তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :77

মার্ক ফাইল খুলে বলতে লাগলো
—“ দুবাইয়ের শিপমেন্ট আজ রাতেই ক্লিয়ার হবে। তবে নতুন যে লোকটা এসেছে ওকে আমি পুরোপুরি ট্রাস্ট করছি না। আর— ”
কিরিস হঠাৎ ধীরে বলে উঠলো—
—“ ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করাও। পরিবারের সবাই পর্যন্ত। ”
—“ অলরেডি করছি। ”
কথাগুলো বলতে বলতেও কিরিসের চোখ আবার লিসির দিকে চলে গেলো। ঠিক তখন লিসি বড় খুন্তিটা সামলাতে গিয়ে একটু কষ্ট পাচ্ছিল। হাঁড়িটা এত বড় যে নাড়তে শক্তি লাগছে। কিরিসের ভ্রু হালকা কুঁচকে গেলো।
সে চেয়ার থেকে একটু সামনে ঝুঁকল। মার্ক সেটা দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো।
—“ বস… আপনি চাইলে আমি গিয়ে হেল্প করি! ”
কিরিস ধীরে চোখ তুলে তাকালো। একটা মাত্র দৃষ্টি।
ব্যস।মার্ক সাথে সাথে গলা পরিষ্কার করে সোজা হয়ে বসে পড়লো —“ মানে… আমি ফাইলটাই বলছিলাম। ”
ওপাশে গাছের ছায়ার নিচে বসা ছেলেরা নিজেদের গল্পে ব্যস্ত। মেয়েরা হাসাহাসি করছে। বড়রা আয়োজন সামলাচ্ছে। আর এইসব কোলাহলের মাঝেও কিরিসের চারপাশে যেন আলাদা একটা স্থিরতা। তার সামনে খোলা ফাইল, ফোনে একের পর এক মেসেজ আসছে, মানুষজন অপেক্ষা করছে সিদ্ধান্তের জন্য… তবুও তার দৃষ্টি বারবার ফিরে যাচ্ছে আগুনের পাশে বসে থাকা শাড়ি পরা মেয়েটার দিকে। যেন সেই দৃশ্যটাই তার দিনের সবচেয়ে শান্ত জায়গা।
গার্ডেনজুড়ে তখন এক অদ্ভুত শান্ত অথচ উৎসবমুখর পরিবেশ। সকালের রোদের তীব্রতা গাছের ঘন পাতার আড়ালে এসে নরম হয়ে গেছে। বাতাসে কাঁচা হলুদ, নারকেল আর দুধের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। দূরে বাড়ির সামনের দিক থেকে মাঝেমধ্যে হাসির শব্দ, কারো ডাকাডাকি, আবার কোথাও থালাবাসনের টুংটাং শব্দ মিলেমিশে পুরো পরিবেশটাকে আরো জীবন্ত করে তুলছে। মাটির চুলার সামনে বসে লিসি আঁচলটা কোমড়ে আরেকটু গুঁজে নিলো। তার লম্বা চুলগুলো একপাশে এনে আলতো করে খোঁপা করা, তবুও কয়েকটা ভেজা কালো চুল কপালের পাশে এসে লেগে আছে। গরম আগুনের আঁচে তার ফর্সা মুখটা হালকা লালচে হয়ে উঠেছে। সুপ্রিয়া বড় হাঁড়িটার পাশে বসে বললো
—“ সাবধানে করো মা, হাঁড়িটা কিন্তু অনেক ভারী। ”
লিসি মুচকি হেসে হাঁড়ির বড় খুন্তিটা হাতে নিয়ে বললো
—“ আরে আম্মু, আমি পারবো। শুধু দুধটা একটু দেখে দিয়েন যেন উপচে না পড়ে। ”
নুসরাত সাথে সাথে বলে উঠলো
—“ উফফ, দেখছো বড় আম্মু? কি কিউট করে আম্মু আম্মু ডাকছে! ”
আরোবি নাটকীয় মুখ করে বলে
—“ আমার তো মনে হচ্ছে কয়েকদিন পর আমাদের ভুলেই যাবে। শুধু শ্বশুরবাড়ির মানুষদের নিয়েই থাকবে।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফুলিয়ে বলে—
—“ একদম মিথ্যা কথা। তোমরা সবাই আমার। আর শ্বশুড়বাড়ির লোক মানে, তুমি বুঝি আমা ননদ নও ”
আরোবি —“ আলবাদ আমি তোর ননদ, কিন্তু বোন ও হয় ভুলে যাস না ”
হিয়া হেসে বলে— “ আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে ক্ষীর বানানো শেষ হলে আগে আমাদের খাওয়াবে। ”
লিসি চোখ ছোট করে তাকালো
—“ আগে কাবির ভাইয়ার জন্য, তারপর তোমাদের। ”
এই কথা শুনে সবাই একসাথে “উউউউ…” করে উঠতেই লিসি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। ওপাশে বসে থাকা কাবির হেসে বলে উঠলো
—“ শুনছিস রিহান? আমাদের সম্মান এখনো আছে। ”
রিহান সাথে সাথে বলে
—“ সম্মান আছে ঠিকই, কিন্তু লিসি এখন পুরোপুরি কিরিস ভাইয়ের টিমে চলে গেছে। ”
ইশান হেসে মাথা নাড়িয়ে বলে
—“ ভাই, ওইটা তো প্রথম দিন থেকেই ছিলো। ”
এই কথা শুনে মেয়েরা আবার হেসে উঠলো। লিসি দুধ নাড়তে নাড়তে একবার দূরে চোখ তুললো। ছেলেদের দিকটায় চোখ যেতেই তার দৃষ্টি হঠাৎ থেমে গেলো।
একটু দূরে বড় আমগাছের পাশে বসে কাজ করছে কিরিস। দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করা। চোখদুটো স্থির। আশেপাশে এত মানুষ, এত কথা, এত কোলাহল তবুও তার দৃষ্টি শুধু একজনের উপরেই আটকে আছে।
লিসির উপর। মাটির চুলার আগুনের আলো লিসির মুখে পড়ছে, আর সেই দৃশ্যটা কিরিস একদৃষ্টিতে দেখছে। তার চোখে সেই চিরচেনা গভীরতা, অধিকার আর অদ্ভুত শান্ত একটা অনুভূতি। মার্ক পাশে দাঁড়িয়ে কিছু বলছিল, কিন্তু কিরিসের মনোযোগ সেদিকে নেই। মার্ক হালকা হেসে বলে —“ বস, সবাই বুঝে যাবে এভাবে তাকিয়ে থাকলে। ”
কিরিস ঠান্ডা গলায় বললো—
—“ দেখুক। ”
মার্ক হেসে মাথা নাড়লো। এদিকে লিসি দ্রুত চোখ নামিয়ে আবার ক্ষীর নাড়তে লাগলো। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ছোট্ট হাসি ফুটে উঠেছে।সুপ্রিয়া সেটা খেয়াল করে মুচকি হেসে ধীরে বলে
—“ আগুনের তাপে গাল লাল হয়েছে, নাকি অন্য কোনো কারণে? ”
লিসি সাথে সাথে বলে —“ আম্মু!”
পাশে বসা সবাই আবার হেসে উঠলো। বড় হাঁড়িতে দুধ ধীরে ধীরে ঘন হতে শুরু করেছে। লিসি খুব যত্ন নিয়ে নাড়ছে, মাঝে মাঝে এলাচ, চিনি আর কিশমিশ দিয়ে দিচ্ছে। তার হাতের প্রতিটা কাজেই যেন একটা অদ্ভুত মায়া আছে। মির্জা বেগম দূর থেকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি দিয়ে বললেন —“ মেয়েটার মধ্যে আলাদা শান্তি আছে। এই জন্যই সবাই এত ভালোবাসে। ”
প্রিয়া ধীরে মাথা নেড়ে বললো —“ শুধু শান্তি না, ঘর সামলানোর ক্ষমতাও আছে। ”
মির্জা গর্বের হাসি দিয়ে বললো —“ আমার নাতনি বলে কথা। ”
চারপাশে তখন উৎসবের গন্ধ আরও গভীর হয়ে উঠছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে লিসির শাড়ির উপর। আগুনের আঁচ, পরিবারের হাসি, প্রিয় মানুষের দৃষ্টি সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন কোনো পুরোনো রাজকীয় বাংলার ছবির মতো সুন্দর হয়ে উঠলো।
বড় হাঁড়ির ক্ষীরটা তখন একদম ঠিকঠাক ঘন হয়ে এসেছে। দুধের সাদা রঙ এখন হালকা মাখনের মতো ক্রিমি হয়ে উঠেছে। চারপাশে এলাচ, দুধ আর জ্বাল দেওয়া ক্ষীরের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গার্ডেনে।
লিসি ধীরে ধীরে শেষবারের মতো বড় খুন্তিটা নাড়িয়ে নিলো। তারপর পাশে রাখা ছোট বাটিতে ভেজানো কেশর আর কুঁচি করা বাদাম উপরে ছড়িয়ে দিলো।
সাথে সাথে নুসরাত মুগ্ধ হয়ে বলে উঠলো —“ উফফ লিসি… দেখতে তো একদম রাজবাড়ির রান্নার মতো লাগছে! ”
আরোবি নাটকীয়ভাবে শ্বাস ফেলে বললো
—“ আমি এখনই খেতে চাই। অনুষ্ঠান পরে হোক। ”
লিসি হেসে বললো —“ আগে সবাইকে পরিবেশন করা হোক, তারপর। ”
বড়রা দূর থেকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি দিলেন। এত বড় হাঁড়ির রান্না এত সুন্দরভাবে সামলানো সত্যিই সহজ কথা না। কিন্তু সবাই অবাক হলো এরপর। কারণ বড় হাঁড়ির কাজ শেষ করেও লিসি থামলো না। পাশেই আগে থেকে রাখা ছোট্ট একটা মাটির হাঁড়ি টেনে নিজের কাছে আনলো সে। তারপর আবার নতুন করে দুধ, চাল আর বাকি জিনিসগুলো গুছিয়ে নিতে শুরু করলো।
নুসরাত অবাক হয়ে বললো—
—“ আরে? আবার রান্না করবি? ”
সুপ্রিয়া পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে চুপ করে রইলো।
লিসি নিচু গলায় বললো
—“ এটা আলাদা। ”
আরোবি চোখ ছোট করে দুষ্টু হেসে বললো
—“ ওওও… আলাদা? কার জন্য শুনি? ”
লিসির গাল হালকা লাল হয়ে উঠলো। সে কিছু না বলে শুধু দুধটা হাঁড়িতে ঢালতে লাগলো। সুপ্রিয়া তখন মায়াভরা চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ আগেই লিসি ওর কাছে খুব মন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছে
কিরিস কেমন ক্ষীর পছন্দ করে… দুধ বেশি ঘন নাকি হালকা, চিনি কম নাকি একটু বেশি, নারকেল দেয় কি না… সেই ছোট ছোট কথাগুলো মনে রেখেই এখন সে আবার নতুন করে রান্না শুরু করেছে। সুপ্রিয়া ধীরে বললো —“ চিনি খুব বেশি না দিলেই হবে মা। আর ও নারকেল একটু বেশি পছন্দ করে। ”
লিসি সাথে সাথে মাথা নেড়ে মনে রাখলো। তারপর নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বললো
—“ আপু, একটু নারকেল এনে দিবেন? একটু বেশি লাগবে। ”
নুসরাত সাথে সাথে হেসে উঠলো
—“ আচ্ছা আচ্ছা বুঝছি! কার জন্য এত যত্ন! ”
পাশে বসা সুরভী ফিসফিস করে বললো
—“ প্রেমে পড়লে মানুষ এভাবেই বদলে যায় বুঝলি? ”
লিসি লজ্জায় চোখ রাঙালো
—“ তোমরা অনেক বেশি কথা বলো। ”
ওপাশে বসে থাকা কাবিরদের দিকেও বিষয়টা পৌঁছে গেলো। রিহান দূর থেকে বলে উঠলো—
—“ এই যে! বড় হাঁড়ি শেষ করে আবার নতুন প্রজেক্ট শুরু হয়েছে নাকি? ”
ইশান হেসে বললো
—“ ভাই, এটা স্পেশাল এডিশন মনে হয়। ”
কাবির চোখ টিপে বললো
—“ নাম দে — ‘কিরিস এক্সক্লুসিভ ক্ষীর।’ ”
এই কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো। লিসি মাথা নিচু করে মৃদু হেসে আবার রান্নায় মন দিলো। মাটির চুলার আগুনে ছোট হাঁড়িটার দুধ ধীরে ধীরে ফুটতে লাগলো। লিসি খুব যত্ন করে নাড়ছে। মাঝে মাঝে নারকেল কুঁচি দিচ্ছে, আবার একটু এলাচ গুঁড়ো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
তার প্রতিটা কাজে একটা অদ্ভুত মায়া। যেন শুধু রান্না না… অনুভূতি মিশিয়ে কিছু তৈরি করছে। দূরে গাছের নিচে বসে থাকা কিরিস পুরো দৃশ্যটা চুপচাপ দেখছিল।
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠলো। এত বড় আয়োজনের মাঝে, এত মানুষের ভিড়ে থেকেও সে বুঝে গেছে ছোট হাঁড়িটার ক্ষীর শুধু তার জন্যই। মার্ক ফাইল বন্ধ করতে করতে নিচু গলায় বললো—“ বস… লিসি তো আপনাকে পুরো শেষ করে দেবে। ”
কিরিস চোখ না সরিয়েই ধীরে বললো
—“ Already did. ”
মার্ক কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হালকা হেসে ফেললো।
ওদিকে বড়রাও বিষয়টা খেয়াল করছিলেন।
প্রিয়া মুগ্ধ গলায় বললো —“ দেখেছো মেয়েটাকে? অন্য কেউ হলে এতক্ষণে ক্লান্ত হয়ে উঠে যেত। ”
মির্জা গর্বের হাসি দিয়ে বললেন
—“ আমার নাতনি মানুষকে ভালোবাসতে জানে। তাই ওর কাজে এত মায়া। ”
সুপ্রিয়ার চোখও নরম হয়ে এলো। কারণ সত্যিই…
এত বড় হাঁড়ির রান্না শেষ করার পরেও কোনো বিরক্তি নেই, ক্লান্তির অভিযোগ নেই। বরং আরো যত্ন নিয়ে, আরো মন দিয়ে নিজের মানুষের জন্য আবার নতুন করে ক্ষীর রান্না করছে লিসি।
ঘন্টা খানিক পরে ছোট মাটির হাঁড়িটার ক্ষীরটাও শেষমেশ একদম নিখুঁতভাবে তৈরি হলো। দুধ ধীরে ধীরে ঘন হয়ে এসেছে, তার ভেতরে নারকেলের নরম কুঁচি, এলাচের মিষ্টি গন্ধ আর উপরে ছড়িয়ে দেওয়া অল্প কেশর পুরো জিনিসটার মধ্যেই যেন আলাদা এক মায়া মিশে আছে। লিসি শেষবারের মতো কাঠের চামচ দিয়ে আলতো করে নাড়িয়ে নিলো। তারপর খুব যত্ন করে হাঁড়িটা চুলা থেকে নামিয়ে একপাশে রেখে দিলো।
সুপ্রিয়া এগিয়ে এসে হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ গলায় বললো —“ একদম ওর পছন্দমতো হয়েছে। ”
লিসির ঠোঁটে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠলো। এরপর সে এক মুহূর্তও অলস দাঁড়িয়ে রইলো না। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বাটি, চামচ, নারকেলের খোসা, দুধের কলসি সব ধীরে ধীরে গুছিয়ে রাখতে লাগলো। চুলার আশপাশও পরিষ্কার করে দিলো, যেন এখানে এত বড় রান্না হয়েছে সেটা বোঝাই না যায়। বড়রা দূর থেকে তাকিয়ে দেখছিলেন।
প্রিয়ার চোখে মুগ্ধতা। সাবেনা ধীরে বললেন
—“ মেয়েটার মধ্যে কেমন ঘর সামলানোর শান্তি আছে দেখছো? ”
সুপ্রিয়া নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন। কারণ সত্যিই…
আজকের পুরো আয়োজনের মাঝেও লিসির ভেতরে কোনো অস্থিরতা নেই। সবকিছু কত সুন্দর করে, যত্ন করে সামলে নিচ্ছে। এতক্ষণ আগুনের সামনে বসে থাকার কারণে তার ফর্সা মুখটা লালচে হয়ে উঠেছে। কপালে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু জমেছে। কয়েকটা চুল ভিজে গালে লেগে আছে। লিসি ধীরে আঁচলটা ঠিক করে বললো —“ আমি একটু হাতমুখ ধুয়ে আসছি আম্মু। ”
সুপ্রিয়া মায়াভরা গলায় বললেন
—“ যাও মা। ”
লিসি ধীরে সেখান থেকে সরে গেলো। আর ঠিক তখনই গার্ডেনের মাঝখানে শুরু হয়ে গেল গায়ে হলুদের মূল আয়োজন। চারপাশে ঢোলের শব্দ, মেয়েদের আনন্দ ধ্বনি, হাসাহাসি পুরো পরিবেশ মুহূর্তেই উৎসবের রঙে ভরে উঠলো। গার্ডেনের মাঝখানে হলুদে সাজানো আসনের উপর দিব্যি রাজাদের মতো বসে আছে কাবির। তার মধ্যে নতুন বরের যে লাজুক ভাব থাকে তার ছিটেফোঁটাও নেই। বরং সে এমন ভাব নিয়ে বসে আছে যেন পুরো আয়োজনটাই তার বহুদিনের জয়ের উৎসব।
রিহান পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বললো
—“ এই লোকটার মধ্যে লজ্জা বলে কিছু আছে? ”
ইশান সাথে সাথে বললো
—“ ভাই, ও জন্ম থেকেই নির্লজ্জ। ”
কাবির হেসে বলে উঠলো—
—“ আরে ভাই, নিজের বিয়ে! খুশি হবো না? ”
সবাই আবার হেসে উঠলো। প্রথমে মির্জা বেগম এগিয়ে এলেন। স্নেহভরা হাতে নাতির কপালে হলুদ মাখিয়ে দোয়া করলেন। তারপর সুপ্রিয়া… তার চোখে স্পষ্ট জল আর হাসির মিশ্র অনুভূতি। নিজের ছেলেকে এভাবে বিয়ের সাজে দেখে মায়া যেন বারবার উপচে পড়ছে।
এরপর একে একে প্রিয়া, সাবেনা, কাবেনা সবাই গায়ে হলুদ দিলেন। চারপাশে তখন হাসির শব্দে পুরো পরিবেশ কাঁপছে। এরপর এল কাজিনদের পালা। কাবির দুই হাত তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো
—“ শোন! আজকে আমাকে কেউ চিনতে পারবে না, এইটাই তোদের টার্গেট! ”
ব্যস। তারপর যা হওয়ার তাই হলো। রিহান প্রথমে পুরো গালে হলুদ মাখিয়ে দিলো। ইশান চুল পর্যন্ত ছাড়লো না। আরোবি এসে নাকের উপর গোল করে হলুদ লাগিয়ে দিলো। নুসরাত তো একদম দুই হাত ভর্তি করে মেখে দিলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাবিরের অবস্থা এমন হলো যে তাকে চিনতেই কষ্ট হচ্ছে। হলুদের আস্ত একটা মূর্তি যেন বসে আছে। সবাই হাসতে হাসতে শেষ।
কাবির নিজেও হেসে কাত।
ঠিক তখনই ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এলো কিরিস।
চারপাশের কোলাহলের মাঝেও মানুষটা আলাদা।
হালকা হলুদাভ শার্ট, স্থির চোখ, গম্ভীর অথচ অদ্ভুত রাজকীয় উপস্থিতি। সে সামনে এসে দাঁড়াতেই আশেপাশের কয়েকজন আত্মীয়ও একটু চুপ হয়ে তাকালো। কাবির কষ্ট করে চোখ মুছে বললো
—“ ভাই, আমার গায়ে আর জায়গা নাই। দয়া করেন। ”
কিরিস ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি টেনে বললো
—“ এত কষ্ট করে তোরা যা বানিয়েছিস, এখন আর মানুষে চিনুক বা না চিনুক… বউ যেন ভয় না পায়। ”
চারপাশে আবার হাসির রোল পড়ে গেলো। তারপর কিরিস খুব ধীরে আঙুলের আগায় সামান্য হলুদ নিলো।
সবাই ভেবেছিল সে হয়তো আর কিছু করবে না।
কিন্তু সে কাবিরের কপালের একদম ফাঁকা ছোট্ট জায়গাটায় আলতো করে হলুদ ছুঁইয়ে দিলো।
তার কণ্ঠটা এবার অনেক শান্ত, অনেক গভীর
—“ সৌভাগ্যবান হও। বড় ভাইয়ের দোয়া সবসময় কাজে লাগে। ”
কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য পরিবেশটা অদ্ভুত নরম হয়ে গেলো। কাবিরও এবার চুপ করে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। চোখেমুখে স্পষ্ট ভালোবাসা।
ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন আরোবি আর নুসরাত এসে লিসিকে টেনে নিয়ে এলো।
—“ এই! তুই বাঁচবি না! ”
লিসি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই গালে হলুদ মাখিয়ে দিলো ওরা। লিসি হেসে পালানোর চেষ্টা করছিল।
আর তখনই তার চোখ গিয়ে থামলো একটু দূরে বসে থাকা কিরিসের উপর। সবাইকে হলুদ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু…
কিরিসের গায়ে একফোঁটাও হলুদ নেই। সে টেবিলের পাশে বসে ফোনে কিছু দেখছে। আশেপাশে মার্ক আর কয়েকজন বিজনেস ক্লায়েন্ট দাঁড়িয়ে। এক মুহূর্তের জন্য লিসির চোখে দুষ্টু ঝিলিক ফুটে উঠলো।
তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সে দুই হাত ভর্তি হলুদ তুলে সরাসরি গিয়ে কিরিসের দুই গালে মাখিয়ে দিলো।
পুরো পরিবেশ থেমে গেলো। মার্কের মুখ হা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাজিনরা নিঃশব্দ। আর বিজনেস ক্লায়েন্টগুলো এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন তারা জীবনের সবচেয়ে অসম্ভব দৃশ্য দেখে ফেলেছে। এই ভয়ংকর, কঠোর, নিয়ন্ত্রণে থাকা মানুষটাকে… কেউ এভাবে ছুঁতেও সাহস করে না। আর সেখানে লিসি দিব্যি দুই গাল ভর্তি হলুদ মেখে দাঁড়িয়ে আছে। কিরিস ধীরে মাথা তুললো।
তার সেই ধোঁয়াটে গভীর চোখ এবার স্থির হয়ে গেলো লিসির উপর।চারপাশের বাতাস যেন কয়েক ডিগ্রি ঠান্ডা হয়ে গেলো। লিসির বুক ধক করে উঠলো। সে খুব ভালো করেই জানে এই চোখের মানে কি। কালবৈশাখী ঝড় আসতে আর বেশি সময় লাগবে না। ব্যস। লিসি ছোট্ট শুকনো হাসি দিয়ে ধীরে ধীরে এক পা… দুই পা… পিছিয়ে যেতে লাগলো। একদম চুপচাপ। যেন কেউ বুঝতেই না পারে সে পালাচ্ছে।
মুহূর্তটা যেন সত্যিই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গিয়েছিল। মার্কের হাতে থাকা ফাইল প্রায় পড়ে যাওয়ার অবস্থা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিদেশি বিজনেস ক্লায়েন্টদের মুখের অবস্থা আরো ভয়াবহ। তারা একবার কিরিসের দিকে তাকাচ্ছে, একবার লিসির দিকে। যেন নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
একজন তো ধীরে নিজের গালে চাপড় মেরে ফিসফিস করে বললো —“ Is this… real? ”
আরেকজন নিজের হাতেই চিমটি কাটলো। চোখ বারবার হাত দিয়ে ডলে নিচ্ছে নিজের আখির উপরই এখন তাদের অবিশ্বাস হচ্ছে, তারা কোনো স্বপ্ন বা ঘোরের মধ্যে নেই তো এই সব ভাবছে। একজন নিজের গালে আরেক বার চড় মেরে সামনের দিকে তাকালো না কাজ হলো না। দৃশ্যটা সত্যিই বাস্তব। যে মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতেও মানুষ দশবার ভাবে… যার নাম শুনলেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় বড় লোক পর্যন্ত হিসাব করে চলে…
সেই মানুষটার দুই গালে এখন দিব্যি হলুদ মাখানো।
আর সেই কাজটা করেছে একটা মেয়ে। তাও সবার সামনে।
ওই দিকে কাবির রিহান আর ইশানের সাথে ফিসফিস করে কয়েক সেকেন্ড ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বললো—
—“ Ya Allah… ভাবি আজকে ইতিহাস লিখে ফেলছে। ”
ওদিকে লিসি তখন বুঝে গেছে এখানে আর এক সেকেন্ড দাঁড়ানো মানেই বিপদ।সে শুকনো হাসি দিয়ে আস্তে আস্তে পিছিয়ে যেতে লাগলো।
এক পা…
দুই পা…
তিন পা…
আর ঠিক তখনইকিরিস ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। না কোনো তাড়া। না কোনো কথা। শুধু তার দাঁড়িয়ে ওঠাটাই যথেষ্ট ছিল চারপাশের পরিবেশ বদলে যাওয়ার জন্য। মার্ক সাথে সাথে মুখ চেপে ধরলো।
রিহান নিচু গলায় বললো—
—“ ইন্নালিল্লাহ… লিসি শেষ। ”
লিসি এবার সত্যিই ঘুরে দৌড় দিতে চাইলো।
কিন্তু সে সুযোগ আর পেল না। কিরিস তার লম্বা লম্বা পায়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সামনে গিয়ে খপ করে লিসির হাতের কব্জি ধরে ফেললো। লিসি চমকে উঠে ঘুরে তাকালো।
—“ আ… আমি তো মজা করে— ”
কথা শেষ হওয়ার আগেই কিরিস একটুও সময় নষ্ট না করে তাকে সরাসরি কাঁধে তুলে নিলো। পুরো গার্ডেন স্তব্ধ।
কেউ শ্বাস পর্যন্ত নিচ্ছে না ঠিকমতো। লিসির চোখ বিস্ফারিত। সে কিরিসের কাঁধে উল্টো হয়ে ঝুলে থেকে ছটফট করতে লাগলো—
—“ আহ্ ভাইয়া ! নামান! ছা—ড়ুন! সবাই দেখছে! ”
কিন্তু কিরিস?
তার মুখে সেই ভয়ংকর শান্ত ভাব। যে ভাব দেখে মানুষ আরো বেশি ভয় পায়। সে কারো দিকে তাকালোও না।
সোজা সামনের দিকে হাঁটতে লাগলো। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আত্মীয়স্বজন, কাজিন, অতিথিরা হা করে তাকিয়ে আছে। কারো মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছে না।
কারণ… এমন দৃশ্য এই বাড়িতে নতুন না হলেও— প্রত্যেকবারই সবাই নতুন করে অবাক হয়।
❝ বাবা-চাচাদের সামনে, এত মানুষের মাঝে এভাবে নিজের বউকে কাঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া… এটা শুধু কিরিসের পক্ষেই সম্ভব। ❞
বাড়ির বয়স্ক মহিলারাও হতভম্ব। সাবেনা মুখে হাত দিয়ে বললেন —“ আরে আল্লাহ … এই ছেলে কোনোদিন মানুষ হবে না! ”
প্রিয়া হাসি চেপে রাখতে রাখতে বললো
—“ এখন আর কিছু বলেও লাভ নেই। ”
আর আনোয়ার সাহেব? তিনি দিব্যি চা হাতে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্য দেখে গম্ভীর মুখে বললেন
—“ আমার বড় ছেলে বলে কথা। ”
পাশ থেকে কেউ হেসে বললো
—“ চাচা, একটু কিছু বলেন! ”
আনোয়ার শান্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন
—“ আরে, দুনিয়ার কারো কথা যে শোনে না, সেখানে আমার কথা শুনবে? ”
চারপাশে আবার হাসির শব্দ উঠলো। কিন্তু কিরিস ইতোমধ্যে সিঁড়ি পেরিয়ে উপরে উঠে গেছে। লিসি এখনো কাঁধে ছটফট করছে—
—“ ভাইয়া ! আমি পড়ে যাবো! ”
কিরিস ঠান্ডা গলায় বললো —“ চুপচাপ থাকো। ”
ব্যস।
লিসি সত্যিই চুপ হয়ে গেলো। কয়েক মুহূর্ত পর সে নিজের ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। সোজা ওয়াশরুমের দিকে। তারপর খুব শান্তভাবে দরজাটা পা দিয়ে বন্ধ করে দিলো। ওয়াশরুমের সাদা আলোয় এখনো কিরিসের দুই গালে লিসির মাখানো হলুদের দাগ স্পষ্ট। আর লিসি…
এখনো তার কাঁধে ঝুলে আছে, বুক ধড়ফড় করছে ভয় আর লজ্জায় একসাথে। ওয়াশরুমের ভেতরটা প্রশস্ত, মার্বেলের ঠান্ডা মেঝে আর সাদা আলোয় পুরো জায়গাটা আরো পরিষ্কার আর শান্ত লাগছে। বাইরে এখনো দূর থেকে হাসির শব্দ গানের আওয়াজ ভেসে আসছে, কিন্তু এই ঘরের ভেতরে যেন সবকিছু আলাদা নিস্তব্ধ। কিরিস ধীরে লিসিকে কাঁধ থেকে নামিয়ে ওয়াশিং মেশিনের পাশের বড় মার্বেলের থামের উপর বসিয়ে দিলো। লিসির বুক তখনো ধড়ফড় করছে। সে কিছু বলবে কি না বুঝে উঠতে পারছে না। মুখে লজ্জা, ভয়, আবার কোথাও একটু হাসিও লুকিয়ে আছে।কিরিস কোনো কথা না বলে সামনে রাখা বেসিন থেকে হাত ভিজিয়ে নিলো। তারপর খুব ধীরে লিসির দুই গালের হলুদ মুছতে শুরু করলো। লিসি স্থির হয়ে বসে রইলো।
ঠান্ডা পানির স্পর্শে তার গরম হয়ে থাকা গাল কেঁপে উঠলো সামান্য। কিরিস খুব যত্ন করে আঙুলের ডগা দিয়ে হলুদের দাগ পরিষ্কার করছে। যেন রাগ নেই, তাড়া নেই… শুধু গভীর মনোযোগ। তারপর লিসির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে
— “ আমার মুখ পরিষ্কার করো! ”
কিরিসের দুই গালের পাশে এখনো হালকা হলুদের দাগ লেগে আছে। সাদা আলোয় দাগগুলো আরো স্পষ্ট দেখাচ্ছে। এত গম্ভীর, ভয়ংকর মানুষটার মুখে এই হলুদের ছোঁয়া কেমন অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। লিসির ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠলো। সে ধীরে ধীরে নিজের শাড়ির আঁচলটা হাতে নিলো। তারপর খুব আলতো করে কিরিসের এক গালের হলুদ মুছতে শুরু করলো। কিরিস স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ পুরোটা সময় শুধু লিসির মুখেই আটকে। লিসি খুব যত্ন করে দাগগুলো পরিষ্কার করছে, যেন একটু জোরেও কিরিসের কোথাও লেগে না যায়। মাঝে মাঝে আঁচলের নরম কাপড় তার ত্বক ছুঁয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তটা এত শান্ত, এত আপন লাগছিল যে বাইরে থাকা কোলাহলের শব্দও যেন অনেক দূরের মনে হচ্ছিল। একসময় লিসি অন্য গালটাও মুছে দিলো। তারপর একদম কাছে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বললো —“ এবার ঠিক হয়েছে… ”
কিরিস কিছু বললো না।
শুধু গভীর চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর লিসির শাড়ির আঁচল আলতো করে হাতে নিয়ে সেটাই দিয়ে নিজের মুখটা মুছে নিলো আবার। মুহূর্তটায় লিসির বুকের ভেতর কেমন যেন নরম হয়ে গেলো।
এত ভয়ংকর, এত কঠিন মানুষটা… তার সাথে এমন কোমল হয়ে যায় কীভাবে?
কিরিস এবার নিচু গলায় বললো
—“ এবার নিজের মুখ পরিষ্কার করো। ”
লিসি ধীরে মাথা নাড়িয়ে বেসিনের দিকে ঝুঁকে নিজের গাল ধুয়ে নিলো। তারপর আবার চোখ তুলে তাকালো কিরিসের দিকে। কিরিস তখন দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। চোখদুটো স্থির। সেই দৃষ্টিতে ভয়ও আছে, অধিকারও আছে, আবার অদ্ভুত গভীর ভালোবাসাও।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে ধীরে বললো
—“ এত বড় দুঃসাহস, মেয়ে তোমার? ”
লিসি ছোট্ট করে চোখ পিটপিট করলো। কিরিস ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
—“ যার সামনে সবাই ভয় পায়… তার গালে তুমি হলুদ মেখে দিয়েছো। ”
তার কণ্ঠটা নিচু, ভারী।
—“ আমার ইমেজ নষ্ট করার শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে। ”
লিসি এবার সত্যিই একটু ভয় পেয়ে গেলো। সে তাড়াতাড়ি বললো
—“ আমি কি করলাম? নিজের বরের গায়ে হলুদ মাখানো কি অন্যায় নাকি? আর… আর আপনি সকালে বলেছিলেন আমাকে কিছু বলবেন না, তাই আপনি আমাকে— ”
কথাটা আর শেষ করতে পারলো না। কারণ পরের মুহূর্তেই কিরিস তাকে নিজের দিকে টেনে নিলো। এক হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তার কোমর। আর গভীরভাবে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো লিসির ঠোঁটে। হঠাৎ হওয়া সেই স্পর্শে লিসির পুরো শরীর কেঁপে উঠলো। তার আঙুলগুলো অজান্তেই কিরিসের শার্ট চেপে ধরলো।
কিরিস যেন এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সব অনুভূতি একসাথে প্রকাশ করছে। তার আলিঙ্গন এতটাই গভীর, এতটাই অধিকারী যে লিসির মনে হচ্ছিল সে ধীরে ধীরে পুরো মানুষটার মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে। বাইরে এখনো গায়ে হলুদের হাসি, গান, মানুষের শব্দ…
আর এখানে শুধু দুজন মানুষের দ্রুত ওঠানামা করা নিঃশ্বাসের শব্দ। কয়েক মিনিট কেটে গেলো।
লিসির সত্যিই দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা।
সে হালকা ছটফট করে কিরিসের বুকের উপর হাত রাখলো। কিন্তু কিরিস তো কিরিস। সে আরো একটু কাছে টেনে নিলো, যেন এই মুহূর্তটা শেষ হোক সে চাইছেই না।
কয়েক মিনিট পর অবশেষে লিসি কোনোভাবে নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিতে পারলো। সে দ্রুত এক পা পিছিয়ে গিয়ে বড় বড় করে শ্বাস নিতে লাগলো। বুকটা এখনো দ্রুত উঠানামা করছে। গাল দুটো আগুনের মতো লাল, চোখে স্পষ্ট লজ্জা আর বিস্ময়ের ছাপ। কিরিস ঠিক আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। চোখদুটো এখনো গভীর হয়ে আছে। লিসি কয়েক সেকেন্ড হাঁপাতে হাঁপাতে তার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর ছোট্ট রাগী গলায় বললো—“ আপনার কোনো দয়া-মায়া নাই! সত্যি বলছি… আমার তো দমই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল! ”
কিরিস ঠোঁটের কোণে ধীর হাসি টেনে বললো
—“ এত নাটক করো কেন? ”
লিসি চোখ বড় বড় করে তাকালো
—“ নাটক? আমি? ”
কিরিস এবার ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
—“ যার এত সাহস, সবার সামনে আমার গালে হলুদ মাখিয়ে দেয়… তার আবার ভয় কিসের? ”
লিসি এবার লজ্জা লুকাতে মুখ ঘুরিয়ে ফেললো।
তারপর নিচু গলায় বিড়বিড় করে বললো—
—“ নিজের বরকে একটু হলুদ মাখিয়েছি, যেন কি অন্যায় করে ফেলেছি… ”
কিরিস শুনে হালকা হেসে ফেললো। সেই বিরল, ছোট্ট হাসিটা। যেটা খুব কম মানুষই দেখতে পায়। লিসি এবার বুঝলো আর এক সেকেন্ড এখানে থাকলে আবার ধরা খেতে হবে।
ব্যস।
সে আচমকা ঘুরে দরজার দিকে দৌড় দিতে গেলো।
আর ঠিক তখনই পিছন থেকে কিরিসের ভারী গলা ভেসে এলো —“ একদম দৌড় দেবে না বলে দিলাম। ”
লিসি দরজার কাছে গিয়ে একবার পিছনে তাকালো।
তার চোখে দুষ্টু ঝিলিক।
—“ কিন্তু আমি তো দৌড় দিবোই। ”
কথাটা বলেই সে সত্যিই দরজা খুলে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো। কিরিস কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে নিজের কোমরে এক হাত রেখে মাথা নাড়লো। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি।
নিচু গলায় নিজেকেই বললো —“ কমবেশি মেয়েদের বিয়ে করলে ঝামেলা হয়… এটাই মনে হয়। শালা ধরার আগে দৌঁড় মারে। ”

তবুও তার চোখে বিরক্তির চেয়ে অনেক বেশি ছিল শান্তি।