তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :33

কিরিস ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে —
— “তুমি ফ্যাশন বোঝো না, লিসি।”
লিসি সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা দেয় —
—“আমার বোঝার দরকার নেই।”
কিরিস হেসে বলে —
—“আমি কিন্তু আগে থেকেই জামা পরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তারপর তুমি এলে।”
লিসি হাল ছেড়ে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে —
— “হুম... আমি কপি করেছি, এবার চুপ করুন আল্লাহর দোহায়।”
দু’জনের চোখে চোখ পড়ে যায় —
একটুখানি নীরবতা,
আর সেই নীরবতাই যেন বলে দেয়—
তর্ক যতই হোক, অনুভূতিগুলো আজ একদম আলাদা ভাষায় কথা বলছে।
কিরিস আর কিছু না বলে লিসিকে সঙ্গে নিয়ে শপিং মলের বাইরে আসে।
এক মুহূর্তেই যেন পরিবেশটা বদলে গেল —
কিছুক্ষণ আগের রোদ ঝলমলে বিকেলটা
এখন অদ্ভুত অন্ধকারে ঢেকে গেছে।
আকাশ কালো, ভারী মেঘে জমাট,
চারপাশে ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস বইছে —
বৃষ্টির আগের সেই পরিচিত মাটির গন্ধ
ধীরে ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।
বাতাসের ছোঁয়ায় লিসির চুল উড়ে এসে মুখে লাগে,
সে হাত দিয়ে ঠিক করতে গিয়ে বুঝতে পারে—
চারপাশে নেমে এসেছে এক অজানা অস্থিরতা।
মানুষজন ছুটোছুটি শুরু করেছে,
দোকানদাররা ছাউনি নামাচ্ছে,
বাতাসে কেমন এক রহস্যময় নিস্তব্ধতা।
কিরিস হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ডানদিকে চোখ তোলে —
সেখান থেকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে মার্ক,
ঠিক সময় মতোই।
মার্ক এগিয়ে এসে হাতে থাকা দুইটা বড় শপিং ব্যাগ কিরিসের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে —
—“যেগুলো আনতে বলেছিলেন, স্যার, সব এনেছি।
এখানে আপনার বলা জিনিসগুলো সব আছে।
আর এই ফাইলগুলো নতুন —
কয়েকজনের নামও আছে, সঙ্গে ডিটেইলস।”
কিরিস ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে সংক্ষিপ্ত স্বরে বলে —
—“ওকে... আমি দেখে নেব ফাইলগুলো।
তুমি ৪৫০ নম্বর ফাইলে তিন নম্বর পৃষ্ঠায় ৬ নম্বর দাগের যে ডিটেইলস আছে,
সেটা এ-টু-জেড আমাকে পাঠাবে।
ওখানে যাদের নাম আছে...
তাদের অনেকেরই বাচ্চা আছে —
আমি সবার নাম চাই।”
[কোডে কথা — চারপাশে কেউ বুঝে না।]
মার্ক মাথা ঝুঁকিয়ে বলে —
— “ঠিক আছে, বস। চিন্তা করবেন না।
আমি দেখে নিচ্ছি — সন্ধ্যার মধ্যেই পেয়ে যাবেন।”
লিসি কৌতূহলভরে ফাইলগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে —
— “এই ফাইলগুলোতে কী আছে? আর এই ব্যাগগুলো তে কি আছে ভাইয়া?”
কিরিস হালকা গলায়, চোখ না ঘুরিয়ে বলে —
— “পরে দেখবে।
এখন চলো... আবহাওয়া ভালো না, বৃষ্টি হতে পারে।”
লিসি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে বলে —
— “হোক, চলুন এখনই, নাহলে আটকা পড়বো।”
কিরিস মৃদু স্বরে বলে —
— “আমার মনে হচ্ছে...
আজ ভালোভাবে যেতে পারবো না।
দ্রুত যাওয়ার সুযোগও নেই।”
লিসি তাকিয়ে প্রশ্ন করে —
—“কেন? কী হয়েছে?”
কিরিস এবার লিসির দিকে না তাকিয়ে,
শান্তভাবে হাতে থাকা অনুর ড্রেসটা মার্কের দিকে বাড়িয়ে দেয় —
“মার্ক, তুমি এটা নিয়ে যাও।
সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে অনু এটা পরবে, সাজতে দেরি হবে।
এখনই দিয়ে আসাই ভালো।
আমার সঙ্গে যে আছে...
মনে হচ্ছে না, একে নিয়ে দ্রুত যেতে পারবো।”
মার্ক মুচকি হেসে কিছু না বলে ব্যাগটা নিয়ে নেয়।
যে “একজন” কথাটা কিরিস বললো,
তার মানে বোঝার মতো বুদ্ধি মার্কের অনেক আগেই হয়েছে।
নিঃশব্দে মাথা নুইয়ে,
বৃষ্টি পড়ার আগেই মার্ক দ্রুত চলে যায়।
আকাশে ঠিক তখনই বিদ্যুতের রেখা ছুটে ওঠে —
লিসি তাকিয়ে দেখে, কিরিসের চোখে সেই একই রকম ঝড়ের প্রতিফলন।
লিসি আর কিরিস গাড়িতে উঠে পড়ে।
কিরিস ইঞ্জিন চালু করে, গাড়ি রিসোর্টের দিকে রওনা দেয়।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা — শহর থেকে একটু দূরের নির্জন অঞ্চল। এই আর এই নিরিবিরি পরিবেশটাই এই রিসোর্টের বৈশিষ্ট্য।
চারপাশে সবুজ গাছপালা,
মাঝেমাঝে ছোট ছোট জমি —
যেখানে ফসলের সবুজ আভা মিশে আছে বাতাসের গন্ধে।
পরিবেশটা শান্ত, মায়াময়, এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরা।
হঠাৎই আকাশ গর্জে ওঠে।
এক নিমিষে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায় —
মেঘের গর্জনের পরপরই ঝমঝম করে নামতে থাকে বৃষ্টি।
তার সঙ্গে দমকা হাওয়া, যেন ঝড় উঠেছে চারদিক থেকে।
কিরিস গাড়ি থামিয়ে ব্রেক চাপল।
—“এই অবস্থায় না যাওয়াই ভালো... একটু কমলে যাওয়া যাবে।”
বৃষ্টির শব্দে ভরে গেল চারপাশ।
লিসি চুপ করে বসে আছে,
চোখ জানালার দিকে —
জানালার কাচ বেয়ে ছোট ছোট পানির ফোঁটা গড়িয়ে নামছে,
প্রতিটা ফোঁটায় যেন একটা গল্প জমে আছে।
হঠাৎই লিসি জানালাটা একটু নামায়,
এক হাত বাড়িয়ে দেয় বাইরে।
বৃষ্টির ঠান্ডা ফোঁটা আর হাওয়ার ঝাপটা গায়ে লাগে —
তার মুখে এক অনাবিল শান্তি।
চুলগুলো এলোমেলো হয়ে বাতাসে উড়ছে,
আর তার চোখে ঠিক সেই শিশুর মতো আনন্দ —
যে প্রথমবার বৃষ্টি ছুঁয়েছে ভালোবাসার মতো করে।
কিরিস তাকিয়ে থাকে নিরবচনে —
একদৃষ্টে, নিঃশব্দে, গভীরভাবে।
যেন সময় থেমে গেছে এই কয়েক মুহূর্তের জন্য।
ওর চোখে সেই একটাই দৃশ্য —
লিসি।
যে মেয়েটাকে দেখতে দেখতে মনে হয়,
এই দেখা শেষ নেই...
এই দৃষ্টি থামবে শুধু মৃত্যুর সঙ্গে।
গাড়ির স্টেরিওতে হালকা করে বাজতে শুরু করে আগের সেই গান —
যেটা রওনা হওয়ার সময় বন্ধ হয়েছিল।
সুরের ভেতর দিয়ে আবার গলে আসে বৃষ্টির শব্দ।
গানটা বাজতেই,
লিসি হালকা গলায় গেয়ে ওঠে —
★ “হঠাৎ বৃষ্টিতে যায় ধুয়ে,
প্রেমেরই রংতুলি যায় ছুঁয়ে,
উদাসী কেউ যেন দূর থেকে,
তোরই নাম ধরে যায় ডেকে...” ★
তার কণ্ঠে যেন বৃষ্টির সুর মিশে যায় —
একটা অদ্ভুত মিষ্টি ছন্দে।
কিরিস শুনে হেসে ফেলে,
চোখ সরায় না ওর দিক থেকে —
— “কার নাম ডেকে যায়, লিসি শর্মা?”
লিসি কিছুক্ষণ চুপ থেকে হেসে ফেলে,
চোখে একটু দুষ্টু ঝিলিক নিয়ে বলে —
— “আপনাকেই ডাকে... শুনুন।”
কিরিস একটু মুচকি হেসে —
— “আমাকে?”
লিসি মাথা নাড়ে,
— “হুম, আপনাকেই... শুনুন না, আমি একটু নিচে নামবো।”
কিরিস তখন ফোন হাতে নিয়ে বলে —
— “না, বাইরে পানি হচ্ছে খুব। বাইরে গেলে পুরো ভিজে যাবে।”
লিসি মুখটা কাত করে, মিষ্টি অভিমান নিয়ে —
— “আহা, যাই না একটু... একটুখানি!”
কিরিস চোখ নামিয়ে ফোনের দিকে তাকায়,
শান্ত গলায় বলে —
— “না, এখন নয়।”
লিসি বুকে হাত গুজে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে —
বৃষ্টি ততক্ষণে আরো জোরে নামছে,
জানালার কাচে প্রতিটা ফোঁটা যেন তার মনখারাপের শব্দে টুং টুং বাজছে।
কিরিস নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে —
গান বাজছে, বৃষ্টি ঝরছে,
আর দু’জনের মাঝখানে জমে থাকা নীরবতা
ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে এক মায়াময় ভালোবাসায়।
বেশ মিনিট খানিক পরে লিসি কিছু না বলেই গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়ে।
কিরিস — “লিসি! না—”
কথাটা শেষ করার আগেই বৃষ্টির ধারা যেন তার কণ্ঠরোধ করে দেয়।
লিসি ততক্ষণে ছাতা না নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে। হালকা বাতাসে তার গাউন ফ্রকের ঘের উড়ছে, চুলগুলো গাল ছুঁয়ে নাচছে, বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লেগে একেবারে ভিজে যাচ্ছে সে।
কিরিস বিরক্ত কিন্তু চুপচাপ — চোখ সরাতে পারছে না।
হাতের ছাতাটা তুলে নিয়ে তবুও নেমে যায় সে, ধীরে ধীরে লিসির কাছে এসে দাঁড়ায়।
তবুও কিরিস নেমে গেল গাড়ি থেকে, যেন বাধ্য হয়েই।
মাটিতে পা দিতেই বৃষ্টির ঠান্ডা পানিটা তার জুতোর নিচে ছলকে উঠল।
লিসি তার দিকে তাকিয়ে হালকা মুচকি হাসল।
কিরিস কিছু না বলে পাশে দাঁড়িয়ে গেল, ছাতাটা লিসির মাথার ওপরে ধরে।
দুজনের মাঝে একদম অল্প দূরত্ব— এতটাই কম, যে লিসির গাউনের কাপড়টা কিরিসের হাতে ছুঁয়ে আছে।
কিরিস — “পাগল নাকি তুমি? এইভাবে ভিজলে ঠান্ডা লাগবে।”
লিসি হেসে বলে — “তাতে কী হয়েছে? ”
কিরিস ছাতা তার মাথার উপর ধরে রাখে, কিন্তু লিসি ছলছলে চোখে তাকিয়ে বলে —
“আমাকে একটু ভিজতে দিন না। নানু কিন্তু আমাকে ভিজতে দিত না! এজন্য চুরি করে ভিজতে হতো, আজকে একটু স্বইচ্ছাতে ভিজতে দিন,আর আমি একা কেন ভিজবো !”
এই বলে ছাতাটা হালকা এক ঝাঁকিতে কিরিসের হাত থেকে নামিয়ে ফেলে দেয়।
দুজনের মাথার উপর এখন শুধু বৃষ্টি, অঝোরে।
লিসি চোখ বন্ধ করে মুখটা তুলে ধরে আকাশের দিকে,
তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কিরিসের বুকের ভেতর কিছু একটা নরম করে দেয়।
সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর নীরবে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় রাস্তার একপাশে—
একটা পুরনো দোকানের মতো জায়গা, অর্ধেক ভাঙা, কিন্তু ছাউনি দেওয়া।
সেখানেই গিয়ে দাঁড়ায় কিরিস। ছাউনির দেওয়া জায়গাশয় দাঁড়িয়ে থেকে তাকিয়ে থাকে,
তার চোখে শুধু একটাই দৃশ্য—
বৃষ্টিভেজা লিসি, ভেজা চুল, ঠোঁটের কোণে একটা অব্যক্ত হাসি,
আর সেই হাসির মধ্যে এমন কিছু আছে যা কিরিসের পুরো পৃথিবিটাকেই থামিয়ে দেয়।
আকাশ এখন একেবারে অন্ধকার—ঝড়ো বাতাসে চারপাশের গাছগুলো দুলছে, আর রাস্তার আলোয় কুয়াশা মিশে এক অদ্ভুত রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করেছে।
লিসির গায়ে তার navy blue রঙের লং gown-ফোরাক, যা বৃষ্টির জলে ভিজে গাঢ় নীল হয়ে উঠেছে।
চুলগুলো ভিজে গাল ছুঁয়ে পড়ছে, চোখের পলকেও পানির ফোঁটা জমে আছে।
কিরিসের গায়ে সাদা শার্টের উপর তার navy blue লং কোট, কোলারে বৃষ্টির পানি জমে ঝরছে টুপটাপ করে।
কিরিস দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক কদম দূরে,
বৃষ্টির শব্দে লিসির কণ্ঠ হারিয়ে যায়, তবুও যেন কিছু একটা বলে উঠছে সে নিজের সঙ্গে—
“এমন বৃষ্টি যদি সারাজীবন থাকে... আমি কোনোদিন ক্লান্ত হবো না...”
কিরিস কাছে এসে নিচু গলায় বলে —
“তুমি পাগল হয়ে গেছো লিসি শর্মা।”
লিসি পিছনে না তাকিয়ে বলে —
“পাগল তো হয়েছি অনেক আগেই, আপনি জানেন না?”
কিরিস ছাতাটা মাথার উপর ধরে,
বৃষ্টির ফোঁটায় তার মুখে আলোর প্রতিফলন—
কিন্তু লিসি হেসে ছাতার হাতল ধরে টান দিয়ে সরিয়ে নেয়, ছাতাটা একপাশে পড়ে যায় রাস্তায়।
লিসি — “ছাতার নিচে এই পৃথিবী দেখা যায় না মিস্টার ।
ভেজার মধ্যে একটা স্বাধীনতা আছে... আর যেটা আপনি বুঝবেন না।”
বৃষ্টি থামার কোনো নাম নেই।
রাস্তার আলোয় কাঁচের মতো ভিজে উঠেছে চারপাশ।
লিসি দাঁড়িয়ে আছে, গায়ে navy blue ফোরাকটা বৃষ্টির পানিতে গাঢ় হয়ে ঝুলে পড়েছে।
চুলগুলো ভিজে গাল বেয়ে নামছে, ঠোঁটে একফোঁটা কাঁপা হাসি।
কিরিস কয়েক কদম দূরে, চোখ নামিয়ে নিচু গলায় বলে —
— “না, আমি বুঝি… কিন্তু এটাও সত্য যে আমার এখন এই বৃষ্টিকে দেখলে ঘৃণা লাগছে।”
লিসি অবাক হয়ে তাকায় —
“ঘৃণা? কেন?”
কিরিসের চোখে হালকা লালচে ঝিলিক,
তার কণ্ঠটা নিচু, ভারী আর গভীর —
— “কারণ সে তোমাকে ছুঁতে পারছে…
তোমার চুলে, মুখে, গলায়, গায়ে—
প্রতিটা ফোঁটা তোমায় ছুঁয়ে যাচ্ছে অনুমতি ছাড়াই,
কিন্তু আমি পারছি না।”
বাতাস এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় যেন।
লিসির চোখে জল না বৃষ্টির ফোঁটা, বোঝা যায় না।
সে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে, কথাহীন।
এই মানুষটা কেমন—
যে বৃষ্টিকেও ভালোবাসার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে,
যে ঈর্ষা করে পানির ফোঁটার সঙ্গেও!
লিসির ঠোঁটে মৃদু একটা হাসি ফুটে ওঠে,
চোখ নামিয়ে আস্তে বলে —
— “আপনি এক অদ্ভুত মানুষ মিস্টার কিরিস রায় চৌধুরী।”
কিরিস হালকা এগিয়ে আসে, চোখে স্থির দৃষ্টি —
—“হ্যাঁ… তোমার জন্য অদ্ভুতই হয়েছি।”
বৃষ্টির ফোঁটা তখনো ঝরছে,
দুজনের মাঝে নিঃশব্দে একটা অদ্ভুত ভালোবাসার কম্পন ছড়িয়ে পড়ে।
তার navy blue ফোরাকটা বাতাসে দুলে ওঠে,
আর বৃষ্টির ফোঁটায় সেই হাসিটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই বলে কিরিস আবার ছাউনির নিচে চলে যায়,আর লিসি মনের আনন্দে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে
লিসিকে আজ এমন মন খুলে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখে,
কিরিসের চোখের সামনে ভেসে উঠে যায় তেরো বছর আগের সেই দিনটা।
শহরের আলো মুছে গিয়ে স্মৃতির পর্দায় খুলে যায় এক পুরোনো দৃশ্য—
তখন তাদের বয়সের পার্থক্য অনেক।
কিরিস তখন পনেরো বছরের এক কিশোর,
আর লিসি… মাত্র পাঁচ।
মির্জা বেগমের এক বান্ধবীর মেয়ে মেঘের বিয়ে ছিলো সেদিন।
বিয়ের ঘরজুড়ে ব্যস্ততা, হাসি, কান্না, আর বিদায়ের বিষণ্ণতা। বরযাত্রীরা চলে গেছে, আত্মীয়স্বজনেরা ভিজে ভিজে ছাউনি নিচে কথা বলছে।
বাড়ির দ্বিতীয় তলার এক কোণার বারান্দায় বসে আছে পনেরো বছরের জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরী।
মুখে কোন হাসি নেই, বরং অদ্ভুত এক শান্ত রাগ মিশে আছে তার চেহারায়।
পরনে কালো রঙের হুডি, হুডির টুপিটা টেনে মুখ প্রায় ঢেকে রেখেছে। চোখদুটো ধারালো—নিশ্চুপ, তবুও ভয় জাগানো।
এই বয়সেই তার মধ্যে এমন এক authority, এমন এক গাম্ভীর্য — যেন সে চারপাশের সবাইকে অবচেতনে নিয়ন্ত্রণ করছে।
কারো সাথে তার তেমন কথা হয় না, প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেই না প্রায়। তবুও যারা জানে, তারা জানে—এই ছেলেটার ভিতরে একটা ভয়ঙ্কর শান্ত আগুন আছে।
বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়তেই কিরিসের চোখ অন্যমনস্ক হয়ে গেলো,
কিন্তু হঠাৎ থমকে গেলো—
বাড়ির নিচের বাগানে, এক ছোট্ট পরি বৃষ্টিতে নেচে বেড়াচ্ছে।
সাদা-গোলাপি ফ্রক পরা, লম্বা ভেজা চুল গাল বেয়ে লেপ্টে গেছে,
মুখে নিষ্পাপ হাসি—
আর হাত দুটো আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে, যেন বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করছে।
কিরিসের বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো—
চোখের সামনে যেন কোনো স্বপ্ন নেমে এলো বাস্তবে।
সে তাকিয়ে রইলো…
তার ৫ বছরের ছোট্ট লিসির দিকে।
এই মেয়েটাকে সে আগে কখনও দেখেনি,
কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে যেন বহু জন্মের চেনা।
তার চোখ আর সরছে না,
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা পড়ছে লিসির গায়ে,
আর প্রতিটি ফোঁটার সাথে কিরিসের মনে হচ্ছে সে নিজেও ভিজে যাচ্ছে,
কোনো এক অদ্ভুত অনুভূতিতে, যা তার বয়সের চেয়ে অনেক গভীর।
একটু পরে একজন মেয়ে এসে লিসিকে নিয়ে ভিতরে যায়
ভেতরে গিয়ে ভেজা জামা বদলে, এক কাপ গরম দুধ হাতে নিয়ে
লিসিকে নিয়ে গিয়ে বসলো সেই একই বারান্দায় —
যেখানে একটু আগে বসে ছিলো কিরিস।
কিরিসের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন—
যেন হঠাৎ পৃথিবীর সব বৃষ্টির শব্দ থেমে গেছে,
থেমে গেছে তার নিঃশ্বাসও।
সে নিজেকে আর সামলাতে পারলো না,
চুপচাপ গিয়ে দাঁড়ালো ছোট লিসির পাশে।
লিসি একদম তার দিকেই তাকিয়ে আছে, বড় বড় চোখে,
আর সেই চোখে কিরিস হারিয়ে গেলো।
তার গলা হালকা কেঁপে উঠলো, তবুও কণ্ঠস্বর নরম—
—“এই মেয়ে… তোমার নাম কি?”
ছোট্ট লিসি গরম দুধের গ্লাসটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে বসে আছে।
ভেজা চুলগুলো গাল ছুঁয়ে সামনে ঝুলে পড়েছে,
চোখদুটো ডাগর, ভিজে আর চকচকে।
সে মাথা তুলে তাকালো—
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পনেরো বছরের সেই যুবকটাকে দেখে যেন মুহূর্তেই থেমে গেলো সময়।
হুডি পড়া, মুখের অর্ধেক ঢাকা,চোখের সামনে এলোমেলো চুল আর নীরব চোখের চাউনি
তবুও কী আশ্চর্য রকমের সুন্দর—
চোখদুটো যেন বিদ্যুতের মতো,
একবার তাকালে সরানোই যায় না।
লিসি থমকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ,
তারপর হালকা মুচকি হেসে বলে—
—“তুমি অনেক সুন্দর…”
কিরিস একটু অবাক হয়, ঠোঁটে অচেনা এক হাসি ফুটে ওঠে।
—“এটা তোমার নাম?”
লিসি চোখ বড় বড় করে মাথা নাড়ে—
— “না না… আমার তো সুন্দর নাম আছে।”
“হুম, সেটা কী?”
লিসি গর্ব মেশানো কণ্ঠে বলে—
—“লিসি শর্মা।”
কিরিস একটু ভুরু কুঁচকে বলে—
—“শর্মা…”
তার ঠোঁটে আবার হাসি ফিরে আসে।
লিসি ততক্ষণে কিরিসের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে ফেলে—
“আপনি অনেক সুন্দর।”
এই কথায় কিরিসের বুকের ভেতর কেমন যেন হালকা কাঁপন লাগে।
ধীরে ধীরে মাথা থেকে হুডিটা নামিয়ে নিলো—
ঘন কালো চুল, উঁচু নাক, তীক্ষ্ণ চোয়াল, সেই দৃষ্টি—
এক মুহূর্তে ছোট লিসির চোখ একেবারে থেমে গেলো।
মনে হলো যেন কোনো রাজপুত্রের মুখ দেখছে সে।
চোখের পাতা না ফেলেই তাকিয়ে থাকে লিসি।
তারপর আস্তে, নিঃশব্দে বলে—
— “আমি কি আপনার গালে একটু হাত দিতে পারি, ভাইয়া?”
কিরিস স্থির হয়ে যায় মুহূর্তের জন্য।
সে তো কাউকেই নিজের গায়ে হাত দিতে দেয় না—
কিন্তু এই ছোট্ট মেয়েটার কণ্ঠে এমন সরলতা,
যে কোনো রাগ, অহংকার, সব যেন গলে যায়।
কিরিস আস্তে করে হেসে ফেলে—
একটা এমন হাসি, যা যেন আগে কখনো তার মুখে দেখা যায়নি।
না জোর করে, না বাধ্য হয়ে—
এই হাসি যেন তার ভেতর থেকে নিজে নিজে বেরিয়ে এলো,
নরম, গভীর, আর অবিশ্বাস্যভাবে সুন্দর।
—“হুম… দিতে পারো,”
সে নিচু স্বরে বলে,
“তবে একটা শর্ত আছে।”
লিসির চোখদুটো চকচক করে উঠলো—
— “সত্যি! তাহলে বলেন, শর্ত কী? আমি মানছি…
নিচু হন, আমি একটুখানি হাত দেব, ঠিক আছে?”
কিরিস শর্ত বলার আগেই মেনে নিয়েছে,
মানে কেমন শর্ত হতে পারে সেটা বলার বাইরে—
কিছু না বলে মাথাটা নিচু করে লিসির মুখের কাছে নিয়ে আসে কিরিস।লিসি তো ছোট ছোট আঙুল দিয়ে হালকা করে ছুঁয়ে দেয় কিরিসের গাল।তার জীবনে প্রথম—
সাহস করেছে কোনো নারী,যদিও এত ছোট, তবুও লিসিই প্রথম মেয়ে মানুষ। যে কিনা কিরিসের গালে হাত দিয়েছে,
সেটাও আবার তার অনুমতি নিয়ে।
কিরিস উঠবে এমন সময়—
ছোট লিসি টুক করে চুমু খেয়ে বসে কিরিসের গালে!
কিরিস একদম থ মেরে গিয়েছিল।
এমনটা সে কল্পনাও করেনি।
উঠে দাঁড়িয়ে বুকের বাম পাশে হাত রাখে,
কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতি—
হৃদস্পন্দন যেন হঠাৎ দ্বিগুণ গতিতে চলছে।
তার পনেরো বছরের জীবনে
এই প্রথম এমন কিছু অনুভব করছে,
যার নাম সে জানে না—
আবেগ, প্রেম, ভালোবাসা, নাকি মায়া, নাকি ছলনা,
কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
কিন্তু একটুকু নিশ্চিত—
ছোট্ট মেয়েটা, যে তার সামনে বসে আছে,
সাধারণ নয়, অসাধারণ কিছু একটা ওর মধ্যে আছে।
এমন অনুভূতি আজ পর্যন্ত কেউ তাকে দিতে পারেনি।
কিরিস নিচু স্বরে বলে—
— “তুমি অনেক দুষ্টু দেখছি…”
লিসি হেসে জবাব দেয়—
— “কোথায়! তুমি অনেক সুন্দর ভাইয়া, তাই!”
কিরিস— “তাই বলে চুমু খাবে!”
— “তুমি বকবে নাকি? … নানু, আমি নানুর কাছে যাবো!”
লিসির চোখ ছলছল করে ওঠে,
ওকে এমন দেখে কিরিস হাত তুলে বলে—
— “এই, বকবো না! আরে কান্না করো না…”
ঠিক তখনই পিছন থেকে মির্জা বেগমের কণ্ঠ—
— “ওরে আমার মা, কী হয়েছে? নানুকে বলো, কে বকেছে তোমায়?”
এই সব কথার মাঝে হঠাৎ—
কিরিসের ভেতরের ছবিগুলো থেমে যায়।
ছোট লিসির সেই মিষ্টি হাসিটা, বৃষ্টিতে ভেজা ফোরাকের আওয়াজ,
সব যেন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়,
যেন কেউ তার স্মৃতির দরজায় হালকা টোকা দিয়ে বলছে—
“ফিরে আসো...”
আর ঠিক তখনই—
পাশ থেকে এক কোমল কণ্ঠে ভেসে আসে—
— “ভাইয়া…”
কিরিস চমকে উঠে বর্তমানের দিকে তাকায়।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে লিসি—
বৃষ্টিতে ভেজা নেভি ব্লু ফোরাক তার গায়ে লেপ্টে আছে,
চুলের ডগা থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।
ওর সেই মায়াবী মুখটা, চোখের কোণে মৃদু হাসি,
হাতে এগিয়ে আসছে কিরিসের দিকে—
—“এখানে আসেন কথা আছে…?”
কিরিস তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
অতীতের সেই ছোট লিসি,
এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তব লিসির মাঝে
এক মুহূর্তে সব পার্থক্য মুছে যায়।
সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দেয়,
লিসির হাতটা নিজের হাতে নিয়ে ওঠে—
চোখে যেন এক অদ্ভুত শান্তি, তবুও গভীর অস্থিরতা।
বৃষ্টি পড়ছে, আকাশ ভিজছে,
আর কিরিসের বুকের ভিতর
পুরোনো এক ভালোবাসা আবার নরমভাবে জেগে উঠছে।
বৃষ্টি তখনও ঝরছে — থেমে থেমে নয়, ছন্দের মতো পড়ছে টুপটাপ।
চারপাশে আলো-অন্ধকারের মিশেল, রাস্তার বাতির নিচে ভেজা জল জমে ছোট ছোট ছায়া তৈরি করছে।
লিসি কিরিসের সামনে এসে কোটের এক কানি ধরে হালকা টান দিয়ে বলে —
— “শুনুন না, এখান থেকে রিসোর্টের পথ মাত্র পাঁচ মিনিট... আমরা একটু হেঁটে যাই?”
কিরিস গম্ভীর চোখে তাকিয়ে বলে —
— “না, এমনিতেই অনেক ভিজে গেছো। এখন গাড়িতে চলো, না হলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
লিসি কোটটা আবার নাড়িয়ে বলে —
— “গাড়িতে গেলে তো গাড়িটাও ভিজে যাবে! আপনি ভিজেছেন, আমিও ভিজেছি— তাহলে কীসের এত ভয়?”
কিরিস বিরক্তভাবে বলে —
— “না মানে না।”
লিসি ঠোঁট ফুলিয়ে বলে —
—“আহা… আপনি কেমন প্রেমিক যে প্রেমিকাকে একটু বৃষ্টি বিলাস করতে দিচ্ছেন না!”
কিরিস হালকা মুচকি হাসে, ভিজে চুল কপালের উপর ঝুলে আছে—
— “ওহে আমার বৃষ্টি-বিলাসী, আমি এমনই প্রেমিক।”
লিসি মজা করে বলে —
—“তাহলে এত অধিকার ফলাতে আসবেন না, শুনলেন!”
কিরিস ঠোঁটে হালকা হাসি রেখে বলে —
— “এমনই আমার প্রেম,তোমাতে যে বাঁধা পড়ে আছি,তোমার হকের মধ্যে নিজেকে না-হক করে বাঁচি।”
লিসি চোখ বড় বড় করে বলে —
—“এখন কবিতা শোনার সময় না কবি মশাই, আপনার খাতায় লিখে রাখুন।
আমি গেলাম, একা একা ভালো লাগলে আসবেন— না আসলেও কিছু যায় আসে না।”
বলেই লিসি বৃষ্টির ভেতর একা একা এগিয়ে যায়।
কিরিস শুধু নীরবে তাকিয়ে থাকে —
ভেজা বাতাসে লিসির চুল উড়ছে, পদে পদে জল ছিটে উঠছে,
আর কিরিসের মুখে মৃদু হাসি—
— “কত বড় হয়ে গেছে মেয়েটা…”
সে গিয়ে হাতে থাকা ছাতাটা গাড়ির ভেতরে রাখে,
গাড়ি লক করে চাবিটা পকেটে ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় লিসির দিকে।
— “ওই, ওখানে দাঁড়াও।”
লিসি থেমে একটু বিরক্ত মুখে ঘুরে বলে —
— “ধুর! এই শালার জুতাটাও শয়তানি করছে… বারবার স্লিপ খাচ্ছে।
না, এটা পরে হাঁটতে পারবো না।”
বলে জুতা খুলে হাতে নেয়।
কিরিস সঙ্গে সঙ্গে বলে —
— “জুতা খুলছো কেন? পায়ে লাগবে… খালি পায়ে হাঁটবে এই রাস্তায়?”
লিসি হেসে বলে —
— “আরেহ, কিছু হবে না!
জুতো পরে হাঁটলে তো স্লিপ খেয়ে পড়ব নিশ্চিত, পানি পড়ে তেলচিটে হয়ে গেছে।”
কিরিস সামনে এসে হাত বাড়ায়—
—“আমার কাছে দাও।”
লিসি জুতাটা বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু চোখে দুষ্টু হাসি—
—“দিচ্ছি তো… কিন্তু এখন আপনি হাতে নিয়ে হাঁটবেন?
মানুষজন দেখলে ভাববে প্রেমিক প্রেমিকার চাকর!”
কিরিস জুতাটা হাতে নিয়ে তাকিয়ে থাকে, ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক মারাত্মক মুচকি হাসি ফুটে ওঠে—
—“হুম, তেমনই ভাবুক… এই পৃথিবীতে আমি না হয় শুধু তোমার চাকর হলাম “
বৃষ্টির পানিতে তাদের দু’জনের ছায়া এক হয়ে যায়,
আর সেই ভেজা রাস্তাটা হয়ে ওঠে তাদের অঘোষিত ভালোবাসার সাক্ষী।
সামনের দিকে হাঁটছে তারা, চারপাশে এখনো হালকা বৃষ্টি,
মাটির গন্ধ, পাতা নড়ার শব্দ, দূরে বজ্রের গর্জন।
আশপাশ থেকে কয়েকটা গাড়ি যায়,
লোকজনের আনাগোনা কম, কিন্তু তাদের দেখা এড়াতে পারছে না কেউ।
এই ভিজে বাদলের বিকেলে,
রাস্তার আলোয় দুজনের সেই হাঁটাটুকু যেন কোনও সিনেমার দৃশ্য।
তবে যে দৃশ্য সবার দৃষ্টি আটকে দিচ্ছে—
সে আর কেউ নয়, লিসি।
বৃষ্টিতে ভেজা তার গায়ের ওপর দিয়ে
পানি ফোটাগুলো গড়িয়ে পড়ছে যেন মুক্তার রেখা,
চুলগুলো ভিজে কপালে লেপ্টে আছে,
চোখে ভেজা আবেশ, ঠোঁটে এক অচেনা লাজুক হাসি।
তার নেভি ব্লু গাউনের কাপড় ভিজে গিয়ে
শরীরের সাথে লেগে আছে—
যেন আঁকিয়ে দিয়েছে সৃষ্টিকর্তার হাতে গড়া নিখুঁত এক রেখাচিত্র।
তাকে দেখে মনে হয়—
কোনও কবি যদি জীবনভর একটিমাত্র রূপের জন্য ছন্দ লিখে যেতে চায়,
সে রূপ হবে এই মেয়েটির।
কিরিসের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন এক আগুন জ্বলে ওঠে,
চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, চোখ দুটো হয়ে ওঠে তীক্ষ্ণ, হিংস্র।
সে এগিয়ে গিয়ে নিজের গায়ের লং কোটটা খুলে লিসির গায়ে পরিয়ে দেয়।
লিসি অবাক হয়ে বলে —
—“এটা কি করছেন?”
কিরিস নিচু গলায়, অথচ প্রতিটি শব্দে এক ঝড় লুকিয়ে বলে —
— “কি করবো বলো…
অন্যের নজর আমার সহ্য হয় না।
আমার গার্লফ্রেন্ড এত সুন্দর যে, বৃষ্টিও তার পিছু ছাড়ছে না।
এখনো দেখো, বৃষ্টি নামছে— যেন তোমার গায়ে হাত দিতে মরিয়া হয়ে আছে।
কিন্তু ওরা? আশপাশের এই মানুষগুলো?
ওদের চোখে এখন তুমি— আমার সবচেয়ে বড় ভয়।”
বলেই কিরিস এক পা এগিয়ে লিসির কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নেয়,
তার চোখ জ্বলছে, গলার স্বর কাঁপছে—
—“যেটা আমার, সেটা শুধু আমার।
যেটা দেখার অধিকার আমার, সেটা কেউ দেখতে পারবে না।
যেটা ছোঁয়ার অধিকার আমার, সেটা ছোঁয়ার অধিকার এই পৃথিবীতে আর কারও নেই।
তুমি শুধু আমার, লিসি শর্মা।
তাই যতটুকু দেখা দরকার, মানুষ ততটুকুই দেখবে—
এর বেশি নয়।”
লিসি শুকনো ঢোক গিলে ফেলে, কণ্ঠে হালকা কাঁপন —
— “এইসব কি করছেন আপনি… রাস্তার মাঝে, সবাই দেখছে তো… চলুন, দ্রুত।”
কিরিস নিঃশব্দে হাত ছেড়ে দেয়,
কিন্তু চোখে সেই একই তীব্র দৃষ্টি রয়ে যায়—
যে দৃষ্টিতে ভালোবাসা যেমন আছে, তেমনি আছে ভয়ঙ্কর এক অধিকারবোধ।

কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছে যায় রিসোর্টের সামনে।
সবার চোখ তাদের দিকে,
দুজনের চুল ভিজে গেছে, জামাকাপড় গায়ে লেপ্টে আছে—
যেন বৃষ্টির সাথে তারা নিজেরাও এক হয়ে গেছে।