তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :59

........... ১ মাস পর...........
এক মাস—পুরো এক মাস পেরিয়ে গেছে।
রায় চৌধুরী বাড়িতে যেন সবকিছু স্বাভাবিক, নিয়মমাফিক, নিরাবেগ। কিরিস এখনো ফেরেনি।
কেউ মুখে কিছু বলে না, কিন্তু নীরবতার ভেতরে একটা চাপা শূন্যতা লুকিয়ে আছে। আর লিসি… সে এখন রেশমপুরে—তার দাদুর ভিটেবাড়িতে।
ভোরের প্রথম আলোকরেখা যখন তালগাছের মাথা ছুঁয়ে আকাশকে স্বর্ণাভ করে তুলছে, তখনই লিসির নিদ্রাভঙ্গ হলো। ঘরের জানালা দিয়ে শিশিরভেজা হাওয়া এসে তার কপালে আলতো স্পর্শ রাখল। দীর্ঘ, কৃষ্ণবর্ণ কেশরাশি যেন রাতের অন্ধকারটুকু বয়ে এনেছে—ঘুম ভাঙতেই সে ধীরে ধীরে উঠে বসল। আজ সে পরবে হালকা গোলাপী রঙের মসলিন শাড়ি—যার কিনারায় সূক্ষ্ম রুপালি জরি। সযত্নে শাড়ি বদলে, কানে ক্ষুদ্র মুক্তোর দুল, হাতে সরু সোনার চুড়ি— অলঙ্কারের ভারে নয়, সৌন্দর্যের স্বাভাবিকতায় সে যেন এক গ্রাম্য পরী।
খান বাড়ির মেয়ে সে—আভিজাত্য তার রক্তে, অথচ সরলতা তার স্বভাবে। নিজেকে আয়নায় শেষবার দেখে নিল। চোখদুটি অকারণে যেন একটু নিস্তেজ।
নিচে নামতেই দাদু উঠোনে পিড়ির উপর বসে রোদ পোহাচ্ছেন। তার হাতে পিতলের গ্লাসে গরম দুধ, পাশে একটি পুরোনো সংবাদপত্র। লিসি এগিয়ে গিয়ে মৃদু হেসে বলল—
“দাদু, এত ভোরে উঠেছেন? শরীর খারাপ তো না?”
দাদু চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন—
“শরীর খারাপ না রে, বয়স হয়েছে তো। তোর নাচের অনুশীলন শেষ হলো?”
লিসি নরম গলায় উত্তর দিল—
“হ্যাঁ দাদু, চিন্তা করো না। প্র্যাকটিস একদম ঠিকমতো করছি। আগামী মাসে অনুষ্ঠানে কোনো ত্রুটি হবে না।”
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা ছিল, কিন্তু অন্তরে এক ফোঁটা অস্থিরতা।
দাদু স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন—
“তুই থাকলে বাড়িটা যেন বাঁচে রে, সকালে নাস্তা শেষ করে তারপর বাড়ি থেকে বের হবি ।”
লিসি মৃদু হাসল, কিন্তু চোখের কোণে অদৃশ্য আর্দ্রতা জমল। খাওয়ার আগে সে ছাদে উঠল। রেশমপুরের সকাল মানেই নীল আকাশ, দূরে নদীর ঢেউ, আর বাতাসে কচি ধানের গন্ধ ছাদের পাড় ঘেঁষে একটি গাছ—
তাতে নতুন ফুটেছে গোলাপী আর বেগুনির মিশ্রিত রঙের ‘ জারুল ’।
ফুলগুলো ছোট ছোট, অথচ অপরূপ। যেন লজ্জায় রাঙা কিশোরীর গাল। লিসি স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।
একটা ফুল ছুঁয়ে বলল খুব আস্তে—
“এক মাস হয়ে গেল…”
কতবার যে সে ফোনের স্ক্রিন জ্বালিয়ে দেখেছে কোনো বার্তা নেই। নিজে পাঠিয়েছে উত্তর আসেনি। আঙুলের ডগা দিয়ে ফোনটা ছুঁয়ে আবার নামিয়ে রাখে সে।
অভিমান যেন শিশিরবিন্দুর মতো বুকের মধ্যে জমে আছে। সে ধীরে ফিসফিস করে—
“ব্যস্ত থাকলে কি একটুখানি খবর দেওয়া যায় না?”
তার কণ্ঠে অভিযোগ নেই, আছে নিঃশব্দ কষ্ট।
নিচে নেমে এল সে। মাটির চুলায় ভাপ ওঠা সেদ্ধ ভাত, সিম ভাজি, আলু-ডালনার সঙ্গে গরম ডাল।
পাশে কাঁচা লঙ্কা আর লবণ। তার ছোটবেলার সঙ্গিনী, পাশের বাড়ির মেয়ে মাধবী, এসে বসেছে। মাধবী হাসতে হাসতে বলল—
“শুনেছিস? এইবার মাঠে শীতের সবজি লাগাবে সবাই। ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো—সব রেডি।”
লিসি মৃদু হেসে বলল—
“চল না খাওয়ার পর দেখে আসি।”
দু’জনে পাশাপাশি বসে ভাত খেল।
মাধবীর হাসি সরল, আর লিসির হাসি আজ একটু থমথমে খাওয়া শেষে তারা বেরিয়ে পড়ল। কাঁচা পথ ধরে হাঁটছে দু’জন। পায়ের নিচে শুকনো পাতা মচমচ শব্দ করছে। দূরে গরুর গাড়ি যাচ্ছে, কারও উঠোনে ধোঁয়া উঠছে। মাঠে গিয়ে দেখে জমি চাষ হয়েছে, কচি চারা বসানোর প্রস্তুতি চলছে। কৃষকেরা ব্যস্ত, কেউ মাটি কোপাচ্ছে, কেউ সার ছড়াচ্ছে। লিসি নিচু হয়ে মুঠোভর্তি মাটি তুলে নিল। মাটির গন্ধ শুঁকে বলল—
“এই গন্ধটা আমার খুব প্রিয়।”
মাধবী হেসে বলল—
“তুই শহরে থাকিস, তবু গ্রামের টান যায় না?”
লিসি চুপ করে রইল। তার চোখ তখন আকাশের দিকে।
আকাশ নীল, একেবারে নির্মল। ঠিক তেমনই নির্মল ছিল তার বিশ্বাস। কিন্তু আজ মনে হলো কোথাও যেন একটুখানি মেঘ জমেছে। তবু সে নিজেকে সামলে নিল।
মাধবীর হাত ধরে বলল—
“দেখিস, শীত এলে এই মাঠ সবুজে ভরে যাবে। জীবনও হয়তো এমনই—অপেক্ষার পরেই রঙ ফিরে আসে।”
তার কণ্ঠে ছিল মৃদু দৃঢ়তা, চোখে অদেখা প্রত্যাশা।
রেশমপুরের বাতাসে তখন কচি সবজির স্বপ্ন ভাসছে—
আর এক কিশোরী হৃদয়ে জমে আছে এক মাসের অব্যক্ত অভিমান।
অন্য দিকে রায় চৌধুরী বাড়ি....
সকালটা আজ অদ্ভুত প্রশান্ত। আকাশে হালকা মেঘের ভেলা, রোদের কোমল পরশ বাড়ির দেওয়ার জুড়ে ছড়িয়ে আছে। বাগানের গন্ধরাজ আর রজনীগন্ধার মিশ্র সুবাস বাতাসে এক স্বস্তির আবরণ বুনেছে। ডাইনিং হলে সকালের নাশতার আয়োজন— গরম পরোটা, নেহারী, সেমাই, আর চায়ের ধোঁয়া। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো আরোবি। চুল খোলা, হালকা নীল সালোয়ার কামিজ, ঠোঁটে দুষ্টু হাসি। নিচে নামতেই বলল—
— “আম্মু, কাল রাতে কথা বলেছিলাম ওর সাথে।”
সুপ্রিয়া চমকে তাকালেন—
— “কার সঙ্গে?”
আরোবি হেসে চেয়ারে বসে বলল—
— “আরে লিসির সঙ্গে ”
টেবিলে এক মুহূর্তের নীরবতা। কাবিন ভুরু কুঁচকে বলল
— “আমাদের তো ফোন দেয় না, তোকে দিল?”
আরোবি কাঁধ ঝাঁকাল—
— “আমি দিয়েছি। ধরেছে।”
রিহান মৃদু হেসে বলল—
— “লিসিদের ওখানে সবসময় ফোন দিলে যায় না, নেটওয়ার্কের সমস্যা ।”
কথার মাঝেই বাইরে গাড়ির শব্দ। গেট খুলতেই এক পরিচিত কণ্ঠ—
— “ওই রে! কেউ নেই নাকি?”
তিশার আব্বু এসে গেছেন। সঙ্গে ইয়াবি, লিজা, আর তাদের আম্মুও কাবেনা।
আজ ভাইয়ের বাড়িতে বোন এসেছে। হলরুমে যেন মুহূর্তে উৎসবের রঙে ভরে উঠল।
তিশা দৌড়ে এসে সুপ্রিয়াকে জড়িয়ে ধরল—
— “মামি! কতদিন পর!”
ইয়াবি আর লিজা রিহান-কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলল— “আজ কিন্তু আমাদের ছুটির দিন, কেউ পালাতে পারবে না।”
হাসি, কোলাহল, খুনসুটি বাড়ি যেন প্রাণ ফিরে পেল। কাজিনরা একসাথে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পরে, ওই দিকে আবার নুসরাত সকালে নাস্তা বানিয়ে টেবিলে এইমাত্র সাজিয়ে শেষ করলো, সুরভী, জারা, আরোবি, লিজা, ইয়াবি, কাবিন আর রিহান তিশাদের নিয়ে গার্ডেনের দিকে চলে গেল।
জারার পাশে দাঁড়িয়ে ইয়াবি বলল—
— “এই প্রমোশন পাওয়ার পর তো কাবিন ভাই বড় অফিসার!”
রিহান হেসে বলল—
— “হ্যাঁ, এখন বিয়ের দাবিও বাড়বে।”
কাবিন ভান করে গম্ভীর মুখে বলল—
— “আমি এখনো স্বাধীন নাগরিক।”
তিশা চোখ পাকিয়ে বলল—
— “স্বাধীনতা বেশিদিন থাকে না।”
আরোবি —“ আহা রে ভাইয়াটার স্বাধীনতা কেড়ে নিলো ”
কাবির —“ অন্য লোক নিয়ে রক্ত দিয়ে হলেও ভিতর নিয়ে আসতাম, কিন্তু এই তো হবু বউ নিয়েছে! ”
সবাই হেসে উঠল। গার্ডেনর দিকে কাজিনরা তাদের মধ্যে কথা বলতে থাকে।
ড্রয়িংরুমে বড়রা বসেছেন। চায়ের কাপ হাতে গল্প জমে উঠেছে। তিশার আব্বু গলা পরিষ্কার করে বললেন—
— “কাবিন তো এখন প্রমোশন পেয়েছে। দায়িত্বও বেড়েছে। আমার মনে হয় বিয়েটা এবার দিয়ে দেওয়া উচিত।”
সুপ্রিয়া মৃদু হাসলেন—
— “আমরাও তাই ভাবছি। ছেলেপেলে বড় হয়ে যাচ্ছে।”
কাবেনা লাজুক স্বরে বললেন—
— “আমাদের আপত্তি তো নেই।”
কথার ভেতরে এক মৃদু ইঙ্গিত— কাবিন আর তিশার বিয়ে নিয়ে আলাপ যেন অদৃশ্য সেতু বুনছে। আনোয়ার সাহেব গভীর কণ্ঠে বললেন—
— “সময় হলে সবই হবে। তবে আগে একটা কথা—”
ঘরে হালকা থমথমে ভাব।
— “বড় ছেলেটার খোঁজ কেউ নিয়েছো?”
সুপ্রিয়ার চোখ নিচু হলো।
— “রাগ করে আছে বোধহয়। ফোন করে না।”
তিশার আব্বু বললেন—
— “রাগ থাকতেই পারে, কিন্তু সে তো বড় ছেলে। সংসারের স্তম্ভ। একবার হলেও ফোন করা উচিত।”
আনোয়ার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন—
— “আমি চাই না ও দূরে থাকুক। যেখানেই থাকুক, অন্তত খবর দিক।”
সুপ্রিয়া আস্তে বলল—
— “ ওগো তুমি একবার ছেলেটার কাছে ফোন দিও, দেখবে ধরবে ”
প্রিয়া ধীরে মাথা নাড়লেন—
— “হ্যাঁ, আপনি দিলে হয়তো ধরবে।”
ঘরের ভেতরে এক নিঃশব্দ ভার নেমে এলো। সবাই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিরিসের অনুপস্থিতি যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা। বাইরে বাগানে হাসির শব্দ ভেসে আসছে কিন্তু ভেতরের বাতাসে চাপা উদ্বেগ।বড় ছেলে বাড়ির গর্ব, বাড়ির ভরসা সে কোথায়?
তার রাগ কি এখনো অটল? নাকি দূরত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো কারণ? রায় চৌধুরী বাড়ির শান্ত সকালটা হঠাৎ করেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রইল।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মির্জা বেগম বলে উঠলেন —“ কাবেনা এসেছিস যখন আজকে থেকে যায়, জামাই বাবা আসো সকালে নাস্তা করি নেই ”
বড়রা সবাই খাবার টেবিলের দিকে পা বাড়ায়। নুসরাত ইতিমধ্যে সবগুছিয়ে রেখেছে, সুপ্রিয়া এসে সবাইর জন্য খাবার বাড়তে থাকে প্রিয়া পরিবেশনের জন্য আছে, আর নুসরাত গার্ডেনের দিকে গেছে সব-কয়টা কাজিনদের ডাকতে, সবাই একে একে এসে সকালে নাস্তা শেষ করলো। সকালের খাবার শেষে সবাই নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে গেলো।
গ্রামের বিকেল....
বিকেলের নরম রোদ ধীরে ধীরে রেশমপুর গ্রামের উপর নেমে এসেছে।
আকাশে সোনালি আলো, দূরে তালগাছের মাথায় হালকা বাতাস দোল খাচ্ছে।
গ্রামের সেই চিরচেনা শান্ত পরিবেশ—যেন সময় এখানে একটু ধীর গতিতে চলে।
খান বাড়ি—পুরোনো জমিদার বাড়ি, এখনো তার আভিজাত্য ধরে রেখেছে।
বাড়ির বিশাল উঠোনে আজ অনেক কাজ চলছে।
মাটির উপর বড় বড় চালুনিতে শুকনো লাল মরিচ রোদে দেওয়া হয়েছে।
কোথাও মুড়ি ভাজার জন্য চাল শুকোচ্ছে, কোথাও শুঁটকি, কোথাও আবার বড়ি।
রোদে শুকোতে থাকা লাল মরিচগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে যেন উঠোন জুড়ে লাল কার্পেট বিছানো।
বাড়ির মেয়েরা যে যার কাজে ব্যস্ত।
কেউ কাঁসার থালা মুছছে,
কেউ চাল কুটছে,
কেউ আবার উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে।
এইসবের মাঝেই বারান্দায় বসে আছেন আকবর খান—
রেশমপুরের সম্মানিত জমিদার বংশের কর্তা।
তার সামনে কাঠের টেবিলে কয়েকটা পুরোনো নথি আর জমির কাগজ ছড়ানো।পাশে গ্রামের দুইজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
আকবর খান গভীর মনোযোগ দিয়ে কাগজ দেখছেন।
— “এই জমিটার মাপ ঠিক করে নিও। ভুল যেন না হয়।”
গ্রামের লোক মাথা নত করে বলল—
— “জি, খান সাহেব।”
তিনি আবার বললেন—
— “আর কালকে সকালেই লোক পাঠাবো। কাজটা শেষ করতে হবে।”
তার কণ্ঠে এখনো সেই জমিদারি কর্তৃত্ব।
বিকেলের রোদ তখন নরম হয়ে এসেছে।
আকাশে হালকা সোনালি আভা, বাতাসে কচি পাতার মৃদু দোল। খান বাড়ির পিছনের বাগানটা যেন এক টুকরো স্বর্গ। এই বাগানটা পুরোটা লিসির নিজের হাতে সাজানো।
গোলাপ, জারুল, নয়নতারা, শিউলি—ছোট ছোট ফুলে ভরে আছে চারপাশ। বাতাসে মিশে আছে ফুলের মিষ্টি সুবাস।লিসি ধীরে ধীরে গাছগুলোর মাঝখান দিয়ে হাঁটছিল। আজ তার পরনে হালকা আকাশি রঙের শাড়ি।
দীর্ঘ কৃষ্ণ কেশ কোমর ছাড়িয়ে নেমে এসেছে হাটু ছুঁয়ে যাচ্ছে —বাতাসে আলতো দুলছে। ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল একটা সাদা কবুতরের দিকে।
বাগানের মাঝখানে ছোট একটা পাথরের সিমের ওপর বসে আছে পাখিটা। মাথাটা কৌতূহলী ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক ঘুরাচ্ছে। লিসি মৃদু হেসে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। তার পায়ের শব্দ এতটাই নরম—
কবুতরটা টেরই পেল না। হঠাৎ লিসি আলতো করে হাত বাড়িয়ে পাখিটাকে তুলে নিল। সাদা নরম পালকে ঢাকা ছোট্ট শরীরটা তার দুই হাতের মাঝে শান্ত হয়ে বসে রইল।
লিসি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল পাখিটার দিকে।
তারপর অজান্তেই ঠোঁটে ভেসে উঠল এক মৃদু সুর—
সে খুব আস্তে গুনগুন করে গাইতে লাগল—
★“সোনার ও পালকের খাঁচে,
লিখে রেখেছিলেম দ্বারে,
যাও পাখি বলো তারে,
সে যেন ভোলে না মোরে,
সুখে থেকো ভালো থেকো…”★
বাতাস যেন থেমে শুনছে সেই সুর।
তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা— মনে হচ্ছিল এই সুরে লুকিয়ে আছে না বলা অনেক কথা। লাইনটা শেষ করে লিসি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে দুই হাত খুলে দিল। কবুতরটা ডানা মেলে আকাশের দিকে উড়ে গেল।লিসি তাকিয়ে রইল সেই উড়ে যাওয়া সাদা ছায়ার দিকে।তার চোখে হালকা এক অচেনা অনুভূতি।
সে আস্তে ফিসফিস করে বলল—
— ★“ যাও পাখি বলো তারে,
সে যেন ভোলে না মোরে,
সুখে থেকো ভালো থেকো…
মনে রেখো এ আমারে....... ”★
বাতাসে তার কথাগুলো মিলিয়ে গেল। দূরে সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। আর বাগানের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পরীর মতো মেয়েটার চোখে তখন এক টুকরো নীরব অপেক্ষা।
বাগানের নিস্তব্ধ বিকেলটা তখন গোধূলির দিকে ঢলে পড়ছে। লিসির হাত থেকে ছাড়া পাওয়া সাদা কবুতরটা ডানা মেলে ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উড়ে গেল।
লিসি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ সেই উড়ে যাওয়া পাখিটার দিকেই নিবদ্ধ। পাখিটা ছোট হতে হতে আকাশের নীলের মধ্যে প্রায় মিলিয়ে যাচ্ছে—
তবু লিসির দৃষ্টি সেখানেই আটকে আছে। তার লম্বা কেশরাশি বাতাসে দুলছে, শাড়ির আঁচলটা আলতো করে উড়ছে। সে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল—
— “যাও পাখি… বলো তারে…
সে যেন ভোলে না মোরে… কখনো যেন না ভুলে, তার কাছে আমার এই মিনতি টা পৌঁছে দিও ”
তার কণ্ঠে ছিল মৃদু অভিমান, আবার অদ্ভুত কোমলতাও।
কবুতরটা আরও দূরে চলে গেল।
লিসি তখনো তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।
মনে হচ্ছে যেন সে শুধু একটা পাখিকে উড়ে যেতে দেখছে না—
বরং দূরে কোথাও থাকা কারও কাছে নিজের মনের খবর পাঠিয়ে দিল।
তার চোখে তখন নীরব এক অপেক্ষা।
যে অপেক্ষার নাম— কিরিস।
.........🇫🇷 ফ্রান্স........
রাতের প্যারিস।
আকাশের নিচে আলোয় ভাসছে শহরটা—আইফেল টাওয়ার দূরে দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় ভঙ্গিতে। কিন্তু শহরের ঝলমলে সৌন্দর্যের আড়ালে আজ আরেকটা খবর ছড়িয়ে পড়েছে নীরবে। ফ্রান্সের আন্ডারওয়ার্ল্ডে সিংহাসন বদলে গেছে। পুরোনো মাফিয়া কিং জ্যাসপার—
তার চেয়ার আর তার ক্ষমতা এখন আর তার হাতে নেই।
আজ সেই চেয়ারে বসে আছে এক নতুন নাম।
কিরিস বা UK।
অন্ধকারাচ্ছন্ন এক বিশাল হলরুম। চারপাশে কালো মার্বেলের দেয়াল, মাঝখানে লম্বা টেবিল। টেবিলের শীর্ষে একটা বিশাল কালো চেয়ার। সেটাই ছিল জ্যাসপারের সিংহাসন। আজ সেখানে বসে আছে কিরিস।
কালো স্যুট, পরিষ্কার শেভ করা মুখ, ঠোঁটে এক অদ্ভুত কঠিন শান্তি। তার ধোঁয়াটে চোখ দুটো যেন পুরো ঘরটা পড়ে ফেলছে। চারপাশে ইউরোপের বড় বড় আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনরা বসে আছে কেউ কথা বলছে না।
কারণ সবাই জানে মাত্র এক মাসে যে লোকটা পুরো ফ্রান্সের মাফিয়া সাম্রাজ্য নিজের হাতে নিয়েছে,
তার সঙ্গে খেলতে যাওয়া মানে মৃত্যু ডেকে আনা।
কিরিস ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার কণ্ঠ ঠান্ডা, কিন্তু শীতল ধারালো—
— “মিটিং শেষ।”
একটা শব্দও আর বাড়তি বলল না। সবাই বুঝে গেছে—
নতুন রাজা এসেছে। কিরিস সোজা নিজের রুমের দিকে যায়। ফ্লোর-টু-সিলিং কাচের জানালা দিয়ে পুরো প্যারিস দেখা যায়। শহরের আলো নিচে ছড়িয়ে আছে। কিরিস জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল।
ঠিক তখন দরজায় নক।
— “Come in.”
ভেতরে ঢুকল মার্ক।
তার বিশ্বস্ত সহযোগী—সহকারীই নয়, ব্যবসার পার্টনার, আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডান হাত।
মার্ক মাথা নত করে বলল—
— “Boss, preparations are ready.”
কিরিস ধীরে ঘুরে তাকাল।
— “For home?”
— “Yes, Boss. Private jet is prepared.”
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল। তার চোখে যেন দূরের কোনো স্মৃতি ভেসে উঠল। তারপর ঠান্ডা স্বরে বলল—
— “আমি যেগুলো গোছাতে বলেছিলাম… সেগুলো গুছিয়েছো?”
মার্ক সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— “Don’t worry, Boss. আপনার প্রত্যেকটা কাজ সফল হয়েছে।”
সে ফাইল খুলে দেখাতে লাগল।
— “ঠিক যেমনটা আপনি চেয়েছিলেন—
লেহেঙ্গা, গয়না, প্রত্যেকটা জিনিস আপনার পছন্দমতো বানানো হয়েছে। ডেলিভারি হয়ে গেছে।”
একটু থেমে আবার বলল—
— “সবকিছু আমি নিজে প্যাকেজ করিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি।”
কিরিসের চোখে অদ্ভুত ঝলক দেখা দিল। কিন্তু সে কিছু বলল না। আরেকটা খবর,মার্ক আবার বলল—
— “Boss, আর একটা বিষয় আছে।”
কিরিস ভ্রু তুলল।
— “বল।”
— “আজ রাতে একটা এক্সিবিশন হচ্ছে। খুব রেয়ার জিনিসের নিলাম হবে—পুরোনো অস্ত্র, ঐতিহাসিক সংগ্রহ, অনেক বিরল জিনিস।”
মার্ক একটু হেসে বলল—
— “আপনি চাইলে যেতে পারেন।”
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলল—
— “Hmm…”
সে টেবিল থেকে কোট তুলে নিল।
— “তাহলে আমরা এক্সিবিশন হল থেকে ডাইরেক্ট এয়ারপোর্টে যাব।”
মার্ক মাথা নত করল।
— “Yes, Boss.”
মার্ক বেরিয়ে যাওয়ার পর কিরিস আবার জানালার সামনে দাঁড়াল। প্যারিসের আলো ঝিলমিল করছে।
কিন্তু তার চোখে এক অদ্ভুত চিন্তা। পুরোনো মাফিয়া কিং—জ্যাসপার সে এত সহজে হার মানার লোক নয়।
কিরিস সিগারেটের শেষ টান দিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— “Let’s see… old lion… তুমি এখন কী করো।”
বাইরে হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বইল।
মনে হলো ফ্রান্সের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ঝড় এখনো শেষ হয়নি। বরং আসল যুদ্ধ এখন শুরু হবে।
রায় চৌধুরী বাড়ির রাতটা আজ অদ্ভুত উজ্জ্বল।
বড় ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছে—কারো হাতে চা, কারো হাতে নাশতা। বাড়িতে আজ অতিথি, হাসি-আড্ডায় পরিবেশ যেন একেবারে উৎসবমুখর।
বাইরে গার্ডেনের মৃদু আলোর নিচে টেবিলে বসে থেকে গল্প করার পর কাবিন, রিহান, ইয়াবি, লিজা,আরোবি, সুরভী, জারা নুসরাত,তিশা হেসে খেলে ভেতরে ঢুকছে।
ঠিক তখনই আনোয়ার সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
— “কাবির, একটু এখানে আয়।”
ঘরে এক মুহূর্তের নীরবতা। কাবির অবাক হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।
— “জি, আব্বু?”
আনোয়ার সাহেব ধীরে চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন।
তারপর শান্ত গলায় বললেন—
— “তোর সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
সবার দৃষ্টি এখন তাদের দিকে। তিনি আবার বললেন—
— “তুই তো এখন প্রমোশন পেয়েছিস। চাকরিতে স্থির হয়েছিস। আমার মনে হয়… এবার তোর বিয়ের কথাটা ভেবে দেখা উচিত।”
ঘরে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। তিশা মাথা নিচু করে বসে আছে। তার গাল হালকা লাল হয়ে গেছে।
সুপ্রিয়া মৃদু হেসে বললেন—
— “আমরাও তো তাই ভাবছি। ছেলেপেলে বড় হয়ে গেছে।”
তিশার আব্বুও মাথা নাড়লেন—
— “আমাদেরও কোনো আপত্তি নেই।”
কাবির একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল—
— “এই মানে সবার সামনে এভাবে কথাটা না বললেও তো হতো, জানো তো যে আমি বিয়েতে রাজি ?”
এই কথা শুনে কাজিনদের হাসি শুরু। রিহান হাত ভাঁজ করে নাটকীয় গলায় বলল—
— “ওহ! আমাদের স্বাধীন ভাইয়ের স্বাধীনতা শেষ হতে চলেছে!”
ইয়াবি হেসে বলল—
— “বিয়ের আগে মানুষ খুব সাহসী থাকে, বিয়ের পর দেখবেন—‘জি জান, ঠিক আছে জান’।”
লিজা মুখ চেপে হাসতে হাসতে বলল—
— “কাবির ভাই, এখন থেকেই অনুশীলন শুরু করেন।”
কাবির ভুরু কুঁচকে বলল—
— “কি অনুশীলন, সব প্যাকটিস করা আছে এখন আমি পুরো প্রো হয়ে গেছি ?”
রিহান সঙ্গে সঙ্গে বলল—
— “ তা না হয় সব করেছিস, কিন্তু বউয়ের সামনে মাথা নত করার অনুশীলন এটা তো করিস নি !”
ঘরে একসঙ্গে হাসির রোল উঠল। কাবির বিরক্ত মুখে বলল—
— “তোদের বিয়ে হলে বুঝবি।”
ইয়াবি সঙ্গে সঙ্গে বলল—
— “আমাদের বিয়ে হলে অন্তত আগেই অভিজ্ঞতা থাকবে, আপনি তো পরীক্ষামূলক কেস!”
আবার হাসি। তিশা মাথা নিচু করে বসে আছে, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে হাসি লুকানো যাচ্ছে না। এই হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই হঠাৎ—
ট্রিং… ট্রিং… ট্রিং…
ড্রয়িংরুমের কোণায় রাখা পুরোনো ল্যান্ডলাইন ফোনটা বেজে উঠল।সবাই একটু থেমে গেল। সুপ্রিয়া উঠে ফোনের কাছে গেলেন। রিসিভার তুলে বললেন—
— “হ্যালো, রায় চৌধুরী হাউস।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ভেসে এলো এক গভীর, ঠান্ডা কণ্ঠ—
— “মা…”
শব্দটা শুনতেই সুপ্রিয়ার হাত কেঁপে উঠল। তার চোখ বড় হয়ে গেল।
— “কিরিস?”
ঘরের সবাই এক মুহূর্তে চুপ। এক মাস পরে—
কিরিসের ফোন। সুপ্রিয়ার গলায় কাঁপন—
— “কিরিস! কেমন আছো বাবা?”
ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠ—
— “ভালো আছি।”
ড্রয়িংরুমে বসা সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে প্রায়। আনোয়ার সাহেব ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন।
রিহান ফিসফিস করে বলল—
— “সত্যি… ভাইয়া?”
সুপ্রিয়া ফোন শক্ত করে ধরে বললেন—
— “এক মাস হয়ে গেল, কোনো খবর দাও না কেন?”
কিরিসের কণ্ঠ খুব স্থির—
— “ব্যস্ত ছিলাম।”
তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সে বলল—
— “আব্বু আছেন?”
আনোয়ার সাহেব এগিয়ে এসে ফোন নিলেন। ঘরে এমন নীরবতা যেন কেউ শ্বাসও নিচ্ছে না।
তিনি ধীরে বললেন—
— “কিরিস।”
ওপাশ থেকে উত্তর—
— “জি, আব্বু।”
এই এক শব্দেই যেন ঘরের ভারী বাতাস নড়ে উঠল।
এক মাস পর। রায় চৌধুরী বাড়িতে আবার শোনা গেল বড় ছেলের কণ্ঠ আর সবাই দাঁড়িয়ে আছে চোখে বিস্ময়, স্বস্তি, আর অদ্ভুত এক অপেক্ষা।সবার দৃষ্টি আনোয়ার সাহেবের হাতে ধরা ল্যান্ডলাইন ফোনের দিকে।
এক মাস পর বড় ছেলে কিরিসের কণ্ঠ আবার এই বাড়িতে শোনা যাচ্ছে। আনোয়ার সাহেব শান্ত গলায় বললেন—
— “কিরিস, কেমন আছিস?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সেই পরিচিত, ঠান্ডা অথচ দৃঢ় কণ্ঠ—
— “ভালো আছি, আব্বু।”
ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই যেন নিঃশ্বাস আটকে শুনছে।
সুপ্রিয়া আর থাকতে না পেরে কাছে এসে দাঁড়ালেন।
আনোয়ার সাহেব আবার বললেন—
— “এক মাস হয়ে গেল। বাড়ির কথা একবারও মনে পড়ল না?”
ওপাশে খুব শান্ত উত্তর—
— “পড়েছে। তাই তো ফোন করেছি।”
এই কথা শুনে সুপ্রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
কিরিস আবার বলল—
— “আমি বাড়ি আসছি।”
এই কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো পড়ল। ঘরের সবাই একসাথে তাকিয়ে রইল। রিহান অবাক হয়ে ফিসফিস করল—
— “ভাইয়া বাড়ি আসছে…?”
তিশা, ইয়াবি, লিজারা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।
সুপ্রিয়া উত্তেজিত গলায় বললেন—
— “সত্যি বলছো বাবা? কবে আসছো?”
কিরিসের গলা আগের মতোই ঠান্ডা—
— “কাল সকাল।”
এক মুহূর্তের জন্য ঘরে যেন আনন্দের ঢেউ উঠল।
কিন্তু ঠিক তখনই কিরিস আবার বলল—
— “তবে একটা শর্ত আছে।”
সবাই থমকে গেল।
আনোয়ার সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন—
— “কিসের শর্ত?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর কিরিস ধীরে ধীরে বলল—
— “আমি একটা জিনিস চাই।”
ঘরের সবাই নিঃশব্দ।
— “আর সেটা যেকোনো মূল্যে আমাকে দিতে হবে।”
এই কথা শুনে সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
সুপ্রিয়া আর দেরি করলেন না। মায়ের স্নেহে ভরা কণ্ঠে তিনি বললেন—
— “দেরি করবো কেন বাবা? তুই যা চাইবি, তোকে তাই দেওয়া হবে।”
তার চোখে তখন শুধু সন্তানের জন্য আকুলতা।
— “এক মাস পর বাড়ি ফিরছিস… তোর যা ইচ্ছে হবে তাই হবে।”
আনোয়ার সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি কিছু বললেন না। শুধু গভীর দৃষ্টিতে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল—
— “ঠিক আছে।”
আরও এক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর তার ঠান্ডা, দৃঢ় কণ্ঠ আবার শোনা গেল—
— “তাহলে কাল সকালে দেখা হচ্ছে।”
লাইনটা কেটে গেল।
টুট… টুট… টুট…
সুপ্রিয়া ধীরে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন। ঘরে তখন অদ্ভুত নীরবতা। সবাই খুশি কারণ কিরিস বাড়ি ফিরছে।
কিন্তু তার সেই কথাটা—
“আমি একটা জিনিস চাই… যেকোনো মূল্যে।”
এই শব্দগুলো যেন ঘরের বাতাসে ভেসে রইল।
রিহান ধীরে বলল—
— “ভাইয়া আবার কি চাইবে?”
কেউ উত্তর দিল না। শুধু আনোয়ার সাহেব চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার অভিজ্ঞ মন বলছে কিরিস যখন কিছু চায়… সেটা সাধারণ কিছু হয় না। মির্জা বেগম হালকা নড়ে বসে বললেন —“ তাহলে কাবির আর তিশার বিয়েটা দ্রুত দেয়া হোক, বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা যাক ”
তিশার আব্বু —“ ঠিক আছে, আমাদের কোনো সমস্যা নেই, দিন ঠিক হলে আমরা সবাইকে জানিয়ে দেবো ”
আনোয়ার —“ তাহলে আজকে তো বৃহস্পতিবার সামনের মঙ্গলবার বিয়ের দিনটা ঠিক করলে কেমন হয়, আমাদের তো সব কিছুই গোছানো আছে শুধু ঠিক সময়ের অপেক্ষা বসে ছিলাম আমরা ”
আনারুল —“ তাহলে আর কি, সব যখন ঠিক আছে তাহলে মিষ্টি খাওয়ানো হোক ”
সুপ্রিয়া—“ কাবির কোনো কথা আছে কি? ”
কাবির —“ একদম না, এই দিনটার জন্য তো তিশা যে হোস্টেলে ছিলো তার দেওয়াল টপকে ওর কাছে গিয়েছিলাম ”
সবাই কাবিরের কথায় হেসে উঠলো,। বাড়িতে আবার বিয়ের সানাই বাজতে চলেছে। কাজিনরা সবাই তিশা আর কাবিরকে নিয়ে মজার কথা বলছে হাসছে, বড়রা তো আর হাসলে হবে না তারা সবকিছু ঠিক করে নিচ্ছে কোথা থেকে কিভাবে সবকিছু শুরু করবে। তিশারা সবাই বাড়ি চলে যাবে সকালে, ইয়াবি তিশার বড় ভাই হওয়ার দায়িত্ব পড়ে গেছে গাধে। ইয়াবি উঠে গিয়ে বাবাদের মাঝে বসলো, সবকিছু নিয়ে একটা হালকা আলোচনা করলো আর কালকে কিরিস আসলে রাতে ওর সাথে একবার কথা বললেই হয়ে যাবে, কিরিসের হাতে একবার বাড়ির সবাই কাজ গুছিয়ে দিতে পারলে কারোর আর কোনো সমস্যা থাকে না । ইয়াবি কথা বলার মাঝে কিরিসকে বলে দেয়েছে কাবিরের বিয়ে ফাইলাল হওয়ার কথা। বাড়িটা আজ যেন এক অন্যরকম প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পুরো বাড়ি আলো, হাসি আর কথাবার্তায় ভরে গেছে।
কারণ একটা বড় খবর এসেছে— কাবিরের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বাড়ির ড্রয়িংরুমে বড়রা সবাই বসে আছে।
মাঝখানে গোল টেবিল, তার উপর চা, নাশতা, ফল—সব সাজানো। আনোয়ার রায় চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন—
—"দেখো, যেহেতু বিয়েটা সামনের মঙ্গলবার… তাই কাল থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। সময় খুব বেশি নেই।"
সুপ্রিয়া হালকা হাসলেন।
—"সময় কম হলেও সমস্যা নেই। আমাদের বাড়ির বিয়ে… ধুমধাম না হলে চলে?"
প্রিয়া তখন পাশে বসে তালিকা লিখছে।
—"গেস্ট লিস্ট, ডেকোরেশন, কেটারিং… সব ঠিক করতে হবে।"