পর্ব :50
ছেলেরা একে একে ঘরের ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে যেতে থাকে—যে যার নিজের ঘরে। কিরিস ভিতরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তার চোখ দুটো অজান্তেই কাউকে খুঁজে ফেরে। কিন্তু যাকে সে খুঁজছে, সেই রমণীর কোনো দেখা মেলে না।হলরুমে লিসিকে না দেখে কিরিস ভাবে, হয়তো অন্য কোথাও আছে। তাই আর কিছু না ভেবে সেও নিজের ঘরের দিকেই চলে যায়।
ছেলেরা উপরে উঠতে শুরু করতেই সুপ্রিয়া নুসরাতকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে—
—“উপরে গিয়ে দেখো তো, রিহানের কিছু লাগবে কি না। আর এদিকে আমি ওদের জন্য চা বানাচ্ছি। প্রিয়া, এদিকে আয় তো।”
প্রিয়া আর সুপ্রিয়া দু’জনেই রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। আর নুসরাত ধীরে ধীরে রিহানের পেছনে পেছনে উপরে উঠতে থাকে।
এইদিকে কিরিস তার ঘরে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে, ফ্রেশ হয়ে আবার নিচে নেমে আসে। ততক্ষণে কাবির আর রিহানও নিচে চলে এসেছে।
নিচে নেমে কিরিস দেখে—জারা, আরোবি আর সুরভী ডাব খাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখেই কাবির অবাক হয়ে বলে ওঠে
—“তোরা এই টাটকা টাটকা ডাব এখন কই পেলি রে! অবশ্যই তোরা বাজার থেকে কিনে আনিস নাই। বাজারে তো এমন টাটকা ডাব পাওয়া যায় না। কই পাইলি, লুবদিরা?”
আরেবি ডাবের পানি এক চুমুকে খেয়ে হেসে বলে—
—“আমরা লুবদি হলে তোরা ছুচ্ছু বোকা মারানি!”
রিহান ভ্রু কুঁচকে বলে—
—“না রে, সত্যি বল। আর এইগুলা বা কি? তোরা কই গিলেছিলি ?”
ছেলেরা একে একে সোফায় বসে পড়ে। ঠিক তখনই সুপ্রিয়া আর প্রিয়া চা নিয়ে আসে—ছেলেদের হাতে চা তুলে দেয়, আর কিরিসের জন্য আলাদা করে কফি।
স্টাডি রুমে আনোয়ার আর আনারুল বসে নিজেদের মধ্যেই গল্পে মেতে আছে।
কিরিস কফির কাপ হাতে নিয়েও মনোযোগ হারায় না—তার মন এখনো লিসিকেই খুঁজছে।
এমন সময় জারা হেসে হালকা স্বরে বলে ওঠে—
—“আরে, আমরা তো সকালে লিসিকে গ্রামের বাড়ি রেখে আসতে গিয়েছিলাম। তাই ওখান থেকেই ওকে নিয়ে এসেছি।”
কথাটা শুনে কাবির আর রিহান দু’জনেই চমকে ওঠে।
কাবির—
—“কি! কখন রেখে এলি? কেন?”
রিহান একটু অভিযোগের সুরে বলে—“আমাদের তো একবারও কিছু বললি না!”
কিরিসের মনে এই মুহূর্তে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না—লিসি গ্রামে চলে গেছে! এই তো একটু আগেই, সকালবেলা, নিজের চোখে সে ঘুমন্ত লিসিকে দেখেছে। অথচ এখন শুনছে—ও নেই!
এই কথাটা শুনে নিজের রাগ আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না কিরিস। চোখের দৃষ্টি শক্ত হয়ে আসে, কণ্ঠে জমে ওঠে তীব্রতা—
—“কে বলেছে যেতে? কেন রেখে এসেছিস ওকে গ্রামে?!”
তার রাগে পুরো হলরুমটা হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে।
এমন সময় মির্জা বেগম শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে—
—“আমি বলেছি। তাছাড়া ও নিজেই বলছিল, একটু যেতে চায়। এমনিতেই ওর মনটা ভালো নেই, একটা ঘটনা ঘটেছে—যার জন্য ও আগেই ভয়ে আছে। ওখানে গেলে হয়তো একটু মনটা ভালো হবে, তারপর আবার চলে আসবে। অত চিন্তা করার কিছু নেই।”
কিন্তু এই কথায় কিরিস আরও ফেটে পড়ে।
—“চিন্তা করতে হবে না মানে কী?! যদি ওখানে আবার কিছু হয়ে যায়, তখন দেখবে কে?
ওর যদি কোনো ক্ষতি হয়, তার দায়িত্ব কে নেবে—একবার ভেবে দেখেছো?
ওটা গ্রাম! সবকিছু সহজে পাওয়া যায় না। এত সহজে কী করে যেতে দিলে?
আর আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজনও বোধ করলে না? অন্তত একবার তো বলতে পারতে!”
কথাগুলো বলতে বলতে কিরিসের কণ্ঠ কাঁপছে —রাগে, দুশ্চিন্তায়, আর অজানা ভয়ে। নিজের ছেলেকে এভাবে রেগে যেতে দেখে সুপ্রিয়া ভীষণ অবাক হয়ে যায়।
কিরিস তো কখনো কারোর যাওয়া-আসায় এমন রাগ দেখায় না—কাজিররা হলেও না। কিন্তু আজ… শুধু লিসির নামেই কেন এমন বিস্ফোরণ? কিরিস আর এক মুহূর্তও বসে থাকতে পারে না। চেয়ার ঠেলে উঠে সোজা উপরের দিকে চলে যায়।তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই হলরুমে গভীর নীরবতা নেমে আসে।
সবাই চুপ।
এই নীরবতার মাঝেই আরোবি একটু ভেবে হালকা স্বরে বলে—
—“আচ্ছা, ঠিক আছে… আমি ভাইয়াকে পরে বলবো।”
বাকিরা ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
হাসি-ঠাট্টা, গল্প—সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকে। টিভিতে কী চলছে কেউ ঠিকমতো খেয়ালও করে না, তবু সেটার দিকেই চোখ। যেন কিছুই ঘটেনি।
কিন্তু উপরের ঘরে—
একটা আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ছে।
কিরিস ঘরে ঢুকেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।
হাতের কাছে যা পায়, টেবিলের ওপর থাকা সবকিছু একের পর এক ছুড়ে মারে।গ্লাস, শোপিস—কয়েকটা কাচের জিনিস দেওয়ালে আছড়ে পড়ে বিকট শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।কাঁচের টুকরোগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে—ঠিক লিসির হৃদয়ের মতোই ভাঙাচোরা। ঘরটা সাউন্ড পুরুপ হওয়ায় আওয়াজ বাইরে আসে না।
তার বুকের ভেতরটা আগুনে পুড়ছে।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে নিজেকে ঠান্ডা করার মরিয়া চেষ্টায় পকেট থেকে ফোন বের করে লিসির নাম্বারে কল দিতে থাকে।
একবার…
দুইবার…
তিনবার…
কিন্তু প্রতিবারই রিং বাজে, রিসিভ হয় না।আর তখনই কিরিস বুঝে যায় ইচ্ছে করেই করছে।এই উপলব্ধিটা তার মাথার ভেতর যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করে।
নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ উঠে আসে।এমন রাগ—যেটা কাউকে মারতে নয়, নিজেকেই ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।
মনে হয়, নিজের মাথাটা দেওয়ালে ঠুকে ভেঙে ফেলবে।
চোখের সামনে সবকিছু কেমন ধোঁয়াটে হয়ে আসতে থাকে।কিরিস হাত দিয়ে চুল চেপে ধরে—পাগল পাগল লাগছে নিজেকে।হঠাৎ কিছু একটা ভেবে ব্যালকনির দিকে চলে যায়।ব্যালকনির টেবিলে বসে পাশের উস্কির বোতলের মুখ খুলে একের পর এক চুমুক দিতে থাকে।
গলা দিয়ে নামছে আগুনের মতো অ্যালকোহল।
পাশেই সিগারেট—একটার পর একটা জ্বালাতে ইচ্ছে করছে।কিন্তু কিছুই কাজ করছে না। রাগ এক চুলও কমছে না।এক মুহূর্তের জন্য মাথায় আসে এখনই গ্রামের দিকে রওনা দেবে।যা হোক, যেভাবেই হোক, লিসির কাছে পৌঁছাতেই হবে।কিন্তু পরক্ষণেই কিরিস থেমে যায়।তার চোখের দৃষ্টি বদলে যায়।এই থামাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।কারণ কিরিস যখন কিছু ভাবে, সে হালকা করে ভাবে না।
তার প্রতিটা ভাবনার পেছনে থাকে হাজারো হিসাব, শত শত পরিকল্পনা।নিজের হাতে গড়া ভবিষ্যৎ সে কোনোভাবেই নষ্ট করবে না।তিল তিল করে বানিয়েছে সে এই সাম্রাজ্য। প্রথম দেখা হওয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত—সবকিছুই ছিল তার নিয়ন্ত্রণে।এত সহজে সে হার মানার মানুষ না।ব্যালকনিতে বসে, অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে গভীরভাবে ভাবতে থাকে।ভাবনার পর ভাবনা।একটার ভেতর আরেকটা।চোখের আগুন নিভে যায় না—বরং ঠান্ডা, হিসেবি, ভয়ংকর হয়ে ওঠে।এই নীরবতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক কারণ এখন কিরিস রেগে নেই সে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
অন্য দিকে গ্রামে..
লিসি বারবার নিজের ফোনটার দিকে তাকাচ্ছে।
স্ক্রিনে একটার পর একটা নাম জ্বলে উঠছে—কিরিস।
কল হিস্ট্রিতে সারি সারি নাম।সে রিসিভ করেনি।
ইচ্ছে করে করেনি ভয় করছে তার কিন্তু অভিমানও আছে—গভীর, নীরব, কষ্টে ভেজা।কিরিসের গলা শুনলেই হয়তো সে ভেঙে পড়বে।সব কথা বেরিয়ে আসবে।আর সে নিজেকে এখনো সামলাতে পারছে না।
হাত কাঁপছে।বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা অস্বাভাবিক জোরে শোনা যাচ্ছে।কিছু না ভেবে সে জানালার কাছে চলে যায়।গ্রামের ঘর—খোলা জানালা।বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ে আকাশভরা চাঁদ।চাঁদের আলো নরম করে ছড়িয়ে আছে চারপাশে।মাঠ, গাছ, দূরের তালগাছের মাথা—সবকিছু কেমন স্বপ্নের মতো লাগছে।মৃদু মৃদু বাতাস বইছে। সেই বাতাসে লিসির ঘন কালো চুলগুলো আলতো করে নড়ে ওঠে।মুখে এসে পড়ে কয়েকগাছা চুল—সে আঙুল দিয়ে সরিয়ে নেয়। এই শান্ত পরিবেশে নিজেকে একটু শান্ত করতে চায় সে।শহরের কোলাহল নেই।কোনো গাড়ির শব্দ নেই।কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, দূরের কুকুরের হালকা ঘেউ ঘেউ।এমন একটা সুন্দর গ্রামীন পরিবেশে দাঁড়িয়ে লিসি ভাবতে থাকে সবকিছু কি সত্যিই এত কঠিন হওয়া দরকার ছিল? চাঁদের দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো ভিজে আসে। কথাগুলো গলার কাছে এসে আটকে যায়। সে ফিসফিস করে বলে—
—“একটু সময় দাও, ভাইয়া… শুধু একটু।”
ফোনটা সে বুকের কাছে চেপে ধরে রিং বন্ধ হয়ে গেছে।
কিন্তু নামটা এখনো জ্বলছে তার মনে। গ্রামের এই নীরব, সুন্দর পরিবেশের মাঝেও লিসির বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে অশান্ত। কারণ সে জানে এই নীরবতাও বেশিদিন থাকবে না।
কিন্তু অন্য দিকে........
গ্রামের থেকে একটু দূরে আরেকটা গ্রামের এক কোণে—
চেয়ারম্যানের পুরনো দোতলা বাড়ির পিছনের দিকটা তখন আধো অন্ধকার।একটা টিনের ছাউনি দেওয়া বারান্দায় বসে আছে নুহান।হাতের সিগারেটটা ধীরে ধীরে জ্বলছে, চোখে ঘন অন্ধকার।ঠিক তখনই হাঁপাতে হাঁপাতে একজন লোক এসে ফিসফিস করে বলে—
—“ওস্তাদ… খবর আছে।”
নুহান চোখ তোলে।
চোখের ভেতর কেমন এক ভয়ংকর ঝিলিক।
—“কি খবর?”
লোকটা গলা নামিয়ে বলে—
—“লিসি গ্রামে চলে এসেছে।”
এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে যায়।
তারপর নুহানের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে।এমন হাসি—যেটা দেখলে মানুষ অকারণেই ভয়ে সরে যায় সে দাঁড়িয়ে পড়ে।
সিগারেটটা পায়ের নিচে চেপে নিভিয়ে দিয়ে গর্জে ওঠে—
—“এবার তো মেয়ে আমার ফাঁদে পড়তেই হবে!”
চোখ দুটো লাল হয়ে ওঠে তার।
—“তোর জন্য দু’দুটো বছর জেল খেটেছি, জানিস?”
—“তোর রূপের নাকি অনেক বড়াই—তাই না?”
হাসিটা এবার আরও বিকৃত হয়ে ওঠে।
—“এই রূপ যদি আমি নষ্ট না করি, তাহলে আমিও নুহান না!”
দুই বছর আগের সেই ঘটনা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার লিসির সঙ্গে বদমাইশি করার চেষ্টা আর ঠিক তখনই বজ্রপাতের মতো নেমে আসে মির্জা বেগম।থানায় কেস পরিবারের সম্মান। রায় চৌধুরী পরিবার যার নামেই পুলিশের হাত শক্ত হয়েছিল। পাঁচ বছরের জেল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে চেয়ারম্যানের ছেলে।ক্ষমতা, টাকা, প্রভাব—সব মিলিয়ে দ্রুতই বেরিয়ে আসে সে।
নুহান দাঁত কিড়মিড় করে বলে
—“কিন্তু এখন তো মেয়েটা আমার সামনে। এবার আমি ছটফট করব না—আমি খেলব।”
সে পাশে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে আদেশের সুরে বলে—
—“কালকে সন্ধ্যা টাইমে…”
একটু থেমে, চোখ সরু করে—
—“পাখিটাকে খাঁচায় বন্দী করব।”
তারপর নিচু গলায়, বিষাক্ত হাসি দিয়ে যোগ করে—
—“আর রাতে… মজা।”
লোকটার গা কেঁপে ওঠে। গ্রামের শান্ত আকাশের নিচে—
এই মুহূর্তে এক ভয়ংকর ঝড় জন্ম নিচ্ছে। যার আঁচ এখনো কেউ টের পায়নি কিন্তু খুব শিগগিরই। এই গ্রাম জানবে,নুহান ফিরে এসেছে আর এবার সে খালি হাতে আসেনি…
নুহান জেল থেকে বের হয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। সে নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিং UK এর সাথে কাজ করে কিন্তু সে কি আদৌ জানি UK কে ? আন্ডারওয়ার্ল্ড সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তা দাপোট আরো বেড়েছে আর খারাপ কাজও।
ভোরের আলো ধীরে ধীরে গ্রামের আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। রাতের শিশির এখনো ঘাসে ঘাসে লেগে আছে।
মুরগির ডাক, দূরের আজানের শব্দ—সব মিলিয়ে সকালটা অদ্ভুত শান্ত লিসি খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে যায়।
রাতটা সে ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনিমচোখের নিচে হালকা ক্লান্তি, তবু মুখে একরকম নীরব শান্ত ভাব।
সে উঠোনে এসে দাঁড়ায়। খালি পায়ে ঠান্ডা মাটিতে পা ছোঁয়াতেই শরীরটা কেঁপে ওঠে।কুয়াশার ভেতর দিয়ে সূর্য উঠছে—নরম, লাজুক আলো।বাতাসটা এখানে আলাদা।
শহরের মতো ভারী না। মৃদু, পরিচ্ছন্ন, বুক ভরে নিতে ইচ্ছে করে। লিসি দু’হাত দিয়ে ওড়নাটা ঠিক করে নেয়।
চুলগুলো আলতো করে কাঁধে ছড়িয়ে আছে।চোখ চলে যায় দূরের পুকুরের দিকে—জলটা আয়নার মতো শান্ত।
তার ফোনটা পাশের টুলের ওপর রাখা।স্ক্রিনে কোনো নতুন কল নেই।সে একবার তাকায়… তারপর আর তাকায় না।
শহরের আকাশ ধূসর।রাতটা যেন এখান থেকে এখনো যায়নি। কিরিসের ঘরের পর্দা অর্ধেক টানা।ভেতরে ধোঁয়ার গন্ধ। খালি উস্কির বোতল, নিভে যাওয়া সিগারেট—সব ছড়িয়ে আছে।সে সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিল।
কখন ঘুমিয়েছে—নিজেও জানে না।এক কি দুই ঘণ্টা, তার বেশি না। চোখ খুলতেই মাথাটা যেন ফেটে যাবে এমন লাগে গলা শুকনো চোখ দুটো লাল।কিন্তু কিরিস সময় নেয় না সে কখনো নেয় না। ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে পানি দেয়। আয়নায় নিজের দিকে তাকায় চোখের ভেতরে ক্লান্তি নেই, আছে ঠান্ডা রাগ। ড্রেস চেঞ্জ করে নেয়। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট,শার্টের উপর কালো কোর্ট টা কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়, হাতে একটা কালো ঘড়ি আর চোখে একটা চশমা, লাল দুটি চোখকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। সবকিছু নিখুঁত, যেমনটা তার হওয়া উচিত।
নিচে নামার সময় কেউ কিছু বলার আগেই সে বলে ওঠে
—“আমি অফিসে যাচ্ছি।”
কণ্ঠ স্বাভাবিক কণ্ঠ স্বাভাবিক কিন্তু খুব বেশি ঠান্ডা।কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না কিরিস দরজা খুলে বেরিয়ে যায়।
গাড়িতে বসে সে জানালার বাইরে তাকায়।শহর জেগে উঠছে হর্ন, মানুষ, ব্যস্ততা। তার ফোনটা একবার হাতে নেয় স্ক্রিন আনলক করে লিসির নাম। কিছু লেখে না কিছু কলও দেয় না গাড়ি স্টার্ট হয় অফিসের দিকে ছুটে চলে।
লিসি সকালে উঠে নাস্তা সেরে বাইরের দিকে পা বাড়ায়। হালকা রোদের ছোঁয়া, চারপাশটা একদম গ্রামের শান্ত সকাল। ঠিক তখনই দেখে—তামান্না মাঠের দিকে যাচ্ছে, হাতে একটা ঝুড়ি।
লিসি এগিয়ে এসে বলে—
—“কই যাস এখন তুই?”
তামান্না হাঁটতে হাঁটতেই উত্তর দেয়—
—“আব্বার কাছে ঝুড়ি দিতে। যাবি কী তুই নাকি?”
লিসির ঠোঁটে হালকা হাসি খেলে যায়—
—“যাবো তো। বেঁচে গেছি, নানু নেই—নাহলে পারমিশন নিয়ে যেতে হতো।”
তামান্না মুচকি হেসে বলে—
—“তাও তো হ্যাঁই বলতো তোকে! আচ্ছা চল, তোর সাথে বকে লাভ নেই।”
দুজনেই হেসে ওঠে। গল্প করতে করতে ওরা দুজনে মাঠের দিকে পা বাড়ায়। কাঁচা রাস্তা, ধানের গন্ধ, সকালের বাতাস—সব মিলিয়ে সময়টা যেন থমকে আছে।
কিছুক্ষণ পর পৌঁছে যায় তামান্নার বাবার কাছে। তামান্না ঝুড়িটা তার বাবার হাতে তুলে দিয়ে সামনে দিকে এগিয়ে যায়। কাঁচা রাস্তার পাশের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ে। একটু পর লিসিও এসে পাশে বসে।
দুজনেই গল্প করছে—এমন সময় তামান্না হঠাৎ বলে ওঠে
—“আচ্ছা, তুই হঠাৎ করে চলে এলি কেন?”
লিসি একটু চুপ হয়ে যায়। চোখ নামিয়ে নেয়। তারপর মুখে জোর করে একটা হাসি টেনে বলে—
—“এমনি আসলাম। আর এটা তো আমার বাড়ি—তাই না? তাহলে আমি ছাড়া কি তুই আসবি!”
তামান্না সন্দেহভরা চোখে তাকায়—
—“তা না। আচ্ছা বাদ দে। তুই ওখানে গিয়ে কতজনকে পটিয়ে ফেলালি?”
লিসি তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করে—
—“আরে নাহ! কী সব বলছিস!”
তামান্না হেসে বলে—
—“তাহলে একরা পারমানেন্ট পটে গেছে—কে সে? আমাকে মিথ্যা বলবি না। আমি তোর চোখ-মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, তুই কারোর প্রেমে পড়েছিস।”
লিসি দ্রুত মাথা নাড়ে—
—“নাহ।”
তামান্না এবার গম্ভীর হয়ে যায়—
—“আবার মিথ্যা! আচ্ছা বল, কী হয়েছে সবটা? যার জন্য তুই হঠাৎ করে চলে এলি। আমাকে বলতে পারিস। খোদার কসম, কাউকে বলবো না।”
লিসি চুপ করে থাকে। সকালের বাতাসে যেন কথাগুলো আটকে যায়…
লিসি একটু মুচকি হাসে। তারপর আর না ভেবে ঠিক করে ফেলে—সবটা বলে দেবে। যে সত্যটার জন্য সে এখানে এসেছে, সেটা লুকিয়ে রাখার আর মানে নেই।
লিসি শান্ত গলায় বলে—
—“আচ্ছা ঠিক আছে, তোকে আমি সব বলবো। তুই মন দিয়ে শুনবি, তারপর বলবি—এটা ঠিক কি না।”
তামান্না হাত ভাঁজ করে বসে বলে—
—“বল বল, আমি তো তৈরি।”
লিসি একটু ইতস্তত করে, তারপর বলে—
—“তুই আমার বড় মামির বড় ছেলেকে চিনিস?”
তামান্না একগাল হাসি দিয়ে বলে ওঠে—
—“চিনি না মানে! খুব ভালো করেই চিনি। ওই সুপ্রিয়া কাকির বড় ছেলে—কিরিস তো!”
লিসি একটু অবাক হয়ে তাকায়—
—“তুই ওনার নামও জানিস? কী করে চিনিস?”
তামান্না হেসে বলে—
—“তোর মতো গাধা নাকি আমি! আরে, উনি তো কত বড় ব্যবসায়ী, কত নাম-ডাক! ওনাকে চিনবো না? গ্রামের সবাই চেনে মনে হয়—তুই বাদে। আর তাছাড়া দেখতেও… মাশাল্লাহ!”
লিসি হালকা বিরক্ত হয়ে বলে—
—“বাবা, তুই দেখছি সব জানিস!”
তামান্না চোখ চিকচিক করে বলে—
—“হুম। কিন্তু আমার কিছু মনে হচ্ছে… তুই আবার এই—”
লিসি হঠাৎ কথাটা বলে ফেলে—
—“এই ভাইয়ার সাথে প্রেম করেছিলাম।”
তামান্না অবাক হলেও হেসে বলে ওঠে—
—“হ্যাঁ, আমি তো জানতাম তুই এটা বলবি। এরপর এটাও বলবি যে তুই ওকে না বলেছিলি, আর উনি তোকে আগে প্রপোজ করেছিল, তুই রাজি হসনি—তাই জোর করে রাজি করিয়েছে।”
লিসি চমকে যায়—
—“তুই কী করে বললি! এটাই তো হয়েছে। আমি তো একদমই চাইনি। কী বাজে বেটা মানুষ!”
তামান্না হাসতে হাসতে বলে—
—“আমি জানি। আর তোর মনে হয় আমি তোর কথা বিশ্বাস করবো? হা হা হা!”
লিসি একটু কষ্ট নিয়ে বলে—
—“তুই বিশ্বাস করিস আর না করিস—এটাই সত্যি। উনি আমাকে সবসময় জোর করেন।”
তামান্না মাথা নেড়ে বলে—
—“হুম হুম। তোর কথা শুনে তো মনে হচ্ছে আমি কোনো সিনেমার কাহিনি শুনছি।”
লিসি জোর দিয়ে বলে—
—“তুই… এটা সত্যি।”
অনেকক্ষণ ধরে লিসি তামান্নাকে বোঝায়। তারপর তামান্না বিশ্বাস করে এরপর ধীরে ধীরে, এক এক করে—যতটা একটা মানুষ আরেকজনকে বলতে পারে, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবটা বলে ফেলে।
সব শুনে তামান্না চুপ করে লিসির দিকে তাকিয়ে থাকে। লিসির চোখের দিকে তাকিয়েই বোঝা যায়—সে কিরিসকে কতটা চায়, নিজের অজান্তেই।
তামান্না মুচকি হেসে বলে—
—“তুই তো ভুলও শুনতে পারিস। একজন অচেনা মেয়ের সামনে কেউ কেন নিজের অনুভূতি খুলে বলবে? আর তোর কথা শুনে তো বোঝাই যাচ্ছে—কেমন মানুষ উনি।”
লিসি একটু অভিমান নিয়ে বলে—
—“কিন্তু বলতে তো পারতেন যে ভালোবাসেন। আমার সামনে তো কোনো দিন বলেননি।”
তামান্না লিসির মাথায় আলতো টোকা দিয়ে বলে—
—“ব্যবহারে কি কখনো বলেনি? মানুষ মুখে অনেক কিছু বলে, কিন্তু তার ব্যবহারই আসল সত্যটা বলে।”
লিসি নিচু স্বরে বলে—
—“হুম… উনি যত্ন করেন আমায়।”
তামান্না নিশ্চিন্ত গলায় বলে—
—“তাহলে তো হয়ে গেল। কিরিস তোকে ভালোবাসে। আর যদি ওই কথাটা নিয়ে তোর সমস্যা থাকে, তাহলে কিরিসের সামনে গিয়ে তোর সব সমস্যা, তোর চাওয়া—সবটা খুলে বলবি।”
লিসি চুপ করে বসে থাকে। বুকের ভেতরের সেই ধুকধুক অনুভূতিটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। নিজেকে সামলে নেয় সে। এবার সে প্রস্তুত—কিরিসের সামনে দাঁড়ানোর।
একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে—
—“চল, বাড়ি চল। আর ধন্যবাদ তোকে… আমাকে বোঝানোর জন্য।”
তামান্না হেসে বলে—
—“হা হা! এটা তো আমার দায়িত্ব—আমার বান্ধবীকে বোঝানো। আর হ্যাঁ, তোর ভাইয়া ফোন দিলে কিন্তু ধরবি, কথা বলবি। এবার চল, বাড়ি।”
লিসি আর তামান্না দুজনে হাসতে হাসতে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। গ্রামের রাস্তায় ওদের হাসির শব্দটা মিলিয়ে যায় বাতাসে…
ঢাকার অফিসের ঘরে কিরিস একা দাঁড়িয়ে আছে। জানালার বাইরে দুপুরের রোদ ঝলমল করছে, কিন্তু তার চোখ আটকে আছে ফোনের স্ক্রিনে।লিসির নামটা কয়েকবার ভেসে ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়।সে একটা দীর্ঘ শ্বাস নেয়।চোখ বন্ধ করতেই লিসির মুখখানি ফেঁসে উঠে। কিরিস নিচু স্বরে নিজেকেই বলে—
—“এবার আর পালাতে দেবো না, লিসি।”
ফোনটা টেবিলে রেখে সে চেয়ারটায় বসে পড়ে। চোখের দৃষ্টি শক্ত, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে যেটা শুধু ওর জন্যই
বাড়িতে ফিরে লিসি সোজা নিজের ঘরে চলে যায়। দুপুরের রোদটা জানালা দিয়ে ঢুকে মেঝেতে আলো ছড়িয়ে আছে।সে ধীরে ধীরে গোসল করতে যায়। ঠান্ডা পানির ছোঁয়ায় শরীরটা আর মনটা দুটোই হালকা হয়ে আসে। মাথার ভেতরের চিন্তাগুলো একটু একটু করে ধুয়ে যায় যেন।গোসল শেষে পরিষ্কার শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়ায় সে।চুলগুলো আলতো করে আঁচড়ায়।
নিজেকে দেখে নিজেই একটু অবাক হয়—চোখে আজ ভয় কম, ভাবনা বেশি।রান্নাঘর থেকে ডাক আসে।
লিসি গিয়ে ভাত আর হালকা তরকারি খায়। খুব বেশি খেতে ইচ্ছে করে না, তবু খেয়ে নেয়।খাওয়া শেষে নিজের ঘরে ফিরে আসে।খাটে শুয়ে পড়ে পাশ ফিরে। জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছে, পর্দাটা নড়ছে।চোখ বন্ধ করে সে ভাবতে থাকে তামান্নার কথা,কিরিসের কথা,
আর নিজের ভেতরের অজানা সাহসের কথা।ধীরে ধীরে চোখ বুজে আসে লিসির।দুপুরের নরম নিস্তব্ধতায় সে একটু বিশ্রাম নেয়…
বিকেলের দিকে রায় চৌধুরী বাড়িটা আবার ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে ওঠে। গেটের সামনে গাড়ি থামে। কালো গাড়ির দরজা খুলে কিরিস নেমে আসে সে সোজা ঘরের ভেতরে ঢোকে। কাউকে কিছু না বলেই নিজের ঘরে চলে যায়। ব্লেজারটা চেয়ারে ছুড়ে দেয়, টাই খুলে রাখে ফোনটা টেবিলে রাখলেও স্ক্রিনটা অনই করে না। কিরিস শার্টের হাতা গুটিয়ে আরোবির রুমের দিকে যায়। দরজার সামনে গিয়ে হালকা টোকা দেয় আরোবি ঘর থেকে বলে —“ ভিতরে আয় ”
তখন কিরিস দরজা খুলে ঘরের মধ্যে যায় কিরিসকে দেখে আরোবি বলে —“তুই আমার ঘরে হঠাৎ কিছু লাগবে! ”
কিরিস তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।তারপর শান্ত গলায় বলে
—“তোর ফোনটা দে।”
আরোবি একটু অবাক হয়, তবু ফোনটা বাড়িয়ে দেয়।
কিরিস ফোনটা হাতে নেয়, নাম্বার ডায়াল করে।
কল যায়।
লিসি তখন দুপুরের ঘুম থেকে উঠে বসেছে। জানালা দিয়ে বিকেলের আলো ঢুকছে। ঘরটা শান্ত হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে স্ক্রিনে নাম ভেসে ওঠে—
আরোবি
লিসি স্বাভাবিক ভাবেই ফোনটা ধরে—
—“হ্যালো, আরোবি?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর খুব পরিচিত, কিন্তু অপ্রত্যাশিত একটা কণ্ঠ—
—“লিসি…”
লিসির বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
—“ক… কিরিস ভাইয়া?”
তার গলাটা হালকা কাঁপে কিরিস ধীরে বলে—
—“হ্যাঁ। আমি।”
লিসি চুপ করে থাকে শ্বাসটা অল্প অল্প হয়ে আসে।
—“আরোবির ফোন থেকে কেন?”
শেষমেশ সে প্রশ্ন করে।কিরিসের কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু গভীর—
—“আমার ফোন থেকে দিলে তো তুমি ধরতে না, তাই না এইজন্য ।”
লিসি জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। মনে পড়ে তামান্নার কথা—সব খুলে বলতে হবে।
—“আপনি… কেনো কথা বলতে চান?”
সে আস্তে করে জিজ্ঞেস করে।
—“তোমার সাথে কথা বলার জন্য কোনো কারণ থাকার দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না ।”
একটু থেমে কিরিস যোগ করে—
—“আর তোমাকে বাড়ি দেখতে চাই।”
লিসির বুকের ভেতরের ধুকধুকটা আবার শুরু হয়।
কিন্তু এবার সে পালায় না।
—“কেনো, আমি যাবো না আর ,”
সে ধীরে বলে।
ওপাশে কিরিসের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে—
“ তাই! না সবটা না জেনে এতো রাগ আমার উপর অলকানন্দা, ”
বিকেলের বাতাসে পর্দা দুলতে থাকে,আর তার মনে শুধু একটাই কথা ঘুরে বেড়ায় এবার আর পিছিয়ে যাওয়ার নেই।ফোনটা কানে নিয়ে লিসি চুপ করে থাকে।ওপাশেও কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা কিরিসই আগে কথা বলে—
—“লিসি......তুমি হয়তো ভুল শুনেছো।”
লিসি অবাক হয়ে যায়—
—“ভুল শুনেছেন?”
কিরিস —“হ্যাঁ,”
কিরিসের কণ্ঠ শান্ত, গম্ভীর।
—“হয়তো তুমি যা ভাবছো… সেটা আমি বলতে চাইনি। তাই্ এই—ভুল বোঝাবুঝি।”
লিসির বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।এই কথাটাই সে ভয় পাচ্ছিল কিন্তু তামান্নার কথা মনে পড়ে যায়।ব্যবহারে যা বোঝা যায়, সেটাই সত্য। আর লিসি কোনো দিন ও কিরিসের ব্যবহারে এমন কেনো দিক পায়নি যে তাকে সে ঘৃণা করবে।লিসি গভীর শ্বাস নেয় এই প্রথম সে আর পালায় না।
—“তাহলে…”
তার কণ্ঠ একটু কাঁপে, তবু থামে না—
—“তাহলে সত্যিটা বলেন, আমি সত্যি টা শুনতে চায়।”
ওপাশে হঠাৎ নীরবতা নেমে আসে কোনো শব্দ নেই।
শুধু শ্বাসের আওয়াজ এক সেকেন্ড…
দুই সেকেন্ড…
সময় যেন থমকে যায় লিসির হাত শক্ত হয়ে ফোনটা আঁকড়ে ধরে।মনে হয়—এই মুহূর্তেই সব ভেঙে যাবে,
অথবা সব ঠিক হয়ে যাবে।অবশেষে কিরিসের গলা শোনা যায় গম্ভীর, ধীর, আর অদ্ভুতভাবে নরম।
—“লিসি…”
সে একটু থামে। যেন কথাটাকে জোর করে বের করতে হচ্ছে।
—“আমি ভালোবাসি।”
লিসির বুক ধক করে ওঠে কিরিস আরেকটু নিচু স্বরে যোগ করে—
—“আমি ভালোবাসি, লিসিকে।”
লিসির চোখ ভিজে ওঠে। কথা বের হয় না কিছুক্ষণ।
কিরিস —“এটা… কখনো বলা হয়নি,কিন্তু অনুভব করোনি—এটা বলতে পারবে না তুমি।”
লিসি চোখ মুছে আস্তে বলে—
—“আমি… শুনতে চেয়েছিলাম শুধু এই এই কথাটাই।”
ওপাশে কিরিসের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে—
—“এবার শুনেছো।”
ফোনটা তখনো কানে,
কিন্তু লিসির মনে হয় আজ সে সত্যিই শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পেরেছে। ফোনের ওপাশে কিরিসের কথাগুলো শেষ হতেই কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে আসে।লিসি ধীরে শ্বাস নেয়।গলার কাঁপুনিটা এবার আর ভয়ের না—স্বস্তির।
—“ ভাইয়া…”
সে আস্তে করে বলে—
—“আমি শুধু এতটাই জানতে চেয়েছিলাম—আপনি কি ইচ্ছে করে আমাকে কষ্ট দিয়েছেন, নাকি আমি ভুল বুঝেছি।”
ওপাশ থেকে কিরিস সঙ্গে সঙ্গে বলে—
—“ কষ্ট আর আমি তোমাকে আমি পুরো পৃথিবীর সাথে লড়াই করে নেবো কিন্তু তোমাকে কষ্ট আমি কখনো দিতে পারবো না ।”
লিসির চোখে জল এসে জমে, কিন্তু ঠোঁটে হালকা হাসি।
—“সত্যি ?”
কিরিস —“হুম , আর আমি যেনো কালকে তোমাকে বাড়িতে দেখি, কালকে অফিস ছুটি তাই সকালে আমি তোমার হাতেই কফি খেতে চায় ”
লিসি দুষ্টুমি করে বলে —“ আর যদি না আসি, আর কফিও না বানায় ”
কিরিস —“ তাহলে আর কি! তোমাকে গ্রাম থেকে তুলে নিয়ে আসবো, আর এবার ভেবোনা এটা করে শুধু ছেড়ে দেবো লিসি শার্মা,, তোমাকে ওখান থেকে সোজা কাজি অফিস তারপর বাসর তারপর বাড়ি নিয়ে আসবো। তাই ভেবে দেখতে পারো কি করতে চাও? নিজের ইচ্ছেতে নাকি অনিশ্চেতে বুঝতে পেরেছ আমার লিসি শার্মা ”
লিসি মুচকি হেসে বলে—
—“হুম বুঝতে পেরেছি।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে থাকে এই নীরবতাটা আর ভারী না—আরামদায়ক।
—“ভালো থেকো এই কয়েক ঘন্টা আমার অলকানন্দা ,”
লিসি শেষবারের মতো বলে।
—“হুম আর আপনিও,”
লিসি শান্ত গলায় উত্তর দেয়।
কলটা কেটে যায় লিসি ফোনটা ধীরে নামিয়ে রাখে।
জানালার বাইরে তাকায়—বিকেলের আলোটা যেন আগের চেয়ে উজ্জ্বল বুকের ভেতরের সব জট খুলে গেছে।মনটা অদ্ভুতভাবে ভালো লাগছে সে মুচকি হাসে।
আজ আর কোনো ভয় নেই।

0 Comments