তোমাকে চাই
পর্ব :35
লিসি ঠোঁট কামড়ে হালকা স্বরে বলে —
"হুম, ঠিক আছি। শুধু শাড়ির আঁচলের পিনটা ভেঙে গেছে… শাড়িটা ঠিকঠাক দাঁড়াচ্ছে না। আমি একপাশে গিয়ে ঠিক করে নিচ্ছি।"
আরোবি মাথা নেড়ে বলে —
"হুম, তাহলে ঠিক করে আয়, আমি ওইদিকে গেলাম।"
লিসি ভিড়ভাট্টা থেকে একটু দূরে চলে আসে—
আলো-ঝলমলে অংশের বাইরে, একদম নিস্তব্ধ করিডরের কোণে।
সামনে কয়েকটা সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরের দিকে,
আশেপাশে হালকা ফুলের গন্ধ আর বাতাসে হালকা সুরের ছোঁয়া।
ও হাতের কাছে থাকা একটা সেফটি পিন তুলে শাড়ির আঁচলে লাগাতে যায়।
কিন্তু তখনই—
পেছন দিক থেকে ভেসে আসে ভারী জুতার শব্দ।
ধীরে ধীরে, মেপে মেপে—
টুপ... টুপ... টুপ...
লিসি প্রথমে মনোযোগ দেয় না।
ভাবল হয়তো কেউ পাশ দিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু শব্দটা একদম তার পেছনে এসে থামে।
এক মুহূর্তের নীরবতা— তারপর শোনা গেল এক গম্ভীর, ভারী, রুদ্ধ কণ্ঠস্বর…
"লিসি শর্মা... চিৎকার করবে না।"
লিসির বুকের ভেতর ধক করে ওঠে।
পেছন ফিরে তাকাতেই—
তার চোখ পড়ে সেই পরিচিত মুখে।
কিরিস।
চোখে যেন অন্ধকারের ঝড়— ঠোঁটে নিয়ন্ত্রণহীন কঠোরতা।
লিসি ভয়ে, বিস্ময়ে, কিছুটা হতভম্ব হয়ে বলে উঠতে যাচ্ছিল —
"কি করছেন আপনি...?"
কিন্তু বাক্য শেষ হওয়ার আগেই—
কিরিস হঠাৎ এক ঝটকায় ওর কোমর জড়িয়ে ধরে,
এক টানে শরীরটাকে নিজের দিকে টেনে তোলে।
পরের মুহূর্তেই—
কিরিসের একহাতে লিসির কোমর শক্তভাবে ধরা,
আরেকহাতে তার পিঠের নিচে সমর্থন—
এক মুহূর্তে শরীরটা হালকা হয়ে গেল লিসির,
পায়ের মাটি যেন মিলিয়ে গেল।
তারপর এক মসৃণ কিন্তু শক্ত গতিতে—
কিরিস ওকে নিজের কাঁধের ওপর তুলে নেয়।
যেভাবে পুরোনো সিনেমায় ভিলেনেরা নায়িকাকে তুলে নিয়ে যায়—
ঠিক সেইভাবেই, কিন্তু এখানে দৃশ্যটার আবহ অন্যরকম—
একটা বিপজ্জনক, অথচ প্রেমে পাগল নীরবতা।
লিসির মাথা ঝুলে পড়েছে কিরিসের পিঠের পাশে,
চুলগুলো ছড়িয়ে পড়েছে নিচে—
ওর মুখে এখন অবিশ্বাস আর আতঙ্কের মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
লিসি কাঁপা গলায় কোনোমতে বলে —
"এইসব কি করছেন আপনি? কেউ দেখে ফেলবে!"
কিরিস কোনো উত্তর না দিয়ে পা বাড়ায় সিঁড়ির দিকে,
তার চোখে এখন একরকম হুমকি আর কাঁপা ভালোবাসার আগুন।
তারপর খুব শান্তভাবে, কিন্তু ভয়ংকরভাবে নিচু স্বরে বলে —
"চুপ থাকো, অলকানন্দা..."
একটা হালকা, নিয়ন্ত্রণহীন থাপ্পড় পড়ে লিসির পিঠে—
যেন ‘চুপ থাকো’ নির্দেশ।
লিসি হালকা কেঁপে ওঠে, মুখে অপ্রস্তুত কণ্ঠ —
"উমম... ছাড়ুন!"
কিন্তু কিরিস থামে না।
তার গতি থেমে নেই,
চোখে এখন এক অদ্ভুত, গভীর আবেগ—
যেন সারা পৃথিবী থেকে ওকে লুকিয়ে নিতে চায় নিজের ভেতর।
চারপাশের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে,
আর লিসির কণ্ঠ হারিয়ে যায় নীরবতার ভেতর—
শুধু শোনা যায় কিরিসের পায়ের ধ্বনি,
যেন এক নিষিদ্ধ ভালোবাসার সুর বাজছে ধীরে ধীরে...
কিরিস লিসিকে কাঁধে তুলে উপরে উঠে যাচ্ছে।
পায়ের ধাপগুলো যেন গুনগুন করে বাজছে— একেকটা পদক্ষেপে কিরিসের নিঃশ্বাস আরও ভারী হয়ে উঠছে।
তার চোখে এখন অদ্ভুত আগুন— রাগ, ভয় আর নিজের ভেতরের ঝড়।
পিছন থেকে দুটি রক্তচক্ষু চোখ এই দৃশ্য সব দেখছে—
অভি।
লিসিকে অস্বস্তিতে দেখে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে আসে সে।
কিন্তু এসে যা দেখলো, তা সে কোনোদিন ভাবেনি।
এক মুহূর্তে তার বুকের ভেতর কাঁপন ধরে যায়, রক্ত যেন উল্টো পথে বইতে শুরু করে।
অভি —
"কিরিস! তোকে আমি এর জন্য কখনো ক্ষমা করবো না!
লিসি শুধু আমার!"
কথাগুলো যেন বিদ্যুতের মতো ছুটে যায় বাতাসে।
অভির কণ্ঠে রাগে মিশে আছে কষ্ট, হাহাকার আর ভালোবাসার তীব্রতা।
সে থামেনি—
যত দ্রুত সম্ভব উপরে উঠতে থাকে, কিরিসের পেছন পেছন।
উপরে গিয়ে কিরিস সরাসরি লিসিদের ঘরের দিকে যায়, দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে।
একটাও কথা না বলে লিসিকে বিছানার উপর রেখে দেয়—
না, ছুঁড়ে ফেলা না, বরং নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানো একরকম তাড়াহুড়োয়।
লিসি বিছানায় হালকা কাঁপছে, মুখে বিস্ময়—
"এই... আপনি..."
বাক্যটা শেষ করার আগেই কিরিস তাকায় ওর দিকে।
চোখে কেমন এক অদ্ভুত নেশা— কিন্তু তা কোনো খারাপ মানে নয়, বরং এক গভীর আবেগের জোয়ার।
লিসির শাড়ির আঁচল এলোমেলো, ভাঙা পিনের জন্যে অল্প সরে গেছে—
ওর বুক ওঠানামা করছে ভয় আর উত্তেজনায়।
কিরিসের দৃষ্টি স্থির, নিঃশ্বাস ভারী— যেন নিজের ভেতরের আগুন নিভাতে পারছে না।
লিসি শুকনো গলায় একটা ঢোক গিলে নেয়।
কিরিস ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে,
তার মুখ লিসির মুখের একেবারে সামনে এসে থামে—
দু’জনের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে।
ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে যায়।
লিসির শরীর জুড়ে অচেনা কাঁপুনি,
কিরিসের মুখে যেন তীব্র এক ব্যথা, ভালোবাসা আর ভয় একসাথে মিশে গেছে।
দু’জনের ঠোঁটের দূরত্ব এখন প্রায় নেই বললেই চলে—
একটা নিঃশ্বাসের ব্যবধান।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা শব্দ—
কেউ যেন ধীরে সিঁড়িতে বসে পড়লো।
কিরিস চমকে উঠে তাকায় জানালার দিকে।
জানলার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে কারও মুখে—
অভি।
তার চোখ স্থির, নিস্তব্ধ—
যেন একসাথে হাজারটা প্রশ্ন, হাজারটা অভিযোগ।
লিসি নিঃশব্দে জমে গেছে।
কিরিসের দৃষ্টি অভির দিকে, আর অভির দৃষ্টি কিরিসের দিকে—
মাঝখানে শুধু নীরবতা, তপ্ত বাতাস,
আর একটা অসমাপ্ত অনুভূতির দোলাচল।
অভি জানলার দিক থেকে সরে গিয়ে নিচে সিঁড়ির ধাপে বসে পড়ে—
মুখে ফ্যাকাশে রঙ, চোখে যেন আগুন নিভে গিয়ে ছাই হয়ে গেছে।
তার ভেতরটা কেমন যেন ভেঙে পড়ছে—
সবকিছু এক মুহূর্তে উলটপালট হয়ে গেছে অভির জগতে...
কিরিস একটা শয়তানি হাসি হাসলো।
মনে হলো, এতক্ষণ ধরে এই হাসিটার জন্যই সে চুপ ছিল। যেন কারো নিজের জায়গা দেখানোর দরকার ছিল — আর সে সেটা দেখিয়ে দিয়েছে।
এটা ছিল তার বিজয়ের হাসি।
লিসি তখনো নির্বাক হয়ে খাটে শুয়ে আছে। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
কিরিস উঠে দাঁড়াল।
ঘরটা নীরব। কিন্তু তার বুক ধকধক করছে, শরীর ঘামে একাকার।
যতই হোক, সে একটা মানুষ — আর এখন নিজেকে ঠিক কতটা কন্ট্রোল করা দরকার, সেটা সে জানে। কিন্তু তার মস্তিষ্ক মানলেও… মনটা মানছে না।
তার চোখ বারবার ফিরে যাচ্ছে লিসির দিকে।
এলোমেলো শাড়িতে লিসিকে এখন যেন অন্যরকম লাগছে — নিষ্পাপ অথচ বিপদজনকভাবে আকর্ষণীয়।
নিজেকে সামলাতে না পেরে কিরিস পাশে থাকা টেবিলের গ্লাসটা তুলে নিজের মাথায় ঢেলে দিলো। ঠান্ডা পানি ঝরে পড়ল তার চুল বেয়ে, গাল বেয়ে।
লিসি হঠাৎ হুঁশে ফিরলো।
চোখের সামনে ভিজে চুলের ফাঁক দিয়ে পানি টপ টপ করে পড়ছে কিরিসের গলায়, বুকের দিকে।
এমন অবস্থাতেও কিরিসকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।
সে খেয়াল করল, কিরিস কেমন আড়চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে।
লিসি চোখ নামিয়ে দেখলো — কিরিসের দৃষ্টি তার বুক আর কোমরের দিকে।
সে দ্রুত নিজের আঁচল টেনে নিলো, শাড়ি ঠিক করে বললো,
— “এইভাবে কি দেখছেন? আর এইসব কি করছেন আপনি?”
কিরিস চুপ। কোনো উত্তর নেই।
লিসি রেগে গিয়ে বললো,
— “এখান… থেকে চলে যান আপনি।”
কিরিস এবার পাশের টেবিল থেকে পানির জগটা হাতে তুলে নিলো।
লিসি হালকা ঠাট্টার সুরে বলল,
— “এই, আপনার এত গরম লাগছে নাকি? তাই নাকি…”
বাক্য শেষ হবার আগেই কিরিস পুরো জগের পানি লিসির মাথায় ঢেলে দিলো।
লিসি হতবাক। পুরো ভিজে একাকার হয়ে তাকিয়ে আছে কিরিসের দিকে।
কিরিস মুখ না ঘুরিয়েই বলে গেল,
— “পাশের টেবিলে শপিং ব্যাগে একটা শাড়ি আছে। ভিজিয়ে দিলাম তো, তাই ওইটা পরে নিও।”
বলে সে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
একবারও পেছন ফিরে তাকালো না।
লিসি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বুঝতে পারলো — এটা ইচ্ছে করেই করেছে কিরিস।
কিন্তু কেন জানি রাগ হওয়ার বদলে বুকের ভিতর কেমন হালকা খুশি খুশি লাগছে।
সে গা থেকে পানি ঝেড়ে টেবিলের উপর রাখা ব্যাগটা খুলে দেখল।
এটা সেই ব্যাগ — অনুর ড্রেসেলার সময় মা-মার্ক কিরিসকে দিয়েছিলেন।
ভিতরে আছে একদম নতুন একটা সাদা সিল্ক শাড়ি। সাদার উপর বাঁশপাতার মতো হালকা সবুজ কাজ করা — নিখুঁত, চোখে লেগে থাকার মতো সৌন্দর্য।
লিসির মুখে এক অজানা মুচকি হাসি ফুটে উঠলো।
কিন্তু মুহূর্তেই বিরক্ত হয়ে গেলো।
“এখন আবার সাজ বদলে শাড়ি পরতে হবে…” — বিড়বিড় করে বলল সে।
চুলও ভিজে একাকার হয়ে গেছে।
তাই আর দেরি না করে ওয়াশরুমে চলে গেল শাড়ি বদলাতে।
কিছুক্ষণ পর, সাদা সিল্ক শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে লিসি।
জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা বাতাসে চুল দুলছে, গায়ের পানির ফোঁটা চকচক করছে —
আর সেই মুহূর্তে, আয়নায় নিজের চোখে নিজেকেই চেনা দায় হয়ে উঠেছে।
চুলগুলো এবার বাঁধা হয়েছে একেবারে নতুন ঢঙে — পিছনে কোপাক পা টাইপে খোঁপা, কিন্তু দুই পাশের চুলগুলো হালকা ছাড়া, গালের ধারে নরমভাবে পড়ে আছে।
চুলের একেকটা ভেজা গোছা যেন নিজের ইচ্ছেয় মুখে এসে লেগে থাকছে।
সাদা সিল্কের শাড়িটা লিসির গায়ে যেন অন্য জগতে তৈরি।
চাইনিজ কাটে গোঁজা, কোমরটা নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে, আর শাড়ির বর্ডারে বাঁশপাতার নকশাগুলো হালকা সবুজে ঝিলমিল করছে আলোয়।
শাড়ির পল্লাটা সামনে থেকে ঘুরে কাঁধে উঠেছে এমনভাবে — যেন কোনো ছবির ফ্রেমে বন্দি এক শিল্পকর্ম।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লিসি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে থমকে গেল।
নিজের চোখেই যেন নিজেরে চিনতে পারছে না।
মুখে কোনো মেকআপ নেই, তবুও ত্বক দুধের মতো ফর্সা, গালে হালকা আভা, ঠোঁটে প্রাকৃতিক গোলাপি রঙ —
যেন বৃষ্টির পর প্রথম রোদে দেখা পলকফেরা রূপকথা।
প্রায় ঘন্টা ঘানিক ধরে সিঁড়ির ধাপে বসে আছে অভি।
চোখের দৃষ্টি স্থির, মুখে অদ্ভুত এক শূন্যতা।
ঠিক তখনই উপরে থেকে নামতে থাকে লিসি।
ভিজে চুল, সাদা সিল্কের শাড়ি, আর মুখে একধরনের অনিশ্চিত শান্তি — যেন কিছুই হয়নি, অথচ ভিতরে কিছু একটা হয়ে গেছে।
অভি মাথা তুলে তাকাতেই থেমে গেল।
তার চোখে এখন হাজারটা প্রশ্ন।
হালকা গলা ভারী করে বলে —
— “তুই… শাড়ি বদলালি ক্যান?”
লিসি একটু থমকে গেল,
চোখে অস্বস্তির ছাপ,
গলার স্বর জড়ানো —
— “ওই... ওইটাতে পানি পড়ে গেছিলো… তাই, ভিজে গেছিল… তাই শাড়িটা বদলাইছি।”
অভি চুপ।
তার দৃষ্টি সরে গেল লিসির চুলে — একদম ভিজে, টপটপ করে পানি পড়ছে নিচে।
সে আবার জিজ্ঞেস করল, কণ্ঠে সন্দেহের রেখা —
— “তাহলে চুল ভিজে ক্যান?”
লিসি এবার এক মুহূর্ত চোখ নামিয়ে হালকা মিথ্যে হাসি এনে বলে —
— “ভাবছিলাম... যেহেতু ভিজেই গেছি, তাই গোসল করে নিই... ভালো লাগছিল না।”
অভি কিছু বলে না।
শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে লিসির দিকে।
তার চোখে এখন রাগ, কষ্ট, আর একরাশ অবিশ্বাস জমে আছে।
মনে হচ্ছে—কিছু একটা সে হারিয়েছে,
অথচ ঠিক কী হারিয়েছে সেটা নিজেও জানে না।
লিসি তার চোখের সেই প্রশ্ন এড়াতে পল্লাটা টেনে মুখটা ঢেকে নিচে নামতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে।
অভি শুধু চুপ করে বসে থাকে,
চোখের সামনে দিয়ে চলে যাওয়া লিসিকে দেখে,
মনে একটা কথাই ঘুরছে—
“ওর চুলে এখনো কার ছোঁয়া রইল?”
লিসি নিচে চলে যাওয়ার কিছু সময় পরেই,
উপরের ঘরের দরজা ধীরে খুলে গেল।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো কিরিস রায় চৌধুরী।
চুলগুলো এখনো ভেজা — কপালের পাশে কয়েক ফোঁটা পানি ঝরে পড়ছে গলার কাছে।
গায়ে সাদা সিল্কের শার্ট,
যার বুকে সবুজ বাঁশপাতার ডিজাইন।
ওর সেই স্পেশাল ফ্যাব্রিক — চাইনিজ সিল্ক,
আর ওপরে পরা কালো কোডটা যেন সম্পূর্ণ রাজসিকতার ছাপ।
সাদা-কালো মিশ্রণে ওকে এখন এমন লাগছে যেন রাত্রির ভিতর জন্ম নেওয়া রাজা,
যার মুখে একফোঁটা হাসি মানেই পৃথিবী থমকে যায়।
সে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে আসে।
নিচে এখনো দাঁড়িয়ে আছে অভি,
মুখে কঠিন ছায়া।
চোখে চোখ পড়তেই অভির মুখ শক্ত হয়ে গেল।
সামনে এগিয়ে এসে থেমে গেল কিরিসের সামনে।
গলায় চাপা রাগ —
— “এই যে... কিরিস ভাই, আপনি ভিজলেন কি করে ?”
কিরিস থেমে, মাথা সামান্য কাত করে হালকা একটা হাসি দিল।
চোখে অদ্ভুত ঠাণ্ডা ঝিলিক,
বলে —
— “তুই এখনো ছোট, অভি… বড় হ, বিয়ে কর, তারপর বুঝবি।”
অভির চোখ রক্ত লাল।
সে কিছু বলতে যাবে, কিন্তু কিরিস কোনো পাত্তা না দিয়ে পাশ কাটিয়ে নিচে নামতে থাকে বিন্দাস ভঙ্গিতে।
তার ভেজা চুল পেছনে ছিটকে পড়ছে,
আর জুতার নিচে মার্বেল ফ্লোরে টুপটাপ পানির শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
অভি দাঁড়িয়ে রইল সিঁড়ির ধাপে,
চোখে ফোঁটা ফোঁটা আগুন জ্বলছে।
তার বুকের ভিতর কেবল একটাই প্রশ্ন ঘুরছে —
“তুই কী করলি, কিরিস?”
আর নিচে কিরিসের প্রতিটি পা ফেলার শব্দ যেন বলে দিচ্ছে —
“আমি যা করেছি, সেটা বুঝতে storybymithila
নিচে এখন সবাই গল্পে মেতে আছে।
কেউ বসে খাওয়া-দাওয়া করছে, কেউ আড্ডায় জমিয়ে রেখেছে সন্ধেটা।
ছেলেরা এক পাশে বসে আছে, গ্লাস হাতে, হালকা হাসি আর কথায় মাতোয়ারা।
ওদিকে অনু আর শাওন নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে —
একজন হাসছে, অন্যজন জবাবে হেসে উঠছে।
কাবির (হাসতে হাসতে):
— "Bro, ওদিকে তাকাও না, আমার ভাইজানের কী দারুণ লাগছে!"
রিহান আর ইয়াবি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেই থমকে যায় —
শুধু ওরা নয়, হলরুমের অর্ধেক মেয়ের চোখ তখন কিরিসের দিকে।
কারও ঠোঁটের কোণে বিস্ময়, কারও মুখে হালকা লাজুক হাসি।
কেউ কেউ তো পাশে বসা বান্ধবীর কাঁধে হেলে ফিসফিস করছে,
“এই লোকটা বাস্তব না সিনেমা থেকে নামছে!”
কিরিস এসে দাঁড়ালো ইয়াবির পাশে।
ইয়াবি (চোখ বড় করে):
— "আহা! কি সুন্দর লাগছে তোকে আজ!"
রিহান (মজা করে):
— "এই শার্টটা দেখে মনে হচ্ছে না এই দেশে! কোথা থেকে আমদানি করলি?"
কাবির (ঠোঁট বাঁকিয়ে):
"ভাই, বাদ দে! ও তো গোটা দুনিয়া থেকে যা খুশি আমদানি করতে পারে! ওখানে এটা তো একটা শার্ট মাত্র!"
সবাই হেসে ওঠে।
এমন সময় রিহান ফোনটা পকেটে রেখে বলে —
— "ইশান বেচারা, সারাক্ষণ অপারেশন নিয়ে ব্যস্ত! একটু আগে ফোন দিয়েছিলাম, বলল OT রুমে যাচ্ছে।"
কাবির:
— "আগে বাড়ি ফিরি, তারপর দেখি আবার সবাই একসাথে হওয়া যায় কিনা।"
কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে ইয়াবি হঠাৎ গলা ঝেড়ে বলে —
— "এই কিরিস! তুই চুপ কেন? আর শুনেছি পাশে একটা Bar আছে!"
কাবির:
— "হুুম! চল তাহলে! বিয়ের আগে যা পারিস করে নে, নাহলে রিহানের মতো শুনতে হবে পরে! তবে বেশি খেয়ো না!"
রিহান (হাসতে হাসতে):
— "এইটা ঠিক! কিন্তু কাবির, তুই মনে হয় বিয়ে করবি না! দাঁড়া, আমি বড় আব্বুকে বলে তোর বিয়ে ঠিক করছি!"
কাবির:
— "তা করতে পারিস! নাহলে আমার বিয়ে হবে কিনা অভরসা কাটণ বড় ভাই বিয়ে না করলে ছোটটার তো দিতে চাই না। আমার বড় ভাইয়া কোন এই জন্মে বিয়ে করবে, আর আমার কবে হবে!"
কাবিরের কথায় সবাই হেসে উঠলেও, কিরিসের দৃষ্টি একবার ঘুরে গেল তার দিকে।
এক সেকেন্ডে হাসিটা থেমে গেল কাবিরের ঠোঁটে —
চোখে পড়ে কিরিসের সেই নিঃশব্দ, শীতল দৃষ্টি,
যার মধ্যে কথার চেয়ে অনেক বেশি ওজন আছে।
কাবির চুপ। নিস্তব্ধতা নেমে এল টেবিলজুড়ে।
ঠিক তখনই,
ভিতর দিক থেকে লিসি আর আরোবি ধীরে ধীরে ভেতরে আসে,
দু’জনের মুখে হাসি, কথার টুকরো ভেসে আসছে—
"না রে, আমি তো ওখানেই ছিলাম…"
এতক্ষণ সবাই অন্যদিকে ব্যস্ত ছিল,
কিন্তু হঠাৎ পুরো হলরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
চোখ যেন আটকে গেল লিসির দিকে।
ওর পরনে সাদা সিল্কের শাড়ি,
হালকা সোনালি আলোয় ঝলমল করছে বর্ডারের বাঁশপাতার ডিজাইন।
চুলটা আধখোলা, কোপাকপা করে বাঁধা, পাশে হালকা কয়েকটা গোছা নেমে এসেছে কানের কাছে।
আলোতে চুলের প্রান্তগুলো চকচক করছে যেন সোনার সুতো বোনা।
আরোবি প্রথমে তাকালো, তারপর আবার কিরিসের দিকে।
কিরিস দাঁড়িয়ে আছে আগের জায়গাতেই —
সাদা সিল্কের শার্ট, ঠিক একই রকম বাঁশপাতার ডিজাইন।
উপর থেকে খোলা কালো কোটটা ওর কাঁধে ঝুলছে অবলীলায়।
তার চুল এখনও হালকা ভেজা, গায়ের গন্ধে মিশে আছে ধোয়া সিল্কের শীতল সুবাস।
আরোবি এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ঠাট্টার সুরে বলে উঠল —
আরোবি (হাসতে হাসতে):
— "আরে বাবা! তলে তলে টেম্পু চালাচ্ছো দেখি! কিন্তু এই টেম্পু চালানো ভীষণ ভালো লাগছে! আগের শরীর থেকে এই শাড়িতে তোকে বেশি সুন্দর লাগছে! এখন তো আকাশটা পুরো ফর্সা হয়ে গেছে, পূর্ণিমার আলোও ঝলমল করছে!"
লিসি লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নেয়, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
লিসি (চুপচাপ):
— "চুপ কর... আমি জানি না ভইয়াও একই রকম শার্ট
আরোবি — "তোকে তো পুরো চাইনিজ লাগছে রে! বাকি আছে শুধু মাথার চুলের কাটাটা। ওইটা বুঝি ভাইয়া দেয়নি?"
লিসি — "আহা চুপ কর!"
আরোবি — "কেন চুপ করবো? দাঁড়া, আমি ভাইয়ার কাছ থেকে বলে এনে দিচ্ছি!"
লিসি আতঙ্কে বারবার বারণ করছে,
লিসি — "না না, আরোবি যাস না, কিছু বলবি না!"
কিন্তু কে শোনে কার কথা—
আরোবি ইতিমধ্যে হাসতে হাসতে ৩৬০° ঘুরে কিরিসের দিকে সোজা চলে যায়।
আরোবি — "এই ভাইয়া, শোনো!"
তার কথায় কিরিস হালকা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
কাবির পাশ থেকে বলে ওঠে — "কি বলবি তুই আবার?"
ইয়াবি — "আরে কিরিস যা, তুই আসলে আমরা একসাথে বের হবো!"
কিরিস গম্ভীর স্বরে — "বল, কি বলবি?"
আরোবি — "হুম... ভীষণ দরকারি!"
আরোবি এবার কিরিসকে একপাশে নিয়ে যায়।
চারপাশের আওয়াজ ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে।
একটু থেমে, নিজেকে সামলে যেন যুদ্ধের আগে সৈনিক প্রস্তুতি নেয়, তেমন ভঙ্গিতে নিচু স্বরে বলে—
আরোবি — "আমি সব জানি... তোর আর লিসির ব্যাপারে। আমি কাউকে বলিনি, বলবোও না। সত্যি বলতে কি—আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি ওকে নিজের বড় ভাবি বলে এক্সেপ্ট করে নিয়েছি।"
কিরিস এক মুহূর্ত থমকে যায়। চোখের ভেতর ক্ষীণ বিস্ময়, কিন্তু মুখে কোন ভাব প্রকাশ নেই।
তারপর ধীরে বলে—
কিরিস — "হুম... তো এই কথাটাই বলতে এখানে আসা?"
আরোবি ঠোঁট চেপে হাসে — "আরে না রে, আগে থেকে রাস্তা ক্লিয়ার করে নিলাম যাতে পরের কথা বলার পর তুই আমাকে না বকিস!"
কিরিস কড়া দৃষ্টি রেখে — "হুম... বকবো না।"
আরোবি মুচকি হেসে বলে —
— "লিসিকে শাড়ি দিলি, ঠিক আছে... কিন্তু ভাইয়া, ওর দিকে একবার তাকা মানে—সবই ঠিক আছে, শুধু একটা জিনিস বাকি!"
কিরিস ভ্রু কুঁচকে — "কি জিনিস?"
আরোবি চোখ টিপে বলে —
— "তোর চুলের কাটাটা! ওকে একটা চুলের কাটা এনে দে, তারপর দেখ—ওকে একদম পুরো মিসেস কিরিস লাগবে!"
কিরিসের চোখে হালকা শীতল দৃষ্টি নেমে আসে। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি।
কিরিস— "তুই ভেবে বলছিস তো? আর কিভাবে জানলি আমি ওকেই বিয়ে করবো?"
আরোবি গলা নিচু করে, কিন্তু মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি —
আরোবি— "তোকে হারে হারে না চিনলেও যতটুকু চিনি, ভালোই চিনি ভাইয়া। এতোটুকু গ্যারান্টি নিতে পারি—তোর বউ যদি কেউ হয়, তবে লিসিই হবে। কারণ তোর জীবনে আর কোন অপশনই তো নেই!"
এক মুহূর্তের জন্য বাতাস ভারী হয়ে যায়।
কিরিসের মুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা, কণ্ঠে ঠান্ডা দৃঢ়তা—
কিরিস— "হুম... এনে দেবো। একটু অপেক্ষা করতে বল।"
আরোবি হালকা হেসে মাথা নেড়ে — "ঠিক আছে, ভাইয়া।"
আরোবি চলে যেতেই সুপ্রিয়া এগিয়ে আসে। তার দৃষ্টি কিরিসের উপর স্থির, মুখে হালকা রাগ, চোখে মায়ের স্বভাবসুলভ তীক্ষ্ণতা।
সুপ্রিয়া— "শোনো... কে না কে কি বলছে, সেটা দেখা দরকার নাই এখন। এটা বলো—এইসব কি? তোমার আর লিসিকে দেখে লোকজন ভাবছে তোমরা স্বামী–স্ত্রী!"
কিরিস হালকা মাথা ঘুরিয়ে তাকায়, ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি। কণ্ঠ বরফের মতো ঠান্ডা—
কিরিস— "তাই নাকি? আমি তো জানতামই না!"
সুপ্রিয়া (রাগ চেপে)— "মজার কথা বলছি না আমি! কোথা থেকে পেলি এই জামাটা?"
কিরিস খুব শান্তভাবে, প্রায় হিসেবি কণ্ঠে বলে—
কিরিস—"আগামী সপ্তাহে চায়নায় মিস্টার হাওইউর সঙ্গে মিটিং ছিল। সেখানেই উনি নতুন টপ কালেকশন দেখাচ্ছিলেন। শেষে উনি আমাকে এই কাপল সেট টা গিফট করেন। আমি বাঙালি হলেও উনি স্পেশাল ভাবে এই শাড়িটা আলাদা করে ডিজাইন করে এই শার্টের সঙ্গে মিল রেখে। এখন আমি তো আর শাড়ি পরবো না—তাই না?"
(একটা হালকা হাসি টেনে নেয় কিরিস, তারপর ব্যাখ্যা চালিয়ে যায়)
কিরিস— "আর এটা মার্ক আমাকে দিয়েছিল অনুর ড্রেস আনার সময় আর তখন তো আমি এটাকে বাড়ি পাঠাতে পারবো না আর না আমি এটাকে আবার চায়নায় পাঠাতে পারবো তাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম সন্ধ্যা থেকে আমার ভালো লাগছিলো না বলে আমি গোসল করছিলাম তারপর এই শার্ট টা পরি, তুমি তো জানো আমি কেমন!"
সুপ্রিয়া (চোখ সরু করে)—"তারপর?"
কিরিস— "তারপর শুনলাম লিসির শাড়ি ভিজে গেছে। তাই ওকে এই শাড়িটা দিলাম। অন্তত শুকনো কিছু পরুক—আমার নিজের বলে কথা।"
সুপ্রিয়া ভুরু কুঁচকে, সন্দেহ আর মমতার মাঝামাঝি সুরে বলে—
সুপ্রিয়া— "আমার মানে কি?"
কিরিস মুখটা মৃদু নিচু করে, ঠোঁটের কোণে হালকা কিন্তু
স্পষ্ট হাসি—
কিরিস— "মানে—বোন, ছোট বোন।"
একটু আগে পর্যন্ত রাগে চোখে আগুন ছিল,
এখন সেই আগুনে মেশা এক শান্ত অথচ শাসনভরা দৃষ্টি নিয়ে সুপ্রিয়া তাকিয়ে আছে নিজের ছেলের দিকে।
তার মুখে এখন তৃপ্তির ছোঁয়া আছে, কিন্তু মায়ের মন জানে — কিছু কথা না বললেই নয়।
সুপ্রিয়া (নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে)—
"শোনো কিরিস, আমি তোমাকে এই কথা বলছি মানে এই নয় যে আমি লিসিকে তোমার পাশে দেখে অপছন্দ করছি… বা এটা পছন্দ নয়।
আমি কিছু মনে করিনি।
কিন্তু আশপাশের মানুষ—ওরা কিন্তু অনেক কিছুই মনে করেছে।"
একটু থেমে, চোখ সরাসরি ছেলের চোখে রেখে, আরও ভারী কণ্ঠে বলে—
সুপ্রিয়া—
"শোনো, কলঙ্ক কখনো ছেলেদের গায়ে লাগে না, লাগে মেয়েদের গায়ে।
পতিতালয়ে কিন্তু শুধু মেয়ে থাকে না, সেখানে ছেলেরাও যায়—
তবু সমাজ দোষ দেয় কাকে?
সেই মেয়েটাকেই।
আমি এই কথার মাধ্যমে বোঝাতে চাচ্ছি—
তুমি হয়তো স্বাভাবিক ভাবে বিষয়টা দেখছো, কিন্তু আশেপাশের মানুষ তা সেভাবে নিচ্ছে না।
তাই ভবিষ্যতে এমন কিছু করবে না, যাতে লিসির নামের সঙ্গে কোনো খারাপ কথা জুরে যায়।
আমি কিন্তু এটা সহ্য করব না।
যা করবে, ভেবে–চিন্তে করবে।"
সুপ্রিয়ার কণ্ঠ থেমে যায়।
বারান্দায় নীরবতা নেমে আসে—শুধু বাতাসের মৃদু শব্দ।
কিরিস ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি টেনে নেয়, চোখ নিচু করে সম্মান দেখায়,
তারপর মাথা তুলে শান্ত অথচ ভয়ঙ্কর দৃঢ় কণ্ঠে বলে—
কিরিস—
"তোমার কথা একদম ঠিক, মা।
চিন্তা করো না… যতদিন আমি বেঁচে আছি, আমার ফুল বাগানের ফুলে কেউ হাত দিতে পারবে না।
আমার ফুলের পবিত্রতা কেউ নষ্ট করার ক্ষমতা রাখে না।
যা আমার, সেটা একান্তই আমার—আর কারও নয়।
কারও নজর পড়ার আগেই সেই নজর আমি নিভিয়ে দিতে পারি।"
(একটু থেমে, চোখে মমতার ছায়া নিয়ে বলে)
কিরিস—
"ধন্যবাদ, আমার আম্মাজান।
এত সুন্দর, এত শক্ত একটা উপদেশ দেওয়ার জন্য।
তোমার কথাগুলো আমি মনে রাখব—চিরকাল।"
সুপ্রিয়া কিছু বলে না।
শুধু তাকিয়ে থাকে নিজের ছেলের মুখে—
যে মুখে আছে রাজা’র মতো স্থিরতা,
আর চোখে এমন এক ভালোবাসা,
যার গভীরতা হয়তো মায়ের কাছেও অজানা।
সুপ্রিয়া ছেলের কথায় হালকা হেসে এগিয়ে এসে কিরিসের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
ছেলের চোখে যে দৃঢ়তা, তা তিনি খুব ভালো করেই জানেন। তবে মা বলে কথা—চিন্তা তো থেকেই যায়।
একটু হাঁটতে হাঁটতে সামনের দিকে গেলেন। পেছনে দাঁড়িয়ে রইলো কিরিস।
একটা গভীর নিঃশ্বাস নিলো সে। জানে সে যা করছে, তা ভুল নয়, কিন্তু মাঝে মাঝে সচেতন থাকা যে জরুরি, তা সে নিজেও মানে।
ঠিক তখনই কাবির এসে হেসে বলল,
— “চল না ভাই, এবার যাই।”
ইয়াবি সাথে সাথেই বলল,
— “আরে কিরিস, তোর ভাইয়ের তর সইছে না রে!”
কিরিস মুচকি হেসে বলল,
— “হুম, চল... আর তুই?”
রিহান উত্তর দিলো,
— “আরে আমি তো আব্বু আর বড় আব্বুকে বলে এসেছি, আমরা ওই সাইটে যাচ্ছি।”
কাবির মুখ টিপে হেসে বলল,
— “গিয়েছিলো তো নুসরাতের কাছ থেমে পারমিশন নিতে, সেই সঙ্গে আব্বুদেরও বলে এসেছে।”
রিহান ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল,
— “তোর মাথা গুলি মারবো আমি, চল এখন!”
হাসতে হাসতে সবাই একসাথে বেরিয়ে গেল।
পেছনে শুধু অভি দাঁড়িয়ে রইলো, নিঃশব্দে।
সবকিছু সে দেখেছে। কিন্তু কিছু একটা যেন মনের ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে —
কয়েকটা প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর সে জানে, তবুও বিশ্বাস করতে মন চায় না।
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে দূরে তাকাল সে —
লিসি হাসছে, ওদের সবার সঙ্গে গল্প করছে, ঠিক আগের মতোই নিষ্পাপ মুখে।
অভি জানে, এই হাসির আড়ালে কিছু আছে —
আর তাই এবার সে ঠিক করলো, উত্তরটা সে নিজের চোখে খুঁজে বের করবে।
ধীরে ধীরে কিরিসদের পিছু নিলো সে...
ওরা সব কয়টা মিলে রিসোর্টের পাশের বারে গেলো।
বারের ভেতরটা আধো আলোয় ঢাকা। হালকা নীল আর সোনালি আলো একে অপরের সঙ্গে মিশে একটা নেশাময় পরিবেশ তৈরি করেছে।
দেয়ালের পাশে বসেছে কিরিস, কাবির, রিহান আর ইয়াবি। সামনে গ্লাসে রাখা কয়েকটা ড্রিংকস —
Blue Label Scotch, Black Russian, আর ইয়াবির সামনে আধা ভরা Mojito।
সবাই গল্পে মেতে আছে, হাসছে, মাঝে মাঝে চুপচাপ বসে কেউ একজন গ্লাসে আঙুল ঘুরাচ্ছে।
কিরিস নিজের গ্লাসে এক চুমুক নিলো, ধীরে ধীরে পেছনে হেলান দিলো। তার মুখে এক ধরনের স্থির শান্তি — যেন বাইরে ঝড় উঠলেও ভেতরে কিছুই নড়ে না।

0 Comments