তোমাকে চাই
পর্ব :39
এই সময় আরোবি মুখ টিপে হাসতে হাসতে লিসির কানে হালকা স্বরে বলে —
"এই এই... আবার কোথা থেকে আপডেট হচ্ছে! কেমন লাগে, দেখিস আমার ভাইকে নিয়ে দৌড় না দেয়, তার আগে তুই দৌড় দিবি!"
লিসি হালকা রাগ দেখিয়ে —
"চুপ কর! আর ভাইকে নিয়ে কে দৌড় দেবে? চুপ করে খা তুই!"
আরোবি হাসি চেপে রাখে, লিসির গালটা লাল হয়ে ওঠে—অজান্তেই কিরিসের চোখ সেদিকে পড়ে, কিন্তু মুখে কিছু বলে না।
সকালের নাস্তা শেষ হতেই ছেলেরা একে একে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়।বাড়ি একটু ফাঁকা হয়ে যায়।
বউরা নিজেদের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ে—কারো গাছের যত্ন, কারো রান্নাঘরের পরিকল্পনা।
আর মেয়েগুলো?
ওরা বসে পিকনিকের তালিকা বানাচ্ছে—কে কি ড্রেস পরবে, কে কি রান্না করবে, কে কোন গান গাইবে…
হাসির রোল উঠছে একের পর এক।
এরমধ্যে ফোনে একে একে সবাই মিলে কথা বলছে অন্য কাজিনদের সঙ্গে।
সবাই আবার এক জায়গায় হবে, ভাবতেই ওদের মুখে খুশির ছটা।
রিহান, যে বাগানবাড়িটা পিকনিকের জন্য ঠিক করেছে—ওটা কিন্তু বেশ স্পেশাল।
ওই বাগানবাড়িটা রিহান কে ওর বড়আব্বু আনোয়ার, জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলেন।সুন্দর, পরিপাটি, গাছপালা ঘেরা সেই বাড়িটা ফাঁকা জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয়ভাবে।সময় পেলেই রায়চৌধুরী পরিবারের সবাই ওখানে যায়।তবে রিহানের এই বাগানবাড়িটা একদম নতুন—গত বছরেই ওর হাতে এসেছে।
বিকেলটা শান্ত, চারপাশে হালকা রোদের ঝিলিক।
রায় চৌধুরী বাড়ির ভেতরে হাসি–ঠাট্টা, কাজের শব্দ, আর মাঝে মাঝে মেয়েদের হাসির রোল। একটু আগেই সব কাজিনরা বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে চারপাশটা কেমন জমজম করছে, হিয়া, লিজা, তিশা আর নুসরাতও বাবার বাড়ি থেকে এসেছে,সবাই আবার একসাথে হয়ে গল্প করছে তা শেষ হচ্ছে না। তাদের কথার কোন শেষই নেই, একটা কথার পিঠে আরেকটা কথা আরসবাই ব্যস্ত পিকনিকের পরিকল্পনায়। ছেলেরা এখনো বাড়িতে ফেরেনি অফিসের কাজে ব্যস্ত, কিরিস বাড়িতে এসেছে কিছু দরকারি ফাইল নিতে হবে আর আনোয়ারের কাছে থেকে কয়েকটা ফাইলে সই করতে হবে। তাই বাড়িতে এসেছে সব কাজ শেষ তার এবার সেও ফিরবে আবার অফিসে।
ঠিক তখনই গেটের বাইরে গাড়ির হর্ন।সবার দৃষ্টি ঘুরে যায়।আনোয়ার বলে ওঠেন —
"মনে হয় নিশি এসে গেছে!"
একটু পরেই কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি থামে দরজার সামনে।গাড়ির দরজা খুলে ধীরে নামে এক মেয়ে— দীর্ঘ, স্ট্রেইট চুল, চোখে কালো সানগ্লাস, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক,চলনে একরকম আত্মবিশ্বাস।
সুপ্রিয়া হাসি মুখে এগিয়ে যায় —
"এসো মা, অনেক দিন পর দেখা! কেমন আছো?"
নিশি ঠোঁটের কোণে একটুখানি হালকা হাসি টেনে বলে —
"ভালো আছি আন্টি। এই বাসাটা এখনো তেমনই সুন্দর, যেমনটা মনে ছিল।"
তারপরই চোখটা ধীরে ঘুরে যায় সিঁড়ির দিকে—
সেখানে কিরিস নিচে নামছে, কালো শার্টে, এক হাতে ফোন, চোখে নিঃশব্দ এক গভীরতা।
নিশির চোখে মুহূর্তেই ঝিলিক পড়ে—
যে ছেলেটার জন্য সে দূরদেশ থেকে ফিরেছে,সে এখন ঠিক সামনে।
কিন্তু কিরিসের চোখ এক মুহূর্তের জন্যও নিশির চোখে আটকে থাকে না।
সে কেবল শান্ত গলায় বলে —
"ওকে গেস্টরুমে নিয়ে যাও। যা দরকার হয়, জানিও।"
তারপর ঘুরে চলে যায় অন্যদিকে।
নিশির ঠোঁটের হাসিটা মুহূর্তেই কেমন ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
ঠিক তখনই সামনের দিক থেকে লিসি সহ বাকি মেয়েরা নিচে নামছে—বাড়িতে নতুন কাউকে আসতে দেখে সবাই একে অপরের দিকে তাকা তাকি করতে থাকে,
লিসি একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে নরম গলায় বলে —
"নতুন গেস্ট বুঝি? আসুন, ভেতরে আসুন।"
নিশি প্রথমবার লিসিকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়।চোখে স্পষ্ট বিস্ময়, কিন্তু পরের মুহূর্তেই তা বদলে যায় ঠাণ্ডা উদাসীনতায়।সে একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত লিসিকে দেখে। তারপর হালকা অ্যাটিটিউডে বলে —
"হুম আসবো তো! এতে তোমার অনুমতি নেওয়ার তো দরকার নেই "
নিশির এমন কথায় লিসি চুপ হয়ে যায় কি বলবে সে, সে তো স্বাভাবিক ভাবে কথাটা বলেছিলো নিশিকে, লিসির সাথে এমন করতে দেখে আরোবি বলে —" এই শোনো তুমি নতুন না তোমার রুম টা ওই দিকে দাঁড়াও আমি কমলাকে বলছি দেখিয়ে দিতে "
নিশি আরোবির কথায় বলে
—"ধন্যবাদ, আমি নিজের রুমটা খুঁজে নিতে পারবো।"
তার ভদ্রতায়ও যেন কাঁটার খোঁচা।
নিশি নিজের ল্যাগেজ হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো, ঠোঁটে অদ্ভুত একটা হাসি।
ওদিকে কিরিস ইতিমধ্যেই গাড়ির চাবি হাতে নিচ্ছে, ফোনে কারও সাথে ছোট একটা কথা বলে বেরিয়ে পড়লো অফিসের দিকে।
ড্রয়িংরুমে একে একে মেয়েরা নিচে নেমে আসে, সোফায় বসে চা নিয়ে গল্পে মেতে ওঠে।
আরোবি হঠাৎ লিসির পাশে সরে এসে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে —
“দেখে মনে হচ্ছে তোকে কিন্তু ও পছন্দ করে নাই… কেমন মেয়েরে বাবা, বিদেশে থেকে ভাবটা বদলে গেছে।”
লিসি — “বুঝলাম না, এমন করে কথা বললো কেনো ও?”
আরোবি — “হুম… ভাবতে দে, আমার মনে হচ্ছে—”
লিসি — “কি মনে হচ্ছে?”
আরোবি (চোখ ছোট করে) — “এই নিশি তোর সতীন হতে চাচ্ছে।”
লিসি (চমকে) — “কি পাগল নাকি?”
আরোবি — “আর দেখলি না কিরিস ভাইয়ার দিকে কেমন করে তাকালো ও? চোখ সরাচ্ছিল না!”
লিসি চুপ করে যায়। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই কামড়ে ধরে।সত্যিই তো… নিশির সেই চোখের দৃষ্টি কিরিসের দিকে অদ্ভুত ছিল।মাথার ভিতর হালকা একটা আগুন যেন ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে, নিজেরও না জানা এক হিংসা…
ওদিকে তিশা সোফার পাশে বসে বললো —
“এই যে, আইডিয়া দিল কে রে যে আমরা পিকনিকে যাই?”
সুরভী হাত তুলে বলে — “আমি বলছিলাম, একটু ফ্রেশ হওয়া দরকাদর সবার।”
লিজা — “ভালো করেছিস, এই হিয়া তোর ওই ভিডিওটা দিতে বলেছিলাম না?”
হিয়া — “ওই ছোট ক্লিপটা নেই, বড়টা দিচ্ছি এখন।”
হাসাহাসি, গল্প, ফোনে রিল দেখা— মেয়েদের ঘর যেন আবার সরগরম হয়ে ওঠে।
রান্নাঘরে ,
সুপ্রিয়া ঢাকনা খুলে ভাজা পেঁয়াজে নেড়ে দিতে দিতে প্রিয়াকে বলে —
“এই নিশিকে কিন্তু আমার সুবিধার মনে হচ্ছে না। লিসির সঙ্গে কথাটা খারাপ বললো। যাই হোক, অতিথি হয়েছে আপাতত, কিছু বলা যাবে না।”
প্রিয়া — “হুম, যেমনটা বলেছো, দেখি। যদি আবার এমন কিছু করে, আমাদের মেয়েদের সঙ্গে এমন ব্যবহার বরদাস্ত করবো না।”
চুলার ধোঁয়ার মধ্যে দুইজনের চোখাচোখি হয়—
দুজনেই বোঝে, ঝড় আসছে, আর সেটা ঘরের ভেতর থেকেই।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রায় চৌধুরী বাড়িটা এখন এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরপুর — ড্রয়িংরুমে মেয়েরা চা আর নাস্তা নিয়ে বসে গল্পে মেতে আছে। হাসির রোল, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ, গল্পের শেষ নেই — যেন আনন্দের কোনো ক্লান্তি নেই কারো মুখে।কিন্তু তখনও নিশি নিচে নামে না। কিছুক্ষণ পর, নরম পায়ের শব্দে ও নামলো সিঁড়ি বেয়ে। ওয়েস্টার্ন পোশাকে — একটা টপ আর জিন্স প্যান্ট। হাঁটায় আছে আত্মবিশ্বাস, চোখে অদ্ভুত এক দীপ্তি। নিচে নামেই কারোর দিকে না তাকিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো।
সবাই থমকে একবার তাকালো—
জারা চুপচাপ ফিসফিসিয়ে বলে —“আহা, সুবিধার মনে হচ্ছে না... এর মনে হয় কিরিস ভাইয়ার উপর ক্রাশ আছে।”
সুরভী — “শুধু ক্রাশ? এখন যেভাবে করছে, দেখে মনে হচ্ছে বিয়েই করবে।”
তিশা— “এই তো একটু আগেই এল! এর মধ্যে এমন ভাব করছে, যেন কতদিন ধরে আমাদের চেনে।”
নুসরাত হাতের চা নামিয়ে বলে উঠে — “চুপ করো তো, আমি দেখি ও কি করছে।”
বলে নুসরাত উঠে দাঁড়ায়, রান্নাঘরের দিকে এগোয়।
ভেতরে তখন প্রিয়া আর সুপ্রিয়া চা শেষ করে হালকা আড্ডায় ব্যস্ত।নিশি ঢুকেই সুপ্রিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
নিশি — “বলছি আন্টি, কিরিস কি খেতে পছন্দ করে?”
সুপ্রিয়া এক মুহূর্ত থেমে তাকালো— মুখে হালকা অবাক ভাব।
সুপ্রিয়া—“কেন মা, কি করবে জেনে?”
নিশি হাসি টেনে — “কি করবো মানে কি! ভবিষ্যৎ নিয়ে আগে থেকেই একটু চিন্তা করছি।”
ওর ঠোঁটের কোণে হালকা আত্মবিশ্বাসী হাসি।সুপ্রিয়া কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেলেন।এই কথাটা বসে মেয়েদের কানে পৌঁছে যায়। সবাই চোখাচোখি করে মুচকি হাসে। এই সময় লিসি চুপচাপ বসে আছে। বাইরে থেকে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে যেন আগুন জ্বলছে। বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে ওঠে নিশির নাম শুনলেই। কিন্তু মুখে কিছুই প্রকাশ করে না — শুধু চোখ নামিয়ে কাপের দিকে তাকিয়ে থাকে। সুপ্রিয়া নিশিকে বলে কিরিস কি খেে পছন্দ করে
নিশি এখন কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলে—
“তাহলে কিরিসের ক্ষীর পছন্দ, তাও আবার চিনি ছাড়া! আচ্ছা আন্টি, কিভাবে বানাতে হয়?”
ঠিক তখনই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা নুসরাত এগিয়ে এলো
— “হঠাৎ তুমি ক্ষীর বানাতে চাও কেন, হ্যাঁ?”
নিশি ভুরু কুঁচকে — “তুমি কে?”
নুসরাত —“এই বাড়ির বউ।”
নিশি —“ওহ, রিহানের বউ! তাহলে তো তুমি আমার খুব কাছের হবে— মানে ভবিষ্যতে আমাকে রান্নায় সাহায্য করবে।”
নুসরাত কিছুটা কড়া গলায় বলে উঠে —“কি সব বলছো তুমি!..... মা, আপনি যান, নানি ডাকছে।”
প্রিয়া চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।সুপ্রিয়া নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, অতিথি বলে কিছু বলেন না।নিশি তখন গ্যাসের পাশে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে ক্ষীর নেড়ে যাচ্ছে— একদম যত্ন করে, যেন কোনো বিশেষ মানুষকে খাওয়াবে।নুসরাত পাশে দাঁড়িয়ে সবটা নিঃশব্দে দেখছে, চোখে একরাশ অস্বস্তি।অবশেষে নিশি এক বাটি ক্ষীর আলাদা করে রাখে— মুখে হালকা তৃপ্তির হাসি।কয়েক মিনিট পরেই দরজার কড়কড়ানি— একসাথে ছেলেরা ঢুকলো। তারা ঢুকেই একে অপরকে দেখে হেসে, গলে মিশে আড্ডায় যোগ দিল। পুরোনো ভাইব, ফিহাসস ও ঠাট — সব মিলেই বাড়িতে নতুন একটা তীব্রতা এসে গেল।
কাবির উচ্ছ্বাসে সঙ্গে বলে — “আরে সবাই! আজ তো মজা হবে!”
রিহান হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে — “ওই— শালিকার বোন কই?”
ইয়াবি হেসে বলে — “ওরে, উপরে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে আয় আগে, তারপর বউ খুঁজিস। আগে দুজন ফ্রেশ হয়ে আয় — আমরা এখানে বসে আছি। ইশান, তুই একটু বয় সারাদিন কি কষ্ট করে না, বেচারা।”
ইশান হেসে — “হুম, কেন না— এই জারা একটু পানি আনবে?”
জারা ইশানের দিকে তাকিয়ে উঠে গেল— সোজা রান্নাঘরের পাশে রেখে থাকা পানির জগ থেকে পানি টালতে থাকে। ছেলেরা তখন ছোপায় গা এলিয়ে বসলো, ঘরের বাতাস হালকা চঞ্চল হয়ে গেল।
ইয়াবি বলে, লিসির দিকে তাকিয়ে — “এই লিসি, কেমন আছো?”
লিসি নম্র কণ্ঠে উত্তর দেয় — “ভালো আছি ভাইয়া।”
ইয়াবি —“সুরভী মামারা কই? মামিরা কই? দেখছি না তো”
সুরভী— “আব্বুরা সম্ভবত স্টাডি রুমে; আম্মু দাদির ঘরে গিয়েছেন; বড় আম্মু রান্নাঘরে — তোরা আব্বুদের ওখানে গিয়ে দেখা করো, আম্মুর সাথেও দেখা হবে।”
সবাই উচ্চস্বরে বললে— সেই আওয়াজে রান্নাঘর থেকে সুপ্রিয়া বেরিয়ে এসে সবার দিকে আলতো করে মুচকি হাসি দিলেন।
সুপ্রিয়া খুশি হয়ে বলে —“তোরা সবাই এসে গেছিস! আজকে তোদের ছোট মামী আর আমি তোদের পছন্দের সব খাবার বানিয়েছি — তবে কিরিস আসে নাই।”
এখানেই একটা চমকভরা নিঃশ্বাস ঘরে ছড়িয়ে পড়ল— কিরিসের নাম শুনে কৌতূহল আর একটা অদ্ভুত অচেনা শূন্যতা তৈরি হলো।
ইশান হালকা কাঁপা কণ্ঠে —“মামি, তোমাকে তো চোখেই দেখিনি কতোদিন! ঠিক আছে — তোমার ছেলে পরে আসবে; আমরা আগে চলে এসেছি।”
সুপ্রিয়া — “শুনেছি তুই এখন অনেক ব্যস্ত?”
ইশান নামি সেই ভঙ্গিতে —“কি করবো— ডাক্তার হয়েছি, একটু ব্যস্ত থাকবই।”
সবাই হেসে উঠলো— হাসি ভাঙলো কিছুকাল আগের সিরিয়াসিটি। ঠিক তখন কাবির আর রিহান উপরে থেকে ফ্রেশ হয়ে নেমে এলো; জারাও হাতে পানি নিয়ে এসে ইশানের গলা দিয়ে দিল।
জারা ঠোঁটে খলখলে হাসি — “নে— তোর পানি।”
ইশান পানি খেয়ে বলে—
“আহা, কলিজা ঠান্ডা গেইল... অবশ্যই হবে না কেনো— কে পানি নিয়ে এসে দিয়েছে, দেখতে হবে না!”
জারা টগবগ করে — “তুই যদি এখন কষ্ট করে না আসতিস, তোর দাঁত আমি ভেঙে দিতাম— বিটকেল কোথাকার।”
ইশান মজার ছলে বলে —“আমি বিটকেল হলে তুই কটকটি।”
সবাই হেসে উঠলো; হাসির মাঝে তিশা হঠাৎ বলল—
“আরে চুপ করো! আর এটা বল — ওই নতুন আপডেট, অথিতি— কি করবি?”
কাবির চোখ মুচড়ে —“অথিতি কই রে...?”
এই কথা বলতেই রান্নাঘরের দরজায় হালকা শব্দ—
নিশি বেরিয়ে এল। সব ছেলেদের চোখ একসঙ্গে নিশির দিকে। কেউ নিশব্দ, কেউ মুচকি হেসে তাকিয়ে আছে, আবার কেউ ঠোঁট কামড়ে রাখছে চুপচাপ।ছেলেরা একে অপরের দিকে চোখাচোখি করতে শুরু করে দেয় তাদের যেন বিশ্বাস হচ্ছে না এই নিশি এখন তাদের বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রিহান তো তার সেই চিপয়ের কথা মনে পরতেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়।
রিহান উত্তেজনায় জোরে বলে উঠে — “আরে এই তো সেই... মানে…”
এর আগেই ইয়াবি তড়িঘড়ি রিহানের মুখ চেপে ধরে।ইয়াবি ফিসফিসিয়ে বলে —“চুপ কর, হাটে হাড়ি ভাঙবি নাকি!”
সবাই হেসে উঠলো।
ইশান মজা করে বলে — “ওয়াও! এখন দেখছি সব বাড়িতেই হোম ডেলিভারি!”
কাবির চোখ টিপে —“হুম… ডিজিটাল বাংলাদেশ!”
সবাই একে অপরের চোখে চোখে তাকায়, দুষ্টুমি লুকিয়ে রাখে না কেউই। ঘরের মধ্যে একধরনের চঞ্চল হাসির তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ঠিক তখনই, হঠাৎ বাইরে গাড়ির হর্ন বাজলো।এক মুহূর্তে সব হাসি থেমে যায়।
বাড়ির গেটের বাইরে চকচকে কালো গাড়ি এসে থামলো।
ড্রাইভারের দরজা খুলে নামলো কিরিস। হাতে কয়েকটা অফিস ফাইল, কাঁধে ঝুলানো কোট, চোখে সাদা ফ্রেমের গ্লাস।সাদা শার্ট, গাঢ় রঙের প্যান্ট চুলগুলো হালকা এলোমেলো, তবু প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে একরাশ গাম্ভীর্য।তার উপস্থিতিতেই যেন পুরো বাড়ির শব্দ থেমে গেল।কেউ কিছু বলার সাহস পেল না।
তার সেই ঠান্ডা, স্থির হাঁটার শব্দই বলে দিল সে ফিরেছে
কিরিস একবারও কারো দিকে তাকাল না।শুধু নিঃশব্দে চৌকাঠ পেরিয়ে, ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলো।সবার চোখ ওর দিকেই। কেউ মুগ্ধ, কেউ সন্ত্রস্ত, কেউ অবাক।ওর ঘরে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে আবার ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।সবাই নিঃশব্দ শুধু লিসি নীচে বসে আছে।
কয়েক মিনিট পর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে—
চুলে হালকা ভেজা ভাব, গলার পাশে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে,
ওর তীক্ষ্ণ চেহারায় যেন আবারও রাজকীয় আবহ ফিরে এসেছে।
ঘরটা হঠাৎ থেমে যায় যেন—
সবাই নিঃশব্দে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।
ঠিক তখনই নিশি একপাশ থেকে উঠে আসে।
হাসতে হাসতে এগিয়ে আসে কিরিসের সামনে, এক হাতে ট্রে, আরেক হাতে হালকা সাহসের ছোঁয়া।
নিশি হাসি মুখে হাত বাড়িয়ে —
“হাই, আমি নিশি… তুমি আমাকে—”
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই, কিরিস হালকা হাসি দিয়ে ওর হাতের দিকে তাকায়,তারপর নিজের হাতটা অল্প ছুঁয়ে দেয়, ভদ্রভাবে।
কিরিস —
“হুম, চিনেছি… এসেছে ভালো হয়েছে, থাকো কিছুদিন আমাদের বাসায়।”
এই কথাটা বলে ও আবার পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়।
কিন্তু ঠিক তখনই—
নিশি হঠাৎ উচ্ছ্বাসে হালকা চিৎকার করে ওঠে,
নিশি — “ওহ মাই গড! আমি ভাবতেই পারিনি তুমি আমার হাতে হাত দেবে!”
ঘরটা মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কিরিস ও নিজে একটু থেমে যায় নিশির চিৎকার শুনে, সবাই ওর দিকে তাকিয়ে অবাক।
ইশান চুপচাপ হেসে বলে— “ও মা, হ্যান্ডশেকেই এমন প্রতিক্রিয়া?”
কাবির ফিসফিস করে — “এমন হলে আলিঙ্গনে তো ঘর কাঁপবে।”
সবাই দমিয়ে হাসছে, কিন্তু কারো সাহস নেই জোরে হেসে ফেলার।ওদিকে সোফার এক কোণে বসে আছে লিসি।
ওর আঙুলে তখন একটা কমলালেবু—
ঠিক নিশির চিৎকার শুনে, লিসির চোখ যায় কিরিসের হাতে যেটা এক সেকেন্ড আগে নিশিকে ছুঁয়েছিল।
ওর চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তে কড়া হয়ে যায়।দৃশ্যটা দেখেই ওর ভেতরটা কেমন টনটন করে ওঠে —
ওর আঙুলের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে কমলালেবুর রস ছিটকে পড়ে টেবিলে।
আরোবি চোখ বড় বড় করে তাকায় —
আরোবি চুপিচুপি করে বলে — “ওই কমলালেবুর সাথে কি শত্রুতা ছিল নাকি?”
লিসি ঠান্ডা গলায় — “না, খোসা একটু শক্ত ছিল।”
আরোবি বুঝে ফেলে— এটা খোসা না, ঈর্ষার রস।
ও আলতো করে লিসির কাঁধে হাত রাখে, নিচু গলায় বলে আরোবি — “চুপ কর, কেউ যেন বুঝতে না পারে।”
লিসি কিছু বলে না, শুধু সামান্য হাসে,
কিন্তু ওর চোখে তখন একধরনের নীরব আগুন—ওদের এই কথোপকথনের ফাঁকেই নিশি এগিয়ে এসে ট্রেটা কিরিসের সামনে ধরে —
নিশি মিষ্টি হাসি দিয়ে —
“এই ক্ষীরটা আমি বানিয়েছি... বিদেশে থেকেও বাংলাদেশি ট্র্যাডিশন ভুলিনি। তোমার জন্যই বানালাম।”
কিরিস একটু থামে, তারপর ভদ্রভাবে ট্রেটা থেকে ক্ষীরের বাটি টা নেয়।চামচে এক চুমুক খায়, তারপর আরেকটা। মুখে বিন্দুমাত্র অভিব্যক্তি নেই —
ও যেন শুধু ভদ্রতার খাতিরে খাচ্ছে।
কিরিস —“ধন্যবাদ কষ্ট করে ক্ষীর বানানোর জন্য ”
কিরিসের মুখে এই কথা শুনে নিশিকে আর পায় কে! নিজের চুলগুলো কানের পাশে গুজে হালকা হাসিতে বলে —
নিশি — "তোমার জন্য তো একটুকু কিছুই না..."
কিরিস আর কথা না বাড়িয়ে সোজা গিয়ে বসে পাশে নিজের চেয়ারে।
রান্নাঘরের বাকি কাজ শেষ করে সুপ্রিয়া এগিয়ে আসে কিরিসের দিকে। টেবিলের ওপর ক্ষীরের বাটিটা একপাশে সরিয়ে রাখা।
সুপ্রিয়া ক্ষীরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে —
সুপ্রিয়া — "শোন, ওই আমাকে বলেছিলো... আর এই—"
কিরিস কথা কেটে দেয় শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় —
কিরিস — "আমি জানি, এটা তুমি বানিয়েছো। নিশি হয়তো একটু নেড়ে দিয়েছে, কিন্তু এই স্বাদ আমার মায়ের হাতের। আমি আমার মায়ের রান্না চিনি। অন্য কেউ বানালে এতক্ষণে বমি উঠে যেতো।"
সুপ্রিয়া হেসে ফেলে। নিজের ছেলের মুখে এমন নিশ্চয়তার সুর শুনে তার মুখে গর্বের ছায়া খেলে যায়।
ওদিকে নিশি কিরিসের চেয়ারের সামনে বসে বসে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কাজিনরা সেই সিন দেখে খিলখিলিয়ে হাসছে, কেউ খোঁচা মারছে, কেউ ইশারা করছে।
লিসি চুপচাপ বসে সব দেখছে।
এমন সময় সুপ্রিয়া ওখান থেকে যাওয়ার আগে হঠাৎ ক্ষীরের বাটিটার দিকে তাকায়, তারপর লিসির দিকে চোখ রেখে বলে —
সুপ্রিয়া — "লিসি, কিরিসের ক্ষীরে একটু মিষ্টি দিয়ে দাও না... না হলে পুরোটা খাবে না, নষ্ট করবে।"
লিসি একটু অবাক হয়ে সুপ্রিয়ার দিকে তাকায়।
সুপ্রিয়া মুচকি হেসে শুধু হালকা মাথা নেড়ে ওখান থেকে চলে যায়।ঘরটা মুহূর্তে নিঃস্তব্ধ হয়ে পড়ে—
সবাই তাকিয়ে আছে লিসির দিকে।সে চুপচাপ বসে আছে, চোখ নিচু, মুখে কোনো ভাব নেই।কিরিস ল্যাপটপ অন করে বসে, স্ক্রিনে চোখ রাখলেও দৃষ্টি বারবার ঘুরে যাচ্ছে লিসির দিকে।তার গলায় ঠান্ডা অথচ ভারী স্বর—
কিরিস — "মা কী বললো শুনতে পেলে না নাকি?"
লিসি মুখ তোলে না, নীরব।তার এই নীরবতা ঘরের বায়ুকে যেন আরও ভারী করে তোলে।পাশ থেকে আরোবি হেসে বলে—
"আরে যা, না হলে কিন্তু সবাই অন্য কিছু ভাববে!"
সঙ্গে সঙ্গে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে।
সবাই একবার লিসির দিকে তাকায়, তারপর কিরিসের দিকে কেউ মুখে কিছু বলে না, কিন্তু চোখে কৌতূহল ঝিলিক দেয়। ওদিকে নিশির মুখ কালো হয়ে গেছে, ঠোঁট শক্ত করে কামড়ে আছে সে।চোখেমুখে রাগ, হিংসা আর অপমানের ছাপ স্পষ্ট।লিসি ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
তার মুখে কোনো রাগ নেই, লজ্জাও নেই। শুধু এক নিঃশব্দ শান্ত ভাব, যেন দায়িত্ববোধে চালিত।সে ধীরপায়ে কিরিসের দিকে এগিয়ে যায়,টেবিলে রাখা ক্ষীরের বাটিটা হাতে তুলে নেয়।সবাই তাকিয়ে আছে—লিসিরচলাফেরায় এমন এক সহজ নিশ্চয়তা,যেন এটাই তার কাজ, তার কর্তব্য।সে বাটি হাতে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে থাকে।
ঠিক তখনই নিশি সামনে এসে পথ আটকায়।
চোখে ক্রোধ, গলায় তীক্ষ্ণ সুর—
নিশি — "কিরিস ক্ষীরে চিনি খেতে পছন্দ করে না, তুমি জানো না? বাটিটা দাও, আমি মিষ্টি দিয়ে দিচ্ছি।"
লিসি নিশির দিকে তাকায়।তার চোখ ঠান্ডা, স্থির, একটুও নড়ে না।
লিসি — "শোনো, আমি জানি না কে ক্ষীরে চিনি খায়,
লবণ খায়, না বিষ খায়...
আমাকে দিতে বলেছে, তাই দিচ্ছি।
সরো সামনে থেকে।"
লিসির কথাটা শেষ হতেই হঠাৎ ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
সব কাজিনদের চোখ একসাথে ঘুরে যায় ওদের দিকে—
আর কিরিস... চোখ ছোট করে তাকিয়ে আছে,
তার চোয়াল শক্ত, ভেতরে কেমন এক অচেনা রাগ জমে উঠছে।চারপাশে যেন কেউ নিঃশ্বাসও নিতে পারছে না,
কাজিনদের মুখে দুষ্টামি মিশ্রিত উত্তেজনার ঝিলিক—কাবির — "এইটা বাকি ছিলো কিন্তু!
এই নিশির আবার আমাদের লিসির সাথে কিসের শত্রুতা?"
ইয়াবি — "এই তো মনে হচ্ছে নাগিন ৭ এর প্রোমো শুট হচ্ছে এখানে!"
তিশা — "আরেহ চুপ করো সবাই!"
সুরভী — "এই লিজা আর হিয়া কই?"
জারা — "ওরা তো উপরে ঘরে!"
হাসিঠাট্টা চললেও, বাতাসে চাপা টান।কিরিসের চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি—নিশির দিকে নয়। লিসির হাতের দিকে, যেখানে ক্ষীরের বাটিটা ধরা।
লিসি নিশিকে পাশ কাটিয়ে হেঁটে যেত থাকে, ঠিক তখনই নিশি আচমকা এগিয়ে এসে লিসির হাত থেকে ক্ষীরের বাটিটা জোর করে কেরে নেয়।গরম ক্ষীর ছিটকে পড়ে লিসির হাতে—
তপ্ত দুধের ফোঁটাগুলো তার ত্বকে লেগে লালচে হয়ে ওঠে,
কিন্তু সে একটাও শব্দ করে না।চুপচাপ, নিঃশব্দে সহ্য করে নেয়।সবার সামনে যেন কিছুই হয়নি এমন ভান করে দাঁড়িয়ে থাকে লিসি,আর নিশি বাটিটা হাতে নিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ঠোঁট কামড়ে গলায় বিষ ঢেলে বলে—
নিশি — "এই কাজ করার অধিকার তোমার কখনই ছিল না! নিজের সীমানার ভেতর থাকো... বিয়াদপ মেয়ে!"
লিসির বুকটা দপ করে ওঠে,মনে মনে নিশিকে হাজারটা গালি দেয়,কিন্তু ঠোঁটের কোণে এক বিন্দুও প্রতিক্রিয়া নেই।চোখে অগ্নি, মুখে নীরবতা, দাঁত কিঁচিয়ে নিজের হাতটা আঁকড়ে ধরে,ধীরে ধীরে নিশির পেছন পেছন রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।ওদিকে কিরিস বসে আছে একদৃষ্টে তাকিয়ে—তার চোখের দৃষ্টি কাঁচের মতো ঠান্ডা,
কিন্তু ভেতরে গলে যাচ্ছে আগুন।ল্যাপটপের স্ক্রিনের আলোয় তার মুখের ছায়া আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে।
আর কাজিনরা?
সবাই একে অপরের মুখ চেয়ে আছে কেউ হাসছে না,
নিশি সোজা গিয়ে ক্ষীরের বাটিটা টেবিলের ওপর রাখে।
নিশি কি করতে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পেরে লিসি বলে —
“ এই শোনো চিনি দিও না ভাইয়া... ”
নিশি কথা কেটে বলে —“তুমি পাগল নাকি! মিষ্টি খেতে চেয়েছে লবণ না, তুমি মনে করছে তুমি বারণ করবে আর আমি শুনবো, you idiot ”
লিসির এবার একটু গায়ে লাগে কথা টা তাই আর কিছু বলে না। নিশি পাশে থাকা চিনির কোওটা থেকে চামচে চিনি তুলে এক চামচ, দুই চামচ... তারপর পুরো মনোযোগ দিয়ে ক্ষীরে মিশিয়ে দেয়।তার মুখে এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি—
যেন এখন কিরিস তার হাতের তৈরি মিষ্টিতেই মুগ্ধ হয়ে যাবে।লিসি দাঁড়িয়ে সব দেখছে।হাসবে নাকি কানবে, বুঝে উঠতে পারছে না—
কারণ সে জানে, কিরিস চিনি ঘৃণা করে।
ক্ষীরে চিনি মিশিয়ে নিশি সেটাকে ভালো করে নাড়াচ্ছে।
বাটিটা হাতে নিয়ে আত্মবিশ্বাসে ভরা ভঙ্গিতে কিরিসের দিকে যেতে থাকে।লিসির ঠোঁটের কোণে একটা চাপা হাসি ফুটে ওঠে—সে জানে, এবার ঝড় আসবেই।
এই বাড়িতে আসার পর থেকে কিরিস সম্পর্কে প্রায় সবকিছুই জেনে গেছে লিসি।কারণ শেষমেশ কিরিসের যত কাজ, যত খাওয়া—সবই তার হাত দিয়েই যায়।
সুপ্রিয়ার সঙ্গে থেকে বহুবার সে নিজের হাতে ক্ষীর সাজিয়েছে কিরিসের জন্য।আর তাই সে জানে—
কিরিসের মিষ্টি মানেই চিনি নয়...
তার মিষ্টি মানে—বাদাম, খেজুর, আর মধু।
সেগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে শুধু সুপ্রিয়াই দেয় কিরিসকে। সে জানে কিরিস ওই চিনি মেশানো ক্ষীর গালে দিলে কি হবে তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে সে তাড়াতাড়ি হাড়ি থেকে আরেকটা ছোট বাটিতে ক্ষীর তুলে নেয়।তারপর সেখানে কুচানো বাদাম, খেজুর দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে দেয়।উপর থেকে আরও খানিক বাদাম ও খেজুর সাজিয়ে দেয়—
শেষে একেবারে নিজের হাতে চারপাশে মধু ছড়িয়ে দেয় নরম বৃত্তে।গন্ধটা যেন সোনালি সন্ধ্যার মতো মিষ্টি হয়ে ওঠে।
ওদিকে নিশি ইতিমধ্যেই কিরিসের কাছে গিয়ে
তার বাটিটা টেবিলে রাখে—
নিশি — “এই নাও, তোমার জন্য বানানো।”
কিরিস ল্যাপটপে চোখ রেখেইচামচ তুলে এক চামচ ক্ষীর মুখে দেয়।চোখে এক মুহূর্তের জন্য নড়াচড়া,তারপর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। ঘরটা যেন মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে—
কাজিনরা সবাই নিশি আর কিরিসের দিকে তাকিয়ে আছে।নিশির মুখে জয়ের ছায়া,কিন্তু কিরিসের মুখে সেই ছায়া—নির্লিপ্ত, ঠান্ডা, বিপজ্জনক।
কিরিস চামচটা চোখের কোণে টেনে মুখে দিতেই হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। পাশের টিস্যু কৌটা হাতে তুলে টিস্যু টেনে কিরিস মুখ থেকে ক্ষীরwipe করে ফেলি—তার চোখে আগুন, গলার স্বর ঠান্ডা কিন্তু রক্তাক্ত:
কিরিস — "What nonsense is this? এতে চিনি কারা দিয়েছে! জানে না নাকি আমি চিনি খাই না? পাগল নাকি তুমি!"
নিশি কিরিসের রেগে থাকা চেহারা দেখে ঘাবড়ে পিছু হটে, কণ্ঠ কাঁপে বলেই—
নিশি — "আন্টি তো মিষ্টি দিতে বলেছে, তাই তো আমি চিনি দিয়েছি... তাতে আপনি এমন করছেন কেন?"
কিরিস গলায় বিষাক্ত এক ফুঁ তুলে বলে—
কিরিস — "এমন করছি কেন? You mad girl, তোমাকে আমি..."
কথা ভাঙে—সবার চোখ ভেদ করে বাড়ির মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কাজিনরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে, কেউ কেউ হাসি ধরে রাখে না।
রিহান (উদ্গুদ্ধ) — "আরে, এইটা তো বাকি ছিল, এবার কে থামাবে একে!"
তৎক্ষণাৎ ইয়াবি পরিস্থিতি সামাল দিতেবলে —"আস্তে, আস্তে—ও তো নতুন গেস্ট, এইসব জানে না; তুই ঠান্ডা হ!"
কিন্তু কিরিস আরও চরমের দিকে ঝুঁকে বলে—
কিরিস — "আমি আর ঠান্ডা! তুই জানিস না নাকি আমি চিনি..."
বাক্য টুকু বলতে না পেরেই লিসি নির্বিকার কণ্ঠে এগিয়ে আসে। সে নিজের আনা ক্ষীরের বাটিটা থেকে এক চামচ তুলে সরাসরি কিরিসের মুখে ঢেলে দেয়।
কিরিস হতবাক হয়ে লিসির দিকে তাকায়; লিভিংরুম

0 Comments