তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :51

ফোনটা রেখে দেওয়ার পর লিসি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে।
তারপর উঠে ঘরের কোণায় রাখা টিভিটা অন করে দেয়।
স্ক্রিনে কোনো সিরিয়াল চলছে—কে কী বলছে সে ঠিক খেয়ালও করে না।
তবু আজ শব্দগুলো আর বিরক্ত লাগছে না।
খাটের ওপর পা ভাঁজ করে বসে সে।
হাতের কাছে রাখা বালিশটা বুকে টেনে নেয়।
মাঝে মাঝে পর্দার দিকে তাকায়,
মাঝে মাঝে আবার জানালার বাইরে।
মনে হয়—
বুকের ভেতরের ভারটা আজ সত্যিই নেমে গেছে।
লিসির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হাসি লেগে থাকে।
চোখ দুটো শান্ত।
টিভির আলো ঘরটাকে নরম করে রেখেছে।
বাইরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছে।
লিসি নিজের মনেই ভাবে সব ঠিক হয়ে গেছে চ্যানেল বদলায় না। সময়টার সঙ্গে নিজেকেই একটু ছেড়ে দেয়।আজ সে খুশি। চুপচাপ, নিঃশব্দে… কিন্তু গভীরভাবে। টিভির স্ক্রিনে তখন পুরোনো দিনের গান বাজছে।শাহরুখ খানের হাসি, সরিষা ক্ষেতের দৃশ্য “দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে” চলছে। লিসি খাটের ওপর পা ভাঁজ করে বসে আছে। চোখ টিভিতে, ঠোঁটের কোণে নরম একটা হাসি।হাতের বালিশটা বুকে জড়িয়ে রেখেছে।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে তামান্না ঘরে ঢোকে।
এক ঝলক টিভির দিকে তাকিয়েই সে হেসে ফেলে—
—“ওহো! দেখি দেখি, কার মন এত ভালো যে শাহরুখ খান বেরিয়ে এসেছে!”
লিসি একটু লজ্জা পেয়ে যায়। তবু চোখ সরায় না স্ক্রিন থেকে—
—“চুপ কর। ভালো লাগছে আজ।”
তামান্না এসে খাটের কোণায় বসে পড়ে।
টিভির দিকে তাকিয়ে বলে—
—“দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে! বাহ! প্রেমে পড়লে মেয়েরা সবসময় এই মুভিই দেখে।”
লিসি হালকা প্রতিবাদ করে—
—“আমি প্রেমে পড়িনি।”
তামান্না কটমট করে তাকায়—
—“হুম, তাই তো! আর আমি রান্না জানি না।”
দুজনেই হেসে ওঠে।
স্ক্রিনে শাহরুখ খান কথা বলছে,
আর লিসির চোখে অদ্ভুত একটা স্বপ্নের আলো।
তামান্না ওর দিকে তাকিয়ে আস্তে বলে—
—“দেখছি, আজ তো কারো মন একদম হালকা।”
লিসি কিছু না বলে শুধু মুচকি হাসে। মনে মনে ভাবে সব ঠিক হয়ে গেছে।
তামান্না —“ চল আমরা মাঠের দিক থেকে ঘুরে আসি, আব্বাও বলেছিলো যেতে ”
লিসি —“ চল, ”
তামান্না ঘর থেকে বের হতে হতে বলে —“ তোকে দেখে মনে হচ্ছে সব ঠিক হয়ে গেছে তাই না ”
লিসি —“ হুম, সব ঠিক হয়ে গেছে আর কালকে সকালে চলে যাবো ”
তামান্না — “ আহ আমি কি করবো তাহলে একা একা ”
লিসি —“ আরে আমার সোনা রাগ করে না ”
এরপর দুজনেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে।বিকেলের আলো তখন নরম হয়ে এসেছে।মাঠের দিকে যাওয়া কাঁচা রাস্তাটা ধুলো-মাখা, দু’পাশে ঘাস আর ছোট ছোট গাছ। লিসি আজ অন্যরকম।হাঁটার মধ্যেই তার পা যেন হালকা হয়ে আছে।ওরা কাঁচা রাস্তা ছেড়ে মাঠের আইলে উঠে পড়ে।চারদিকে ধানক্ষেত, দূরে নীল আকাশ, হালকা বাতাসে জামার ওড়না দুলছে হঠাৎ লিসি থেমে যায়।
মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়।চোখে উচ্ছ্বাস, ঠোঁটে হাসি।তারপর হঠাৎ করেই খুশি মনে গেয়ে ওঠে—
🎶
“Kaisa Hai Kaun Hai Wo Jaane Kahan Hai
Ho Kaisa Hai Kaun Hai Woh Jaane Kahan Hai
Jiske Liye Mere Hoton Pe Aah Hai…”
🎶
তার কণ্ঠটা খোলা মাঠে ছড়িয়ে পড়ে।
বাতাস যেন গানটা বয়ে নিয়ে যায় ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে।তামান্না কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে।
তারপর হেসে লিসির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে, তালে তালে গেয়ে ওঠে—
🎶
“Apna Hai Ya Begana Hai Wo
Sach Hai Ya Koi Afsana Hai Wo
Dekhe Ghur Ghur Ke Yunhi Door Door Se
Use Kahon Meri Neend Na Churaye…”
🎶
দুজনের চোখে চোখ পড়ে হাসি আর গানের মধ্যে একটা মিষ্টি দুষ্টুমি তারপর আর আলাদা থাকে না।মাঠের আইলের মাঝখানেই দুজনে একসাথে, আনন্দে গলা মিলিয়ে গেয়ে ওঠে—
🎶
“Mere Khwaabon Mein Jo Aaye
Aake Mujhe Chhed Jaaye
Use Kahon Kabhi Saamne To Aaye…”
🎶
লিসি ঘুরে ঘুরে হাঁটে তামান্না হাত তুলে তাল দেয়।
ওদের হাসি, গান আর খুশি মিশে যায় বিকেলের বাতাসে।
এই মাঠ, এই রাস্তা সব যেন আজ লিসির আনন্দের সাক্ষী। টোন থাকবে নরম, আনন্দের রেশ, হালকা ইঙ্গিত
মাঠের আইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে ঝুঁকে পড়েছে, দুজনেরই খেয়াল নেই।
আকাশের রং ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে।নীল থেকে কমলা, কমলা থেকে হালকা বেগুনি। ধানক্ষেতে বাতাস লাগলে শোঁ শোঁ শব্দ ওঠে। গান থামলেও লিসির মুখে হাসিটা থামে না। সে হাত ছড়িয়ে একটু দৌড়ে নেয় আইলের ওপর। তামান্না পিছন থেকে ডাকে—
—“এই পাগলি, পড়ে যাবি!”
লিসি হেসে ফিরে তাকায়—
—“আজ পড়লেও কষ্ট লাগবে না!”
ঠিক তখনই, একটু দূরে মাঠের অন্য প্রান্তে, কাঁচা রাস্তার ধারে একজন মানুষ থেমে দাঁড়ায় সে কাছে আসে না।
শুধু দূর থেকেই তাকিয়ে থাকে দুজন মেয়ের হাসি,
খোলা মাঠে গানের রেশ,আর লিসির সেই উজ্জ্বল মুখ—সবটাই তার চোখে পড়ে লোকটা কারো সঙ্গে কথা বলে না। শুধু কিছুক্ষণ দেখে,তারপর ধীরে ধীরে অন্য দিকে চলে যায়।লিসি আর তামান্না কিছুই টের পায় না।আকাশে তখন সন্ধ্যার আজান ভেসে আসে।চারপাশে নরম নীরবতা।তামান্না লিসির পাশে এসে হাঁটে—
—“চল, অন্ধকার নামার আগেই বাড়ি ফিরি।”
লিসি মাথা নাড়ে। মাঠের দিকে শেষবারের মতো তাকায়।
মনে হয় আজকের এই খুশিটা এই মাঠটাই বুঝি মনে রেখে দেবে দুজনেই পাশাপাশি হাঁটতে থাকে,কাঁচা রাস্তা ধরে বাড়ির দিকে। মাঠের আইল পেরিয়ে দুজনে কাঁচা রাস্তা ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে দুজনের বেড়ানোর জন্য কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে ওরা দুজনেই বুঝতে পারে না কিন্তু এর মধ্যেই সন্ধ্যা নেমে গেছে চারপাশটা অদ্ভুতভাবে ফাঁকা মাঠে আর কোনো লোকজন নেই।
দূরে শুধু একটা বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে—ওটাই এখন ভরসা তামান্না একটু জোরে হাঁটে। লিসি তার ওড়নাটা শক্ত করে ধরে।
—“চল, ও বাড়িটার কাছে পৌঁছালেই ঠিক আছে,”
তামান্না নিচু গলায় বলে।
—“হুম,”
লিসি মাথা নাড়ে। গ্রাম নিজের হলেও এই ফাঁকা সন্ধ্যাটা আজ অস্বস্তিকর লাগছে।ঠিক তখনই কাঁচা রাস্তার মোড় থেকে হঠাৎ কয়েকটা ছায়া সামনে এসে পড়ে।
চার-পাঁচজন ছেলে আর তাদের মাঝখানে নুহান সঙ্গে একটা গাড়ি নিয়ে এসেছে। তার চোখ সোজা গিয়ে পড়ে লিসির ওপর। নুহান ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে—
—“আরে, এ যে লিসি না?”
ছেলেগুলোর মধ্যে কেউ একজন হাসে আরেকজন বাজে চোখে তাকায়।
—“সন্ধ্যায় একা একা মাঠে ঘোরা ভালো লাগে নাকি?”
নুহান কণ্ঠে কটু হাসি লিসির বুক ধক করে ওঠে।
সে চোখ নামিয়ে নেয় তামান্নার হাত শক্ত করে ধরে।
—“চল,”
লিসি ফিসফিস করে বলে দুজনেই পাশ কাটিয়ে যেতে চায় কিন্তু নুহান এক পা সামনে বাড়ায়।
—“এত তাড়া কিসের?”
তার চোখ লিসির দিকে আটকে।
—“এমন করে হাঁটলে তো তাকানোই লাগে!”
পেছনের ছেলেগুলো খিকখিক করে হেসে ওঠে লিসির শরীর কেঁপে ওঠে সে আর চোখ তোলে না।
—“দয়া করে আমাদের যেতে দিন,”
তামান্না সাহস জোগাড় করে বলে।
নুহান হেসে বলে—
—“দয়া? আরে, আমরা তো নিজের গ্রামেই আছি!”
লিসি আবার একবার পাশ কাটিয়ে যেতে চায়।
কিন্তু নুহান হাত বাড়িয়ে তার পথ আটকায়।
—“এত ভয় পাও কেন?”
তার কণ্ঠটা এবার নিচু, বাজে।
—“দেখতে তো আজ খুব সুন্দর লাগছে।”
লিসির চোখে জল এসে যায়। গলা শুকিয়ে আসে।
—“আমাদের ছাড়ুন,”
সে কাঁপা গলায় বলে। কিন্তু নুহান এবার আর নড়ে না।
সন্ধ্যার নীরব কাঁচা রাস্তায় হাওয়ার শব্দটা যেন আরও জোরে শোনা যায় আর লিসির বুকের ভেতর ভয়টা চেপে বসে…
নুহান তখন আরে বাজে ভাবে বলে —“ তোকে আগে যেমন দেখেছিলাম এখন তো তার থেকেও হাজার গুন সুন্দরী হয়েছিস। বাহ ' লাভই হয়েছে আমার। তোর জন্য আমি কত কিছু সহ্য করেছি, কি বাল ছিড়েছিলাম তোর, আমি শুধু একটু ওড়নার আঁচলটাই ধরেছিলাম তাই তোর নানিকে বলে আমাকে জেলে পাঠিয়ে দিলে। এখন তোকে আমি হারে হারে টের পাওয়াবো এই চেয়ারম্যানের ছেলে নুহান কি জিনিস! ”
কাঁচা রাস্তায় বাতাস হঠাৎ থেমে যায় সন্ধ্যার অন্ধকারটা যেন একটু ঘন হয়ে নামে নুহানের কথাগুলো শুনে লিসি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায় ভয়ের মাঝেও চোখে হঠাৎ একটা প্রশ্ন জ্বলে ওঠে।
—“কী বলছ?”
তার গলা কাঁপে, তবু সোজা তাকায়। নুহান হেসে এক পা সামনে আসে। তার কণ্ঠে চাপা রাগ আর বিকৃত তৃপ্তি—
—“তুই জানিস না? তোর জন্যই তো দুই বছর জেল খেটেছি।”
তামান্না চমকে ওঠে—
—“কী! লিসির জন্য?”
নুহান দাঁত চেপে বলে—
—“হ্যাঁ। তোর সম্মানের গল্পটা তখন অন্যরকম ছিল। প্রথম ভেবেছিলাম—তোকে অপমান করবো, তোর সম্মানে দাগ লাগাবো।”
সে থামে। চোখ দিয়ে লিসিকে একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত মাপে।
—“কিন্তু এখন…”
তার কণ্ঠটা আরও নিচু হয়—
—“এখন তোর রূপ দেখে মনে হচ্ছে—তোকে বিয়ে করলেই ভালো। একদিন করে ভালো লাগবে না, বিয়ে তারপর… প্রতিদিন। আরে যখন বাইরেরটা দেখে মন ভরবে না। তখন তোকে বিয়ে করার পর ঘরে এসে পার্মানেন্ট সুন্দরের কাছে এসে মন ভরে নিয়ে যাবে। আর তোর সৌন্দর্য তো কখনো কমছেই না দেখছি! ”
পেছনের ছেলেগুলো হেসে ওঠে সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই—শুধু হিংস্রতা লিসির শরীর কেঁপে ওঠে।
সে এক পা পিছিয়ে যায়।
—“তুই অসভ্য!”
লিসি হঠাৎ জোরে বলে ওঠে।
—“আমাকে ছুঁয়েও দেখবি না।”
নুহানের মুখ শক্ত হয়ে যায়।
—“ভুল করছিস, লিসি। আজ তোকে এখান থেকে নিয়ে যাবো।”
সে হাতের ইশারা করতেই দুজন ছেলে এগিয়ে আসে।
তামান্না হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে—
—“কেউ আছে? কেউ আছে নাকি!”
তার গলা ফাঁকা মাঠে ছড়িয়ে পড়ে কিন্তু চারদিকে শুধু অন্ধকার আর নীরবতা একজন ছেলে লিসির হাত ধরতে যায়।
—“আমাকে ছেড়ে দাও!”
লিসি চিৎকার করে হাত ছাড়াতে চেষ্টা করে।
ভয়ের মাঝেও সে লড়াই করে। নুহান রেগে গিয়ে বলে—
—“চুপ! বেশি চেঁচাস না।”
লিসি হঠাৎ সাহস করে সামনে পা বাড়ায়—
—“শুনে রাখিস, নুহান। আজ যদি আমাকে কিছু করিস আমার নানু তোকে ছাড়বে না ।”
নুহান ঠাট্টা করে হাসে—
—“কি করবে আমার বাল ছিরবে আর তখন তো আমি তার নাত জামাই হয়ে যাবো আমার কিছু হলে তার নাতনি কষ্ট পাবে যে....... হা হা ।”
ঠিক তখনই দূরে একটা দরজা খোলার শব্দ।
কুকুরের ডাক নুহান একটু থমকে যায়।চারদিকে তাকায়। তামান্না আবার জোরে চিৎকার করে—
—“বাঁচাও! কেউ আসুন!”
ছেলেগুলো অস্থির হয়ে ওঠে নুহান দাঁত চেপে বলে—
—“আজ ছাড়ছি না… সময় লাগবে মাত্র।”
লিসির চোখে জল,কিন্তু মাথা নিচু করে না সে সন্ধ্যার।
নুহান —“ তোকে ভালো ভালোই বলছি আমার সাথে চল লিসি ”
লিসি —“ মরে গেলেও না অসভ্য লোক, কি কর ভাবলে আমি তোর সাথে যাবো ”
ঠিক সেই সময় নুহানের চোখ হঠাৎ তামান্নার দিকে যায়।
একটা ঠান্ডা হাসি ঠোঁটে লেগে থাকে।
—“দেখ লিসি,”
সে ধীরে ধীরে বলে,
—“তুই একা এলে এক কথা। কিন্তু তোর এই পাশে তামান্না ওকে কিন্তু আমার ছেলেদের কাছে এখন ছেড়ে দেবো। আর ওরা না বিষন দুষ্ট মেয়ে দেখলে ঠিক থাকে না তাই বুঝতে পারছিস তামান্না অবস্থা কি হবে, তোর সামনেই করবে ওরা চিন্তা করিস না ”
কিন্তু তামান্না শক্ত হয়ে দাঁড়ায় নিজের পরোয়া না করে লিসির হয়ে বলে
—“ওকে ছেড়ে দে,”
নুহান পাশের একজন ছেলেকে ইশারা করে।
—“এই মেয়েটার কী হতে পারে, তুই জানিস তো ”
লিসির বুকের ভেতরটা হঠাৎ ছিঁড়ে যায় সে এক পা সামনে এসে দাঁড়ায়।
—“ওকে কিছু বলবি না,কিছু করবে না ”
লিসি দ্রুত বলে ওঠে।
—“আমি যাবো। আমাকে ছেড়ে দাও, তামান্নাকে যেতে দাও।”
তামান্না চিৎকার করে ওঠে—
—“না! লিসি না!”
নুহান ঠাট্টার হাসি হাসে—
—“বুদ্ধিমানের কাজ করছিস। নইলে তোর বান্ধবীর ভবিষ্যৎটা খুব সুন্দর হবে না।”
লিসি আর দেরি করে না। ভয়ে নয় ভালোবাসা আর দায়িত্বে সে ধীরে ধীরে তামান্নার হাতে নিজের ফোনটা গুঁজে দেয় চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বলে—
—“এই ফোনে… প্রথম যে নাম্বারটা আছে, ওখানে কল করবি। আশা করি নিরাশ হবি না দ্রুত এখান থেকে চলে যাবি। আমার যা হওয়ার… তা হবে।”
তামান্নার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
—“আমি তোকে ছেড়ে যাবো না…”
লিসি খুব আস্তে বলে,
—“প্লিজ।”
নুহান বিরক্ত হয়ে ওঠে।
—“এত নাটক বন্ধ কর।”
দুজন ছেলে এগিয়ে এসে লিসির হাত ধরে লিসি আর প্রতিরোধ করে না। তামান্না দৌড়ে এসে ধরে টান দেয়—
—“ছাড়ো! ওকে ছাড়ো!”
কেউ শোনে না লিসির চোখ ভিজে যায়।
তামান্নারও। দুজনের কান্না সন্ধ্যার ফাঁকা রাস্তায় মিশে যায়, কিন্তু ওদের মন গলায় না একটুও নুহান ঠান্ডা গলায় বলে—
—“নিয়ে চল।”
লিসিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। তামান্না মাটিতে বসে পড়ে, হাত কাঁপতে কাঁপতে ফোনটা শক্ত করে ধরে।
আর লিসি চোখ বন্ধ করে, মনে মনে শুধু একটা কথাই বলে—
“ভাইয়া… আপনি কোথায়?আমার খুব ভয় করছে…”
সন্ধ্যার অন্ধকারটা আজ লিসিকে গিলে নেয়…
ওরা লিসিকে জোর করে গাড়িতে তোলে লিসি চেয়েও কিছু করতে পারে না।
শহরে সন্ধ্যা নেমেছে।রায় চৌধুরী বাড়ির ড্রইংরুমে নরম আলো জ্বলছে।অফিস থেকে ফেরা ছেলেরা ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমেছে। হাসি, গল্প, দিনের টুকিটাকি কথা—ঘরটা ভরে আছে স্বাভাবিকতায়।কিরিস নিজের চেয়ারে বসে আছে একটু দূরে।চোখ ফোনে, আঙুলে হালকা কাজ।
মুখটা আজ অদ্ভুত শান্ত। সুপ্রিয়া এক কাপ কফি এগিয়ে দেয়। কিরিস কফিটা হাতে নেয়,চোখ না তুলেই বলে—
—“থ্যাংক ইউ।”
বাকিরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে থাকে।
হাসি, ঠাট্টা, দিনের গল্প। কিছুক্ষণ পরে কিরিস কফিটা শেষ করে।আজ মনটা সত্যিই ভালো তার।
কারণ লিসি আর তার সব ভুল বোঝাবুঝি শেষ।
বেশ কিছুক্ষন পরে সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে কিচেনের দিকে যায়। ফ্রিজ খুলে একটা জুস বের করে।ঢাকনা খুলে এক চুমুক দিতে যাবে—
ঠিক তখনই ড্রইংরুমে ফোনটা বেজে ওঠে। কিরিস বিরক্ত হয়ে ভুরু কুঁচকে তাকায়।খাওয়ার সময় ফোন—সে একদমই পছন্দ করে না।এই সময় কাবির এগিয়ে আসে।
টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নেয়।
—“Bro, ফোনটা ধরবো?”
কিরিস জুসে হালকা এক সিপ নিয়ে বলে—
—“হুম, ধর।”
কাবির স্ক্রিনের দিকে তাকায় Unknown Number.
সে কানে তোলে।
—“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে ভেসে আসে একটা কাঁপা, কান্নাভেজা কণ্ঠ—
—“ভাইয়া… ভাইয়া, আমি তামান্না…”
কাবিরের মুখের হাসিটা মিলিয়ে যায়।
—“কি হয়েছে? কাঁদছো কেন মেয়ে?”
ওপাশ থেকে শব্দ ভাঙা ভাঙা—
—“লিসি… লিসিকে তুলে নিয়ে গেছে…”
এক সেকেন্ড।
পুরো ড্রইংরুমটা থেমে যায়। কাবিরের গলা হঠাৎ জোরে উঠে যায়—
—“কি?!”
কিচেনে দাঁড়িয়ে থাকা কিরিস এই একটা শব্দেই ঘুরে তাকায়।
—“কি হয়েছে?”
গলাটা ঠান্ডা, কিন্তু চোখ তীক্ষ্ণ। কাবির ফোনটা শক্ত করে ধরে বলে ওঠে—
—“Bro… ও বলছে—লিসিকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে!”
মুহূর্তের মধ্যে কিরিসের চোখ বদলে যায়। যেন আলো নিভে অন্ধকার নেমে আসে। জুসের গ্লাসটা তার হাত থেকে চুপচাপ মেঝেতে পড়ে ভেঙে যায়। ড্রইংরুমে হইচই পড়ে যায়। সুপ্রিয়া, বাকিরা সবাই উঠে দাঁড়ায়। কিরিস ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। কাবিরের হাত থেকে ফোনটা নেয়।
ড্রইংরুমে তখন নিঃশব্দ। কারো শ্বাস নেওয়ার শব্দও যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে কিরিস ফোনটা কানে ধরে আছে।
কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু সেই শান্তি ভয়ংকর।
—“কে করেছে?”
ওপাশ থেকে তামান্নার কান্না থামে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে ভাঙা গলায় বলতে শুরু করে—
—“ভাইয়া… নুহান… গ্রামের চেয়ারম্যানের ছেলে।
ও… ও লিসির জন্য দু’বছর জেল খেটেছে।
আজ সন্ধ্যায়… ওরা পথ আটকে… আমাকে ভয় দেখিয়ে… লিসিকে নিয়ে যায়…”
প্রতিটা শব্দ ড্রইংরুমের দেয়ালে আঘাত করে।
কিরিস একটুও নড়ে না। শুধু চোখ দুটো ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যায়।
ঠিক তখনই মির্জা বেগম সামনে এগিয়ে আসেন।
তার চোখ লাল। কণ্ঠ কাঁপছে, কিন্তু শক্ত।
—“নুহান…”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
—“এই ছেলেটাই একবার লিসির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিল।”
সবাই তার দিকে তাকায়।
—“আমি নিজে মামলা করে
ওকে জেলে পাঠিয়েছিলাম।”
তার গলায় রাগ আর কষ্ট একসাথে ভেঙে পড়ে।
—“আমি ভেবেছিলাম… শিক্ষা হয়ে গেছে। কিন্তু না কিরিস ও ভালো ছেলে না আমার সোনা নাতনি টার সাথে যেন কিছু না করে! ”
কিরিসের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে এই প্রথম সে কথা বলে—
—“মার্ক।”
এক শব্দ কিন্তু আদেশ ফোনের নাম্বার বদলে ফোন দেয়
—“ঢাকা শহরের রাস্তা ক্লিয়ার কর।
ট্রাফিক সিগন্যাল—সব বন্ধ।”
মার্ক ফোনের ওপাশ থেকে এক সেকেন্ডও দেরি করে না—
—“On it, Boss.”
ঘরের ভেতরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে যায় রিহান উঠে দাঁড়ায়—
—“আমি যাবো।”
কাবির সঙ্গে সঙ্গে—
—“আমি আর রিহান একসাথেই যাবো।”
আরোবি সামনে এগিয়ে এসে বলে—
—“আমরাও যাবো,। একা না।”
কিরিস কিছু বলে না। সে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নেয়।
কারো দিকে তাকায় না। ড্রইংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই জানে এই মুহূর্তে কিরিসকে থামানো যায় না সে দরজার দিকে হাঁটে। পিছন থেকে মির্জা বেগমের কণ্ঠ ভেঙে আসে—
—“ওকে ফিরিয়ে আনিস… যেভাবেই হোক।”
কিরিস দরজায় দাঁড়িয়ে এক সেকেন্ড থামে।
তারপর বলে—
—“আমি ওকে ফিরিয়ে আনবো।”
একটু থেমে—
—“আর যারা ছুঁয়েছে…”
কণ্ঠ নেমে আসে বরফের মতো ঠান্ডা।
—“তারা বাঁচবে না।”
দরজা বন্ধ হয় রায় চৌধুরী বাড়িতে
একটা ঝড় বেরিয়ে গেল আর শহরের রাস্তা একটার পর একটা নিস্তব্ধ হয়ে যেতে শুরু করে।মির্জা বেগম চিন্তায় বসে পরে তাকে এমন অবস্থা পরতে দেখে প্রিয়া সুপ্রিয়া এগিয়ে যায়।
সুপ্রিয়া—“ মা চিন্তা করবেন না আমার ছেলেটা আমার এতোটুকু বিশ্বাস আছে, যে লিসিকে ঠিক ফিরিয়ে আনবে কিচ্ছু হবে না চিন্তা করবেন না ”
আনোয়ার মাকে সান্তনা দিয়ে বলে —“ মা চিন্তা করোনা তোমার কিছু হলেই কিন্তু সবার আগে লিসির খারাপ লাগবে ”
আনারুল —“ ঠিক তুমি শান্ত হও মা,,, ”
বাড়ি জুরে একটা টেনশন নেমে আসলো চার দিকটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল বাকিরা বেরিয়ে পড়েছে লিসিকে খোঁজার উদ্দেশ্য।
ঢাকা শহর।
সন্ধ্যার আলো নিভে রাত নামতে নামতে হঠাৎই শহরের ছন্দ বদলে যায়। একটার পর একটা ট্রাফিক সিগন্যাল নিভে যাচ্ছে। লাল—হলুদ—সব অন্ধকার। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশরা হঠাৎ ইয়ারপিসে নির্দেশ পায়।
—“All clear. No stopping.”
এক মুহূর্তের মধ্যেই তারা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। কারো চোখে প্রশ্ন নেই, শুধু সতর্কতা দূর থেকে একটা কালো গাড়ির শব্দ ধীরে না ভয়ংকর দ্রুত কিরিসের গাড়ি
হেডলাইটের আলো রাস্তাকে কেটে এগিয়ে আসছে।
গাড়ির ভেতরে কিরিস। চোখ সামনে,হাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত করে ধরা চেহারায় কোনো আবেগ নেই।এই মুখটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। গাড়ি সিগনালের সামনে এসে থামে না।একজন ট্রাফিক পুলিশ হাত তোলে সাধারণ নিয়মে নয়,সম্মানে।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন ফিসফিস করে
—“কি হয়েছে?”
—“এত পুলিশ, সিগন্যাল বন্ধ কেন?”
—“কার গাড়ি?”
একজন ধীরে বলে ওঠে—
—“রায় চৌধুরীর গাড়ি।”
আরেকজন চুপ করে যায় গাড়িটা সামনে ছুটে যায়।
রাস্তায় আর কোনো গাড়ি নেই। শহর যেন একজন মানুষের জন্য নিজেকে খালি করে দিয়েছে।
কিরিসের ব্লুটুথ কানে—
—“Boss, সব রুট ক্লিয়ার। লোকেশন ট্র্যাক করছি।”
কিরিস একটুও কথা বলে না। শুধু অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দেয়। BMW গাড়ির স্পিড বাড়ে গাড়ি ফুল স্পিডে চলছে রাস্তায় বাতাস কাঁপে। হেডলাইটের আলোয় ঢাকার রাত পিছিয়ে যায় এই শহর জানে— কিরিস কি জিনিস!
আর এখন কিরিসের মাথায় একটাই নাম লিসি। গাড়ি ছুটে চলে রাত আরও গভীর হয় ঝড় আসছে।
কিরিস এখন পাগলের মতো গাড়ি চালাচ্ছে কোনো দিকে তার মন নেই গাড়ি ফুল স্পিডে চলছে রাস্তায় বাতাসকে চিড়ে যাচ্ছে যেন মনে হয় পিছনে পরে যাচ্ছে একের পর এক বিল্ডিং।
কিরিসের গাড়ি অনেক আগেই চোখের আড়াল হয়ে গেছে। তার ঠিক কিছুক্ষণ পর আরেকটা কালো গাড়ি রায় চৌধুরী বাড়ির গেট পেরিয়ে রাস্তায় নামে।গাড়ির ভেতরে—রিহান ড্রাইভিং সিটে,পাশে কাবির,পেছনে আরোবি আর জারা। গাড়ির ভেতর অদ্ভুত টেনশন।
কাবির ফোন কানে দিয়ে দ্রুত কথা বলছে—
—“ইয়াবি, এখনই বের হ। ইশানকেও নিয়ে আয়।
কোনো প্রশ্ন না।”
ফোন কেটে যায়। জারা চুপ করে বসে আছে,
হাত দুটো শক্ত করে ধরা। চোখে ভয় স্পষ্ট। আরোবি আয়নায় তাকিয়ে বলে—
—“কিরিস একা চলে গেল… এটা ভালো লাগছে না।”
রিহান দাঁতে দাঁত চেপে—
—“আরে চিন্তা করিস না ও আমাদের ভাই ঠিক লিসিকে খুঁজে নেবে ”
এই সময় কাবির ফোনটা নামিয়ে হঠাৎ হালকা হেসে বলে—“ হুম আমার ভরসা আছে ভাইয়ার উপর কি। তোর নেই নাকি আরোবি!।”
আরোবি বিরক্ত হয়ে তাকায়—
—“এই সময়েও তোর মাথায় ফান!”
কাবির কাঁধ ঝাঁকিয়ে—
—“না হাসলে মাথা ঠিক থাকে না, জানিস তো।”
একটু পরে ওরা একটা ক্যাপের ওখানে পৌছায় ইশান দাঁড়িয়ে আছে সঙ্গে ইয়াবিও। ওরা দ্রুত গাড়িতে উঠে পরে। ইশান গাড়িতে উঠেই বলে—
—“এইটা কি কোনো সিনেমা নাকি? সবাই এমন সিরিয়াস কেন?”
জারা চোখ বড় করে—
—“তুই চুপ কর! পরিস্থিতি বুঝিস না?”
ইশান হেসে—
—“আমি বুঝি বলেই তো হাসছি।
তুই ভয় পেলে কিউট লাগে।”
জারা রেগে গিয়ে —
—“একদম বাজে!”
আরোবি তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে—
—“এই দুইজন, এখন না। প্লিজ।”
ইয়াবি —“ হয়েছে টা কি? এতো জরুরি ডাক ”
আরোবি সবটা ইয়াবি আর ইশানকে বললে দুজনে চুপ হয়ে যায় ইয়াবি বড় ভাইয়ের মতো বলে —” কোন জানোয়ার আমার বোনের দিকে নজর দেচ্ছে তাকে দেখছে ইচ্ছে করছে ,,, ”
ইশান —“ মনে হচ্ছে সামনে পেলে খানিক ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলতাম ”
রিহান —“ সব করবো আমি লোকেশন খুজবো তাই ইয়াবি গাড়ি চালা ”
সে কেবল মাথা নাড়ে। ইয়াবি ড্রাইভিং সিটে বসো রিহান পিছনে যায় তার ট্যাবলেট টা খুলে কিছু কাজ করতে থাকে মিনিটখানেক পরে বলে ওঠে —
“সাকসেসফুল! ”
এরপরে লোকেশনটা সেন্ড করে দেয় কিরিসের ফোনে।
গাড়িগুলো আবার একসাথে চলতে শুরু করে। ভেতরে আবার নীরবতা।জারা আস্তে করে বলে—
—“লিসি ঠিক থাকবে তো?”
এই প্রশ্নে কারো কাছে উত্তর নেই।
আরোবি ধীরে বলে—
—“কিরিস ভাইয়া আছে।”
এই একটা নামেই সবাই একটু ভরসা পায়। রাস্তায় গাড়িগুলো ছুটে চলে। একদিকে টেনশন, আরেকদিকে সম্পর্কের টান, হালকা হাসির আড়ালে লুকোনো ভয়।
কারণ সবাই জানে এই রাত কাউকে না কাউকে চিরদিনের মতো বদলে দেবে।
দূরে ফাঁকা মাঠে একটা তাম্বু টাঙ্গানো হয়েছে একেবারে বিয়ের মতো করে রঙিন কাপড়, কাগজের ফুল—সব কিছুই যেন হাস্যকর, কারণ এখানে কোনো আনন্দ নেই।
লিসি প্রথমে ছুটে পালানোর চেষ্টা করেছিল। একবার না—বারবার। কখনো টাম্বুর একপাশ ঠেলে বেরোতে চেয়েছে, কখনো চিৎকার করতে গিয়েও গলা শুকিয়ে গেছে কিন্তু চারদিকে লোক।পালানোর পথ নেই।একজন তার হাত ধরে টেনে বসিয়ে দেয়।
আরেকজন চোখ রাঙায়—
—“চুপ করে বস।”
তারপর ধীরে ধীরে লিসি থেমে যায় আর লড়াই না।
আর চিৎকার না চুপচাপ বসে থাকে কেউ বলে—
—“এইভাবে বস, বউ মানুষ।”
“বউ”—
এই শব্দটা শুনে লিসির বুকের ভেতর কিছু একটা মরে যায়। নুহান সামনে এসে দাঁড়ায়। আজ তার মুখে বিজয়ের হাসি।
—“এখন ঠিক আছে,”
সে বলে—
—“এইভাবেই সুন্দর লাগে একটু সেজে নে তারপর তোর আর আমার বিয়ে। ”
লিসি মাথা তোলে না চোখের সামনে শুধু অন্ধকার।
সে ভাবে—আমি বেঁচে আছি, তাই না? নাকি এই জায়গাতেই আমি শেষ? কেউ তার কপালে কিছু ছোঁয়ায়।
সে কেঁপে ওঠে, কিন্তু প্রতিবাদ করে না।কারণ সে বুঝে গেছে—আজ প্রতিবাদ মানে শুধু আরও ক্ষতি।
একজন বলে ওঠে—
—“বউ তো চুপচাপ, কাজ শুরু করা যাক!”
লিসির চোখ দিয়ে জল নামে কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই।
সে শুধু মনে মনে বলে—
“ভাইয়া আমি আর পারছি না, আপনি আসুন না আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, ভাইয়া ”
টাম্বুর ভেতরে আলোটা অদ্ভুত খুব উজ্জ্বল না,আবার অন্ধকারও না ঠিক এমন আলো, যাতে মানুষ নিজের ছায়াকেই ভয় পায়। লিসিকে ধরে এনে বসানো হয়।
সে বসে না বসিয়ে দেওয়া হয় হাত দুটো শক্ত করে ধরে রাখা।
কেউ বলে—
—“চুপ কর, বেশি নড়বি না।”
লিসি নড়ে না কারণ সে জানে,নড়লেই আরও খারাপ হবে। তার সামনে রাখা হয় লাল শাড়ি নতুন, ভারী, চকচকে।
—“পড়।”
লিসি মাথা নাড়ে। খুব ছোট করে। এই ‘না’-টা কাউকে স্পর্শ করে না। দুজন মেয়ে এগিয়ে আসে তারা কাজ জানে এটা তাদের প্রথম না।লিসিকে জোর করে শাড়ি পরানো হয়। একেকটা গিঁট তার বুকের ভেতর বাঁধা পড়ে।
মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয় লাল বিয়ের ওড়না। লিসির চোখের সামনে সবকিছু লাল হয়ে যায়। হাতের কবজিতে
লাল রেশমি চুড়ি একটা একটা করে চুড়ির শব্দে তার মাথা ঝাঁঝরা হয়ে যায় গলায় হার, কানে ঝুমকো, নাকে নাকফুল, কপালে টিপ, পায়ে আলতা।ৃএকটা আয়না সামনে ধরে কেউ বলে—
—“দেখ, একদম বউ হয়ে গেছিস।”
লিসি আয়নায় তাকায় না তাকালে সে নিজেকেই চিনবে না। তার গা ঘিনঘিন করে ওঠে এই সাজ তার নয়। এই লাল ভালোবাসার নয়। এটা ঘৃণার রঙ যার জন্য এই লাল বেনারসি পরার কথা ছিলো তার জন্য আজ লিসি পরছে না। লিসি লম্বা চুলগুলো মেয়ে দুজন বাঁধতে পারে না তাই খুলা রাখে যা ওড়নার নিচে ঠিকমতো লুকোয় না।
লিসির চোখে পানি আসে কিন্তু পড়ে না কারণ সে ক্লান্ত।
সব চেষ্টা করে ফেলেছে। এখানে আসা থেকে রাস্তায় পর্যন্ত চিৎকার পালানো এখন আর কিছু নেই।তাকে টেনে টাম্বুর মাঝখানে আনা হয় মাটিতে ধুলো জমে আছে।
লিসির চোখ সেই ধুলোতেই আটকে থাকে। মনে হয়—
এই ধুলোই তার এখনকার জায়গা। নুহান পাশে বসে।
মুখে বিকৃত তৃপ্তি।
—“আজ তুই আমার বউ হবি, ওফ কি সুন্দর লাগছে তোকে লাল শাড়িতে,,! ”
কেউ বলে—
—“চুপ করে বসে থাক।”
লিসি বসে একদম চুপ চারিদিকে সবাই অট্ট হাসি দেচ্ছে এরপর একজন কাজি আসে প্রথম নুহাহকে কবুল বলতে বলে
একবার, দুবার, তৃতীয়বার নুহান কবুল বলে এবার লিসির পালা। লিসি চোখ তোলে না তার ভেতরে কোনো শব্দ নেই কোনো আশা নেই। শুধু একটাই অনুভূতি এটা আমি না।