদারি আমলের ছবি, আর ছাদের ঝাড়বাতির নরম আলো পুরো জায়গাটাকে এক অন্যরকম আভা দিচ্ছে।
পায়ের নুপুরের ঝুনঝুন শব্দ করিডোর জুড়ে মৃদু প্রতিধ্বনি তুলছে। আরোবি এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বললো—
“এই দিকটা কিন্তু খুব কম লোকই ইউজ করে… একদম শর্টকাট, বুঝলি!”
লিসি চারদিকে তাকাতে তাকাতে মুগ্ধ গলায় বললো—
“ বাড়িটা… সত্যি খুব সুন্দর।”
আরোবি গর্ব নিয়ে বলে —“ আমার বড় ভাই আর তোর বর কিরিস এই বাড়িটা বানিয়েছে, ডিজাইন ও কিন্তু ওরই মত মতো করা। ”
লিসি —“ হুম দম তো আছে বেডার ”
করিডোরটা শেষ হতেই তারা পৌঁছে গেল আরেকটা বারান্দায়—এটা পুরোপুরি পেছনের দিক। সামনে খোলা আকাশ, নিচে বিশাল গার্ডেনের আলো ভরা অনুষ্ঠান দৃশ্য। এই বারান্দা থেকেই সোজা নেমে গেছে এক প্রশস্ত সিঁড়ি—সাদা পাথরের তৈরি, দুপাশে কারুকাজ করা রেলিং, আর সিঁড়ির ধাপে ধাপে লাইটের আলো পড়ে যেন সোনালি আভা ছড়াচ্ছে। নিচে তাকালেই দেখা যাচ্ছে গার্ডেন—অনুষ্টানের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন।
আরোবি হাসতে হাসতে বললো—
“কেমন? শর্টকাটটা খারাপ না, তাই না?”
লিসি মুগ্ধ চোখে নিচের দিকে তাকিয়ে ধীরে বললো—
“না… একদম স্বপ্নের মতো লাগছে…”
নুপুরের মৃদু শব্দ আর হালকা বাতাসে ওদের শাড়ির আঁচল উড়তে উড়তে… দুজন একসাথে সেই সিঁড়ি দিয়ে নিচের গার্ডেনের দিকে নামতে শুরু করলো…।
সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছে লিসি আর আরোবি। নুপুরের ঝুনঝুন শব্দে যেন পুরো বাড়িটা এক মুহূর্তে চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
নিচে বসে থাকা মেয়েরা— হিয়া , জারা, সুরভী, নুসরাত —একসাথে তাকিয়ে হা হয়ে গেল।
সুরভী মুখ চেপে বলে উঠলো—
“ইসস… লিসি! তুই নাকি মানুষ? নাকি স্বর্গ থেকে নেমে আসছিস!”
হিয়া দৌড়ে এসে লিসির হাত ধরে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো— “এই শাড়িটা… এই গহনাগুলো… উফফ! কে সাজিয়েছে তোকে বল তো?”
আরোবি সাথে সাথেই ঢুকে পড়ে—
“কে আর! আমাদের মহান, ভয়ংকর, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সুপার রোমান্টিক ভাইয়া!”
এই কথা শুনে মেয়েরা একসাথে “ওওওও…” করে উঠলো। লিসি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো—
“তোরা না, একদম বাড়াবাড়ি করিস…”
জারা মুচকি হেসে বলে—
“বাড়াবাড়ি না, ফ্যাক্ট বলছি। আজকে তোকে দেখে যে কেউ প্রেমে পড়ে যাবে!”
ওদিকে ছেলেদের আড্ডায় তখন আলাদা নাটক চলছে।আরোবির কথা কানে যেতেই তারাও কিরিসকে একটু নাড়তে থাকে। কাবির কিরিসের পাশে বসে মুচকি হেসে বললো—
“ভাই… আমাদের কিছু শেখাবি? এই যে আগেই সব সেট করে রাখা—শাড়ি, গহনা… আমরা তো এসব চিন্তাই করতে পারি না!”
রিহান হেসে যোগ করলো—
“সত্যি ভাই, তুমি তো লেভেল আলাদা! আমরা এখনো ‘কি গিফট দিবো’ এইটা নিয়েই কনফিউজড থাকি!”
ইশান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—
“Boss, আপনি তো দেখি ডাবল লাইফ—একদিকে ভয়ংকর, আরেকদিকে পুরো লাভার বয়!”
সবাই হেসে উঠলো। কিরিস কিছুই বললো না।
সে শুধু মাথা একটু ঘুরিয়ে তাকালো… দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লিসির দিকে। এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের সব শব্দ যেন থেমে গেল। তার চোখ স্থির—গভীর, তীক্ষ্ণ… কিন্তু ভিতরে লুকানো এক অদ্ভুত নরম অনুভূতি। লিসির নুপুরের শব্দ, তার লাজুক মুখ, শাড়ির ভাঁজে ঢাকা কোমল সৌন্দর্য—সবকিছু সে নিঃশব্দে দেখছে। কাবির ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বললো— “ভাই… আমরা কিন্তু বুঝতেছি!”
রিহান মুচকি হেসে— “একদম চোখে লেখা আছে!”
কিরিস এবার ধীরে চোখ সরিয়ে নিলো… কিন্তু ঠোঁটের কোণে অতি সূক্ষ্ম একটা হাসি ফুটে উঠলো—যেটা কেউ দেখলো না। আর লিসি… সে নিচে নামতে নামতে একবার চুপচাপ তাকালো কিরিসের দিকে তার বুকটা আবার হালকা কেঁপে উঠলো…।
লিসি মেয়েদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছে সবাই তাকিয়ে আছে। আসলে একজনই তাকিয়ে আছে।
আর সেটাই তার সবথেকে বেশি টের পাচ্ছে। কিরিস তখন এলাকার কিছু লোকের সঙ্গে কথা বলছিলো, কথা বলা শেষ করে সে লিসির দিকে একবার তাকায় তারপর আবার সবার দিকে চারপাশের দিকে। সবটা দেখে
ধীরে ধীরে কিরিস এগিয়ে এল। ভিড় নিজে থেকেই সরে গেল তার হাঁটার মধ্যে এমন একটা উপস্থিতি, কেউ সামনে দাঁড়াতে সাহস পেল না। সে এসে একদম সামনে দাঁড়াল। কিছু বলল না কয়েক সেকেন্ড। শুধু তাকিয়ে রইল। কিরিস আসার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা লিসিকে ছেড়ে অন্য দিকে চলে গেছে। আরোবি যাওয়ার আগে তো ওকে অলদাবেষ্ট বলে গেছে। কিরিস তার দিকে একনজরে তাকিয়ে আছে। একটু পরে লিসি নিচু গলায় বলল
—“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
কিরিস খুব আস্তে বলল
—“কারণ তুমি আমাকে তাকাতে বাধ্য করছো।”
লিসির গাল লাল হয়ে উঠল।
—“সবাই দেখছে…”
—“দেখতে দাও।”
একই উত্তর। সব সময়ের মতো। কিরিস হাত বাড়িয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে লিসির আঁচলটা ঠিক করে দিল যেন এটা একদম স্বাভাবিক ব্যাপার। তার আঙুল ছুঁয়ে গেল লিসির কাঁধ লিসি কেঁপে উঠল হালকা। কিরিস নিচু গলায় বলল,
—“নুপুরটা পরেছো?”
লিসি অবাক হয়ে তাকাল,
—“আপনি খেয়াল করেছেন?”
—“আমি না খেয়াল করলে কে করবে?”
লিসি চুপ। ঠিক তখনই মিউজিক একটু জোরে বেজে উঠল। স্টেজে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার ঘোষণা। সবাই ধীরে ধীরে বসতে লাগল। রিহান চিৎকার করে বলল
—“সবাই আসো! শুরু হয়ে গেছে!”
কিরিস লিসির দিকে তাকিয়ে বলল,
—“চলো।”
লিসি হালকা মাথা নাড়ল। কিরিস তার হাত ধরল— দৃঢ়, নিজের মতো করে। আর দুজন একসাথে গার্ডেনের ভিড়ের মাঝে এগিয়ে গেল।
গার্ডেনের একপাশে চেয়ার টেবিল সাজানো—সেখানে পাড়ার কয়েকজন আন্টি, ফুফু, প্রতিবেশীরা একসাথে বসে গল্প করছিলেন। আলো-আঁধারির মাঝে হঠাৎই তাদের চোখ গিয়ে আটকে গেল লিসির ওপর।
—“এই মেয়েটা কে?”
—“উফফ… কী সুন্দর!”
—“হাতের চুড়িটা দেখেছো? এটা না তোর চুড়ি সুপ্রিয়া। এটা কি তোর বাড়ির বউ নাকি !”
একজন আরেকজনকে ঠেলে দেখাচ্ছে তাদের কৌতূহল একদম চেপে রাখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর তারা একসাথে উঠে গিয়ে সুপ্রিয়া আর প্রিয়াকে ঘিরে ধরল।
—“শুনছো, এই মেয়েটা কে?”
—“আগে তো দেখিনি!”
—“ রিহানের বিয়েতে তো দেখেছিলাম মনে হয়… কিন্তু তখন তো কিছু বলোনি!”
প্রশ্নের পর প্রশ্ন—একদম ঝড়। সুপ্রিয়া প্রথমে হালকা হেসে সব শুনলেন তারপর গলায় মিশে গেল একরাশ গর্ব আর আনন্দ —“আরেহ… আমার বড় বৌমা।”
সবাই একসাথে,
—“কি?!”
সুপ্রিয়া এবার একটু গর্ব করে বললেন,
—“কিরিস বিয়ে করেছে। ও কিরিসের বউ।”
এক মুহূর্তে চারপাশে চুপ তারপর একসাথে বিস্ময়ের শব্দ—“কখন?!”
—“আমাদের কিছুই বললি না!”
—“চুপচাপ বিয়ে করে ফেলল!”
প্রিয়া হেসে বলল —“হ্যাঁ, একটু হুট করেই হয়েছে সব…”
সুপ্রিয়া এবার একটু আবেগ নিয়ে বললেন,
—“আরেহ, বিয়ে করেছে—এটাই তো আমাদের জন্য অনেক। আমি তো ভাবছিলাম, বৌমার মুখ না দেখেই হয়তো… কিন্তু আল্লাহর রহমতে, ছোট ছেলের বিয়ের আগেই বড় ছেলেটা বিয়ে করল… বৌমার মুখটা তো দেখতে পারলাম।”
তার চোখে স্পষ্ট তৃপ্তি। চারপাশে থাকা সবাই এবার আবার লিসির দিকে তাকাল—
—“সত্যি বলতে কি, একদম পছন্দ মতো বউ এনেছে!”
—“মেয়েটার রূপটা দেখেছো? একদম লক্ষ্মী!”
—“চোখ সরানো যায় না!”
—“কিরিসের সাথে একদম মানিয়েছে!”
আরেকজন হেসে বলল,
—“এই রকম বউ হলে তো লুকিয়ে রাখতেই হয়!”
সবাই হেসে উঠল। দূরে দাঁড়িয়ে লিসি সবকিছু ঠিক শুনতে পাচ্ছে না কিন্তু বুঝতে পারছে—সবাই তাকিয়ে আছে, কথা বলছে তাকে নিয়েই। তার গাল হালকা লাল হয়ে উঠল। আর একটু দূরে— কিরিস দাঁড়িয়ে, চুপচাপ সব দেখছে। তার চোখে সেই চেনা তৃপ্তি… যেন মনে মনে বলছে— “দেখো… আমার পছন্দ।”
গার্ডেনে অনুষ্ঠান এখন পুরো জমে উঠেছে। মিউজিক, আলো, মানুষের হাসি—সব মিলিয়ে একদম প্রাণবন্ত পরিবেশ। স্টেজে ছোটখাটো প্রোগ্রাম চলছে—কেউ গান গাইছে, কেউ মজা করছে। চারপাশে অতিথিরা বসে গল্প করছে। লিসি মেয়েদের সাথে বসে আছে, কিন্তু বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছে একদিকে কিরিস। সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে কয়েকজন বড়দের সাথে কথা বলছে, মাঝে মাঝে স্টাফদের কিছু নির্দেশ দিচ্ছে। তার উপস্থিতি এমন যেখানেই দাঁড়ায়, সেখানটাই যেন কেন্দ্র হয়ে যায়।
ঠিক তখনই কাবির মাইক হাতে নিয়ে স্টেজে উঠে পড়ল।
—“Attention সবাই!”
সবাই একসাথে তাকাল। রিহান হাসতে হাসতে বলল,
—“আজকে যেহেতু আমাদের ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান… আর সবাই এত সুন্দর করে রেডি হয়ে এসেছে… একটা ছোট্ট গেম না হলে চলে?”
ইশান পেছন থেকে চিৎকার করল,
—“হ্যাঁ! গেম চাই!”
সবাই তালি দিল। কাবির চোখ ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাল,
তারপর হঠাৎ বলল —“প্রথমে আমরা ডাকবো… আমাদের নতুন ভাবিকে!”
লিসি কিছু বুঝে উঠতে পারছেনা কারণ তার পাশে আবার নুসরাত ও দাঁড়িয়ে আছে সেও তো এই বাড়ির বউ। কিন্তু ইশান আর রিহান স্টেজ থেকে নেমে ওদের দিকে এগোতে থাকে সবার নজর এখন ওদের উপর। গার্ডেনের বিশাল সবুজ প্রান্তরটা আজ উৎসবের আলোয় আলোকময়। মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে একটি উঁচু মঞ্চ—চারদিকে ফুলের বর্ণিল সাজ, উপর থেকে ঝুলছে আলোর মালা, আর চারপাশে পরিবারের সকল সদস্যদের কোলাহল। এই সময় হঠাৎ ইশান আর রিহান একসাথে এগিয়ে এলো।
“এই যে লিসি, একটু এদিকে আয় তো…” —রিহান হেসে বললো।
লিসি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওরা দু’জন মিলে তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে তাকে আলতো করে মঞ্চের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। লিসি অবাক, লজ্জিত—বারবার বলছে—
“এই… কোথায় নিচ্ছো? আমি যাবো না…”
ইশান হেসে উঠলো—
“আজকে তোকে না নিয়ে গেলে আমাদের মান-সম্মান সব শেষ!”
মঞ্চে উঠতেই চারপাশে হালকা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো। সবার দৃষ্টি একত্রে এসে থামলো লিসির উপর।
রিহান সামনে এগিয়ে এসে মাইক্রোফোনটা হাতে তুলে নিল। তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য, তবুও ভেতরে লুকানো আনন্দ স্পষ্ট—
“সম্মানিত উপস্থিত সকল আত্মীয়-স্বজন, প্রিয়জন এবং আমাদের এই প্রাসাদসম গৃহের আপনজনেরা… আজকের এই আনন্দময় আসরে আমরা এক বিশেষ ব্যক্তিত্বকে আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করিতে চলিয়াছি।”
একটু থেমে, চোখ ঘুরিয়ে লিসির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো সে।
“ইনি—আমাদের গৃহের নবাগত বড় বৌমা…
জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরীর সহধর্মিণী—লিসি।”
এক মুহূর্তে চারপাশে করতালির ধ্বনি, উল্লাস, মৃদু হাসির ঢেউ বয়ে গেল। লিসির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো—লজ্জা, সংকোচ, আবার এক অদ্ভুত অপরিচিত আনন্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তার চোখেমুখে।
ইশান এবার হালকা মজা করে বললো—
“শুধু পরিচয় দিলেই তো হবে না! আমাদের পরিবারের নিয়ম আছে—নতুন সদস্যকে একটু ‘পরীক্ষা’ দিতে হয়!”
চারপাশে হাসির রোল উঠলো।
একটি ছোট বাটি নিয়ে আসা হলো—তার ভেতরে ভাঁজ করা কিছু চিরকুট। রিহান বললো—
“এই খেলাটার নাম—‘পরিচয়ের প্রমাণ’। এখানে কিছু প্রশ্ন লেখা আছে… এবং সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে আমাদের নতুন ভাবিকে।”
লিসি একটু অপ্রস্তুত হয়ে তাকালো—
“আমি… যদি না পারি?”
ইশান সাথে সাথেই বলে উঠলো—
“তা হলে শাস্তি আছে! কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি—তুমি পারবেই।”
হালকা কাঁপা হাতে লিসি একটি চিরকুট তুলে নিল।
খুলে পড়তেই তার চোখে পড়ে—
“তোমার স্বামীর প্রিয় খাদ্য কী?”
এক মুহূর্তের জন্য সে থমকে গেল। চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সকলের দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ।
লিসি ধীরে মাথা তুলে তাকালো… দূরে, ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে কিরিস। নীরব, স্থির, তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একদৃষ্টে লিসির উপর নিবদ্ধ। সেই দৃষ্টিতে কোনো তাড়া নেই, কোনো কথা নেই—কিন্তু আছে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা… যেন সে জানে, লিসি উত্তরটি দেবে। লিসি ধীরে বললো—
“…তার প্রিয় খাবার—মাটন রেজালা।”
এক মুহূর্তের নীরবতার পর চারপাশে করতালির শব্দ ছড়িয়ে পড়লো। রিহান বিস্মিত হয়ে বললো—
“ওয়াও! একদম সঠিক!”
এরপর আরেকটি চিরকুট— “তার অপছন্দের বিষয় কী?”
লিসি এবার একটু থেমে, কিরিসের চোখের দিকে তাকিয়ে, খুব ধীরে বললো—
“মিথ্যা… আর অবাধ্যতা।”
এই উত্তরে যেন মুহূর্তের জন্য পরিবেশ বদলে গেল। কেউ কেউ অবাক, কেউ মুচকি হাসছে। কিরিসের চোখে ক্ষীণ এক ঝিলিক খেলে গেল—গর্ব? নাকি স্বীকৃতি? বোঝা গেল না। একটার পর একটা প্রশ্ন— তার পছন্দের রং, তার অভ্যাস, তার রাগের কারণ… লিসি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিলো—কখনো একটু থেমে, কখনো নিঃশব্দে কিরিসের দিকে তাকিয়ে… কিন্তু প্রতিটি উত্তরই নিখুঁত।
চারপাশে বিস্ময় আর প্রশংসার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো।
ইশান মাইক্রোফোন তুলে বললো—
“দেখে মনে হচ্ছে—এই সম্পর্ক শুধু নামেই নয়… অন্তর থেকেও গড়ে উঠছে।”
সবাই আবার করতালিতে মেতে উঠলো।
আর কিরিস… সে এখনো একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে—নীরব, অচঞ্চল। কিন্তু তার চোখে এক গভীর, অদৃশ্য অনুভূতির তরঙ্গ স্পষ্ট যেন এই মুহূর্তে, সকলের অগোচরে, সে নিজের সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছে এই মেয়েটিই তার… শুধুই তার…।
মঞ্চ হতে অবতরণ করিবার সময় লিসির পদক্ষেপে যেন এক অদৃশ্য কম্পন দোলা দিতেছিল। বহিরঙ্গে সে শান্ত, সংযত—কিন্তু অন্তরালে অনুভূতির ঘূর্ণিঝড়। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামিতে নামিতে মনে মনে সে বিড়বিড় করিল—
“রাক্ষসের বাচ্চা একটা… একটুও কিছু বললো না! এমন গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো যেন কিছুই যায় আসে না! উফফ… রাগী গন্ডার কোথাকার!”
তবুও, এই অভিযোগের অন্তরালে লুকায়িত ছিল এক অদ্ভুত প্রত্যাশা—হয়তো সে কিছু বলবে, একটুখানি ইঙ্গিত দিবে… কিন্তু কিরিস তার স্বভাবসিদ্ধ নীরবতায় অটল রইল। এই সময় পুনরায় সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া ইশান মঞ্চে উপস্থিত হইল। তার কণ্ঠে ছিল সুশৃঙ্খল দৃঢ়তা— “প্রিয়জনেরা, আজকের এই সন্ধ্যা আমরা অতিরিক্ত আড়ম্বরের মধ্যে নিবিষ্ট করিব না। নৃত্য, সঙ্গীত এবং সকল বিনোদনের আসর অনুষ্ঠিত হবে আগামীকালের মেহেদি অনুষ্ঠানে।”

0 Comments