পর্ব :81
এই মানুষটার হার্ট অ্যাটাক হয়নি। সে নিজের শরীরে মৃত্যু ঢুকিয়ে এসেছে। ঠিক তখনই সামনে থাকা গাড়িগুলো একে একে বেরিয়ে গেল। বাবারা আর বাকিরা আগেই চলে গেছে সবাই বিয়ে আনন্দ করতে করতে কিন্তু কেউ জানে না যে বর কিপন্যাপ হয়েছিলো। গাড়িগুলো রাস্তায় চলছ। এখন শুধু এরা চারজন আর লিসি দিয়ে পাঁচ।
ইয়াবি ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। ইশান সামনে পাশের সিটে। আর পিছনে লিসি কোনো মতে কিরিসকে ধরে বসলো। কিন্তু কিরিস তাকে ছাড়লো না। একটুও না।
তার হাত এখনো লিসির কোমড় শক্ত করে জড়িয়ে আছে। মাথা নিচু হয়ে আছে তার কাঁধে।গাড়ি চলতে শুরু করলো। বাইরের আলো একটার পর একটা গাড়ির কাঁচে পড়ে সরে যাচ্ছে। আর ভিতরে— লিসি বারবার কিরিসের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তার বুকের ভিতর অদ্ভুত অস্বস্তি।
কিছু একটা ঠিক নেই খুব বেশি ঠিক নেই। সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বললো—
— “ ভাইয়া…?”
কোনো উত্তর নেই। শুধু মানুষটা আরো একটু কাছে সরে এলো। যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব শক্তি শেষ হয়ে গেলেও… এই মেয়েটাকে ছেড়ে দিতে রাজি না।
গাড়িটা ফাঁকা রাস্তা ধরে দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
কিরিস এখনো লিসিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। মাথাটা তার কাঁধে রাখা। কিন্তু ধীরে ধীরে শরীরের ভিতরের বিষ আবার নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে শুরু করলো। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে শরীরের তাপ অস্বাভাবিক। হঠাৎ কিরিসের ভ্রু কুঁচকে গেল।
গলা শুকিয়ে আসছে পেটের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠলো।
লিসি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলো কিছু একটা হচ্ছে।
—“ কি হচ্ছে …? ”
কিরিস চোখ বন্ধ করেই খুব নিচু গলায় বললো
— “ ভালো লাগছে না… ”
পরের মুহূর্তেই সে হঠাৎ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লো। গালের নুনা পানি ঢোক গেলার পরেই আবার গা গুলিয়ে উঠলো আর এবার বমি। সোজা লিসির পায়ের শাড়ির উপর। গাড়ির ভিতর এক মুহূর্ত নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ইশান দ্রুত পিছনে তাকিয়ে বলে উঠলো
— “ আরে আরে…! অ্যান্টিডোট কাজ করছে।”
ইয়াবি ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপলো। কারণ তারা জানে এতক্ষণ মৃত্যু সাথে লড়ে এখন এই লোকটার অবস্থা এমন যে বাচ্চাদের মতো বমি করছে।
কিন্তু লিসি?
একটু অবাক হলো এমনটা আশা করিনি নিজের শাড়ির দিকে তাকালো,তারপর কিরিসের দিকে সে এখনো গলা টেনে যাচ্ছে।কিন্তু লিসি একবারও বিরক্ত হলো না একবারও না। বরং সঙ্গে সঙ্গে দুই হাতে কিরিসকে আরো শক্ত করে ধরে ফেললো যেন সে পড়ে না যায়। কিরিস কষ্টে চোখ খুলে নিচু গলায় বললো
— “ সরি… শাড়িটা নষ্ট করে ফেললাম। ”
কথাগুলো বলার সময় তার গলায় এমন এক ক্লান্তি ছিল… যা খুব কম মানুষ কোনোদিন শুনেছে। লিসির বুকটা হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। সে কিছু না বলে নিজের হাতের তালু দিয়ে খুব যত্ন করে কিরিসের ঠোঁট মুছে দিল। তারপর পাশের ব্যাগ থেকে ছোট নরম কাপড় বের করলো। ধীরে ধীরে কিরিসের মুখটা পরিষ্কার করতে লাগলো।
এমনভাবে…
যেন একটা ছোট শিশুকে সামলাচ্ছে। তার চোখে বিরক্তি নেই ঘৃণা নেই। শুধু গভীর মায়া আর অধিকার।
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করলো
—“ ঘৃণা লাগছে না? ”
লিসি থেমে গেল তারপর অবাক হয়ে তাকালো।
—“ ঘেন্না লাগবে কেন? ”
কিরিস তাকিয়ে আছে তার দিকে, তার এই তাকানোতে সে একটা মান সম্মত উত্তর চায় সেটা বুঝা যাচ্ছে লিসি তার চোখের দিকে তাকায় তারপর খুব শান্ত গলায় বললো —“ স্বামী হোন আপনি আমার। ”
এক মুহূর্ত থেমে ধীরে তার কপালে হাত রাখলো
— “ আপনাকে এমন অবস্থায় রেখে আমি কী করে দূরে সরে যাই? ”
গাড়ির ভিতর কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বললো না।
শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ। আর সেই কথাগুলো যেন নীরবে গিয়ে আঘাত করলো কিরিসের বুকের গভীরে।
এই মানুষটা সারা জীবন দেখেছে ভয়,স্বার্থ,বিশ্বাসঘাতকতা। কিন্তু আজ একটা মেয়ে তার বমিতে ভেজা শাড়ি নিয়েও বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে তাকে আগলে রাখছে। এমন ভালোবাসা খুব কম মানুষ পায়।
কিরিস ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে আবার লিসিকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। মাথাটা তার ঘাড়ে নামিয়ে চোখ বন্ধ করলো। প্রথমবারের মতো তার মুখে অদ্ভুত শান্তি ফুটে উঠলো। যেন পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধের পরে সে নিজের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। সামনের লুকিং গ্লাসে সবকিছু দেখছিল ইয়াবি আর ইশান দু’জনই কিছু বললো না। শুধু ঠোঁট চেপে হাসছে। কিন্তু দু’জনের মনেই একই কথা। একটু আগেই যে মানুষটা নিজের শরীরে বিষ ঢুকিয়েছে…
যে লোকটার নাম শুনে মানুষ কাঁপে… সে এখন এই মেয়েটার কাঁধে মুখ লুকিয়ে নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে আছে। ইয়াবি ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকালো।
ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটলো।
— “ শেষমেশ বাঘটারও একটা ঘর হলো। ”
ইশান নিচু গলায় বললো — “ না… ঘর না। ”
সে আয়নায় পিছনের দু’জনের দিকে তাকালো।
এদিকে লিসি সামনে থাকা টিস্যুর বক্স থেকে টিস্যু বের করলো। কিরিস এখনো তার গলায় মুখ গুঁজে আছে।লিসি ধীরে ধীরে টিস্যু দিয়ে নিজের শাড়িটা পরিষ্কার করছে একটুও বিরক্ত না হয়ে। বরং বারবার কিরিসের মুখের দিকে তাকাচ্ছে তার চুল ঠিক করে দিচ্ছে।
কপালের ঘাম মুছে দিচ্ছে। যেন তার সমস্ত পৃথিবী এই একজন মানুষকে ঘিরেই। আর সত্যি বলতে এমন একজন সহধর্মিণী পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। যে স্ত্রী শুধু সুখের সময় হাত ধরে না… পুরুষটার সবচেয়ে ভাঙা, অসহায় মুহূর্তেও তার পাশে বসে বলে—
“আপনি অসুস্থ হতে পারেন… দুর্বল হতে পারেন… তবুও আপনি আমার কাছেই নিরাপদ।”
কিরিস আধখোলা চোখে লিসির দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে বললো —“ লিসি …? ”
লিসি নিচু হয়ে এলো কিরিস ক্লান্ত হাসলো।
— “ মানুষ আমাকে অনেক নামে ডাকে… ”
তার আঙুল ধীরে লিসির হাত ছুঁলো।
—“ কিন্তু “স্বামী” শব্দটা… সবচেয়ে বেশি শান্তি দেয়।”
............
কয়েক ঘণ্টা পর—
কালো গাড়িটা এসে থামলো বিশাল আলোকসজ্জায় মোড়ানো বিয়ের ভেনুর সামনে। চারপাশ যেন উৎসবে জ্বলছে। ঝাড়বাতির আলো, ফুলের গন্ধ, দূরে ঢোলের শব্দ, হাসাহাসি, ছোটাছুটি পুরো পরিবেশটাই একেবারে বিয়ে বাড়ির অনুভূতি তুলে দিচ্ছে।বাইরে অতিথিদের ভিড়। কেউ বরের জন্য অপেক্ষা করছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ আবার স্টেজের সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত।
গাড়ি থামার সাথে সাথেই ইয়াবি আর ইশান দরজা খুলে নেমে পড়লো।
— “ আরে দৌড়! দেরি হলে জারাকে দেখা মিস হয়ে যাবে!
ইশান একদম ছেলেমানুষের মতো দৌড় দিল ভিতরের দিকে। ইয়াবিও পিছনে হেসে বললো—
—“ আমার জন্য একটু জায়গায় রাখিস, নতুন মেয়ে দেখার.. এই !
এই দুইজন ছোটখাটো মজা আর বিয়ের অনুষ্ঠান মাতাতে ওস্তাদ। মুহূর্তেই দু’জন ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। বাইরে উৎসবের উন্মাদনা।
আর ভিতরে গাড়ির পিছনের সিটে এখনো নীরবতা।
কিরিস এখনো লিসিকে জড়িয়ে ধরে আছে। হয়তো কিছুক্ষণ চোখ লেগে গিয়েছিল তার। লিসি ধীরে ধীরে তার কাঁধে হাত রাখলো। নরম গলায় ডাকলো—
— “ এই যে শুনছেস… উঠুন?
কিরিস খুব ধীরে চোখ খুললো। কয়েক সেকেন্ড যেন বুঝতেই পারলো না সে কোথায়। তারপর চোখ গিয়ে থামলো লিসির মুখে। আর আশ্চর্যভাবে এখন তাকে অনেকটাই স্বাভাবিক লাগছে। বিষের তীব্রতা পুরোপুরি যায়নি, কিন্তু আগের মতো ভয়ংকরও না। কিরিস কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো সোজা হয়ে বসে আসে, লিসির শাড়ির দিকে তাকালো যেখানে সে বমি করে ছিলো, লিসি যে সুন্দর করে মুছে একটু পারফিউম মেরে দেছে যাতে বোঝা না যায়। কিরিস এবার লিসির মুখে দিকে তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বললো
— “ শার্টটা দাও। ”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ খুলে সুন্দর করে ভাঁজ করা শার্টটা বের করলো। ওয়াইন কালারের। সাথে ব্ল্যাক কোট।
সবকিছু এমনভাবে বেছে রাখা যেন কিরিসের ব্যক্তিত্বের সাথেই তৈরি। কিরিস ধীরে কোটটা পাশে রাখলো।
তারপর শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করলো। লিসি প্রথমে স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই যখন কিরিস কালো শার্টটা পুরো খুলে ফেললো লিসির নিঃশ্বাস আটকে গেল। চওড়া বুক, কঠিন পেশি, হালকা উঠে থাকা শিরা আর শরীরজুড়ে সেই পুরুষালী তীব্রতা… যেটা কোনো ভাষায় বোঝানো যায় না।
লিসি দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে ফেললো। কিরিস সেটা দেখেই ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ফেললো।
— কী হলো?
— কিছু না।
— তাহলে তাকাচ্ছো না কেন?
লিসি আরও লজ্জা পেয়ে বললো—
— এমন করে… ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে চাইলে তো তাকাতে লজ্জা লাগবেই।
কিরিস ভ্রু তুললো।
— ও… তাহলে পছন্দ হয়েছে আমার বডি?
— না!
উত্তরটা এত দ্রুত এলো যে কিরিস হেসে ফেললো।
পরের মুহূর্তেই সে হাত বাড়িয়ে লিসিকে টেনে নিজের খালি বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো। লিসি হতভম্ব।
—“ এই …! ”
তার গাল মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে গেল। মাথাটা এসে ঠেকলো কিরিসের উষ্ণ বুকে। ভিতর থেকে স্পষ্ট হার্টবিট শোনা যাচ্ছে।
ধুক…
ধুক…
ধুক…
কিরিস নিচু হয়ে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো — “ মিথ্যে বললে চোখ আগে ধরা দেয়, Sweetheart। ”
লিসির বুক কেঁপে উঠলো। সে দুই হাত দিয়ে কিরিসের বুক ঠেলে সরানোর চেষ্টা করলো।
— “ ছাড়ুন… কেউ দেখে ফেলবে…”
কিরিস আরো একটু কাছে টেনে নিল। তার গলায় ক্লান্তি থাকলেও দুষ্টুমি একটুও কমেনি।
— “ দেখুক,আর তোমার এই কথা পুরোনো হয়ে গেছে বউজান। আমার বউকে আমি কাপড় পরিয়ে নাকি কাপড় ছাড়া আদর করবো সেটা আবার ব্যাক্তিগত ব্যাপার ”
লিসি চোখ বড় করে ভাবে কাপড় ছাড়া মানে! লজ্জায় সে মাথা নিচু করে বলে — “ আপনি একদম অসভ্য। ”
কিরিস শান্ত গলায় —“ শুধু তোমার সাথে। ”
লিসি এবার সত্যিই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো।
কিরিস কিছুক্ষণ তাকে এভাবেই ধরে রাখলো। যেন এই কয়েক সেকেন্ডেই সে আবার নিজের শক্তিটা ফিরে পাচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দিয়ে ওয়াইন কালারের শার্টটা পরে নিল। সামনের দুই-তিনটা বোতাম খোলা রাখলো। গলায় হালকা শিরা দেখা যাচ্ছে।
তারপর ব্ল্যাক কোটটা কাঁধে চাপাতেই মুহূর্তে আবার সেই আগের কিরিস রায় চৌধুরী ফিরে এলো সেই অভিজাত ভয়ংকর সুদর্শন। যেন কিছুক্ষণ আগেও সে মৃত্যুর সাথে লড়াই করেনি। লিসি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো।
আর কিরিস? সে ধীরে হাত বাড়িয়ে লিসির থুতনি তুলে বললো —“ এভাবে তাকিয়ে থাকলে কিন্তু আজ বিয়েতে কেউ বরের দিকে তাকাবে না। ”
লিসি কিরিসের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে নেমে গেল। নামতেই চারপাশের আলো, শব্দ, বিয়ের উচ্ছ্বাস যেন একসাথে তাকে ঘিরে ধরলো। দূরে সবার ছোট বাচ্চা, বড়রা, মেয়েরা ছেলেরা সবার চিৎকার কারও হাসি কারও দৌড়াদৌড়ি। পুরো ভেনুটা একেবারে উৎসবের রাজ্য। লিসি দু’পা এগিয়েই হঠাৎ থেমে গেল। তারপর যেন কিছু মনে পড়তেই আবার দ্রুত ফিরে এলো গাড়ির কাছে। কিরিস ভ্রু তুলে তাকালো।
লিসি মুখ ফুলিয়ে বললো — “ আপনার জন্যই সব ভুলে যাই আমি! ”
তারপর পিছনের সিট থেকে দুইটা ব্যাগ টেনে হাতে নিল।
একটাতে কিরিসের দরকারি জিনিস, আরেকটাতে লিসির নিজের। ব্যাগ তুলতে গিয়েও সে কিরিসের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে ভেংচি কাটলো।
— ” এত জড়িয়ে ধরলে মানুষ জিনিসপত্র ভুলবেই। ”
কিরিস কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললো।
একদম নিচু, ক্লান্ত হাসি। কিন্তু সেই হাসিটাও অদ্ভুত সুন্দর। মুহূর্তের জন্য তার সমস্ত যন্ত্রণা যেন চাপা পড়ে গেল। সত্যি বলতে অস্বস্তি এখনো হচ্ছে। বিষের প্রভাব পুরোপুরি যায়নি। শরীরের ভিতর চাপা ব্যথা রয়ে গেছে।
কিন্তু তারপরও… এই মেয়েটার ছোট ছোট কাণ্ড দেখে নিজেকে আটকে রাখা যায় না। লিসি আবার দৌড়ে ভিতরের দিকে চলে গেল। তার শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ে উঠলো। কিরিস কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার যাওয়ার দিকে। তারপর ধীরে দরজা ঠেলে গাড়ি থেকে নামলো।
দুপুরের সূর্যের আলো এসে পড়লো তার উপর। ওয়াইন কালারের শার্ট উপরে ব্ল্যাক কোট। সামনের দুইটা বোতাম খোলা। চোখে সেই চিরচেনা ঠান্ডা দৃষ্টি মুখে কঠোরতা।
যেন পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা তাকে ভাঙতে পারে।
সামনে ইতিমধ্যেই দাঁড়িয়ে ছিল রিহান, ইয়াবি আর ইশান। তিনজনের চোখই একবার কিরিসের দিকে গেল।
কারণ তারা জানে এই মানুষটা কয়েক ঘণ্টা আগেই মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে এসেছে। কিন্তু তাকে দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। গাড়ির ভিতরে কাবির বসে আছে।
ইশান আগেই সব ড্রেসিং ঠিকঠাক করে দিয়েছে।
মুখ ধুয়ে, চুল সেট করে, পোশাক গুছিয়ে যেন কিছুই হয়নি। কারণ আজ তার বিয়ে। আজ কোনো অন্ধকারকে সেই আনন্দ ছুঁতে দেওয়া যাবে না। ইয়াবি সিগারেটটা মাটিতে ফেলে জুতোর নিচে পিষে দিল।
তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো — “ চলি তাহলে? ”
কিরিস ধীরে মাথা নাড়লো।
তারপর চারজন একসাথে বিয়ের গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
ইশান ইয়াবিকে বলে উঠে —“ এই তুই না বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার একদম প্রফেসার, তাহলে সিগারেট খাস না ”
ইয়াবি হেসে বলে —“ For extra protein”
ওদের এইসব মজার কথা বলতে বলতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।
আর সত্যি বলতে—
দূর থেকে তাদের দেখলে মনে হচ্ছিল কোনো সিনেমার দৃশ্য। চারজন মানুষ চারটা আলাদা ব্যক্তিত্ব।
চারজনের মাঝেই এমন একটা উপস্থিতি… যেটা সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকে না। তাদের হাঁটার ভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি, চারপাশের উপর নিয়ন্ত্রণ সবকিছুতেই ক্ষমতার ছাপ।
কেউ বুঝতেই পারবে না… এই মানুষগুলো একটু আগেই মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে এসেছে। এদের দেখে শুধু একটাই কথা মাথায় আসে—
The Hell soldiers and Their God Jiyan Kiris Roy Chowdhury.
যে বিষ শরীরে নিয়েও মাথা নিচু করে না। যে ভাঙে… কিন্তু কখনো নত হয় না। বিয়ের ভেনুর মূল গেটের সামনে তখন একেবারে উৎসবের হুল্লোড়। রঙিন ফুল দিয়ে সাজানো প্রবেশপথ। দুই পাশে ফেয়ারি লাইট জ্বলছে।
মেয়েদের একটা দল বড় টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কারও হাতে শরবতের ট্রে, কারও হাতে ফুল, কেউ আবার বরপক্ষের কাছ থেকে “গেট মানি” আদায়ের প্ল্যান করছে। সুরভী, আরোবি, জারা, হিয়া, নুসরাত, লিজা সে এখানেই ছিলো তিশার ছোট বোন হওয়ার জন্য সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে।
—“ আজ কিন্তু টাকা ছাড়া কাউকে ঢুকতে দিবো না! ”
— “ বিশেষ করে কাবির ভাইয়াকে! ”
—“ আরে ওদের দিকটা দেখ আগে! ”
হঠাৎ এক মেয়ের কথায় সবাই তাকালো সামনের দিকে।
আর তারপর… কয়েক সেকেন্ডের জন্য সত্যি সত্যিই অনেকের নিঃশ্বাস আটকে গেল। সবাই চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে সামনের,মেয়েদের তো গাল হা হয়ে গেছে,ছেলেরাও দেখছে । দূর থেকে ধীরে ধীরে হাঁটতে আসছে চারজন। সামনের আলো গিয়ে পড়ছে তাদের উপর। ইশান আর ইয়াবি নিজেদের মতো কথা বলতে বলতে হাঁটছে। রিহানের মুখে সেই স্বাভাবিক নির্লিপ্ত ভাব।
আর মাঝখানে কিরিস। ওয়াইন কালারের শার্টের উপর ব্ল্যাক কোট। সামনের বোতাম খানিকটা খোলা।
চওড়া কাঁধ। সোজা হয়ে হাঁটার ভঙ্গি। চোখে সেই ঠান্ডা অথচ ভয়ংকর আকর্ষণ। যেন কোনো সিনেমার পর্দা ছিঁড়ে বাস্তবে বেরিয়ে এসেছে কেউ। চারপাশের অনেক মেয়েই প্রায় তাকিয়ে থাকতে ভুলে গেল।
কেউ ধীরে ফিসফিস করলো
— “ ও মাই গড… ”
আরেকজন তো সরাসরি বলেই ফেললো
— “ মানুষ এত হ্যান্ডসাম হয় কীভাবে? ”
— “ শুধু হ্যান্ডসাম না… দেখ না পার্সোনালিটি! ”
—“ আর বডিটা… আল্লাহ…! ”
সত্যিই লোকটাকে যেন আলাদা করেই বানানো হয়েছে।
যেমন লম্বা… তেমন সুদর্শন… তেমন উপস্থিতি…
আর সেই হাঁটার মধ্যে এমন একটা দম্ভ আছে যেটা অভিনয় করে আনা যায় না। কেউ জানে না…
এই মানুষটা কিছুক্ষণ আগেই নিজের শরীরে বিষ নিয়েছে। এখনো তার শরীরের ভিতরে যন্ত্রণা চলছে।
তবুও বাইরে থেকে তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে-ই পুরো জায়গাটার নিয়ন্ত্রণে। মেয়েদের মধ্যে ছোটখাটো হুলস্থুল পড়ে গেল। কেউ চুল ঠিক করছে কেউ লিপগ্লস বের করেছে। কেউ আবার ফিসফিস করে নাম জানার চেষ্টা করছে। জারা হাসতে হাসতে বললো
— শেষ। আজকে আবার অর্ধেক মেয়ে প্রেমে পড়ে যাবে।
হিয়া নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরলো—
— আমি তো পড়েই গেছি, আমার এই Handsome ভাইদের উপর।
সবাই হেসে উঠলো। ঠিক তখনই ভিড়ের একটু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লিসি সবকিছু দেখছিল। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠলো।
কারণ এই “ফাটাফাটি” মানুষটার উপর যতই আশেপাশের মেয়েরা পাগল হোক না কেন…
তারা একটা জিনিস জানে না। এই বিপজ্জনক সুন্দর মানুষটার হৃদয় অনেক আগেই কেউ চুরি করে নিয়েছে।
আর সেই চোরটা এই মুহূর্তে শাড়ি পরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কিরিস হাঁটতে হাঁটতে একবার চোখ তুলে তাকালো। সরাসরি লিসির দিকে। মুহূর্তেই চারপাশের সব শব্দ যেন থেমে গেল তার চোখের সেই দৃষ্টি এত গভীর ছিল…যে লিসির বুক ধুক উঠলো। যেন শত মানুষের ভিড়েও লোকটা শুধু তাকেই দেখছে। আর সত্যিটাও সেটাই। কিরিসের চোখে পৃথিবীর সবকিছু গুরুত্ব হারাতে পারে… কিন্তু লিসি না কখনো না। তার কাছে পৃথিবীর সব থেকে মূল্যবান জিনিস তার প্রাণ প্রিয় বউজান।
বিয়ের গেটের সামনে তখন যেন আলাদা এক যুদ্ধক্ষেত্র বসেছে। একপাশে মেয়েদের দল অন্যপাশে ছেলেরা।
মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাবির আজকের বর, মুখে বিরক্তির অভিনয় করলেও চোখেমুখে স্পষ্ট উত্তেজনা। বড়রা তো অনেক আগেই নিজেদের মতো ভিতরে চলে গেছে। কারণ তারা জানে, গেট আটকে টাকা আদায়, টিপ্পনী, ঠাট্টা এসব ছোটদের রাজত্ব। আর আজকের দিনটা পুরোপুরি ওদের। জারা দু’হাত কোমরে রেখে সামনে এসে দাঁড়ালো।
— “ থামুন! এই গেট দিয়ে প্রবেশ করতে হলে ট্যাক্স দিতে হবে!”
ইশান সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয় মুখ করে বললো
— “ আমরা গরিব মানুষ, সোনা। ”
— “ গরিব? ”
হিয়া ভ্রু তুলে বললো
— “ তোমাদের কোটের দামে তো আমাদের পুরো শপিং হয়ে যাবে! ”
চারপাশে হেসে উঠলো সবাই। এদিকে কাবিরকে নিয়ে শুরু হয়ে গেছে টানাটানি।
— “ বরকে আগে আটকাও! ”
—“ না টাকা, না প্রবেশ! ”
কিন্তু মজার বিষয় হলো…
বরের চেয়ে বেশি নজর পড়েছে আরেকজনের উপর।
কিরিস। সে একটু পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, দু’হাত পকেটে গুঁজে। মুখে সেই চিরচেনা স্থিরতা চারপাশে এত হৈচৈ, এত প্রশংসা— তবুও তার চোখেমুখে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন নেই। যেন এসব তার জীবনের বহু পুরোনো, বহু বিরক্তিকর কোনো বিষয়। কিন্তু মেয়েদের অবস্থা?
প্রায় পাগল হওয়ার উপক্রম। একজন আরেকজনের কানে ফিসফিস করছে।
— “ এত সুন্দর মানুষ আমি লাইফে দেখি নাই। ”
—” দেখেছো চোখ দুটো? ”
— “ আর ওই পার্সোনালিটি… আল্লাহ! ”
—“ মনে হচ্ছে নেটফ্লিক্সের কোনো ডার্ক মাফিয়া সিরিজ থেকে উঠে এসেছে! ”
একটা মেয়ে হেসে সামনে এগিয়ে এলো। চোখ ছোট করে কিরিসের দিকে তাকিয়ে বললো
— “ আচ্ছা ভাইয়া… একটা কথা বলি? ”
কিরিস ভ্রু সামান্য তুললো।
— ” বলো। ”
— “আপনার কি বিয়ে হয়ে গেছে? ”
চারপাশ মুহূর্তে চুপ। কারণ প্রশ্নটা সবাই শুনতে চাচ্ছিল।
আর লিসি? সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে।
তার চোখ স্থির কিরিসের মুখে। বান্দা যদি আজ উল্টাপাল্টা কিছু বলে… তাহলে পরে তার কপালে দুঃখ আছে। কিন্তু কিরিস? সে একদম শান্ত।একটুও তাড়াহুড়ো নেই। একটুও বিরক্তি নেই। আরেকটা মেয়ে হেসে বললো —“ গার্লফ্রেন্ড আছে কি ? ”
ইশান আর ইয়াবি তখনই মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। কারণ তারা জানে এখন কিছু একটা হবে।এইসময়টা গেটের সামনে একেবারে ছোটখাটো আদালত বসে গেছে। মাঝখানে কিরিস দাঁড়িয়ে। একদম শান্ত দু’হাত পকেটে। মুখে সেই নির্লিপ্ত ভাব যেন এই মুহূর্তে আশেপাশে কী হচ্ছে, তাতে তার জীবনের কোনো আগ্রহই নেই। আর সামনে? মেয়েদের পুরো দল তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। কেউ শরবতের গ্লাস হাতে, কেউ ফোন অন করে ভিডিও করছে, কেউ আবার সরাসরি তাকিয়েই আছে। একটা মেয়ে নিচু গলায় আরেক জনকে বললো —
“ আমি যদি আরেকটু তাকাই, আমি নিজেই বিয়ের প্রপোজাল দিয়ে দিবো। ”
মেয়েটা কনুই মেরে ফিসফিস করলো
— “ আগে দেখে নে মানুষটা শ্বাস নেয় কিনা। এত পারফেক্ট হওয়া বৈধ না। ”
পাশে দাঁড়িয়ে ইশান মুখ চেপে হাসছে। আর লিসি? সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে মুখে মিষ্টি হাসি। কিন্তু চোখ?
একদম সোজা কিরিসের দিকে। এমন দৃষ্টি…
যেটা স্পষ্ট বলছে— “আজ যদি উল্টোপাল্টা কিছু বলেন… বাসায় গিয়ে খবর আছে।”
কিরিস সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করে দাঁড়িয়ে আছে।
একটা মেয়ে সাহস করে সামনে এলো।
— “ আচ্ছা ভাইয়া… একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
—“' করো। ”
— “ আপনি কি সবসময় এমন সিরিয়াস থাকেন?”
কিরিস শান্তভাবে বললো —“ না। মাঝে মাঝে এর থেকে বেশি সিরিয়াসও থাকি ।”
চারপাশে সঙ্গে সঙ্গে হাসির শব্দ উঠলো। লিসিও ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপলো। কিন্তু মেয়েদের প্রশ্নের শেষ নেই তারা একে একের পর এক প্রশ্ন করছে, কাবির চুপ করে দাড়িয়ে আছে, সবটা দেখছে হাসছেও। এরমধ্যেই মেয়েদের মূল প্রশ্ন কিরিসের বিয়ে হয়েছে কিনা। একজন মেয়ে সবটা ছেড়ে এগিয়ে এসে জোড়ে বলে উঠে —
“ আরে বলুন না, আপনি কি সিঙ্গেল? ”
চারপাশ থেকে বাকি মেয়ে কয়টা কথার সাথে তাল মিলিয়ে বলছে হ্যাঁ বলো বলো, বলো। কিরিস কিছু বললো না চুপ করে দাড়িয়ে আছে। কিরিসের দিকে তাকিয়ে আছে রিহান ইয়াবি কাবির ইশান তার উত্তরের জন্য মেয়েরাও আছে আগ্রহ নিয়ে। একটা নিশ্বাস নিয়ে কিরিস ধীরে ধীরে পকেট থেকে হাত বের করলো। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের বাঁ হাতটা সামনে তুললো। দুপুরের সূর্যের আলো এসে পড়লো তার হাতে। আর পরের মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ।
কারণ তার হাতে গাঢ় মেহেদিতে স্পষ্ট লেখা—
“My Wife Lisi”
এক মুহূর্ত, দুই মুহূর্ত। তারপর পুরো মেয়েদের দল একসাথে চিৎকার করে উঠলো
— ওওওওওওহ!!!
লিসি হতবাক। সত্যি বলতে, সে নিজেও এটা আশা করেনি। তার বুকের ভিতরটা হঠাৎ অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠলো। লোকটা… এত মানুষের সামনে… এভাবে?
তার নাম নিজের হাতে লিখে রেখেছে? কিরিস তখনো একদম শান্ত। যেন এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।
কিন্তু তার চোখ? সেগুলো সরাসরি লিসির উপর স্থির।
সেই দৃষ্টিতে এমন এক অধিকার ছিল… যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যেন নীরবে বলছে
“আমি কাউকে কিছু বুঝিয়ে বলি না। আমি শুধু জানিয়ে দিই তুমি আমার।”
ইশান সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চাপড়ে উঠলো—
—“ শেষ! ভাই প্রেমে শেষ!”
ইয়াবি মাথা নেড়ে বললো
— “ না, এ আর প্রেম না। এ তো সরাসরি আত্মসমর্পণ।”
ছেলেদের দল এবার লিসিকে ঘিরে ধরলো।
— “ ভাবি, কী জাদু করছেন বলেন তো?”
—“ এই মানুষটারে বশ করলেন কীভাবে?”
— “ কিরিস ভাই তো পুরো শেষ!”
লিসির গাল লাল হয়ে গেছে। সে চোখ নামিয়ে ফেললো, কিন্তু ঠোঁটের কোণের হাসিটা লুকাতে পারলো না।
আর আশেপাশের কিছু মেয়ের মুখ? মুহূর্তেই ম্লান কারণ সত্যিটা সহ্য করা কঠিন। যে মানুষটাকে দেখে কয়েক মিনিট আগেও তাদের বুক কাঁপছিল…সে মানুষটা অনেক আগেই কারও হয়ে গেছে সম্পূর্ণভাবে। কিরিস ধীরে ধীরে আবার হাত নামিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে ফেললো। তারপর একপাশে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো
— “ এখন রাস্তা ছাড়বে? নাকি স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে যেতে হবে?”
সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে আবার হাসির রোল পড়ে গেল।
আর লিসি? সে শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইলো নিজের মানুষটার দিকে। অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর পুরুষগুলো যখন ভালোবাসে… তখন তারা শব্দ দিয়ে না অধিকার দিয়ে চিনিয়ে দেয়।
চারপাশে তখনো হাসির আবহাওয়া রয়ে গেছে। মেয়েরা চুপ থাকছে না, একবার টাকা একবার কিরিসের সম্পর্কে একবার কাবিরকে নিয়ে টানাটানি। এর মধ্যে আরেকটা মেয়ে এবার বললো— “ আচ্ছা আপনার দিকে এত মেয়ে তাকিয়ে থাকে… আপনার বউ জেলাস হয় না?
এইবার আশেপাশে “উউউউ” শব্দ উঠলো। সবাই উত্তর শোনার জন্য মুখিয়ে। কিরিস ধীরে মাথা ঘুরিয়ে লিসির দিকে তাকালো। লিসি সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরু করলো।
একদম পরিষ্কার হুমকি।
“ভেবে উত্তর দিবেন।”
ইশান পাশ থেকে ফিসফিস করলো —“ ভাই, বাঁচতে চাইলে হিসাব করে কথা বলিস।”
ইয়াবি নিচু গলায় যোগ করলো
—“ লিসির চোখে আমি কবর দেখতে পাচ্ছি। ”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে আবার মেয়েটার দিকে তাকালো।
—“ জেলাস হয় কিনা জানি না…”
একটু থামলো। তারপর খুব শান্তভাবে বললো—
— “ তবে আমি অন্যদিকে তাকানোর সময় পাই না। ”
এক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা। তারপর পুরো গেটের সামনে হো হো করে হাসি পড়ে গেল। ইশান নাটকীয়ভাবে বুক চাপড়ে বললো — “ শেষ! আমাদের bro আজ লিসির আঁচলে !”
ইয়াবি মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো
— “ কিরিস রায় চৌধুরী আজকে লিসির চোখে ”
সত্যিই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কিন্তু মুখ ঘুরানোর আগেই কিরিস আবার শান্ত গলায় বললো
— আসলে…
সবাই আবার চুপ। কিরিস একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে যোগ করলো —“ আমার স্ত্রী রাগ করলে আমি একটু ভয় পাই।”
এইবার ছেলেরা সরাসরি চিৎকার করে উঠলো
— কিরিস ভাই ভয় পায়!!!
— ইতিহাস সৃষ্টি!!!
লিসি একটু এগিয়ে এসে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো —“ আপনি ভয় পান?”
কিরিস একদম গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লো।
— ” হুম। ”
—“ কাকে? ”
এক মুহূর্ত থেমে নিচু গলায় বললো
— “ কারণ গুলি খেলে মানুষ একবার মরে… কিন্তু তোমার চোখে তাকালে আমি বারবার মরি ।
এবার তো আশেপাশে সবাই প্রায় হাসতে হাসতে শেষ।লিসি লজ্জায় একদম মাথা নিচু করে ফেললো।
আর কিরিস?সে একপাশে ঠোঁট বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু তার চোখে সেই দুষ্টু ঝিলিক স্পষ্ট যেটা শুধু লিসির জন্যই থাকে।
এবার কথা আবার ঘুরে গেছে, আবহাওয়া যেমন ক্ষণে ক্ষণে বদলায় এখানে তেমন কথার টপিকও বদলাচ্ছে। এইসবটা ঝেড়ে এবার মেয়েরা আসল কথায় আছে। যেটা হলো বিয়ে বাড়ির মূল আর্কষণ গেট ধরা আর তার টাকা নেওয়া। মেয়েরা এবার সেই কাজটাই করছে।

0 Comments