তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :41

সবাই একে একে নিচে চলে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ গল্প-গুজব, হাসাহাসি—তারপর কিরিস হাতে ধরা কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে গম্ভীর, অথচ নেতৃত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে বলে উঠল—
কিরিস — "সবাই কি সব গুছানো শেষ? যদি হয়ে থাকে, তাহলে গিয়ে একেবারে গুছিয়ে নাও। যার যা গোছানো, সব নিয়ে এসে সকালে ব্রেকফাস্ট করে বের হবো। আর রিহান—তুই আন্টির কাছে ফোন দিয়েছিলি?"
রিহান — "হুম, দিয়েছি। আন্টিকে বলে দিয়েছি পুরো বাগানবাড়িটা পরিষ্কার করাতে। আর যা যা লাগবে সব এনে রেখে দিয়েছেন। সকালে আমাকে বলে দিল—আমরা জাস্ট যাবো আর ইনজয় করবো।"
আনোয়ার খবরের কাগজ ভাজ করে রাখলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন—
আনোয়ার — "তাহলে আর দেরি করিস না। তোরা গিয়ে সব গুছিয়ে নে। সুরভী—তোরা আগে যা, তোদের গোছাতে দেরি হবে—জানা কথা।"
এটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে ইশান চোখ বড় করে বলে উঠল—
ইশান — "দেখেছিস? শুধু আমরা না, এখন মামারাও বলছে—তোদের গোছাতে দেরি হয়!"
জারা — "তুই চুপ কর! না হলে এই চায়ের গ্লাসটা তোমার মাথায় ভেঙে দেব!"
রান্নাঘর থেকে প্রিয়া হাসতে হাসতে বলে উঠল—
প্রিয়া — "এই, আমার জামাইয়ের গায়ে যদি হাত দিস—তাহলে তোরই হবে কিন্তু, জারা!"
জারা থ হয়ে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে—
জারা — "আরেএএ… আমার সাথে ওর বিয়ে এখনো হয়নি—আপনি এখন থেকেই ওকে জামাই ডাকছেন?"
ইশান তো খুশিতে লাফ দিয়ে বলে—
ইশান — "এই না হলে আমার হবু শাশুড়ী মা! দেখ—তোর থেকে আমার কদর বেশি!"
জারা বিরক্ত হয়ে গলা বড় করল—
জারা — "আমার সাথে বিয়ে না হলে তুই কোন দিক থেকে জামাই—আমি-ই দেখে নেব!"
ওদের এই আনন্দময় বাকবিতণ্ডা দেখে বাড়ির সবাই দারুণ মজা পেল। কারোর মুখে হাসি থামেই না।
আস্তে আস্তে হাসির মধ্যেই মেয়েরা উপরে চলে গেল তাদের গোছাতে—সাজুগুজুর প্রস্তুতি তো আগেই একটু বেশি সময়সাপেক্ষ।
ছেলে-মেয়েদের যেতে-যেতে বেশ সময় লেগে গেল।
কিন্তু ঠিক এক ঘণ্টা পর সবার আগে হলরুমে ছেলেরাই হাজির হলো—সব ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে একে একে ড্রাইভারদের হাতে গাড়িতে তুলল।
সব কাজ শেষ হলে ঠিক তখনই—
কিরিস সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল।কালো শার্ট, সাদা প্যান্ট—একেবারে ক্লাসিক, মার্জিত, অথচ অদ্ভুতভাবে বিপজ্জনক সৌন্দর্যের আভা। হাতঘড়ির কালো লেদার স্ট্র্যাপটা আলোয় ঝলসে উঠছে।তার হাঁটার ছন্দে পুরো হলরুম যেন থমকে যায় মুহূর্তের জন্য।ছেলেরা হালকা শিস দিতে না দিলেও মুখের উজ্জ্বলতা লুকাতে পারে না।
কিরিস একবারও তাকায় না, সোজা গিয়ে সোফার পাশে দাঁড়িয়ে ফোন দেখে।তার উপস্থিতিই যথেষ্ট সবাইকে চুপ করানোর জন্য।
কয়েক মিনিট পরে—
মেয়েরা একে একে সিঁড়ি দিয়ে নামে।
সবাই সাজগোজ করে রেডি—কিন্তু লিসি নেই।
মেয়েরা সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে একটু জায়গা ফাঁকা করে।ওদের চোখ হঠাৎ ওপরে থেমে যায় আর তারপর,
অন্ধকার থেকে আলোয় পা দেওয়ার মতো—
নিশি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে।কালো অফ-শোল্ডার জাম্পস্যুট, কোমরটা নিখুঁতভাবে ধরে রেখেছে।হাতে ছোট ব্যাগ, খোলা ঢেউ খেলানো চুল—
একেবারে ম্যাচ করে গেছে কিরিসের কালো-সাদা লুকের সাথে।পুরো হলরুম থমকে যায়।ছেলেদের চোখ এক মুহূর্তে বড় হয়ে যায়।মেয়েরা ছেলেদের দিকে বিরক্ত চোখে তাকায়।ইশান, ইয়াবি, রিহান—
তিনজনেই নিশিকে দেখে একটু ‘ওওফ’ টাইপ মুখ করে থাকে।ফিসফিস—
“দেখেছিস? আজকে তো নিশি লুকটাই কিল করছে!”
মেয়েদের হালকা ঈর্ষা-মেশানো চোখ, ছেলেদের অবাক দৃষ্টি সব মিলিয়ে নিশির মুখে আত্মবিশ্বাসী নরম হাসি ফুটে ওঠে।কিন্তু আসল মুহূর্তটা হয় যখন কিরিস মাথা তোলে।এক সেকেন্ড,দুই সেকেন্ড।তার চোখ নিশির ওপর থেমে যায় একদম স্থির, মাপা, অস্বাভাবিক শান্ত দৃষ্টি।
নিশি সেই তাকানো অনুভব করতেইগলার কাছে একটু লজ্জা, তবে মুখে নিজেকে বিশেষ মনে করার স্পষ্ট ভাব।
কারণ কিরিস খুব কমই কাউকে এভাবে দেখে।আর সবাই সেটা লক্ষ্য করে।মেয়েরা একে অপরকে কনুই মারে।ছেলেরা হেসে বলে—
“ইসস… নিশি তো আজ স্পেশাল মনে করছে নিজেকে, দেখলি?”
নিশি ধীরে ধীরে হাসে,আর কিরিস এক ঝলক তাকিয়ে, মুখে অভিব্যক্তি না দেখিয়ে আবার ফোনে চোখ রাখে—
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে অতি হালকা, খুবই হালকা এক চেনা বাঁক।যেটা সবাই না দেখলেও নিশি বুঝে যায়।ছেলেরা এখনো নিশির দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েরা কেউ ওপর থেকে নামছে, কেউ ব্যাগ ঠিক করছে—ঘরের ভেতর এক ধরনের হালকা হৈ-হুল্লোড়।
ঠিক তখনই নুসরাত মুখে টান টান একটা মিথ্যে হাসি নিয়ে রিহানের পাশে এসে দাঁড়ায়।
চোখ দুটো লালচে, স্পষ্ট রাগ চেপে রাখা।
নুসরাত দাঁতে দাঁত চেপে —
"মিস্টার রিহান রায় চৌধুরী… আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন আপনার বউ আছে? আপনি বিবাহিত।"
রিহান হকচকিয়ে নুসরাতের দিকে তাকায়।
তার এই রাগ দেখলেই বোঝা যায় আজ বাঁচা মুশকিল।
রিহান —
"আরে… শোন তো—"
কথা শেষ করার সুযোগও পেল না।
নুসরাত শুধু তাকিয়েই থাকে।
রিহান তাই চুপ।
এদিকে তিশা ঘুরে গিয়ে কাবিরের পাশে দাঁড়ায়।
তিশা —
"মিস্টার কাবির রায় চৌধুরী, আপনি ও কি ভুলে যাচ্ছেন আপনার বাগদত্তা আছে?"
কাবির রিহানের দিকে তাকায়, দুজনেই একসাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
স্পষ্ট—আজ কারোর রাত ভালো যাবে না।
এই দৃশ্য দেখে ইশান জারাকে বলে ওঠে—
ইশান —
"জারা, তুই কিছু বলবি না? আমায়?"
জারা রাগ চেপে হালকা হেসে বলে—
জারা —
"তোর চরিত্র যে লুজ, সেটা আমি অনেক আগেই জানি।
তোর এই তাকানোয় আমার কিছুই আসে যায় না।"
কিন্তু তার চোখে হিংসা পরিষ্কার।
ইশান এবার ইয়াবির দিকে তাকায়।
ইশান —
"আমাদের না হয় হলো, কিন্তু তুই হা করে আছিস কেন?"
ইয়াবি —
"কারণ আমি সিঙ্গেল। এটা দেখার পুরো অধিকার আমার আছে।"
ঠিক তখনই আরোবি এসে ইয়াবির মাথায় জোরে একটা চাটি মারে।
আরোবি —
"কিন্তু তোর বোনেরা এটা মানবে না।"
তিশা, লিজা, হিয়া, সুরভী, নুসরাত—একসাথে বলে ওঠে সবাই —
"ঠিক আছে এবার , কথা ঠিক বলেছে আরোবি।"
ইয়াবি লজ্জায় চুপসে যায়।
ইশান হেসে বলে—
ইশান —
"আমাদের তো একজন করে দিলো…
তোকে তো সবাই মিলে দিলো।
এই হিসেবে মিংগেল হওয়াই ভালো, কি বলিস?"
রিহান আর কাবির সাথে সাথেই বলে—
রিহান-কাবির —
"ঠিক! একদম ঠিক!"
ঘরের ভেতর হাসির রোল পড়ে।
কিন্তু—
এই পুরো সময় কিরিসকে কেউ একটাও কথা বলেনি।
কিরিস এক কোণে দাঁড়িয়ে, হাত গুটিয়ে, চাবিটা আঙুলে ঘোরাচ্ছে।তার পাশে নিশি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে—
কোনো কথা নয়, কোনো প্রতিক্রিয়া নয়।
শুধু ঠাণ্ডা, স্থির উপস্থিতি।কিরিস নিশির দিকে একবার তাকায়।নিশিও তাকিয়ে থাকে, খুব স্বাভাবিকভাবে।কেউ কিছু বলার সাহসই পায় না।এভাবেই সবাই নিজেদের ব্যাগ নিয়ে গেটের দিকে যেতে থাকে।নিশি নিচে নেমে আসার পর হলরুমে কিছুক্ষণ শুধু ফিসফাস, প্রশংসা আর হালকা ঈর্ষার শব্দই শোনা যাচ্ছিল। ছেলেরা ব্যাগ তুলছে, মেয়েরা নিজের ঠোঁটের রঙ ঠিক করছে, আর সবাই অপেক্ষা—কে জানে কখন লিসি নামবে।
কিরিস হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে—
" আর কতক্ষন লাগবে দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের "
তখন আরবি পাশ থেকে বলে ওঠে—" আরে একটু সময় তো লাগবে আমাদের একটু সাজিয়ে দিয়েছে তো এজন্য ওর নিজের গোছাতে একটু দেরি হচ্ছে। চলে আসবে ওই দেখ, বলতে না বলতেই চলে আসলো
আরোবির কথায় সবাই উপরে তাকালে দেখে লিসি নিচে নামছে, সাদা ফ্লোই গাউনটা পরে দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির মাথায়।গাউনটা যেন তার গায়ের সাথে মিশে গিয়ে এক ধরনের নরম আলো তৈরি করেছে।সাদা কাপড়ের ওপর কালো এম্ব্রয়ডারির ডিটেইল…
ঘরের পুরো পরিবেশ যেন এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ।
তার লম্বা চুল সামনে নেমে এসেছে,
গাউনের সাথে পুরোটা যেন রাজকন্যার মতো লাগে।
মেয়েরা নিশিকে নিয়ে যে ঈর্ষা করছিল এক সেকেন্ডে সবাই ভুলে যায়।মুখ হা করে তাকিয়ে থাকে।
ছেলেরা চুপ…
কেউ কথা বলে না।
ইশান রিহানের কানে ফিসফিস করে—
“আরে… এ কি! আজ তো লিসিকে দেখে কিরিসের হার্ট আটকে যাওয়ার মতো লাগছে!”
কিরিস — স্থির। কিন্তু ঝড় ভিতরে।সোফার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিরিস একদম ধীরে মাথা তোলে।তার চোখ লিসির ওপর পড়তেই সেকেন্ডটা থেমে যায়।নিশির দিকে যে একঝলক দেখেছিল,তা ছিল নরম, মেপে দেওয়া প্রাপ্য দৃষ্টি।কিন্তু লিসিকে দেখার মুহূর্ত একেবারে আলাদা।
তার চোখের রঙ যেন গাঢ় হয়ে ওঠে,চোখে অদ্ভুত এক দখলদারিত্ব,খুব চাপা, খুব ব্যক্তিগত...
এক ধরনের আকর্ষণ যা সে কাউকে দেখায় না।
সোফার আর্মরেস্টে ধরে থাকা কিরিসের হাতের শিরা কেঁপে ওঠে।কিন্তু মুখে একটাও ভাব নেই।
লিসি সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নামছে,প্রতিটা স্টেপ যেন তার কালজয়ী সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।
লিসি নিচে নামতেই
নিশি এক সাইডে দাঁড়িয়ে তাকায় তার আত্মবিশ্বাস এক মুহূর্তে কেঁপে ওঠে।কারণ কিরিসের দৃষ্টি নিশির ওপর যতটুকু ছিল লিসির ওপর তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি গভীর।
সবশেষে লিসি নিচে পৌঁছালে কিরিস চোখ না সরিয়েই বলে—
“চলো। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
কিন্তু তার গলার স্বর…অদ্ভুতভাবে নরম যেন শুধু লিসিকেই বলা।
সবাই এবার একে একে বাড়ির বাইরে চলে এসেছে। জিনিসপত্র আগেই গাড়িতে তোলা হয়ে গেছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আনোয়ার, আনারুল, প্রিয়া, সুপ্রিয়া আর মির্জা বেগম—সবাই মায়া ভরা চোখে বিদায় দিচ্ছে।
বাড়ির সামনে তিনটা গাড়ি দাঁড় করানো—
দুইটা চকচকে কালো SUV আর মাঝখানে সাদা রঙের BMW।
সবার যে যার মতো করে হিসাব চলছে—কে কোন গাড়িতে বসবে।
আরোবি লিসির কনুইতে হালকা ধাক্কা মেরে ফিসফিস করে বলে—
"তুই গিয়ে ভাইয়ার সাথে বস। ওই নিশিকে যেতে দিস না!"
লিসি — "শোন, আমার অতো শখ নেই তোর ভাইয়ের পাশে বসার! বসুক ওই নিশি।"
— বলে লিসি খানিকটা রাগী-ঠাট্টার মিশ্র অভিব্যক্তি দেয়।
ঠিক তখন হিয়া গাড়ির দরজা থেকে বলে ওঠে—
"লিসি, ওই পানির বোতলগুলো নিয়ে আসো তো! আমরা গাড়িতে উঠে পড়েছি তাই বললাম।"
লিসি মাথা নেড়ে ভেতরে ঢোকে। আরোবি লিসিকে যেতে দেখে মিনমিন করে বলে—
"এই আমি সামনের গাড়িতে উঠছি, তুই ও আয়। আর ওই নিশি মরুক গিয়ে!"
লিসি আরোবিকে হাতের ইশারায় একটা লাইক দেখায়। আরোবি হেসে গাড়িতে উঠে যায়।
এখন প্রায় সবাই গাড়িতে উঠে পড়েছে—শুধু কিরিস, নিশি, ইয়াবি আর লিসি বাকি।
লিসি দেখে পানির বোতলগুলো কিরিসের গাড়ির ঠিক পাশে রাখা।
সে স্বাভাবিকভাবে নিচু হয়ে বোতলগুলো তোলে… কিন্তু বোতলগুলোর ওজন ধারণার চেয়ে বেশি হওয়ায় হাত ফসকে যাচ্ছিল, শরীরও পিছনের দিকে উল্টে যাওয়ার মতো এক সেকেন্ডের ব্যবধানে—
কিরিস দ্রুত এগিয়ে আসে।এক হাতে সব বোতল তুলে ধরে, আর অন্য হাতে লিসির কোমর শক্তভাবে জাপটে নিজের দিকে টেনে নেয়।যেন তার হাতেই লিসির জন্য ।
লিসি চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকে—কি ঘটল, সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না।
কিরিসও চোখ না সরিয়ে লিসির দিকে তাকিয়ে থাকে…
দু’জনকে একসাথে এমন লাগছে যেন তারা বহুদিন ধরেই একে অপরের জন্য তৈরি।
কিন্তু—
নিশি এই দৃশ্য দেখে প্রচণ্ড রেগে নিজের ব্যাগের বেল্টটা জোরে চেপে ধরে।
তার চোখে হিংসা আর জ্বালা পরিষ্কার বোঝা যায়।
ইয়াবি পাশে দাঁড়িয়ে দাড়িতে হাত দেয়ার ভান করে নাটকীয়ভাবে বলে—
"ওহো… এত সুন্দর সিনেমার দৃশ্য! লাইফে এমন একটা কিরিস–লিসি জুটি দরকার। ফাটাফাটি পেয়ার!"
লিসি কিরিসের হাত থেকে সরে যেতে চাইতেই—
কিরিস তার কোমরটা আরও শক্ত করে ধরে টেনে নেয়, চোখে অদ্ভুত আগুন।
কিরিস — "এতো তাড়া কিসের তোমার? পালানোর চেষ্টা করছো নাকি?"
লিসি তার শ্বাস আটকে যেতে থাকা অনুভব করে।
কিরিসের গ্রিপ থেকে হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে কষ্ট করে বলে—
"ছাড়ুন আমায়! সাবাই আছে এখানে… আরোবি অপেক্ষা করছে!"
কিন্তু কিরিস এবার তাকে আরও কাছে টেনে আনে—
এতটা কাছে যে লিসির কানের পাশ দিয়ে কিরিসের নিশ্বাস গরম হয়ে লিসির গালে ছুঁয়ে যায়।
কিরিস কানে কানে, ভয়ংকর নরম গলায়—
"লিসি শর্মা… তোমাকে আজকে যে কতকিছু মনে হচ্ছে…"
লিসির বুক কেঁপে ওঠে।
সে কিরিসের হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে চুপচাপ বলে—
"মানে কি বলছেন আপনি… ছাড়ুন আমায়… কোমরে ব্যথা পাচ্ছি… এতো জোরে ধরেছেন!"
হঠাৎ করে কিরিসের কণ্ঠ বদলে যায়—
গম্ভীর… নেশালো… গভীর… যেন ভিতরে একটা অন্য কিছু চলছে তার ।
কিরিস —
"তোমাকে দেখে মাঝে মাঝে মনে হয় একটা রসগোল্লা… রসে ডোবা টইটম্বুর… মিষ্টি স্বাদের।"
"আবার মনে হয় ভ্যানিলা কেক… তার উপরে চকলেটের হালকা ঘ্রাণ।"
"সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে… তোমাকে এক কামড়ে খেয়ে ফেলি… একদম…"
বলে কিরিস লিসির কানের পাশে হালকা কামড় দিয়ে দেয়।
লিসির গায়ে যেন বিদ্যুৎ বয়ে যায়।
কিরিসের এই অভদ্র–ভদ্র, মিষ্টি–নেশা, dangerous–romantic কথার মিশ্রণে সে পুরো কেঁপে ওঠে।
কিছু বলতে পারে না… নিঃশ্বাস পর্যন্ত আটকায়।
শেষমেশ নিজের শক্তি সঞ্চয় করে লিসি কিরিসের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
এক মুহূর্ত দেরি না করে হেঁটে খানিক দূর চলে যায়—
কিরিস তখনো দাঁড়িয়ে আছে, একহাতে সব ভারী পানির বোতল, অন্যহাতে প্রায় ফাঁকা জায়গা—যেখানে লিসি ছিল।
ইয়াবি লিসির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মজা করে হাততালি দেয়ার ভঙ্গি করে বলে—
ইয়াবি — "বাহ লিসি! কি সুন্দর দৃশ্য দেখালে! আর কিরিসকে দেখো—এখনো ওই সব ভারী বোতল ধরে আছে!"
লিসি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়—
কিরিস তার দিকেই তাকিয়ে আছে…
হালকা, স্লো মোশনের মতো জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়—
লিসির মনে আবার ধক করে ওঠে।
সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলে—
লিসি — "তা পারবেনা কেন? প্রতিদিন তো জিম করে—এতোটুকু না পারলে আর বেডা মানুষ হতে হবে না!"
বলে গটগট করে চলে যায়।
ইয়াবি পিছনে ফিরে তাকিয়ে হেসে কিরিসকে দেখে—
আর কিরিসের চোখ লিসির যাওয়া পথেই আটকে থাকে…
ইয়াবি হাত তুলে বলে—
"Bro, আমি সামনের গাড়িতে উঠলাম। এই নিশি—চলে আসো আমাদের সঙ্গে!"
নিশি এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল…
ওর ভেতরের আগুনটা সে শ্বাস চেপে চেপে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ইয়াবির এই কথাটা শুনতেই নিশির ঠোঁটের ডগায় একটা আত্মবিশ্বাসী মুচকি হাসি ফুটে ওঠে।
সে দু’পা এগিয়ে যায় কিরিসের দিকে।
পেছনে ফিরে একটু জোরেই বলে—
"আমি কিরিসের সঙ্গে যাবো ওর গাড়িতে। শুনতে পেয়েছো?"
কথাটা ইচ্ছা করেই জোরে বলা—
যেন লিসি ঠিকই শুনতে পায়। আর লিসি… শোনে। পুরোটা শোনে। ইয়াবি একবার কিরিসের দিকে তাকায়…
একবার নিশির দিকে, আবার লিসির দিকে ঠিক যেন সে এখন এ যেন লাভট্রাঙ্গেল ।
নিশি এগিয়ে গিয়ে কিরিসের একদম পাশে দাঁড়ায়।
নিশি মিষ্টি ভান করে বলে— "আমি কি যেতে পারি তোমার সাথে?"
কিরিস কয়েক সেকেন্ড চুপ…
চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা তারপর খুব ঠান্ডা গলায় বলে—
কিরিস — "হুম। উঠো গাড়িতে।"
এই একটা লাইনেই গাড়ির ভিতরে থাকা সব কাজিনদের মুখ হাঁ হয়ে যায়।তারা সব কয়টা গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে দিয়েছে।
কারণ সবাই জানে কিরিস কখনো তার গাড়িতে কাউকে উঠায় না।সবসময় একাই চালিয়েছে।বাবা-মা, ভাইবোন ছাড়া কেউই তার গাড়িতে চড়তে পারে না।আর লিসি আসার পর শুধু লিসিকে নিয়ে কিরিস প্রথমবার একা গাড়ি চালিয়েছিল।
আর আজ?
সে নিশিকে বলছে—“উঠো।”
নিশি তো আনন্দে গলে যায়।হাসিমুখে গাড়ির সামনে দরজা খুলে বসে পড়ে।
নিজেকে জিতেছে মনে হচ্ছে।লিসি নিজের গাড়িতে উঠে বসে দরজাটা এত জোরে লাগায়..... ঢ্যাং!
ইয়াবি চমকে ওঠে।কিরিসও শব্দটা খেয়াল করে।
ইয়াবি মজা করে বলে—
"একটু আস্তে ! না হলে এই গাড়ির দরজা কিনতে গিয়ে আমরা ফকির হয়ে যাবো!"
লিসি রাগে চোখ উল্টে বলে—
লিসি — "বাইরে দাঁড়িয়ে না থেকে ভিতরে বসেন, ভাইয়া!"
ইয়াবি আর কথা বাড়ায় না।গাড়ির ভেতর বাকি সবাই হেসে ওঠে কিন্তু লিসি হাসে না।সে শুধু লুকিং গ্লাসে বারবার পিছনের কিরিসের গাড়িটার দিকে তাকায়।তার মুখে অভিমান, কষ্ট, আর একটুখানি ঈর্ষার চাপা আগুন।অবশেষে সব গাড়ি বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।বড়রা হাসিমুখে বিদায় দেয় ছোটদের।তারপর তারা ভেতরে ঢুকে যায়।রাস্তায় গাড়ি এগিয়ে চলে একটার পর একটা গাছ…দোকান…বিল্ডিং…সব পেছনে ফেলে…
গাড়ির ভেতরে সবাই নিজের নিজের কথায় মেতে আছে,
কিন্তু লিসি—একদম চুপচাপ।
বাইরে তাকিয়ে থাকে, যেন তার মনটা কোথাও হারিয়ে গেছে।হাওয়া খুব সুন্দর বইছে।লিসি আজ যে গাউনটা পরেছে—তার ওড়নার একপাশ হাওয়ায় নড়ে গিয়ে গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।হাওয়ার দমক বাড়তেই ওড়নাটা স্লো মোশনের মতো উড়তে থাকে…নীল আকাশে নরম সাদা মেঘের ঢেউ তুলতে থাকে।
ঠিক তখন—
পিছনের গাড়িতে বসে কিরিস সবকিছু দেখে।
তার গাড়ির সামনে দিয়ে উড়তে থাকা ওই ওড়নার অংশটাসরাসরি তার চোখে পড়ে।স্টিয়ারিং ধরে থাকা কিরিসের আঙুল থেমে যায়…
চোখ একটু বড় হয়…শ্বাসের গতি সামান্য থেমে যায়।ওড়নার উড়ার সঙ্গে সঙ্গেকিরিসের মুখে এমন এক নরম, dangerous-রোমান্টিক অনুভূতি আসে যেটা সে সাধারণত কাউকেই দেখতে দেয় না।তার চোখ শুধু লিসির গাড়িতেই আটকে থাকে। যেভাবে ওড়নাটা বাতাসে নাচছে কিরিস দেখে মনে হয় যেনলিসিই নরমভাবে তাকে ডাকছে…
তার দৃষ্টি নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে।নিশি পাশে বসে কথা বলতে যেতে গিয়েও থেমে যায়—
কারণ কিরিসের মনোযোগ যে পুরোপুরি ওই উড়তে থাকা ওড়না আর লিসির দিকেই।লিসি নিজের অজান্তেই জানালার পাশে হেলে আছে,ওড়নার নরম কাপড় চুলের পাশে স্লো-মোতে নাচছে আর কিরিসের চোখ তাতে অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে ওঠে।সে নিজের অজান্তে ঠোঁট কামড়ে ফেলে…
হালকা নিচে নামিয়ে আবার উঠে তাকায়—
সে হারা গেছে।একটা উড়ন্ত ওড়নায়।একটা মেয়ের ছায়ায় রাস্তায় তিনটা গাড়ি একসাথে এগিয়ে চলেছে।
লিসির গাড়ির জানালা দিয়ে ওড়নার একপাশ এখনো বাইরে উড়ছে হাওয়ায় নরম গোলাপি ঢেউ তুলে।
পেছনে কিরিসের চোখ সেই উড়ন্ত ওড়না ছাড়তেই পারছে না।একসময় ওড়নাটা এতটাই উড়ে যায় যে
রাস্তার অন্য গাড়ির সাথে লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়।কিরিসের ভেতর হঠাৎ ভয় আর রাগের মিশ্র একটা শীতল ঝড় ওঠে।সে হঠাৎ করে নিজের গাড়িটা এগিয়ে লিসির গাড়ির একেবারে পাশ বরাবর এনে দেয়।
স্টিয়ারিং ধরে তার হাত শক্ত হয়।চোখে একইসাথে উদ্বেগ—আর অধিকার।নিশি বিস্ময়ে বলে ওঠে—
"কি হলো? এত কাছে গেলে বিপদ হতে পারে…"
কিন্তু কিরিস তার কথা শোনে না।
তার সম্পূর্ণ মনোযোগ কেবল লিসির উপর।গাড়ি পাশাপাশি আসতেই কিরিস হালকা জানালাটা নামিয়ে সরাসরি বলে—
"লিসি… ওড়নাটা সামলাও।
এভাবে বাইরে রাখো না—অল্পের জন্য এক্সিডেন্ট হয়ে যেত।"
তার কণ্ঠ ঠান্ডা, গভীর, অথচ এমন যত্নে ভরা
যা যে কেউ শুনলেই বুঝতে পারবে এটা আদেশের মধ্যে লুকানো ভয়। যেন তাকে কিছু হলে সে নিজেই ভেঙে পড়বে।লিসি চমকে উঠে দ্রুত ওড়নাটা টেনে ভেতরে নেয়।
হালকা নরম গলায় বলে—
"ওহ… দুঃখিত… খেয়াল ছিল না…"
এতদূর পর্যন্ত সব ঠিক ছিল ঠিক তখনই নিশি সুযোগটা লুফে নেয়।সে জেনে শুনেই একটু সামনে ঝুকে
নিজেকে এমনভাবে কিরিসের চোখের সামনে আনে
যেন লোকজন বুঝতেই পারে সে আর কিরিস এক গাড়িতে।কিছুটা নরম, একটু চ্যালেঞ্জিং স্বরে বলে—
"হ্যাঁ লিসি, ও ঠিকই বলেছে।
আমাদের গাড়িটা তো তোমাদের পাশেই…
একটু অসাবধান হলেই বড় দুর্ঘটনা হয়ে যেতে পারতো।
কিরিস তো খুব চিন্তা করে তোমার জন্য।"
শেষ লাইনটা বলার সময় নিশি নিজের চুলটা ঠিক করে,
গায়ে হালকা ভর দিয়ে কিরিসের খুব কাছে আসে—
যেন “দেখিয়ে” দিতে চায় সে কিরিসের গাড়িতেই আছে।
সে-ই এখন তার পাশে।কিন্তু—
কিরিস নিশির দিকে ফিরেও তাকায় না।তার চোখ তখনো লিসির উপরেই আটকে থাকে।
দেখে যেন নিশ্চিত হতে চায় ওড়নাটা ঠিকমতো ভেতরে এসেছে কি না।লিসি নিশির সেই টোন শুনে
জানালার ফ্রেমটা একটু শক্ত করে ধরে চোখ দুটো ব্যথায় নরম হয়ে যায়। চুপচাপ তাকিয়ে থাকে সামনের দিকে।হাওয়া কমে গেছে।কিন্তু লিসির ভেতর ঝড়টা তখনই শুরু হয়।
নিশির কথা শেষ হতেই লিসির বুকটায় যেন কিছু একটা খচখচে ব্যথা লাগে।নিশির সেই ইচ্ছাকৃত দেখানো,
কিরিস আর নিশির একই গাড়িতে থাকা—
সবকিছু মিলিয়ে তার চোখের ভেতর অদ্ভুত ঝড় জমে ওঠে।লিসি আর এক মুহূর্তও সেই দিকে তাকায় না।
সে রেগে মুখটা শক্ত করে এদিক থেকে সেদিকে ঘুরিয়ে নেয়।চোখ জানালার বাইরে মন ভিতরের আগুনে।
ওড়নাটা সে আস্তে করে সামলে নেয়,কিন্তু তার আঙুলেও রাগের কাঁপন।লুকিং গ্লাসে কিরিস একবার তাকায় লিসির মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া দেখে তার ভ্রু হালকা কুঁচকে যায়।কিন্তু সে কিছু বলে না।কিছু করে না।শুধু নিঃশব্দে
তার চোখের ভেতরের ঝড়টা লুকিয়ে রাখে।নিশি মুখের কোণে হালকা মুচকি হাসি টানে যেন নিজেকে বিজয়ী মনে করছে।কিন্তু কিরিস তার দিকে সামান্যও নজর দেয় না।
এরপর—
তিনটা গাড়ি আবার আগের মতো রাস্তায় ছন্দে ছন্দে এগিয়ে যেতে থাকে।সবার গাড়িতে আবার আগের মতো হাসি-ঠাট্টা শুরু হয়,কিন্তু লিসির গাড়িতে সে চুপচাপ বসে থাকে।রাগে, কষ্টে, অভিমানে তার চোখ দুইটা আরও শক্ত করে জানালার বাইরে স্থির হয়ে যায়।আর কিরিস গাড়ির মাঝে মাঝে চোখ তুলে এমনভাবে লিসির গাড়ির দিকে তাকায় যেন সে নিশ্চিত হতে চায় লিসি ঠিক আছে কিনা।
রাস্তাটা শান্ত।গাড়িগুলোও স্বাভাবিক গতিতে চলছে।
তিনটা গাড়ি একসাথে ধীরে ধীরে ঢুকে গেল সবুজে মোড়া সেই বাগানবাড়ির লোহার গেটের ভেতর। গেটটা খুলে যেতেই সামনে যেন অন্য এক দুনিয়া—
চারদিকে লম্বা লম্বা আমগাছ, কাঁঠালগাছ, সুগন্ধি ফুলের সারি, ছায়া আর হালকা বাতাস টেনে নিচ্ছে চোখ।
ছোট ছোট পাথরের পথ, দুই পাশে রঙিন ফুলের গাছ, আর মাঝখান দিয়ে সরু সাদা হাঁটার পথ বাগানবাড়ির দিকে গেছে। বাড়িটার রঙ অফ-হোয়াইট, বড় বড় কাঁচের জানালা, ছাদের নিচে কাঠের ডেক— শান্ত, বিলাসবহুল, ঠিক রিসোর্টের মতন।ওদের আসার আগেই সব পরিষ্কার করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বারান্দায় সাজানো রট আইরন চেয়ার, রঙিন কুশন, টেবিলে তাজা ফুলের ডেকোরেশন। ভেতরের লাইটিং হালকা হলুদ—উষ্ণ, নরম, আরামদায়ক। দূর থেকে লোহার গেটটা খুলতেই গাড়িগুলো একে একে ভেতরে ঢুকল। চারপাশে গাছগাছালির স্নিগ্ধতা, পুকুরের ধারে সারি সারি লাইট, আর বাগানবাড়ির সামনে বড় বারান্দা—সব মিলিয়ে একদম শান্ত, আরামদায়ক পরিবেশ।
গাড়ি থামতেই প্রথমে রিহান নেমে হালকা স্ট্রেচ করলো।
রিহান — "উফ! কতদূর থেকে আসলাম! কিন্তু জায়গাটা বেশ—"
হিয়া গাড়ির দরজা খুলে চারপাশ দেখে চোখ বড় করে —
হিয়া — "ওয়াও… বাহ! খুব সুন্দর তো!"
লিজা জারা দু’জনেই একটু সামনের দিকে হেঁটে সবুজ ঘাসের সুবাস টেনে নিল।
জারা — "এখানে দুইদিন থাকলে মনটাই একদম ফ্রেশ হয়ে যাবে।"
এদিকে লিসি ধীরে নামে। তার সাথে আরোবি। লিসি চারদিকে একবার ঘুরে দেখে— আশেপাশের নীরবতা তাকে বেশ ভালো লাগছে।
তখনই বাগানবাড়ির ভেতর থেকে দু’জন কাজের লোক দ্রুত বেরিয়ে এল।
কাজের লোক —
"স্যার, ম্যাডাম—সবার ব্যাগগুলো আমরা ভিতরে নিয়ে যাই।"
ওদের কথা শেষ হতেই ছেলেরা মেয়েরা নিজেদের ব্যাগ নামিয়ে দিয়ে ভিতরের দিকে এগিয়ে গেল।
বাড়ির ভেতরটা ছিল একদম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, বড় বড় জানালায় আলো ঢুকছে, চারদিকে হালকা লেবুর ঘ্রাণ।
সবাই ঢুকেই একে একে রুমগুলো দেখতে শুরু করলো—
লিসি & আরোবি দুজন মিলে দ্বিতীয় তলার একটা শান্ত, ভেন্টিলেটেড রুম বেছে নিল।
আরোবি — “এই রুমটা বেশ! চল, আমরা এখানেই থাকবো।”
লিসি মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
হিয়া & লিজা দু’জন বেশ উত্তেজিতভাবে পাশের রুমটাই নিয়ে নিল।
হিয়া — “আমাদের রুমে কিন্তু রাতে ভয়ের গল্প হবে!”
লিজা — “জাস্ট ট্রাই কর, আমি প্রথমেই পালাবো।”— বলে হেসে দেয়।
সুরভী, জারা, তিশা একটু বড় রুম বেছে নিল যাতে তিনজনই আরামে থাকতে পারে।
রিহান & নুসরাত সিঁড়ির নিচের ডানপাশের রুমটা নিল।যেটা রিহানের নিজস্ব রুম, যেহেতু বাগানবাড়িটা রিহানের তাই এই বাড়ির একটি বিশেষ রুম রিহানেরই নুসরাত রুমটা দেখে খুশিতে বলে —
“এই রুমটা বেশ কিউট!”
রিহান — “হ্যাঁ,কেননা এইসব তো তোমারই জন্য সোনা।”
নুসরাত —“হুম নাও একটু আগে ফ্রেস হয়ে নাও!”
কাবির & ইশান ওদের রুমটা একটু কোণায়।
কাবির — “ভালই, আমাদের একটু শান্তি থাকবে।”
ইশান — “হুম, ঠিক আছে।”
ইয়াবি সে আলাদা রুম নিল সামনের দিকটায়।
নিশি হাঁটতে হাঁটতে একটু খুঁজে দেখে ইচ্ছে করেই কিরিসের পাশের রুমটা নিল।
নিশি — "এই রুমটা ঠিক আছে… আর পাশেই তো—"
সে বাকিটা মনে মনে বলেই হাসলো।
কিরিস তার জন্য আলাদা বড় গেস্ট রুম তো থাকবেই।
সে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল, সুটকেস রেখে জানালার পাশে থামলো।চারদিকে চোখ বুলিয়ে একবার দেখলো।
কিরিস — “হুম… ঠিক আছে।”
কিরিস যে জায়গায় যাক না কেন তার জন্য আলাদা করে একটা স্পেশাল রুম থাকবেই,কারণ বান্দা যে কোন রুমে থাকতে অভস্ত্য নয় আর যার জন্য সে যেখানেই যায় কিংবা যেখানে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ মনে করে সেখানো ওর জন্য আলাদা করে রুম রাখা হয়। কিরিসের এমন ব্যবহারে সবাই অভ্যস্ত, তাই আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি গিলে তারা আগে থেকে কিরিসের জন্য একটা করে আলাদা রুম ঠিক করে রাখে।
সবাই রুম সিলেক্ট করা শেষ করতেই রিহান উচ্চস্বরে বললো—
“ঠিক আছে! এখন সবাই ফ্রেশ হয়ে নাও। অনেক দূরের জার্নি, একটু রেস্ট নিয়ে তারপর বাইরে গার্ডেনে বসবো।”

সবাই মাথা নেড়ে যার যার রুমে ঢুকে গেল—
কেউ শাওয়ার নিচ্ছে, কেউ ব্যাগ খুলছে, কেউ আবার বিছানায় একটু শুয়ে পড়েছে।