তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :68

গাড়ি আবার রাস্তায় ছুটতে শুরু করে। লিসি এক হাতে আইসক্রিম, আরেক হাতে চিপস নিয়ে দিব্যি খাচ্ছে। মুখে আগের মতোই হাসি… যেন কিছুক্ষণ আগের অভিমান বলে কিছুই ছিল না। কিরিস একবার তাকিয়ে আবার রাস্তার দিকে মন দেয়
—“সবগুলো একাই খেয়ে ফেলবে নাকি?”
লিসি সাথে সাথে—
—“আপনি তো খেতে চাননি!”
কিরিস ভ্রু তোলে—
—“আমি কবে বললাম?”
লিসি আইসক্রিমটা নিজের দিকে টেনে নেয়—
—“এখন বললে আর পাবেন না।”
কিরিস হালকা হেসে বলে—
—“একটা দাও।”
লিসি একটু ভেবে, খুব ছোট্ট একটা কামড় দিয়ে বাকি অংশটা এগিয়ে দেয় —“এই নিন।”
কিরিস তাকিয়ে থাকে —“এইটুকু?”
লিসি গম্ভীর ভান করে —“ডায়েট কন্ট্রোল।”
কিরিস হাসি চাপতে না পেরে বলে
—“তুমি খাও, আমি থাক।”
লিসি মুচকি হেসে আবার খেতে শুরু করে।
ঠিক তখনই চিপস খেতে খেতে হঠাৎ “কড়কড়” শব্দে একটু বেশি জোরে কামড় দেয়, আর টুকরো উড়ে গিয়ে কিরিসের শার্টে পড়ে। এক সেকেন্ড নীরবতা… লিসি ধীরে ধীরে তাকায় কিরিসের দিকে। কিরিস নিচে নিজের শার্টের দিকে তাকায়… তারপর ধীরে মাথা তোলে।
লিসি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে—
—“আমি… ইচ্ছা করে করিনি!”
কিরিস গম্ভীর ভান করে—
—“গাড়িতে বসে খাবার খাওয়ার রুলস জানো না?”
লিসি তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে মুছতে যায়—
—“সরি সরি, আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি!”
কিরিস হঠাৎ তার হাতটা ধরে ফেলে।
—“থামো।”
লিসি থেমে যায়—
—“কি হলো?”
কিরিস এক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হালকা হেসে ফেলে—
—“এত টেনশন নিচ্ছো কেন? একটা চিপসই তো।”
লিসি হাঁফ ছেড়ে—
—“আপনি এমন করে বললেন… আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম!”
কিরিস মজা করে—
—“ভয় পাওয়াটা খারাপ না… আমার জন্য ভালো।”
লিসি চোখ ঘুরিয়ে—
—“ড্রামা কমান।”
ঠিক তখনই লিসির হাতে থাকা আইসক্রিম একটু গলে গিয়ে আঙুলে লেগে যায়।
—“উফ! এটা আবার…”
সে একটু অস্থির হয়ে পড়ে। কিরিস পাশ থেকে দেখে, হালকা করে তার হাতটা নিজের দিকে টেনে নেয়।
লিসি চমকে—
—“এই! কি করছেন?”
কিরিস একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার আঙুল থেকে গলে পড়া আইসক্রিমটা টিস্যু দিয়ে মুছে দেয়।
—“ঠিকমতো খেতে পারো না?”
লিসি একটু থমকে যায়… তারপর নিচু স্বরে—
—“পারতাম… আপনি ডিস্টার্ব করছেন বলে পারছি না।”
কিরিস মুচকি হাসে—
—“আমি কিছুই করিনি।”
লিসি ঠোঁট ফুলিয়ে —“আপনিই সব করেন।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ… তারপর হঠাৎ লিসি আবার চিপস খেতে খেতে বলে—
—“আরো আইসক্রিম কেন আনেননি?”
কিরিস অবাক —“চারটা কম হলো?”
লিসি সিরিয়াস ভান করে
—“হ্যাঁ। আমার তো প্ল্যান ছিল আরো খাওয়ার।”
কিরিস হেসে মাথা নাড়ে
—“তোমার জন্য আলাদা একটা ফ্রিজ লাগবে মনে হচ্ছে।”
লিসি গর্ব করে —“হুম, সেটাও আপনি এনে দিবেন।”
কিরিস চোখ সরু করে —“অর্ডার দিচ্ছো?”
লিসি হাসে —“হ্যাঁ, আমি তো আপনার… বউ।”
শেষ কথাটা বলেই নিজেই একটু চুপ হয়ে যায়। কিরিস এক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে… তারপর খুব নরম স্বরে বলে —“হুম… সেটাই।”
গাড়ির ভেতর আবার নীরবতা নেমে আসে কিন্তু এবার সেটা অস্বস্তির না… একটা অদ্ভুত মিষ্টি, আরামদায়ক নীরবতা। বাইরে রাস্তা এগিয়ে চলছে… আর ভেতরে
তাদের গল্পটাও ধীরে ধীরে, আরও গভীর হয়ে উঠছে।
লিসি খাচ্ছে কিরিস ড্রাইভ করতে করতে লিসির দিকে তাকাচ্ছে। কিরিস লিসির দিকে তাকিয়ে বলে —
“ জানালাটা পুরো খুলে দাও। তুমি তো খাচ্ছো তোমার আবার গা পাকালে আরেক জ্বালা, ”
লিসি জানালা পুরোটা খুলে কিরিসের দিকে ফিরে বলে —“ আমাকে নিয়ে আপনার জ্বালা হচ্ছে নাকি, গা পাকালে সত্যি বলছি আমার গায়ে করে দেবো ”
কিরিস হেসে বলে — “ করো, আমি বারণ করেছি কি! আর বউয়ের সব কিছুই আমার কাছে অমৃত ”
লিসি মুখ ঘুরিয়ে বলে —“ আপনার সাথে কথা বলা বৃথা ”
কিছুক্ষণ পরে.........
মার্কেটের বিশাল গেটের সামনে একে একে গাড়িগুলো এসে থামে। কাঁচের দেয়ালে আলো ঝলমল করছে, ভেতরের ব্যস্ততা বাইরে থেকেই বোঝা যায়।
ড্রাইভার দরজা খুলতেই সবাই একসাথে নামতে শুরু করে—
হাসি, কথা, উত্তেজনা—পুরো পরিবেশ যেন মুহূর্তেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। বাইরে তখন হালকা ভিড়—রঙিন ব্যানার, আলো, দোকানের কাঁচে ঝলমলে সাজ, মানুষের কোলাহল—সব মিলিয়ে জমজমাট পরিবেশ। জারা চারপাশে তাকিয়ে হাত ছড়িয়ে বলে
—“ওহহো! আজকে তো পুরো মার্কেট আমাদের!”
রিহান সাথে সাথে —“আজকে কেউ বাঁচবে না, সবাই প্রস্তুত থাকো!”
কাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে স্টাইল করে—
—“কার্ড কার কাছে?”
সবাই একসাথে কিরিসের দিকে তাকায়। কিরিস সানগ্লাস চোখে লাগিয়ে শান্ত গলায়—
—“যা লাগবে, নাও। কিন্তু লিমিট মাথায় রাখবে।”
ইশান হেসে—
—“লিমিট শব্দটা আজকে ডিকশনারি থেকে বাদ!”
সবাই হেসে ওঠে।
মার্কেটের বিশাল গেটের সামনে একে একে গাড়িগুলো এসে থামে। কাঁচের দেয়ালে আলো ঝলমল করছে, ভেতরের ব্যস্ততা বাইরে থেকেই বোঝা যায়।
ড্রাইভার দরজা খুলতেই সবাই একসাথে নামতে শুরু করে—
হাসি, কথা, উত্তেজনা—পুরো পরিবেশ যেন মুহূর্তেই জীবন্ত হয়ে ওঠে।
ঠিক তখনই—
গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটা চেনা মুখ চোখে পড়ে।
তিশা… লিজা… আর ইয়াবি। তিনজনই হাসিমুখে অপেক্ষা করছে। কাবির প্রথমেই দেখে চিৎকার করে উঠে
—“এইইই! ইয়াবি!.....তিশা তুমিও! ”
ইয়াবি হাত তুলে —“ওই শালা!”
দুজন ছুটে গিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে।
রিহান হেসে —“ওরে! পুরো গ্যাং এক হয়ে গেছে!”
ইশান মুচকি হেসে কিরিসের দিকে তাকায়
—“তুই ডেকেছিস, তাই না?”
কিরিস শান্তভাবে সানগ্লাস ঠিক করে
—“হুম। ভাবলাম তিশা এসে নিজের জিনিস পছন্দ করলে বেশি ভালো হয় ”
ইয়াবি এবার কিরিসের সামনে এসে দাঁড়ায়, চোখে দুষ্টু ঝিলিক —“তুই সেই শেষমেষ বিয়ে করে নিলি! বাহ bro… আমাদের না জানিয়ে! আমি শুনে খুশিতে আমার স্টুডেন্টের একদিন ছুটি দিয়েছিলাম ”
কিরিস ভ্রু তোলে —“সময় পাইনি।”
লিজা হেসে বলে —“সময় পাইনি না… ইচ্ছে ছিল না!”
সবাই হেসে ওঠে। তিশা সামনে এগিয়ে এসে লিসির দিকে তাকায়। একটু মুগ্ধ হয়ে—
—“ লিসি? শেষে আমার বড় জা হয়ে গেলি, কি বলবো এখন লিসি নাকি ভাবি ”
লিসি মিষ্টি হেসে মাথা নাড়ে —“জ্বি… তাই বলবেন আপনাদের বারণ করলেও শুনবে না ”
ইয়াবি সাথে সাথে —“ভাবি!”
লিসি একটু চমকে তাকায় —“কি?”
ইয়াবি হাসতে হাসতে—
—“ভাবি বলবো না? আমাদের বসের বউ!”
কাবির যোগ করে—
—“এইটা অফিশিয়াল টাইটেল!”
লিসি এবার নিজের মাথায় হাত দিয়ে বলে —“ ইয়াবি ভাইয়া, তোমাকে আমি বলে দিচ্ছে তুমি আমাকে আগের মতোই লিসি বলে ডাকবে ”
আরোবি লিসির কাঁধে হাত দিয়ে বলে —“ কাকে বলছিস, ওই গাধা তোকে আবার ভাবি বলে ডাকলো বলে”
ইয়াবি চোখ বড় করে বলে—“ এই আরোবি তোকে কিন্তু ধরে বেঁধে রাখবো, সবসময় বাজেকথা, ওর কথা শুনবি না ভাবি ”
আরোবি খিলখিল করে হেসে ইয়াবির বুকে হালকা চড় মেরে বলে —“ কে যেন কেবল বললো ভাবি বলবে না, আসলেই তুই গাধা ”
হিয়া—“ আরে যাকে ভাবি বলছিস সে কিন্তু লজ্জা পাচ্ছে”
সবাই আবার হেসে ওঠে।
লিসি লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকায়…আর কিরিস পাশ থেকে একবার তাকিয়ে হালকা মুচকি হাসে।
এরপর সবাই একসাথে ভেতরে ঢোকে। মার্কেটের ভেতরের আলো, গন্ধ, সাজ—সব মিলিয়ে যেন আলাদা একটা জগৎ। কিরিস সবাইকে নিয়ে সোজা একটা বড়, অভিজাত শোরুমে ঢুকে পড়ে। দোকানটা একদম আলাদা— ভিতরে সবকিছু ইম্পোর্টেড, সাজানো-গোছানো, নিখুঁত। সবাই ঢুকতেই ম্যানেজার এগিয়ে এসে মাথা নোয়ায়
—“স্যার, সব প্রস্তুত আছে।”
কিরিস হালকা মাথা নাড়ে —“দেখাও।”
এক এক করে র‍্যাক থেকে শাড়ি, পাঞ্জাবি, ড্রেস বের হতে থাকে। সবগুলোই আলাদা আলাদা কালার, ডিজাইন—
কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার সবই আগে থেকেই অর্ডার করা। ইশান অবাক হয়ে—
—“ওয়াও… সব আগে থেকেই রেডি?”
কাবির হেসে —“এইটাই কিরিস স্টাইল!”
রিহান —“আগে অর্ডার, পরে এন্ট্রি!”
লিসি চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখছে।
তার চোখে বিস্ময়… এত কিছু, এত সুন্দর করে সাজানো—সব যেন অবাস্তব লাগে। ঠিক তখনই— আরেকটা গাড়ি এসে থামে বাইরে। কিছুক্ষণ পর ভেতরে ঢুকে পড়ে মার্ক।
কিরিসের পাশে এসে দাঁড়িয়ে —“Everything set.”
কিরিস মাথা নাড়ে —“Good.”
মার্ক একবার চারপাশে তাকিয়ে —
—“ আপনি যা বলেছিলেন সবকিছু তৈরি আছে শুধু আপনাদের পছন্দ হলে হচ্ছে ”
এরপর ধীরে ধীরে সবাই নিজেদের মতো ভাগ হয়ে যায়।
ছেলেরা—কিরিস, ইশান, কাবির, রিহান, ইয়াবি, মার্ক—এক পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকে। ইশান একটা পাঞ্জাবি তুলে—
—“এইটা কেমন?”
রিহান —“বিয়ে বাড়ির হিরো লাগবে!”
ইয়াবি —“না, একটু ডার্ক কালার নে… বেশি স্মার্ট লাগবে।”
কিরিস শান্তভাবে —“This one suits you better.”
ওদিকে মেয়েরা একেবারে অন্য জগতে। শাড়ি একের পর এক খুলে দেখছে, তুলনা করছে, হাসছে। জারা একটা শাড়ি তুলে —“এইটা কার জন্য?”
সুরভী —“ জারা জন্য দাও!”
জারা হেসে —“আমার বিয়ে না এখন!”
লিজা মজা করে —“আগে থেকে প্রাকটিস কর!”
লিসি একটা লাল ভারী বিনারসি শাড়ি হাতে নিয়ে তিশার দিকে এগিয়ে দেয় —“এইটা তোমার উপর খুব সুন্দর লাগবে…”
তিশা শাড়িটা নিজের গায়ে ধরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়।
সবাই একসাথে —“ওহহহ!”
জারা—
—“এইটাই নে! ফাইনাল!”
লিসি মুচকি হেসে —“হ্যাঁ, একদম পারফেক্ট…”
পুরো দোকানটা ভরে যায় হাসি, গল্প, খুনসুটিতে।
কেউ সিরিয়াস না কিন্তু তবুও সবকিছু নিখুঁতভাবে এগোচ্ছে। আর এই সব কিছুর মাঝেও কিরিস দূর থেকে একবার তাকায়…
লিসির দিকে। সে মেয়েদের মাঝে দাঁড়িয়ে, শাড়ি হাতে, হাসছে… একদম নিজের মতো। কিরিসের চোখে আবার সেই অদ্ভুত শান্তি ফিরে আসে যেন এত কোলাহলের মাঝেও তার দুনিয়াটা ঠিক জায়গাতেই আছে।
মার্কেটের ভেতরটা যেন একদম আলোর ঝলকানি—চারদিকে ব্র্যান্ডের শোরুম, কাঁচের দেয়ালে প্রতিফলিত নিজেদের স্টাইলিশ অবয়ব। কিরিসদের পুরো গ্রুপ ঢুকতেই দোকানদাররা পর্যন্ত একটু থমকে তাকায় ওদের প্রেজেন্সটাই আলাদা। একটা বড় শোরুমে ঢুকে ছেলেরা সবাই আলাদা আলাদা র‍্যাকে গিয়ে জামা দেখতে শুরু করল। কাবির একটা ডার্ক ব্লু শার্ট তুলে ধরে বলল,
—“এইটা দেখ, ক্লাসি! একদম পারফেক্ট।”
রিহান সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে একটা অফ-হোয়াইট তুলে নিয়ে বলল —“ধুর! এইটা অনেক বেশি রিচ লাগছে। বিয়ের ফাংশনের জন্য এইটাই বেস্ট।”
সুরভী একটু দূর থেকে হেসে বলল,
—“তোমরা ছেলেরা কিছুই বোঝো না, শুধু রঙ দেখলেই হয়ে গেল নাকি!”
কাবির চোখ পাকিয়ে —“এই যে, আমরা কিন্তু রঙ ম্যাচ করে সেট বানাচ্ছি, বুঝলা? সবাই এক কালার থিমে যাবো।”
আরো কয়েকজন কাজিনও জড়িয়ে গেল তর্কে—
—“না ভাই, ডার্ক শেডই ভালো।”
—“না না, লাইট কালারেই এলিগেন্স আসে।”
—“এইটা দেখ, ফ্যাব্রিকটা কেমন! এইটা নিলে সবার থেকে আলাদা লাগবে।”
কথা কাটাকাটি এমন পর্যায়ে গেল যে দোকানদারও একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল—কাকে সাপোর্ট করবে বুঝতে পারছে না। ঠিক তখনই কিরিস একপাশে দাঁড়িয়ে, দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে, একদম শান্ত চোখে সব দেখছিল।
হালকা মাথা ঘুরিয়ে ইয়াবির দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল —“লিসিকে ডেকে আন।”
এক মুহূর্তে চারপাশ চুপ। কাবির ভ্রু কুঁচকে
—“লিসি? ওকে কেন?”
রিহান হালকা অবাক হয়ে,
—“আমরা নিজেরা ঠিক করতে পারি না নাকি?”
কিরিস শুধু একবার চোখ তুলল—সে চোখে এমন একটা অথরিটি ছিল, কেউ আর দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করার সাহস পেল না। ইয়াবি ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বলল,
—“আসছি, ভাবিকে নিয়ে আসি।”
কিছুক্ষণ পরেই লিসি ঢুকল—হালকা ক্লান্ত, কিন্তু মুখে সেই স্বাভাবিক সৌন্দর্য। চারপাশে এতগুলো ছেলের মাঝে একটু থমকে দাঁড়াল। ইয়াবি এগিয়ে এসে বলল,
—“ভাবি, একটা হেল্প লাগে… কোনটা ভালো বলবেন?”
লিসি একটু বিরক্ত মুখে বলল,
—“তোমরা এতজন আছো, নিজেরা ঠিক করো না?”
সে ঘুরে চলে যেতে নিল হঠাৎই পেছন থেকে কিরিস এগিয়ে এসে লিসির গলার পেছনে হালকা করে হাত রেখে তাকে নিজের দিকে টেনে আনল। নিচু, ভারী গলায় বলল —“আগে বলো।”
লিসি থমকে গেল। এক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল—“এই বেডাটা একদমই ঠিক না… সব সময় এমন করে!”
তারপর একটু রাগী চোখে কিরিসের দিকে তাকাল, কিন্তু সেই চোখে লুকানো মায়া স্পষ্ট —“ আগে আমার গলা ছাড়ুন ব্যথা পাচ্ছি ”
কিরিস ছেড়ে দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকলো। লিসি দুইটা শার্ট হাতে নিল একটা ডার্ক ব্লু, আরেকটা অফ-হোয়াইট।
আস্তে করে ফ্যাব্রিকটা ছুঁয়ে, খুব মন দিয়ে দেখতে লাগল। তারপর শান্ত, আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
—“এই ডার্ক ব্লুটার কাটিং ভালো, কিন্তু ফ্যাব্রিকটা একটু হার্ড… লাইটে তেমন ফ্লো করবে না।”
সবাই চুপ। সে অফ-হোয়াইটটার দিকে ইশারা করে বলল,
—“এইটা… এইটার ফ্যাব্রিক সফট, লাইটে পড়লে একটা ন্যাচারাল গ্লো আসবে। আর গ্রুপে একসাথে পরলে অনেক বেশি এলিগেন্ট লাগবে… চোখে লাগবে না, কিন্তু নজর কাড়বে।”
দোকানদার অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল,
—“ম্যাডাম একদম ঠিক বলেছেন! এইটা আমাদের প্রিমিয়াম কালেকশন…”
কাবির মাথা নাড়িয়ে হেসে বলল,
—“ঠিক আছে, আমরা হেরে গেলাম। ভাবির চয়েস ফাইনাল।”

রিহান মুচকি হেসে,
—“বুঝলাম, আসল স্টাইল সেন্স কার কাছে।”
ইয়াবি হেসে ফিসফিস করে বলল,
—“ভাই, তুই তো আগেই জানতিস কে জিতবে।”
কিরিস কিছু বলল না—শুধু লিসির দিকে একবার তাকাল, সেই চিরচেনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। আর লিসি?
চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল… কিন্তু ঠোঁটের কোণে লুকানো একটা হাসি ঠিকই ধরা পড়ল।
শোরুমের ভেতরে তখনও ছেলেদের হালকা হাসাহাসি চলছে—লিসির বলা অফ-হোয়াইট শার্টগুলো একে একে প্যাক হচ্ছে। দোকানদারও বিশেষ যত্ন নিচ্ছে, যেন ভিআইপি কাস্টমার। ঠিক তখনই কিরিসের ফোনটা ভাইব্রেট করল। স্ক্রিনে নামটা ভেসে উঠল— আম্মু।
কিরিস একপাশে সরে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করল,
—“জি, মা ।”
ওপাশ থেকে সুপ্রিয়ার শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠ,
—“শোন কিরিস, তোরা যেহেতু মার্কেটে আছিস… তিশার জন্য বিয়ের গহনা গুলো নিয়ে আসবি। যেগুলো আমি আগেই সিলেক্ট করে রেখেছিলাম, সেগুলো পালিশ করিয়ে রেডি করে রাখছে—ওগুলো নিয়ে নিবি।”
কিরিস সংক্ষেপে —“ঠিক আছে।”
সুপ্রিয়া আবার বললেন, এবার একটু গুরুত্ব দিয়ে,
—“আর শোন… মাথার জন্য যে সোনার মুকুটটা বানাতে দিয়েছিলাম, সেটা ভালো করে দেখে নিবি। কাজটা যেন একদম নিখুঁত হয়—একটু হালকা ডিজাইন, কিন্তু রাজকীয় লুক থাকতে হবে… বুঝলি?”
কিরিসের চোখে হালকা ঝিলিক —“হুম।”
সুপ্রিয়া —“আর হাতের যে দুইটা বালা… ওই দুটো কিন্তু আমি স্পেশালি অর্ডার দিয়েছি। খুব ভারী না, কিন্তু ডিজাইন যেন ইউনিক হয়। ওই দুটো কিন্তু মাস্ট আনবি—একটুও কম্প্রোমাইজ চলবে না।”
—“ঠিক আছে মা।”
তারপর সুপ্রিয়ার কণ্ঠে হালকা মায়া মিশে গেল,
—“আর শোন… আমার বড় বৌমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাস। ওর চোখ ভালো—ও যা পছন্দ করবে, সেটা নিয়েই নিবি দোকান থেকে। আর লিসির যদি কিছু পছন্দ হয় তাহলে ওকেও কিনে দিবি। যা চায়বে তাই দিবি। ”
এই কথাটা শুনে কিরিসের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। নিচু গলায় বলল,
—“সোনার দোকানটাই ওর নামে করে দিবো।”
ওপাশে সুপ্রিয়া হালকা হেসে বললেন,
—“পাগল ছেলে! ঠিক আছে, যা—দেখে শুনে কিনিস।”
ফোনটা কেটে গেল। কিরিস ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
তার দৃষ্টি গিয়ে থামল লিসির ওপর—যে তখন ইয়াবিদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কিছু একটা দেখছিল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে সোজা হেঁটে গেল লিসির কাছে। লিসি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কিরিস তার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল।
—“চলো।”
লিসি হকচকিয়ে —“কোথায়?”
কিরিস একটুও না থেমে —“জেরার দরকার নেই। চলো।”
লিসি বিরক্ত হয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল,
—“এইভাবে টানাটানি করছো কেন? আমি যাচ্ছি না—”
কিন্তু কিরিসের গ্রিপ আরও শক্ত হলো।
সে একটু ঝুঁকে, নিচু গলায় বলল —“চুপচাপ এসো… না হলে এখানেই কোলে তুলে নিয়ে যাবো।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে চুপ। চোখ বড় বড় করে তাকাল চারপাশে—সবাই তাকিয়ে আছে। কাবির হেসে উঠল,
—“ওহো! আবার শুরু হয়ে গেছে।”
রিহান মাথা নাড়িয়ে,
—“ভাই, আমরা এখানেই থাকি। তোরা যাও, নিজেরা শপিং কর।”
ইয়াবি ফিসফিস করে —“ভাবি, রক্ষা নাই আপনার।”
লিসি দাঁতে দাঁত চেপে কিরিসের দিকে তাকাল,
—“আপনি একদম অসভ্য!”
কিরিস নির্বিকার, ঠান্ডা চোখে —“হ্যাঁ, তোমার জন্যই।”
এরপর আর কিছু না বলে সে লিসিকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেল শোরুম থেকে। কাঁচের দরজা পেরিয়ে, সরাসরি সোনার দোকানের দিকে। আর পেছনে দাঁড়িয়ে বাকিরা হাসতে হাসতে ওদের চলে যাওয়া দেখতেই থাকল।
শোরুম থেকে বেরিয়ে কিরিস সোজা সোনার দোকানের দিকেই হাঁটছিল, হাতটা এখনও শক্ত করে ধরে আছে লিসির। যেন একবার ছাড়লেই হারিয়ে যাবে।
সামনের বড় গ্লাসের বিল্ডিং—উপরের তলায় নামকরা জুয়েলারি শপ। লিফটের সামনে এসে কিরিস থামল।
—“চলো।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে পিছিয়ে গেল,
—“না… আমি লিফটে উঠবো না।”
কিরিস ভ্রু কুঁচকে তাকাল —“কেন?”
লিসি একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল
—“গা কেমন করে… দম বন্ধ লাগে। আমি সিঁড়ি দিয়ে যাবো।”
এক সেকেন্ড কিরিস চুপ করে রইল। তারপর একদম সহজ গলায় বলল —“ঠিক আছে।”
কোন জোরাজুরি নেই—শুধু তার হাতটা আরও দৃঢ়ভাবে ধরে নিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল দুজন। মার্কেটের ভেতর দিয়ে যে যেই পাশ দিয়ে যাচ্ছে, সবাই একবার করে তাকাচ্ছে।
বিশেষ করে মেয়েরা—কিরিসকে দেখলে চোখ সরানোই দায়। লম্বা, নিখুঁত ফিগার, শার্প চোখ, ঠান্ডা এক্সপ্রেশন… যেন সিনেমার কোনো ক্যারেক্টার। কিছু মেয়ের ফিসফাস ভেসে আসছে—
—“ওমাইগড, ছেলেটা কে?”
—“মডেল নাকি?”
—“উফ, লুকটা দেখেছিস?”
কিন্তু কিরিস? একবারও চারপাশে তাকাচ্ছে না।
তার পুরো ফোকাস শুধু লিসি এক হাত দিয়ে ওর হাত শক্ত করে ধরা, আরেক হাতটা হালকা করে ওর কাঁধের কাছে… যেন কেউ ছুঁতে না পারে। একদম পজেসিভ, স্পষ্ট। লিসি বিরক্ত মুখে বলল,
—“এভাবে ধরে রাখার কি দরকার? আমি পালিয়ে যাচ্ছি নাকি?”
কিরিস শান্ত গলায় —“হ্যাঁ।”
লিসি থমকে —“কি?”
কিরিস একবার তাকাল তার দিকে, চোখে হালকা দুষ্টুমি
—“তুমি সুযোগ পেলেই পালাবে।”
লিসি চোখ ছোট করে তাকাল
—“আপনার থেকেই পালাতে ইচ্ছে করে।”
কিরিস হালকা হেসে উঠল,
—“দেখো… সত্যিটা নিজেই বলছো।”
লিসি মুখ ঘুরিয়ে নিল
—“হুম, বেশি ভাববেন না।”
দুজন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে—চারপাশে লোকজন তাকিয়ে আছে, কেউ কেউ থেমেও যাচ্ছে। কিরিসের গ্রিপ একটুও ঢিলা হয়নি। লিসি নিচু গলায় বলল,
—“সবাই তাকাচ্ছে…”
কিরিস নির্বিকার —“তাকাতে দাও।”
লিসি —“আমার অস্বস্তি লাগছে।”
কিরিস একটু ঝুঁকে, তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
—“তুমি আমার সঙ্গে আছো… কারো সাহস হবে কিছু বলার?”
লিসির গাল হালকা লাল হয়ে উঠল।
—“আপনি সব সময় এমন কেন?”
কিরিস —“কেমন?”
লিসি —“এভাবে… সব কিছুর ওপর নিজের অধিকার দেখান।”
কিরিস এক সেকেন্ড থেমে, চোখে সরাসরি তাকাল,
—“কারণ তুমি আমার।”
লিসি চুপ। কিছু বলল না—শুধু হাঁটতে লাগল।
সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে কিরিস আবার ওর হাতটা একটু টেনে নিল —“চলো, এখন আসল কাজ।”
লিসি হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল,
—“দেখি, আজ আবার কত সোনা কিনাতে চান আমাকে দিয়ে…”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে,
—“তুমি যত বলবে… ততই কম হবে।”
উপরের তলায় উঠেই লিসি যেন একটু রাগ ঝেড়ে ফেলতে চাইল—হাতটা ছাড়িয়ে দিয়ে আগে আগে হাঁটা শুরু করল। দ্রুত পায়ে সোজা জুয়েলারি শপের দিকেই যাচ্ছে। কিরিস পেছন থেকে ধীর পায়ে হাঁটছে, চোখ কিন্তু একদম ওর ওপরই। হালকা গলায় বলল
—“ধীরে… পড়ে যাবে।”
লিসি না ঘুরেই —“আমি পারি হাঁটতে।”
কিরিস ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—“আগের বারও তো বলেছিলে। শেষে কী হলো? নিজের পায়ে ব্যাগ ফেলে দিলে।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে থেমে ঘুরে দাঁড়াল, চোখ রাগে গোল,
—“কি বললেন? আমি কি এতই অসাবধান নাকি?”
—“হুম।”
—“আপনি আমাকে কি ভাবেন হ্যা—”
কথা শেষ করার আগেই হঠাৎ করে ওর পা হালকা বেঁকে গেল।
—“আহ্!”
লিসি কুঁকড়ে গিয়ে পা চেপে ধরল। একদম ঠিক জায়গাতেই মুচকে গেছে। কিরিস এক সেকেন্ডেই কাছে চলে এল, চোখ কড়া হয়ে গেল
—“দেখলে? বলেছিলাম না!”
লিসি দাঁতে দাঁত চেপে —“কিছু হয়নি…”
কিরিস নিচু হয়ে ওর পা একবার দেখে নিল, তারপর হালকা রাগী গলায়,
—“চুপ করো। সব সময় জেদ দেখাতে হবে?”
তারপর কোনো কথা না শুনেই তাকে কোলে তোলার জন্য হাত বাড়াল। লিসি তাড়াতাড়ি বাধা দিল,
—“না! আমাকে কোলে নেবেন না… আমি হাঁটতে পারবো।”
কিরিস ভ্রু তুলল —“পারবে?”
—“হ্যাঁ!”
—“ঠিক আছে…একবারই বলবো কথা না শুনলে কিন্তু এখান থেকে..... ।”
কিরিস পরের বাক্য মুখ থেকে বের করার আগে লিসি এক সেকেন্ড থেমে, তারপর বলল,
—“ফেলে দেবেন তাই না?”
কিরিস থামল। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল, চোখে সেই চেনা দুষ্টু ঝিলিক,
—“কি?”
লিসি একটু এগিয়ে এসে বলল,
—“আগের বারও তো বলেছিলেন—ফেলে দেবেন… কিন্তু দেননি।”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
—“এইবার দেবো।”
—“না, দেবেন না।”
—“দেখো।”
এই বলে হঠাৎ করেই কিরিস লিসির বাহুতে হাত দিয়ে এক ঝটকায় তাকে উপরে তুলে নিল। একদম রেলিং এর পাশে গিয়ে ফেলে দেওয়ার মতো ভাব।
—“আহহহহহ ভাইয়া!!”
লিসি চমকে উঠে চিৎকার করে ফেলল। কিরিস যেন সত্যিই ছেড়ে দিতে যাবে এমন ভঙ্গি করতেই লিসি ভয়ে তাড়াতাড়ি ওর গলায় হাত জড়িয়ে, একদম ওর বুকে লেপ্টে গেল।
—“না না! ছাড়বেন না!”
চারপাশে সবাই থেমে তাকাচ্ছে, কেউ কেউ মুচকি হাসছে।
কিরিস এবার শক্ত করে তাকে কোলে তুলে নিল, বুকের সাথে চেপে ধরে।—“চিৎকার কমাও।”
লিসি রাগে, লজ্জায় কাঁপছে,
—“আপনি একদম পাগল! যদি পড়ে যেতাম?”
কিরিস ঠান্ডা গলায়,
—“আমি থাকলে তুমি পড়বে না।”
—“আপনার ওপর এত ভরসা কেন করবো?”
—“কারণ তুমি করো।”
লিসি থমকে গেল এক সেকেন্ড। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিল,
—“হুম… বেশি ভাববেন না।”
কিরিস হালকা হেসে,
—“ধরেই তো আছি, ভাবার দরকার কি?”
লিসি নিচু গলায়,
—“সবাই তাকাচ্ছে…”
—“তাকাতে দাও।”
—“আমাকে নামান…”
—“না।”
—“প্লিজ…”
—“না।”
শেষ কথাটা এতটাই শান্ত কিন্তু দৃঢ় ছিল যে লিসি আর কিছু বলতে পারল না। কিরিস তাকে কোলে নিয়েই ধীরে ধীরে জুয়েলারি শপের দিকে হাঁটতে লাগল।
তার হাঁটা, তার দৃষ্টি—সবকিছুতেই এক ধরনের রাজকীয় নিশ্চয়তা। আর লিসি? রাগে মুখ ফুলিয়ে রেখেছে… কিন্তু হাত দুটো এখনও শক্ত করে কিরিসের গলায় জড়িয়ে আছে।
কাঁচের দরজাটা খুলতেই ভেতর থেকে এক ঝলক সোনালি আলো যেন তাদের দুজনকে ঘিরে ফেলল। পুরো শোরুমটা ঝলমলে—ক্রিস্টাল লাইটের নিচে সারি সারি গহনা, প্রতিটা যেন নিজের সৌন্দর্য নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আর সেই আলোয়—কিরিসের কোলে লিসি।
ভেতরে ঢুকতেই স্টাফরা একসাথে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ম্যানেজার নিজে এগিয়ে এল, মুখে ভদ্র হাসি, কিন্তু চোখে স্পষ্ট বিস্ময়—এই দুজনকে দেখেই বোঝা যায়, এরা আলাদা।
—“স্যার, প্লিজ এইদিকে…”
কিরিস ধীর পায়ে সোফার দিকে গেল, কিন্তু নামানোর কোনো লক্ষণ নেই। লিসি নিচু গলায় ফিসফিস করে,
—“এবার নামান… প্লিজ।”
কিরিস শান্ত,
—“ব্যথা করছে না?”
—“করছে… কিন্তু—”
—“তাহলে চুপ।”
তারপর খুব যত্ন করে তাকে সোফায় বসিয়ে দিল।
কিন্তু হাত ছাড়ল না—আঙুলগুলো এখনও জড়িয়ে আছে। ম্যানেজার জিজ্ঞেস করল,
—“স্যার, কী দেখতে চান?”
কিরিস একবারও না ভেবে বলল,
—“ব্রাইডাল কালেকশন। আর… যা সবচেয়ে ভালো আছে।”
লিসি অবাক হয়ে তাকাল,
—“ব্রাইডাল কেন?”
কিরিস তার দিকে না তাকিয়েই বলল,
—“দেখো।”
একটার পর একটা ট্রে সামনে আসতে লাগল—নেকলেস, বালা, কানের দুল, মাথার মুকুট… প্রতিটা আগেরটার থেকে বেশি সুন্দর। লিসি প্রথমে একটু দূরত্ব রেখে বসেছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে চোখ আটকে গেল গহনাগুলোর দিকে। একটা সোনার নেকলেস সামনে রাখা হলো—হালকা কিন্তু ডিজাইনে একদম রাজকীয়, ছোট ছোট পাথরের কাজ, আলো পড়তেই ঝলমল করে উঠছে। কিরিস সেটার দিকে ইশারা করল,
—“এইটা।”
ম্যানেজার মাথা নেড়ে,
—“জি স্যার, এটা আমাদের কাস্টম ডিজাইন…”
কিরিস তাকাল লিসির দিকে,
—“পছন্দ?”
লিসি নেকলেসটার দিকে তাকিয়ে একটু চুপ করে থাকল, তারপর খুব ধীরে বলল,
—“খুব… সুন্দর।”
তার গলায় একটা মুগ্ধতা ছিল—নিজেও বুঝতে পারছিল না। তারপর বালার ট্রে সামনে এলো।
দুটো বালা—একটা একটু মোটা, কিন্তু ডিজাইনটা এত সূক্ষ্ম যে ভারী লাগছে না। অন্যটা পাতলা, কিন্তু পাথরের কাজ এমনভাবে বসানো যেন আলো নিজের মতো খেলা করছে। লিসি হাত বাড়িয়ে একটা তুলে নিল।
আস্তে করে আঙুল বুলিয়ে বলল,
—“এইটার কাজটা দেখেছেন? একদম ইউনিক… খুব হেভি না, কিন্তু লুকটা রিচ।”
কিরিস শুধু তাকিয়ে আছে—ওর বলা প্রতিটা শব্দ যেন মন দিয়ে শুনছে।
—“দুটোই প্যাক করুন।”
লিসি চমকে,
—“দুটোই?”
—“হ্যাঁ।”
—“একটা নিলেই তো হয়—”
কিরিস এবার সরাসরি চোখে চোখ রাখল,
—“তুমি যেটা ছুঁয়েছো… সেটা ফেলে রাখা যায় না।”
লিসি থেমে গেল। তারপর ধীরে বলল,
—“এইগুলো তিশার জন্য… তাই না?”
কিরিস কিছু বলল না কয়েক সেকেন্ড। তারপর হালকা ঝুঁকে, খুব নিচু গলায় বলল,
—“না।”
লিসির বুক কেমন করে উঠল,
—“মানে?”
কিরিস এবার স্পষ্ট করে বলল,
—“এইগুলো… তোমার জন্য।”
পুরো শোরুম যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল। লিসি অবাক, হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে,
—“আমার জন্য? কেন?”
কিরিস শান্ত, কিন্তু চোখে সেই গভীরতা,
—“কারণ তুমি ছাড়া আর কাউকে মানাবে না।”
লিসির গলা শুকিয়ে গেল।
—“কিন্তু… এত দামী—”
—“আমি দাম দেখি না।”
একটা নেকলেস তুলে নিয়ে সে নিজে লিসির গলায় পরিয়ে দিল। ঠান্ডা সোনার স্পর্শে লিসি হালকা কেঁপে উঠল। কিরিস একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে দেখল—
আলোয় ঝলমল করছে গহনাটা, কিন্তু তার থেকেও বেশি উজ্জ্বল লাগছে লিসিকে।
নিচু গলায় বলল,
—“পারফেক্ট।”
লিসি আয়নায় নিজেকে দেখল এটা সে? নাকি অন্য কেউ? সোনার ছোঁয়ায় নারীর সৌন্দর্য নাকি দ্বিগুন বেরে যায় আর আজ যেটা একদম বোঝা যাচ্ছে। তার চোখে অদ্ভুত এক অনুভূতি—লজ্জা, অবাক হওয়া, আর কোথাও একটা নরম সুখ।
—“আমি… নিতে পারবো না।”