পর্ব :56
মার্ক একপাশে দাঁড়িয়ে, ট্যাবলেট হাতে।
মার্ক হঠাৎ বলে ওঠে—
“ বস… একটা ব্যাপার আছে। সত্যি কথা বলতে গেলে…
লিসিকে টার্গেট করা হচ্ছে। ”
এই কথাটার সঙ্গে সঙ্গেই—
ইয়াবি — “ কী?! ”
রিহান — “ কাকে টার্গেট? কেন?”
কাবির — “ আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না। ”
ইশান একটু সামনে ঝুঁকে—
“ লিসি তো আমাদের বোন, ওর তো কোনো সম্পর্ক নেই এইসবের সাথে তাহলে ওকে কেন? ”
কিরিস ধীরে চোখ তোলে একটা দীর্ঘ শ্বাস নেয়।
— “ কারণ আমি যদি মাফিয়া ওয়ার্ল্ডের কিং হয়ে থাকি…
তাহলে লিসি হচ্ছে কুইন। ”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা কিরিস চালিয়ে যায়
— আন্ডারওয়ার্ল্ডে একটাই মেয়ে আছে। যাকে নিয়ে এত আলোচনা, এত ফাইল, এত তথ্য— আর কেউ না লিসি, লিসি খান। ”
রিহান চোখ কপালে তুলে—
—“ কিন্তু কেন? ”
কিরিস হালকা হেসে বলে—
— “ কারণ সে আবাস খানের মেয়ে। আবাস খান শুধু একজন সাধারণ চাকরিজীবী না। সে ছিল ডিপ-কভার সিক্রেট স্পাই। ডাক্স-লেভেলের। ”
ইয়াবি — “ মানে…ফুল আন্ডার?”
কিরিস — “ সবচেয়ে ভয়ংকরটা। আবাস খানের কাছে ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কোড, লোকেশন, নাম, ডিল—সব।”
কাবির শ্বাস টেনে নেয়—
— আর সেই তথ্য…?
কিরিস — “ সেই তথ্যের চাবি একটাই।
তার একমাত্র মেয়ে—লিসি। ”
ইশান ধীরে বলে — “ আর লিসি নিজেই জানে না… ওর দাম কত।”
কিরিস মাথা নোয়ায়।
কিরিস:
— আবাস খান বড্ড চালাক মানুষ।
সে এমনভাবে নিজের মেয়েকে সব কিছু থেকে দূরে রেখেছে যেন কিছুই না জানে, কিছুই না হয়।
একটু থেমে মুখে হালকা বাকাঁ হাসি টেনে ওয়াইনের গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে বলে
— আর আমাকে বেছে নিয়েছে
ওকে প্রটেক্ট করার জন্য। আমার হবু শশুর মশাই মরে গিয়েও মেয়েকে আমার হাতে দিলেন না। এমন কাজ করে রেখে গেয়েছেন যার জন্য আমাকে ওর ১৯ বছর হওয়া পরে বিয়ে করতে হবে।
ইয়াবি ভুরু কুঁচকে বলে —“ ১৯ বছর কেন এর আগে ওকে বিয়ে করলে কি হবে? ”
কিরিস মুচকি হাসে—
— “ ১৯ বছরের আগে যদি ওর বিয়ে হয় তাহলে গোটা ৩০ বিলিয়ন ডলারের প্রপার্টি ওর হবু বরের নামে হয়ে যাবে আর যদি ১৯ বছর পরে ওর বিয়ে হয় তাহলে ওর ভিতর থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার চলে যাবে গভারমেন্ট ফান্ডে। আর বাকি প্রপার্টি থেকে যাবে লিসির নামে আর তার সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অজানা হাজারো রহস্যের ফাইল। ”
কিরিস থেমে একটু নিশ্বাস নেয় তারপর আবার বলতে থাকে —“ এমন শ্বশুরমশাই পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। নিজের জামাইকে মাফিয়া বানিয়ে দিয়েছে।
আমার মনে হয় আবাস খান ভবিষ্যৎ দেখতে পারে। ”
সবাই স্তব্ধ সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু এই নিস্তব্ধতা যেন আরো জোরে জোরে কথা বলছে এরপরে কিরিস মার্কের দিকে তাকিয়ে বলে
—“ মার্কের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল আবাস খান। বলতে পারিস বেস্ট ফ্রেন্ড। আবাস খান নিজেই মার্কে আমার কাছে পাঠিয়ে ছিলেন। ”
ইয়াবি চমকে ওঠে—
— মানে মার্ক ভাই…?
মার্ক মাথা নোয়ায়। কিরিসের দিকে তাকিয়ে একটু খানি হাসি ঠোঁটের আগায় নিয়ে এসে বলে
—“ বসের বিশ্বস্ত সহকারী হওয়ার গল্পটা হঠাৎ না।”
মার্কের কথায় সবাই মাথা নাড়ায়
কিরিস ধীরে বলে—
—“ মার্কের সঙ্গে কাজ করার পর থেকে কতবার জিজ্ঞেস করেছিলাম কে আমাকে পাঠিয়েছে। কিন্তু একবারও বলিনি। যখন নিজেই জানতে পারলাম… তখন আর কী বলব। ততক্ষণে আমার হাত রক্তে রাঙানো। ”
ঘরের ভেতর ভারী নীরবতা।
হঠাৎ রিহান হেসে ওঠে—
— “ তার মানে তুই সত্যিই লিসিকে…বাহ ব্রো! ”
কাবির হাসে—
— “ এটাই তো তোর কাছ থেকে এক্সপেক্ট করেছিলাম। ”
ইশান যোগ করে—
—“ কুইনকে সেভ করার জন্য কিং তো লাগবেই।”
ইয়াবি মার্কের দিকে তাকিয়ে বলে—
“কিন্তু মার্ক ভাই, একটু বলেন তো আমাদের বড় ভাই কীভাবে আপনার দলে গিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে ঢুকলো? হ্যাঁ লিসি বাবা আপনাকে ওর কাছে পাঠিয়েছিল কিন্তু আমার এই কাঁঠালে আটার ভাই রাজি হল কি করে! এইতো জীবনে কোনো কাজে লাভ রাজি হয়না? ”
কাবির হেসে বলে—
“ ঢুকলোই যখন, আমাদেরও টেনেহিঁচড়ে ঢুকালো। ”
ইশান —“ ওই কথা তুই বলিস না! বাবা, প্রথম দিন যখন দেখতে পেয়েছিলাম আর প্রথম দিন ও যখন আমাদেরকে ওই জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল... আহ ভাবলেও এখন কেমন লাগে ”
কাবির মার্কের দিকে তাকিয়ে বলে —“ আপনি বলেন ”
মার্ক হালকা হেসে বসে পড়ে।
— “ বস ঢুকেছিল একা। কিন্তু রাজা একা রাজত্ব করে না।
কিরিস উঠে দাঁড়ায় চোখে দৃঢ়তা।
— “ লিসি শুধু আমার ভালোবাসা না।
সে আমার দায়িত্ব, আমার সীমা,আমার যুদ্ধ। My fucking obsessed and observed Lisi Sharma ”
একটু থেমে চোখে সেই পুরোনো তীক্ষ্ণতা এনে বলে উঠে
— “ আর যে এই কুইনকে ছুঁতে চাইবে…সে বুঝে নেবে
কিং কাকে বলে। ”
ভাইরা একসাথে তাকায় হালকা হাসি, গর্ব, ভয়—সব মিলিয়ে।
রিহান —“ চল তাহলে, রাজা।
রাজত্ব আগলে রাখি। ”
কিরিসের কথাগুলোর পরও ভাইদের মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরছে। ইশান চুপচাপ ছিল অনেকক্ষণ।
শেষমেশ বলে ওঠে—
— “ কিন্তু একটা কথা এখনো বুঝলাম না। মাফিয়া ওয়ার্ল্ডের সাথে তোর… মিলটা কীভাবে হলো? ”
রিহান যোগ করে—
—“ হ্যাঁ। এইটা হঠাৎ হওয়ার কথা না। ”
কাবির সামনের দিকে ঝুঁকে—
— বল না ব্রো। শুরুটা কোথা থেকে? আমরা যখন তোর টিমে যোগ হয়েছিলাম তখন ও তোর ভালোই রাজত্ব ছিলো, ”
কিরিস একটু হেসে চোখ নামায় হাসিটা নরম, কিন্তু চোখে স্মৃতি ভারী।
— “ পনেরো বছর বয়সে। ”
ভাইরা একসাথে তাকায় একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আবাট কিরিসের দিকে তাকায়।
—“ আমি যখন পড়াশোনা যেন লন্ডনে গিয়েছিলাম তখনই প্রথম মার্কের সাথে দেখা। সে আমাকে ফলো করছিল। বারবার বলেছিলাম আমার পিছু নিস না। কিন্তু সে ছাড়েনি। আমার ডিটেলস, আমার জায়গা, আমার চলাফেরা, আমার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস সব বের করে ফেলেছিল। একদিন এসে শুধু একটা প্রশ্ন করেছিলো — ”
কিরিস (মার্কের গলার অনুকরণে):
— ” Am I interested in the underworld? ”
রিহান শিস দেয়—
— “ পনেরোতে এই প্রশ্ন! ”
কিরিস মাথা ঝাঁকায়।
— “ প্রথমে কনফিউশনে ছিলাম।
কিন্তু পরে… মার্ক আমাকে এমন এমন কথা বলে যার জন্য... রাজি হই। ”
মার্ক এবার কথা নেয়।
—“ দুঃখিত সেদিনকার ওরকম ব্যবহারের জন্য কিন্তু সেদিন কে যদি আমি কথাগুলো না বলতাম তাহলে হয়তো আপনি আজকে এই চেয়ারে বসে থাকতেন না My Lord। আজও মনে আছে সেই দিনটা। আমি যখন প্রথম আন্ডারওয়ার্ল্ডে বসকে নিয়ে যাই… ”
সে হালকা হাসে।
— “ সবাই হাসছিল। ”
ইয়াবি— “ কেন? ”
মার্ক — “ বলছিল সবচেয়ে ইয়াংগেস্ট মাফিয়া, আমার মতো এতো বড় একটা লোক কি করে এতো ছোট একজনের গোলামি করে ।”
কাবির হেসে ওঠে—
— আমরা থাকলে আমরাও হাসতাম।
মার্কের হাসিটা মিলিয়ে যায়।
— কিন্তু সেই পার্টিতে একটা ছোট ঘটনা হয়েছিল।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। ছোটরা ঠিক যেমন ভূতের গল্প শোনার সময় মাঝে মাঝে থেমে যায় এবং তখন যে নীরবতা আর ভয় তাদের মনের ভিতর ধুকবুক ধুকবুক করে সেটা এখন ছেলেদের মনের ভিতর চলছে মনোযোগ দিয়ে তারা শুনছে প্রত্যেকটা কথা। একটু থেমে এরপরে আবার বলতে শুরু করে মার্ক
—” বস রেগে গিয়েছিল।”
এই কথায় কিরিস চুপ করে আছে চুপচাপ বসে ড্রিঙ্ক করছে, এই দেখে ইয়াবি বলে —
“ আপনি কন্টিনিউ করেন ”
মার্ক ধীরে বলে—
— “ সেই রাতে তিনজন বড় মাপের মাফিয়া বসকে অসম্মান করেছিল। একজন রাশিয়ান, একজন ইতালিয়ান, একজন মেক্সিকান। পনেরো বছরের একটা ছেলে যখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে… আর তারপর
তাদের অফার করা অস্ত্রের মধ্যে থেকে দা তুলে নিয়ে তাদের গলায় বসায় এবং একজনের পর একজনকে হত্যা করতে থাকে তখন তাদের রিঅ্যাকশন কেমন হয়
বলতে হয় না। ওদেরকে মারার পর বসের পুরো গায় রক্ত মেখে গিয়েছিল কিন্তু ভয় ছেঁটে ফোটাও তার চোখে ছিল না চুপচাপ এসে আবার নিজের জায়গায় বসে ছিল যেটা দেখে আশপাশের বাকি মাফিয়ারা একটু হলেও বুঝতে পেরেছিল কে এসেছে এই সাম্রাজ্যে। সেই দিন থেকেই নামটা বদলে যায়।”
মার্ক স্পষ্ট করে বলে —
— “ কিরিস মানে UK। Underworld King. ”
ইশান ফিসফিস করে—
— “ শিট…”
কাবির অবাক হয়ে তাকিয়ে—
— “ বাহ ব্রো… তুই তো সেই! এই গল্প দিয়ে তো খুব একটা মুভি হয়ে যাবে আর যাতে তুই অ্যাক্টিং করলে Oscar award অবশ্যই পেয়ে যাবি ”
রিহান — “ বুঝলাম কেন আজও কেউ তোর চোখে চোখ রেখে কথা বলে না। ”
ইয়াবি মাথা নেড়ে—
— “ আর এখনো সেই প্রথা চলছে। ”
কিরিস উঠে দাঁড়ায়। আলোটা তার মুখে পড়ে।
— “ ভয়টা আমি তৈরি করিনি। ওরা নিজেরাই শিখেছে।
আর এখন… এই রাজত্ব শুধু আমার না। ”
মার্ক এবং ভাইদের দিকে তাকায়।
— “ তোমরাও এর অংশ।”
কাবির দাঁড়িয়ে বলে—
— “ তাহলে চল, লেজেন্ডের পাশে দাঁড়াই। ”
ভাইয়েরা সবাই হেসে উঠে। কিছুক্ষণ পরে.........
যেখানে রাজত্বের রাত শেষ হয়ে বাড়ির নীরবতা শুরু হয়।
গাড়ির কনভয় ধীরে ধীরে শহরের আলো পেরিয়ে বাড়ির দিকে আসে।কোনো গান নেই কোনো কথা নেই।
শুধু ইঞ্জিনের শব্দ আর জানালার বাইরে ছুটে যাওয়া রাত। পিছনের সিটে কিরিস বসে আছে। চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুম নেই। মুখে সেই নির্লিপ্ত ভাব যেটা যুদ্ধ শেষে আসে।
রিহান একবার তাকায়, কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। কাবির ফিসফিস করে—
—“ আজকে অনেক কিছু জানলাম। ”
ইশান শুধু বলে—
—“ হ্যাঁ। ”
গাড়ি বাড়ির গেটের সামনে থামে। সবাই নেমে পড়ে।
রাত অনেক গভীর ভেতরে ঢুকতেই পরিচিত নীরবতা—
পরিবার ঘুমিয়ে পড়েছে। কিরিস সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত থামে। উপরের দিকের করিডোরে তাকায়—
লিসির ঘরের আলো নিভে আছে। এক সেকেন্ডের জন্য
তার চোখ নরম হয় তারপর কিছুই না। সবাই নিজের নিজের রুমে চলে যায় দরজা বন্ধ হয় একে একে।
লাইট নিভে যায় বাড়িটা ঘুমিয়ে পড়ে অজান্তেই।
কিন্তু এই বাড়ির এক বাসিন্দা জানে, আজ রাতটা সাধারণ রাত না। আরেকটা যুদ্ধ শেষ হয়েছে,
আরেকটা শুরু হওয়ার অপেক্ষায়। রাত আরও গভীর হয় সবাই ঘুমায়।
সকালটা একদম স্বাভাবিক ডাইনিং টেবিলে নাশতার গন্ধ। হালকা কথাবার্তা, হাসি সবাই যে যার মতো খেয়ে নিচ্ছে ছেলেরা অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি। কাবির, রিহান—টাই ঠিক করছে, ঘড়ি পরছে। কিরিসও পুরো তৈরি। ডার্ক শার্ট, স্লিভ একটু গুটানো চেহারায় সেই চিরচেনা সিরিয়াস ভাব কিন্তু চোখে আজ অদ্ভুত একটা উষ্ণতা। সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করে।
ঠিক তখনই উপর থেকে লিসিও নামছে।
সাদা-হালকা রঙের গাউন পরা, চুল আলতো করে বাঁধা।
সকালবেলার লিসিকে আরও নরম লাগছে। কিরিস এক ঝলকে তাকিয়ে থেমে যায়। পরের মুহূর্তেই—
সিঁড়ির পাশের দেয়ালের কাছে লিসিকে থামিয়ে দেয়।
দুই হাত দেয়ালের দুপাশে রাখে। মাঝখানে লিসি—
হঠাৎ করেই যেন বন্দী হয়ে যায় তার মাঝখানে।
লিসি চমকে উঠে বলে — “ ভা… ভাইয়া! নিচে সবাই—”
কিরিস নিচু গলায়, চোখে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে
—“ এখন কেউ নেই। ”
লিসি চোখ নামিয়ে নেয়।
কিরিস — “ একটা নতুন নিয়ম করেছি। সারারাত আমি ভেবে ঠিক করেছি ”
লিসি — “ কী নিয়ম? ”
কিরিস একটু ঝুঁকে আসে।
— “ এখন থেকে অফিসে যাওয়ার আগে একটা কিস না পেলে আমি যাবো না। ”
লিসি লজ্জায় ফিসফিস করে—
— “ এইসব কী বলছেন… না.... দিতে পারবো না ”
কিরিস — “ বারণ করলেও চলবে না। ”
লিসি কিছু বলার আগেই কিরিস আলতো করে তার ঠোঁটে একটা ছোট্ট লিপ কিস দেয় খুব অল্প কিন্তু যথেষ্ট।
লিসি থমকে যায়। কিরিস কপালে ঠেকিয়ে কপাল রেখে বলে— “ আরে এতো দেখসি রসগোল্লা থেকেও মিষ্টি, এত মিষ্টি ঠোট কেন তোমার! ”
লিসি —“ এই.. আপনি চুপ করুন কি সব বলছেন ”
কিরিস লিসির কাছে আরো ঝুঁকে এসে সিরিয়াস ভাবে বলে —“ শোনো লিসি, এবার থেকে যদি সকালে কিস না দাও…! ”
সে চোখ তুলে তাকায়। কিরিস হালকা হুমকি, হালকা হাসি নিয়ে বলে
— “ আমি প্রমিস করছি, তুমি নিচে সবার সঙ্গে বসে থাকলেও আমি ওখানেই এসে কিস করে চলে যাবো। এটা কিন্তু তোমার জন্য বিপদজনক। ”
লিসির চোখ বড় হয়ে যায়। মুখের কথা হারিয়ে ফেলেছে, এখন শুধু ভাবছে কিরিস এতো নির্লজ্জ হলো কবে থেকে।
কিরিস — “প্রতিদিন সকালে আমার ঘরে এসে
একটা মর্নিং কিস আর অফিসে যাওয়ার আগে একটা গুডবাই কিস। ডিল?”
লিসি মুখ লাল করে বলে—
— আপনি একদম…!
কিরিস হেসে ওঠে। দেয়াল থেকে হাত সরিয়ে লিসির কোমড় জরিয়ে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আবার লিসির ঠোঁট কিস করতে থাকে এবার আরো তীব্র ভাবে লিসি চেয়েও কিছু করতে পারছে কিরিস নিজের এক হাত লিসির হাত ধরে রেখেছে। লিসিকে ছেড়ে দিয়ে ঠোঁট বাইট করে বলে —“ ভীষণ মিষ্টি, আর এমন মিষ্টি আমার প্রতিদিন লাগবে ”
লিসি কিছু বলার আগেই কিরিস সরে যায়। কোটটা কাঁধে ফেলে সিঁড়ি নামতে থাকে। একটু আবার লিসির দিকে ফিরে বলে
— “ এখন অফিসে যাচ্ছি। ভেবে নিও নিয়মটা মানবে কি না। ”
কিরিস নিচে চলে যায় লিসি নিজের ঠোঁটে হাত দিয়ে বলে —“ নির্লজ্জ বেডা লোক, ভীষণ মিষ্টি... আহ বেশি মিষ্টি খেলে ডায়বেটিস হয় তা জানে না নাকি ”
বলে লিসি সিঁড়ি উপরে দিকে তাকায় সিঁড়ির উপরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সুরভী চোখ বড় বড়।
হাতে থাকা চায়ের কাপ মুখে আর উঠছে না অবাকে শেষ সীমানার দাঁড়িয়ে আছে। পুরো সিনটা দেখে ফেলেছে।
সুরভী হতভম্ব কোনো রকমে মুখ থেকে কথা বের করে বলে — “ ও… ওকে… ঠিক আছে! আমি কিছু দেখিনি! কিছুই না! ”
লিসি সুরভীর কাছে দৌড়ে গিয়ে বলে—
— “ না না, এমন কিছু না! ভুল বুঝেছ! ”
সুরভী হাত তুলে বলে—
— ” আরে বাবা, মেনে নিয়েছি। মানে কখনো এটা আশা করিনি তো। তাই একটু শকট হয়ে গিয়েছিলাম। এতটা রোমান্টিক আমাদের বড় ভাই সেটা আমার জানা ছিলো না। আচ্ছা ঠিক আছে। এত ঘাবড়াস কেন? ”
একটু দুষ্টু হেসে যোগ করে লিসির গালে হাতে হালকা টেনে বলে —
— “ সকাল সকাল যা দেখলাম… সেটা তো খারাপ না। এইরকম সিন প্রত্যেকদিন দেখতে পারলে তো ভালই হয়। আমি মেনে নিয়েছি তোকে আমার হৃদয় বড় ভাবির জায়গায় বসিয়ে দিয়েছি ”
লিসি লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলে। নিচে গাড়ির শব্দ শোনা যায় কিরিস বেরিয়ে যাচ্ছে।সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লিসির ঠোঁটে অজান্তেই একটা ছোট হাসি লেগে থাকে।
সুরভী আর লিসি একসাথে নিচে নামে।
সকাল ঠিক ৯:৩০।
রায় চৌধুরী গ্রুপের হেড অফিস গ্লাস আর স্টিলের বিশাল টাওয়ার। লবিতে ঢুকতেই পরিবেশ বদলে যায়।
কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ ট্যাবলেট হাতে রিপোর্ট রিভিউ করছে।
হঠাৎ—
“গুড মর্নিং স্যার”
“মর্নিং স্যার”
“CEO স্যার আসছেন”
একটার পর একটা কণ্ঠ। কিরিস লিফট থেকে বের হয়।
তার পোশাক আর চলাফেরা বরাবরই চোখে পড়ার মতো চেহারায় কোনো তাড়া নেই, কিন্তু উপস্থিতিতেই চাপ।
মার্ক পাশে হাঁটছে, হাতে আইপ্যাড।
মার্ক —“ বস, আজকের শিডিউলটা একটু হেভি। ১০টায় বোর্ড মিটিং, ১১:৩০-এ সিঙ্গাপুর কল, দুপুরে ফাইন্যান্স টিম। ”
কিরিস হাঁটতে হাঁটতেই বলে—
— “ সিঙ্গাপুর ডিলটা হোল্ডে রেখো। টার্মস আবার রিভাইজ চাই। ”
মার্ক থামে না, নোট নেয়।
— “ ঠিক আছে। ”
কিরিস নিজের কেবিনে ঢোকে। পুরো ফ্লোর জুড়ে কাঁচের দেয়াল। শহরটা নিচে খেলনার মতো। সে চেয়ারেও বসে না।সোজা ফাইল নেয়।
কিরিস —“ এই প্রজেক্টে কে সাইন করেছে? ”
একজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এগিয়ে আসে।
— “ স্যার, আমি। ”
কিরিস চোখ তুলে তাকায়। এক সেকেন্ড।
—“ নামটা পড়েছ?”
— “ জি স্যার। ”
কিরিস — “ তাহলে এই ক্লজটা কীভাবে মিস করলে?”
ঘরে নিস্তব্ধতা। কিরিস ফাইলটা টেবিলে রাখে।
কিরিস — “ এখানে আমরা লিড করছি। ফলোয়ার না। ”
শান্ত গলায়, কিন্তু প্রশ্নাতীত।
কিরিস — ” আজকের মধ্যে ঠিক করে দাও। নইলে প্রজেক্ট নয় তুমি বদলাবে। ”
কেউ তর্ক করে না। কেউ প্রশ্ন করে না।
সবাই জানে— এই মানুষটা সিদ্ধান্ত নেয়, আর সেই সিদ্ধান্তই শেষ কথা। মার্ক হালকা করে বলে—
—“ বস, মিডিয়া ইন্টারভিউটা? ”
কিরিস চেয়ার টেনে বসে। ল্যাপটপ খুলে।
—“ ক্যানসেল। আজ কাজ কথা বলবে, আমি না।”
বোর্ড মিটিং শুরু হয়। স্ক্রিনে গ্রাফ, নাম্বার, প্রেজেন্টেশন।
সবাই কথা বলছে। কিরিস চুপচাপ শুনছে।
হঠাৎ—
— “ এই গ্রোথটা রিয়েল না। ”
একজন ডিরেক্টর চমকে ওঠে।
— “ মানে স্যার? ”
কিরিস:
— “ এটা শর্ট-টার্ম। আমি লং-টার্ম চাই। ”
স্ক্রিনে নিজেই কলম দিয়ে চিহ্ন টানে।
— “ এখানে কাট। এখানে ইনভেস্ট। আর এই ডিপার্টমেন্টে নতুন হেড। ”
সবাই শুধু মাথা নেড়ে নেয়। মিটিং শেষ। লোকজন বেরিয়ে যায়। কিরিস একা বসে কফিতে চুমুক দেয়।
মার্ক বলে—
— “ বস, আপনি চাইলে আজ একটু স্লো নিতে পারতেন।”
কিরিস জানালার বাইরে তাকায়।
শহরের কোলাহল। এক সেকেন্ডের জন্য তার চোখ নরম হয় তারপর আবার কঠিন।
— “ রাজা ব্যস্ত না থাকলে রাজত্ব থাকে না, মার্ক।
মার্ক হালকা হাসে।
—“ ঠিকই বলেছেন, My Lord। ”
কিরিস চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। আজকের দিন
শুধু কাজের। কিন্তু তার মন কোথাও অন্যখানে আটকে আছে। একটু পরে আবাট কিরিস তার চেয়ারে বসে।
ডেস্কে ফাইল, ট্যাবলেট, তিনটা স্ক্রিনে আলাদা আলাদা ডাটা।
—“এই ডিলটা আজকের মধ্যেই ক্লোজ চাই। না, আমি কাল না—এখন চাই।”
কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
একজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ঢুকেই থেমে যায়। —“সার, ইউরোপ সেকশনের—”
কিরিস চোখ তোলে।
“আমার সময় নষ্ট করো না। সলিউশন নিয়ে এসো।”
রুমে কেউ কথা বলে না। সবাই জানে—এই মানুষটার সামনে ভুল মানে শেষ। মার্ক এক পাশে দাঁড়িয়ে, হালকা রিলাক্সড। —“বস, মিডনাইট শিপমেন্ট রেডি।”
কিরিস মাথা নাড়ায়। —“ডাবল সিকিউরিটি। একটা স্ক্র্যাচও চাই না।”
সে কল কাটে। চেয়ারে হেলান দেয়।
দেখতে দেখতে বিকাল গড়িয়ে যায় চারপাশটা সূর্যের হালকা সোনালী আলোয় মোরা, বাড়ির ভিতরে হল রুমে বসে আছে সব কাজিনরা বড়রা নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত।
ড্রয়িংরুমে সোফা দখল করে বসে আছে কাজিনরা—সুরভী, আরোবি, জারা, নুসরাত আর লিসি। টিভিতে কিছু চলছে, কিন্তু কারও মন সেখানে নেই। সুরভী হঠাৎ লিসির দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসে
—“এই লিসি, আজকাল তুই খুব সিরিয়াস হয়ে গেছিস না?”
লিসি ভ্রু কুঁচকে —“মানে?”
সুরভী—“মানে, আগে আমরা বসে আড্ডা দিলে তুই হাসতিস, এখন তুই হাসিস ঠিকই কিন্তু চোখটা কই যেন অন্যদিকে থাকে।”
আরোবি খিলখিল করে হাসে—“ওই দিকে… অফিসের দিকে ”
লিসি গাল ফুলিয়ে বলে—“ধুর! এসব কিছু না।”
ঠিক তখনই জারা হঠাৎ বলে ওঠে— —“ইস্! এখন যদি আইসক্রিম থাকত!”
সবাই একসাথে— —“হ্যাঁ.....!”
আরোবি উঠে গিয়ে ফ্রিজ খুলে দেখে।
এক সেকেন্ড পর হতাশ মুখ —“খালি। একেবারে খালি!”
সুরভী সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয় গলায়—“এইটা তো অন্যায়!
এমন আবহাওয়ায় আইসক্রিম না থাকা মানে অপরাধ!”
লিসি হেসে বলে— —“আমরা চাইলে তো বাইরে থেকে আনাতে পারি।”
সুরভী মাথা নেড়ে —“না না, আমরা বললে দেরি হবে।
কিন্তু যদি নেত্রী বলে তাহলে কাজটা একদম VIP স্পিডে হবে।”
সবাই একসাথে লিসির দিকে তাকায়।
লিসি অবাক —“আমি?”
জারা —“ কিরিস ভাইয়ার কাছে ফোন দাও,কারণ ওনি একমাত্র ব্যক্তি যে কম সময়ে এই কাজটা করতে পারবে ”
নুসরাত —“ কিন্তু ফোন করবে কে? ”
সুরভী —“ লিসি.. কারণ লিসি আমাদের ছোট বোন ও বললে নিশ্চয়ই কিরিস পাঠিয়ে দেবে তাই না লিসি! ”
লিসি মুখ নিচু করে চুপ করে আছে এরা যে ইচ্ছে করে এটা করছে এটা বুঝতে বাকি নেই।
আরোবি কানে কানে—“তুই না বললে কিরিস করবে না,
আর তুই বললে…সে অফিস উল্টে ফেলবে । নে নে ফোন কর ”
লিসি একটু লজ্জা পেয়ে ফোনটা হাতে নেয়। একটু থেমে ডায়াল করে।
অফিসে কিরিস। গ্লাস ওয়াল কেবিন, সামনে বড় টেবিল, ফাইল, ল্যাপটপ। মার্ক পাশে দাঁড়িয়ে কিছু বোঝাচ্ছে।
ঠিক তখন ফোন ভাইব্রেট করে। কিরিস স্ক্রিন দেখে মুহূর্তেই সব থামায় —“মার্ক, ওয়ান মিনিট।”
ফোন ধরে —“হ্যাঁ?”
লিসির কণ্ঠ—“একটু আইসক্রিম পাঠিয়ে দিতে পাঠিয়ে দিতে পারবে, আসলে ফ্রিজের গুলো শেষ, একটু যদি.... ?”
কিরিসের কণ্ঠ একদম বদলে যায় —“কি ফ্লেভার?”
লিসি হকচকিয়ে —“এত তাড়াতাড়ি?”
—“বলো।”
—“চকলেট, ভ্যানিলা… আর স্ট্রবেরি।”
কিরিস হালকা হেসে —“পনেরো মিনিট।”
কল কেটে যায়।
মার্ক তাকিয়ে —“মিটিংটা…?”
কিরিস কোট তুলে নেয় —“তুমি আইসক্রিম নিয়ে যাও।”
মার্ক blink করে —“স্যার?”
—“বাড়িতে। এখন।”
মার্ক মুচকি হাসে—“ হুম আমি মিটিং টা ২০ মিনিট পিছিয়ে দিচ্ছি। ”
বলে মার্ক চলে যায় আর কিরিস চেয়ারে বসে ফোনটা হাতে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে মুচকি হাসে।
ঠিক সময়মতো বাড়ির গেটের সামনে গাড়ি থামে।
মার্ক নিজে নেমে বড় একটা ব্যাগ হাতে দেয়।
ভেতরে ঢুকতেই সবাই চিৎকার —“আইসক্রিম এসেছে.....!”
সুরভী লিসির কানে ফিসফিস —“দেখলি? আমরা বললে হয় না,তুই বললে কিরিস হ্যাঁ বলবেই, আমার ভাবি ।”
লিসি কিছু না বলে শুধু হেসে নেয়। আইসক্রিম ভাগ হতে থাকে হাসি, দুষ্টুমি, ঠাট্টা। লিসি এক চামচ আইসক্রিম মুখে দিয়ে মনে মনে ভাবে একটা ফোন কল, আর পুরো পৃথিবী একটু মিষ্টি হয়ে যায়।
দূরে অফিসের কেবিনে,কিরিস আবার কাজে বসে—
ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে। কারণ সে জানে,
বাড়িতে এখন সবাই খুশি।
সন্ধ্যা বেলা....
অফিস থেকে ফিরেই তিনজন—কিরিস, কাবির আর রিহান। গাড়ি থামতেই বোঝা যায়, দিনটা সহজ যায়নি।
কিরিসের মুখে সেই চিরচেনা ঠান্ডা ভাব,
কিন্তু চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ।কাবির ঢুকেই বলে —“আজকে আর পারছি না ভাই, মাথাটা ধরে আছে।”
রিহান জুতো খুলতে খুলতে —“অফিস না, আজকে যেন যুদ্ধক্ষেত্র ছিল।”
তিনজনই ওপরের দিকে চলে যায়।
ফ্রেশ শাওয়ার, পরিষ্কার কাপড়—
কিরিস ঘরে ঢুকে ঘরে ঢুকতেই তার শরীরটা ঢিলে হয়ে আসে, কিন্তু মনটা এখনো ভারী।
সন্ধ্যায় সবাই হলরুমে।
টিভি চলছে, কেউ গল্প করছে, কেউ মোবাইলে।
এমন সময় রান্নাঘর থেকে লিসি বের হয়—
হাতে ট্রে, তাতে ধোঁয়া ওঠা কফি।
সে সোজা কিরিসের কাছে গিয়ে ট্রেটা নামায়।
লিসি মৃদু গলায়—“অনেক ক্লান্ত লাগছে দেখছি। কফিটা গরম।”
কিরিস চোখ তুলে তাকায়। কথা কম, কিন্তু চোখে আলাদা নরমভাব—“তুমি বানিয়েছ?”
লিসি মাথা নাড়ায়। কিরিস কফিতে এক চুমুক দিয়ে ধীরে বলে —“এই কফিটাই সারাদিনের সব ক্লান্তি নামিয়ে দেয়।”
আরোবি পাশ থেকে ফিসফিস—“কফি না… বানানো মানুষটার জন্য ”
সুরভী —“এই কফিটা কিন্তু স্পেশাল ব্র্যান্ড—‘লিসি এডিশন’ ”
লিসি লজ্জা পেয়ে চুপ করে থাকে।
কিরিস শুধু হালকা হাসে—কিছু না বলেই।
এমন সময় আনোয়ার সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন —“কিরিস, তোর সাথে একটু কথা আছে।”
কিরিস সোজা হয়ে বসে —“জি বাবা।”
আনোয়ার হাতে একটা খাম তুলে দেন। ভেতরে কয়েকটা মেয়ের ছবি।
—“দেখ। পরিবার দেখেই বাছাই করেছি। এবার তোর বিয়েটা ঠিক করা দরকার।”
হলরুমে নিস্তব্ধতা।
কাবির আর রিহান চোখাচোখি করে তারপর লিসির দিকে তাকায় আরোবি সুরভীও লিসির দিকে তাকায় লিসি শুধু কিরিসের দিকে তাকিয়ে আছে কোনো কথা নেই সবাই চুপচাপ।
কিরিস শান্ত গলায় —“এখন এই বিষয়ে কথা বলতে চাই না।”
আনোয়ার একটু চটে —“সব সময় এই কথাই বলিস!
তোর বয়স কম নয়।”
রিহান হালকা হাসি দিয়ে —“চাচা, কিরিসের জিনিস জোর করে হয় না।”
আনোয়ার তাকিয়ে —“তুই মাঝখানে পড়িস না।
আমি বড়দের মতো কথা বলছি।”
এই কথা শুনে রিহান চুপ কিন্তু কাজিনরা মুখ বন্ধ করে হাসছে রিহানের কথায়।
হলরুমে তখনো সবাই আছে।
কিরিস চুপচাপ বসে ছিল এতক্ষণ।কিন্তু আনোয়ার আবার ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বলেন—
—“এইগুলো শুধু দেখার জন্য না, একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।”
এইবার কিরিস ধীরে ধীরে কফির মগটা টেবিলে নামায়।
টক। শব্দটা ছোট, কিন্তু ঘরের ভেতর অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে যায়। কিরিস উঠে দাঁড়ায় কণ্ঠে চিৎকার নেই—
বরং ভয়ংকর শান্ত।
—“বাবা, একটা কথা পরিষ্কার করে বলি।”
সবাই ওর দিকে তাকায়।
—“এই বাড়িতে থাকার শর্ত যদি হয়। আমাকে বিয়ে করতে হবে তাহলে এই বাড়িতে থাকার দরকার নেই আমার।”
হলরুমে নিস্তব্ধতা।
আনোয়ার অবাক হয়ে —“এই কী বলছিস তুই!”
কিরিস চোখ নামিয়ে নয়, চোখে চোখ রেখে—
—“আমি বিয়ে করবো কি করবো না, সেটা আমার সিদ্ধান্ত। কারও চাপের কারণে না।”
কাবির চুপ করে আছে। রিহান গম্ভীর। সুপ্রিয়া একবার লিসির দিকে তাকায় লিসি তখনো চুপ, একদম স্বাভাবিক। কিরিস আবার বলে—
—“আমার বিয়ে দরকার হলে আমি নিজেই করবো।
কিন্তু সেটা তোমাদের জোরাজোরি তেও না বা
এই বাড়িতে থাকার লাইসেন্স পাওয়ার জন্যও না।”
আনোয়ার গলার স্বর নামিয়ে —“তুই বাড়াবাড়ি করছিস।”
কিরিস ঠান্ডা হেসে —“না। আমি সীমা টানছি।”
এক সেকেন্ড থেমে আবার বলে—
—“এই বিষয়টা যদি বারবার উঠতে থাকে, আমি এখান থেকে সরে যাবো। তখন কেউ যেন না বলে আমি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
এইবার সুপ্রিয়া দ্রুত বলে ওঠে —“থামো দুজনেই।
আজ এখানেই শেষ।”
আনোয়ার আর কিছু বলে না। মুখ শক্ত করে বসে থাকে।
কিরিস আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। ঘুরে সোজা উপরের দিকে চলে যায়। সিঁড়ি ভাঙার শব্দ মিলিয়ে গেলে হলরুমে শুধু একটা ভারী শ্বাস পড়ে থাকে।
আর লিসি? সে কিছুই বলেনি।
কিন্তু সবাই বুঝে গেছে এই রাগের পেছনে শুধুই জেদ নেই কিছু একটা আছে… যেটা কিরিস কাউকে ছুঁতে দেবে না।
সময় যেন নদীর স্রোতের মতন বয়ে যায় কখন কিভাবে চলে গেল বোঝা যায় না দেখতে দেখতে একটা সপ্তাহ কেটে গেল আর এই একটা সপ্তাহর মধ্যে সবচেয়ে কমন জিনিস যেটা ছিল সেটা হচ্ছে কিরিসের বিয়ে কথা।
এক সপ্তাহ।
একটা সপ্তাহ—যেটা কিরিসের কাছে এক বছরের মতো লেগেছে দিনে কিছু না বললেও রাতে হলেই কথাটা উঠে আসে।
কখনো ডাইনিং টেবিলে—
—“এই বয়সে মানুষ সংসার গুছায়।”
কখনো খবরের কাগজ নামাতে নামাতে—
—“বাড়িতে একজন বউ এলে ঘরটা পূর্ণ হয়।”
কখনো একেবারে হালকা গলায়—
—“তোর জন্যই তো ভাবছি।”
কিরিস কিছু বলে না একবারও না সে শুধু শোনে।
চুপ করে কিন্তু প্রতিটা কথা তার ভেতরে কোথাও জমতে থাকে।

0 Comments