পর্ব :79
লিসি তখন সামনে থাকা কাপড় টা সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখছে। কিরিস আলমারির ভিতর থেকে কিছু বের করতে বের করতে শান্ত গলায় বলল
— “তাই তো… একটা কাজ করো।”
— “জি?”
— “টাইটা বেঁধে দাও।”
ওপাশে ভিডিও কলে থাকা ক্লায়েন্টের গলার শব্দ একদম বন্ধ। পুরো নীরবতা। মনে হচ্ছিল লোকটা বুঝতেই পারছে না সে ঠিক কী শুনেছে। এই মানুষটা… যে কাউকে ধমক দিয়ে কাঁপিয়ে দেয়, সে এখন কাউকে টাই বেঁধে দিতে বলছে? লিসি ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলল।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
আগে সে টাই বাঁধতেই পারত না। কতবার যে উল্টো করেছে, ভুল করেছে…
একদিন আরোবির সঙ্গে নিয়ে বাধার চেষ্টা করে। আরোবির গলায় সে টাই পড়াতে শুরু করে,আর প্রথমে টাই এমনভাবে বেঁধেছিল যে আরোবি নিজেই খুলতে গিয়ে হেসে গড়াগড়ি খেয়ে বলেছিল—
“এটা টাই না, ফাঁসির দড়ি।”
সেই কথা মনে পড়তেই লিসির ঠোঁটে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল। এখন অবশ্য সে বেশ ভালোই পারে। বার বার চেষ্টা করার পর এখন সে দক্ষ হয়ে গেছে। কিরিস লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর লিসি টাই ধরেই বিরক্ত মুখে তাকাল— “এইদিকে আসুন তো।”
কিরিস ভ্রু তুলল।
— “কেন?”
— “এত লম্বা মানুষকে টাই বাঁধবো কিভাবে? খেয়ে খেয়ে শুধু খাম্বার মতো লম্বা হয়েছেন।”
ওপাশে ভিডিও কলে কেউ হালকা কাশি দিল। সম্ভবত হাসি চাপছে। কিরিস কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ সামান্য ঝুঁকে দাঁড়ালো। তবুও লিসির নাগাল ঠিকমতো হচ্ছে না দেখে সে শেষে খাটের উপর উঠে দাঁড়াল। তার নূপুরের শব্দে রুমটা কেমন নরম হয়ে উঠল।।তারপর খুব মন দিয়ে টাইটা গুছিয়ে বাঁধতে লাগল। কিরিস স্থির চোখে শুধু তার মুখটাই দেখছিল। লিসির পাতলা আঙুলগুলো ধীরে ধীরে টাইয়ের নট ঠিক করছে… আর তার কপালের পাশ দিয়ে চুল বারবার সামনে পড়ে যাচ্ছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য ভিডিও কল, কাজ, পৃথিবী সব যেন দূরে সরে গিয়েছিল। টাই বাঁধা শেষ করে লিসি গর্বিত গলায় বলল,
— “হয়ে গেছে।”
কিরিস আয়নার দিকে তাকিয়ে একবার টাইটা দেখল।
তারপর নিচু গলায় বলল — “হুম। ভালো।”
এই “ভালো” শব্দটাই তার মুখে বিশাল প্রশংসা।
লিসি খাট থেকে নামতেই কিরিস ট্যাবটা বন্ধ করে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। যাওয়ার আগে থেমে বলল,
— “নিচে আসার সময় আমার ব্লেজারটা আর ওয়াইন রঙের শার্টটা সঙ্গে একটা ঘড়ি নিয়ে আসবে। ড্রেসিং রুম থেকে।”
লিসি সাথে সাথে তার হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকালো।
— “হাতে তো একটা অলরেডি পরেই আছেন।
আর কয়টা করবেন?”
কিরিস দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে বলল,
— “ওটা এক ঘণ্টা আগে পরেছি। পুরনো হয়ে গেছে। নতুন একটা আনো।”
দরজা খুলে সে বেরিয়ে গেল। লিসি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে তারপর হাফ ছেড়ে বিছানায় বসে পড়ল।
— “বড়লোক মানুষ…”
তার বিরক্ত গলায়ও অদ্ভুত মায়া লুকানো ছিল। তারপর
লিসি ধীরে ধীরে ড্রেসিংরুমের দরজাটা খুলে ভিতরে ঢুকল। ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যায় এটা সাধারণ কারও ড্রেসিংরুম না। চারদিকে দামি পারফিউমের গন্ধ,
সাজানো ঘড়ির কালেকশন, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কোট, টাই, কাফলিংকস। একপাশে কাচের শেলফে সারি সারি ঘড়ি রাখা। Rolex, Patek Philippe, Audemars Piguet…
যে ঘড়িগুলোর দাম শুনলে সাধারণ মানুষের হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। লিসি অভ্যস্ত চোখে তাকিয়ে শুধু মাথা নাড়ল। তারপর শেলফের পাশ থেকে একটা সুন্দর Hermès leather tote bag বের করল। কালকেই কিরিস এনে দিয়েছিল। অবশ্য লিসি বলেছিলো আর কিরিস এনে দেছে। ম্যাট ব্ল্যাক রঙের ব্যাগটা একদম এলিগেন্ট। বাইরে থেকে ছোট দেখালেও ভেতরে প্রচুর জায়গা। ব্যাগটা লিসির ভীষণ পছন্দ হয়েছিল।
সে দেরি না করে গুছানো শুরু করল। প্রথমে ছোট্ট কালো কৌটায় রাখা Black Ivory Coffee ভেতরে রাখল।
তারপর কিরিসের জন্য একটা নতুন ঘড়ি বেছে নিল।
পাশাপাশি একটা সিলভার টাই ক্লিপ। তারপর শেলফ খুলে সুন্দর করে ভাঁজ করা একটা স্কার্ফ বের করল।
কিরিস অনেকসময় গাড়িতে বসে থাকলে হালকা ঠান্ডা লাগলে এটা ব্যবহার করে। এরপর একে একে আরো কিছু জিনিস ঢুকতে লাগল ব্যাগে—
একটা Tom Ford oud wood perfume travel spray
একটা ছোট Montblanc fountain pen
তার প্রিয় imported sugar-free dark chocolate
মিন্ট ট্যাবলেট
এক জোড়া extra cufflinks
আর ছোট্ট একটা medicine pouch।
কারণ কিরিস এমন মানুষ বাইরে থেকে যত ঠান্ডা আর গুছানো দেখাক, তার ছোট ছোট প্রয়োজনের শেষ নেই।
সবসময় কফি লাগবে। কলম লাগবে। হঠাৎ মাথা ধরলে medicine চাই। টাই ঠিক না লাগলে extra tie clip চাই।
আগে অবশ্য সব নিজেই ম্যানেজ করত।
কিন্তু এখন… লিসি জিনিসগুলো গুছাতে গুছাতে নিজেই বিড়বিড় করল — “হুম… এখন তো ম্যানেজ করার জন্য একটা বউ আছে।”
কথাটা বলেই নিজেই হালকা লজ্জা পেয়ে গেল। ব্যাগটা গুছিয়ে বিছানার পাশে রাখল সে। তারপর নিজের জন্য আলমারি খুলল। খুব যত্ন করে একটা শাড়ি বের করল,
সাথে matching গয়না। সব সুন্দর করে খাটের উপর সাজিয়ে রাখল। তারপর চারদিকে তাকাতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পুরো রুমটা আবার কিরিস এলোমেলো করে রেখে গেছে। সোফার উপর ফাইল। টেবিলে কাগজ।
বিছানার পাশে ট্যাবের কভার। একদিকে টাই, আরেকদিকে কোট। লিসি হাত কোমড়ে রেখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল।
— “একটা মানুষ এত অগোছালো কিভাবে হয় আল্লাহ…”
তারপর ধীরে ধীরে সব গুছানো শুরু করল। ফাইলগুলো আলাদা করে সাজালো। গুরুত্বপূর্ণ কাগজ একসাথে রাখল। টেবিল পরিষ্কার করল। কোট ঠিক জায়গায় ঝুলিয়ে দিল। বিছানার চাদরটাও টেনে ঠিক করে দিল।
ধীরে ধীরে পুরো রুমটা একদম পরিপাটি হয়ে উঠল।
শেষে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকিয়ে ছোট্ট হাসল লিসি।
এখন রুমটা দেখতে সত্যিই রাজকীয় লাগছে।
আর এই গুছানো, যত্নে ভরা ছোট ছোট কাজগুলোর মাঝেই যেন অদৃশ্যভাবে ফুটে উঠছিল এই ঘরটা এখন শুধু কিরিসের না… এখানে একটা মেয়ের ছোঁয়াও জড়িয়ে গেছে।
রুমটা পুরো গুছিয়ে শেষ করে লিসি ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। খাটের উপর সুন্দর করে রাখা আছে তার শাড়িটা। গাঢ় মেরুন রঙের নেট শাড়ি।
পুরো শাড়িজুড়ে সূক্ষ্ম সিকুইন আর স্টোনের কাজ, আলো পড়লেই চিকচিক করে উঠছে। রাজকীয় অথচ কোমল একটা সৌন্দর্য। আর পাশে রাখা ব্লাউজটা সে হাতে তুলে একটু তাকালো। গভীর নেক ঠিকই আছে, কিন্তু অতিরিক্ত খোলামেলা না। লিসির কোমল সৌন্দর্যের সঙ্গে মানানসই মার্জিত ডিজাইন।
অতিরিক্ত কিছু নয়…
তবুও চোখ সরানো কঠিন।
কিরিস আজ মেরুন শার্ট পরবে তার উপর ব্ল্যাক কোট আর ব্ল্যাক প্যান্ট। আর লিসির এই শাড়িটা যেন ঠিক তার সঙ্গেই মিলিয়ে তৈরি। লিসি ধীরে ধীরে রেডি হতে শুরু করল। চুল নিয়ে কিছুক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবল সে। এত লম্বা চুল পুরো খোলা রাখলে সুন্দর লাগবে ঠিকই… কিন্তু আজকের সাজে আরো ভালো লাগবে যদি সামনের অংশটা হালকা টুইস্ট করে পিছনে ছোট্ট স্টোন ক্লিপে আটকানো থাকে, আর বাকিটা ঢেউ খেলানো অবস্থায় পিঠ বেয়ে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত নেমে থাকে।
শেষমেশ সেটাই করল সে। চুলের কালো ঢেউ মেরুন শাড়ির উপর পড়ে পুরো সাজটাকে যেন আরো গভীর করে তুলল। তারপর গয়নার দিকে তাকালো। ভারী কিছু না। ম্যাচিং ওয়াইন-স্টোনের একটা চিকন চোকার সেট,
সাথে ছোট dangling earrings, হাতে slim diamond bracelet আর একটা elegant ring। কারণ লিসির সৌন্দর্য এমনিতেই এত তীব্র যে বেশি গয়না দিলে উল্টো ভারী লাগত। শেষে ছোট্ট একটা matching clutch bag হাতে নিল সে। আর আলাদা করে পাশে রাখা Hermès tote bag টা দেখে নিজেই হালকা হাসল। ওটা পুরোপুরি কিরিসের জন্য। ভেতরে কফি, ঘড়ি, পারফিউম, medicine pouch… বান্দার ছোটখাটো প্রয়োজনের অর্ধেক জিনিসই সেখানে। সব গুছিয়ে নিয়ে লিসি গয়নার বাক্সটা সাবধানে tote bag-এর ভিতরে রাখল। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে ধীরে ধীরে deep nude shade-এর lipstick দিতে লাগল।
ঠিক তখনই—
ধাপাধাপি শব্দ তুলে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল আরবি, জারা, হিয়া, নুসরাত আর সুরভী। ভিতরে ঢুকেই সবাই কয়েক সেকেন্ড থমকে গেল জারা প্রথমে চোখ বড় বড় করে বলল,
— “ইয়া আল্লাহ…”
হিয়া মুখ হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
— “লিসি আপু… তুমি মানুষ নাকি Pinterest?”
পুরো রুমে হাসির শব্দ উঠল।
আরবি এসে সরাসরি লিসির পাশে দাঁড়িয়ে আয়নায় তাকালো — “না সিরিয়াসলি বলতেছি…
এই রঙটা তোমার উপর এত সুন্দর লাগতেছে কেন?”
সুরভী মজা করে বলল,
— “আজকে কাবির ভাইয়ের বিয়েতে কেউ কনের দিকে তাকাবে না।
সবাই বড় ভাবির দিকেই তাকিয়ে থাকবে।” লিসি সাথে সাথে লজ্জা পেয়ে বলল,
— “আহা থামো তো তোমরা…”
নুসরাত হঠাৎ খাটের উপর রাখা কিরিসের ব্ল্যাক কোটটা আর শার্টা হাতে তুলে বলল,
— “ওহহহ! তাইলে আজকে ম্যাচিং ম্যাচিং খেলা চলতেছে?”
হিয়া সাথে সাথে বলে উঠল,
— “এই জন্যই কিরিস ভাই সকালে এত চুপচাপ ছিল!”
লিসি ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
— “মানে?”
জারা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— “মানে উনি মনে মনে ভাবতেছিলেন—
‘আমার বউ আজ সবাইরে হার্ট অ্যাটাক দিবে।’”
আবার সবাই হেসে উঠল। লিসি এবার হালকা বিরক্ত গলায় বলল — “তোমরা না একদম…”
কিন্তু তার লাল হয়ে যাওয়া কান দেখে সবাই আরো মজা পেতে লাগল। এদিকে নুসরাত tote bag টা খুলে ভেতরে উঁকি দিয়ে অবাক।
— “এই ব্যাগে কী আছে?”
হিয়া উঁকি দিয়ে সাথে সাথে বলে উঠল,
— “কফি… ঘড়ি… পারফিউম… medicine…”
তারপর নাটকীয় মুখ করে বলল,
— “বুঝছিস? এইটা বউ না। এইটা personal luxury management system।”
নুসরাত —“ আরে নিজেও রিহানের জন্য এতো কিছু নেই নি, অবশ্য আমার রিহানের এতো কিছু লাগে না।
পুরো রুম আবার হাসিতে ভরে উঠল। লিসি এবার সত্যি সত্যি লজ্জা পেয়ে বলল — “উনি পরে খুঁজবে তো… তাই রাখছি।”
আরবি মুচকি হেসে ধীরে বলল,
— “হুম… খুঁজে পেলে রাগ করবে না। না পেলে পুরো দুনিয়া কাঁপাবে।”
কথাটা শুনে সবাই একসাথে মাথা নাড়ল। কারণ এটা সবাই জানে কিরিসের জীবন যত ভয়ংকরই হোক…
তার ছোট ছোট অভ্যাসগুলো সে বেশ কদর করে।
লিসি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাজটা আরেকবার দেখল। তার পায়ে রুপার নূপুরের নরম ঝংকার। নাকে ছোট্ট হীরের নাকফুল। আর হাতে সেই দুইটা সোনার চুড়ি কিরিসের দেওয়া। এই জিনিসগুলো খোলা একরকম নিষেধই। কেউ মুখে কিছু না বললেও লিসি জানে… ওগুলো শুধু গয়না না। ওর উপর কিরিসের নীরব অধিকার। লিসি এবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবার চুল খুলে দিল। স্টোনের কাজ করা ক্লিপটা খুলতেই ঘন কালো চুল ঢেউ খেলিয়ে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত নেমে এলো। সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ল।
না…
আজ বেশি স্টোন, বেশি সাজ তার ভালো লাগছে না।
তাই সামনের চুলগুলো শুধু হালকা করে গুছিয়ে কানের পাশে সেট করল। বাকিটা পুরো খোলা রাখল। কিরিসও বলেছিলো চুলগুলো খুলা রাখতে। আর এই সাধারণ সৌন্দর্যটাই যেন তাকে আরো ভয়ংকর সুন্দর করে তুলল। মেরুন শাড়ির উপর কালো ঢেউ খেলানো চুল… হাতে সোনার চুড়ি… নাকে ছোট্ট নাকফুল…
একদম রাজবাড়ির বউয়ের মতো লাগছিল তাকে।
আরবি তাকিয়ে থেকে ধীরে বলল,
— “এখন তো একদম শেষ…”
হিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “কিরিস ভাই আজকে মানুষ খুন করলেও অবাক হবো না।”
জারা—“ বলবে আমার বউয়ের উপর কেউ নজর দিবি না শালা ”
সবাই হেসে উঠল। তারপর একে একে সবাই নিচে নামতে শুরু করল। নিচতলায় তখন একদম বিশৃঙ্খল সুন্দর ব্যস্ততা। বাইরে সারি সারি কালো গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে।
বডিগার্ড, ড্রাইভার, লোকজন সবাই ব্যস্ত। কেউ ফুল তুলছে, কেউ গিফট রাখছে, কেউ অতিথিদের উঠাচ্ছে।
এই ব্যস্ততার মাঝেই ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে সবার সঙ্গে নামল লিসি। এক হাতে ছোট matching clutch bag।
আর কাঁধে Hermès tote bag যেটা পুরোপুরি কিরিসের জিনিসে ভর্তি, আর সঙ্গে হাতে ধরে রাখা কিরিসের কোর্ট।তার নূপুরের শব্দ ধীরে ধীরে সিঁড়ি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। আর আশেপাশের কয়েকজন স্টাফ পর্যন্ত একবার তাকিয়ে থেমে গেল। কারণ লিসিকে আজ সত্যিই অসাধারণ লাগছিল। অতিরিক্ত কিছু না…
তবুও চোখ সরানো যায় না। নুসরাত এসে পাশে দাঁড়াল।
দুজন একসাথে এগিয়ে গেল সুপ্রিয়া আর প্রিয়ার দিকে।
সুপ্রিয়া প্রথমে নুসরাতকে দেখে মুচকি হাসলেন।
তারপর লিসির দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে রইলেন। মায়াভরা চোখে বললেন,
— “মাশাআল্লাহ… আমার বড় বৌমাকে আজ একদম রাজরানীর মতো লাগছে।”
প্রিয়াও মুগ্ধ হয়ে বললেন,
— “এই শাড়িটার রঙ তোমার উপর অসম্ভব সুন্দর মানিয়েছে মা।”
লিসি লাজুক মুখে মাথা নিচু করল।
নুসরাত একটু নাটকীয় সুরে বলে —“ দেখছো বড় বউমাকে পেয়ে এখন আমাকে ভুলে গেছে! ”
প্রিয়া —“ তা কি করে যায়, আমাদের বাড়ির আদরের দুই বউমা তোমরা তাই না, আপা ”
সুপ্রিয়া সম্মতি দিলো —“ অবশ্য একজন রানী হলে আরোকজন পরী, কেউ কম যায় না, আর এতো জিনিস নিশ্চিত ভাবে কিরিসের তাই না! আগে আমি করতাম এখন তুমি করো। ”
এই কথা শুনে লিসি মুচকি হেসে উঠে। এরপর নুসরাত আর লিসি দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
তারপর একে একে সবাই গাড়িতে উঠতে শুরু করল।
হাসাহাসি, ডাকা-ডাকি, হৈচৈ পুরো বাড়ি যেন চলন্ত উৎসব। কিন্তু… সবাই উঠলেও লিসি উঠল না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কারণ সে জানে কিরিস এখনো আসেনি
আর কিরিসের বউ হয়ে সে তাকে ছাড়া গাড়িতে উঠবে?
অসম্ভব। তাই সবার ব্যস্ততার মাঝেও সে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল। এক হাতে clutch bag,
কাঁধে tote bag, মেরুন শাড়ির আঁচল বাতাসে হালকা উড়ছে… আর তার চোখ বারবার সিঁড়ির দিকেই চলে যাচ্ছিল। চারপাশের সবাই একে একে গাড়িতে উঠেছে, কাজিনরা তো লিসিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই বুঝতে পেরেছে বান্দীর বান্দা এখনো আসিনি।
আরেবি গাড়িতে উঠার আগে লিসির কাছে এসে বলে —“ দেখে সোনা তোমার বর যেন তোমাকে দেখে টপকে মানে পটল না তোলে। ”
লিসি একটু হেসে —“ নাহ তা আর যাচ্ছে না, ওনি যা মানুষ কইমাছের প্রাণ এতো সহজে মরবে না ”
আরোবি সম্মতি জানায় —“ তা ঠিক আমি গেলাম তুই ভাইয়ার সঙ্গে আসিস আর এবার কিন্তু গেটে তোকে আমাদের পক্ষে চাই ”
লিসি —“ হুম ঠিক আছে ”
আরোবি গাড়িতে উঠে গেলো। বাড়ির সামনে তখন একের পর এক গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে। কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়িগুলোর সারি পুরো পরিবেশটাকে যেন আরো গম্ভীর করে তুলেছে। ড্রাইভাররা প্রস্তুত।
বডিগার্ডরা চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। সবার মুখে ব্যস্ততা। ঠিক তখনই গেটের বাইরে থেকে ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকল আরেকটা গাড়ি। ম্যাট ব্ল্যাক রঙের BMW গাড়িটা বাড়ির সামনে এসে থামতেই আশেপাশের কয়েকজন স্টাফ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ড্রাইভার সামনে। পিছনের সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে কিরিস। এক হাতে ফোন অন্য হাতে ফাইল। গাড়ি থামার পরও কয়েক সেকেন্ড সে মাথা নিচু করে কিছু একটা পড়ছিল। লিসি দূর থেকে তাকিয়ে খানিকটা বিরক্ত হলো।
এই মানুষটা কি কোনোদিন স্বাভাবিক হতে পারে না?
বিয়ের দিনেও কাজ। মনে হচ্ছিল এগিয়ে গিয়ে বলতে
— “একদিন কাজ না করলে দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে নাকি?”
কিন্তু কিছু বলল না। কারণ সে জানে কিরিসের জীবনটা সাধারণ না, বড় ব্যাবসায়ী সে, তার আন্ডারে লাক্ষ লাক্ষ মানুষ কাজ করে, একসাথে দুইটা ব্যাবসা সামলায় একটা পরিবারের আরেকটা নিজের গড়ে তোলা Business Empire VELCRON Company। VELCRON Company নামটি কেবল একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত এক প্রভাবশালী সাম্রাজ্যের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর শতাধিক দেশে যার শাখা, ব্যবসায়িক আধিপত্য ও নিজস্ব সম্পত্তির বিস্তার ছড়িয়ে আছে রাজকীয় দৃঢ়তায়। যে দেশে তার পদচারণা পড়েছে, সেখানেই নির্মিত হয়েছে ব্যক্তিগত প্রাসাদসম আবাসন, বিলাসবহুল পেন্টহাউস কিংবা ব্যক্তিগত ভিলা যেন পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তেই তার নিজস্ব একেকটি রাজত্ব বিদ্যমান। অঢেল সম্পদ, সীমাহীন প্রভাব ও অগণিত ব্যবসায়িক চুক্তির ভিড়ে ‘ব্ল্যাক কার্ড’ তার কাছে বহু আগেই সাধারণ এক অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।
অর্থ তার জন্য প্রয়োজন নয়, বরং ক্ষমতার আরেকটি নীরব প্রতীক। পারিবারিক RC মানে RayCrest Group of Industries কে নিজ হাতে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি VELCRON Company এর বৈশ্বিক সাম্রাজ্যও সমান দৃঢ়তায় পরিচালনা করে সে। দুটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের সিইও হওয়া সত্ত্বেও তার কর্মনিষ্ঠা এতটাই নিখুঁত যে সময় পর্যন্ত যেন তার নির্দেশ মেনে চলে। লিসি ধীরে এগিয়ে গিয়ে দরজার কাছে দাড়ালো গাড়ির দরজা খুলতেই কিরিস ধীরে মাথা তুলে তাকালো। আর তারপর… তার দৃষ্টি এসে থামল লিসির উপর মুহূর্তটা যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল। চারপাশে মানুষ আছে, শব্দ আছে, গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজ আছে তবুও তার কাছে সবকিছু হঠাৎ দূরে সরে গেল।
শুধু দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। গাঢ় মেরুন শাড়িতে আবৃত। খোলা দীর্ঘ কেশ বাতাসে দুলছে। নাকে ছোট্ট নাকফুল। হাতে তার দেওয়া সোনার চুড়ি।
আর কাঁধে ঝুলছে সেই tote bag যার ভিতরে তার প্রয়োজনের ছোট ছোট জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখা।
কিরিস স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতরকার অনুভূতিগুলো বাইরে থেকে কখনো বোঝা যায় না।
সে এমন মানুষ, যার মুখের উপর ঝড় এলেও অভিব্যক্তি বদলায় না। কিন্তু তার দিকে তাকালে দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও কোমল হয়ে উঠল, কেননা এই মেয়েটা শুধু সুন্দর না।
সে এমন এক শান্তি, যে শান্তির অস্তিত্ব কিরিস নিজের জীবনে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। তার চারপাশে বরাবরই ছিল রক্ত, ভয়, ক্ষমতা, হিসাব, বিশ্বাসঘাতকতা।
মানুষ তাকে দেখলে ভয় পায়, মাথা নিচু করে। আর সেই জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটা নিঃশব্দে তার কফি গুছিয়ে রাখে, তার টাই ঠিক করে দেয়,
তার এলোমেলো ঘর সাজিয়ে রাখে। এক অদ্ভুত গৃহস্থ শান্তি। যেটার প্রতি মানুষ আসক্ত হয়ে যায় অজান্তেই।
বাইরের পৃথিবীর কাছে কিরিস ভয়ংকর, প্রভাবশালী ও অপরাজেয় অথচ লিসির সামনে এলেই তার সমস্ত কঠোরতা নিঃশব্দে প্রশান্তিতে গলে যায়। তখন সে আর সাম্রাজ্যের অধিপতি থাকে না, কেবল নিজের শান্তির আশ্রয়ে ফিরে আসা এক ক্লান্ত মানুষ হয়ে ওঠে। কিরিসের দৃষ্টি ধীরে ধীরে লিসির মুখ থেকে নেমে তার হাতে থাকা চুড়িগুলোর দিকে গেল তার দেওয়া। এবং মেয়েটা এখনো সেগুলো খুলেনি। অদ্ভুত এক তৃপ্তি নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ল তার ভেতরে। লিসি তার দৃষ্টি টের পেয়ে অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে ফেলল। তারপর ছোট্ট গলায় বলল,
— “সবাই চলে যাচ্ছে…”
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে গাড়ির দরজা পুরো খুলে দিল নিচু, শান্ত অথচ কর্তৃত্বভরা গলায় বলল,
— “উঠো।”
লিসি ধীরে গাড়িতে উঠে তার পাশে বসল। তার tote bag টা সাবধানে পাশে রাখতেই কিরিস একঝলক তাকালো।
সে কিছু বলল না। কিন্তু সে জানে ভেতরে কী কী আছে।
ড্রাইভার রিয়ার ভিউ মিররে একবার তাকিয়ে অনুমতি চাইতেই কিরিস শান্তভাবে বলল,
— “চলো।”
পরমুহূর্তেই একের পর এক গাড়ির সারি ধীরে ধীরে রায় চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করল। সামনে কালো গাড়ির লম্বা লাইন। পেছনে নিরাপত্তার গাড়ি।
আজ তারা যাচ্ছে এক বিয়ের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই বহরের মাঝখানে বসে থাকা কিছু মানুষের চোখে ছিল আনন্দ… আর কিছু মানুষের চোখে ছিল আসন্ন ঝড়ের নীরব পূর্বাভাস। কিরিস লিসির দিকে তাকিয়ে আছে লিসি কিরিসের দৃষ্টি অনুভব করে ব্যাগটাকে একটু নিজের কাছে টেনে বলে —“ ওইভাবে কি দেখছেন! কোনদিন দেখেননি নাকি আমাকে? ”
কিরিস মুচকি হাসলো মারাত্মক তার মুচকি হাসি। পুরুষের এমন মুচকি হাসি ভীষণ মারাত্মক হয়। হাসিটা বজায় রেখেই লিসির চোখের দিকে তাকায় চোখে চোখ রেখেই বলে উঠে — “যুদ্ধক্ষেত্রে অদম্য বীরের মতো দৃঢ় থাকা পুরুষও দিনের শেষে নিজের প্রিয় নারীর সান্নিধ্যেই খুঁজে পায় প্রকৃত শান্তি। ”
লিসি চোখ না সরিয়ে চোখে চোখ রেখেই মনের গভীর থেকেই বলে উঠে — “কারণ প্রতিটি অজেয় বীরের অন্তরালেও এমন এক নারী বিরাজমান থাকে, যার সান্নিধ্যে এসে তার সমস্ত রণহুঙ্কার স্তব্ধ হয়ে যায়, আর সে কেবল শান্তির আশ্রয় প্রার্থনা করে।”
কিরিস তাকিয়ে থেকেই বলে — “তাহলে সত্যিই… তুমিই সেই পরিচিত অনুচ্চারিত শান্তি।”
এই একটি বাক্যের ভেতরেই কিরিস যেন বোঝাতে চায় লিসি তার কাছে নতুন কেউ নয়। বহু যুদ্ধ, বহু জন্মের ক্লান্ত পথ পেরিয়ে সে যেন আগেই অনুভব করেছিল এই নারীকে। যাকে সে আজ পেয়েছে, সে আসলে কোনো নতুন আগমন নয়; বরং বহু যুগ ধরে হারিয়ে যাওয়া এক অব্যক্ত পরিচয়, যা আজ আবার ফিরে এসেছে তার জীবনে।
লিসি এবার চোখ ফিরিয়ে নিজের ঘোর কাটিয়ে বলে উঠে —“ এমন ভাবে বলছেন যেন আমি আপনার সাথে আগে দেখা করেছি। আগের জন্মে দেখা করেছিলাম নাকি? ”
কিরিস চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে—“ হয়তো অবশ্যই। তুমি দেখা করেছিলে। আমাদের দেখা হয়েছিল। আর দেখো এখন আবার হয়েছে। ”
লিসি আর কিছু বললো না চুপ থাকলো।
রাস্তাজুড়ে তখন রায় চৌধুরীদের গাড়ির লম্বা বহর এগিয়ে চলেছে। সামনের গাড়িগুলোতে যেন ছোটখাটো উৎসব বসেছে। গাড়িতে তো একদম হুলস্থুল অবস্থা।
ইশান জোরে গান চালিয়ে বসেছে, আর হিয়া বারবার আয়নায় নিজের মুখ দেখছে।
— “আমার চুল ঠিক আছে তো?”
নুসরাত বিরক্ত হয়ে বলল,
— “ তুই পাঁচ মিনিট পর পর একই প্রশ্ন করতেছিস।”
— “আজকে বিয়ে ! আমি সুন্দর না লাগলে চলবে?”
গাড়ির ভিতর আবার হাসির রোল উঠল। গাড়িতে মেয়েদের অবস্থা আরো ভয়ংকর। জারা আর হিয়া ভিডিও করছে নুসরাত গান গাইছে, আরবি সবার candid ছবি তুলছে। পুরো পরিবেশে আনন্দের ঝলক।
কিন্তু… সেই কোলাহল থেকে আলাদা হয়ে মাঝের কালো গাড়িটার ভিতর ছিল একদম অন্যরকম নীরবতা।
ড্রাইভার সামনে স্থির হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। পিছনের সিটে কিরিস আর লিসি। লিসি জানালার পাশে বসে বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। আর কিরিস ট্যাব খুলে কিছু একটা দেখছে। কয়েক সেকেন্ড পর লিসি বিরক্ত গলায় বলল,
— “আপনার কাজ কি কোনোদিন শেষ হয় না?”
কিরিস চোখ না তুলেই বলল,
— “হয়।”
— “কবে?”
— “যেদিন মরবো।”
লিসি ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
— “আল্লাহ! মানুষ এত অশুভ কথা বলে?”
কিরিস এবার হালকা তাকালো তার দিকে।
— “তুমি সকাল থেকে আমাকে বকছো কেন?”
— “কারণ আপনি বিয়ের দিনেও মানুষকে ভয় দেখান, কাজ করেন, আর ঠিকমতো রেডিও হন না।”
— “আমি তো রেডি।”
লিসি সাথে সাথে বলল,
— “কোথায় রেডি? ব্লেজারও আমি এনে দিলাম, যে শার্টা অনুষ্ঠানে পরবেন সেটা আমার ব্যাগে,ঘড়ি আমার কাছে শুধু একটা কালো শার্টটা পরে আছেন ।”
কিরিস এবার ট্যাবটা বন্ধ করল। তারপর ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ দৃষ্টি লিসির দিকে ঘুরল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বলল
— “তোমার lipstick টা একটু হালকা করা উচিত ছিল।”
লিসি অবাক হয়ে ঠোঁটে হাত দিল।
— “কোথায়? এত গাঢ় লাগছে নাকি?”
সে ব্যাগ থেকে ছোট আয়নাটা বের করতে যাবে ঠিক তখনই কিরিস হঠাৎ তার ঘাড়ের পিছনে হাত রাখল।
পরের মুহূর্তেই টেনে নিজের দিকে নিয়ে এলো।
লিসি হতভম্ব হয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কিরিস তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। একদম গভীর, থামাহীন চুম্বন। গাড়ির ভিতর মুহূর্তে নিঃশ্বাস আটকে যাওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হলো। ড্রাইভার সামনে তাকিয়েই রইল। মনে হচ্ছিল জীবনে কিছুই শোনেনি, কিছুই দেখেনি। আর লিসি? সে পুরো ছটফট করছে।
এক হাতে কিরিসের শার্ট চেপে ধরে তাকে সরানোর চেষ্টা করছে।
— “ম্ম… কিরিস… ছাড়ুন…”
কিন্তু কিরিস যেন ইচ্ছা করেই আরো সময় নিচ্ছে।
পুরো এক মিনিট পর ধীরে ধীরে তাকে ছাড়ল সে।
লিসির নিঃশ্বাস এলোমেলো চোখ বিস্ফারিত। ঠোঁটের lipstick অর্ধেক নষ্ট। সে হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে তারপর বিরক্ত গলায় বলল
— “পাগল নাকি আপনি! এত সুন্দর করে সেজেছি সব নষ্ট করে দিলেন!”
কিরিস সম্পূর্ণ শান্ত মুখে তার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে বলল — “এখন হালকা লাগছে।”
লিসি কয়েক সেকেন্ড বিশ্বাসই করতে পারল না। তারপর রাগে প্রায় ফেটে পড়ে বলল,
— “আপনি ইচ্ছা করে করেছেন!”
— “হুম।”
— “অসভ্য মানুষ একটা!”
— “তবুও আমার সাথেই বসে আছো।”
— “গাড়ি থেকে নামিয়ে দেন তাহলে!”
কিরিস ঠান্ডা গলায় বলল,
— “অসম্ভব।”
লিসি বিরক্ত হয়ে ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে ঠোঁট ঠিক করতে লাগল। আর কিরিস পাশে বসে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত মুখে তাকিয়ে আছে। তার চোখের কোণে তখন স্পষ্ট চাপা হাসি। কারণ এই মেয়েটার সাথে এমন তর্ক করাটাও তার কাছে অদ্ভুত শান্তির মতো লাগছিল। লিসি আয়নাটা সামনে ধরে বিরক্ত মুখে ঠোঁট ঠিক করছে। আর পাশ থেকে কিরিস সম্পূর্ণ শান্তভাবে তাকিয়ে আছে।
যেন কিছুই হয়নি। লিসি রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,
— “একদম তাকাবেন না আমার দিকে।”
— “কেন?”
— “কারণ আপনি অপরাধী।”
কিরিস ভ্রু তুলল।
— “আমি কী করেছি?”
লিসি অবিশ্বাসের চোখে তাকালো।
— “আল্লাহ! মানুষ এত নির্লজ্জ কিভাবে হয়?”
কিরিস এবার সিটে হেলান দিয়ে ধীরে বলল
— “তোমাকে সুন্দর লাগছিল।”
— “তাই বলে lipstick নষ্ট করতে হবে?”
— “ওটা এমনিতেও বেশি ছিল।”
লিসি টিস্যু ছুঁড়ে মারল তার দিকে।
— “আপনার কোনো aesthetic sense নাই।”
কিরিস টিস্যুটা হাতে ধরে শান্তভাবে বলল
— “আমার sense ঠিকই আছে। তোমাকে হালকা সাজে বেশি সুন্দর লাগে।”
লিসি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর জোর করে গম্ভীর মুখ করে বলল,
— “তবুও জিজ্ঞেস না করে এমন করা যায় না।”
— “আমি কি permission নিয়ে কিছু করি?”
কথাটা এত স্বাভাবিকভাবে বলল যে লিসি আবার থেমে গেল। তারপর নিচু গলায় বিড়বিড় করল,
— “মাফিয়া টাইপ মানুষ…”
কিরিস শুনেও না শোনার ভান করল। কিছুক্ষণ পর লিসি আবার ব্যাগ খুলে lipstick বের করতেই কিরিস তাকালো।
— “আবার দিবে?”
— “হ্যাঁ দিবো।”
— “তারপর?”
— “তারপর কিছু না।”
কিরিস ধীরে সামনে ঝুঁকে এল।
— “আমি আবার নষ্ট করে দিবো।”
লিসির চোখ গোল হয়ে গেল সে সাথে সাথে lipstick ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল।
— “দিবো না!”
কিরিসের ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠল।
লিসি সেটা দেখে আরো বিরক্ত হলো।
— “আপনি হাসছেন কেন?”
— “তুমি ভয় পেয়েছো।”
— “মোটেও না!”
— “তাহলে lipstick লাগাও।”
— “না লাগালেই হলো।”
— “হুম।”
লিসি এবার মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড পর কিরিস ধীরে তার কাঁধে পড়ে থাকা চুলের একটা গোছা আঙুলে সরিয়ে দিল।
নিচু গলায় বলল — “চুল খোলা রাখাটা ঠিক করেছো।”
লিসি চমকে তার দিকে তাকালো। কারণ কিরিস খুব কমই এমন সরাসরি প্রশংসা করে। সে ছোট্ট গলায় বলল,
— “স্টোনগুলো ভালো লাগছিল না…ভালোই করেছো তোমার বেশি কিছু লাগে না।”
লিসির গাল হালকা লাল হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
— “আপনি আজকে খুব কথা বলছেন।”
— “তোমাকে আজকে খুব সুন্দর লাগছো।”
এইবার সত্যি সত্যিই লিসি চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে.....
লিসি এখনও হালকা রাগী মুখে জানালার দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। গাড়ির ভিতর নরম আলো, হালকা পারফিউমের গন্ধ আর বাইরের রাস্তার শব্দ মিলিয়ে অদ্ভুত শান্ত একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। হঠাৎ তার চোখ গেল সামনের সিট আর পিছনের সিটের মাঝখানে।
কালো টিন্টেড একটা পাতলা পার্টিশন, পাশে ছোট্ট কন্ট্রোল বাটন। লিসি কৌতূহলী হয়ে ভ্রু কুঁচকালো।
তারপর আঙুল তুলে বলল
— “এইটা কিসের জন্য?”
কিরিস একবার তাকিয়ে আবার ট্যাবে চোখ দিল।
— “পর্দা।”
— “সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। কেন লাগানো?”
কিরিস এবার ধীরে ট্যাবটা নামালো। তার চোখে সেই ভয়ংকর শান্ত ভাবটা ফুটে উঠল। তারপর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক গলায় বলল
— “একটু আগে তোমার সাথে যা করলাম না?”
লিসি কিছু বুঝে না বুঝে তাকিয়ে রইল। কিরিস ঠান্ডা গলায় বাকিটা বলল,
— “ওটা করার জন্য।আর যখন ওর থেকেও একটু বেশি কিছু করতে ইচ্ছা করবে, তখন পর্দা টেনে দিবো।
যাতে শুধু আমি দেখতে পাই।”
লিসির চোখ একদম বড় হয়ে গেল
— “কী?!”
তার মুখ লাল হয়ে উঠল মুহূর্তেই। সামনে ড্রাইভার এখনও এমনভাবে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে যেন সে জন্ম থেকেই কিছু শোনে না। লিসি সাথে সাথে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল
— “আপনি এসব কী বলেন!”
কিরিস ভ্রু তুলল।
— “মিথ্যা বলেছি?”
— “চুপ!”
— “তুমি জিজ্ঞেস করেছো।”
লিসি বিরক্ত হয়ে তার হাতে হালকা চাপড় দিল
— “সব প্রশ্নের এমন উত্তর দিতে হয়?”
— “আমি ঘুরিয়ে কথা বলি না।”
— “আপনার সমস্যা কী জানেন? আপনি খুব নির্লজ্জ।”
কিরিস শান্তভাবে বলল
— “তোমার সাথে? হুম।”
এই স্বীকারোক্তিটা এত নির্লিপ্তভাবে বলল যে লিসি কয়েক সেকেন্ড চুপ মেরে গেল। তারপর আবার গম্ভীর মুখ করে বলল
— “পর্দা টানার কোনো দরকার নাই।”
— “এখন না।”
— “কখনোই না!”
কিরিস হালকা ঝুঁকে তার দিকে তাকালো।
— “নিশ্চিত?”
লিসি সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।
— “আপনি অসভ্য।”
— “তবুও আমার বউ।”
লিসি এবার সত্যি সত্যিই কথা হারিয়ে ফেলল।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ব্যাগটা বুকে জড়িয়ে ধরল।
তারপর খুব আস্তে বিড়বিড় করল,
— “আল্লাহ… এই মানুষটার সাথে কিভাবে থাকি আমি…”
কিরিস স্পষ্ট শুনেও কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে সেই চাপা, বিপজ্জনক হাসিটা ফুটে উঠল আবার।
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ লিসির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে সিটে হেলান দিয়ে নিচু, ভারী গলায় বলল
— “পর্দা তো আমি একদিন টানবোই…”
লিসি সাথে সাথে চোখ বড় করে তাকালো।
— “আপনি আবার শুরু করেছেন!”
কিরিস তার কথা না শুনেই শান্তভাবে বলল,
— “আর সেদিন এই back seat-এ কী কী হবে…”
সে সামান্য ঝুঁকে লিসির কানের কাছে মুখ নিয়ে এলো।
— “সেটা শুধু দেখবে ”
লিসির বুক ধক করে উঠল। তারপর সাথে সাথে সে কিরিসকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল।
— “আল্লাহ! আপনার মুখে কোনো লাগাম নাই?”
কিরিস সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত মুখে সোজা হয়ে বসল।
— “আমি শুধু future planning বললাম।”
— “এইসবকে planning বলে?”
— “হুম।”
লিসি হতাশ মুখে মাথায় হাত দিল।
— “আপনি বাইরে এত ভয়ংকর সিরিয়াস থাকেন কিভাবে? মানুষ জানলে বিশ্বাসই করবে না।”
কিরিস এবার ঠান্ডা চোখে তাকালো।
— “মানুষের সব জানার দরকারও নেই।”
তার গলার স্বরটা হঠাৎ গভীর হয়ে উঠল।
— “কিছু জিনিস শুধু তোমার জন্য।”
কথাটা শুনে লিসি কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে গেল।
তারপর মুখ লুকানোর জন্য জানালার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল — “বেশি কথা বলেন…”
কিরিস ধীরে তার হাতে থাকা চুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল — “তবুও শুনো।”
লিসির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু সেটা লুকাতে সে তাড়াতাড়ি গম্ভীর মুখ করে বলল,
— “আমি কিন্তু পর্দা টানতে দিবো না।”
কিরিস হালকা ভ্রু তুলল।
— “দেখা যাবে। এমন ভাবে পর্দা টানবো যে মিসেস কিরিস আপনি পরের দিন উঠে দাড়াতে পারবেন না। ”
নাহ লিসির আর সত্যিই কিছু বলার নেই সাদা মুখটা লজ্জায় একদম টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে।
লিসি মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, আর কিরিস ফোনে কিছু একটা দেখছিল।
ঠিক তখনই........ টুন।
ফোনে একটা encrypted notification ভেসে উঠল।
কিরিসের চোখ মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। মেসেজটা ছোট।
“Kabir has been taken.”
এক সেকেন্ড দুই সেকেন্ড। তার মুখের অভিব্যক্তি বদলালো না। শুধু চোখের গভীরতা হঠাৎ ভয়ংকর ঠান্ডা হয়ে উঠল। লিসি সেটা খেয়াল করে ভ্রু কুঁচকালো।
— “কি হয়েছে?”
কিরিস উত্তর দিল না। ঠিক তখনই আবার ফোনে আরেকটা মেসেজ এল। Unknown Number.
সে মেসেজটা খুলল।
* “নিজের ভাইকে যদি বাঁচাতে চাও, তাহলে এখানে চলে আসো।”*
নিচে একটা location pin।
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে মাথা তুলল। সেই দৃষ্টি দেখে লিসির বুক কেঁপে উঠল কারণ এই চোখ সে খুব কম দেখেছে। এই চোখ মানে কিছু একটা খুব খারাপ হতে চলেছে। ঠিক তখনই রিহানের কল চলে এলো।
কিরিস কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে হাঁপানো গলা
— “ভাই! আমি বুঝতে পারতেছি না কিভাবে হলো!
আমি মাত্র দুই মিনিটের জন্য বাইরে গেছিলাম...
কাবির শেরওয়ানি ট্রাই করতে ঢুকছিল...... তারপর.....”
ওপাশে বিশৃঙ্খলার শব্দ। কারও চিৎকার দৌড়াদৌড়ি।
রিহান প্রায় রাগ আর অপরাধবোধে কাঁপছে।
— “আমি বুঝতে পারি নাই ভাই! হঠাৎ দেখি দোকানের পিছনের দরজা খোলা.....আর কাবির নাই!”
কিরিস চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল। তারপর নিচু, অস্বাভাবিক শান্ত গলায় বলল,
— “তুই বুঝতে পারবি না।”
ওপাশ চুপ। কিরিস এবার ধীরে বলল,
— “কারণ এটা হবেই। আমি কাল সন্ধ্যায় তোদের একটা কথা বলেছিলাম।”
তার গলার স্বর ঠান্ডা হয়ে উঠল।
— “আশা করি মনে আছে।”
রিহান সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
কারণ হ্যাঁ… কিরিস বলেছিল—
“ওরা আজ টোপ ফেলবে।।যাকে সবচেয়ে সহজ মনে হবে, তাকে নেবে।”
আর সেই সহজ টোপটাই হয়েছিল কাবির। মূলত যখন কাবির শেরওয়ানি ট্রাই করতে fitting room-এ ঢুকেছিল… ঠিক তখন পিছন থেকে কেউ ভারী কিছু দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।
তারপর কয়েক মিনিটের ভিতরই তাকে সরিয়ে ফেলা হয়।
পুরো কাজ এত নিখুঁতভাবে হয়েছে যে রিহান বুঝতেই পারেনি। কিরিস চোখ খুলে ধীরে বলল,
— “লোকেশন পাঠাচ্ছি। তোরা কেউ কিছু করবি না যতক্ষণ আমি না যাই।”
— “কিন্তু ভাই....”
— “I said wait.”
একটা মাত্র বাক্য। ওপাশ সঙ্গে সঙ্গে চুপ। কল কেটে যেতেই গাড়ির ভিতরের বাতাস বদলে গেল। লিসি কিরিসের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বুকের ভিতর কেমন অস্বস্তি জমছে।
— “কি হয়েছে…?”
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সামনে তাকিয়ে বলল,
— “ড্রাইভার গাড়ি ঘুরাও।”
ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে দিক পরিবর্তন করল। লিসি এবার পুরোপুরি সোজা হয়ে বসল। ফোনে আসা location-এর দিকে তাকিয়ে রইল। শহরের মূল রাস্তা ছাড়িয়ে গাড়ি ধীরে ধীরে নির্জন দিকের দিকে যেতে শুরু করল।চারপাশের ভিড় কমে আসছে। বড় বড় বিল্ডিং শেষ হয়ে আধা-ফাঁকা এলাকা শুরু হয়েছে। কিছু দূরে একটা পুরনো অসমাপ্ত বিল্ডিং দাঁড়িয়ে। অর্ধেক তৈরি।
জানালায় কাচ নেই। চারপাশে ভাঙা ইট, লোহার রড।
এলাকাটা ব্যস্ত শহরের খুব দূরে না তবুও অদ্ভুত নির্জন।
যেন ইচ্ছা করেই এই জায়গাটা বেছে নেওয়া হয়েছে।
গাড়ির ভিতরে তখন ভয়ংকর নীরবতা। আর সেই নীরবতার মাঝখানে বসে থাকা কিরিসকে দেখে মনে হচ্ছিল সে এখন আর শুধু একজন বড় ব্যবসায়ী না।
তার ভিতরের সেই ভয়ংকর মানুষটা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।
গাড়িটা ধীরে ধীরে সেই অসমাপ্ত বিল্ডিংয়ের একটু দূরে এসে থামল চারপাশ অস্বাভাবিক নির্জন। দূরে কিছু নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে, ভাঙা কংক্রিট, মরিচা ধরা রড, আধা তৈরি দেয়াল সব মিলিয়ে জায়গাটা অদ্ভুত ঠান্ডা লাগছিল। কিরিস ফোনটা একবার দেখে ধীরে দরজা খুলল। নামার আগে হঠাৎ থেমে লিসির দিকে তাকালো।
তার গলার স্বর আগের মতোই শান্ত। যেন বাইরে কোনো বিপদ অপেক্ষা করছে না।
— “পেছনে দেখো।”
লিসি ভ্রু কুঁচকে পিছনের ছোট compartment-এর দিকে তাকালো। ভিতরে সুন্দর করে রাখা একটা chilled can আর ছোট box।
কিরিস বলল — “তোমার favourite drink।”
লিসি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। এতকিছুর মাঝেও সে এটা মনে রেখেছে? কিরিস যেন খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল — “ওখানে chips-ও আছে। আমি ভিতর থেকে আসছি। কিছু কাজ আছে।”
লিসি ছোট্ট করে মাথা নাড়ল। সে কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কারণ সে জানে কিরিসের কাজের শেষ নেই।
আর কিছু কিছু প্রশ্ন না করাই ভালো। ঠিক তখনই পিছন থেকে একের পর এক আরও তিনটা কালো গাড়ি এসে থামল। দরজা খুলে দ্রুত নেমে এলো কয়েকজন লোক।
সবাই কালো পোশাকে। কানের কাছে communication device মার্কও তাদের মাঝে ছিল। সে সোজা এসে কিরিসের পাশে দাঁড়াল। কিরিস শান্ত চোখে বিল্ডিংটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “সব exit cover করা হয়েছে?”
— “Yes boss.”
— “কেউ বের হতে পারবে না।”
তার গলার স্বরটা এত ঠান্ডা ছিল যে বাতাস পর্যন্ত ভারী লাগছিল এরপর সে একবার পিছনে তাকালো।
যে গাড়িতে লিসি বসে আছে, সেটার সামনে-পেছনে ইতোমধ্যে armed bodyguard দাঁড়িয়ে গেছে।
গাড়িটা সম্পূর্ণ bulletproof। এমনকি যদি পরিস্থিতি খারাপও হয় ড্রাইভার নির্দিষ্ট গলি দিয়ে কয়েক মিনিটের ভিতরে এলাকা ছাড়তে পারবে।
সব হিসাব আগেই করা। সবচেয়ে আগে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে লিসিকে। কারণ কিরিস কখনো নিজের দুর্বল জায়গা খোলা রাখে না। আর লিসি সে তার সবচেয়ে মূল্যবান দুর্বলতা। কিরিস আর মার্ক ধীরে ধীরে বিল্ডিংয়ের ভিতরে ঢুকে গেল। বাইরের বাতাসটা আরো ভারী হয়ে উঠল।
―――
আর ভিতরে? লিসি একদম শান্তভাবে সিটে বসে আছে।
তার হাতে ফোন। স্ক্রল করছে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে পাশের packet থেকে chips নিয়ে খাচ্ছে।
তার পাশে রাখা tote bag, সামনে favourite drink।
দেখলে মনে হবে একটা মেয়ে হয়তো কোনো কারণে একটু অপেক্ষা করছে। বাইরে কী ভয়ংকর পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে আছে সেটা বোঝার উপায় নেই।
আর সে বুঝছেও না পুরোপুরি। কিন্তু সেটা কিরিস ইচ্ছা করেই হতে দেয়নি। কারণ তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলো থেকে লিসিকে যতটা সম্ভব দূরে রাখে সে।
সে চায় না এই মেয়েটার চোখে ভয় বাসা বাঁধুক।
চায় না তার নিষ্ঠুর পৃথিবীর রক্তাক্ত বাস্তবতা লিসির কোমল স্বভাবটাকে ছুঁয়ে যাক। তাই সবসময় এমনভাবেই রাখে সুরক্ষিত আলাদা শান্ত। গাড়ির ভেতরে বসে লিসি হঠাৎ নিজের ঠোঁট ঠিক করতে গিয়ে আয়নায় তাকালো।
Lipstick এখনও হালকা এলোমেলো। তার মুখে অজান্তেই ছোট্ট বিরক্ত হাসি ফুটে উঠল।
— “অসভ্য মানুষ…”
খুব আস্তে বিড়বিড় করল সে। আর সেই মুহূর্তেই বাইরে অসমাপ্ত বিল্ডিংয়ের অন্ধকারের ভিতর ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কিরিস।
পুরোনো, পরিত্যক্ত বিল্ডিংটা বাইরে থেকে যতটা নীরব দেখাচ্ছিল… ভিতরে ঢুকতেই যেন মৃত্যুর গন্ধটা আরও ঘন হয়ে উঠলো। ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে রাতের ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। কোথাও কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে আছে। চারপাশে আধো অন্ধকার, শুধু মাঝখানে একটা ঝুলন্ত লাইট দুলছে— টুপ… টুপ… শব্দ তুলে।
সেই আলোতেই দেখা গেল দৃশ্যটা। মাঝখানে একটা লোহার চেয়ারে কাবিরকে হাত-পা বেঁধে রাখা। সাদা শার্ট রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে। ঠোঁট ফেটে গেছে, কপাল বেয়ে টুপটুপ করে রক্ত পড়ছে। মাথা নিচু হয়ে আছে। আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে কয়েকজন লোক কারও হাত ভাঙা, কারও মুখ রক্তাক্ত, কারও আবার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে…
কাবির একা অনেকক্ষণ লড়েছিল। কিন্তু শেষ আঘাতটার পরে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ঠক…
সঙ্গে সঙ্গে পুরো হলরুম নিস্তব্ধ। কালো কোট পরে ধীর পায়ে ভিতরে ঢুকলো কিরিস।
তার পাশে মার্ক। মার্কের চোখ পুরো ঘর স্ক্যান করছে, কিন্তু কিরিসের চোখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো রাগও নেই। শুধু ভয়ংকর নীরবতা রাহভান মাঝখানে সোফায় বসে ছিল। ঠোঁটে বিকৃত হাসি। কিরিস চারপাশে একবার তাকালো। তারপর চোখ গিয়ে থামলো কাবিরের উপর।

0 Comments