পর্ব :63
কিরিস হাত বাড়িয়ে সেটা তুলে নিল। ঢাকনা খুলে খুব আস্তে ঘ্রাণ নিল। একটা নরম, মিষ্টি সুবাস… যেটা স্পষ্টই লিসির। তার চোখ ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার ভেতরের সেই কঠিন, নির্মম মানুষটা যেন নিঃশব্দে গলে গেল। তার মনের ভেতর ধীরে ধীরে একটা অনুভূতি ভেসে উঠল—
“এটাই কি তবে… সংসার?”
যে মানুষটা এতদিন শুধু ক্ষমতা, ভয় আর অন্ধকারে বেঁচে ছিল আজ সে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট, সাধারণ দৃশ্যের সামনে…
আর সেটাই তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠছে।
সে আয়নার দিকে তাকাল আবার।কিন্তু এবার নিজের শরীর না নিজের চোখের দিকে। সেখানে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন। কঠিনতা আছে… কিন্তু তার ভেতরে নরম কিছু মিশে গেছে। নিচু গলায় নিজের সাথেই বলল—
“আমি ভেবেছিলাম আমি শুধু দখল করতে জানি…”
একটু থামল।
আস্তে করে বডি ওয়াশটা জায়গায় রেখে দিল।
“…কিন্তু ওকে পেয়ে মনে হচ্ছে—আমি রাখতে চাই।”
তার ঠোঁটে ধীরে একটা গভীর, সংযত হাসি ফুটে উঠল।
কিছুক্ষণ পর সে শুধু একটা তোয়াল জড়িয়ে বাইরে বের হলো।তার ভেজা শরীর থেকে এখনও জল পড়ছে।
ঘরের আলোয় তার শরীরের রেখাগুলো আরও স্পষ্ট।
আর সামনে—
লিসি দাঁড়িয়ে।।চুল মুছতে মুছতে হঠাৎ থেমে গেছে।
তার চোখ কিরিসের উপর স্থির। লজ্জা… বিস্ময়… অচেনা টান—সব একসাথে। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কিরিসের দিকে, কিরিস ধীরে দাঁড়িয়ে আছে সামনে।
তার শরীর ভেজা… জলবিন্দুগুলো কাঁধ বেয়ে নেমে বুকের উপর গড়িয়ে পড়ছে। তার গঠন যেন নিখুঁতভাবে খোদাই করা— প্রশস্ত কাঁধ, শক্ত বুক, আর স্পষ্ট খোদাই করা অ্যাবস। প্রতিটা পেশী যেন আলাদা করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে— না অতিরিক্ত, না কম—একটা নিয়ন্ত্রিত, শক্তিশালী সৌন্দর্য।
তার পিঠ— পিছনে থাকা ছোট ঝুলানো আয়নার প্রতিফলনে দেখা যাচ্ছে চওড়া, দৃঢ়, আর পেশীগুলোর সূক্ষ্ম রেখা যেন ছায়া-আলোর খেলায় আরও গভীর হয়ে উঠেছে। এটা শুধু একটা শরীর না এটা ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ আর শৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি। কিরিস ধীরে তার দিকে এগোতে লাগল। তার দৃষ্টি এবার আর কঠিন না—
বরং গভীর… স্থির… অধিকারী। লিসি এইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিরিস বলে —“ কি হয়েছে মিসেস কিরিসের কি এই বডি ভালো লেগেছে? ”
লিসি কিরিসের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বাঁধা কন্ঠে বলে —” না,,মানে.. আপনি এমন ভাবে কেন! ”
কিরিস —“ তাহলে কেমন ভাবে দেখতে চাচ্ছো, তোয়ালে ছাড়া! ”
লিসি চোখ বড় করে কিরিসের দিকে তাকায়, কিন্তু কিরিস মুখে দুষ্ট হাসি নিয়ে লিসির দিকে এগোতে থাকে —“ তাহলে দেখাচ্ছে আমি তোমাকে ”
লিসি হঠাৎ চমকে উঠে পাশ কাটিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ। ঘরে আবার নীরবতা। কিরিস কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে মাথা নিচু করে হালকা হাসল। তার চোখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি।
স্বপ্ন… যা সে কখনও স্বীকারও করেনি আজ সেটা বাস্তব হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পরে সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছে লিসি।
তার চুল এখনও একটু ভেজা, শাড়িটা সুন্দর করে পরা, কিন্তু মুখে সেই লাজুক অস্বস্তি মনে হচ্ছে যেন সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে। যে বাড়িতে আগে ইচ্ছে মতো ঘুরতো সেখানে এখন সবার সামনে যেতে লজ্জা লাগছে। কিন্তু সবকিছু ভাবনা একপাশে রেখে সে নিচে নামে আর হলরুমে ঢুকতেই সবাই একসাথে তার দিকে তাকাল। এক সেকেন্ড চুপ… তারপর—
রিহান মুখ চেপে হাসতে হাসতে বলল—
“ওহহহ! আমাদের নতুন বউমা অবশেষে আগমন করলেন!”
কাবির নাটকীয়ভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বলল—
“স্বাগতম! কেমন কাটলো… মানে… ঘুম?”
লিসির গাল সঙ্গে সঙ্গে লাল হয়ে গেল। নুসরাত পাশ থেকে কনুই মেরে বলল—
“এইসব প্রশ্ন করিস না! মেয়েটা লজ্জা পাবে!”
তারপর নিজেই আবার জিজ্ঞেস করল—
“আচ্ছা সত্যি বল, ভাইয়া কি খুব বিরক্ত করছিল?”
সুরভী আর জারা তখন হাসি চাপতে পারছে না।
জারা বলল—
“আমাদের তো মনে হচ্ছে আজকে কেউ ঠিকমতো ঘুমায়নি!”
লিসি একদম অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে—
“আমি… আমি, চুপ করো দয়া করে তোমরা…”
সবাই একসাথে—
“ওহহহহ!”
কাবির হাত তুলে বলল—
“চুপ ! ঠিক আছে! আমরা কিছু বলছি না!”
রিহান নিচু গলায় বলল—
“সকালের ঘুম এত রোমান্টিক হয় নাকি?”
এদিকে বড়রাও বসে আছেন। সুপ্রিয়া হালকা হেসে বললেন—
“ঠিক আছে, তোমরা আর বিরক্ত করো না।”
মির্জা বেগম মুচকি হেসে লিসির দিকে তাকালেন—
“কেমন আছো মা?”
লিসি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল—
“ভালো… নানু তোমাকে আমি! কেন তুমি ভাইয়াকে.... ”
ঠিক তখনই—
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার শব্দ। সবাই একসাথে তাকাল।
ধীরে ধীরে নিচে নামছে কিরিস। একদম ফ্রেশ—
সাদা শার্ট, হাতার বোতাম হালকা গোটানো, চুল ঠিকঠাক সেট করা। তার সেই স্বাভাবিক, আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি—
যেন পুরো ঘরের পরিবেশই বদলে গেল। সে নিচে নেমে একবার সবার দিকে তাকাল… তারপর চোখ গিয়ে থামল লিসির উপর। এক সেকেন্ড। লিসি সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল। নুসরাত আস্তে করে রিহানের কানে বলল— “দেখেছিস? শুরু হয়ে গেছে!”
রিহান ফিসফিস করে বলল—
“এই দুজনের সামনে আমরা একদম সাইড ক্যারেক্টার।”
কাবির হেসে বলল—
“ভাইয়া একদম সিনেমার হিরো হয়ে নামছে!”
কিরিস ধীরে এসে সোফার পাশে দাঁড়াল।কিছু বলল না। কিন্তু তার দৃষ্টি এখনও লিসির উপর স্থির।লিসি সেটা টের পাচ্ছে… আর তার গাল আবার লাল হয়ে উঠছে। পুরো হলরুমে তখন একটাই অনুভূতি মজা, লজ্জা, আর নতুন একটা সম্পর্কের শুরু।
রায় চৌধুরী বাড়ির বিশাল হলরুম…
সকালের নরম আলো বড় বড় জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পুরো ঘরটাকে এক রাজকীয় আবহ দিচ্ছে। সোনালি ঝাড়বাতির আলো এখনও মৃদু জ্বলছে, যেন রাতের উৎসবের ছোঁয়া পুরোপুরি কাটেনি।
একপাশে বড়রা সুপ্রিয়া, প্রিয়া, আনোয়ার, আনারুল, মির্জা বেগম—সবাই গম্ভীর কিন্তু স্নিগ্ধ মুখে বসে আছেন।
আর অন্যপাশে…
নুসরাত, রিহান, কাবির, সুরভী, জারা, আরোবি—সবাই একসাথে গাদাগাদি করে বসে আছে, মুখ চেপে হাসি আটকাতে আটকাতে ফিসফিস করছে।
কাবির আস্তে বলে —“ আজকে কিন্তু আমাদের ভাবির ইন্টারভিউ হবে!”
সুরভী চাপা হাসি দিয়ে —“ চুপ! কিরিস ভাই শুনলে শেষ!”
লিসি লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। সবটা কেমন এলেমেলো লাগছে লিসির কাছে। লিসিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুপ্রিয়া নরম গলায় ডাকে
— “ লিসি মা, এখানে এসে বসো। ”
লিসি ধীরে ধীরে গিয়ে বসে সুপ্রিয়ার পাশে।
একটু নীরবতা…
তারপর সুপ্রিয়া ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে খুব শান্ত গলায় বলে — “ মা… সবকিছু খুব হঠাৎ হয়ে গেছে। তোর জন্য সহজ না, সেটা আমরা বুঝি। ”
প্রিয়া মাথায় হাত রেখে — “ কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, তুই এই বাড়ির বউ না… তুই এই বাড়ির মেয়ে।
ঠিক তখনই সুপ্রিয়া একটা লাল ভেলভেট বক্স খুলে—
দুটো ভারী, কারুকাজ করা সোনার বালা বের করে লিসির হাতে পরিয়ে দেয়।
—“ এটা এই বাড়ির বড় বৌমার বালা… আজ থেকে এটা তোর। দেখি হাতে পরে নে। এর আগেও তো পরেছিলি রিহানের বিয়েতে। ”
লিসি মনে পরে সে সুপ্রিয়ার হাত থেকে নিয়ে পরেছিলো কিন্তু কে যানতো সেটা একদিন তার নিজের হবে।
মির্জা বেগম এগিয়ে এসে একটা গয়নার সেট দেয়
— “ বড় বউমা বলে কথা, এটা আমার তরফ থেকে। ”
লিসি মির্জা বেগমের দিকে তাকিয়ে আছে তখন তিনি হেসে বলে —“ আরে তোর যেমন নানি হই তেমন কিরিসের দাদিও হই, তাই আমার দাদুভাই এর বউয়ের তো আমার কিছু দিতে হয় ”
আনোয়ার একটা বক্স এগিয়ে দেয়
— “ এখানে কিছু স্বর্ণের জিনিস আছে… তোর জন্য।
আনারুল হেসে —“ আর এটা আমার থেকে… (একটা স্টাইলিশ ব্রেসলেট দেয়) একটু আলাদা, তোর ওপর ভালো লাগবে। ”
প্রিয়া শাড়ির আঁচল থেকে হাত বের করে লিসির হাতে একটা ছোট বাক্স দিয়ে বলে —“ এতে একটা ডায়মন্ডের আংটি আছে, যেটা আমি কিরিসের বউকে দেবো বলে কিনেছিলাম, তাই এখন এটা তোর ”
লিসি এতো উপহার পেয়ে কি করবে বুঝতে পারছে,
সুপ্রিয়া তখন মুচকি হেসে বলে —“ আর শোন, এগুলো তো কিছুই না… আমার আলমারিতে আরো গয়না আছে। আমি আমার বড় ছেলের বৌমার জন্য বানিয়ে রেখেছিলাম… সবই তোর। আমি ওগুলো তোর রুমে পাঠিয়ে দিবো ”
হলরুমে হালকা হাসির ঢেউ ওঠে।
লিসি চুপচাপ… চোখ ভেজা, কিন্তু মুখে একটুখানি হাসি।
ঠিক তখনই—
সুপ্রিয়া একটু থেমে, ওর গালে হাত রেখে নরম গলায় বলে —“ আর একটা কথা… আমাকে “মা” বলে ডাকবি, কেমন? ”
লিসি থমকে যায়… হাত দুটো শক্ত হয়ে আসে।
প্রিয়া মৃদু হেসে — “ আর ওকে (আনোয়ারের দিকে ইশারা করে) “বাবা” বলবি। ”
পুরো হলরুম এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ।
লিসির চোখ নিচু… ঠোঁট কাঁপছে হালকা।
ধীরে ধীরে বলে— —আমি… আমি তো…
কথাটা শেষ করতে পারে না।
তার চোখে জমে ওঠা জলটা এবার গড়িয়ে পড়ে।
সুপ্রিয়া সাথে সাথে ওকে বুকে টেনে নেয় — “ আরে পাগলি… কাঁদছিস কেন? ”
নরম গলায় বলে— “ ঠিক আছে… যখন মন চাইবে, তখন ডাকবি। জোর নেই। ”
আনোয়ার মাথা নেড়ে শান্ত গলায় — “ হ্যাঁ মা, কোনো তাড়া নেই… যখন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবি। তোর মতো মেয়ে কিরিসের বউ হয়েছে এটা তো ওর ভাগ্য ”
প্রিয়া ওর চোখের জল মুছে দেয়।
কাজিনরাও এবার চুপ… কারো মুখে আর হাসি নেই।
এই পুরো সময়টা—
কিরিস দাঁড়িয়ে আছে… চোখ একটুও সরেনি লিসির ওপর থেকে। ওর চোখে আজ অন্যরকম কিছু…
রাগ না, কঠোরতা না বরং গভীর, অদ্ভুত এক অনুভূতি…
লিসির চোখের জল দেখেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে… সবাই একটু সরে যায়।
কিরিস লিসির সামনে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলে — “ No one will force you. ”
একটু থামে… তারপর আরও নিচু, কিন্তু দৃঢ় গলায়—
—“ Take your time. ”
লিসি ধীরে মাথা তোলে… দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে যায়।
ওই দৃষ্টিতে নিরাপত্তা, অধিকার, আর এক নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি। হলরুমে আবার হালকা প্রাণ ফিরে আসে…
কিন্তু এই মুহূর্তটা লিসির জীবনের এক নতুন সম্পর্কের দরজা খুলে দিলো। আর কিরিস… দূর থেকে নয়, আজ যেন একটু কাছ থেকেই ওকে নিজের করে রাখার প্রতিজ্ঞা করল।
লিসিকে শান্তনা দেওয়ার জন্য আরোবি ওকে সব বড়দের মাঝখান থেকে টেনে একপাশে বসে। ধীরে ধীরে গম্ভীর পরিবেশ টা আবার হাসি ঠাট্টায় ভরে যায় সবাই এবার কাবিরের বিয়ে নিয়ে কথা বলতে থাকে। কাবিরের বিয়েতে কি কি করবে, রিহানের বিয়ের মতো এই বিয়েটাও চমৎকার হবে সেটা জানা কথা। সবাই যখন গল্প করতে ব্যস্ত লিসি তখন চুপচাপ বসে, হাতের বালা নিয়ে খেলছে, চোখে হালকা লজ্জা। পাশে রাখা আছে বাকিদের দেওয়া গিফট গুলো।
ঠিক তখনই—
আরবি হঠাৎ বলে ওঠে — “ এই সব তো হলো… কিন্তু পাশেরটা? (কিরিসের দিকে তাকিয়ে) ভাইয়া তো এখনো কিছুই দিলো না! নাকি আাসর ঘরে দিয়েছে! ”
সাথে সাথে সবাই — “ হ্যাঁআআ! কিরিস ভাইয়ের গিফট কোথায়? ”
লিসি তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ে —না না… দরকার নেই…, সবাই এমনিতেই অনেক দিয়েছে আর দরকার..... ”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই—
কিরিস ঠান্ডা গলায় বলে —“ কে বলেছে, আমি কিছু দিইনি?
পুরো হলরুম চুপ।
সে ধীরে উঠে দাঁড়ায়… চোখ সরাসরি লিসির দিকে।
—“ এইদিকে আসো। ”
লিসির বুক কেঁপে ওঠে… তবুও ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ায়। সবাই নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে।
কিরিস পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট, সুন্দর বক্স বের করে। ধীরে খুলে ভেতরে একটা নেকলেস…
সিম্পল… কিন্তু এতটাই রাজকীয় যে চোখ সরানো যায় না। মাঝখানের পাথরটা এমন ঝলমল করছে, যেন নিজের আলো নিজেই ছড়াচ্ছে।
ঘরের সবাই একসাথে — “ ওহহহ… ”
কিরিস খুব স্বাভাবিক গলায় বলে— “ প্যারিসে একটা নিলাম হয়েছিল… ওখান থেকে নিয়েছি। ”
একটু থামে… লিসির দিকে তাকিয়ে নরম গলায়—
—“ শুনেছি এটা আগে এক রানীর ছিল। ”
তারপর একটুখানি ঝুঁকে, নিচু গলায়—
—“ তাই ভাবলাম… আমার রানীর গলায়ই মানাবে। ”
এই কথা শুনে পুরো হলরুম literally অবাক!
নুসরাত চোখ বড় বড় করে —“ রানীর হার! ”
রিহান ফিসফিস করে — “ কিরিস ভাই কি সিরিয়াস নাকি! ”
কাবির তো মুখ হা করে —“ এইটা কতো দামের? ”
কিরিস একদম নির্লিপ্তভাবে বলে —“ তেমন কিছুই না… প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। ”
— “ কীইইইই!!! ”
পুরো হলরুম একসাথে চিৎকার করে ওঠে!
সুপ্রিয়া পর্যন্ত অবাক হয়ে —“ কিরিস! ”
প্রিয়া মুখে হাত দেয় —“এই ছেলেটা একদম পাগল!”
আনোয়ার হালকা কাশি দিয়ে— “ তোর কাছে হয়তো কিছু না… কিন্তু আমাদের জন্য এটা অনেক কিছু! ”
আনারুল হেসে মাথা নাড়ে — “ এটা তো ইতিহাস! বউকে দেওয়ার জন্য এতো দামি জিনিস, এই না হলে রায় চৌধুরী বাড়ির বড় ছেলে, একদম খানদানি, ”
এই সবের মধ্যে লিসি পুরো অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে… কিছু বলতেই পারছে না। কিরিস তার দিকে তাকিয়ে একটু ভ্রু কুঁচকে বলে —“ এত অবাক হওয়ার কী আছে? ”
তারপর নরম গলায়—
—“ তোমার জন্যই তো এনেছি। পিছন ঘুরো। ”
লিসি ধীরে পেছন ফিরে দাঁড়ায়…
কিরিস নিজের হাতে তার চুল সরিয়ে দেয়… আঙুলের ছোঁয়ায় লিসির শরীর কেঁপে ওঠে। খুব যত্ন করে নেকলেসটা গলায় পরিয়ে দেয়।
তারপর একটু ঝুঁকে, খুব নিচু গলায়—
—“ এবার ঠিক লাগছে। আমার রানীর গলায় এমনই দামি জিনিস মানায়, ”
এরপর লিসির কানে কাছে মুখ নিয়ে আস্তে করে বলে —
“ রুমে গিয়ে ড্রেসিংরুমের ভিতরে যেও, ওখানে তোমার জন্য সব সুন্দর করে গুছানো আছে সুইটহার্ট ”
লিসির চোখ বুজে আসে এক মুহূর্তের জন্য…
ঠিক তখনই—
কাবির চেঁচিয়ে ওঠে — “ ব্রোও! আমি এটার ছবি ফোনে দেখেছি ”
সবাই আবার হেসে ফেলে।
কাবির বলে — “ দেখছিস? আমাদের কিরিস ভাই গিফট হিসেবে পুরো ১.৫ বিলিয়ন ডলারের রানীর হার নিজের রানীর গলায় পরিয়ে দিল! ”
রিহান — “ এভাবেই তো হওয়া উচিত! রাজা যেমন, রানীকে তেমন ট্রিট! ”
সবাই — “ উফফফ! ”
সুপ্রিয়া মাথা নাড়িয়ে হেসে — “ আমার ছেলেটা একদমই বদলায়নি…”
প্রিয়া মুচকি হেসে— “ না, বদলেছে… এখন আরও বেশি পাগল হয়েছে। ”
এইসব কথার মাঝে—লিসি আস্তে করে হাত দিয়ে নেকলেসটা ছোঁয়…তার চোখ ভেজা… কিন্তু ঠোঁটে একটুখানি হাসি। আর সামনে দাঁড়িয়ে কিরিস শুধু তাকিয়ে আছে… সেই একই দৃষ্টি—গভীর, অধিকারভরা, আর নিঃশব্দে ভালোবাসায় ভরা।
হলরুমের আবহ ধীরে ধীরে বদলে যায়… হাসি-ঠাট্টা একটু কমে এসে এখন একটা ব্যস্ত, আয়োজনমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একপাশে বড় সোফায় বসে আছেন আনোয়ার আর আনারুল। তাদের সামনে গিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে বসে পড়ে কিরিস—এক পা অন্য পায়ের ওপর তুলে, আঙুলে হালকা টোকা দিচ্ছে টেবিলে… চোখে সেই ক্যালকুলেটিভ, ঠান্ডা ভাব।
আনোয়ার গলা খাঁকারি দিয়ে বলে
—“ কিরিস, কাবিরের বিয়ের সব দায়িত্ব কিন্তু এবার তোর ওপর। ”
আনারুল হেসে — “ হ্যাঁ, তুই না থাকলে এই বাড়ির কোনো কাজ ঠিকমতো এগোয় না। ”
কিরিস একটুও বাড়াবাড়ি না করে মাথা নেড়ে — “ হুম। ”
তারপর একটু সামনে ঝুঁকে একদম গুছিয়ে বলতে শুরু করে
— “ আজকে শুক্রবার… সামনে মঙ্গলবার বিয়ে। গেস্ট লিস্ট আমি আগেই ফাইনাল করে ইনভাইটেশন পাঠিয়ে দিয়েছি। ”
আনোয়ার অবাক হয়ে — “ এত তাড়াতাড়ি? ”
কিরিস শান্ত গলায় — “ দেরি করলে কন্ট্রোল থাকে না। ”
তারপর এক এক করে বলতে থাকে—
—মেহেদি নাইট রবিবার রাতে হবে। সোমবার গায়ে হলুদ… শুধু ফ্যামিলি আর ক্লোজ সার্কেল। মঙ্গলবার আকদ (নিকাহ) দুপুরে… কাজি ঠিক করা আছে, সব ডকুমেন্ট রেডি থাকবে। ”
আনারুল মাথা নাড়িয়ে —“ ভালো… খুব ভালো। ”
কিরিস আবার বলে—
—“ ক্যাটারিং বুকড। আলাদা করে কাবাব, বিরিয়ানি, রেজালা—সব আইটেম ফাইনাল। গেস্টদের থাকার জন্য গেস্ট হাউজ রেডি করা হচ্ছে।সিকিউরিটি আমি নিজের মতো করে সেট করে দিয়েছি। ”
আনোয়ার এবার সত্যি মুগ্ধ — “ তুই তো সব আগেই করে রেখেছিস! ”
কিরিস হালকা কাঁধ ঝাঁকায় — “ কাজ শেষ না করে আমি বসে থাকি না। ”
কিরিস সব কথা ঠিক করে উঠতে যাবে তখন আনারুল বলে —“ যেহেতু রবিবারে মেহেদী অনুষ্ঠান হবে তাহলে, এই শনি বার কি করবি? ”
কিরিস শান্ত ভাবে বলে —“ কি করবো, নিশ্চিত ভাবে এরা ( কাজিনদের দিকে চোখ ঘুরিয়ে) সকালে কোনাকাটা করবে আর সন্ধ্যায় একটা পার্টি রাখবে। তাই কালকে সকালেই সব ডেকোরেশনের মানুষ চলে আসবে আর সন্ধ্যার আগে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি এই কথা গুলো দাদিকে বলে দিও। ”
বলে কিরিস উঠে একপাশে একা হয়ে বসে হাতে ফোনটা নিয়ে কিছু কাজ করছে এমন সময় মার্ক আসে সবাই একবার মার্কের দিকে তাকাই। সবাই হেসে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে কারণ মার্কেও তারা ১ মাস পরে দেখছে,মার্ক কিরিসের কাছে কিছু ফাইল দিয়ে বলে —
“ বস আপনার সাইন লাগবে ”
কিরিস ফাইল গুলো নেয়, তারপর মার্ক চলে যায় কিরিস বসে বসে ফসইলগুলো দেখছে।
ওপাশে বসে থাকা কাজিনরা কান খাড়া করে সব শুনেছে,আনোয়ার আর কিরিসের কথা।
কাবির ফিসফিস করে — “ এইজন্যই তো আমি বিয়ে করছি… আমার কিছুই করতে হচ্ছে না! ”
রিহান চাপা হেসে — “ তুই শুধু বর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবি! ”
হঠাৎ পাশেই বসে থাকা সুরভী নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে বলে ওঠে—
— “ আরে, এই কিরিসের বিয়েটা তো হঠাৎ হয়ে গেল… আমাদের ডাকই পড়ল না! ”
জারা হেসে —“ হ্যাঁরে ভাই, এত বড় বিয়ে, আর আমরা খেতেই পারলাম না! ”
কাবির সাথে সাথে বলে — “ আপনারা শুধু খাওয়ার চিন্তা করেন নাকি? ”
আরোবি হেসে — “ বিয়ে পড়ানোও করতাম, খেতামও! ”
পুরো হলরুমে আবার হাসির রোল পড়ে। এইসবের মাঝে… একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে লিসি। চুপচাপ… কিন্তু চোখ বারবার চলে যাচ্ছে কিরিসের দিকে। কিরিস কথা বলতে বলতে হঠাৎ একবার তাকায়… দুজনের চোখ মিলতেই সে খুব সূক্ষ্মভাবে হাতের ইশারায় ডাকে।
লিসির বুক ধক করে ওঠে… সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
সবাই ব্যস্ত, কেউ তেমন খেয়াল করে না। লিসি কাছে আসতেই কিরিস একটু সরে বসে জায়গা করে দেয়।
নিচু গলায় বলে — “ এত দূরে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন?
লিসি আস্তে — “ এখানে সবাই আছে… ”
কিরিস হালকা ভ্রু তোলে — “ তাতে? ”
এক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে, খুব নিচু গলায় বলে—
—“ তোমাকে দেখতে না পেলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়।”
লিসি থমকে যায়… চোখ নিচু করে ফেলে। কিরিস টেবিলের নিচে খুব আস্তে তার হাতটা ধরে—
—“ নেকলেসটা ভারী লাগছে? ”
লিসি মাথা নাড়ে — “ না… ”
কিরিস হালকা ঝুঁকে — “ ভালো… কারণ এটা সবসময় তোমার গলাতেই দেখতে চাই। ”
লিসির গাল লাল হয়ে যায়। ঠিক তখনই—
কাবির দূর থেকে চিৎকার দেয় — “ এইইই! ওখানে কী হচ্ছে? আমরা কিন্তু সব দেখছি! ”
সবাই আবার হেসে ওঠে। লিসি তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নেয়, লজ্জায় মাথা নিচু। কিরিস একদম নির্লিপ্তভাবে সোজা হয়ে বসে — “ নিজের বিয়ের দিকে মন দে। ”
কাবির হাসতে হাসতে — “ আমার বিয়ের সব তো তুই সামলাচ্ছিস, আমি একটু রোমান্স শিখি না বড় ভাইয়ের কাছ থেকে ? ”
আনোয়ার মাথা নাড়িয়ে হেসে — “ এই বাড়িতে শান্তি বলে কিছু থাকবে না আর! ”
হাসির মধ্যে, কোলাহলের মধ্যে— কিরিস আর লিসি আবার একবার চোখাচোখি করে…এইবার কোনো কথা নেই… তবুও সবকিছু যেন বলে দেয়— এই ভিড়ের মধ্যেও,
ওরা একে অপরের জন্য আলাদা।
হলরুমে একপাশে বড়রা নিজেদের মতো গল্প করছে, আর মাঝখানে কাজিনদের আলাদা একটা “মিনি পার্টি” বসে গেছে। কাবিরকে মাঝখানে বসিয়ে সবাই ঘিরে আছে। নুসরাত হাততালি দিয়ে
— “ আজকের মেইন টপিক: “বর কাবিরের ভবিষ্যৎ জীবন!”
সুরভী নাটকীয় গলায় — “ বিয়ের পর ভাই, তোর স্বাধীনতা শেষ! ”
জারা হেসে — “ আজকে শেষ দিন, যা করার করে নে! কালকে থেকে সব শুরু ”
কাবির মুখ বাঁকিয়ে — “ তোমরা সবাই আমার বিরুদ্ধে কেন! ”
এর মধ্যে আরোবি লিসিকে খোঁচা দিয়ে — “ ভাবি, আপনি কিন্তু কিরিস ভাইকে কন্ট্রোলে রাখবেন! ”
লিসি লজ্জা পেয়ে — “ আমি? আমি কিছুই পারবো না… আর ভাবি ভাবি করছিস কেন, লিসি বলে ডাক ”
আরোবি —“ হ্যাঁ, বড় ভাবির নাম ধরে ডাকলে বড় ভাইয়া নাম ভুলিয়ে দেবে আমাদের ”
লিসি বিরক্তি নিয়ে বলে —“ বাল ভুলিয়ে দেবে, আগে যে ভাবে ডাকতে ওইভাবে ডাকবে, আমার অতো ভাবি ডাক শুনতে ইচ্ছে করছে না ”
সবাই হেসে ওঠে। তারপর সুরভী লিসিকে শান্তনা দিয়ে বলে —“ ঠিক আছে, আমরা তোকে আগের মতোই লিসি বলে ডাকবো, কিন্তু মাঝে মাঝপ কিন্তু ভাবি ডাক শুনতে হবেই ”
বলেই সবাই আবার হেসে উঠে এবং সিরভীর কথার সাথে সবাই একমত হয়। কাবির আর রিহান কিরিসের ডাকে কিরিসের ওখানে চলে গেছে, মেয়েরা বসে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে।
একটু দূরে, সোফার কোণে বসে আছে কিরিস, রিহান, কাবির। কিরিস একটু সামনে ঝুঁকে, নিচু গলায় বলে
— “ ফাইলগুলো রেডি? ”
কাবির একটু সোজা হয়ে বসে — “ হাফওয়ে হয়েছে… ”
কিরিস ঠান্ডা গলায় — “ কমপ্লিট করো। ডিলটা ক্লোজ করতে হবে বিয়ের আগেই। ”
রিহান চারপাশে তাকিয়ে আস্তে বলে
— “ লোকেশনও ফাইনাল… শুধু সিগন্যালের অপেক্ষা। ”
কাবির একটু বিরক্ত গলায় ফিসফিস করে
— “ এই সময়েও কাজ করতে হবে নাকি! ”
কিরিস একদম স্থির দৃষ্টিতে তাকায়
— “ এই সময়েই করতে হয়। ”
একটু থেমে — “ বিয়ে হয়ে গেলে সময় পাবে না। ”
কাবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে — “ জীবনে শান্তি নাই… ”
ঠিক তখনই রিহান মুচকি হেসে বলে
— “ চিন্তা করিস না… আমার বিয়ের সময় আমি কী করছিলাম মনে আছে? ”
কাবির ভ্রু কুঁচকে —“ কি? ”
রিহান গর্ব করে — “ বিয়ের আগের রাত পর্যন্ত কাজ করেছি! ”
একটু থেমে কাবিরের কাঁধে চাপড়ে — “ তোর বিয়েতেও তুই কাজ করবি… আমি ছাড় পাই নাই, তুইও পাবি না! ”
কাবির হতাশ মুখে কিরিসের দিকে তাকিয়ে বলে — “ আরে ভাই… আমি তো তোর নিজের ভাই! একটু ছাড় দে না! ”
রিহান হেসে — “ না! ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান! ”
কাবির আস্তে কিরিসের দিকে তাকিয়ে — “ ভাই… তুমি কিছু বলো… ”
কিরিস ঠান্ডা গলায় — “ ফাইলগুলো আজ রাতের মধ্যে রেডি করো। ”
কাবির মাথায় হাত দেয় — “ শেষ! আমার বিয়ে গেছে! ”
তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে বলে — “ আচ্ছা ঠিক আছে… করে দিবো ফাইলগুলো। ”
রিহান হেসে — “ এই তো আমার ভাই! ”
ওপাশে—
মেয়েদের গ্রুপে আবার নতুন আলোচনা শুরু—
সুরভী — “ কাবির ভাইকে বিয়ের পর আমরা একদম চেঞ্জ করে দিবো! ”
জারা— “ হ্যাঁ! আগে একটু ভাব নিক, পরে সব বুঝবে! ”
আরোবি লিসির কানে কানে — “ তুই দেখ, এই বাড়ির সব ছেলেই বাইরে বস, কিন্তু ঘরে… ”
লিসি হেসে ফেলে, এই পুরো কোলাহলের মাঝেও একবার দূর থেকে কিরিস তাকায়… লিসির দিকে।
লিসিও তাকায়… এক সেকেন্ডের সেই চোখাচোখি চারপাশে যতই হাসি-ঠাট্টা, প্ল্যানিং, গোপন কাজ চলুক না কেন… ওদের দুজনের মাঝে একটা আলাদা, নিঃশব্দ সংযোগ তৈরি হয়ে আছে।
হলরুমের একপাশে মেয়েদের আলাদা আড্ডা জমে উঠেছে…
লিসি, আরোবি, নুসরাত, সুরভী, জারা—সবাই মিলে গোল হয়ে বসে আছে। কথার টপিক একটাই—
লিসি আর কিরিসের হঠাৎ বিয়ে। আরোবি চোখ টিপে বলে
— “ তো ভাবি… কেমন লাগছে আমাদের কিরিস ভাইকে?”
জারা যোগ করে
—“ সোজা কথা বলবেন কিন্তু! আমরা কিন্তু সব বুঝি! ”
লিসি একটু হেসে মাথা নিচু করে “ —আমি… কিছু বলার মতো… ”
কথাটা শেষ করে না।
সুরভী হেসে — “ এই “কিছু বলার মতো না” মানেই অনেক কিছু আছে! আল্লাহ আমি প্রথম দিন যে দিন দেখেছিলাম সিঁড়ির ওখানে...... ”
কথা শেষ করার আগেই লিসি সুরভীর মুখ চেপে ধরে বলে —“ আল্লাহর দোহায়, তুমি ওই কথা বলো না ”
আরোবি লিসির দিকে তাকিয়ে নিজের গালে হাত দিয়ে বলে —“ তাহলে আমি বলবো কি...?!”
লিসি ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলে —“ ওহ্হ তোমরা চুপ করবে ”
জারা—“ ঠিক আছে আমরা আর আপনাকে জালাবো না কি বলো নুসরাত ভাবি ”
নুসরাত লিসির কাছে গিয়ে পিছন দিক থেকে ঘাড়ে হাত দিয়ে বলে —“ হ্যাঁ, আর তোরা আমার বড় জা কে বিরক্ত করা বন্ধ কর, বয়সে লিসি ছোট হলেও সম্পর্কে কিন্তু আমার বড় হয়ে গেছে ”
সবাই একসাথে হেসে ওঠে। লিসি আর কিছু বলে না কারণ এদের সঙ্গে কথায় পারা যাবে না।
কিন্তু সেই হাসির মাঝেও লিসির চোখ একবার দূরে বসে থাকা কিরিসের দিকে যায়…
তারপর আবার চোখ নামিয়ে নেয়। মনে মনে—
“আমাকে জোর করে বিয়ে করেছে… তাই না?”
তার ভেতরে কোথাও একটা জেদ, একটা আগুন জ্বলে ওঠে—
“ঠিক আছে… আমিও দেখাবো আপনাকে… এই লিসি খান কী জিনিস।...আমি যদি আপনার হারে লবণ না দেই… এমন ঝালাবো যে আপনি নিজেই বলবেন, ‘কেন বিয়ে করেছিলাম একে!’”
তার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে।
এই সময় সুপ্রিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলে — “ চলো প্রিয়া, দুপুরের রান্না দেখি। ”
প্রিয়া মাথা নাড়িয়ে— “হ্যাঁ, অনেক কাজ পড়ে আছে। ”
ওরা দুজন রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। নুসরাতও উঠে —“আমি আসছি! এই তোরা থাক আম্মু দের একটু সাহায্য করে দিয়ে আসি ”
আরোবি হঠাৎ লিসির দিকে তাকিয়ে নাটকীয় গলায় বলে —“ এই যে… এই বাড়ির বড় বউমা! ”
সবাই তাকায়।
— “ আজকে কিন্তু আপনি রান্না করে আমাদের খাওয়াবেন! নিয়ম আছে! ”
জারা হাততালি দিয়ে — “ হ্যাঁ হ্যাঁ! আজকে ভাবির হাতের রান্না! ”
সুরভী — “ দেখি তো, কিরিস ভাই কতো ভাগ্যবান! “
লিসি একটু থমকে যায়… তারপর আস্তে মাথা নাড়ে।
—ঠিক আছে… চলো, আর এমন করছো যেন আমার হাতের রান্না খাও নি! ”
আরোবি —“ আরে লিসি বোনের হাতের রান্না খেয়েছি ভাবির না ”
সবাই একসাথে হেসে রান্নাঘরের দিকে যায়।
রান্নাঘর…
বড়, পরিপাটি, একসাথে অনেকজন কাজ করার মতো জায়গা। সুপ্রিয়া নির্দেশ দিচ্ছে — “ লিসি, তুমি ভাতটা দেখে দাও। “
—“ নুসরাত, মাংসটা মেরিনেট করো। ”
— “ আরোবি, সালাদ কাটো। ”
লিসি ধীরে ধীরে কাজ শুরু করে…
প্রথমে একটু অস্বস্তি থাকলেও, ধীরে ধীরে হাত খুলে যায়। মাঝে মাঝে সবাই মজা করছে—
আরোবি — “ লিসি ভাবি, নুন বেশি দিয়স না কিন্তু! ”
লিসি মুচকি হেসে — “ দেখবি না? ”
নুসরাত — “ না না, আমরা টেস্ট করেই বুঝবো! ”
সবাই আবার হেসে ওঠে। এই হাসি-ঠাট্টার মধ্যে—
লিসি নিজেও হালকা হয়ে যায়… কিন্তু মাঝে মাঝে তার মাথায় সেই কথাটাই ঘুরছে—
“দেখাবো আপনাকে…”
এদিকে—
স্টাডি রুমে
আনোয়ার আর আনারুল চা হাতে বসে গল্প করছে।
আনোয়ার বলে — “ বাড়িটা আবার আগের মতো হয়ে উঠছে… ”

0 Comments