তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :86

ঠিক তখনই.... টিক।
কাঁচের স্বয়ংক্রিয় দরজাটি খুলে গেল আর পরের মুহূর্তেই হাসি যেন হঠাৎ থেমে গেল। কেউ কিছু বলল না কেউ হেসে উঠল না। ইয়াবির জুস টানা বন্ধ, ইশানের নল মাঝ আকাশে স্থির। রিহানের মুখে থাকা অভিযোগও যেন মুহূর্তে উধাও। কারণ দরজা দিয়ে প্রবেশ করেছে কিরিস রায় চৌধুরী শীতল মুখাবয়ব অটল পদক্ষেপ। চোখে সেই অদ্ভুত নীরব কর্তৃত্ব, যা উচ্চস্বরে কিছু না বলেও পুরো কক্ষকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। সে কারও দিকে তাকাল না সোজা নিজের নির্ধারিত আসনের দিকে এগিয়ে গেল।
তারপর ধীর ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে পড়ল। দুই হাত টেবিলের ওপর রাখল। মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশ পাল্টে গেল। যেখানে কয়েক সেকেন্ড আগেও বন্ধুমহলের হাসি-ঠাট্টা চলছিল, সেখানে এখন কাজের গাম্ভীর্য নেমে এসেছে। ইয়াবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইশানের দিকে তাকাল।
ইশানও তাকাল দুজনের চোখে একই ভাষা।
"আনন্দ সমাপ্ত।"
অন্যদিকে......
ব্ল্যাকস্টোন টাওয়ারের নিচের প্রাইভেট পার্কিং জোন।
ল্যাম্বরগিনি রেভুয়েল্তো এখনো একই স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। খোলা ছাদের গাড়ির ভেতরে বসে আছে লিসি।
চারপাশে নিরাপত্তার বলয় দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র প্রহরীরা। কারও দৃষ্টি প্রবেশপথে। কারও দৃষ্টি ছাদে কারও দৃষ্টি আশেপাশের যানবাহনে। তবুও লিসির কাছে এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। তার মুখে এই মুহূর্তে একটাই ভাব বিরক্তি। সে ট্যাবলেটের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু মন সেখানে নেই।
মনে মনে শুধু একটাই কথা ঘুরছে—"এই লোকটার মাথায় আসলে সমস্যা আছে। সোজা বাড়ি যাওয়া যেত না? না। অবশ্যই না। আমাকে এখানে বসিয়ে রেখে কাজ করতে হবে! একদিন না একদিন আমি সত্যিই ওনাকে মারব।"
মুখ ফুলিয়ে সে কেকের বাক্সটা টেনে নিল। ঢাকনা খুলতেই চোখ বড় হয়ে গেল। বড়সড় দুই পাউন্ডের কেক।
সুন্দরভাবে সাজানো। পাশেই বিভিন্ন ফ্লেভারের আইসক্রিম। আরও রয়েছে নানা ধরনের স্ন্যাকস।
লিসি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর নিজেই বিড়বিড় করল
—"আচ্ছা... বাড়ি না নিয়ে এসে এখানে রাখার শাস্তি হিসেবে এগুলো খেয়ে ফেলি।"
কেক এর সঙ্গে থাকা ছোট চামচটা দিয়ে লিসি
এক টুকরো কেক তুলে মুখে দিল তারপর আরেক টুকরো তারপর আরেকটা। মুহূর্তের মধ্যে মুখের অভিমান কিছুটা কমে গেল মুভি চলছে, কেক চলছে, আইসক্রিমও চলছে। লিসি নিজের জগতে সম্পূর্ণ নিমগ্ন খেতে ব্যস্ত, খাওয়া দাওয়ায় লিসির কেনো খুঁতখুঁতে নেই, সে বেশন খেতে পারে, বাচ্চাদের মতো পা গুটিয়ে বসে লিসি কেক খাচ্ছে। এমন সময় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন প্রহরী অন্যমনস্কভাবে তার দিকে তাকাল। তারপর আরেকজন।
তারপর তৃতীয়জন তাদের দৃষ্টিতে কৌতূহল। কারণ তারা বহু বছর ধরে কিরিস রায় চৌধুরীর নিরাপত্তা দায়িত্বে রয়েছে। তারা দেখেছে মন্ত্রীদের,শিল্পপতিদের,আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের।
কূটনীতিকদের, অসংখ্য ক্ষমতাবান মানুষকে।
কিন্তু এমন দৃশ্য? না, কখনো না।
যে মানুষটির নাম শুনে অনেকের কণ্ঠ শুকিয়ে যায়...
যার এক নির্দেশে বিশাল বিশাল সাম্রাজ্য নড়ে ওঠে...
যে মানুষ সর্বদা পাথরের মতো কঠোর...
সেই মানুষই কিনা একটি মেয়েকে গাড়িতে বসিয়ে বসিয়ে রেখে গেছে কেক, আইসক্রিম,মুভি। আর বহুপর্দার নিরাপত্তা বলয়সহ!
প্রহরীদের একজন ধীরে বলল
—"ম্যাডামকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো স্কুলপড়ুয়া মেয়ে।"
আরেকজন মৃদুস্বরে উত্তর দিল
—"কিন্তু স্যারের কাছে উনিই সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ।"
তৃতীয়জন গম্ভীর মুখে বলল
—"এই কারণেই তো পুরো এলাকা লকডাউন অবস্থায় আছে।"
দূরে বসে লিসি অবশ্য এসবের কিছুই জানে না।
সে তখন কেকের আরেক টুকরো মুখে দিয়ে সিনেমার দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে আবার মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করছে
—"বাড়ি গেলে কি ক্ষতি হতো? একদম জ্বালিয়ে মারে লোকটা..."
কিন্তু কথাগুলো বলার সময়ও তার চোখের কোণে অজান্তেই হাসির রেখা ফুটে উঠছে। আর উপরে ব্ল্যাকস্টোন টাওয়ারের কাঁচঘেরা কক্ষে বসে থাকা কিরিস হয়তো কাজ করছে। তবুও তার নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তর এই মুহূর্তে কেবল একটিই বিষয় নিশ্চিত করছে গাড়ির ভেতরে বসে থাকা সেই অভিমানী মেয়েটির দিকে অনুমতি ছাড়া কেউ যেন এক পা-ও এগোতে না পারে।
★★★
ল্যাম্বরগিনি রেভুয়েল্তোর খোলা ছাদের নিচে বসে লিসি এখন সম্পূর্ণ নিজের জগতে হারিয়ে গেছে। দুই পাউন্ডের কেক? প্রায় শেষ। আইসক্রিম? অনেকক্ষণ আগেই ইতিহাস হয়ে গেছে। চিপসের বড় প্যাকেটটাও অর্ধেকের বেশি উধাও সামনে ট্যাবলেটে মুভি চলছে। প্রথমে বেশ হাসাহাসি ছিল তারপর একটু রোমান্স তারপর হঠাৎ—
দুঃখজনক দৃশ্য নায়ক মারা গেছে। নায়িকা বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
ব্যস!
লিসিরও চোখ ভিজে গেল প্রথমে ঠোঁট ফুলল। তারপর নাক টানল তারপর...হুহুহুহু...কান্না শুরু।
দুই মিনিট পর —"আআআহহহহ... মরে গেল রে!"
আরও জোরে কান্না। গাড়ি থেকে প্রায় বিশ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কামরুল সাহেবের বুক ধক করে উঠল। তিনি বহু বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামলেছেন গোলাগুলি,অপহরণের চেষ্টা সন্ত্রাসী হামলার হুমকি সব। কিন্তু এই পরিস্থিতি?
না। এর কোনো প্রশিক্ষণ তাকে কেউ দেয়নি।
তিনি দূর থেকে দেখলেন ম্যাডাম কাঁদছেন। তার মাথার ভেতর সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা দৃশ্য ভেসে উঠল।
এক ঘণ্টা আগে কিরিসের ঠান্ডা কণ্ঠ
—"শুনে রাখো। ওর যেন কোনো ক্ষতি না হয়।"
—"জি স্যার।"
—"কোনো সমস্যা হলে..."
—"জি স্যার?"
—"তোমাকে টুকরো টুকরো করে কেটে এড্রোনকে দিয়ে খাওয়াবো।"
—"জি স্যার..."
সেই কথা মনে পরতেই দেহ থেকে যেন রুহ বের হয়ে গলো তার। বর্তমানে ফিরে এসে কামরুলের গলা শুকিয়ে গেল।
—"ইয়া আল্লাহ..."
তার পাশে থাকা আরেক গার্ড বলল—
—"স্যার, ম্যাডাম কাঁদছেন।"
—"আমি অন্ধ না!"
—"তাহলে?"
—"তাহলে কি! কারণ বের কর!"
—"আমি যাব?"
—"না! আমি নিজেই যাচ্ছি!"
যেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ফাঁসির মঞ্চে যাচ্ছে, সেই ভঙ্গিতে তিনি গাড়ির দিকে এগোলেন। গিয়ে কাঁপা গলায় বললেন—
—"ম্যা... ম্যাডাম?"
লিসি মুখ তুলে তাকাল চোখ লাল গাল ভেজা হাতে আধখাওয়া চিপস।
—"কি?"
—"আপনি... কাঁদছেন কেন?"
এই প্রশ্ন শুনেই লিসির কান্না আরও বেড়ে গেল হুহুহুহু...করে কান্না করলো। কামরুলের প্রায় হার্ট অ্যাটাক হওয়ার উপক্রম। নিজের বুকে হাত রাখে গলা শুকিয়ে কাট।
—"ম্যাডাম! কি হয়েছে?"
—"সে... সে..."
—"কে ম্যাডাম?"
—"মরে গেছে!"
—"ক... কে মরে গেছে?"
কামরুলের মাথায় তখন হাজার চিন্তা। কেউ কি হামলা করেছে? কাউকে কি গুলি করা হয়েছে? স্যারের কোনো শত্রু? কোনো আত্মীয়? কি হয়েছে? লিসি কাঁদতে কাঁদতে ট্যাবলেট দেখাল।
—"এই যে! নায়কটা মরে গেছে!"
কামরুল কয়েক সেকেন্ড চুপ তারপর ট্যাবলেটের দিকে তাকাল। তারপর লিসির দিকে তারপর আবার ট্যাবলেটের দিকে। মনে হলো আত্মা শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
—"মানে... সিনেমার নায়ক?"
—"হ্যাঁ!"
—"সত্যি মানুষ না?"
—"না!"
—"ওহ..."
কামরুলের হাঁটু প্রায় ভেঙে পড়ল। কিন্তু বিপদ এখানেই শেষ নয়। লিসি আবার কাঁদতে শুরু করেছে।
—"ওর সাথে এমন কেন করলো!"
—"জি ম্যাডাম..."
—"ওদের মিলিয়ে দিল না কেন!"
—"জি ম্যাডাম..."
—"খুব খারাপ!"
—"জি ম্যাডাম..."
লিসি এবার কান্না করতে করতে বলেব উঠে —" কি শুধু জি ম্যাডাম করছেন...., ভালো কথা বলুন "
কামরুল এবার বলে —" ঠিক হয়নি, সরি সরি,, ওদের উচিত ছিলে নায়কে বাঁচানো, আপনি চাইলে এই ডিকেন্টরের সাথে কথা বলে সিন বদলাতে বললো "
লিসি ঠোঁট ফুলিয়ে বলে " আহ কিন্তু এতো সুন্দর প্রেম আর ভালোবাসা তো দেখতে পাবো না.. "
কামরুল —" ম্যাডাম গো.. চুপ করেন "
লিসি ভুরু কুঁচকে হেকচি তুলে বলে —" কেন চুপ করবো "
কামরুল এবার নিজেও কান্না করে বলে —" আপনি চুপ না করলে সকালে আমার বউ কান্না করবে,, "
লিসি একটু অবাক হলো —" কেনো?? "
কামরুল —" আরে আমি মরলে তো আমার বউ কান্না করবে তাই না "
লিসি —" আরেকটা অসমাপ্ত ভালেবাসা...... "
বলে কান্না করছে এতক্ষণে কামরুলেরও চোখে পানি চলে এসেছে। পাশের গার্ডরা হতবাক একজন ফিসফিস করে বলল —"স্যারও কাঁদছে নাকি?"
আরেকজন বলল "মনে হয়।"
তৃতীয়জন বলল— "চাকরি বাঁচানোর কান্না।"
পাঁচ মিনিট পরে দৃশ্যটা এমন দাঁড়াল লিসি কাঁদছে।
কামরুল কাঁদছে। আরেকজন গার্ড টিস্যু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরেকজন পানি নিয়ে এসেছে। আরেকজন বুঝতেই পারছে না কি হচ্ছে। ঠিক তখনই ইয়ারপিসে আওয়াজ এল —"স্যার একটু পরে নিচে আসছেন।"
সব গার্ড একসঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়াল কামরুলের মুখের রং উধাও —"শেষ।"
—"কেন স্যার?"
—"স্যার যদি দেখে ম্যাডাম কাঁদছে, আর আমিও কাঁদছি, তাহলে আজকেই আমার জানাজা হবে।"
ঠিক তখন লিসি নাক টেনে বলল
—"আরেকটা চিপস দিবেন?"
কামরুল মুহূর্তে প্যাকেট এগিয়ে দিল।
—"পুরো কার্টন নিয়ে আসি ম্যাডাম?"
—"আনেন।"
—"এইমাত্র আনছি!"
চাকরি রক্ষার এমন প্রাণপণ চেষ্টা দেখে আশেপাশের গার্ডরা মুখ ফিরিয়ে হাসি চেপে রাখতে লাগল। কিন্তু চারকি তো পরের কথা আগে আসে জীবন। লিসি কান্না করলে তার জীবন শেষ।
ব্ল্যাকস্টোন টাওয়ারের উপরের তলায় তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। নিচে যেখানে লিসি আর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা পাল্লা দিয়ে কান্নাকাটি করছে, উপরে সেখানে কয়েকজন মানুষের জীবনের সমস্ত সাহস একে একে উধাও হয়ে যাচ্ছে মিটিং প্রায় শেষ। কিরিস নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। রিহান ফাইল বন্ধ করল কাবির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইশান টেবিলের ওপর হাত রেখে বলল —"অবশেষে শেষ।"
ইয়াবি চুপচাপ জুস খাচ্ছে। ঠিক তখনই
শশশশশশশশ....
অদ্ভুত একটা শব্দ খুব ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট। রিহান ভ্রু কুঁচকালো।
—"শুনলি?"
কাবির চারপাশে তাকালো —"কি?"
রিহান —"শব্দ।"
ইশানও সোজা হয়ে বসল —"আমিও শুনলাম।"
আবার শশশশশশশশশশশ....
এবার একটু জোরে কাবির উঠে দাঁড়াল।
—"কোথা থেকে আসছে?"
রিহান টেবিলের নিচে তাকালো।
—"এসি নষ্ট নাকি?"
ইশান বলল —"এসি থেকে সাপের মতো শব্দ আসে নাকি?"
শুধু ইয়াবি চুপচাপ বসে আছে তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি সে যেন আগেই বুঝে ফেলেছে।
কিন্তু কিছু বলছে না পরের মুহূর্তেই—
ধপ!
কাবিরের মুখের রং উধাও। রিহানের চশমা প্রায় পড়ে যাওয়ার অবস্থা। ইশান সরাসরি সোফার ওপরে উঠে গেল কারণ কিরিসের চেয়ারের পেছন দিক থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসেছে একটা বিশাল অজগর, মোটা, দীর্ঘ।
প্রায় কলাগাছের গুঁড়ির মতো মোটা সাপটা। তার বিশাল দেহ কিরিসের চেয়ার জড়িয়ে ফেলেছে। মাথা উঠে এসেছে কিরিসের কাঁধের সমান উচ্চতায়। কাবির কাঁপা গলায় বলল—
—"ভাই.য়া.. .."
—"হুম?"
—"তোর পেছনে..."
—"জানি।"
—"জানিস?!"
—"হ্যাঁ।"
—"এড্রোন আছে!"
—"জানি তো।"
—"তুই এত শান্ত কেন?!"
কিরিস বিরক্ত মুখে বলল —"কারণ ও আমার সাপ।"
পুরো রুম নিস্তব্ধ রিহান ফিসফিস করে বলল—
—"আমি চাকরি ছেড়ে দেব।"
ইশান বলল —"আমি দেশ ছেড়ে দেব।"
কাবির বলল —"আমি গ্রহ ছেড়ে দেব।"
ঠিক তখন কিরিস ধীরে মার্কের দিকে তাকালো।
—"তুমি এনেছো?"
মার্ক মাথা নিচু করল —"সরি বস।"
—"কারণ?"
—"এড্রোন আপনাকে দেখার জন্য খুব উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল।"
—"তাই?"
—"আমি থামাতে পারিনি।"
এড্রোন নামের বিশাল অজগরটা তখন মাথা এনে কিরিসের কাঁধে ঘষছে যেন একটা আদুরে বিড়ালছানা।
কিরিস তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
—"একটু অপেক্ষা করো।"
সাপটা যেন সত্যিই বুঝল শান্ত হয়ে গেল।
রিহান বিস্ময়ে বলল—
—"এটা কি সত্যি ঘটছে?"
ইয়াবি জুস টানতে টানতে বলল—
—"হ্যাঁ।"
—"তুই ভয় পাচ্ছিস না?"
—"অভ্যাস হয়ে গেছে।"
ঠিক তখন আরও বড় বিপদ কিরিসের কোটের হাতার ভেতর থেকে কিছু একটা নড়ল কাবির দেখল। তারপর জমে গেল।
—"না..."
—"কি হলো?" ইশান জিজ্ঞেস করল।
—"ওর হাতের ভিতর কিছু নড়ছে!"
পরের মুহূর্তে—
দুই হাতার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল দুটো ছোট সাপ।
একটা দুধের মতো সাদা আরেকটা পাতার মতো সবুজ
দুটোই চিকন ছোট আর ভীষণ চঞ্চল দুজন দুই হাত বেয়ে উঠে এসে কিরিসের কাঁধে বসে পড়ল।
ইশান চোখ বন্ধ করে ফেলল।
—"আমি কিছু দেখছি না।"
রিহান বলল —"আমিও না।"
কাবির বলল —"আমি এখনো বেঁচে আছি কেন?"
কিরিস সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সাপ দুটোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
—"এদেরও এনেছো?"
মার্ক গর্বিত গলায় বলল—
—"জি বস।"
—"বাকিরা কোথায়?"
—"উত্তর ঢাকার বাড়িতে।"
—"হুম।"
মার্ক বলল —"আপনাকে দেখার জন্য সবাই খুব উত্তেজিত।"
কিরিস মাথা নাড়ল তার পুরো মনোযোগ এখন সাপদের দিকে। ইয়াবি হঠাৎ বলল
—"একটা কথা বলি?"
—"বল।"
—"গোসল করে আমার বোন লিসির কাছে যাস।"
রুমে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা কিরিস ভ্রু তুলল।
—"কেন?"
—"এইমাত্র তিনজনকে আদর করলি।"
—"তারপর?"
—"তারপর আবার গিয়ে ওকে ছুঁবি।"
কিরিস শান্ত গলায় বলল —"ওর জন্য আমি সবসময় পরিষ্কার থাকি।"
ইয়াবি মাথা নাড়ল —"দেখ, এই উত্তরটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।"
রিহান বলল —"আমি একমত।"
ইশান বলল —"একশো ভাগ।"
কাবির বলল —"সাপগুলোর চেয়ে এই উত্তর বেশি ভয়ংকর। "
কিরিস কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলে —" একটু গায়ে হাত দিবি নাকি "
কাবির একটু সরে গিয়ে বলে —" ধন্যবাদ ভাইয়া কিন্তু না,, আমি.. ওহ ওদের গা বিশন ঠান্ডা আমি একবার হাত দিয়েছিলাম "
ইশান —" আমি এটা মরা দেখেছি জীবন্ত নয়,, তুই লুয়া লোকা আর এড্রোনকে নিয়ে থাকিস কি করে, "
রিহান হাফ ছেড়ে বলে —" ইশান এখনো তো সবাই বাকি আছে, গোটা জঙ্গলে সব প্রাণী ওর কাছে আছে "
ইয়াবি মাথা নেড়ে —" ঠিক ঠিক। কিন্তু তুই কি leo কে নিয়ে আসিস নি, আহহ ওকে আমার খুব ভালো লাগে "
কাবির —" ওহ হ্যাঁ ওই বিড়াল মানে লিও ওকে নিয়ে আসিস এগুলো না "
ওরা নিজেদের মধ্যে কিরিসকে সব প্রাণী কালেকশনের কথা বলছে। আর ঠিক সেই সময় নিচে পার্কিং জোনে
লিসি আর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা এখনো কাঁদছে।
লিসি কাঁদছে সিনেমার নায়ক মারা গেছে বলে। আর নিরাপত্তা কর্মকর্তা কাঁদছে কারণ লিসি কাঁদছে। উপরে অজগর, সাপ, আতঙ্ক। নিচে কেক, চিপস আর কান্না।
ব্ল্যাকস্টোন টাওয়ারের ইতিহাসে সম্ভবত এটাই ছিল সবচেয়ে অদ্ভুত রাত।
প্রায় আধঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নিজের প্রিয় সরীসৃপদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর অবশেষে কিরিস উঠে দাঁড়াল। এড্রোন ইতোমধ্যে কক্ষের এক অন্ধকার কোণে নিজের বিশাল দেহ গুটিয়ে ফেলেছে। সাদা ছোট্ট সাপটা কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। পাতার রঙের সবুজ সাপটাও কোনো ফাঁকফোকর খুঁজে লুকিয়ে পড়েছে। যেন কিছুক্ষণ আগের সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য কখনো ঘটেইনি। কিরিস ধীর পদক্ষেপে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর শাওয়ারের জলের শব্দ থেমে গেল। দরজা খুলে সে বাইরে বেরিয়ে এলো।
শার্ট বদলায়নি সেই গাঢ় মেরুন রঙের শার্টই আবার পরেছে। তবে মুখমণ্ডলে এখন অন্যরকম সতেজতা।
ভেজা চুলের ডগা থেকে দুই-এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে কপালের পাশে। হাতঘড়ির স্টিলের অংশ আলোয় ঝলসে উঠছে তার উপস্থিতি এমনিতেই ভারী। কিন্তু এখন যেন আরও নীরব আরও শীতল আরও বিপজ্জনক।
মার্ক একবার তাকিয়ে মাথা নত করল।
কিরিস শার্টটের হাতা গুটিয়ে বলে —" ওদের কেউ এখান থেকে নিয়ে যেও। "
মার্ক মাথা নাড়লো। রিহান, কাবির, ইশান আর ইয়াবিও উঠে দাঁড়ালো। মিটিং শেষ রাতও অনেক হয়েছে। ধীরে ধীরে সবাই লিফটের দিকে এগিয়ে গেল।
অন্যদিকে—
ল্যাম্বরগিনির ভেতরে বসে লিসির কান্না এখনো পুরোপুরি থামেনি। চিপসের প্যাকেট একপাশে কেকের বাক্স প্রায় খালি ট্যাবলেটের পর্দা বন্ধ। আর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কামরুলের অবস্থা আরও করুণ। তিনি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছেন যেন বিচার দিবসের অপেক্ষা করছেন বারবার ঘড়ি দেখছেন। বারবার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। কারণ তিনি জানেন স্যার নামছেন। আর ম্যাডাম কিছুক্ষণ আগেও কাঁদছিলেন ঠিক তখনই লিফটের দরজা খুলল। সব নিরাপত্তাকর্মী একসঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল কিরিস বেরিয়ে এল তার পেছনে মার্ক।
তার পেছনে ইয়াবি, রিহান, কাবির, ইশান।
কামরুলের বুক ধকধক শুরু হয়ে গেল। কিরিস কয়েক পা এগিয়ে গাড়ির কাছে আসতেই সে প্রায় দৌড়ে সামনে এসে দাঁড়াল।
— "স্যার!"
কিরিস থামল।
— "হুম?"
— "স্যার, আমি কিছু করিনি!"
কিরিস ভ্রু কুঁচকাল।
— "কি?"
— "ম্যাডাম নিজে নিজেই কেঁদেছেন!"
— "..."
— "আমি কিছু করিনি স্যার!"
— "..."
— "আল্লাহর কসম!"
— "..."
— "স্যার আমাকে মাফ করে দিন!"
কিছুক্ষণ নীরবতা তারপর কিরিস ঠান্ডা গলায় বলল
— "গেট আউট।"
কামরুলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল বেঁচে গেছে!
এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে সে প্রায় দৌড়ে সেখান থেকে সরে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা হাসি চেপে কষ্ট পাচ্ছে। কাবির দৃশ্যটা দেখে ফিসফিস করে বলল
— "লোকটার আজ নতুন জীবন শুরু হলো।"
রিহান মাথা নাড়ল — "দ্বিতীয় জন্ম।"
ইশান বলল— "ওকে দেখে মনে হচ্ছিল শেষ উইল লিখে ফেলেছে।"
ইয়াবি হেসে ফেলল তারপর কিরিসের দিকে তাকিয়ে বলল — "জীবনে একটা মেয়ে পেয়েছিস তুই।"
রিহান সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল
— "আর সেই একটা মেয়েকে নিয়ে পুরো দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করে রাখছিস।"
কাবির বলল — "রাষ্ট্রপতিরও এত সিকিউরিটি থাকে না।"
ইশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল — "ভালোবাসা জিনিসটা সত্যিই ভয়ংকর, যেমন আমার জারা, ওরে মনে পড়লেও শুধু ওর লাথি আর কিল-ঘুষির কথা মনে পরে ।"
রিহান ইয়াবি কাবির হেসে উঠলো কিরিস কোনো উত্তর দিল না শুধু গাড়ির ভেতরে তাকাল লিসি মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। চোখ দুটো এখনো একটু লাল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কেঁদেছে। সবার মুখের হাসি আরও চওড়া হয়ে গেল। কিরিস একবার মাত্র তাদের দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে চারজনের হাসি অর্ধেক কমে গেল।
— "চলো।"
একটা শব্দ।
ব্যস।
আর কোনো কথা নয়।
রিহান কাবির ইশান ও ইয়াবি নিজেদের পথে।
মার্কও মাথা নত করে সরে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশাল পার্কিং এলাকা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল।
শুধু রয়ে গেল কালো ল্যাম্বরগিনি। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিরিস। গাড়ির ভেতরে বসে থাকা লিসি।
রাতের বাতাসে লিসির চুল উড়ছে। আর কিরিস দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। কিছুক্ষণ আগেও চারপাশে ছিল মানুষ, শব্দ, আলোড়ন। এখন যেন পুরো পৃথিবী নীরব শুধু তারা দুজন। কিরিস গাড়ির দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড লিসির দিকে তাকিয়ে রইল।
খোলা ছাদের নিচে বসে আছে সে। চোখ দুটো সামান্য লাল গালে কান্নার ক্ষীণ চিহ্ন এখনো শুকায়নি।
আর পাশে একটা প্রায় খালি কেকের বাক্স।
খালি আইসক্রিম কাপ অর্ধেক চিপসের প্যাকেট। দৃশ্যটা দেখে কিরিসের ভ্রু সামান্য উঠল। ধীরে ধীরে গাড়ির পাশে এসে ঝুঁকে বলল —"কাঁদছিলে কেন?"
লিসি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল।
—"কিছু না।"
—"কিছু না হলে চোখ লাল কেন?"
—"কিছু না বলেছি তো।"
—"লিসি।"
তার গলায় সেই পরিচিত সতর্কতা।
যেটা শুনলে সাধারণ মানুষ এক মুহূর্তে সত্য কথা বলে দেয় কিন্তু লিসি সাধারণ মানুষ নয় সে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল —"মারা গেছে গো।"
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ।
—"কে মারা গেছে?"
লিসি ট্যাবলেটের দিকে আঙুল দেখাল।
—"নায়কটা।"
—"..."
—"ওদের মিল হলো না।"
—"..."
—"খুব খারাপ।"
কিরিস চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।
এখন সে বুঝতে পারছে কেন প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা এমন অবস্থা করে ফেলেছিল তারপর তার দৃষ্টি পড়ল কেকের বাক্সে ভিতরে প্রায় কিছুই নেই। মাত্র এক কোণায় ছোট্ট এক টুকরো পড়ে আছে। কিরিস ধীরে বলল
—"তুমি কি সত্যিই পুরো দুই পাউন্ডের কেক খেয়ে ফেলেছ?"
কিরিস অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল লিসি মাথা নাড়ল।
—"হ্যাঁ।"
—"এত খেলে কিন্তু মোটা হয়ে যাবে।"
লিসি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল
—"আমি মোটা হয়ে গেলে কি আর ভালোবাসবেন না?"
কিরিস ভ্রু কুঁচকে তাকাল
—"এই প্রশ্নটা তোমার মাথায় এলো কীভাবে?"
—"উত্তর দিন।"
কিছুক্ষণ নীরব থেকে কিরিস বলল
—"ভালোবাসা কি মানুষের ওজন দেখে হয়?"
—"অনেকেই তো রূপ আর শরীর দেখেই ভালোবাসে।"
কিরিস ধীরে ধীরে তার হাতটা নিজের হাতে নিল।
—"সেটা ভালো লাগা হতে পারে, ভালোবাসা নয়।"
লিসি তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল কিরিস শান্ত স্বরে বলল —"শোনো, তুমি যদি খুব রোগা হও, তবুও তুমি আমার। তুমি যদি অনেকটা মোটা হয়ে যাও, তবুও তুমি আমার। তোমার চেহারা বদলাতে পারে, কিন্তু তোমার জন্য আমার অনুভূতি বদলাবে না।"
—"এতটা নিশ্চিত কীভাবে?"
—"কারণ আমি তোমার মুখের প্রেমে পড়িনি, লিসি। আমি তোমার প্রেমে পড়েছি, তোমার রুহের প্রেমে পড়েছি আত্মা প্রেমে পড়েছি,।
লিসির ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল
—"তবুও যদি একদিন আমাকে আর সুন্দর না লাগে?"
কিরিস হালকা মাথা নাড়ল।
—"একজন মানুষ সবার চোখে সুন্দর হতে পারে না। কিন্তু নিজের মানুষের চোখে সে সবসময়ই সুন্দর থাকে।"
—"তাহলে আমি মোটা হলেও সুন্দর?"
—"তুমি যদি কদাচিৎ স্থূলকায়ও হও, তবুও আমার চোখে পরীই থাকবে। কারণ তোমার সৌন্দর্য তোমার অবয়বে নয়, তোমার অস্তিত্বে।"
এক মুহূর্ত থেমে সে আরও নিচু স্বরে বলল
—"একদিন যদি তোমার মুখে বয়সের রেখা পড়ে, তবুও আমি সেগুলোকে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প বলে মনে করব। কারণ প্রতিটি রেখায় থাকবে আমার সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতি।"
লিসি নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল
—"বেশ কঠিন কঠিন কথা বলতে পারেন আপনি।"
কিরিসও হালকা হাসল।
—"কথাগুলো কঠিন নয়, সত্যি।"
—"তাহলে কালও কেক খাব।"
—"খাবে। তবে সীমার মধ্যে।"
—"আবার শর্ত!"
—"ভালোবাসা নিঃশর্ত, কিন্তু স্বাস্থ্য নয়।"
কথাটা শুনে লিসি হেসে ফেলল। আর কিরিস তার হাসির দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য হয়তো আর নেই। কিন্তু লিসি তো লিসি মুখ ফুলিয়ে জানালার বাইরে তাকাল সে। কিরিস গাড়ির অন্য পাশে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল। দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের শব্দ অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
ইঞ্জিন স্টার্ট দিল মুহূর্তেই ল্যাম্বরগিনির শক্তিশালী V12 ইঞ্জিন গর্জে উঠল। সামনের নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত রাস্তা পরিষ্কার করে দিল গেট খুলে গেল। আর ধীরে ধীরে ব্ল্যাকস্টোন টাওয়ারের প্রাঙ্গণ ছেড়ে বেরিয়ে এল গাড়িটি।
ঢাকার রাত তখন অনেকটাই শান্ত রাস্তার আলো একের পর এক পেছনে সরে যাচ্ছে। লিসি প্রথমে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা সিটে ঠেকিয়ে দিল, পেট ভরা, কান্নাও করা হয়েছে।
অভিমানও করা হয়েছে এখন আর ঝগড়া করার শক্তি নেই। অন্যদিকে কিরিস এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে চোখ স্থির মনোযোগ অটুট।
কিন্তু মাঝেমধ্যে তার দৃষ্টি পাশের সিটে বসা মেয়েটির দিকে চলে যাচ্ছে যে কিছুক্ষণ আগে সিনেমার নায়ক মারা যাওয়ায় কেঁদেছে। আর দুই পাউন্ডের কেক প্রায় একাই শেষ করে ফেলেছে গাড়ি সামনে এগিয়ে চলল।
ঢাকার আলো পেছনে পড়ে রইল আর রাতের নরম বাতাসের মধ্যে, তাদের দুজনকে নিয়ে কালো ল্যাম্বরগিনিটি নিঃশব্দে বাড়ির পথে ছুটতে লাগল।
রাত তখন প্রায় তিনটা ছুঁইছুঁই।
দীর্ঘ দিনের ক্লান্তি, বিয়ের ব্যস্ততা, অতিথিদের আনাগোনা সব মিলিয়ে রায় চৌধুরী বাড়ির সেই চিরচেনা কোলাহল অনেক আগেই স্তিমিত হয়ে এসেছে। বিশাল অট্টালিকার অধিকাংশ আলো নিভে গেছে। শুধু নিচতলার হলরুমে এখনো কয়েকটি আলো জ্বলছে। ল্যাম্বরগিনির ইঞ্জিনের শব্দ থামতেই গেটের নিরাপত্তারক্ষীরা সজাগ হয়ে দাঁড়াল। গাড়ির দরজা খুলে লিসি দ্রুত নেমে পড়ল।
তার চোখেমুখে স্পষ্ট ক্লান্তি। আজ আর কোনো কথা বলার শক্তি নেই। সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই হলরুমে বসে থাকা বড়দের চোখ তার দিকে ঘুরে গেল। মির্জা বেগম সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন পাশে আনোয়ার, আনারুল আরও কয়েকজন প্রবীণ আত্মীয়।
টেবিলজুড়ে হিসাবের খাতা, কিছু ফাইল আর চায়ের কাপ ছড়িয়ে আছে। লিসিকে দেখেই আনোয়ার ভ্রু তুললেন।
— "এত দেরি হলো কেন মা?"
লিসি হাই চেপে বলল—
— " ভাইয়ার কাছ ছিলো আব্বু তাই দেরি,,, "
এক মুহূর্ত নীরবতা তারপর আনোয়ার মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন।
— "ওহ... তা-ও ঠিক।"
লিসি আর দাঁড়াল না।
— "আমি ঘুমাতে যাচ্ছি।"
— "যাও মা।"
— "শুভরাত্রি।"
— "শুভরাত্রি।"
কথা শেষ করেই সে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখন কিরিসও ভেতরে প্রবেশ করল কিন্তু সে উপরে গেল না। একবার মাত্র সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আবার হলরুমের দিকে ফিরে এল বড়দের আলোচনার মাঝখানে গিয়ে বসল বিয়ের খরচ, অতিথিদের ব্যবস্থাপনা, বাকি থাকা হিসাব,কিছু ব্যবসায়িক বিষয়।
সব মিলিয়ে আলোচনা এখনো শেষ হয়নি। কিরিস শান্ত মুখে ফাইল টেনে নিল। আর কথা শুরু হলো নতুন করে।
ওইদিকে নিজের ঘরে ঢুকেই লিসি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
দরজা বন্ধ আজকের দিনের পর এই মুহূর্তে এর চেয়ে বড় আশীর্বাদ আর কিছু হতে পারে না।
সে ধীরে ধীরে ব্যাগ দুইটা টেবিলের ওপর রাখল।
সঙ্গে আনা জিনিসপত্র গুছিয়ে একপাশে রাখল তারপর কোনো সময় নষ্ট না করে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। শরীরের প্রতিটি অস্থিতে যেন ক্লান্তি জমে আছে। কিছুক্ষণ পর ঠান্ডা জলের ঝরনা তার ওপর নেমে এলো সারাদিনের ধুলো, ক্লান্তি, অবসাদ ধীরে ধীরে ধুয়ে যেতে লাগল। আজ আর তার মধ্যে এতটুকু শক্তিও অবশিষ্ট নেই যে দীর্ঘ সময় নিয়ে সাজগোজ করবে শাড়ি পরবে।
তাই ওয়ারড্রোব খুলে দ্রুত একটি আরামদায়ক সিল্কের নাইটড্রেস বের করল নরম কাপড়। ঘুমানোর জন্য একেবারে উপযুক্ত সঙ্গে হালকা একটি লম্বা উপরে পড়ার জন্য কোর্ট মতো আছে। ড্রেসটার পিঠের দিক থেকে বেশ খোলা, বলতে গেলে শুধু চিকন কোরাচ বেল্ট দেওয়া পুরো পিঠে। লিসি মারাত্মক রকম সুন্দর লাগছে এতে ড্রেস টা পরে নিয়ে চুলগুলো আলগাভাবে মুছে নিল।
তারপর আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ল। নরম বালিশে মাথা ছোঁয়াতেই চোখ দুটো আধবোজা হয়ে এলো। বাইরে কোথাও দূরে রাতের বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে।
ঘরের ভেতরে হালকা সুগন্ধ মনে হলো পৃথিবীর সমস্ত শান্তি যেন এই মুহূর্তে তার বিছানার ওপর এসে জড়ো হয়েছে। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই গভীর ঘুম তাকে নিজের জগতে টেনে নিয়ে গেল। অন্যদিকে নিচতলার হলরুমে এখনো আলো জ্বলছে কিরিস ফাইলের পাতা উল্টাচ্ছে বড়রা আলোচনা করছেন আর বিশাল রায় চৌধুরী বাড়ি ধীরে ধীরে আরও গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় ডুবে যাচ্ছে।
রাত তখন অনেক গভীর সারা বাড়ি নিস্তব্ধ।
দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে কিরিস নিজের ঘরে ফিরে এলো। দরজা বন্ধ করেই কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিছানার দিকে তাকাতেই তার চোখ থেমে গেল।
লিসি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দিনভর ক্লান্তি যেন তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিয়েছে। কিরিস ধীরে ধীরে নিজের শার্ট খুলে একপাশে রাখল, পোশাক বদলে শুধু আরামদায়ক ট্রাউজার পরে নিল। তারপর আবার দৃষ্টি ফিরে গেল বিছানার দিকে। ঘরের মৃদু আলোয় লিসির মুখটা অদ্ভুত শান্ত লাগছে। লম্বা চুলগুলো বালিশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। সে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল।
তার দৃষ্টি গিয়ে থামল লিসির পিঠের দিকে নাইট ড্রেসটার পেঠ খোলা থাকায় কোমরের কাছে থাকা সেই ছোট্ট জন্মচিহ্নটা বহুবার দেখলেও আজও তার চোখ সেখানে আটকে যায়। দুটি ছোট পাখির ডানার মতো দেখতে চিহ্নটি যেন আলাদা করেই নজর কাড়ে। কিরিস ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে বসল। মুহূর্তের জন্য হাত বাড়িয়ে লিসির চুলগুলো সরিয়ে দিল পিঠ থেকে। এরপর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঝুঁকে নিজের ঠোঁট টা ছুঁয়ে দিলো তার কোমড়ে কাছে জন্ম চিহ্নে। ঘুমের মধ্যেই লিসি সামান্য নড়ে উঠল অস্পষ্ট গলায় বিড়বিড় করল
— "ঘুম পাচ্ছে..."
কিরিসের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— "জানি।"
লিসি আর কিছু বলল না। আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু কিরিস তো কথা শোনার বান্দা নয়। সে লিসিকে কোমড় জড়িয়ে ধরে তারপর আলতো করে পিঠে হাত দিয়ে তাকে ঝাঁকিয়ে বলতে থাকে —“ নাহ তুনি ঘুমাতে পারবে না,,, ওই ওই ওই ”
লিসি ঘুম ঘোরে বিরক্তি নিয়ে বলে —" কি করছেন "
কিরিস লিসি মুখে হাত দিয়ে বলে —" ওই তোমাকে কে বলেছে এই নাইট ড্রেস পরে ঘুমাতে, আমি সামলাতে পারছিনা"
লিসি কিছু বলছে সে সত্যিই ঘুমিয়েছে কিরিস তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ তারপর লিসির গলায় মুখ গুছে দিলো সেখানে অনবরত এলোপাতাড়ি চুমু খেতে লাগলো। লিসি সরিয়ে দিতে চাচ্ছে কিন্তু কিরিস ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোই নিয়ে নেছে। কিরিসের গলায় চুমু খাওয়া হলে সে এবার লিসি পিঠে, মুখে, বুকে যেখানে পাচ্ছে সেখানে চুমু খাচ্ছে। লিসি এবার খুব বিরক্তি হলো সে আলতো করে চোখ খুললো।
—" আহহহ একটু ঘুমাতে দিন .... কাল সকালে আবার উঠতে হবে "
কিরিস সুরু চোখে তাকিয়ে আছে। লিসি একটু তাকিয়ে থেকে বললো —" আপনি যখন ঘুমিয়ে ছিলেন তখন কি আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করেছি "
তার চোখদুটো দেখে মনে হচ্ছে ঘুমা না পরতে পারলে লিসি এবার কান্না করে দেবে, কিরিস কিছু বলতে যাবে লিসি তখন টুস করে কিরিসের ঠোঁটে চুমু খেয়ে বসে। কিরিস তাকিয়ে আছে কিন্তু তার একটু পরেই লিসি কিরিসের বাহু ধরে নিজের বুকে মধ্যে নিয়ে আসে ওকে জরিয়ে ধরে। কিরিসকে নিজের বুকে লুকিয়ে নেয় তারপর পিঠে বাচ্চাদের মতো হালকা হাতে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দেচ্ছে কিরিস ওর বুকে মুখগুছে আছে তারপর বললো —" আমি কি বাচ্চা নাকি যে এভাবে ঘুম পড়াচ্ছো"
লিসি ঘুমের মধ্যে বললো —" ঘুম পড়ুন.. "
কিরিস আর কিছু বললো না চুপ করে শান্ত বাচ্চার মতো লিসিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে।
★★★
ভোরের শেষ প্রহর পেরিয়ে সকাল ধীরে ধীরে রায় চৌধুরী বাড়ির আঙিনায় নেমে এসেছে। জানালার ফাঁক গলে সূর্যের কোমল আলো ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় আটটা ছুঁইছুঁই লিসির ঘুম ভাঙল ধীরে ধীরে। চোখ খুলতেই প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না।
তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল।
কিরিস তার বুকে মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
সারারাতের ক্লান্তি যেন অবশেষে তাকে হার মানিয়েছে।
যে মানুষটাকে সবাই ভয় পায়, যার একটিমাত্র দৃষ্টিতে বড় বড় মানুষের কণ্ঠ শুকিয়ে যায়, সেই মানুষটাকেই এখন কতটা শান্ত আর নিরীহ লাগছে। লিসি ধীরে ধীরে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। তারপর নিচু হয়ে কপালে একটি আলতো চুম্বন এঁকে দিল মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলল—
—"আপনি জানেন, ঘুমের মধ্যে আপনাকে কত সুন্দর লাগে, আমার বেপরোয়া পুরুষ ?"
কিরিস নড়ল না কিন্তু তার শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দে সামান্য পরিবর্তন হলো। লিসি সেটা খেয়াল করল না সে আরও একটু ঝুঁকে বলল
—" বাজে লোক একটুও ঘুমাতে দেবে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত নিজের তৃপ্তি হচ্ছে। যদি আমাকে আরো জ্বালাতেন তাহলে আমি আপনার মেরে দিতাম। বাজে লোক "
তার ঠোঁটে নরম হাসি ফুটে উঠল।
—"কিন্তু এখন আপনাকে দেখলে মনে হয় একদম শান্ত একটা ছেলে।"
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল চোখ দুটো কেমন অদ্ভুত অনুভূতি জেগে উঠলো মায়া ভরা ডাগর চোখে তাকিয়ে আছে কিরিসের মুখে পানে তারপর বলল—
—"আমি কখনো আপনাকে বলি না। কিন্তু আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি। অনেক বেশি।"
কিরিস চোখ বন্ধ রেখেই শুনছে। একটি শব্দও করল না লিসি আবার ফিসফিস করে বলল—
—"তবে আপনি মাঝে মাঝে খুব জ্বালান। গতকালও বাড়ি না এসে কতক্ষণ আমাকে গাড়িতে বসিয়ে রাখলেন!"
সবাই কে বকেন কেমন রাগী বদমেজাজি...... তবুও..."
তার আঙুল কিরিসের কপালে ছুঁয়ে গেল।
—"আপনাকে ছাড়া কিছুই ভালো লাগে না, আপনাকে যে আমি বড্ড ভালোবাসি। "
কিরিসের ঠোঁটের কোণে অতি ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু চোখ খুলল না লিসি ভেবেই নিল সে এখনো ঘুমিয়ে আছে। ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে সে হালকা রঙের একটি শাড়ি পরে নেয় সাদা আর নেভি ব্লু রঙের চুল পিঠে ছড়িয়ে আছে,কানে ছোট ঝুমকা, নাকে নাক ফুল, হাতে কিরিসের দেওয়া চুড়ি দুটো।

নিচতলায় এখনো বিয়ের আবহ কাটেনি। বাড়ির হলরুমে গার্ডেনে শিশুদের ছোটাছুটি আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা হাসি-আড্ডা একপাশে তিশা লাল শাড়ি পরে বসে আছে।
আজ তার এলাকার আত্মীয়রা আসবে তাকে দেখতে।
তাই সকালের পর থেকেই সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত।
আর অন্যদিকে রিহান, কাবির, ইশান, ইয়াবি আর বাকি ছেলেদের অবস্থা করুণ চোখের নিচে কালচে দাগ।
চুল এলোমেলো মুখে চরম ক্লান্তি কাবির সোফায় আধশোয়া হয়ে বলল —"আমি আর বাঁচব না।"
রিহান সঙ্গে সঙ্গে বলল
—"নাটক করিস না।"
—"সত্যি বলছি।"
—"কালকে তিনবার তোকে ঘুমাতে দেখেছি।"
ইশান হাই তুলে বলল —"আমাদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বিয়ে না, যুদ্ধ করেছি।"
রিহান চা হাতে নিয়ে বলল—
—"দেখ কাবির, ভালো দিকটা ভাব।"
—"কি ভালো দিক?"
—"এই অবস্থায় বাসর করলে তুই পাঁচ মিনিটও টিকতে পারতিস না।"
চারপাশে হো হো করে হাসি পড়ে গেল রিহান কাঁধে হাত রেখে বলল —"ধৈর্য ধর।"
ইশান বলল —"আজকে বিশ্রাম।"
রিহান গম্ভীর মুখে বলল
—"আগামীকাল থেকে সেঞ্চুরির পরিকল্পনা কর।"
ইয়াবি কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলে —" বেশি উড়ো না, তিশা কিন্তু আমার বোন, আমি এখনো বসে আছি।
কাবির কুশন ছুড়ে মারল
— " তো এখন আমার বউ। তোর বোন পরে এখন তিশা আমার, আমার আমার "
ইয়াবি মুখ ঘুরিয়ে নিলো আর চারপাশ আবার হাসিতে ভরে উঠল। ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল লিসি।
মির্জা বেগম তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন কেউ বললেন —"মাশাআল্লাহ।"
সাবেনা —"একদম রাজবাড়ির বউয়ের মতো লাগছে। তবে আমাদের তিশাও তো কম নয় "
আর সকালের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা লিসিকে দেখে মনে হচ্ছিল রায় চৌধুরী বাড়ির সমস্ত উৎসব, সমস্ত আনন্দ আর সমস্ত সৌন্দর্য যেন এক জায়গায় এসে মিলিত হয়েছে। একদিকে গুরুজনদের আনাগোনা, আরেকদিকে বাচ্চাদের ছোটাছুটি সব মিলিয়ে পুরো বাড়ি এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসে ভরপুর। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে লিসি মাঝখানে দাঁড়ালো আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটনা ঘটল।
কাবির প্রথমে এগিয়ে এল তারপর ইশান তারপর রিহান
সবশেষে ইয়াবি চারজন একসঙ্গে এমনভাবে এগিয়ে এল যেন কোনো বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। লিসি চোখ বড় করে বলল— "কি হয়েছে ?"
কিছু বলার আগেই ধপ করে চারজন একসঙ্গে লিসির সামনে বসে পড়ল! একেবারে ফ্লোরে তারপর চারজন একসঙ্গে লিসির পা ধরে ফেলল। পুরো হলরুম স্তব্ধ।
সবাই এই চমক থেকে বাইরে আসতে কিছু সেকেন্ড লাগলে। মেয়েদের দিক থেকে একসঙ্গে চাপা হাসির শব্দ উঠল নুসরাত হাত দিয়ে মুখ ঢাকল জারা প্রায় কাঁদতে কাঁদতে হাসছে। হিয়া সোফার পেছনে লুকিয়ে পড়েছে।
সুরভী বলল — "এরা কি করছে রে!"
আরোবি বলল — "আমি আর পারছি না!"
লিসি হতভম্ব দাঁড়িয়ে আছে কি বলবে বুঝতেও পারছে না বেচারা ছেলেরা ওর পা আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে লিসি পা টা হালকা নাড়িয়ে — "আরে ভাইয়ারা! ছাড়ো! আমার শাড়ি খুলে যাবে!"
কাবির নিচে থেকেই বলল — "না! আজকে না!"
ইশান বলল— "আজকে তুই আমাদের শেষ ভরসা!"
রিহান বলল — "তোর বরকে বলে দে আজকে আমাদের কাজ থেকে ছুটি দিক!"
ইয়াবি মাথা কাত করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল
— "আমার সোনা বোন, বল। আজকে কাজ বন্ধ করায় দে।"
লিসি চোখ কুঁচকে বলল— " ইয়াবি তুমি আমাকে ‘সোনা’ বোন বলছো আমাকে?"
ইয়াবি সঙ্গে সঙ্গে বলল — "হ্যাঁ! আমার সোনা বোন! আমার মিষ্টি বোন !"
রিহান যোগ করল — "আমাদেরও রক্ষা কর!"
কাবির বলল — "আমরা আর বাঁচব না!"
ইশান নাটকীয়ভাবে বলল — "আমরা ঘুম চাই!"
চারপাশে হাসির ঝড় গুরুজনরাও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।লিসি এবার সত্যিই দিশেহারা।
— "আচ্ছা ঠিক আছে! ঠিক আছে! ছাড়ো! আমি বলব!"
চারজন একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল যেন যুদ্ধ জিতে গেছে।
কাবির বলল — "১০০ বার বলবি?"
লিসি বিরক্ত মুখে বলল — "হ্যাঁ! ১০০ বার!"
ইয়াবি হাততালি দিল — "হাজার বার বললে ভালো হতো!"
লিসি চোখ ঘুরিয়ে বলল — "তোমরা পাগল!"
ঠিক তখনই পেছন থেকে মেয়েরা হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ার অবস্থা
নুসরাত বলল — "এরা বাচ্চা নাকি!"
জারা বলল — "পুরো সার্কাস চলছে!"
আরোবি বলল — "লিসির বর কিরিস ভাইয়া জানলে আজ এদের কী হবে!"
লিসি মাথা চেপে ধরল।
— "আমি কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা..."
আর সেই মুহূর্তে রায় চৌধুরী বাড়ির সকালটা যেন সম্পূর্ণ এক হাসির নাট্যমঞ্চে পরিণত হয়ে গেল। লিসি আর ওখানে দাঁড়ালো না মেয়েদের ওখানে গিয়ে শাড়ির আঁচল গুছিয়ে বসলো। তিশা দূরে এইসব দেখছে কিন্তু কিছু বলছে শুধু মুচকি হাসছে আজকে এটাই তার প্রধান কাজ, আজকে তাকে সবাই দেখবে সে পুতুলের মতো চুপ করে বসে থাকব।
অন্য দিকে বাড়ির পিছনের বিশাল বাগানটা সকালবেলায় যেন আলাদা এক পৃথিবী। নরম ঘাসে শিশির এখনো লেগে আছে। হালকা রোদ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ছেঁকে এসে পড়ছে সবুজ মাটির ওপর।
দূরে বিশাল ময়দানটা দেখা যাচ্ছে সেখানে রাতের অনুষ্ঠানের জন্য মঞ্চ, আলো আর সাজসজ্জার কাজ চলছে। কর্মীরা ব্যস্ত ইলেকট্রিক তার টানছে ফুলের গেট তৈরি করছে লাইট বসাচ্ছে। আর তার মাঝেই একদল মেয়ে বাগানের এক কোণে চলে এসেছে। নুসরাত, জারা, হিয়া, সুরভী, আরোবি । তারা কোনো ঝামেলা ছাড়াই ঘাসের ওপর বসে পড়েছে। একদম নির্ভার ভঙ্গিতে।
যেন রাজপ্রাসাদের বাগান তাদেরই নিজের জায়গা।
লিসি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে আরোবি এগিয়ে এল। হালকা অভিমান মেশানো হাসি মুখে — "এই মেয়ে!"
লিসি ঘুরে তাকাল — "কি হলো?"
আরোবি ভ্রু কুঁচকে বলল
— "তুই কদিন ধরে আমার সাথে ঠিকভাবে কথা বলিস না কেন?"
লিসি চোখ বড় করে বলল — "আমি আবার কী করলাম?"
— "করিস না কিছুই। সেটাই সমস্যা।"
লিসি হেসে ফেলল।
— "আমি তো ব্যস্ত ছিলাম।"
আরোবি কাঁধ ঝাঁকালো।
— "সবাই ব্যস্ত, কিন্তু বন্ধুত্ব তো ভুলে যায় না।"
লিসি একটু থেমে গেল তারপর ধীরে ধীরে আরোবির পাশে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। নরম সবুজ ঘাসে বসতেই যেন পুরো পরিবেশটাই আরও শান্ত হয়ে গেল।
সে হেসে বলল — "এই যে বসে পড়লাম। এখন খুশি?"
আরোবি সঙ্গে সঙ্গে হাসল — "না। এখন একটু খুশি। পুরো না।"
— "আর কী করলে পুরো খুশি হবে?"....