পর্ব :85
গেটের সামনে তখন বিদায়ের আবহ পুরোপুরি নেমে এসেছে। তিশা একবার মায়ের কাছে, একবার বাবার কাছে, আবার ভাইয়ের কাছে গিয়ে কাঁদছে। আর চারপাশের সবাই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে।
কাবির শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে দুই হাত কোমড়ে রেখে বলল — "শোনো, তুমি যদি আর পাঁচ মিনিট কাঁদো, তাহলে আমি কিন্তু এখানেই আবার বিয়ে বাতিল ঘোষণা করে দেব!"
তিশা কান্নার মাঝেই চোখ বড় বড় করে তাকাল।
— "কি?!"
ইশান সঙ্গে সঙ্গে বলল — "হ্যাঁ, আবার নতুন করে পাত্র খোঁজা হবে।"
রিহান গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল,
— "ইতিমধ্যে তিনজন লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।"
জারা চোখ পাকিয়ে বলল,
— "তোমাদের মাথা খারাপ!"
সুরভী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "দেখছো? বউ বিদায় হচ্ছে, আর এদের ফাজলামি বন্ধ হচ্ছে না।"
— "এটাই তো আমাদের দায়িত্ব।"
ইশান বুক ফুলিয়ে বলল।
— "মানুষ কাঁদবে, আমরা হাসাবো।"
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— "তুমি কাউকে হাসাও না, বিরক্ত করো!"
সবাই হেসে ফেলল এদিকে সুরভী চোখ মুছতে মুছতে বলল — "তিশা একটা কথা বলি?"
— "কি?"
— "বাড়িতে গিয়ে যদি কাবির বেশি জ্বালায়, আমাদের বলে দিবি "
জারা সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল — "আমরা ওনাকে অপহরণ করে নিয়ে যাব।"
কাবির নাটকীয় ভঙ্গিতে পিছিয়ে গেল।
— "এই পরিবারে আমার কোনো সম্মান নেই!"
আরো এক দফা হাসির রোল উঠল। কিছুক্ষণ পর বড়রা এগিয়ে এলেন একজন একজন করে তিশার মাথায় হাত রেখে দোয়া করতে লাগলেন।
— "সুখে থাকো মা।"
— "সংসার আলো করে রেখো।"
— "আল্লাহ তোমাদের দাম্পত্য জীবনে বরকত দান করুন।"
— "সবসময় একে অপরের পাশে থাকবে।"
তিশা কাঁদতে কাঁদতেই সবার দোয়া নিল। চারপাশে আবেগ আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
কিন্তু এই ভিড়ের একটু দূরে... এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল লিসি কেউ খেয়াল করেনি।
সে পুরো ঘটনাটা দেখছিল। তিশার কান্না... মাকে জড়িয়ে ধরা... বাবার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলা... ভাইকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা...
সবকিছু তার চোখ দুটো ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠেছে।
অজান্তেই শাড়ির আঁচলটা মুঠো করে চেপে ধরল।
বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠছে।
তারও তো মা ছিল বাবাও ছিল। আজ যদি তারা থাকত...
তাহলে তার বিয়ের সময় হয়তো সেও একবার তাদের বুকে মুখ লুকিয়ে বলতে পারত— "আমি যাচ্ছি..."
যদিও তার বিয়ে তেমন ভাবে হয়নি কিন্তু তারা বেঁচে থাকলে হয়তো এইভাবে হতো। তার বাবা তো তাকে এভাবে কারোর হাতে ওকে তুলে দিতো না। ভাবনাটা আসতেই চোখের কোণে জমে থাকা জল আর আটকে রাখতে পারল না।
এক ফোঁটা...
দুই ফোঁটা...
তারপর নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়তে লাগল লিসি মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল কেউ যেন না দেখে কিন্তু একজন দেখছিল। দূর থেকে সবকিছু দেখছিল কিরিস।
সে বুঝতে পেরেছিল তিশার জন্য লিসি কাঁদছে না।
সে কাঁদছে নিজের না-পাওয়াগুলোর জন্য। নিজের শূন্যতার জন্য। ধীরে ধীরে কিরিস এগিয়ে এল। কিছু না বলে লিসির পিছনে দাঁড়াল। তারপর খুব আস্তে করে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। পরের মুহূর্তেই শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। এমনভাবে, যেন পৃথিবীর কোনো দুঃখ তার কাছে পৌঁছাতে না পারে এক হাত লিসির মাথার পেছনে অন্য হাত তার কাঁধে। মাথার ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "সুইটহার্ট... কেন কাঁদছো?"
লিসি কোনো উত্তর দিতে পারল না। শুধু আরও শক্ত করে কিরিসের শার্টটা মুঠো করে ধরল। কিরিস নিচু হয়ে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
— "এইদিকে তাকাও..."
নরম গলায় বলল সে।
— "আমার দিকে তাকাও।"
লিসি মাথা নাড়ল পারছে না। চোখের জল থামছেই না।
কিরিস আরও একটু কাছে টেনে নিল। এমনভাবে আড়াল করে রাখল, যেন আশেপাশের কেউ তার কান্না দেখতে না পায়।
— "শোনো..."
তার গলা ছিল অস্বাভাবিক কোমল।
— "তুমি একা নও।"
লিসি ফুঁপিয়ে উঠল।
— "আমি জানি..."
— "না, তুমি এখন জানো না।"
কিরিস মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
— "যতদিন আমি আছি, তোমার চোখের জল পড়বে না।"
লিসি আর কিছু বলল না শুধু মুখটা লুকিয়ে রাখল তার বুকের মধ্যে। আর কিরিস দাঁড়িয়ে রইল চারপাশে বিদায়ের কান্না, দোয়া, ভালোবাসা, হাসি-ঠাট্টা চলছিল।
কিন্তু সেই মুহূর্তে তার সমস্ত মনোযোগ ছিল শুধু এক জায়গায় তার বউয়ের চোখের জল যেন আর কেউ দেখতে না পায়।
......কয়েক মিনিট পরে......
কিরিস এখনও লিসিকে নিজের বুকের মধ্যে আগলে রেখেছে। চারপাশে বিদায়ের কান্না, মানুষের ভিড়, দোয়া আর আবেগের ঢেউ চললেও সে যেন সবকিছু থেকে লিসিকে আড়াল করে রেখেছে। লিসির আঙুলগুলো এখনও কিরিসের শার্ট শক্ত করে ধরে আছে কিরিস নিচু হয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। চোখ দুটো লাল।
গালে অশ্রুর দাগ। দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। মৃদু স্বরে বলল
— "জানো, আমার এখন মৃত শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতিও হিংসা হচ্ছে।"
লিসি ভেজা চোখে তাকাল কিরিস হালকা হেসে বলল,
— "কারণ তাদের জন্য তুমি তোমার এত সুন্দর চোখে পানি ফেলছ।"
তার আঙুল আলতো করে লিসির চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছে দিল।
— "আমি চাই না তোমার এই চোখে কষ্টের জল থাকুক।"
লিসি চুপ কিরিস আরও নরম গলায় বলল,
— "তুমি যখন হাসো, তখন এই চোখ দুটো সবচেয়ে সুন্দর লাগে।"
লিসি ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে রইল। কিরিস বুঝল, এখন বড় বড় কথা কাজ করবে না। তাই হঠাৎ গম্ভীর মুখে বলল,
— "আচ্ছা আচ্ছা, এবার চুপ করো।"
— "..."
— "বাড়ি ফেরার সময় কেক কিনে দেব।"
লিসি চোখ তুলে তাকাল।
— "..."
— "চকলেটও কিনে দেব।"
— "..."
— "আর যা চাইবে তাই কিনে দেব।"
এবার লিসির কান্নার মাঝেই হাসি পেয়ে গেল।
— "সব দিবেন?"
— "হুম।"
— "সত্যি?"
কিরিস ভান করে চিন্তা করার অভিনয় করল।
— "দেখি... বাজেটের ওপর নির্ভর করছে।"
লিসি সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে একটা চিমটি কাটল।
কিরিস হেসে উঠল।
— "আচ্ছা আচ্ছা, দিবো। সব দিবো।"
তারপর কপালে আলতো টোকা দিয়ে বলল,
— "আমার বউ জানের জন্য পুরো দুনিয়াও যদি লাগে, সেটাও হাজির করব।"
লিসির মুখে অবশেষে ছোট্ট একটা হাসি ফুটল।
ওদিকে বিদায়ের প্রস্তুতি প্রায় শেষ ইয়াবি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখে জল নেই বললেই চলে, কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছে ভেতরে কতটা ঝড় চলছে ঠিক তখনই আরোবি পাশে এসে দাঁড়াল। ইয়াবি হাতড়ে কিছু একটা খুঁজছে... সম্ভবত টিস্যু। আরোবি সেটা বুঝে হালকা বিরক্ত মুখে নিজের শাড়ির আঁচলটা এগিয়ে দিল।
— "নে, এটা দিয়ে মুছে নে।"
ইয়াবি অবাক হয়ে তাকাল।
— "কি?"
— "চোখ।"
আরোবি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল
— "তোকে কেমন ভ্যাবলার মতো লাগছে।"
কয়েক সেকেন্ড ইয়াবি শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল।
যেন ওই চোখ দুটোর ভেতর কিছু খুঁজছে। কিন্তু বরাবরই মতো ফাঁকা সে যেটা খুজবে আরোবির দুটি চোখে তা অনেক আগেই আরোবি বিসর্জন দিয়েছে সঙ্গে তার সকল ভালোলাগার অনূভুতি গুলোও মাটি চাপা দিয়েছে। ইয়াবি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, সে জানে এটার কারণ তাই কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে আঁচলটা হাতে নিল।তারপর চোখটা মুছে ফেলল। মুছে শেষ করে আঁচলটা আবার ফিরিয়ে দিতে দিতে মুচকি হেসে বলল,
— "ধন্যবাদ।"
আরোবি মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসি লুকাতে পারল না। এদিকে কাবির তিশাকে আগলে নিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এক হাতে তিশার ব্যাগ অন্য হাতে তিশার শাড়ির আঁচল সামলাচ্ছে।
তিশা এখনও মাঝেমধ্যে চোখ মুছছে। কাবির নিচু গলায় কিছু একটা বলতেই মেয়েটা কান্নার মাঝেও হালকা হেসে ফেলল। ধীরে ধীরে তারা বরের গাড়িতে উঠে বসল।
সামনের গাড়িতে উঠে গেছেন আনোয়ার সাহেব, আনারুল সাহেব, কাবেনা, সাবেনা এবং পরিবারের অন্য বড়রা।
এক এক করে গাড়িগুলো স্টার্ট নিতে শুরু করল।
কাজিনরাও নিজেদের মতো করে গাড়িতে উঠছে।
ঠিক তখনই আরোবি জানালা দিয়ে মাথা বের করে চিৎকার দিল,
— "এই লিসি!"
লিসি তাকাল আরোবি আঙুল নেড়ে বলল,
— "জলদি আসিস!"
— "কেন?"
— "আমি কিন্তু তোর জন্য ওয়েট করতে করতে বোর হয়ে গেলে দায়ী তুই!"
পাশ থেকে জারা বলে উঠল,
— "মিথ্যা কথা! পাঁচ মিনিট পরেই ফোন দিবে।"
— "চুপ!"
আরোবি প্রতিবাদ করল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ভেতর হাসির রোল পড়ে গেল। বিদায়ের কান্না এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবু সেই কান্নার ফাঁকেই রয়ে গেল প্রিয় মানুষদের খুনসুটি, ভালোবাসা আর ফিরে দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি।
এক এক করে গাড়িগুলো রাতের অন্ধকারে এগিয়ে যেতে লাগল। আর পেছনে রয়ে গেল আলোয় ভরা সেই বাড়ি, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও ছিল উৎসব, হাসি আর এক অবিস্মরণীয় বিদায়ের মুহূর্ত।
বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা প্রায় শেষ। উৎসবের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এসেছে। বাইরে রাত নেমেছে অনেকক্ষণ আগেই। একে একে বেশিরভাগ গাড়িই রওনা দিয়েছে, শুধু কয়েকটি গাড়ি এখনো ভেন্যুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কিরিসের কিছু জরুরি কাজ পড়ায় সে মার্ক ও ইয়াবিকে নিয়ে বেরিয়েছে। যাওয়ার আগে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যেন লিসির কোনো অসুবিধা না হয়।
বড় হলরুমের একপাশে সোফায় বসে আছে লিসি। একই রকম সাজ এখনো তার গায়ে, তবে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবুও তার সৌন্দর্যে যেন কোনো ভাঁটা পড়েনি। হালকা আলোতেও তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো শিল্পীর আঁকা জীবন্ত ছবি। হাতে ফোন নিয়ে কয়েকবার কিরিসকে কল করলো সে কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।
— "হ্যাঁ, বলো।"
— "আপনি কোথায়?"
— "বাইরেই আছি। একটা জরুরি কাজ আছে।"
— "আর কতক্ষণ লাগবে?"
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো,
— "অনেকক্ষণ লাগতে পারে। তুমি অপেক্ষা করো। ফুফুরা তো আছেন, লিজাও আছে। ওদের সঙ্গে গল্প করো। আমি কাজ শেষ করেই আসছি।"
— "আচ্ছা..."
— "খাবার খেয়ে নিও। আর একদম চিন্তা করবে না।"
— "হুম।"
কল কেটে গেল।
লিসি দীর্ঘশ্বাস ফেললো প্রথমে ভেবেছিল আজ বাড়ি ফিরে ঠান্ডা পানিতে একটা শান্তির শাওয়ার নেবে, তারপর আরাম করে ঘুমাবে। কিন্তু সেই আশায় যেন পানি পড়ে গেছে।
সময় গড়াতে লাগলো।
রাত দশটা...
এগারোটা...
তারপর ধীরে ধীরে বারোটার দিকেও এগোতে শুরু করলো এখন ভেন্যুতে শুধু ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরাই আছে, কাবেনা এসে বললেন,
— "মা, তোমরা খেয়ে নাও। ”
লিসি ও লিজা বাধ্য হয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিল।
খাওয়ার পর সবাই আবার বড় রুমটিতে বসে গল্প শুরু করলো। কাবেনার বাড়ির বয়স্ক মহিলারা যেন সুযোগ পেয়ে গেছেন। একজন হেসে বললেন,
— "মা, রান্নাবান্না করতে পারো তো?"
লিসি ভদ্রভাবে মাথা নাড়লো।
— "জি, পারি।"
আরেকজন বললেন,
— "কি কি রান্না পারো?"
— "মোটামুটি সবই।"
— "বাহ! আজকালকার মেয়েদের তো রান্নাঘরে দেখাই যায় না।"
আরেকজন আগ্রহ নিয়ে বললেন,
— "সেলাই জানো?"
— "অল্প একটু।"
— "সংসারের কাজ?"
— "সেগুলোও করি।"
মহিলারা সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন।ঠিক তখন কাবেনা হেসে বললেন
— "আমার ছোট বোন আমেনার মেয়ে ও।"
কথাটা শুনে কয়েকজন মহিলা একসাথে তাকালেন।
— "ওহ্! আমেনার মেয়ে?"
— "হ্যাঁ।"
— "তোমার বিয়েতে দেখেছিলাম মনে হয়।"
— "দেখেছিলেন।"
— "একদম মায়ের মতো হয়েছে।"
— "চেহারা, চোখ-মুখ সবই।"
— "বরং আরো বেশি সুন্দর হয়েছে।"
— "আমেনাও খুব সুন্দরী ছিল।"
— "আল্লাহ্, কী মিষ্টি মেয়ে!"
একটার পর একটা প্রশংসা আর গল্প চলতেই থাকলো।
লিসি শুধু ভদ্রভাবে হাসছে। পাশে বসে থাকা লিজা ধীরে ধীরে তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো,
— "তুই তো ফেঁসে গেছিস রে!"
লিসি অবাক হয়ে তাকালো
— "কেন?"
— "এরা যদি একবার কথা বলা শুরু করে, তাহলে আর শেষ নেই। ভোর হয়ে যাবে, তবু থামবে না।"
বলেই লিজা নিজের ফোন বের করে স্ক্রল করতে শুরু করলো। লিসি অসহায় মুখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
সময় আরও এগোলো। রাত এখন প্রায় বারোটার কাছাকাছি। সারাদিনের ক্লান্তি, বিয়ের অনুষ্ঠান, অতিথিদের ভিড় সব মিলিয়ে তার চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছে। চারপাশে এখনো গল্প চলছে। কেউ পুরোনো দিনের স্মৃতি বলছে। কেউ আত্মীয়তার হিসাব কষছে।
কেউ আবার আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে। বড় রুমের একপাশে কয়েকজন ছোট বাচ্চা আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ মায়ের কোল ঘেঁষে, কেউ সোফার উপর গুটিসুটি মেরে।লিসি প্রথমে সোজা হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করলো। তারপর মাথাটা ধীরে ধীরে সোফার পেছনে ঠেকিয়ে দিল। একবার ফোনের স্ক্রিনে তাকালো। কিরিসের কোনো খবর নেই।
কোনো মেসেজও না। মুখে হালকা অভিমান ফুটে উঠলো। মনে মনে বিড়বিড় করলো,
"মানুষটা গেল কোথায়?"
কিছুক্ষণ পর আর চোখ খোলা রাখতে পারলো না।
ধীরে ধীরে তার পাপড়িগুলো নুয়ে এলো। মাথাটা একপাশে কাত হয়ে গেল। আর সবার গল্পের মাঝেই, শিশুদের মতো শান্ত মুখে, গভীর ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লো লিসি। রুমজুড়ে তখনও গল্পের আসর চলছে।
কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝেও ঘুমন্ত লিসির মুখে এমন এক প্রশান্তি ছড়িয়ে ছিল, যেন চারপাশের পৃথিবীর কোনো শব্দই আর তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
অন্যদিকে...
শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, আধা-নির্মিত একটি পুরোনো গুদামঘরের সামনে এসে থামলো কালো রঙের এসইউভিগুলো। গাড়ি থেকে নেমেই ইয়াবি চারপাশে তাকালো। জায়গাটা অস্বাভাবিক রকমের নির্জন। চারদিকে কিরিসের লোকজন পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে। মার্ক সামনে এগিয়ে দরজা খুলে দিল।
ভেতরে ঢুকতেই ইয়াবির ভুরু কুঁচকে গেল। তারপর পরের মুহূর্তেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল। গুদামের ভেতরে রাহভানের কয়েকজন লোককে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে তাদের গায়ে শুধু underwear ছাড়া আর কিছুই নেই। তাদের অবস্থা দেখে ইয়াবি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলো না।
— ".. হাহাহা..."
ইয়াবি বিশন পরিমান হাচ্ছে থামার নামই নেই। মার্ক বিরক্ত হয়ে তাকালো
— "কি হলো?"
ইয়াবি আবারও হাসলো
— "না ... কিছু না..."
সামনে বসে থাকা লোকগুলোর মুখের অবস্থা এমন, যেন জীবনের সব দম্ভ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উধাও হয়ে গেছে।
এদিকে কিরিসের মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। যেন বিষয়টা তার কাছে একদম স্বাভাবিক। সে ধীর পায়ে হেঁটে সামনে রাখা চেয়ারে বসলো। এক পা আরেক পায়ের উপর তুলে শান্ত গলায় বললো,
— "মার্ক।"
— "জি, বস।"
— "এদেরকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলো।"
— "কোথায় শিফট করবো?"
— "আগের জায়গায় না। নতুন লোকেশন ব্যবহার করো।"
মার্ক মাথা নাড়লো।
— "ঠিক আছে।"
কিরিস আবার বললো,
— "এদের খবর বাইরে যাওয়া চলবে না। একজনও মুখ খুলতে পারবে না।"
— "বুঝেছি।"
লোকগুলো ভয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলো। কেউ একটি শব্দও করার সাহস পেল না কিছুক্ষণ পরে কিরিস টেবিলের উপর রাখা ফাইলের দিকে তাকালো।
মার্ক কয়েকটি তথ্য সামনে রাখলো।
পরবর্তী চাল, ব্যবসার কিছু বিষয় এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চললো।
পুরো সময়টাতেই কিরিসের কণ্ঠ ছিল ঠাণ্ডা এবং হিসেবি।
যে মানুষটাকে পরিবারের সবাই শুধু রাগী ব্যবসায়ী হিসেবে জানে, এই মুহূর্তে তাকে দেখলে কেউ অন্য কিছুই ভাবতো। আলোচনা শেষ হওয়ার পর ইয়াবি হঠাৎ বললো,
— "তূর্য আর আরিয়ান আসবে না নাকি?"
কিরিস মোবাইলের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
— "আসবে।"
— "কবে?"
— "কালকে।"
একটু থেমে আবার বললো,
— "না হলে পরশু।"
ইয়াবি মাথা নাড়লো।
— "অনেকদিন হলো সবাই একসাথে বসা হয় না। একসাথে অনেক ফান করতাম।
কিরিসের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটলো। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শেষ হতেই সবাই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
মার্ক থেকে গেল বাকি ব্যবস্থাপনার জন্য। কিরিস ও ইয়াবি গাড়িতে উঠে বসল। ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই কালো গাড়িটি রাতের অন্ধকার চিরে এগিয়ে চললো।
ফিরে যাচ্ছে ভেন্যুর দিকে।
আর ওদিকে... ভেন্যুর বড় রুমে তখনও আত্মীয়স্বজনদের গল্প চলছে। কেউ চা খাচ্ছে, কেউ পুরোনো স্মৃতি বলছে লিজা ফোন হাতে বসে আছে।
আর লিসি...
সোফার এক কোণে মাথা কাত করে গভীর ঘুমে ডুবে আছে তার পাশে টোট ব্যাগটা রাখা কোলে ছোট ব্যাগটা। মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে দেখতে যেন আরও শান্ত, আরও কোমল লাগছে। কেউ জানেই না, যার জন্য সে এতক্ষণ অপেক্ষা করছে, সেই কিরিস ইতিমধ্যেই ফেরার পথে। ভেন্যুর অধিকাংশ আলো নিভে গেছে। কেবল কয়েকটি ঝাড়বাতির নরম আলো বিশাল হলরুমটাকে আধো-আলো, আধো-অন্ধকারে ঢেকে রেখেছে। ঠিক সেই সময় দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো কিরিস। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, মুখে সারাদিনের ক্লান্তির লেশমাত্র নেই। বরং চোখে সেই চিরচেনা স্থিরতা। মার্ক ও ইয়াবি কিছুক্ষণ আগেই নিজেদের গাড়িতে চলে গেছে। ভেন্যুর বাইরে এখন দাঁড়িয়ে আছে কিরিসের নতুন ইমপোর্ট করা ল্যাম্বরগিনি।
মার্ক কয়েকদিন আগেই গাড়িটি সরাসরি কোম্পানি থেকে এনে দিয়েছে। অবশ্য জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরীর জন্য এটা কোনো বড় বিষয়ই নয়। যে মানুষ প্রয়োজনে বিদেশ থেকে বিরল গাছের জন্য মাটি পর্যন্ত আনিয়ে নিতে পারে, তার কাছে একটি গাড়ি নিছকই দৈনন্দিন ব্যাপার।
হলরুমে ঢুকেই কিরিসের দৃষ্টি গিয়ে থামলো এক কোণে।
সেখানে সোফার উপর মাথা কাত করে ঘুমিয়ে আছে লিসি। চারপাশে গল্প চলছে কেউ পুরোনো স্মৃতি বলছে।
কিন্তু এসবের মাঝেও লিসি যেন নিজের ছোট্ট এক জগতে হারিয়ে গেছে। চোখ দুটো বন্ধ। এক হাত আলতো করে নিজের ছোট ব্যাগটার উপর রাখা। মুখে অপার্থিব প্রশান্তি। কিরিস কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। ফুফুর সামনে গিয়ে বললো,
— "ফুফু, আমরা তাহলে উঠি। অনেক রাত হয়ে গেছে।"
কাবেনা মুচকি হেসে বললেন,
— "হ্যাঁ বাবা। সাবধানে যেও।"
জামাইবাবুও মাথা নাড়লেন।
— "গিয়ে খবর দিয়ো।"
— "জি।"
কিরিস আবার লিসির দিকে তাকালো।
তারপর নিচু হয়ে কয়েক সেকেন্ড মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা এমনভাবে ঘুমাচ্ছে যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তার নেই তাকে ডাকলো না ঘুম ভাঙালো না।
শুধু এক হাত তার পিঠের নিচে, আরেক হাত হাঁটুর নিচে নিয়ে অত্যন্ত সাবধানে তাকে কোলে তুলে নিল।
ঘুমন্ত অবস্থায় লিসি অজান্তেই আরও একটু তার বুকের দিকে সরে এলো। কিরিসের চোখ মুহূর্তের জন্য নরম হয়ে উঠলো। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা লিজা তখন নিচে পড়ে থাকা ysl হাই হিল জোড়া হাতে তুলে নিয়ে বললো,
— "ভাইয়া, এটা?"
এক হাতেই লিসিকে ধরে রেখে অন্য হাতে জুতোগুলো নিয়ে নিল কিরিস। তারপর লিসির টোট ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে বললো,
— "লিজা, ওটা আমার গাড়ির সামনে রেখে দে।"
— "আচ্ছা ভাইয়া।"
লিজা সঙ্গে সঙ্গে ভদ্র মেয়ের মতো ব্যাগটা তুলে নিল।
এদিকে পুরো রুমের বয়স্ক মানুষজন চুপচাপ তাকিয়ে আছেন কারও মুখে চাপা হাসি। কারও চোখে স্নেহ।
কারও মুখে বিস্ময়। একজন বয়স্ক চাচা মৃদু হেসে বললেন — "ছেলেটার লজ্জা-শরম বলে কিছু নেই।"
পাশ থেকে আরেকজন বললেন
— "আরে, এখনকার ছেলেপেলেরা এমনই।"
কথাটা শুনে কিরিস থামলো। মাথা ঘুরিয়ে তাদের দিকে তাকালো। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললো
— "যে নারী আমার স্ত্রী, তাকে বহন করতে আমার সংকোচ হয় না। সম্মান করতে লজ্জা লাগে না। পৃথিবী যা খুশি ভাবুক, আমার কাছে সে সর্বদা আমার দায়িত্ব, আমার সম্মান এবং আমার আপনজন।"
কথাটা শুনে পুরো রুম কয়েক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেল। কেউ আর কিছু বললো না। শুধু অনেকের মুখেই প্রশংসার হাসি ফুটে উঠলো। কিরিস আর দাঁড়ালো না।
কোলে ঘুমন্ত লিসি। এক হাতে তার জুতো।
ধীর, স্থির পদক্ষেপে দরজার দিকে এগিয়ে চললো।
বাইরে রাতের ঠান্ডা বাতাস বইছে। ভেন্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটা সাধারণ কোনো সুপারকার নয়।
এটি ছিল Lamborghini Revuelto— ল্যাম্বরগিনির সর্বাধুনিক V12 হাইব্রিড সুপারকারগুলোর একটি। নিচু, আগ্রাসী নকশা, তীক্ষ্ণ হেডলাইট আর যেন শিকারি প্রাণীর মতো গড়ন। রাতের আলোয় গাড়িটাকে আরও ভয়ংকর সুন্দর লাগছিল। কিরিস গাড়ির কাছে এসে এক মুহূর্ত থামলো। তার কোলে তখনও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে লিসি। গাড়ির দরজা ওপরে উঠে খুলে গেল। লিজা ব্যাগটা সামনে রেখে ভেতরে চলে যেতেই চারপাশ আরও নির্জন হয়ে গেল। কিরিস নিচু হয়ে প্রথমে লিসির শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে দিল। তারপর সাবধানে তাকে নিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল। তবে আলাদা সিটে নয়।
যেভাবে রিহানের বিয়ের রাতে তাকে আগলে রেখেছিল, ঠিক সেভাবেই। লিসিকে নিজের কোলে বসিয়ে নিল।
ঘুমন্ত লিসি অজান্তেই মুখ গুঁজে দিল তার বুকে।
কিরিস একবার নিচে তাকালো। মেয়েটার মুখে এমন প্রশান্তি, যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। সে ধীরে ধীরে লিসির লম্বা চুলগুলো সরিয়ে দিল। শাড়ির ভাঁজগুলো গুছিয়ে দিল। যেন কোথাও একটুও অস্বস্তি না হয়। তারপর বুকের সঙ্গে আরও একটু শক্ত করে আগলে নিয়ে সিটবেল্ট টেনে দুজনকে একসাথে আটকে নিল। গাড়ির সামান্য ঝাঁকুনিতেও যাতে লিসি সামনে হেলে না পড়ে। সবকিছু নিশ্চিত করে তবেই স্টার্ট বাটনে চাপ দিল। গাড়ির উপরের অংশ নামিয়ে দিলো।
পরের মুহূর্তেই—
গর্জে উঠলো Lamborghini Revuelto-এর V12 ইঞ্জিন।
নিস্তব্ধ রাত যেন এক ঝটকায় কেঁপে উঠলো।
গভীর, ভারী, শক্তিশালী সেই শব্দ শুনলেই বোঝা যায়
এটা কোনো সাধারণ গাড়ি নয়।
স্টিয়ারিংয়ে এক হাত। অন্য হাতটা লিসির কোমর জড়িয়ে আছে। যেন ঘুমন্ত মেয়েটাকে পৃথিবীর সব বিপদ থেকে আড়াল করে রেখেছে। ধীরে ধীরে গাড়িটা ভেন্যু ছেড়ে বেরিয়ে এলো। তারপর মেইন রোডে উঠতেই গতি বাড়তে শুরু করলো। কিরিসের ড্রাইভিং দক্ষতা নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। তার আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। যে গতিতে অধিকাংশ মানুষের হাত কাঁপতে শুরু করবে, সেই গতিতেও তার চোখের পলক পর্যন্ত পড়ে না। রেস ট্র্যাকে নামলে সে প্রথম সারির ড্রাইভারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে এমনটাই বলে তার পরিচিতরা।
তবু আজ তার গতি নিয়ন্ত্রিত। কারণ তার কোলে ঘুমিয়ে আছে লিসি। রাতের হাইওয়ে প্রায় ফাঁকা। দূরে দূরে ছুটে যাচ্ছে কয়েকটি ট্রাক। কোথাও কোনো বাসের আলো।
কোথাও আবার নির্জন অন্ধকার। জানালার বাইরে শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে। রাস্তার দুই ধারে সারি সারি গাছ। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে।
আর দূর থেকে শোনা যাচ্ছে রাতজাগা শহরের অস্পষ্ট গুঞ্জন। কিরিস নিচে তাকালো। লিসি আরও একটু তার বুকের সঙ্গে লেপ্টে এসেছে। ঘুমের ঘোরে যেন অবচেতনভাবেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।
কিরিসের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠলো।
এক মুহূর্তের জন্য স্টিয়ারিং থেকে চোখ না সরিয়েই সে মাথা নিচু করে লিসির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
তারপর আবার সামনে তাকালো। ল্যাম্বরগিনির ইঞ্জিন গর্জন তুলে রাতের মহাসড়ক চিরে এগিয়ে চললো।
আর সেই গাড়ির ভেতরে একজন পৃথিবী কাঁপানো ক্ষমতাবান মানুষ। আর তার বুকের মধ্যে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা একমাত্র নারী, যার সামনে জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরীর সমস্ত কঠোরতা নিঃশব্দে হার মেনে যায়।
রাত আরও গভীর হয়েছে। Lamborghini Revuelto নির্জন মহাসড়ক চিরে এগিয়ে চলেছে। চারদিকে আধো অন্ধকার। দূরে দূরে কয়েকটি স্ট্রিটলাইটের হলুদ আলো রাস্তার বুকে লম্বা ছায়া ফেলছে। গাড়ির ভেতরে নরম উষ্ণতা। কিরিস এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে আছে।
অন্য হাত দিয়ে আগলে রেখেছে লিসিকে। ঘুমন্ত লিসি এতক্ষণ তার বুকের সঙ্গে হেলান দিয়ে ছিল। কিন্তু হঠাৎ একটি মোড় ঘোরার সময় সামান্য নড়ে উঠলো।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুললো। কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝতে পারলো না মাথা ভারী চারপাশ অন্ধকার।
তারপর অনুভব করলো সে বসে আছে কিরিসের কোলে।
একদম আগের মতো। লিসি চোখ কুঁচকে উপরে তাকালো। কিরিস গাড়ি চালাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে তার ঘুম উড়ে গেল।
— "এই!"
কিরিস ভ্রু তুললো।
— "কি হলো?"
— "আপনি আবারও করেছেন!"
— "কি করেছি?"
— "রিহান ভাইয়ার বিয়েতে যেমন করেছিলেন, ঠিক তেমন!"
কিরিসের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো।
— "ওহ্, সেটা?"
— "হ্যাঁ, সেটা! আপনি ভীষণ বেয়াদব।"
— "আমি?"
— "জি, আপনি।"
— "ঘুমিয়ে থাকা মানুষকে কোলে করে নিয়ে এসেছি, এখন আবার আমিই বেয়াদব?"
লিসি গম্ভীর মুখ করার চেষ্টা করলো। কিন্তু ঘুম জড়ানো মুখে সেটা মোটেও ভয়ঙ্কর লাগলো না।
— "হ্যাঁ, বেয়াদব।"
— "ঠিক আছে।"
— "আর আমি কোথায় আছি সেটাও না বলে..."
কিরিস কিছু না বলে মুচকি হাসলো।
তারপর হঠাৎ... স্টিয়ারিং সামান্য ঘুরিয়ে এক্সিলারেটরে চাপ দিল।
পরের মুহূর্তেই গর্জন তুলে ছুটে উঠলো Revuelto।
ভি-টুয়েলভ ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা কাঁপিয়ে দিল। রাস্তার আলো একটার পর একটা পেছনে সরে যেতে লাগলো। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে। গাড়ির শরীর নিচু হয়ে বাতাস চিরে এগিয়ে চলেছে। মুহুর্তেই লিসির মুখের রং সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেল।
— "ইয়া আল্লাহ!"
ভয়ে লিসির সি চিৎকার করে উঠলো —“ আহহহহহহহহ”
বেচারী! ঘুমের রেশ তার এখনো কাটিনি তার মধ্যে কিরিস আবার এই করছে,,, আর কোনো কথা না বলে সে দুহাতে কিরিসকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
মুখ গুঁজে দিল তার বুকে।
— "ভাইয়া....!"
— "হুম?"
— "গাড়ি আস্তে চালান!"
— "কেন?"
— "কেন মানে?"
আরেকটা গতি বাড়তেই লিসির প্রায় কান্না পেয়ে গেল।
— "গাড়ি থামান!"
— "থামাবো কেন?"
— "আমি এত তাড়াতাড়ি মরতে চাই না!"
কিরিস হেসে ফেললো। লিসি আরও শক্ত করে ধরে বললো
— "সত্যি বলছি! আমার এখনো কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। আমি আগে থেকে কিভাবে মরবো বলেন তো?"
কিরিসের চোখে দুষ্টু ঝিলিক ফুটে উঠলো।
— "তাহলে সমস্যা কোথায়?"
— "মানে?"
— "চলো বাড়ি গিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করে ফেলি।"
লিসি সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুললো
— "কি?!"
কিরিস সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত মুখে বললো
— "আর যদি বাড়ি যেতে ইচ্ছে না করে..."
সে একবার চারপাশে তাকানোর ভান করলো।
— "গাড়িও তো আছে।"
— "চুপ!"
লিসির মুখ মুহূর্তে টকটকে লাল হয়ে গেল।
— "আপনি একদম চুপ করবেন!"
— "কেন?"
— "কারণ আমি বলেছি।"
— "খুব শক্ত কারণ।"
— "আমি সিরিয়াস!"
— "আমিও।"
— "আল্লাহ্, কী অসহ্য মানুষ!"
কিরিস এবার হেসে ফেললো। লিসি রাগী চোখে তাকিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিজেও ঠোঁট চেপে হাসি লুকাতে পারলো না। কয়েক সেকেন্ড পর কিরিস গতি কমিয়ে আনলো। ইঞ্জিনের গর্জন শান্ত হলো। গাড়ি এবার স্বাভাবিক গতিতে চলতে লাগলো। লিসি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
— "এই তো মানুষ হওয়া শুরু করেছেন।"
— "আমি তো আগেও মানুষ ছিলাম।"
— "না। আগে আপনি বিপদ ছিলেন।"
— "এখন?"
— "এখন মাঝারি ধরনের বিপদ।"
কিরিস মাথা নাড়লো। তারপর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ রইলো। বাইরে রাতের বাতাস দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
মাঝে মাঝে অন্য গাড়ির আলো এসে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। লিসি হঠাৎ বললো—
— "শুনুন?"
— "হুম?"
— "আমি কেক খাবো।"
কিরিস নিচে তাকালো।
— "এখন?"
— "হ্যাঁ।"
— "রাত প্রায় একটা বাজে।"
— "তাতে কি?"
— "তোমার যুক্তির কাছে আমি হেরে গেলাম।"
লিসি বিজয়ীর মতো হাসলো।
— "তাহলে?"
কিরিস মাথা নাড়লো।
— "আচ্ছা।"
— "সত্যি?"
— "হ্যাঁ, সত্যি।"
— "চকলেট কেক?"
— "হবে।"
— "আর আইসক্রিম ?"
— "হবে।"
— "আর..."
— "যা যা বলেছিলাম, সব হবে।"
লিসি সন্তুষ্ট হয়ে আবার তার বুকে মাথা রাখলো।
কিরিস মৃদু হাসলো। তারপর এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে, অন্য হাতে নিজের স্ত্রীকে আগলে রেখে, গভীর রাতের নির্জন রাস্তা পেরিয়ে বাড়ির পথে এগিয়ে চললো। কিরিস লিসির মাথায় হাত দিয়ে আঙুলে কিছু চুল পেছিয়ে কেমন মোহ লাগানো ভারী কন্ঠে বলে —“ Sweetheart..”
লিসি কিরিসের দিকে তাকায় কিরিস লিসির চোখে চোখ রাখে। গাড়িটা হঠাৎ একপাশে দাড় করায়। লিসি কিছু বুঝতে পারছে না। তখন কিরিস দুষ্ট চোখে তাকিয়ে বললো —“ সুইটহার্ট আমার না খুব ইচ্ছে করছে ”
লিসি ভুরু কুঁচকালো —“ কি!! ইচ্ছে করছে? ”
কিরিসের চোখে কেমন ঘোর লাগানো মহো যা কারোর হৃদয় কাঁপিয়ে দিতে পারে। তার চোখদুটো একদম তীক্ষ্ণ কেমন ছোট কিন্তু ভয়ংকর একদম হান্টার বা ফক্স সেপের চোখ, আর যখন তার এই চোখে ঘোর লাগানো দুষ্ট ভাব নিয়ে আসে কি মহো যে লাগে... তা বোঝানো দায়। লিসি একটা শুকনো ঢোক গেলে কিরিসের মতিগতি সুবিধার লাগছে না, লিসি একটু চেপে যেতে লাগলো কিন্তু কিরিস ওর পিঠে হাত রেখে কাছে টেনে আনে, এক হাতে লিসির মুখে পাশ থেকে চুলগুলো সরিয়ে চিবুক ধরে মুখটা উপরে করে , কিরিস এবার আর তার ওষ্ঠ দিয়ে বাক্য প্রয়োগ করলো —“ আমার.....!”
লিসি চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে কাঁপা গলায় বললো —“ আপনার..”
লিসি ভয় পাচ্ছে এখন যদি কিরিস কিছু করে তাহলে তাকে বাঁচানো কেউ নেই ফাঁকা নির্জন রাস্তা। কিরিস আবার বললো —“ আমার আর ভার্জিন থাকতে ইচ্ছে করছে না ”
লিসি চমকে উঠলো ডাগর ডাগর আঁখি দুটো বড় করে তাকিয়ে আছে কিরিসের দিকে কিরিস আর দেরি করলো না নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো তার ঠোঁটে, লিসির কি করবে বুঝতে পারছে লিসির শার্ট চেপে ধরে আছে। কিছুক্ষণ পরে কিরিস ঠোঁট ছেড়ে দিতেই লিসি দম নিলো। কিন্তু পরের মুহুর্তেই কিরিস ঠান্ডা হাত লিসির শাড়ির তল দিয়ে উন্মুক্ত কোমড় হাত রাখলো, কিরিসের হাতটা বেশ ঠান্ডা, রাতের ঠান্ডা বাতাস লাগায় এমন হয়েছে, লিসি বুঝতে পারছে এখন যদি কিরিস না থামে তাহলে ওর কপালে বেগ আছে, কিরিসের হাত তখন লিসির শাড়ির তলে উন্মুক্ত জায়গায় বিচরণ করছে লিসির নাভির কাছে কিরিসের হাত সেটা ধীরে উপরে উঠছে আর লিসির গায়ে লেম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে লিসি একটা শ্বাস নিলো হঠাৎ কিরিসের গালে দুহাত রাখলো।লিসি কিরিসের দিকে তাকিয়ে একটু সাহস করে বললো —“ এখন না... দয়া করে এখন না.. আমি.. এখনো প্রস্তুত নই,, একটু সময় দিন ”
কিরিস থেমে গেলো কিন্তু হাত সরালো না কিরিস লিসির দিকে তাকিয়ে বলে — “ এটাই শেষ এরপরে যখন আমার ইচ্ছে লাগবে তোমার বারণ শুনবো না কিন্তু ”
লিসি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো কিরিস তখন চট করে বললো —“ আমি তাই বলে হাত সরাচ্ছি না,,, অবশেষে আমার হাতটা তার যোগ্য জায়গায় গেছে ”
লিসি চোখবড় করে তাকিয়ে কিরিসের হাত সরানো চেষ্টা করছে কিন্তু কিরিসের হাতের শক্তির কাছে লিসি কিছুই না,, লিসি এবার নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে তারপর কিরিস বাম হাতের দিকে তাকালো যেটা গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে আছে। তারপর ওর হাতটা আর কিরিসের হাতটা পাশাপাশি রেখে বললো —” আপনার হাত এতো বড় কেন,?”
কিরিসের চিকন লম্বা আঙুল তারপর হাতের উপর শিরাগুলো কেমন ভাসানে, কিন্তু সেটা বাজে দেখাচ্ছে না। কিরিস এবার মৃদু হেসে ফেললো। তারপর আবার বললো —“ আমার শুধু হাত নয় অনেক কিছুই বড়, দেখতে চাও নাকি? ”
লিসির ওর দিকে তাকায় চোখ বড় করে। লিসি হয়তো কিরিসের কথা বুঝতে পেরেছ, ঠোঁট কামড়ে কিরিসের দিকে তাকিয়ে বললো —“ আহ ছাড়ুন না.. মানে ওখান থেকে হাত সরান আমার কেমন লাগছে ”
কিরিস তো শোনার বান্দা নয় ওর হাত এখনো লিসির কোমড়ে আছে,—“ জীনবেও না আমি এখন এই ভাবো গাড়ি চালাবো, ”
লিসি এবার পুরো চুপ হয়ে গেছে মানে হার মেনে নিয়েছে। কিরিস আবার গাড়ি স্টার্ট দিলো, একটু পরেই সে তার হাত ধীরে লিসির পেটের উপর থেকে সরিয়ে কোমড়ের পাশে হাত রাখলো, লিসি কিছু বলে সে বুঝতে পেরেছে।কিরিস তার কখনো অস্তিত্বে রাখবে না.. কখনো নয়।
ল্যাম্বরগিনি রেভুয়েল্তোর গর্জন যেন রাতের ঢাকা শহরের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। খোলা ছাদের গাড়িতে বসে আছে লিসি। লিসি প্রায় পুরোপুরি কিরিসের বুকে মুখ গুঁজে আছে। একটাও কথা বলছে না। অভিমান করেছে কি না, সেটা হয়তো সে নিজেও জানে না। শুধু দুই হাত দিয়ে কিরিসের শার্টটা শক্ত করে ধরে আছে। ঢাকার রাতের বাতাসের সঙ্গে তার দীর্ঘ কালো চুলগুলো বারবার উড়ে এসে কিরিসের মুখে লাগছে। কিরিস কিছু বলছে না।শুধু এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে এমন নিখুঁতভাবে গাড়ি চালাচ্ছে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ এটাই।
ঘণ্টায় কত গতিতে গাড়ি ছুটছে সেটা দেখলে সাধারণ মানুষের বুক কেঁপে উঠত। কিন্তু কিরিসের চোখে বিন্দুমাত্র অস্থিরতা নেই। সামনের রাস্তা, আশেপাশের গাড়ি, ট্রাফিক সিগন্যাল, দূরের মোড় সবকিছু যেন একইসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে সে। লিসি একবার মুখ তুলে তাকালো। তারপর আবার কিরিসের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। কিরিস হালকা গলায় বলল
— "কি হলো?"
— "কিছু না।"
— "মিথ্যা বলছো।"
— "আপনি সব জানেন না?"
কিরিসের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
— "সব জানি বলেই তো জিজ্ঞেস করছি।"
লিসি মুখ বাঁকিয়ে আবার চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর ঢাকার আকাশ ছোঁয়া কালো কাচে মোড়া বিশাল অট্টালিকাটি চোখে পড়ল।
BLACKSTONE TOWER
রাতের আলোয় ভবনটা যেন কোনো কর্পোরেট সাম্রাজ্যের কেন্দ্র নয়, বরং আধুনিক কোনো দুর্গ।
প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী।
গাড়ি ঢোকার আগেই চারদিকের ব্যারিকেড খুলে গেল।
কেউ গাড়ি থামানোর সাহস পর্যন্ত করল না। ল্যাম্বরগিনি সরাসরি ভিতরে ঢুকে গেল। লিসি অবাক হয়ে চারদিকে তাকালো।
— "এখানে কেন?"
কিরিস গাড়ি থামিয়ে শান্ত গলায় বলল—
— "কাজ আছে।"
— "এখন?"
— "হ্যাঁ।"
— "বাসায় যাবেন না?"
— "পরে।"
লিসি ভুরু কুঁচকালো।
— "আমি তাহলে?"
— "তুমি এখানে থাকবে।"
— "একা?"
— "হুম।"
— "আমি একা বসে থাকবো?"
কিরিস তার দিকে তাকালো। চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত।
পরের মুহূর্তে—
টুক!
একটা তুড়ি বাজাল। লিসি বুঝে ওঠার আগেই কোথা থেকে যেন মার্ক এসে হাজির। যেন অপেক্ষাতেই ছিল।
তার হাতে বড় একটি কেকের বক্স। অন্য হাতে আইসক্রিম পেছনে আরও দুইজন লোক তাদের হাতে বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট। লিসির চোখ গোল হয়ে গেল।
— "এগুলো কি?"
মার্ক ভদ্রভাবে মাথা নত করল।
— "ম্যাডামের জন্য, স্যার।"
লিসি এবার কিরিসের দিকে তাকালো।
— "আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি?"
কিরিস নির্বিকার গলায় বলল
— "তুমি তো বলেছিলে খাবে ।"
— "আপনি খুব বিরক্তিকর, আমি বলিনি আমি বাইরে বসে খাবো, বাড়ি গিয়ে খাবো।"
— "জানি।"
লিসি এবার সত্যিই কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল।
এরই মধ্যে আরেকটি বিষয় তার চোখে পড়ল। গাড়ির চারপাশে অদৃশ্য বলয় তৈরি হয়েছে। প্রথমে খেয়াল করেনি। এখন বুঝল ল্যাম্বরগিনির চারপাশে কয়েকজন বডিগার্ড অবস্থান নিয়েছে আরও দূরে আরও দূরে।
প্রায় পুরো এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী। কেউ ফোনে কথা বলছে। কেউ কানে ইয়ারপিস লাগিয়ে নজরদারি করছে কেউ ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ আশেপাশের প্রতিটি গাড়ি পর্যবেক্ষণ করছে। মনে হচ্ছে যেন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান এসেছেন। লিসি হতবাক।
— "এত লোক কেন?"
কিরিস উত্তর দিল না মার্ক উত্তর দিল।
— "স্যার এখানে থাকলে এটাই স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ম্যাডাম।"
— "স্বাভাবিক?"
মার্ক মৃদু হাসল।
— "জি ম্যাডাম।"
লিসি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারল কিরিস তাকে এখানে একা রেখে যাচ্ছে না।
বরং পুরো একটি নিরাপত্তা বলয়ের কেন্দ্রে বসিয়ে রেখে যাচ্ছে। একটা মাছিকেও অনুমতি ছাড়া কাছে আসতে দেওয়া হবে না। কিরিস তখন মার্কের হাত থেকে একটি ট্যাবলেট নিয়ে লিসির হাতে দিল।
— "এটা দেখো।"
— "কি আছে এতে?"
— "মুভি।"
— "আমি মুভি দেখবো কেন?"
— "কারণ আমি ব্যস্ত।"
— "আমি যদি না দেখি?"
— "তাহলে কেক খাবে।"
— "না খেলে?"
— "আইসক্রিম খাবে।"
— "সেটাও না খেলে?"
কিরিস এবার তার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—
— "তাহলে ফিরে এসে হিসাব নেবো।"
লিসি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফুলিয়ে ফেলল।
— "হুম!"
কিরিস হালকা হাসল তারপর গাড়ি থেকে নামল।
মার্কও নেমে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে মার্ক আবার একবার চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল। ইয়ারপিসে কিছু নির্দেশ দিল সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী অবস্থান বদলে নিল। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে লিসি বুঝতেই পারল না। কিরিস কয়েক কদম হেঁটে থামল।
পেছনে ফিরে তাকালো। লিসি তখনও গাড়ির সিটে বসে আছে। চুলগুলো বাইরের মৃদু বাতাসে উড়ছে হাতে ট্যাবলেট মুখে অভিমান কিরিস কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। যেন নিশ্চিত হচ্ছে সে নিরাপদ আছে।
তারপর ব্ল্যাকস্টোন টাওয়ারের বিশাল কাঁচের দরজা খুলে গেল। আর ঢাকার ক্ষমতাবান মানুষদেরও যার সামনে মাথা নত করতে হয় সেই কিরিস রায় চৌধুরী ধীর পায়ে ভিতরে প্রবেশ করল। আর বাইরে সারা নিরাপত্তা বলয়ের কেন্দ্রে বসে রইল তার সবচেয়ে মূল্যবান
মানুষটি।
ব্ল্যাকস্টোন টাওয়ারের সর্বোচ্চ তলাগুলোর একটি।
যে ফ্লোরে সাধারণ কর্মচারীদের প্রবেশাধিকার নেই, এমনকি অধিকাংশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও পূর্বানুমতি ছাড়া পা রাখতে পারে না। সেখানে অবস্থিত কিরিস রায় চৌধুরীর ব্যক্তিগত কনফারেন্স স্যুইট। বিশাল কাঁচের দেয়ালের ওপারে রাতের ঢাকা শহর আলোয় ঝলমল করছে। আর সেই কক্ষে বসে আছে পাঁচজন যুবক, যাদের নাম শুনলেই অনেকের বুক কেঁপে ওঠে।
ইয়াবি, ইশান,রিহান,কাবির এবং কিরিস। তবে কিরিস এখনো কক্ষে প্রবেশ করেনি। ফলে ভেতরের পরিবেশ যথেষ্ট প্রাণবন্ত। রিহান সোফার একপ্রান্তে বসে কাবিরের কাঁধে ধাক্কা মেরে বলল
—"দেখছিস? আমার বিয়ের সময় আমাকে দিয়ে যে পরিমাণ কাজ করানো হয়েছে, এখনও কোমর সোজা করতে পারি না।"
কাবির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল
—"তোর কোমর সোজা হয় না অলসতার জন্য। কাজের জন্য না।"
—"চুপ কর। তোর বিয়ের জন্যও এখন আমি খাটছি।"
—"তুই খাটছিস?"
কাবির ভ্রু তুলল।
—"আমি তো দেখছি সবাই খাটছে, শুধু তুই খাচ্ছিস।"
ইয়াবি ও ইশান ইতোমধ্যে দুই পাশে বসে জুসের গ্লাসে লম্বা নল লাগিয়ে টানছে। দুজনের মুখে সেই বিশেষ ধরনের হাসি, যা দেখে বোঝা যায় তারা ঝামেলা উপভোগ করছে। ইশান ধীরে ধীরে জুস টেনে বলল
—"আমি কিন্তু নিরপেক্ষ।"
ইয়াবি মাথা নাড়ল।
—"আমিও।"
—"আমরা শুধু দর্শক।"
—"খুব শিক্ষণীয় দৃশ্য।"
রিহান চোখ কুঁচকে বলল —"তোরা দুইজন একদম অকর্মণ্য।"
—"ধন্যবাদ।"
—"এটা প্রশংসা ছিল না।"
—"তবুও ধন্যবাদ।"
কক্ষজুড়ে হাসির রোল উঠল।

0 Comments