পর্ব :48
নুপুরের ঝনঝন শব্দটা মিলিয়ে যেতেই কিরিসের শরীর শক্ত হয়ে যায়।
এই শব্দ সে ভুল করতে পারে না।
এই শব্দ মানেই—লিসি।
এক মুহূর্তের জন্য নিশির অস্তিত্ব তার কাছে শূন্য হয়ে যায়।
কিরিস ধীরে শ্বাস নেয়।
চোখ দুটো লালচে।
কণ্ঠ ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে আগুন।
নিশি কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কিরিস হঠাৎ কথা বলে ওঠে—
নিশির দিকে না তাকিয়ে,
কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন দেয়াল ভেঙে ওপাশে পৌঁছায়।
—“আমি লিসিকে ভালোবাসি না because I observe her badly। আমি যা করি সেটা ভালোবাসা না, দখল। আমি ফুল দিই না, আমি নাম মুছি। লিসির দিকে কেউ তাকালে আমি চেঁচাই না, ঝামেলা করি না, শুধু মনে রাখি—চেহারা, চোখ, হাঁটার ভঙ্গি, সাহসের মাত্রা। আমি কাউকে নিষেধ করি না, কারণ নিষেধ মানে সুযোগ দেওয়া; আমি সুযোগ দিই না। কেউ যদি ভাবে লিসি হাসছে মানে সে অনুমতি পেয়েছে, আমি তাকে সময় দিই—নিজেকে ভুল প্রমাণ করার সময়।”
এরপর নিশির দিকে শয়তানি নজর দিয়ে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলে
—“ আমি প্রেমিক হলে ঈর্ষা করতাম, আমি ঈর্ষা করি না; ঈর্ষা দুর্বলদের জন্য। আমি সিদ্ধান্ত নিই। লিসি কোথায় যাবে আমি আগে জানি, কার সঙ্গে থাকবে আমি আগেই ঠিক করে রাখি, কে নিরাপদ আর কে বিপদ—এই লিস্ট আমার মাথায় থাকে। কেউ সীমা ছুঁলে আমি রাগ করি না, আবেগ দেখাই না, শুধু পরিষ্কার করি—যেন আর কোনোদিন সেই চোখ লিসির দিকে উঠতে না পারে। আমি তাকে বন্দি করি না, কারণ বন্দি জিনিস পালাতে চায়; আমি তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখি—আমার নজরে। মানুষ ভাবে আমি ঠান্ডা, আসলে আমি নিশ্চিত। আমি ভালোবাসলে ছেড়ে দিতে পারতাম; আমি পারি না। লিসি আমার দুর্বলতা না, লিসি আমার নিয়ম। আর নিয়ম ভাঙলে আমি ক্ষমা করি না—আমি ইতিহাস মুছে দিই।
এইটুকু বলেই কিরিস হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায়।নিশির ঠোঁটে তখন শয়তানি হাসি।সে বুঝে গেছে যেটা দরকার ছিল, সেটা হয়ে গেছে।
নিশি হালকা স্বরে বলে—
“দেখো তো… তোমার নিয়মটা কোথায় গেল?”
কিরিস আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না।দৌড়ে সিঁড়ির দিকে যায়।নিশিও পিছন পিছন।কিন্তু লিসি নেই।
করিডোর ফাঁকা।সিঁড়ি খালি।উপরের ঘরগুলো নীরব।
কোথাও নেই সে।কিরিসের বুকের ভেতর প্রথমবারের মতো কিছু একটা ভেঙে পড়ে।চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।আর পেছনে নিশির ঠোঁটে ধীরে ধীরেআরও গভীর, আরও ভয়ংকর একটা হাসি।
ওইদিকে....
বেলকনির রেলিংয়ে দুই হাত রেখে লিসি দাঁড়িয়ে ছিল।
চোখ দুটো ফাঁকা।নিচে তাকানোরও সাহস নেই, আবার ভেতরে ঢোকার শক্তিও নেই। চোখের কোনো অনুভূতি নেই শুধু নিরবে চোখের নোনা পানি ঝরছে। কোনো ভাবে এই পানি থামা নাম নিচ্ছে না। বুকের ভেতরটা জ্বালা করছে।কিরিসের কথাগুলো বারবার মাথায় ঘুরছে—
“আমি লিসিকে ভালোবাসি না।”
ঠিক তখনই পেছনে কারো পায়ের শব্দ।লিসি ঘুরে তাকানোর আগেই নিশির কণ্ঠ কানে আসে ঠান্ডা, বিষাক্ত।
নিশি ব্যঙ্গাত্মক হাসি—
“কি হলো?শুনে ভালো লাগেনি?”
লিসি কিছু বলে না।চোখ নামিয়ে চোখের পানি মুছে নেয়
নিশি এগিয়ে আসে, খুব কাছে।গলায় কটু হাসি—
—“তুই বুঝিস না লিসি?তোর জায়গাটা কখনোই তোর ছিল না।”
লিসির ঠোঁট কাঁপে—
“সেটা তোমাকে আমার বলতে হবে না ”
নিশি হেসে ওঠে।এই হাসিতে কোনো মানবিকতা নেই।
—“কিরিসকে পেতে হলে…তোকে মরতে হবে।”
লিসির মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে।মনে হয় সে ভুল শুনছে।
—“কি…?”
নিশি আরও কাছে আসে।
—“তুই থাকলে আমি কিছুই পাবো না।আর আমি হারতে পারি না।”
এক মুহূর্তের জন্য লিসি ভাবে ও কি সত্যি এমন কিছু করতে পারে?
নিশি আবার বলে —“ মানতে হবে তুই বিশন সুন্দরী, তোর সৌন্দর্যের সামনে সবকিছু হারমানে, হয়তো তার জন্য কিরিস ও তোর রুপে পাগল হয়ে গেছে, তুই আমার দেখা সবথেকে সুন্দরী নারী ”
লিসি কিছু বলে না চুপচাপ আছে লিসি ভাবে এখান থেকে চলে যাবে আর কিরিসের কাছে প্রশ্ন করবে তাকে কেনো এভাবে ভাঙা হলো কেনো এভাবে কষ্ট দেওয়া হলো, সেতো কিরিসের কাছে যায়নি কিরিস ওর কাছে এসেছে।
এইসব ভাবনার মধ্যে নিশি শয়তানি হাসি দিয়ে বলে —“সরি কিন্তু তোকে মরতে হবে এখন, তোর কষ্ট দিলে আমার প্রতিশোধ নেওয়া হবে, আঘাত তোর লাগবে কিন্তু ক্ষত কিরিসের ”
লিসির চিন্তাটা শেষ হওয়ার আগেই একটা ধাক্কা।
হঠাৎ,নির্দয়।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে লিসি বুঝতেই পারে না
কি হলো, কি করতে হবে।রেলিংয়ের হাতটা ফসকে যায়।এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় সে মরতে যাচ্ছে।
শূন্যতা, হাওয়ার চাপ।
তারপর
একটা বিকট শব্দ।নিচে রাখা কাঁচের টেবিল ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।কাঁচের টুকরো গায়ে বিঁধে যায়।
মাথায় তীব্র আঘাত লাগে।চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে।শেষ যে অনুভূতিটুকু থাকে তা শুধু ঠান্ডা। কোনো ব্যথা অনুভব হচ্ছে না লিসির শরীর বাসনা হয়ে যাচ্ছে চোখ বুঁজে আসছে। তারপর সব নিস্তব্ধ লিসি জ্ঞান হারায়।উপরতলায় বেলকনিতে দাঁড়িয়ে নিশি নিচে তাকায়।ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা ভয়ংকর, শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে।হঠাৎ নিচে থেকে বিকট এক শব্দ ভেসে আসে কাঁচ ভাঙার শব্দ।
এক মুহূর্তে পুরো বাড়ি থমকে যায়।
—“কি হলো?!”
—“ওইটা কী শব্দ?”
সবাই একসাথে ছুটে আসে নিচের দিকে।আর ঠিক তখনই মাটিতে পড়ে থাকা একটা শরীর, লিসি।
কালো জামার উপর রক্তের ছিটা কাঁচের টুকরো আর রক্তে ভিজে গেছে।পিঠে ভাঙা কাঁচ গেঁথে আছে।
মাথার কপাল দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
—“আল্লাহ!”
—“লিসি!”
—“কি করে পড়লো?!”
চারপাশে হইচই পড়ে যায়।কেউ ঘাবড়ে যায়, কেউ চিৎকার করে ওঠে।কয়েকজন উপরের দিকে তাকায়।
—“উপরে কেউ ছিল?”
—“বেলকনিতে তো কেউ নেই!”
সবাই হতভম্ব।তাহলে পড়লো কী করে?
এই প্রশ্নটা সবার মাথায় ঘুরছে কি করে পরলো
আরোবি — “ এই লিসি কি হয়েছে এই কথা বল! ”
সুরভী —“ আল্লাহ গো এই ইশান দেখনা ”
ইশান —“ দাঁড়া.. মাথায় লাগায় জ্ঞান হারিয়েছে ”
ইয়াবি এইদিকে ওইদিকে তাকিয়ে বলে —
“ আরে শালার শাহাজাহান কই গিলে তোর মমতাজ গেলো এরপর তোকেও মনে হয় তাজমহল বানাতে হবে,,, আরে কই... ”
না আসতে দেরি হলো না কিরিসের, দৌড়ে আসে এসে এই দৃশ্য দেখে বুকের ভিতরে হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠে। নিশির কথা শুধু মিলিয়ে নিচ্ছে আর সত্যি সে সেটাই করেছে, কিরিস চোখ বন্ধ করে কিছু ভাবলো তারপর
আর কোনো কিছু না ভেবে সে দৌড়ে গিয়ে লিসির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে।
—“লিসি…”
কাঁপা হাতে ওকে কোলে তুলে নেয়,লিসির শরীর নিথর শ্বাস খুব হালকা।পিঠের ক্ষত থেকে রক্ত পড়ছে এক ফোঁটা, আরেক ফোঁটা…কিরিসের শার্ট ভিজে যাচ্ছে।
ইশান —“ আরে ওকে হাসপাতালে নিয়ে চল ”
কিরিস গর্জে ওঠে—
—“এক সেকেন্ডও না!”
চোখ দুটো লাল।কণ্ঠ কাঁপছে কিন্তু আদেশ স্পষ্ট—
—“গাড়ি আনো। এখনই।”
লিসিকে শক্ত করে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে
সে সোজা দরজার দিকে এগোয়।তার মাথার ভেতর শুধু একটাই কথাও ঝাঁপ দেয়নি।ও কখনোই ঝাঁপ দেবে না।
—“আমার কথার জন্য…”
নিজের গলা নিজেই শুনতে পায় না।
এক মুহূর্তও দেরি না করে লিসিকে গাড়িতে তোলে।
দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে গাড়ি ছুটে বেরিয়ে যায়।
আর পেছনে পড়ে থাকে ভাঙা কাঁচ, রক্তের দাগ
আর অসংখ্য প্রশ্ন।উপরের বেলকনি তখনও ফাঁকা।কিরিস লিসির মুখে হাত দিয়ে বলে —“ এই দেখো এই লিসি কথা শোনো আমার, কেন এমন করলে ”
হাসপাতালের দিকে ছুটে চলা গাড়ির ভেতর কিরিস একবারও চোখ সরায় না,লিসির মুখ ফ্যাকাশে।
শ্বাস আছে—কিন্তু খুব হালকা।ঠিক তখনই তার ফোন ভাইব্রেট করে,একবার তাকায় স্ক্রিনে শুধু একটাই নাম—মার্ক।
কিরিস কল ধরে, গলা নিচু—
“উপরে বেলকনিতে কে ছিল?”
অন্য পাশ থেকে উত্তর আসে—
“কেউ না, স্যার।কিন্তু একটা মেয়ের ছায়া সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে। মুখ দেখা যায়নি।”
কিরিসের চোখ ঠান্ডা হয়ে যায়।আরেকটা কথা বলে—
“নিশি।”
এক সেকেন্ড নীরবতা।
—“হ্যাঁ, স্যার বুঝতে পেরেছি কি করতে হবে ।”
কিরিস আর কিছু বলে না কল কেটে দেয়।
বাড়ির পেছনের গেট আলো কম।
নিশি একা দাঁড়িয়ে ছিল, ফোনে কারো সাথে কথা বলছে।
—“সব ঠিক হয়ে যাবে…হ্যাঁ, আমি—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই পেছন থেকে কালো ভ্যানটা থামে দুজন লোক নেমে আসে কোনো কথা নেই।
কোনো হইচই নেই একটা কাপড় মুখে। একটা হাত কব্জিতে নিশি চিৎকার করতে গিয়েও পারে না।সবকিছু শেষ হতে দশ সেকেন্ডও লাগে না।ভ্যানের দরজা বন্ধ হয়।শব্দ মিলিয়ে যায়।
হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে গাড়ি থামতেই কিরিসের লোকজন আগে নেমে পড়ে।এক মুহূর্তও দেরি হয় না।
—“স্ট্রেচার! ডাক্তারের টিম এখনই!”
লিসিকে নামানো মাত্রই নার্সরা ছুটে আসে।
রক্তে ভেজা শরীর।মাথা আর পিঠে আঘাত স্পষ্ট।
ডাক্তার দ্রুত চেক করে
—“হেড ইনজুরি আছে।ব্যাকের কাঁচ বের করতে হবে।BP ড্রপ করছে।”
কিরিস এক পা সামনে আসে, গলা ঠান্ডা কিন্তু আদেশমূলক—
—“সামরিক প্রোটোকল।টাইম ওয়েস্ট নয়। যা লাগবে এখনই করো।”
ডাক্তার আর প্রশ্ন করে না।
এরপরে ইশানও OT রুমের দিকে যেতে থাকে চোখে আতঙ্ক, কিন্তু মাথা ঠান্ডা।
—“স্ট্রেচার আনো, সাবধানে।”
কিন্তু এবার ওই ডাক্তার বলে —“ আপনি কি ডাক্তার! ”
ইশান —“ হ্যাঁ আমার বোন হয়, একটু কম্প্রোমাইজ করেন প্লিজ ”
ডাক্তার মাথা নাড়প এবং ইশানের সঙ্গে কাজ করতে থাকে।
লিসিকে নামানো হয়।সে অচেতন, কিন্তু শ্বাস ঠিক আছে।
কিরিস এক মুহূর্তের জন্যও হাত ছাড়ে না।ইশান দ্রুত চেক করে—
—“প্যানিক করার কিছু নেই।একতলা থেকে পড়েছে।মাথায় হালকা আঘাত, কিন্তু ব্লিডিং বেশি না।”
সবাই একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।পিঠের দিকে তাকাতেই ইশানের মুখ শক্ত হয়ে যায়।
—“কাঁচ ফুটেছে।এইটাই মেইন প্রবলেম।”
লিসিকে ট্রিটমেন্ট রুমে নেওয়া হয়।কিরিস বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।কাজিনরা চারপাশে।জারা কাঁপা গলায় বলে—
—“ও ঠিক তো?”
ইশান ভেতর থেকে উত্তর দেয়—
—“হ্যাঁ, শুধু ব্যথা পাবে।”
একজন মেয়ে নার্স পিঠের ড্রেস খুলে সাবধানে কাঁচের টুকরোগুলো বের করা হয়।রক্ত পড়ছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে।
—“স্যালাইন দাও,” ইশান বলে।
হাতে ক্যানুলা ঢোকানো হয়।স্যালাইন ঝুলে যায়।মাথার ক্ষত পরিষ্কার করে হালকা ব্যান্ডেজ দেওয়া হয়।
চুলে হাতও দেওয়া হয় না।কিছুক্ষণ পর ইশান বেরিয়ে আসে।
—“ভয়ের কিছু নেই।জ্ঞান ফিরে আসবে।আজ রাতটা অবজারভেশনে রাখবো, তাই না ডাক্তার! ।”
ডাক্তার —“ yes!”
কিরিস মাথা নাড়ে।একটা শব্দও বের হয় না।
কাজিনরা চারদিকে জড়ো হয়।
সুরভী ফিসফিস করে—
—“এমন হলো কীভাবে?”
আরোবি নিচু গলায়—
—“উপরে কেউ ছিল না… সবাই দেখেছে।”
এই কথাটা কিরিসের কানে যায়।চোখ আরও ঠান্ডা হয়ে যায়।কিছুক্ষণ পর সে ধীরে বলে—
—“এখানে ভিড় দরকার নেই।সবাই বাড়ি যাও।”
জারা প্রতিবাদ করতে চায়—
—“কিন্তু—”
কিরিস তাকায়।কথা থেমে যায়।
সুরভী —“ ঠিক আছে আমরা এখান থেকে সোজা বাড়ি যাচ্ছি তুই আর ইশান ইয়াবি এখানে থাক,!”
কাবির—“ হুম আমরা এদের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি ”
তিশা—“ কাবির আমাদের বাসায় নামিয়ে দিও আমরা আর এখন তোমাদের বাড়ি যাবো না রাস্তায় তো আমাদের বাড়ি পরবে ”
কাবিরের কথায় সবাই যখন চলে যাচ্ছিলো তখন কিরিস আরোবিকে বলে —“ আরোবি তুই থাক এখানে আর এরা যাক”
আরোবি —“ ঠিক আছে, সুরভী তোরা যা আমি লিসির কাছে থাকি ”
আরোবিকে রাখার কারণ একমাত্র আরোবিই আছে যে লিসিকে বোঝাতে এবং শান্তনা দিতে পারবে, একটু পরে এক এক করে সবাই হাসপাতাল ছাড়ে।কেউ চোখ মুছতে মুছতে,কেউ চিন্তায় ডুবে।শেষে করিডোরে থাকে শুধু কিরিস আর ইশান,ইয়াবি আর আরোবি।
ইয়াবি কিরিসের কাঁধে হাত রাখে—
—“নিজেকে দোষ দিস না।ও ঝাঁপ দেয়নি।”
এই কথাটা কিরিসের বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে যায়।কেবিনের ভেতর লিসি শুয়ে আছে চুল এলোমেলো, মুখ ফ্যাকাশে,হাতে স্যালাইন।কিরিস দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।আজ সে পাহারা দিচ্ছে না সে অপেক্ষা করছে লিসি চোখ খুলবে বলে।
ঠিক আছে।
রাতটা হাসপাতালের করিডোরে থমকে থাকে।
ঘড়ির কাঁটা শব্দ করে চলে, কিন্তু কারো চোখে ঘুম নেই।
আরোবি একবার কেবিনের দিকে তাকায়, তারপর কিরিসের কাছে এসে নিচু গলায় বলে—
—“আমি ভেতরে গিয়ে থাকি? তুই একটু রেস্ট নে।”
কিরিস তাকায় না চোখ কেবিনের দরজায়।
—“না। ও একা থাকবে না।আর তুমি এখানেই থাকো।”
আরোবি কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়।এই কণ্ঠে তর্ক করার জায়গা নেই।
তখন ইশান বলে —“ ইয়াবি ওকে নিয়ে আয় আমরা এই কেবিনে থাকি আয় ”
ইয়াবি কিরিসের কাছে গিয়ে বলে —“ এখন চল তুই আবার আসিস এখন একটু রেস্ট কর চল ”
ইয়াবি কিরিসকে টেনে পাশের কেবিনে নিয়ে যায় ওখানে আজ এরা তিন জন ছেলে মানুষ থাকবে আর আরোবি লিসির কেবিনে।
রাত পেরিয়ে যায়।
ভোরের আলো জানালার কাঁচে পড়ে।
স্যালাইনের বোতলটা অর্ধেক নেমে এসেছে।
হঠাৎ…
লিসির আঙুল কেঁপে ওঠে তার শ্বাসের ছন্দ বদলায়।
কপাল কুঁচকে যায়।কিরিস এক মুহূর্তেই সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
—“লিসি…”
কণ্ঠটা নিচু,ভাঙা।লিসির চোখ ধীরে ধীরে খুলে যায়।
ঝাপসা দৃষ্টি, মাথা ভারী।কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে ফিসফিস করে—
—“আহ,,…”
কিরিস এগিয়ে আসে, কিন্তু ছোঁয় না,শুধু খুব কাছে দাঁড়ায়।
—“আমি আছি।”
এই তিনটা শব্দে বুকটা হালকা হয় লিসি চোখ ঘুরিয়ে তাকায়।হাতের স্যালাইন দেখে ভ্রু কুঁচকে যায়।
—“আমি… এখানে কেন?”
আরোবি দ্রুত ডাক দেয়—
—“ইশান!”
কিরিসের চোখ কিন্তু লিসির উপরেই।
—“তুমি পড়ে গিয়েছিলে।একতলা থেকে।”
লিসি চুপ করে থাকে।কিছু একটা মনে পড়তে চায়, কিন্তু ধরতে পারে না।তার চোখের কোণে হঠাৎ পানি জমে ওঠে।
—“আমি… আমি ভেবেছিলাম…”
কথাটা শেষ হয় না।কিরিস খুব ধীরে বলে—
—“ভেবেছিলে কিছু হবে।”
লিসি তাকায় তার দিকে।চোখে ভয়, বিভ্রান্তি আর অদ্ভুত একটা কষ্ট।
—“আপনি… এখানে কেন?”
কিরিস এক সেকেন্ড চুপ করে থাকে।
তারপর—
—“কারণ তুমি এখানে।”
লিসি চোখ বন্ধ করে নেয়।এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে বালিশে।ভেতরে কোথাও একটা ভেঙে যাচ্ছে,কিন্তু সে জানে না কেন।আর কিরিস সে জানে এই সকালে
শুধু লিসির জ্ঞান ফেরেনি,কিরিসের ভেতরে একটা যুদ্ধও শুরু হয়ে গেছে।
লিসির চোখ খোলা, কিন্তু সে কারো দিকে তাকাতে চাইছে না।ছাদের দিকে স্থির দৃষ্টি, যেন কিছুই নেই—আবার যেন সব শেষ।কিরিস কাছে এগোতেই সে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
—“লিসি…”
কোনো উত্তর আসে না।আরোবি পাশে বসা দেখতেই লিসির ঠোঁট কেঁপে ওঠে,চোখ ভরে আসে।
—“আমি কথা বলতে চাই না, সে নিচু গলায় বলে আমাকে একা থাকতে দাও।”
কণ্ঠে রাগ নেই,শুধু ভাঙা।আরোবি আর কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ইশান ঢুকে পড়ে।লিসির চোখে পানি দেখে ইশান কড়া গলায় বলে—
—“এই অবস্থায় কান্নাকাটি করিস না।বডি উইক, মাথায় আঘাত—কন্ট্রোল কর।”
আরোবি দাঁড়িয়ে পড়ে।
—“আমি ওকে একটু পরে দেখি,” বলে ইশান বেরিয়ে যায়
কেবিনে তখন শুধু আরোবি আর লিসি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।তারপর লিসির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
—“ওনি আমাকে ভালোবাসে না, তাই না?আমি শুনেছি…”
কথাটা শেষ করতে পারে না গলা আটকে আসে।
আরোবির চোখ শক্ত হয়ে যায় সব মিলিয়ে নিতে এক সেকেন্ডও লাগে না তার।মনে মনে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে—
‘নিশি… হারামজাদি।’
সে নিজেকে সামলে লিসির হাতটা ধরে।
—“শোন,এইটা তুই ভুলেও বিশ্বাস করিস না।”
লিসি তাকায় তার দিকে চোখে সন্দেহ, ভয়।
—“আমি নিজের কানে শুনেছি…”
আরোবি মাথা নাড়ে।
—“শুনেছিস, বুঝিস নাই।কিছু কথা এমন থাকে যেগুলো অর্ধেক সত্য, পুরোটা বিষ।”
লিসি কিছু বলে না শুধু চোখ নামিয়ে নেয়।আরোবি এগিয়ে আসে।
—“তুই জানিস না ও কতটা আগলে রাখে তোকে।কিছু মানুষ ভালোবাসি বলেই মুখে আনে না।আর কিছু মানুষ আছে… যাদের কথা বিশ্বাস করলে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা।”
লিসির চোখে আবার পানি জমে।
—“আমি তো কিছু চাইনি…”
আরোবি কপালে হাত রেখে বলে—
—“এই জন্যই তুই আলাদা।আর এই জন্যই কেউ কেউ তোর ক্ষতি করতে চাইছে।”
লিসি চুপচাপ কিন্তু মনটার ভেতরে হাজারটা প্রশ্ন।
আরোবি তার হাতটা চেপে ধরে।
—“তুই একা না।আমি আছি।”
এই কথাগুলো কেবিনের দরজার ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট শোনা যায়।বাইরে দাঁড়িয়ে কিরিস একটা শব্দও করে না।তার চোখ অন্ধকার হয়ে আসে।ঠোঁট শক্ত সে বুঝে যায় লিসি তাকে ভুল বুঝেছে।আর সেই ভুল বোঝাবুঝির পিছনে
একটা নাম আছে।কিরিস ধীরে চোখ বন্ধ করে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর।
কেবিনের দরজাটা খুলে কিরিস ঢোকে।
লিসি তখন জানালার দিকে মুখ করে শুয়ে আছে।
—“লিসি…”
কোনো প্রতিক্রিয়া নেই কিরিস এক ধাপ এগোয়।
—“আমার দিকে তাকাও।”
লিসি নড়ে না চোখও না।সে যেন শুনতেই পায়নি না কি শুনেও পাত্তা দেয়নি।আরোবি পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখে।
কিরিস আর একবার ডাকতে যায়—
—“লিসি..”
লিসি হঠাৎ খুব শান্ত গলায় বলে—
—“আমাকে ডাকবেন না।”
এই প্রথম কথা কিন্তু কিরিসের দিকে না তাকিয়েই।কিরিস থেমে যায় শব্দটা যেন বুকের ভেতর গিয়ে লাগে।
আরোবি দ্রুত বলে—
—“ও এখন কথা বলবে না।”
কিরিস আর এক সেকেন্ডও থাকে না চুপচাপ বেরিয়ে যায়, কেবিনে ভারী নীরবতা।ঠিক তখনই আরোবির ফোনটা বেজে ওঠে।সে বাইরে গিয়ে রিসিভ করে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার চোখ বদলে যায়।
—“কি?কখন ? হ্যাঁ… বুঝেছি।”
ফোন কেটে সে আবার কেবিনে ঢোকে।লিসি মুখ না ফিরিয়েই বলে—
—“কে ছিল?”
আরোবি একটু চুপ করে থেকে বলে—
—“বাড়ি থেকে।বলছে নিশি নাকি দেশ ছেড়ে গেছে।”
লিসির বুকটা কেঁপে ওঠে।
—“কি…? কোথায়?”
আরোবি—“ওর বাবার কাছে,”
এই কথাটার সঙ্গে সঙ্গেই লিসির মাথার ভেতর শব্দগুলো ফিরে আসে—‘আমাকে কিরিসকে পেতে হলে তোকে মরতে হবে…’‘তুই মরবি…’
তার হাত নিজের অজান্তেই চাদর মুঠো করে ধরে।
—“ও কি সত্যিই চলে গেছে?”
লিসির কণ্ঠ কাঁপা আরোবি চোখ নামায়।এক সেকেন্ডের জন্য।লিসি শুধু জানালার কাঁচে নিজের অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখে।তার মনে হয় নিশি শুধু যায়নি,সে কিছু রেখে গেছে একটা ভয়, একটা সন্দেহ আর কিরিসের বলা সেই কথাগুলো ‘আমি ভালোবাসি না…’
কেবিনের বাইরে করিডোরে কিরিস দাঁড়িয়ে আছে।
এই খবরটা সে আগেই জানে।নিশি কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে—সব।কিন্তু সে জানে না এই মিথ্যা খবরটাই লিসির মনে কী বিষ ঢালছে।
হাসপাতালের করিডোরে দুপুরের আলো ঢুকে পড়েছে।
কেবিনের ভেতর লিসি চুপচাপ শুয়ে—একটা শব্দও নেই।
নার্সরা ছাড়পত্রের কাগজ আনছে। বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু।কিরিস দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে।ভেতরে ঢোকার সাহসটা আজ তার নেই।আরোবি পাশে এসে দাঁড়ায়।
কিছুক্ষণ চুপ।তারপর হঠাৎ বলে—
—“এইভাবে না।এইভাবে ভালোবাসা হয় না, ভাইয়া।এইটা ভালোবাসা না—এইটা ক্ষমতা।”
কিরিস কিছু বলে না।আরোবির গলা ভারী হয়ে আসে।
—“তুই জানিস আমি কেন বুঝি? কারণ আমি একবার ভালোবাসায় ঢুকেছিলাম। অন্ধভাবে, বিশ্বাস দিয়ে,আর বিশ্বাস ভাঙলে ক্ষতটা শরীরে লাগে না লাগে আত্মায়।রাতে ঘুম ভেঙে যায়,নিজেকে প্রশ্ন করতে করতে মানুষ শেষ হয়ে যায়। তুই যদি আজও চুপ থাকিস, যদি ওকে বুঝাতে না যাস,তাহলে ও ভাববে—তুই তাকে খেলনা ভেবেছিস।”
কিরিস দাঁতে দাঁত চেপে বলে—
—“আমি যা করি—ওর নিরাপত্তার জন্য।”
আরোবি তৎক্ষণাৎ কড়া গলায়—
—“নিরাপত্তা নামে দখল করলে ভালোবাসা মরে যায়।ভালোবাসা মানে সব জানানো না। ভালোবাসা মানে অন্তত মিথ্যা না বলা।”
সে এক পা এগিয়ে আসে।
—“তুই জানিস না কেমন লাগে,যখন যার জন্য বুক পুড়ায় সে ভাবে তুমি তাকে চাইনি।”
আরোবির চোখে একটা পুরনো অন্ধকার ভেসে ওঠে।
—“আমার ক্ষেত্রে কেউ একদিন কিছু বলেনি।আমি বিশ্বাস করেছিলাম—ও চুপ মানে ভালোবাসা।পরে বুঝেছি চুপ মানে অবহেলা।সেই অবহেলা আমাকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল,যেখান থেকে ফিরে আসা যায় না। তুই তো জানিস আমার অতীত! ”
কিরিস এবার চোখ তুলে তাকায়।আরোবি শেষ কথা বলে
—“লিসি কথা বলছে না—এটা রাগ না।এটা ভাঙা বিশ্বাস,এটার রিপেয়ার হয় কথা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে।নয়তো একদিন দেখবি—সে ঠিকই হাসছে, ঠিকই আছে কিন্তু তোর আর দরকার নেই।”
কিরিস নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে।কেবিনের ভেতর থেকে লিসির কণ্ঠ ভেসে আসে না কোনো ডাক নেই।
নার্স এসে বলে—
—“ডিসচার্জ রেডি।”
বাড়ি যাওয়ার সময়।কিরিস দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একবার বলে—
—“লিসি…”
ভেতর থেকে কোনো উত্তর আসে না লিসি জানালার দিকে তাকিয়েই থাকে।আরোবি ধীরে চোখ নামায়।
এই নীরবতাটা আজ কিরিসকে যে ব্যথা দিল কোনো গুলি কিংবা ক্ষতও দিতে পারত না।আরোবি লিসির হাত শক্ত করে ধরে গাড়ির পিছনের সিটে বসায়।
লিসি মাঝখানে, এক পাশে আরোবি—আর সামনে ড্রাইভিং সিটে কিরিস।ইয়াবি চুপচাপ কিরিসের পাশের সিটে বসে, আর পিছনে ইশান—ওদের দুজনের সাথেই।
গাড়ি চলতে শুরু করে।পুরো এক ঘণ্টার পথ গাড়ির ভেতরে ছিল একদম নিঃশব্দ।ইঞ্জিনের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।লিসি একবারও মুখ খুলল না।
চোখ দুটো জানালার বাইরে স্থির, কিন্তু দৃষ্টিটা কোথাও আটকে নেই মনে হচ্ছিল, সে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে।কিরিস বারবার রিয়ারভিউ মিররে তাকাচ্ছিল।
একবারও কিছু বলেনি কিন্তু তার চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো ভয়ংকর রকম ঠান্ডা।ঘণ্টা খানিক পরে গাড়ি বাড়ির সামনে থামে।গাড়ি থেকে নামতেই দরজার দিক থেকে প্রায় দৌড়ে আসে মির্জা বেগম।চোখে ভয়, কণ্ঠে কান্না
—“আমার সোনা… আমার কলিজা… কী হয়েছে মা তোমার? নানু কত ভয় পেয়েছিল, তুই জানিস!”
এই কথা শুনেই লিসির বাঁধ ভেঙে যায়।সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।মির্জা বেগমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে।মৃদু, কাঁপা স্বরে শুধু একটাই শব্দ বের হয়
—“নানু…”
মির্জা বেগম লিসির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, বুকের সাথে চেপে ধরে।এদিকে সুপ্রিয়া আর প্রিয়াও এগিয়ে আসে।
সুপ্রিয়া একটু সিদ্ধান্তের সুরে বলে
—“আচ্ছা মা, এবার ওকে উপরে রেখে আসি। আরোবি, নিয়ে যা।”
প্রিয়া লিসির মুখের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বলে —“দেখো তো, কতটা চিকন হয়ে গেছে!”
সুপ্রিয়া লিসির কপালে আলতো করে হাত রেখে বলে— —“লিসি মা, উপরে যা।খাওয়ার সময় নিচে নামিস।আর কিছু লাগলে ডাকবি, নিজে নিজে নামিস না শুনেছিস?”
লিসি কোনো উত্তর দেয় না।শুধু মাথা হালকা করে নাড়ায়।আরোবি লিসিকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে যায়।
তার সাথে সুরভী আর জারাও উঠে যায়।নিচে, ড্রয়িংরুমে কিরিস, ইয়াবি আর ইশান চুপচাপ ভেতরে ঢুকে সোফায় বসে পড়ে।কেউ কথা বলে না।ঘরের বাতাসটা ভারী।
আর কিরিস সে নিচু চোখে বসে আছে, কিন্তু তার নীরবতা ভয়ংকর কিছু ঘটার আগের শান্তির মতো।
একটু পরে মির্জা বেগম কিরিসকে ইশারা করেন—
—“আয়… একটু কথা আছে।”
ঘরের এক কোণে দু’জনে বসে।
মির্জা বেগমের মুখে আজ আদর কম, চোখে চিন্তা বেশি।
—“আমি তোকে ছোট থেকে দেখেছি, কিরিস।তুই কঠোর, কিন্তু নিষ্ঠুর না। আমি জানি তোদের ভুলবোঝাবুঝি হয়েছে, আরোবি ফোনে বলেছিলো আমার সাথে ”
কিরিস মাথা নিচু করে বসে থাকে।কোনো উত্তর নেই।
মির্জা বেগম ধীরে বলেন—
—“লিসি আজ ভেঙে গেছে।শরীরের ব্যথা বড় কিছু না। মনেরটা ভয়ংকর।”
একটু থেমে—
—“তুই কি জানিস, মেয়েরা কখন সবচেয়ে বেশি কাঁদে?”
কিরিস ফিসফিস করে—
—“যখন কষ্ট পায়?”
মির্জা বেগম মাথা নাড়েন।
—“না। যখন তারা বোঝে—যাকে নিজের ভেবেছিল, সে তাকে নিজের ভাবেনি।”
এই কথাটা কিরিসের বুকের ভেতর ঢুকে যায়।কিরিস প্রথমবার চোখ তোলে।
—“আমি ওকে কষ্ট দিতে চাইনি।”
মির্জা বেগমের কণ্ঠ নরম হয়।
—“আমি জানি।”কিন্তু ভালোবাসা ইচ্ছে দিয়ে হয় না, ভাষা দিয়ে হয়।”
তিনি একটু কাছে এগিয়ে এসে বলেন—
—“মেয়েটা যদি আজ কথা না বলে—এটা জেদ না। এটা আত্মসম্মান, তার লুকানো ভালোবাসা তোর উপর। এইটা ভাঙতে গেলে হাত জোরে না—মন নরম করতে হয়।”
কিরিসের গলা শক্ত হয়ে আসে।
—“আমি যদি দেরি করে ফেলি?”
মির্জা বেগম কিরিসের কাঁধে হাত রাখেন।
—“আর যদি আজও না বলিস কাল হয়তো সে ঠিকই বাঁচবে,কিন্তু তোর পাশে থাকবে না।”
কিরিস চোখ বন্ধ করে।এই কথাগুলো গুলির চেয়েও গভীর ক্ষত দেয়।মির্জা বেগম উঠে দাঁড়ান।
—“যাস না এখন।আজ ওকে নিজের মতো থাকতে দে।”
কিরিস একা বসে থাকে এই প্রথম সে সত্যি করে বুঝে
ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবী দখল করা যায়, মানুষকে ভয় দেখিয়ে মাথা নোয়ানো যায়,কিন্তু একটা ভাঙা মন…
একটা কাঁপতে থাকা হৃদয় সেটা শুধু সত্য দিয়েই জোড়া লাগে।আজ তার সব ক্ষমতা অর্থহীন মনে হয়।সে আর কিছু বলে না।নিজের ঘরে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে, চাবি তুলে নেয় আর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়।সুপ্রিয়া জিজ্ঞেস করলে শুধু বলে —“অফিসের কাজ।”
কিন্তু এটা কোনো অফিসের কাজ না।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে।
আকাশ গাঢ় নীল থেকে ধীরে ধীরে কালো হয়ে যায়।রাত নামে, কিন্তু কিরিস ফেরে না।বাড়ির ভেতরে তখন সবাই লিসির ঘরে।কেউ লিসির পাশে খাটে বসে,কেউ সোফায়,কেউ ডিভানে পা ঝুলিয়ে গল্প করছে।মনটা যখন খুব খারাপ থাকে তখন যদি সবাই পাশে থাকে,মনটা একটু হলেও হালকা হয়।এই সময়েই দরজায় শব্দ হয়।
আনোয়ার আর আনারুল ঘরে ঢোকে।আনোয়ার লিসির দিকে একটা ব্যাগ বাড়িয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বলে
—“কী আছে বলো তো?”
লিসি মুচকি হেসে, চোখ তুলে বলে
—“জানি না তো, মামা!”
আনোয়ার —“আমাদের বোনজির জন্য চকলেট, কেক আর আইসক্রিম।”
আনারুল আরেকটা ব্যাগ এগিয়ে দেয় —“আর এটা তোর এই দুই মামা দিক থেকে।এই ব্যাগে আছে তোর পছন্দের সব খাবার।”
লিসি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।কী বলবে, বুঝে উঠতে পারে না।এত আদর সে কখনো পায়নি।চোখ দুটো হালকা ভিজে ওঠে।জারা হেসে বলে
—“তুই লাকি রে!আমাদের কিছু হলে আব্বু এমন এনে দেয় না!”
আনারুল সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর গলায় বলে
—“কে বলেছে? আমার মেয়েদের কিছু হলে আমি এমন এনে দিই না?”
ঘরের ভেতর একটু হাসি ছড়িয়ে পড়ে।

0 Comments