তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :57

রাত প্রায় বারোটা।
হলরুমে শুধু টিভির আলো কিরিস সোফার একপাশে বসে আছে। ফোনটা হাতে—কিন্তু স্ক্রিনে কিছু দেখছে না।
ঠিক তখনই আনোয়ার আবার বলে ওঠে—
—“আর কতদিন এভাবে থাকবি? একটা সিদ্ধান্ত তো নিতেই হবে।”
এইবার কিরিসের চোখের পাতা একটু নড়ে।
—“এক সপ্তাহ হলো। একই কথা।”
আনোয়ার থামে না— —“আমি তোর ভালোই চাইছি।”
কিরিস ধীরে উঠে দাঁড়ায় কণ্ঠে রাগ আছে, কিন্তু সেটা চিৎকারের না বরং ঠান্ডা, ভয়ংকর।
—“ভালো চাইলে একই কথা বারবার বলা লাগে না।”
আনোয়ার বিরক্ত নিয়ে বলে
—“তুই কেন বুঝতে চাস না!”
এই কথাটাতেই কিরিসের ভেতরের কিছু একটা ভেঙে যায় সে আর কিছু বলে না। এক সেকেন্ড চুপ করে থাকে।
তারপর শুধু বলে—
—“ঠিক আছে, থাকবো না তোমার বাড়িতে আমি, চলে যাবো কালকে ”
আনোয়ার ও ছেলের কথায় তাল মিলিয়ে বলে —“ হ্যাঁ চলে যাস, ”
কিরিস —“ ঠিক আছে! ”
এই “ঠিক আছে” মেনে নেওয়া না।
বরং… একটা সিদ্ধান্ত। কিরিসের ভিতরের ভাবনা
সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে।
ঘরটা অদ্ভুত শান্ত এই ঘরে সে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আজও নিচ্ছে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ভাবে—
“একই কথা, একই চাপ, একই দেয়াল আমি যদি এখানেই থাকি এই কথাগুলো থামবে না।”
হাতে ঘড়ির দিকে যায়। ফোনটা তুলে নেয় মনে মনে সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে যায় এখানে না। এখন না। আমি কিছুদিনের জন্য সরে যাবো। কেউ না জানলেও চলবে।
রাত গভীর কিরিস ল্যাপটপে কাজ করছে। সবকিছু ভালো করে হিসাব করে নিচ্ছে। এমন সময় মার্কের নাম স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই কিরিস কলটা ধরে।
কিরিস নিচু স্বরে—“মার্ক, জেট রেডি করো।”
ওপাশে এক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর শান্ত উত্তর —“সময়?”
—“ভোর। খুব ভোরে।”
কিরিস আর কিছু বলে না। কল কেটে যায়।
ঘড়ির দিকে তাকায়—
৩:০০ AM।
বাড়িটা গভীর ঘুমে ডুবে আছে। করিডোরে আলো নিভু নিভু। কিরিস ফোনটা আবার হাতে নেয়। এইবার নামটা— আরোবি।
অন্য আরোবির ঘরে লিসি আর সে ঘুমিয়ে আছে, গভীর ঘুমের মধ্যে ফোন বেজে ওঠে। আরোবি বিরক্ত গলায়—“এই কে…?”
কিরিসের কণ্ঠ খুব শান্ত —“আমি।”
আরোবি একদম সোজা হয়ে বসে—“ভাই?”
—“আমি ঘর থেকে বের হচ্ছি।”
আরোবি হকচকিয়ে —“এখন? এই সময়ে?”
কিরিস —“হ্যাঁ। আমি লিসির কাছে যাচ্ছি, তুই সুরভীর কাছে যা।”
আরোবি কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর ধীরে
—“ঠিক আছে… আমি দরজা খুলে যাচ্ছি। তুই এসে নক করিস। এই কিছু হয়েছে নাকি! ”
কিরিস শুধু বলে —“না, তুই যা আর ধন্যবাদ।”
কল কেটে যায়। আরোবি তখনো পুরোটা বুঝে ওঠেনি। কিন্তু সে জানে— এটা প্রশ্ন করার সময় না। সে নিঃশব্দে উঠে সুরভীর রুমের দিকে চলে যায়।
কিরিস ধীরে দরজা খুলে বের হয়। একদম শব্দহীন।
করিডোর পার হওয়া— সব কিছু যেন শ্বাস আটকে করে।
আরোবি আগেই দরজা খুলে রেখেছে। এক মুহূর্ত চোখাচোখি।আরোবি ফিসফিস করে—“ভাই… সব ঠিক তো?”
কিরিস এক সেকেন্ড থামে। তারপর শুধু বলে —“হুম সব ঠিক আছে, তুই যা, আর কাউকে বলবি না ।”
আরোবি নিজের হাত ঠোঁটের কাছে তুলে চেন লাগানোর মতো করে এটে দেয় মানে সে কাউকে বলবে না।
এরপর সে আর কথা না বাড়িয়ে সোজা এগিয়ে যায়।
সুরভীর ঘরের সামনে গিয়ে আরোবি দরজায় হালকা নক করে, কিছুক্ষণ পরে সুরভী দরজা খুলে। আরোবি দ্রুত সুরভীর ঘরের মধ্যে চলে যায়। সুরভীর ঘরে হালকা ল্যাম্প জ্বলছে।আরোবি দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে।
সুরভী —“ তুই এতো রাতে এখানে কেন? কিছু হয়েছে? ”
আরোবি —“ আরে নাহ! কিরিস ভাইয়া লিসির সঙ্গে কি কথা বলবে তাই আমাকে তোর ঘরে আসতে বলেছে। ”
সুরভী নিচু স্বরে—“কিরিস এত রাতে লিসির কাছে কেন গেল?”
আরোবি বিছানার ধারে বসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে
—“মনে হয় রোমান্টিক কথা বলবে,।”
সুরভী চুপ করে শোনে।
—“হুম, যদি ওরা কিছু করে বসে! ,”
আরোবি ধীরে বলে,
—“নাহ, এতোটুকু ভরসা আমার ভাইয়ার উপর আছে, যে খারাপ কিছু করবো না ।”
সুরভীর চোখ বড় হয়—“বাহ ভালো ভরসা আছে যে দেখছি ?”
আরোবি মাথা নাড়ে—“হুম নে এবার ঘুমা, আমার পাকা ঘুম ভেঙে দিয়েছে ভাইয়া ”
একটু থেমে আবার বলে —“তুই এখনো জেগেছিলে নাকি, নিশ্চিত উপন্যাস পড়ছিলি, দাড়া আমি আম্মু কে সকালে বলবো ”
সুরভী হালকা হাসে।—“তাই! কি বলবি যে তুই আমার ঘরে রাতে এসে দেখেছিস, আর যদি আম্মু জিজ্ঞেস করে তুই কি করতে আমার ঘরে এসেছিলি। তাই বেশি কথা না বলে ঘুম পড়, আমিও এবার ঘুমাবো ।”
আরোবি মাথা ঝুঁকিয়ে— “বাহ, রাত ৩-৪ পর্যন্ত বান্দা আমার উপন্যাস পড়ে, ”
সুরভী মুচকি হাসে এরপর দুজনে একসাথে ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘরটা আবার শান্ত হয়ে যায়।
অন্য দিকে কিরিস ঘরে ঢুকে দরজা লক করে দেয়।
লিসি ঘুমিয়ে আছে। শ্বাসটা ধীরে, নিয়মিত।কিরিস দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে।
এই মুখটা—সব যুদ্ধের মাঝেও তার একমাত্র শান্তি।
সে ধীরে ধীরে বিছানার পাশে আসে। কোনো শব্দ না করে।বিছানায় উঠে,হাতের ভর দিয়ে লিসির পাশে ঝুঁকে পড়ে। চোখভরে দেখে চুল, বন্ধ চোখ, শান্ত মুখ।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব আস্তে ঠোঁট ছোঁয়ায়। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর আরেকটু গভীর। লিসির শ্বাস হঠাৎ একটু থেমে যায়। বুক ওঠানামা বদলে যায়।
চোখ খুলে দেখে কিরিস। সে কিছু বলার আগেই
কিরিস আস্তে করে হাত রেখে ফিসফিস করে—
—“চুপ... কিছু বলবে না, একটু তোমার কাছে থাকতে দাও, শুধু আজ রাতটা তোমার কাছে থাকতে দাও ।”
তারপর আবার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।এবার খুব নরম।
লিসির চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে। হাতটা অজান্তেই কিরিসের শার্ট আঁকড়ে ধরে।কিরিস কপাল ঠেকিয়ে থাকে। কোনো কথা নেই।এই মুহূর্তে সে আর কোথাও যেতে চায় না কিন্তু জানে ভোর আসছে।
হঠাৎ লিসি ফিসফিস করে
—“হঠাৎ এখন আসার কারণ ?”
কিরিস থেমে যায় কিছুক্ষণ চুপ। তারপর খুব নিচু গলায় —“তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছিনা যে আর.... —”
কথাটা শেষ করতে পারে না লিসি উঠে বসতেই কিরিস আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। হঠাৎ তাকে বুকে টেনে নেয়। এমনভাবে আঁকড়ে ধরে যেন এটাই শেষ আশ্রয়। তার কণ্ঠ কাঁপে
—“সবাই আমাকে থামাতে চায়… কিন্তু আমি শুধু তোমার কাছে থামি।”
লিসির হাত ধীরে কিরিসের পিঠে উঠে যায় সে কিছু বলে না। শুধু অনুভব করে এই মানুষটা বাইরে যত শক্ত,
ভেতরে ততটাই নরম। কিরিস তার মুখ দুহাতে ধরে চোখে অদ্ভুত অস্থিরতা।
—“তুমি জানো না, তোমাকে ছাড়া আমি কোথাও সম্পূর্ণ না।”
তারপর ঠোঁট ছোঁয়ায় এইবার আর চুপচাপ না। ভেতরে জমে থাকা সব ভয়, সব রাগ, সব চাপ একসাথে মিশে যায় সেই চুম্বনে।মলিসি প্রথমে থমকে যায়। আস্তে বলে —“কিরিস…”
কিন্তু শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই সে বুঝে যায় এই মানুষটা ভেঙে পড়ছে। লিসি আর বাধা দেয় না। তার আঙুলগুলো কিরিসের শার্ট আঁকড়ে ধরে কিরিস যেন হারিয়ে যাচ্ছে সেই অনুভবে। চুম্বনটা দীর্ঘ হয়, গভীর হয় কিন্তু তাড়াহুড়া না,নবরং মরিয়া। মাঝে এক মুহূর্তে লিসির শ্বাস কেঁপে ওঠে। কিরিস তখনই থামে। কপাল কপালে ঠেকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে—
—“আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি… যখন মনে পরছে তোমাকে রেখে যেতে হবে।”
লিসি খুব ধীরে বলে জিজ্ঞেস করে
—“কোথায় যাবেন আপনি! ।”
কিরিস মুচকি হাসে টেনে বলে —“ তোমায় ছেড়ে বহু দূরে যাবো কোথায়!.....। লিসি শার্মা আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না ”
বলে কিরিস আবার তাকে জড়িয়ে ধরে এইবার একটু শান্তভাবে। বাইরে দূরে আজানের শব্দ ভেসে আসে।
ভোর হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতরে সময় থেমে আছে। কিরিস শুধু ফিসফিস করে—
—“যদি আমি যাইও… মনে রাখো, আমি ফিরব। কারণ আমার সবকিছু এখানে।”
কিরিস কিছুক্ষণ লিসির দিকে তাকিয়ে থাকে, তার নির্লজ্জ চোখ টুকু শুধু লিসির কাপা মিষ্টি ঠোঁটের দিকে যাচ্ছে। কিরিস লিসি মুখে হাতে দিয়ে তার বৃদ্ধা আঙুল লিসির ঠোঁটে ছুঁয়ে দিয়ে বলে —“ অলকানন্দা আজকে আমাকে বাঁধা দিও না, প্লিজ ”
নীরব শান্ত হিংস্র এই চোখ দুটো যখন কোন আবদার করে তখন মারাত্মক রকমের মায়াবী লাগে আর সেই মায়ায় লিসির ডাগরআঁখি দুটো আটকে যায় মুচকি হেসে একরাশ লজ্জা লুকিয়ে বলে —“ ঠিক আছে দিবো না ”
ব্যস কিরিসকে পায় কে! কিরিস লিসির দিকে তাকিয়ে আছে এমনভাবে… যেন পৃথিবীতে আর কিছু নেই। লিসি কিছু বলার আগেই কিরিস হঠাৎ তাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। তার হাত দুটো লিসির কোমরে শক্ত হয়ে জড়িয়ে যায়।
লিসি —“ কিন্তু আপনি এমন করছেন.........? ”
কথাটা পুরো শেষ হওয়ার আগেই কিরিস তার ঠোঁটে চুপ করিয়ে দেয়। প্রথমে চুমুটা নরম ছিল। তারপর ধীরে ধীরে গভীর হলো। এক ঝটকায় তাকে বেডের উপর শুইয়ে দিল। লিসির চুল ছড়িয়ে পড়লো সাদা চাদরের উপর।
জামার গলাটা একটু বড়, যেটা সামনের থেকে একটু সরে গেল, সে তাড়াতাড়ি ঠিক করতে গেল কিন্তু কিরিস তার হাতটা ধরে ফেললো। তার চোখে আগুন না, বরং অদ্ভুত এক তৃষ্ণা। সে ঝুঁকে এল আবার। এবার চুমুটা দীর্ঘ… গভীর… অধিকারী।
লিসির নিশ্বাস কেঁপে উঠলো। তার আঙুলগুলো কিরিসের শার্টের কলার চেপে ধরলো।
— “ 'উম' একটু থামুন! ”
ফিসফিস স্বর। কিরিস ঠোঁট সরিয়ে তার কপালে চুমু দিলো। তারপর আবার ঠোঁটে ফিরে গেল—
ধীরে… কিন্তু এবার আরও গভীরভাবে।
লিসি কোনো বাঁধা দিচ্ছে না, কিন্তু অনবরত কিস করায় লিসি নিশ্বাস নিতে একটু কষ্ট হচ্ছিল তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। হাতদুটো কখন যে কিরিসের কাঁধে গিয়ে থেমেছে—সে নিজেও বুঝতে পারেনি। কিরিস তাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে যেন সে হারিয়ে যাবে। যেন এই মুহূর্তটাই তার সবকিছু। হঠাৎ কিরিস থেমে গেল।
তার কপাল লিসির কপালে ঠেকানো। দুজনের নিশ্বাস এক হয়ে গেছে।
— “তুমি বুঝো না লিসি… তোমার উপর আমার সব ভর।”
লিসি চোখ বন্ধ করলো। তার কণ্ঠ কাঁপছে—
— “আপনি পাগল…”
কিরিস হালকা হাসলো। আবার আলতো করে ঠোঁটে একটা ছোট চুমু দিলো। এবার নরম মায়াভরা। তারপর তাকে বুকে টেনে নিলো। এই মুহূর্তে কোনো তাড়াহুড়া নেই। শুধু দুজনের হৃদস্পন্দন। ঘরের বাতাস ভারী, কিন্তু উষ্ণ কিরিস লিসিকে জড়িয়ে ধরে আছে এমনভাবে, যেন হাত ছাড়লেই সে হারিয়ে যাবে। লিসির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে খুব নিচু গলায় বলে—
—“আজ রাতে যেমন তোমার পাশে আছি… আই প্রমিস, যখন ফিরবো— তখন আর লুকিয়ে না। তখন আমাদের প্রথম রাত হবে।”
লিসির শ্বাস থমকে যায়। কিরিস তার মুখটা দুহাতে ধরে, চোখের গভীরে তাকিয়ে বলে—
—“লিসি শর্মা… ওটা হবে তোমার আর আমার বাসর রাত। সবাই জানবে, তুমি শুধু আমার।”
লিসির গাল লাল হয়ে ওঠে। চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে —“এতো কথা বলা লাগবে না…”
কিরিস হালকা হেসে আবার ঠোঁট ছোঁয়ায় এইবার একটু দীর্ঘ, একটু গভীর। চাপা আবেগ, দখল, ভালোবাসা—সব মিশে। লিসির ঠোঁট লাল হয়ে ওঠে। শ্বাস কেঁপে যায়।
কিরিস ধীরে সরে এসে কপালে ঠেকিয়ে বলে—
—“এই লালচে রঙটা মনে রাখবো। ফিরে এসে আবার দেখবো আর যদি না থাকে তাহলে চিন্তা করো না,, আবার তোমার ঠোঁট এমন লাল করার ক্ষমতা আমার আছে ।”
লিসি লজ্জায় চোখ বন্ধ করে। তারপর আস্তে করে কিরিসের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলে।
—“আপনি এখন শুধু যাওয়া কথা বলছেন কেনো? কোথাও চলে যাবেন নাকি!।”
কিরিসের বুকের ভেতর কাঁপন নামে। সে লিসিকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
—“আমি ফিরব, কারণ আমার ঘুম, আমার শান্তি সব তোমার কাছে।”
বাইরে ফজরের আজান ভেসে আসে। শেষ প্রহর। কিরিস লিসিকে বুকের ভেতর আটকে রাখে। হাত চুলে বুলিয়ে দেয় ধীরে ধীরে। লিসিও এবার হাত তুলে কিরিসকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। যেন বলছে যেও, কিন্তু ভেঙে যেও না। ধীরে ধীরে দুজনের শ্বাস এক তাল হয়ে আসে।
ঘুম নেমে আসে একটা অদ্ভুত শান্তির ঘুম। ভোরের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢোকে দুজনকে একসাথে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় ছুঁয়ে যায়। যেন সময়ও জানে এই গল্প এখনো শেষ হয়নি। ফজরের আজান শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। ঘরের ভেতর হালকা নীলচে ভোরের আলো। কিরিসের চোখ খুলে যায় প্রথমে। কয়েক সেকেন্ড কিছুই ভাবে না শুধু তাকিয়ে থাকে তার বুকের ওপর ঘুমিয়ে থাকা লিসির দিকে। লিসি শান্ত। তার লম্বা চুল ছড়িয়ে আছে কিরিসের বুকে। হালকা খোলা ঠোঁট, গভীর ঘুম… মুখে একফোঁটা নির্ভারতা।কিরিসের বুকটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। গত রাতের কথা মনে পড়ে তার নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি। সে খুব ধীরে লিসির গাল ছুঁয়ে দেয়।
আঙুল কেঁপে ওঠে।
—“আমি ফিরবো…”
ফিসফিস করে বলে, কিন্তু শব্দ বেরোয় না প্রায়। লিসি অচেতন ঘুমের ভেতর একটু নড়ে। আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তাকে। সেই মুহূর্তে কিরিসের ভেতরে যুদ্ধ শুরু হয়। থাকবে?নাকি যাবে? তার চোখ কঠিন হয়ে যায় আবার। যে রাগ, যে অপমান, যে এক সপ্তাহ ধরে জমে থাকা আগুন সেটা তাকে ছাড়ে না। ধীরে ধীরে লিসির হাত নিজের বুক থেকে আলগা করে। অত্যন্ত যত্নে। যেন ভেঙে না যায়। বালিশটা টেনে এনে লিসির বাহুর নিচে গুঁজে দেয়,যেন সে বুঝতেই না পারে।
তারপর উঠে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বিছানার পাশে দেখে।মনে গেঁথে নেয় এই মুখটা। হঠাৎ ঝুঁকে এসে কপালে খুব হালকা একটা চুমু খায়।
—“ আমাদের আবার দেখা হবে লিসি শার্মা ।”
তারপর সোজা হয়ে দাঁড়ায়, নিজের হাতের দিকে তাকায় একটা বেসলেট যেটা চুল দিয়ে খুব সুন্দর করে বেওনি করা এবং তার উপরে দুইটা অক্ষর K&L যেটা পাশাপাশি বসানো । কিরিস মুচকি হাসে টেনে বলে —
“ অলকানন্দা তোমার চুলের ছোঁয়া, তোমার অস্তিত্ব আমি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে ”
তারপর চোখে সেই পরিচিত কঠিন দৃষ্টি ফিরে আসে। দরজার দিকে হাঁটে একবারও পেছনে তাকায় না কারণ জানে, একবার তাকালে আর যেতে পারবে না। দরজা খুলে নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়।ঘর আবার নিস্তব্ধ।কয়েক মিনিট পর লিসি ঘুমের ভেতর অস্পষ্টভাবে ফিসফিস করে—
—“কউ যাচ্ছেন? …”
কিন্তু তখন আর কেউ নেই জানালার বাইরে সূর্য উঠছে।
বাড়ির সবাই এখনো ঘুমিয়ে।দূরে, খুব দূরে আকাশে হয়তো ইতিমধ্যেই প্রস্তুত ফ্লাইং জেট। আর লিসি?
সে এখনো জানে না তার বুকের উষ্ণতা যেটা ছিল,
সেটা এখন খালি। লিসির ঘুম ভাঙলো ধীরে ধীরে।
ঘরটা ফাঁকা। বিছানার একপাশ ঠান্ডা। সে স্বাভাবিকভাবেই ভ্রু কুঁচকে ফিসফিস করলো—
“অফিসে চলে গেছে বোধহয়…”
তার ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠলো।
মনে কোনো সন্দেহ নেই। কিরিস তো ব্যস্ত মানুষ… সিইও… ভোরে বের হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। সে ধীরে ধীরে উঠে বসলো।জামা ঠিক করে বাথরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। চুল আঁচড়াতে গিয়ে হঠাৎ চোখ গেল নিজের ঠোঁটের দিকে, এক সেকেন্ড।তারপর দ্বিতীয় সেকেন্ডে চোখ বড় হয়ে গেল। ঠোঁট দুটো হালকা লাল… সামান্য ফুলে আছে। গত রাতের কথা বিদ্যুতের মতো মনে পড়তেই তার কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেল।
কিরিসের কণ্ঠ—
“আই পমিজ… ফিরে এসে তোমার সাথে প্রথম রাত কাটাবো…”
লিসি দুহাতে নিজের গাল চেপে ধরলো।
—“এই মানুষটা না…!”
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। ঠোঁট ছুঁয়ে দেখে। আস্তে করে ফিসফিস করে—
—“পাগল…”
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে বালিশের পাশে।সে একটু থমকে গেল।বিছানার পাশে সুন্দর করে রাখা একটা পুতুল। রোপান্জেল। লম্বা সোনালি গাউন পরা পুতুলটা।
কিন্তু তার মাথার লম্বা চুলের জায়গায় বাঁধা আছে কালো, আসল চুলের বেণী। লিসির বুকটা কেঁপে উঠলো। সে ধীরে ধীরে পুতুলটা তুলে নিলো হাতে। তার নিজের কাটা চুল… সেই নির্দয় ভাবে কাটা চুলগুলো সেটা কিরিস এত যত্ন করে রেখে দিয়েছে? তার চোখ ভিজে উঠলো না, কিন্তু ভেতরটা নরম হয়ে গেল।
—“আপনি তো সত্যিই পাগল…”
একটা অদ্ভুত ভালো লাগা ছড়িয়ে গেল তার বুক জুড়ে।
রাগ না অভিমান না। শুধু অদ্ভুত মায়া। সে পুতুলটা বুকে জড়িয়ে একবার চোখ বন্ধ করলো। তারপর আলতো করে বিছানায় রেখে দিলো। ওড়না টা ঠিক করে চুল গুছিয়ে নিলো। ঠোঁটে হালকা লিপবাম লাগিয়ে নিলো—লালভাবটা একটু ঢাকার জন্য। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দরজা খুলে নিচে নামলো।বাড়ির ভেতর সকালের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু তার ভেতরে এখনো নরম এক গোপন সকাল রয়ে গেছে যেটা শুধু তার আর কিরিসের। লিসি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। তার মুখে এখনো সেই হালকা লাজুক হাসি…
মনে ভোরের উষ্ণতা। কিন্তু নিচে নেমেই সে থেমে গেল।
ড্রয়িংরুমে অদ্ভুত নীরবতা। সবাই আছে কিন্তু কারও মুখে কথা নেই। সুপ্রিয়া বসে আছেন সোফায়, কপালে ভাঁজ চোখে মৃদু পানির ফোটা। আনোয়ার ফোন কানে নিয়ে কারও সাথে তীব্র গলায় কথা বলছে। ঘরের বাতাস ভারী।
লিসির বুকটা ধক করে উঠলো।
— “কি হয়েছে?”
কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। আনোয়ার ফোন কেটে বললো নিচু গলায়—
“ভোরে… কিরিস বাড়ি ছেড়ে গেছে।”
এক মুহূর্ত। লিসির মাথার ভেতর যেন শব্দ থেমে গেল।
“কি…?”
তার ঠোঁট শুকিয়ে গেল এই তো ভোরে সে তার বুকের মধ্যে ছিল। তার হাতের উষ্ণতা… তার কপালের চুমু…
তাহলে?
তার চোখ অজান্তেই সিঁড়ির দিকটা খুঁজলো যেন এখনই কিরিস নিচে নামবে। কিন্তু না সত্যিটা বাতাসে ঝুলছে।
আরোবি আর সুরভী ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়ালো।মসুরভী খুব আস্তে বললো—
“লিসি… তুই কিছু জানিস?”
আরোবি চোখে কৌতূহল আর চিন্তা মিশিয়ে তাকিয়ে আছে। লিসির বুকের ভেতর ঝড়। কিন্তু মুখ শান্ত।
সে মাথা নাড়লো।
— “না তো… আমি তো ভেবেছিলাম অফিসে গেছে।”
তার কণ্ঠ স্বাভাবিক। অবিশ্বাস্য রকম স্বাভাবিক। কেউ বুঝতে পারলো না— তার আঙুলগুলো ওড়নার আঁচল শক্ত করে চেপে আছে। সুরভী একবার আরোবির দিকে তাকালো। কিছু যেন মিলছে না তাদের কাছে। কিন্তু লিসির চোখে শুধু বিস্ময়। সে ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লো। মনে একটা প্রশ্নই ঘুরছে— সে গেলে… আমাকে না বলে কেন?
তার ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে। মাথার ভেতর শুধু ভোরের সেই মুহূর্ত ঘুরছে। হঠাৎ মনে পড়লো রোপান্জেল।
পুতুলটা। তাহলে সে জানত… সে যাবে?
লিসির বুকের ভেতর হালকা ব্যথা উঠলো। কিন্তু সে সেটা মুখে আনলো না। শুধু খুব আস্তে বললো—
— “একবারও জানালো না আমায় …”
কিন্তু নিজের মনেই প্রশ্ন তাহলে আমাকে জড়িয়ে কেন ঘুমালে? ঘরের ভেতর অস্বস্তি আরও ঘনীভূত হলো। আর লিসির ভেতরে শুরু হলো এক অদ্ভুত শূন্যতা। সবাই চুপচাপ আছে রিহান কাবির একে অপরের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে বাড়িতে। ড্রয়িংরুমে হঠাৎ আনোয়ার আবার ফোন পেল। সে ফোন কানে দিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে শুনলো… তারপর মুখটা আরও শক্ত হয়ে গেল।
— “প্রাইভেট জেট টেক অফ করেছে। দুবাই হয়ে ফ্রান্স।”
ঘর নিস্তব্ধ। সুরভী ফিসফিস করলো—
“মানে… সত্যিই চলে গেছে?”
লিসির বুকের ভেতর যেন কেউ ধাক্কা দিলো।
ফ্রান্স? এটা অফিস ট্রিপ না।
এটা বড় কিছু। আরোবি এবার সরাসরি লিসির দিকে তাকালো।
— “তুমি সত্যিই কিছু জানো না?”
লিসি মাথা নেড়ে দিলো।
— “না…”
তার কণ্ঠ শান্ত। কিন্তু তার কানে বাজছে শুধু ফ্রান্স।
অন্য দিকে.....
কালো এসইউভি দ্রুতগতিতে ছুটছে এয়ারস্ট্রিপের দিকে।
ভেতরে বসে আছে কিরিস। কালো স্যুট। চোখে ডার্ক গ্লাস। মুখ সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। ভোরের কোমলতা নেই আর।
সে এখন রায় চৌধুরী না— আন্ডারওয়ার্ল্ড কিং। মার্ক সামনে বসে ফাইল খুলে বলছে—
— “ফ্রান্সে ডেলাক্রোয়া গ্রুপ ডাবল ক্রস করেছে।
ওরা ভেবেছে আপনি নিজে আসবেন না।”
কিরিস ঠান্ডা গলায় বললো—
— “ওরা ভেবেছে ভুল।”
গাড়ি থামলো প্রাইভেট এয়ারস্ট্রিপে। জেট প্রস্তুত।
নামার আগে কিরিস এক মুহূর্ত থামলো। তার ফোনে স্ক্রিন জ্বলে উঠলো। লক স্ক্রিনে— লিসির ছবি। তার চোখের দৃষ্টি এক সেকেন্ডের জন্য নরম হলো। মার্ক খেয়াল করলো, কিন্তু কিছু বললো না।
— “মিশন ক্লিন?” মার্ক জিজ্ঞেস করলো।
— “না।”
কিরিস গ্লাস খুলে বললো,
— “এইবার একটা মেসেজ দিতে হবে।”
তার চোখে বিপজ্জনক ঝিলিক।
— “ফ্রান্সে ঢুকে প্রথমে তাদের ফাইন্যান্স কেটে দাও।
তারপর মানুষ।”
মার্ক মাথা নেড়ে বললো—
“রজার দ্যাট।”
কিরিস জেটে উঠে দাঁড়ালো দরজার সামনে। হাওয়া তার কোট উড়িয়ে দিচ্ছে। সে আকাশের দিকে তাকালো একবার। তারপর ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ। জেট রানওয়েতে গতি নিল।
আবার বাড়িতে......
লিসি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে অকারণ অস্থিরতা। সে জানে না কেন—
কিন্তু মনে হচ্ছে কিছু বড় হতে যাচ্ছে। তার ঠোঁট ছুঁয়ে যায় অজান্তে। ফিসফিস করে—
— “কই গেলন আমাকে না বলে …”
দূরে আকাশে একটা ছোট সাদা বিন্দু মিলিয়ে যাচ্ছে।
জেট ইতিমধ্যে মেঘ ভেদ করে উঠেছে। ভেতরে নরম হলুদ আলো। শান্ত, বিলাসবহুল পরিবেশ। কালো লেদারের সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে কিরিস। এক পা অন্য পায়ের উপর তুলে। হাতে ক্রিস্টাল গ্লাস— কিন্তু তাতে মদ না, শুধু বরফ আর পানি। চোখ বন্ধ। মনে হয় শান্ত। কিন্তু তার ভেতরে চলেছে হিসেব। মার্ক সামনে ফাইল খুলে বসে আছে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অবশেষে বললো—
— “বস…”
কিরিস চোখ না খুলেই বললো—
— “বল।”
মার্ক একটু ইতস্তত করে—
— “আপনি এভাবে হঠাৎ চলে আসলেন… তাহলে লিসির কি হবে?”
এক সেকেন্ড। জেটের ইঞ্জিনের শব্দ যেন আরও ভারী শোনা গেল। কিরিস ধীরে চোখ খুললো।তার দৃষ্টি শান্ত।
কিন্তু গভীর।
— “আমি কি কখনো কিছু না ভেবে করি না, মার্ক?”
মার্ক চুপ। কিরিস গ্লাসটা টেবিলে রাখলো।
— “শোনো… আমি যেই মুহূর্তে ফ্রান্সের প্যারিসে ল্যান্ড করবো… ঠিক সেই মুহূর্তে লিসি রেশমপুর চলে যাবে।”
মার্ক ভ্রু কুঁচকালো।
— “রেশমপুর?”
— “তার দাদুর বাড়ি। আকবর খানের কাছে।”
মার্ক এবার সোজা হয়ে বসল।
— “আপনি আগে থেকে ঠিক করে রেখেছেন?”
কিরিস হালকা হাসলো।
— “আমি কখনো ওকে সুরক্ষা ছাড়া রাখি?”
তার চোখে ঠান্ডা আত্মবিশ্বাস।
— “ঢাকার বাড়িতে থাকলে নজর থাকবে।
আমি চাই না কেউ ওকে ব্যবহার করার কথা ভাবুক।”
মার্ক নিচু গলায় বললো—
— “ফ্রান্সের ডেলাক্রোয়া গ্রুপ যদি আপনার পার্সোনাল লাইফ টার্গেট করে—”
কিরিসের চোখ মুহূর্তে কঠিন হয়ে গেল।
— “তাহলে তারা ভুল করবে।”
একটা বিরতি। তার গলা নরম হলো একটু।
— “ও এখনো জানে না আমি কে পুরোপুরি।
আর আমি চাইও না এই যুদ্ধের গন্ধ ওর কাছে যাক।”
মার্ক তাকিয়ে রইলো।
— “বস… আপনি গেলে ও কষ্ট পাবে।”
কিরিস জানালার বাইরে তাকালো। নিচে মেঘের সাদা সমুদ্র। খুব আস্তে বললো—
— “কষ্ট পাবে, জানি।”
তার কণ্ঠে এবার নিঃশব্দ ভয়।
— “এই মিশন ক্লিন করতে হবে। ডেলাক্রোয়া ভেবেছে আমি শুধু ব্যবসায়ী। ওদের ভুলটা আমি নিজে গিয়ে ঠিক করে আসবো।”
মার্ক ফাইল বন্ধ করলো।
— “প্যারিসে আমাদের লোক রেডি। ফাইন্যান্স লাইন কাটা হবে আজ রাতেই।”
কিরিস ঠান্ডা গলায়—
— “না। আগে ওদের আত্মবিশ্বাস কেটে দাও। তারপর টাকা।”
তার ঠোঁটে সামান্য বাঁকা হাসি।
— “ওরা বুঝুক আমি এলে শহর বদলে যায়।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর খুব আস্তে, প্রায় নিজের সাথে—
— “লিসি নিরাপদ থাকবে। আমার মানুষ, আমার নিয়ম।”
জেট মেঘের ভেতর ঢুকে গেল। আলো একটু কেঁপে উঠলো মার্ক জানে এই শান্ত মানুষটাই কয়েক ঘণ্টা পর প্যারিসে ঝড় নামাবে। আর দূরে…রেশমপুরের পথে হয়তো ইতিমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে।

রায় চৌধুরী বাড়ির হলরুম অস্বাভাবিক চুপচাপ।
এ বাড়িতে সাধারণত সকাল মানেই হাসাহাসি, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ… আজ শুধু চামচের হালকা ঠোকাঠুকি। সুপ্রিয়া মাথা নিচু করে বসে আছেন। তার বড় ছেলে..বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। তার চোখ লাল।
লিসি একটু দূরে বসে আছে। তার মনটাও অদ্ভুত ভারী।
ভোরের সেই বুকের উষ্ণতা… আর এখন এই শূন্যতা।
কিন্তু সে কিছু প্রকাশ করলো না। শুধু চুপচাপ মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। কাবির কাশি দিয়ে বললো—
— “বাবা… আমাদের অফিসে যেতে হবে।”
রিহানও মাথা নেড়ে—
— “হ্যাঁ, আজ কয়েকটা মিটিং আছে।”
আনোয়ার গম্ভীর গলায় বললেন—
— “আগে সবাই নাস্তা করো। খালি পেটে কেউ বের হবে না।”
সুপ্রিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিলেন—
— “কিন্তু—”
ঠিক তখনই মির্জা বেগম দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—
— “বাচ্চাদের খেতে দাও, সুপ্রিয়া। এই বিষয় আমরা পরে কথা বলবো।”
একটা নিঃশব্দ নির্দেশ যেন সুপ্রিয়া চুপ হয়ে গেলেন।
প্রিয়া — “ সবাই টেবিলে আসো আমি খাবার সার্ভ করছি”
মেয়েরা আর ছেলেরা একে একে উঠে গেলো, কারোর খাবার ইচ্ছে নেই কিন্তু তারপরে খেতে বসেছে। সবাই খেতে শুরু করলো। কিন্তু কেউ আসলে খাচ্ছে না।
শুধু প্লেটে নড়াচড়া। লিসির হাত থেমে আছে। তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক স্মৃতি জেগে উঠছে। তার বুকটা হালকা কেঁপে উঠলো।
ঠিক তখন টিং।
কাবিরের ফোনে মেসেজ। সে অবচেতনে ফোনটা দেখলো। স্ক্রিনে শুধু একটা নাম কিরিস।
মেসেজ — “তোরা যথা সময়ে চলে আসিস। লোকেশন শেয়ার করা আছে। দেরি করিস না।”
সময় দেওয়া আছে স্পষ্ট। কাবির হঠাৎ কাশতে কাশতে প্রায় দম আটকে ফেললো।
— “খখ—”
সুপ্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বকা দিলেন—
— “কাবির! ঠিকমতো খেতে পারিস না, সারাক্ষণ ফোন, খাওয়ার সময় ও ফোন, ফোন না দেখে গলা দিয়ে খাবার নামে না ?”
কাবির তাড়াতাড়ি মাথা নাড়লো—
— “সরি মা…”
সে জানে কিরিস চলে যাওয়ার রাগ আর কষ্ট তার উপর ঝারছে সুপ্রিয়া। কিন্তু তার চোখ রিহানের দিকে। রিহানের ফোনও কেঁপে উঠলো। টিং...একই নাম। একই নির্দেশ।
রিহান স্ক্রিন দেখে নিঃশব্দে গভীর শ্বাস নিলো। দু’জনের চোখাচোখি তারা বুঝে গেছে। কিরিস বাড়ি থেকে চলে গেলোও তাদের কাজ বন্ধ নেই । আর এরপরে যেটা হতে চলেছে সেটা শুধু অফিস মিটিং না। কাবির হঠাৎ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালো—
— “বাবা… আমাদের একটু আগে বের হতে হবে।”
রিহানও দ্রুত উঠে—
— “হ্যাঁ, ট্রাফিক আছে।”
আনোয়ার তাদের দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে চাইলেন।
— “এত তাড়া কিসের?”
কাবির সংযত গলায়—
— “ওয়ার্ক ইস্যু ”
এক মুহূর্ত থেমে—
— “আমরা যাচ্ছি এবার ডাক্তার আর শিক্ষক কেউও বলতে হবে ।”
আনারুল —“ তোরা যে কি বলছি বুঝতে পারছিনা, ”
কাবির উঠে ব্লেজার টা হাতে নিয়ে বলে —“ অফিসের কাজ নিয়ে চিন্তা করো না, ”