পর্ব :83
সেই ঘ্রাণে যেন ক্লান্ত মনও সতেজ হয়ে ওঠে।
সে খুব যত্ন করে অনুপাত মেপে কফি বানাল চিনি ঠিক যতটুকু কিরিস পছন্দ করে দুধ ঠিক যতটুকু প্রয়োজন।
অতিরিক্ত কিছু নয়। কমও নয়। সবশেষে একটি সুন্দর কাপের মধ্যে কফি ঢেলে ট্রেতে রাখল। কফির কাপটাও সে ব্যাগে করে এনেছে। কফির উপরিভাগে ধোঁয়া পাক খেতে খেতে উঠছে। সুগন্ধ এতটাই তীব্র যে কয়েক ফুট দূর থেকেও অনুভব করা যায়। লিজা তাকিয়ে বলল
—"এই কফি খেয়ে কেউ প্রেমে পড়ে গেলে কিন্তু আমি দায়ী না।"
লিসি হেসে ফেলল তারপর অত্যন্ত সাবধানে ট্রে হাতে নিচে নামতে শুরু করল ভেন্যুর ভেতর তখন আরও লোক বেড়েছে। তাই ধীরে ধীরে হাঁটছে সে কফির এক ফোঁটাও যেন না পড়ে। অবশেষে সে কিরিসের সামনে এসে দাঁড়াল কিরিস তখন ফোনে কিছু দেখছিল। লিসির উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুলতেই তার সামনে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ।
সে কয়েক সেকেন্ড কাপটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লিসির দিকে।
—"তুমি সত্যিই বানিয়ে এনেছ?"
—"না, দোকান থেকে কিনে এনেছি।"
কিরিস ভ্রু তুলল লিসির মুখে দুষ্টু হাসি। কিরিস কাপ হাতে নিয়ে ধীরে বলল
—"কীভাবে বানালে?"
—"কফি যেমন বানায়।"
—"বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলে নাকি?"
এইবার লিসি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
—"তা কী করব বলুন?"
—"মানে?"
—"আপনি তো চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত বারো ঘণ্টা কফি খান।"
কিরিসের চোখে হালকা হাসি ফুটল।
—"অতিরঞ্জন করছ।"
—"একদম না।"
—"করছ।"
—"আপনি না থাকলে আপনার কফির কাপগুলো সাক্ষী দিত।"
কিরিস এবার আর কিছু বলল না শুধু কফির কাপে চুমুক দিল। এক মুহূর্ত.... দুই মুহূর্ত... তারপর চোখের কোণে অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এলো। এটা তার পছন্দের স্বাদ।
ঠিক যেমনটা সে চায়। না কম, না বেশি। লিসি সেটা লক্ষ্য করল। তার ঠোঁটের কোণে সন্তুষ্টির ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
—"আচ্ছা, আমি যাই।"
কিরিস কাপ হাতে রেখেই বলল
—"হুম।"
লিসি আর কিছু না বলে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
আর কিরিস ধীরে ধীরে কফিতে আরেকটি চুমুক দিল।
চারপাশে শত মানুষের কোলাহল, হাসি, আলো আর উৎসবের উচ্ছ্বাস।তবু সেই মুহূর্তে তার হাতে ধরা কফির কাপটা যেন শুধু কফি ছিল না কারও নীরব যত্নের উষ্ণ প্রকাশও ছিল।
..........
কিরিস ধীরস্থির ভঙ্গিতে শেষ চুমুকটুকু কফির কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে নিল। তার মুখাবয়বে কোনো পরিবর্তন নেই, যেন চারপাশের সমস্ত কোলাহল, উচ্ছ্বাস কিংবা উৎসবের উন্মাদনা তার ব্যক্তিত্বের বিশাল প্রাচীরে এসে নীরবে থেমে যায়। অথচ রেনি জুড়ে তখন উৎসবের আবহ ক্রমশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে। আলোকসজ্জার ঝলকানিতে পুরো প্রাঙ্গণ যেন রূপকথার কোনো রাজপ্রাসাদে পরিণত হয়েছে। অতিথিদের কথোপকথন, হাসির রোল, শিশুদের ছোটাছুটি আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ সব মিলিয়ে এক অপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে চারদিক। এবার অনুষ্ঠানের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত পর্ব কনের আগমন। ডিজেরা ইতোমধ্যেই নিজেদের কনসোলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই সুরের ঝংকারে পুরো পরিবেশ কাঁপিয়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। সাউন্ড চেকের শেষ ধাপ সম্পন্ন হতেই বিশাল স্টেজের চারপাশে এক ধরনের প্রত্যাশার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
যেসব মেয়েরা বিগত কয়েক রাত ধরে নিরলসভাবে নাচের অনুশীলন করেছে, তারা নিজেদের পোশাক-পরিচ্ছদ আর সাজসজ্জা ঠিকঠাক করে ধীরে ধীরে স্টেজের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। জারা, নুসরাত, সুরভী, আরোবি, হিয়া, লিজা প্রত্যেকের চোখেমুখে আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি। ছেলেরাও কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। রিহান, ইয়াবি, ইশান তিনজনের মধ্যেই স্পষ্ট উত্তেজনা। বিশেষ করে বর নিজেই আজ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। বারবার কোটের কলার ঠিক করছে, বন্ধুদের সঙ্গে হাস্যরসে মেতে উঠছে, আবার মাঝেমধ্যে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে এমন ভঙ্গি দিচ্ছে যেন আজকের প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতির পাতায় অমর করে রাখতে চায়। ক্যামেরাম্যানদের অবস্থা আরও ব্যস্ত। কেউ লেন্স পরিবর্তন করছে, কেউ অ্যাঙ্গেল ঠিক করছে, কেউ আবার স্টেডিক্যাম কাঁধে নিয়ে সম্ভাব্য প্রতিটি দৃশ্য বন্দি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের চোখে স্পষ্ট এক ধরনের পেশাদার উত্তেজনা কারণ কয়েক মুহূর্ত পরেই শুরু হতে যাচ্ছে অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ। সামনের সারিতে বরযাত্রীদের জন্য নির্ধারিত আসনগুলোও প্রায় পূর্ণ। আনোয়ার সাহেব, আনারুল সাহেব, সাবেনা বেগম, মাবেনা বেগম এবং তাঁদের স্বামীরা পরিপাটি ভঙ্গিতে বসে আছেন। তাঁদের মুখে সন্তুষ্টির হাসি, চোখেমুখে আনন্দের ছাপ। সবাই ব্যস্ত, সবাই উচ্ছ্বসিত শুধু একজনের মন যেন এই আনন্দমেলার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
লিসি। সে নীরবে বসে আছে। বাহ্যিকভাবে শান্ত হলেও তার অন্তরের গভীরে যেন এক অদ্ভুত ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
চারপাশের হাসি, আনন্দ, উল্লাস কিছুই এই মুহূর্তে তার মন ছুঁতে পারছে না। তার দৃষ্টি একবার গিয়ে স্থির হলো কিরিসের উপর। আর সেই দৃষ্টি পড়তেই বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ যেন আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
মনে মনে সে কতশত কথা বলে ফেলল তাকে। কত অভিযোগ? কত অভিমান? কত না বলা কষ্ট?
তার আজও মনে আছে সেই দিনটি। যেদিন কোনো স্বপ্ন ছিল না, কোনো প্রস্তুতি ছিল না, কোনো সম্মতি ছিল না।
রাস্তার মাঝখান থেকে যেন ঝড়ের মতো এসে তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল কিরিস। চারপাশে অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষী। একের পর এক গাড়ি পুলিশের উপস্থিতি। আর সেই ভয়ঙ্কর, অদম্য মানুষটি—যার সিদ্ধান্তের সামনে কেউ দাঁড়াতে পারেনি। সেদিন তার পাশে ছিল না পরিবার ছিল না আপনজন। ছিল না কারোর স্নেহমাখা হাত কিংবা দাদির আশ্বস্ত করা কণ্ঠস্বর। সে ছিল সম্পূর্ণ একা।
অসহায়। আর সেই নিঃসঙ্গতার মধ্যেই কিরিস তাকে নিজের জীবনের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছিল। তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে কবুল বলিয়ে নিয়েছিলো। ভাবতেই আজও বুকের কোথাও একটা দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠে।
লিসি ঠোঁট কামড়ে আবারও কিরিসের দিকে তাকাল।
লোকটা নির্লিপ্ত মুখে বসে আছে। যেন পৃথিবীর কোনো বিষয়ই তাকে বিচলিত করতে পারে না। এই নির্লিপ্ততাই কখনো কখনো লিসির সবচেয়ে বেশি রাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মনে মনে সে ক্ষুব্ধ স্বরে বলল—
"অসভ্য মানুষ একটা... নিজের ইচ্ছেটাকেই সবকিছু মনে করে। পৃথিবীতে অন্য কারও মতামতেরও যে মূল্য আছে, সেটা কখনো বুঝবে না!"
তবু অদ্ভুত ব্যাপার যতবার সে কিরিসের উপর রাগ করে, ততবারই তার চোখ অনিচ্ছাসত্ত্বেও আবার সেই মানুষটার দিকেই ফিরে যায়। হয়তো রাগের কারণেই! হয়তো অভিমানের কারণেই! অথবা হয়তো এমন কোনো অদ্ভুত বন্ধনের কারণে, যার ব্যাখ্যা সে নিজেও এখনো খুঁজে পায়নি। এদিকে স্টেজের সামনে ভিড় আরও ঘন হয়ে উঠছে। সাউন্ড সিস্টেমে ধীরে ধীরে বেজে উঠছে প্রারম্ভিক সুর। সবাই বুঝতে পারছে আর মাত্র কয়েক মুহূর্ত। তারপরই শুরু হবে কনের আনুষ্ঠানিক আগমন।
আর লিসি জানে যতই অভিমান থাকুক, যতই নিজেকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করুক, শেষ পর্যন্ত তাকেও স্টেজে উঠতেই হবে।।কারণ আজকের রাত শুধু একটি অনুষ্ঠানের রাত নয় এটি এমন এক রাত, যার প্রতিটি মুহূর্ত আগামী বহু বছর ধরে স্মৃতির ভাঁজে অম্লান হয়ে থেকে যাবে। ভেন্যুর বিশাল অডিটোরিয়ামটি তখন আলো, সুর আর উচ্ছ্বাসে যেন এক স্বপ্নলোকের রূপ ধারণ করেছে। চারদিকে ঝলমলে আলোকসজ্জা, মাথার উপর ঝাড়বাতির দীপ্তি, আর তার মাঝখানে শত শত অতিথির উচ্ছ্বসিত উপস্থিতি—সব মিলিয়ে পরিবেশটিকে করে তুলেছে আরও জীবন্ত, আরও বর্ণময়। ডিজের সাউন্ড সিস্টেমে ভেসে উঠল জনপ্রিয় সেই সুর—
"Tere ghar aaya, main aaya tujhko lene...
Dil ke badle mein dil ka nazrana dene
Meri har dhadkan
Kya bole hai sun, sun, sun, sun
Saajan ji ghar aaye, saajan ji ghar aaye
Dulhan kyun sharmaye? Saajan ji ghar aaye "
গান শুরু হতেই যেন পুরো হলঘরের আবহ বদলে গেল।
স্টেজের দু'পাশ থেকে নৃত্যের তালে তালে এগিয়ে এলো কাজিনদের দল। জারা, নুসরাত, সুরভী, আরোবি, হিয়া, লিজা প্রত্যেকেই আজ যেন উৎসবের রঙে রাঙানো।
তাদের ঘূর্ণায়মান পদক্ষেপ, হাতের মুদ্রা আর মুখের প্রাণবন্ত অভিব্যক্তি মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
অন্যদিকে ছেলেরাও কম যায় না। ইশান, ইয়াবি, রিহান, আরও অনেকে নাচের ছন্দে যোগ দিল। তবে তাদের নাচের চেয়েও বেশি নজর কাড়ছিল মেয়েদের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া। কখনও প্রশংসাসূচক দৃষ্টি, কখনও মজার অঙ্গভঙ্গি, কখনও আবার ঠাট্টা-তামাশা।
মেয়েদের সঙ্গে ছেলেদের এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা যেন চলছিল। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার ভেতরেও ছিল বোঝাপড়া, বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার এক মধুর সমন্বয়।
ইশান তো সুযোগ পেলেই জারার দিকে তাকিয়ে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়ে দিচ্ছে। জারা চোখ কুঁচকে এমন ভঙ্গি করল যেন বিষয়টি তার একেবারেই পছন্দ হয়নি। তারপর আবার ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা হাসি সব গোপন ফাঁস করে দিল। চারপাশে উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠল। ইয়াবি তো পেট চেপে দাঁড়িয়ে আছে।
রিহান মাথা নেড়ে বলল
—"এদের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমাদের শান্তি নাই!"
আরও একদফা হাসির রোল উঠল চারদিকে। গানের সুর বদলে গেল চারপাশে চাঞ্চল্যপূর্ণ পরিবেশটা কেমন যেন একটা গান্ধীর্য ভাব ধারণ করল যেন এই মুহূর্তটাই এই সময় সবচেয়ে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় যেটা সবার নজর কাড়লো। গানের পরবর্তী কলি ভেসে এলো—
"Ae dil, chalega ab na koi bahana... Gori ko hoga ab saajan ke ghar jaana..."
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই হলঘরের প্রধান প্রবেশদ্বারের দিকে ঘুরে গেল সকলের দৃষ্টি। সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল ধীর পদক্ষেপে প্রবেশ করল কনে।
তিশা। রক্তিম লাল শাড়িতে মোড়ানো তার অবয়ব যেন কোনো রাজকন্যার। মাথার উপর দীর্ঘ ঘোমটা নেমে এসেছে। গলায়, হাতে, কানে, কপালে ঝলমল করছে মূল্যবান অলংকার। কোথাও খাঁটি সোনার দীপ্তি.. কোথাও হীরের নির্মল ঝলকানি.... আলোকরশ্মি পড়তেই গহনাগুলো এমনভাবে ঝিকমিক করে উঠছিল যেন রাতের আকাশ থেকে অসংখ্য নক্ষত্র নেমে এসেছে তার গায়ে। আজ তাকে দেখে সত্যিই মনে হচ্ছিল রায়চৌধুরী পরিবারের ছোট বউ। গানের তালে তালে হাত-পা সঙ্গে নাচের অঙ্গী ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিতে চাইল এখন আর তার মন কোন বায়না শুনতে রাজি নয় লাল টুকটুকে শাড়ি পরে সে বিয়ের বিয়েতে এসেছে তার প্রিয় মানুষটিকে নিজের করে নিতে। তাকে তার প্রিয়তম ঘরে যেতেই হবে তার এই হৃদয়ের হৃদপিণ্ড টাও বারণ করলে আজ বারণ শুনছে না তার সজাগ মস্তিষ্ক। কাজিনদের মাঝখানে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল সে আর সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা কাবির...
সে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।
তার দৃষ্টি সম্পূর্ণভাবে স্থির হয়ে গেল তিশার উপর।
বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন অদ্ভুতভাবে দ্রুত হয়ে উঠল।
এতদিনের অপেক্ষা এতদিনের ভালোবাসা এতদিনের স্বপ্ন। আজ বাস্তব হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
এক মুহূর্তে এমন অবস্থা হলো যে কাবিরের মনে হলো পা দুটো আর শরীরের ভার বহন করতে পারছে না। তার বুকের বা পাশে হাত দিয়ে অনবরত হওয়ার হৃদপিণ্ডটাকে থামানোর চেষ্টা করছে। বুকে হাত দিয়ে সে হালকা টলমল করে উঠতেই পাশ থেকে দ্রুত ইয়াবি ও ইশান তাকে ধরে ফেলল একদম সিনেমা দৃশ্য। ইয়াবি ফিসফিস করে বলল—
—" দুলাভাই, এখনই পড়ে গেলে বিয়ে বন্ধ হয়ে যাবে কিন্তু! তখন আর আমার বোনকে বিয়ে করতে হবে না! "
ইশান যোগ করল —"কনের আগে বরকে হাসপাতালে নিতে হবে তখন!"
চারপাশে আবারও হাসির রোল উঠল। তবে কাবিরের কানে যেন কিছুই পৌঁছাচ্ছিল না। তার সমস্ত জগৎ তখন তিশাকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ। তিশা কাছে আসতেই কাবির ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল তিশা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সেই হাতের উপর নিজের হাত রাখল। সেই স্পর্শে যেন দুই হৃদয়ের দূরত্ব মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। কাবির আলতো টানে তাকে নিজের কাছে নিয়ে এল। তারপর সবার সামনে অত্যন্ত স্নেহভরা ভঙ্গিতে তিশার কপালে একটি কোমল চুম্বন এঁকে দিল কোনো বাড়াবাড়ি নয় কোনো প্রদর্শন নয়। শুধু এক গভীর অধিকারবোধ।
এক নীরব প্রতিশ্রুতি—
"এবার তুমি আমার। শুধু আজকের জন্য নয়, গোটা জীবনের জন্য।"
কাবিরের চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল অশ্রুবিন্দু।
তিশা সেটা দেখেই মৃদু বিস্মিত হলো। কাবির তাকে তার স্বার্থ চওড়া বুকে জড়িয়ে ধরল গুটিশুটি হয়ে লাল টুকটুকে বউটা তার বুকে লুকিয়ে গেল। তিশা কাবিরের বুক থেকে হালকা সরে আসলো তার মুখ দেখা পর্যন্ত তারপর পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। কিন্তু হাত পড়তেই কাবিরের মুখ থেকে হালকা একটা উঃ শব্দ বেরিয়ে এল। রডের আঘাতের ব্যথা এখনও পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। ইয়াবি দ্রুত বলে উঠল
—"আরে আরে! মাথায় হাত দিচ্ছিস কেন? এত কষ্ট করে সেট করা চুল সব নষ্ট হয়ে যাবে!"
কথাটা শুনে তিশা ভেজা চোখেই হেসে ফেলল চারপাশেও হাসির ঢেউ বয়ে গেল। কাবির চোখ মুছে মৃদু হেসে বলল —"এই যে, কাঁদবি না কিন্তু। এত সুন্দর করে সেজেছিস, কান্না করলে মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে। আমার বউ কাঁদে না। "
তিশা ঠোঁট কামড়ে হাসল কাবির আবার বলল—
—"আমি ব্যাটা মানুষ। আমার তো কোনো মেকআপ নাই। আমি চাইলে কাঁদতেই পারি!"
এবার আর কেউ নিজের হাসি আটকে রাখতে পারল না।
কনের ভেজা চোখ। বিয়ের আবেগ বন্ধুদের খুনসুটি পরিবারের হাসি আর ভালোবাসার সেই নির্মল মুহূর্ত
সবকিছু মিলিয়ে ভেন্যুর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত উষ্ণতা। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটুকু যেন সময়ের বুকে চিরকালের জন্য স্থির হয়ে থাকুক। স্টেজের আলো তখনও ঝলমল করছে। কাবির আর তিশা নিজেদের নির্ধারিত আসনে বসেছে। চারপাশে কাজিনদের উচ্ছ্বাস, অতিথিদের করতালি, ডিজের ছন্দময় সুর—সব মিলিয়ে পুরো ভেন্যু যেন আনন্দের এক উজ্জ্বল আবরণে ঢেকে আছে। গানের তালে তালে আবার শুরু হয়েছে নাচ, হাসি আর খুনসুটি। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝেও এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল লিসি। তার দৃষ্টি স্থির স্টেজের দিকে।
এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন চোখের সামনে শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, নিজের জীবনের কোনো হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনাও দেখতে পাচ্ছে। ঠিক তখনই তার পাশে এসে নীরবে দাঁড়াল কিরিস, তার চোখে সেই চিরচেনা স্থিরতা।
কিছুক্ষণ লিসির দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল
—"এত মনোযোগ দিয়ে কী দেখছো?"
লিসি চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল
—"আমার পূরণ না হওয়া স্বপ্ন।"
কিরিস ভ্রু সামান্য উঁচু করল।
—"মানে?"
লিসি এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। চোখে অভিমান, ঠোঁটে মৃদু বিদ্রূপ।
—"মানে, কিছু মানুষের বিয়ে হয় পরিবার নিয়ে, আত্মীয়স্বজন নিয়ে, হাসি-আনন্দ নিয়ে। আর কিছু মানুষের বিয়ে হয়..."
সে একটু থামল। তারপর সরাসরি কিরিসের চোখে চোখ রেখে বলল—
—"রাস্তা উপর সুয়ে। "
কিরিস ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টানল।
—"আবার শুরু হলো?"
—"শুরু হবে না? আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন?"
—"না।"
—"অনুমতি নিয়েছিলেন?"
—"না।"
—"আমার দাদুকে ভালো করে আগে জানিয়েছিলেন ?"
—"না।"
—"তাহলে?"
—"তাহলে বিয়ে হয়ে গেছে।"
কিরিস এমন স্বাভাবিকভাবে কথাটা বলল যে লিসি হতবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্ত হয়ে বলল
—" আপনার সঙ্গে কথা বলাই ভুল!"
কিরিস নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল
—"তবুও তো প্রতিদিন বলো।"
—"কারণ অভিযোগ জমে আছে।"
—"ছাড়ো না।"
—"ছাড়ব কেন?"
—"জানি না।"
লিসি এবার পুরোপুরি তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
—" আপনি আমাকে কাঁধে করে তুলে এনেছিলেন।"
—"হুম।"
—"মাটিতে বসিয়ে বিয়ে করেছ।"
—"হুম।"
—"চারপাশে পুলিশ।"
—"হুম।"
—" আপনার লোকজন।"
—"হুম।"
—"মাথার উপর বন্দুক।"
—"সেটা নিরাপত্তার জন্য ছিল।"
—"বাহ! কী সুন্দর নিরাপত্তা!"
—"ধন্যবাদ।"
লিসি বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। কিরিস এবার নিচু গলায় বলল—
—"আর কিছু?"
—"অনেক কিছু।"
—"তাহলে তালিকা করে দাও।"
—"তালিকা লিখতে গেলে তিন খাতা লাগবে।"
—"আমি কিনে দেব।"
এইবার নিজের অজান্তেই লিসির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সে সেটা লুকিয়ে ফেলল। কিরিস অবশ্য দেখে ফেলেছে। সে শান্ত গলায় বলল—
—"হাসলে কেন?"
—"হাসিনি।"
—"হেসেছো।"
—"না।"
—"হ্যাঁ।"
—"না।"
—"ঠিক আছে, না।"
কথাটা শুনে আবারও হেসে ফেলল লিসি।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ স্টেজে তখন নতুন পারফরম্যান্স শুরু হয়েছে। আলো বদলাচ্ছে সুর বদলাচ্ছে চারপাশে হাততালি। লিসি আবার স্টেজের দিকে তাকিয়ে বলল
—"তবুও একটা কথা সত্যি।"
—"কী?"
—"আমার স্বপ্নটা পূরণ হয়নি।"
এইবার কিরিস উত্তর দিতে একটু সময় নিল। তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল স্টেজে বসে থাকা কাবির আর তিশার উপর।
তারপর ধীরে বলল—
—"সব মানুষের স্বপ্ন একই রকম হয় না।"
—"আমারটা ছিল।"
—" কেমন ছিলো? "
—" বেশি কিছু না। সুন্দর করে সাজগোজ করে, সবাই থাকবে নিজের মধ্যে একটা লাজুক ভাব থাকবে যে না আজ আমার বিয়ে। কিন্তু আপনি! আপনার জন্য আমাকে পালিয়ে যেতে হলো। রাস্তার পারে আপনি আমাকে জোর করে বিয়ে করলেন। "
—"জানি।"
—"তাহলে?"
কিরিস কিছুক্ষণ নীরব রইল। তার গাঢ় দৃষ্টি স্থির ছিল লিসির মুখে। তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল—
—"তোমার যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, সেটা আমি জানি। জোর করে নিশ্চয়ই আমি বিয়ে করেছি। কিন্তু ভালো তো আমি একা বাসি না... তুমিও তো বাসো আমাকে, তাই না? নাকি সবটাই মিথ্যা? নারীর এক মায়াময় ছলনা মাত্র?"
লিসি বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর ধীরে ধীরে বলল
—"স্বপ্নের ভালোবাসায় ছলনা থাকে না। যে অনুভূতি হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশ থেকে জন্ম নেয়, তার মধ্যে প্রতারণার স্থান হয় না।"
কিরিসের চোখের পাতা কেঁপে উঠল।
—"তাহলে বলো, কেন আমার ভালোবাসার উপর তোমার এত অভিযোগ?"
লিসি মৃদু হাসল। সেই হাসির মধ্যে ছিল বিষাদ, অভিমান আর গভীর মমতা।
—"অভিযোগ ভালোবাসার বিরুদ্ধে নয়। অভিযোগ তার প্রকাশের বিরুদ্ধে। ভালোবাসা যখন অধিকার হয়ে ওঠে, তখন সে কখনো কখনো হৃদয়কে আহত করে ফেলে।"
কিরিস ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।
—"তুমি কি মনে করো আমার ভালোবাসা শুধু অধিকার?"
—"না। তোমার ভালোবাসা সমুদ্রের মতো গভীর। কিন্তু কখনো কখনো সেই সমুদ্রের ঢেউ এত প্রবল হয়ে ওঠে যে তীরের অস্তিত্ব ভুলে যায়।"
—"আমি তোমাকে হারানোর ভয় পাই, লিসি। সেই ভয় আমাকে নিষ্ঠুর করে তোলে।"
লিসি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল
—"যে ভালোবাসা হারানোর আশঙ্কায় কাঁপে, সে ভালোবাসা কখনো মিথ্যা হয় না। কারণ মিথ্যা অনুভূতি বিচ্ছেদের ভয় পায় না।"
কিরিসের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
—"তাহলে তুমি স্বীকার করছো, আমার ভালোবাসায় ছলনা নেই?"
—"আমি বহুদিন আগেই তা স্বীকার করেছি।"
—"তবুও আমার বিরুদ্ধে এত অভিমান?"
—"অভিমান তো সেই মানুষটির উপরই জন্মায়, যার কাছে হৃদয়ের দাবি থাকে। অপরিচিত মানুষের প্রতি কেউ অভিমান করে না।"
কিরিস নীরবে শুনতে লাগল। লিসি আবার বলল
—"শোনেন.. সকল মানুষ ভালোবাসার নামে প্রতারণা করে না। পৃথিবীতে এখনও কিছু হৃদয় আছে, যারা নিঃস্বার্থ অনুরাগের ভাষা বোঝে। আপনি যেমন জানেন আপনার ভালোবাসায় ছলনা নেই, তেমনি আমিও জানি আমার অনুভূতির মধ্যেও কোনো কপটতা নেই।"
কিরিসের দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে উঠল।
—"তাহলে কেন মনে হয়, তুমি এখনও আমার থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছো?"
লিসি মৃদু স্বরে উত্তর দিল
—"দূরত্ব সবসময় পথের নয়, কখনো কখনো কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন, কিছু অব্যক্ত কষ্ট, কিছু অপ্রাপ্ত মুহূর্ত মানুষের অন্তরে অদৃশ্য প্রাচীর নির্মাণ করে।"
—"আর সেই প্রাচীর কি ভাঙা সম্ভব?"
লিসি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল
—"সম্ভব। যদি ভালোবাসা অধিকার নয়, আশ্রয় হয়ে ওঠে। যদি ভয় নয়, বিশ্বাস পথ দেখায়।"
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল —"আমার সমগ্র জীবনে আমি বহু মানুষকে জয় করেছি, বহু সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছি। অথচ তোমার হৃদয়ের সামনে এসে আজও নিজেকে অসহায় মনে হয়।"
—"কারণ হৃদয় জয় করা যায় না। হৃদয় কেবল অর্জন করা যায়।"
কিরিস ধীরে ধীরে তার হাতটা নিজের হাতে নিল।
—"তাহলে আজ একটি কথা শোনো, লিসি। আমার ভালোবাসা হয়তো নিখুঁত নয়, হয়তো ত্রুটিপূর্ণ, হয়তো অনেক সময় কঠোর। কিন্তু তার প্রতিটি স্পন্দন সত্য। আমার অস্তিত্বের প্রতিটি কণায় তোমার নাম লেখা আছে।"
লিসি মৃদু কাঁপা কণ্ঠে বলল
—"আর আমার ভালোবাসা কোনো ক্ষণস্থায়ী মোহ নয়। এটি এমন এক অনুরাগ, যা অভিমান জানে, অশ্রু জানে, কষ্ট জানে তবুও প্রিয় মানুষটির হাত ছেড়ে যেতে জানে না।"
নীরবতা নেমে এল। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও দুজনের হৃদয় যেন একই ভাষায় কথা বলছিল
★ ভালোবাসা ছলনা নয়, ভালোবাসা হলো সেই সত্য, যার সামনে সকল অহংকার, সকল অভিযোগ, সকল অভিমান একদিন নতজানু হয়ে যায়। ★
কিরিস তখনও তাকিয়ে আছে সেই স্থির, গভীর চোখে।
—"কিন্তু একটা কথা খুব ভালো করে খেয়াল করেছো?"
—"কী?"
—"স্বপ্নটা হয়তো তোমার মতো করে শুরু হয়নি।"
সে সামান্য থামল।
—"কিন্তু আমি এখনও আছি।"
লিসি কিছু বলল না চুপ করে তারপরও প্রত্যেকটা কথা তা শ্রবন করছে সে শুধু শ্রবণই করছে না সেটা নিয়ে মনে আদালতে বারবার দাখিল জমা দিচ্ছে। কিরিস আবার বলল —"আজও আছি।"
—"জানি।"
—"তোমার খেয়াল রাখছি।"
—"জানি।"
—"তাহলে?"
লিসি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
—"বর হওয়ার পর সবাই এমন মিষ্টি কথা বলতে শেখে নাকি?"
কিরিস হালকা হেসে ফেলল।
—"আমি তো অনেক আগেই শিখেছিলাম।"
—"মিথ্যা।"
—"বিশ্বাস করো বা না করো।"
তাদের ক্ষণিক আগের সেই গভীর কথোপকথন আবার স্বাভাবিক মুহুর্তে ফিরে আসলো ঠিক আগের মত খুনসুটি। লিসি নিজের অনুভূতি প্রকাশে কোনরকম ন্যাকামি করে না যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই সে বলে আর তার এ বিষয়টাই মন কেরেছে এক হৃদয়হীন মানবের। কিরিস হ্যাঁ তার হৃদয় শুধুমাত্র এই এক নারীতেই নত হয়। এমন পুরুষ কই পাবে নারী তুমি! যার সামনে তুমি ছাড়া অন্য কেউ সমতুল্য নয়। যে তোমাকে আঘাত দিয়ে ভালবাসতে জানে না, আগলে রেখে ভালবাসতে জানে। যারা আঘাতে ভালোবাসে সেটাকে কি ভালোবাসা বলে? জোর করে কিংবা আঘাত দিয়ে কিংবা বন্দী করে নিজের মতো করে কাছে রেখে ভালোবাসাকে কি বলে আমি জানিনা! সেটা কি ভালোবাসা? নাকি নিজের রাজত্ব যেখানে রানীর কোন অধিকার নেই। অবশ্য সেই নারী শেষমেষ সেই পুরুষ এই আকৃষ্ট হয়। যে তাকে বন্দী সাম্রাজ্য রাখে। তাহলে কি বুঝলে? নারী সর্বদায় ভালোবেসে এসেছে আঘাত করা পুরুষকেও। বন্দি করা পুরুষকেও। নিজের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস সম্মানের উপর আঙুল তোলা পুরুষকেও। তাহলে পুরুষ তোমার কি উচিত নয় তোমার প্রিয়শীয় কে যত্নে রাখা যার জন্য তোমার হৃদয় স্পন্দিত হয়। যাকে দেখলে তোমার অনন্য মনে হয় যাতে ওদের দিকে তাকালে মনে হয় সে তোমারি জন্য সৃষ্টি। একটু ভাবো কজন পুরুষেই আছে যে তার নারীকে মুক্ত আকাশে ছেড়ে দেয়। নিজের সমস্তটা দিয়ে আগলে রাখে কখনো আঘাত করে না বন্দী করে না। তাহলে দেখবে নারী তোমাকে বরাবরই ভালবাসবে কিন্তু যখন তুমি তার ভালোবাসা আরো ভালো করে দেবে তখন তার ভালোবাসা এতটাই গভীর হবে যে গোটা দুনিয়া তোমার বিরুদ্ধে চলে গেলেও এই একটি নারীকে তুমি পাবে তোমার পাশে। হ্যাঁ তোমার প্রিয়সি তোমার প্রিয়তম তোমার অষ্টাদশী তোমার হৃদয়ের সেই স্পন্দিত হওয়ার কারণ, তোমার ভালোবাসা তোমার পাশে আছে। তখন তোমার অন্ধকার দুনিয়াকে দেখেও তার ভয় লাগবে না কারণ সে এতোটুকু বিশ্বাস করতে জানবে যে গোটা দুনিয়া তার ক্ষতি করলেও তোমার ওই শান্ত প্রস্তুত বুক তার জন্য সব চেয়ে নিরাপদ স্থান। তাই পুরুষ নিজের শখের নারীকে সঠিক রূপে ভালোবাসতে জানো তোমাকে সে ভালবাসবে যদি তুমি তাকে ভালোবেসে থাকো। কিন্তু কিভাবে বাসবে সেটা নিজস্ব ব্যাপার তোমার। ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।
তবে হ্যাঁ এমন এক সঠিক পুরুষ যে তার নারীকে তার গোটা সব দিয়ে আগলে রেখেছো তার রাজ্যে তার কোন বাধা নেই। সে তার রাজ্যের রানী তার যা ইচ্ছা সে করবে। আর এমন এক ভাগ্যবান পুরুষ পেয়েছে লিসি। কিরিস যে তাকে তার সবটা দিয়ে আগলে রেখেছে, তাকে সর্বদা নিজের মতো করে চলতে দিয়েছে কখনো বাধা দেয়নি সে তার শখের নারীর কদর করতে জানে আঘাত কিংবা বন্দী নয় কিংবা জোরপূর্বক নয় তাকে তা সাম্রাজ্যের মুকুট পড়ার রানি বানিয়ে রেখেছে।
★★★
অন্য দিকে স্টেজ থেকে তখন করতালির শব্দ ভেসে এলো। কাবির আর তিশা নিজেদের আসনে বসে পরবর্তী পরিবেশনা দেখছে। সুরের ধারা আবার ফিরে এসেছে আগের উচ্ছ্বসিত ছন্দে। ভেন্যু জুড়ে আবার হাসি, আলো আর আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে। আর সেই ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লিসি আর কিরিসও নিজেদের মতো করে কথার আড়ালে লুকিয়ে রাখছে অভিমান, অভিযোগ, আর এক অদ্ভুত গভীর সম্পর্কের নীরব সত্যগুলো। স্টেজের চারপাশ তখন করতালিতে মুখর।
আলো একবার নীল, একবার সোনালি, একবার রক্তিম আভায় পুরো মঞ্চকে রাঙিয়ে তুলছে। কাজিনদের দল একের পর এক পারফরম্যান্স দিয়ে অতিথিদের মুগ্ধ করে চলেছে। ঠিক তখনই জারা, নুসরাত, হিয়া আর আরোবি মিলে প্রায় জোর করেই লিসিকে স্টেজে তুলে আনল।
—"চল! এবার তোর পালা!"
—"আমি পারব না!"
—"এই ডায়লগ আর না!"
হাসতে হাসতে সবাই তাকে মাঝখানে এনে দাঁড় করিয়ে দিল। স্টেজে উঠতেই গানের নতুন অংশ ভেসে উঠল।
লিসির চোখে মুহূর্তের জন্য অন্যরকম এক ঝিলিক দেখা দিল।
অভিমান, অভিযোগ, ভালোবাসা, অস্বীকার স্বীকার সবকিছু যেন একসাথে মিশে আছে সেখানে। তারপর ধীরে ধীরে সে ছন্দে ভেসে গেল। গানের কলি বাজল—
"Deewane ki chaal mein, phans gayi main iss jaal mein... Ae sakhiyon, kaise? Bolo (bolo) "
লিসি দুই হাত ছড়িয়ে ঘুরে দাঁড়াল। তার শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ে উঠল। মুখের অভিব্যক্তিতে এমন এক মিশ্র অনুভূতি ফুটে উঠল যেন সে সত্যিই কারও পাতা জালে আটকে পড়েছে চারপাশের কাজিনরা সঙ্গে সঙ্গে সুর ধরল। জারা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
—"বলো! কিভাবে?"
হিয়া হেসে উঠল নুসরাত তালি দিল। আর লিসি চোখের কোণ দিয়ে একবার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কিরিসের দিকে তাকাল। তাকানোটা এত ক্ষণিকের ছিল যে অন্য কেউ বুঝল না। কিন্তু কিরিস বুঝল সম্পূর্ণ বুঝল। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াবি সেটা খেয়াল করেই কিরিসের হাত ধরে টান দিল।
—"দাঁড়িয়ে কী করছিস?"
—"কিছু না।"
—"আজকে কিছু না চলবে না।"
—"ইয়াবি—"
—"না। উপরে ওঠ, আজকে আমাদেরও দেখাতে হবে আমাদের হ্যান্ডসাম ভাইকে ।"
কথা শেষ হওয়ার আগেই সে প্রায় জোর করে কিরিসকে স্টেজে তুলে আনল। চারদিকে শোরগোল শুরু হয়ে গেল।
—"উফফফ!"
—"কিরিস ভাই স্টেজে!"
—"আজকে কিছু একটা হবে!"
ইশান তো শিসই দিয়ে ফেলল। কিরিস প্রথমে নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু ঠিক তখনই গানের পরের লাইন ভেসে উঠল—
"Haan, mujh pe toh, ae dilruba, teri sakhiyan bhi fida...Yeh bolengi kya? Poochho (poochho) "
মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি স্থির হলো লিসির উপর।
তারপর অবিশ্বাস্যভাবে সে গানের তালের সঙ্গে সামান্য একদম সিনেমার সিনেমার মতো হালকা করে নাচলো কিরিস। আর সেই একটুকু নড়াচড়াতেই পুরো হলরুমে যেন বিস্ফোরণ ঘটে গেল।
—"ওহহহহ!"
—"শেষ!"
—"আজকে ইতিহাস!"
জারা আর হিয়া তো প্রায় লাফিয়ে উঠল। লিসিও বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। কিরিস খুব বেশি কিছু করল না।
তার স্বভাবের সঙ্গে মানানসই সংযত ভঙ্গিতেই দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু চোখের ভাষা, ঠোঁটের কোণের ক্ষীণ হাসি আর গানের সঙ্গে মিলে যাওয়া তার অভিব্যক্তিই যেন বাকিটা বলে দিচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হচ্ছিল এই গানটা যেন সত্যিই তাদের দুজনের জন্য লেখা। লিসির অভিযোগ। কিরিসের উত্তর।
লিসির অভিমান। কিরিসের নীরব স্বীকারোক্তি।
সবকিছু যেন সুরের ভেতর অদ্ভুতভাবে মিশে গেছে।
গান শেষ হওয়ার আগেই কিরিস আবার নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে স্টেজ থেকে নেমে গেল।
যেন কিছুই ঘটেনি। যেন এতক্ষণ সবাই যা দেখল, তা কেবলই কল্পনা। কিন্তু তার যাওয়ার আগে লিসির দিকে ছুঁড়ে দেওয়া এক ঝলক দৃষ্টি অনেক কথাই বলে গেল।
স্টেজে তখনও উৎসব চলছে। লিসি আবার কাজিনদের সঙ্গে যোগ দিল। জারা তার হাত ধরে ঘুরিয়ে দিল।
নুসরাত তালি দিল। হিয়া আর আরোবি একসঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচতে লাগল। অন্যদিকে ইশান, ইয়াবি, রিহানরাও ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়। ছেলেদের দলও সমান উদ্যমে অংশ নিল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো স্টেজ আনন্দে ফেটে পড়ল কারও মধ্যে ক্লান্তি নেই। কারও মধ্যে সংকোচ নেই। শুধু হাসি, উল্লাস আর পরিবারের মানুষদের সঙ্গে কাটানো অমূল্য সময়। আলোকরশ্মির ঝলকানিতে, ক্যামেরার অবিরাম ফ্ল্যাশে আর করতালির গর্জনে মনে হচ্ছিল আজকের রাতটা শুধু একটি বিয়ের অনুষ্ঠান নয়, এটা এমন এক স্মৃতি, যা বহু বছর পরেও সবাই হাসিমুখে মনে করবে। দীর্ঘ সময়ের নাচ, গান, হাসি-ঠাট্টা আর আনন্দ-উল্লাসের পর অবশেষে অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি উপস্থিত হলো।
ভেন্যুর মাঝখানে সুন্দরভাবে বিয়ের আসর সাজানো হয়েছে। সাদা ফুল, সোনালি আলোকসজ্জা আর মার্জিত আয়োজনে পুরো পরিবেশটিই যেন এক পবিত্র আবহ ধারণ করেছে। অতিথিরা ধীরে ধীরে নিজেদের আসনে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে ডিজের তালে তালে পুরো হল কাঁপছিল, এখন সেখানে এক ধরনের প্রশান্ত নীরবতা। কাজি সাহেব সামনে বসে কাগজপত্র গুছিয়ে নিলেন। কাবিরকে ডাকা হলো অন্যদিকে তিশাও নির্ধারিত স্থানে বসল। তাদের মাঝে একটা সুন্দর ফুলের পর্দা টেনে দেওয়া হলো। সবার চোখে তখন একটাই প্রত্যাশা একটি নতুন জীবনের সূচনা। কাজি সাহেব প্রথমে খুতবা পাঠ করলেন। এরপর ইসলামী বিধান অনুযায়ী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।
কাবিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করা হলো—
—"আপনি কি কাবির রায় চৌধুরী , মোহরানা নির্ধারিত শর্তে মামুন সাহেবের কন্যা তিশা সিকদারকে বিবাহ কবুল করছেন?"
কাবিরের কণ্ঠ দৃঢ় ও স্পষ্ট।
—"আলহামদুলিল্লাহ, কবুল করছি।"
তিনবার একই প্রশ্ন। তিনবারই একই উত্তর।
—"কবুল করছি।"
অন্যদিকে তিশার কাছেও একই প্রশ্ন পৌঁছালো।
লজ্জায় রাঙা মুখে, নিচু স্বরে হলেও স্পষ্টভাবে সে বলল —"কবুল করছি।"
তিনবার।
পূর্ণ সম্মতিতে। সাক্ষীদের উপস্থিতিতে পরিবারের দোয়া ও ভালোবাসার মাঝে অবশেষে কাজি সাহেব মুচকি হেসে ঘোষণা করলেন
—"আলহামদুলিল্লাহ। শরিয়ত মোতাবেক এ বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে।"
মুহূর্তের মধ্যে চারদিক করতালিতে ভরে উঠল।
"মাশাআল্লাহ!"
"আলহামদুলিল্লাহ!"
বিভিন্ন দিক থেকে শুভেচ্ছার ধ্বনি ভেসে এলো। কেউ দোয়া করল। কেউ চোখ মুছল। কেউ আবার মোবাইল বের করে সেই বিশেষ মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সামনের সারিতে বসে থাকা আনোয়ার সাহেবের চোখেও আনন্দের ছাপ স্পষ্ট। তার পাশেই বসে ছিল লিসি। সে হাসিমুখে পুরো দৃশ্যটি দেখছিল। এমন সময় হঠাৎ তার মনোযোগ অন্যদিকে চলে গেল। পাঁচ-ছয় বছরের একটি ছোট ছেলে বারবার তার দিকে তাকাচ্ছে। ছেলেটির চোখে সেই দুষ্টুমি, যা দেখলেই বোঝা যায় এখনই কিছু একটা ঘটবে। লিসির দীর্ঘ, ঘন, কালো চুলগুলো বসে থাকার কারণে মেঝের উপর ছড়িয়ে পড়েছিল। ছেলেটি কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এসে চুলের একগোছা ধরে টান দিল।
—"আহ্..."
লিসি ঘুরে তাকাল। ছেলেটার দিকে মিষ্টি হেসে বলল
—"বাবু, চুল ধরো না। ব্যথা লাগে।"
ছেলেটা তার কথা শুনল না বরং আরও মজা পেয়ে আবার টান দিল। লিসি ধৈর্য ধরে বলল
—"ভালো ছেলে হও। ছেড়ে দাও।"
কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না বারবার একই কাজ করতে লাগল সে। একসময় লিসি পাশের দিকে তাকিয়ে ছেলেটির মাকে ভদ্রভাবে বলল
—"আন্টি, আপনার ছেলেটাকে একটু সামলাবেন? আমার চুল ধরে টানছে।"
মহিলা শুনলেন ঠিকই, কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না।
উল্টো অন্য কারও সঙ্গে গল্প করতেই ব্যস্ত রইলেন।
লিসি এবার নিজের চুলগুলো সামনের দিকে এনে গুছিয়ে রাখল কিন্তু তাতেও রক্ষা হলো না। ছেলেটি আবারও এগিয়ে এসে আগের চেয়েও শক্ত করে চুল ধরে ফেলল। এবার সত্যিই ব্যথা পেল লিসি সে উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু ছেলেটি এমনভাবে চুল চেপে ধরে আছে যে ছাড়ছেই না।
—"বাবু, ছেড়ে দাও।"
—"না!"
—"ব্যথা পাচ্ছি।"
—"না!"
লিসি এবার একটু কড়া স্বরে বলল
—"ছেড়ে দাও বলেছি।"
কথাটা শুনে ছেলেটা মুখ কুঁচকে কান্না শুরু করল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কান্না করলেও চুল ছাড়ল না।
বরং আরও আঁকড়ে ধরে রইল। পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। তখনই ছেলেটির মা উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্ত স্বরে বললেন
—"এতটুকু বাচ্চাকে এভাবে বকছেন কেন?"
লিসি বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল।
—"আমি তো শুধু চুল ছাড়তে বলেছি।"
—"বাচ্চা মানুষ। একটু ধরেছে তো কী হয়েছে?"
এই কথাটা আশেপাশের কয়েকজনও শুনে ফেলল।
ঠিক তখনই আনোয়ার সাহেব নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু দৃঢ়।
—"একটু মাফ করবেন।"
মহিলা তার দিকে তাকালেন আনোয়ার সাহেব বললেন
—"সমস্যাটা কী?"
—"আপনারা আমার ছেলেকে বকছেন।"
আনোয়ার সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন—
—"আপনার ছেলে আমাদের বাড়ির বউয়ের চুল ধরে টানছে। ও ব্যথা পাচ্ছে, সেটা তো আপনি দেখছেন।"
মহিলা কিছু বলার আগেই তিনি আবার বললেন
—"লিসি তো প্রথমে খুব ভদ্রভাবেই বলেছে। তারপরও যদি বাচ্চা না শোনে, তাহলে তাকে বোঝানো আপনার দায়িত্ব।"
চারপাশে উপস্থিত কয়েকজন সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। আনোয়ার সাহেব শান্ত গলায় যোগ করলেন
—"বাচ্চারা দুষ্টুমি করতেই পারে। কিন্তু বড়দের কাজ হলো তাদের শেখানো কোথায় থামতে হয়।"
কথাগুলো বলার পর তিনি নিজেই নিচু হয়ে ছেলেটির হাত থেকে আলতো করে চুল ছাড়িয়ে দিলেন। তারপর ছেলেটির মাথায় হাত রেখে বললেন
—"ভালো ছেলে হতে হলে কাউকে কষ্ট দেওয়া যায় না, বুঝেছো?"
চারপাশের উত্তেজনাটা ধীরে ধীরে কমে এলো। আর ভেন্যুর অন্যপ্রান্তে তখনও ভেসে আসছে নতুন দম্পতিকে ঘিরে আনন্দ আর শুভেচ্ছার ধ্বনি
"আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ ওদের দাম্পত্য জীবন সুখী করুক।"
আনোয়ার সাহেবের কথা শুনে চারপাশে উপস্থিত অনেকেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। তিনি লিসির দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন
—"আর একটা কথা মনে রাখবেন, ও শুধু আমার বউমা না। ও আমার নিজের মেয়ের মতো। আমি ওকে সেই ভাবেই দেখি। তাই কেউ যদি ওকে অসম্মান করে, সেটা আমারও খারাপ লাগে।"
কথাগুলো শুনে লিসি ধীরে ধীরে আনোয়ারের দিকে তাকাল তার চোখে কৃতজ্ঞতার নরম ছায়া। কোনো কথা বলল না শুধু মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠল তার মুখে।
কিন্তু সমস্যা তখনও শেষ হয়নি। ছোট ছেলেটা কান্না থামিয়ে আবারও লিসির লম্বা চুলের দিকে হাত বাড়াতে লাগল। লিসি এবার সতর্ক হয়ে চুলগুলো সরিয়ে নিতে গেল।।কিন্তু তার আগেই ছেলেটা আবার একগোছা চুল ধরে ফেলল।।চারপাশের কয়েকজন বিরক্ত হয়ে তাকাল।
আর ঠিক তখনই একটা ঠান্ডা, ভারী কণ্ঠ ভেসে এলো—
—"হাতটা ছাড়ো।"
ঠিক তখনই পিছন দিক থেকে একটি বড় হাত ছেলেটার জামার কলার শক্ত করে ধরে ফেলল। এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটল যে ছেলেটা নিজেও বুঝে উঠতে পারল না। পরের মুহূর্তেই সে মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে উঠে গেল। ভয়ে তার হাত থেকে সঙ্গে সঙ্গে লিসির চুল ছুটে গেল।।চারপাশের মানুষও চমকে পিছন ফিরে তাকাল কিরিস।
তার মুখে কোনো রাগের প্রকাশ নেই, কিন্তু চোখের ঠান্ডা দৃষ্টিটা মুহূর্তেই পরিবেশ স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ছেলেটাকে নিজের মুখোমুখি এনে নিচু স্বরে বলল—
"আমার বউয়ের চুলে হাত দেওয়ার সাহস কোথা থেকে পেলে?"
ছেলেটার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
ভয়ে তার চোখে পানি চলে এলো। আর আশেপাশে উপস্থিত সবাই নিঃশব্দে কিরিসের দিকে তাকিয়ে রইল। কিরিস ছেলেটার কানের কাছে এসে বলে —“ যে হাত দিয়ে আমার বউয়ের চুলে হাত দিয়েছো সে হাত কেটে কুকুরকে দিয়ে খাওয়াবো বুঝেছো ”
ছোট ছেলেটা একটু ভয় পেয়ে উঠলো তার চোখে নোনা পানি জমে উঠেছে, ভয়ে কিরিসের তাকাতেও পারছে না নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করছে কিন্তু কিরিস ছেলেটাকে এমন ভাবে ধরে রেখেছে যে ছেলেটা নিজেকে ছাড়াতে অক্ষম। জিম করা বডি এমনি এমনি হয়নি কিরিসের এমন ভাবে ছেলেটাকে ধরেছে যেন সেটা কিছুই না। সে যেন একদম পাতলা। ছেলেটা আর সহ্য করতে পেল না, মায়ের দিকে তাকিয়ে ফ্যান ফ্যান করে কান্না করে দিল। লিসি কিরিসের দিকে তাকিয়ে আছে। কিরিস এবার ছেলেটাকে ছেড়ে দিলো মাটিতে ছেলেটার পা পরতেই সে মায়ের বুকে গিয়ে কান্না করে দিল তারপরও ভুলের শাস্তি সে এখন বলে বলে পাচ্ছে ভুল। কিন্তু তার মা বিষয়টা ভালোভাবে নিলেন না। তিনি বিরক্ত স্বরে বললেন —"বাচ্চা মানুষ। এত বড় ব্যাপার করার কী আছে?"
কিরিস দাঁড়িয়ে আছে তার মুখে কোনো রাগ নেই।
কিন্তু সেই অস্বাভাবিক শান্তভাবটাই যেন বেশি ভয়ংকর।
—"বাচ্চা মানুষ বলেই ভদ্রভাবে বলা হয়েছে।"
মহিলা এবার একটু জোরে বললেন
—"আপনি জানেন আমার স্বামী কে?"
চারপাশে কয়েকজন একে অপরের দিকে তাকাল।
কিরিসের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
—"না। তবে শুনতে চাই।"
ঠিক তখনই মহিলার স্বামী সামনে এগিয়ে এলেন।
তিনি সম্ভবত দূর থেকে কিছুটা পরিস্থিতি দেখেছিলেন।
কিন্তু কাছে এসে কিরিসকে স্পষ্ট দেখতে না দেখতেই তার মুখের রঙ বদলে গেল। চোখ বড় হয়ে উঠল মুহূর্তের মধ্যে তার আত্মবিশ্বাস কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
তিনি দ্রুত স্ত্রীর দিকে ঘুরে বললেন—
—"থাক। বিষয়টা এখানেই শেষ করো।"
—"কিন্তু—"
—"আমি বলেছি শেষ করো।"
তারপর তিনি লিসির দিকে তাকিয়ে বললেন—
—"মাফ করবেন। বাচ্চাটা ভুল করেছে। আর হবে না।"
আনোয়ার সাহেব চুপচাপ দৃশ্যটা দেখছিলেন।
লোকটি স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার পর তিনি মৃদু হাসলেন। তারপর উপস্থিত সবার উদ্দেশে বললেন—
—"যে বাবা নিজের সন্তানকে ভদ্রতা শেখাতে পারে না, সে পরে পৃথিবীকে দোষ দেয়। আর যে সন্তানকে সম্মান করতে শেখায়, তাকে আর কাউকে ভয় দেখাতে হয় না।"
কথাটা শুনে আশেপাশের অনেকে মাথা নাড়ল। ইয়াবি মুখ চেপে হাসছে। ইশানও কষ্টে হাসি আটকে রেখেছে।
আর লিসি? সে এখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে। তার লম্বা কালো চুল কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে। নিঃশব্দে একবার কিরিসের দিকে তাকাল।

0 Comments