পর্ব :52
এই বউ আমি না লাল শাড়ির ভেতরে একটা মেয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে টাম্বুর বাইরে রাত নেমে গেছে। ভেতরে একটা জীবন জোর করে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
টাম্বুর ভেতরটা নিস্তব্ধ লিসির কবুল বলছেনা চুপচাপ বসে আছে মাথা নিচে করে। সব চোখ লিসির দিকে।
—“বল,”
কেউ বলে।
—“কবুল বল এই মেয়ে ?”
লিসি মাথা নিচু করে বসে আছে।চোখ মাটির দিকে মাটিটা ধুলোয় ভরা শুকনো, রুক্ষ এক সেকেন্ডের জন্য
তার মাথার ভেতরে কিছু একটা ঝলকে ওঠে শেষ চেষ্টা।
সে হঠাৎ পা নড়ায়।
—“পা চুলকাচ্ছে…”
কথাটা খুব আস্তে কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয় না লিসি ধীরে মাটিতে হাত নামায়। ধুলো, শুকনো বালি মুঠো ভরে নেয়।
পরের মুহূর্তে সে ঝাঁপিয়ে ওঠে ধুলোটা ছুড়ে মারে নুহানের চোখে।
—“আহ!”
এক সেকেন্ডের বিশৃঙ্খলা লিসি দৌড় দেয় শেষবারের মতো চোখে ধুলো পড়ায় কেউ সঙ্গে সঙ্গে ধরতে পারে না।
সে দৌড়ায় হাঁপাতে হাঁপাতে,কিন্তু বেশি দূর না। কিন্তু কেউ পেছন থেকে টেনে ধরে লিসির শরীরটা ছিটকে আসে।
নুহানের চোখ লাল। রাগে থরথর করছে সে।
—“শালা!”
একটা ভয়ংকর চড়, এমন চড় যাতে লিসি ছিটকে পড়ে যায় মাটিতে। মাথা একপাশে লাগে। ঠোঁট ফেটে যায়।
রক্ত গড়িয়ে পড়ে ঠোঁটের পাশ দিয়ে,মাটিতে।
লিসি উঠতে পারে না। নুহান দাঁড়িয়ে থেকে বলে—
—“ভেবেছিলাম কমের ওপর দিয়েই ছাড়বো।”
একটু থেমে,ঠান্ডা হাসি—
—“কিন্তু না।তুই তো কথা শুনবি না।”
সে সামনে ঝুঁকে আসে।
—“তোর জন্য জেলে যাওয়ার পর
আমার শখের চুল কেটে দিয়েছিলো…”
তার চোখে বিকৃত আনন্দ।
—“এখন তোর পালা।”
লিসির চোখ বড় হয়ে যায় সে বুঝে যায়। তার শরীর কেঁপে ওঠে।
—“না… না প্লিজ…”
গলাটা ভেঙে আসে।
—“আমার চুল না… আমি হাত জোড় করছি…”
সে কাঁদে কাকুতি মিনতি করে। কিন্তু কেউ শোনে না।
দুজন লোক তার হাত দুটো শক্ত করে ধরে। লিসি ছটফট করে চিৎকার করতে চায় কিন্তু গলা বেরোয় না। নুহানের হাতে একজন একটা কাঁচি দিয়ে যায় তারপর, চ্যাঁচ।
একটা বড় গোছা চুল কেটে পড়ে যায় যে চুল একসময় হাঁটুর নিচে নামতো, মাটিতে ছুঁয়ার মতো ছিলো
এখন হাঁটুর সমানে যায় লিসি স্তব্ধ হয়ে যায় সে আর কাঁদে না আর নড়ে না মাটিতে বসে থাকে ফাঁকা চোখে।
চুলের গোছাটা মাটিতে পড়ে থাকে। লিসি একদম চুপ।
হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা নিজের চুলের গোছা,
মাটির ধুলো আঙুলের ফাঁকে ঢুকে গেছে কিন্তু সে কিছুই টের পাচ্ছে না। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল অন্য এক দৃশ্য।
ছোট বেলার ঝাপসা স্মৃতি আর তার মায়ের রেখে যাওয়া ডায়েরি, মায়ের পুরোনো ডায়েরির পাতা। হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজে মায়ের লেখা—
“তোর বাবা লম্বা চুল খুব ভালোবাসতো।
বলতো—লিসির চুল হবে রূপাঞ্জেলের মতো,
একদম কোমর ছুঁয়ে যাবে আর তারপরে নাকি মাটিতেও ছুঁয়ে যাবে। বলতো আমি নিজে গুছিয়ে দেবো, তেল দেবো, বেণী করবো—এই দায়িত্বটা নাকি তোর বাবার।”
লিসির বুকের ভেতর কিছু একটা হু হু করে উঠল।
তার বাবার মুখটা মনে পড়ল।কখনো সে বাবাকে দেখেনি,
তবু কতবার ভেবেছে যদি বাবা বেঁচে থাকতো,
তাহলে আজ এই চুলে কেউ হাত তুলতে পারতো?
মনে পড়ল বাবার সেই কথাটা,যেটা মা লিখে রেখেছিল—
“আমার মেয়ের চুলে কেউ জোর করবে না।
এটা আমার আদরের মেয়ের গর্ব। আমি চায়,আমার মেয়ে চুল লম্বা হোক, আমার রুপানজেল আমার লিসি সোনা মা ”
লিসির চোখ ঝাপসা হয়ে এলো এই চুল শুধু চুল না।
এটা ছিল বাবার স্বপ্ন, মায়ের যত্ন, আর নিজের অস্তিত্বের একটা অংশ। যখন সে তার নানুর মুখে এই কথা শুনে ছিল আর পড়তে শেখার পরে থেকে যখন তার মায়ের ডায়েরির পাতাগুলো পড়েছিল তখন থেকে তার চুলে সে কখনো কাঁচি দেয়নি। খুব সযত্নে গুছিয়ে রেখেছে বাবার স্বপ্নের চুল। আর তাছাড়া মির্জা বেগম কখনো তার চুল কাটতে পরামর্শ দেননি। সর্বদা তাকে ভালো তেল এনে দিয়েছেন যাতে চুলগুলো সুন্দর হয়। এই সব মনে পড়তে বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে লিসির। সে চুপচাপ বসে রইল।
কারণ সে বুঝে গেছে আজ শুধু তার চুল না, আজ তার বাবার রেখে যাওয়া শেষ আদরটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।আর ঠিক সেই সময়ই কাঁচির ধাতব শব্দটা তার বুকের ভেতর দিয়ে একটা ধারালো ছুরির মতো বয়ে গেল। লিসি মাটিতে বসে আছে চুলের গোছাটা সে নিজেই তুলে নেয় মুঠোয় শক্ত করে ধরে।
এই চুল এখন আর সৌন্দর্য না এটা তার অপমানের প্রমাণ নুহান তখনও থামেনি।সে পাশ থেকে একটা মোটা লাঠি তুলে নেয় লিসির মাথার ওপর ছায়া পড়ে।চারপাশে কেউ কথা বলে না।সবাই বুঝে গেছে এই আঘাতটা পড়লে আর ওঠা যাবে না।কিন্তু লিসি নড়ে না চুপ। নুহান লাঠিটা পুরো জোরে নামাতে যায় ঠিক তখনই—
ঠাস!
লিসির হাত উঠে আসে। লাঠিটা হাওয়ায় থেমে যায়।সে মুঠোয় ধরে ফেলে একদম শক্ত করে। নুহান টান দেয় লিসি ছাড়ে না। এই প্রথম সে মাথা তোলে চোখ দুটো
রাগে তীক্ষ্ণ,ভয়শূন্য। মায়বী ডাগর ডাগর দুটি চোখ যখন ভয়ংকর রকম দাগের রূপান্তরিত হয় তখন সেটা ভীষণ ভয়ঙ্কর দেখায় অনুভূতিহীন দুটি চোখে তাকিয়ে আছে নুহানের দিকে কিন্তু এতে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত বিষ ঢেলে আছে এই দুটি চোখে।
সে ধীরে বলে—
—“ধন্যবাদ…তোমাদের দাদু আমাকে এটা শেখানোর জন্য।”
এক সেকেন্ড তারপর লিসি ঝাঁকুনি দিয়ে লাঠিটা নুহানের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। এই লাঠি তার কাছে অচেনা না।
তার দাদু লাঠি চালাতেন আর এখনো চালায়।গ্রামের খোলা আকাশের নিচে আর লিসি ছোট থেকেই দেখেছে,
শিখেছে। আর দাদু শিখিয়েছে তাকে আর লিসি লাঠি চালানোতে বেশ দক্ষ স্বয়ং আকবর খানের প্রিয় লিসি এই লাঠি এতোভালো চালানোর জন্য। সে চিৎকার করে —
—“আহ!”
প্রথম বাড়ি নুহানের মাথার পাশে পড়ে। সে হোঁচট খায়।
দ্বিতীয় বাড়ি কাঁধে। লাঠির শব্দে বাতাস কেঁপে ওঠে।
লিসি থামে না। একটার পর একটা আঘাত। হাতে আঙ্গুলে লাঠি ঘোরে এতো নিখুঁতভাবে, পা বদলায়,দৃষ্টি স্থির যেন ভয় নয় এখন নিয়ম কাজ করছে।
একজন এগোতে যায় লিসি নিচু হয়ে লাঠি চালায়।
সে পড়ে যায়। আরেকজন পেছন থেকে ধরতে গেলে—
লিসি ঘুরে দাঁড়িয়ে হাতের ওপর আঘাত করে লাঠি পড়ে যায়। এক, দুই, তিন লিসি গুনে না। শুধু আঘাত করে চোখ বন্ধ করে যাকে সামনে পাচ্ছে তাকে মারছে। মোটামুটি দশজন কেউ পড়ে, কেউ উঠে পালায়,কেউ শুধু চিৎকার করে।
টাম্বুর ভেতর অরাজকতা শেষে লিসি হাঁপাতে থাকে।
হাত কাঁপছে,কিন্তু চোখ স্থির। সে মাটিতে পড়ে থাকা
নিজের চুলের গোছাটা তুলে নেয়। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে তারপর দৌড়। লাঠি ফেলে দেয় নুহান মাথায় হাত দিয়ে সুয়ে আছে লিসি পালিয়ে যেতে দেখে ফেলে দেওয়া লাঠিটা লিসির পায়ের বরাবর মারে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। কিন্তু থামে না পায়ে বড্ড লেগেছে দৌড়ানো কষ্টকর কিন্তু তারপরও দৌড়াচ্ছে কারণ এটা ছাড়া এখন আর কোন উপায় নেই। অন্ধকারের দিকে ফাঁকা রাস্তায়। পা ব্যথা,শ্বাস ভাঙা,চোখে পানি তবু দৌড় থামে না। কারণ এবার সে শুধু পালাচ্ছে না সে বাঁচছে।
............
রাত আরও গভীর হয় চারপাশে কেউ নেই কোন গাড়ি-ঘোড়া নেই পাকা রাস্তার ওপর একটা বধূ দৌড়াচ্ছে। লাল শাড়ি ধুলোয় মলিন,ওড়না এক পাশে সরে গেছে পায়ে নুপুর। ঝম… ঝম…নুপুরের শব্দটা
এই ফাঁকা রাস্তায় অস্বাভাবিকভাবে জোরে শোনা যায়।
স্ট্রিটলাইটের আলো একটার পর একটা তার শরীর ছুঁয়ে চলে যায় কখনো আলো, কখনো অন্ধকার। এই আলো-অন্ধকারের মাঝখানে লিসি। খালি পা ইটের রাস্তায় পা কেটে যাচ্ছে। চামড়া ছেঁড়ে রক্ত বেরোয়।
কিন্তু সে তাকায় না। ব্যথা এখন তার কাছে বিলাসিতা।
শুধু দৌড়। যতদূর শরীর নেয়, তার চেয়েও একটু বেশি।
হাঁপাতে হাঁপাতে বুকটা যেন ফেটে যাবে।পেছন থেকে
পায়ের শব্দ। একটা না অনেকগুলো নুহান। তার লোকেরা। লিসির গলা কাঁপে। হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলে—
—“ভাইয়া…আসুন না…”
শ্বাস ভেঙে যায়।
—“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে…”
একটা স্ট্রিটলাইটের নিচে সে থামে না শুধু চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়।
—“এবার না আসলে…”
কণ্ঠ ভেঙে যায়।
—“আপনার অলকানন্দা
অন্য কারোর হয়ে যাবে…”
কথাগুলো বাতাসে ভেঙে যায় কেউ শোনে কি না—
সে জানে না। সে আবার দৌড়ায় রাস্তাটা হঠাৎ ঢালু হয়।
সামনে গ্রামের পুরোনো ব্রিজ। নিচে পানির স্রোত অন্ধকারে জলের শব্দ শোনা যায় একটানা, গভীর।
লিসির চোখ ঝাপসা হয়ে আসে পা আর চলে না।
হঠাৎ— একটা হোঁচট। শরীরটা সামনের দিকে ছিটকে যায়। সে পড়ে যায় পাকা রাস্তায়। হাতের তালুতে আগুন জ্বলে ওঠে হাঁটুতে তীব্র ব্যথা নুপুরের শব্দ থেমে যায়।
লিসি উঠে বসতে চায় কিন্তু পারে না। হাঁপাতে থাকে।মচুল মুখে লেপ্টে আছে। রক্ত, ধুলো, ঘাম সব একসাথে ব্রিজের পাশে পানির শব্দ আরও স্পষ্ট। পেছনের শব্দ
আরও কাছে আসে লিসি চোখ বন্ধ করে। এই অন্ধকারে
সে একদম একা। রাত, রাস্তা, স্রোত সব তার বিরুদ্ধে।
কিন্তু তবু তার ভেতরে একটা ক্ষীণ আশা এখনও জ্বলছে।
লিসি আবার দাঁড়ায় নিজের কষ্টের বিরুদ্ধে তার শরীর তার সঙ্গ দিচ্ছে না কিন্তু তারপরও দাড়ায়। কীভাবে দাঁড়ায় সে নিজেও জানে না, পা কাঁপছে,শরীর টলমল,
শ্বাস এলোমেলো। নুহান তখনও কয়েক কদম দূরে।
তার আগেই লিসি ব্রিজের একদম শেষ থামের ওপর উঠে দাঁড়ায়। নিচে কালো জল স্রোত ছুটে যাচ্ছে এক পা ফসকালেই সব শেষ। লিসি পেছনে তাকায় না। সামনে তাকিয়েই চিৎকার করে ওঠে—
—“তোর মতো জঘন্য লোককে আমি আমাকে ছুঁতে দিতে পারি না !”
কণ্ঠটা ভাঙা, কিন্তু চোখ দুটো ভয়ংকর শান্ত।
—“হয় আমি মরবো…”
এক সেকেন্ড থামে।
—“নাহয় বাঁচবো। কিন্তু তোকে ছুঁতে দেবো না—কখনো না! এই লিসি শার্মাকে ছোঁয়ার অধিকার সে শুধু একজনকে দিয়েছে এবং সেই প্রথম এবং শেষ দ্বিতীয় কোন পুরুষ আমাকে ছুঁতে পারবে না। ”
নুহান থমকে যায় সে এই লিসিকে চেনে না।
—“লিসি, পাগল হয়েছিস?”
নুহান হাত বাড়ায়।
—“নাম! পড়ে যাবি!”
কিন্তু লিসি আর শোনে না। তার শরীর বিধ্বস্ত, মন ছিন্নভিন্ন তবু সিদ্ধান্তটা পরিষ্কার। সে এক পা পিছিয়ে নেয়। ঝাঁপ দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত—
হঠাৎ—
ঝলসে ওঠে হেডলাইট তীব্র সাদা আলো ব্রিজটাকে কেটে ফেলে। একটা গাড়ি অসম্ভব গতিতে ছুটে আসছে।
নুহান চোখ ঢেকে নেয়। লিসির চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।
কিচ্———!
একটা ভয়ংকর ব্রেকের শব্দ গাড়িটা ব্রিজের মুখে এসে থামে। এক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা তারপর গাড়ির দরজা খুলে যায়। একটা ছায়া বেরিয়ে আসে। লম্বা, কঠিন, অচেনা-চেনা সেই অবয়ব জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরী।
হাঁটতে হাঁটতেই তার গলা ছুটে আসে রুক্ষ, ফেটে যাওয়া, আতঙ্কে ভরা—
—“লিসি—!”
আরও এক কদম এগিয়ে—
—“লিসি, কী করছো!”
লিসি ঝাঁপ দেওয়ার ভঙ্গিতেই থেমে যায়।এই কণ্ঠ এই নাম ধরে ডাকা রাত, নদী, মৃত্যু সবকিছুর মাঝখানে
একটা ফাটল ধরে। লিসির চোখ বড় হয়ে যায়।
এক ফোঁটা জল চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু সে এখনও ব্রিজের কিনারায় দাঁড়িয়ে। এক পা এপাশে এক পা ওপাশে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে।
লিসির পা হঠাৎ পিছলে যায় এক সেকেন্ড শুধু এক সেকেন্ড শরীরটা হাওয়ায় ভাসে নদীর কালো স্রোত যেন তাকে টেনে নিতে চায় ঠিক তখনই একটা হাত।
লোহার মতো শক্ত,কাঁপুনি-হীন কিরিসের হাত লিসির কবজি শক্ত করে ধরে ফেলে।
—“লিসি—!”
এক ঝাঁকুনিতে সে টেনে তোলে লিসির শরীর ব্রিজের উপর আছড়ে পড়ে। বেঁচে গেছে। কিন্তু— লিসি একদম স্তব্ধ। চোখ খোলা,দৃষ্টি ফাঁকা। কোনো শব্দ নেই।
কিরিসের বুকের উপর লিসির মুখ কিরিস লিসির মুখটা তুলে তার দিকে তাকিয়ে বলে
—“লিসি… শোনো… আমি আছি…”
সে ধীরে ধীরে লিসির কাঁধে হাত রাখে।
—“ভয় পেয়ো না… আর কেউ কিছু করতে পারবে না…”
লিসি তাকায় না শ্বাস নিচ্ছে,কিন্তু যেন বেঁচে নেই।
—“লিসি…”
কিরিসের গলা এবার ভারী হয়ে আসে।
—“আমার দিকে তাকাও…”
হঠাৎ—লিসি কেঁপে ওঠে। কিরিসের দিকে অদ্ভুত চাও নিতে তাকায় যেন কোন স্বপ্ন দেখছে সে দিবা স্বপ্ন নাকি সত্যি তার সামনে আছে তার প্রিয়া মানুষ এক সেকেন্ড নিজের চোখ দুটো দিয়ে মানুষটিকে শনাক্ত করতেই পরমুহূর্তে সে কিরিসকে জড়িয়ে ধরে। এমনভাবে,
যেন আর এক সেকেন্ড দেরি হলেই সব শেষ হয়ে যাবে।
—“ভাইয়া———!!!”
একটা হাউমাউ কান্না রাতকে কাঁপিয়ে দেয়। লিসির চিৎকার ভেঙে পড়ে কিরিসের বুকের মধ্যে। হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে,নখ গেঁথে যায় তার শার্টে।
—“আহ.. ভাইয়া আমি …”
কান্নার মধ্যে শব্দগুলো ভেঙে যায়। কিরিস এক মুহূর্ত স্থির হয়ে যায়। সে এমন কান্না কখনো দেখেনি।হাউমাউ করে কান্না করছে। কিরিস ধীরে ধীরে তাকে জড়িয়ে ধরে।
আস্তে খুব আস্তে। ঠিক তখনই তার চোখে পড়ে—
লিসির কোমরের পাশে একগুচ্ছ কাটা চুল,গিঁট দিয়ে বাঁধা। তারপর চোখ যায় লিসির চুলের আগায়।
এলোমেলো, অসমান, নির্দয়ভাবে কাটা।
এক সেকেন্ডে সব বোঝা হয়ে যায় কিরিসের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে আর ঠিক তখনই সে দেখে লিসির ঠোঁট।
ফাটা, শুকনো রক্ত জমে আছে।
এক মুহূর্তে কিরিসের ভেতরের মানুষটা মরে যায়।
বাকি থাকে শুধু হিংস্র পরশুটা যেটা একবার জাগ্রত হলে দুনিয়ায় কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।
সে লিসিকে আরও শক্ত করে নিজের মধ্যে টেনে নেয়।
এবার সে-ই তাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে,যেন পৃথিবীর সবকিছুর বিরুদ্ধে একাই ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।
—“আমি আছি…”
কিরিসের কণ্ঠ চাপা, ভয়ংকর শান্ত।
—“আর কেউ তোকে ছুঁতে পারবে না।
কেউ না।”
লিসির কান্না থামে না কিন্তু এই প্রথম সে নিরাপদ।
কিরিসের বুকে মাথা রেখে সে ভেঙে পড়ে। আর কিরিস—
চোখ তুলে অন্ধকারের দিকে তাকায়।যেখানে নুহান আর তার লোকেরা দাঁড়িয়ে।
কিরিস তখনও লিসিকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে আছে।
লিসির কান্না ধীরে ধীরে থেমে আসছে কিন্তু তার শরীর এখনো কাঁপছে ঠিক তখনই দূরে আবার হেডলাইট।
একটা গাড়ি দ্রুত অস্বাভাবিক দ্রুত।গ্রামের ফাঁকা রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে গাড়িগুলো এসে ব্রিজের কাছে থামে। গাড়ির দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে যায়।
—“ভাই—!”
রিহানের গলা,এরপর বাকিরাও নেমে আসে গাড়ি থেকে ইয়াবি, ইশান, কাবির, জারা আর আরোবি
কণ্ঠে ভয়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি রাগ।সবাই দৌড়ে আসে। চোখ প্রথমে পড়ে লিসির ওপর লাল শাড়ি, এলোমেলো চুল,ঠোঁটে রক্ত, কিরিসের বুকে জড়ানো ভাঙা একটা মানুষ। এক মুহূর্তের জন্য ছেলেরা থেমে যায়। জারা আর আরোবি নিজের মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছি ফেলার মত অবস্থা। ছেলেদের চোখ লাল হয়ে ওঠে।
ইয়াবি —“কিরিস…”
কাবিরের গলা কেঁপে ওঠে।
—“কে করেছে?”
কিরিস মাথা তোলে। একটুও শব্দ করে না।
শুধু চোখের ইশারা। রিহানের চোখ সেই দিকেই যায়—
নুহান।
আর তার লোকগুলো।
কিছু দাঁড়িয়ে, কিছু জন বেশ জখম হয়তো কেউ বেশ দুলাই দিয়েছে মনে হচ্ছে । ইয়াবি ঠোঁট বাঁকা হাসিতে বেঁকে যায়। কিন্তু সেটা হাসি না ওটা শিকারির হাসি।
—“ঠিক আছে,”
রিহান ধীরে বলে।
—“বাকিটা আমি দেখছি।”
কিরিস তখন লিসির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে খুব নিচু স্বরে বলে—
—“চোখ বন্ধ করো ”
লিসি চোখ বন্ধ করে ঠিক সেই মুহূর্তে রিহান, ইয়াবি, ইশান কাবির কোট খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয় রাস্তায়।
হাঁটতে হাঁটতে নুহানের সামনে দাঁড়ায় সবকয়টা
—“আজকে তোমাকে আমরা টুইংকেল টুইংকেল লিটিল স্টার শেখাব ?”
রিহান ঠাণ্ডা গলায় বলে।
—“আমাদের বোনের দিকে হাত দেওয়া তাই না কত বড় সাহস আজকে তোর বুক চিরে দেখবো তোর এত বড় সাহস কি করে হয় ”…
নুহান পিছিয়ে যেতে চায় কিন্তু পারে না।
গ্রামের ফাঁকা রাতমহঠাৎ খুব ছোট হয়ে যায় রিহান নুহানের কলার ধরে টেনে কাছে আনে।
—“তুই জানিস,আজ যদি মরিস…তবুও তোর জন্য কম হবে।”
পেছন থেকে কিরিসের গলা আসে একদম শান্ত।
—“মেরে ফেলিস না।”
রিহান থামে কিরিস বলে—
—“ও বাঁচবে। কিন্তু এমনভাবে…যেন প্রতিদিন মরার কথা মনে থাকে।”
রিহান ধীরে মাথা নেড়ে বলে—
—“বুঝেছি, ভাই।”
নুহান আর তার লোকে লোকেরা পরিস্থিতিতে বোঝার চেষ্টা করছে একটা মেয়ের পিছনে এত লোক কি করে!
কিরিস এখনো লিসিকে নিয়ে বসে আছে। হঠাৎ লিসির শরীরটা কিরিসের বুকে হালকা হয়ে আসে এই প্রথম কিরিস সেটা টের পায় যেন বুকের মধ্যে ধরা মানুষটা হঠাৎ ওজন হারাল।
—“লিসি…?”
কিরিস নিচু স্বরে ডাকে কোনো উত্তর নেই। লিসির মাথাটা তার কাঁধ থেকে ঢলে পড়ে, চোখ দুটো আধখোলা,শ্বাসটা অস্বাভাবিক ধীর।এক মুহূর্ত তারপরই কিরিস বুঝে যায়।
—“শিট—!”
সে সঙ্গে সঙ্গে লিসিকে কোলে তোলে। লিসির পা দুটো ঝুলে পড়ে,নুপুরের শব্দ নেই আর। কিরিসের বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে যায়।
—“ লিসি দেখো আমার জান কিছু হবে না..... এই এই ইশান এদিকে আয় ”
ইশান এগিয়ে আসে। ইশান গিয়ে লিসিকে দেখে, ইশান —“ বুঝতে পারছি না হয়তো অনেক ক্লান্ত হয়ে গেছে। ব্রো দ্রুত বাড়ি নিয়ে চল! ”
কিরিস —“ হুম জারা গাড়ি চালা, গ্রামের বাড়ি চল ”
জারা এগিয়ে এসে বলে —“ ঠিক আছে ভাইয়া তুমি ওঠো গাড়িতে! ”
ইশান আর জারা দুজনে গাড়িতে উঠে, কিরিস আর এক মুহূর্ত দেরি করে না। সে দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে
পেছনের সিটে বসে। লিসিকে নিজের কোলে নেয়।
লিসির মাথাটা তার বুকের সঙ্গে ঠেকানো। এক হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে, আরেক হাত দিয়ে দরজা বন্ধ করে।গাড়ির ভেতরে হালকা আলো কিরিস নিচু হয়ে লিসির কপালে ঠোঁট ছোঁয়।
—“চোখ খুলে থাকলেইও তো হতো, অলকানন্দা…”
কণ্ঠটা ভেঙে যায়।
—“আমি আছি।”
ড্রাইভার তাকায় আয়নায়।
—“ চালা, ফুল স্পিডে ”
গাড়ি চলতে শুরু করে। জারা গাড়ি চালাচ্ছে ইশান আর কিরিস পিছনে সিটে বসে আছে ইশান লিসির দিকে তাকিয়ে আছে,
ব্রিজ পেছনে পড়ে যায় রাতের অন্ধকারে শুধু একটা গাড়ি ছুটে যায় ভেতরে একজন ভাঙা মেয়ে আর একজন বেসামাল হয়ে ওঠা পুরুষ।
পেছনে নুহান আর তার লোকেরা দাঁড়িয়ে থাকে।
রিহান ধীরে হাতা গুটিয়ে নেয়।
—“এবার শুরু,”
সে ফিসফিস করে রাতটা আর নীরব থাকে না। চারদিক অদ্ভুতভাবে নীরব। ব্রিজের পাশের ফাঁকা জায়গাটা যেন শ্বাস আটকে রেখেছে। আরোবি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।হাত বুকে গুছে, মুখে অলস ভঙ্গিতে।
রিহান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—
—“এই তুই, চুপ করে ওখানেই দাঁড়া।
যা দেখতে যাচ্ছিস, বাড়ি গিয়ে বলবি না যেন।”
আরবি ভুরু তুলে তাকায়।
—“আমাকে দেখে কি গাধা মনে হচ্ছে?”
হালকা হাসি।
—“আরে ভাই, ফাইট দেখার জন্যই তো এতদূর আসছি।
মারামারি কর, আরেকটু দেখিয়ে দে তোরা কী পারিস।
ফ্রিতে সিনেমা দেখতে পারলে, কেউ কি না বলে নাকি?”
ইয়াবি পাশে দাঁড়িয়ে হেসে ফেলে।
ঠিক তখন—
অন্ধকারের ভেতর থেকে নুহান এগিয়ে আসে। হাঁটার ভঙ্গিতে জোর করে সাহস ঢোকানো।
—“জানিস তোরা কার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস?”
নুহান গলা চড়া করে বলে।
—“আমি UK-এর হয়ে কাজ করি।ওখানে আমার নাম আছে, দাপট আছে।তোদের মতো লোক আমি রোজ দেখি।”
এই কথা শুনে ইয়াবি এমনভাবে হাসেযেন সে কোনো জোক শুনেছে।
—“UK?”
হাসতে হাসতে চোখ মুছে।
—“তুই জানিস UK আসলে কার?”
সবাই থমকে যায়। কাবির ধীরে ধীরে সামনে আসে।
গলা শান্ত, ভয়ংকর ঠান্ডা—
—“UK মানে
The One And Only
জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরী।”
এক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ইয়াবি যোগ করে—
—“আর তুই হাত দিয়েছিস কার দিকে জানিস?”
হালকা হাসি মিলিয়ে যায়।
—“ওর নারী।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের রাজার-রানী।এখন ভেবে দেখ তোর কী হওয়ার কথা।”
নুহানের মুখের রং বদলে যায়। চোয়াল শক্ত হয়। ঠিক তখনই নুহানের এক লোক আরোবির দিকে তাকিয়ে কুৎসিতভাবে বলে—
—“এই মেয়ে তুই এখানে কি করতে আসছিস, তোকেও কি ধরে..... —”
চড়।
ইয়াবির হাত ওঠার শব্দটা পুরো জায়গা কাঁপিয়ে দেয়।
লোকটা ঘুরে মাটিতে পড়ে। ইয়াবি গম্ভীর গলায় বলে—
—“মুখের ভাষা সামলে কথা বল।”
আর সেটাই ছিল শেষ সতর্কতা। পরের মুহূর্তেই নরক খুলে যায়। রিহান সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে একজনের কলার ধরে হাঁটু তুলে দেয় পেটে। লোকটা শ্বাস নিতে না পেরে ভেঙে পড়ে। কাবির পেছন থেকে একজনের হাত ঘুরিয়ে ভেঙে দেয় হাড়ের শব্দ শোনা যায়, এক লাফে দুজনের মাঝখানে ঢুকে একজনের মুখে কনুই,আরেকজনের গলায় লাথি। ইয়াবি যেন আলাদা কিছু ঠান্ডা চোখ, নিখুঁত মুভ। একজন এগোতেই ঘাড়ে ধরে মাটিতে আছাড়।
আরেকজনের নাকে ঘুষি রক্ত ছিটকে পড়ে।নুহানের লোকেরা সংখ্যায় বেশি কিন্তু তারা রাস্তার মারামারি জানে। আর এরা যুদ্ধ। আন্ডারওয়াল্ডের কিং এর সৈনিকদের সামনে রাস্তার পাতি গুন্ডারা। মুহূর্তে দশজন পড়ে যায় কেউ উঠে দাঁড়াতে পারছে না নুহান পিছিয়ে যায় এক পা। চোখে ভয় ঠিক তখনই ইয়াবি তার দিকে এগোয়।
—“তুই জেলে গিয়েছিলি, মনে আছে?”
ঠান্ডা কণ্ঠ।
—“আজ হিসাবটা পুরো করবো।”
নুহান দৌড়াতে চায়—
কিন্তু কাবির পেছন থেকে ধরে ফেলে।
—“সিনেমা শেষ হয়নি ভাই,”
হেসে বলে।
—“ক্লাইম্যাক্স বাকি।”
রাস্তায় পড়ে থাকে
রক্ত, ভাঙা দেহ। আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সৈন্যরা দাঁড়িয়ে থাকে নিঃশব্দ, অক্ষত, ভয়ংকর। যেন এটা ছিল তাদের জন্য আরেকটা রাতের কাজ মাত্র।নুহান হাত তুলতেই
কাবির লাথি মারে পেটে।নুহান ছিটকে পড়ে যায়।
ইয়াবি ধীরে ধীরে কাছে আসে। হাসি নেই আর একটা ঘুষি নুহানের নাক ভেঙে যায়। আরেকটা চোখ ফুলে ওঠে। রিহান শেষ বাড়িটা দেয় পাঁজরে। নুহান মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।রক্ত, কাশি, আর্তনাদ কিন্তু কেউ থামে
না নুহান প্রায় আদমরা হয়ে আছে। ঠিক তখনই একটা কালো গাড়ি থামে দরজা খুলে মার্ক নামেন চোখে কোনো অনুভূতি নেই। দুজন লোক নুহানকে তুলে নেয়। নুহান কিছু বলতে চায় কণ্ঠ বের হয় না। মার্ক গাড়িতে তোলার আগে বলে—
—“তোর শেষ রায় আমার বস দেবে।”
গাড়ির দরজা বন্ধ হয়।গাড়ি অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
রাস্তায় পড়ে থাকে নুহানের লোকজন ভাঙা, নিস্তেজ।
আরবি একবার তাকায়।
—“চল, ভাইয়ার কাছে ফিরি।”
রাতটা তখনো জানে না আসল ঝড় এখনো শুরু হয়নি।
চারদিকে তখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পড়ে থাকা লোকজন, ভাঙা লাঠি, রক্তের দাগ।কাবির চারপাশ একবার দেখে হালকা ভঙ্গিতে হাত ঝাড়ে।
—“আহ্, শান্তি।”
ইয়াবি ঘাড় ঘোরাতে ঘোরাতে বলে—
—“শান্তি না ভাই, এটা তো ওয়ার্ম-আপ ছিল।”
কাবির নিজের হাতটা নাড়াতে নাড়াতে—
—“একজন যদি একটু ভালো ফাইট দিতো!
সবাই এক ধাক্কাতেই শেষ।”
রিহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ বলে—
—“তুই কিন্তু আজ বেশি মারছিস ইয়াবি।”
ইয়াবি চোখ বড় করে—
—“আমি? ”
নিজের দিকে আঙুল।
—” আমি তো শুধু হাসছিলাম!”
আরবি ফোঁস করে হেসে ওঠে।
—“হাসতে হাসতেই চারজনের দাঁত ভেঙেছিস,
এটাই তোর সমস্যা তোর বউ যদি একটু আমার মতো হয়। তাহলে তো তুই ওর দাতঁ হাসতে হাসতে ভাঙবি ”
ইয়াবি গম্ভীর মুখ করে—
—“হিংসা করছিস, কর। আর আমার বউ? একবার বিয়ে করি তারপর দেখিস কিভাবে রাখি আমি আমার বউকে ?”
কাবির তখন হাত বুলিয়ে নিজের শার্টের দিকে তাকায়।
—“দেখ… রক্ত লেগে গেছে।”
আহাজারি সুর।
—“আম্মু দেখলে বলবে—
‘এইজন্যই তোদের রাতে বের হতে দিই না।’”
রিহান ঠান্ডা গলায় বলে—
—“এখনো বলবে।”
সবাই একসাথে তাকায় তার দিকে ইয়াবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে—
—“ভাইয়া কিরিস থাকলে বলতো—
‘চুপ, বাড়ি গিয়ে কাপড় বদলাও।’”
এই কথা শুনে সবাই হালকা থেমে যায় এক মুহূর্ত নীরবতা তারপর আরোবি হেসে ওঠে।
—“চল, দেরি হচ্ছে, ভাইয়া এখন লিসিকে নিয়ে বসে আছে,আমরা এখানে স্টান্ট দেখাচ্ছি।”
কাবির মুচকি হেসে বলে—
—“আজকে কিন্তু আমি ফার্স্ট মারলাম, নোটেড?”
ইয়াবি সঙ্গে সঙ্গে—
—“ফার্স্ট মারলে কী হবে,
লাস্ট তো আমিই দিয়েছি।”
রিহান শান্ত গলায় শেষ কথা বলে—
—“বাড়ি গিয়ে তর্ক করিস।”
চারজন ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে পেছনে পড়ে থাকে
একটা ভাঙা রাত। রাস্তাটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল।
পাকা রাস্তা শেষ হয়ে কাঁচা মাটির পথ শুরু হতেই গাড়ির আলো নরম হয়ে গেল। চারপাশে ধানক্ষেত, দূরে কুয়াশার মতো অন্ধকার। গাড়ির ভেতরে কেউ কথা বলছে না।
সামনের গাড়িতে কিরিস। পেছনের গাড়িতে—রিহান, ইয়াবি, কাবির, আরোবি।আর লিসি কিরিসের কোলেই।
তার মাথাটা কিরিসের বুকের একপাশে হেলে আছে। নিঃশ্বাস খুব হালকা, মাঝে মাঝে থেমে থেমে আসে। কিরিস এক হাত দিয়ে ওর পিঠ জড়িয়ে ধরে আছে, আরেক হাত লিসির কাটা চুলের এলোমেলো আগা স্পর্শ করছে—যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না, এই চুল একসময় পায়ের গোড়ালি ছুঁয়ে থাকত এখন সেটা হাঁটু পর্যন্ত!
আরবি চুপ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
ইয়াবির মুখে আজ কোনো হাসি নেই।
রিহানের চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন– ঠিক হয়ে যাবে তো সব?
কাবির বারবার ঘড়ির দিকে তাকায়।গ্রামের বাড়ির গেটটা খুলতেই পুরনো আমগাছের ছায়া পড়ে গাড়ির উপর। বাড়িটা আলোয় ভরা না—শুধু বারান্দার একটা বাতি জ্বলছে। যেন ঘুম ভেঙে জেগে থাকা এক বৃদ্ধ মানুষ গাড়ি থামে।বারান্দায় বসে আছে তামান্না ওর তার বাবা মা আর রুমি। তাদের মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
কিরিস নিজেই লিসিকে কোলে তুলে নেয়।লিসির পা দুটো ঝুলে আছে। খালি পা। ইটের কাটা দাগ এখনো লালচে। কিরিস সেটা দেখে চোখ সরিয়ে নেয়—এই মুহূর্তে সে ভেঙে পড়তে পারবে না। ঘরের ভেতরে আগেই প্রস্তুত করা হয়েছে।
কিরিস লিসিকে তার ঘরে সুয়ে দেয়। ইশানও চলে আসে আর সঙ্গে সবাই ঘরের মধ্যে এসেছে। ইশান ধীরে ধীরে কাজ শুরু করে। প্রথমে পা, পায়ের তলায় কেটে যাওয়া জায়গাগুলো পরিষ্কার করে। লিসির ভ্রু একটু কুঁচকে যায়—অচেতন অবস্থাতেও শরীর ব্যথা বোঝে।
—“জোরে দৌড়িয়েছে, ঠিক হয়ে যাবে এটা ইনজেকশন দিচ্ছি, শরীরের সমস্ত ব্যথা কমে যাবে ঠিক হয়ে যাবে,.... একটু ভয় পেয়েছে মনে হয়। ”
কিরিস কিছু বলে না সে শুধু লিসির হাতটা ধরে থাকে।
হাতের কবজি, আঙুল—সব ঠিক আছে। কিন্তু ঠোঁটের কোণায় শুকনো রক্ত। ইশান ঠোঁট টা পরিষ্কার করতে গেলে কিরিস থামিয়ে দেয় তারপর নিজে তুলো ভিজিয়ে আলতো করে পরিষ্কার করে।

0 Comments