তোমাকে চাই
পর্ব :38
লিসি এখনও হেসে হাঁপাচ্ছে, কিরিস চুপচাপ তাকিয়ে আছে তার দিকে।
তার মুখে ঘামের বিন্দু, চুলের গোছা উড়ে এসে কপালে লেগেছে—
কিরিসের বুকের ভেতর হালকা কিছু নড়ে ওঠে।
লিসি হাসতে হাসতে —“দেখলেন তো, পালানো কিন্তু খারাপ কিছু না!”
কিরিস চোখ কুঁচকে, ঠান্ডা গলায় — “তুমি পাগল… তোমার মতো মেয়েরা মানুষকে বিপদে ফেলতে জন্মেছে।”
লিসি ভ্রু তুলে — “বিপদে? পেয়ারা চুরি করে পালানোও নাকি বিপদ?”
কিরিস—“তুমি জানো না, আমি কী কী থেকে পালিয়েছি জীবনে…
আজকে প্রথম একটা মেয়ে আমার হাত টেনে দৌড়েছে।”
লিসি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
একটা মুহূর্তের জন্য চারপাশটা নিঃস্তব্ধ—
শুধু দূরে বিকেলের আলো মাটিতে ছায়া ফেলছে।
তারপর হালকা ভঙ্গিতে লিসি বলে—
লিসি — “তাহলে আজ আপনি নতুন কিছু শিখলেন তাই না”
কিরিস নিচু স্বরে —“তুমি খুব আলাদা, লিসি…”
লিসি মুখ ঘুরিয়ে নেয়, গালে হালকা লজ্জার ছোঁয়া।
কিরিস পাশ থেকে হাঁটতে হাঁটতে গম্ভীর মুখে বলে—
কিরি — “চলো, এখন বাড়ি যাওয়া দরকার।”
লিসি ঠোঁট বাঁকিয়ে—“রাগ করলেন?”
কিরিস মুখ শক্ত করে — “রাগ করিনি, কিন্তু তুমি ভাগ্যবান যে আমি এখন কথা বলছি।”
লিসি দুষ্টু হেসে —“ওহ, মানে ভয় পেয়ে গেছেন?”
কিরিসের চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি — “ভয় আমি পাই না, লিসি। আর তোমার জন্ম যদি আমাকে বিপদে ফেলার হয় তাহলে আমি সারাজীবন বিপদে পরতে রাজি ।”
লিসির হাঁটা থেমে যায়।
সে তাকিয়ে থাকে কিরিসের মুখের দিকে—
যেখানে ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি, আর চোখে ভয়ঙ্কর গভীরতা।
লিসি আস্তে করে চোখ তুলে তাকিয়ে বলে — “আপনি সত্যি অদ্ভুত…”
কিরিস — “তোমার মতোই।”
দুজন ধীরে ধীরে গেটের দিকে হাঁটতে থাকে।
আকাশে হালকা সূর্যাস্তের আভা, হাওয়া ঠান্ডা।
লিসি মাথা নিচু করে হাঁটছে,আর কিরিস—তার পাশে, নীরবে,তবু মনে মনে সেই দৌড়ের মুহূর্তটা যেন বারবার ফিরে আসছে তার চোখে—যেভাবে লিসি হাত ধরে টেনেছিল তাকে,যেভাবে প্রথমবার… সে সত্যিকারের বেঁচে থাকা অনুভব করেছিল।
বিকেলের আলো ম্লান হয়ে এসেছে।
বাড়ির হলরুমে তখন গল্প চলছে — আনোয়ার, আনারুল, মির্জা বেগম, কাবির, রিহানসহ অনেকেই বসে।
হাসাহাসি, চায়ের কাপ, আলাপচারিতা — এমন সময় হঠাৎ গেটের দিক থেকে দুইটা ছায়া দেখা যায়।
কিরিস আর লিসি।দুজনেই হাঁটছে নিঃশব্দে।লিসির মুখ লাল, চোখে লজ্জা, আর কিরিসের মুখে সেই চেনা গম্ভীর ভাব — ঠোঁটের কোণে চাপা রাগ, চোখে নিঃশব্দ ধমক।
সবাই থেমে যায়, একসাথে তাকায় ওদের দিকে।
হঠাৎ নীরবতা নেমে আসে।
শুধু পেছনে একজন চাকরীর কণ্ঠ শোনা যায়—“চা দেবো স্যার?”
আনোয়ার ভ্রু কুঁচকে — “এই তোরা কোথা থেকে আসছিস?”
লিসি মাথা নিচু করে মেয়েদের দিকে এগিয়ে যায়, গিয়ে তাদের মাঝে বসে পড়ে।
তার গলায় নিচু স্বর—
লিসি — “পেয়ারাগুলো কই?”
জারা ধীরে ধীরে বলে — “ আছে বেশ কয়েকটা পরে নিস, নাহলে এখন জানলে মার একটাও বাইরে পরবে না ... তুই তো পালায়ছিলি।”
আরোবি চুপচাপ হেসে বলে — “কিরিস ভাইয়ের সামনে কিছু বলিস না।”
লিসি চোখ নামিয়ে নেয়।এদিকে কিরিস দরজার পাশে দাঁড়িয়ে, চোখ কুঁচকে একবার তাকায়—
সব মেয়ের মুখে ভয়, কেউ হাসতে পারছে না।
তার চোখে এমন এক দৃষ্টি—যেন শুধু দৃষ্টিতেই সবাই চুপ হয়ে যায়।
আনোয়ার অবাক হয়ে — “কিরিস, ব্যাপারটা কী?”
কিরিস ঠান্ডা কণ্ঠে — “চুরি।”
সবাই একসাথে—“চুরি?”
কিরিস — “হ্যাঁ। আমাদের বাড়িরর মেয়েরা আজ পেয়ারা চুরি করাও শিখে গেছে।”
তার ঠোঁটে রাগ মেশানো ঠান্ডা হাসি,
চোখ গিয়ে পড়ে লিসির ওপর।
মির্জা বেগম চোখ বড় বড় করে — “হায় আল্লাহ! পেয়ারা চুরি?”
সুরভী চুপচাপ বলে — “ওইটাও মিষ্টি পেয়ারা ছিল, খারাপ না।”
কিরিস ভ্রু তুলে তাকায়, সুরভী তাড়াতাড়ি মুখ নিচু করে।
আনোয়ার মুখে হালকা হাসি টেনে গম্ভীর হয়ে বলে—
“এই বয়সে সবাই একটু দুষ্টুমি করে, কিন্তু পরের বাগানের গাছে ওঠা ঠিক না, তাই না কিরিস?”
কিরিস কঠিন কণ্ঠে বলে উঠে — “না, ঠিক না।”
তার গলা এমন ঠান্ডা যে মেয়েরা সবাই নিঃশব্দ।
লিসি চুপচাপ নিজের ওড়নার কোনা ঘুরিয়ে বসে।
ঠিক তখনই কাবির আর রিহান একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে—
লিসি এরমধ্যে মুখ ফুসকে বলে —“ আপনিও তো আমাকে পেয়ারা চুরি করতে সাহায্য করেছন! ”
সবাই লিসির দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কারোর মুখে কোনো কথা নেই কিরিসের সামনে এতে বড় দুঃসাহস দেখানোর ক্ষমতা কারোর হয়নি এখনো কিন্তু লিসির এমন কথায় সুপ্রিয়া নিজের হাসি বন্ধ রাখতে পারলো না,
সুপ্রিয়া—“যাক কিছু তো একটা করেছিস এই জীবনে ”
কথা শেষ হতেই বাড়ির বড়দের মুখে হালকা হাসি খেলে যায়। আর কিরিস তো লিসির দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে লিসিকে এখন হাতের কাছে পেলে কি করতো তা সে নিজেও জানো না, লিসি মুখ নিচু করে বসে তার বলে ফেলা কথায় নিজেই নিজেকে গালি দেচ্ছে।
কাবির — “ওরে ভাই, কিরিস ভাই তো ধরা খেয়ে গেছে!”
রিহান — “এই প্রথম দেখি ভাইয়ার সাথে কেউ চুরি করে পালাচ্ছে!”
সবার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
মির্জা বেগম মুখে হাত চেপে হাসি লুকানোর চেষ্টা করেন।
আনারুল ঠোঁট চেপে বলে—“বাহ, পেয়ারা প্রেম শুরু!”
কিরিস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় ওদের দিকে—
কিরিস — “আর কিছু বলবে?”
কাবির আর রিহান তখনই সোজা হয়ে বসে যায়, মুখ নিচু করে—
রিহান চুপচাপ করে বলে —“না ভাইয়া…”
পুরো বারান্দা আবার নিঃশব্দ।
শুধু এক কোণে লিসি মুখ নামিয়ে সামান্য হেসে নেয়,
আর কিরিস সেটা দেখে ফেলার পর নিজের মুখে যেন ক্ষীণ এক হাসি চেপে রাখে।
আনোয়ার চায়ের কাপ হাতে দিয়ে — “ঠিক আছে, আজকের মতো শাস্তি মাফ, কাল থেকে কিন্তু কেউ গাছে উঠবে না।”
লিসি চুপচাপ, ধীরে —“জ্বি, মামা…”
কিরিস পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুধু ফিসফিস করে বলে—
কিরিস — “আর একবারও এমন কাজ করে ধরা পড়লে, শাস্তিটা আমি দেব।”
লিসির হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়—
তার মুখে লজ্জার ছাপ, চোখে মিষ্টি ভয়।
আর দূরে কাবির-রিহান আবার মুচকি হেসে বলে ওঠে—
কাবির — “ওফ্ ভাই, পেয়ারা কাহিনি ইতিহাস হয়ে যাবে!”
আর কোনো কথা কানে না নিয়ে কিরিস সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলেই সবাই কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে ওর পেছনের দিকে।
লিসি নিচু মাথা নিচে করে পিছনে হাত দিয়ে আলতো করে সেই পেয়ারাটা বের করে আনে। সবাই হতবাক—
তারপর কাবির হঠাৎ হো হো করে হেসে ওঠে—
কাবির — “দেখলি তো! কিরিস ভাইয়ের হাত থেকে পেয়ারাও লিসি উদ্ধার করে ফেললো!”
রিহান সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
রিহান — “ওই পেয়ারা এখন ইতিহাসে নাম লেখাবে!”
সবাই হেসে ওঠে—মেয়ের দলও চাপা হাসিতে ফেটে পড়ে।
লিসি একটু হেঁসে চুপচাপ বসে।আরোবি এগিয়ে এসে বলে — “এই যে, চোরবাবু পেয়ারা ফেরত দিলো, এখন খাওয়া শুরু করা হোক!”
সবাই মজা করে হাসে।
তখন মির্জা বেগম একদম শান্ত গলায় বলে ওঠেন—
“আমি না কতবার বলেছি ওকে, এই অভ্যেসগুলো একটু কমাতে!ওই গাছে চড়া, ফুল তুলতে যাওয়া, পেয়ারা পাড়া—সবই ওর সেই গ্রামের অভ্যেস!
বারণ করতে করতে আমারই হাল ছেড়ে গেছে।
ভাবছিলাম শহরে এই সব করতে পারবে না—কোথায় কী!”
এই কথা শুনে আনোয়ার চায়ের কাপ নামিয়ে হেসে বলেন — “আরে, মা, এইসব জিনিসেই তো মেয়েটার প্রাণ! আর লিসির এই অভ্যাস গুলোই তো আমার ভালো লাগে ”
গম্ভীর মুখে গৃহিণীসুলভ কণ্ঠে পাশে বসা প্রিয়া বলে উঠে —“হ্যাঁ ঠিক বললেন, তবে এসব না মানে বেয়াদবি!
এভাবে রাস্তা থেকে পেয়ারা পেড়ে খাওয়া! এটা ঠিক না খাওয়ার ইচ্ছে করলে চেয়ে খাবি না হলে আমাদের বলবি। আমাদের কি কম আছে ? কিন্তু সত্যি বলতে চুরি করা জিনিস একটু মিষ্টি হয় ”
এই কথাতেই আবার হাসির ঢেউ—
কাবির, রিহান, আরোবি সবাই একসাথে বলে ওঠে—
কাবির — “গ্রাম হোক আর শহর, চুরি করা পেয়ারা কিন্তু দারুণ স্বাদের!”
আরোবি পেয়ারাটা কেটে সবাইকে দেয় — “এই নিন সবাই খান, চুরি করা মিষ্টির স্বাদে পেয়ারা। ”
সবাই হাসতে হাসতে খেতে শুরু করে।
মির্জা বেগমও শেষে মুখ লুকিয়ে মৃদু হাসেন—
আর আনারুল মজা করে বলেন,
—“পরের বার পেয়ারা খেতে মন চাইলে সরাসরি বলবে,
আমাদের বাগানের গাছগুলো তোমাদের জন্যই।”
লিসি মাথা নিচু করে হাসে, ঠোঁটের কোণে ছোট্ট লজ্জার ছোঁয়া,
আর আশেপাশের সবাইর মুখে শুধু হাসি।
নিচে সবাই হাসি-ঠাট্টা করছে, পেয়ারা কাটছে, গল্প চলছে।
কিন্তু ওপরতলা পুরো নিস্তব্ধ…
সিঁড়ির দিক থেকে আসছে হালকা হলুদ আলো।
কিরিস নিজের রুমের দরজা আধখোলা রেখে ভেতরে বসে আছে।
শার্টের হাতা গুটানো, হাতের কাটা অংশে লালচে দাগ—
মাটিতে ছোট্ট রক্তের এক ফোঁটা পড়েছে।
সে খুব শান্তভাবে বসে আছে, কিন্তু মুখে সেই গোপন ব্যথা চোখ দুটো জানালার দিকে, যেন চিন্তায় ডুবে আছে।
নীচের হাসির শব্দ উপরে আসলেও সে নির্বিকার হয়ে থাকে।
সবাই বসে আছে একসাথে আর মেয়েরা নিচে মজা করছে, কিন্তু লিসির হঠাৎ মনটা কেমন দোলা দেয়।
তার চোখে ভেসে ওঠে সেই মুহূর্ত—
যখন গাছের নিচে পড়ে যাচ্ছিল সে,আর কিরিস হাত দিয়ে মাথা বাঁচাতে গিয়েনিজের হাতটাকেই কেটে ফেলেছিল।একটা ভয়ের মতো কষ্ট বুকের ওপর চেপে বসে। সেই দৃশ্য টা মনে পরতেই যেন নিজেকে বড্ড অপরাধী বোধ করছে লিসি, সবার মাঝে থেকেও কেন জানি তার মনটা সবার মাঝে নেই। লিসি আর বসে থাকতে পারে না সবার মাঝখান থেকে সে নিঃশব্দে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে থাকে ওকে উপরে যেতে দেখে জারা বলে —“ কি করতে যাস উপরে? ”
লিসি—“একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি আবার একটু পরে ”
লিসি সোজা গিয়ে দাড়ায় কিরিসের দরজার সামনে।
দরজা আধখোলা, ভেতরে দেখা যায় কিরিস এক কোণায় বসে— কেটে যাওয়া হাত টা টেবিলের উপর একপাশে রেখে দিয়েছে।
লিসি কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে আলতো করে দরজায় নক করে।
কিরিস চোখ না ঘুরিয়ে সোজাসাপটা বলে —
“ভেতরে এসো।”
লিসি ধীরে ভেতরে ঢোকে।
কিরিস মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে—
তার চোখে বিস্ময় আর সাথে একটু উষ্ণতা।
লিসি মৃদু, ভাঙা কণ্ঠে বলে
—“আপনার হাত… কেটে গেছে।”
কিরিস যেন বিষয়টাকে হালকা করতে চায়
— “কিছু হয়নি।”
কিন্তু লিসি কাছে গিয়ে কিরিসের হাত নিজের হাতে তুলে নেয়।
মেয়ে হিসেবে তার স্পর্শ নরম, আবার ভয়ভরা।
লিসির চোখে মায়া জমে যায় —
লিসি ফিসফিস করে —
“কিছু হয়নি মানে?
আপনি আমাকে বাঁচাতে গিয়েই… এইটা হলো।”
কিরিস প্রথমে কিছু বলে না—
তার চোখ শুধু লিসির মুখে স্থির হয়ে থাকে।
এত কাছে লিসিকে দেখলে তার ভেতরটা নরম হয়ে যায়।
লিসি নিজের ওড়নার কোণা পাশে থাকা পানির গ্লাসে হালকা ভিজিয়ে আলতো করে কিরিসের হাতে চেপে ধরে।
রক্তটা মুছতে গিয়ে তার হাত কাঁপে।
লিসি —“ব্যথা লাগছে?”
কিরিস ধীরে মাথা নাড়ে।
কিরিস —“না… এখন না।”
লিসি মাথা তোলে—দুজনের চোখে চোখ পড়ে।
হাওয়া থেমে যায়।এক অচেনা উষ্ণতা সারা রুমে ছড়িয়ে পড়ে। লিসি এমন মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে
কিরিস তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে দেয়—
কিরিস — “মন খারাপ কেন, কি হয়েছে?”
লিসি — “আমার জন্য আপনার হাতটা কেটে গেলো। কি দরকার ছিল আমার মাথার নিচে হাত দেওয়ার?”
কিরিস — “যদি তোমার মাথায় ব্যথা লাগতো... তাহলে তুমি যেটা মাথায় অনুভব করতে, আমি সেটা রুহে অনুভব করতাম। আর যদি রুহে ব্যথা লাগে, তাহলে বলো, আমি কিভাবে বাঁচি?”
কিরিসের কণ্ঠে এমন এক শান্ত গভীরতা, এমন এক মায়া—যেন প্রতিটি শব্দে ওর সমস্ত সত্তা গলে আছে।
লিসি নির্বাক হয়ে যায়। কেউ এমন করে কথা বলে? প্রতিটি শব্দ যেন তাকে কিরিসের আরও কাছে টেনে নিচ্ছে, অজান্তেই।
লিসি — “হয়েছে, এখন আর এইসব বলতে হবে না। হাতে ব্যথার জায়গায় ব্যান্ডেজ লাগিয়ে নিবেন, না হলে আরও ব্যথা বাড়বে।”
কিরিস কিছু বলে না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে, যেন নিঃশব্দে হাজার কথা বলে ফেলছে।
লিসি ধীরে ধীরে উঠে যেতে থাকে।
পেছন থেকে কিরিস মুচকি হেসে বলে —
“ভালোই তো দেখছি, খেয়াল রাখছো। এতোটুকু কেটে গিয়েছেতেই এমন ব্যস্ততা! আর কিভাবে বুঝলে আমার হাতে লেগেছে?”
লিসি থেমে যায়, একবার ঘুরে তাকায়। চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি — শান্ত অথচ ভেতরে ঝড়।
লিসি — “ওই যে আপনি বললেন, আমার ব্যথা লাগলে আপনার রুহে লাগে...
তেমন, আপনার ব্যথা লাগলে আমারও রুহে লাগে।
আপনার ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতা আমার জন্ম থেকেই আছে।
কারণ—প্রাণপ্রিয়, প্রিয়তম... জন্ম যেন আমার তোমারই জন্য। তাই ব্যথাটাও আমারই।”
কথাগুলো বলার পর লিসি নিজেই থমকে যায়।
এই কথা সে কীভাবে বলল, নিজেই বুঝতে পারে না।
মনে হয়, কোথাও গভীর থেকে, হৃদয়ের গহিনে জমে থাকা কোনো অজানা স্মৃতি নিজে থেকেই উচ্চারিত হলো তার মুখে।
কিরিস স্তব্ধ। চোখে কেমন এক অজানা সাগর ভাসে।
লিসির সেই অদ্ভুত কথাগুলো যেন ওর মনের গোপন দরজা খুলে দিলো—পুরনো স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া সময়, অচেনা অনুভূতির ঢেউ।
লিসি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে যায়।চুপচাপ নিচে নেমে যায়।পেছনে শুধু কিরিসের নিঃশ্বাসের ভারী শব্দ—
যেন সেই নিঃশ্বাসেও লিসির নাম মিশে আছে।
রাত তখন ৯’টার পরে।
পুরো বাড়ি ভরে আছে আলো আর হাসির শব্দে —
বড় ডাইনিং টেবিলে সবাই একে একে বসেছে।
আজ রাতে রান্না হয়েছে কিরিসের পছন্দের সব পদ — পোলাও, রোস্ট, কোরমা, দই, পায়েস, আর পাশে কাটা লেবু ও সালাদ।
সবাই খেতে বসলে কিরিস চুপচাপ নিজের চেয়ারে বসে থাকে।
সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, গলায় হালকা রুপালি চেইন — কিন্তু মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
কিরিস কখনোই ভাত হাত দিয়ে খায় না — ছোটবেলা থেকেই না। বরাবরই সুপ্রিয়া তাকে নিজ হাতে করে খাওয়ায়।আজ ও ব্যতিক্রম নয় তার সব পছন্দের খাবার তাই সুপ্রিয়া পরম যত্নে তাকে আজও ভাত খায়িয়ে দেবে।
সুপ্রিয়া — “এই কিরিস, আজ কিন্তু তোর পছন্দের সব রান্না করেছি। রোস্টটা একটু খেয়ে দেখ।”
কিরিস — “হুম, জানি মা।”
আরোবি — “ কি ব্যাপার বড় আম্মু আজকে হঠাৎ সব ভাইয়ার পছন্দের বিশেষ কোন দিন নাকি! ”
কাবির —“আরে ভাইয়াকে খাওয়ানোর জন্য কোন বিশেষ দিন লাগে নাকি! আম্মুদের তো সব সময় ব্যস্ত থাকে ভাইয়াকে কিভাবে খাওয়াবে, একমাত্র বড় ছেলে বলে কথা আর আমরা তো ভেসে ভেসে এসেছি। ”
কাবিরের কথায় খাবার টেবিলে হালকা হাসির রোল পড়ে গেল স্বাভাবিক হতে প্রিয়া মাংসের বাটিটা একপাশে রেখে বলে — “ তোদের আর কি বলব বল, তোরা যা খেতে পছন্দ করিস সবসময় তো তাই রান্না করি। আজকে ভাবলাম একটু কিরিসের পছন্দের কিছুই রান্না করি। আর এমনিতেও তোরাও তো এই সব খাস, নাকি খাস না!”
প্রিয়ায় কথায় সবাই হাসি দেয় তারপর যে যার খাওয়ায় মনোনিবেশ করে। সুপ্রিয়া হেসে ছোট একটা ভাতের মুঠো করে কিরিসের সামনে তুলে দেয়, নিজের হাতে খাওয়াতে শুরু করেন।
সবাই হাসিমুখে দেখছে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না — কারণ সবাই জানে, এই দৃশ্যটা খুব বিরল।
সুপ্রিয়া — “তুই ছোটবেলাতেও এমন ছিলি। কখনো ভাত ছুঁতিস না, কেবল আমি খাওয়াতাম। আজও সেই তুই!”
কিরিস (হালকা হেসে) — “তুমি আছো বলেই হয়তো এখনো সেই ছোট্টটার মতোই আছি।”
কিরিসের কথায় লিসির প্রকার বিশম খায় তারপর নিজেকে সামলে আবার খেতে শুরু করে।
চারপাশে তখন শুধু হাসির শব্দ, কারো গল্পের আওয়াজ, হাসাহাসি।
সবাই খাচ্ছে নিজের মতো, কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না — শান্ত, পরিপাটি পরিবেশ।
লিসি টেবিলের শেষপ্রান্তে বসে আছে, মুখ নিচু করে নিজের ভাত খাচ্ছে।
আজ কোনো চোখাচোখি নেই, কোনো আবেগ নেই — শুধু নরম আলো, খাবারের গন্ধ, আর পারিবারিক এক নিঃশব্দ সন্ধ্যা।
খাওয়া শেষে কিরিস মা’কে বলে —
“আমি উঠি, মা।”
সুপ্রিয়া — “যা, একটু আগে ঘুমিয়ে পড়, অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে।”
কিরিস মাথা নেড়ে চুপচাপ উঠে নিজের ঘরে চলে যায়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই খাওয়া শেষ করে, ঘর গুছিয়ে নেয়।
এক এক করে সব ঘরের আলো নিভে আসে।
বাড়ি ঢেকে যায় নরম অন্ধকারে।
শুধু দূরের কুকুরের ডাক আর বাতাসে দুলে থাকা গাছের পাতা—
এই নিস্তব্ধতার মাঝেও যেন একটা অদ্ভুত শান্তি।
রায় চৌধুরী বাড়ির সবাই ঘুমে,
শুধু চাঁদ জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছে—
যেন সেও আজ এই শান্ত রাতটায় মুগ্ধ হয়ে গেছে।
সকাল আটটা পেরিয়েছে।
সূর্যের আলোয় উঠোন ঝলমল করছে, গাছের পাতায় শিশিরের ফোঁটা এখনো ঝুলে আছে।
বাড়ির ভেতরটা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম পরোটা, ডিমভাজি আর চায়ের গন্ধ।
ঝিরা হাঁটাহাঁটি করছে, কেউ চা পরিবেশন করছে, কেউ নাস্তার প্লেট সাজাচ্ছে।
উপরে থেকে একে একে নামছে সবাই —
রিহান ঘুম ঘুম চোখে হাই তুলতে তুলতে বলে,
“এই সকালে উঠতেই হবে নাকি? এখনো চোখই খুলছে না…”
নিচে বসে থাকা আরোবি হাসতে হাসতে বলে —
“তুই তো ঘুম থেকে উঠেই আবার ঘুমাতে চাস!”
এমন সময় লিসি সুরভী জারা ও একসাথে নামতে থাকে।
লিসি সাদা হালকা কাজ করা সালোয়ারে, চুলটা খোলা রেখেছে — মুখে এখনো ঘুমের ছাপ। নিচে নামতেই আরোবি মজা করে বলে,
আরোবি — “এই যে রাজকন্যা, ঘুম ভাঙল নাকি? সূর্য মামা তো অনেকক্ষণ আগেই উঠেছে!”
লিসি — “তোমরা না একেবারে সকাল সকাল শুরু করে দাও মজা!”
সবার মুখে হালকা হাসি ছড়িয়ে পড়ে।একে একে সবাই এসে ছোপায় বসে তার পর তাদের গরম চা পরিবেশ করা হলে সবাই গরম গরম চা খেতে শুরু করে। এরপর কিরিস নিচে নেমে আসে ধীরে, কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজারে, মুখে তাজা অথচ স্থির ভাব।
সুপ্রিয়া দূর থেকে বলেন —
“এই কিরিস, কফি খেয়ে নে আগে, তারপর যা।”
কিরিস — “হুম, আনো।”
ও একপাশে চুপচাপ বসে কফি খেতে শুরু করে।
তার পাশে লিসি বসে আছে শান্তভাবে, মগের ধোঁয়া চোখে লেগে যাচ্ছে, কিন্তু মুখে একটাও কথা নেই।
ঠিক তখনই আরোবি বলে উঠল —
“শোনো, তোমরা মনে আছে, কেউ বলেছিল না— আবার সবাই মিলে একসাথে হই, আগের মতো?”
সুরভী চায়ের চুমুক দিয়ে বলে —
“হ্যাঁ রে! আমি-ই বলেছিলাম মনে হয়। সত্যি, অনেকদিন হলো একসাথে কোথাও যাওয়া হয়নি।”
প্রিয়া পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওদের এই কথা শুনে দাঁড়িয়ে পরে বলে — “হুম, ঠিকই বলেছো। আগে কত গল্প, হাসি, আড্ডা ছিল তোমাদের মধ্যে। এখন সবাই নিজের মতো ব্যস্ত।”
আরোবি — “তাহলে ঠিক করা যাক, আজ কোনো অজুহাত নয়! আমরা সবাই একসাথে যাই।”
রিহান (উচ্ছ্বসিত) — “হ্যাঁ! একটা পিকনিক দেই চল! আমার বাগানবাড়ি আছে, জায়গাটা দারুণ!”
আরোবি — “চমৎকার! সবাই রাজি তো?”
আরোবির এই কথাটা বলে মির্জা বেগম আনোয়ার এবং আনারুল এদের দিকে তাকালেন ওদের কি এমন ভাবে তাকাতে দেখে মির্জা বেগম হেসে বলে — “রাজি না হয়ে উপায় আছে? যাও, একটু আনন্দ করো সবাই। কতদিন পর এমন ভাব এসেছে!”
আনোয়ার একটু হেসে বলে —
"তাহলে তোমরা সবাই যাও ঘুরে আসো, আমরা কিন্তু বড়রা যাব না। আর হ্যাঁ, ওদের সব কয়টাকেও ডেকে নাও।"
আনারুল সঙ্গে সঙ্গে যোগ দেয় —
"ওদের আজকে আসতে বল, সব গুছিয়ে নিয়ে কাল তোরা সবাই মিলে পিকনিকের প্রস্তুতি নে। যা যা লাগে, সব ঠিক করে রাখবি, আর তার পরের দিন রওনা দিস।"
আনারুলের কথা শুনে সুরভী হেসে বলে —
"আরে বাবা, তুমি তো দেখছি সব প্ল্যান বানিয়ে ফেললে! তাহলে আমরা তাই করি।"
এই সময় কাবির খুশিতে চোখ চকচকিয়ে কিরিসের দিকে তাকিয়ে বলে —
"ভাইয়া, তুই যাবি না?"
কিরিস ফোনে চোখ রাখতেই গম্ভীর স্বরে উত্তর দেয় —
"না, আমি যাব না। আমার কাজ আছে। এসব ফালতু কাজ আমার হয় না।"
কিরিসের মুখে এমন স্বাভাবিক ঠান্ডা উত্তর শুনে সবাই একে অপরের দিকে তাকায়।
মুহূর্তের মধ্যে হালকা নিস্তব্ধতা।
তারপরই সুপ্রিয়া এগিয়ে এসে বলে —
"কাজ কিসের কাজ! তুই ওদের সঙ্গে যাবি। অফিসের কাজ তো তুই আর তোর বাবা মিলে সামলাই সবসময়। একটু ঘুরে আয়, যাই হোক!"
কিরিস বিরক্ত মুখে —
"মা, আমার এইসব ভালো লাগে না।"
সুপ্রিয়া —
"ভালো লাগুক বা না লাগুক, লাগাতে হবে। আর তুই যাবি, এটাই ফাইনাল। ওরা যেদিন পিকনিক করবে, তুই সেদিন যাবি।"
কিরিস মাথা নেড়ে নিঃশ্বাস ফেলে —
"মা, তোমাকে নিয়ে আমি আর পারি না।"
রিহান হেসে বলে —
"তাহলে আমি আন্টিকে ফোন দিয়ে বলে দিচ্ছি, বাড়িটা আগে থেকে পরিষ্কার করে রাখতে!"
জারা দুষ্টু চোখে বলে —
"আমি কি বাইক নিয়ে যাব?"
কাবির —
"ও ভালো কথা! জারা, তুই ইশানকে হাসপাতাল থেকে ড্রপ করে নিয়ে আয়। বেচারার এখন রোগীর চাপ বেশি। আমি ওকে আগেই বলে দেব, যেন ছুটি নিতে পারে।"
জারা হাসতে হাসতে —
"ওই দিলে তো আমার ব্রেকই লাগবে না!"
তার কথায় সবাই একসঙ্গে হেসে ওঠে।
এই হাসির ভেতরেই কোণের চেয়ারে বসে থাকা লিসির দিকে নজর পড়ে আরোবির।
আরোবি হালকা করে লিসির কাঁধে হাত রেখে বলে —
"কি রে, তুইও নাকি কিরিস ভাইয়ার মতো যাবি না?"
লিসি মিষ্টি মুখে তাকিয়ে বলে —
"কেন যাবো না? আমি যাবো! আর আমি আবার কবে থেকে ভাইয়ার মতো রাক্ষ..."
বলেই মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরে লজ্জায়।
আরোবি নিজের হাসি কষ্টে আটকে রেখেছে।
কিরিসও বুঝে ফেলেছে, লিসি আসলে ঠিক কী বলতে চেয়েছিলো।
সুরভী আবার সবাইকে গুছিয়ে বলে —
"আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে আমরা কি কি করবো সব লিস্ট করি। রিহান, তুই সবাইকে ফোন দিয়ে জানিয়ে দে, আর হ্যাঁ, আমার ভাবিকেও বল—বাড়ি চলে আসতে!"
রিহান হেসে বলে —
"অবশ্যই! তোর ভাবি না আসলে আমার কি হবে! আমি সবাইকে বলে দেবো।"
আরোবি মজা করে —
"তাহলে তোরা সব গুছিয়ে নে অফিসের, না হলে আবার জামেলা হবে।"
কাবির —
"হুম, নিবো চল। আগে খেয়ে বের হ, না হলে দেরি হয়ে যাবে।"
সবাই মিলে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়।
সকালের হালকা নাস্তার টেবিলে হাসি, কথার ঝলকানি—পুরো ঘরটা যেন আলোয় ভরে ওঠে।
নাস্তা চলতে চলতেই কিরিস জুসের গ্লাসে হালকা চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় বলে —
"বাবা, তোমার ফ্রেন্ড রাছি’র মেয়ে নিশি আজ দেশে ফিরছে। নিশ্চয়ই তোমাকে বলেছে—ও আমাদের বাসায় উঠবে। কাউকে পাঠিয়ে দিও, যেন এয়ারপোর্ট থেকে ওকে ড্রপ করে আনে।"
আনোয়ার একটু মাথা নেড়ে বলে —
"হুম, হ্যাঁ। সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে। ও বলছিল, এখানে তোদের কেউ থাকে না, তাই বাংলাদেশে এসে ক’দিন আমাদের বাড়িতে থাকবে। আমি বলেছি—কোনো সমস্যা নেই, এত বড় বাসা, একজন মানুষ উঠলে কি এমন হবে! আমি কাউকে পাঠিয়ে দেবো।"

0 Comments