তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :43

দুজনে বেশকিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পরে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে লিসির মনটাও ভালো হয়ে যায়।
বাড়িটা গভীর রাতে পুরো নিস্তব্ধ। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কেবল দূরের একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ।
লিসির ঘরে হালকা অন্ধকার। জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। লিসি এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। হঠাৎ শরীরটা কাঁপতে শুরু করল… হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল, আর মুখ পুরো লাল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জ্বরটা একদম তীব্র হয়ে গেল।
লিসি নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট পাচ্ছে… গলাটা শুকিয়ে কাঠ।
ঠিক তখনই পাশের বিছানায় থাকা আরোবি হঠাৎ জেগে উঠল।
লিসির কাঁপুনির শব্দ তাকে বিভ্রান্ত করল।
আরোবি চোখ মুছে সামনে তাকাতেই—
“লিসি?! হে আল্লাহ !”
তার গলা শুকিয়ে গেল।
লিসির কপাল গরম লালচে—আগুনের মতো জ্বলছে।
আরোবি হাত রেখে চমকে উঠল—
“এতো গরম… এতো জ্বর…!”
লিসি চোখ খুলতে পারছে না। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। গলার ভেতর দিয়ে শুধু একটু গোঙানির মতো শব্দ—
“আঃ… পানি…”
আরোবি দ্রুত উঠে পানি এগিয়ে দিল, কিন্তু লিসি শক্তিও পাচ্ছে না। গ্লাসটা হাতেই ধরতে পারছে না।
আরোবি কাঁপা গলায় বলল—
“লিসি, প্লিজ… চোখ খোলো… কথা বলো আমার সাথে…”
কিন্তু লিসি অচেতন—বিলকুল বেহুঁশ।
আরোবির হাত কাঁপতে লাগল। ভয়ে চোখ ভিজে উঠল—
“না না, এভাবে হঠাৎ জ্বর হয় কিভাবে…! আমি কারো ডাকছি!”
আরোবি বুঝতেই পারছে না কী করবে। চারদিকে হাতড়ে নিজের ফোনটা বের করতেই কাঁপা কাঁপা আঙুলে ইশানকে কল দিলো।
ওদিকে ইশান আর কাবির ঘরে বসে কাজ করছিল। হঠাৎ মাঝরাতে আরোবির কল পেয়ে ইশানের ভুরু কুঁচকে গেল। ফোন রিসিভ করতেই—
ইশান — “কি হয়েছে এতো রাতে?”
আরোবি আতঙ্কে গলা কেঁপে উঠল— “এই… লিসির ভীষণ জ্বর আইছে। গা পুরা গরম হয়ে পুড়তাছে। দ্রুত আমার ঘরে আয়… প্লিজ।”
আরোবির কণ্ঠে কান্নার চাপ স্পষ্ট। ইশান একটু নরম হয়ে বলল—
ইশান — “এই, চিন্তা করিস না। আমি আসছি। ওরে ওইভাবে রাখ।”
ইশান তড়িঘড়ি উঠে নিজের মেডিকেল ব্যাগ বের করতে লাগল। ওর এমন তাড়াহুড়ো দেখে কাবির হতভম্ব—
কাবির — “কি হইছে রে? কি করছিস?”
ইশান — “আরবি ফোন দিছে— লিসির ভীষণ জ্বর। চল তাড়াতাড়ি।”
বাক্য শেষ হতেই কাবিরও চমকে উঠে সঙ্গে নিল। দুজনেই দ্রুত আরোবির ঘরের দিকে হাঁটা দিল।
ঠিক তখন ইয়াবি কিরিসের রুমের দিকে যাচ্ছিল। ওদের এত দ্রুত ছুটে যেতে দেখে অবাক হয়ে থামল—
ইয়াবি — “কী হইছে তোরা? কোথায় দৌড়াইতাছিস?”
পিছন ফিরে হাঁটতে হাঁটতে কাবির বলল—
কাবির — “লিসির নাকি জ্বর আইছে। তাই যাইতেছি।”
ইয়াবি আরও একবার অবাক— তারপর নাটকীয়ভাবে চোখ বড় করে বলল—
ইয়াবি — “তাহলে কিরিস রুমে কি করছে? গাদা ভাই! ওরে তোর বউ মরল, তুই বিপত্নী হইলা রে!”
বলে ইয়াবি সরাসরি কিরিসের রুমের দিকে ছুটে গেল।
ওদিকে রিহান আর নুসরাত তখনো ঘুমায়নি। বাইরে এই হইচই শুনে দরজা খুলল। দেখে ইশান-কাবির দৌড়াচ্ছে আর ইয়াবি বিপরীত দিকে উলটাপালটা চিৎকার করছে।
চিন্তায় পড়ে রিহান বলল—
রিহান — “চলো, দেখি কি হইছে।”
নুসরাত মাথা নেড়ে রাজি হল।
দুজনেই তাড়াতাড়ি আরোবির ঘরের দিকে ছুটে গেল।
ইশান ঘরে এসে বলল—
“কী হয়েছে? কাকে—”
আরোবি লিসির ঘরের দিকে ইশারায় বলল—
”… প্লিজ… লিসির খুব জ্বর। দেখ না।”
ইশান এক সেকেন্ডও দেরি করল না।
তার মেডিকেল ব্যাগ তো সবসময় থাকে।
দ্রুত লিসির কাছে গিয়ে হাত রাখতেই চমকে উঠল—
“এটা তো অনেক হাই ফিভার… ১০৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে মনে হয়!”
কাবির উদ্বিগ্ন—
“হাসপাতাল নিয়ে যাব নাকি?”
ইশান মাথা নেড়ে বলল—
“না, এখনই দরকার নেই। আমি আছি। ঠান্ডা পানি আনো, গামছা আনো। ওর কাপড় বদলে হালকা করে দাও।”
রিহান আর নুসরাত দৌড়ে গেল।কাবির গামছা নিয়ে এল।
আরোবি পানির বাটি এনে দিল।
আরোবি খুব যত্নে ঠান্ডা পানি দিয়ে লিসির হাত-মুখলিসির কপাল ভিজে উঠল… কিন্তু সে এখনো অচেতন।আরোবির চোখ ভিজে উঠছে, গলা কাঁপছে—
“এ ইশান… ও কথা বলছে না কেন…”
ইশান শান্ত গলায়, কিন্তু উদ্বেগ লুকানো—
“ভয় পাস না। হঠাৎ তাপমাত্রা বাড়লে এমন হয়। আমি ইনজেকশন দিচ্ছি… তারপর ধীরে ধীরে নরমাল হবে।”
ইশান ইনজেকশন প্রস্তুত করল।
আরোবি লিসির হাত ধরে বসে আছে—চোখে জল।
রিহান দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করল—
“লিসি এভাবে অসুস্থ হবে ভাবতেই কেমন লাগছে…”
নুসরাত —" কখন কি হলো কিছুই বুঝতে পারছি না, আল্লাহ আল্লাহ করে লিসি সুস্থ হলে বাঁচি "
কাবির নিশ্বাস ফেলে বলল—
“দুই ঘণ্টা আগে তো হাসছিলো…”
ইশান ইঞ্জেকশন দিতে দিতে বলল—
“ওকে পুরো রাত নজরে রাখতে হবে। কোনো সমস্যা হলে আমাকে ডাকবি।”
আরোবি মাথা নেড়ে বলল—
“আমি ঘুমাবো না। লিসির পাশে থাকব।”
লিসির চোখ আধখোলা…নিশ্বাস ধীরে ধীরে উঠানামা করছে।
ইয়াবি হাঁপাতে হাঁপাতে কিরিসের দরজার সামনে পৌঁছে গেলো। ভেতরে মৃদু আলো জ্বলছে—কিরিস এখনো জেগেই আছে, টেবিলে ফাইল খোলা, হাতে সিগারেট… পুরো ঘর জুড়ে সেই রুদ্ধশ্বাস গভীর নীরবতা।
ইয়াবি দরজায় তিনবার টোকার সাথে সাথেই কিরিসের ভ্রু কুঁচকে উঠলো।
— “ভিতরে আসো।”
দরজা খুলে ঢুকতেই ইয়াবি এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললো,
— “গাদা ভাই! লিসির নাকি ভয়ংকর জ্বর আইছে! ইশান, কাবির সবাই দৌড় দিছে ওর ঘরে!”
কিরিসের চোখ এক মুহূর্তে লাল হয়ে উঠলো। চেয়ার সরানোর শব্দটা এমন ভয়ঙ্কর হলো যেন ভূমিকম্প।
সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে ভাসছে, আর কিরিসের দাঁত চেপে ধরা গলা—
— “What?”
একটা শব্দ।
কিন্তু সেই শব্দে পুরো ঘরে যেন ঝড় বয়ে গেল।
কিরিস এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজার দিকে হাঁটা দিল, ইয়াবি পিছন পিছন দৌড়ালো।
করিডোরের আলোতে তার পোড়া-ধরা চোখ আরো তীক্ষ্ণ, ঠোঁট সোজা রেখা—
লিসির নাম শুনলে তার ভেতরের সব নিয়ন্ত্রণ এক নিমিষে ভেঙে পড়ে।
কিরিস এগোতেই সবাই পথ ছেড়ে দাঁড়ালো।
রিহান আর নুসরাতও বেরিয়ে দেখে স্থির হয়ে গেল।সোজা লিসির রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
ভেতরে তখন ইশান লিসির কপালে হাত দিয়ে তাপ মাপছে,কাবির তো হতবাক হয়ে বাড়ির ফিরিস্তি ভুলে গেছে।
আরোবি কান্না চেপে বসে আছে বিছানার পাশে—
লিসির পুরো শরীর জ্বরে কাঁপছে, গা লাল হয়ে উঠেছে, নিঃশ্বাস দ্রুত…চুলগুলো মুখে লেপ্টে গেছে ঘামে।
কিরিস ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা ঠেলে ঢুকলো।
ঘর নিঃশব্দ।সবাই তাকিয়ে আছে কারণ এই অবস্থা প্রথমবার কিরিস নিজের চোখে দেখছে।
ইশান মাথা উঠিয়ে বললো,
— “bro তুই ওহ চিন্তা করিস না আমি ঔষধ দিয়ে দিছি।”
কিরিসের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।তার চোখ লিসির উপর স্থির সেই কোমল মুখটা জ্বরে পুড়ে লাল হয়ে আছে।
কোনো কথা মুখ দিয়ে বের হলো না তার ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে বসলো।
তার হাতটা লিসির কপালে যেতেই এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ বদলে গেল।
— “She is burning…”
গভীর, নিচু, কাঁপা গলায় বললো।
রিহান–নুসরাত দরজায় দাঁড়িয়ে শ্বাস আটকে আছে—কিরিস…চোখ নামিয়ে লিসির দিকে তাকিয়ে আছে এমনভাবে,যেন কেউ তার পৃথিবীটা কেড়ে নিয়েছে।
কিরিস শুধু চুপ করে লিসির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
ঘরের সবাই নিঃশ্বাস ধরে লিসির দিকে তাকিয়ে আছে—তার কপালে ঘাম, ঠোঁট ফ্যাকাশে, চোখ বন্ধ। সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই ইশান গলা খাঁকারি দিয়ে বললো—
“Bro, আমার মতে ওকে একটা স্যালাইন দিলে ভালো হয়। কিন্তু এখন রাতে বাইরে যাবে কে?”
কিরিস ধীরে মাথা তোলে, ইশানের দিকে শান্ত, কিন্তু কর্তৃত্বে ভরা দৃষ্টিতে তাকায়। একদম ভদ্র, নিখুঁত কণ্ঠে বলে—
কিরিস — “নাম বল। আমি মার্ককে পাঠাচ্ছি আনতে।”
ইশান তাড়াতাড়ি একটা কাগজে স্যালাইনের নাম লিখে কিরিসকে ধরিয়ে দেয়। কিরিস সেটা সঙ্গে সঙ্গে মার্ককে পাঠিয়ে দেয়।
এইসবের মাঝেই কাবির এগিয়ে এসে বলে—
“আমি কি বাকিদের ডাকবো?”
এর আগেই নুসরাত হাত তুলে থামিয়ে দেয়।
নুসরাত — “না, ওদের ডাকতে হবে না। এমনি তেই জার্নি করে এসে সবাই ক্লান্ত। হয়তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমরা তো আছি এখানে লিসির কাছে।”
কিরিস মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়।
কিরিস — “হুম। কাউকে ডাকতে হবে না। সকালের মধ্যে জ্বর কমে যাবে… তাই তো ইশান?”
ইশান — “হুম, ইনশাআল্লাহ কমে যাবে।”
আরোবি লিসির মুখে আলতো করে হাত রাখে—তার চোখে ভয়।
আরোবি — “কিন্তু ও চোখ খুলছে না কেন?”
ইশান — “ঘুম ঘোরে জ্বর এসেছে। আবার হঠাৎ করে এসেছে বলে সাবকনশাস কাজ করতে পারছে না। চিন্তা করিস না—এই রকম হয়। ঠিক হয়ে যাবে।”
ঠিক তখনই নিচে বাড়ির বেল বাজে।
রিহান তাড়াতাড়ি নিচে দৌড়ে যায়, মার্কের কাছ থেকে স্যালাইন নিয়ে ফিরে আসে।
ইশান দ্রুত লিসির কানেলা ঠিক করে স্যালাইন সেট করে দেয়।
ইশান — “সকালে শেষ হবে। তখন আমাকে ডাকিস, আমি খুলে দেবো। বেশিক্ষণ রেখে দিবি না—নাহলে রক্ত উঠে যাবে নলে।”
আরোবি — “হুম।”
সব কিছু ঠিক হয়ে গেলে কিরিস চারিদিকে একবার তাকিয়ে গভীর, নিখুঁত কণ্ঠে বলে—
“তাহলে সবাই ঘরে চলো। লিসি এখানে থাকুক—আর আরোবি তো আছে।”
ইয়াবি — “হুম চল। কাল সকালে তো তোর একগাদা প্ল্যানও আছে।”
নুসরাত — “আরোবি, কোনো অসুবিধা হলে আমাদের ডাকিস।”
আরোবি — “হুম, তোমরা যাও। আমি আছি।”
এক এক করে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
ইশান তার ব্যাগ নিয়ে চলে যায়।
নুসরাত, কাবির, ইয়াবি—সবাই ধীরে ধীরে সরে যায়।
সবশেষে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কিরিস আরেকবার লিসির দিকে তাকায়।
তার চোখে অদ্ভুত নরমতা… আবার ঝড়ের মতো দমে থাকা রাগও।
কিছু না বলে সে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে।
ইয়াবি পাশে এসে হাঁটা মিলিয়ে নেয়।
হাঁটতে হাঁটতে কিরিস নিচু গলায় বলে—
— “এই নিশির চ্যাপ্টার কালকে না হলে তার পরের দিন শেষ করতে হবে। জেনে গেছি—চিপ কোথায়।”
ইয়াবি ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসলো।
ইয়াবি — “ওয়াও, ভালো তো! আর এই নিশির জন্যই লিসির জ্বর এসেছে—বুঝেছিস?”
কিরিস কোনো জবাব দেয় না।
তার মুখে ঠাণ্ডা, পাথরের মতো নীরবতা।
ফোনটা কানে নিয়ে মার্ক কে কিছু নির্দেশ দিতে থাকে—কথাগুলো ছোট, ধারালো, নিখুঁত।
ইয়াবি নিজের কথাই বুঝে নেয়, কিছুই না বলে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়।
আবার পুরো তলাটা নীরব হয়ে যায়—ভয়, ক্লান্তি আর অদেখা উত্তাপে ভরা নীরবতা।
আরোবি লিসির পাশে বসে আছে, খুব ধীরে ধীরে জলপট্টি বদলে দিচ্ছে—লিসির নিঃশ্বাস মাঝেমধ্যে ভারী হয়ে ওঠে।
এক ঘণ্টা পর…
হালকা করে দরজায় টোকা পড়ে।
আরোবি একটু চমকে উঠে বেড থেকে নেমে দরজা খুলল।দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে কিরিস।
চোখের নিচে ছায়া… মুখে শক্ত, অটল অভিব্যক্তি।
কিছু না বলে কিরিস ভেতরে ঢুকে যায়, আরোবি দ্রুত আশপাশ দেখে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
আরোবি পিছন থেকে গম্ভীর গলায় বলে উঠে—
“তুই জানিস, তুই ওকে ওই কথাগুলো বলার পর কতটা কষ্ট পেয়েছে?ও ঘরে এসে কান্না করছিল।ওরম ভাবে বলা উচিত হয়নি তোর।এরপর থেকে যেন ওর সাথে এমন ভাবে কথা বলিস না—তুই।”
কিরিস একদম নীরবে কথাগুলো শোনে।
তাৎক্ষণিক রাগ নেই, কিন্তু চোখে তীব্র, গা-ছমছমে অন্ধকার জমে থাকে।
একটু পর সে শান্ত, কিন্তু নিখুঁত ভরসায় বলে
— “আমি আজকে এখানে থাকবো। তুই গিয়ে ডিভানে ঘুমা।”
আরোবি হতভম্ব।
আরোবি — “তুই থাকবি মানে… লিসির পাশে?”
কিরিস — “হুম।”
বলে এগিয়ে গিয়ে লিসির কপালে হাত রাখলো—
তার গায়ের তাপ একটু কমেছে, স্যালাইন চলছে, ওষুধও কাজ করছে।আরোবি আর কথা বাড়াল না।
সে মুচকি হেসে বেডের পাশ থেকে বালিশ আর ব্ল্যাঙ্কেট তুলে নিল।
আরোবি — “তাহলে দেখিস… কিছু হলে ডাকিস। আমি ঘুমিয়ে পড়লে কিছুই দেখবো না।আর দেখ—লিসি কিন্তু অসুস্থ।”
ধীরে ধীরে ডিভানে গিয়ে শুয়ে পড়ে আরোবি।
চিন্তা আর ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো নরম হয়ে আসে।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার শ্বাস-প্রশ্বাস গভীর হয়ে যায়।সে ঘুমিয়ে পড়ে।ঘরে এখন শুধু দু’জন অচেতন লিসি…আর তার পাশে চুপচাপ বসে থাকা কিরিস।
রাত গভীর…
ঘরে ম্লান আলো।ডিভানে আরোবি গভীর ঘুমে।
কিরিস নীরবে লিসির পাশে বসে—দৃষ্টি স্থির, কোনো শব্দ নেই।হঠাৎ লিসির শরীরটা কেঁপে ওঠে।মৃদু, দুর্বল কম্পন… যেন ঠাণ্ডা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।এক মুহূর্তেই কিরিস সামনে ঝুঁকে পড়ে।সে ব্ল্যাঙ্কেটটা টেনে পুরোপুরি লিসির গায়ে তুলে দিল।তবুও লিসির দেহ হালকা কাঁপতেই থাকে।কিরিস এক সেকেন্ডও দেরি করলো না।ধীরে, খুব সতর্কভাবে স্যালাইনের নল আর কানেলার দিকে শ’বারবার নজর রেখে সে লিসিকে বুকে টেনে নিল।
লিসির মাথাটা তার বুকের কাছে এসে ঠেকে।
কিরিসের শক্ত বুকে লিসির গরম নিশ্বাস পড়ে।এক হাতে কিরিস লিসিকে জড়িয়ে রাখলো। অন্য হাত দিয়ে স্যালাইনের নলটা আস্তে আস্তে ঠিক জায়গায় সেট করে দিল,যাতে টান না লাগে।লিসির ঠোঁট একটু কেঁপে উঠলো।মাথাটা কিরিসের বুকের দিকে আরও গুটিয়ে গেল।কিরিস নিচু গলায় ফিসফিস করে বললো—
"কেন এতো দুশ্চিন্তে ফেলো আমাকে আলোকান্দা, আমি যে এই তোমার কষ্ট সইতে পারি না।"
তার গলা সেই পরিচিত, গভীর, স্পর্শকাতর স্বরে কেঁপে উঠল।লিসির হাতটা তখন নিস্তেজভাবে বুকে রাখা ছিল।
কিরিস আলতো করে সেই হাতটা নিজের আঙুল দিয়ে জড়িয়ে ধরে রাখল একদম ধীরে, যেন ভেঙে না যায়।
লিসির শরীরের কাঁপুনি কমতে শুরু করলো…
তার নিশ্বাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।কিরিস নিজের বুকে জড়িয়ে তাকে একটু উপরে তুলে আদর করে মাথায় হাত রাখলো।তার আঙুল লিসির মাথার চুল সরিয়ে কপালেসেই স্পর্শে লিসির শরীর একটু ঢলে পড়ে,
যেন সব ভয় গলে যাচ্ছে।কিরিস লিসির কপালে খুব হালকা চুম্বন রাখলো শুধু একবার।দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করলো।লিসি তার বুকে গুটিসুটি হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে—
কিরিস তাকে পুরো রাত সেইভাবেই ধরে রাখে,
এক ইঞ্চি নড়ে না,শুধু মাঝেমধ্যে তার জ্বর চেক করে,
আরো কাছে টেনে নেয়…যেন পৃথিবী থেকে লুকিয়ে রাখছে।
রাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছে।
ঘরের ম্লান আলোয় লিসি ঘুম ঘোরে অনুভব করলো…
মাথার নিচে যেন কঠিন কোনো কাঁধ…
আর তার চারপাশে উষ্ণ শক্ত একটা বাহু জড়িয়ে আছে।নরম আলো ঢুকতে শুরু করেছে জানালা দিয়ে।
লিসির তাপমাত্রা প্রায় স্বাভাবিক।
হঠাৎ ঘুমের ভেতর হাতড়াতে হাতটা তুলে দিতেই—
ওর আঙুল থেমে গেল কিছুতে।নরম না…দেয়াল না…
একটা শক্ত, গরম, পেশীর মতো কিছু…
লিসির চোখ ধীরে ধীরে খুলল।
দেখল সে কিরিসের বুকে শুয়ে আছে।তার হাত লিসির কোমর জড়িয়ে রাখা।তাদের শরীর একদম কাছাকাছি, নিঃশ্বাস পর্যন্ত মিশে আছে।লিসির পিটপিটে বিভ্রান্ত চোখ বড় হয়ে গেলো।
— “আ—আপনি আ.......…?”
চিৎকার করে ওঠার আগেই কিরিস হাত বাড়িয়ে তার মুখটা আলতো চেপে ধরল।
— “চুপ… করো! "
লিসি আরও অবাক।এমন অবস্থায় তার মুখ লাল হয়ে যায়লিসি ফিসফিস করে
— “আর—আরবি কোথায়?”
কিরিস জবাব দিল না।
হাত দিয়ে ইশারা করে দিলো, আরোবি ডিভানে কুঁকড়ে ঘুমিয়ে আছে।লিসি ভ্রু কুঁচকে মনে মনে গালি দিতে লাগল,
“এই মেয়ে এখানে ঘুমায় কিভাবে! আমি কেন… এখানে…”
এরপর ধীরে ধীরে বলে উঠল,
— “আমি ঠিক আছি… আপনি উঠুন।”
কিরিস ঠোঁটের কোণে হালকা বিপজ্জনক হাসি টেনে বলল—
— “তুমি ঠিক আছো কি না সেটা আমি ঠিক করব… তুমি না।”
এখনো সে লিসিকে ছাড়েনি। লিসি আর কি বলবে বুঝতে পারছে না কিরিস এখনো চোখ বন্ধ করে আছে। লিসি প্রথমে বুঝতে পারলো না। লিসি চুপচাপ কিছুক্ষণ ওইভাবে থাকে ভাবতে থাকে সে কি করবে।তার মাথা কিরিসের বুকের ঠিক ওপর রাখা তার নিঃশ্বাসের ওঠানামা বুকের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে অনুভব করছে।লিসি একটু নড়তেই কিরিসের হাত শক্ত হয়ে লিসির কোমড় জরিয়ে আবার নিজের দিকে টেনে নিল।একদম স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
লিসি থমকে গেল।তার চোখ বড় হয়ে গেল, নিঃশ্বাস আটকে গেল মুহূর্তে।
লিসি মৃদু, ভয়ে ভেজা স্বরে —
"ভাইয়া…?"
কিরিস চোখ খুললো।তাঁর সেই পরিচিত, তীক্ষ্ণ, অন্ধকার চোখ কিন্তু আজ ভোরের নরম আলোয় আরও গভীর, আরও dangerous ভাবে সুন্দর।সে কিছুক্ষণ একদম চুপচাপ লিসির চোখের দিকে চেয়ে রইল।একটুও নড়েনি।
লিসি লজ্জায়, ভয় আর অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে
শরীরটা হালকা কাঁপছে।কিরিস ধীরে, একদম নিচু গলায় বলে—
" চিৎকার করোনা সবাই উঠে যাবে চুপ করে সুয়ে থাকো।"
লিসির চোখ আরও বড় হয়ে গেল।
সে উঠে বসতে যাবে কিন্তু স্যালাইনের নল টান লেগে যাবে দেখে কিরিস দ্রুত হাত বাড়িয়ে ওকে থামিয়ে দিল।
কিরিস গম্ভীর, আদেশের স্বরে—
"ধীরে। নলে টান লাগলে সমস্যা হবে।"
তার আঙুল লিসির কব্জির ওপর ছুঁয়ে আছে মুখটা খুব কাছে, এতটাই যে লিসির গরম শ্বাস কিরিসের ঠোঁটে লাগে।লিসি পুরোপুরি লজ্জায় গুটিয়ে গেল।
লিসি —
"আমি… আপনি এখানে… কেন…"
কিরিস চোখ না সরিয়ে বলে—
"কারণ রাতে তুমি কাঁপছিলে।
আমি না থাকলে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে যেতি।"
লিসির মুখটা গোলাপের মতো লাল হয়ে গেল।
লিসি —" আর কেউ ছিলোনা নাকি যে আপনি এসেছেন।"
বলে চোখ নিচে নামিয়ে ফেললো।কিরিস আবার হাত বাড়িয়ে তার চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিল আলতো, নিজের অজান্তেই।
কিরিস নিচু গলায়—
"এখন কেমন লাগছে?"
লিসির হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়।
তবুও খুব আস্তে বললো—
"ভালো…"
কিরিস হালকা তাকালো তার ঠোঁটের দিকে,
তারপর চোখে গভীর, dangerous কোমলতা নিয়ে।
কিরিস —
"হুম… ঠিক আছে।"
লিসি কিছু বলতে পারে না।তার কণ্ঠ আটকে যায়।এতক্ষণে ডিভান থেকে আরোবি ঘুম ভাঙার শব্দ করে নড়েচড়ে ওঠে।কিরিস ধীরে লিসিকে ছাড়লো কিন্তু হাতটা তার কপালের ওপর রেখে বললো—
"চুপচাপ শুয়ে থাক। এখনও পুরোপুরি ঠিক হইনি।"
আরোবি চোখ মুছতে মুছতে জেগে উঠে তাকাতেই দেখে লিসি আর কিরিস একেবারে কাছাকাছি।
আরোবি দুই চোখ বড় করে ফিসফিস করলো —
"ও মা… এ তো পুরো ছবির সিন…"
কিরিস sideways তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায়—
কিরিস —
"চুপ।"
আরোবি একদম চুপ। একটু পরে আরোবি মুখ বাঁকিয়ে হঠাৎ বললো—
"এই তো! এক রাতেই এতো অ্যাডভান্স—আমি কি কাল থেকে আলাদা রুমে ঘুমাবো নাকি?"
লিসি লজ্জায় ‘আহ!’ করে চাদরটা আরও টেনে নেয়।
কিরিস ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায় একটা সেই ঠাণ্ডা, ভয় ধরানো look।আরোবি সঙ্গে সঙ্গে হাত তোলার ভঙ্গি করে—
"ঠিক আছে ঠিক আছে! কিছু বললাম না! Carry on!"
কিরিস হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
ব্ল্যাঙ্কেটটা লিসির গা ঠিক করে দিয়ে বললো—
"আরোবি, দেখ। নলে টান লাগলে ডাকিস।"
আরোবি মাথা নাড়ল—
"হুম। বুঝেছি বাবা। তুই যা।"
কিরিস এগিয়ে এসে লিসির পাশে দাঁড়ায়।
লিসি মাথা নিচু করে আছে তার নিঃশ্বাস ছোট হয়ে যাচ্ছে লজ্জায়।কিরিস এক হাত বাড়িয়ে খুব আলতো করে তার চিবুকটা ছুঁয়ে মুখটা ওপরে তুলে দিল।
দৃষ্টিটা গভীর।সকালবেলার আলো তার মুখে পড়ে আরও শার্প, আরও hypnotic হয়ে ওঠে।তারপর কিরিস নিচু হয়ে লিসির কপালে খুব নরম, উষ্ণ, একটুকু চুমু দিল।
লিসির চোখ এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে যায় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় ভয়ংকরভাবে।চুমু তুলে নিয়ে কিরিস তার কানে খুব নিচু গলায় বললো—
"সুস্থ হলে… পরে আমার ঘরে কফি নিয়ে আসবে।"
এক সেকেন্ড থেমেমচোখে সেই dangerous, royal half-smile —
"শুধু তুমি বানাবে। আর কেউ নয়।"
লিসি পুরো লাল হয়ে গেল।
কিছু বলতে পারল না।কিরিস সোজা হয়ে দাঁড়ালো, আরোবির দিকে না তাকিয়েই দরজার দিকে হাঁটল।
যাওয়ার সময় শুধু একবার পেছনে ফিরে লিসিকে দেখে নিল তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।আরোবি মুখ হাঁ করে লিসির দিকে তাকিয়ে বললো—
"এটা কি এখন থেকে নতুন রুটিন নাকি? কফি + কিস = মর্নিং সার্ভিস?"
লিসি বালিশ দিয়ে মারতে গেল—
"আরোবি চুপ!"
আরোবি হেসে গড়াগড়ি খায়। এরপর লিসি বেড থেকে উঠতে যায়,তখন আরোবি এগিয়ে এসে বলে —" দাঁড়া আগে এই নল খুলে দিই এমনিতে স্যালাইন শেষ হয়ে গেছে "
আরোবি আলতো করে স্যালাইনের নল খুলে দেয় হাতে আঁকা টান লাগায় 'উফ' করে ওঠে লিসি, তারপরেও আরোবি যথেষ্ট আস্তে করে খুলে দেন নলটা হাতে এখন শুধু আছে ক্যানেলা
একটু পরে সকালের মৃদু সূর্যের আলোয় যখন চারপাশ ঝলমল করে ওঠে সবাই ঘুম থেকে উঠে গেছে সবাই বাড়িতে হালকা গুঞ্জন চলছে।
আরোবি আর লিসি দুজনেই ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হল। লিসির মুখে সেই অসুস্থতার ছাপ একটু রয়ে গেছে—চোখগুলো কুঁচকে আছে, চুল হালকা ভেজা, মুখটা ফ্যাকাশে। আরোবি বারবার তার হাত ধরে রাখতে চাইছে যেন পড়ে না যায়।
নীচে নামতেই প্রথমেই সুরভী ছুটে আসে—
— “এই লিসি! রাতে জ্বর আইছিল, তুই কিছু বললি না? ঠিক আছিস তো?”
সুরভীর গলার উত্তেজনা দেখে লিসি অদ্ভুত লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো।
তারপরই জারা তিশা হিয়া লিজা সবাই জড়ো হয়ে গেল লিসির চারপাশে।
তিশা ভুরু কুঁচকে বলে—
— “তুই জ্বর নিয়ে ঘুমাইছিস? একবার একটা ডাক দিলে হইতো রে! আমরা আছি তো!”
জারা এসে লিসির গালে হাত ঠেকালো—
— “এখন কেমন লাগতেছে? মাথা ঝিমাইতেছে?”
লিসি হালকা হাসার চেষ্টা করল—
— “না এখন অনেকটা ভাল… আরোবি ছিলো পাশে।”
আরোবি গর্বিতভাবে গলা উঁচু করতেই আবার সবাই তাকিয়ে হাঁসলো।এই সময় রুমের দিক থেকে দ্রুত হেঁটে এলো ইশান। ইশান সোজা এসে লিসির হাতটা নিজের হাতে নিল।তার কপালে ভাঁজ—
— “হাতটা দেখা তো… নলটা কখন খুললি?”
লিসি কিছু বলার আগেই আরোবি বলে—
— “ভোরের দিকে খুলে দিছি …”
ঈশান একটা বিরক্তি ভরা নিঃশ্বাস ছাড়ল—
— “আরবি, তোরা না জিনিসের কোন ঠিক রাখোস না। নলটা ফুলা ছিলো, এখনো চাপ আছে। আর একটু থাকলে রক্ত বের হইয়া, ব্যথায় চিৎকার করতো।”
লিসি আতঙ্কে চোখ বড় করে—
— “ও তাইলে এখন কি করি?”
ঈশান নরম স্বরে বললো—
— “কিছু না। আমি খুলে দিচ্ছি পুরোটা। ভয় পাস না। এখন ঠিকই আছে।”
লিসি দ্রুত বলে উঠে —" একটু পরে তুমি এই সুইঁ বের করো ঠিক আছে এখন শুধু এর মুখটা খুলে দাও, পরে দিলে তো সমস্যা হবে না তাই না! "
ইশান লিসির কথায় হেসে ফেলে কারণ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে লিসি ভয় পাচ্ছে, ক্যানেলা হাত থেকে বের করার সময় যদিও ব্যথা পায়
ইশান —" হুম হবে, এখন দাও তো হাতটা মুখটা খুলে দিই হাওয়া বেরিয়ে যাক।
বলে ইশান মুখ খুলতে শুরু করে হাতের শিরাই হালকা টান খেলে লিসি ব্যথায় হালকা মুখ কুঁচকে ফেলল।
নিখুঁত দক্ষতায় ঈশান কাজ শেষ করল।
— “এখন কোন সমস্যা নাই। শুধু পানি খাবি আর হালকা খাবি। ঠিক আছে?”
আরোবি পাশে দাঁড়িয়ে—
— “আমার কেয়ারিং-এর জন্য এইরকম। রাতভর আমি জেগে ছিলাম।”
ইয়াবি তাকে ধাক্কা দিয়ে কানে কানে বলে—
— “চুপ কর! রাতভর ছোট ডিভানে গুরগুর করে ঘুমাইছে! সব জানি!”
আরোবি অবাক হয়ে ইয়াবির দিকে তাকালো তারপর বলে —" তুই আমার সাথে পরে দেখা করবি ঠিক আছে প্রফেসার ইয়াবি "
হলরুমটার বাতাসেই যেন উষ্ণ একটা আপন ঘ্রাণ। সবাই নরম সোফাগুলোতে গোল হয়ে বসে আছে—
হালকা গল্প, খুনসুটি, হাসি-ঠাট্টা… পুরো বাড়িটা যেন একটা উৎসবমুখর সকালে ডুবে আছে।
লিসি যতবার পাশে দিয়ে যায়, কারো না কারো প্রশ্ন—
“কেমন আছিস?”, “ব্যথা কমেছে?”, “আরোবি ঠিকঠাক খাইয়েছে তো?”
আরোবি তো পুরোই পাগল বোনের পেছনে—
সে আপেল কেটে টুকটুক করে লিসির গালে ছুঁইয়ে দিচ্ছে, মুখে দিচ্ছে, আবার নতুন টুকরা কাটছে।
জারা ভ্রু কুঁচকে —“আমাকে একটা দে আপি।”
আরোবি—“হুম, এই নে।” বলে এক কামড়ে কাটা টুকরা জারার হাতে দেয়।
রিহান হেসে মাথা নেড়ে বলে—
“তুই অনেক লাকি রে লিসি… নাহলে আমার এই বোন তোকে এভাবে আপেল কেটে, গালে তুলে খাওয়ানো— অসম্ভব!”
লিসি লাজুক ভঙ্গিতে—
“তাতো হবোই… তাই না আরোবি?”
আরোবি গর্বে ভরা চোখে—
“অবশ্যই! আমার লিসি সোনা।”
এমন সময় তিশা একটু এগিয়ে এসে চারপাশ দেখে—
“এই সেই নিশি কই রে?”
নিশির নাম শোনা মাত্রই লিসির মুখের রঙ বদলে যায়।
মনে মনে— “এই মেয়েটার নামও নিতে হবে এখন!”—গালাগালি করে ফেলে নিঃশব্দে।
কাবির পাশে বসে কফির কাপ নেড়ে বলে—
“হয়তো ঘরে আছে। বড়লোকের মেয়ে… ১০–১১টা না বাজলে উঠবে কি!”
তিশা চোখ সরু করে—
“তোমার দেখছি একটু বেশিই মনে থাকে ওর ব্যাপারে?”
কাবির সরাসরি তাকিয়ে থাকতে না পেরে লজ্জায় তিশার পাশের সোফায় গিয়ে বসল—
স্পষ্ট বোঝা যায়, মান বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে ইশান লিসির হাতের ব্যান্ডেজ দেখে এগিয়ে আসে—
“লিসি, এবার দাও তো… ক্যানেলা টা খুলে দেই। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে।”
কথা শুনেই লিসি চমকে উঠে—
“না! মানে… ওই ব্যথা লাগবে তো!”
হলরুমের সবাই হেসে ফেলে।
ইশান মাথা নেড়ে—
“আরে না রে, দে। ব্যথা লাগবে না।”
ইশান হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলেই লিসি দুহাতে বুকে জড়িয়ে ফেলে হাত দুটো—
“না না না! খুলতে হবে না! ব্যথা পাবো আমি!”
আরোবি পাশে বসে ভ্রু তুলে—
“ব্যথা পাবি? যখন তোর হাতে পড়িয়ে ছিলাম—তখন তো ব্যথা লাগেনি? তখন ঠিক ছিলি, আর খুললেই ব্যথা?”
লিসি নরম গলায়—
“তখন তো হুঁশে ছিলাম না… বুঝতেই পারিনি। এখন তো পুরো হুঁশে আছি!”
লিজা অবাক ভঙ্গিতে—
“আমি তো এরকম দেখিনি!”
হিয়া এগিয়ে এসে নুসরাতকে বলে—
“এই, তুই চল আমার সাথে উপরে—কথা আছে। আপু, খেতে ডাকিস।”

নুসরাত—“হুম।”