পর্ব :53
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ একটার পর একটা।
রাতের মধ্যে গ্রামের বাড়ি যেন হঠাৎ জেগে উঠল।
আনোয়ার প্রথম ঢোকে পেছনে আনারুল। তারপর মির্জা বেগম, সুপ্রিয়া, প্রিয়া—সবার চোখে একই আতঙ্ক।
মির্জা বেগম লিসিকে দেখেই বসে পড়েন।
—“আমার সোনা লিসি ঠিক আছে তো, কি হয়েছে ওর এমন কেন এই কিরিস লিসি ঠিক আছে তো! ,”
গলা কেঁপে ওঠে।
সুপ্রিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ ভিজে গেছে, কিন্তু সে কাঁদছে না প্রিয়া এগিয়ে এসে কিরিসের পাশে বসে।
—“ঠিক আছে কিনা এইটা বল ?”
কিরিস মাথা নাড়ায়।
—“ ঠিক আছে,”
ইশান বলে,
—“ঘুম দরকার ওকে একটু সুয়ে থাকতে দে ”
আনোয়ার চাচা কিরিসের কাঁধে হাত রাখেন।—“তুই এখানেই থাক, আমরা আছি।”
রাত গভীর হয়।
সবাই একে একে বাইরে চলে যায়। কেউ চা আনে, কেউ প্রার্থনা করে ঘরে থাকে শুধু কিরিস আর লিসি। ঘরের বাতিটা মৃদু আলো দিচ্ছে। লিসির মুখটা সেই আলোয় ফ্যাকাশে, কিন্তু শান্ত কিরিস বিছানার পাশে বসে।
আস্তে করে বলে—
—“লিসি… ঘুমাও আমি আছি ।”
সে জানে, লিসি শুনতে পাচ্ছে না।
তবু বলে।
—“ তোমাকে ছোঁয়ার অধিকার শুধু আমার আছে।
তাই নিশ্চিত থাকো অলকানন্দা তোমাকে কেউ ছুঁতে পারবে না ।”
তার চোখ যায় লিসির চুলের দিকে।চুল—যেটা একসময় হাঁটুর অনেক নিচে, পায়ের গোড়ালি ছুঁয়ে থাকত। চলতে গেলে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ত। আজ।সেটা কাটা।হাঁটুর নিচে এসে থেমে গেছে কিরিস চোখ বন্ধ করে। কিরিস লিসির পাশে চুপচাপ বসে আছে।
গ্রামবাড়িটা এমনিতেই পরিষ্কার।তবু এতগুলো মানুষ হঠাৎ এসে পড়ায় সবাই যেন নিজের অজান্তেই কাজে লেগে যায়। রুমি হালকা করে সবার ঘর পরিষ্কার করে দেয়। এমনি তেই ঘরগুলো পরিষ্কার থাকে সবসময় পরিষ্কার করে রাখা হয়। সবাই যে যার ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে থাকে আর এই দিকে রাতে গভীর হতে প্রিয়া আর সুপ্রিয়া কিচেনে ঢোকে।
—“রাতে ভারী কিছু দরকার নেই,”
সুপ্রিয়া বলে,
—“হালকা চা বানাই।”
রুমিও চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে কাপগুলো নামিয়ে দেয়।
চুলায় কেটলি বসে, চায়ের পাতার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে গোটা বাড়িতে।
গ্রামের বাড়ির মাঝারি হলরুমে সবাই এসে বসে। কেউ কথা বলছে কম, কেউ একেবারেই না সবার চোখে ক্লান্তি, চিন্তা, আর একটা অদ্ভুত স্বস্তি যেন সবাই ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছে। ওইদিকে, ভেতরের ঘরটায় শুধু লিসি আর কিরিস, লিসি এখনো শুয়ে আছে। ঘুম না, অজ্ঞান না—একটা গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে।কিরিস চেয়ারে বসে আছে তার পাশে।এক হাত লিসির বিছানার ধারে, যেন ছুঁয়ে আছে—আবার ছোঁয়াও না।সে তাকিয়ে থাকে লিসির মুখের দিকে।শ্বাসের ওঠানামা গুনে গুনে দেখে।
এত লোক বাড়িতে, তবু ঘরটার ভেতর অদ্ভুত শান্ত।
সুপ্রিয়া হাতে একটা ট্রে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘরে ঢোকে।
এক কাপ কফি,আর সঙ্গে হালকা কিছু নাস্তা।
কিরিসকে দেখে সে একটু থামে ছেলেটা বসে আছে, ঠিক যেমনটা সে ভেবেছিল লিসির পাশ ছাড়েনি এক মুহূর্তের জন্যও।
—“এই নে,”
খুব নিচু গলায় বলে সুপ্রিয়া,
—“রাতে কিছু খাস নি।”
ট্রেটা টেবিলে রেখে সে আর কিছু বলে না।শুধু একবার লিসির দিকে তাকায় তারপর ছেলের দিকে।মায়ের চোখে প্রশ্ন নেই, উপদেশ নেই শুধু বুঝে নেওয়া।কিরিস ধীরে মাথা নেড়ে কফির কাপটা হাতে নেয়।চুমুক দেয়, কিন্তু চোখ লিসির দিক থেকেই সরে না ঘরটার ভেতর তখন
একটা অদ্ভুত দৃশ্য বাইরে পুরো বাড়ি জেগে আছে,
আর এই ঘরে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে
চুপচাপ পাহারা দিচ্ছে।
ঘরের ভেতরটা নিস্তব্ধ।
বাইরের হলরুমে মানুষের গুঞ্জন থাকলেও, এই ঘরটায় ঢুকলেই শব্দ যেন থেমে যায়।লিসি শুয়ে আছে বিছানায়—শরীর শান্ত, মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু ভেতরে কত ঝড় বয়ে গেছে তার চিহ্ন লুকোনো যায় না। কিরিস চেয়ারে বসে আছে একদম পাশে তার চোখ লিসির মুখে স্থির।
একবারও সরে না এই সময় দরজার কাছে হালকা শব্দ সুপ্রিয়া একবার লিসির দিকে তাকান তারপর ছেলের দিকে মা–ছেলের চোখে চোখ পড়ে।কোনো কথা লাগে না।সুপ্রিয়া ধীরে এসে বিছানার একপাশে বসেন।লিসির কপালের কাছে হাত রাখেন—মা হয়ে নয়,একজন অভিভাবক হয়ে।
—“ঘুমটা গভীর,”
খুব আস্তে বলেন তিনি।
কিরিস মাথা নেড়ে বলে,
—“ইশান বলেছে জেগে উঠতে সময় লাগতে পারে।”
সুপ্রিয়া আর কিছু বলেন না শুধু চুপচাপ থাকেন।
এক এক করে সবাই ঘরে ঢুকতে থাকে মির্জা বেগম আগে।তারপর আনোয়ার, আনারুল রিহান, কাবির, ইয়াবি, আরোবি, জারা, ইশান—সবাই।
কেউ কথা বলে না কেউ চেয়ার টানে না যেন এই ঘরে শব্দ করাটাও অপরাধ।সবাই দাঁড়িয়ে বা বসে থাকে, চোখ এক জায়গায় লিসির দিকে।হঠাৎ মির্জা বেগমের কণ্ঠ ভাঙে নীরবতা।
—“নুহানের কি হয়েছে?”
তিনি প্রশ্ন করেন,
—“কোথায় সে?”
ঘরের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে আসে কিরিস কিছু বলে না। শুধু ধীরে ছেলেদের দিকে তাকায় ইয়াবি এক কদম এগিয়ে এসে বলে,
—“পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।”
এক মুহূর্ত থামে, তারপর হালকা স্বরে যোগ করে—
—“ওকে না… ওর লোকজনদেরকেও।”
এই কথাটা শুনে আরোবির চোখ বড় হয়ে যায়। সে তাকায় ইয়াবির দিকে।সে জানে—এটা পুরো সত্য না।
কি বড় একটা মিথ্যা কতা বলবো কিন্তু আরোবি কিছু বলে না। মির্জা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলেন চোখ বন্ধ করেন এক মুহূর্তের জন্য।
—“ভালো,”
শুধু এটুকুই বলেন তিনি এই সময় বিছানায় লিসির শরীর হালকা নড়ে ওঠে খুব সামান্য।কিন্তু কিরিস টের পায় সবার আগে। সে সোজা হয়ে বসে।ইশান নিচু স্বরে বলে—
—“হয়তো ঘুম ভাঙছে… মানে জ্ঞান ফিরছে।”
লিসির কপালে ভাঁজ পড়ে ভুরু কুঁচকে যায়।একটা চাপা শব্দ বের হয় গলা থেকে ভয়ের শব্দ। কিরিস আর দেরি করে না।সে হাত বাড়িয়ে লিসির হাত ধরে শক্ত করে না,
আবার আলগাও না ঠিক যেমনটা দরকার।
—“লিসি,”
খুব নিচু স্বরে ডাকে সে,
—“আমি আছি।”
লিসির আঙুল কেঁপে ওঠে মির্জা বেগম এগিয়ে এসে
অন্য পাশে বসেন।
—“মা,”
আস্তে বলেন তিনি,
—“ভয় পাস না।”
ঘরের ভেতর তখন সবাই আছে কিন্তু কেউ সামনে আসে না।কেউ প্রশ্ন করে না শুধু উপস্থিত লিসির চোখ এখনো পুরো খোলে না, কিন্তু তার শ্বাস দ্রুত।ভয়ের স্মৃতি এখনো তার শরীরে আটকে আছে কিরিস তার হাত ধরে রাখে।
একটু ঝুঁকে এসে বলে—“ কিছু হয়নি, সবাই আছে দেখো!”
লিসির কপাল থেকে একফোঁটা ঘাম গড়িয়ে পড়ে। কিরিস নিজের আঙুলে মুছে দেয়। সুপ্রিয়া চুপচাপ দৃশ্যটা দেখেন।
হঠাৎ করে লিসির শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে।
একটা তীব্র শ্বাস,তারপর—
—“আ…!”
চিৎকার করে উঠে বসে লিসি।চোখ দুটো আতঙ্কে বড়, শ্বাস এলোমেলো। চারপাশে তাকানোর সময় নেই, কিছু বোঝার আগেই তার চোখ গিয়ে পড়ে কিরিসের মুখে।এক মুহূর্তও দেরি করে না সে। লিসি হঠাৎ করে সামনে ঝুঁকে
কিরিসকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে এমন করে ধরে,যেন ছেড়ে দিলেই সব আবার ভেঙে যাবে।
—“ভাইয়া…!”
ফুপিয়ে ওঠে সে কথা আর বের হয় না শুধু কান্না, দম আটকে আসা কান্না,ভয়ে জমে থাকা কান্না,বেঁচে যাওয়ার কান্না। ঘরের ভেতর সবাই চুপ করে তাকিয়ে থাকে কেউ নড়ে না,কেউ কথা বলে না এই মুহূর্তটা শুধু ওদের। কিরিস প্রথমে একটু অবাক হয়,তারপর ধীরে ধীরে দু’হাত দিয়ে লিসিকে জড়িয়ে ধরে। শক্ত করে নয়,আবার ঢিলাও না। একদম যেমনটা দরকার।
—“শান্ত হও,”
নিচু গলায় বলে সে,
—“আমি আছি।”
লিসির কাঁধ কাঁপছে। তার হাতের মুঠো আরও শক্ত হয় কিরিসের জামায়।
—“সব ঠিক আছে,”
কিরিস আবার বলে,
—“ দেখো সবাই আছে, বাড়ির সবাই আছে... লিসি দেখো আমার কথা শোনো ”
কিন্তু লিসি তখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। তার কাছে সবকিছু এখনো ঘোরের মতো।মনে হচ্ছে এটা একটা স্বপ্ন, সে যদি এখন কিরিসকে ছেড়ে দেয় তাহলে সব আবার এলোমেলো হয়ে যাবে। সে ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলে—
—“আমি… আমি ভয় পেয়েছিলাম…”
কিরিস একটু পেছনে সরে লিসির মুখটা নিজের দিকে তোলে।
—“দেখ,”
আস্তে বলে,
—“চারপাশে তাকাও।”
লিসি কাঁপা চোখে তাকায় এক এক করে মুখগুলো দেখতে পায়—
মির্জা বেগম,সুপ্রিয়া,আনোয়ার,আনারুল,রিহান, কাবির, ইয়াবি, আরোবি, জারা, ইশান…
সবাই আছে। কেউ কোথাও যায়নি।লিসির শ্বাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। সে আবার কিরিসের দিকে তাকায়।
—“আপনি… সত্যিই আছেন?”
ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে। কিরিস হালকা হাসে,
—“আছি। একদম এখানেই।”
এইবার যেন লিসির ভেতরের কিছু ভেঙে পড়ে। সে ধীরে ধীরে কিরিসের বুক থেকে সরে বিছানার পাশে নামতে চায়। মির্জা বেগম তখন এগিয়ে আসেন।লিসি তাকায় তার দিকে।এক মুহূর্ত দেরি করে না।সে উঠে গিয়ে
মির্জা বেগমকে জড়িয়ে ধরে।
—“নানু.....”
কণ্ঠ ভেঙে যায়। মির্জা বেগম দুই হাত দিয়ে লিসির মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরেন।
—“আছি মা,আমি আছি কিছু হবে। আমার লিসির কিছুর হবে না ”
সুপ্রিয়া কাছে এসে লিসির পিঠে হাত রাখেন। জারা চোখ মুছে নেয়।আরোবি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু চোখ ভিজে। রিহান নিচু স্বরে বলে—
—“আর ভয় নেই, ”
ইয়াবি —“ আরে বোন আমার, আমরা আছি তোর কিছু হবে না! ”
এই ঘরে তখন কেউ একা না। লিসি ধীরে ধীরে জ্ঞানে ফিরে আসে। ভয়টা এখনো আছে,কিন্তু তার চারপাশে
এতগুলো হাত,এতগুলো মানুষ।সে আবার কিরিসের দিকে তাকায়। কিরিস শুধু মাথা নেড়ে বলে—
—“ সব ঠিক হয়ে গেছে, তুমি এখন নিরাপদ, বাড়ির সবাই আছে এখন তোমার সামনে ”
আর এইবার লিসি বিশ্বাস করে।
রাতের আঁধার ঘরে ধীরে ধীরে নেমে এসেছে।
লিসি এখনও চুপচাপ বসে আছে। চোখের কোণ ভেজা,
হৃদয়টা দগদগ করছে,আতঙ্কের ঢেউ এখনও বাকি আছে। কিন্তু কিরিস পাশে বসে আছেন।তার হাত লিসির কাঁধে রাখা,মৃদু চাপ দিয়ে বলে—
—“সব ঠিক হয়ে যাবে, তুমি আমার কাছে আছো। আর কেউ তোমার গায়ে হাত দিতে পারবে না।”
লিসি ধীরে ধীরে কাঁপা হাত সরিয়ে কিরিসের হাত ধরে শক্ত করে চেপে ধরে।মনের ভয়টা ঠিক হয়ে যায় না,
কিন্তু বুকটা আর একা নেই।কিরিসের শান্ত, দৃঢ় উপস্থিতি লিসিকে কিছুটা হালকা করে। ঘরের অন্য প্রান্তে সবাই এখনো সাইরেন্স বজায় রেখেছে। একে একে সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যায় লিসিকে একটু একা থাকতে দেয় কিন্তু একেবারে নয় তার পাশে আরবি ও জারা বসে আছে,কিরিস ও বাইরে চলে গেছে। জারা আর আরোবি লিসির পাশে বসে লিসিকে শান্তনা দেচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে সুপ্রিয়া ঘরে আসে হাতে খাবার ট্রে ভিতরে ঢুকে মৃদু হাসি আর সহানুভূতির চোখে তারা লিসিকে দেখে।সুপ্রিয়া কাছাকাছি চলে আসে।
—“লিসি, এবার তুমি নতুন জামা পরে নাও, আর হালকা রাতের খাবার খাও,”
হালকা স্বরে বলে সে। লিসি শুরুতে চাইছে না,কিন্তু সুপ্রিয়ার চোখের কোমলতা আর মাতৃসুলভ ভাব
লিসিকে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়। লিসি গিয়ে পরনের শাড়ি ওড়না সব জিনিস খুলে ঠিক আগের লিসির মতো একটা গাউন পরে আসে, এসে সুপ্রিয়ার পাশে বসে।
সুপ্রিয়া লিসির হাতে চামচ তুলে দিয়ে বলেন—
—“থামো না, খাও। এটাই তোমার শক্তি বাড়াবে।”
লিসি ধীরে ধীরে মুখে খায়,প্রথমে একদম চুপচাপ,
কিন্তু কয়েকটি গাল খাওয়ায় বোঝায়—সন্তানিক ভয় কেটে আসছে।আরোবি ওয়াশরুম থেকে লিসির খুলে রাখা শাড়ি আর জিনিসগুলো হাতে নিয়ে বাইরে যেতে থাকে। লিসি আর বাকিরা তখন নিজেদের কথায় এতটাই ডুবে ছিল যে ওইদিকে কারও চোখ যায় না। সেই সুযোগেই আরোবি ধীরে ধীরে উঠানের দিকে এগিয়ে যায়।ঠিক উঠানে পা রাখতেই মুখোমুখি হয় কিরিসের সঙ্গে। কিরিস তখন উঠানে দাঁড়িয়ে বেয়ার খাচ্ছিলো। আরোবির হাতে থাকা জিনিসগুলোর দিকে কিরিসের চোখ এক ঝলক পড়তেই তার চোখের দৃষ্টি বদলে যায়। ঠান্ডা, কঠিন—কিন্তু ভেতরে আগুন লুকানো।
কিরিস এক পা এগিয়ে এসে নিচু কণ্ঠে বলে
—“আমার কাছে দে।এইগুলো চোখে দেখার যোগ্য নয়।”
আরোবি কোনো প্রশ্ন করে না। এক মুহূর্ত দেরি না করে জিনিসগুলো কিরিসের হাতে দিয়ে চুপচাপ সরে যায়।
কিরিস উঠানের একপাশে চলে যায়। পকেট থেকে একটা ড্যাসলাইট বের করে। হাতে থাকা বিয়ারের ক্যান খুলে একেবারে নির্দয়ভাবে ঢেলে দেয়—লাল শাড়ি আর বাকি জিনিসগুলোর ওপর।
পরের মুহূর্তেই আগুন।
দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে শাড়ি, কাপড়, স্মৃতি।
আগুনের শিখা উঁচু হয়ে নাচতে থাকে, আর কিরিস একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই আগুনের দিকে—চোখে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো আফসোস নেই।
নিচু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে সে বলে
—“তোমার ছোঁয়া জিনিস অন্য কেউ ছুঁতে পারে না।
আর যার সঙ্গে তোমার খারাপ স্মৃতি জড়িয়ে আছে—
সেই জিনিসটাই আমি জ্বালিয়ে দেবো।
তোমার জীবনে কোনো খারাপ কিছু থাকতে পারে না, অলকানন্দা ।”
ঠিক সেই সময় পূর্ব কোণে সূর্য উঠতে শুরু করে।
সূর্যের হালকা সোনালি আভা আর জ্বলতে থাকা আগুন একসাথে মিলেমিশে যেন একটাই কথা প্রমাণ করে—
কিরিস মিথ্যে বলে না।
লিসির জীবনে খারাপ স্মৃতির কোনো জায়গা নেই।
ভোরের আলো ধীরে ধীরে গ্রামটাকে জাগিয়ে তোলে।
পূর্ব আকাশে হালকা সোনালি রঙ, কুয়াশার পর্দা ভেদ করে সূর্যের প্রথম আলো উঠানে ছড়িয়ে পড়ে। রাতের নীরবতা ভেঙে দূরে কোথাও মোরগ ডাকার শব্দ, গাছের ডালে ডালে পাখিদের কিচিরমিচির।
রায় চৌধুরী বাড়ির উঠানটা তখনো শিশিরে ভেজা।
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে জ্বাল দেওয়া চুলার শব্দ। সুপ্রিয়া আর প্রিয়া দু’জনেই ভোরেই উঠে পড়েছে। একপাশে কেটলি বসানো, অন্যপাশে ভেজে নেওয়া হচ্ছে পেঁয়াজ আর মরিচ—কাঁচা চালের ভাত বসবে আজ সকালে। গ্রামের সকালের গন্ধটাই আলাদা।
আনোয়ার আর আনারুল মির্জা বেগম বসে আসে একপাশে তাদের মুখের আবভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা কিছু জরুরী বিষয় নিয়ে কথা বলছে,
উঠানের এক পাশে রিহান, ইয়াবি, কাবির, ইশান, জারা আর আরোবি গোল হয়ে বসে আছে। কারো হাতে চা, কারো হাতে বিস্কুট। হালকা হাসি-ঠাট্টা চলছে।
কিরিস ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে শান্ত ভাব, কিন্তু নজরটা সব সময় চারপাশে।
এমন সময় ঘরের দিক থেকে লিসি বেরিয়ে আসে।
হালকা রঙের থ্রি-পিস করা। চুল খোলা, মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে এক ধরনের নরম ভাব। সে এসে আরবি আর জারার মাঝখানে বসে।আরোবি সঙ্গে সঙ্গে বলে
—“আরে বাহ, আজ তো আমাদের মাঝে রানি এসেছে!”
জারা হেসে ওঠে
—” হুম এই লিসি, চল বাড়ি তারপর দেখবি সুরভী আর নুসরাত তোর জন্য কি করেছে ।”
ইশান মজা করে বলে— “ কি করবে সোনা তুমি থাকলে তো আর কিছু লাগে না,”
রিহান —“ এই আরোবি কি করছে আমার বউ নুসরাত বল না! ”
আরোবি —“ তুই যদি এখন আমার পাও ধরিস না তাহলেও বলবো না কারণ এই সারপ্রাইজ টা লিসির জন্য”
ইয়াবি—“ বাদ দে রিহান এরা মেয়ে মানুষ, পেট থেকে কথা বের কথা অতো সোজা না, কি বলো আমার বোন মিষ্টি লিসি...!”
কাবির—“ শুধু মিষ্টি লিসি নাকি, কেক, চকলেট,আইসক্রিম, রসগোল্লা, গোলাপ জামুন, সন্দেশ সব মিষ্টি স্বাদের বোন লিসি ”
লিসি হালকা হাসে। তারপর বলে —“ এর থেকে ভালো তুমি আমাকে মিষ্টির দোকান বলে দিতে ”
অনেকক্ষণ পর এই হাসিটাই যেন ওর বুকটা একটু হালকা করে দেয়। আর সবাই ও খুশি হয় লিসির কথা শুনে। যাক একটু হলেও লিসির মনটা হালকা হয়েছে এবং পুরোনো কথাগুলো ভুলতে পারছে।
রিহান বলে
—“এই তো, হাসিটা ঠিক আছে। এভাবেই থাক।”
কাবির যোগ করে
—“গ্রামের বাতাস কাজ করছে মনে হয়।”
লিসি কিছু বলে না, শুধু মাথা একটু নিচু করে হাসে।
কিরিস দূর থেকেই সবটা দেখে। চোখে কোনো হস্তক্ষেপ নেই, শুধু একরাশ নিশ্চিন্তি।
ঠিক তখনই প্রিয়ার ডাক
—“এই যে সবাই, খাওয়ার জন্য এসো!”
এক এক করে সবাই উঠে পড়ে।সবাই ঘরের ভেতরে ঢোকে।গ্রামের বাড়ি হলেও রায় চৌধুরী বাড়ির ডাইনিং রুমটা আধুনিক। বড় ডাইনিং টেবিল, ঝকঝকে চেয়ার—এক দিক থেকে রাজকীয় পরিবেশ। আবার জানালা দিয়ে দেখা যায় গ্রামের উঠান, গাছপালা, খোলা বাতাস।
দুটো জগৎ যেন এক জায়গায় মিশে আছে।
সবাই টেবিলে বসে খাওয়া শুরু করে।
খাওয়ার মাঝেই কিরিস গম্ভীর কিন্তু শান্ত কণ্ঠে বলে—“খাওয়ার পরে আমরা বের হচ্ছি। গাড়ি কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। সবাই খাওয়া-দাওয়া করে গুছিয়ে নাও, আমরা খাওয়ার পরেই বের হব।”
সবাই মাথা নাড়ে। —“ঠিক আছে।”
লিসি চুপচাপ। কোনো কথা নেই। খাওয়া শেষ হয়।
সবাই যে যার মতো হালকা করে নিজেকে গুছিয়ে নেয়—এক রাতের জন্যই তো আসা। লিসি নিজের প্রয়োজনের কিছু জিনিস চুপচাপ গুছিয়ে নেয়। কিছুক্ষণ পর একে একে তিনটা গাড়ি এসে দাঁড়ায় উঠানে। বাড়ির সবাই বেরিয়ে আসে। শহরের দিকে রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি।
ঠিক তখনই উঠানের এক পাশ থেকে তামান্না এগিয়ে আসে। লিসিকে দেখেই তামান্নার মুখে এক মুহূর্তে হাসি ফুটে ওঠে মনটা যেন ভালো হয়ে যায়।সে একদম কাছে এসে কোনো কথা না বলে লিসিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। লিসি কিছুক্ষণ থমকে থাকে…তারপর ধীরে ধীরে দু’হাত তুলে তামান্নাকে জড়িয়ে ধরে।এই আলিঙ্গনটা যেন লিসির বুকের ভেতরের সব চাপ একটু হলেও কমিয়ে দেয়।
লিসি—“ তুই কোথায় ছিলি রাতে ঠিক মতো বাড়ি পৌঁছে ছিলি তো! ”
তামান্না —“ হুম তুই...তুই ঠিক আছিসতো, কিছু হয়নি তো তোর? ”
লিসি —“ নাহ ঠিক আছে, কারণ ঠিক মানুষকে ফোন করেছিলি তুই ”
বলে লিসি কিরিসের দিকে তাকায় তখন কিরিস ফোন ঘাটছে দাঁড়িয়ে। মির্জা বেগম একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিলেন। চোখে কৃতজ্ঞতা, মুখে নরম হাসি।তিনি এগিয়ে এসে তামান্নার কাঁধে হাত রাখলেন
—“মা, তুই একা ফেলে যাস নাই… এইটাই আমাদের জন্য অনেক বড় কথা। এমন বিপদের সময় পাশে থাকা সবার ভাগ্যে থাকে না।”
তামান্না একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে —“এটা আমার দায়িত্ব ছিল দাদি । ও আমার শুধু বান্ধবী না… আমার বোন হয় বুঝেছো ।”
মির্জা বেগমের চোখ ভিজে ওঠে
—“আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক মা।”
আনোয়ার —“ হুম তোমার মতো একটা বোন পাওয়া লিসির জন্য ভাগ্যের ”
আনারুল —“ ঠিক বলেছেন ভাইজান এখন এরকম বোন পাওয়া যায় না ”
তখন আরোবি আর জারা এগিয়ে এসে মুখ ফুলিয়ে বলে —“ বললেই হল তাহলে আমরা কি জলে ভেসে এসেছি, লিসি আমাদের বোন বুঝেছ যে তাকাবে তার চোখ তুলে নিয়ে আসবো, তাই না আরোবি ”
আরোবি— “ হুম পরেরটুকু বললি না তো যে চোখ তুলে দানা গুড় দিয়ে খাব? ”
ইয়াবি—“ কেন রাক্ষসী নাকি তোরা ”
কাবির —“ অবশ্য তাই তো রাক্ষসী সব, ”
সুপ্রিয়া—“ তোরা থামবি একটা সিরিয়াস সময়ও মজা, তামান্না তোমাকে ধন্যবাদ আমার মেয়েকে বাঁচানোর জন্য”
তামান্না হেসে প্রশংসা টা গ্রহণ করে। সবার কথার মাঝে কিরিস চুপ ছিলো। তামান্না আর লিসি হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময় পেছন থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে কিরিস।তামান্নার দিকে একবার তাকায়। সেই তাকানোটা ভয়ংকর না, বরং গভীর—যেন সে মানুষটাকে অনেক আগেই চিনে রেখেছে। কিরিস শান্ত কণ্ঠে বলে —“তোমার সম্পর্কে আমি সব জানি।”
তামান্না একটু চমকে তাকায়।
—“ভালো স্টুডেন্ট, পড়ালেখায়ও ভালো… সামনে আরও অনেক দূর যেতে চাও... ।”
কিরিস এক পা এগিয়ে আসে
—“তোমার পড়ালেখার সব খরচ আমি বহন করবো। শুধু পড়াশোনা করো।”
চারপাশটা হঠাৎ চুপচাপ।
—“তোমার বাবার সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। বিদেশে পড়ার জন্য তোমার কোর্স সিলেক্ট করে দেওয়া হবে। চিন্তা করো না।”
তামান্না হতবাক।
—“এই মানে… এটা তো অনেক বড়—”
কিরিস মাথা নেড়ে থামিয়ে দেয়
—“না। এটা খুব ছোট্ট একটা উপহার।”
একটু থেমে, গলা আরও ভারী হয়ে আসে
—“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহারকে বাঁচানোর জন্য।”
এই কথা শুনে রিহান, কাবির, ইয়াবি, ইশান—একসাথে হালকা হাসে। জারা আর আরোবি চোখাচোখি করে মুচকি দেয়।
আর লিসি?
লিসি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কিরিসের দিকে।
কিছু বলতে গিয়েও পারে না। বুকের ভেতরটা ভরে ওঠে—কথা আটকে যায় গলায়। মির্জা বেগম চোখ মুছেন।
সুপ্রিয়া ফিসফিস করে
—“এই ছেলেটা আল্লাহর পাঠানো।”
বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হয়। কাজিনরা ঠাট্টা শুরু করে ইশান বলে
—“আরে তামান্না, বিদেশে যাওয়ার আগে তুমি একবার ঢাকায় আমাদের বাসা থেকে ঘুরে এসো !”
ইয়াবি হেসে—
—“বিদেশ গিয়া আবার বড় মানুষ হইস! এখন তো ছোট দেখাচ্ছে ”
তামান্না হেসে মাথা নাড়ে। গাড়ি ভাগ করা হয়।
কাবির, রিহান, ইয়াবি, ইশান, জারা—এক গাড়িতে।
আনোয়ার, আনারুল, প্রিয়া, সুপ্রিয়া, মির্জা বেগম—আরেক গাড়িতে।
আর কিরিসের গাড়িতে— লিসি আর আরোবি।
আরোবি পেছনে উঠে পড়ে
—“ ওই, সামনে বস, একবারও পিছনে আসার চিন্তা করিস না ।”
লিসি একটু ইতস্তত করে সামনে বসতে যায়। হাঁটার সময় কিরিস খেয়াল করে লিসি খুড়িয়ে হাঁটছে, পায়ের তলায় ব্যথা যার জন্য লিসি স্বভাবিক ভাবে হাঁটতে পারছে। কিরিস কিছু না ভেবে লিসির কাছে যায়, হুট করে লিসিকে কোলে তুলে নেয় লিসি অবাক হয়ে বলে উঠে
—“ কি করছেন নামান! ”
কিরিস —“ চুপ করে থাকো ”
এই দৃশ্য টা সবাই দেখে সবার মুখে হালকা মিষ্টি হাসি কিন্তু আনোয়ার একটু চোখ সরু করে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। লিসিকে সিটে বসিয়ে দিয়ে কিরিস নিজেই ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট হয়। গাড়ি চলতে শুরু করে। লিসি একটু অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসে। কয়েক ঘন্টা অনবরত দৌড়ানোর কারণে এবং রাস্তার পিছে যেমন লাল হয়ে গেছে তেমন খানিক জায়গায় কেটে গেছে যার জন্য পায়ের তলাটা যেন জ্বলছে। জুতো পরেও ব্যথা যাচ্ছে না। জানালা দিয়ে হালকা বাতাস এসে পায়ে লাগছে—তাতে শান্তি আছে, কিন্তু ব্যথাও আছে।
আরোবি পেছন থেকে ফিসফিস করে —“ব্যথা করছে?”
লিসি ছোট করে মাথা নাড়ে—“হ্যাঁ… একটু।”
আরোবি মজা করে
—“বীরাঙ্গনা হইছোস, ব্যথা তো হবেই!”
লিসির ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি আসে। কিরিস সব বুঝেও কিছু বলে না চুপচাপ গাড়ি চালায়।
হাতটা স্টিয়ারিংয়ে শক্ত, কিন্তু বুকের ভেতরটা নরম।
সে জানে লিসি এখনো কিছু বলেনি। কিন্তু তার না বলা ভালোবাসা… এই গাড়ির নীরবতার মধ্যেই ভরে আছে।
তামান্নাকে বিদায় জানিয়ে একটার পর একটা গাড়ি শহরের দিকে চলে যায়। সবচেয়ে পেছনে নীরবে, পাহারার মতো কিরিসের গাড়ি। গ্রামটা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়।আর সামনে অপেক্ষা করছে—নতুন অধ্যায়।
লিসি এখনো অস্বস্তিতে আছে। বারবার হালকা করে পা নাড়িয়ে তুলছে—যেন বাতাসটা পায়ের তলায় একটু ছুঁয়ে যায়। ছোট ছোট এই নড়াচড়া কিরিসের চোখ এড়ায় না।
সামনে একটু দূরেই বড় একটা বাজার। আলো, মানুষ, শব্দ—সব মিলিয়ে ব্যস্ততা।কিরিস হঠাৎ গাড়িটা বাজারের ভেতর দিয়ে ঢুকিয়ে একপাশে থামিয়ে দেয়। লিসি আর আরোবি দুজনেই একটু অবাক। কিরিস পকেট থেকে ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে আরোবির দিকে এগিয়ে দেয় —“গিয়ে কিছু খাবার কিনে আন। লিসির জন্য আইসক্রিম আর চিপস আনিস।”
আরোবি মুচকি হেসে —“আর আমি কী করবো?”
কিরিস শান্ত গলায়
—“তোর যা ভালো লাগে তাই আনিস। আর আমার জন্য একটা রেডবুল।”
লিসি শুধু কিরিসের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলবে—কিন্তু বারণও করতে পারছে না।
আরোবি দরজা খুলতে খুলতে বলে
—“নে, আমি বুঝি তোরা একা একটু সময় চাইছিস। আমি যাচ্ছি, তোরা যা করার করে নে।”
লিসি আর চুপ থাকতে পারে না
—“আরোবি, তুই কি সব—”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আরোবি নেমে গেছে।
গাড়ির ভেতরে হঠাৎ নিস্তব্ধতা। শুধু কিরিস আর লিসি। লিসি কিরিসের দিকে তাকায়। চোখে চোখ পড়তেই দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়।
কিরিস ধীরে সিটবেল্ট খুলে লিসির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
লিসি যেন সিটের সাথে মিশে যায়।এই অবস্থায় কিরিস লিসির মুখের দিকে তাকিয়ে হালকা মুচকি হাসে। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লিসির পা দুটো টেনে তুলে নিজের কোলে রাখে।এক মুহূর্তের জন্য লিসি অবাক হয়ে যায়। হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে সে পিঠ ঠেকায় গাড়ির জানালায়।
—“কি করছেন—ভাইয়া… পা—আপনার গায়ে পা লাগছে তো,”
লিসির কণ্ঠ কাঁপে।
কিরিস নির্ভার—“তো? কী হয়েছে? চুপ করে বসো।”
লিসি দ্রুত বলে —“না… আপনি আমার বড়—এইটা—”
কথাটা শেষ করতে পারে না।
কিরিস চোখ তুলে তাকায়। গলায় কোনো রাগ নেই, শুধু দৃঢ়তা —“এইসব কথা এখন না।”
সে খুব সাবধানে লিসির পা দুটো ঠিক করে ধরে, যেন কোথাও চাপ না পড়ে। আঙুলের ছোঁয়ায় ব্যথা এড়িয়ে যায়। লিসি কথা হারিয়ে ফেলে। চোখ নামিয়ে নেয়। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। গাড়ির বাইরে বাজারের কোলাহল। ভেতরে—নীরবতা আর সেই নীরবতার ভেতরেই কিরিসের না বলা ভালোবাসা আর লিসির না বলা অনুভূতি একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে। কিরিস আর কিছু বলে না। এক মুহূর্তেই সে লিসির কাছে ঝুঁকে পড়ে। লিসির মাথার পেছনে হাত রেখে শক্ত করে নিজের দিকে টেনে নেয়—হঠাৎ, কিন্তু নিরাপদ।
লিসি কিছু বোঝার আগেই কিরিস আলতো করে ওর ঠোঁটে একটা চুম্বন এঁকে দেয়। না তাড়াহুড়া, না রুক্ষতা—
শুধু একটুখানি স্পর্শ, যেটা শ্বাস থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। লিসি বাক্য হারিয়ে ফেলে। চোখ বড় হয়ে যায়।
নিজের ঠোঁট নিজেই কামড়ে ধরে—যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। কিরিস ওর সেই অবস্থা দেখে মুচকি হাসে।
এরপর কিছু না বলে লিসির পা থেকে জুতো দুটো খুলে দেয়। পায়ের তলা দুটো লাল হয়ে আছে। কিছু কিছু জায়গায় হালকা কাটা আছে। কিরিস গাড়ির সামনের ছোট ড্রয়ার খুলে একটা মলম বের করে। ঢাকনা খুলে খুব যত্নে লিসির পায়ে লাগাতে শুরু করে।
হঠাৎ ছোঁয়ায় —“ইস—”
লিসি হালকা করে কেঁপে ওঠে। কিরিস সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যায়। চাপ কমিয়ে দেয়। আঙুল আরও নরম হয়ে আসে।
ফুঁ দিতে দিতে ধীরে ধীরে মলম মাখাতে থাকে। ব্যথা যেন একটু একটু করে গলে যায়। মলম লাগানো শেষ হলে কিরিস লিসির দিকে তাকায়। চোখে গভীরতা, কণ্ঠে চাপা আগুন—
—“কি ভেবে ছিলে? আমার কাছ থেকে এতো সহজে ছাড়া পেয়ে যাবে, লিসি শার্মা?”
একটু থামে। চোখ দুটো নরম হয়ে আসে, গলাটাও ভারী—“আমি তোমাকে শুধু সংসার করার জন্য চাইনি।
শুধু ভালোবাসার জন্যও না। শুধু এই এক জীবনের জন্যও না। ইহকাল, পরকাল… আর এরপরও যদি কোনো জন্ম থাকে আমি শুধু তোমাকেই চাই। তোমার বিকল্প কাউকে না শুধু তোমাকে ।”.........

0 Comments