তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :61

আর রুমে বসে আকবর খান দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে হাসছেন।
— “হাহাহা… আমার নাতনিকে বিয়ে করা এত সহজ না রে কিরিস রায় চৌধুরী। আমার নাতনি শুধু জিয়ানের সাথে বিয়ে হবে, কোনো কিরিসের সাথে না ”
একটু পরেই জমিদার বাড়ির সামনে। এক এক করে কালো লাক্সারি গাড়ির কনভয় এসে থামলো।
গ্রামের মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছে।
এমন রাজকীয় বরযাত্রী এই এলাকায় খুব কমই দেখা যায়। সবচেয়ে সামনে থাকা কালো রোলস রয়েস ধীরে থামলো। সবাই নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে।
গাড়ির দরজা খুললো। ধীরে ধীরে নিচে নামলো
কিরিস রায় চৌধুরী। সাদা স্যুট, কাঁধে ব্লেজার, চোখে সেই ঠান্ডা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তার পা মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই—
ক্লিক!
একটা ঠান্ডা ধাতব শব্দ। এক মুহূর্তে একটা বন্দুক এসে ঠেকলো কিরিসের মাথায়। চারপাশের গার্ডরা সাথে সাথে নড়েচড়ে উঠলো। কিন্তু কিরিস একদম নড়লো না।
সে শুধু ধীরে মাথা ঘুরিয়ে সামনে তাকালো। বন্দুক ধরে দাঁড়িয়ে আছেন জমিদার আকবর খান। কিরিসের ঠোঁটে হালকা মুচকি হাসি ফুটে উঠলো।
একদম শান্ত গলায় বললো—
— “কি ব্যাপার আকবর খান… নিজের নাতজামাইকে গুলি করে মারতে চাচ্ছেন?”
আকবর খান চোখ ছোট করে তার দিকে তাকালেন।
কয়েক সেকেন্ড ভালো করে মুখ দেখলেন।
তারপর হঠাৎ অবাক হয়ে উঠলেন—
— “দেখি তো… এই তো… জিয়ান!”
তার চোখে চিনে ফেলার আনন্দ।
— “জিয়ান!”
কিরিস শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আকবর খান আবার বললেন—
— “আমি তো জিয়ানকে চিনি…কিন্তু কিরিসকে তো না৷ কোথায় সেই কিরিস ওকে আমি আজকে মেরেই ফেলবো আমার লিসিকে কষ্ট দেওয়া, কোথায় সে । তোমার দাদি তো বললো… কিরিস আমার নাতনিকে বিয়ে করতে আসছে!”
কিরিস ধীরে হাত তুলে নিজের মাথা থেকে বন্দুকটা আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিল। তারপর একদম স্থির চোখে তাকিয়ে বললো—
— “আমিই কিরিস। আমি জিয়ান।”
একটু থেমে ঠান্ডা গলায় বললো—
— “আমি জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরী।”
তার চোখ সরাসরি আকবর খানের চোখে।
— “বুঝতে পেরেছেন… আকবর খান?”
এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর আকবর খান হঠাৎ হেসে উঠলেন।
— “হাহাহা!”
বন্দুকটা নিচে নামিয়ে দিলেন। তারপর এগিয়ে এসে কিরিসকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
— “এই তো আমার নাতজামাই! আমি তো সবসময় তোকে-ই চেয়েছি!”
তিনি হাসতে হাসতে বললেন—
— “আজ তো জমিদার বাড়ির মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল।”
চারপাশে থাকা সবাই হালকা হাসতে শুরু করলো।
পরিবেশটা হালকা হয়ে গেল।
কিন্তু ঠিক তখনই আকবর খানের মুখ হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি গলা পরিষ্কার করে বললেন—
— “আসলে… একটা ছোট্ট কান্ড হয়ে গেছে।”
কিরিস ভ্রু তুললো।
— “কী কান্ড?”
আকবর খান একটু অস্বস্তি নিয়ে বললেন—
— “লিসি… পালিয়ে গেছে, আমি তো জানতাম না তুমিই জিয়ান, তাই ওকে পালাতে বলেছি ।”
চারপাশে হালকা ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। কিন্তু কিরিস একদম চুপ। তার মুখে কোনো রাগ নেই। কোনো অবাক ভাবও নেই। শুধু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি।
যেন সে আগেই জানতো। তার চোখ দূরের অন্ধকারের দিকে গেল।মনে মনে বললো—
“তুমি পালাবে… আমি খুঁজে নেবো।”
কারণ সে খুব ভালো করেই জানে লিসির মাথায় এখন কি চলছে। আর খেলা এখনই শুরু হলো। জমিদার বাড়িতে তখন হালকা অস্থিরতা। সবাই বুঝে গেছে—
লিসি পালিয়েছে। কিন্তু কিরিস? সে একদম শান্ত দাঁড়িয়ে আছে। তারপর হঠাৎ ঠান্ডা গলায় বললো—
— “পুরো এলাকা ঘিরে ফেলো।”
মার্ক সাথে সাথে ফোন বের করলো।
— “Yes, boss.”
কিরিস আবার বললো—
— “কোন রাস্তা দিয়ে বের হয়েছে খুঁজে বের করো।”
তার চোখে তখন অদ্ভুত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
— “ও বেশি দূরে যেতে পারবে না। আর গেলোও খুজে বের করো, ”
তারপর আকবারের দিজে তাকিয়ে বললেন —” চিন্তা করো না দাদাশ্বশুর তোমার নাতকি আমি বিয়ে করে সোজা বাড়ি নিয়ে যাবো, এখানে আর আসবো না তাই পরের বার দেখা হচ্ছে, আমি লিসিকে নিয়ে পরের বার আসবো, ভালো থাকেন সবাই ”
একদম শান্ত ভাবে কথা গুলো বললো কিরিস, চারপাশের মানুষ অবাক বউ পালিয়ে গেছে তারপরও এতো শান্ত সে, এমন ভাবে যাচ্ছে যেন বিয়ে হয়ে গেছে বউ নিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে—
লিসি সত্যিই অনেকটা দূরে চলে এসেছে। বউ সাজে, সাদা লেহেঙ্গা পরে দৌড়ে দৌড়ে একটা লোকাল বাসে উঠে পড়েছিল। বাস তাকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নামিয়ে দিয়েছে। টাকা না থাকায় হাতে থাকা একটা চুরি কনটাক্টের হাতে ধরিয়ে দিয়ে লিসি দৌড় দেছে, বারবার তাকে পিছন থেকে ডাকার পরেও সে থামিনি। এখন সে একা হাঁটছে। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ। সাদা বিয়ের পোশাকে একটা মেয়েকে একা হাঁটতে দেখলে যে কারো চোখে পড়বে। লিসি একটু নার্ভাস হয়ে চারপাশে তাকালো।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা ছেলের গলা শোনা গেল।
— “এই শুনছেন…”
লিসি থেমে গেল।
একটা ছেলে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
তার চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি। লিসির বুক ধকধক করতে লাগলো। সে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ছেলেটাও পিছু নিতে লাগলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে
আরও দুইজন ছেলে রাস্তার পাশে থেকে বের হয়ে এলো।
তারা ধীরে ধীরে লিসিকে ঘিরে ধরলো।
একজন মুচকি হেসে বললো—
— “বউ সাজে একা কোথায় যাচ্ছেন?”
লিসি ভয় পেয়ে গেল। সে পিছিয়ে যেতে লাগলো।
— “রাস্তা ছাড়ুন…”
একজন একটু এগিয়ে এসে বলে —“ বউ সেজে একা বেড়ানো ভালো না, বলো যদি আমি বর হতে পারি ”
লিসি —“ সরুন বলছি, ভালো হবে না কিন্তু ”
কিন্তু তারা আরও কাছে এগিয়ে এলো। ঠিক তখনই—
ধাম!
হঠাৎ একটা বন্দুকের শব্দ। পুরো রাস্তা কেঁপে উঠলো। ছেলেগুলো ভয় পেয়ে চারদিকে তাকালো।
আরেকটা গুলির শব্দ—
ধাম!
কাছের গাছের ডালে গুলি লাগলো। ছেলেগুলো আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না।
— “চল পালা!”
বলতে বলতেই দৌড়ে পালিয়ে গেল। লিসি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে।
ঠিক তখনই— দূর থেকে গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠলো।
একটা না…
দুইটা না…
একটার পর একটা কালো গাড়ি।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গাড়িগুলো এসে রাস্তার মাঝখানে থামলো। চারদিক থেকে লিসিকে ঘিরে ফেললো। গাড়ির দরজা খুলতে লাগলো। গার্ডরা নেমে দাঁড়ালো। লিসির বুক আবার ধক করে উঠলো।
সবশেষে মাঝখানের গাড়ির দরজা ধীরে খুললো।
ভেতর থেকে নামলো কিরিস রায় চৌধুরী।সাদা স্যুটে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার চোখ সোজা লিসির দিকে।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বললো না। হালকা বাতাসে লিসির সাদা ওড়না উড়ছে। কিরিস ধীরে ধীরে তার দিকে হাঁটতে লাগলো। তার ঠোঁটে সেই রহস্যময় মুচকি হাসি।
তারপর একদম শান্ত গলায় বললো—
— “পালিয়ে কোথায় যাচ্ছিলে… লিসি শার্মা ?”
লিসি চুপ। কিরিস আরও এক কদম এগিয়ে এলো।
তার চোখে তীব্র দৃষ্টি।
— “আমি বলেছিলাম না…তুমি পালাতে পারো…
কিন্তু আমি খুঁজে পারি।”
চারপাশের অন্ধকার রাস্তার মাঝে দুজন একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে। আর তাদের মাঝখানে শুরু হতে যাচ্ছে আসল খেলা।ফাঁকা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে
লিসি। সাদা বিয়ের লেহেঙ্গা বাতাসে দুলছে।
চারপাশে কালো গাড়ি তাকে ঘিরে রেখেছে।
গার্ডরা দূরে দাঁড়িয়ে। আর সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে কিরিস রায় চৌধুরী। তার চোখ একদম স্থির।
লিসি ঠোঁট ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিরিস সামনে এসে থামলো। একটু ঝুঁকে শান্ত গলায় বললো—
— “পালিয়ে কোথায় যাচ্ছিলে?”
লিসি সাথে সাথে বললো—
— “আপনার কাছ থেকে দূরে।”
কিরিসের ঠোঁটে হালকা হাসি।
— “কেন?”
লিসি রেগে বললো—
— “কারণ আমি এই বিয়ে করবো না!”
কিরিস ভ্রু তুললো।
— “করবে না?”
লিসি — “না!”
লিসি জোরে বললো—
— “এত সহজে আপনাকে বিয়ে করবো না!”
কিরিস এক কদম এগিয়ে এলো।
— “লিসি… আজকে বিয়ে হবে। আর সেটা আমার সাথেই হবে।”
লিসি চোখ বড় বড় করে বললো—
— “আমি বলেছি না করবো না!”
ঠিক তখন দূরে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল।
পুলিশের গাড়ি। একটার পর একটা এসে রাস্তার পাশে থামলো। কয়েকজন পুলিশ অফিসার দৌড়ে এসে বললো—
— “Sir!”
— “We heard gunshots!”
তারপর চারপাশ দেখে একটু কনফিউজ হয়ে গেল।
একজন বলেই ফেললো—
— “Sir… আপনি তো বলেছিলেন এমার্জেন্সি মিশন!”
— “এটা কি ইমার্জেন্সি মিশন… নাকি রোমান্টিক মিশন?”
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের কেউ কেউ হাসি চেপে রাখছে।
কিরিস চোখ সরু করে বললো—
— “My life’s first wife is trying to run away.”
— “That is the emergency.”
পুলিশ অফিসাররা একে অন্যের দিকে তাকালো।
তারপর একজন হেসে বললো—
— “Oh… understood sir.”
— “Carry on.”
তারা একটু দূরে সরে দাঁড়ালো। লিসি লজ্জা আর রাগে লাল।
— “আপনি পুরো পুলিশ ডেকে এনেছেন?!”
কিরিস শান্ত গলায় বললো—
— “তুমি পালাচ্ছিলে। আমি খুঁজতে এসেছি।”
লিসি হাত গুটিয়ে বললো—
— “আমি তবুও বিয়ে করবো না।”
কিরিস কাছে এসে নিচু গলায় বললো—
— “তুমি বউ সাজে পালিয়ে বেড়াচ্ছো…আর ভাবছো আমি তোমাকে ছেড়ে দেব?”
লিসি চোখ পাকালো।
— “হ্যাঁ!”
কিরিস মুচকি হাসলো। তারপর ধীরে লিসির ওড়নার এক কোণা ধরে বললো—
— “লিসি…আজ তুমি পালাতে পারবে না।”
লিসি জেদি গলায় বললো—
— “দেখে নিন!”
কিরিস তার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো—
— “আজকে বিয়ে হবেই।”
লিসির বুক ধক করে উঠলো। চারপাশে অন্ধকার রাস্তা…
পুলিশ… গাড়ি.. আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিরিস আর লিসির রোমান্টিক যুদ্ধ।
লিসি চারপাশ দিকে তাকালো একটা চাপা ভাব বোঝা যাচ্ছে, পুলিশ, গার্ড সবকিছু আর তারপর এই ভয়ংকর মানুষ কিরিস, যে একাই যথেষ্ট যেকোনো পরিবেশে চাপ সৃষ্টি করার জন্য, এবার লিসি একটা শ্বাস নেয়। লিসি ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে।
— “আমি বলেছি আমি বিয়ে করবো না!”
কিরিস একদম শান্তভাবে এগিয়ে আসছে।
— “আজকে বিয়ে হবেই।”
লিসি আবার পিছালো। কিন্তু হঠাৎ—
তার লেহেঙ্গার লম্বা পাতা পায়ের সাথে জড়িয়ে গেল।
— “আহ!”
সে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে লাগলো। কিন্তু ঠিক তখনই—
কিরিস ঝট করে তাকে ধরে ফেললো। তার হাত গিয়ে পড়লো লিসির মাথার নিচে যাতে রাস্তার সাথে মাথা না লাগে। দুজনেই ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তার পাশে মাটিতে পড়ে গেল। লিসি নিচে…আর তার উপর ঝুঁকে আছে
কিরিস। দুজনের মুখ একদম কাছে। লিসির নিঃশ্বাস দ্রুত। কিরিস নিচু গলায় বললো—
— “এতোদূর পালিয়ে শান্তি হয়নি, নাকি আরো পালাবে ?”
লিসি চোখ পাকালো।
— “হুম পালাবো, আর আপনি আমাকে জোর করে বিয়ে করতে পারবেন না !”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হাসি টানলো।
— “বিয়ে তো তোমাকে করতেই হবে,যেটা তোমার ইচ্ছে হোক বা অইচ্ছা ।”
লিসি জেদি গলায় বললো—
— “করবো না! আমি এই বিয়ে করবো না!”
লিসি চারপাশে দিকে তাকালে এবার সোজা পুলিশ দের দিকে তাকিয়ে বললো —“ আপনি সরুন, আমাকে ছেড়ে দিন না হলে কিন্তু আমি এই পুলিশের কাছে আপনার নামে কেস করে দেবো ”
লিসির কথায় মার্ক হেসে ফেলবো, সঙ্গে সব গার্ড এমনকি পুলিশরাও হাসছে, কিরিস লিসির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে —” আমার নামে কেস করবে ”
লিসি জেদি গলায় —“ হ্যাঁ, এই পুলিশ মশাই কেস লিখুন এনার নামে, নারী নির্যাতনের, ওনি আমাকে জোর করে বিয়ে করছেন, ”
পুলিশদের মধ্যে উঁচু পদের পুলিশ টা বলে উঠে —“ দুঃখিত ম্যাডাম আমার ওনার নামে কেস নেই না, আর আমরা তো সব দেখছি, আপনি বিয়ে করে নেন সমস্যা নেই ”
নাও লিসি আর কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না এখানে সবাই কিরিসের লোক শুধু সে বিরোধী পক্ষ, লিসির কি করবে বুঝতে পারছে না,
ঠিক তখনই—
পেছন থেকে হইচই শোনা গেল। দুইজন বডিগার্ড একজন কাজিকে কাঁধে করে নিয়ে এসে নামিয়ে দিল
একদম তাদের পাশে। কাজি হাঁপাচ্ছে।
— “আরে বাবা! এইভাবে কাঁধে করে নিয়ে আসার কি দরকার ছিল?!”
চারপাশে পুলিশ, গার্ড, গাড়ি।
আর মাঝখানে— মাটিতে পড়ে আছে বর আর কনে।
কাজি মাথা চুলকে বললো—
— “এই অবস্থাতেই নাকি বিয়ে পড়াতে হবে?”
কিরিস ঠান্ডা গলায় বললো—
— “বিয়ে পড়ান।”
কাজি গলা খাঁকারি দিল।
— “আচ্ছা…কিন্তু এখানে তো মনে হচ্ছে না ”
কিরিস তীক্ষ্ণ চোখে কাজির দিকে তাকায় —“ আপনাকে বিয়ে পড়াতে বলছি বিয়ে পড়ান, বেশি কথা বলবে ফল ভালো হবে না ”
কাজি শুঁকনো একটা ঢোক গেলে বুঝতে পারে কিরিস মানুষ টা সুবিধার না, যা বলছে তাই করা ভালো
তারপর নিয়মমতো বলতে শুরু করলো।
— “জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরী… আপনি কি লিসি শর্মাকে বিয়ে করতে রাজি?”
কিরিস এক সেকেন্ডও দেরি না করে বললো—
— “কবুল।”
কিরিস তিনবারই দ্রুত কবুল বলে দেয়। কাজি এবার লিসির দিকে তাকালো।
— “লিসি শর্মা… আপনি কি—”
লিসি সাথে সাথে বললো—
— “না!”
চারপাশে সবাই একটু থমকে গেল। কাজি ভুরু কুঁচকে বললো—
— “বউমা… এত লোক দাঁড়িয়ে আছে…না বললে কিন্তু আমারই সমস্যা হবে!”
লিসি জেদ ধরে বললো—
— “আমি করবো না বিয়ে!”
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে কোমর থেকে রিভলভারটা বের করলো।
সোজা তুলে ধরলো লিসির মাথার দিকে। চারপাশে সবাই চুপ। লিসির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ভয় পেয়েছে… কিন্তু সেটা দেখাতে চাইছে না। কিরিস একদম ঠান্ডা গলায় বললো—
— “আমি এক থেকে তিন পর্যন্ত গুনবো।”
তার চোখ ভয়ংকর স্থির।
— “যদি কবুল না বলো…তাহলে তুমি হবে আমার হয়ে সাজা শেষ বউ।”
চারপাশে বাতাস ভারী হয়ে গেল। কিরিস আবার বললো
—“ বিয়ে করলে আমাকে করবে…না হলে কাউকে না। এখানেই মরবে তুমি। বুঝতে পেরেছো?”
লিসি জেদি চোখে তাকিয়ে রইলো। তার বুক কাঁপছে…
কিন্তু ঠোঁট শক্ত।
— “আমি করবো না বিয়ে।”
কিরিস বাঁকা হাসি দিল। তারপর গুনতে শুরু করলো —
— “এক…”
লিসির বুক ধড়ফড় করছে।
— “দুই…”
সবাই নিঃশ্বাস আটকে আছে।
কিরিস বললো—
— “তিন—”
ঠিক তখনই—
ধাম!
হঠাৎ গুলির শব্দ। লিসি ভয় পেয়ে চমকে উঠলো।
— “ আহহহহহ.......কবুল! কবুল! কবুল!”
সে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললো। চারপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর কিরিস ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো। দেখলো পেছনে দাঁড়িয়ে মার্ক বন্দুক হাতে।
মার্ক একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো—
— “Sorry boss… Timing একটু এগিয়ে গেছে।”
কিরিস মুচকি হাসলো। তারপর নিচে তাকালো। লিসি তখনও তার শার্ট শক্ত করে ধরে আছে। কিরিস ফিসফিস করে বললো—
— “দেখলে? শেষে তো কবুল বলতেই হলো।”
লিসি বুঝতে পেরে রাগে চোখ বড় করলো।
— “আপনি আমাকে ভয় দেখালেন!”
কিরিস শান্ত গলায় বললো—
— “না…”
তার ঠোঁটে ধীরে হাসি ফুটলো।
— “আমি তোমাকে বিয়ে করলাম।”
আর রাস্তার মাঝখানে শুয়ে শুয়েই জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরী আর লিসি শার্মার বিয়ে হয়ে গেল।
লিসি এখনও রাগে চোখ চকচক করছে। কিরিস ধীরে মুখ ঘুরিয়ে বললো—
— “চলো, শেষপর্যন্ত আজকে পালানো হলো না।”
কাজি এবার বিয়ের কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলে —“ এবার সাইন করলে হয়ে যাবে ”
কিরিস লিসির দিকে তাকায় সে ভালো করে বুঝতে পেরেছে সাইন এখন আর হবে। তাই কিরিস মার্কের দিকে হাত বাড়ায় —“ ছুরি দাও মার্ক লিসি মনে হয় না সাইন করবে তাই হাত কেটে রক্ত দিয়ে সাইন করতে হবে। ”
লিসি চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে —“ পাগল নাকি, আপনি আমার হাত কাটবেন, আমি সাইন করছি, একদম হাত কাটবেন না ”
লিসি ভালো করে যানে যদি সে এবার জেদ করে তাহলে তার সুন্দর হাতের আঙুলের বলি হয়ে যাবে তাই ভালোই ভালোই সাইন করা ভালো। কিরিস উঠে বসলো লিসিও উঠে বসলো দুজনে সাইন করলো, তারপর বিয়ে দোয়া পড়ানো হলো মোনাজাত ধরা হলো, পুলিশ থেকে গার্ড এবং মার্কসহ সবাই দোয়া পরলো লিসিও আর উপায় পেলো না,সব শেষ আলহামদুলিল্লাহ বলে বিয়ে শেষ করলো।
কিরিস এবার উঠে দাঁড়ালো লিসির উপর থেকে, হাত বাড়িয়ে লিসিকে টেনে তুললো, লিসি উঠে নিজের লেহেঙ্গা টা ঠিক করে নেয়, মাথার ওড়না টা টেনে কিরিসের দিকে তাকায় কিছু বলতে যাবে.....
হঠাৎ কিরিস ঝট করে লিসিকে কাঁধে তুলে ধীরে গাড়ির দিকে এগোলো। লিসি অবাক, চোখ বড় বড়।
— “আপনি… আমাকে কাঁধে তুলে…?”
কিরিস মুচকি হাসলো।
— “হ্যাঁ, আর এখন আর কোথাও পালাবি না।”
গাড়িতে উঠে কিরিস লিসিকে বসালো। তারপর ধীরে মুখ, হাত, পা সব ধরে বেঁধে দিল যাতে পালানো সম্ভব না হয়।
লিসি হালকা চিৎকার দিল—
— “আপনি কি করছেন!”
কিরিস কোলে ধরে বললো—
— “এবার থেকে তুমি আমার কাছে থাকছো। বুঝেছো?”
লিসি বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে বললো—
— “আমি থাকবো না! আমাকে ছেড়ে দিন। ”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হাসি টানলো।
— “না বলার অবকাশ নেই। আজ থেকে তুমি আমার। আর পালানো যাবে না।”
কিরিস এবার লিসির মুখে যত্নের সঙ্গে টেপ লাগিয়ে দিলো লিসি শুধু তাকিয়ে আছে, তার হাত পা সব কিরিস বেঁধে ফেলে অল্প সময়ের মধ্যে। বডিগার্ডরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ ও তারা শুধু তাকিয়ে আছে। কিরিস চোখ বুলিয়ে বললো—
— “পুলিশদেরও দেখছো… কি অবস্থা! কখনো জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়িনি। আমার লাইফের প্রথম বউ পালানোর চেষ্টা করলো… ফানি না?”
লিসি চোখ পাকালো, আর বিরক্তি আর একটু লজ্জার মধ্যে। একদিকে কাজি আর পুলিশের অফিসাররা দাঁড়িয়ে হেসে ফেললো।
— “বাবা! এটা জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর বিয়ে পড়ানো।”
কিরিস গাড়ির হ্যান্ডেল ধরে বললো—
— “ঠিক আছে… রওনা দেওয়ার সময়।”
গাড়ি ধীরে ধীরে রাস্তা ধরে চলে গেল। ঢাকার দিকে। লিসি এখনও কোলে বসে চুপচাপ। কিরিস মাঝে মাঝে তার দিকে তাকিয়ে বললো—
— “আজ থেকে তুমি আর পালাবে না।”
লিসি গম্ভীর চোখে তার দিকে তাকাল। মনে মনে বললো
— “আমি জেদ ধরে রেখেছি, কিন্তু… হায়…”
কিরিস আবার ধীরে মুচকি হাসলো। তার উপর আবার কিরিস লিসিকে নিজের কোলে বসিয়ে রেখেছে। গাড়ি চলে যাচ্ছে। রাস্তা ফাঁকা, চারপাশে হালকা বাতাস। শহরের দিকে, রায় চৌধুরীর অভিযান চলতে থাকলো। আর লিসি কোলে বসে, রাগ আর ভয় মিশিয়ে ভাবছে—
“এই কিরিস… এতো শক্তিশালী আর দুষ্টু হতে পারে!”

রাত তখন প্রায় নামতে চলেছে।
রায় চৌধুরী বাড়ির বিশাল গেটের সামনে হঠাৎ করেই একে একে সব গাড়ি এসে দাঁড়ালো। গাড়ির হেডলাইটের আলোতে পুরো বাড়ির সামনের আঙিনা ঝলসে উঠলো।
গার্ডরা সঙ্গে সঙ্গে গেট খুলে দিল। গাড়ির দরজা খুলে ধীরে ধীরে নামলো কিরিস। সাদা শার্ট, হাতার বোতাম খোলা, চোখে সেই ভয়ংকর ঠান্ডা দৃষ্টি। তার মুখে আজ অদ্ভুত একটা কঠিন ভাব। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সবাই অবাক হয়ে গেল। কিরিস গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ভেতরে হাত ঢুকালো… আর তারপর— একটা মেয়েকে কাঁধে তুলে নিল। মেয়েটার হাত-পা মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা। আর সে মরিয়া হয়ে নড়াচড়া করছে।
— লিসি।
তার লম্বা চুলগুলো কিরিসের পিঠ বেয়ে নিচে নেমে এসেছে। সে কিরিসের কাঁধে উল্টো হয়ে ঝুলে আছে।
লিসি আড়মোড়া করছে ছাড়া পাওয়ার জন্য কিন্তু কিরিস একটুও পাত্তা দিল না। যেন সত্যিই কোনো ভিলেন নায়িকাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কিরিস সোজা বাড়ির ভিতর ঢুকলো হলরুমে বসে থাকা সবাই অবাক এই দৃশ্য দেখে।
নুসরাত চোখ বড় বড় করে বলল—
“আরে…!!”
রিহান তো প্রায় লাফিয়ে উঠলো।
“ওইটা কি… লিসি না?!”
কাবির মুখ হাঁ হয়ে গেল।
“এই শালা… ভাইয়া কি কিডন্যাপ করে আনছে নাকি!”
সুরভী ফিসফিস করে বলল—
“আমি তো সিনেমায়ও এমন দেখিনি…”
এরই মধ্যে বড়রাও এগিয়ে এলো।
সুপ্রিয়া থমকে দাঁড়ালেন।
“কিরিস…?”
আনোয়ার সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
আর কিরিস? সে একদম স্বাভাবিকভাবে হাঁটছে।
কাঁধে লিসি ছটফট করছে, হাত-পা নাড়াচ্ছে।
লিসি কিরিসের পিঠে ছোট ছোট ঘুষিও মারছে।
কিরিস একবার মাথা একটু ঘুরিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল—
“চুপ করে থাকো। না হলে সত্যিই বেঁধে রাখবো।”
লিসি ক্ষেপে গিয়ে মনে মনে বললো—
“আমি তো আগেই বাঁধা!”
এই কথা শুনে পেছনে দাঁড়ানো কাজিনরা হাসি চেপে রাখতে পারলো না। রিহান কাবিরের কানে বলল—
“ভাই… এটা কি অপহরণ না রোমান্স?”
কাবির গম্ভীর মুখে বলল—
“ কিরিস স্টাইলের রোমান্স।”
এদিকে কিরিস একটুও পাত্তা না দিয়ে সোজা বাড়ির দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। সবাই হতবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। লিসি এখনও ছটফট করছে।
রায় চৌধুরী বাড়ির বিশাল হলরুম।সবাই এক অদ্ভুত চুপচাপ উত্তেজনার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। কিরিস একদম নির্লিপ্ত মুখে হেঁটে এসে লিসিকে সোফায় বসিয়ে দিল।
লিসির হাত-পা এখনও বাঁধা, মুখেও টেপ মারা। চোখ দুটো বড় বড় করে সে একবার কিরিসের দিকে, একবার চারপাশের সবাইয়ের দিকে তাকাচ্ছে। তার লম্বা চুলগুলো সোফার উপর দিয়ে প্রায় নিচে পড়ে গেছে। ঘরের মধ্যে এমন একটা অবস্থা সবাই লিসির দিকে একবার তাকাচ্ছে… আবার কিরিসের দিকে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন সবাই একই প্রশ্ন ভাবছে—
“এটা কি হলো এখন?”
কিরিস তখন খুব শান্তভাবে চারপাশে তাকাল। তারপর একেবারে স্বাভাবিক গলায় বলল—
“নাও… বিয়ে করে এনেছি।”
পুরো হলরুম পিনড্রপ সাইলেন্ট। কিরিস আবার বলল—
“তোমাদের বাড়ির বউমা।”
তার ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি।
“এখন থেকে… কিরিস রায় চৌধুরীর বউ — লিসি রায় চৌধুরী।”
এক সেকেন্ড…
দুই সেকেন্ড…
তারপর পুরো হলরুম যেন একসাথে বিস্ফোরিত হলো।
রিহান লাফ দিয়ে উঠে বলল—
“কি বললি ভাইয়া?!!”
কাবির প্রায় সোফা থেকে পড়ে যাচ্ছিল।
“এক মিনিট! আমরা কি ঘুমাচ্ছি নাকি?”
নুসরাত মাথায় হাত দিয়ে বলল—
“আল্লাহ! ভাইয়া তো সরাসরি কিডন্যাপ করে বিয়ে করে আনছে!”
জারা মুখ চেপে হাসছে।
“এইটা তো পুরো সিনেমা!”
সুরভী অবাক হয়ে বলল—
“কিন্তু লিসির তো হাত-পা বাঁধা!”
নুসরাত গম্ভীর মুখে বলল—
“ কিরিসের বিয়ে স্টাইল আলাদা।”
এদিকে সোফায় বসে লিসির চোখ প্রায় বের হয়ে আসার অবস্থা। সে “মমমমম!” করে কিছু বলার চেষ্টা করছে।
ঠিক তখনই আরোবি দৌড়ে এলো।
“আরে আগে মুখটা তো খুলো!”
সে তাড়াতাড়ি লিসির মুখের কাপড় খুলে দিল।
লিসি সঙ্গে সঙ্গে জোরে বলে উঠল—
“এইটা কি হয়েছে?! আমাকে জোর করে—”
কিন্তু কথা শেষ করার আগেই আরোবি আবার বলল—
“এক মিনিট এক মিনিট!”
সে লিসির হাত-পায়ের বাঁধনও খুলতে লাগল।
“এভাবে বউমাকে বেঁধে আনে কেউ?”
এদিকে কাবির হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে নাটকীয় গলায় বলল— “এই আনন্দ টা উদযাপন করা দরকার!”
সবাই তার দিকে তাকাল। কাবির বলল—
“এক মিনিট!”
সে দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। রিহান চিৎকার করল—
“এই পাগল কোথায় গেলি!”
কিছুক্ষণ পর কাবির একটা মিষ্টির বক্স নিয়ে দৌড়ে ফিরে এল।
— “নাও! সবাই মিষ্টি খাও!”
সে প্রথমে একটা মিষ্টি তুলে কিরিসের মুখে ঢুকিয়ে দিল।
“অভিনন্দন ভাইয়া! অপহরণ সফল হয়েছে!”
পুরো হলরুম হেসে উঠল। রিহান আরেকটা মিষ্টি নিয়ে বলল— “এইটা বউমার জন্য!”
তারপর লিসির দিকে এগিয়ে দিল।
— “স্বাগতম রায় চৌধুরী পরিবারে।”
লিসি এখনও হতবাক।
“আমি কিন্তু—”
নুসরাত দ্রুত বলল—
“না না! আগে মিষ্টি খাও!”
জারা হেসে বলল—
“বাকি প্রতিবাদ পরে করা যাবে।”
সুরভী মজা করে বলল—
“আমরা আগে বিয়ের ট্রিট নেব।”
এদিকে বড়রা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে।
সুপ্রিয়া মাথা নাড়িয়ে বললেন—
“এই ছেলের আর কোনো দিনও স্বাভাবিক কিছু হবে না।”
আনোয়ার সাহেব কিরিসের দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন— “তুমি অন্তত মেয়েটাকে ভালোভাবে আনতে পারতে …”
কিরিস শান্তভাবে সোফার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ শুধু লিসির উপর। লিসি রাগে লাল হয়ে বলল—
“ আপনাকে আমি....! ”
কিরিস ধীরে ঝুঁকে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
“চুপচাপ বসে থাকো… বউ।”
লিসির চোখ আবার বড় হয়ে গেল। আর চারপাশে—
কাজিনরা এখনও মিষ্টি খাওয়ানো আর হাসাহাসি নিয়ে ব্যস্ত। পুরো রায় চৌধুরী বাড়িতে যেন একটা বিশাল নাটক শুরু হয়ে গেছে।
হলরুমে তখনও হাসাহাসি, ফিসফাস, মিষ্টি খাওয়ানো—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত উৎসবের মতো পরিবেশ।
লিসি সোফার কোণায় বসে আছে। তার গাল দুটো লাল হয়ে গেছে লজ্জায়। চোখ নামিয়ে রেখেছে…
এতগুলো মানুষের সামনে বসে থাকতে তার যেন মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। কিছুক্ষণ পর বড়রা একটু সামনে এগিয়ে এলেন। সুপ্রিয়া ধীরে লিসির পাশে বসলেন। তার মাথায় আলতো করে হাত রাখলেন।
নরম গলায় বললেন—
“লিসি মা… ভয় পেয়ো না। আমরা তোকে অনেক দিন ধরেই চিনি, আগে আমার বাড়ির মেয়ে ছিলও এখন বউমা।”
লিসি ধীরে চোখ তুলল। মির্জা বেগম তখন সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখে কিন্তু স্পষ্ট খুশি। তিনি মুচকি হেসে বললেন—
“আমি তো আগেই বুঝছিলাম… এই মেয়েটাকেই একদিন আমার কিরিস নিয়ে আসবে।”
এই কথা শুনে পাশ থেকে নুসরাত মুখ চেপে হাসল।
মির্জা বেগম আবার বললেন—
“আচ্ছা হয়েছে। আমার দাদুভাইয়ের বউ তো এমন সুন্দর হবে—এটা তো স্বাভাবিক।”
প্রিয়া এগিয়ে আসলো —“ হুম, এবার আমাদের দুই বউমার ভার কমলো, আমার কাজের দায়িত্ব আমার বউমা নুসরাত নেয়েছে আর এবার সুপ্রিয়ার কাজের দায়িত্ব তার বড় বউমা নেবে,, একদম মন খারাপ করবে না লিসি , ”
আনোয়ার বসে থেকেই বললো —“ জানি সবটা হঠাৎ হয়েছে, কি করবো এমন একটা ছেলে হয়েছে আমার, কিন্তু কোনো চিন্তা নয়, কিন্তু আমার ছেলে তোমাকে সুখে রাখবে এটা জানি ”
আনারুল হেসে বললো —” হুম। আর লিসি তো নতুন নয় এখানে, তাই একদম ভয় পাবে না, আগের মতো যা ইচ্ছে তাই করবে কোনো বাঁধা নেই ”
সবাই হালকা হেসে উঠল। লিসি এত লজ্জা পেল যে মাথা একদম নিচু করে ফেলল। তার আঙুলগুলো আঁকড়ে আছে শাড়ির আঁচল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল…
কিন্তু চারপাশে সবার এত খুশি মুখ দেখে থেমে গেল।
মনে মনে ভাবল—
“এখন কিছু বললে তো সবাই কষ্ট পাবে…”
তাই চুপচাপ বসে রইল।
এদিকে কিরিস এতক্ষণ পুরোটা সময় একটা কথাও বলেনি। সে একবার সবার দিকে তাকাল…
তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে ঘুরে সিঁড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল। রিহান সেটা দেখে হঠাৎ জোরে বলল—
“এই ভাইয়া!”
কিরিস থামল না, শুধু একটু মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
রিহান দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল—
“বাসর ঘর কিন্তু সাজানো হয়ে গেছে!”
পুরো হলরুম আবার হাসিতে ফেটে পড়ল।
রিহান চালিয়ে গেল—
“একদম সাদা সাদা ফুল দিয়ে সাজানো। তাই কিছু নষ্ট করবি না!”
কাবির পাশ থেকে বলল—
“হ্যাঁ! আমরা অনেক কষ্ট করে সাজিয়েছি!”
নুসরাত নাটকীয় গলায় বলল—
“আর ফুলগুলো কিন্তু দামি!”
সবাই আবার হেসে উঠল।
কিরিস কয়েক সেকেন্ড তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু সে কিছুই বলল না। শুধু মাথা একটু নেড়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।