পর্ব :60
এদিকে বড়দের সিরিয়াস আলোচনা চললেও—
বাড়ির ছোটরা আর কাজিনরা একেবারে উল্টো মুডে।
ডাইনিং এর পাশে লিভিং স্পেসে সবাই গোল হয়ে বসে হাসাহাসি করছে। রিহান কাবিরকে কনুই দিয়ে খোঁচা দিল
—"ওই কাবির ভাই… বিয়ের পর কিন্তু আমাদের ভুলে যাবেন না।"
ইয়াবি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো—
—"ভুলবে কেন? বউকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে!"
সঙ্গে সঙ্গে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। কাবিল লজ্জা পেয়ে বালিশ ছুঁড়ে মারলো—
—"চুপ কর তোরা!"
রিহান নাটকীয় মুখ করে বললো—
—"আমরা তো ভাবছি বিয়ের রাতে দরজার সামনে বসে টাকা আদায় করবো।"
একজন কাজিন বললো—
—"না না… আগে ঠিক কর, বউদিকে কী নামে ডাকবো!"
আবারও হাসির রোল পড়ে গেল। আবারও হাসির রোল পড়ে গেল। এই হাসি, ঠাট্টা আর হৈচৈয়ে
পুরো রায় চৌধুরী বাড়ি যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। ঠিক তখনই প্রিয়া হঠাৎ মনে করিয়ে দিল—
—"আচ্ছা শুনেছো তো? কাল সকালে কিরিস আসছে।"
এক মুহূর্তে সবাই একটু থেমে গেল।
জারা চোখ বড় করে বললো—
—"সত্যি? ভাইয়া এক মাস পরে আসছে?"
কাবির মাথা নেড়ে বললো—
—"হ্যাঁ… সকালে ফ্লাইট।"
একজন কাজিন একটু ভয় মিশ্রিত হাসি দিয়ে বললো—
—"তাহলে কাল থেকে আবার সোজা হয়ে চলতে হবে!"
সবাই আবার হেসে উঠলো…
কিন্তু সেই হাসির মাঝেও একটা আলাদা উত্তেজনা ছিল।
কারণ— কিরিস রায় চৌধুরী।
এই বাড়ির সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে শক্তিশালী,
আর একই সাথে সবচেয়ে রহস্যময়মানুষ।
রাত অনেক হয়ে গেল। খাওয়াদাওয়া শেষে একে একে সবাই নিজেদের রুমে চলে গেল। পুরো বাড়ি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। শুধু দূরে গার্ডদের পায়ের শব্দ আর রাতের বাতাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সবার মনে একটা আলাদা উত্তেজনা রয়ে গেল—
কাল সকালে কিরিস ফিরছে।
রাতের আকাশে বিশাল একটি প্রাইভেট জেট ধীরে ধীরে নেমে এলো। ফ্রান্সের প্যারিস থেকে সরাসরি উড়ে আসা সেই ফ্লাইটটি অবশেষে বাংলাদেশের মাটিতে অবতরণ করলো। ঢাকার বিমানবন্দরের একদম ভিআইপি অংশে আগে থেকেই নিরাপত্তা টাইট করা। সাধারণ মানুষের প্রবেশ নেই বললেই চলে। প্লেনের দরজা খুলতেই ঠান্ডা সকালের বাতাস ঢুকে পড়লো ভেতরে।
কয়েক সেকেন্ড পরে— ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো একজন মানুষ। কালো শার্ট, কালো ট্রাউজার…
কাঁধে হালকা ঝুলানো ব্লেজার… হাতে ঝকঝকে রোলেক্স ঘড়ি। চোখে সেই তীক্ষ্ণ, ঠান্ডা দৃষ্টি। সে আর কেউ না—
কিরিস রায় চৌধুরী। এক মাস পরে সে ফিরেছে।
তার পেছনে নামলো মার্ক এবং আরও কয়েকজন লোক।
মার্ক একটু ঝুঁকে বললো—
—“Sir, the convoy is ready.”
কিরিস কোনো উত্তর দিল না।
শুধু একবার চারপাশে তাকালো।
তার উপস্থিতিতেই যেন আশেপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। এয়ারপোর্টের ভিআইপি গেট দিয়ে বের হতেই
সামনে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা কালো লাক্সারি গাড়ি। মাঝখানে একটি ব্ল্যাক রোলস রয়েস।
গাড়ির দরজা খুলে দিল একজন গার্ড। কিরিস ধীরে ভেতরে বসে পড়লো। এক মুহূর্ত পরে ইঞ্জিনের শব্দে পুরো কনভয় একসাথে স্টার্ট নিল। ঢাকার রাস্তা দিয়ে দ্রুত এগিয়ে চললো গাড়িগুলো।গাড়ির ভেতরে কিরিস চুপচাপ বসে আছে। তার চোখ জানালার বাইরে।
এক মাস ধরে বিদেশে ছিল… ব্যবসা, মিটিং, ডিল—
সব শেষ করে অবশেষে সে ফিরছে নিজের জায়গায়।
রায় চৌধুরী বাড়ি। মার্ক ট্যাবলেটে কিছু দেখে বললো—
—“Sir, everything is ready at home.”
কিরিস ধীরে চোখ বন্ধ করলো কয়েক সেকেন্ড।
তারপর ঠান্ডা গলায় শুধু বললো—
—“Drive faster.”
গাড়ির গতি আরও বেড়ে গেল।
এদিকে— রায় চৌধুরী বাড়িতে সকালের নাস্তা শেষ করে সবাই অপেক্ষা করছে। রিহান বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছে। কাবির বললো—
—“আর একটু সময় লাগবে। এয়ারপোর্ট থেকে আসতে সময় লাগে।”
ঠিক তখনই দূর থেকে গাড়ির শব্দ ভেসে এলো।
গেটের গার্ড ওয়াকিটকিতে বললো—
—“Sir… convoy approaching.”
এক মুহূর্তে বাড়ির সবাই থেমে গেল। বিশাল লোহার গেট ধীরে খুলে গেল। দূর থেকে কালো গাড়ির কনভয় ভেতরে ঢুকতে লাগলো। রোদে ঝকঝক করছে গাড়িগুলো একটার পর একটা গাড়ি এসে থামলো বাড়ির সামনে।
সবচেয়ে সামনে থাকা রোলস রয়েসটা ধীরে থামলো।
গার্ড দরজা খুলে দাঁড়িয়ে গেল।সবাই নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে। আর তারপর— গাড়ি থেকে নামলো কিরিস রায় চৌধুরী। এক মাস পরে এই বাড়ির সবচেয়ে ভয়ংকর… সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটা আবার ফিরেছে।
পুরো উঠোন যেন এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
রায় চৌধুরী বাড়ির বিশাল আঙিনায় একের পর এক কালো গাড়ি এসে থামলো। গার্ড দরজা খুলতেই ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলো কিরিস রায় চৌধুরী।
কালো শার্ট, কালো ট্রাউজার… কাঁধে ব্লেজার ঝুলানো…
চোখে সেই ঠান্ডা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। এক মাস পরে বাড়ির মাটিতে পা রাখলো সে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে গেল—
“কিরিস এসেছে!”
ঘরের ভেতর থেকে সবাই বের হয়ে এলো। সবার আগে এগিয়ে এলেন সুপ্রিয়া। ছেলেকে সামনে দেখে তার চোখ হঠাৎ ভিজে উঠলো।
— “এতোদিন পরে এলি বাবা…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি কিরিসকে জড়িয়ে ধরলেন। কিরিস প্রথমে একটু স্থির দাঁড়িয়ে রইলো…
তারপর খুব ধীরে মায়ের কাঁধে হাত রাখলো।
শান্ত গলায় বললো—
— “আমি ভালো আছি মা।”
সুপ্রিয়া চোখ মুছতে মুছতে বললেন—
— “তুই ঠিক মতো খাস? নিজের খেয়াল রাখিস তো?”
কিরিস হালকা হাসলো। তারপর একে একে সবার দিকে তাকালো। কাবির, রিহান, সুরভী, আরোবি, জারা —
সবাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। রিহান হেসে বললো—
— “ভাইয়া… এক মাস পরে অবশেষে ফিরলেন।”
কিরিস তার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বললো—
— “হুম।”
এরপর সে ধীরে ব্লেজারটা কাঁধ থেকে নামিয়ে হাতে নিল।
চারপাশে একবার তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললো—
— “আমার তোমাদের সবার সাথে কিছু কথা আছে…
রুমে চলো।”
কথাটা বলেই সে ঘুরে দাঁড়ালো। সোজা হাঁটতে লাগলো
আনোয়ার রায় চৌধুরীর স্টাডি রুমের দিকে।
স্টাডি রুম।
ভেতরে বসে আছেন মিস্টার আনোয়ার রায় চৌধুরী।
টেবিলের উপর দাবার বোর্ড সাজানো। তিনি একা বসে শান্তভাবে চেস খেলছিলেন। ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো কিরিস। কিরিস ঢুকতেই আনোয়ার সাহেব একবার তাকালেন। তারপর আবার দাবার বোর্ডে চোখ দিলেন। কিরিস ধীরে এসে তার সামনে চেয়ারে বসে পড়লো। কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বললো না।
ঘরে শুধু দাবার গুটির শব্দ। তারপর কিরিস ঠান্ডা গলায় বললো—
— “যে কারণে বাড়ির ছেড়ে ছিলাম…
সেই কারণেই আমি আবার ফিরে এসেছি।”
ঘরে থাকা সবাই তখন চুপচাপ। আনোয়ার এবার সরাসরি কিরিসের দিকে তাকালো।
— “বলো.... কি চাও? তোমার ডিমান্ড কি?”
আনোয়ার রায় চৌধুরী ধীরে দাবার একটা গুটি সরালেন।
তারপর শান্ত গলায় বললেন—
— “চায় তো অনেক কিছু কিন্তু তোমার কাছ থেকে শুধু অনুমতি চায় ?”
এক মুহূর্তও দেরি করলো না কিরিস। স্পষ্ট গলায় বললো—
— “আমি বিয়ে করতে চাই।”
ঘরে থাকা সবাই একে অন্যের দিকে তাকালো।
কিরিস আবার বললো—
— “আর আমি বিয়ে করবো আজকে বিকালে।”
এবার সত্যি সবাই অবাক। কাজিরা বাইরে দরজায় কান পেতে সব শুনছে, কিরিসের মুখে বিয়ের কথা শুনে সবাই প্রায় অকাশ থেকে পরার মতো অবস্থা।
রিহান ফিসফিস করে বললো—
— “কি?”
নুসরাত আস্তে করে রিহানের মাথায় ঠোকা দিয়ে বলে —” আস্তে কথা বলো বাবারা শুনতে পেলে তোমাকে ধরে কেলাবে ”
নুসরাতের কথায় কাজিরা হালকা হেসে উঠে, তারপর সবাই আবার কান পেতে শুনতে থাকে ভিতরে কি কথা চলছে।
ঘরের মধ্যে সবাই যখন অবাকের কারণে কিছু বলতে পারছেনা তখন কিরিস একদম স্থির গলায় বললো—
— “পাত্রী… লিসি শর্মা। বাবাই তো বলছি বাড়ির বড় ছেলের বিয়ে না দিয়ে কাবিরের বিয়ে কি করে দেবে? তাই কাবিরের বিয়ে আগে আমি বিয়ে করছি আজকে, শুক্রবারে তোমার বড় ছেলের বিয়ে আর মঙ্গলবারে তোমার ছোট ছেলে কাবিরের বিয়ে, একসাথে ডাবল খুশি, তাই মুখ ঠিক করে হাসো বাবা ”
এক মুহূর্তে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। এই শুনে দরজার পাশ থেকে উঠে কাবির আর রিহান একে অপরের দিকে তাকালো।
সুপ্রিয়া অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন।
কিন্তু এইসবের মাঝেই একজনের মুখে অন্যরকম হাসি ফুটে উঠলো। মির্জা বেগম। তিনি মুচকি মুচকি হাসছেন।
তার চোখে যেন আগেই সব জানা ছিল। কিরিস ধীরে তার দিকে তাকালো। তারপর বললো—
— “ দাদি … আকবার খানের কাছে ফোন দিয়ে খবর দিয়ে দাও।”
সবাই আবার অবাক। কিরিস ঠান্ডা গলায় বললো—
— “বিকেলে বরযাত্রী যাচ্ছে তার বাড়ি।”
মির্জা বেগম এবার হেসে বললেন—
— “তা হলে তো আর চিন্তা নেই।”
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—
— “যা… আগে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে নে।”
কিরিস ধীরে উঠে দাঁড়ালো। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে হঠাৎ থামলো। তার চোখ গিয়ে পড়লো টেবিলের উপর রাখা দাবার বোর্ডে। সে বাবার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো। তারপর বললো—
— “আমি সন্ধ্যায় আপনার বড় বউমাকে নিয়ে এসে আপনাকে চেকমেট দেচ্ছি… মিস্টার আনোয়ার রায় চৌধুরী।”
কথাটা বলে সে ঘুরে দাঁড়ালো। আনোয়ারের স্টাডি রুমে কথা শেষ করে কিরিস ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
শেষবার সবার দিকে তাকিয়ে বললো—
— “আমি যা বলেছি… সেটাই হবে।”
তারপর ঘুরে দরজার দিকে হাঁটলো। দরজার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে খুলতেই— ধপাস!
হঠাৎ কয়েকটা শরীর প্রায় তার উপর পড়ে যাওয়ার অবস্থা। নুসরাত, রিহান, কাবির, সুরভী, জারা, আরবি—
সবাই একসাথে দরজার সামনে কানের কাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দরজা খুলতেই তারা সবাই হুড়মুড় করে সামনে ঝুঁকে পড়লো। রিহান কোনোমতে দেয়াল ধরে দাঁড়ালো। কাবির প্রায় মেঝেতে বসে পড়ার অবস্থা।
সুরভী দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো—
— “আমরা কিন্তু কিছুই শুনিনি!”
জারা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়লো—
— “হ্যাঁ হ্যাঁ… কিছুই না!”
নুসরাত চোখ বড় করে বললো—
— “আমরা তো এখানে দিয়ে যাচ্ছিলাম!”
রিহান গম্ভীর মুখ করে বললো—
— “হ্যাঁ… একদম কাকতালীয় ব্যাপার।”
কিরিস একদম চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
তার ঠান্ডা চোখ এক এক করে সবার মুখে।
কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছে না।
ঠিক তখনই—
কাবির হঠাৎ গলা পরিষ্কার করলো।
— “আচ্ছা ভাই…”
সবাই তার দিকে তাকালো।
কাবির বুক ফুলিয়ে বললো—
— “বেশি মেশিনটা করিস না।”
রিহান ভুরু কুঁচকালো।
— “কোন মেশিন?”
কাবির বললো—
— “মানে… টেনশন নিস না!”
তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে কিরিসের কাঁধে হাত রাখলো।
— “তোর জন্য সন্ধ্যেবেলা বাসর ঘর রেডি করার দায়িত্ব আমার!”
সবাই একসাথে—
— “কি?!”
কাবির গর্ব করে বললো—
— “মিষ্টি থেকে শুরু করে ফুল… সব ব্যবস্থা আমি করবো।”
রিহান হাসি চাপতে চাপতে বললো—
— “বাহ!”
সুরভী বললো—
— “এই তো আমাদের কাবির!”
কাবির আবার বললো—
— “আর বোনেদের মধ্যে থেকে কে যাবে বউ আনতে…”
সে জারার দিকে তাকালো।
— “ওটা আমরা ম্যানেজ করে নেবো।”
আরবি হাসতে হাসতে বললো—
— “মানে সব প্ল্যান হয়ে গেছে!”
কাবির বুক চাপড়ে বললো—
— “চিন্তা করিস না ভাই!”
— “আমরা সবাই তোর সাপোর্টে আছি।”
রিহান হাত তুলে বললো—
— “হ্যাঁ… আমি তো আগেই মেনে নিয়েছি।”
নুসরাত মাথা নাড়লো—
— “আমিও।”
সুরভী বললো—
— “আমরা সবাই।”
জারা হাসলো—
— “বউ আনতে গেলে কিন্তু আমরাও যাবো।”
সবাই একসাথে হইচই শুরু করলো।
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটলো।
সে শুধু বললো—
— “তোরা শেষ?”
সবাই একসাথে চুপ। কাবির ফিসফিস করে বললো—
— “না… আরেকটু বাকি ছিল।”
রিহান হেসে ফেললো। আর কিরিস মাথা নাড়িয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো। পেছন থেকে কাবির আবার চিৎকার করলো—
— “ভাই! ফুলের রং লাল না সাদা রাখবো?”
কিরিস না ঘুরেই বললো—
— “চুপ।”
সাথে সাথে পুরো করিডরে হাসির রোল পড়ে গেল।
ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে উঠে গেল। আর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই এখনও অবাক হয়ে আছে কিরিস রায় চৌধুরী আজ বিকেলেই বিয়ে করতে যাচ্ছে…
আর পাত্রী— লিসি শর্মা।
অন্য দিকে......
স্টাডি রুম...
দেয়ালে বড় বুকশেলফ, পুরোনো কাঠের টেবিল, আর মাঝখানে দাবার বোর্ড। আনোয়ার রায় চৌধুরী চেয়ারে বসে আছেন গম্ভীর মুখে।
ঘরে বসে আছেন— সুপ্রিয়া, প্রিয়া, আনারুল আর মির্জা বেগম। পরিবেশটা ভারী।
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে আনোয়ার ধীরে বললেন—
— “এভাবে কেউ বিয়ের কথা ঘোষণা করে? বিকেলে বিয়ে করবে… আর আমাদের শুধু জানিয়ে দিল!”
তার গলায় স্পষ্ট বিরক্তি। তিনি সবার দিকে তাকালেন।
— “তোমরা কি এই বিয়েতে রাজি?”
প্রিয়া প্রথমে হালকা হাসলো।
— “ আসলে ভাইজান আমি রাজি আছি ।”
সুপ্রিয়াও শান্তভাবে বললেন—
— “আমিও, আমি তো লিসির মতো একটা বউ চেয়েছিলাম আমার বড় ছেলের জন্য ।”
আনারুল মাথা নেড়ে বললো—
— “আমারও কোনো আপত্তি নেই,ভাই জান তুমিও মেনে নাও, কিরিস কে তো আমরা চিনি। ”
আনোয়ার ভুরু কুঁচকে তাকালেন।
— “মানে… তোমরা সবাই রাজি?”
ঠিক তখন মির্জা বেগম ধীরে মুচকি হাসলেন।
— “কেন দেবো না? কেনো রাজি হবো না আনোয়ার? ”
আনোয়ার তার দিকে তাকালেন। মির্জা বেগম ধীরে বললেন—
— “তোর কাছে যদি ১৫ বছরের একটা ছেলে এসে দাঁড়িয়ে বলে—”
তিনি একটু থামলেন। তারপর কিরিসের কণ্ঠ নকল করে বললেন—
— “দাদু… আমি মেয়েটাকে চাই। তুমি ওকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখবে। একদম পুতুলের মতো। ওকে এমনভাবে রাখবে যেন একটা পবিত্র ফুলের মতো থাকে। যেমন একটা ফুল বাগানে ফুটে থাকে… ঠিক তেমন। যেন কেউ ওকে বাজেভাবে দেখতে না পারে। যখনই কারো চোখ পড়বে… যেন ভদ্রতা আর সভ্যতার মাঝেই দেখে। আমি ওকে চাই। তুমি ওকে আমার জন্য রেখে দাও।”
আনোয়ার অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। মির্জা বেগম এবার ধীরে বললেন—
— “তুই কি জানিস… সেই দিন থেকেই কিরিস আমাকে লিসির খেয়াল রাখতে বলেছে?”
ঘরের সবাই একটু চমকালো।
— “লিসির পড়াশোনা…।তার প্রয়োজনীয় সব জিনিস…এমনকি খরচের টাকাও। সব সে পাঠিয়েছে।”
আনোয়ার এবার পুরো চুপ। মির্জা বেগম বললেন—
— “আজকে থেকে না… প্রথম দেখা থেকেই ছেলেটা পাগল। তেরোটা বছর ধরে দূর থেকে মেয়েটাকে আগলে রেখে বড় করেছে।”
ঘরে নিস্তব্ধতা। তিনি শেষবার বললেন—
— “এখন বল… ওরকম ছেলের হাতে মেয়ে না দিয়ে কার হাতে দিবি?”
আনোয়ার গভীরভাবে চিন্তা করলেন। হঠাৎ যেন অনেক কিছু বুঝে গেলেন। তিনি বুঝলেন কেন তার ছেলে সবসময় লিসির ব্যাপারে নরম ছিল। কেন কেউ লিসির নাম নিলেই তার চোখ বদলে যেত। কারণ সেটা শুধু পছন্দ ছিল না… সেটা ছিল তেরো বছরের ভালোবাসা।
আনোয়ার ধীরে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন।
তারপর বললেন—
— “তাই নাকি…”
তার চোখে অন্যরকম ভাব। তিনি ধীরে বললেন—
— “ঠিক আছে… দেখি ছেলেটা কি করে।”
ঘরের ভেতর হালকা শান্তি নেমে এলো।
সুপ্রিয়া মৃদু হাসলেন। মির্জা বেগম ধীরে বললেন—
— “আমি জানি… এই বিয়েটা হবেই।”
মির্জা বেগম হেসে উঠে দাঁড়ালেন বাইরে বের হতে হতে বললেন —“ যাই আকবর কে খবর টা জানিয়ে দেই, মেয়ের বাড়ি বলে কথা! ”
বলে তিনি চলে গেলেন, একে একে সবাই স্টাডি রুমের থেকে বের হয়ে চলে আসলেন ঘরে বসে আছেন শুধু আনোয়ার আর আনারুল। স্টাডি রুম থেকে বের হওয়ার পরই মির্জা বেগম ধীরে ধীরে ড্রইংরুমে এসে বসলেন।
টেবিলের উপর রাখা পুরোনো ল্যান্ডলাইন টেলিফোনটা নিজের দিকে টেনে নিলেন। চশমাটা ঠিক করে নম্বর ডায়াল করলেন। কয়েক সেকেন্ড পর ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো— “হ্যালো… আকবর খান বলছি।”
মির্জা বেগম ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বললেন—
— “আকবর, আমি মির্জা বলছি।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর আকবর খান বললেন—
— “এই সময় ফোন? কি ব্যাপার?”
মির্জা বেগম একদম শান্ত গলায় বললেন—
— “আজ বিকেলে তোমার বাড়িতে বরযাত্রী যাবে।”
ওপাশে হঠাৎই গলা একটু চড়ে গেল—
— “মানে?!”
— “কিসের বরযাত্রী?”
মির্জা বেগম যেন খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন—
— “আমাদের কিরিস… তোমার নাতনি লিসিকে বিয়ে করতে আসছে।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ চুপ। তারপর হঠাৎই আকবর খানের গলা ভারী হয়ে উঠলো—
— “কি করে ঠিক করলে তুমি?!”
— “আমার নাতনির বিয়ে হবে আর আমি কিছুই জানবো না?! হঠাৎ করে বললে বিকেলে বিয়ে হবে!”
মির্জা বেগম এবার একটু মুচকি হেসে বললেন—
— “এই তো জানালোম।”
আকবর খান বিরক্ত হয়ে বললেন—
— “মির্জা! এসব মজা করার সময় এটা? আমি ঠিক করেছি মানে কি?”
মির্জা বেগম এবার একটু গম্ভীর গলায় বললেন—
— “কারণ আমি জানি… এই বিয়েটাই ঠিক। আর তুমিও জানো।”
আকবর খান হেসে উঠলেন।
— “আমি কিন্তু এত সহজে আমার নাতনিকে নিয়ে যেতে দেবো না।”
মির্জা বেগম ঠান্ডা গলায় বললেন—
— “দেবে না? তাহলে দেখাই যাক।”
দুজনেই কয়েক সেকেন্ড চুপ।।তারপর আকবর খান গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন—
— “আচ্ছা… পাঠাও দেখি। কার এত বুকের পাটা…
যে জমিদার আকবর খানের বাড়ি থেকে আমার নাতনিকে তুলে নিয়ে যায়।”
মির্জা বেগম হালকা হাসলেন।
— “ কোনো কিছু করতে হবে না শুধু আমার লিসি কে বউ সাজিয়ে রেখো আমার দাদুভাই গিয়ে বিয়ে করে নিয়ে চলে আসবে। তারপর যখন আবার ওরা তোমাদের ওখানে যাবে তখন অনুষ্ঠান করো ।”
আকবর খান কিছু বললেন না চুপ থাকলেন। ফোনটা ধীরে রেখে দিলেন তিনি।
এদিকে রেশমপুর জমিদার বাড়ি।
লিসি সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে দাদুর গম্ভীর গলা ভেসে এলো—
— “লিসি!”
লিসি অবাক হয়ে ঘরে ঢুকলো।
— “কি হয়েছে দাদু?”
আকবর খান তার দিকে তাকিয়ে বললেন
— “আজ বিকেলে বরযাত্রী আসছে।”
লিসি থমকে গেল।
— “কার?”
আকবর খান ধীরে বললেন—
— “তোমাকে বিয়ে করতে।”
লিসির চোখ বড় হয়ে গেল।
— “কি?! আমি বিয়ে করবো না!”
সে প্রায় চিৎকার করে উঠলো।
— “আমি এই বিয়ে করবো না দাদু! কার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করছো আর আমার মতামত নেওয়ার কোনো প্রয়োজন মনে করলে না ”
আকবর —“ আরে তোর নানু ফোন দিয়ে বলে তোকে বিয়ে করতে ডার,দাদুভাই কিরিস আসছে, এসে বিয়ে করে নিয়ে চলে যাবে ”
একটুর জন্য লিসি পুরো থমকে গেলো কিরিস বাড়ি ফিরেছে, কিন্তু তাকে একবারও জানালো না, তারপর আবার বিয়ে, এটা ভাবতেই লিসির মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে চিন্তায়। লিসির চোখে রাগ আর অভিমান একসাথে।
সে বললো—
— “এতদিন কোথায় ছিল সে? আজ হঠাৎ এসে বললেই বিয়ে হয়ে যাবে?”
তার গলা কাঁপছে।
— “আমি করবো না এই বিয়ে।”
তারপর একটু থেমে বললো—
— “আর তুমি তো জানো দাদু… ও কেমন। ওর রাগ… ওর আচরণ…ওর সাথে বিয়ে করা যায়?”
আকবর খান চুপচাপ শুনছিলেন। তারপর ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। লিসির মাথায় হাত রেখে বললেন—
— “আমি কি তোকে দিতে চাই? আমি তো নিজেও চাই না।”
লিসি একটু শান্ত হলো। কিন্তু আকবর খান আবার বললেন—
— “তবে আসতে দে।”
তার চোখ হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠলো।
— “যদি তোর সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করে… এই জমিদার বাড়ির উঠোনেই গুলি করে উড়িয়ে দেব।”
লিসি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। তার মাথা ঘুরে যাচ্ছে।
একদিকে কিরিস আসছে তাকে বিয়ে করতে… আর অন্যদিকে তার দাদু বন্দুক নিয়ে প্রস্তুত।
সে আস্তে বললো—
— “হায় আল্লাহ… আমি তো পড়েছি মহা ঝামেলায়!”
দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে আসে, লিসি চুপচাপ ঘরে বসে আছে দিনটা যেন পানির মতে পাওয়া গড়িয়ে যাচ্ছে।জমিদার বাড়িতে বিকেলের আগেই হঠাৎ এক অদ্ভুত ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। ঠিক দেড় ঘণ্টার মধ্যেই
রায় চৌধুরী বাড়ি থেকে গাড়ি এসে পৌঁছালো। গাড়ি থেকে আনন্দের সাথে নেমে আসলো আরোবি। এসে সে চারপাশ ভালো করে দেখলো, কি সুন্দর গ্রামের পরিবেশ জমিদারের ছোয়া আর গ্রামের আবহাওয়া। একটু পরেই
বড় বড় বাক্স নামানো হচ্ছে গাড়ি থেকে। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। একজন কাজের লোক বললো—
— “এসব কি?”
আরোবি সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললো—
— “বিয়ের শাড়ি আর গয়না।”
আরোবি সব জিনিস নিয়ে সোজা লিসিট ঘরের দিকে যায়, কয়েক জন কাজের লোক এগিয়ে এসে বাক্স গুলো ঘরে নিয়ে আসে। এরপর এক এক করে বাক্স খোলা শুরু হলো। ভেতর থেকে বের হলো দামী শাড়ি, গয়না, কসমেটিকস, জুতা—সবকিছু। সবই ফ্রান্সের প্যারিসের বিখ্যাত ডিজাইনারদের তৈরি। প্রতিটা জিনিস এত সুন্দর আর রাজকীয় যে ঘরে থাকা মেয়েরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। শেষে আরোবি আরেকটা বড় বাক্স খুললো। ভেতর থেকে বের হলো একটা একদম সাদা লেহেঙ্গা। মুক্তোর কাজ, সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি… যেন রাজকন্যার বিয়ের পোশাক।
এটাই লিসির বিয়ের আউটফিট। আরোবি সেটা হাতে নিয়ে লিসির রুমে ঢুকলো। লিসি তখন বিছানার কোণায় চুপ করে বসে আছে। চোখে এখনও রাগ আর অভিমান।
আরোবি ঢুকেই বললো—
— “দেখ তো…”
লেহেঙ্গাটা সামনে ধরতেই লিসির চোখ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে মুখ ঘুরিয়ে বললো—
— “আমি এটা করবো না।”
তার গলা একটু কেঁপে উঠলো।
— “এত সহজে ওকে দেওয়া যাবে না আমাকে।”
আরোবি হালকা হেসে তার পাশে বসলো।
— “এত রাগ?”
লিসি মুখ গোমড়া করে বললো—
— “হ্যাঁ।”
আরোবি ধীরে বললো—
— “দেখ… আমার ভাই বলে কথা। তোর জন্যই প্যারিস থেকে সব ডিজাইন করে এনেছে। তোকে খুব ভালোবাসে। আর আমার কাছে আয় একটু জরিয়ে ধর, কতদূর থেকে আমি তোর জন্য এসেছি। ”
লিসি আরোবিকে জরিয়ে ধরলো। আরোবি তো লিসিকে এমন ভাবে জরিয়ে ধরেছে যেন মনে হচ্ছে এই বুঝি কেউ লিসিকে কেড়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু লিসি কিছু বললো না। কিন্তু তার চোখে আবার সেই পুরোনো অভিমান। মনে মনে ভাবলো—
“এত সহজে না… আমাকে এতদিন কষ্ট পেতে হয়েছে… তাকেও একটু কষ্ট পেতে হবে।”
সে মনে মনে ঠিক করে নিল—
“বিয়ে করবো… কিন্তু এত সহজে না।”
তারপর ধীরে বললো—
— “ঠিক আছে… সাজাও।”
আরোবি হেসে বললো—
— “এই তো আমার লিসি।”
ঘরের ভেতর শুরু হলো সাজানো। সাদা লেহেঙ্গাটা লিসির গায়ে পরানো হলো। তার লম্বা কালো চুল খোলা রেখে হালকা কার্ল করা হলো। মাথায় টিকলি, কানে দুল, গলায় হালকা নেকলেস। মুখে নরম মেকআপ। সবশেষে যখন আয়নার সামনে দাঁড়ালো ঘরে থাকা সবাই কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে গেল। লিসি যেন সত্যিই কোনো রাজকন্যা। সাদা লেহেঙ্গায় তার সৌন্দর্য আরও অবিশ্বাস্য লাগছে। আরোবি মুগ্ধ হয়ে বললো—
— “আল্লাহ… তোকে তো একদম পরীর মতো লাগছে।”
লিসি একটু লজ্জা পেলেও মুখ ঘুরিয়ে বসে রইলো।
ঠিক তখনই আরোবি হঠাৎ বললো—
— “আচ্ছা একটা খবর দিবো?”
লিসি তাকালো।
— “কি?”
আরোবি হাসলো।
— “কাবিরের বিয়েও ঠিক হয়েছে।”
লিসির চোখ বড় হয়ে গেল।
— “সত্যি? কার সাথে?”
আরোবি বললো—
— “তিশার সাথে।”
এক মুহূর্তেই লিসির মুখে বড় হাসি ফুটে উঠলো।
— “সত্যি?! অবশেষে!”
সে খুশি হয়ে বললো—
— “আমি জানতাম এটাই হবে।”
আরোবি হেসে বললো—
— “হুম।”
তারপর ধীরে বললো—
— “আমি এখন যাই। বরযাত্রীরা তো আসবে।”
লিসির মাথায় হাত রেখে বললো—
— “চিন্তা করিস না। সব ঠিক হবে। আর আমি এখন আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি, ভাইয়া বলেছে শুধু সে এসে তোকে নিয়ে যাবে, কোনো ঝামেলা না কোনো মানুষ না শুধু বর আর বউ বিয়ে পড়াবে আর তোকে নিয়ে চলে যাবে ”
আরোবি কথা বলে লিসিকে আলতো করে জরিয়ে ধরে কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে ধীরে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ঘরে এখন একা বসে আছে বউ সেজে লিসি।
সাদা লেহেঙ্গায়, মাথা নিচু করে। তার বুকের ভেতর ধকধক করছে। সে আস্তে ফিসফিস করে বললো—
— “কিরিস…”
তারপর ঠোঁট ফুলিয়ে বললো—
— “এত সহজে কিন্তু আপনাকে বিয়ে করছি না…”
দূরে কোথাও তখন বরযাত্রী নিয়ে আসছে কিরিস রায় চৌধুরী।
খান বাড়ির উপরের ঘরে বউ সেজে চুপচাপ বসে আছে লিসি। সাদা লেহেঙ্গা, মাথায় ওড়না, লম্বা চুল কাঁধে নেমে আছে। দেখতে যেন একেবারে রাজকন্যা। কিন্তু তার মুখে হাসি নেই। ঠোঁট ফুলিয়ে বসে আছে। ঠিক তখন দরজা ধীরে খুলে ভেতরে ঢুকলেন আকবর খান। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার নাতনিকে এভাবে বউ সাজে দেখে চোখে একটু নরমতা চলে এলো।
— “লিসি…”
লিসি মাথা তুললো।
— “দাদু…”
আকবর খান ধীরে তার সামনে এসে বসলেন।
— “শেষবারের মতো দেখতে এলাম।”
তারপর একটু হেসে বললেন—
— “কি রে… এত চুপচাপ কেন?”
লিসি হঠাৎ মুখ গোমড়া করে বললো—
— “আমি কিন্তু এখনো বলছি… আমি এই বিয়ে করবো না।”
আকবর খান ভুরু তুললেন।
— “আবার শুরু করলি?”
লিসি এবার সুযোগ পেয়ে শুরু করলো—
— “তুমি জানো না দাদু ও কেমন! ওর রাগ দেখেছো? সবাই তো ওকে ভয় পায়! ও তো একেবারে রাগী, হিংস্র… মানুষকে কি চোখে দেখে!”
সে একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো—
— “ওর সাথে বিয়ে করলে আমার জীবন শেষ!”
আকবর খান চুপচাপ শুনছিলেন। তারপর হালকা হেসে বললেন—
— “তুই তো বেশ বদনামই করে ফেললি ছেলেটার।”
লিসি ঠোঁট ফুলিয়ে বললো—
— “সত্যিই বলছি।”
তারপর একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো—
— “দাদু… আমি পালিয়ে গেলে কেমন হয়?”
আকবর খান ভুরু কুঁচকালেন।
— “কি বললি?”
লিসি ধীরে বললো—
— “আমি যদি একটু পালিয়ে যাই…তাহলে তো বিয়ে হবে না!”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর আকবর খান হঠাৎ করে হেসে উঠলেন।
— “হাহাহা…”
লিসি অবাক।
— “তুমি হাসছো কেন?”
আকবর খান মাথা নেড়ে বললেন—
— “তুই একদম তোর দাদীর মতো।”
তারপর একটু ঝুঁকে বললেন—
— “ঠিক আছে… পালা।”
লিসি চোখ বড় বড় করে তাকালো।
— “সত্যি?! লোকে কিছু বলবে না ”
আকবর খান আঙুল তুলে বললেন—
— “তুই আমার নাতনি আকবর খানের একমাত্র ছেলের একমাত্র মেয়ে, তোকে কে কি বলবে হ্যাঁ, আমি সব দেখে নেবো, আমার লিসির সোনার খুশির কাজে মানসম্মান সব তুচ্ছ জিনিস, কিন্তু বেশি দূরে যাবি না। এই বাড়ির আশেপাশেই থাকবি।....আমি তো দেখতে চাই…কার এত সাহস… যে আমার নাতনিকে আবার ধরে নিয়ে আসে।”
লিসির মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠলো। সে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
— “ঠিক আছে দাদু… আমি একটু যাচ্ছি।”
আকবর খান আবার হেসে উঠলেন।
— “যা। দেখি কি হয়।”
লিসি চুপচাপ দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল। কয়েক মিনিট পরে জমিদার বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বউ সেজে লিসি পালিয়ে গেল।

0 Comments