পর্ব :64
আনারুল মুচকি হেসে
— “ হ্যাঁ… অনেকদিন পর এমন প্রাণ এসেছে। ”
আর অন্যপাশে কিরিস, রিহান, কাবির একসাথে বসে।
কাবির বিরক্ত মুখে
—“ আমি বিয়ে করছি, না অফিস খুলেছি! ”
রিহান হেসে —“ দুটোই! ”
কিরিস চুপচাপ বসে আছে… কিন্তু তার চোখ একবার দরজার দিকে যায় যেদিক দিয়ে রান্নাঘর।
এক সেকেন্ডের জন্য থামে…
তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
কাবির খেয়াল করে —“ কি ভাইয়া ? রান্নার গন্ধ আসছে নাকি? ”
রিহান মুচকি হেসে — “ না… অন্যকিছুর গন্ধ! ”
কিরিস একদম নির্লিপ্ত— “ চুপ করে বসো। ”
কিন্তু তার চোখের কোণে একটুখানি হাসি লুকানো থাকে।
রান্নাঘরের কোলাহল, হলরুমের হাসি,
স্টাডি রুমের শান্ত আলাপ সব মিলিয়ে বাড়িটা আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে…
আর এই সবকিছুর মাঝেই একটা নতুন সম্পর্ক,
একটা অদ্ভুত টান, চুপচাপ নিজের জায়গা তৈরি করে নিচ্ছে…
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে গেল।
দুপুরের রান্না শেষ হয়ে গেলে—
ডাইনিং হলে সবাই একসাথে বসে খাওয়ায় মেতে ওঠে।
বড় টেবিলটা ভর্তি—গরম ভাত, কাবাব, রেজালা, ভুনা, সালাদ…
জারা প্রথম লোকমা মুখে দিয়েই —“ ওহহহ! ভাবি, আপনি তো সিরিয়াসলি ভালো রান্না করেন! ”
সুরভী নাটকীয়ভাবে —“ কিরিস ভাইয়া , আপনি তো লটারি মেরেছেন!”
জারা —“ আমরা তো এখন থেকে প্রতিদিন ভাবির হাতের রান্না খাবো! ”
লিসি লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলে।
সুপ্রিয়া খুশি হয়ে — ” আমার বউমা পারবেই। আর এমন করছিস যেন লিসির হাতের রান্না আজ প্রথম খেলি! ”
আরোবি খেতে খেতে বলে —“ বিষয়টা সেটা নয়, লিসির হাতের রান্না আগে খেয়েছি, কিন্তু ভাবি হিসেবে নয়, তাই মনে হয় ভাবি হওয়ার পরে লিসির হাতের রান্নার স্বাদ আরো বেড়ে গেছে। ”
কাবির আর রিহান তো খাচ্ছে আর সঙ্গে তাদের কাজ নিয়ে কথা বলছে বেচারা দুইটার শান্তি নেই। সবার মাঝে
কিরিস কিছু না বলে চুপচাপ চামচ দিয়ে ধীরে ধীরে খাচ্ছে… কিন্তু একবার চোখ তুলে লিসির দিকে তাকায় এক সেকেন্ড।
তারপর আবার নিচে।
কিন্তু সেই এক সেকেন্ডেই লিসির বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে।
দুপুরে খাওয়ার পরেই কিরিস সোজা বাইরে চলে যায় কিছু কাজ আছে নাকি তার, আর সবাই দুপুরের রোদ কমলে গার্ডেনের দিকে গিয়ে বসে।
বিকেল…
রায় চৌধুরী বাড়ির বিশাল গার্ডেন।
সবুজ ঘাস, চারপাশে ফুল, মাঝখানে বসার জন্য লাইট ডেকোরেশন, ফেয়ারি লাইট ঝুলানো… যেগুলো এখন বন্ধ সন্ধ্যার সময় জ্বলবে।
সবাই মাটিতে গোল হয়ে বসে আছে।
কেউ গিটার ধরেছে, কেউ হাততালি দিচ্ছে।
রিহান গলা ছেড়ে গান ধরেছে —
ডোলী সজা কে রখনা
লেনে তুঝে ও গোরী
আযেংগে তেরহ সজনা …” 
সবাই হেসে ওঠে।
কাবির চিৎকার করে —“ এই গান বন্ধ কর! ”
আরোবি —“ না না, এটা তোর থিম সং! ”
কাবির অসহায় হয়ে বলে —“ আরে আমাকে কে তো দেখে শুনে বিয়ে দেচ্ছে না, আমি প্রেম করে করছি আমার পছন্দের মানুষের সাথে তাহলে তোরা এমন করছিস কেন!! ”
জারা—“ এমন না করলে হবে না তো ”
রিহান গিটার নামিয়ে বলে —“ এই গানটা তুই তিশাকে আনার সময় গাইবি ”
সবাই আবার হেসে ওঠে।
গান-হাসির ফাঁকে এবার শুরু হয় বিয়ের প্ল্যানিং—
নুসরাত — “ মেহেদি নাইটে আমি সবুজ শাড়ি পরবো!
সুরভী — “ না! সবুজ তো রিহানের বিয়েতে পরেছি, কিন্তু আমরা কচি পাতার রঙের শাড়ি পরতে পারি? ”
জারা — “ তাহলে এইটাই হলো, আমি তো শাড়ি না পরলে তোরা আমাকে জাতের বাইরে করে দেবে । ”
আরোবি — “ অবশ্যই বিয়েতে তুই কি শার্ট প্যান্ট পরবি! আমরা তাহলে এই রঙ ঠিক করলাম … লিসি....ভাবি, আপনি কী পরবেন?
সবাই একসাথে লিসির দিকে তাকায়। লিসি সবার দিকে তাকিয়ে কি বলবে ভেবে দেখতে দেখতে একটু ভেবে —
“ আমি… সবাই যা পরবে তাই পরবো …”
নুসরাত সাথে সাথে —“ আমার মনে হয় এবার লিসির অনেক কাজ আছে, কাবিরের বড় ভাবি হিসেবে ”
সবাই “উউউ…” করে ওঠে। লিসি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে। কাবির একটু মজা নাটকীয় সুর করে বলে —“ ও আমার বড় ভাবি গো! পারো যদি আমার ভাইটাকে একটু বলো আমাদের একটু কাজ কম করে দিতে। ”
রিহান —“ ঠিক ঠিক আর হ্যাঁ পারিস যদি নিজের শাড়ির আঁচলে বেঁধে রাখিস ”
বলে কাবির আর রিহান হাসতে থাকে তারা তো জানে কিরিস লিসিকে ঠিক কতটা ভালোবাসে। আর এইদিকে লিসি বিরক্তি নিয়ে বলে —“ ভাইয়া তোমরাও শুরু করলে, বলেছি না আগের মতোই লিসি বলে ডাকবে ভাবি বলবে না, এবার বলবে আর কথা বলবো না তোমাদের সাথে ”
বলে লিসি মুখ ঘুরিয়ে বসে, আর লিসির এমন ব্যবহার দেখে সবাই হাসতে থাকে আর ওকে শান্তনা দিয়ে বলে তারা ওকে আগের মতোই লিসি বলে ডাকবে ওদের চোখে লিসি সবসময় ওদের ছোট বোন থাকবে। সবাই নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে,কথা বলছে।
ঠিক তখনই—
গেটের দিকে হঠাৎ গাড়ির শব্দ… সবাই তাকায়।
একটা, দুইটা, তিনটা গাড়ি ঢুকে আসে ভেতরে।
কাবির উঠে দাঁড়িয়ে —“ কে আসলো আবার?
গাড়ি থেকে একে একে নেমে আসে—
ঈশান… হিয়া… আর তাদের মা-বাবা। তারা সোজা গাড়ি থেকে নেমে হলরুমে ডোকে হলরুমে তখন কেউই ছিল না সবাই গার্ডেনের দিকে আছে বাড়ির কাজের লোক কমলা বলে দিলে কেউ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না সবাই গার্ডেনের দিকে চলে গেল, সবাইকে একসাথে গার্ডেনে দেখে কাজিনরা তো আনন্দে দাড়িয়ে পরেছে, বড়রাও হাসিমাখা মুখনিয়ে স্বাগতম জানাচ্ছে,
নুসরাত চিৎকার করে — “ ঈশান ভাইইই! হিয়া, আম্মু আব্বু, তোমরা চলে এসেছো ”
হিয়া দৌড়ে এসে— “ হাই গাইস! আমি চলে এসেছি ”
সবাই উঠে গিয়ে একসাথে হইচই শুরু করে দেয়।
আলিঙ্গন, হাসাহাসি, চিৎকার পুরো গার্ডেন আবার জমে ওঠে। ঈশান কাবিরকে জড়িয়ে ধরে — “ বর সাহেব! আমাদের বাদ দিয়ে বিয়ে ঠিক করে ফেললি? ”
কাবির হেসে — “ তুই দেরি করেছিস! ”
হিয়া লিসির সামনে এসে থামে… একটু অবাক হয়ে তাকায়—
—“ ওহ… এটাই আমাদের নতুন ভাবি নাকি? লিসি শেষ মেষ তুই আমি যখন প্রথম আম্মু আব্বুর কোথা থেকে শুনেছি কর আমি আনন্দে অবাক এ সোফা থেকে পড়ে গিয়েছি আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কিরিস ভাইয়া আমাদের ওই বড় হিটলার কিরিস ভাইয়া ও বিয়ে করেছে!
হিয়াকে সরিয়ে দিয়ে সাবেনা আর মাবেনা এগিয়ে এসে লিসিকে দুজনে একসাথে জড়িয়ে ধরে,
সাবেনা —“ আল্লাহ! আমি যখন ভাইজানের কাছ থেকে শুনেছি, কিরিস লিসিকে বিয়ে করেছে, আমি যে আনন্দে কি করবো ভেবে পারছি না ”
মাবেনা লিসির মাথায় হাত রেখে বলে — “ একদম আল্লাহ দুজনকে একে অপরকে করে তৈরি করে দেছে, দুজনকে একসাথে মাশা-আল্লাহ লাগবে ”
তাদের স্বামীরাও লিসিকে দেখে কিছু শুভ কামনা দিয়ে দেয়, সুপ্রিয়া প্রিয়া দুজনে দাঁড়িয়ে আছে ওদের পাশে,মির্জা বেগম ও মেয়েদের এতদিন পরে কাছে পেয়ে খুশি, আনোয়ার আনারুল আর তাদের বোনের স্বামীরা একপাশে গিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে বসে, এইদিকে সুপ্রিয়া এগিয়ে এসে বলে —“ সাবেনা তোমরা গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো আগে তারপর এসে গল্প করো, ওদের দুটোর কথা বাদ দাও, ওদের অনেক শক্তি আছে ”
এই কথা শুনে সাবেনা আর মাবেনা দুজনেই নিজেদের ব্যাগ থেকে মেরুন রঙের একটা করে বড় বাক্স বের করে। যেটা দেখে সুপ্রিয়ার আর বুঝতে বাকি থাকে না তারা লিসির জন্য উপহার এসেছে, সুপ্রিয়ার ওদের দিকে তাকিয়ে বলে —“ এইসবের আবার কি দরকার ছিলো ”
প্রিয়া—“ হ্যাঁ তোমরা আগে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো! ”
সাবেনা বাক্স টা খুলে একটা সোনার নেকলেস বের করে লিসির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে —“ তা বলবে হবে, কিরিস কি আমার কম আদরের, আর তার বউ তো আমাদের কত আদরের হব,তার সঙ্গে সে আবার আমাদের বাড়ির মেয়ে, কিরিসের বউ এর জন্য আমি এটা বানিয়ে ছিলাম, ”
বলে লিসির গলায় পরিয়ে দিয়ে বলে —“ বাহ্ কি সুন্দর একদম তোর গলার জন্য বানানো ”
লিসি ইতস্তত করে বলে —“ খালামনি এটা অনেক দামি, আর থাক দিতে হবে না.... ”
মাবেনা লিসির কথা কেটে বলে —“ দিতে হবে না মানে, কিরিসের বউ এর জন্য আমাদের বাড়ি তো বাড়ি গোটা গুষ্টির মানুষ অপেক্ষা করেছে, আর যখন হলো তখন কিছু দেবো না, ”
বলে সে তার হাতের বাক্স খুলে একজোড়া বড় সোনার টাবড়া ঝুমকো বের করে —“ দেখি কানের দুলটো খুলে এদুটো পর ”
লিসি কি বলবে বুঝতে পারছে না সুপ্রিয়ার দিকে তাকালে সুপ্রিয়া হেসে মাথা নাড়ে, চোখের চাউনি দিয়ে বুঝিয়ে দেয় নাও এইগুলো তোমারই, লিসি কিছি বলতে যাবে আরোবি এগিয়ে এসে বলে —“ দাও ফুফগ আমার কাছে আমি পড়িয়ে দিচ্ছি ”
আরোবি লিসির কানের দুল খুলে মাবেনার দেওয়া ঝুমকো পড়িয়ে দেয়। যেটা দেখে মাবেনা সন্তুষ্টি নিয়ে বলে —“ মাশা-আল্লাহ দারুণ মানিয়েছে এবার আমরা ফ্রেশ হতে যেতে পারি কি বলিস বোন ”
সাবেনা —“ একদম , নে তোরা এবার নিজেদের মধ্যে কথা আল আমরা ভিতরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসি ”
লিসি চুপ করে দাড়িয়ে আছে কি বলবে বুঝতে পারছে গলার আর কানের গহনায় হাত দিয়ে মুচকি হাসে, খুব ভালো করে বুঝতে পারছে কিরিস ঠিক কতটা আদরের এই পরিবারের ওর রাগ, খিটখিটে মেজাজ, হওয়ার পরেও সবাই ওকে কতটা ভালোবাসে, লিসি যদি কিরিসের বউ না হতো তারপরেও যে হতো তাকেও এমন আদর করা হতো,সুপ্রিয়া সাবেনাদের নিয়ে ভিতরে যাবার সময় বলে —“ এই যে নোনদায় দুইজন ভিতরে এসে ফ্রেশ হয়ে নিন, ”
আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে বলে— “ আর তুমিও আসো দুলাভাইদের পেয়ে আর খোজ নেই ”
আনারুলরা হেসে ভিতরে দিকে যেতে থাকে বড়রা সবাই একে একে ভিতরে যায় মির্জা বেগমকে ধরে তার মেয়েরা নিয়ে যায়, এদিকে বড়রা এগিয়ে এসে অতিথিদের নিয়ে ভেতরে যায়।
লিসি চুপ করে দাড়িয়ে আছে তখন আরোবি ওকে টেনে বসিয়ে বলে —” আর এখানে বসে পর আর শোন কি কথা হয় দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ”
লিসি বসে পরে তখন ইশান লিসিকে দেখে মিষ্টি হেসে বড়দের মতো ভাব নিয়ে বলে — “ মাশাআল্লাহ… আপনি তো অনেক সুন্দর! ভাবি ”
লিসি লজ্জা পাওয়ার ভাব নিয়ে — “ ধন্যবাদ…”
গার্ডোনে সবাই আবার গোল হয়ে বসে কিন্তু এখন দলটা আরও বড়, আরও প্রাণবন্ত।
রিহান বলে — “ এবার পারফরম্যান্স হবে! নতুন গেস্ট এসেছে! ”
ইশান হেসে নিজের কোর্টটা পাশে রেখে বলে — “ আমি কিন্তু গান গাইবো না! ”
জারা ইশানকে খুটা দিয়ে বলে —“ গান গাইতে পারলি তারপর তো গাইবে ”
সুরভী ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলে— “ নাও এবার এদের দুজনের ঝগড়া দেখতে দেখতে আমাদের দিন
শেষ । ”
সবাই আবার হেসে ওঠে। ইশান তখন বলে —“ এই এটা তে কিন্তু আমার দোষ নেই তোর বোন আমার সাথে ইচ্ছে করে ঝগড়া করে ”
এটা শুনে জারা নিজের শার্টের জাতা গোটাতে গোটাতে বলে —“ তুই কি আমাকে ঝোকরুটে বলছিস দাড়া... ”
সুরভী জারার কোমড় জরিয়ে ওকে উঠা থেকে থামিয়ে বলে —” এই থাম নাহলে এক চড় মারবো কিন্তু ”
ইশান তখন লিসির পিছনে গিয়ে বাচ্চাদের মতো লুকিয়ে বলে —“ এই দেখেছিস তোর বোন আমাকে মারতে আসছে, বড় ভাবি গো বাঁচাও ”
জারা বসে হাফ ছেড়ে বলে —“ লিসির পিছনে লুকিয়ে লাভ নেই তের যখন মারবো তাখন দেখে নিস ”
ইশান সরে এসে রিহান আর কাবিরের মাঝে বসে বলে —“ তুই যদি আমাকে মারতে আসিস তাহলে আবার লিসির পিছনে লুকাবো, আর লিসির কিছু কিরিস তোকে দেবে, কারণ লিসি এখন কিরিসের জিনিস ওর কিছু হলে... ”
রিহান আর কাবির একসাথে বলে —“ দুনিয়ায় উল্টো পাল্টা করে দেবে কিরিস ”
এই কথা শুনে কাজিনরা সবাই একসাথে বলে —“ ঠিক ঠিক ”
লিসি শুধু চুপ করে আছে আর এদের কাজে হাসছে। কাজিনরা সবাই একসাথে হাসাহাসি করছে আনন্দ করছে।
সন্ধ্যার আলোটা ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে নেমে এসেছে রায় চৌধুরী বাড়ির বিশাল আঙিনায়। চারদিক জুড়ে রঙিন ফেয়ারি লাইটের ঝলকানি—মনে হচ্ছে আকাশের তারা নেমে এসে বাড়ির প্রতিটি কোণায় আশ্রয় নিয়েছে। হালকা শীতল বাতাসে গন্ধ ছড়িয়ে আছে ফুলের—রজনীগন্ধা, গোলাপ, আর সাথে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা বিরিয়ানির মশলার মাদকতা। বিয়েবাড়ির সেই চিরচেনা উচ্ছ্বাস, কোলাহল আর হাসির রোল মিলেমিশে এক অদ্ভুত মোহময় পরিবেশ তৈরি করেছে।
বড় হলরুমটা যেন আজ গল্পের আসর। একপাশে নরম সোফায় বসে আছেন মাবেনা, সাবেনা, সুপ্রিয়া, প্রিয়া আর মির্জা বেগম। তাঁদের কথোপকথনের মাঝে মাঝেই ভেসে উঠছে হাসির ঝিলিক সুপ্রিয়া মুচকি হেসে বললেন। —“এই প্রিয়া, তোর শাড়িটার কালারটা কিন্তু একদম পারফেক্ট হয়েছে রে!”
প্রিয়া একটু লাজুক হেসে বলল,— “ তুমি পছন্দ করে দিয়েছিলে তো, না হলে আমি এসব বুঝি নাকি!”
মির্জা বেগম বললেন, — “ আজকে বড্ড খুশি লাগছে একদিকে আমার বড় দাদুভাই বিয়ে করেছে আবার ছোটার বিয়ে, তারপর আবার আমার মেয়ে ছেলেরা সবকয়টা একসাথে আছে শুধু কাবেনা নেই, আচ্ছা ও একা সব পেরে উঠবে তো ! ”
সাবেনা তার মাকে শান্তনা দিয়ে বলে —“ মা চিন্তা করো না আমি আসার আসে ওর কাছ থেকে শুনে তারপর এই বাড়িতে এসেছে, নাহলে আমি ওখানে চলে যেতাম ”
মাবেনা —” হুম মা আর ইয়াবি তো আছে ওখানে তারপর ও জা ভাসুরা সবাই আছে, ওর বললো সবটা ওরা গুছিয়ে নেবে আমরা ভাইয়া বাড়ি যায়, ”
সুপ্রিয়া একটু হেসে বলে —“ আমার বড় ছেলেটা যদিনা থাকতো তাহলে আমাদের এইসব আয়োজন করতে দেখতে কত হিমসিম খেতাম ”
সুপ্রিয়ার কথায় সবাই একসাথে হালকা ভরসার হাসি দেয়। অন্যদিকে, আরেক কোণে সাবেনা আর মাবেনার স্বামীরা, সঙ্গে আনোয়ার আর আনারুল গম্ভীর অথচ আরামদায়ক ভঙ্গিতে গল্পে মগ্ন আনোয়ার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন— “বিয়ের দায়িত্ব তো কম না, ভাই…”
আনারুল হালকা হেসে উত্তর দিলেন— “দায়িত্ব যতই থাক, আনন্দটা কিন্তু এখানেই!”
এদিকে হলরুমের মাঝামাঝি জায়গাটা জমে উঠেছে কাজিনদের আড্ডায়। সুরভী, জারা, নুসরাত, হিয়া, আরোবি, লিসি, ইশান, কাবির, রিহান—সবাই গোল হয়ে বসে আছে, যেন ছোটখাটো এক দুনিয়া।
হঠাৎ সুরভী মুখ বাঁকিয়ে বলল,— “ ইয়াবি আর লিজা না থাকলে এই ফানটাই আসলেই মিসিং লাগে!”
জারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, — “হুম… তিশার বিয়ে বলে কথা, ইয়াবি ওর বড় ভাই তাহলে ও কি করে আসবে … কিন্তু তাও না আসাটা কেমন জানি লাগে!”
রিহান মাথা নাড়িয়ে বলল — “ওরা থাকলে এখনই বাড়িটা উল্টে ফেলতাম আমার সবাই !”
লিসি হালকা হেসে চুপচাপ বসে থাকে, কিন্তু চোখের কোণে কোথাও একটা শূন্যতার ছাপ স্পষ্ট।
ঠিক সেই সময় হলরুমের বড় দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে যায়। সব আলো, সব কোলাহল যেন এক মুহূর্তে থেমে গিয়ে তাকিয়ে থাকে সেখানে কিরিস। তার পাশে মার্ক ও আছে, মার্ক কোনো কথা না বলে কিরিস ভিতরে আসতেই চলে যায়। কালো শার্টের বোতাম দুটো খোলা, হাতার কফ ভাঁজ করা, মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট—কিন্তু সেই ক্লান্তির মাঝেও তার ব্যক্তিত্ব যেন আরো তীক্ষ্ণ, আরো ভয়ংকর আকর্ষণীয়। এক হাতে কিছু ফাইল, অন্য হাতে ফোন—চোখে সেই চিরচেনা গভীরতা, যার ভেতর লুকিয়ে আছে অসংখ্য চাপ বাড়ির দায়িত্ব, অফিসের চাপ, নিজস্ব গোপন জগতের ভার…
সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে সিঁড়ির পাশে দাঁড়ায়।
সুপ্রিয়া উদ্বিগ্ন গলায় বললেন — “কিরিস, বাবা… দিনটা কেমন গেল?”
কিরিস এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে আবার খুলে, ঠোঁটের কোণে ক্লান্ত হাসি টেনে বলল, — “সব ঠিক আছে, মা… তুমি চিন্তা করো না। আমাকে একটু উপরে যেতে দাও… রেস্ট নিতে হবে।”
সাবেনা ওর দিকে তাকিয়ে বলে —“ হুম যা ফ্রেশ হয়ে এসে তারপর কথা বলিস ”
কিরিস —“ ঠিক আছে ফুফু, আমি উপরে গেলাম ”
তার গলায় ক্লান্তির ভার এতটাই স্পষ্ট, কেউ আর কিছু বলতে পারে না। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়… ধীরে, ভারী পায়ে।
লিসি নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে তার পেছনে… চোখে অদ্ভুত এক টান। হঠাৎ সুপ্রিয়া লিসিকে হালকা করে ইশারা করে।
— “শোন… কিরিসের জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে উপরে দিয়ে আসো… লিসি ।”
লিসি চুপচাপ উঠে রান্নাঘরের দিকে যেতে থাকে। তখন
ইশান ভুরু নাচিয়ে মুচকি হেসে বলে, — “ওহহো… কফি নাকি, না অন্য কিছু?”
কাবির সাথে সাথে বলে ওঠে — “এইটা কফি না, ‘স্পেশাল কেয়ার’!”
নুসরাত হেসে ফেলে — “লিসি, আমরা কি বুঝি না নাকি?”
লিসি একটু লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, — “চুপ করো তো তোমরা… আগে মনে কোনোদিন আমি কফি বানিয়ে নিয়ে যায় নি ”
সবাই হালকা হাসিতে মেতে ওঠে। কিন্তু সেই হাসির মাঝেই এক কাপ গরম কফি বানিয়ে নিয়ে হাতে নিয়ে লিসি নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। তার পায়ের নূপুরের ক্ষীণ শব্দটুকু যেন সন্ধ্যার নরম সুরের সাথে মিশে যায়।
ধীরে ধীরে… সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠে যায় সে—
কাউকে আর কিছু না বলেই।পেছনে রয়ে যায় আলো, হাসি আর কোলাহল… আর সামনে অপেক্ষা করছে এক অন্যরকম নীরবতা।
ঘরের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে ভেতরে ঢোকে লিসি।
ঘরটা নিঃশব্দ—কেবলমাত্র বাথরুম থেকে ভেসে আসছে পানির মৃদু শব্দ। কিরিস গোসল করতে গেছে। বিশাল ঘরটা যেন তার উপস্থিতি ছাড়া একটু শূন্য লাগছে।
বিছানার উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কয়েকটা ফাইল—কাগজগুলো এলোমেলো হয়ে পড়েছে, যেন দিনের ক্লান্তি আর তাড়াহুড়োর ছাপ ওগুলোর মাঝেই আটকে আছে।
লিসি নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে কফির কাপটা বেডসাইড টেবিলের উপর আলতো করে রেখে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে বসে পড়ে বিছানার ধারে…
এক এক করে ফাইলগুলো তুলে নেয়, যত্ন করে গুছিয়ে একপাশে রেখে দেয়—যেন অগোছালো কোনো জীবনের ছোট্ট অংশটাকে সে নিজ হাতে শৃঙ্খলায় ফেরাচ্ছে।
এরপর এক মুহূর্ত থেমে থেকে উঠে দাঁড়ায়।
ড্রেসিংরুমের দিকে পা বাড়ায়। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসে কিরিসের জন্য একটা পরিপাটি পোশাক হাতে নিয়ে—একদম ক্যাজুয়াল একটা নরম কাপড়ের টিশার্ট আর টাওজার … নিখুঁতভাবে বেছে নেয়া। বিছানার উপর সুন্দর করে সাজিয়ে রেখে দেয়। সবকিছু শেষ করে একবার চারপাশে তাকায় লিসি। ঘরটা এখন শান্ত, পরিপাটি… ঠিক যেমনটা হওয়া উচিত।
হঠাৎ যেন কি মনে করে সে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়ায় সেই বিশাল বেলকনির সামনে।
কিরিসের ঘরের বেলকনি—এই বাড়ির সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। দরজাটা ঠেলে বাইরে পা রাখতেই মৃদু সন্ধ্যার বাতাস এসে ছুঁয়ে যায় তার মুখ, তার চুল, তার সত্তা। চারপাশ যেন এক টুকরো স্বর্গ।
বেলকনির চারদিকে সারি সারি টব— রজনীগন্ধা, জুঁই, বেলী, গোলাপ, টগর, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা… ফুলগুলো নরম আলোয় আরও মোহনীয় হয়ে ফুটে আছে।
একপাশে লতিয়ে ওঠা বাগানবিলাস (বোগেনভেলিয়া)—গাঢ় গোলাপি আর সাদা মিশে তৈরি করেছে রঙের এক অপূর্ব খেলা।
আর ঠিক বেলকনির এক কোণে সবচেয়ে যত্নে, সবচেয়ে নিখুঁতভাবে সাজানো " অলকানন্দা " ফুলের গাছ।
নরম হলুদ আর কমলা আভায় ভরা সেই ফুলগুলো যেন সন্ধ্যার আলোকে নিজের করে নিয়েছে। কিছু ছোট বসার জায়গা—কাঠের চেয়ার, পাশে ছোট টেবিল…
আর এক কোণে একটা দোলনা—নরম কুশনে ঢাকা, হালকা বাতাসে একটু একটু দুলছে। লিসি ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়ায় রেলিংয়ের কাছে। তার গায়ে থাকা থ্রি-পিসের ওড়নাটা বাতাসে হালকা করে উড়ে উঠছে… সাথে তার কোমর ছুঁয়ে থাকা লম্বা, ঘন, কালো চুলগুলোও দুলছে মৃদু ছন্দে। সে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য— সন্ধ্যার মিষ্টি বাতাসটাকে অনুভব করে। লিসি এর আগেও কিরিসের ঘরে আসলে এটা শুধু বেডের চারপাশের দৃশ্যটাই দেখতো, আশপাশ ঘুরে দেখা হয়নি কিন্তু এখন এটা লিসিও ঘর তাই বিকেলের দিকে লিসি ঘরের প্রতিটা দিক ঘুরে দেখেছে।
ঠিক তখনই— বাথরুমের দরজা খুলে যায়।
কিরিস বেরিয়ে আসে। চুল ভেজা… মুখে সেই চিরচেনা কঠিন ভাব, কিন্তু চোখে ক্লান্তির ছাপ এখনো স্পষ্ট।
ঘরের ভেতর ঢুকেই তার চোখ থেমে যায়। অগোছালো কিছুই নেই। সব কিছু পরিপাটি… ফাইলগুলো সুন্দর করে গুছানো, বিছানার উপর সাজানো তার পোশাক।
এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে ঝলকে ওঠে অদ্ভুত এক অনুভূতি— কে যেন তার অগোছালো পৃথিবীটাকে ছুঁয়ে ঠিক করে দিয়ে গেছে।
তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে সরে যায় বেলকনির দিকে।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে লিসি। সন্ধ্যার আলো আর বাতাসে মিশে থাকা এক অপার্থিব দৃশ্য…
বেডের উপর থেকে জামাকাপড় গুলো নিয়ে সেগুলো পড়ে গুছিয়ে নিলো। এরপর কিরিস নিঃশব্দে এগিয়ে যায়। টেবিল থেকে কফির কাপটা তুলে নেয়।
তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বেলকনির দিকে আসে।
লিসির পেছনে এসে দাঁড়ায়। কিছু না বলে— শুধু তাকিয়ে থাকে। লিসি হালকা করে ঘুরে তাকায়। চোখে চোখ পড়ে কথা নেই, শব্দ নেই… কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই জমে ওঠে এক গভীর, অদ্ভুত, অব্যক্ত অনুভূতি। কিরিস কফির কাপটা ঠোঁটে তুলে এক চুমুক দেয়। তারপর নিচু, ভারী গলায় বলে—
“এখানে কি করছো…! ভালো লেগেছে জায়গাটা? ”
লিসি কিছু বলে না। শুধু চোখ নামিয়ে হালকা মাথা নাড়ে।
সন্ধ্যার বাতাস আরও একটু জোরে বয়ে যায় আর তাদের মাঝের দূরত্বটা যেন অদৃশ্যভাবে একটু একটু করে কমে আসে…
বেলকনির নরম আলো-ছায়ার মাঝে দু’জনের নীরবতা কিছুক্ষণ ঝুলে থাকে। হঠাৎ কিরিস কফির কাপটা পাশের টেবিলে নামিয়ে রাখে। তারপর একটুও শব্দ না করে—পেছন থেকে লিসির কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
লিসি হকচকিয়ে ওঠে — “এই—কি করছেন !”
কিরিস মুখটা নামিয়ে আনে তার কাঁধের কাছে… ভেজা চুলের ফোঁটা ছুঁয়ে যায় লিসির গলা।
গভীর, ক্লান্ত কিন্তু দুষ্টু গলায় বলে— “বিয়ের পরের দিন থেকেই দেখি… আমার ঘর গোছানোর দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছো?”
লিসি একটু ছটফট করে,— “ছাড়ুন… কেউ দেখে ফেলবে!”
কিরিস হালকা হেসে আরো কাছে টেনে নেয় — “এই বেলকনিতে? এটা আমার ঘর আর তুমি আমার বউ। তাই যদি কেউ দেখে ফেলেও তাতে কি আসে যায়। সবাই নিচে ব্যস্ত… আর তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?”
লিসি ঠোঁট ফুলিয়ে বলে — “আমি ভয় দেখাচ্ছি না… কিন্তু এত সহজে আমাকে পেয়ে যাবেন ভাবছেন কি করে ?”
কিরিস ভ্রু কুঁচকে, চোখ সরু করে তাকায়
— “ওহ… তাই নাকি? তাহলে একটু কঠিন করে নিতে হবে বুঝি?”
লিসি এবার তার হাতটা সরানোর চেষ্টা করে — “হ্যাঁ… এত সহজে ধরা দেচ্ছি না আমি।”
কিরিস একটুও না ছেড়ে, বরং আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফেলে। তার গলার কাছে মুখ এনে ধীরে বলে
— “ধরা না দিলে… জোর করেই নিয়ে নিতে জানি।”
লিসির বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সে একটু লজ্জা, একটু রাগ মিশিয়ে বলে— “ আপনি… ছাড়ুন বলছি!”
কিরিস এবার মুখটা তুলে তার কানের পাশে ফিসফিস করে— “আজ সারাদিনের ক্লান্তি… জানো কিভাবে দূর হয়?”
লিসি ভান করে উদাস গলায় বলে— “ আমি কি করে জানবো? আর আমার জানার দরকার নেই।”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলে— “একটা হাগ… আর একটা কিস।”
লিসি সাথে সাথে বলে ওঠে— “না! এত সহজে কিছুই পাবেন না আপনি ।”
কিন্তু কথাটা শেষ হওয়ার আগেই কিরিস তাকে ঘুরিয়ে নিজের সামনে আনে। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে তার চোখের দিকে… তারপর হঠাৎ করে বুকের সাথে চেপে ধরে। একটা গভীর, শক্ত, নির্ভরতার হাগ যেন সত্যিই দিনের সব ক্লান্তি সে এই এক আলিঙ্গনেই মুছে ফেলতে চায়। লিসির হাত ধীরে ধীরে থেমে যায়…
সে আর বাধা দেয় না। বরং অজান্তেই তার বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে ফেলে। কিরিস চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত ফিসফিস করে— “এইটাই দরকার ছিল…”
তারপর একটু দূরে সরে এসে নিচু গলায় বলে— “এখন কিসটা বাকি।”
লিসি চোখ বড় করে তাকায় — “স্বপ্ন দেখুন !”
কিরিস দুষ্টু হেসে এগিয়ে আসে— “আমি কিন্তু অপেক্ষা করতে পারি না।”
লিসি পিছিয়ে যায় এক পা — “করতেই হবে… আমি এত সহজ না।”
কিরিস আর সময় নষ্ট করে না হাত বাড়িয়ে তাকে আবার টেনে আনে নিজের কাছে। এইবার তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তার ঠোঁট ছুঁয়ে নেয় লিসির ঠোঁট। নরম… কিন্তু অধিকার ভরা এক চুম্বন। লিসি প্রথমে থমকে যায়… তারপর চোখ বন্ধ হয়ে আসে ধীরে ধীরে। মুহূর্তটা যেন সময়কে থামিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর— লিসি হঠাৎ নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। গাল লাল হয়ে গেছে, শ্বাস কেঁপে উঠছে। সে নিচের দিকে তাকিয়ে হালকা কাঁপা গলায় বলে— “হয়ে গেছে… এবার ছাড়ুন …”
কিরিস মুচকি হেসে তাকিয়ে থাকে। লিসি একবার তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ঝট করে আবার এগিয়ে এসে খুব দ্রুত একটা ছোট্ট কিস দিয়ে দেয় কিরিসের গালে।
তারপর সাথে সাথে পেছনে সরে গিয়ে বলে— “এটা… নিজের থেকে দিলাম। বেশি আশা করো না!”
কিরিস অবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে।
আর সেই সুযোগে লিসি লজ্জায় হেসে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে যায়… সোজা নিচে নামার জন্য। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে কিরিস ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এক তৃপ্ত, দখলদার হাসি… আর সন্ধ্যার বাতাসে মিশে থাকে তাদের সেই নীরব, গভীর ভালোবাসার গন্ধ।
ওইদিকে নিচে সবাই হলরুমে বসে আছে। লিসি ধীরে নিচে নামে তারপর আবার সবার সঙ্গে বসে পরে ঘরের ভিতরের কথা মনে পরতেই মুচকি হেসে উঠে সে। এই ভাবে চলছে সবকিছু কাজিনদের আড্ডাটা আরও জমে উঠেছে। সুরভী, জারা, নুসরাত, হিয়া, আরোবি, লিসি, ইশান, কাবির, রিহান—সবাই গোল হয়ে বসে আছে, মাঝেমধ্যে হেসে উঠছে এমনভাবে, যেন কোনো দুঃখ, কোনো চিন্তা তাদের ছুঁতেও পারে না।
কাবির হঠাৎ বলল — “দেখিস, আমার বউ কিন্তু এন্ট্রি নেবে একদম সিনেমার মতো!”
রিহান সাথে সাথে বলে উঠল — “আগে বউকে সামলাতে পারিস কিনা সেটা দেখ, তারপর এন্ট্রির কথা ভাবিস!”
সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।
কাবির ও রিহান কে দেখে বলে — “ তুই যদি তোর বউকে না সামলাতে পারিস তাঁর মানে তো এই নয় আমি ও পারবো না ”
আবার একবার হাসির রোল পরে গেলো ওদের ভিতরে।
জারা মুচকি হেসে বলে — “কাবির,তোর বউ কিন্তু তোকে একদম কন্ট্রোল করবে, আমি আগেই বলে রাখলাম!”
কাবির ভ্রু কুঁচকে নাটকীয় গলায় বলল — “আমি? কন্ট্রোল? অসম্ভব!”
ইশান পাশে বসে ঠোঁট কামড়ে হাসে — “হ্যাঁ, আমরা দেখবো…”
লিসি চুপচাপ বসে, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে নরম হাসি—কিছুক্ষণ আগের মুহূর্তটা যেন এখনো তার ভেতরে লেগে আছে।

0 Comments