তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :69

কিরিস এক পা এগিয়ে এসে বলল,
—“তোমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি।”
—“ভাইয়া.....—”
—“আমি যা দেই… সেটা তুমি নাও।”
লিসি আর কিছু বলতে পারল না। ম্যানেজার মুগ্ধ হয়ে সব দেখছে,
—“স্যার, সত্যিই… ম্যাডামের ওপর অসাধারণ লাগছে।”
কিরিস ঠান্ডা গলায় —“প্যাক করবেন না।”
সবাই অবাক।
—“ম্যাডাম এটা পরেই যাবেন।”
কিরিস —“ হুম ওর গলায় থাক ”
লিসির চোখ বড় হয়ে গেল —“কি?!”
কিরিস হালকা হাসল —“এখন থেকেই অভ্যাস করো। আর ম্যানেজার আমার মা যে গহনাগুলো পালিশের জন্য দিয়েচিলো ওইগুলোও প্যাক করে দেন। ”
ম্যানেজার মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো, এরমধ্যে লিসি কিছু বলার আগেই কিরিস আবার তার হাতটা ধরল। দৃঢ়, নিজের মতো করে। আর সেই ঝলমলে শোরুমে সোনার আলোয় মোড়া, দুজনের সেই দৃশ্যটা যেন একদম রাজকীয়… একদম তাদের মতোই জুয়েলারি শপের ভেতরে তখন শেষের কাজগুলো চলছে। ম্যানেজার একে একে পালিশ করা গহনাগুলো বের করে আনছে—সোনার সেই মুকুট, দুইটা বালা, নেকলেস সেট… আরো টুকিটাকি বেশ গহনা। প্রতিটা যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে।
ম্যানেজার ভদ্রভাবে বলল,
—“স্যার, এগুলো সব রেডি। যেমন বলেছিলেন ঠিক তেমনই পালিশ করা হয়েছে।”
কিরিস হালকা মাথা নেড়ে ইশারা করতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মার্ক এগিয়ে এল। তার সঙ্গে আরও দু’জন বডিগার্ড—স্মার্ট, চুপচাপ, কিন্তু একদম প্রফেশনাল। মার্ক ব্যাগগুলো একে একে হাতে নিয়ে চেক করতে করতে বলল —“সব ঠিক আছে, বস।”
কিরিস শুধু একবার তাকাল—একদম হিসেবি দৃষ্টি।
তারপর আবার পুরো মনোযোগ লিসির দিকে।
লিসি তখনও গলায় গহনা পরে বসে আছে, একটু অস্বস্তি, একটু লজ্জা—
—“এখন তো নামতে দিবেন, তাই না?”
কিরিস কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি ঝুঁকে আবার তাকে কোলে তুলে নিল।
—“এই না! না—না, নামান!”
লিসি হাত-পা ছুঁড়তে লাগল,
—“সবাই দেখছে!”
—“দেখতে দাও।”
—“আমি হাঁটতে পারবো—”
—“জানি। তবুও না।”
একদম ঠান্ডা, ফাইনাল টোন। মার্ক আর বডিগার্ডরা ব্যাগ নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল আর কিরিস লিসিকে কোলে নিয়েই ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগল। নিচের শোরুমে ঢুকতেই সবাই একসাথে তাকাল। কাবির প্রথমেই হেসে উঠল —“ওহহো! আবার কোলে! ভাবি তো আজ VIP ট্রীটমেন্ট পাচ্ছে!”
রিহান হাত গুটিয়ে —“আমরা ভুল করেছিলাম ভাই, আমাদেরও একটু পা মুচকানো উচিত ছিল।”
সবাই হেসে উঠল। লিসি মুখ লাল করে বলল,
—“চুপ করবে তোমরা !”
ইয়াবি চোখ টিপে —“ভাবি, কষ্ট করছেন কেন? ভাই তো সার্ভিস দিতে প্রস্তুত।”
কিরিস নির্বিকার,
—“ কথা শেষ?”
কাবির হাত তুলে —“না না, আমরা চুপ!”
শেষে কিরিস লিসিকে আস্তে করে নামিয়ে দিল। এইবার মেয়েরা ঘিরে ধরল লিসিকে। তিশা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,
—“এই নেকলেসটা … উফফ! একদম রানি লাগছিল তোরে!”
লিসি —“ তোমার জন্য ও আছে বিয়ের দিন পরে 'উফ' করো "
লিসির কথা মেয়েরা একটু হেসে উঠলো, তিশাকে নিয়ে হালকা খুনসুটি হচ্ছে তখন লিজা লিসিকে বলল
—“ ব্লাউজগুলো আমরা ট্রায়াল দিয়ে ফেলেছি। দারুণ হয়েছে!”
আরোবি এসে হাত ধরে টেনে বলল —“তুই যাস, ট্রায়াল রুমে গিয়ে পরে দেখিস। তোরটা সবচেয়ে সুন্দর লাগবে, গ্যারান্টি!, আমাদের সবার ট্রায়াল দেওয়া শেষ তুই বাকি আছিস, যা ”
লিসি হেসে বলল —“এই তো যাচ্ছি…”
মেয়েদের মাঝে দাঁড়িয়ে ওদের সাথে গল্পে মেতে উঠল—হাসি, খুনসুটি, তুলনা কে কারটা ভালো..... ওদিকে একটু দূরে কিরিস ছেলেদের সাথে দাঁড়িয়ে, কিন্তু চোখ বারবার চলে যাচ্ছে লিসির দিকে। কাবির খেয়াল করে মুচকি হেসে বলল,
—“ভাই, আমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু তোমার মন তো অন্য জায়গায়।”
কিরিস শান্ত —“চুপ করে দাঁড়া। ”
লিসি অবশেষে একটা ব্লাউজ হাতে নিয়ে ট্রায়াল রুমের দিকে হাঁটা দিল।
—“আমি গিয়ে দেখি…”
ঠিক তখনই হঠাৎ পিছন থেকে আবার সেই পরিচিত শক্ত হাত। এক ঝটকায় কিরিস তাকে কোলে তুলে নিল।
—“আবার?!”
লিসি প্রায় চিৎকার করে উঠল,
—“আপনি থামবেন না?!”
চারপাশে আবার হাসির রোল পড়ে গেল।
রিহান —“এইবার তো রেকর্ড হয়ে যাবে!”
ইয়াবি —“ভাবি, এখন আর নামার উপায় নাই।”
লিসি রাগে, লজ্জায় কিরিসের কাঁধে হালকা চাপড় মারল—“আমাকে নামান!”
কিরিস একদম সিরিয়াস —“না।”
—“আমি নিজে যেতে পারবো!”
—“জানি।”
—“তাহলে—”
—“চুপ।”
একদম ফাইনাল।
সবাই হাসতে হাসতে দেখছে আর কিরিস সোজা ট্রায়াল রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর ধীরে করে লিসিকে নামিয়ে দিল। লিসি দাঁত চেপে বলল,
—“আপনার সাথে পরে কথা আছে!”
কিরিস ঠান্ডা গলায়,
—“আমি আছি।”
লিসি চোখ পাকিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। বাইরে কিরিস ট্রায়াল রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। হাত পকেটে, চোখ সোজা দরজার দিকে। কাবির দূর থেকে বলল,
—“ভাই, গার্ড ডিউটি নাকি?”
রিহান যোগ করল,
—“কেউ যেন ব্লাউজ চুরি না করে!”
সবাই আবার হেসে উঠল। কিরিস শুধু একবার তাকাল—
সবাই চুপ। তারপর আবার দরজার দিকে চোখ। ভেতরে লিসি কাপড় বদলাচ্ছে আর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সে…
একদম নিজের মতো করে একদম নিজের মানুষটাকে আগলে রেখে। ট্রায়াল রুমটা একপাশে বেশি লোকজনের আসা যাওয়া নেই। ট্রায়াল রুমের ভেতরটা নরম আলোয় ভরা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লিসি ব্লাউজটা পরে নিচ্ছে হালকা কাঁধ খোলা ডিজাইন, পেছনে ফিতেটা এখনও খোলা। সে একটু বিরক্ত গলায় নিজেই বলতে লাগল,
—“এই ফিতেগুলো কে এমন বানায়… বাঁধতেই পারছি না…”
ঠিক তখনই দরজাটা খুব আস্তে করে খুলে গেল।
লিসি চমকে ঘুরে দাঁড়াল —“কে?? —”
কথা শেষ করার আগেই থেমে গেল।
কিরিস। দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকেই লাগিয়ে দিল। লিসির চোখ বড় হয়ে গেল,
—“আপনি! এখানে কেন?!”
কিরিস কোনো উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। তার দৃষ্টি… একদম গভীর, একদম থেমে থাকা— যেন সামনে যা দেখছে, তা থেকে চোখ সরানো অসম্ভব। লিসি একটু পিছিয়ে গেল পাশে ফেলে রাখা শাড়ির আঁচল টা কোনো ভাবে বুকের উপর দিলো, একেবারে এলোমেলো অবস্থা আর তারপরে সামনে দাঁড়িয়ে আছে কিরিস। লিসি একটা শুকনো ঢোক গেলে বলে —“বের হন… কেউ দেখে ফেলবে—”
কিরিস নিচু গলায় বলল —“ঘুরে দাঁড়াও।”
—“কি?”
—“ফিতেটা বাঁধবো।”
লিসি এক সেকেন্ড থেমে রইল… তারপর কিছু না বলে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। কিরিস খুব কাছে এসে দাঁড়াল।
তার আঙুলগুলো ছুঁয়ে গেল লিসির পিঠ—নরম, উষ্ণ স্পর্শ। লিসি কেঁপে উঠল হালকা করে। কিরিস ধীরে ধীরে ফিতেটা বেঁধে দিচ্ছে কিন্তু তার দৃষ্টি আয়নায়, লিসির চোখের ওপর। দুজনের চোখ এক হয়ে আছে আয়নার ভেতর দিয়ে। ফিতেটা বেঁধে শেষ করেও সে সরল না।
লিসি আস্তে বলল —“হয়ে গেছে… এখন যান…”
কিরিস কোনো উত্তর দিল না। হঠাৎ করেই সে লিসির হাত ধরে ঘুরিয়ে নিজের দিকে নিয়ে এল। এক ঝটকায়—
তার ঠোঁট চেপে ধরল লিসির ঠোঁটে। লিসি পুরো অবাক, নিঃশ্বাস আটকে গেল— প্রথমে ধাক্কা দিতে গেল, কিন্তু কিরিসের গ্রিপ শক্ত। চুমুটাতে জোর ছিল, অধিকার ছিল… আর একটা অদ্ভুত গভীরতা—যেন নিজেকে আটকাতে পারছে না। কয়েক সেকেন্ড পর—
কিরিস ধীরে সরে এল। লিসির শ্বাস দ্রুত, চোখ কাঁপছে
—“আপনি… পাগল নাকি?!”
কিরিস তার কপালে হালকা ঠেকিয়ে, নিচু, ভারী গলায় বলল —“এইভাবে তোমাকে দেখলে… ঠিক থাকতে পারি না।”
লিসির গাল লাল হয়ে উঠল। কিরিস তার চিবুকটা আলতো করে তুলে চোখে চোখ রেখে বলল,
—“একটা ব্লাউজেই যদি এই অবস্থা হয়… পুরো সাজে তোমাকে দেখলে কী হবে, ভাবতে পারছো?”
তার চোখে একধরনের নেশা কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারায়নি, শুধু গভীর হয়ে গেছে। লিসি গলা শুকিয়ে ফিসফিস করল,
—“বের হন… প্লিজ…”
কে শোনে কার কথা কিরিস ঠাই হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লিসির পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। কেমন করে লিসির দিকে তাকিয়ে আছে এই বুঝি খেয়ে ফেলবে। ট্রায়াল রুমের ভেতরের বাতাসটা যেন হঠাৎই ভারী হয়ে উঠেছিল। লিসি এখনও পুরোটা সামলে উঠতে পারেনি আর কিরিস… যেন নিজেকে আটকে রাখতে পারছে না। একটু পরে কিরিস আবারও এগিয়ে এল। লিসি দ্রুত তার কন্ঠ নালির বাঁধা পেরিয়ে মুখ দিয়ে অস্পষ্ট বাক্য বলে উঠলো
—“ ভাইয়া… বের হন.......কেউ....—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আবার তার ঠোঁট চেপে ধরল।
এইবারটা আগের থেকেও গভীর, আরও অস্থির—
লিসি প্রথমে ধাক্কা দিতে গেল, কিন্তু কিরিসের হাত ওর কোমর জড়িয়ে ধরতেই থেমে গেল। চুমুগুলো একটার পর একটা— একটু তাড়াহুড়া, একটু পাগলামি… যেন সময় কম, কিন্তু অনুভূতি বেশি। লিসির শাড়ির ভাজের মধ্যে দিয়ে নরম কোমড়ে হাত রাখলো কিরিস, নিজের কাছে টেনে নিলো এতো কাছে যে লিসির বুকের স্পন্দন আর কিরিসের বুকের স্পন্দন এক হয়ে গেছে। কিরিসের মতো দূর্লভ পুরুষকে নিজের কাছ থেকে সরাতে অক্ষম লিসির মতো কোমল মেয়ে। শেষে লিসি আর কিছু বুঝতে না পেরে কিরিসের শার্ট খামচে ধরে। কিছুক্ষণ এইভাবে চলে। শেষে নিজেই হালকা জোর করে নিজেকে সরাল কিরিস। দুজনের শ্বাসই ভারী। লিসির ঠোঁট গোলাপি হয়ে উঠেছে, একটু ফুলে গেছে চোখে রাগ, লজ্জা, আর অদ্ভুত একটা ঝিলিক।
—“আপনি একদম অসভ্য! এখানে এসব—”
কিরিস হালকা হাঁপাতে হাঁপাতে মুচকি হাসল,
—“চুপ… বেশি বলো না। নাহলে আবার শুরু হয়ে যাবো।”
লিসি কিরিসের কথা একেবারে গাল হা করে বলে
—“ আহ্‌ আপনি অসভ্য... বেয়াদব বেডা লোক ”
কিরিস আর কিছু বলে না শুধু লিসির দিকে আরেক বার তাকায় তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু একবারে বের হওয়ার আগে একবার তাকাল সেই একই নেশাভরা দৃষ্টি। বাইরে বের হতেই কিরিস স্বাভাবিক হয়ে গেল যেন কিছুই হয়নি। হালকা করে নিজের ঠোঁটটা আঙুল দিয়ে মুছে নিল। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াবি সেটা দেখেই ভ্রু তুলে হাসল,
—“ভাই… মনে হয় কাজ সেরে আসছিস?”
কাবির হেসে —“এইজন্যই তো এতক্ষণ দরজার সামনে পাহারা!”
ইশান — “ আমি জীবনেও ভাবিনি কিরিসের মতো গ্যাংস্টার এতো রোমান্টিক ”
রিহান ইশানকে শান্তনা দিয়ে বলে —“ তুই এই কথা আমার বোন সুরভীকে বললে ও বিশ্বাস করে নিবে কারণ she is novel reader ”
ছেলেরা একসাথে হো হো করে হেসে উঠল।
কিরিস একবার তাকাল সবাই একটু চুপ, কিন্তু মুখে চাপা হাসি রয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ট্রায়াল রুমের দরজা খুলে লিসি বের হলো। মুখটা একটু লাল, ঠোঁট এখনো গোলাপি আভা নিয়ে আছে। সোজা কিরিসের দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল —“আপনার সাথে পরে হিসাব আছে…”
কিরিস ঠান্ডা —“অপেক্ষায় থাকবো।”
লিসি চোখ পাকিয়ে অন্যদিকে তাকাল। তারপর মেয়েদের দিকে ঘুরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল
—“ফিট হয়েছে… ভালোই।”
আরোবি দৌড়ে এসে বলল —“আমি বলেছিলাম না! তোরটাই সবচেয়ে সুন্দর লাগবে!”
লিজা হাসতে হাসতে —“কিন্তু তোর মুখটা এমন লাল কেন হ্যা?”
লিসি এক সেকেন্ড থেমে গেল —“গরম লাগছে…”
পেছনে দাঁড়িয়ে ইয়াবি ফিসফিস করে বলল —“হুম… গরম তো লাগবেই ”
কিরিস হালকা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল চোখে সেই চেনা সতর্ক দৃষ্টি। ইয়াবি সঙ্গে সঙ্গে চুপ। আর লিসি? রাগে মুখ ফুলিয়ে আছে… কিন্তু মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই ঠোঁট ছুঁয়ে দেখছে। এই ভাবে একে একে সব কেনাকাটা করতে থাকে সবাই। সবাইয়ের কেনাকাটা শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে এসেছে। মার্ক আর বডিগার্ডরা একের পর এক শপিং ব্যাগ গাড়িতে তুলে দিচ্ছে—কাপড়, জুতা, গহনা… যেন পুরো একটা শপিং মলই কিনে ফেলা হয়েছে।
মার্ক এগিয়ে এসে বলল,
—“বস, সব লোড হয়ে গেছে।”
কিরিস মাথা নেড়ে ইশারা করল। কাবির হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বলল —“উফফ! আজকের শপিং শেষ! আমি তো ক্লান্ত!”
রিহান হেসে —“ক্লান্ত? তুই তো শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস!”
ইয়াবি যোগ করল,
—“আসল কাজ তো কিরিস আর লিসি করছে!”
এই কথা শুনে ছেলেরা একসাথে “ওহহো!” বলে উঠল।
লিসি সাথে সাথে চোখ রাঙিয়ে বলল,
—“চুপ করবেন তোমরা !”
তিশা ইয়াবি আর লিজা এর তিনজন একসাথে বের হয়ে যায়, তিশাকে তো কাবির যেতে দেবে না তারপর সব কাজিনরা ওকে আটকে তিশাকে পাঠিয়ে দিয়েছে,আগামী মঙ্গলবার ওর বিয়ে কিন্তু এখনই বউকে ছাড়া থাকতে পারছেনা এমন কথা বলে হাসা করছি দাঁড়িয়ে কাজিনরা। কিরিস একপাশে দাঁড়িয়ে, ঠান্ডা চোখে সব দেখছিল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
—“তোমরা সবাই এক গাড়িতে যাও।”
কাবির ভ্রু তুলে,
—“আর তুই?”
কিরিস দরজা খুলতে খুলতে বলল,
—“আমি আসছি।”
সবাই বুঝে ফেলল। ইশান হেসে ফিসফিস করল —“আলাদা সেটআপ চলছে।”
লিসি বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আমি ওদের সাথেই যাবো—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই কিরিস তার হাতটা ধরে টেনে নিজের গাড়ির দিকে নিয়ে গেল।
—“না। তুমি আমার সাথে।”
—“কেন? আমি—”
—“কারণ আমি বলছি।”
একদম ফাইনাল। লিসি আর কিছু বলতে পারল না, শুধু মুখ ফুলিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। বাকি কাজিনরাও গাড়িতে উঠে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। গাড়িগুলো ধীরে ধীরে মার্কেট থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে বিকেলের আলো—হালকা সোনালি রোদ, রাস্তার ভিড়, দোকানের সাইনবোর্ডগুলো একে একে পেছনে পড়ে যাচ্ছে।

ভেতরে—একটা অদ্ভুত শান্তি। কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। লিসি জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, মুখে হালকা রাগের ছাপ। কিরিস স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে একবার তার দিকে তাকাল,
—“রাগ করেছো?”
—“না।”
—“মিথ্যে।”
লিসি এবার ঘুরে তাকাল,
—“আপনি সব সময় এমন করেন কেন?”
—“কেমন?”
—“জোর করে সব নিজের মতো… আমাকে কিছু বলতে দেন না।”
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল —“কারণ আমি জানি… তুমি না বললেও, শেষ পর্যন্ত আমার কাছেই থাকবে।”
লিসি থেমে গেল।
—“আপনার এই আত্মবিশ্বাসটা একটু বেশি না?”
কিরিস হালকা হাসল —“তুমি কমাও, আমিও কমাবো।”
লিসি মুখ ঘুরিয়ে আবার জানালার বাইরে তাকাল,
—“অসম্ভব।”
গাড়ির ভেতর আবার একটু নীরবতা।।হঠাৎ কিরিস বলল —“পা কেমন?”
লিসি একটু অবাক হয়ে তাকাল,
—“ভালো… তেমন কিছু হয়নি।”
—“মিথ্যে বলো না।”
—“আচ্ছা… একটু ব্যথা করছে।”
কিরিস গাড়ি সাইডে থামাল। লিসি চমকে,
—“কি হলো?”
কিরিস কিছু না বলে তার পায়ের দিকে ঝুঁকল।
—“এই—কি করছেন?”
কিরিস খুব স্বাভাবিকভাবে তার পা নিজের হাতে নিয়ে হালকা চাপ দিয়ে দেখল,
—“এখানে?”
লিসি কেঁপে উঠল,
—“হুম…”
তার স্পর্শে অদ্ভুত একটা নরম অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
কিরিস আস্তে করে মালিশ করতে লাগল।
—“এভাবে দৌড়াবে না।”
লিসি নিচু গলায় বলল,
—“আপনি না থাকলে কে সামলাতো আমাকে?”
কিরিস থামল এক সেকেন্ড। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল —“আমি না থাকলে… তুমি এমন হতে না।”
লিসি চুপ। কথাটা যেন সরাসরি গিয়ে লাগল কোথাও।
কিছুক্ষণ পর কিরিস আবার গাড়ি স্টার্ট দিল।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে নামছে আকাশে কমলা রঙ ছড়িয়ে পড়ছে। গাড়ির ভেতরে দুজনের মাঝে আর আগের মতো ঝগড়া নেই। শুধু নরম একটা নীরবতা…যেখানে না বলেও অনেক কিছু বলা হয়ে যাচ্ছে।
গাড়িটা আবার ধীরে রাস্তায় উঠেছে—বিকেলের আলো তখন আরও নরম হয়ে এসেছে, জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছে। কিরিস হঠাৎ এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখেই অন্য হাতে লিসির পা আলতো করে নিজের দিকে টেনে নিল। লিসি চমকে উঠল,
—“এই! কি করছেন?”
কিরিস একদম স্বাভাবিকভাবে ওর পা নিজের কোলের ওপর তুলে রাখল,
—“শান্ত হয়ে বসো।”
—“আমি ঠিক আছি—”
—“জানি।”
তারপরও হাত ছাড়ল না। এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে, আরেক হাত দিয়ে খুব আস্তে আস্তে লিসির পায়ের ওপর আঙুল বুলাতে লাগল—হালকা চাপ, যেন ব্যথাটা কমে যায়। লিসি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে আসছে।
—“আপনি এভাবে ড্রাইভ করছেন… ঠিক না।”
কিরিস চোখ না সরিয়েই বলল,
—“আমি ঠিক আছি।”
—“না, আমি বলছি—”
—“চুপচাপ বসে থাকো। আর সামনে থেকে কুশনটা মাথার নিচে দাও যাতে গাড়ির ধাক্কায় জানলায় তোমার মাথায় না লাগে।
গলায় কোনো রাগ নেই, কিন্তু একদম শুনতেই হবে এমন টোন। লিসি একটু মুখ ফুলিয়ে জানালার দিকে কুশনটা রেখে তারপর মাথা দিয়ে বললো —“সব সময় এমন করেন…”
কিরিস হালকা হাসল —“তোমার সাথে না করলে কার সাথে করবো?”
লিসি এবার তাকাল তার দিকে। এক সেকেন্ড… দুজনের চোখে চোখ। তারপর লিসি নিচু গলায় বলল,
—“আপনি খুব বিরক্তিকর।”
—“জানি।”
—“আর জেদি।”
—“সেটাও জানি।”
—“তবুও বদলাবেন না?”
কিরিস এক ঝলক তাকাল —“তুমি বললে ভাববো।”
লিসি কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ বসে রইল। তার পা এখনও কিরিসের কোলের ওপর— আর কিরিস মাঝে মাঝে হালকা চাপ দিয়ে দিচ্ছে। বাইরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, আকাশে কমলা-গোলাপি রঙ মিশে গেছে।
গাড়ির ভেতরে নরম আলো, নরম স্পর্শ, আর দুজনের মাঝে এক অদ্ভুত নীরবতা… যেটা আর অস্বস্তিকর না—
বরং খুব কাছের। গাড়িটা এখন শহরের একটা শান্ত রাস্তা ধরে চলছে। জানালার বাইরে দোকানের আলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে—বিকেল ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় ঢুকে পড়ছে। লিসির পা এখনো কিরিসের কোলেই রাখা। কিরিস এক হাতে স্টিয়ারিং, আরেক হাতে হালকা করে পায়ের ব্যথাটা ম্যাসাজ করে দিচ্ছে। হঠাৎ কিরিস জিজ্ঞেস করল,
—“কিছু খাবে?”
লিসি একটু মাথা ঘুরিয়ে তাকাল,
—“এখন?”
—“হুম।”
লিসি ভ্রু তুলে বলল —“আপনি না বললে আমি কি খেতে পারি না নাকি?”
কিরিস হালকা হাসল,
—“পারো। কিন্তু বলো।”
লিসি একটু ভাব করে বলল —“আমি কিছুই খাব না।”
কিরিস চোখ সরাল না রাস্তা থেকে
—“মিথ্যে।”
—“সত্যি!”
—“তাহলে গত এক ঘণ্টা ধরে আমার দিকে তাকাচ্ছিলে কেন?”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল,
—“আমি আপনার দিকে তাকাইনি!”
কিরিস শান্ত গলায়,
—“ঠিক আছে। জানালা নিজের থেকেই আপনার দিকে তাকাচ্ছিল।”
লিসি চোখ বড় করে তাকাল,
—“আপনি আবার শুরু করেছেন!”
কিরিস এবার হালকা হাসল,
—“ঠিক আছে, খাবার না চাইলে আমি অর্ডার দেবো না।”
লিসি একটু উঠে বসে বললো —“ আমি আপনার দিকে তাকিয়ে আছি তার মানে খিদে পেয়েছে কি করে বুঝলেন,... দাঁড়ান আপনি আমাকে আপনাকে খেতে বলছেন না তো! ”
কিরিস মুচকি হেসে বলে —“ তাও ভালো হতো যদি তুমি আমাকে খেতে, কারণ আমারও মাঝে মাঝে তোমাকে খেতে ইচ্ছে করে। ”
লিসি একটু চোখ বড় করে তাকিয়ে বলে —“ আসলেই আপনি বেয়াদব ”
কিরিস —“ হুম শুধু তোমার জন্য, যানো অন্য কেউ আমার সাথে এমন করে কথা বলার সাহস তো দূর কল্পনায়ও ভাবে না, আর তুমি কতো সহজে কথা বলো মিসেস কিরিস আই মিন সুইটহার্ট ”
লিসি এক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব ছোট গলায় বলল —“কিন্তু… একটু ফুচকা হলে খেতে পারি।”
কিরিস ভ্রু তুলে —“ফুচকা?”
—“হ্যাঁ। সমস্যা?”
—“না।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে কিরিস আবার বলল,
—“আজ ফুচকা না।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে রাগ দেখিয়ে বলল,
—“কেন?! আপনি সবকিছুই না করবেন কেন?”
কিরিস শান্তভাবে বলল,
—“কারণ রাস্তার ফুচকা না।”
লিসি মুখ ফুলিয়ে বলল,
—“আপনি তো সবকিছুতেই ‘না’ বলেন।”
কিরিস এবার একবার তার দিকে তাকাল,
—“ঠিক আছে, ‘না’ বাদ দিলাম।”
লিসি একটু থমকে গেল,
—“মানে?”
—“আজকে তুমি যেটা খেতে চাও, সেটাই হবে।”
লিসি একটু অবাক, তারপর ধীরে ধীরে হাসি চলে এলো,
—“সত্যি?”
কিরিস হালকা মাথা নাড়ল,
—“কিন্তু এক শর্ত।”
—“কি?”
—“খেতে গিয়ে আবার দৌড়াবে না।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আমি দৌড়াই না!”
কিরিস শান্ত গলায়,
—“গতকালও বলেছিলে।”
লিসি মুখ বাঁকাল —“আপনি সবকিছু মনে রাখেন কেন?”
—“কারণ তুমি ভুলে যাও।”
এই কথা শুনে লিসি হালকা হেসে ফেলল,
—“আপনি খুব বিরক্তিকর, জানেন?”
কিরিস এবার এবার সত্যি একটু হাসল,
—“তবুও আমার সাথেই বসে আছো।”
লিসি কিছু বলতে পারল না।
শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছোট্ট করে বলল,
—“হুম… সেটাই সমস্যা।”
কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসিটা লুকাতে পারল না।
গাড়িটা ধীরে ধীরে একটা পরিচিত ফুড স্ট্রিটের সামনে এসে থামল। সন্ধ্যার আলো পুরোপুরি নেমে এসেছে—চারপাশে লাইট, ভাজা খাবারের গন্ধ, আর মানুষের ভিড়। কিরিস নামল প্রথমে। তারপর দরজা খুলে লিসির দিকে তাকাল।
—“নামো।”
লিসি পা নামাতে গিয়েই থেমে গেল,
—“আমার পা এখন ঠিক আছে।”
কিরিস এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
—“তাহলে প্রমাণ দাও।”
লিসি ভ্রু কুঁচকে,
—“কি প্রমাণ?”
কিরিস কিছু না বলে শুধু দাঁড়িয়ে রইল।
লিসি বিরক্ত হয়ে নিজেই গাড়ি থেকে নামল, কিন্তু নামতেই একটু ভারসাম্য হারাল। কিরিস সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে ধরল,
—“এই।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে হাত ছাড়িয়ে নিল,
—“আমি পারি!”
কিরিস শান্ত গলায়,
—“হ্যাঁ, পারো। কিন্তু পড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত।”
লিসি মুখ বাঁকাল —“আপনি সবসময় আমাকে বাচ্চা ভাবেন।”
কিরিস খুব হালকা গলায় বলল,
—“না।”
—“তাহলে?”
—“আমার দায়িত্ব।”
এই কথায় লিসি একটু থেমে গেল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল —“চলেন, ফুচকা খাব।”
কিরিস একবার তাকাল —“এটাই তোমার ডিনার?”
—“হ্যাঁ।”
—“ঠিক আছে।”
ফুচকার দোকানের সামনে ভিড়। কাঁচের কাউন্টারের ওপাশে ঝাল-মিষ্টি, টক-ঝাল পানি—সব সাজানো।
লিসি উত্তেজনায় এগিয়ে গেল,
—“এক প্লেট দাও!”
কিরিস পেছনে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে আছে।
দোকানদার কিরিসকে দেখে একটু থতমত খেয়ে গেল, তারপর দ্রুত সার্ভ করতে শুরু করল। লিসি প্রথম ফুচকা মুখে দিতেই চোখ বড় করে ফেলল,
—“উফফ! এইটাই তো আসল!”
কিরিস ঠান্ডা গলায় বলল —“এটা খেয়েই তুমি এত খুশি?”
লিসি মুখ ভর্তি অবস্থায়,
—“হ্যাঁ!”
কিরিস হালকা মাথা নাড়ল,
—“অদ্ভুত।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আপনি সবকিছুকেই অদ্ভুত বলেন।”
কিরিস এক পা এগিয়ে এসে একটা ফুচকা তুলে নিল,
—“আমি ট্রাই করি।”
লিসি অবাক,
—“আপনি ফুচকা খাবেন?”
—“হুম, কেন খেতে পারি না।”
লিসি মুখে ফুচকা চিবাতে চিবাতে বলে —“ নাহ আপনি তো আবার খাওয়া দাওয়ার বিষয় একটু অন্য রকম তা।”
কিরিস চুপ করে দাড়িয়ে আছে তারপর শান্ত গলায় বলে —“ আরে আমি খাবো না তুমি খাও এই সব, আমি খেলে আমাকে হাসপাতালেও ভর্তি নেবে না। ”
লিসি মুখ বাঁকিয়ে বলে —“ হুম মনে হয় আমি আপনাকে বিষ খাওয়াচ্ছি! ”
কিরিস একটু বাঁকা হাসি দিয়ে বলে —“ তুমি বিষ খাওয়ালে খেতে পারি কোনো সমস্যা নেই ”
লিসি থমকে গেল। তারপর দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল,
—“বেশি কথা না… খেতে দিন আমাকে ।”
কিরিস হালকা হাসল —“চলো, শেষ করে আইসক্রিম কিনে দিবো ।”
লিসি চোখ বড় করে —“আইসক্রিমও?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনি আজকে খুব দানশীল হয়ে গেছেন কেন?”
কিরিস খুব শান্ত গলায় বলল,
—“আজ তুমি খুশি আছো।”
লিসি আর কিছু বলল না। শুধু ফুচকার প্লেটটা নিয়ে আবার খেতে লাগল আর কিরিস পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল, যেন ফুচকার থেকেও ওকে বেশি দেখছে।
ফুচকার দোকানের সামনে ভিড়টা একটু বেড়েই গেছে।
লিসি একের পর এক ফুচকা খাচ্ছে—চোখে সেই খুশির ঝিলিক। আর কিরিস? সে পাশে দাঁড়িয়ে আছে, একদম সোজা হয়ে—হাত পকেটে, চোখ শান্ত। দোকানদার আবার একটা ফুচকা বাড়িয়ে দিতে গেলে কিরিস মাথা নাড়িয়ে বলল —“না, আমি খাব না।”
লিসি মুখ তুলে বলল,
—“এই তো একটু খেলে কি হয় —”
—“ দেখছি এইটাই যথেষ্ট।”
লিসি চোখ ঘুরিয়ে বলল —“উফ, আপনার এসব ভাব!”
এদিকে আশেপাশের মেয়েরা বারবার তাকাচ্ছে।
—“ওই ছেলেটাকে দেখেছিস?”
—“উফফ… কী লুক!”
—“ওদের দুজনকে একসাথে কত সুন্দর লাগছে…”
ফিসফাস থামছেই না। লিসি একটু অস্বস্তি নিয়ে কিরিসের দিকে তাকাল,
—“সবাই তাকাচ্ছে…”
কিরিস নির্বিকার,
—“তাকাতে দাও।”
তার চোখে একটুও আগ্রহ নেই অন্য কারও দিকে শুধু লিসি।
লিসি মেয়েগুলোর দিকে কেমন করে তাকিয়ে আবার কিরিসের দিকে তাকিয়ে আছে —“ আমার দিকে তাকাচ্ছে না আপনার দিকে তাকাচ্ছে মেয়েরা ”
কিরিস —“ তাহলে কি করবো বউজান। আপনি কি জেলাস! ”
লিসি নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে —“ জেলাস আর আমি! অসম্ভব ”
কিরিস কিছু বলে না কিন্তু লিসিকে দেখে বোঝা যাচ্ছে ঠিক কি পরিমাণ যে জেলাস। একটু পরে লিসির ফুচকা খাওয়া শেষ হতেই কিরিস বলল,
—“চলো।”
—“কোথায়?”
—“আইসক্রিম।”
লিসির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল,
—“সত্যি?”
—“হুম।”
পাশের একটা ছোট কিন্তু সুন্দর আইসক্রিম পার্লারে ঢুকল তারা। কিরিস কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—“তুমি যেটা চাও, নাও।”
লিসি একটু ভাব করে মেনু দেখল, তারপর বলল,
—“চকলেট আর ভ্যানিলা মিক্সড।”
কিরিস মাথা নাড়িয়ে অর্ডার দিল। কিছুক্ষণ পর আইসক্রিমটা হাতে দিয়ে বলল,
—“এই নাও।”
লিসি নিয়ে হালকা হাসল,
—“ধন্যবাদ।”
কিরিস ভ্রু তুলল,
—“আজকে ধন্যবাদও বলছো?”
—“সব সময় বলি না, তাই না?”
—“না।”
লিসি এক চামচ খেয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,
—“উফফ… দারুণ!”
কিরিস তাকিয়ে রইল—
আইসক্রিমের দিকে না, লিসির দিকে।
—“এত ভালো?”
—“হ্যাঁ! আপনি খাবেন?”
—“না।”
—“আবার না!”
কিরিস হালকা হাসল,
—“তুমি খাও।”
লিসি মুখ বাঁকিয়ে আবার খেতে লাগল। সব শেষ করে তারা আবার গাড়িতে উঠল। রাত নেমে গেছে পুরোপুরি—রাস্তার লাইট, গাড়ির হেডলাইট, শহরের ব্যস্ততা।
গাড়ি ধীরে বাড়ির দিকে এগোতে লাগল। ভেতরে নরম নীরবতা। লিসি জানালার পাশে বসে, হাতে এখনও আইসক্রিমের শেষ অংশটা আর কিরিস মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে ওর দিকে।
—“আজকে দিনটা খারাপ ছিল না…”
লিসি আস্তে বলল। কিরিস স্টিয়ারিংয়ে চোখ রেখেই বলল —“খারাপ হওয়ার সুযোগ দিইনি।”
লিসি হালকা হেসে ফেলল। গাড়ি সামনে এগিয়ে চলল আর তাদের দিনটা ধীরে ধীরে শান্তিতে মিশে গেল।