তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :67

সুপ্রিয়া লিসির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে তৃপ্তির হাসির দেয় —“ যাক অবশেষে মেয়েটা মেনে নিতে পেরেছে ”
বলে সুপ্রিয়া চলে যায় আবার রান্না ঘরে। লিসি গার্ডেনের দিকে যায় যেখানে আনোয়ার আর আনারুল বসে গল্প করছে। গার্ডেনের সকালের নরম রোদে হালকা কুয়াশার ছোঁয়া। পাখির ডাক, গাছের পাতায় শিশির—সব মিলিয়ে এক প্রশান্ত পরিবেশ। লিসি হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে টেবিলে চা রেখে বলে —“ আব্বু, ছোট আব্বু আপনাদের চা। ”
আনোয়ার আর আনারুল দুজনে হেসে ফেলে লিসির মুখ থেকে আব্বু ডাক শুনে। লিসি চায়ের ট্রে টেবিলে রাখতেই আনোয়ার আর আনারুল দুজনেই একটু চমকে তাকায়, তারপর হেসে ফেলে। আনোয়ার হেসে মাথা নেড়ে বলে—
—“আব্বু বলছো? এই ডাকে তো মনটাই ভরে গেল মা…”
আনারুল মজা করে বলে—
—“এই ডাকটা কিন্তু খুব দামি, বুঝলা ভাই? এতদিনে আমাদেরও কেউ আব্বু বলার মতো হলো!”
লিসি হালকা লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকায়, ঠোঁটে ছোট্ট হাসি
—“আপনারা তো আমার আব্বুই… তাহলে আর কি বলবো?”
আনোয়ার স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে
—“এই কথাটার জন্যই তো আমরা এতদিন অপেক্ষা করছিলাম…”
আনারুল কাপটা হাতে নিয়ে চা চুমুক দিতে দিতে বলে
—“শোনো লিসি, তুমি এই বাড়িতে শুধু বউমা না… তুমি এই বাড়ির নিজের মানুষ, আমাদের মেয়ে। কোনো কিছুতে অস্বস্তি লাগলে বা কিছু দরকার হলে সরাসরি আমাদের বলবা, ঠিক আছে?”
লিসি মাথা নাড়িয়ে হালকা হাসে
—“জ্বি ছোট আব্বু…”
হঠাৎই আনোয়ার একটু সিরিয়াস হয়ে, কিন্তু চোখে মায়া রেখেই বলে —“আর একটা কথা… কিরিস যদি কখনো বেশি রাগ দেখায়, আমাদের জানাবে। ওর রাগটা একটু… বেশি।”
আনারুল সাথে সাথে হেসে বলে—
—“একটু না, অনেক বেশি! তবে মেয়েটার জন্য ও পাগল, এটা কিন্তু আমরা জানি।”
এই কথা শুনে লিসির গাল হালকা লাল হয়ে যায়। সে চোখ নামিয়ে ফেলে, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে।
ঠিক তখনই হালকা বাতাসে তার লম্বা চুল উড়ে এসে গাল ছুঁয়ে যায়… আর দূর থেকে কারো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সেই দৃশ্যটাকে নিঃশব্দে নিজের মধ্যে বন্দী করে রাখে।
উপরের ঘরের বেলকনি থেকে পুরো দৃশ্যটা সে গভীরভাবে লক্ষ্য করছে। তার চোখে এক অদ্ভুত শান্তি… আবার এক অদ্ভুত অধিকার। মনে মনে খুব নিচু স্বরে বলে ওঠে —“আমার… শুধু আমার…”
লিসি ধীরে ধীরে গার্ডেন থেকে ঘরের ভেতরে ঢুকে আসে। সকালের আলো এখন পুরো বাড়িটাকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। ভিতরে ঢুকতেই ড্রইংরুমে জমে উঠেছে কাজিনদের আড্ডা। ইশান সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে, কাবির আর রিহান কোনো একটা বিষয় নিয়ে তর্ক করছে। জারা, সুরভী, আরোবি, নুসরাত আর হিয়া মিলে হাসাহাসি করছে—পুরো পরিবেশটাই প্রাণবন্ত।
লিসিকে ঢুকতে দেখে জারা চিৎকার করে বলে—
—“এইইই, আমাদের নববধূ এসে গেছে!”
সাথে সাথে সবাই একসাথে তাকায়, তারপর একসাথে মজা করে —“ওওওহহ!”
লিসি লজ্জা পেয়ে বলে —“আরে থামো তো তোমরা…”
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে সুপ্রিয়া ট্রে হাতে বেরিয়ে আসে। সবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে
—“এই সকাল সকাল এত হৈচৈ কিসের?”
তারপর লিসির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে
—“লিসি মা, কিরিস উঠেছে?”
লিসি একটু থেমে, স্বাভাবিক গলায় বলে—
—“না আম্মু… এখনো ওঠেনি।”
সুপ্রিয়া হালকা হাসে, যেন আগেই জানতো—
—“ ওহ্, ভালে হয়েছে… ওর ঘুম খুব কাঁচা। এমনিতেই ঠিকমতো ঘুমায় না, তাই ওকে ঘুমাতে দাও।”
এই কথা শুনে ইশান মুখ টিপে হাসে
—“আগে তো ভাইয়া নাকি একদমই ঘুমাতো না…”
কাবির সাথে সাথে যোগ করে
—“হ্যাঁ রে! এখন দেখ… বউ আসার পর ঘুমটা বেশ ভালোই হচ্ছে মনে হয়!”
রিহান নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে—
—“এটাই বলে শান্তির ঘুম!”
সাথে সাথে সবাই হেসে ওঠে —“হাহাহা!”
লিসি লজ্জায় একদম লাল হয়ে যায়—
—“তোমরা না একদম…!”
সুরভী মজা করে বলে —“আচ্ছা আচ্ছা, কিছু বলবো না… কিন্তু ব্যাপারটা সন্দেহজনক!”
আবার সবাই হেসে ওঠে। ঠিক তখনই বাইরে থেকে শব্দ ভেসে আসে। সবাই একটু চুপ হয়ে তাকায়।
সকাল প্রায় ৮টা বাজে। গার্ডেনের দিকে তাকিয়ে দেখা যায়, একের পর এক ডেকোরেশন-এর লোকজন ঢুকছে। বিশাল ফাঁকা গার্ডেন জুড়ে তারা কাজ শুরু করে দিয়েছে—কেউ লাইট ঝুলাচ্ছে, কেউ ফুল সাজাচ্ছে, কেউ স্টেজ বানাচ্ছে। ঘরের ভেতরেও কয়েকজন ঢুকে দেয়াল, সিঁড়ি, করিডর—সব জায়গা সাজাতে শুরু করে দেয়। পুরো বাড়িটা ধীরে ধীরে উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠছে।
এই সব কিছুর মাঝেই হঠাৎ সিঁড়ির দিক থেকে ভারী, ধীর পায়ের শব্দ ভেসে আসে…
টক… টক… টক…
সবাই একসাথে চুপ হয়ে যায়। সবার দৃষ্টি সিঁড়ির দিকে উঠে যায়। আর পরের মুহূর্তেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে কিরিস। খালি গা… এলোমেলো চুল … শুধু পরনে টাওয়াজ প্যান্ট …
তার সুগঠিত বডি—স্পষ্ট অ্যাবস, চওড়া কাঁধ, শক্ত বুক… প্রতিটা মাংসপেশি যেন নিখুঁতভাবে গড়া। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখ দুটো আগের মতোই তীক্ষ্ণ… ভয়ংকরভাবে আকর্ষণীয়। পুরো রুম এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ। জারা আস্তে করে ফিসফিস করে—
—“ও মাই গড…”
সুরভী মুখ ঢেকে ফেলে—
—“এইটা কি সকাল সকাল দেখলাম!”
রিহান নিচু স্বরে বলে—
—“ভাই, জিমটা আজকে আবার নতুন করে খুলতে হবে মনে হয়…”
ইশান হেসে বলে—
—“চুপ কর, সামনে বউ আছে!”
আরোবি হেসে —“ বিশ্বাস কর ভাইয়া, তোর বডি দেখে ফিদা হয়ে গেছি, একদম পারফেক্ট ”
লিসি একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিরিসের দিকে আটকে গেছে… তারপর হঠাৎ বুঝতে পেরে দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়। তার গাল লাল হয়ে গেছে। কিরিস ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে… তার দৃষ্টি একবারও অন্য কোথাও যায় না—
সরাসরি লিসির উপর। যেন পুরো ঘরে আর কেউ নেই…
শুধু সে… আর তার “বউ”।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার পর এক মুহূর্তও নষ্ট করলো না কিরিস। চারপাশে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবকিছু দেখে নিয়ে সরাসরি এগিয়ে গেল গার্ডেনের দিকে, যেখানে ডেকোরেশনের লোকজন কাজ শুরু করেছে।লোকগুলোর মধ্যে একজন, সম্ভবত তাদের ডিরেক্টর, কিছু নির্দেশ দিচ্ছিল। কিরিস তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই লোকটা একটু থমকে যায়। কিরিস শান্ত কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ গলায় বলে —“গাড়িটার ডেকোরেশনটা আমি একটু সিম্পল চাই।”
লোকটা সাথে সাথে মাথা নাড়ে—
—“জি স্যার, কেমনভাবে?”
কিরিস হাত গুটিয়ে, হালকা চোখ সরু করে বলে—
—“অতিরিক্ত কিছু না। লাইট, ফুল—সব থাকবে, কিন্তু একদম এলিগেন্ট। বেশি ঘ্যাচাঘ্যাচি কিছু যেন না হয়। বুঝছেন তো?”
লোকটা দ্রুত বলে—
—“জি স্যার, একদম ক্লাসি লুক দিবো।”
কিরিস ছোট্ট করে মাথা নাড়িয়ে গার্ডেনের অন্য পাশে চলে যায়, যেখানে স্টেজ আর বসার জায়গা সাজানো হচ্ছে। সে একে একে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখছে, কোথাও একটু ভুল দেখলেই ঠিক করে দিচ্ছে। এর মাঝেই হঠাৎ থেমে যায় সে। ধীরে ধীরে ঘুরে বাড়ির ভিতরে ঢোকে। চারপাশটা আবার দেখে নেয় তারপর তাকায় সরাসরি লিসির দিকে। তার চোখে সেই চেনা অধিকার… নিঃশব্দ নির্দেশ। —“কফি নিয়ে এসো।”
এক সেকেন্ড থেমে আবার বলে—
—“আর উপর থেকে একটা শার্টও নিয়ে আসো।”
কথাগুলো বলেই আর একবারও না তাকিয়ে সে আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। লিসি ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই স্থির হয়ে যায়। তারপর মুখটা একটু কুঁচকে ফেলে, খুব নিচু স্বরে নিজেই নিজেকে বলে—
—“হুঁ… আদেশ দেওয়ার ভঙ্গিটা দেখো!”
ঠিক তখনই পেছন থেকে ইশান ফিসফিস করে
—“কি বললো ভাইয়া?”
কাবির হেসে বলে —“মনে হয় ডিউটি দিয়ে গেছে!”
রিহান নাটকীয়ভাবে বলে —“বউ মানেই পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট!”
নুসরাত তখন পাশ থেকে রিহানের দিকে তাকিয়ে বলে —
“ তাই বুঝি! ”
রিহান মুখে হাসি টেনে কথা ঘুরিয়ে বলে —“ আরে আমার বউ এর কাছে আমি তো অ্যাসিস্ট্যান্ট, আর আমার বউ তো আমার বস ”
নুসরাত মুখ চেপে হেসে ফেলে সঙ্গে সবাই একসাথে হেসে ওঠে। লিসি চোখ বড় বড় করে তাদের দিকে তাকায়
—“চুপ করো তো! তোমরা না একদমই ভালো না!”
সুরভী মজা করে বলে—
—“আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা কিছু বলবো না… তুমি যাও, ‘বস’-এর অর্ডার কমপ্লিট করো!”
আবার হাসির রোল পড়ে। লিসি মুখ ঘুরিয়ে নেয়, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসি স্পষ্ট। মনে মনে একটু রাগী ভঙ্গিতে বলে—
—“নিজে গিয়ে নিতে পারতো না নাকি… সব কাজ আমার দিয়ে করাবে! উপর থেকে খালি গায়ে আসার দরকার কি ছিলো বেয়াদব বেডা লোক! ”
তবুও সে রান্নাঘরের দিকে যায়।চুলায় পানি বসায় কফির জন্য। গরম পানির হালকা শব্দ উঠতেই সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। কিরিসের রুমে ঢুকে আলমারি খুলে একটা শার্ট বের করে—সাদা, একদম পরিপাটি।
শার্টটা হাতে নিয়ে এক মুহূর্ত থেমে যায় সে… তারপর নিচে নেমে আসে। রান্নাঘরে এসে কফিটা যত্ন করে বানায়। কাপ থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে… কফির গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। এক হাতে কফি, অন্য হাতে শার্ট নিয়ে ধীরে ধীরে গার্ডেনের দিকে এগিয়ে যায় লিসি। গার্ডেনে ঢুকতেই তার চোখ পড়ে কিরিসের উপর। সে পুরো ব্যস্ত—কাউকে কিছু বুঝাচ্ছে, কোথাও লাইট ঠিক করছে, আবার কারো কাজ থামিয়ে নতুন করে সাজাতে বলছে।
তার প্রতিটা মুভমেন্টে একটা অদ্ভুত কর্তৃত্ব… একটা অদৃশ্য শক্তি, যা সবাইকে নিঃশব্দে নিয়ন্ত্রণ করছে।
লিসি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে এক অদ্ভুত অনুভূতি অবাক হওয়া… মুগ্ধতা… আর অজানা কিছু। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় কিরিসের দিকে… হাতে ধোঁয়া ওঠা কফি… আর তার জন্য আনা শার্ট।
লিসি ধীরে ধীরে কিরিসের সামনে এসে দাঁড়ায়। চারপাশে কাজের ব্যস্ততা, লোকজনের আনাগোনা—তবুও যেন সেই মুহূর্তে সবকিছু একটু থেমে যায়। লিসি কাপটা এগিয়ে দেয় —“এই নিন… আপনার কফি।”
অন্য হাতে শার্টটা বাড়িয়ে দেয় —“আর এটা…”
কিরিস কফির কাপটা নেয়, তারপর শার্টের দিকে না তাকিয়ে আগে লিসির মুখের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে হালকা দুষ্ট হাসি।
—“এইভাবে দাঁড়িয়ে দেখছিলে কেন? আমি কাজ করছিলাম তাই দেখছিলে নাকি আমাকে ?”
লিসি সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নেয়
—“আমি কারো দিকে তাকাইনি… আপনি নিজেকে খুব বেশি কিছু ভাবেন।”
কিরিস হালকা হেসে কাছে ঝুঁকে আসে
—“তাই? তাহলে একটু আগেই চোখ নামিয়ে নিলে কেন?”
লিসি একটু তেতো গলায় বলে
—“রোদ ছিল, চোখে লাগছিল।”
কিরিস নিচু স্বরে হাসে
—“রোদ… না অন্য কিছু?”
লিসি এবার বিরক্ত হয়ে বলে
—“আপনি না একদমই অসহ্য!”
কিরিস হঠাৎ তার হাতটা ধরে ফেলে। লিসি চমকে উঠে—
—“এই! কি করছেন?”
কিরিস চোখ সরু করে, মুচকি হেসে বলে—
—“এমন করে দেখছো যখন… ছুঁয়ে দেখবে না?”
লিসি সাথে সাথে মাথা নাড়ে—
—“না! একদম না!”
কিন্তু কিরিস শোনে না। ধীরে ধীরে লিসির হাতটা নিজের বুকের ওপর এনে রাখে। তার উষ্ণ, শক্ত গায়ের স্পর্শে লিসি একদম থমকে যায়।
—“এই! ছাড়ুন…!”
কিরিস মজা নিয়ে বলে
—“কি হলো? এতক্ষণ তো তাকাচ্ছিলে…”
লিসি চোখ বড় করে, হাত সরানোর চেষ্টা করে
—“আমি তাকাইনি বলেছি তো!”
কিরিস আরও একটু কাছে ঝুঁকে আসে—
—“মিথ্যে বলছো…”
কিরিস লিসির হাতটা বুক থেকে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামাতে থাকে। জিম করা বডি হাতের তালুর নিচে স্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছে। লিসি চোখ বন্ধ করে ফেলে। আর সহ্য না করতে পেরে লিসি এবার সত্যিই জোরে হাত ছাড়িয়ে নেয়। এক পা পিছিয়ে গিয়ে লজ্জা আর রাগ মেশানো গলায় বলে—
—“বেয়াদব! একদম নির্লজ্জ একটা লোক! লজ্জা বলে কিছু নেই আপনার!”
কথা শেষ করেই ঘুরে দৌড় দেয় ভেতরের দিকে।
কিরিস কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে… তারপর হঠাৎ করে হেসে ফেলে—একটা গভীর, তৃপ্তির হাসি। শার্টটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে পরে নেয়।
এক হাতে কফির কাপ তুলে নিয়ে আবার আগের মতোই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণের সেই দুষ্ট হাসিটা আর মিলিয়ে যায় না।
গার্ডেনের কাজ ধীরে ধীরে গুছিয়ে আসে। কিরিস শেষবারের মতো চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়—সব ঠিক আছে কিনা নিশ্চিত হয়ে তবেই সে ভেতরের দিকে হাঁটে।
ঘরে ঢুকতেই দেখে সবাই এখনো আড্ডায় মশগুল। কেউ হাসছে, কেউ ফোন দেখছে, কেউ আবার ডেকোরেশন নিয়ে আলোচনা করছে। কিরিস একদম মাঝখানে এসে থামে। তার উপস্থিতিতেই আস্তে আস্তে সবার শব্দ কমে যায়। গম্ভীর কিন্তু স্বাভাবিক গলায় বলে—
—“সবাই ব্রেকফাস্ট করে নাও। তারপর রেডি হয়ে গুছিয়ে নেবে… মার্কেটে যেতে হবে।”
এক সেকেন্ড নীরবতা… তারপর হঠাৎ
—“ইয়েসসস!”
—“শপিং টাইম!”
—“আজকে তো জমে যাবে!”
ইশান হাত তুলে বলে—
—“ভাইয়া, আজকে কিন্তু কেউ বাঁচবে না! পুরো মার্কেট খালি করে দিবো!”
কাবির সাথে সাথে যোগ করে—
—“কার্ডটা রেডি রাখেন!”
রিহান হেসে বলে—
—“আজকে বাজেট বলে কিছু নাই!”
সবাই হেসে ওঠে।
কিরিস ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি এনে বলে—
—“যা লাগবে, নাও। কিন্তু সময় নষ্ট করবে না কেউ।”
সুরভী মজা করে বলে—
—“এইটা কিন্তু রেকর্ড করে রাখতে হবে!”
জারা লাফিয়ে উঠে—
—“চলো চলো! আগে খেয়ে নেই, তারপর যুদ্ধ শুরু!”

এই আনন্দের মাঝেই সুপ্রিয়া এসে দাঁড়ায়—
—“আচ্ছা আচ্ছা, এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। আগে সবাই টেবিলে আসো, নাস্তা রেডি।”
ডাইনিং টেবিলের দিকে একে একে সবাই যেতে শুরু করে। বড় টেবিলটা নানা রকম খাবারে ভরে গেছে—পরোটা, ডিম, সবজি, ফল, জুস… পুরো একটা জমজমাট সকালের আয়োজন। সবাই নিজের নিজের জায়গায় বসে পড়ে। হাসি, মজা, গল্প—সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা উষ্ণ আর আনন্দে ভরে ওঠে। লিসিও চুপচাপ এসে বসে, মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকায়…
কিরিসের দিকে। কিরিসও একবার চোখ তুলে তাকায়—
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে যায়… তারপর দুজনেই আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু সেই এক মুহূর্ত নীরব, অথচ অনেক কিছু বলে যায়। কিরিসকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রিয়া বলে —“ তুই দাঁড়িয়ে কেন? আয় খেয়ে নে ”.
কিরিস —“ নাহ আমি উপরে যাবো। ফ্রেশ হয়ে আছি এসে তাই খাবো তার মধ্যে এদের গুছানো হয়ে যাবে।”
বলে কিরিস উপরে চলে যায় আর বাকিরা সবাই খেতে থাকে। ইশান মুখ ভেংচি কেটে বলে
—“দেখছো? বড়লোকদের আবার আলাদা টাইমে খাওয়ার সিস্টেম!”
কাবির হেসে বলে —“স্টাইল ভাই, স্টাইল!”
সুরভী মাথা নেড়ে।—“এই মানুষটাকে বুঝা মুশকিল!”
লিসি চুপচাপ বসে থাকে, কিছু বলে না… শুধু একবার সিঁড়ির দিকে তাকায়। এরপর সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নেয়। হাসতে হাসতে, গল্প করতে করতে একে একে উঠে যায় নিজেদের রুমে—মার্কেটে যাওয়ার জন্য গুছাতে। ডাইনিং এরিয়া ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসে। লিসি সুপ্রিয়ার সঙ্গে কিছু কাজ এগিয়ে দিয়ে উপরে উঠতে থাকে সিঁড়ি দিয়ে ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে কিরিস। এবার সে পুরো গুছানো—চুল ঠিক করা, মুখে সেই স্বাভাবিক গম্ভীর ভাব, চোখে হালকা ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু উপস্থিতি আগের মতোই শক্তিশালী। লিসি একবার কিরিসের দিকে তাকায় কিরিসও লিসির দিকে তাকায় তারপর আর কিছু না বলে উপরে উঠে যায়।
সুপ্রিয়া তখনও টেবিলের পাশে ছিল। তাকে নামতে দেখে মৃদু হাসে —“জানতাম, এখনই নামবে।”
কিরিস কিছু না বলে চেয়ারে বসে। সুপ্রিয়া তার সামনে হালকা করে নাস্তা সাজিয়ে দেয় টোস্ট, বাটার, অমলেট, সাথে এক কাপ ব্ল্যাক কফি—একটু বিদেশি স্টাইলে সাজানো। —“ভারী কিছু দিলাম না, হালকা করে খাও।”
কিরিস ছোট্ট করে মাথা নাড়ে —“হুম।”
সে ধীরে ধীরে খাওয়া শুরু করে।
চারপাশে এখন আর সেই আগের হৈচৈ নেই…
ঘরটা অনেকটাই শান্ত। উপরে থেকে কাজিনদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে—সবাই প্রস্তুত হচ্ছে, কে কি পরবে, কি কিনবে—এইসব নিয়ে ব্যস্ত। আর নিচে কিরিস একা বসে, ধীরেসুস্থে খাচ্ছে। তার প্রতিটা মুভমেন্টে একটা পরিপাটি, নিয়ন্ত্রিত ভাব… যেন সবকিছু নিজের ছন্দে চলছে।
মাঝে মাঝে সে থেমে হালকা কফিতে চুমুক দেয়…
আর কিছুক্ষণ পর।সব গুছিয়ে, একেবারে তৈরি হয়ে, সে নিশ্চুপেই নিজের নাস্তা শেষ করতে থাকে।
ডাইনিং এরিয়ায় তখন এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ। কিরিস একা বসে ধীরে ধীরে কফিতে চুমুক দিচ্ছে, সামনে টোস্ট আর অমলেট। ঠিক তখনই ওপর থেকে হইহই শব্দ করতে করতে নেমে আসে কাবির, ইশান আর রিহান।
তিনজনই একদম রেডি—স্টাইলিশ পোশাক, চুল সেট করা, মুখে সেই চেনা দুষ্টু ভাব। ইশান এসে চেয়ারটা টেনে বসে —“ওহো… বস এখনো ব্রেকফাস্ট মোডে!”
কাবির ফলের ডালার দিকে হাত বাড়িয়ে একটা আপেল তুলে নেয় —“আমাদের জন্য কিছু রাখেন নাই নাকি?”
রিহান চেয়ার টেনে বসে হেসে বলে—
—“থাকলে তো এই লোক একা খেয়ে ফেলতো!”
কিরিস একবারও তাদের দিকে তাকায় না, শুধু কফিতে চুমুক দেয়।
—“ একটু আগে খেয়ে উঠে গেলি না! আর আমি কি খেতে বারণ করেছি, যা ইচ্ছা তাই খা।”
তিনজনই ফলের ডালা থেকে আপেল, আঙুর, কলা নিয়ে খেতে শুরু করে। কিছুক্ষণ মজা করার পর হঠাৎই তাদের কথার টোন একটু বদলে যায়। ইশান নিচু গলায় বলে
—“সব গোছানো শেষ।”
কাবির হালকা গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ে
—“গার্ডেন, এন্ট্রি, গাড়ি—সব ক্লিয়ার।”
রিহান চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলে—
—“লোকগুলোও ঠিক আছে। কোনো সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি।”
কিরিস এবার ধীরে ধীরে কফির কাপ নামিয়ে রাখে।
চোখ তুলে একবার তাকায়—তীক্ষ্ণ, হিসেবি দৃষ্টি।
—“বাইরের সিকিউরিটি?”
ইশান উত্তর দেয়—
—“ডাবল লেয়ার। কেউ ঢুকতে পারবে না চেক ছাড়া।”
একটু থেমে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি এনে বলে—
—“Everything under control… bro.”
কাবির একটু ঝুঁকে আসে—
—“আর ওই জিনিসটা… ready.”
রিহান নিচু স্বরে যোগ করে—
—“ Antidote তৈরি, bro.”
কিরিসের চোখে এক ঝলক সন্তুষ্টি খেলে যায়।
—“Good.”
একটা ছোট্ট শব্দ… কিন্তু তার মধ্যে কঠিন ভার। সে আবার খাওয়া শুরু করে, যেন কিছুই হয়নি। কাবির আবার স্বাভাবিক টোনে ফিরে আসে—
—“আজকে কিন্তু শপিংয়ে যাচ্ছি, সিরিয়াসলি কিছু কিনতে হবে!”
ইশান সাথে সাথে
—“হ্যাঁ, আজকে কোনো ছাড় নাই!”
রিহান হেসে বলে
—“বাজেট ওভার হবেই!”
পরিবেশ আবার হালকা হয়ে যায়। কিন্তু সেই কয়েকটা কথার মাঝেই লুকিয়ে থাকে অন্য এক জগৎ… যেখানে কিরিস আর তার টিম সবসময় এক ধাপ এগিয়ে। কিরিস নিজের খাওয়া শেষ করে বসে আছে। কফির কাপের শেষ চুমুক আছে। তখন উপরে একে একে সবাই রেডি হয়ে নিচে নামতে শুরু করে। প্রথমে জারা, সুরভী, আরোবি, নুসরাত, হিয়া—সবাই একেকজন একেক স্টাইলে সাজা, হাসতে হাসতে নামছে। পুরো পরিবেশটা যেন রঙিন হয়ে উঠেছে।
কিন্তু—
সিঁড়ির মাঝখানে এসে থামে লিসি।।আজ সে একদম অন্যরকম। হালকা অরেঞ্জ কালারের শাড়ি… নরম, স্নিগ্ধ একটা আভা ছড়িয়ে আছে পুরো লুকে। সাথে হালকা সোনার গয়না—কান, গলা, হাতে—সবকিছুই পরিমিত, কিন্তু রাজকীয়। লম্বা চুলটা আধখোলা, কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে… মুখে হালকা মেকআপ, কপালে ছোট্ট টিপ—
একদম নিখুঁত “বউ” লুক। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। সুরভী আস্তে বলে —“ওয়াও…”
জারা হেসে —“এইটা তো একদম কিলার লুক!”
হিয়া মজা করে —“আজকে তো কেউ বাঁচবে না!”
আরোবি লিসির দিকে হাত বারিয়ে বলে —“ ইশ আমি কেন ছেলে হলাম না,! ”
আরোবির কথায় মেয়েরা হেসে উঠে। লিসি হালকা লজ্জা পেয়ে নিচে নামতে থাকে। ঠিক তখনই কিরিসের চোখ উঠে যায় সিঁড়ির দিকে। আর সে থেমে যায়।
তার দৃষ্টি একদম স্থির হয়ে পড়ে লিসির উপর। কয়েক সেকেন্ড… কোনো শব্দ নেই। তার চোখে সেই চেনা তীক্ষ্ণতা নেই এবার বরং একটা গভীর, মুগ্ধতা মেশানো নীরবতা।
ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। কাবির পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে—
—“ভাই শেষ…”
ইশান মাথা নাড়িয়ে —“গেলো আজকে…”
রিহান হেসে —“এই লুকের সামনে কেউ টিকবে না!”
লিসি নিচে নেমে আসে, কিন্তু কিরিসের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে না। এক মুহূর্তের জন্য চোখে চোখ পড়ে লিসি দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলে। কিরিস ধীরে ধীরে বলে।
—“চলো।”
একটা শব্দ… কিন্তু তার ভেতরে অদ্ভুত একটা কোমলতা।
এরপর শুরু হয় বের হওয়ার প্রস্তুতি। এবার গার্ডেনের থেকে একে একে সুপ্রিয়া, প্রিয়া, সাবেনা, মাবেনা আর মির্জা বেগম। মির্জা বেগম আজ কয়েকদিন মেয়েদের সাথে ঘরে গল্প করে কাটিয়েছেন। সুপ্রিয়া লিসিকে দেখে এগিয়ে এসে বলে —“ এই তো রায় চৌধুরী বাড়ির বড় বউমা, একদম ঠিকঠাক, কে বলো তোমরা? ”
সাবেনা হেসে —“ আর কিছু বলার নেই বাড়ির দুই বউমাই সুন্দরী, আর এবার আরেকটা আসছে পুরো বাড়িটা পূরণ হয়ে যাবে ”
মাবেনা —“ যা বলেছিস। ”
মির্জা —“ যা তাহলে তোরা দেরি করিস না। তোদের তো আবার মার্কেট করতে গেলে হুঁশ থাকে না। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিস। ”
বাড়ির বড়দের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সবাই বাড়ির বাইরে বের হয়ে পরে। বাড়ির সামনে একের পর এক গাড়ি প্রস্তুত। সবার যে যার মতো গাড়িতে উঠতে থাকে।
সবাই যখন একে একে গাড়িতে উঠছে, তখন একটু হালকা বিশৃঙ্খলা—কে কোন গাড়িতে বসবে তা নিয়েই হাসাহাসি, টানাটানি। লিসি একটু দূরে দাঁড়িয়ে, যেন ইচ্ছা করেই অন্য গাড়ির দিকে এগোতে চায়।
জারা হাত ধরে টান দেয়
—“লিসি, তুমি আমাদের গাড়িতে আসো!”
লিসি একটু স্বস্তির হাসি দেয়
—“হ্যাঁ, আমি তোমাদের সাথেই—”
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে আসে সেই গম্ভীর, শান্ত গলা— “লিসি।”
একটা শব্দ… কিন্তু যেন সব থামিয়ে দেয়। লিসি থেমে যায়। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকায়। কিরিস গাড়ির দরজার পাশে দাঁড়িয়ে, চোখ সরাসরি তার দিকে।
—“এদিকে আসো।”
লিসি একটু অস্বস্তি নিয়ে বলে
—“আমি… ওদের সাথে গেলেই হয়…”
কিরিস ভ্রু সামান্য তোলে—
—“কেন?”
লিসি একটু জড়তা নিয়ে—
—“এমনি… সবাই মিলে গেলে ভালো লাগে…”
কিরিস ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার চোখে হালকা দুষ্টু ঝিলিক। নিচু স্বরে বলে—
—“সবাই মিলে তো সারা দিনই থাকবে… এখন আমার সাথে যেতে সমস্যা কোথায়?”
লিসি একটু রাগী গলায়
—“সমস্যা নেই… কিন্তু সবসময় আপনার সাথেই থাকতে হবে নাকি?”
কিরিস হালকা ঝুঁকে আসে
—“হ্যাঁ। তোমার ক্ষেত্রে—হবে।”
লিসি চোখ বড় করে তাকায়—
—“আপনি না একদম জোরজবরদস্তি করেন!”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হাসি এনে বলে—
—“তাহলে?”
একটু থেমে, আরও নিচু স্বরে—
—“নিজে থেকে উঠবে… না আমি তুলে নিবো?”
লিসি চারপাশে তাকায় সবাই তাকিয়ে আছে, মুখে চাপা হাসি। আরোবি ফিসফিস করে—
—“যাও যাও… নাহলে লাইভ ড্রামা হবে!”
রিহান হেসে—
—“আমরা কিন্তু রেকর্ড করবো!”
লিসি বিরক্ত হয়ে বলে—
—“তোমরা চুপ করবে!”
তারপর কিরিসের দিকে তাকিয়ে, নিচু গলায়—
—“ঠিক আছে… যাচ্ছি।”
কিরিস একপাশে সরে দাঁড়ায়। লিসি মুখ ঘুরিয়ে, হালকা রাগী ভঙ্গিতে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। কিরিস দরজা বন্ধ করে, নিজেও পাশে বসে পড়ে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই আবার হেসে ওঠে—
—“ওহহো!”
কিরিস একবারও পাত্তা দেয় না। গাড়ির ভেতরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। লিসি জানালার দিকে তাকিয়ে আছে, মুখটা একটু ফুলিয়ে। কিরিস ধীরে ধীরে বলে
—“এত রাগ?”
লিসি তাকায় না —“না।”
কিরিস মুচকি হেসে —“ভালো… কারণ সামনে অনেক সময় আছে রাগ ভাঙানোর।”
লিসি এবার চোখ ঘুরিয়ে তাকায়
—“আপনার সাথে কথা বলা মানেই ঝামেলা!”
কিরিস হালকা হেসে সিটে হেলান দেয়। আর ঠিক তখনই গাড়ি স্টার্ট নেয়। এক এক করে সব গাড়ি চলতে শুরু করে… আর তাদের দুজনের এই নীরব, দুষ্টু, টানটান মুহূর্ত নতুন একটা অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যায়। বাকিরাও বাকি দুইটা গাড়ি নিয়ে রওনা দেয়। পরপর তিনটে গাড়ি রায় চৌধুরী বাড়ির গেট দিয়ে বের হয়ে চলে যায়।
গাড়ির ভেতর হালকা নীরবতা। বাইরে রাস্তার দৃশ্য পাল্টাচ্ছে একের পর এক—কিন্তু ভেতরে যেন সময়টা একটু থমকে আছে। লিসি জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। ঠোঁট ফুলানো, চোখে স্পষ্ট অভিমান।
কিরিস পাশ থেকে একবার তাকায়… তারপর আবার সামনে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলে
—“এত চুপ কেন?”
লিসি তাকায় না —“চুপ থাকতেই ভালো লাগছে।”
কিরিস ভ্রু তোলে —“আমার সাথে বসে চুপ থাকাটা নতুন।”
লিসি একটু কটমট করে তাকায় —“সবসময় কথা বলতেই হবে নাকি?”
কিরিস হালকা হাসে —“না… কিন্তু এই মুখটা দেখে মনে হচ্ছে কেউ জোর করে তুলে এনেছে।”
লিসি সাথে সাথে —“ঠিকই ধরেছেন।”
কিরিস এবার একটু গম্ভীর ভান করে —“ওহ… তাহলে নামিয়ে দেই?”
লিসি এক সেকেন্ড থামে… তারপর মুখ ঘুরিয়ে নেয়
—“দরকার নেই।”
কিরিস আর কিছু বলে না। হঠাৎই— গাড়ি সাইডে এনে থামিয়ে দেয়। লিসি অবাক হয়ে তাকায়
—“কি হলো?”
কিরিস কিছু না বলে দরজা খুলে নেমে যায়।
—“এই! কোথায় যাচ্ছেন?”
কোনো উত্তর নেই। লিসি বিরক্ত হয়ে বসে থাকে—
—“আবার কি নতুন নাটক…”
কয়েক মিনিট পর—
কিরিস ফিরে আসে। হাতে তিন-চারটা আইসক্রিম… আর সাথে কয়েকটা চিপসের প্যাকেট। গাড়িতে উঠে এসে একদম সামনে ধরে —“নাও।”
লিসি একটু হতভম্ব —“এগুলো…?”
কিরিস স্বাভাবিক গলায় —“রাগ ভাঙানোর জিনিস।”
লিসির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি চলে আসে
—“আমি কি বাচ্চা নাকি?”
কিরিস হালকা ঝুঁকে, চোখে দুষ্টু ঝিলিক
—“হ্যাঁ। আমার কাছে তো তাই।”
লিসি এবার সত্যিই হেসে ফেলে
—“আপনি না…!”
তবুও আইসক্রিমটা নিয়ে নেয়। এক কামড় দিতেই তার মুখে সেই ছোট্ট, খুশির হাসিটা ফিরে আসে। চিপসের প্যাকেট খুলে খেতে খেতে বলে
—“ঠিক আছে… রাগ একটু কমলো।”
কিরিস তাকে দেখেই থাকে। তার চোখে সেই চেনা কঠোরতা নেই বরং একদম নরম, তৃপ্ত একটা অনুভূতি।
ধীরে বলে —“একটু?”
লিসি মজা করে—
—“হুম… পুরোটা না।”
কিরিস হেসে মাথা নাড়ে
—“বাচ্চাদের মতোই… পুরো রাগ ভাঙাতে এখনো সময় লাগে।”
লিসি চোখ ছোট করে তাকায় —“আমি কিন্তু বাচ্চা না!”
কিরিস নিচু স্বরে —“আমার কাছে… থাকলেই হলো।”
লিসি কিছু বলে না…
শুধু চুপচাপ আইসক্রিম খেতে থাকে। কিন্তু এবার তার মুখে অভিমান নেই আছে নরম একটা হাসি।
আর সেই হাসিটা দেখেই— কিরিস আবার ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। তার ঠোঁটের কোণেও তখন একটুকরো সন্তুষ্টির ছাপ যেন তার সবচেয়ে প্রিয় কাজটা সে ঠিকঠাকই করতে পেরেছে… রাগ ভাঙানো।