তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :80

এক সেকেন্ড,দুই সেকেন্ড। কাবির আধখোলা চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো — “ ভাই… ”
মার্কের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
কিন্তু কিরিস?
সে যেন কিছুই অনুভব করলো না। একদম ধীর পায়ে হেঁটে রাহভানের সামনে গিয়ে রাখা চেয়ারটায় বসে পড়লো। যেন এটা কোনো অপহরণের জায়গা না…
বরং তার নিজের দরবার এক পা আরেক পায়ের উপর তুলে বসল সে। তারপর শান্ত গলায় বললো
— “ আমার ছোট ভাইকে ছেড়ে দাও। ”
রাহভান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হঠাৎ হেসে উঠলো বিকৃত, ঠান্ডা হাসি
— বাহ…! কিরিস রায় চৌধুরী নিজে এসেছে? ভাইয়ের জন্য?
কিরিস নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে রইলো। রাহভান এবার সামনে ঝুঁকে বললো
— তোমার লোকেরা আমার ভাইকে কীভাবে মেরেছিল মনে আছে? হাঁটুতে গুলি করেছিলে… তারপর রাস্তার মাঝে ফেলে রেখেছিলে! আজ বুঝতে পারছো ভাই হারানোর কষ্ট?
মার্ক গর্জে উঠলো— “ মুখ সামলে.... ”
হাত তুলে মার্ককে থামিয়ে দিল কিরিস তার চোখ এখনো স্থির ভয়ংকর শান্ত।
— “ তোমার ভাই ব্যবসার নিয়ম ভেঙেছিল। ”
— “ ব্যবসা? ”
রাহভান দাঁড়িয়ে পড়লো — এটাকে তুমি ব্যবসা বলো? তোমার কারণে আমার ভাই মরেছে!
কিরিস ধীরে মাথা কাত করলো — “ তোমার ভাই শিশু পাচার করতো। ”
পুরো হলরুম নিস্তব্ধ রাহভানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
কিরিস ঠান্ডা গলায় বলে চললো
— “ আমি শুধু তাকে মারিনি… উদাহরণ বানিয়েছিলাম। যেন আর কেউ বাচ্চাদের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস না পায়। ”
রাহভান দাঁত চেপে হাসলো — “ আর আজ আমি তোমার ভাইকে উদাহরণ বানাবো। ”
কাবির মাথা তুলে কষ্টে বললো — “ ভাইয়া… এদের সাথে কথা বলিস না…
রাহভান হঠাৎ কাবিরের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে দিল। মার্ক সঙ্গে সঙ্গে কোমরে হাত নিল। কিন্তু কিরিস? সে নড়লোও না। শুধু ধীরে ধীরে বললো — “ বন্দুকটা নামাও। ”
রাহভান হেসে উঠলো —“ না নামালে? ”
কিরিস এবার সামান্য সামনে ঝুঁকল। তার চোখ দুটো অন্ধকার হয়ে উঠেছে শান্ত, যেন এটা তার কাছে কিছুই নয়।
— “ তাহলে আজ এখানে যারা দাঁড়িয়ে আছে… একজনও জীবিত বের হবে না। ”
কথাটা এতটাই শান্তভাবে বললো যে পুরো রুমের বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেল। রাহভানের পাশে দাঁড়ানো দু-তিনজন লোকও অস্বস্তিতে একে অপরের দিকে তাকালো।
কারণ তারা জানে কিরিস রাগ দেখিয়ে ভয় দেখায় না।
সে শান্ত থাকলেই সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর। রাহভান আবার জোরে হেসে উঠলো
— “ তুমি একা এসেছো, কিরিস! চারপাশে আমার লোক! তুমি ভাবছো এখান থেকে বের হতে পারবে? ”
কিরিস ধীরে নিজের ঘড়ির দিকে তাকালো। টিক…
টিক… তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললো
— “ আমি ভিতরে ঢোকার তিন মিনিট আগে এই বিল্ডিংয়ের চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়েছে। ”
রাহভানের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। মার্ক ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বললো — “ আর তোর লোকদের ফোন? নেটওয়ার্ক? সব জ্যাম করা। ”
ঠিক তখনই রাহভানের এক লোক দৌড়ে ভিতরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো — “ ভাই… বাইরে… বাইরে পুরো এলাকা......”
কথা শেষ করার আগেই..... ঠাস! কিরিস টেবিলের উপর রাখা বন্দুকটা এক টানে তুলে লোকটার কপালে গুলি করলো। পুরো রুম কেঁপে উঠলো। কাবিরও চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো। আর কিরিস? সে আবার আগের মতো শান্ত হয়ে বসে পড়লো।
বন্দুকটা হালকা হাত বুলিয়ে টেবিলে রেখে ধীরে বললো সুরু চোখে তাকালো সামনের দিকে
—“ আমি যখন শান্তভাবে কিছু চাই… তখন সেটা দিয়ে দেওয়াই ভালো। ”
পুরো হলরুমটা তখন থমথমে। কিরিসের শেষ কথার পর কয়েক সেকেন্ড যেন কেউ নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিল। টেবিলের উপর রক্তের ফোঁটা পড়ার শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল। রাহভান ধীরে ধীরে নিচু হয়ে পাশের টেবিল থেকে একটা কালো বক্স তুলে নিল। ছোট চামড়ায় মোড়ানো। তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই বিকৃত হাসি ফুটে উঠলো — “ জানো কিরিস…? আমার ভাই কীভাবে মরেছিল? ”
মার্ক চোখ সরু করে তাকালো কিরিস নিশ্চুপ। রাহভান ধীরে ধীরে বক্সটা খুললো। ভিতরে কাঁচের ছোট্ট ভায়াল। গাঢ় কালচে সবুজ তরল। পাশে একটা ইনজেকশন।
আলো পড়তেই তরলটা অদ্ভুতভাবে চকচক করে উঠলো।
কাবির দুর্বল চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করলো
—“ ভাইয়া… না… ”
রাহভান ইনজেকশনটা হাতে তুলে নিয়ে বললো—
—“ এটা সাপের বিষ। সাধারণ না। আফ্রিকান ব্ল্যাক মাম্বা আর আরো কয়েকটা টক্সিন মিশিয়ে বানানো। শরীরে ঢুকলে মানুষ পুরোপুরি মারা যাওয়ার আগে নিজের শরীর ভেতর থেকে পুড়ে যাওয়ার অনুভূতি পায়। ”
সে ধীরে ধীরে কিরিসের দিকে এগিয়ে এলো।
— “ আমার ভাইকে এভাবেই মারা হয়েছিল। ইনডাকশনের মাধ্যমে… ধীরে ধীরে। সে মরার আগে কাঁদছিল, চিৎকার করছিল। ”
রাহভানের চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো।
— “ আজ তুমিও সেটা অনুভব করবে। ”
মার্ক সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ালো — “ তোর সাহস.....”
কিরিস হাত তুলে মার্ককে থামিয়ে দিল একদম ধীরে।
তার চোখ এখনো স্থির। রাহভান এবার ইনজেকশনটা কিরিসের সামনে ধরে বললো
— “ নিজের হাতে নিজের শরীরে পুশ করবে এটা। নাহলে… ”
ঠাস! কাবিরের মাথায় বন্দুকের বাট মারলো সে।
কাবির ব্যথায় গোঙিয়ে উঠলো। কপাল থেকে আবার রক্ত গড়িয়ে পড়লো, চোখ গুলো যেন একদম বন্ধ হয়ে আসছে তার ।
মার্ক গর্জে উঠলো — “ কাবির! ”
রাহভান চিৎকার করে বললো
— “ না! আজ কোনো হিরোগিরি না! আজ বড় ভাই নিজের ভাইয়ের জন্য কতদূর যেতে পারে সেটা দেখবো!”
পুরো রুম নিস্তব্ধ সবাই তাকিয়ে আছে কিরিসের দিকে।
কিন্তু সে?
একদম নড়লো না। ধীরে ধীরে চোখ তুলে কাবিরের দিকে তাকালো। কাবির মাথা নাড়ছে
— “ ভাইয়া… করিস না… ”
কিরিস কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে ইনজেকশনটা তুলে নিল। মার্ক অবিশ্বাসে তাকিয়ে গেল।
— “ বস …! ”
রাহভানের ঠোঁটে বিজয়ী হাসি — “ এই তো…! অবশেষে মানুষ হয়েছো? ”
কিরিস ইনজেকশনটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।
তারপর শান্ত গলায় বললো — “ you made a huge mistake , রাহভান। ”
রাহভান ভ্রু কুঁচকালো — কী ভুল?
কিরিস ধীরে ধীরে দাঁড়ালো তার কালো কোটের বোতাম খুলে ফেললো —“ তুমি ভেবেছো আমি মৃত্যু ভয় পাই। no way, i am UK. Even dead cannot control me ”।
পুরোনো বিল্ডিংটার ভিতর তখন এমন নীরবতা… যেন দেয়ালগুলোও শ্বাস আটকে রেখেছে। ঝুলন্ত লাইটটা দুলছে। টুপ… টুপ… রক্ত পড়ার শব্দ।
মাঝখানে বাঁধা কাবির অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে নিজের বড় ভাইয়ের দিকে। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে কিরিস রায় চৌধুরী। যে মানুষটার নাম শুনলে শহরের বড় বড় গ্যাং পর্যন্ত রাস্তা বদলে ফেলে… সেই মানুষটা আজ নিজের ভাইয়ের জন্য মৃত্যুকে হাতে তুলে নিয়েছে।
রাহভান ঠান্ডা হাসি দিয়ে বলে
— “ নাও। নিজের হাতে পুশ করো। তারপর তোমার ভাইকে ছেড়ে দিবো।”
কাবির যেন পাগলের মতো মাথা নাড়তে লাগলো। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। নিজের সবটা দিয়ে সে কিরিসকে বারণ করার চেষ্টা করছে, বুক ভেটে কান্না করতে ইচ্ছে করছে তার, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কান্না চেপে রাখার জন্য। তারপর সে অনবরত মাথা নেড়ে বলছে
— “ না ভাইয়া…! না…! প্লিজ করিস না…! ”
তার গলাটা কেঁপে উঠলো, নিজ কন্ঠের সাথে তার কথা উচ্চারিত হচ্ছে না, কাঁপা কাঁপা গলায় বলে
— “ আমি মরি… আমি মরে যাই… তুই করিস না ভাইয়া… প্লিজ…! ”
পুরো শরীর কাঁপছে ছেলেটার সে কখনো নিজের জন্য কাঁদেনি। কিন্তু আজ… আজ সে তার ভাইয়ের জন্য ভেঙে পড়েছে। কিরিস ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো।
সেই দৃষ্টি… অদ্ভুত শান্ত অদ্ভুত মায়াময়। যে চোখে পৃথিবী কখনো কোমলতা দেখেনি, সেই চোখেই আজ ভাইয়ের জন্য নিঃশব্দ স্নেহ জমে আছে। কিরিস ধীরে সামনে এগিয়ে এসে কাবিরের রক্তাক্ত মুখটা নিজের হাতে তুলে ধরলো। আঙুলে লেগে গেল রক্ত তবুও তার কণ্ঠ স্থির।
— “ ছোটবেলায় তুই হওয়ার পরে মা আমাকে একটা কথাই বলেছিল, “বড় ভাই মানে বাবার ছায়া,বাবার সমান। ”
কাবির ফুঁপিয়ে উঠলো — “ ভাই… ”
কিরিস খুব ধীরে তার কপালের রক্ত মুছে দিল।
তারপর নিচু গলায় বললো —“ মাকে কথা দিয়ে এসেছি…তার ছোট ছেলেটাকে নিজের হাতে বিয়ে দিবো। ঘরে লাল টুকটুকে বউমা আনবো। তোর বাচ্চাদের মাথায় হাত রেখে বলবো 'আমি তোর বড় আব্বু '। ”
নিজেকে শান্ত রেখেই আবার বলে
—“ সেই কথা আমি মরার আগ পর্যন্ত ভাঙতে দিবো না। ”
কাবির এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো,নিজের সবটা দিয়ে কান্না করে উঠলো, পুরুষের এমন কান্না খুব ভয়ংকর, তাদের চোখের এই দামি পানি শুধু তাদের জন্য আখি হতে নিচে নেমে গাল ছুঁই যাদের সে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসে।
— “ ভাইয়া…! আ...আমার লাগবে না কারও…! তুই থাকলেই হবে… প্লিজ ভাই…! ”
কিরিস মৃদু হেসে মাথায় হাত রাখলো।
— “ পৃথিবীতে সব সম্পর্ক রক্তে হয় না, কাবির। কিছু সম্পর্ক মানুষ নিজের জান দিয়ে আগলে রাখে। ”
এক সেকেন্ড থেমে সে নিচু গলায় বললো—
—“ তুই আমার সেই সম্পর্ক। আমার আদরের ছোট ভাই।”
পুরো হলরুম নিস্তব্ধ মার্ক মুখ ঘুরিয়ে নিল।
তার চোয়াল শক্ত ঠিক তখনই কিরিসের চোখ ধীরে ধীরে উঠে গেল রাহভানের পেছনের অন্ধকার দিকে। রাহভান কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছায়া থেকে বেরিয়ে এলো তিনটা অবয়ব রিহান, ইশান আর ইয়াবি।
কালো পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে তারা। ইয়াবির ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি। সে বাড়িতে থাকলেও রায় চৌধুরী পরিবারের উপর একটা আঁচ পড়লে খবর তার কানে পৌঁছাতেই হবে। আর কাবির? সে তো তাদের বুকের টুকরো।
রাহভানের মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কিন্তু কিরিস যেন কিছুই দেখলো না। সে শুধু শান্তভাবে ইনজেকশনটার দিকে তাকালো। তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে সেটা তুলে নিল। কাবির চিৎকার করে উঠলো
—“ ভাইয়া নাaaaaaaaaa…!! ”
মার্ক এগিয়ে যেতে গিয়েও থেমে গেল। কারণ সে জানে
কিরিস একবার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে থামানোর ক্ষমতা কারও নেই। কিরিস নিজের শার্টের হাতার কাপড় গুটিয়ে শিরার উপর ইনজেকশনটা বসালো। একদম স্থির হাতে।
একটুও কাঁপলো না তারপর… পুশ। পুরো বিষ নিজের শরীরে ঢুকিয়ে দিল। কাবিরের বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো।
—“ ভাইইইইই…!!! ”
রাহভান পর্যন্ত কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো।
আর কিরিস? সে ধীরে ইনজেকশনটা বের করে মেঝেতে ছুড়ে ফেললো।
ঠক!
তারপর মাথা তুলে রাহভানের দিকে তাকালো। চোখ দুটো এখনো আগের মতোই ঠান্ডা। ভয়ংকর অটল।
— “ মনে রাখিস রাহভান… ”
সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
—“ Uk নিজের মৃত্যুকে ভয় পায় না। ”
এক সেকেন্ড থেমে কাবিরের দিকে তাকালো।
তারপর সেই লাইনটা বললো… যেটা শুনে পুরো রুম নিঃশব্দ হয়ে গেল।
— “আমার ছোট ভাইয়ের চোখে পানি আসার আগেই আমি মৃত্যুর চোখে চোখ রাখি।”
আরেক পা এগিয়ে—
— “কারণ ও শুধু আমার ভাই না… ও আমার একটা অংশ।”
কাবির মাথা নিচু করে কাঁদছে। আর কিরিস?
সে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক পাহাড়ের মতো। বিষ শরীরে ঢোকার পরও অটুট অদম্য।
★★★
কিন্তু বিষ তার প্রভাব দেখাতে শুরু করলো কিছুক্ষণই মধ্যে। কিরিসের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠলো। হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। গলার পাশের রগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কপালের নীলচে শিরাগুলো টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে শ্বাস একটু ভারী। মাথার ভিতর যেন হাজারটা হাতুড়ি একসাথে আঘাত করছে। চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে, গলা শুকিয়ে আসছে, কেমন ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। শিরার রক্ত যেন জমাট বেঁধে যাচ্ছে। তবুও সে দাঁড়িয়ে আছে একদম সোজা অটল। মনে হচ্ছে বিষটা তার শরীরকে ভাঙছে… কিন্তু মানুষটাকে না। ধীরে ধীরে কিরিস চোখ তুললো। চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল হয়ে গেছে।সেই চোখে এখন এমন কিছু আছে, যেটা দেখে রাহভানের পাশের লোকগুলো পর্যন্ত ভয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। রাহভান প্রথমবারের মতো সত্যিকারের আতঙ্ক অনুভব করলো। কারণ একজন মানুষ বিষ শরীরে নিয়েও এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না... অসম্ভব।
ঠিক তখনই—
পেছনের অন্ধকারে ভারী বুটের শব্দ উঠলো।
ঠক…
ঠক…
ঠক…
সবাই ঘুরে তাকাতেই ছায়া কেটে সামনে এলো রিহান, ইশান আর ইয়াবি। তিনজনের চোখেই ঠান্ডা হত্যার নেশা।
ইয়াবি নিজের গ্লাভস খুলতে খুলতে হেসে বললো
—“ you are finish ?”
রিহান চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বললো—
— “ no.no । এখন শুরু। ”
এক মুহূর্তে পুরো পরিস্থিতি বদলে গেল। যারা এতক্ষণ অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের হাত কাঁপতে শুরু করেছে। কারণ তারা বুঝে গেছে UK এর টিম একসাথে মানে মৃত্যু। যেখানে দুনিয়ায় সব মাফিয়াদের মধ্যে UK মানে কিরিস তার এই সাম্রাজ্যের সৈনিকদের জন্য পরিচিত,এদের আগমনে বড় বড় মাফিয়ারাও চোখ তুলে তাকায় না। তারা এখন সবকয়টা একটা সাথে UkThe Underworld king And his soldiers.
★★★★★★
Let's introduce the Hell Gate of the Underworld
“NOX DYNASTY”
একটি নাম, যার উচ্চারণেই বহু প্রভাবশালী সাম্রাজ্যের ভিত কেঁপে ওঠে। এই সাম্রাজ্যের শীর্ষে অবস্থান করে
কিরিস The Underworld King. যার উপস্থিতি মানেই নীরব আতঙ্ক, অদৃশ্য আধিপত্য ও নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ।
রিহান — প্রযুক্তির অন্ধকার সম্রাট। পৃথিবীর যেকোনো ডিভাইস, যেকোনো সিকিউরিটি তার কাছে কেবল কয়েক মুহূর্তের খেলা।
কাবির — জেরা ও মানসিক চাপে সত্য বের করে আনার শিল্পে অদ্বিতীয়। তার সামনে অধিকাংশ মানুষ নিজের অজান্তেই ভেঙে পড়ে।
ইশান — সাধারণ চোখে একজন ডাক্তার, অথচ মৃত্যুর দুয়ার থেকেও মানুষ ফিরিয়ে আনার অস্বাভাবিক দক্ষতা রাখে।
ইয়াবি— mind game ও psychological trap-এর জীবন্ত মাস্টারমাইন্ড। তথ্য বিশ্লেষণ, pattern decode ও checkmate দিতে সে প্রায় অতিমানবীয়।
★ কিরিসের এই চার ভাইয়ের পরে আসে কিরিসের দুই Best Friend .........
আরিয়ান — criminal law-এর অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট। খুন, মাফিয়া, আন্ডারওয়ার্ল্ড— প্রতিটি জটিল কেস তার কাছে যেন খোলা বই।
তূর্য — ছদ্মবেশ, espionage ও infiltration-এর ভয়ংকর প্রতিভা। কত শত পরিচয়ে সে পৃথিবী ঘুরেছে, তার হিসাব সে নিজেও জানে না।
আর এদের সকলের কেন্দ্রবিন্দু কিরিস এক ব্যক্তি, যার মাঝে যুদ্ধনীতি, বুদ্ধি, নির্মমতা ও নেতৃত্ব একসঙ্গে বিরাজমান। তাদের সাম্রাজ্যে ভুলের ক্ষমা নেই, বিশ্বাসঘাতকতার অস্তিত্ব নেই, আর একবার ‘NOX DYNASTY’-এর নজরে পড়লে পৃথিবীর কোনো প্রান্তই আর নিরাপদ থাকে না।”

এইদিকে মূল জায়গায় ফেরা যাক, এদের কে একসাথে দেখে রাহভান পিছিয়ে যেতে লাগলো। কারণ এরা সবাই চলতে ফেরা The Hell, আর কিরিস তো নিজেই The Hell King। তার গলা শুকিয়ে আসলো,গলার অন্তঃস্থ থেকে কোন শব্দই বাহিক্যভাবে বের হইতেছে না, কথা জড়িয়ে বলে উঠে
—“ না… না দাঁড়াও...... ”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ইয়াবি এক লাথিতে তার লোকটাকে দেয়ালে ছুড়ে মারলো।
ধড়াম!
ইশান সরাসরি সামনে এগিয়ে গেল। রিহানের চোখে তখন আগুন হাত মুষ্টি বদ্ধ করে আছে, তার সামনে থেকে কাবিরকে নিয়ে এসেছে, মন চাচ্ছে এই লোকগুলোর দাঁত ভেঙে গুড়িয়ে দিতে।
কিন্তু কিরিস দাঁত চেপে হঠাৎ গর্জে উঠলো — “ মারিস না…! ”
সবাই থেমে গেল কিরিস কষ্টে শ্বাস নিয়ে বললো
—“ ওকে বাঁচিয়ে রাখ… ওর সাথে আমার হিসাব আলাদা। ”
তার গলাটা ভারী হয়ে এসেছে বিষ পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে হঠাৎ তার হাঁটু সামান্য কেঁপে উঠলো। চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে ধীরে, কখনো অন্ধকার কখনো আবার ভালো দেখছে সব। হাতের, গলার, মাথার শিরার রগ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ফুলে উঠেছে তীব্র যন্ত্রণায়। কিন্তু সে দাঁড়িয়ে আছে নিজের পায়ে কিন্তু এবার তার পা দুটো কেমন ঢিল হয়ে আসছে। মার্ক দ্রুত পাশে এসে ধরলো।
— “ bosssss ”
ঠিক তখনই রিহান কাবিরের বাঁধন খুলে দিতেই কাবির প্রায় দৌড়ে এসে কিরিসকে জড়িয়ে ধরলো, সবটা নিজের বাঁচানো শক্তি দিয়ে কেঁদে উঠলো।
—“ ভাইয়া! ”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে কান্নার জন্য কথা জড়িয়ে উঠছে
— “ তোর কিছু হয়নি তো? আমার দিকে তাক… ভাই…!”
কাবিরের হাত কাঁপছে সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এই মানুষটা তার জন্য নিজের শরীরে মৃত্যু ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিরিস ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ছোট ভাইটার দিকে তাকালো। বিষের যন্ত্রণায় তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। তবুও ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটলো। সে কষ্টে হাত তুলে কাবিরের মাথায় রাখলো।
—“ আরে পাগল… এত সহজে তোর ভাই মরবে না। ”
কাবির কেঁদেই যাচ্ছে
— “ আমি বিয়ে করবো না… কোথাও যাবো না…! ”
কয়েকঘন্টা আগে বিয়ে করতে পাগল হওয়া ভাইয়াটা এখন নিজের বড় ভাইয়ের জন্য তার প্রিয় নারীকেও বাদ দিতে চাচ্ছে। কিরিস এবার রিহানের দিকে তাকালো।
গলার স্বর ভারী, কিন্তু নির্দেশ এখনো আগের মতোই কঠিন —” ওকে নিয়ে যা।”
রিহান এগিয়ে এলো। কিরিস ধীরে ধীরে বললো
— “ আমি অলরেডি সব রেডি করে রেখেছি… আমার আসতে একটু দেরি হবে শুধু। ”
সে কষ্টে শ্বাস নিল তারপর কাবিরের গাল চেপে ধরে বললো—“ আজ তোর বিয়ে, বোকা। তিশার সামনে এমন মুখ নিয়ে যাবি? ”
কাবির মাথা নাড়ছে — “ না ভাই… আমি তোকে ছেড়ে...”
কিরিস গলা শক্ত করে — “ কাবির। ”
একটা শব্দ একদম বড় ভাইয়ের স্বরে। সঙ্গে সঙ্গে কাবির থেমে গেল। কিরিস ধীরে বললো—
— “ বাবারা গাড়িতে আছে সামনের দিকে। তোরা সামনে দিক থেকে গিয়ে গাড়িটা ধরে নিবি। ”
এক সেকেন্ড থেমে—
—“ কিছু হয়েছে সেটা যেন কেউ বুঝতে না পারে। ”
কাবির চোখ বন্ধ করে ফেললো। এই মানুষটার অবস্থা এত খারাপ… তবুও নিজের কথা না ভেবে তার বিয়ের কথা ভাবছে। কাবির হঠাৎ কিরিসের হাত শক্ত করে ধরে কাঁপা গলায় বললো —“ ভাই… তুই না থাকলে আমার জীবনের কোনো মানে নাই। ”
কিরিস কিছু বললো না। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
সেই স্পর্শে এমন আশ্বাস ছিল… যেন পৃথিবী ভেঙে পড়লেও বড় ভাইটা পাশে থাকবে। অবশেষে রিহান আর দু’জন লোক কাবিরকে নিয়ে যেতে লাগলো। কাবির বারবার পিছনে তাকাচ্ছে। চোখ ভরা পানি। আর কিরিস?
সে দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারের মাঝে। তার হাত মুঠো হয়ে আছে এত শক্ত করে যে আঙুলের গিঁট সাদা হয়ে গেছে। ইশান দ্রুত ব্যাগ খুলে এন্টিভেনম বের করলো।
—“ মার্ক! হাতটা ধর! ”
মার্ক কিরিসকে শক্ত করে ধরে রাখলো। ইশান দ্রুত ইনজেকশন পুশ করলো শিরায়। কিন্তু বিষ ইতিমধ্যে ছড়িয়ে গেছে। কিরিসের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।
ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে। তবুও সে মাথা নিচু করলো না। ইয়াবি ধীরে ধীরে রাহভানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তার ঠোঁটে হালকা হাসি। কিন্তু সেই হাসির ভিতর মৃত্যু লুকানো — “ জানিস রাহভান…? ”
সে নিচু হয়ে ফিসফিস করে বললো
— “ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য কী? ”
রাহভান কাঁপছে। ইয়াবি চোখ তুলে কিরিসের দিকে তাকালো।
—“ একটা ভাইয়ের জন্য… আরেক ভাইয়ের মৃত্যুকে হাসিমুখে গ্রহণ করা। ”
পুরো হলরুমে তখন শুধু ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কিরিস রায় চৌধুরী
বিষে জর্জরিত। তবুও পাহাড়ের মতো অটল।
যেন মৃত্যু পর্যন্ত তাকে ছুঁতে ভয় পাচ্ছে। বিষ শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে পুরোপুরি। এন্টিভেনম দেওয়ার পর কয়েক মিনিটের জন্য কিরিসের শ্বাস কিছুটা স্বাভাবিক হলেও শরীরের ভিতরের যুদ্ধটা এখনো থামেনি। কপালের রগগুলো টান টান। চোখের লালচে আভা এখনো যায়নি।
হাতের শিরাগুলো এমনভাবে ফুলে আছে যেন চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসবে। তবুও…
লোকটা দাঁড়িয়ে আছে একদম সোজা যেন মৃত্যু এসে সামনে দাঁড়ালেও সে তাকে বসতে বলবে— “অপেক্ষা কর।”
ইয়াবি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ধীরে মাথা নাড়লো।
—“ এই লোকটা মানুষ না। ”
ইশান কিরিসের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধ ধরলো।
— “ চল। আর এক মিনিটও এখানে না। ”
কিরিস ধীরে মাথা তুললো তার নিঃশ্বাস ভারী, কিন্তু চোখ এখনো স্থির। সেই চোখে দুর্বলতা নেই অদ্ভুত শান্তি।
যেটা তাকে সবচেয়ে ভয়ংকর করে তোলে। কারণ জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরী কখনো চিৎকার করে না। সে শান্ত থাকে। আর সেই শান্ত মানুষটাই শহরের সবচেয়ে হিংস্র দানব। কিরিস ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো। ইয়াবি আর ইশান দুই পাশ থেকে তাকে ধরে আছে। প্রয়োজনের তুলনায় কম না, কারণ সে একা হাঁটতে পারলেও তাকে একা ছাড়া যায় না এখন। মার্ক ঠিক পিছনে। চারপাশে রাহভানের লোকগুলো নিথর পড়ে আছে। আর মাঝখানে হাঁটছে কিরিস ক্ষতবিক্ষত নয় বিষে জর্জরিত।
তবুও তার উপস্থিতি এমন… যেন আহত একটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। রক্ত ঝরছে, শরীর কাঁপছে…কিন্তু তার গর্জন কমেনি। ঠিক সিংহের মতো যে ক্ষুধায় মরলেও কখনো ঘাস মুখে তোলে না।
কিরিসও তেমন। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও মাথা নত করে না। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়? সে এখনো শান্ত।
আর এটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষগুলো কখনো রাগ দেখিয়ে যুদ্ধ করে না… তারা নীরব থেকে ধ্বংস করে।
বিল্ডিংয়ের দরজা ঠেলে বাইরে বের হতেই ঠান্ডা রাতের বাতাস এসে লাগলো। সামনে কালো গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে।
বাইরের আলো পড়তেই কিরিসের মুখটা আরও ফ্যাকাশে দেখালো।
ঠিক তখন সামনের গাড়িটার জানালা ধীরে নিচে নামলো। ভিতর থেকে লিসি তাকিয়েছিল স্বাভাবিক ভাবেই… কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার পুরো মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে দেখলো কিরিসকে ধরে নিয়ে আসছে ইয়াবি আর ইশান। তার কালো শার্টের হাতা রক্তে ভেজা।
ঠোঁটের কোণে শুকনো রক্ত। চোখ লাল। আর হাঁটার সময় শরীরটা সামান্য দুলছে। লিসির বুকের ভিতর ধক করে উঠলো। কোনো কারণ ছাড়াই তার বুকটা হঠাৎ অসহ্য ব্যথা করতে শুরু করলো। বুকের ভিতরে চিন চিন অনুভূতি বাড়তে লাগবো। মনে হলো কেউ ভিতর থেকে শক্ত করে চেপে ধরেছে সে এক মুহূর্তও দেরি করলো না।
দরজা খুলে দ্রুত নেমে পড়লো গাড়ি থেকে।
— “ ভাইয়া …!
তার গলায় আতঙ্ক আর ভয় সঙ্গে কাঁপন তো আছেই
সে কয়েক পা এগিয়ে এসে থেমে গেল। কারণ সে বুঝতেই পারছে না কি হয়েছে?
এখানে কী হচ্ছে? কেন সবাই এত অস্বাভাবিক চুপ?
কেন মার্কের চোখ এত ভয়ংকর ঠান্ডা? কেন ইশানের হাতে রক্ত?
আর… কেন কিরিস এমন দেখাচ্ছে?
লিসির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে কিরিসের সামনে দাঁড়ালো। চোখ দুটো কাঁপছে।
—“ কী হয়েছে আপনার…? ”
কিরিস কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো। সেই দৃষ্টি এখনো আগের মতোই গভীর। যেন বিষও সেই চোখের ক্ষমতা কমাতে পারেনি। কয়েক সেকেন্ড পর সে খুব ধীরে বললো — “ কিছু না। ”
কিন্তু কথাটা বলতেই তার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠলো।
লিসির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো সে কিরিসের হাত ধরতেই অনুভব করলো শরীরটা অস্বাভাবিক গরম।
আর হাতের শিরাগুলো শক্ত হয়ে আছে। লিসির চোখ ভিজে উঠলো — “ মিথ্যে বলছো…”
তার গলাটা ভেঙে গেল কান্না টা বের হতে চাচ্ছে কিন্তু চেপে রেখে চোখে টলমল পানি নিয়ে বলে —“ কি হয়েছে? বলুন না এমন দেখাচ্ছে কেন আপনাকে? ”
কিরিস উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে হাত তুলে লিসির মাথায় রাখলো। সেই স্পর্শটা এখনো আগের মতোই
যেন পৃথিবীর কোনো ঝড় তাকে ছুঁতে পারবে না।
কিন্তু লিসি বুঝতে পারছে… আজ কিছু একটা ভয়ংকর হয়েছে খুব ভয়ংকর।
ইয়াবি আর ইশান একে অপরের দিকে তাকালো।
তারপর ধীরে ধীরে কিরিসকে নিয়ে এগিয়ে এসে প্রায় লিসির উপরই ছেড়ে দিল লিসি হকচকিয়ে গেল।
— “ আরে…! ”
পরের মুহূর্তেই কিরিস নিচু হয়ে তার কাঁধে মুখ গুঁজে দিল। গরম নিঃশ্বাস এসে লাগলো লিসির গলায়।
এক হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তার কোমড়।
এতটাই শক্ত… যেন ছেড়ে দিলে পড়ে যাবে।
লিসির বুক কেঁপে উঠলো। সে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারছিল না। শুধু অনুভব করছিল কিরিসের শরীর অস্বাভাবিক গরম নিঃশ্বাস ভারী। আর সে আজ অদ্ভুতভাবে চুপ। লিসি তাড়াতাড়ি কিরিসকে সামলে ধরে ইয়াবির দিকে তাকালো।
—“ ভাইয়া… কী হয়েছে ওনার? ”
ইয়াবি মুখ খোলার আগেই ইশান একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে উঠলো
— “ আরে কিছু না। একটু হার্ট অ্যাটাক টাইপ হয়েছে। ”
—“ কীইই?! ”
লিসি প্রায় চিৎকার করে উঠলো। ইশান দ্রুত হাত নেড়ে বললো —“ আরে না না! ওইরকম না! মানে বুঝতেই তো পারছিস… সারাদিন এত কাজ করে! এত প্রেসার! শরীর একটু কেমন কেমন করছিল তাই। ”
সে চারপাশে তাকিয়ে গলা নিচু করলো —“ দেখ না, সবাই এদিকে তাকিয়ে আছে। ”
তারপর কিরিসের দিকে ইশারা করে বললো
— “ কাজের চাপটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। এজন্য হঠাৎ একটু প্রবলেম হয়েছে। ”
লিসি পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও কথাটা উড়িয়েও দিতে পারলো না। কারণ সত্যিই কিরিস দিনরাত কাজ করে।
ঘুম নেই বিশ্রাম নেই। উপর থেকে সবসময় সেই ভয়ংকর গম্ভীর ভাব। তার বুকটা আরো মোচড় দিয়ে উঠলো।
সে ধীরে ধীরে কিরিসের চুলে হাত বুলিয়ে বললো
— তারপরেও এমন লাগছে কেন আপনাকে…?
কিরিস উত্তর দিল না। বরং আরো শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরলো। মুখটা পুরোপুরি লিসির গলায় ডুবিয়ে রাখলো। যেন এই মানুষটার শরীরের সমস্ত যন্ত্রণা থেকে বাঁচার একমাত্র জায়গা এই মেয়েটা। লিসি অসহায়ভাবে চারপাশে তাকিয়ে হঠাৎ বললো
—“ হাসি লাগছে আমার এখন। ”
ইয়াবি ভ্রু তুললো —“ কেন? ”
লিসি ঠোঁট ফুলিয়ে কিরিসের দিকে তাকালো।
—“ যাকে দেখে হার্ট অ্যাটাকও হার্ট অ্যাটাক করে… তার নাকি আবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে! ”
দুই সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ইয়াবি মুখ ঘুরিয়ে ফেললো ঠোঁটের কোনের হাসিটা লুকানোর জন্য। ইশান ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করলো। মার্ক পর্যন্ত নিচু মাথায় কাশি দিল। কারণ সত্যিটা জানলে লিসি হয়তো এখনই কেঁদে ফেলতো। অবশ্য তার চোখে পানি টলমল করছে।