পর্ব :84
ছেলেটার ঘটনাটা শেষ হওয়ার পরও লিসির মুখে সেই অস্বস্তির ছাপ রয়ে গিয়েছিল। কিরিস কয়েক মুহূর্ত দূর থেকে তাকিয়ে রইল। কোনো কথা না বলে লিসির হাতটা নিজের হাতে নিয়ে ভিড় থেকে খানিকটা পাশে সরিয়ে আনল লিসি অবাক হয়ে তাকাল।
—"কী হলো?"
কিরিস উত্তর দিল না তার দৃষ্টি গিয়ে থামল লিসির চুলে।
একটু আগে ছেলেটার টানাটানিতে এলোমেলো হয়ে যাওয়া দীর্ঘ, ঘন, কৃষ্ণবর্ণ কেশরাশি আলতো হাতে গুছিয়ে দিল সে। তারপর মাথার উপর হাত রেখে ধীরে ধীরে বুলিয়ে দিল। লিসি নিজের চুলে কারোর হাত দেওয়া পছন্দ করে না কিন্তু কিরিস দিচ্ছে বলে সে কিছু বললো না। কিরিস চুলগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে দিয়ে বলে
—"ব্যথা পেয়েছো?"
লিসি মুখ ফিরিয়ে নিল।
—"না।"
—"মিথ্যা বলছো।"
—"সত্যি।"
কিরিস মৃদু হেসে উঠল।
—"আমার সোনা বউটাকে আমি চিনি।"
লিসির গাল লাল হয়ে উঠল।
—"এত লোকের মাঝে এসব বলো না।"
—"কেন?"
—"ভালো লাগে না।"
—" তাই কিন্তু তোমার গাল কিন্তু অন্য কথা বলছে।"
লিসি এবার সত্যিই আর চোখ তুলে তাকাতে পারল না।
তার বুকের ভেতর যেন অকারণে অস্থিরতা জন্ম নিচ্ছে।
কিরিস আবার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল—
—"ঠিক আছো তো?"
লিসি খুব আস্তে মাথা নাড়ল।
—"হুম।"
—"ভালো। আমার এলোকেশীর তাহলে মনটা ভালো হলো।"
লিসি কিরিসের দিকে তাকিয়ে বলে —" আর কত নামে ডাকবেন শুনি ... "
—" এই পৃথিবীতে যত নাম আছে আর যেটা আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে তোমার জন্যই শুধু আমার এই দুই ওষ্ঠ দিয়ে উচ্চারিত হয়। সেই সকল নামে আমি তোমাকে ডাকবো "
লিসি আর কিছু বললো না। তারপর কিরিস ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল—
—"আমি যাচ্ছি। একটু কাজ আছে।"
—"সবসময় কাজ।"
—"কেউ তো করতে হবে।"
—"হুম।"
কিরিস মুচকি হেসে চলে গেল। কিন্তু কয়েক কদম যাওয়ার পর আবার ফিরে তাকাল। লিসি তখনও দাঁড়িয়ে আছে। যেন অজান্তেই তার চোখ কিরিসকেই খুঁজছে।
কিছুক্ষণ পরে লিসি নিজের ব্যাগ খুলল। ভেতর থেকে একটি মখমলি গয়নার বাক্স বের করল। সুপ্রিয়া নিজ হাতে তাকে দিয়েছিলেন।
—" বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পরে তিশাকে পরিয়ে দিস।"
সেই কথাটা মনে পড়তেই লিসি ধীরে ধীরে স্টেজের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন চারপাশের পরিবেশে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এলো।
একজন দুইজন তারপর আরও অনেকের দৃষ্টি গিয়ে থামল তার উপর। মেরুন রঙের শাড়িতে আবৃত লিসির অবয়ব যেন আলো-ছায়ার মাঝখান থেকে উঠে আসা কোনো রূপকথার চরিত্র। তার দীর্ঘ কেশরাশি হাঁটুরও নিচে নেমে এসেছে। ঘন, মসৃণ, কৃষ্ণকালো সেই চুল আলোর স্পর্শে যেন রাতের আকাশের মতো দীপ্তিমান হয়ে উঠেছে। প্রতিটি পদক্ষেপে চুলগুলো কোমল ঢেউয়ের মতো দুলে উঠছে। তার মুখাবয়বে ছিল অদ্ভুত এক কোমলতা। বড় বড় মায়াভরা চোখ। সুশ্রী নাসিকা।
অতিসূক্ষ্ম গোলাপি অধর। আর এমন এক প্রশান্ত সৌন্দর্য, যা উচ্চকণ্ঠে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে না বরং নীরবে সকলের মন জয় করে নেয়। অনেকেই অবাক হয়ে ফিসফিস করে উঠল
—"ওই মেয়েটা কে?"
—"মাশাআল্লাহ..."
—"কী অপূর্ব!"
—"আরে, ও তো রায়চৌধুরী বাড়ির বড় বউমা!"
—"জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরীর স্ত্রী!"
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
সামনের সারিতে বসে থাকা আনোয়ার সাহেবের বুক যেন গর্বে ভরে উঠল। তার চোখে ছিল স্নেহমাখা তৃপ্তি আনারুল সাহেবও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। পরিবারের আত্মীয়স্বজন, পার্টির সবাই,, প্রত্যেকের মুখেই প্রশংসা।
কিন্তু একজনের দৃষ্টি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা... কিরিস। সে দূরে দাঁড়িয়ে আছে চোখ স্থির স্টেজের উপর সেই দৃষ্টিতে গর্ব ছিল.. মুগ্ধতা ছিল....অধিকার ছিল..কিন্তু তার থেকেও বেশি ছিল এক অদ্ভুত গভীর ভালোবাসা।
যে ভালোবাসার শুরু আছে কিন্তু যার শেষ যেন কোথাও নেই। লিসি ধীরে ধীরে স্টেজে উঠে তিশার পাশে গিয়ে দাঁড়াল তিশা তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। লিসিও হাসল।
তারপর আস্তে বলল
—"এখন তো আমি তোমার বড় জা হয়ে গেছি, তাই না আপু?"
তিশার চোখ ভিজে উঠল।
—"হ্যাঁ।"
লিসি গয়নার বাক্সটা খুলল। ভেতরে রাখা ছিল একটি ভারী, রাজকীয় নকশার গহনা। রায়চৌধুরী পরিবারের ছোট বউমার মর্যাদার প্রতীক। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সে গহনাটি তিশার গলায় পরিয়ে দিল। পুরো হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে দেখল সেই দৃশ্য এ যেন শুধু একটি অলংকার পরানো নয়। এ ছিল পরিবারের বড় বউমার পক্ষ থেকে ছোট বউমাকে সাদরে গ্রহণ করে নেওয়ার এক নীরব ঘোষণা। একটি নতুন সম্পর্কের সূচনা একটি নতুন অধ্যায়ের স্বীকৃতি। তিশার মুখে হাসি কাবিরের মুখে আবেগমাখা হাসি। আর লিসি সে শুধু স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে স্টেজ থেকে নেমে এল। কিন্তু নামার আগে একবার চোখ তুলে তাকাল। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কিরিসের সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়ে গেল। কিরিসের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। আর সেই একটুকু হাসিই যেন হাজার শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে গেল।
★★★
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ। আবেগ, দোয়া, হাসি, ছবি তোলা সবকিছুর পর এবার পুরো ভেন্যু জুড়ে শুরু হলো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন খাওয়া-দাওয়া। বিশাল বুফে কাউন্টার আলোর ঝলকানিতে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এক সারিতে সাজানো রয়েছে সুগন্ধি জাফরানি পোলাও, সাদা ভাত, মাখন-দেওয়া গ্রিলড চিকেন, চিকেন রোস্ট, মুগ ডালের হালকা স্যুপ, সবজি স্ট্যু, ফিশ ফিলেট, সালাদ বার, দই, ফলমূল, আর বিভিন্ন ধরনের ডেজার্ট। অতিথিরা যে যার পছন্দমতো খাবার নিয়ে নিজেদের টেবিলে বসছে। হাসির রোল, গল্প, ঠাট্টা সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। অন্যদিকে লিসি, জারা, নুসরাত, আরোবি, সুরভী, হিয়া আর লিজা নিজেদের প্লেট হাতে নিয়ে এক টেবিলে বসেছে।
মেয়েদের আড্ডা তো আর থামে না।
—"আরে ওই চিকেনটা আমাকে দে!"
—"নিজে নিয়ে আয়!"
—"আমার প্লেটে কেন এত সালাদ?"
—"কারণ তোর ডায়েট করার কথা ছিল!"
সঙ্গে সঙ্গে সবাই হেসে উঠল নুসরাত বলল—
—"আজকে ডায়েটের কথা বললে শেষ!"
আবারও হাসির ঝড় অন্যদিকে ছেলেদের টেবিলেও কম হইচই নয়। ইশান, ইয়াবি, রিহান সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত। তবে একজনকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন এই পুরো অনুষ্ঠানের বাইরে কিরিস। তার সামনে খাবার আছে।
কিন্তু সে খাচ্ছে না কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর উঠে দাঁড়াল। সোজা হেঁটে এসে লিসির পাশে দাঁড়াল। লিসি তখন চামচে করে পোলাও তুলছে। হঠাৎ মাথার উপর পরিচিত গলা
—"রুমে চলো।"
লিসি চমকে তাকাল।
—"কোথায়?"
—"রুমে।"
—"কেন?"
—"ঘুম পাচ্ছে।"
লিসি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর অবিশ্বাসের স্বরে বলল
—"এত বড় মানুষ আপনি, ঘুম পাচ্ছে বলে আমাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছেন?"
কিরিস নির্বিকার।
—"হ্যাঁ।"
—"আমি খাচ্ছি।"
—"দেখতে পাচ্ছি।"
—"তাহলে?"
—"খাওয়া শেষ করে আসো।"
লিসির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
—"একা একা ঘুমাতে পারবেন না নাকি?"
কিরিস একদম গম্ভীর মুখে বলল
—"পারব।"
—"তাহলে?"
—"তবুও আসো।"
জারা, আরোবি, সুরভী সব কাজিনরা পাশে বসে সব শুনছে। আরোবি মুখ চেপে হাসছে হিয়া তো প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছে। লিসি এবার জিজ্ঞেস করল
—"আপনি খেয়েছেন?"
—"না।"
—"খাননি কেন?"
—"ইচ্ছা করছে না।"
—"আগে খান।"
—"পরে খাব।"
—"না।"
—"হ্যাঁ।"
—"না।"
—"লিসি।"
একটা শব্দ একটা মাত্র ডাক আর সঙ্গে সঙ্গে লিসি চুপ।
কিরিস শান্ত স্বরে বলল
—"আমি উপরে যাচ্ছি।"
তারপর একটু ঝুঁকে যোগ করল
—"ঘুমানোর আগে তোমাকে দেখতে চাই।"
মুহূর্তেই লিসির গাল লাল হয়ে উঠল। জারা মুখ চেপে রাখলেও আর হাসি আটকাতে পারল না। কিরিস শেষবারের মতো তাকিয়ে ধীর পায়ে চলে গেল।
ভেন্যুর উপরের তলায় আগে থেকেই তার জন্য একটি প্রাইভেট স্যুট বুক করা আছে। এটা তার বহুদিনের অভ্যাস। যেখানেই যায়, নিজের নির্জন ব্যক্তিগত জায়গার ব্যবস্থা আগে থেকেই করে রাখে। কিরিস চলে যাওয়ার পর লিসি প্লেটের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—"শান্তি নাই।"
আরোবি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল
—"কিসের শান্তি?"
—"দেখছিস না?"
সুরভী হেসে বলল—
—"দেখছি। খুব ভালো করেই দেখছি।"
হিয়া যোগ করল—
—"আমাদের লিসির সংসার হয়ে গেছে রে!"
—"চুপ কর!"
—"না, সত্যি!"
—"বর ঘুমাবে, বউ খাবার নিয়ে যাবে!"
—"আহারে!"
টেবিলজুড়ে আবারও হাসির রোল পড়ে গেল। লিসি মুখ গম্ভীর রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু নিজেরও হাসি পেয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সে কিরিসের জন্য আলাদা করে খাবার নিল। খুব ভালো করেই জানে সে কী খায়।
ঝাল পছন্দ করে না অতিরিক্ত মসলা পছন্দ করে না।
তাই একটা ট্রেতে সাজিয়ে নিল সাদা ভাত, হালকা মাখন-দেওয়া গ্রিলড চিকেন, অল্প সবজি স্ট্যু, শসা-গাজরের সালাদ এবং এক গ্লাস পানি সঙ্গে আরেক গ্লাস ঠান্ডা কমলার জুস। একেবারে সাদামাটা।
একেবারে কিরিসের মতো। ট্রে হাতে নিয়ে দাঁড়াতেই নুসরাত নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
—"যাও বউমা, স্বামীর খেয়াল রাখো। "
তারপট রিহানের দিকে তাকিয়ে বলে —" আমার টার এতো খেদমত করা লাগে তার আমার খেয়ে রাখা এই লেগ পিচটা দিলেই খুশি। ওই বর খাবা নাকি "
রিহান প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলে —" হুম দাও বউ সোনা "
একতরফা সবাই হাসি দিলো। জারা এর পর লিসির দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল
—"আমরা নিচে আছি।"
হিয়া বলল —"বরকে না খাইয়ে ঘুমাতে দিয়ো না গো লিসি।"
লিজা বলল —"আর নিজেও খেয়ে নিও।"
সবাই আবার হাসল লিসি মাথা নেড়ে বলল
—"তোমাদের সঙ্গে পরে হিসাব হবে।"
তারপর ট্রেটা সাবধানে হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আর বুকের ভেতর কোথাও অদ্ভুত এক উষ্ণ অনুভূতি নীরবে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
যে অনুভূতির নাম হয়তো দায়িত্ব। হয়তো অভ্যাস।
অথবা হয়তো তার চেয়েও গভীর কিছু।
ভেন্যুর উপরের তলায় অবস্থিত কক্ষটি সাধারণ কোনো রুম ছিল না। কিরিস যেখানেই যায়, নিজের জন্য একটি নির্জন, শান্ত ও ব্যক্তিগত জায়গা আগে থেকেই নিশ্চিত করে রাখে এই কক্ষটিও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রশস্ত ঘরের একপাশ জুড়ে বড় কাঁচের জানালা। ছাদের নরম ঝাড়বাতির আলো পুরো ঘরটিকে এক প্রশান্ত, রাজকীয় আবহ দিয়েছে। ধূসর ও সোনালি রঙের সমন্বয়ে সাজানো দেয়াল, নরম কার্পেট, আর মাঝখানে বিশাল কিং-সাইজের বিছানা সব মিলিয়ে যেন কোনো অভিজাত হোটেলের ব্যক্তিগত স্যুট। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল লিসি হাতে খাবারের ট্রে। কিরিস তখন সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে চোখেমুখে স্পষ্ট ক্লান্তি।
লিসি ট্রেটা টেবিলের উপর রাখতেই কিরিস একবার তাকাল তারপর খাবারের দিকে। তারপর আবার লিসির দিকে। লিসি ভ্রু কুঁচকে বলল—
—"এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?"
—"এটা কী?"
—"খাবার।"
—"আমি দেখছি।"
—"তাহলে?"
কিরিস প্লেটের দিকে আঙুল দেখাল।
—"ভাত এত বেশি কেন?"
—"এত বেশি কোথায়?"
—"বেশি।"
—"এক চামচও না।"
—"অনেক।"
লিসি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—"আপনার মতো খুঁতখুঁতে মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।"
কিরিস নির্লিপ্তভাবে বলল—
—"তাই নাকি?"
—"হ্যাঁ।"
—"ভালো।"
—"ভালো মানে?"
—"তুমি অভ্যস্ত হয়ে গেছো।"
লিসি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তারপর চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
—"এখন চুপচাপ খাবেন।"
লিসি ট্রেটা টেবিলের উপর রেখে প্লেটটা কিরিসের দিকে এগিয়ে দিল। কিন্তু কিরিস প্লেটের দিকে তাকালও না।
হাত দেওয়া তো দূরের কথা। সে নির্বিকার মুখে সোফায় হেলান দিয়ে বসে রইল। লিসি ভুরু কুঁচকে বলল
—"কী হলো? খেয়ে নিন।"
কিরিস অন্যদিকে তাকিয়েই উত্তর দিল
—"আমি হাত দিয়ে খাই না, জানো না ।"
লিসি সঙ্গে সঙ্গে বলল
—"তাহলে পা দিয়ে খান।"
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর কিরিস ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল চোখের কোণে মৃদু হাসি।
—"খুব মজা পাচ্ছো?"
—"একদম না।"
—"দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।"
—"আমি খাবার নিয়ে এসেছি, গল্প করতে না।"
—"হুম।"
—"তাহলে খাওয়া শুরু করুন।"
কিরিস এবার মাথা নাড়ল।
—"করব না।"
—"কেন?"
—"ইচ্ছা করছে না।"
—"কিছুক্ষণ আগে তো ঘুমের জন্য পুরো ভেন্যু মাথায় তুলেছিলেন। এখন আবার খাওয়ার সময় ইচ্ছা করছে না?"
—"না।"
—"অসাধারণ।"
লিসি দুই হাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কিরিস কিছুক্ষণ তাকে দেখল। তারপর একেবারে স্বাভাবিক গলায় বলল
—"তুমি খাইয়ে দাও।"
লিসি যেন কথাটাই আশা করেছিল।
—"এই জন্য এতক্ষণ নাটক?"
—"নাটক না।"
—"তাহলে?"
—"তোমার হাতে খেতে চাই।"
কথাটা এমন স্বাভাবিকভাবে বলল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক অনুরোধ এটাই। লিসি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—"আপনাকে নিয়ে সত্যিই পারা যায় না।"
তবুও সে বসে পড়ল। হাতের চুড়ি দুটো একটু উপরে সরিয়ে নিল। তারপর প্লেটটা নিজের দিকে টেনে এনে ধীরে ধীরে ভাত মাখতে শুরু করল।
সাদা ভাতের সঙ্গে অল্প সবজি আর সামান্য চিকেন।মিশিয়ে ছোট ছোট গ্রাস তৈরি করছে। তার আঙুলের নড়াচড়া ধীর, যত্নশীল। কিরিস চুপচাপ বসে শুধু তাকিয়ে আছে। যেন খাবারের চেয়ে এই দৃশ্যটাই তার বেশি পছন্দ। লিসি একসময় মুখ তুলে বলল
—"এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?"
—"দেখছি।"
—"কী?"
—"তুমি আমাকে কত যত্ন করো।"
লিসি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল।
—"বেশি কথা না বলে মুখ খুলুন।"
কিরিস বাধ্য ছেলের মতো মুখ খুলল লিসি তাকে প্রথম গ্রাসটা খাইয়ে দিল। তারপর দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয়।
ঘরের নীরবতার মাঝে শুধু তাদের কথোপকথন আর মাঝে মাঝে লিসির বিরক্ত স্বর শোনা যাচ্ছে
—"ধীরে না, খেয়ে নিন।"
—"খাচ্ছি তো।"
—"এভাবে খেলে সকাল হয়ে যাবে।"
—"সকাল হলে সমস্যা কী?"
—"আমার সমস্যা।"
কিরিস মৃদু হেসে ফেলল। আর লিসি বিরক্তির ভান করলেও তার চোখের কোণে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা। যতই অভিযোগ করুক, শেষ পর্যন্ত মানুষটার খাওয়া না হলে তার নিজেরও যেন শান্তি হয় না।
ধীরে ধীরে পুরো খাবার শেষ করল।
এরপর লিসি ঠান্ডা জুসের গ্লাসটা এগিয়ে দিল।
কিরিস গ্লাসটা হাতে নিয়ে কয়েক চুমুকে শেষ করে ফেলল। তারপর গভীর একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। মনে হলো দীর্ঘদিনের ক্লান্তি যেন কিছুটা হলেও কমেছে।
লিসি প্লেটগুলো গুছিয়ে নিয়ে দাঁড়াল।
—"হয়েছে?"
—"হুম।"
—"ভালো। এবার গিয়ে ঘুমিয়ে পরেন "
কিরিস কিছু বললো না। সে ট্রে সরিয়ে রেখে হাত ধোয়ার জন্য ওয়াশবেসিনের দিকে এগিয়ে গেল। সোফায় বসে থাকা কিরিস, যে কিছুক্ষণ আগেও খাবার নিয়ে অকারণে অভিযোগ করছিল, অথচ শেষ পর্যন্ত লিসির হাত থেকেই নিশ্চিন্তে পুরো খাবার খেয়ে নিল। হাত ধোয়ার জন্য কল খুলতেই আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি চোখে পড়ল লিসির। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে মৃদু এক হাসি ফুটে উঠল বিরক্তিকর মানুষটা তবুও না খাইয়ে শান্তি নেই। লিসি হাত ধুয়ে ফিরে এলো টিস্যু দিয়ে আঙুলের ডগাগুলো আলতো করে মুছতে মুছতে সে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। রুমের নরম আলোয় চারপাশটা আরও শান্ত, আরও নির্জন লাগছে।
নিচে এখনও বিয়ের অনুষ্ঠানের ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে, কিন্তু এই কক্ষে যেন অন্য এক জগৎ। এক মুহূর্ত আগেও সে ভাবছিল কিরিস হয়তো আধঘুমে আছে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সব হিসাব এলোমেলো হয়ে গেল। হঠাৎ পিছন থেকে একটি শক্ত বাহু তাকে জড়িয়ে ধরল। কিরিস লিসি গলায় মুখ গুছে দিলো। লিসি কেঁপে উঠলো
—" আহ্....এই !"
কথাটা শেষ করার আগেই সে নিজেকে বিছানার উপর আবিষ্কার করল। কিরিস তাকে ওইভাবে জড়িয়ে ধরে বেডের উপর এনেছে। অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল লিসি। কিন্তু সেই বিস্ময় স্থায়ী হওয়ার আগেই কিরিস একটু উঠে লিসির উপর উঠে পরলো
তারপর এমন কিছু করল, যা লিসি কল্পনাও করেনি।
অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে, একেবারে কোনো শিশুর মতো নির্ভরতা নিয়ে নিজের মুখটা লিসির বুকে গুছে দিলো।
যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি শেষে এটাই তার নিরাপদ আশ্রয়। লিসির নিঃশ্বাস এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন অকারণে দ্রুত হয়ে উঠল।
এমন কিরিসকে সে খুব কমই দেখেছে। সবার কাছে ভয়ঙ্কর। সবার কাছে অদম্য। সবার কাছে কঠোর।
কিন্তু এই মুহূর্তে?
এই মুহূর্তে সে কেবল একজন ক্লান্ত মানুষ, যে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার কাছে এসে নিশ্চিন্ত হতে চায়।
কিরিস ওইভাবে লিসি নরম বুকে মুখ গুছে সামান্য নড়তেই লিসি অনুভব করল তার উষ্ণ নিঃশ্বাস। অকারণে তার শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে গেল। গায়ের লোমগুলো কেমন অজান্তেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে তার। কি এক অদ্ভুত অনুভূতি বয়ে যাচ্ছে লিসির দেহে কিরিসের এমন ছোঁয়ায়। সে নিজের ঠোঁট কামড়ে কিরিসের ঘন, রেশমি চুলে আঙুল চালিয়ে দিল। তারপর খুব আস্তে বলল
—"এভাবে নড়বেন না।"
কিরিস চোখ না খুলেই বলল ওইভাবে থেকেই বললো
—"কেন?"
—"ব্যথা পাবেন।"
—"কোথায়?"
লিসি এক মুহূর্ত থেমে গেল তারপর মুখ ফিরিয়ে নিল।
কিরিস এবার মাথা সামান্য তুলে তার দিকে তাকাল।
চোখ দুটো আধঘুমে ঝাপসা। তারপর আবার লিসির বুকে মুখ গুছলো নিজেকে ভালো করে কমফোর্টেবল করে নিচ্ছে। কিরিস নড়ছে কিন্তু অসুবিধা লিসির হচ্ছে লিসির এবার কিরিসের চুল একটু জোড়ে খামচ্ছে বলে —
" বললাম না নড়বেন না ব্যথা পাবো "
কিরিস আবার ওর বললো—" কেথায়? "
লিসি এবার আস্তে করে বললো—" যেখানে মুখ গুছে আছেস, সেনসিটিভ জায়গা... এখন এই করছে পরে ব্যথা হবে। "
কিন্তু সেই দৃষ্টির গভীরতা অদ্ভুত।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থেকে সে মৃদু স্বরে বলল —"Mine."
লিসির গাল মুহূর্তেই রাঙা হয়ে উঠল। কিরিস ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে আবার মাথা নামিয়ে দিল।
—"All mine."
কথাগুলো বলার ভঙ্গিতে কোনো অহংকার ছিল না।
ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি এক অদ্ভুত নিশ্চয়তা।
যেন বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে অবশেষে সে নিজের ঠিকানাটা খুঁজে পেয়েছে। লিসি কিছু বলল না।
শুধু নিঃশব্দে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
বাইরে উৎসবের আলো এখনও জ্বলছে নিচে হাসি-আনন্দ এখনও চলছে। আর উপরে, সেই নীরব কক্ষে, দুইজন মানুষ নিজেদের মতো করে কিছু মুহূর্ত জমা করে রাখছিল যে মুহূর্তগুলো শব্দের চেয়ে অনুভূতিতে অনেক বেশি গভীর। মৃদু আলোয় ঘুমন্ত দু'জন মানুষকে দেখে মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি এসে আশ্রয় নিয়েছে এই ছোট্ট মুহূর্তটার মধ্যে। কিরিস মাথা রেখে আছে লিসির বুকে, শিশুর মতো নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে। তার মুখে নেই সেই চিরচেনা কঠোরতা, নেই ভয়ঙ্কর ব্যক্তিত্বের ছাপ শুধু এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ঘুমের ঘোরেই হালকা নড়েচড়ে উঠল সে।
— “উফ... ঘুমাতে যাওয়ার আগে ব্রা পরবে না .. ব্যথা লাগছে... আমার মুখে... "
অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করতে করতে কাঁধের কাছে অস্বস্তিকরভাবে জড়িয়ে থাকা ব্রা ব্লেটের অংশটা একটু সরিয়ে দিল সে। তারপর আবার আগের মতো মাথা গুঁজে দিল লিসির কাছে। লিসি বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর খুব আস্তে করে কিরিসের মাথায় একটা হালকা চাপড় মেরে ফিসফিস করে বলল,
— “নির্লজ্জ একটা... ঘুমের মধ্যেও মুখে যা আসে তাই বলো! বেয়াদব বেডা লোক ”
তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে উঠল মৃদু হাসি।
আঙুলগুলো ধীরে ধীরে কিরিসের ঘন কালো চুলের ভেতর হারিয়ে গেল। সে যতবার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, মনে হচ্ছিল কিরিসের মুখটা ততই শান্ত হয়ে উঠছে। কিছুক্ষণ পর লিসি নরম স্বরে ডাকল,
— “শুনছেন...?”
কিরিস আধোঘুমে গুঞ্জন তুলল,
— “হুমম... কী হয়েছে...?”
— “আপনার কাছে ব্লুটুথ আছে?”
চোখ না খুলেই বলল,
— “দেখো... প্যান্টের পকেটে আছে...”
কথা শেষ করেই যেন আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে। বরং আগের চেয়েও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল লিসিকে, যেন অচেতন মনেও তাকে ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে নেই। লিসি একটু অপ্রস্তুত হয়ে চারদিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে ব্লুটুথ বের করে এক কানে লাগাল।
এক হাতে ফোন স্ক্রল করছে, অন্য হাতটা অবিরাম ঘুরে বেড়াচ্ছে কিরিসের চুলে। দৃশ্যটা এতটাই শান্ত, এতটাই আপন যে সময় যেন সেখানে থমকে দাঁড়িয়েছে।
বাইরে থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসে কিরিসের গায়ে কাঁপুনি খেল। লিসি সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা পাশে রেখে বিছানার কোণ থেকে কম্বলটা টেনে নিল। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে কিরিসের গায়ে জড়িয়ে দিল। তারপর আবার আলতো করে কপালের ওপর ঝুলে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল।
ঘুমন্ত কিরিস অজান্তেই আরও একটু কাছে সরে এল।
লিসি মৃদু হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। মুহূর্তটা ছিল শব্দহীন, অথচ হাজারো কথায় পূর্ণ। কোনো স্বীকারোক্তি ছিল না, কোনো প্রতিশ্রুতিও নয় তবু সেই নীরবতার ভেতর লুকিয়ে ছিল এক গভীর মায়া, এক অদ্ভুত প্রশান্তি; যেন পৃথিবীর সমস্ত ঝড়ঝাপটার পর দু'টি ক্লান্ত প্রাণ অবশেষে খুঁজে পেয়েছে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়।
ঘরের ভেতর সময় যেন থমকে আছে। বাইরের পৃথিবী তখনো নীরব, জানালার ফাঁক গলে আসা ঠান্ডা বাতাস ধীরে ধীরে ঘরের উষ্ণতা ছুঁয়ে যাচ্ছে। ঘুম ভাঙল কিরিসের চোখ খুলে প্রথম মুহূর্তে সে কিছুই বুঝতে পারল না। মাথাটা হালকা ভারী, কিন্তু আগের সেই তীব্র যন্ত্রণার ছাপ আর নেই। বিষের প্রভাব প্রায় সম্পূর্ণ কেটে গেছে শরীর এখন অনেকটাই স্বাভাবিক, অনেকটাই স্বস্তির।
ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল, সে শুয়ে আছে লিসির বুকে এক অদ্ভুত, নিরাপদ আশ্রয়ের মতো।
এক মুহূর্ত সে চুপ করে রইল। তারপর চোখ একটু নড়তেই দেখতে পেল লিসি,,, কানে ব্লুটুথ, হাতে ফোন। স্ক্রিনে কিছু দেখছে, খুব মনোযোগ দিয়ে। যেন তার উপস্থিতি ছাড়া আর কিছুই এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ নয়, অথচ তার এক হাত অনবরত কিরিসের চুলে হালকা ছোঁয়া দিচ্ছে অবচেতন যত্নে।
কিরিস ধীরে ধীরে উঠে বসে ফিসফিস করে বলল,
— “ফোন দেখচ্ছো …?”
লিসি চমকে না উঠে, শান্ত গলায় বলল,
— “ হুম আপনি ঘুমাচ্ছিলেন। ডিস্টার্ব করিনি।”
কিরিস কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। চোখে এখন আর সেই আগুন নেই বরং অদ্ভুত এক নরমতা।
— “ঘুমটা… ভালো ছিল।”
লিসি হালকা ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
— “ভালো তো থাকবেই, ঘুমের মধ্যে নাটক করেছেন আপনি।”
কিরিস হালকা হাসল। তারপর আস্তে করে নিজের অবস্থান ঠিক করে নিলো। লিসির মুখের দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি থেমে গেল। ঘুমের কারণে লিসির চুল কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেছে, শাড়িটাও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অগোছালো তবু সেই অগোছালোতাতেই যেন এক অদ্ভুত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, যা কিরিসের দৃষ্টিকে থামিয়ে দেয়।
সে খুব ধীরে, খুব শান্তভাবে বলল,
— “তুমি না থাকলে… আমি হয়তো এই ঘুমটা পেতাম না।”
লিসি কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
কিরিস আর এক মুহূর্ত দেরি না করে লিসির দিকে একটু এগিয়ে এসে তার ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল একটি সংক্ষিপ্ত, নরম চুম্বন, যেখানে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, শুধু কৃতজ্ঞতা আর গভীর নীরবতা, তারপর চুমু টাকে গভীর করলো কিরিস নিজের সবটা দিয়ে লিসিকে বেডে চেপে ধরে কিস করছে লিসির ঠোঁটের অদ্ভুত স্বাদ গ্রহণ করছে সে কিন্তু ঠিক তখনই লিসির হাত থেকে ফোনটা হালকা কেঁপে পড়ে গেল বিছানায়। লিসির নিশ্বাস ঘন হতে থাকলো সঙ্গে সঙ্গে কিরিসের বুকে হাত দিয়ে একটু দূরে ঠেলে দিতে গেলো কিন্তু কিরিস ছাড়ার বান্দা নয় লিসি কোমড় আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। বেশ কিছুক্ষন পরে নিজের তৃপ্তি মিটিয়ে কিরিস লিসির ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে নিলো। কিরিস আস্তে করে নিজের জিহ্বা টা দিয়ে নিজের ঠোঁট ছুয়ে নিলে। যেন লেগে থাকা শেষ লিসির ঠোঁটের স্বাদটুকু ও সে পান করছে। লিসি ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে কিরিস দিকে তাকিয়ে
— “এই! আপনি কি শুরু করেছেন আবার?”
কণ্ঠে রাগ থাকলেও চোখে ছিল লজ্জার এক অদ্ভুত ছায়া। কিরিস খুব শান্তভাবে তাকিয়ে রইল, তারপর নিচু স্বরে বলল,
— “ঘুম থেকে উঠে যদি তোমাকে না দেখি… তাহলে আবার অস্থির হয়ে যাব।”
তারপর কিরিস আবার বললো— " শুরু তো আমার এখন অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করছে মনে হচ্ছে তোমার পরণের এই আবরণ আমি সরিয়ে নিজের করে নেই "
লিসি একটু থেমে গেল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিল, কিন্তু কণ্ঠ নরম হয়ে এল,
— “ আমি অসভ্য, কি সব বলছেন। একদম ওই রকম কিছু করবে না। ”
তারপর লিসি নিজের ঠোঁট মুছতে মুছতে বলে —
“ বেয়াদব বেডালোক ওই ভাবে একদম তাকাবেন না "
কিরিস ধীরে ধীরে আবার হালকা হাসল। এবার আর কিছু বলল না। কিরিস ধীরে ধীরে নিজের শার্টটা ঠিক করে নিল। ঘুমের ভাঁজ কিছুটা এখনও রয়ে গেছে কাপড়ে, সে হাত দিয়ে একবার টেনে ঠিক করে নিল, তারপর কব্জির ঘড়িটা সোজা করল যেন আগের সেই শক্ত, নিয়ন্ত্রিত মানুষটা আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
অন্যদিকে লিসি উঠে দাঁড়াল। কিরিসের ঘুমের জন্য তার শাড়িটা পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে, চুল কাঁধে ছড়িয়ে আছে। সে একবার আয়নার দিকে তাকিয়ে হালকা বিরক্ত মুখ করল, তারপর ধীরে ধীরে নিজের শাড়ি ঠিক করতে লাগল। একই সঙ্গে ব্লাউজের দিকটা সামলে, অগোছালো অংশগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিল খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। কিরিস একপাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। লিসি একবার চোখ তুলে তাকাতেই সে ধীর স্বরে বলল,
— “রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে… ওইটা পরবে না।”
লিসি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “কোনটা?”
কিরিস একটু এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল,
— “ব্রা।”
লিসি মুহূর্তে অবাক হয়ে গেল গাল দুটো টমেটোর মতো লাল হয়ে গেল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে হালকা রাগ মিশ্রিত স্বরে বলল,
— “আপনার মাথায় কি সমস্যা আছে? এগুলো বলার কিছু আছে নাকি?”
কিরিস নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল, তারপর একদম ঠান্ডা গলায় যোগ করল,
— “আমার ধৈর্য কম। ওইসব খুলতে গেলে বিরক্ত লাগে।”
লিসি এবার সত্যিই থেমে গেল। নিজের গালে হালকা করে হাত দিয়ে বাতাস দেওয়ার চেষ্টা করছে লজ্জায় তারপর আবার বললো —“ আপনার ধৈর্য নেই তাতে আমার কি...,আমি আমার জিনিস সামলে নিবো ”
কিরিস কেমন সুরু চোখে তাকিয়ে আছে তারপর একদম শান্ত ভাবে বললো —“ ঠিক আছে কিন্তু আমার যখন তোমাকে পুরোপুরি পেতে ইচ্ছে করবে তখন যদি এই সব পরে থাকো তাহলে... আমি কিন্তু নিজেকে সামলিয়ে ভদ্র মানুষের মতো খুলতে পারবো না, সোজা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো ”
লিসি চোখ গোল করে তাকিয়ে আছে বিস্মিত —“ কি... কিসের.. কি.. করার কথা... বলছেন ”
কিরিস ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে —“ বাংলা বোঝো না sweetheart ঠিক আছে... ”
লিসি কিছু বলতে যাবে তখন কিরিস লিসির ঠোঁটে হাত দিয়ে চুপ করিয়ে ওর একদম কানের কাছে মুখটা নিয়ে যায় কিরিসের গরম নিশ্বাস লিসির কানে লাগতেই কেমন গা শিউড়ে উঠলো লিসির অদ্ভুত অনুভূতি, নিজের ভিতরে যেন ঠিক আগের মতোই আবার ঝড় শুরু হয়ে যাচ্ছে, কিরিস এবার বলে উঠলো —“ when i will fuck you sweetheart i make sure you are without clothes ”
কিরিস একটু থেমে আবার কেমন একদম নির্লজ্জ ভাবে জোরে বলে উঠলো —“ You heard me...! ”
লিসি একদম চুপ করে আছে লজ্জায় তার কান গরম হয়ে যাচ্ছে কান দিয়ে ধোঁয়া উঠার মতো নিজের মুখটা দুহাত দিয়ে ঢেকে রেখেছে। কিন্তু কিরিস কাছে এসে হাত টা সরিয়ে দিলে ঠোঁট বাঁকিয়ে ঘোর লাগানো তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে —“ I will fuck you sweetheart ”
লিসি কিরিসের কাছ থেকে হালকা সরে গিয়ে নিজের কাঁপা হাত দিয়ে কিরিসের মুখ চেপে ধরে বললো —
“ আহহহহহ চুপ করুন.....আ..আপনি বেয়াদব হয়ে যাচ্ছেন ”
কিরিস লিসির কোমড় জরিয়ে ধরে কাছে টেনে লিসির ঠোঁটে একটা পাগল করা চুমু একে দিলে। লিসি ছাড়াতে পারছেনা,একটু পরে কিরিস ঠোঁট ছেড়ে বললো — “ তাই আগে থেকে সতর্ক করে দিলাম, যদি তুমি নিজ ইচ্ছে তে নিজের কাপড় নষ্ট না করতে চাও ”
তার চোখে ছিল সেই পরিচিত দৃঢ়তা, কিন্তু মুখে ছিল এক অদ্ভুত স্বাভাবিকতা যেন এটা নিয়েই তার কোনো দ্বিধা নেই। লিসি এবার হালকা ভান করা রাগ আর লজ্জা মিশ্রিত গলায় বলল,
— “আপনি একদম অসভ্য হয়ে যাচ্ছেন দিন দিন!”
কিরিস হালকা হাসল।
— “তুমি আমার সামনে থাকলে আমি পৃথিবীর সবথেকে শ্রেষ্ঠ অসভ্য হয়ে যায়।
এই কথাটা বলার ভঙ্গিতে কোনো নাটক ছিল না ছিল একেবারে সহজ, কিন্তু গভীর সত্য। লিসি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নিজের ঠোঁটে হাত দিয়ে তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— “আহহহহ... বেশি কথা বলবেন না। আগে নিচে নামেন, সবাই অপেক্ষা করছে।”
কিরিস আর কিছু বলল না। শুধু একবার লিসির দিকে তাকিয়ে নিল যেন তার এই ছোট্ট রাগ, লজ্জা আর অস্বস্তি সবই তার কাছে অদ্ভুতভাবে আপন। এরপর দু’জনেই প্রস্তুত হয়ে নিল। কিছুক্ষণ পর, তারা একসঙ্গে ঘর থেকে বের হল। ফ্রেশ হয়ে, নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়া দুইজন মানুষ একজনের চোখে স্বাভাবিক কঠোরতা, আর অন্যজনের চোখে শান্ত আর স্বাভাবিক আনন্দের অনুভূতি। ধীরে ধীরে তারা নিচে নামল বিয়ের মূল ভেন্যুর দিকে, যেখানে অপেক্ষা করছিল পরিবার, আলো, আর সেই বড় সামাজিক ভিড় যার মাঝেও এই দু’জনের মধ্যে চলছিল একেবারে আলাদা, নীরব কিন্তু গভীর এক টান।
সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামল কিরিস আর লিসি।
ভেন্যুর ভেতরের পরিবেশ তখন পুরোপুরি বদলে গেছে।
ব্যস্ততা আর আনুষ্ঠানিকতা শেষ এখন চারপাশে ছড়িয়ে আছে ক্লান্তি আর স্বস্তির মিশ্র এক আবহ। কেউ কেউ খাবার শেষে অলস ভঙ্গিতে বসে আছে, কেউ আবার ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গল্পে মেতে আছে। সন্ধ্যা প্রায় নেমে এসেছে। আকাশে হালকা নীলচে-কমলা রঙের ছোঁয়া, আর ভেন্যুর আলোর ঝলকানি একে ধীরে ধীরে রাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বর-কনের পাশে এখনও কিছু আত্মীয় আসা-যাওয়া করছে, তবে মূল ভিড়টা এখন আর আগের মতো নেই সবাই নিজের মতো করে বিশ্রামে। এক পাশে কাজিনদের গোল হয়ে বসা “মিটিং” এখন প্রায় যুদ্ধক্ষেত্রের মতো অবস্থা হাসি, ঠাট্টা, একে অপরকে খোঁচা মারা, আর মাঝেমধ্যে অকারণেই হেসে গড়াগড়ি। কারও মুখে সিরিয়াস কথা নেই, যেন আজকের দিনটা শুধুই আনন্দের জন্য। ঠিক তখনই কিরিস নিচে নামল।
তার উপস্থিতি যেন মুহূর্তেই বাতাসের টোন বদলে দিল। সে চারদিকে একবার তাকাল, তারপর হাত তুলে কয়েকজন ছেলেকে আঙুল দিয়ে ইশারা করল।
ইশারাটা খুব সাধারণ কিন্তু অর্থটা সবাই বুঝে ফেলল।
রেস্ট শেষ। ছেলেরা একে অপরের দিকে তাকাল। কারও মুখে হালকা হাসি, কারও চোখে “আবার শুরু” টাইপ ক্লান্তি। তবে কেউই কিছু বলল না কিরিসের সামনে বলার সাহসও ছিল না, ইচ্ছেও না।
রিহান নিচু গলায় বলল,
— “ bro ডাকছে… উঠতে হবে।”
ইশান হেসে বলল,
— “রেস্টের সময়টা মনে হয় এখানেই শেষ।”
ইয়াবি ওদের দুজনের কাঁধ হাত দিয়ে এগোতে থাকে।
অন্যদিকে লিসি একটু দূরে মেয়েদের দিকে এগিয়ে গেল। তার উপস্থিতি দেখেই কয়েকজন মেয়ে দুষ্টু হাসি বিনিময় করল। হিয়া ফিসফিস করে বলল,
— “এখন এসেছে… দেখি আজকে কী হয়!”
সুরভী মুচকি হেসে বলল,
— “দেরি করে এসেছে, নিশ্চয়ই বিশেষ কিছু ছিল…”
লিসি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবাই তাকে ঘিরে ধরল। শুরু হয়ে গেল মজা, খোঁচা, আর হালকা হাসাহাসি।
কিন্তু ভিড়ের মাঝেও একবার কিরিসের চোখ তার দিকে গেল। লিসি মেয়েদের সাথে মিশে গেছে হাসছে, লজ্জা পাচ্ছে, আবার কখনো বিরক্ত হয়ে কিছু বলছে। কিরিস কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল — “চলো।”
তার কণ্ঠে আদেশ ছিল, কিন্তু চোখে ছিল এক ধরনের শান্ত নজরদারি যেন এই ভিড়, এই হাসি-ঠাট্টার মাঝেও তার একটাই নিশ্চিত দৃষ্টি, লিসির দিকেই।
.......
ভেন্যুর একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল কিরিস, রিহান, ইশান আর ইয়াবি । চারপাশে হাসি-ঠাট্টা চললেও কিরিসের মুখে সেই পরিচিত গম্ভীর ভাব। সে একবার সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— "বিয়ের সব অনুষ্ঠান শেষ হলে, কনে বিদায়ের পর সোজা বাড়িতে যাবে।"
রিহান মাথা নেড়ে বলল — "তারপর?"
কিরিস পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলল,
— "বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হবে। কেউ ঘুমাবে না। কেউ অজুহাত দিবে না।"
ইশান মুখ কুঁচকে বলল — "ভাই, সারাদিনের ধকলের পর। "
কিরিস ভ্রু তুলল ইশান সঙ্গে সঙ্গে চুপ। ইয়াবি পাশে দাঁড়িয়ে হেসে ফেলল কিরিস এবার বলল,
— "রাত দশটার মধ্যে সবাই চলে আসবে।"
ইয়াবি জিজ্ঞেস করল — "কোথায়?"
কিরিস ধীর স্বরে উত্তর দিল — "ব্ল্যাকস্টোন টাওয়ার।"
নামটা শুনেই সবাই বুঝে গেল। ওদের পরিচিত সেই গোপন আস্তানা। রিহান হালকা হেসে বলল,
— "অনেকদিন পর মিটিং বসছে মনে হচ্ছে।"
— "মিটিং না," bro শান্ত গলায় বলল, "কিছু কাজ আছে।"
ওর গলা শুনেই ছেলেরা আর প্রশ্ন করল না।
কারণ কিরিস যখন "কাজ" বলে, তখন সাধারণত সেটা গুরুত্বপূর্ণ কিছুই হয়।
ওদিকে মেয়েদের অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো। লিসি একা একটা সোফায় বসার চেষ্টা করেছিল কিন্তু সে সুযোগ পেল না। জারা, নুসরাত, হিয়া, লিজা, সুরভী আর আরোবি তাকে ঘিরে বসেছে।
— "বল! এতক্ষণ কোথায় ছিলি?"
— "হ্যাঁ, হ্যাঁ, হিসাব দে!"
— "আমরা তো খুঁজেই পাইনি!"
— "এক ঘণ্টা না দুই ঘণ্টা?"
— "নাকি তিন ঘণ্টা?"
কথার সঙ্গে সঙ্গে কেউ গাল টিপে দিচ্ছে, কেউ কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে, কেউ আবার পাশে বসে হেসেই যাচ্ছে।
— "আরে থামো তো!"
লিসি লজ্জায় প্রায় লাল হয়ে বলল। কিন্তু কে শোনে কার কথা! আরোবি নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— "মহোদয়া আজকে খুব ব্যস্ত ছিলেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করার সময় ছিল না।"
সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল। লিসি এবার একটা কুশন তুলে মারার ভান করতেই মেয়েগুলো আরও জোরে হাসতে শুরু করল। এভাবেই হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই সময় কেটে যাচ্ছিল।
এরই মধ্যে সন্ধ্যার আলো পুরোপুরি মিলিয়ে গিয়ে চারপাশে রাতের আবহ নেমে এসেছে। ভেন্যুর ঝাড়বাতি, ফেয়ারি লাইট আর সাজসজ্জার আলোয় পুরো জায়গাটা ঝলমল করছে। একটু দূরে বাড়ির বড়রা একত্রে বসে ছিলেন। আনোয়ার সাহেব, আনারুল সাহেব, তিশার বাবা, কয়েকজন চাচা, মামা এবং পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা আলোচনা করছিলেন। শেষমেশ আনোয়ার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— "আচ্ছা, এবার মনে হয় বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে হবে।"
আনারুল সাহেব মাথা নেড়ে বললেন
— "হ্যাঁ, রাতও হয়ে যাচ্ছে।"
তিশার বাবা চারপাশে তাকিয়ে বললেন,
— "সবাইকে ডাকা হোক। কনে বিদায়ের সময় হয়ে এসেছে।"
কথাটা ছড়িয়ে পড়তেই পরিবেশের রং যেন একটু বদলে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে শুধু হাসি-আনন্দ ছিল, সেখানে এখন ধীরে ধীরে আবেগের একটা স্রোত তৈরি হতে শুরু করল। কারণ যত আনন্দই হোক বিদায়ের মুহূর্ত সবসময়ই আলাদা। আর সেই মুহূর্তটিই এখন ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসছে। ধীরে ধীরে হাসি-ঠাট্টায় ভরা সন্ধ্যাটার রং বদলে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে চারপাশ কাঁপছিল হাসির শব্দে, সেখানে এখন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। ভেন্যুর মূল গেটের সামনে প্রায় সবাই জড়ো হয়েছে। সাজানো আলো এখনও জ্বলছে, কিন্তু সেই আলোর উজ্জ্বলতার মাঝেও বিদায়ের বিষণ্নতা স্পষ্ট। তিশা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ভারী শাড়িটা সামলে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। কাবির একদম পাশে দাঁড়িয়ে আছে, এক হাতে তিশার শাড়ির আঁচলটা ধরে সাহায্য করছে, অন্য হাতে মাঝে মাঝে ওকে সামলে দিচ্ছে। তিশার চোখ দুটো টলমল করছে। এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিদায়ের মুহূর্ত সামনে আসতেই বুকের ভেতর জমে থাকা সব আবেগ যেন একসঙ্গে জেগে উঠল। কাবেনা বেগম সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিশা একবার মায়ের দিকে তাকাল।
তারপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
— "আম্মু..."
এক ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। পরের মুহূর্তেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নয় একেবারে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
কাবেনা বেগমও মেয়েকে বুকে চেপে ধরলেন। তার নিজের চোখ দিয়েও অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। চারপাশ থেকে সবাই বোঝানোর চেষ্টা করছে।
— "আরে মা, কান্না করিস না।"
— "পরের বাড়ি তো যাচ্ছিস না!"
— "নিজের মানুষদের কাছেই যাচ্ছিস।"
— "কালকেই আবার দেখা হবে।"
কিন্তু বিদায়ের কান্না কি এসব যুক্তি মানে?
মনের ভেতরের টান তো আর দূরত্ব দিয়ে মাপা যায় না।
তিশা এরপর বাবার দিকে এগিয়ে গেল।
— "আব্বু..."
আনারুল সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করছেন, কিন্তু চোখের কোণে জমে থাকা জল লুকাতে পারলেন না। তিশা বাবাকে জড়িয়ে ধরতেই তিনি শুধু বললেন,
— "ভালো থাকিস মা..."
ব্যস। এই দুটো শব্দেই যেন হাজারটা অনুভূতি লুকিয়ে ছিল। বাবা তাদের ভালেবাসার ব্যাখা হাজার শব্দ নয় বরং কয়েকটি শব্দে তারা প্রকাশ করে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ইয়াবি সে চুপচাপ একদম চুপ।
ছোটবেলা থেকে বোনটার জন্য কত কিছু করেছে, কত ঝগড়া করেছে, কতবার আগলে রেখেছে সেসব স্মৃতি যেন একসঙ্গে ভিড় করছে। চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে।
তিশা এবার ভাইয়ের দিকে তাকাল আর পারল না।
— "ভাইয়া..."
দৌড়ে গিয়ে ইয়াবিকে জড়িয়ে ধরল। ইয়াবি সঙ্গে সঙ্গে বোনকে বুকের মধ্যে টেনে নিল। নিজেও চোখ নামিয়ে ফেলল।
— "কাঁদিস না পাগলি..."
গলাটা কেঁপে উঠল তারও।
— "আমি তো আছিই।"
তিশা মাথা নাড়ছে, আবার কাঁদছেও। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় সবার চোখেই জল। কেউ প্রকাশ করছে, কেউ লুকানোর চেষ্টা করছে। আরোবি ইয়াবির পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব দেখছে। তার চোখেও হালকা জল।
রিহান আর নুসরাত পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। নুসরাত চোখ মুছতেই রিহান টিস্যু এগিয়ে দিল। তারপর নিজেই আরেকটা টিস্যু বের করে নিজের চোখও মুছে ফেলল।
নুসরাত তাকিয়ে বলল,
— "তুমি কাঁদছো নাকি?"
রিহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— "ধুলো গেছে চোখে।"
— "রাতে?"
— "হ্যাঁ। রাতের ধুলো।"
নুসরাত চোখ ঘুরিয়ে তাকাল। এদিকে জারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে চোখ মুছছে। ঠিক তখনই ইশান অত্যন্ত গম্ভীর মুখে জারার শাড়ির আঁচল টেনে নিয়ে নিজের চোখ মুছতে শুরু করল জারা প্রথমে বুঝতে পারেনি।
তারপর দেখে চিৎকার করে উঠল,
— "এইইই! আমার শাড়ি!"
ইশান নাক টেনে বলল,
— "অনুভূতি সামলাতে পারছি না।"
— "টিস্যু ছিল না?"
— "তোমার আঁচলটা বেশি আবেগী।"
পাশ থেকে রিহান হেসে কুঁকড়ে গেল। আর হিয়া, লিজা আর সুরভীর অবস্থা আরও করুণ। তিনজনই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে আবার একে অপরকে টিস্যু দিচ্ছে।
আবার কাঁদছে আবার বলছে,
— "মেকআপ নষ্ট হয়ে গেল!"
— "আমার আইলাইনার শেষ!"
— "আমার মাসকারা গলে গেছে!"
এরপর আবার তিনজন একসঙ্গে কেঁদে উঠছে।
চারপাশের মানুষজন কান্নার মাঝেও হেসে ফেলল।
রিহান মাথা নেড়ে বলল,
— "এদেরকে দেখে মনে হচ্ছে বিদায় না, বিউটি পার্লারের জরুরি সভা বসেছে।"
সঙ্গে সঙ্গে আশপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।
কান্না আর হাসি দুটো অনুভূতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল সেই মুহূর্তে। কারণ বিদায়ের রাতগুলো এমনই হয়।
চোখে জল থাকে, বুক ভারী হয়ে থাকে তবুও কাছের মানুষগুলো থাকলে, কান্নার মাঝেও কোথাও না কোথাও একটু হাসি ঠিকই থেকে যায়।

0 Comments