তোমাকে চাই
পর্ব :37
ক্যামেরার ক্লিকের শব্দে মুহূর্তটা জমে ওঠে।
ক্লিক!
ছবিটায় দেখা যায় —
লিসি হালকা লজ্জায় চোখ নামিয়ে রেখেছে, কিরিসের ঠোঁটে আত্মবিশ্বাসী মুচকি হাসি, তার হাত লিসির কোমরে হালকা স্পর্শে বাঁধা।
দূর থেকে কেউ দেখলে বুঝতেই পারবে না, তারা প্রেমে আছে—তবুও ছবির ভেতর প্রেম যেন লুকানো আগুনের মতো জ্বলছে।
আরোবি —“এই ছবিটা ইতিহাস হবে ভাইয়া, একদিন সবাই বলবে—‘এই সেই কাপল!’”
ইয়াবি— “এই ইতিহাসে আমি নাম চাই না, আমি নির্দোষ।”
কিরিস হালকা মুচকি হাসে, তারপর বলে—
“থাক, আর তুলতে হবে না। ফোন দে। আর এখান থেকে যা... আমার কিছু কথা আছে লিসির সাথে।”
ইয়াবি হেসে বলে,
ইয়াবি— “এই আরোবি, চল। ওদের বেশি বিরক্ত করলে আজ রাতেই আমাদের খবর হবে!”
আরোবি মুখ বাঁকিয়ে — “হুম... ঠিক আছে। এই লিসি, তুই কিন্তু দ্রুত আসিস, নাহলে সবাই খুঁজতে শুরু করবে।”
ওরা চলে যায়।
লিসি সুযোগ পেয়ে একটু সরে যেতে চায়, কিন্তু কিরিস হঠাৎ আবার টেনে নেয়।
সে লিসিকে একদম কাছে নিয়ে আসে, মুখের সঙ্গে মুখ প্রায় ছুঁইছুঁই।
কিরিস (নিচু গলায়)
—“সামনে তাকাও।”
সে ফোনটা সামনে ধরে একটা সেলফি তোলে।
লিসির গাল লজ্জায় জ্বলছে, চোখ নিচু, ঠোঁট হালকা কাঁপছে।
ফোনটা নামিয়ে কিরিস হঠাৎ বলে—
কিরিস— “লিসি, তোর ঠোঁটে কি যেন লেগে আছে...”
সে হাত বাড়াতে যায়—
কিন্তু লিসি তৎক্ষণাৎ নিজের হাত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে, চোখ বড় বড় করে তাকায় কিরিসের দিকে।
এক মুহূর্তের নীরবতা, তারপর—
লিসি কিছু না বলে হঠাৎ দৌড়ে পালিয়ে যায়।
তার শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ে ওঠে, গন্ধে মিশে যায় আতর আর রাতের শীতল হাওয়া।
কিরিস হাসিমুখে তাকিয়ে বলে—
কিরিস —“আস্তে... পরে যাবে কিন্তু।”
গভীর রাতে রিসোর্টে এখন নিস্তব্ধতা।
পার্টি শেষ—সবাই খাওয়া-দাওয়া করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
দূর থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া কিছুই শোনা যায় না।
আগামীকাল সকালে কিরিস আর তার পরিবার ফিরে যাবে, অনু আর অন্যরাও নিজ নিজ বাড়ি।
কিন্তু এই মুহূর্তে কিরিসের ঘরে এখনো মৃদু আলো জ্বলছে।
ঘড়িতে রাত ১টা ১৫ মিনিট।
কিরিস একা বসে আছে ল্যাপটপের সামনে।
মার্ক পাঠানো নুহানের ফাইলগুলো একে একে খুলে দেখছে।তার চোখে ঠান্ডা মনোযোগ, ঠোঁটে সিগারেটের দাগ, পাশে টেবিলে গলিত ধোঁয়ার ছায়া। হঠাৎ কিরিস ফোনটা বের করে, লিসি সঙ্গে তোলা ছবিটা দেখে হাত দিয়ে স্ক্রিনে ছবিটা বড় করে ।
চোখের কোণে হালকা নরমতা, ঠোঁটে একটুখানি হাসি।
সে কিছু না বলে চুপচাপ ছবিটা সেভ করে।
কয়েক সেকেন্ড পর, ফোনের স্ক্রিনে দেখা যায় —
ওই ছবিটাই এখন কিরিসের হোমস্ক্রিন।
কিরিস নিজের সঙ্গে বলে—“এবার এটা কেউ মুছতে পারবে না... এমনকি তুমিও না, অলকানন্দা।”
সকালের নরম রোদে রিসোর্টটা ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে। চারপাশে ব্যস্ততা — কেউ ব্যাগ গুছাচ্ছে, কেউ গাড়ির ট্রাঙ্কে লাগেজ তুলছে। পাখিদের ডাক, হালকা কফির গন্ধ আর সকালের ঠাণ্ডা বাতাসে এক শান্ত অথচ সক্রিয় পরিবেশ।
কিরিস তখন এক কাপ কফি হাতে রিসোর্টের বাগানে দাঁড়িয়ে। সাদা কাপে ধোঁয়া উঠছে, আর তার চোখ দূরের পাহাড়ের দিকে। একে একে সবাই নিচে নেমে আসছে, প্রস্তুত যাত্রার জন্য।
অভিরা সব গুছিয়ে নিয়ে চলে এসেছে। ঠিক তখনই ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামে লিসি—
চোখে এখনো ঘুমের ছোঁয়া, পাশে আরোবি। দু’জনই নিচে দাঁড়িয়ে সবার কথাবার্তা শুনছে। কিরিস ও এবার উপরে চলে যায় গুছিয়ে নিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কিরিসও ঘর থেকে বের হয়। আজ তার পরনে কফি রঙের শার্ট— উপরের দুটি বোতাম খোলা, বুকের উপর স্পষ্ট abs দেখা যাচ্ছে। চারপাশের কয়েকজন মেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক ঝলক তাকিয়ে নেয়।
কিরিস নির্বিকারভাবে বাবার দিকে এগিয়ে যায়।
কিরিস— “বাবা, একটা ইমারজেন্সি কাজ পড়েছে। আমি এখান থেকে সরাসরি সেখানে যাচ্ছি। তোমরা সবাই বাসায় চলে যাও। হয়তো আজ রাতে ফিরব।”
আনোয়ার — “কোনো বিশেষ কাজ বুঝি?”
কিরিস—“হুম।”
তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলে,
কিরিস— “খালামনি, খালু— তোমরা ভালো থেকো। আমরা চললাম।”
সবাই যখন বিদায় নিচ্ছে, ঠিক তখনই মার্ক গাড়ি থেকে নেমে আসে। তার হাতে ভাঁজ করা একটা কোট। নিশ্চুপে এগিয়ে এসে সেটা কিরিসের দিকে বাড়িয়ে দেয়।
কিরিস কোটটা হাতে নিয়ে পড়ে নেয়— যেন ওর শরীরের জন্যই বানানো। সূর্যের আলোয় চকচক করছে কালো ঘড়ির রূপালি ফ্রেম।
গাড়িতে ওঠার আগমুহূর্তে চোখটা হঠাৎ ঘুরে যায় লিসির দিকে।
দুই চোখে চোখ পড়ে যায়— মুহূর্তটা স্থির হয়ে থাকে এক সেকেন্ডের জন্য।
লিসি তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নেয়।
কিরিস এবার আরোবির দিকে তাকায়।
আরোবি হাসতে হাসতে বলে—
আরোবি — “এই, এটা ভাইয়ার কলম! লিসি, এটা দিয়ে আয় তো।”
লিসি— “কি? আমি কেন…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আরোবি হালকা ধাক্কা দেয়। লিসি টলে গিয়ে কোনো মতে সামলে কিরিসের সামনে এসে পড়ে।
কিরিস সঙ্গে সঙ্গে তার কাঁধ ধরে ফেলে— দৃঢ়ভাবে।
কিরিস নিম্নস্বরে)— “তুমি রাতের পরে পালিয়ে গেলে কেন?”
লিসি চমকে, নিচু গলায় —“আমি... ভয় পেয়েছিলাম।”
কিরিস চোখে চোখ রেখে—“ভয়? আমার কাছ থেকে?”
লিসি চোখ নামিয়ে — “আপনি হঠাৎ এত কাছে চলে এসেছিলেন... বুঝতে পারিনি কি করব।”
কিরিস এক ধাপ কাছে এসে এমন স্বরে বলে, যা শুধু ওরা দু’জনই শুনতে পায়—
“তুমি পালিয়ে গেছো, কিন্তু আমি তো তোমার দৌড়ের দিকটাই মুখস্থ করে ফেলেছি।”
লিসি হঠাৎ তাকিয়ে দেখে— তার চোখে কিছু আছে, ভালোবাসা না ভয়, বোঝা মুশকিল।
কিরিস হালকা হাসে, ঠোঁটের কোণে তীব্র এক শান্ত আগুন—
“যাবার সময় অন্তত বলতে পারতে... আমি চলে যাচ্ছি।”
লিসি চোখ নামিয়ে “চলে যাচ্ছি।”
কিরিস এক পা সামনে এগিয়ে এসে বলে—
“যেখানেই যাও না কেন, তোমার শেষ ঠিকানা হবে এই কিরিসের হৃদয়।”
লিসি হালকা চমকে উঠে লজ্জায় কিছু বলে না।
কিরিস কলমটা হাতে নিয়ে তার কানের পাশে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে—
“রাতে অপেক্ষা করো... আমি কিন্তু তোমার জন্য আসবো।”
লিসি মৃদু কণ্ঠে— “হুম…”
কিরিস গাড়িতে উঠে চলে যায়।
ধুলোর হালকা আস্তরণে আকাশটা ঝাপসা লাগে।
লিসি ফিরে আসে সবার মাঝে।
অভি তখন হালকা অভিমান নিয়ে বলে—
অভি— “তাহলে... আবার কবে দেখা হবে?”
লিসি হাসতে হাসতে —“হয়তো খুব শিগগিরই। মন খারাপ করিস না, চকলেট কিনে দেবো ঠিক আছে?”
অভি মুচকি হেসে —“হুম, দিতে হবে কিন্তু। আর মনে রাখো— দেখা যেন সত্যি খুব শিগগিরই হয়।”
সবাই একে একে বিদায় নিয়ে গাড়িতে ওঠে।
রিসোর্টের দরজা পেরিয়ে গাড়িগুলো দূর সড়কে মিলিয়ে যায়।
পেছনে রয়ে যায় কেবল সেই সকালের আলো... আর লিসির চোখে ভাসতে থাকা কিরিসের গভীর দৃষ্টি।কিরিসের গাড়ি কোথাও থামে না সোজা তার নিজস্ব বাড়ির দিকে যায়। রিসোর্ট থেকে ফিরে সরাসরি সে যায় তার প্রাইভেট ভিলায়—
যেখানে সাধারণ কেউ প্রবেশের অনুমতি পায় না।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে কয়েকজন গার্ড, আর ভেতরে একদম নীরব পরিবেশ।
কিরিস সোফায় বসে আছে, হাতে এক কাপ কালো কফি।
চোখে সেই চেনা ঠাণ্ডা দৃষ্টি।
ঠিক তখন দরজায় টোকা—
মার্ক ঢুকে আসে হাতে একটা মোটা ফাইল নিয়ে।
মার্ক— “Sir, নুহানের ব্যাপারে রিপোর্ট রেডি।”
কিরিস ফাইলের দিকে না তাকিয়ে শুধু বলে—
কিরিস — “বলো।”
মার্ক ফাইল খুলে পড়ে শোনাতে শুরু করে—
মার্ক—
“নুহান চট্টগ্রামের রামপুরা ইউনিয়ন— ওই গ্রামের চেয়ারম্যান সাঈদুল হকের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই বদমেজাজি, আর মেয়েদের পেছনে ঘোরাঘুরি ছিল অভ্যাস।
পাঁচ বছর আগে ইভটিজিং-এর এক ঘটনায় মেয়েটার পরিবার মামলা করে— তখন জেল খাটে তিন বছর।
সেই তিন বছরেই ভেতরে কিছু লোকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়।
বাইরে বেরিয়ে এসে সরাসরি যোগ দেয় আন্ডারওয়ার্ল্ডে।
বাবা চেয়ারম্যান হওয়ায়, পুলিশের ভেতরে কিছু সংযোগ পেয়ে যায়।এখন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার আর আশেপাশের এলাকায় drug route, extortion— এসব নিয়ন্ত্রণে রাখে।
নিজেকে বলে ‘Nuhan Vision’, কারণ তার একটা নিজের লোকাল গ্যাং আছে যেটাকে তারা বলে The Vision Group।”
কিরিসের মুখে কোনো ভাব নেই, শুধু চোখ স্থির।
কিরিস (নিম্নস্বরে)— “বয়স কত?”
মার্ক — “পঁচিশ। কিন্তু মাথাটা খুব হাইপার, sir। মেয়েদের নিয়ে আগ্রহটা আজও যায়নি। কয়েক মাস আগে নাকি গ্রামের এক মেয়ের পেছনে ঘুরছিল— নামটা বাদ দিয়েছে সবাই, ভয় পেয়ে।”
কিরিস —“আর এখন?”
মার্ক— “এখন ঢাকায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুনেছি, কারও সঙ্গে দেখা করতে আসবে শিগগির।”
কিরিসের আঙুল ধীরে ধীরে কফির কাপে টোকা দেয়—
চোখে ঠাণ্ডা আগুন।
কিরিস— “আমি জানি সে কাদের সঙ্গে দেখা করতে চায়।”
মার্ক কিছু বলতে যায়, কিরিস হাত তুলে থামিয়ে দেয়।
কিরিস —“তুমি তাকে নজরে রাখো। ওর এক পা ঢাকা নামলে খবর চাই।
আর যারা তার পাশে আছে— তাদের নামও আমার টেবিলে আনো।”
মার্ক —“Yes, boss.”
কিরিস দাঁড়িয়ে জানালার দিকে যায়।
বাইরে সূর্যের আলো, কিন্তু তার চোখে সেই আলো ঢোকে না।
কিরিস (নিজের মনে ধীরে) — “একটা সাপ যদি একবার ফোঁস করে, ওর মাথা কেটে ফেলাই শ্রেয়।”
মার্ক শান্তভাবে মাথা নেড়ে বেরিয়ে যায়।
এক ঘণ্টা পরেই কিরিস নিজের গাড়িতে উঠে চলে যায় শহরের দিকে।
পিছনের সিটে ফাইল আর ল্যাপটপ, সামনে ড্রাইভার নীরব।
ফোন বেজে ওঠে—
Mark —“Boss, underworld side-এর আজকের মিটিং আপনাকে ছাড়াই করা হচ্ছিল, আমি বাতিল করে দিয়েছি।”
কিরিস (শান্ত গলায়)—“ভালো করেছো। বাকি কাজগুলো আমি দুপুরেই অফিসে গিয়ে শেষ করব।”
গাড়ি গতি নেয়।
সামনে ভেসে ওঠে RayChowdhury Group-এর বিল্ডিং—কাঁচের দেওয়ালে সূর্যের প্রতিফলন, আর লবিতে দাঁড়িয়ে থাকা ডজনখানেক গার্ড।
দুপুরের আগেই সে চেম্বারে বসে যায়।
টেবিলে কাগজপত্র সাজানো, সেক্রেটারিরা ভেতরে-বাইরে ঘুরছে।
একটা মিটিং শেষ, আরেকটা শুরু।
কিরিসের কণ্ঠে শীতল কঠোরতা—
কিরিস — “এই প্রজেক্টের অনুমোদন আমি নিজেই দিচ্ছি।আর ফাইনাল পেমেন্টটা কাল সকালেই ক্লিয়ার করো। আমি বিলম্ব চাই না।”
সবাই চুপ।
শুধু “Yes, sir” ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় ঘরের ভেতর।
সাইন করে শেষ ফাইলটা বন্ধ করতেই ঘড়িতে বাজে দুপুর দুটো।
সে চেয়ার হেলান দিয়ে বসে, চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নেয়। এরপর কিরিস বাড়ি ফিরে রাত করে সবাই হলরুমে বসে আছে। কিরিসকে আসতে দেখে আনোয়ার —“এই তো এলি, আজ বেশ দেরি করলি।”
কিরিস (শান্ত গলায়)— “কিছু জরুরি কাজ ছিল অফিসে। এখন সব ক্লিয়ার।”
সুপ্রিয়া— “তুই খেয়েছিস কিছু?”
কিরিস— “হ্যাঁ, একটু অফিসেই।”
সুপ্রিয়া—“তাহলে ফ্রেশ হয়ে আয় আমি ডিনার রেডি করছি সবাই খেতে আসো তুই যাব বাবা ফ্রেশ হয়ে আয়।”
কিরিস উপরে চলে যায় আর সবাই ও রাতের খাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। রায় চৌধুরী বাড়িটা দিনের কোলাহল শেষে একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। ডাইনিং টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেছে, হাসাহাসি, গল্প, খাবারের গন্ধে ভরে আছে পুরো ঘর।
কিরিস আজ পুরোপুরি স্বাভাবিক। শার্টের হাতা গুটিয়ে বসেছে, প্লেটে ভাত তুলে ধীরে ধীরে খাচ্ছে। মুখে কোনো রাগ, ক্লান্তি বা গম্ভীর ভাব নেই — যেন আজকের সে এক সাধারণ মানুষ, কোনো দুনিয়ার ভয় নেই তার মধ্যে।
লিসিও ওখানেই বসে, খাওয়ার সময় কিরিসের দিকে বিশেষ নজর দেয়নি। কিন্তু তার মন অজান্তে জানে — এই মানুষটা যখনই আশেপাশে থাকে, চারপাশের বাতাস বদলে যায়।
খাওয়া শেষ হলে সবাই ধীরে ধীরে রুমে চলে যায়। আনোয়ার সাহেব বলেন,
— “চলো, আজ সবাই অনেক ক্লান্ত। সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।”
সবাই শুভরাত্রি জানিয়ে চলে যায়।
বাড়িটা কিছুক্ষণের মধ্যেই নীরব হয়ে পড়ে।
রাত তখন প্রায় এগারোটা। হালকা বাতাস বইছে। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে পুরো উঠোনে।
লিসি একা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। রাতের জামা পরে আছে — হালকা সাদা রঙের, ঢেউ খেলানো কাপড়। চুলগুলো খোলা, হাওয়ায় উড়ছে ধীরে ধীরে।
হঠাৎ নিচের দিক থেকে কিরিসের পায়ের শব্দ। ধীরে ধীরে সে উপরে উঠে আসে, হাতে মোবাইল, কিন্তু চোখে সেই স্থির স্বাভাবিক ভাবটা।
বেলকনির দরজায় দাঁড়িয়ে কিরিস বলে —
— “ঘুমাওনি এখনো?”
লিসি একটু চমকে তাকায়, তারপর শান্তভাবে বলে,
— “ঘুম আসছে না। হাওয়া ভালো লাগছিল।”
কিরিস পাশে এসে দাঁড়ায়, দুজনেই চুপ। কিছুক্ষণ শুধু বাতাসের শব্দ।
কিরিস ধীরে বলে,
— “আজ সারাদিনে একবারও তো কথা হয়নি আমাদের।”
লিসি মৃদু হেসে, চোখ নামিয়ে —
— “আপনি তো ব্যস্ত ছিলেন।”
কিরিস —“ব্যস্ত থাকি, কিন্তু তবু মনে হয় কেউ আছে যাকে না দেখলে দিনের হিসেব অসম্পূর্ণ লাগে।”
লিসি চুপ করে থাকে। বাতাসে তার চুল উড়ে এসে কিরিসের গালে লাগে। কিরিস এক মুহূর্তে হাত বাড়িয়ে চুলটা আলতো সরিয়ে দেয়।
লিসির নিঃশ্বাস কেঁপে ওঠে, কিন্তু সে কিছু বলে না।
কিরিস তাকিয়ে থাকে চাঁদের দিকে, নিচু স্বরে বলে —
— “সবাই ভাবে আমি নির্দয়, কিন্তু সত্যি বলতে... যাকে ভালোবাসি, তার সামনে আমি একেবারে অসহায়।”
লিসি মৃদু স্বরে —
— “ভালোবাসা কি সবসময় এমন হয়?”
কিরিস তাকায় তার দিকে, চোখে গভীরতা —
— “হয়তো না... কিন্তু আমারটা এমনই।”
নিঃশব্দ মুহূর্তটা ভরে যায় বাতাসের গন্ধে। দূরে একটা কুকুরের ডাক, তারপর আবার নীরবতা।
লিসি ধীরে পা বাড়ায় রুমের দিকে।
লিসি — “শুভরাত্রি।”
কিরিস একটুখানি হাসে —
— “ঘুমিও না আজ খুব গভীরভাবে... হয়তো দেখা হবে স্বপ্নে।”
লিসি কিছু বলে না, শুধু হালকা হাসে, দরজা খুলে ভেতরে চলে যায়।
চাঁদের আলোয় কিরিসের মুখে তখন এক অদ্ভুত শান্তি, তবু চোখের গভীরে আগুনের মতো কিছু জ্বলছে — এক এমন ভালোবাসা, যা কেউ থামাতে পারবে না।
সকাল ৮:০০
ভোরের আলো ধীরে ধীরে বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। পাখির ডাক, হালকা বাতাসে ফুলের গন্ধ— সব মিলিয়ে একদম শান্ত, নিরিবিলি এক সকাল।
ডাইনিং রুমে তখন সবার উপস্থিতি। টেবিলে সাজানো চা, বিস্কুট, পাউরুটি, ডিম, আর লুসি।
আনোয়ার সাহেব পত্রিকা হাতে বসে আছেন, পাশে সুপ্রিয়া খালামনি।
কিরিসও এসেছে সময়মতো— ধূসর রঙের শার্ট, হাতায় ঘড়ি, চুল নিখুঁতভাবে আঁচড়ানো। মুখে আগের রাতের কোনো ছায়া নেই, একেবারে স্বাভাবিক, স্থির, রাজকীয় এক উপস্থিতি।
আরেক পাশে বসে আছে লিসি, এখনো রাতের শান্ত ভাবটা তার মুখে, চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
আরোবি, প্রিয়া আর অন্য মেয়েরা টেবিলে গল্প করছে— কে কখন উঠেছে, কে কত চা খেয়েছে, এসব নিয়ে হালকা হাসাহাসি।
আরোবি বলে,
— “আজকে রোদটা বেশ নরম, নাস্তা শেষে গার্ডেনে বসবো, কি বলো?”
জারা হেসে উত্তর দেয়,
— “চা হাতে ফুল দেখলে সকালটা আরো সুন্দর হবে।”
লিসিও মাথা নাড়ে, মৃদু হাসে।
খাওয়া শেষে সবাই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
আনোয়ার সাহেব কিরিসের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— “আজ অফিসে একটু ব্যস্ততা থাকবে, তুমি হয়তো দেরি করবে ফিরে আসতে?”
কিরিস শান্ত স্বরে বলে,
— “হ্যাঁ, কিছু ফাইল সাইন করতে হবে। বিকেলের আগে ফিরতে পারবো না।”
আনোয়ার সাহেব মাথা নেড়ে বলেন,
— “ঠিক আছে, সাবধানে যেও।”
কিরিস একে একে সবাইকে ‘বাই’ বলে বাইরে যায়।
বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, মার্ক ইতিমধ্যেই সেখানে অপেক্ষায়। রিহান কাবির ও ওর সঙ্গে যাবে বলে দাঁড়িয়ে আছে।দরজার কাছে এসে কিরিস একবার ঘুরে তাকায় এরপর ওরা তিনজনই গাড়িতে উঠে রওনা দে অফিসের দিকে— ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে মেয়েদের হাসির শব্দ, সকালের নির্ভার সময়টা যেন পুরো বাড়িকে ঘিরে রেখেছে।
মেয়েরা সবাই গার্ডেনে।
লিসি হাতে কাপে চা নিয়ে বসে আছে, সামনে গাঁদা আর গোলাপের সারি।
আরোবি বলছে,
— “এই গাছগুলোতে নতুন মাটি দিতে হবে, নাহলে ফুল শুকিয়ে যাবে।”
লিসি হেসে বলে,
— “তুমি বললেই হয়ে যাবে, আমি বিকেলে এনে দেবো মাটি।”
সুরভী বইয়ের পাতা উল্টে চোখ লিসির দিকে করে যোগ দেয়,
— “চলো, কাল সকালেও এখানে বসবো, দারুণ লাগে এমন সময়।”
মেয়েরা ওইদিকে গল্পে ব্যস্ত। আর ওই দিকে আনোয়ার আর আনারুল চুপচাপ বসে আছে। আনোয়ার হাতের আঙ্গুলে খোঁচা দিয়ে কয়েকটা সবজি গাছ দেখছে; শেষ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো—
“মা, শীত তো পরতে যাচ্ছে। তুমি গ্রামের দিকে গেলে কয়েকটা—সবজির গাছ এনে দেবে তো। এদিকের জিনিস ভালো হবে না। কোথায় গ্রামের শাকসবজি আর কোথায় শহরের... মা, তুমি গেলে এনে দিও।”
মির্জা বেগম মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলেন। সুপ্রিয়া ও প্রিয়া নিজেদের মধ্যে বসে কিছু গল্প করছে। সে সময় আরোবি জারাকে একটু খোঁচা দিয়ে বলল—
“এই জারা, তোর ইশানে খবর কি?”
জারা—“আমি জানি না।”
আরোবি—“না জানলে হবে না। আমি তো ইয়াবির কাছে শুনেছি, ওর নাকি একটা মেয়ে আছে — কলিক, মানে একই হাসপাতালে কাজ করে। ভালো বন্ধুত্ব নাকি ওদের—দেখিস, তোর ইশান কে নিয়ে যেন অন্য কেউ দৌড় না দেয়।”
আরোবির কথা শুনে জারার মুখে সামান্য রাগ উঁকি দিলেও সে ভেতরে গিলে নিল—
“তা... যাই হোক,তুই চুপ করতো এবার?”
সুরভী উপন্যাসের বইটা এক পাশে রেখে শান্ত ভঙ্গিতে বলল—
“বলছি কি, আমাদের কিছু করা উচিত যাতে আমরা সবাই একসাথে হই।”
লিসি—“নুসরাত আপু কবে আসবে?”
জারা—“ভাবি তো বলছিলো, ফুফু একটু অসুস্থ, তাই গেছে। কয়দিন পর চলে আসবে।”
লিসি—“ওহ, তাহলে কি করবা তোমরা এখন?”
আরোবি—“জানিস লিসি, পাশের বাড়ির আঙ্কেলদের রাস্তার পাশে পেয়ারা গাছে কি পেয়ারা হয়েছে—কয়টা তো পেকে গিয়েছে। দেখলে মনে হয় টেনে ছিড়ে খেয়ে ফেলি।”
লিসি—“সত্যি? তাহলে চলো চুরি করে পেরে আনবো, কাউকে বলবা না কিন্তু।”
সুরভী—“কি লিসি! তুই শেষমেষ চুরি করবি? এই পেয়ারা গাছ আমাদের বাগানেও আছে।”
লিসি—“বাদ দাও তো তুমি আমাদের পেয়ারা গাছের কথা! লোকের জিনিস চুরি করে খাওয়ার মজা আলাদা। কিন্তু এখন যাওয়া যাবে না—অনেক লোক রাস্তায় আছে। বিকালে যাব, ঠিক আছে? যাবে তো?”
আরোবি—“হুম হুম, যাবো।”
জারা—“আমি তো কখনো চুরি করিনি এভাবে, কিন্তু এবার করতে হবে—না হলে মজা লাগছে না।”
সুরভী—“আমি কি করবো? আমি যাবো। আর রিহানরা আসলে আমি বলবো আমরা কিভাবে একসাথে হওশা যায়, ঠিক আছে?”
মেয়েরা আনন্দে ঝুমছে—বিরক্তকর সময়টা এখন তাদের জন্য পরিণত হচ্ছে আনন্দকর একটি মুহূর্তে। বিকালের অপেক্ষায় তারা অধীর আগ্রহে বসে আছে।
ওইদিকে দুপুর গড়িয়ে যাওয়ায় বাড়ির বউরা রান্নাঘরে চলে গেছে রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত হতে। আনোয়ার আর আনারুল তাদের মধ্যে কথা বলতে বলতে সময় কাটাচ্ছে। মির্জা বেগমের পায়ে ব্যথা হলে পায়ে তেল মালিশ করতে ঘরে চলে যান। চারপাশ নীরবতা দিয়ে ভরে উঠল—মধ্যাহ্নের সেই কোমল নীরবতা, যেন ক্ষণিকেই সূর্য ঢলে গিয়েছে এবং বাড়িটি ধীরে ধীরে বিশ্রামের দিকে সরে যাচ্ছে।
পড়ন্ত বিকেল।
রোদটা নরম হয়ে এসেছে, বাতাসে কেমন একটা ঘুমঘুম ভাব।
বাড়ির ভেতর একেবারে নিরবতা—সবাই দুপুরের খাওয়া শেষে ঘরে গিয়ে বিশ্রামে।
কিন্তু মেয়েরা? তাদের তো বিশ্রামের সময় না।
চারজন মেয়ে চুপি চুপি বারান্দা পেরিয়ে বাইরে বেরোয়।
দারোয়ান দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করে—
দারোয়ান: “কোথায় যান মামুনিরা?”
আরোবি হেসে বলে উঠে — “আরে মামা, চুপ করো, হাঁটতে যাচ্ছি একটু।”
বলে কিছু দূর স্বাভাবিকভাবে হেটে গিয়ে সামনে গিয়েই এক দৌড় মেরে সবাই চলে যায় পাশের আঙ্কেলের বাড়ির পেছনে—
যেখানে একটা বড় পেয়ারা গাছ দাঁড়িয়ে আছে।
লিসি তো বেজায় খুশি।
তার চোখে ঝিলিক—
সুরভী —“ভাই, জীবনে প্রথমবার এমনটা করছি।”
জারা — “এখন কী করবি?”
লিসি — “ওই দেখো, ওই ডালে কত পেয়ারা! আমি গাছে উঠছি।”
আরোবি চোখ বড় বড় করে — “তুই গাছে উঠতে পারিস?”
লিসি আত্মবিশ্বাসের সুরে বলে উঠে — “ আমি খান বাড়ির মেয়ে আর খান বাড়ির মেয়েরা সব পারে! আমি বড় হয়েছি গ্রামে। আমি গাছে উঠতে না পারলে কে পারবে? তোমরা চুপ করে থাকো, আমি পেয়ারা পেরে দিই, তোমরা নিচে ধরো।”
আরোবি হেসে বলে —“ওকে বস, আপনি চুরি করেন, আমরা আছি—ধরা না পড়ার আগ পর্যন্ত!”
সবাই মুচকি হাসে।
লিসি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ডাল ধরে টান দেয়, পা রাখে—ডালটা কেঁপে ওঠে, কিন্তু সে ভয় পায় না।
একটু একটু করে উপরে উঠে যায়।
হাত বাড়িয়ে একটা সোনালি পেয়ারা ছিঁড়ে নেয়।
নিচে সবাই হাত বাড়িয়ে দেয়।
লিসি— “এই নাও, একদম টাটকা।”
সবাই নিচ থেকে পেয়ারা নেয়, হাসাহাসি করে।
লিসি নেমে এসে কোমরে হাত রেখে তাকায় উপরের দিকে—
লিসি — “ওই দেখো, ওই টা উপরেরটা! কি সুন্দর পেয়ারা। কেউ যদি আমাকে একটু তুলে দিতো, পারা যেত।”
সুরভী— “যা পেয়েছিস, তাই যথেষ্ট। কেউ দেখার আগে ভাগ এখান থেকে।”
জারা — “হুম... ওয়াও, কি মিষ্টি!”
সবাই পেয়ারা কামড়ে খায়।
লিসি একটা পেয়ারা জামায় মুছে কামড় বসায়—
তার চোখে যেন শিশুসুলভ আনন্দ, মুখে একরাশ হাসি।
আরোবি —“উম্... চল, না হলে কেউ দেখে ফেলবে।”
ঠিক তখনই—
দূর থেকে একটা কালো গাড়ি আসতে দেখা যায়।
মেয়েরা প্রথমে ভাবে, হয়তো অন্য কেউ।
কিন্তু গাড়িটা একেবারে ওদের সামনে এসে থামলো।
ইঞ্জিনের শব্দ থামতেই চারদিক নিস্তব্ধ।
জানালাটা ধীরে ধীরে নিচে নামলো—
আর ভেতর থেকে দেখা গেল কিরিস।
তার চোখে সাদা ফ্রেমবিহীন পাতলা গ্লাসওয়ালা চশমা,
যেটা তার চোখের তীক্ষ্ণতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কালো শার্টের হাতা গুটানো, হাতের ঘড়িটা চকচক করছে সূর্যের আলোয়।
চুল হালকা এলোমেলো, মুখে সেই আগের মতোই গম্ভীর ভাব—
কিন্তু চোখ... সেই চোখের দৃষ্টি যেন ছুরি হয়ে সবার বুক চিরে যায়।
লিসি চুপচাপ দাঁড়িয়ে, হাতে এখনো পেয়ারা ধরা।
তার নিঃশ্বাস যেন আটকে গেছে বুকের ভেতর।
কিরিস এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে।
কোনো কথা বলে না, শুধু সেই দৃষ্টি—
যেন ওরা একেকটা শিশুসুলভ অপরাধে ধরা পড়েছে,
কিন্তু শাস্তিটা কতটা ভয়ংকর হবে, তা কেউ জানে না।
জারা ভয়ে ভাঙা গলায় —
—“ও... ভাইয়া... আমরা এখানে একটু হাঁটতে এসেছিলাম...”
কিরিস সামান্য মাথা কাত করে লিসির দিকে তাকায়,
তার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা ঠান্ডা হাসি।
একটু থেমে নিচু গলায় বলে—
কিরিস— “হাঁটা? নাকি অন্য কিছু ?”
লিসির চোখ নামিয়ে আসে,
তার আঙুলের মাঝে চেপে ধরা পেয়ারাটা যেন ভারি হয়ে যায়।
গাড়ি থেকে নেমে কিরিস ধীরে ধীরে ওদের দিকে এগিয়ে আসে। চোখ কুঁচকে একবার দেখে বলে—
কিরিস— “তা রাস্তায় হাঁটতে এসে কোন মানুষ গাছে উঠে পেয়ারা চুরি করে পরে?”
আরোবি চোখ বড় করে মাথায় হাত দিয়ে বলে —
“লে—হালুয়া! লিসি পালা।”
তাহলে সবাই দৌড় দেয় য়—লিসিও যেতে চায়—তখনই কিরিস তাড়াহুড়ো করে লিসির ওড়না টেনে ধরে।
লিসি আলতো করে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে—
লিসি— “ছাড়ুন...”
কিরিস সরাসরি, ঝুঁকে করে বলে—
কিরিস— “না, কি করছিলে?”
লিসি — “চুরি করছিলাম, আপনি করবেন—”
লিসি কষ্টে কন্ঠে বললে কিরিস একটু এগিয়ে এসে তাকে দেখে—
গাড়িতে বসে থাকা মার্ক কিছু বলার চেষ্টা করলে কিরিসের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে চুপ হয়ে যায়।
লিসি মার্ক দিকে তাকিয়ে আওয়াজ করে বলে —
“মার্ক আঙ্কেল, আপনি গাড়ি নিয়ে বাড়ি যান। আপনার মালিক আজ হেঁটে বাড়ি যাবে।”
কিরিস লিসির এই আচরণে অলক্ষিত অবাক; মার্ক আর কিছু বলার আগেই কিরিস মার্ক এর দিকে তাকিয়ে গাড়ি বাড়ি নিয়ে যেতে বলে কিরিসের অনুমতি পেয়ে মার্ক গাড়িতে চড়ে চলে যায়।
ফাঁকা রাস্তা। দুজনে রাত্রির আগের ধূসর আলোয় দাঁড়িয়ে।
লিসি হাতে থাকা পেয়ারা কামড় দিয়ে কিরিসের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে—
লিসি —“খাবেন?”
কিরিস: “না, পেয়ারা খায় না।”
লিসি — “তাহলে তো এবার আপনাকে খেতেই হবে—নিন, ধরুন।”
হঠাৎ লিসি একপ্রকার জোর করে কিরিসের গালের কাছে পেয়ারা দিয়ে দেয়। কিরিস অবাক হয়ে একটু কামড়ে নেয়—পেয়ারাটা সত্যিই মিষ্টি।
লিসি —“কি মিষ্টি, না?”
কিরিস— “না হলে ও! —যেহেতু তুমি এটা খেয়েছো, তাই অবশ্যই এটা মিষ্টি হবে।”
লিসি —“আপনার ফালতু কথা বাদ দিন। আর আমাকে একটু উপরে তুলুন তো, ওই পেয়ারা টা পারবো, তারপর বাড়ি যাবো।”
কিরিস— “নিজে তো চোর — আর আমাকেও তোমার সাথে চোর বানিয়ে দিচ্ছো। যদি গাছের মালিক দেখতে পায়, তাহলে কি হবে বলো তো?”
লিসি চট করে বলে ফেলে — “কি আর বলবে? বিখ্যাত বিজনেসম্যান কিরিস, পেয়ারা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে — কি লজ্জার কথা!”
কিরিস হয় একটু কণ্ঠ কঠোর করে — “আজকে একটু বেশিই কথা বলছো, না?”
লিসি —“ও হুম! বলছি—তাহলে আমাকে ধরবেন নাকি? পাশের বাড়ির আঙ্কেলকে ডেকে আনবো আমাকে ওঠানোর জন্য ।”
কিরিস হাসি মিশিয়ে উত্তর দেয় — “আমি জানতাম না তুমি এতো বড় মাপের চোর।”
লিসি — “বাদ দাও। তাহলে আমার সাথে এখন আর আপনার সম্পর্ক রাখতে হবে না—আমার বয়ফ্রেন্ড হতে হবে না।”
কিরিস মুচকি হেসে এক পা এগিয়ে এসে লিসির কোমর ধরে তাকে উপরে তোলে—লিসি প্রথমেই একটু বেসামাল হয়ে পড়ে।
লিসি —“এই—এই—আস্তে!”
কিরিস — “চুপ করো, দ্রুত কর, বাড়ি যাবো।”
কেবল পেয়ারাটা লিসির হাতের নাগালে পেয়েছে হাত দিয়ে ছিড়ে মুঠো করে রাখল ঠিক সেই সময়ে—উইপিং রাগে একটা কণ্ঠ ফেটে ওঠে—উপরে থেকে কারো কণ্ঠ বসন্ত-গলায় বলে — “এই—এই! কে আমার পেয়ারা গাছে দাঁড়িয়ে আছে?”
এই কথা শোনা মাত্র লিসি দ্রুত করে নামার চেষ্টা করে; হঠাৎ করে অস্বাভাবিক গতিতে নামতে গিয়ে লিসি বেশামাল হয়ে যায়—তার কারণে কিরিসের হাত লিসির কোমর থেকে খানিক আলগা হয়ে পড়ে। দুজন মিলে রাস্তার ওপর গড়াগড়ি করে পরে যায়।
সোজা পাকা রাস্তার ওপর কিরিস আর লিসি পরে যায়।পরে যাওয়ার সময় কিরিস লিসির মাথার নিচে হাত দেয় যেন মাথায় আঘাত না লাগে— পাকা রাস্তায় জোরে হাত পড়ার সঙ্গে কিরিসের হাতটা খানিক ছুলে যায়। লিসি কষ্ট পাবার ভান করে দ্রুত উঠে দাঁড়ায়—কিরিসও সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়।
চারদিকে হঠাৎ জেগে ওঠা নীরবতা; পথটা এখন বয়স্ক ব্যক্তির দিকে। দুজনের চোখে লজ্জা ও অস্বস্তির মিশ্রণ। কিরিস দ্রুত লিসিকে সামলান, কণ্ঠে মিশে আছে সামান্য তিক্ততা আর লুকানো সতর্কতা—তাকে টেনে দিকে-দিকে দাঁড় করায় যেন কেউ আর কোনো অপ্রীতিকর ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না।
বয়স্ক লোকটার কণ্ঠ আবার শোনা মাত্রই লিসি থমকে যায়।চোখ বড় করে কিরিসের দিকে তাকায়—
এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের হাতে থাকা পেয়ারাটা কিরিসের হাতে গুঁজে দেয়, তারপর হঠাৎ তার হাত দু’হাতে শক্ত করে ধরে বলে—
লিসি (চোখ বড় করে, তাড়াহুড়ো গলায়):
“চলুন! দৌড়ান!”
বলেই একপ্রকার টেনে নেয় কিরিসকে—
পথে গাছের পাতা উড়ছে, তাদের ওড়না-শার্ট বাতাসে উড়ছে,লিসির খোলা চুলের হালকা করে কিরিসের মুখে লাগছে। বাতাসে দুলে উঠা তার জামাটা আর তাদের এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত যেটা জীবনের পাতায় আজীবন লেখা থাকবে কখনো হারিয়ে যাবে না একটা স্মৃতি, ভালোবাসার স্মৃতি ; একটা অমর স্মৃতি।
আর দুজন একসাথে দৌড়াচ্ছে—
যেন বাচ্চাদের মতো এক অপরাধ করে পালাচ্ছে, হাসতে হাসতে, নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসছে তবুও থামছে না।
কিরিসের মুখে এক মুহূর্তের অবিশ্বাসের হাসি।
তার জীবনে সে অনেক কিছু থেকে দৌড়েছে—
বন্দুক, গ্যাং, বিপদ, রক্ত, মৃত্যুর —
কিন্তু এভাবে, হাত ধরে, একটা মেয়ের সাথে হেসে দৌড়ানো?
এটা একদম নতুন অনুভূতি।
লিসির হাসিটা উচ্ছ্বসিত, চোখে দুষ্টামি ঝিলিক—
সে কিরিসকে টেনে নিয়ে যায় রাস্তার এক কোণে, যেখানে কেউ দেখতে পায় না।
দুজন হাঁপাতে হাঁপাতে থেমে দাঁড়ায়।
লিসি দেয়ালের পাশে হেলান দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলে—
লিসি — “উফফ্... বাঁচলাম!”
তার মুখে শিশুসুলভ আনন্দের হাসি।
কিরিস তাকে তাকিয়ে দেখে—
হাসছে, ক্লান্ত, তবু চোখে অদ্ভুত আলো।
তার বুকের মধ্যে কোথাও কিছু কাঁপে—
একটা নতুন, অচেনা অনুভূতি।
কিরিস নরম গলায় বলে — “তুমি জানো... আমার জীবনে আমি অনেক কিছুর থেকে পালিয়েছি...
কিন্তু এভাবে—হাত ধরে, হাসতে হাসতে...
কখনও না।”
লিসি তার দিকে চেয়ে হালকা হাসে—
লিসি — “তাহলে আজ থেকে শিখে নিন, মি. কিরিস রায় চৌধুরী।”
দুজনের চোখে চোখ পড়ে—
মুহূর্তটা যেন থেমে যায়,
রোদের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে তাদের মুখে পড়ে,
হাওয়া বয়ে যায় নিঃশব্দে—
শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ, আর অদ্ভুত এক নীরব উষ্ণতা চারপাশে ছড়িয়ে থাকে।

0 Comments