পর্ব :66
হলরুমের হাসাহাসি তখনো থামেনি ঠিক সেই সময় প্রিয়া রান্নাঘরের দিক থেকে এসে হাত তুলে বলে উঠল—
“এই শোনো, সবাই! অনেক আড্ডা হয়েছে—এবার খেতে আসো!”
সাথে সাথে সুরভী বলে — “ইয়েস! এইটাই তো আমরা অপেক্ষা করছিলাম!”
ইশান উঠে দাঁড়িয়ে বলে — “চলো চলো—দেরি করলে ভালো ভালো আইটেম শেষ হয়ে যাবে!”
কাবির মুখ গম্ভীর করে বলে — “আমার জন্য আলাদা করে রেখে দিস!”
জারা হাসতে হাসতে বলে — “তোর জন্য কিছুই রাখবো না!”
সবাই হাসতে হাসতে ডাইনিং এর দিকে চলে যায়।
বড় ডাইনিং টেবিলটা সাজানো—রকমারি খাবার, গরম ভাত, তারকারি, মাছঝোল, সালাদ… চারপাশে খাবারের গন্ধে ভরে গেছে পরিবেশ সবাই একে একে বসে পড়ে।
ঠিক তখনই ধীরে ধীরে এসে চেয়ার টেনে বসে কিরিস।
তার উপস্থিতিতে পরিবেশ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়, তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। সুপ্রিয়া চোখ কুঁচকে তাকিয়ে বলে—
“এই কিরিস… তুই কাবিরকে কি বলেছিস?”
টেবিলের সবাই হালকা চুপ হয়ে তাকায়।
কাবির সাথে সাথে বলে — “এই! আম্মু, তুমি আগে ওকে জিজ্ঞেস করো!”
কিরিস একদম শান্তভাবে প্লেটে খাবার নিতে নিতে বলে—
“আমি তো সত্যিটাই বলেছি।”
রিহান সাথে সাথে হেসে ফেলে।
সুপ্রিয়া ভ্রু তোলে — “কি সত্যি?”
কিরিস এবার হালকা তাকিয়ে, একদম সিরিয়াস ফেসে বলে—
“যে ওকে তুমি ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম।”
এক সেকেন্ড…
তারপর পুরো টেবিল ফেটে পড়ে হাসিতে!
সুরভী প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলে — “আমি আর পারছি না!”
ইশান টেবিল চাপড়ে বলে — “এইটা আজকের বেস্ট!”
কাবির রাগ দেখিয়ে বলে — “দেখছো আম্মু! আবার বলছে!”
সুপ্রিয়া হাসতে হাসতে বলে — “আরে পাগল, ও তোকে খেপাচ্ছে!”
কাবির মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে — “আমি কারো সাথে কথা বলবো না!”
কিরিস এবার একটু নরম হয়ে তার প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলে—
“খা আগে… না খেলে কালকে মার্কেটে যাওয়ার এনার্জি পাবি না।”
কাবির একটু তাকিয়ে থাকে… তারপর চুপচাপ খাওয়া শুরু করে। রিহান হেসে বলে — “দেখ, পাঁচ মিনিটেই রাগ গায়েব!”
জারা বলে — “এইটাই হচ্ছে ভাইদের ভালোবাসা!”
লিসি চুপচাপ বসে সব দেখছে তার ঠোঁটের কোণে নরম হাসি। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো তার ভেতরে অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। খাওয়া চলতে থাকে মাঝে মাঝে ঠাট্টা, হাসি, গল্প… কেউ কারো প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে, কেউ আবার মজা করে কারোটা চুরি করছে।
একটা একদম পারফেক্ট ফ্যামিলি ডিনার।
—
খাওয়া শেষ হলে সবাই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
কেউ পানি খায়, কেউ সোফায় গিয়ে বসে। হলরুমে আবার একটু আড্ডা জমে, তবে আগের মতো জোরে না ক্লান্তি এসে গেছে সবার মাঝে। সুরভী হাই তুলে বলে, — “আমি সত্যি আর পারছি না… ঘুম পাচ্ছে খুব।”
হিয়া বলে — “চল, আজ এখানেই শুয়ে পড়ি।”
ইশান বলে — “হলরুম ক্যাম্পিং—পারফেক্ট!”
আনোয়ার এবার উঠে কড়া আদেশের সুরে বলে —“ নাহ সবাই ঘরে গিয়ে ঘুমাও, কালকে আবার মার্কেটে যাবে সবাই, সকাল সকাল উঠতে হবে তাই ভালে ঘুম দরকার, যাও সবাই নিজের ঘরে। ”
সবাই আর কিছু বললো না, যে যার মতো উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। ধীরে ধীরে পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। যে যার ঘরে চলে গেছে… আলো নিভে এসেছে বেশিরভাগ জায়গায়। শুধু করিডোরের হালকা হলুদ আলোটা জ্বলছে—নরম, শান্ত। সেই করিডোরেই দাঁড়িয়ে আছে লিসি। কিরিসের ঘরের সামনে। দরজার দিকে তাকিয়ে… আবার চোখ নামিয়ে নেয়। নিজের হাত দুটো একসাথে জড়িয়ে ধরে—হালকা নার্ভাস।
মনে মনে নিজেকেই বলছে—
“এটাই তো এখন আমার ঘর… ঢুকতেই পারি…”
একটু থামে। আবার মনে হয়—
“কিন্তু… এভাবে ঢোকা ঠিক হবে তো?”
তার বুকের ভেতর ধকধক করছে।
বিয়ের দ্বিতীয় দিন…
সবকিছু চেনা হয়েও যেন এখনো নতুন, অচেনা। সে একটা গভীর নিঃশ্বাস নেয়। ধীরে হাত বাড়িয়ে দরজাটা ঠেলে খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
—
ঘরের ভেতর নরম আলো।
কিরিস বিছানার পাশে সোফায় বসে আছে—ল্যাপটপটা একপাশে রাখা, যেন কাজ শেষ করেছে একটু আগেই।
দরজার শব্দে সে মুখ তোলে। চোখ গিয়ে থামে লিসির উপর। এক সেকেন্ড নীরবতা।
লিসি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে… কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পায় না। কিরিস হালকা ভ্রু তুলে বলে—
“দাঁড়িয়ে থাকবে… নাকি ভেতরে আসবে?”
তার গলায় হালকা মজা। লিসি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে
— “আমি… মানে… আমি তো।”
কিরিস হালকা হেসে বলে — “এই ঘরটা কি তোমার না?”
কথাটা এত সহজভাবে বলে যেন সব দ্বিধা এক মুহূর্তে ভেঙে যায়। লিসি ধীরে ধীরে ভেতরে আসে। দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দেয়। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে… তারপর গিয়ে বিছানার এক কোণে বসে পড়ে।
আবার নীরবতা। কিরিস তার দিকে তাকিয়ে থাকে—
চোখে সেই গভীর, পড়তে না পারা দৃষ্টি।
—“এত চুপ কেন?”
লিসি নিচের দিকে তাকিয়ে বলে — “কিছু না…”
কিরিস একটু এগিয়ে আসে।
— “কিছু না মানে?”
লিসি এবার হালকা মুখ তুলে তাকায় চোখে মিশে আছে লজ্জা, দ্বিধা, আর অল্প অভিমান।
— “সবকিছু… নতুন লাগছে।”
কিরিস কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর খুব নরম গলায় বলে— “নতুন জিনিসগুলোই একসময় নিজের হয়ে যায়।”
লিসির বুকটা কেমন হালকা হয়ে যায় কথাটা শুনে।
কিরিস একটু কাছে এসে বসে— দুজনের মাঝের দূরত্বটা কমে যায়।
— “তুমি ভয় পাচ্ছ?”
লিসি ধীরে মাথা নাড়ে — “না… ভয় না… শুধু…”
কথা শেষ করতে পারে না। কিরিস মুচকি হেসে বলে—“অভ্যাস হয়ে যাবে।”
একটু থেমে—
“আমার সাথে।”
লিসির চোখে হালকা ঝিলিক আসে। ঘরের নরম আলো, রাতের নিস্তব্ধতা সবকিছু মিলে মুহূর্তটা অদ্ভুত শান্ত হয়ে ওঠে। বাইরে হালকা বাতাসে পর্দা দুলছে…
আর ভেতরে দু’জন মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরের কাছে আসার অভ্যাস শিখছে। ঘরের ভেতরটা তখন একদম নীরব… নরম আলোয় কিরিস আর লিসি একে অপরের খুব কাছে বসে। কথা থেমে গেছে—কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই অদ্ভুত এক টান। কিরিস ধীরে ধীরে একটু এগিয়ে আসে। তার দৃষ্টি স্থির—সোজা লিসির চোখে। লিসির নিঃশ্বাস কেমন যেন আটকে আসে…
সে একটু পেছাতে চায়, কিন্তু পারে না।
কিরিস নিচু গলায় বলে— “এত দূরে বসে থাকলে তো অভ্যাস হবে না…”
লিসির গাল লাল হয়ে ওঠে।
— “আমি… ঠিক আছি…”
কিরিস মুচকি হেসে বলে— “আমি তো ঠিক নেই।”
এই বলে সে আলতো করে লিসির হাতটা ধরে।
একটা নরম টান— লিসি হালকা দুলে এসে আরও কাছে চলে আসে। দুজনের মাঝে এখন এক ফোঁটা দূরত্বও নেই প্রায়…লিসির চোখ নিচু, ঠোঁট কাঁপছে হালকা।
কিরিস ধীরে বলে— “এভাবে পালালে হবে?”
লিসি কিছু বলতে যায় ঠিক তখনই—
টক টক!
দরজায় হঠাৎ টোকা পড়ে। লিসি এক ঝটকায় সরে গিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে!
চোখ বড় বড়— “আল্লাহ! কেউ দেখে ফেললে কি হবে!”
তার মুখের সেই ভয় পাওয়া এক্সপ্রেশন দেখে কিরিস এক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে…
তারপর হঠাৎ হেসে ফেলে।
— “এই পাগলী…”
সে হেসেই বলে— “এখন তুমি আমার বউ… প্রেমিকা না!”
লিসি একদম থমকে যায়।
— “মানে?”
কিরিস উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে—
চোখে দুষ্টু ঝিলিক।
— “মানে—ধরা পড়লে এখন কেউ কিছু বলবে না… বরং বলবে—ঠিকই আছে!”
লিসি লজ্জায় গাল ঢেকে ফেলে — “উফ! আপনি না…”
আবার দরজায় টোকা— “ভাইয়া… ঘুমাওনি তো?”
বাইরে থেকে ইশানের গলা। কিরিস হালকা গলা উঁচু করে বলে— “কি হয়েছে?”
ইশান বাইরে থেকে বলে — “ওই… কাবির বলছে সে তোমার সাথে কথা বলবে না—এইটা ফাইনাল জানিয়ে দিলাম!”
ভেতরে এক সেকেন্ড নীরবতা— তারপর কিরিস হেসে বলে — “ঠিক আছে… ওকে বল আমি ঘুমিয়ে গেছি!”
লিসি মুখ চেপে হাসে।
বাইরে থেকে ইশান বলে — “ঠিক আছে! ও তো আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে নাটক করতে করতে!”
পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে যায়। ঘরের ভেতর আবার শান্তি নেমে আসে। লিসি ধীরে কিরিসের দিকে তাকায়—
“আপনাদের বাসা একদম আলাদা…”
কিরিস ভ্রু তুলে বলে — “ভালো না?”
লিসি মুচকি হেসে বলে — “অনেক ভালো…”
কিরিস একটু ঝুঁকে আসে নিচু গলায় বলে — “তাহলে অভ্যাস শুরু করে দাও…”
লিসি লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয় কিন্তু এবার আর দূরে সরে যায় না। আর সেই নরম, দুষ্টু, মিষ্টি রাতটা ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে ওঠে…
রাতের নিস্তব্ধতা ঘরের কোণে ভেসে আসছে। কিরিস ল্যাপটপের স্ক্রিনে ডুবে কাজ করছে, চোখের পাতার নিচে হালকা ছায়া। মন শান্ত, কিন্তু সজাগ। লিসি কিছু না বলে চুপচাপ বসে ফোন দেখছে খাটের কোণে।
কিরিস এক নজর তাকিয়ে চুপচাপ হাসে। একটু পরে লিসি ধীরে ধীরে উঠে ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়—ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে ফিরে আসে। কিরিস ল্যাপটপ বন্ধ করে পাশে চলে আসে। কিরিস লিসির কাছে এসে বলে —“ কি ব্যাপার একটুর মধ্যেই অভ্যাস হয়ে গেছে, আর কোনো অভিযোগ নেই? ”
লিসি— “ অভিযোগ নেই মানে কি! যা অভিযোগ আছে তা আপনি শুনলে ফুরাবে না, আর আপনি কবে বা আমার কথা শুনেছে, অসভ্য বেডা লোক ”
কিরিস লিসির কথায় মাথা নাড়িয়ে বলে —“ হুম তুমি তো যানো আমি অসভ্য, কিন্তু এখন কিন্তু আমি তোমার অসভ্য স্বামী তাই যা বলবে ভেবে বলবে! ”
লিসি একটু সরে গিয়ে বলে —“ একদম কাছে আসবেন না, আমি তো আজকেও আসতাম না এ ঘরে কিন্তু আপনি যা মানুষ আবার যদি তুলে আনেন ”
কিরিস নড়ে বসে বলে —“ হুম তুলে তো আনতাম কিন্তু আজকে আর ছেড়ে দিতাম না তোমাকে, সুইটহার্ট, একদম বাসর করে ফেলতাম, ”
লিসি একটু গাল ফুলিয়ে বলে —“ দেখেছেন আপনি কি অসভ্য, ”
কিরিস —“ নিজের বউ এর সাথে অসভ্যতামি করবো না তো কার সাথে করবো, বাইরের লোকের সাথে ”
কিরিস এবার লিসির আরো কাছে সরে আছে নেশালো কন্ঠে ঘোর লাগা চোখে বলে—“ আমি যে ঠিক কতটা অসভ্য তুমি জানো না সুইটহার্ট! যেদিন জানবে সেদিন তোমার লজ্জা থাকবে না ”
লিসি কিরিসের বুকে হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলে —“ দুরে যান, কাছে আসবেন না ”
কিরিস একটু চোখ ছোট করে বলে —“ তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না তুমি এখনো আমাকে ভয় পাও। বেশ কথা বলছো তো দেখছি ”
লিসি উত্তর দিয়ে বলে —“ ভয় পেয়ে আর কি করবো? আপনি কি আমাকে ছাড়বেন ”
কিরিস —“ হুম এবার বুঝেছো, তোমাকে তো আমি বিয়ে করেছি তাই না ”
এবার লিসি একটু জেদ মেশানো স্বরে বলল—
“আপনি তো জোর করে বিয়ে করেছেন… পাপ করেছেন… আমাকে ভালোবেসে ?”
কিরিস হেসে বলে, “ পাপ, হুম করেছে। তোমাকে ভালবাসতে হলে যদি আমাকে পৃথিবীর সবথেকে সর্বোচ্চ পাপিষ্ঠ ব্যক্তি হতে হয় তাতেও আমি রাজি আর সেখানে তো এতোটুকু পাপ কিছুই না ”
কিরিস একটু থামল। ঠোঁটের কোণে সেই রহস্যময়, তীক্ষ্ণ হাসিটা আরও গাঢ় হলো। তারপর ধীরে, ভারী কণ্ঠে বলল—
“পাপ বলছো? লিসি… তোমাকে ভালোবাসা যদি পাপের শিরোমণি হয়, তবে সেই পাপের অগ্নিস্নান আমি বহু আগেই সম্পন্ন করেছি।
যেদিন প্রথম তোমার নিষ্পাপ মুখে বৃষ্টির জলের স্পর্শ দেখেছিলাম, সেদিনই আমার অন্তর শুদ্ধতা বিসর্জন দিয়ে তোমার নামে কলুষিত হয়ে গেছে। সেই দিন থেকেই আমি পাপী—তোমার রূপের কাছে, তোমার অস্তিত্বের কাছে, তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের কাছে।
এই পৃথিবীর ধর্ম, নীতি,শাস্ত্র—সবকিছু যদি একত্রে দাঁড়িয়ে আমাকে অপরাধী ঘোষণা করে, তবুও আমি বিন্দুমাত্র বিচলিত হবো না। কারণ আমি জানি, এই পাপই আমার একমাত্র পূণ্য… এই অপরাধই আমার একমাত্র মুক্তি।
তাই শোনো—
তোমাকে ভালোবাসা যদি মহাপাপ হয়, তবে আমি সেই পাপের অমর সাধক।
আর এই পাপের শাস্তি যদি তোমাকেই চিরকাল নিজের করে পাওয়া হয়…
তবে আমি হাজারবার, লক্ষবার সেই শাস্তি বরণ করতে প্রস্তুত।”
লিসি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো কিরিসের দিকে… চোখে অদ্ভুত এক আলো, লাজ, ভয় আর জেদের মিশ্রণ। তারপর ধীরে, কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলল—
“পাপ যখন সজ্ঞানে গ্রহণ করা হয়… তখন তার দহনও অমৃতসম লাগে। কিন্তু যে পাপে অন্যের ইচ্ছা বন্দী হয়… সে পাপ মধুর নয়, সে শুধু অমৃত ।”
কথাটা বলেই লিসি চোখ নামিয়ে নিল।
আর কিরিস… একটুও অবাক হলো না।
বরং ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো যেন এমন উত্তর শোনার জন্য সে আগেই প্রস্তুত ছিল। এবার আবার
লিসি মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, ঠোঁট ফুলিয়ে
— “জোর করে বিয়ে করেছেন… এখন আবার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না। আমি কিন্তু একদমই সহ্য করবো না।”
কিরিস ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এল, চোখে দুষ্টু ঝিলিক
— “সহ্য করবে না? আচ্ছা… না-ই করো। কিন্তু আমি তো থামবো না, লিসি।”
লিসি ঘুরে তাকাল, ভ্রু কুঁচকে
— “আমি কিন্তু সত্যি বলছি, কাছে আসবেন না!”
কিরিস আরেকটু ঝুঁকে, নিচু স্বরে
— “আর আমি-ও সত্যি বলছি… আমি তো আসবোই।”
লিসি একটু পেছাতে গেল, কিন্তু দেয়ালে আটকে গেল
— “আপনি একদম অসভ্য!”
কিরিস হেসে ফেলে
— “তোমার স্বামী হয়ে একটু অসভ্য না হলে চলে?”
লিসি চোখ বড় বড় করে তাকাল
— “স্বামী হয়েছেন বলে সবকিছু করবেন নাকি?”
কিরিস ফিসফিস করে
— “সবকিছু না… শুধু যেগুলো তোমাকে লজ্জা দেয়, সেগুলোই।”
লিসির গাল লাল হয়ে গেল, কিন্তু মুখে জেদ
— “আমি কিন্তু ভয় পাই না!”
কিরিস মুচকি হেসে আরও একটু ঝুঁকে—
“জানি… তবুও কাঁপছো কেন, হুম?”
লিসি এবার একদম চুপ… আর কিরিসের চোখে সেই পরিচিত দুষ্টু, গভীর ভালোবাসার ছাপ—যেখানে জোরও আছে, আদরও আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার হালকা টোকা। সুপ্রিয়া এসে বলল — “ কিরিস এই কিরিস,, ভিতরে আসতে পারি?”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে বলে — “আসো!”
কিরিস হেসে মুখ তুলে বলে
— “নক করার কি আছে? ভিতরে আসো ?”
সুপ্রিয়া হেসে মাথা নাড়িয়ে বলে
— “এখন তো বিয়ে করেছিস… নক করার দরকার নেই। ভুল সময় চলে যাবে, পরে মাকে দোষ দিবি।”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানল
— “মা….. কথাটা ঠিক ”
সুপ্রিয়া মুচকি হাসলো লিসি চুপ করে আছে, তখন সুপ্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে কমলাকে ডাক দেয়, কমলা তখন একগাদা গহনার বাক্স বয়ে আনে। খাটের পাশে রাখে।
কমলা বক্স গুলো রেখে বলে —“ বাবা কতোগুলো আমার পানির টান লাগলো, আমি গেলাম ”
বলে সে চলে যায় সুপ্রিয়া এগিয়ে গিয়ে বলে
— “লিসি, এগুলো সব আমি কিরিসের বউয়ের জন্য রেখেছিলাম… আর এখন এগুলো তোমার।”
লিসি প্রথমে লজ্জায় হাত আটকে রাখে কি বলবে ভেবে পারছে না, এতগুলো গহনা সুপ্রিয়া তার হাতে হাত রেখে বলল — “দেখো, এখন তুমি বড় বৌমা। আর কাবির তোমার ছোট দেবর। তার ছোট দেবরের বিয়েতে তোমার অনেক দায়িত্ব থাকবে। আমি যে চুড়ি দিয়েছে —ওই দুটো সবসময় পড়বে। প্রত্যেকটা অনুষ্ঠান চলাকালীন তুমি পরে থাকবে। যারা তোমাকে দেখেই বোঝা যায় তুমি রায়চৌধুরী বাড়ির বউ...... বড় বউ। ”
লিসি চোখে আড়ম্বরপূর্ণ হাসি দিয়ে বলে,
— “হ্যাঁ, আমি করব। আমি চেষ্টা করব।”
সুপ্রিয়া —“ আর গয়না গুলো পছন্দ হয়েছে তো! খুলে খুলে সবকয়টা দেখে নেবে, অনেক আগে করে বানিয়ে ছিলাম তো, যদি কোনটা ভালো না লাগে আমাকে বলবা আবার নতুন করে বানিয়ে দেব। ”
লিসি মুখে একটা স্বাভাবিক হাসি রেখে সন্তুষ্টির সুরে বলে —“ কেন পছন্দ হবে না মায়ের দেওয়া জিনিস কখনো কি খারাপ হয়! ”
সুপ্রিয়া খুশিতে মুচকি হাসে লিসির মুখে মায়ের কথা শুনে কিরিস ও লিসির দিকে একবার তাকায় তারপর নিজের জায়গায় গিয়ে বসে আবার ল্যাপটপ নিয়ে। সুপ্রিয়া তো খুশিতে বলে উঠে —“তাহলে প্রথমবার আম্মু বলে ডাকলে! আরেকবার ডাকো ।”
লিসি মৃদু কণ্ঠে বলে — “ আম্মু।”
সুপ্রিয়ার চোখে আনন্দ—শেষ অবশেষে তার বউমা তাকে আম্মু বলে ডাকলো। কিরিস মৃদু হেসে ল্যাপটপের দিকে ফিরে যায়, আবার কাজ শুরু করে।
সুপ্রিয়া —“ তাহলে সুয়ে পরো আমি গেলাম,কালকে তো আবার সকাল সকাল উঠতে হবে, সব কাজ বাকি আছে।”
সুপ্রিয়া তখন ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, আর লিসি—খুশি, স্বস্তিতে বসে থাকে। রাতের শান্তি আবার ঘরের চারপাশে নেমে আসে। হল কেবল আলো, নিঃশ্বাস, আর তাদের ছোট ছোট হাসি।
চারপাশে এক ধরনের নীরবতা, শুধু হালকা বাতাসে পর্দার দুলে ওঠা। সুপ্রিয়ার দেওয়া গহনার বক্সগুলো বুকে আগলে লিসি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। এতদিন আলমারি থেকেই কাপড় নিয়েছে… কিন্তু আজ—প্রথমবার সে পা বাড়াল ড্রেসিং রুমের দিকে। দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। বিশাল একটা জায়গা… যেন ছোটখাটো একটা আলাদা জগৎ। চারপাশে নরম আলো, দেয়ালজুড়ে কাঁচের শেলফ, সারি সারি হ্যাঙ্গারে ঝুলছে কিরিসের নিখুঁতভাবে গুছানো শার্ট, স্যুট, কোট… সবকিছু এত পরিপাটি যেন কোনো শোরুম।
আর ঠিক পাশেই লিসির জন্য আলাদা করে সাজানো এক রাজ্য। শাড়ি… রঙের পর রঙ, নরম রেশম, জমকালো কাজ করা বেনারসি…
জামাকাপড়, ওড়না, স্যান্ডেল, হিল—একটা মেয়ের যা যা দরকার, সব। রেশমি চুড়ি, ছোট ছোট গয়না—সবকিছু এত যত্নে সাজানো, যেন বহুদিন ধরেই কেউ অপেক্ষা করে রেখেছে। লিসির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল…
মুহূর্তের জন্য সে ভুলেই গেল শ্বাস নিতে। এই পুরো বাড়িতে শুধুমাত্র কিরিসের ঘরেই এমন একটা ড্রেসিং রুম…
আর তার ভেতরে—তার জন্য এতকিছু?
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সে গহনার বক্সগুলো একটা শেলফে রাখল। হাত বুলিয়ে দেখল একটা শাড়ি… যেন নিজের না, স্বপ্নের কিছু ছুঁয়ে দেখছে। একটু থেমে… গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
ঘরে এসে দেখল।কিরিস সোফায় হেলান দিয়ে বসে, ল্যাপটপে কিছু কাজ করছে। আলোটা তার মুখে পড়ছে, চোখ দুটো গভীর, মনোযোগী। লিসির পায়ের শব্দে সে চোখ তুলে তাকাল।
— “কি হলো?”
তার কণ্ঠ স্বাভাবিক, কিন্তু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি—
— “পছন্দ হয়েছে তো?”
লিসি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল… এখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। কিরিস ল্যাপটপটা বন্ধ করে ধীরে উঠে দাঁড়াল, তার দিকে এগিয়ে এসে থামল—
— “সব… তোমার জন্যই।”
লিসির চোখে আবার সেই বিস্ময়… আর কোথাও খুব গভীরে, অদ্ভুত এক নরম অনুভূতি ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে। লিসি নিচু সুরে, একটু দ্বিধা নিয়ে বলল
— “আপনি কি করে এইসব… রেখেছেন?”
কিরিস শান্ত গলায় উত্তর দিল
— “বিয়ে করলে তো এইসব লাগে… আর আমার বউ বলে কথা, তার জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জিনিসটাই গুছানো থাকবে।”
লিসি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করল
— “আপনি আমার জামা কাপড়ের সাইজ কি করে জানেন?”
কিরিস ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বলল
— “আমি শুধু তোমার জামা কাপড়ের সাইজ জানি না… তোমার পায়ের জুতার, তোমার হাতের চুড়ির, তোমার আঙুলের মাপ—কোন আংটি তোমার হাতে ঠিকঠাক বসবে, সেটাও জানি… এমনকি—”
কিরিস একটু থামল… ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসিটা আরও গাঢ় হলো। চোখ এক মুহূর্তের জন্য লিসির দিকে নেমে এলো। লিসি সঙ্গে সঙ্গে হাত দিয়ে বুক ঢেকে, চোখ রাঙিয়ে বলল— “লুচ্চা বেডা! কোথায় তাকাচ্ছেন? চোখ নিচে নামান!”
কিরিস হেসে ফেলল, একদম নির্ভীক ভঙ্গিতে—
“চোখ নামাবো কেন? নিজের বউকে দেখছি… এতে আবার লজ্জা কিসের?কোনো অপরাধ করছি নাকি?”
লিসি মুখ ঘুরিয়ে নিল, গাল টকটকে লাল—
“আপনি একদমই অসভ্য!”
কিরিস ধীরে ধীরে একটু ঝুঁকে এল, গলায় নরম দুষ্টামি
— “অসভ্য না হলে কি আর এতদিনে তোমার সব মাপ জানা যেত?”
লিসি চমকে তাকাল— “মানে?!”
কিরিস হালকা হেসে বলল
— “মানে… আমার জিনিসের খেয়াল রাখতে হয়, তাই আগে থেকেই সব জেনে রাখা ভালো।”
লিসি রাগ দেখাতে গিয়ে নিজেই গুলিয়ে গেল
—“আমি আপনার কোনো জিনিস না!”
কিরিস চোখে গভীরতা নিয়ে, ধীরস্বরে
— “হয়েছো… অনেক আগেই। শুধু তুমি এখনো বুঝতে দেরি করছো।”
লিসি থেমে গেল… আর কিরিসের চোখে সেই পরিচিত দুষ্টু-মায়া মেশানো দৃষ্টি যেখানে অধিকার আছে, আবার অদ্ভুত এক নরম ভালোবাসাও লুকিয়ে আছে।লিসি আর কিছু বলল না…
মুখটা হালকা ঘুরিয়ে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে লাগল। তার চোখে-মুখে এখনো লজ্জা আর অস্বস্তির ছাপ, কিন্তু ঠোঁটের কোণে কোথাও যেন একটুখানি চাপা অনুভূতি লুকিয়ে আছে।
ঘরের ভেতরটা হঠাৎ করেই চুপচাপ হয়ে গেল…
শুধু চুল আঁচড়ানোর হালকা শব্দ। কিরিস কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে লিসির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কোনো কথা না বলে ধীরে ঘুরে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দে লিসি একবার আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল… গাল দুটো এখনও লাল, চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক। সে নিঃশ্বাস ফেলল ধীরে… কিন্তু কিছু বলল।
রাতটা ধীরে ধীরে আরও নীরব হয়ে উঠেছে…
লিসি চুলগুলো আলতো করে গুছিয়ে বেণী করে নিল। তারপর খাটের এক পাশে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ল, মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে— যেন একটু দূরত্ব রেখেই ঘুমোতে চায়। কিছুক্ষণ পর কিরিস ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে। এক ঝটকায় ঘরের লাইট অফ হয়ে গেল— চারপাশে শুধু মৃদু অন্ধকার। খাটে উঠে সে লিসির পাশে শুয়ে পড়ল। প্রথমে কিছুই করল না…
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই হঠাৎ করে হাত বাড়িয়ে লিসির কোমর জড়িয়ে নিজের দিকে টেনে নিল। লিসি চমকে উঠল — “এই… কি করছেন! একটু দূরে থাকুন!”
কিরিস তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল— “অভ্যাস… এটা ছাড়া আমার ঘুম আসে না।”
লিসি থমকে গেল, লজ্জা আর অস্বস্তি মিলিয়ে গলা কাঁপছে— “অভ্যাস মানে? এসব আবার কেমন অভ্যাস!”
কিরিস হালকা হেসে কিছু না বলে উঠে নিজের শার্টটা খুলে পাশে ফেলে দিল। লিসি আরও অবাক
— “আপনি… আপনি জামা খুললেন কেন?!”
কিরিস নির্বিকার স্বরে —“জামা পরে ঘুমাতে পারি না।”
লিসির গাল লাল হয়ে গেল অন্ধকারেও— “আপনি একদম…!”
কথাটা শেষ করতে পারল না সে। কিরিস তখন পিছন দিক থেকে তাকে আরও কাছে টেনে নিল, তার বুকের সাথে একদম লাগিয়ে কোমরে হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। লিসি একটু নড়াচড়া করল, কিন্তু ছাড়ানোর চেষ্টা করল না… শুধু খুব আস্তে বলল— “ছাড়ুন…”
কিরিস নিচু স্বরে বলল— “ঘুমাও।”
তার কণ্ঠে এমন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা…
যেন এভাবেই তাকে কাছে রেখে ঘুমানোই তার স্বাভাবিক, নিজের মতো করে ভালোবাসার একমাত্র উপায়।
লিসি চুপ হয়ে গেল…
আর অন্ধকারের মধ্যে— দু’জন একদম কাছাকাছি, এক নিঃশ্বাসের দূরত্বে… নীরব রাতটা ধীরে ধীরে তাদের দু’জনকেই ঘুমের মাঝে জড়িয়ে নিল।
সকালটা নরম আলোয় ভরে উঠেছে…
কিরিস এখনো গভীর ঘুমে, লিসিকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে। তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে লিসির ঘাড়ে লাগছে। লিসির ঘুম ভাঙল…
চোখ মেলে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে উঠতে গেল।
কিন্তু…
কিরিসের হাতটা আরও শক্ত হয়ে গেল কোমরে।
লিসি হালকা অবাক হয়ে তাকাল
—“এই… ছাড়ুন… উঠতে হবে তো…”
কিরিস আধো ঘুমের মধ্যে, চোখ না খুলেই বলল
— “না… কোথাও যেতে দিবো না…”
লিসি একটু হেসে ফেলল, তারপর খুব নরম, মিষ্টি গলায় বলল— “ছাড়ুন… নিচে যাবো না? সবাই উঠেছে…
আর এখন আমি তো আপনার বউ তাই না, নিচে না গেলে হবে! …”
কথাটা বলেই লিসি কিছু একটা ভাবলো এই পাগলকে মানানোর একটাই উপায় সেটা হচ্ছে ভালোবাসা,তাই সে আলতো করে ঝুঁকে কিরিসের কপালে একটা মিষ্টি চুমু দিল। কিরিস চোখ খুলল ধীরে… তার ঠোঁটে হালকা হাসি
— “এটা না… এখানে…”
সে হাত দিয়ে ইশারায় নিজের ঠোঁটের দিকে দেখাল।
লিসি লজ্জা পেয়ে হালকা হেসে ফেলল
— “আপনি একদমই…!”
তবুও… একটু ঝুঁকে খুব আলতো করে তার ঠোঁটে একটা ছোট্ট চুমু দিল। কিন্তু কিরিস তাতেই থামল না—
সে লিসির ঠোঁটটা একটু শক্ত করে ধরে রাখল কয়েক মুহূর্ত…
যেন ছেড়ে দিতে চাইছে না। লিসি হালকা ধাক্কা দিয়ে সরে গেল— “এবার ছাড়ুন!”
কিরিস এবার আস্তে করে ছেড়ে দিল।
লিসি উঠে দাঁড়াল, গাল লাল… একবার পেছনে তাকাল, কিরিস এখনো শুয়ে, চোখে সেই দুষ্টু-মায়া ভরা হাসি।
লিসি তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিল, জামা কাপড় বদলে নিলো ঘর থেকে বের হওয়ার আগে কিরিসের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকায় নিজের মনে অজান্তেই মুখ দিয়ে আস্তে বেরিয়ে যায়— “ কি সুন্দর লাগছে ওনাকে! কতটা নিষ্পাপ লাগছে ঘুমিয়ে থাকতে দেখতে। কিন্তু চোখ খুললেই আবার সেই রাক্ষসের মত ছিটখিতে। ”
তারপর আর কোনো কথা না বলে নিচে চলে গেল। আর কিরিস… এখনো খাটে শুয়ে, এক হাত মাথার নিচে— ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে, যেন সেই মুহূর্তটাই মনে মনে আবার উপভোগ করছে।
নিচে হলরুমে তখনও কেউ ঘুম থেকে উঠে নাই সকাল ৭ টা বাজে কেবল,, রান্নাঘরে শুধু সুপ্রিয়া আর প্রিয়া দু’জনেই ব্যস্ত চায়ের কেটলি চড়ানো, কাপ সাজানো, হালকা গল্প… সব মিলিয়ে একটা মিষ্টি পারিবারিক আবহ। আর বাড়ির কাজের লোকেরা বাদবাকি টুকটাক কাজগুলো করে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই লিসি ধীরে ধীরে নিচে নামল। প্রিয়া তাকিয়ে হেসে বলল— “আরে লিসি! উঠেছো? এসো এসো, চা বানাতে সাহায্য করো।”
লিসি একটু লজ্জা নিয়ে এগিয়ে গেল— “হুম… আমি দিচ্ছি।”
সে কাপগুলো সাজাতে লাগল, চা ঢালতে লাগল সাবধানে। এমন সময় একে একে কাজিনরাও এসে হাজির— নুসরাত, রিহান, কাবির, সুরভী—সবাই ঘুম চোখে, কিন্তু মুখে হাসি। রিহান হাই তুলে বলল—
“চা ছাড়া সকালই শুরু হয় না!”
নুসরাত মজা করে— “আজকে দেখি লিসির হাতের চা! স্পেশাল হবে কিন্তু! ”
তারপর প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে —“ মা আমি কিন্তু আজ আর রান্না ঘরে সাহায্য করলাম না ”
প্রিয়া হেসে বললো — “ আরে ঠিক আছে। তুমি আজকে বসে থাকো। ”
আরোবি লিসির দিকে তাকায় বলে উঠে —“ ওই বড় ভাবি আমার চায়ে চিনি দেবে বেশি করে, আমি কিন্তু মিষ্টি বেশি খায় ”
লিসি হেসে মাথা নেড়ে চা এগিয়ে দিল একে একে সবার হাতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই যার যার কাপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল কেউ সোফায়, কেউ নিচে, কেউ আবার গল্পে মেতে উঠল। লিসি দুটো কাপ হাতে নিল আলাদা করে। প্রিয়া জিজ্ঞেস করল— “ওগুলো কার জন্য?”
লিসি নরম গলায় বলল—
“আব্বু আর ছোট আব্বুর জজন্য … গার্ডেনে আছে না?”
লিসির কথায় পুরো হলরুমটা চুপ হয়ে গেলো কাজিনরা একসাথে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। ইশান —“ তাহলে অবশেষে লিসি শশুর–শাশুড়িকে বাবা মা বলে ডাক লই! ”
জারা— “ হ্যাঁ, আর ডাকবে না কেন! ”
তখন সুপ্রিয়া হেসে বলে —“ হুম হয়েছে, ওকে আর লজ্জা দিও না, যা তোর আব্বু আর ছোট আব্বুকে চা দিয়ে আয়। ”
লিসি মুচকি হেসে মাথা নেড়ে গার্ডেনে দিকে চলে যায়।

0 Comments