তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :78

লিসি প্রায় দৌড়ে নিচে নেমে এলো। তার গাল এখনো লাল, নিঃশ্বাস একটু দ্রুত, আর চোখেমুখে এমন এক অদ্ভুত আলো ফুটে আছে যেটা দেখলেই বোঝা যায় কিছুক্ষণ আগেই কেউ তাকে খুব করে ভালোবেসেছে।
গার্ডেনে পা রাখতেই কয়েক জোড়া চোখ একসাথে তার দিকে ঘুরে গেল। বিশেষ করে কাজিনদের। আরোবি প্রথমেই চোখ ছোট করে তাকিয়ে বললো
—“ ওহহহ… কারো মুখ এত লাল কেন শুনি? আগুনের তাপে, নাকি অন্য কিছুর তাপে? ”
সাথে সাথে চারপাশে চাপা হাসি পড়ে গেল। নুসরাত ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকাতে আটকাতে বললো
—“ আরে ওকে একটু শ্বাস নিতে দে আগে। ”
হিয়া নিচু গলায় সুরভীকে বললো
—“ আমি নিশ্চিত, উপরে ঝড় বয়ে গেছে। ”
লিসি সাথে সাথে বললো
—“ তোমরা অনেক বেশি কথা বলো! ”
কিন্তু তার লজ্জাভরা মুখই সব বলে দিচ্ছিল।
ওদিকে বড়রাও বিষয়টা বুঝতে পেরে নিজেদের মধ্যে মুচকি হাসছিলেন। সাবেনা ধীরে বললেন—
—“ নতুন বউ-জামাই… এদের আর কিছু বলার নাই। ”
প্রিয়া হেসে মাথা নাড়িয়ে বললেন
—“ কিরিসকে এমন করে শুধু লিসিই সামলাতে পারে। ”
এই হাসি-ঠাট্টার মাঝেই লিসি নিজেকে সামলে নিলো। তারপর বড় হাঁড়ির পাশে গিয়ে ক্ষীর পরিবেশন করা শুরু করলো। মাটির ছোট ছোট বাটিতে ধীরে ধীরে ক্ষীর তুলে দিচ্ছে সে। উপরে বাদাম আর কেশরের ছিটা। চারপাশে মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। কাবির প্রথম বাটি হাতে নিয়ে বললো —“ আজকে যদি ক্ষীর ভালো না হয়, আমি কিন্তু বিয়ে করবো না। ”
রিহান সাথে সাথে বললো —“ চিন্তা করিস না, ক্ষীর ভালো হবেই। কারণ এটা আমাদের বোন রান্না করেছে। ”
ইশান নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো
—“ আরেকবার বলছি, সবাই নোট কর— এমন বোন লাখে একটা। ”
লিসি হেসে মাথা নাড়লো। এরপর সে একে একে বড়দের হাতে ক্ষীর দিতে লাগলো। মির্জা বেগম প্রথম চামচ মুখে দিয়েই চোখ বন্ধ করে বললেন
—“ একদম গ্রামের আসল স্বাদ… ”
সুপ্রিয়ার চোখে তখন গর্ব স্পষ্ট। কারণ মেয়েটা শুধু রান্নাই করেনি, পুরো আয়োজনটাকেই নিজের মায়ায় সুন্দর করে তুলেছে।
এদিকে........
কিরিস আবার আগের জায়গায় গিয়ে বসেছে।
টেবিলের উপর ফাইল খোলা, ফোন পাশে রাখা, কিন্তু পরিবেশ আগের মতো নেই। কারণ তার সামনে বসে থাকা বিদেশি ক্লায়েন্টগুলোর অবস্থা এখনো করুণ।
একজন মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। আরেকজন ফাঁকা চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে যেন এখনো প্রসেস করার চেষ্টা করছে একটু আগে কি দেখলো। তাদের জীবনে অনেক ভয়ংকর দৃশ্য দেখেছে। বন্দুক, রক্ত, আন্ডারওয়ার্ল্ড, ডিল, বিশ্বাসঘাতকতা… এসব দেখেও এতটা হতবাক হয়নি তারা।
কিন্তু যে মানুষটাকে সবাই ভয় পায়, যাকে দেখে বড় বড় লোক পর্যন্ত কথা মেপে বলে…
সেই কিরিসকে একটা মেয়ে সবার সামনে হলুদ মেখে দিয়েছে, তারপর সে আবার তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে গেছে! এই দৃশ্য তাদের মাথায় এখনো ঢুকছে না।
একজন ধীরে মার্কের দিকে ঝুঁকে ইংরেজিতে বললো
—“ Does… he always act like this around her? ”
মার্ক ঠোঁট শক্ত করে হাসি আটকাতে আটকাতে বললো
—“ You haven’t seen anything yet. ”
তারপর দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে ফেললো।
কারণ সে জানে একবার যদি হেসে ফেলে, আজকে তার চাকরি তো দূরের কথা, জানটাই বিপদে পড়ে যাবে।
ওপাশে রিহান, কাবির, ইশানদের অবস্থাও প্রায় একই।
ওরা একেকজন মুখ নিচু করে হাসি চেপে মরছে।
কাবির ফিসফিস করে বললো
—“ ভাই… কিরিস ভাইয়ের ওই মুখটা দেখছিস? ”
ইশান সাথে সাথে বললো
—“ আমি জীবনে ভাবিনি কেউ ওর গালে হলুদ মেখে বেঁচে থাকবে। ”
রিহান মাথা নাড়িয়ে বললো
—“ না ভাই… লিসি আলাদা লেভেলের মানুষ। ”
ঠিক তখনই লিসি ধীরে ছোট মাটির হাঁড়িটা হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো। আর কিরিস… ফাইলের উপর চোখ রেখেও বুঝে গেলো ওটা তার জন্য। লিসি ধীরে ধীরে ছোট মাটির হাঁড়িটা হাতে নিয়ে কিরিসের দিকে এগিয়ে এলো। ক্লায়েন্টদের নিয়ে মার্ক চলে গেছে কারণ ওরা আর দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় নেই। এইদিকে চারপাশে তখনো হাসাহাসি চলছে, কিন্তু লিসি মেয়েটার পুরো মনোযোগ যেন শুধু একজন মানুষের উপরেই। সে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ালো। কিরিস তখন ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে কিছু দেখছিল। স্ক্রিনে দ্রুত চলতে থাকা ভিডিওর আলো তার গম্ভীর মুখে পড়ছে। পাশে রাখা ফোনে একের পর এক মেসেজ আসছে।
লিসি নরম গলায় বললো
—“ ক্ষীর… ”
কিরিস চোখ তুলে তাকালো। তারপর লিসির হাতে থাকা ছোট হাঁড়িটার দিকে দৃষ্টি গেলো। মুহূর্তের মধ্যেই সে বুঝে গেলো এটা আলাদা করে তার জন্য বানানো। লিসি ছোট বাটিতে ক্ষীর তুলে তার সামনে ধরলো। উপরে নারকেল একটু বেশি, ঠিক যেমনটা সে পছন্দ করে।
রিহান হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে কাবিরের সাথে নিচু গলায় বললো —“ বস… স্পেশাল ট্রিটমেন্ট। ”
কিরিস ঠান্ডা চোখে একবার তাকাতেই রিহান সাথে সাথে চুপ। লিসি চামচটা কিরিসের দিকে এগিয়ে দিলো।
কিরিস ধীরে এক চামচ মুখে নিলো।
দুই সেকেন্ড চুপ। তারপর খুব অল্প করে মাথা নাড়লো।
কিন্তু সেই ছোট্ট ভঙ্গিটুকুই যথেষ্ট ছিল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তার ভালো লেগেছে। লিসির মুখে সাথে সাথে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠলো। ওদিকে টেবিলের উপর খোলা ল্যাপটপে তখন অন্য এক দৃশ্য চলছিল। স্ক্রিনে একটা অন্ধকার গুদামঘর। একজন মানুষ মাটিতে পড়ে আছে, কয়েকজন তাকে মারছে নির্মমভাবে। রক্ত মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ছে। লোকটার চিৎকার পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে ক্ষীণভাবে।
কিন্তু কিরিস?
সে একদম স্বাভাবিকভাবে ক্ষীর খাচ্ছে। যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য দেখছে। তার চোখে না রাগ, না উত্তেজনা, না দয়া। শুধু ঠান্ডা স্থিরতা। যেন এই জগতটা তার কাছে খুব সাধারণ। লিসি দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু একটু দূরে সরে দাঁড়ায়। তখন মার্ক আবার আসে সোজা কিরিসের পাশে দাঁড়ায়। কিরিসের বাম কানে ব্লুটুথ যার জন্য আওয়াজ একটাও বাইরে যাচ্ছে না। মার্ক ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো
—“ বস, কথা বলছে না এখনো। ”
কিরিস আরেক চামচ ক্ষীর খেয়ে বললো
—“ বলবে। সময় দাও। ”
যেন কারো জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত না… একটা সাধারণ ব্যবসায়িক আলোচনা চলছে। ঠিক তখনই রিহান দূর থেকে বলে উঠলো
—“ এই যে! ভাই! গায়ে হলুদের দিনেও কাজ করছেন? একটু মানুষ হন! ”
কাবিরও হেসে বললো —“ লিসি এত কষ্ট করে ক্ষীর বানাইছে, অন্তত আজকে কাজটা অফ রাখেন পুরো। ”
এই কথা শুনে আশেপাশে সবাই হেসে উঠলো।
কিরিস ধীরে চোখ তুলে বললো —“ তোদের অনুষ্ঠান ঠিকঠাক চলতেছে তো? তাহলে চুপচাপ খা। ”
রিহান নাটকীয়ভাবে বুক চেপে বললো
—“ দেখছিস লিসি ? মানুষটা রোমান্টিকও ভয় দেখিয়ে! ”
লিসি মুখ নিচু করে হেসে ফেললো।
আর মার্ক?
সে এখনো প্রাণপণে নিজের হাসি আটকাচ্ছে। কারণ সত্যি বলতে এই দৃশ্যগুলো তার কাছেও অবিশ্বাস্য লাগে মাঝে মাঝে। একদিকে ল্যাপটপে কারো জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সেই মানুষটাই নিজের বউয়ের হাতে বানানো ক্ষীর খাচ্ছে শান্ত মুখে। দুপুরের দিকে ধীরে ধীরে পুরো বাড়ি একটু শান্ত হতে শুরু করলো। গায়ে হলুদের কোলাহল শেষে সবাই একে একে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাওয়ার জন্য জড়ো হলো। বিশাল ডাইনিং স্পেসে সবাই একসাথে খাচ্ছে, গল্প করছে, হাসছে। লিসি আর বাড়ির মেয়েরা সবাইকে খাবার পরিবেশন করতে ব্যস্ত। কাবির এখনো হলুদের রঙ পুরোপুরি তুলতে পারেনি। তাকে দেখে সবাই আবার হাসাহাসি শুরু করলো।
খাওয়া শেষ হতে হতে বিকেলের নরম ক্লান্তি নেমে এলো বাড়িজুড়ে। বড়রা নিজেদের ঘরে বিশ্রাম নিতে চলে গেলেন। কাজিনরাও যে যার মতো ছড়িয়ে পড়লো।
ঠিক তখনই কিরিস আবার পুরোপুরি অন্য মানুষ হয়ে গেল। তার মুখের নরম ভাব মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিলো সেই পরিচিত ঠান্ডা গম্ভীরতা। সে শার্ট বদলে নিলো শার্টের হাতা ঠিক করতে করতে নিচে নামলো। মার্ক ইতোমধ্যে গাড়ির ব্যবস্থা করে ফেলেছে। রিহান কাবিরও তৈরি হয়ে নিচে এলো। যদিও আজ কাবিরের গায়ে হলুদ, তবুও কিছু জরুরি কাজ আছে। রিহান গাড়ির চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে বললো —“ ভাই, আজকে যদি কোনো কাজ না থাকতো! ”
কিরিস শান্ত গলায় বললো —“ কাজ থামে না। ”
ওদিকে ইশানও হাসপাতালের জন্য বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে ডাক্তার। জরুরি একজন পেশেন্ট এসেছে।
ব্যাগ কাঁধে নিতে নিতে বললো —“ রাতে ফিরতে দেরি হতে পারে। ”
এরপর একে একে সবাই বেরিয়ে গেল। বাড়িটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। এখন পুরো বাড়িতে মূলত মেয়েরাই আছে। গার্ডেনে বিকেলের হালকা বাতাস বইছে, দূরে কোথাও শঙ্খের শব্দ ভেসে আসছে… আর সেই বিশাল বাড়িটা যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য নারীদের হাসি, গল্প আর আড্ডায় ভরে উঠলো।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। রায় চৌধুরী বাড়ির বিশাল উঠানজুড়ে দুপুরের কোলাহলের পর এক ধরনের আরামদায়ক শান্তি নেমে এসেছে। পুরুষেরা বেশিরভাগই বাইরে কেউ অফিসে, কেউ হাসপাতালে, কেউ কাজে। এখন পুরো বাড়িটা যেন মেয়েদের দখলে। উপরের বারান্দা থেকে নিচ পর্যন্ত কোথাও হাসির শব্দ, কোথাও গল্প, কোথাও আবার শাড়ির খসখস আওয়াজ ভেসে আসছে। গার্ডেনের একপাশে বড় পাটি পেতে সবাই গোল হয়ে বসেছে। মাঝখানে নানা রকম চুড়ি, আলতা, ফুল, মেহেদির কোন সব ছড়িয়ে রাখা। আরোবি হঠাৎ লিসির হাত টেনে নিজের পাশে বসিয়ে বললো
—“ আজকে কিন্তু তোকে ছাড়া আমাদের আড্ডা জমবে না। ”
লিসি হেসে বসে পড়লো। নুসরাত চুড়ির বাক্স খুলতে খুলতে বললো —“ আগে এটা বল… উপরে কি হয়েছিল?”
লিসি সাথে সাথে চোখ বড় বড় করে বললো
—“ কিছু হয়নি! ”
সুরভী নাটকীয়ভাবে মাথা নাড়িয়ে বললো
—“ আহা রে… এই ‘কিছু হয়নি’ কথাটার মধ্যেই সব লুকানো থাকে। ”
হিয়া হেসে গড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা।
—“ লিসির গাল দেখলেই তো বোঝা যাচ্ছিল! ”
লিসি এবার সত্যিই লজ্জা পেয়ে গেলো। সে দ্রুত কথাটা ঘোরানোর জন্য বললো —“ আচ্ছা, তোমাদের কেউ চা খাবে? আমি বানিয়ে আনছি। ”
আরোবি সাথে সাথে তার আঁচল ধরে টেনে বসিয়ে দিলো—“ একদম না। আগে সব বল, তারপর যাস। ”
চারপাশে আবার হাসির রোল পড়ে গেলো। এদিকে সুপ্রিয়া, প্রিয়া, সাবেনারা একটু দূরে বসে মেয়েদের এসব খুনসুটি দেখছিলেন। প্রিয়া মুচকি হেসে বললেন
—“ লিসি জন্য বাড়িটা আরো জীবন্ত হয়ে গেছে। ”
সুপ্রিয়া শান্ত চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সত্যিই তো… এত অল্প সময়েই সবাইকে কত আপন করে নিয়েছে। ওদিকে লিসি এখনো কাজিনদের প্রশ্ন থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই নুসরাত দুষ্টু হেসে বললো—“ আচ্ছা, একটা কথা বল… কিরিস ভাই কি সত্যি সত্যি তোকে কাঁধে করে নিয়ে গেছে? তারপর কি ...... কিস করেছিলো?? ”
লিসি মুখ ঢেকে ফেললো প্রায় —“ উফফ তোমরা না! ”
সুরভী নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো
—“ আমাদের তো মনে হচ্ছিল কোনো সিনেমার হিরো সিন চলছে। ”
আরোবি সাথে সাথে বলে উঠলো—
—“ সিনেমার হিরোরা এত ভয়ংকর হয় না। জিয়ান কিরিসের লুকের আর ব্যবহারের সাথে হিরো মানায় না ভিলেন মানায়, ভাইয়া পুরাই ভিলেম নাম্বার 1। কিরিস ভাই যখন উঠে দাঁড়ালো, আমার তো মনে হচ্ছিল কেউ এখন মারা যাবে। ”
সবাই আবার হেসে উঠলো। এই হাসাহাসির মাঝেই হঠাৎ বিদ্যুৎ চমৎকালো। চারপাশ মুহূর্তে একটু অন্ধকার হয়ে এলো। হিয়া সাথে সাথে চমকে উঠলো—
—“ উফফ! এই সময়েই হতে হলো? ”
গোধূলির আধো অন্ধকার, গাছের পাতায় দুলতে থাকা বাতাস আর মেয়েদের গোল হয়ে বসে থাকা পুরো দৃশ্যটার মধ্যে অদ্ভুত মায়া তৈরি হলো। লিসি ধীরে মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকালো। আকাশে মেঘ জমছে হালকা। মনে হচ্ছে সন্ধ্যার পর বৃষ্টি নামতে পারে।
আর ঠিক সেই সময় তার ফোনে ছোট্ট একটা মেসেজ এলো। স্ক্রিনে শুধু একটা নাম ভেসে উঠলো।
“KIRIS”
লিসির বুকটা অকারণে ধক করে উঠলো। সে চুপচাপ মেসেজ খুললো।
—“ দৌড় দিয়ে পালানোর হিসাব এখনো বাকি আছে। ”
মেসেজটা পড়তেই লিসির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। আরোবি সাথে সাথে সেটা খেয়াল করে ফেললো —“ ওওওহ! কে মেসেজ দিয়েছে? ”
লিসি দ্রুত ফোন লুকিয়ে বললো —“ কেউ না! ”
কিন্তু তার লজ্জাভরা হাসিই সবাইকে সব বলে দিলো।
সন্ধ্যা নামার আগ মুহূর্ত থেকেই আকাশের রং বদলাতে শুরু করেছিল। দূরের কালচে মেঘগুলো ধীরে ধীরে পুরো আকাশ ঢেকে ফেলছে। বাতাসে ভিজে মাটির গন্ধ মিশে গেছে, যেন বৃষ্টি নামার আগে প্রকৃতি নিজেই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে। চারপাশে হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে। গাছের ডালগুলো দুলছে জোরে জোরে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ক্ষীণ আলো মেঘের আড়ালে ঝলকে উঠছে। রায় চৌধুরী বাড়ির ছাদে তখন মেয়েদের ছোট্ট আসর বসেছে। বড়রা সবাই রাতের খাবার খেয়ে আগেই নিজেদের ঘরে চলে গেছেন। কাল ভোরে আবার বিয়ের অনুষ্ঠান, তাই তাদের দ্রুত ঘুমানো দরকার। কিন্তু এই বাড়ির ছোটদের বোঝাবে কে? এদের তো রাত গভীর না হলে ঘুমই আসে না। ছাদের একপাশে বড় মাদুর পেতে সবাই গোল হয়ে বসে আছে। কেউ গল্প করছে, কেউ গান ধরেছে, কেউ আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষা করছে। বাতাসে মেয়েদের চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বারবার। আর সেই পুরো পরিবেশটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে লিসি।
ছাদের রেলিং ধরে। তার পরনে নরম হালকা রঙের থ্রি-পিস। বাতাসে ওড়নার কোনা বারবার উড়ে গিয়ে তার হাতে জড়িয়ে যাচ্ছে। খোলা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের পাশে এসে লাগছে। সে একদৃষ্টিতে দূরের মেঘভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তটা এত সুন্দর লাগছিল যে মনে হচ্ছিল কেউ যদি এখন ছবি আঁকে, তবে এই দৃশ্যটাই আঁকবে। আরোবি হঠাৎ বলে উঠলো
—“ উফফ! এই আবহাওয়ায় যদি গরম গরম কিছু খেতে পেতাম! ”
ঠিক তখনই নিচ থেকে ছেলেদের গলার শব্দ ভেসে এলো। কয়েক সেকেন্ড পর সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলো কাবির, রিহান আর ইশান। সবার হাতে বড় বড় ব্যাগ।
রিহান নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো
—“ তোমাদের ইচ্ছা পূরণ করতে হাজির হয়েছি আমরা। ”
ব্যাগ খুলতেই গরম গরম চপ, পেঁয়াজি, জিলাপি আর তারা আসার আগে চা বানিয়েও নিয়ে এসেছে। তারা একটু আগেই এসেছে শুধু চা বানানোর জন্য উপরে আসিনি। ধোঁয়া ওঠা চায়ের গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো। মেয়েরা সাথে সাথে খুশিতে চিৎকার করে উঠলো।নুসরাত দ্রুত একটা প্যাকেট নিয়ে বললো
—“ আহহ! আজকে তোমাদের মাফ করে দিলাম। ”
সুরভী পেঁয়াজি মুখে দিতে দিতে বললো
—“ এই আবহাওয়ায় এগুলোর স্বাদ আলাদা লাগে। ”
কাবির বুক ফুলিয়ে বললো
—“ দেখছো? আমরা না থাকলে তোদের জীবনই অসম্পূর্ণ। ”
আরোবি সাথে সাথে বললো —“ বেশি ভাবিস না। খাবার এনেছিস বলে আজকে বেঁচে গেছিস। ”
চারপাশে আবার হাসির রোল পড়ে গেলো।
এই হাসি-ঠাট্টার মাঝেই ধীরে ছাদে উঠলো কিরিস।
সে ইতোমধ্যে চেঞ্জ করে এসেছে। আজ আর সেই ভয়ংকর ব্যবসায়ী বা মাফিয়া ডনের লুক নেই। কালো নরম টি-শার্ট, সাথে হালকা ট্রাউজার। চুলগুলো ধোয়া, সামান্য ভেজা। হাতের ঘড়িটা ছাড়া আর কিছু নেই।
তবুও মানুষটার মধ্যে সেই অদ্ভুত ভারী উপস্থিতি রয়েই গেছে। ছাদে পা রেখেই তার চোখ সোজা গিয়ে থামলো
লিসির উপর। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার চুল বাতাসে উড়ছে। ওড়নার কোনা বারবার পিছনে ভেসে যাচ্ছে। দূরের মেঘের আলো এসে তার মুখে পড়ছে।
কয়েক সেকেন্ড কিরিস স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো।
চারপাশের শব্দ যেন ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেলো তার কাছে। শুধু ওই একটাই দৃশ্য পরিষ্কার লিসিও হয়তো অনুভব করেছিল। সে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো।
দুজনের চোখ এক হতেই বাতাসটা যেন আরো ঠান্ডা হয়ে উঠলো।ঠিক তখনই হঠাৎ জোরে বাতাস এলো।
লিসির চুল উড়ে গিয়ে মুখ ঢেকে দিলো।
আর কিরিস…
অজান্তেই ঠোঁটের কোণে খুব ছোট্ট একটা হাসি ফুটিয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
ছাদের উপর তখন হালকা অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরের আকাশে বিদ্যুৎ মাঝে মাঝে চিকচিক করছে। বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে বইছে, যেন যেকোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নেমে যাবে। চারপাশে সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত। কেউ চপ খাচ্ছে, কেউ গল্প করছে, কেউ আবার গান ধরেছে।
আর সেই কোলাহলের মাঝেই কিরিস ধীরে ধীরে লিসির দিকে এগিয়ে এলো। লিসি তখনো রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে। বাতাসে তার চুল বারবার মুখের উপর এসে পড়ছে। সে হাত দিয়ে সরাচ্ছে আবার উড়ে আসছে। কিরিস এসে ঠিক তার পাশে দাঁড়ালো। একদম কাছে। কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বললো না। শুধু বাতাসের শব্দ। তারপর কিরিস খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাতে থাকা কফির মগে চুমুক দিলো। লিসি তাকিয়ে দেখলো। বুঝতে বাকি নেই সে নিশ্চিত তার মাকে ডেকে কফি বানিয়ে দিতে বলেছে আর সঙ্গে বাকি ছেলে কয়টা চা। লিসি তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ তারপর ভ্রু কুঁচকে বললো
—“ আপনি এত কফি খান কেন? ”
কিরিস মগটা হাতে নিয়েই তার দিকে তাকালো
—“ ভালো লাগে। ”
লিসি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো
—“ মিথ্যা। কেউ এত ভালো লাগলেও দিনে এতবার কফি খায় না। ”
কিরিস হালকা হাসলো। বাতাসে তার ভেজা চুল কপালের উপর পড়ে আছে। সেই শান্ত হাসিটা মানুষটার ভয়ংকর দিকটাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য আড়াল করে দেয়।
লিসি এবার আরেকটু কাছে সরে এসে নিচু গলায় বললো —“ আর এতবার গোসল? আজকে আমি গুনেছি… তিনবার। ”
কিরিস ভ্রু তুললো —“ তুমি গুনেছো? ”
লিসি বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি বললো
—“ মানে… চোখে পড়েছে। ”
কিরিস এবার মুচকি হেসে কফিতে আরেক চুমুক দিলো।
—“ কাজের চাপ থাকলে অভ্যাস হয়ে যায়। ”
লিসি কৌতূহলী চোখে তাকালো। কিরিস কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো —“ মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। কফি আর ঠান্ডা পানি… দুটোই কাজে লাগে। ”
তার কণ্ঠটা এবার অনেক শান্ত।
গভীর।
লিসি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। এই মানুষটাকে বাইরে থেকে যতটা কঠিন লাগে… ভেতরে ঠিক কতটা ক্লান্ত, সেটা খুব কম মানুষই বোঝে।
বাতাসে আবার জোরে হাওয়া এলো। লিসির ওড়না উড়ে গিয়ে প্রায় কিরিসের হাতে লাগলো। কিরিস আলতো করে ওড়নার কোনাটা ধরে তার হাতে দিলো। লিসি ছোট্ট করে “থ্যাংক ইউ” বললো। তারপর আচমকা মুখে দুষ্টু হাসি এনে বললো —“ তাহলে আপনাকে রোজ দশবার গোসল করতে হবে বুঝছেন ? মাথা ঠান্ডা রাখার জন্য। ”
কিরিস ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালো
—“ এত চিন্তা করো আমার জন্য? ”
লিসি সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নিলো
—“ কে বলেছে চিন্তা করি? ”
কিরিস একটু ঝুঁকে এলো
—“ তাহলে দুপুরে আলাদা করে ক্ষীর রান্না করেছিলে কেন? ”
লিসি এবার সত্যিই ধরা খেয়ে গেলো। সে তোতলাতে লাগলো —“ আমি… মানে… সবার জন্যই— ”
কিরিস খুব নিচু গলায় বললো —“ মিথ্যা বলো না। ”
তার কণ্ঠে চাপা হাসি। লিসি লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো। কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে বিড়বিড় করে বললো—“ আপনার জন্যই বানিয়েছিলাম… তো কি হয়েছে? ”
কিরিস কিছু বললো না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
সেই দৃষ্টি এত গভীর ছিল যে লিসির বুক আবার অকারণে ধড়ফড় করে উঠলো। ঠিক তখনই দূর থেকে রিহানের গলা ভেসে এলো
—“ ভাইইই! লিসিকে একা ছাড়! আমরা এখনও জীবিত আছি! ”
চারপাশে সাথে সাথে হাসির শব্দ উঠলো। লিসি সুযোগ পেয়ে তাড়াতাড়ি সরে যেতে চাইলো। কিন্তু যাওয়ার আগে কিরিস ধীরে তার হাতের আঙুল ছুঁয়ে বললো
—“ দৌড় দিবে? ”
লিসি একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো
—“ দিবো। ”
তারপর সত্যিই দৌড়ে বাকিদের মাঝে চলে গেলো।
আর কিরিস… কফির মগ হাতে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখতেই থাকলো।
ছাদের একপাশে কাঠের লম্বা বসার জায়গাটায় গিয়ে বসল কিরিস। সামনে ছোট টেবিল। তার উপর ল্যাপটপ খোলা। স্ক্রিনের নীলচে আলো অন্ধকারে তার মুখের ধারালো রেখাগুলোকে আরো স্পষ্ট করে তুলছে। আঙুলগুলো দ্রুত কিবোর্ডে চলতে শুরু করলো।
আবার সেই কাজ। আবার সেই হিসাব, মেইল, ফাইল, সিদ্ধান্ত। আর ছাদের অন্যপাশে মেয়েরা এখনো নিজেদের গল্পে ব্যস্ত। কেউ পুরোনো কাহিনি বলছে, কেউ হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে, কেউ আবার বৃষ্টির গন্ধ নিয়ে কবিতা শুরু করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে রিহান আর কাবিরও কথা ছুড়ে দিচ্ছে, আর তাতেই নতুন করে হাসির রোল উঠছে। সময়ের সাথে সাথে রাত আরো গভীর হতে লাগলো। আকাশের মেঘ এখন পুরো ছাদ ঢেকে ফেলেছে। বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেছে বেশ। দূরে কোথাও মৃদু বজ্রের শব্দও শোনা যাচ্ছে। একসময় বড় বড় হাই তুলতে শুরু করলো সবাই।
নুসরাত উঠে দাঁড়িয়ে বললো
—“ আমি আর পারছি না, কালকে আবার সকালে উঠতে হবে। ”
রিহান নুসরাত কে ধরে বলে —“ ওই কোলে করে নিয়ে যাবো নাকি হেঁটে যাবে! "
নুসরাত মুচকি হাসলো —“ তাও নিতে পারো husband ”
আরোবিও সাথে সাথে বললো—
—“ হুম, চল নিচে যাই। নাহলে তোদের প্রেম দেখতে হবে ”
এক এক করে সবাই নিচে নেমে যেতে লাগলো।
ছাদ ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে এলো। শুধু কিরিস এখনো বসে কাজ করছে। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে লিসি।
সে ছোট্ট করে হাই তুললো। চোখদুটো আধবোজা হয়ে আসছে। বাতাসে তার চুল এলোমেলো, আর ঠান্ডায় হাত দুটো ওড়নার ভেতর ঢুকিয়ে রেখেছে।
ঠিক তখনই টুপ…
এক ফোঁটা বৃষ্টি এসে পড়লো ছাদের মেঝেতে।
তারপর আরেকটা। ধীরে ধীরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। লিসি কয়েক সেকেন্ড আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে কিরিসের পাশে গিয়ে বসল। কিরিস ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বুঝে গেলো। সে একবার তাকালো লিসির দিকে।
মেয়েটার চোখে স্পষ্ট ঘুম। মাথাটাও ধীরে ধীরে একদিকে হেলে পড়ছে। কিরিস খুব আস্তে তার হাতটা ধরে টেনে নিজের দিকে আনলো। তারপর কোনো কথা না বলেই তাকে নিজের কোলের উপর বসিয়ে নিলো।
লিসি সাথে সাথে হালকা প্রতিবাদ করলো—
—“ আমি ঘুমাইনি… কি করছেন, কোলে নিচ্ছে কেন? ”
কিরিস শান্ত গলায় বললো—
—“ জানি। চুপ করে ঘুমায় ”
তারপর এক হাত দিয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো। বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাস থেকে আড়াল করে রাখার মতো করে।
—“ চোখ বন্ধ করো। ”
লিসি মাথা নাড়িয়ে বললো—
—“ না… আপনি কাজ করুন, আমি পাশে বসে আছি। নামান। ”
কিরিস এবার নিচু হয়ে তার কপালের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো —“ একদম চুপচাপ ঘুমাও। ”
তার কণ্ঠে এমন এক শান্ত আদেশ ছিল, যেটা অমান্য করার শক্তি লিসির কখনোই থাকে না। কয়েক মিনিট পর সত্যিই মেয়েটার শরীর ধীরে ধীরে ঢিলে হয়ে এলো।
সে মাথা রেখে দিলো কিরিসের বুকে। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেলো। বৃষ্টির ছোট ছোট ফোঁটা বাতাসে ভেসে এসে ছাদের ধারে পড়ছে। দূরে মেঘ গর্জে উঠছে হালকা।
আর কিরিস…
এক হাতে ল্যাপটপে কাজ করছে, অন্য হাতে লিসিকে এমনভাবে জড়িয়ে রেখেছে যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কিছু। মাঝে মাঝে নিচে তাকিয়ে দেখছে
মেয়েটা সত্যিই বাচ্চাদের মতো ঘুমিয়ে পড়েছে।
তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা টি-শার্ট ভেদ করে কিরিসের বুক ছুঁয়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ পর অবশেষে সে ল্যাপটপ বন্ধ করলো। বৃষ্টি তখন একটু বেড়েছে। বাতাসও ঠান্ডা হয়ে গেছে আরো। কিরিস ধীরে লিসিকে দুই হাতে তুলে নিলো কোলে। মেয়েটা আধঘুমের মাঝেও অজান্তে তার গলার কাছে মুখ গুঁজে এলো। কিরিস কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। ঘরে ঢুকে খুব সাবধানে লিসিকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। এরপর নিজেও পাশে শুয়ে চাদরটা দুজনের উপর টেনে দিলো।বাইরে তখন টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ। ঘরের ভেতর নরম অন্ধকার আর ঠান্ডা আবহাওয়া। লিসি ঘুমের মধ্যেই একটু সরে এসে কিরিসের আরও কাছে চলে এলো। কিরিস আলতো করে তাকে জড়িয়ে নিলো। তারপর চোখ বন্ধ করলো।
এভাবেই বৃষ্টিভেজা সেই রাতটাও ধীরে ধীরে দুজন মানুষকে জড়িয়ে শান্ত হয়ে এলো।
রাতের শেষ প্রহরে বৃষ্টিটা আরো কিছুটা বেড়েছিল।
জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ পড়ছিল একটানা। ঠান্ডা বাতাস পর্দা সরিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকছিল ধীরে ধীরে। সেই নরম অন্ধকার ঘরের মাঝখানে কিরিস এখনো লিসিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। লিসির মাথাটা তার বুকের উপর রাখা। এক হাত অজান্তেই কিরিসের টি-শার্ট চেপে ধরে আছে, যেন ঘুমের মাঝেও মানুষটাকে ছেড়ে দিতে চাইছে না।
আর কিরিস…
ঘুমের মধ্যেও আলতো করে তাকে নিজের মাঝে আগলে রেখেছে। যেন এই শান্তিটুকু তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।

১৮ ই মে মঙ্গলবার সকাল ৭ টা
রায় চৌধুরী বাড়িতে আজ যেন একেবারে উৎসব নেমেছে। আজ কাবিরের বিয়ে। ভোর হতেই পুরো বাড়ি জেগে উঠেছে মানুষের কণ্ঠে, হাসিতে, ছোটাছুটিতে।
নিচে রান্নাঘরে সকাল থেকেই ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। বড় বড় হাঁড়িতে রান্না হচ্ছে, কেউ ফুল সাজাচ্ছে, কেউ অতিথিদের রুম দেখছে, কেউ আবার ডেকোরেশনের শেষ কাজগুলো ঠিক করছে। পুরো বাড়িটা যেন রঙ, আলো আর উৎসবের গন্ধে ভরে গেছে। বড়রা সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত। সুপ্রিয়া একদিকে কাজের লোকদের নির্দেশ দিচ্ছেন, অন্যদিকে বিয়ের গয়না আর শাড়িগুলো মিলিয়ে দেখছেন।
অন্য দিকে....
সকালবেলার নরম আলো ধীরে ধীরে পর্দার ফাঁক গলে ঘরের ভেতরে ঢুকছে। বাইরে পুরো বাড়ি তখন থেকেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কারো ডাকাডাকি, কোথাও হাসির শব্দ, কোথাও আবার তাড়াহুড়ো করে কিছু খোঁজার আওয়াজ ভেসে আসছে। কিন্তু এই ঘরটা এখনো শান্ত।
বিছানার উপর কিরিস আর লিসি ঠিক আগের রাতের মতোই ঘুমিয়ে আছে। লিসি আধা ঘুমের মাঝেই কিরিসের বুকের সাথে জড়িয়ে আছে। আর কিরিসের হাত শক্ত করে জড়ানো তার কোমরে। কাল রাতে কিরিস হঠাৎ করে লিসিকে বেডে সুয়ে দিয়ে নিজে শার্ট খুলে সুয়ে পড়ায় চেঞ্জ করার সুযোগই পায়নি।
আর লিসি তো শাড়ি পরে ঘুমাতেই পারে না।
ঘুমের মধ্যে শাড়ি এলোমেলো হয়ে গেছে। আঁচল প্রায় নেই বললেই চলে, চুলগুলোও পুরো বিছানাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। পায়ের দিক থেকে শাড়ি হাঁটু উপরে।
সকালের ঠান্ডা বাতাসে লিসির ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙলো।
চোখ খুলেই প্রথমে কিছু বুঝতে পারলো না। তারপর বুঝলো সে এখনো কিরিসের বুকের উপর আধশোয়া হয়ে আছে। আর কিরিস?
সে এখনো ঘুমাচ্ছে। লিসি নিজের দিকে তাকালো শাড়ি তার পুরো এলোমেলো। যেটা দেখে লিসি ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে সরে যেতে গেলো। কারণ এই অবস্থায় কিরিস দেখলে লিসির কপালে সকালেই দুঃখ চলে আসবে। তাই কোনো মতে শাড়িটা বুকে টেনে কিরিসের কাছ থেকে সরে যেতে চাই।
ঠিক তখনই
কিরিস না তাকিয়েই আরো শক্ত করে তাকে নিজের দিকে টেনে নিলো।
লিসি চমকে উঠলো।
—“ উফফ! ছাড়ুন! ”
কিরিস চোখ না খুলেই ভারী গলায় বললো
—“ কোথায় যাচ্ছো? ”
লিসি ফিসফিস করে বললো
—“ নিচে সবাই উঠে গেছে… আজকে বিয়ে… ”
কিরিস এবার আধখোলা চোখে তার দিকে তাকালো।
চুল এলোমেলো, ঘুমভাঙা চোখ তবুও মানুষটার দৃষ্টি আগের মতোই গভীর। সে আরো কাছে টেনে নিয়ে বললো —“ পাঁচ মিনিট। ”
লিসি সাথে সাথে মাথা নাড়লো —“ না! আমাকে যেতে হবে! ”
কিরিস ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি এনে বললো
—“ এত সকালে কে দেখবে তোমাকে? ”
লিসি মুখ গোমড়া করে বললো—
—“ সবাই দেখবে! আর… আমার শাড়ির অবস্থা দেখেছেন? ”
কিরিস এবার সত্যিই নিচে তাকালো তারপর মুচকি হেসে ফেললো। লিসি লজ্জায় সাথে সাথে চাদর টেনে নিলো।
—“ হাসছেন কেন! ”
কিরিস শান্ত গলায় বললো—
—“ কারণ তুমি ঘুমালে একদম বাচ্চাদের মতো হয়ে যাও।”
লিসি চোখ ছোট করে তাকালো —“ আর আপনি একদম অত্যাচারী। ”
কিরিস এবার ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো।
—“ হুম। শুধু তোমার সাথে। ”
লিসির বুকটা ধক করে উঠলো। সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে থাকলো না। কোনোরকমে কিরিসের হাত সরিয়ে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে গেলো। তারপর প্রায় দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর বের হলো হালকা রঙের সুন্দর একটা কামিজ পরে। চুল তাড়াহুড়ো করে বাঁধা, মুখে এখনো লজ্জার আভা। কিরিস তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বসে তাকে দেখছে।।লিসি দ্রুত বললো
—“ তাকাবেন না এভাবে! ”
কিরিস শান্ত ভঙ্গিতে বললো
—“ না তাকিয়ে থাকাও কঠিন। ”
লিসি সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে হাঁটলো।
যাওয়ার আগে আবার পিছনে তাকিয়ে বললো—
—“ দ্রুত নিচে আসবেন। সবাই ব্যস্ত। ”
তারপর সত্যিই দৌড়ে বেরিয়ে গেলো। কিরিস কয়েক সেকেন্ড দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর ধীরে উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেল। নিচে তখন পুরো বাড়ি একেবারে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। কারণ আজ বরপক্ষ যাবে কনের বাড়ি। আর বিয়ের দিনের সকালে কখনো কিছু ঠিকঠাক হয় নাকি?
কেউ নিজের পাঞ্জাবি খুঁজে পাচ্ছে না।
কেউ জুতা।
কেউ আবার ফোন কোথায় রেখেছে সেটাই ভুলে গেছে।
রিহান সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে
—“ আমার ঘড়িটা কে সরাইছে?! ”
ইশান পাশ থেকে বললো—
—“ তুই নিজেই হারাইছিস। ”
কাবির meanwhile দিব্যি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করছে। আজও তার মধ্যে কোনো টেনশন নেই। সুপ্রিয়া পুরো বাড়ি সামলাতে ব্যস্ত। কিন্তু তিনি আজ যাবেন না।।নিজের ছেলের বিয়ে বলে সে বাড়ি থাকবে। প্রিয়াও থেকে যাচ্ছে তার সাথে। আর মির্জা বেগমের হাঁটুর ব্যথার কারণে তিনিও বাড়িতেই থাকবেন।
যাচ্ছেন সাবেনা, কাবেনা, পাপড়ি আর বাড়ির অন্যরা।
আনোয়ার আর আনারুল তো সকাল থেকেই লোকজন সামলাতে ব্যস্ত।
ড্রইংরুমের একপাশে বড় বড় ট্রেতে মিষ্টি, মিঠাই, ফল, ফুল, ডাব সব সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে। কেউ কাপড় গুছাচ্ছে, কেউ উপহারের বাক্স মিলিয়ে দেখছে।
একটাও কিছু বাদ পড়া যাবে না। এই ব্যস্ততার মাঝেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো লিসি।
আর কয়েক মিনিট পর কিরিসও নিচে এলো।
ফ্রেশ হয়ে। চুল ভেজা, হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ।
তার শান্ত, ভারী উপস্থিতিতে মুহূর্তের জন্যও চারপাশের তাড়াহুড়ো যেন একটু থেমে গেল। কিরিস সোজা গিয়ে ছোফায় বসলো, চারপাশ দেখছে সবাই ব্যস্ত।
চারদিকে মানুষ, শব্দ, হাঁটাহাঁটি, তাড়াহুড়ো অথচ কারো ঠিকমতো বসে খাওয়ার সময় নেই। ডাইনিং টেবিলে হালকা নাস্তা রাখা হলেও সবাই যে যার মতো দু’কামড় খেয়েই উঠে পড়েছে। কেউ ফোনে ব্যস্ত, কেউ গিফট সামলাচ্ছে, কেউ গাড়ির ব্যবস্থা দেখছে। উপরে মেয়েদের ফ্লোরে তো একদম উৎসবের পরিবেশ। জারা, হিয়া, নুসরাত, আরোবি সবাই লিসিকে নিয়ে ব্যস্ত। কেউ শাড়ি আয়রন করছে, কেউ গয়না মিলাচ্ছে, কেউ মেকআপ বক্স খুলে বসেছে। এদিকে নিচে ছেলেদের ফ্লোরে সম্পূর্ণ উল্টো অবস্থা। সুট, কোট, ঘড়ি, পারফিউম সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ইশান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে, রিহান ফোনে কারও সাথে কথা বলছে,
আর কাবির…
সে রীতিমতো সোফার মাঝখানে বসে মাথা চুলকাচ্ছে।
— “আমি কি লুঙ্গি পরে বিয়ে করতে যাব নাকি?”
তার বিরক্ত গলা শুনে ইশান হেসে কফিতে দম আটকে ফেলল।
— “ভাই তুই চাইলে পাঞ্জাবি পরে কাবিন করতে পারিস, নতুন ট্রেন্ড হবে।”
— “চুপ কর হারামজাদা!”
কাবির বালিশ ছুঁড়ে মারতেই ইশান হেসে সরে গেল।
ঠিক তখনই…
টক… টক… টক…
ভারী বুটের শব্দে পুরো রুমটা যেন মুহূর্তে থেমে গেল।
দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো কিরিস। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, চোখে সেই ঠান্ডা ভয়ংকর স্থিরতা। তার হাতে ফোন, আর মুখভর্তি অদ্ভুত শান্ত ভাব যে শান্তি দেখলে সবাই আরো ভয় পায়। সে ধীরে ধীরে কাবিরের দিকে তাকাল।
— “ড্রেস নিয়ে এত চিৎকার করছিস কেন?”
কাবির মুখ কুঁচকে বলল
— “ভাই আমার বিয়ে আজ। আর আমার শেরওয়ানি নাই!”
কিরিস সোফার পাশে এসে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল,
— “আছে। আনিনি।”
সবাই একসাথে তাকালো ইশান ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “মানে?”
কিরিস এবার রিহানের দিকে তাকাল
— “তুই কাবিরকে নিয়ে এখনই বের হবি।
ওখান থেকে ড্রেস নিয়ে সরাসরি চেঞ্জ করে নিচে নামবি।
তারপর গাড়িতে উঠে ডাইরেক্ট ভেন্যু।”
কাবির অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
— “কিন্তু আনিস নি কেন?”
কিরিস ফোনটা পকেটে রেখে ধীরে বলল
— “আজ রাস্তা পরিষ্কার না,জ্যাম বেশি। আর আজকাল সামনে যা দেখা যায়, পিছনে তার চেয়েও বেশি কিছু থাকে। ভালো করে নজর রাখতে হয়… যাতে পিছনের অবস্থা বোঝা যায়, আর সামনে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।”
তার গলার স্বর ছিল স্বাভাবিক। একদম সাধারণ একটা ব্যাখ্যা।
কিন্তু…
ঘরে থাকা ছেলেগুলোর মাথার ভিতর কথাটা ঢুকতেই পরিবেশ বদলে গেল। রিহানের চোখ মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে উঠল। ইশানের হাসিটাও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কারণ তারা সবাই বুঝেছে এটা কোনো ড্রেস আনার দায়িত্ব না। এটা টহল। টার্গেটের ভিতরে লোক ঢুকেছে কি না সেটা নিশ্চিত করার মিশন। আজ রায়হানের বড় ভাই রাহভান হামলা করবে এই খবর আগেই কনফার্ম হয়েছে।
আর কিরিস এখন কাবির আর রিহানকে আগে পাঠাচ্ছে… টোপ হিসেবে। কাবির কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। তারপর বুকের উপর হাত রেখে ফিসফিস করে পড়তে শুরু করল
— “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ…”
রিহান পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রাখল
— “এত ভয় পাইস না ভাই। মরলে একসাথে মরবো।”
— “চুপ কর! আমার আজ বিয়ে!”
কাবির প্রায় কেঁদে উঠল।
— “আল্লাহর ওয়াস্তে আজকে যেন আমাকে মাইরা না ফেলে!”
সোফার একপাশে বসে ইশান এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হো হো করে হেসে উঠল।
— “দেখে যা! মানুষ বিয়ের দিন কাবিন পড়ে…
আর এই ব্যাটা কালিমা পড়ে বের হচ্ছে মরার ভয়ে !”
কাবির এবার জুতা হাতে তুলে তেড়ে গেল
— “ইশান! তোরে আমি আজকেই খুন করবো!”
পুরো রুমে আবার হৈচৈ শুরু হয়ে গেল। আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিরিস শুধু একবার ঘড়ির দিকে তাকালো। তার ঠান্ডা চোখে তখন অন্য হিসাব চলছিল। আজকের দিনটা শুধু বিয়ের দিন না… আজ কে বাঁচবে, আর কে ভুল করবে সেই হিসাবও শুরু হয়ে গেছে। নিচের ফ্লোরটা তখন একদম মাথার উপর দিয়ে ঝড় যাওয়ার মতো অবস্থা। কেউ টাই খুঁজছে, কেউ ঘড়ি, কেউ জুতা। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাবির এমন মুখ করে আছে যেন তাকে বিয়েতে না, যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। রিহান গাড়ির চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে বলল
— “চল ভাই, দেরি হইতেছে।”
কাবির বুকের উপর হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল
— “আমারে যদি কিছু হয়… আমার বউরে বলে দিস আমি ওরে অনেক ভালোবাসতাম।”
ইশান সাথে সাথে বলে উঠল
— “আগে বিয়ে হোক, তারপর ভালোবাসিস!”
রুমজুড়ে আবার হাসির শব্দ উঠল। কাবির এবার নাটকীয় ভঙ্গিতে সোফার উপর উঠে দাঁড়াল।
— “শুনে রাখ! আজকে যদি আমার কিছু হয়, আমার রুমের PS5 ইশান পাবে না!”
— “ওইটা তোরে মেরে হলেও আমি নিয়ে নিবো।”
ইশান নির্লজ্জের মতো বলতেই রিহান হাসি চেপে মাথা নাড়ল। ঠিক তখনই কিরিস পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল।
কাবির তাড়াতাড়ি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
— “ভাই, একটা কথা বল তো… সত্যি সত্যি গুলি চলবে?”
কিরিস কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল — “চেষ্টা করবি যেন আগে তোর বিয়ে হয়। তারপর মরিস।”
এক সেকেন্ড নীরবতা… তারপর পুরো রুম ফেটে পড়ল হাসিতে। কাবির চিৎকার করে বলে— “এইডা কোনো সান্ত্বনা?”
কাবিরের চিৎকারে ইশান এবার মেঝেতে বসে হেসে কাঁদার অবস্থা। শেষমেশ অনেক নাটক, কালিমা, আর দোয়া দরুদ পড়ে কাবির আর রিহান গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেল। গাড়ি বের হওয়ার সময়ও কাবির জানালা দিয়ে মাথা বের করে বলছিল—
— “দোয়া কইরো ভাইসব!”
ইশান নিচে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে চিৎকার করল,
— “কবুল বলার আগে মইরা যাস না!”
তারপর আবার হাসির রোল।
―――
এদিকে বাড়ির ভেতরে অন্যরকম ব্যস্ততা।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে লিসি খুব যত্ন করে ছোট ছোট কৌটায় কফি গুছিয়ে রাখছে। সাধারণ কফি না Black Ivory Coffee.
পৃথিবীর সবচেয়ে দামি আর বিরল কফিগুলোর একটি।
এত স্ট্রং আর রেয়ার যে সবাই এটা খেতেও পারে না।
কিরিস ছাড়া এই বাড়িতে আর কেউ ছুঁয়েও দেখে না প্রায়। লিসি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে কফিটা আলাদা প্যাক করল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে কিরিস যেখানে যাবে, কিছুক্ষণ পরই কফি চাইবেই।
আর না পেলে?
তার মেজাজ কেমন হয় সেটা পুরো বাড়ির জানা।
তাই আগে থেকেই সুন্দর ছোট্ট কালো কৌটায় কফিটা গুছিয়ে রাখল সে। তারপর সেটা হাতে নিয়ে উপরে উঠতে যাবে। ঠিক তখনই পিছন থেকে সুপ্রিয়ার কণ্ঠ ভেসে এলো।
— “লিসি মা, আমার সাথে একটু ঘরে আসো তো।”
লিসি ঘুরে শান্তভাবে বলল — “জি আম্মু ।”
সে সুপ্রিয়ার পেছন পেছন ঘরের দিকে গেল। ঘরটা আজ খুব সাজানো। বিছানার উপর শাড়ি, গয়না, ফুল সব সুন্দর করে রাখা। সুপ্রিয়া ধীরে ধীরে আলমারির লকার খুললেন। তারপর ভেতর থেকে একটা ভারী গয়নার বাক্স বের করলেন। লিসি চুপচাপ তাকিয়ে রইল। বাক্সটা খুলতেই ভেতর থেকে ঝলসে উঠল সোনার আলো।
মাঝখানে বিশাল এক হার। পাশে দুইটা মোটা চুড়ি।
পুরো সেটটাই এত রাজকীয় যে চোখ সরানো কঠিন।
লিসির বুঝতে বাকি রইল না। এটা তিশার জন্য।
কারণ ঠিক এমন একটা সেট সুপ্রিয়া আগেই তাকে দিয়েছিলেন। সুপ্রিয়া বাক্সটা লিসির হাতে তুলে দিয়ে নরম গলায় বললেন
— “কবুল বলার পরে এটা তুমি গিয়ে তিশাকে পরিয়ে দিবে।”
লিসি হতভম্ব হয়ে তাকাল।
— “আমি?”
— “হ্যাঁ। এই বাড়ির বড় বৌমা হিসেবে।”
তার কণ্ঠে গর্ব ছিল।
— “আমার অনুপস্থিতি থেকে তুমি ওকে সম্মানের সঙ্গে গয়নাগুলো পরাবে। এটা ওর প্রাপ্য।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে ইতস্তত করে উঠল
— “কিন্তু আম্মু … আমি এত বড় দায়িত্ব—”
সুপ্রিয়া মৃদু হেসে তার কথা থামালেন। তারপর ধীরে ধীরে লিসির মাথায় হাত রাখলেন।
— “আমার ছেলের দায়িত্ব যে মেয়েটা নিয়েছে…
তার কফি গুছিয়ে রাখে, প্রয়োজনের জিনিস মনে করিয়ে দেয়, রাগ বুঝে চুপ থাকে… তার কাছে এসব গয়নার দায়িত্ব খুব ছোট।”
লিসি চুপ হয়ে গেল। সুপ্রিয়া আবার বললেন
— “সংসারে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কী জানো? নিজের স্বামীর খেয়াল রাখা। বাকিগুলো সব তার কাছে ঠুনকো।”
কথাগুলো শুনে লিসির গাল লাল হয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে বাক্সটা দুই হাতে নিল। তারপর মাথা নিচু করে নরম গলায় বলল — “ঠিক আছে আম্মু … আমি পরিয়ে দিবো।”
সুপ্রিয়ার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। লিসি এরপর গয়নার বাক্সটা বুকে আগলে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল। তার পায়ের নূপুরের মৃদু শব্দে করিডোরটা কেমন শান্ত হয়ে উঠছিল… আর তার হাতে ধরা বাক্সটা যেন আজ শুধু গয়না না এই বাড়ির বড় বৌমা হওয়ার নীরব দায়িত্বও বহন করছিল। লিসি ধীরে ধীরে নিজের রুমের দরজাটা খুলে ভিতরে ঢুকল। ঢুকেই থমকে গেল একটু।
পুরো রুমজুড়ে হালকা পারফিউম আর কফির গন্ধ মিশে আছে। বড় জানালার পর্দা দিয়ে সকালের আলো এসে পড়েছে ভেতরে। আর সেই আলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কিরিস। শুধু কালো শার্ট আর ডার্ক প্যান্ট পরা।
শার্টের উপরের দুইটা বোতাম খোলা, হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। গলায় টাই ঝুলছে ঠিকই, কিন্তু এখনো বাঁধা হয়নি। কানে ব্লুটুথ, হাতে ট্যাব। বান্দা ভিডিও কলে কারও সঙ্গে এত সিরিয়াস মুখে কথা বলছে যেন আজ তার নিজের বিয়ে না, কোনো আন্তর্জাতিক ডিল ফাইনাল হচ্ছে — “No, move the shipment tonight. I don’t want any delay…”
এক হাতে ট্যাব স্ক্রল করছে, অন্য হাতে আলমারি ।
লিসি ভিতরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে লাগিয়ে বলল,
— “খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে গুছিয়ে নিন ?”
তারপর হাতে থাকা কফির কৌটা আর গয়নার বক্সটা একপাশে রাখতে রাখতে বলল,
— “ আব্বু আপনাকে ডাকছে নিচে।”
লিসির কণ্ঠ শুনে কিরিস প্রথমবার মাথা তুলে তাকালো।
কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়েই রইল। যেন এত কাজের মাঝেও তার চোখ এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেছে।