তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :82

বিয়ের গেটের সামনে এখন এবাট পুরোপুরি যুদ্ধাবস্থা।
একপাশে মেয়েদের দল আরোবি, সুরভী, জারা, নুসরাত, হিয়া, লিজা… আর একটু পেছনে শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে লিসি। অন্যপাশে ছেলেরা রিহান, ইয়াবি, ইশান আর বাকিরা। মাঝখানে কাবিরকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে যেন সে কোনো বন্দী রাজপুত্র। সবসময় বকবক করলেও নিজের বিয়ের গেটের সামনে বান্দা একদম চুপ আর সামনে ফুলের মালা ধরে গেট আটকে রেখেছে মেয়েরা।
ইশান দুই হাত কোমরে দিয়ে নাটকীয় গলায় বলে উঠলো—“ আহা রে দুনিয়া! মানুষের স্বার্থপরতা নিজের চোখে দেখে ফেললাম আজ! ”
জারা ভ্রু তুলে বললো
— “ কী হলো আবার? তুই কি এমন দেখলি ডাক্তার? ”
ইশান বুকে হাত দিয়ে কষ্টের অভিনয় করলো।
— “ আসার সময় তোদের গাড়িতে আমরা “ভাইয়া” ছিলাম। ”
জারার দিকে তাকিয়ে আঙুল তুলে বলে —” তুই আমার সোনা ভবিষ্যৎ বউ ছিলি ”
জারা চোখ বড় করে রেগে কিছু বলতে যাবে তার মধ্যে
রিহান সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলো
— “রিহান ভাইয়া এটা খাবেন?” “ইশান ভাইয়া ওইদিকে বসেন!”
ইয়াবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
— “ আর এখন টাকা নেওয়ার সময়? ”
তিনজন একসাথে আঙুল তুলে চিৎকার করলো—
— ” অন্য পক্ষ!!! ”
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।
আরোবি ইয়াবির দিকে তাকিয়ে বলে —“ ওলে রে রে, ছেলে আমার রাগ করেছে, এই আজ না তোর বোনের বিয়ে তুই ওইপাশে কেন? ”
ইয়াবি জিহ্বা কামড় দিয়ে বলে —“ হ্যাঁ নিজের বোনের বিয়ে বটে.... কিন্তু আগে আমার ভাইয়েরা,একদম পবিত্র সম্পর্ক? ”
ইশান ইয়াবি কাঁধে হাত দিয়ে —“ একদম ভাই। কিন্তু তুরা এতো স্বার্থপর হলে কি করে ”
সুরভী ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো—
— “ হতে হয়, হতে হয়। ”
নুসরাত গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লো।
— “ এটা টাকার মামলা। ”
হিয়া নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো—
—“ এখানে আপন-পর বলে কিছু নেই। ”
লিজা হাত বাড়িয়ে সামনে বললো
— “ আগে ক্যাশ, তারপর প্রবেশ। ”
ইশান হতবাক মুখ করে বললো
— ” মানে এত বছরের সম্পর্কের মূল্য এই? ”
জারা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল
— “ অবশ্যই। সম্পর্ক সবসময় আগে থাকলেও এখন টাকা আগে। ”
রিহান মাথা নেড়ে বললো—
— “ এই জন্যই বলি, মেয়েদের বিশ্বাস করতে নাই। ”
আরোবি চোখ ছোট করে বললো
—“ তা ঠিক। কিন্তু টাকা দিতে যখন সমস্যা নাই, তখন এত কান্নাকাটি কেন? ”
ইয়াবি কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বললো
—“ সমস্যা টাকা না।”
একটু থেমে নাটকীয়ভাবে বললো—
— “ সমস্যা সম্মানের। ”
— “ ওমা! ”
হিয়া হেসে উঠলো।
—“ কয়েক লাখ টাকার মানুষ আবার কয়েক হাজার টাকার জন্য সম্মান খুঁজতেছে!”
ইশান আঙুল তুলে বললো
— “ এই কয়েক হাজার দিয়েই বড়লোকরা বড়লোক থাকে। ”
নুসরাত মুখ গম্ভীর করে বললো—
— “ আমরা কমে নেবো না। ”
— “ আমরাও বাড়িয়ে দিবো না। ”
— “ টাকা ছাড়া গেট খুলবো না। ”
—” টাকা ছাড়া ঢুকবোই।”
—“ দেখি কিভাবে ঢুকো!”
—“ দেখি কিভাবে আটকাও!”
এভাবে দুইপক্ষের তর্ক বাড়তেই থাকলো।চারপাশে সবাই দাঁড়িয়ে মজা দেখছে। কেউ ভিডিও করছে কেউ আবার পাশ থেকে উসকানি দিচ্ছে। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাবির মাথা চুলকাচ্ছে।
— “ ভাই, আমার বিয়েটা আজকেই হবে তো? ”
এইদিকে কিরিস একটু পেছনে দাঁড়িয়ে সব দেখছে।
মুখে বিরক্তি। সত্যি বলতে একটু আগেই লোকটা মৃত্যুর সাথে লড়াই করে এসেছে। এখন এসে এই “গেট ট্যাক্স” নাটক দেখছে। তার কপালের রগ ধীরে ধীরে উঠছে।
লিসি সেটা দূর থেকেই বুঝে ফেললো।সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু চোখ বারবার কিরিসের দিকে যাচ্ছে।
কারণ সে জানে এই মানুষটা যদি এখন বিরক্ত হয়ে কিছু বলে… তাহলে পুরো গেটের নাটক শেষ। ঠিক তখনই ইশান আবার বলে উঠলো
—“ আচ্ছা, শেষ অফার। পাঁচ হাজার।”
মেয়েরা একসাথে চিৎকার করে উঠলো
— “ নাআআআ!!! ”
জারা হাত তুলে বললো
—“ এই শার্টের এক হাতার দাম পাঁচ হাজার!”
ইয়াবি ভ্রু তুলে বললো
— “ শার্টের দাম ধরলে তোদের পুরো গেট কিনে ফেলতে পারবো। ”
হিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো
— “ কিনে ফেলুন না। দেখি সাহস আছে কিনা। ”
এইবার রিহান সরাসরি নাটকীয়ভাবে কাবিরের কাঁধে হাত রেখে বললো —“ দেখছিস ভাই? প্রেমে পড়ে আমরা কী ভুল করেছি? ”
কাবির দীর্ঘশ্বাস ফেললো
—“ ভাই… বিয়ে করার আগে মানুষকে ভালো করে চিনে নিস। ”
লিসি এতক্ষণ চুপ ছিল। কিন্তু এবার ঠোঁট চেপে হাসি আটকাতে পারলো না। ঠিক তখনই কিরিস ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। মুহূর্তে দুইপক্ষই একটু চুপ হয়ে গেল।
কারণ তার উপস্থিতিতেই আলাদা চাপ আছে।
সে একবার মেয়েদের দিকে তাকালো। তারপর ছেলেদের দিকে। এরপর বিরক্ত গলায় বললো
—“ তোরা কি সারাদিন এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি?”
ইশান সঙ্গে সঙ্গে বললো
—“ ভাই, এটা সম্মানের লড়াই। ”
কিরিস ঠান্ডা চোখে তাকালো।
— “ তোর সম্মান পাঁচ হাজার টাকায় আটকে আছে? ”
চারপাশে আবার হাসির শব্দ উঠলো। ইয়াবি নিচু গলায় বললো—” শেষ। বড়ভাই মাঠে নেমে গেছে।”
আর লিসি? সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে কিরিসের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ লোকটার বিরক্ত মুখটাও অদ্ভুত সুন্দর লাগে। গেটের সামনে তর্ক যেন থামার নামই নিচ্ছে না।
ছেলেরা একদাম কমানোর চেষ্টা করছে। মেয়েরা দাম বাড়িয়েই যাচ্ছে। শেষমেশ আরোবি হাত তুলে ঘোষণা দিল — “ ফাইনাল কথা। সত্তর হাজার টাকা। ”
এক সেকেন্ড নীরবতা তারপর— “ কীইইই?! ”
ইশান এমনভাবে চিৎকার করলো যেন কেউ তার হৃদপিণ্ড খুলে নিয়েছে। রিহান কপালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।
— “ এই টাকায় ছোটখাটো জমি কেনা যায়! ”
ইয়াবি বুক চেপে বললো
— “ ডাকাতি করলেও এত ভদ্রভাবে করে না। ”
হিয়া ভ্রু তুলে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো
—“ বিয়ের গেট আটকানোও একটা শিল্প।”
নুসরাত মাথা নেড়ে যোগ করলো
—“ আর শিল্পের মূল্য থাকেই।”
ছেলেদের অবস্থা এমন যেন গালে মাছি বসলে সেটাও তাড়ানোর শক্তি নাই। কাবির তো সরাসরি বলে ফেললো—“ ভাই, আমারে ফিরায়া নিয়ে চল। আমি বিয়ে করুম না। ”
চারপাশে হেসে উঠলো সবাই। ঠিক তখন লিসি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার শাড়ির আঁচল হালকা বাতাসে উড়ছে মুখে মিষ্টি হাসি কিন্তু চোখে সেই চেনা দুষ্টুমি।
সে এসে একদম কিরিসের সামনে দাঁড়ালো। চারপাশের সবাই সঙ্গে সঙ্গে চুপ। কারণ এই দুইজনের কথোপকথন আলাদা লেভেলের বিনোদন। লিসি মাথা সামান্য কাত করে খুব মিষ্টি গলায় বললো
—“ টাকা না দিলে কিন্তু যেতে দেবো না, ভাইয়ারা।”
ইশান সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয়ভাবে বললো
— “ দেখছিস ভাই? নিজের মানুষও আজ শত্রুপক্ষ।”
কিন্তু কিরিস? সে শুধু তাকিয়ে আছে লিসির দিকে একদম স্থিরভাবে। যেন আশেপাশে এত মানুষই নেই। শুধু এই মেয়েটা আছে। গেটের সামনে এখন লিসি আর কিরিস মুখোমুখি। এবার হবে আসল তর্ক, কিন্তু এটা কি মানুষের পক্ষ দলের নাকি মনের পক্ষ দলের। সে শান্ত গলায় বললো — “ কত চাই? ”
লিসির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো।
—“ এত সহজে দিবেন নাকি?”
—“ দরকার হলে দিবো।”
—” ওমা…!”
হিয়া পাশে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে হাসলো। লিসি দুই হাত বুকের সামনে গুটিয়ে বললো — “ আগে বলেন, আমাদের মূল্য কত? ”
কিরিস একপাশে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো
— “তোমাদের? অত বেশি না।”
চারপাশে “উউউউ!” শব্দ উঠলো লিসি চোখ সরু করলো।
—“ তাই নাকি?”
—“ হুম। ”
—“ তাহলে আমরা যাচ্ছি। গেট বন্ধ। ”
সে ঘুরে যাওয়ার ভান করতেই কিরিস ধীরে তার শাড়ির আঁচল ধরে ফেললো। পুরো গেটের সামনে সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার পড়ে গেল।
— “ওহহহহহ!”
লিসি দ্রুত নিচু গলায় বললো —“ সবাই দেখছে!”
কিরিস নির্বিকার — ” দেখতে দাও।”
তারপর একটু ঝুঁকে খুব নিচু স্বরে বললো
—“ তুমি সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে এই সব আমার চোখে পড়ে না ”
লিসির গাল মুহূর্তে লাল হয়ে গেল। জারা সরাসরি মাথায় হাত দিল —“ এরা বিয়ের গেটে রোমান্স করতেছে! ”
ইয়াবি নাটকীয়ভাবে কাবিরের কাঁধে মাথা রেখে বললো
—“ ভাই… আমরা সিঙ্গেল মানুষ। আমাদের সামনে এসব না করলেই না? ”
সবার হাসাহাসি আর খুনসুটির মধ্যে লিসি শাড়ির আঁচল সামান্য টেনে নিজের দিকে আনল। তারপর গভীর, অদ্ভুত স্থির এক দৃষ্টিতে কিরিসের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল — “নারীকে আবিষ্ট করতে আপনি নিঃসন্দেহে পারঙ্গম, মশাই। তবে সাবধান, অতিমাত্রায় মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করবেন না। কারণ নারী যদি সত্যিই ভালোবাসতে জানে, তবে ধ্বংস করতেও জানে।”
চারপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
কিরিসের অধরে ধীর এক হাসি ফুটে উঠল। সে এক পা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল
— “নারীকে ধ্বংসের প্রতিমা বলা হয়, লিসি। কারণ স্রষ্টা তাকে এমন এক শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যার সামনে পুরুষের সমস্ত অহংকার একদিন নতিস্বীকার করে।”
তার দৃষ্টি আরও গভীর হলো।
— “আর যদি তুমি সেই ধ্বংসের দূত হও, তবে জেনে রেখো— তোমার হাতে বিনষ্ট হওয়ার সৌভাগ্যও আমি সানন্দে গ্রহণ করব।”
লিসির চোখের পাতা কেঁপে উঠল তারপরে কন্ঠ অটুট রেখেই বলে — “সৌভাগ্য বলছেন? ধ্বংসের পরিণতি কিন্তু বড় নির্মম।”
কিরিস স্থির হয়ে শান্ত ভাবে বলে— “নির্মমতা ভয় পায় তারা, যাদের হারাবার কিছু থাকে। আমি তো বহু আগেই নিজের সমস্ত স্থিরতা তোমার কাছে সমর্পণ করেছি।”
লিসির নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো।
— “তাহলে একদিন যদি আপনার সমস্ত সাম্রাজ্য, সমস্ত অহংকার, সমস্ত শক্তি আমার কারণেই ভস্ম হয়ে যায়?”
কিরিসের চোখে তখন অদ্ভুত এক দীপ্তি।
— “সাম্রাজ্য পুনর্গঠন করা যায়, ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা যায়, সম্পদ আবার অর্জন করা যায়। কিন্তু যে নারী হৃদয়ের শূন্যতম স্থানে আসন গ্রহণ করে, তার বিকল্প সৃষ্টি করার ক্ষমতা স্রষ্টাও দ্বিতীয়বার প্রয়োগ করেন না।”
নিস্তব্ধতা এমন নিস্তব্ধতা, যেখানে বাতাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়। লিসি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে বলল — “তবে ভয় হয়, মশাই। এত গভীর অনুরাগের পরিণতি অধিকাংশ সময় সুখে শেষ হয় না।”
কিরিসের কণ্ঠ এবার আশ্চর্যরকম কোমল হয়ে উঠল।
— “যে প্রেম পরিণতির হিসাব রাখে, তা অনুরাগ হতে পারে; কিন্তু প্রেম নয়। প্রেম তো সেই অগ্নিশিখা, যা জেনেও জ্বালায়— তবু মানুষ তার দিকেই হাত বাড়ায়।”
কথা শেষ। আর কোনো শব্দ উচ্চারিত হলো না।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোও যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিল। আর কিরিস... সে শুধু তাকিয়ে রইল লিসির দিকে। যেন শত কোলাহলের মাঝেও পৃথিবীতে এই মুহূর্তে দেখার মতো একমাত্র দৃশ্য লিসি।
লিসি কিছুক্ষণ নীরবে তার দিকে চেয়ে রইল। তারপর অধরের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে মৃদুস্বরে বলল
— “তাহলে কি এটাই বলতে চাইছেন, আপনি? আমার ইচ্ছা হলে একদিন আপনাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিতে পারি?”
কিরিস এক মুহূর্তও দৃষ্টি সরাল না। তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন বহু প্রতীক্ষিত কোনো সত্য অবশেষে উচ্চারিত হয়েছে — “ধ্বংস?”
সে মৃদু হাসল উঠলো মারাত্মক তার এই মৃদু হাসি
— “তোমার জন্যই তো এতকাল প্রতীক্ষার প্রহর গুনেছি, লিসি। যে পুরুষ যুগের পর যুগ নিজের প্রিয়তমার আগমনের অপেক্ষা করে, সে তার হাতেই পরাজিত হতে শেখে।”
লিসির বুকের ভেতর অকারণে কেঁপে উঠল। কিরিস আবার বলল
— “আর শুনে রাখো, নিজের প্রিয়সীর হাতে বিনষ্ট হওয়ার মধ্যে যে মাধুর্য আছে, তা কোনো বিজয়ের উল্লাসেও নেই।”
তার দৃষ্টি আরও গভীর হলো।
— “আমার সমস্ত অহংকার, সমস্ত শক্তি, সমস্ত অর্জন এমনকি আমার সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার ইতিহাসও তোমার সম্মুখে সমর্পিত।”
এক মুহূর্ত থেমে সে নিচু স্বরে যোগ করল
— “তুমি চাইলে আমাকে ভেঙে দিতে পারো, লিসি। কারণ যে হৃদয় তোমার নামে নিজেকে উৎসর্গ করেছে, তার আর রক্ষা পাওয়ার কোনো বাসনা থাকে না।”
চারপাশে আবার নীরবতা নেমে এল। আর সেই নীরবতার মাঝেই কিরিসের শেষ কথাটি যেন দীর্ঘ প্রতিধ্বনির মতো ভেসে রইল — “আমার সমস্ত কিছু তোমার জন্য উপস্থিত; এখন ধ্বংস করবে, না আশ্রয় দেবে— সেই অধিকারও তোমার।”
দুজনের কথোপকথন থেমে গেল আর কোনো শব্দ উচ্চারিত হলো না। কেবল চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল তারা। সেই দৃষ্টির ভেতরে ছিল না কোনো লজ্জা, না কোনো দ্বিধা, না কোনো অস্থিরতা ছিল কেবল এক গভীর, অবিচল অনুরাগ; এমন এক অনুভূতি, যা ভাষার সীমা অতিক্রম করে আত্মার গভীরে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
লিসির বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন জাগছিল।
কিরিসের চোখ দুটো যেন তাকে দেখছিল না, তাকে অনুভব করছিল। যেন বহু বছরের প্রতীক্ষা, অসংখ্য নীরব রাত্রি, অগণিত অব্যক্ত অনুভূতি এসে স্থির হয়েছে সেই এক দৃষ্টিতে।
হঠাৎ—
— “আরে ভাই! গেট ধরতে এসে কি কাব্যসভা খুলে বসেছিস নাকি?”
রিহানের উচ্চস্বরে চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।
নুসরাত সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল—
— “আমরা তো ভেবেছিলাম টাকা-পয়সার দরকষাকষি হবে। এখানে দেখি কবিতা, দর্শন আর হৃদয়ের বিচারসভা চলছে!”

ইশান নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল
— “এই জন্যই বলি, অতিরিক্ত প্রেম জাতীয় সম্পদের জন্য ক্ষতিকর। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষকে কাঁদিয়ে ছাড়বে নাকি?”
রিহান হেসে বলল
— “গেটের টোল দিতে এসে দেখি প্রেমের মহাকাব্যের প্রথম খণ্ড পাঠ হচ্ছে!”
ইয়াবি মাথা নেড়ে গম্ভীর মুখে যোগ করল
— “আমি নিশ্চিত, আর পাঁচ মিনিট সময় দিলে ভাইয়া বোধহয় ‘অনুরাগতত্ত্ব ও আত্মসমর্পণের দর্শন’ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বক্তৃতা শুরু করত!”
চারপাশে আবারও হাসির ঝড় উঠল। লিসির অধরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও এক টুকরো মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু কিরিস... সে হাসল না। তার দৃষ্টি তখনও লিসির মুখেই নিবদ্ধ। যেন চারপাশের সমস্ত কোলাহল, সমস্ত উল্লাস, সমস্ত রসিকতা তার শ্রবণের বাইরে। কারণ কয়েক মুহূর্ত আগেই যে কথাগুলো সে উচ্চারণ করেছে, সেগুলো কোনো রসিকতা ছিল না, কোনো ক্ষণিক আবেগও ছিল না। সেগুলো ছিল তার জীবনের নগ্নতম সত্য। তার দৃষ্টিতে স্পষ্ট ছিল এক ভয়ংকর নিশ্চয়তা
যে পুরুষ পৃথিবীর কাছে অপরাজেয়, সে নিজের সমস্ত শক্তি, সমস্ত অহংকার, সমস্ত অর্জন স্বেচ্ছায় সমর্পণ করেছে এই এক নারীর হাতে। আর যদি কোনোদিন ধ্বংস নেমেও আসে তবে সেই ধ্বংসের অধিকারও সে অন্য কারও নয়, কেবল লিসির হাতেই দেখতে চায়। সেই কারণেই কিরিসের চোখে কোনো ভয় ছিল না। ছিল কেবল গভীর প্রশান্তি। যেন দীর্ঘ যাত্রার শেষে একজন যোদ্ধা অবশেষে তার গন্তব্য খুঁজে পেয়েছে। চারপাশে হাসাহাসির মধ্যে কিরিস এবার পকেট থেকে ফোন বের করলো একদম শান্তভাবে বললো —“ নম্বর দাও। ”
মেয়েরা প্রথমে ভাবলো দর কষাকষি হবে। কিন্তু তারপরও আরোবি কোমড়ে হাত দিয়ে নাম্বার বলতে থাকে পাশ থেকে সুরভী বলে —“ আরে আমরা কিন্তু ঠিক নাম্বার দিছি। টাকা না আসলে কিন্তু খবর আছে ভাইয়া। ”
লিজা —“ কি হবে আমার দুলাভাই এই বিয়ের গেট থেকেই বিদায় নেবে, আমার বোনের আর বিয়ে করা হচ্ছে না ”
কিন্তু পরের মুহূর্তেই টিং!
আরোবির ফোনে নোটিফিকেশন উঠলো। সে তাকিয়ে প্রথমে স্থির হয়ে গেল। তারপর চোখ বড় বড় করে চিৎকার দিল — এক লাখ!!!
পুরো গেটের সামনে মুহূর্তে বিস্ফোরণ।
— কীইইই?!
— এক লাখ টাকা?!
— ও মাই গড!
হিয়া তো প্রায় লাফিয়ে উঠলো। নুসরাত ফোন কেড়ে নিয়ে আবার চেক করলো সত্যিই। এক লাখ টাকা ট্রান্সফার হয়েছে। লিসি হা করে কিরিসের দিকে তাকিয়ে আছে,বিয়ে গেটে সে একলক্ষ টাকা খরচ করে ফেললো তাও আবার চোখের পলকে।
ইয়াবি নিচু গলায় বললো
— ” শেষ। এখন এরা আমাদের আত্মীয় না, মালিক।”
ইশান বুক চেপে বললো
— “ ভাই, এত সহজে টাকা দিলে আমাদের সম্মান কোথায় রইলো? ”
কিরিস নির্লিপ্তভাবে ফোন পকেটে রেখে বললো— ”তোদের সম্মান বাঁচাতে গেলে রাত হয়ে যেত। আর আমার ভালো লাগছে না ”
চারপাশে আবার হাসির রোল পড়ে গেল। আর লিসি? সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে কিরিসের দিকে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে। কারণ লোকটা টাকা দেয়নি শুধু…
সে হাসিমুখে তার খুশিটা কিনে নিয়েছে। কিরিস কাবিরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল—
—“ আমার ছোট ভাইয়ের জন্য তো কোটি টাকাও খরচ করতে পারি, সেখানে এটা কিছুই না।”
কথাটা শুনে আশেপাশে থাকা সবাই আবারও হইহই করে উঠল। কাবির নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে বলল
—”ভাইয়া, তোমার মতো ভাই সবাই পায় না। আমি আবেগে ভেসে যাচ্ছি!”
সঙ্গে সঙ্গে ইশান বলে উঠল — “আবেগে ভাসিস না, আগে টাকাগুলো ঠিকমতো গুনে রাখ। পরে যেন কম না হয়!”
সবাই হেসে উঠল এরপর কিরিস ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে লিসির দিকে তাকাল। তার সেই গভীর, স্থির দৃষ্টি কয়েক মুহূর্তের জন্য লিসিকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল। কিরিস বলল —”তো বউজান, এবার কি ভিতরে যেতে পারি?”
লিসির গাল হালকা লাল হয়ে উঠল চারপাশের কাজিনরা সঙ্গে সঙ্গে....
—“উহহহহহ!”
—“বউজান বলছে দেখ!”
—“এই যে, শুরু হয়ে গেছে!”
হিয়া আর জারা তো একদম লাফিয়ে উঠল।
লিসি লজ্জা পেয়ে বলল —“ ভিতরে যেতে চাইলে যান। এত নাটক করার কি আছে?”
কিরিস ভ্রু তুলে বলল —” আরে, একটা কথা তো এখনও বাকি আছে।”
—“ কি?”
—“ শরবত কিন্তু আমি তোমার হাত থেকেই খাবো।”
এইবার পুরো দল আবার চিৎকার করে উঠল।
—“ ওহহহহহ!”
—” সরাসরি ডিমান্ড!”
—“ ভাইয়া আজকে কোনো ছাড় দিচ্ছে না!”
লিসি অসহায়ের মতো সবার দিকে তাকিয়ে বলল
—“ তোমরা সবাই চুপ করবে? ”
কিন্তু তাতে উল্টো সবাই আরও বেশি হাসাহাসি শুরু করে দিল। মেয়েরা দ্রুত সুন্দর ট্রেতে করে শরবত নিয়ে এল।
যারা কিছুক্ষণ আগেও গেট আটকিয়ে দর কষাকষি করছিল, এখন তারাই একদম ভিআইপি আপ্যায়নে ব্যস্ত। একজন বলল —“ আসুন দুলাভাই, এইদিকে আসুন।”
আরেকজন বলল—
—“বসবেন নাকি একটু?”
ইশান ফিসফিস করে বলল—
—“দেখছিস? এক লাখ টাকার সম্মান!”
রিহান মাথা নেড়ে বলল—
—“ টাকার ম্যাজিক বলে একটা কথা আছে!”
আবারও হাসির রোল পড়ে গেল লিসি বাধ্য হয়ে ট্রে থেকে একটি গ্লাস তুলে কিরিসের দিকে বাড়িয়ে দিল। কিরিস গ্লাস নেওয়ার সময় ইচ্ছে করেই কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় ধরে লিসির আঙুল স্পর্শ করে রাখল লিসি সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল। কিরিসের ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সবকিছু ক্যামেরায় বন্দি করতে ব্যস্ত ফটোগ্রাফাররা। একদিকে ঢোলের শব্দ, অন্যদিকে চারপাশে রঙিন আলো আর হাসি-আনন্দে ভরে উঠেছে পুরো পরিবেশ গেটের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই ভেতর থেকে কয়েকজন বড়রা এগিয়ে এলেন।
—“ আচ্ছা আচ্ছা, এবার সবাইকে ভিতরে নিয়ে আসো।”
—“ বরপক্ষ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে।”
সঙ্গে সঙ্গে দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েরা ফুলের পাপড়ি ছিটাতে শুরু করল। ছেলেরা হৈচৈ করতে করতে সামনে এগোচ্ছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ লাইভ করছে, কেউ আবার কাবিরকে নিয়ে মজা করছে। কাবির হেঁটে যেতে যেতে বলল —“ আজকে আমি বর না, আজকে পুরো শো কিরিস ভাইয়ার!”
পাশ থেকে জারা বলে উঠল
—“ না না, আজকে শো কিরিস ভাইয়া আর লিসি !”
এই কথা শুনে সবাই আবার একসাথে হো হো করে হেসে উঠল। আর সেই হাসি-আনন্দ, খুনসুটি আর উৎসবের মধ্যেই বরপক্ষকে নিয়ে সবাই ধীরে ধীরে বিয়ের বাড়ির ভেতরের বিশাল সাজানো ভেন্যুর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।দূর থেকে সানাইয়ের সুর ভেসে এলো। তার সাথে মিলিয়ে বাজতে শুরু করলো—
“তেরে ঘর আয়া… মেঁ আয়া তুজকো লেনে…”
চারপাশে মুহূর্তে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হলো।
ঢোল, সানাই, আলো সবকিছু মিলে বিয়ের আসল রঙ ফুটে উঠলো। বরযাত্রীরা ধীরে ধীরে গেট পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে শুরু করলো কাবির এখন আর সেই নাটকীয় বর না এখন সে একজন বর, যার চারপাশে বন্ধুদের হাসি আর মেয়েদের মজা। মেয়েরা তাকে ঘিরে হালকা টানাটানি করছে।
—“ বর ভাই, এখানে বসুন!”
—“ না না, এখানে ফটো ভালো আসবে!”
— “আগে চা খাবেন নাকি মিষ্টি?”
এভাবে হাসির মাঝেই সবাই ভেতরের দিকে এগোতে লাগলো। লিসি তখন মেয়েদের সাথে ভিড়ের মাঝে ঢুকে গেছে।তার শাড়ি সামলাতে সামলাতে সে কিরিসের দিকে একবার তাকালো কিরিসও তাকালো। দুই চোখের মধ্যে এক মুহূর্তের নিঃশব্দ যোগাযোগ।যেখানে কোনো শব্দ লাগে না। শুধু বোঝাপড়া থাকে। ভেনুর ভিতরে বরকে নিয়ে গিয়ে বিশেষভাবে সাজানো আসনে বসানো হলো।
কাবিরকে তার নির্দিষ্ট জায়গায় বসানো হলো। আর ঠিক তার পাশেই খালি রাখা হলো আরেকটা জায়গা।
তার বউয়ের জন্য। লাল কাপড়ে সাজানো, ফুল দিয়ে ঘেরা সেই আসনটা যেন অপেক্ষা করছে। চারপাশে আবার হালকা শোরগোল, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, হাসি, গান
সবকিছু মিলিয়ে বিয়ের আসল জাঁকজমক শুরু হয়ে গেছে। বরপক্ষকে যথাযথ সম্মান আর আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে ভিতরে নিয়ে আসা হয়েছে। বিশাল হলজুড়ে রঙিন আলো ঝলমল করছে। একপাশে সুন্দর করে সাজানো স্টেজ, যেখানে আর কিছুক্ষণ পরেই কনে এসে বসবে। চারদিকে অতিথিদের কোলাহল, হাসাহাসি, গল্পগুজব সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা জমজমাট। বড়রা নিজেদের মধ্যে গল্পে ব্যস্ত। কেউ পুরনো দিনের স্মৃতি টানছে, কেউ বিয়ের আয়োজনের প্রশংসা করছে।
অন্যদিকে কাজিনদের দলও ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে।
জারা, হিয়া, নুসরাত, অন্য মেয়েরা নিজেদের আড্ডায় মশগুল। কাবিরকে ঘিরেও কয়েকজন বন্ধু আর আত্মীয় বসে মজা করছে। কিন্তু এত মানুষের ভিড়ের মাঝেও কিরিস যেন একটু আলাদা। একপাশে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি জায়গায় বসে আছে সে। মেরুন শার্টের হাতা সামান্য গুটানো, মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এখনও আগের মতোই আছে। তবে আজ তার মধ্যে একটা অস্বস্তি স্পষ্ট বিষক্রিয়ার ধাক্কা পুরোপুরি কাটেনি এখনও। বাইরে থেকে যতটা স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে, ভেতরে ভেতরে শরীরটা এখনও দুর্বল। সে ফোন বের করে স্ক্রিনে চোখ রাখল সঙ্গে সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে তূর্য আর আরিয়ানের কয়েকটা নতুন মেসেজ ভেসে উঠল। প্রথম মেসেজ—
তূর্যঃ ” ভাই, ক্ষমা করে দিস। কাবিরের বিয়েতে আসতে পারলাম না। কিন্তু আমি বাসায় বসে তিন প্লেট কাচ্চি খেয়ে তোমাদের জন্য দোয়া করেছি।”
তার নিচেই আরিয়ানের রিপ্লাই—
“ মিথ্যা কথা। তিন প্লেট না, পাঁচ প্লেট। আমি ভিডিও কলে দেখেছি।”
তূর্যঃ “চুপ কর! বন্ধু হিসেবে আমাকে সাপোর্ট দিবি, এক্সপোজ না!”
কিরিস এবার ওদের কথা মধ্যে টাইপ করে লেখে বলে —
“ তূর্য তুই তো এখন ইংল্যান্ডে। ওখানে বিরিয়ানির পেলি কোথায়, অবশ্য তুই যে খানে থাকিস ওখানে বিরিয়ানি পাওয়া যায় না। ”
তূর্য —“ লে হালুয়া। তুই তো পাকাল মাছ, কিন্তু বিশ্বাস কর আমি নিজে রান্না করে খাবো ”
আরিয়ানঃ “ কিরিস ভাই, এই লোকটার ওপর ভরসা কইরেন না। বিয়েতে আসার বদলে এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস করছে—'দুলাভাই, শরবতটা একটু দিবেন?”
তূর্যঃ “ আরিয়ান, তোর বিয়ে হলে আমি ডিজে ডেকে 'বেবি শার্ক' গান বাজাবো। ”
আরিয়ানঃ ” তুই বিয়ে পর্যন্ত বাঁচলে তো!”
কিরিসঃ “ আচ্ছা আরিয়ান তুই মিস্টার রবার্ট এর খুনের মামলাটার কেস ফাইল উঠাচ্ছিস নাকি টাইপিং করছিস ”
আরিয়ানঃ “ ওহ্ দোস্ত তুই কি অন্তর্যামী নাকি রে বাবা! সব জানিস কি করে? ”
তূর্যঃ“ এই ওই বোকাচো** কথা বাদ দে, আমরা কালকে মানে হ্যাঁ টুমরো আসবো বাড়িতে ওকে। ”
তূর্য আর আরিয়ানের মেসেজের থ্রেডটা যেন ধীরে ধীরে একেবারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল।
আরিয়ানঃ —"তুই কি তাহলে বালের রাজা! ওই কিরিস, আমিও আসবো। একটা সুন্দর মেয়ে দেখে দিস তো! শালা বয়স হয়ে যাচ্ছে, চুল পাকতে শুরু করছে, কিন্তু একটা বিয়ে করতে পারলাম না। অবশ্য গার্লফ্রেন্ডের অভাব নেই, তারপরও একটা সুন্দর বউ তো দরকার!"
তূর্যঃ —"আসলেই তুই মহা বোকাচো***। তোর না একটা মায়াবতী আছে? তারপরেও শালার গার্লফ্রেন্ডের ঠিক নেই। কয়টা আছে নিজেও জানে না।"
তারপর আরেকটা মেসেজ—
তূর্যঃ —"ওই দোস্ত, জানিস? ওর বেশিরভাগ কেসে খুনির বউ, ননদ, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যে সুন্দরী থাকে, তার সাথেই গিয়ে প্রেম জমায়!"
আরিয়ানঃ —"এটাকে বলে তদন্তের অংশ।"
তূর্যঃ —"তদন্ত না, তোরটা 'হৃদয় উদ্ধার অভিযান'।"
আরিয়ানঃ —"মানুষের কষ্টে পাশে দাঁড়াই।"
তূর্যঃ —"হ্যাঁ, বিশেষ করে যদি মানুষটা সুন্দরী মহিলা হয়।"
কিরিসের ঠোঁটের কোণে তখনই হাসির রেখা ফুটে উঠল।
কিন্তু ওরা থামার পাত্র নয়।
আরিয়ানঃ —"শুন, গতবার একটা আন্টি আমাকে বলছে, 'বাবা, তুমি খুব ভালো ছেলে।'"
তূর্যঃ —"তারপর?"
আরিয়ানঃ —"আমি বললাম, 'আপনার মেয়েও কি আপনার মতোই সুন্দর?'"
তূর্যঃ —"এরপর?"
আরিয়ানঃ —"এরপর আমাকে বাসা থেকে বের করে দিল।"
তূর্যঃ —"আলহামদুলিল্লাহ।"
আরেকটা মেসেজ ঢুকল।
তূর্যঃ —"কিরিস, তুই সাক্ষী। এই লোকটা একবার একটা মেয়েকে ইমপ্রেস করার জন্য বলেছিল—'তোমার চোখে আমি আমার ভবিষ্যৎ দেখতে পাই।'"
আরিয়ানঃ —"রোমান্টিক লাইন ছিল।"
তূর্যঃ —"মেয়েটা উত্তর দিয়েছিল—'চোখের ডাক্তার দেখান।'"
কিরিস এবার নিচু হয়ে কপালে হাত দিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করল মেসেজ আসতেই থাকল।
আরিয়ানঃ —"ওই কিরিস, তোর বিয়েতে আমি বেস্ট ম্যান হবো।"
তূর্যঃ —"তুই হলে বিয়ে ভেঙে যাবে।"
আরিয়ানঃ —"কেন?"
তূর্যঃ —"কারণ তুই স্টেজে উঠে বলবি—'কনে পক্ষের কেউ কি সিঙ্গেল আছেন?'"
আরিয়ানঃ —"ভালো আইডিয়া দিলি তো!"
তূর্যঃ —"হে আল্লাহ..."
তারপর কয়েক সেকেন্ডের বিরতি হঠাৎ আবার মেসেজ।
আরিয়ানঃ —"শুন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
তূর্যঃ —"কি?"
আরিয়ানঃ —"এখন থেকে আমি সিরিয়াস।"
তূর্যঃ —"এই মেসেজের স্ক্রিনশট নিয়ে রাখলাম।"
আরিয়ানঃ —"কেন?"
তূর্যঃ —"যেদিন আবার নতুন গার্লফ্রেন্ডের ছবি দিবি, সেদিন প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করব।"
আরিয়ানঃ —"বন্ধু না, শত্রু।"
তূর্যঃ —"সত্যিকারের বন্ধু।"
আরিয়ানঃ —"কিরিস, তুই বিচার কর।"
তূর্যঃ —"কিরিস এখন কফি খাচ্ছে। আমাদের মতো বেকারদের বিচার করার সময় তার নেই।"
আরিয়ানঃ —"ওই কফিটাও নিশ্চিত কেউ বিশেষ একজন বানিয়ে দিয়েছে।"
তূর্যঃ —"হুম।"
আরিয়ানঃ —"হুমমম।"
তূর্যঃ —"হুমমমমম।"
আরিয়ানঃ —"হুমমমমমমমম।"
তারপর শেষ মেসেজ
তূর্যঃ —"কিরিস অনলাইন আছে কিন্তু রিপ্লাই দিচ্ছে না।"
আরিয়ানঃ —"মানে হাসছে।"
তূর্যঃ —"মানে ধরা খেয়েছে।"
আরিয়ানঃ —"মানে আমরা ঠিক জায়গায় আঘাত করেছি।"
ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কিরিস মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হঠাৎ তূর্য আবার গ্রুপের নাম চেঞ্জ করে ফেলেছে কখনো তূর্য তো কখনো আরিয়ান গ্রুপের নাম চেঞ্জ করতেই থাকে আজকের টা একটু ইউনিক।
WhatsApp Group :★ Psycho King & His Two Problems★
আর গ্রুপের ডিসপ্লে ছবিতে দেওয়া তিনজনের একটা পুরনো ছবি। তূর্য আবার মেসেজ দিয়ে এটা পাঠায়
— ” ☠️ Psycho | 🤪 Trico | ❤️ Lovaco”
তারপর ব্যাখ্যা দেচ্ছে সে
তূর্যঃ —"দেখ, কিরিস হলো Psycho। মাথা ঠান্ডা রেখে ভয়ংকর কাজ করে।"
আরিয়ানঃ —"ঠিক আছে। তারপর?"
তূর্যঃ —"আমি Trico। কারণ আমার মাথায় একসাথে তিনশো চিন্তা ঘুরে।"
আরিয়ানঃ —"আর আমি?"
তূর্যঃ —"তুই Lovaco।"
আরিয়ানঃ —"এটা আবার কী?"
তূর্যঃ —"Love + Pagol = Lovaco."
আরিয়ানঃ —"আমি প্রতিবাদ জানালাম "
তূর্যঃ —"প্রতিবাদ গ্রহণ করা হলো না।"
কিরিসঃ —"..."
আরিয়ানঃ —"দেখ! কিরিসও কিছু বলছে না। মানে সে আমার পক্ষেই আছে।"
তূর্যঃ —"না। ও ভাবছে তোকে গ্রুপ থেকে বের করবে কি না।"
আরিয়ানঃ— " আহ আমি হলাম নাম করা বিখ্যাত লইয়ার, আমি এমন কোন কেস নেই যে আমি সল্ভ করতে পারিনা। আর এখন শালা আমার কেসই কেউ নিতে চাচ্ছে না। "
এরপর গ্রুপে প্রায় পাঁচ মিনিট শুধু তূর্য শুশুধু 😂😂😂😂😂 রিঅ্যাকশন দেছে ।
তারপর অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। দূর থেকে দেখলে মনে হতো সে যেন শুধু মেসেজ পড়ছে। কিন্তু যারা তাকে ভালো করে চেনে, তারা জানত। তূর্য আর আরিয়ান যখন একসাথে শুরু করে, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে গম্ভীর মানুষটাকেও হাসিয়ে ছাড়তে পারে। ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন রিহান এসে হাজির।
—"এই এই এই!"
তার পেছনেই ইশান।
—"দাঁড়া দাঁড়া! কিরিস হাসছে!"
ইয়াবি অবাক হয়ে বলল
—"না না, আমি বিশ্বাস করি না। কিরিস হাসছে মানে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে।"
তিনজন একসাথে কিরিসের পাশে বসে পড়ল। রিহান সন্দেহের চোখে ফোনের দিকে তাকাল।
—"কি দেখছেন?"
কিরিস ফোন সরিয়ে বলল—
—"তোমাদের কাজ নেই?"
—"নেই।"
—"একদমই নেই।"
—"আজকে আমরা বেকার।"
তিনজন একসাথে উত্তর দিল। কিরিস বিরক্ত মুখে মাথা নাড়ল।পরের মুহূর্তেই ইশান বিদ্যুতের গতিতে ফোনটা কেড়ে নিল।
—"ধর!"
—"দৌড়!"
রিহান আর ইয়াবি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দৌড় দিল।
—"আগে আমি দেখব!"
—"না, আগে আমি!"
—"ফোনটা এদিকে দে!"
দূর থেকে তাদের এই কাণ্ড দেখে আশেপাশের সবাই হাসতে শুরু করল। কিরিস কয়েক সেকেন্ড তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে বিরক্তির ভাব আনার চেষ্টা করলেও চোখের কোণে ক্ষীণ হাসি লুকিয়ে রইল। তবু সেই অস্বস্তিটা পুরোপুরি যাচ্ছে না হালকা মাথা ঝিমঝিম করছে। কপালের পাশে একটা চাপা ব্যথাও অনুভব করছে। সে ধীরে ধীরে পিঠ ঠেকিয়ে বসল চারপাশের কোলাহল যেন কিছুটা দূর থেকে ভেসে আসছে।
এমন সময় অন্যপ্রান্তে বসে থাকা লিসির দৃষ্টি আবারও তার দিকে গিয়ে থামল। চারপাশে মেয়েদের হাসাহাসি, গল্প, খুনসুটি চলছেই। জারা কিছু বলছে, হিয়া হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। লিসিও মাঝেমধ্যে তাদের কথায় হাসছে।
কিন্তু তার চোখ বারবার কিরিসের দিকেই চলে যাচ্ছে।
অনেক মানুষের ভিড়ের মাঝেও সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে—
কিরিস ঠিক স্বাভাবিক নেই তার মুখের রং আগের মতো নেই। চোখের নিচেও ক্লান্তির ছাপ। আর সবচেয়ে বড় কথা কিরিস যতই লুকানোর চেষ্টা করুক, লিসি বুঝতে পারছে সে অস্বস্তিতে আছে। মেয়েদের গল্পের মাঝেও লিসির মনটা অজান্তেই ওদিকেই পড়ে রইল।
একবার, দুবার, তিনবার...
প্রতিবারই তাকিয়ে দেখছে কিরিস একইভাবে বসে আছে মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করছে। আবার খুলছে আর তখনই লিসির বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা জমতে লাগল। চারপাশে বিয়ের আনন্দ, আলো, হাসি, উচ্ছ্বাস
কিন্তু তার মন যেন বারবার একজন মানুষের কাছেই গিয়ে আটকে যাচ্ছে।
চারদিকে এখনো হাসির শব্দ, গল্পের ঝাঁপি, চায়ের কাপে ধোঁয়া, বাচ্চাদের ছোটাছুটি সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত আনন্দমেলা। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝেও কিরিসের চারপাশে যেন এক অদৃশ্য নিস্তব্ধতার বলয় তৈরি হয়ে আছে। সে একইভাবে বসে আছে একপাশে। চারপাশে কয়েকজন চেনা জানা বড়রা বা ছোটরা ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করছে, সে সবটা ঠিক রেখেই উত্তর দিচ্ছে।মুখে কোনো অস্বস্তি নেই। কিন্তু মুখে প্রশান্তির আভাস থাকলেও শরীরের ক্লান্তি আর অস্বস্তি পুরোপুরি গোপন করতে পারছে না। হঠাৎ সে চোখ তুলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইশানকে দেখল। গম্ভীর কণ্ঠে ডাকল
—"ইশান।"
ইশান সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল —"জি, ভাইয়া?"
কিরিস সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল —"এদিকে আয়।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই ইশান এসে পাশে বসল কিরিস নিচু স্বরে বলল—
—"শরীরটা এখনও কেমন যেন লাগছে।"
ইশানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ কিরিসকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করল। তারপর পকেট থেকে একটি ছোট ওষুধের পাতা বের করে বলল—
—"চিন্তা করিস না, ব্রো। এটা খা। তারপর সুযোগ পেলে আধঘণ্টা চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিবি। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
কিরিস কিছু বলল না শুধু ওষুধটা নিয়ে খেয়ে নিল।
ইশান সন্তুষ্ট মুখে মাথা নাড়ল।
—"এইবার আমি গেলাম ।"
দূর থেকে রিহান চিৎকার করে উঠল
—"এই ইশান! আয় আয়! ইয়াবি আবার ফোন নিয়ে পালিয়েছে!"
—"আসছি!"
বলেই ইশান উঠে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ পর তিনজনের হৈচৈ আবার উঠানের অন্যপ্রান্তে মিলিয়ে গেল।তাদের হাসাহাসি, তর্ক, অকারণ চিৎকার এসব যেন কখনও শেষ হওয়ার নয়। কিরিস অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে মাথা ঘুরিয়ে সামনে তাকাতেই সে থমকে গেল। মানুষের ভিড়ের মাঝখান দিয়ে কেউ একজন এগিয়ে আসছে। অত্যন্ত ধীর পদক্ষেপে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। কিন্তু তার উপস্থিতি আশেপাশের সমস্ত কোলাহলকে যেন ম্লান করে দিচ্ছে।... লিসি মেরুন রঙের শাড়িটি আলোয় আরও কোমল দেখাচ্ছে। তার দীর্ঘ কৃষ্ণবর্ণ কেশরাশি পিঠ বেয়ে প্রায় কোমরের নিচ পর্যন্ত নেমে এসেছে। চারপাশের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাতাসের মৃদু প্রবাহে সেই চুলগুলো বারবার দুলে উঠছে যেন কোনো শান্ত নদীর বুকে অকারণ জেগে ওঠা ঢেউ। উঠানের বিভিন্ন প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেরই দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার দিকে চলে যাচ্ছে। কারও চোখে বিস্ময় কারও চোখে মুগ্ধতা।
কারও চোখে নিছক প্রশংসা। কিন্তু লিসি সেসবের কিছুই লক্ষ্য করল না। সে সোজা এসে কিরিসের সামনে দাঁড়াল।
কিরিস ধীরে মাথা তুলে তাকাল। দুজনের দৃষ্টি কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল। লিসি প্রথমে কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর শান্ত স্বরে বলল
—"এখন কেমন আছেন?"
কিরিস স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলল
—"ভালো।"
—"মিথ্যা বলছেন।"
—"কেন?"
—"কারণ আপনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।"
কিরিসের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
—"তুমি এখন ডাক্তারও হয়ে গেছ?"
—"না।"
লিসি মাথা নেড়ে বলল
—"তবে কিছু মানুষকে বুঝতে ডিগ্রি লাগে না।"
কথাটা শুনে কিরিস কয়েক মুহূর্ত নীরব হয়ে গেল।
তারপর ধীরে বলল —"আমার কিছু হয়নি।"
লিসি সন্দেহভরা চোখে তাকাল।
—"হুম। আপনার কিছু হয় না। পৃথিবীর সবার সবকিছুর হয়, শুধু আপনার হয় না।"
কিরিস এবার সত্যিই মৃদু হেসে ফেলল। সেই হাসি খুব ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তবুও ছিল। লিসি কিছুক্ষণ তাকে পর্যবেক্ষণ করে বলল —"কফি খাবেন?"
কিরিস ভ্রু তুলল।
—"কফি?"
—"হ্যাঁ।"
—"এখানে কোথায় পাবে?"
—"পাওয়া যাবে।"
—"আর আমি যেখানে-সেখানে যা-তা খাই না।"
লিসির চোখ গোল হয়ে গেল তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—"ওহ! এত খুঁতখুঁতে কেন আপনি ?"
—" জানি না, সব খাবারের টেস্ট আমার সহ্য হয়।"
—" এতো বেচে খেয়ে বাঁচেন কী করে আপনি?"
কিরিস এবার সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকাল।
লিসি থামল না।
—"সারাক্ষণ বেছে বেছে খাওয়া, বেছে বেছে থাকা, বেছে বেছে সবকিছু করা..."
তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
—"বড় কষ্টের জীবন।"
কিরিসের চোখে এবার স্পষ্ট হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল।
—"তোমার বক্তব্য শেষ?"
—"না।"
—"তাহলে চালিয়ে যাও।"
—"শুনতে ভালো লাগছে বুঝি?"
—"মন্দ না।"
লিসি হালকা বিরক্তির ভান করে বলল—
—"আচ্ছা, এত কথা বাদ দিন। খাবেন কি না বলেন।"
কিরিস কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
অদ্ভুত এক কোমলতা ধীরে ধীরে তার দৃষ্টিতে নেমে এলো তারপর মৃদু স্বরে বলল
—"যদি তোমার বানানো হয়... তাহলে খেতে পারি।"
লিসির চোখে বিজয়ের ঝিলিক দেখা দিল।
—"এই তো! মানুষ হওয়া শুরু করেছেন।"
—"অতিরিক্ত খুশি হওয়ার কিছু নেই।"
—"আছে।"
—"কেন?"
—"কারণ আজ আমি একটা অসম্ভব কাজ করতে পেরেছি।"
—"কি কাজ?"
—"কিরিস রায় চৌধুরীকে রাজি করানো।"
এই বলে সে নিজেই হেসে ফেলল তারপর ঘুরে দাঁড়াল।
আর কিরিসের দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার পিছু নিল।
লিসি দূরে সরে যেতে লাগল। তার দীর্ঘ কেশরাশি বাতাসে দুলে দুলে পিঠের উপর ছড়িয়ে পড়ছে। মৃদু শীতল বাতাসের ছোঁয়ায় সেগুলো কখনও ডানদিকে, কখনও বাঁদিকে ভেসে উঠছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন গোধূলির আলোয় কোনো কৃষ্ণবর্ণ নদী নিজের বুকে নীরব ঢেউ তুলছে। কিরিস নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
অস্বস্তি, ক্লান্তি, শরীরের অবসাদ সবকিছুর মাঝেও তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠল। সম্ভবত ওষুধ কাজ করা শুরু করেছে। অথবা ওষুধের চেয়েও কার্যকর কোনো উপস্থিতি এইমাত্র তার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। লিসি যখন কিরিসের কাছ থেকে সরে এলো, তখনও তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির আভা লেগে ছিল।
বিয়ের ভেন্যুটি তখন আলোর ঝলকানিতে এক স্বপ্নপুরীর রূপ নিয়েছে। বিশাল হলরুমের ছাদজুড়ে ঝুলছে ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি, চারদিকে তাজা ফুলের সাজসজ্জা, আর নরম সুরে বাজতে থাকা সংগীত পুরো পরিবেশকে আরও মোহময় করে তুলেছে। লাল-মেরুন রঙের শাড়িতে লিসিকে আজ যেন অপরূপ লাগছে।
তার দীর্ঘ কৃষ্ণকেশ পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে ঢেউখেলানো অন্ধকারের মতো। অন্যদিকে মেরুন রঙের শার্টের ওপর কালো কোট পরে বসে আছে কিরিস। তার ব্যক্তিত্ব এমনিতেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কিন্তু আজ যেন সেই উপস্থিতি আরও গভীর, আরও তীক্ষ্ণ।
লিসি ধীরে ধীরে ভিড় এড়িয়ে ভেন্যুর ভেতরের অংশে চলে গেল। সোজা গিয়ে দাঁড়াল কাবেনার সামনে। তিশার আম্মু তখন কয়েকজন অতিথির সঙ্গে কথা বলছিলেন।
লিসিকে দেখেই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
—"আরে আমার সোনা!"
তিনি হাত বাড়িয়ে লিসিকে কাছে টেনে নিলেন।
—"বাহ! কত সুন্দর লাগছে তোকে!"
মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে আবার বললেন—"আমি তোকে দেখতে আসতেই পারলাম না রে ।"
তারপর মুচকি হেসে বললেন—
—"রায় চৌধুরী বাড়ির বড় বউমা হয়ে গেছিস, এখন তোকে দেখাই দায়।"
লিসির গাল হালকা লাল হয়ে উঠল।
—"খালামণি..."
—"আচ্ছা আচ্ছা, লজ্জা পাচ্ছিস কেন? আমি তো একই সঙ্গে এখন তোর খালামনি এবং ফুফু শাশুড়ী "
লিসি হেসে উঠলো নিজেদের মধ্যে বিয়ে হলে যা হয়। নিজের লোক আবার নিজের হয়ে যায় অন্য রকমভাবে। কিছুক্ষণ পর লিসি একটু ইতস্তত করে বলল
—"খালামণি, এখানে কোথাও কিচেন আছে?"
কাবেনা ভ্রু তুললেন।
—"কিচেন?"
—"হ্যাঁ... মানে একটু নিরিবিলি জায়গা হলে ভালো হয়।"
—"কেন?"
লিসি এক মুহূর্ত থেমে বলল —"একটু কফি বানাতাম।"
কাবেনার মুখে তখনই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
তিনি এমনভাবে মাথা নেড়ে বললেন যেন সব বুঝে গেছেন।
—"আচ্ছা আচ্ছা... আমি বুঝতে পেরেছি।"
লিসি অবাক হয়ে তাকাল।
—"কি বুঝলেন?"
—"কার জন্য কফি বানাবি সেটা।"
লিসি কিছু বলার আগেই কাবেনা হেসে উঠলেন।
—"ছেলেটা আমাদের খুব খুঁতখুঁতে।"
—"খুবই।"
—"আমি জানি।"
তারপর চারদিকে তাকিয়ে ডাক দিলেন—
—"লিজা!"
কিছুক্ষণ পর লিজা দ্রুত এগিয়ে এলো।
—"জি, আম্মু ?"
—"লিসিকে দোতলার কিচেনে নিয়ে যা।"
লিজা সঙ্গে সঙ্গে বলল
—"আরে, এতটুকু ব্যাপার! আমাকে আগে বললেই হতো।"
তারপর লিসির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
—"চলুন ভাবি, আমি নিয়ে যাচ্ছি।"
লিসি মাথা নেড়ে তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। ভেন্যুর দোতলার অংশটা তুলনামূলক নিরিবিলি। নিচের কোলাহল এখানে অনেকটাই মৃদু হয়ে এসেছে।
কিচেনে ঢুকেই লিসি ব্যাগ খুলল। লিজা কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে ছিল। পরের মুহূর্তে ব্যাগের ভেতর থেকে একটি পরিচিত ব্র্যান্ডের পানামা গেইশা কফি ছোট কৌটা বের হতে দেখে তার চোখ বড় হয়ে গেল।
—" এটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস?"
লিসি মৃদু হেসে বলল
—"হ্যাঁ। আরেকটা balck lvory ও আছে কিন্তু ওটা এখন দিবো না, ওনি তো কাজ করছেন না। "
—"আগেই প্ল্যান করে রেখেছিলেন নাকি?"
—"হতে পারে।"
লিজা হেসে মাথা নাড়ল। লিসি ধীরে ধীরে কফি তৈরি করতে শুরু করল। গরম পানির ওপর কফির গুঁড়া পড়তেই এক তীব্র, সমৃদ্ধ সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
সেই ঘ্রাণে যেন ক্লান্ত মনও সতেজ হয়ে ওঠে।