তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :32

কিরিস ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল —
— “আমার Good morning kiss নিতে, লিসি শর্মা।”
লিসি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল —
— “এহ্‌... এটা নিতে আবার আমার ঘরে আসা লাগে?”
কিরিস ঠান্ডা স্বরে, কিন্তু তাতে খুনসুটি মিশে —
— “কেন, তুমি যেতে নাকি?”
লিসি তাড়াতাড়ি বলে —
— “না মানে... আপনি সরুন বলছি প্লিজ! কেউ চলে আসবে, বাজে দেখাবে এভাবে।”
কিরিস আরও কাছে ঝুঁকে বলে —
— “আগে কিস, তারপর সবকিছু।”
লিসির চোখে বিরক্তি, মুখে অসহায়তা।
এমনভাবে কিরিস ওর উপরে আছে যে নড়াচড়া করাও কঠিন।
মনে মনে জ্বলছে লিসি, “এই লোকটা একদম সহ্য হয় না!”
শেষমেশ পরিস্থিতি থেকে বাঁচার উপায় খুঁজে বলে উঠল —
— “আচ্ছা ঠিক আছে, দিবো... কিন্তু আপনি আগে উঠুন প্লিজ। কেমন লাগছে আপনাকে, উঠুন তো বাজে লোক!”
কিরিস হালকা হাসল, একদম নিচু গলায় —
— “উঠতে হবে কেন? এইভাবেই নিচ্ছি। আমার তো কোনো অসুবিধা নেই... তুমিও তো রাজি।”
বলে কিরিস হঠাৎ লিসির ঠোঁটের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
লিসি আতঙ্কে বলল —
— “এই না... না... উমমম!”
কিন্তু ততক্ষণে কিরিসের ঠোঁট ছুঁয়ে গেছে তার ঠোঁটকে।
একটা গভীর, ধীর, তীব্র চুমু — যেটা থেকে লিসি নিজেকে ছাড়াতে পারছে না।
ওর হাত-পা ছুঁড়ছে, কিন্তু কিরিসের শক্ত বাহুতে বাঁধা পড়ে আছে পুরোপুরি।
ঠিক তখনই বাইরে করিডোর থেকে পায়ের শব্দ ভেসে এল।
পায়ের শব্দটা কাছে আসছে ক্রমে —
লিসির বুকের ভিতর কেঁপে উঠল। নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে কিরিসকে সরানোর চেষ্টা করতে থাকে,, লিসি শুধু মনে হচ্ছে যদি কেউ দেখে ফেলে...!
ভয়ে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল —
— “উমম... !”
কিরিস থেমে গেল, মুখ তুলল লিসির ঠোঁট থেকে। এক ভুরু উঁচু করে মুচকি হেসে বলল —
— “কি হয়েছে?”
লিসি —" মনে হচ্ছে কেউ আসছে "
কিরিস —" তো আমি কি করবো! "
লিসি হাঁপাতে হাঁপাতে বলে —
— “আরো বলছি না... কেউ আসছে বললাম তো!”
কিরিসও বুঝে ফেলেছে কে আসছে, তবু মুখে বিন্দুমাত্র ভয় নেই, বরং শান্ত।হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে গলা ভেসে এলো অভির —
— “এই লিসি! আর কত ঘুমিয়ে থাকবি? উঠ দাড়া, না হয় আমি কিন্তু এসে তোর গায়ে পানি ঢেলে দিব!”
অভির আওয়াজে কিরিসের মুখের এক্সপ্রেশন মুহূর্তেই বদলে গেল।
লিসি এক দমে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে —
এই মানুষটা কি পাগল নাকি! কিরিসের চোখে একটুখানি বিরক্তি, একটুখানি মজা, আর অদ্ভুত এক জেদ।
লিসির দিকে তাকিয়ে যেন বলল চোখে চোখে —
“তোমার দিন শেষ !”
লিসির অবস্থা তখন কাঁদো কাঁদো।
মনে হচ্ছে দুই খালাতো ভাইয়ের মাঝখানে ফেঁসে গেছে সে —
একজন ঘরের ভেতর, অন্যজন দরজার বাইরে।
অভি নিচে বসে ফোন চালাচ্ছিল, হঠাৎ মনে পড়ে গেল — মা, মানে পাপড়ি, তাকে কিছু আনতে বলেছিলেন।
ভাবল, “লিসিকে একবার ডেকে নিয়ে আসি, একসাথে যাওয়া যাবে।”
এই ভেবেই এখন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকছে,
আর ভিতরে চলছে নিঃশব্দ এক যুদ্ধ —
লিসির মাথা কাজ করছে না — বাইরে অভির ডাক, ভেতরে কিরিসের চোখে সেই নির্লজ্জ শান্তি।
মুহূর্তের মধ্যে লিসি যেন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—
অভি যদি এখন ঢুকে পড়ে তাহলে শেষ!
অভি দরজা খুলে ভিতরে আসতে থাকে আর দরজা খুলার আওয়াজ শুনে লিসি দ্বিধা না করে তাড়াতাড়ি পাশে থাকা চাদরটা টেনে কিরিসকে নিজের মধ্যে ঢেকে নিল।
কিরিস একটুও অবাক হলো না, বরং বিন্দাস হেসে সেই চাদরের নিচেই লিসিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। লিসির মাজা আঁকড়ে ধরে বুকে মাথা রাখে।
তার ঠোঁটে এক দুষ্টু মুচকি হাসি—
যেন বলছে, “এই তো ঠিক জায়গায় এসেছি।”
লিসি কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল —
— “এই আপনি ছাড়ুন! অভি দেখে ফেলবে এমন করলে...”
কিরিস শান্তভাবে বলে —
— “দেখুক, আমি তো তোমার স্বপ্নে এসেছি সকালবেলা।”
লিসির গাল লাল হয়ে গেল, কিন্তু এখন কিছু বলার অবস্থায় নেই।
অভি এবার ভিতরে এসে আবার বলল —
— “এই লিসি! এখনো উঠিসনি? ঘুম পাড়ানি গান গাইব নাকি?”
লিসি মরিয়া হয়ে চাদরের ভেতর থেকে উত্তর দিল —
— “না... না অভি, আমি উঠছি... একটু পরে উঠছি,তুই যা আগে!”
অভি বলল —
— “তুই কি অসুস্থ নাকি? কিরে এইভাবে কথা বলছিস কেন?”
লিসি বিছানায় আধা উঠেই বলল —
— “না অভি, একটুও না... মাথাটা একটু ধরেছে, আমি একটু পরে নিচে আসব।”
অভি কিছুটা সন্দেহের ভঙ্গিতে বলল —
— “ঠিক আছে, আমি নিচে যাচ্ছি, তুই দেরি করিস না কিন্তু।”
লিসি —" হুম, যা আমি আহহহ......"
তার আচমকা চিৎকারে অভি কপাল ভাঁজ করে পাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
—"কি হয়েছে? তোর পাশে যেন কেউ আছে। দেখি তো।"
লিসি দ্রুত মাথা নিচু করে উত্তর দিল—
—"না, একদম না, আমার পাশে… আরোবি… হ্যাঁ, আরোবি ঘুমিয়ে আছে। আর হ্যাঁ, এভাবে মেয়েদের রুমে ঢোকবি না। এখন আমি উঠছি না। তুই নিচে যা, আমি ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে একেবারে আসব।"
অভি কিছুটা সন্দিহান হয়ে বলল—
—"কিন্তু আমি তো আরোবিকে বাইরে দেখেছি। মনে হচ্ছে সে ঘুমোয়নি।"
লিসি অস্থির হয়ে চুপচাপ কয়েক মুহূর্ত, তারপর বলল—
—"আমি বলছি তা … তোর বিশ্বাস হচ্ছে না। যা, তুই এখান থেকে চলে যা।"
অভি একটু খারাপ লাগলো, মনে হলো লিসি তার সঙ্গে সরাসরি এমন কথা বলছে না। তারপরও বোঝার চেষ্টা করল, যাচাই করতে চাইল, কারণ পাশের আরবি শুয়ে আছে, তাই চিৎকারের কারণ কিছুটা সন্দেহজনক।
অভি—
—"হুম, ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। কিন্তু তুই কেন চিৎকার করলি?"
লিসি ভয়ে ছোট্ট একটা কণ্ঠে বলল—
—"ওই… চুলে টান লাগেছিল… তাই ব্যথা… আহ…"
অভি হালকা ভোঁচকা হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল—
—"আবার?"
লিসি অসহায় হয়ে কেবল হুঁশিয়ার মতো উত্তর দিল—
—"হুম…"
লিসি কিছু বলতে পারছে না, কারণ কিরিস তার মাজায় হাত রেখে ছোট ছোট চিমটি কাটছে। লিসি ঠিক বুঝতে পারছে না, এটা কেন করছে, শুধু মনে হচ্ছে এটা কেবল তাদের মধ্যে, আর অভি যেন বোঝে যে পাশে থাকা ব্যক্তি —আরোবি নয়—বরং কেবল কিরিস।
অভি একটু মাথা নাড়ল—
—"ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি।"
অভি যখন ঘুরে চলে গেল, লিসি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই পারল না—
কারণ চাদরের নিচে কিরিস তখনো ওর কোমর জড়িয়ে রেখেছে।
লিসি ধমকের স্বরে বলল —
— “এই, ছাড়ুন এখন, শেষ হয়ে গেছে নাটক!”
কিরিস এক চোখ বন্ধ করে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে বলল —
— “তুমি তো বললে উঠতে না... আমি ভেবেছিলাম তুমি সত্যিই চাও আমি থাকি।”
লিসি বিরক্তিতে ঠোঁট কামড়ে বলল —
— “আপনি এমন করেন কেন বলুন তো? মাথা খারাপ করে দেন আমার!”
কিরিস হেসে বলল —
— “এই তো আমার সকালবেলার ব্যায়াম — তোমার রাগ দেখলে দিনটা ভালো যায়।”
বলেই চুপিচুপি লিসির হাতের কাছে এক চিমটি কাটল।
লিসি চমকে উঠল —
— “আআহ! ভইয়া! এবার কিন্তু সত্যি মেরে ফেলব আপনাকে!”
কিরিস হেসে হেসে বলল —
— “তোমার এই রাগটাই তো সবচেয়ে সুন্দর।”
লিসি বিরক্ত হয়ে চাদরটা ছুঁড়ে মাথায় মারল কিরিসের —
— “চুপ করুন! না হলে এখনই লাথি মেরে ফেলে দেবো!”
কিরিস হালকা হাসি চেপে বলল —
— “ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি... কিন্তু মনে রেখো, আমার Good Morning এখনো অসম্পূর্ণ।”
বলে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে পড়ল কিরিস।
আর লিসি বালিশে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল —
— “বাজে লোক!”
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে তখনও ছিল একটুখানি অনিচ্ছুক হাসি...
৯:৩০
নিচতলা, রিসোর্টের বড় হলঘর
রিসোর্টজুড়ে আজ এক ভিন্ন উচ্ছ্বাস। সকালের রোদ কাচের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ছে, কেউ কেউ গাছপালার মধ্যে ঘুরছে, কেউ সাজসজ্জার তদারকি করছে। নিচে বড় হলঘরে বসে গল্প করছে অভি, রিহান, কাবির, ইয়াবি।
কাবির সোফায় আধশোয়া ভঙ্গিতে বসে বলল —
— “এই, কেউ লিসিকে দেখেছিস? সকাল থেকে উধাও।”
ইয়াবি অভির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল —
— “তুই না ওকে ডেকে তুলতে গেলি? কি হলো?”
অভি একটু গম্ভীর মুখে বলল —
— “তুলি নাই, ঘুমাচ্ছিল। মেয়েটা সারারাত জেগেছে মনে হয়।”
রিহান মুখে হাসি টেনে বলে —
— “তুই কি এখন চিন্তায় পড়ছিস নাকি, ভাই? নাকি চিন্তাটা অন্য কিছু?”
অভি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল —
— “বাজে কথা বলিস না। চিন্তা কিসের? বন্ধু আমার।”
কাবির মুচকি হেসে বলে —
— “বন্ধু তুই একটু বেশি কেয়ার করিস কিন্তু।”
সবাই হেসে উঠতেই ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল লিসি।
গোলাপি রঙের হালকা সুতির পোশাক, মুখে ঘুম জড়ানো ক্লান্তি কিন্তু চোখে মায়া।
পাশেই হালকা সাদা শার্ট পরে, গলায় ঠান্ডা ভাব নিয়ে কিরিসও নিচে নামছে ধীরে ধীরে — যেন কিছুই হয়নি সকালে।
দুজনের চোখ একবারের জন্য মুখোমুখি হতেই সময়টা থেমে গেল।
লিসির বুক ধড়ফড় করছে, কিরিসের মুখে সেই calm but dangerous হাসি।
অভি সেটা খেয়াল করলো — ঠোঁট কামড়ে অন্যদিকে তাকাল, যেন কিছু না দেখে ফেলার চেষ্টা করছে।
ইয়াবি মজা করে বলল —
— “এই লিসি, এইভাবে নামছিস কেন? এতো দেরি করে উঠেছিস।”
লিসি তাড়াতাড়ি নিজের গাল স্পর্শ করে বলল —
— “না মানে... ঘুমই ভাঙে নি, এখনই উঠলাম।”
রিহান —
— “ভালো ঘুম হলে মুখে এই glow আসে নাকি !”
কিরিস টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে কফির কাপটা হাতে তুলে নেয়, হালকা ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলে —
— “হয়তো ঘুম নয়, কারো উপস্থিতিতেই এসেছে এই glow।”
সবাই হেসে উঠল, শুধু লিসির গাল লাল হয়ে গেল লজ্জায়।
অভি একবার কিরিসের দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নেয়, চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি।
পাপড়ি (অভির মা) তখন পাশ থেকে এসে বলল —
— “সবাই বসে পড়ো, সকালের নাশতা তৈরি। লিসি মা, তুই কিরিসকে সার্ভ করে দে, ওর হাতে তো কাটা আছে।”
লিসির মুখ শুকিয়ে গেল, কিরিস ঠোঁটে এক গোপন হাসি লুকিয়ে বসে পড়ল।
লিসি চুপচাপ টেবিলের পাশে এসে থালায় ভাত, ডিম, কফি এগিয়ে দিল।
অভি বসে সবকিছু নিরবে দেখছে — তার চোখে যেন জ্বলন্ত ঈর্ষার ছায়া।
কিরিস হাত বাড়িয়ে থালা টানার সময় লিসির আঙুলে হালকা ছোঁয়া লাগতেই বলল নিচু গলায় —
— “সকালটা সুন্দর হয়ে গেল।”
লিসি একটুখানি থেমে গেল, তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল —
— “চুপ করুন।”
কিন্তু তার মুখের হাসিটা চাপা থাকল না।
অভির চোখের দিকে পড়ল সেই হাসি — আর তার বুকের ভেতর হঠাৎ এক টান খেলে গেল।
সবাই আরাম করছে খাওয়া শেষে
রিসোর্টের হলঘরে হালকা হাসির আওয়াজ, কেউ সোফায় হেলান দিয়ে বসে, কেউ কফি কাপ হাতে আড্ডা দিচ্ছে।
কিরিস, কাবির, রিহান, ইয়াবি সবাই একসাথে বসে আছে।
লিসি একপাশে বসে আরোবিদের সাথে গল্প করছে
এমন সময় পাপড়ি এগিয়ে এসে অভিকে বলে
— “ তোকে তো আমি বলেছিলাম যে ওই ড্রেসটা একটু ঢিলা হয়েছে, তাই ফিটিং করাতে পাঠিয়েছিলাম। আজ সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান, ওইটা নিয়ে আসবি তো?”
অভি তখন ফোন দেখছিল, মুখ তুলে বলে —
— “জ্বি আম্মু , আনতে হবে,, আমি নিয়ে আসব। লিসি, তুই চল, একসাথে যাই।”
পাপড়ি খুশি হয়ে বললেন —
— “ও ঠিকই বলেছে। দুজন একসাথে নিয়ে আয় নাহলে আমার এ ছেলে একা যাবে না।”
লিসি পাপড়ির মুখের উপর কিছু বলতেও পারছে না, কিরিসের দিকে একবার তাকিয়ে মৃদু সরে বলে
—" ঠিক আছে আন্টি "
অভি মুচকি হেসে বলে —
— “ঠিক আছে মা, বাইকটা বের করে রেখেছি। আমি একটু রেডি হচ্ছি।”
লিসি মাথা নিচু করে চুপ থাকে।
কিরিস তখন সোজা সোফার কোণায় বসে, একটা কলা হাতে নিয়ে খেতে শুরু করেছে।
সবাইর নজর অন্যদিকে, কিন্তু ওর মুখে সেই চেনা দুষ্টু ভাবটা।
খাওয়া শেষ করে কিরিস ধীরে ধীরে কলার খোসাটা আঙুলে পাকিয়ে ধরে সিঁড়ির দিকে হালকা ছুড়ে দিল।
খোসাটা গিয়ে সিঁড়ির নিচে পড়ে রইল — একদম চোখে না পড়ার মতো জায়গায়।
রিহান হালকা চোখ বড় করে ফিসফিস করে কাবিরকে বলে —
— “এইটা ইচ্ছে করেই দিল মনে হয়…”
কাবির মাথা নাড়ে, “চুপ” ইশারা দেয়, কিন্তু ইয়াবি হেসে ফেলে।
ঠিক তখনই অভি বলল —
— “আমি উপরে যাচ্ছি, জ্যাকেটটা আর চাবি নিয়ে আসি।”
অভি উঠে সিঁড়ির দিকে হাঁটছে, আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
কিরিস ঠান্ডা গলায় বলে উঠল —
— “লিসি, দুধ খাবো।”
সবাই চুপ!
এক সেকেন্ডের জন্য পুরো হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কাবির, রিহান, ইয়াবি,আরোবি জারা,সুরভী — সবাই হা করে কিরিসের দিকে তাকিয়ে রইল।
লিসি হতভম্ব! মুখ লাল হয়ে গেল।
অভি থমকে দাঁড়াল, অবাক হয়ে পেছন ফিরে তাকাল —
— “কি?”
এবং ঠিক সেই সময়, তার পা গিয়ে পড়ল সেই কলার খোসার উপর!
এক মুহূর্তেই — স্লিপ!
অভি পিছলে গিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় গড়াগড়ি খেয়ে পড়ল
সবাই ছুটে গেল সামনে, কাবির হাসি চেপে রাখতে পারছে না।
পাপড়ি ছুটে এসে বলে —
— “এই আল্লাহ, অভি, লাগেনি তো?”
অভি কষ্টে উঠে বলে —
— “এইখানে কে খোসা ফেলেছে?”
কিরিস তখন একদম শান্ত মুখে সোফায় হেলান দিয়ে বলে —
— ”আমার দিকে তাকাচ্ছিস কেন! আমি ফেলিনি আর লিসি খালামনি আমাকে এক গ্লাস দুধ দিতে বলেছিলো না ওইটা দাও।”
সবাই এবার হেসে গড়াগড়ি!
রিহান হাঁপাতে হাঁপাতে বলে —
— “এই লোকটা সিরিয়াসলি আলাদা জাতের!”
কাবির বলল —
— “না ভাই, এ শুধু কলা না, এটা একদম কৌশলগত অস্ত্র!”
লিসি মুখ লাল করে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে, কিরিস হালকা হাসি টেনে গম্ভীর ভাবে বলে —
— “তুমি না লিসি, তাড়াতাড়ি খালামণির দেওয়া দুধটা এনে দাও, নয়তো সবাই ভাববে আমি সিরিয়াসলি বলেছি।”
সবাই আবার হেসে উঠল —
কিন্তু কিরিসের চোখে তখনও সেই মিষ্টি, দুষ্টু দৃষ্টি লেগে রইল লিসির দিকে…
অভি এখনো নিচে বসে মুখ ভার করে, সবাই তাকে একটু ঠাট্টা করছে। রিহান হেসে বলে —
— “ভাই, কলার খোসার সঙ্গে যুদ্ধ করে হেরে গেলি নাকি?”
অভি বিরক্ত মুখে বলল —
— “তুই থাম, ওই কিরিসের জন্যই হলো সব!”
কিরিস তখন সোফায় হেলান দিয়ে বসে, দুই হাত ছড়িয়ে, ঠোঁটের কোণে একটুখানি ব্যঙ্গাত্মক হাসি।
একদম বিন্দাস ভঙ্গিতে বলে —
— “দুধটা আনবে কে, লিসি?”
লিসি দাঁত কামড়ে বলল —
— “আপনি কি এখনো সেই কথা ভাবছেন? "
এরপর আস্তে করে বলে — "আপনার জন্যই তো এই কাণ্ড হলো!”
কিরিস এক ভুরু তুলে শান্ত গলায় বলে —
— “তোমার বন্ধু অভি হাঁটতে জানে না, তার দোষও আমার?”
সবাই হেসে ফেলে। লিসি লজ্জা আর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উঠে দাঁড়ায়।
— “এই যে, দুধ! এখন খেয়ে সুখে থাকুন আপনি!”
বলেই ট্রেতে গ্লাসটা একটু জোরে রাখল কিরিসের সামনে।
গ্লাসটা কিঞ্চিৎ শব্দ করে পড়ল টেবিলে, কিন্তু কিরিস চোখ না তুলেই গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলল —
— “তাপমাত্রা ঠিক আছে।”
রিহান হেসে বলে —
— “কি ভাই, যেন পাঁচ তারকা হোটেলের কাস্টমার রিভিউ দিচ্ছে!”
লিসি বিরক্ত মুখে পেছনে ফিরে যাচ্ছিল, কিন্তু কিরিসের শান্ত, গম্ভীর গলা শুনে থেমে গেল —
— “ধন্যবাদ, মিসেস রায় চৌধুরী।”
লিসি এক মুহূর্ত থেমে ঘুরে তাকায় —
— “কি বললেন?”
কিরিস গ্লাস হাতে ঠোঁটে নিয়ে এক চুমুক দিয়ে বলে —
— “এইটুকু শুনে যদি এতটা কাঁপো, ভাবো যদি সত্যিই একদিন সেটা হয়ে যাও।”
লিসির বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে গেল। সবাই কিছুই বুঝলো না, কিন্তু ওদের চোখে চোখ পড়ে গেল মুহূর্তের জন্য…
চারদিকের হাসি-ঠাট্টা মিলিয়ে গেল, শুধু নরম এক টানটান নীরবতা রয়ে গেল।
তারপর কিরিস দুধের শেষ চুমুক নিয়ে গ্লাসটা টেবিলে রাখল —
— “একদম পারফেক্ট।”
লিসি ধীর পায়ে চলে গেল, আর কিরিসের ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসিটা আবার ফিরে এল।
অভি এবার বসা থেকে উঠে হাটাঁর চেষ্টা করে।পাপড়ি কাজ বাদ দিয়ে অভির কাছে এসে বসে।
অভি হালকা খুঁড়িয়ে হাঁটছে, পা ধরে মুখ কুঁচকে আছে।
পাপড়ি ওর পাশে বসে ব্যান্ডেজ বের করছেন।
পাপড়ি (রেগে):
— “এই ছেলে, তোর একটাও কাজ ঠিকঠাক হয় না! কে তোকে বলেছে কলার খোসার উপরে গিয়ে ব্যালেন্স হারাতে?!”
অভি (বুক ফুলিয়ে):
— “মা, আমি কী জানি কেউ খোসা ফেলেছে! আমি তো ফোনে তাকিয়ে ছিলাম না।”
রিহান (হাসি চাপতে চাপতে):
— “তোর সমস্যা হলো, তুই সবসময় ফোনেই তাকিয়ে থাকিস।”
ইয়াবি (হেসে):
— “তোর ফোনটাই কলা দিয়ে নামিয়ে দিল আজ!”
সবাই হেসে ফেলল।
অভি চুপ করে মুখ ফিরিয়ে রইল।
পাপড়ি (রাগ ঝেরে):
— “হাসাহাসি বন্ধ করো তোরা সবাই! তোর পায়ের এই অবস্থা এখন কি হবে ? কে নিয়ে আসবে এখন? এই পায়ে তো অভি কোথাও যেতে পারবে না।”
লিসি মুখ নিচু করে ফিসফিস করে বলল —
— “জ্বি খালা, আনতে হবে তো… আমি ভাবছিলাম অভি সঙ্গে যাব কিন্তু পাগল ছেলে তো পায়ে ব্যথা পেয়ে বসে আছে।”
পাপড়ি (হালকা বিরক্ত গলায়):
— “এখন আর ও যাবে না, কষ্টে দাঁড়াতেই পারছে না। এই জন্যই তো বলি, একটু দেখেশুনে চলতে শেখ!”
তারপর চোখ ঘুরিয়ে কিরিসের দিকে তাকালেন।
— “কিরিস বাবা, তুই একটু যাস না? তোকে তো চিনি, কাজটা ঠিকভাবে করে আনবি।”
সবাই একসাথে কিরিসের দিকে তাকালো।
কিরিস তখন সোফার পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল স্ক্রিনে তাকিয়ে ছিল, মুখ তুলে হালকা হাসল—
কিরিস:
— “ঠিক আছে খালামণি, আমি নিয়ে আসছি।”
লিসি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
সে তো অভির সঙ্গে যাওয়ার জন্যই সব গুছিয়ে রেখেছিল—ড্রেস, ব্যাগ, হালকা পারফিউম, চুল বাঁধা পর্যন্ত ঠিক করে ফেলেছিল।
এখন হঠাৎ শুনছে সে যাচ্ছে কিরিসের সঙ্গে!
রিহান (চুপিচুপি কাবিরকে বলে):
— “আহা, এখন তো মজা শুরু।”
কাবির (মুচকি হেসে):
— “দেখ, সন্ধ্যার আগে একটা ছোট রোমান্টিক অ্যাকসিডেন্ট হবেই।”
কালকে কিরিসের ওই ব্যবহারে জন্য এরা দুইজন ও একটু ধারণায় এসেছে কিরিস আর লিসির ব্যাপারে কিন্তু এতে তারা বড্ড খুশি অবশেষে তাদের বড় ভাইও কাউকে তো একটা পছন্দ করলো।
পাপড়ি:
— “লিসি মা, তুই একটু তাড়াতাড়ি রেডি হ। বাইক নিয়ে যেতে হবে না, কিরিসের গাড়ি আছে, নিরাপদ হবে।”
লিসি কিছু বলার আগেই কিরিস গম্ভীর গলায় বলে —
— “পনেরো মিনিট সময়, তারপর আমি রওনা হব।”
সবাই হাসাহাসি থেমে গেল, কিরিসের গলায় সেই পরিচিত কর্তৃত্বের ছাপ।
লিসি নিঃশব্দে মাথা নাড়ল, কিন্তু মনে মনে একটাই কথা —
"এই মানুষটার সঙ্গে গাড়িতে একা? আজ আমার হার্টবিটই শেষ করবে!"
কিরিস মোবাইলটা পকেটে রেখে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
আর ওর প্রতিটা পদক্ষেপে নিচের সবাই একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
রিহান হালকা গলায় বলল —
— “অভির কলা খোসার পড়াটা আজ প্রেমের গল্পে পরিণত হলো!”
ইয়াবি —" মনে তো তাই হচ্ছে bro "
সবাই হেসে উঠল আবার, আর কিরিস শুধু উপরে উঠতে উঠতে নিচের দিকে তাকিয়ে হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল…
একটা royal smile — যেন সবকিছু আগেই তার পরিকল্পনায় ছিল।
১ ঘন্টা পরে;
রিসোর্টের গেটের সামনে গাড়িটা একপাশে দাঁড় করানো।
গাছের ফাঁক দিয়ে হালকা রোদ খেলছে,গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে কিরিস —
নেভি ব্লু লং কোট, নিচে একদম সাদা crisp শার্ট,
শার্টের গলার বোতাম খুলে রাখা,
চুল হালকা ছড়ানো — যেন অনায়াসে সাজানো পরিপূর্ণতা।চোখে সানগ্লাস, তবুও ওর দৃষ্টি ভেদ করে যায় ভেতর পর্যন্ত।নিঃশব্দ, কিন্তু উপস্থিতিটাই যেন বাকি সকালের ওপর ছায়া ফেলছে।
আর সেই মুহূর্তেই রিসোর্টের দরজা খুলে বাইরে আসে লিসি।
একটুখানি হাওয়ার ঝাপটায় চুল উড়লো —
ওর পরনে নেভি ব্লু কালারের গাউন ফ্রক,
যার নিচের অংশে হালকা সাদা ছোঁয়া — সিল্কের মতো মোলায়েম কাপড়টা হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে দুলছে,চলাফেরায় যেন মেঘের ভাঁজ খেলে যায়।
চুলগুলো খোলা।
রোদে পড়ে হালকা চকচক করছে।
হাতে একটা ছোট পার্স, আর পায়ে নরম হিল —
পুরোটা যেন কোনো ফেয়ারিটেল ফ্রেম থেকে বেরিয়ে এসেছে।
কিরিসের চোখ এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।
যে মানুষটা আজ পর্যন্ত কাউকে নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশংসা করেনি,সেই কিরিস নিজের ভেতরের অনুভূতিটা চেপে রেখে।একটা হালকা মুচকি হাসি দেয়।
কিরিস নরম গলায় বলে —
— “আজকের দিন টা সুন্দর না লিসি "
লিসি একটু অন্য মনষ্ক হয় বলে —" হুম সুন্দর "
কিরিস এবার আস্তে করে বলে —" হুম সেটা হতে পারে তোমার চোখে আমার চোখে আমি তো পুরা একটা নতুন সুন্দর দিন দেখছি আর সেটা হলে তুমি "
লিসি একটু থমকে তাকায়,
চোখে একরাশ বিস্ময় —
“কি বললেন আপনি?”
কিরিস হালকা মাথা নাড়ে —
—“কিছু না... শুনতে হবে না।”
তারপর গাড়ির দরজা খুলে দেয় লিসির জন্য,
যেন পুরনো অভ্যাসে রয়ে গেছে তার ভদ্রতা।
লিসি নিঃশব্দে উঠে বসে, কিরিসও পাশে এসে বসে।
গাড়ি ধীরে ধীরে রিসোর্টের গেট পেরিয়ে চলে যায়,
রাস্তায় একপাশে গাছ, হালকা বাতাস, আর মাঝেমাঝে সূর্যের দাগ।
কিরিস ড্রাইভ করছে, মুখে একটুকরো স্থিরতা —
কিন্তু ভেতরে চলছে ঝড়।লিসি জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে,চুল উড়ছে বাতাসে,আর কিরিসের এক চোখে আটকে আছে তার প্রতিটা অঙ্গভঙ্গি।
গাড়ি চলতে শুরু করে।
হালকা বাতাসে ওর চুলগুলো সামনে উড়ে আসে,
কিরিস ডান হাতে স্টিয়ারিং ধরে,
বাম হাতটা হঠাৎ ওর মুখের সামনে আসা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দেয়।
এক মুহূর্ত থেমে যায় সময় —
তারপর কিছু না বলে, আবার সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালিয়ে যেতে থাকে।গাড়িতে হালকা আলো, বাইরে গোধূলির নরম ছায়া।ঠিক সেই সময় স্টেরিওতে বাজতে শুরু করে দেবের গান —
🎶 "মনে ঝড়ো হাওয়া,
বুকে ধরে যাওয়া,
কোন ফাগুনেতে জ্বলছি আমরা..." 🎶
গানটা যেন ঠিক ওদের জন্যই বাজছে —
লিসি চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে,
বাতাসে উড়ে তার চুলের গোছা কিরিসের মুখ ছুঁয়ে যায় হালকা করে।
কিরিস নিঃশব্দে গিলে নেয় নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলো—
যেন চোখের দৃষ্টি দিয়ে কিছু বলে ফেলবে ভেবে ভয় পাচ্ছে।
তারপর স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে আস্তে গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে —
★ “এটা কি ভুল না কি সুখ, দাও বলে...
ভেবে আকুল ক্লান্ত বুক, দাও বলে...” ★
লিসি হঠাৎ ঘাড় কাত করে তাকায় —
চোখ বড় বড় হয়ে থেমে যায় কিরিসের মুখের দিকে।
তার চোখে একরাশ বিস্ময় আর একটুখানি মুগ্ধতা।
কিরিস চোখের কোণ দিয়ে টের পায় ওর দৃষ্টি।
হালকা হেসে বলে —
—“কি হলো?”
লিসি একটু নরম গলায় —
— “আপনি... বাংলা গান পারেন?”
কিরিস এক চিলতে হাসি টেনে বলে —
—“এটা কেমন প্রশ্ন?”
লিসি মুখ বাঁকিয়ে বলে —
— “না, মানে আপনি তো ইংরেজদের মধ্যে বড় হয়েছেন! তাই ভাবছিলাম...”
কিরিস শান্ত স্বরে, দৃষ্টি সামনের রাস্তার দিকে রেখে বলে —
—“কি করবো বলো...
ইংরেজদের মধ্যে বড় হলেও জন্ম তো দিয়েছে এক বাঙালি মা।
তাহলে বাংলা না শিখে কোথায় যাব?
যতই হোক, বাঙালি বলে কথা—
একটু তো বাংলা গান পারতেই হবে, না হলে বাঙালি মেয়ের মন জয় করবো কীভাবে?”
লিসি মুচকি হেসে বলে —
“বাঙালি মেয়েদের মন জয়! আমি তো ভেবেছিলাম আপনি ইংরেজ মেয়েকেই বিয়ে করবেন।”
কিরিস হালকা স্পিড বাড়িয়ে বলে —
— “কেনো? তুমি বাঙালি মেয়ে না নাকি? ইংরেজ?”
লিসি ভুরু কুঁচকে বলে —
—“এই আমাকে কোন অ্যাঙ্গেলে ইংরেজ মনে হয় বলুন তো?
আপনার মতো আমি ইংরেজদের মতো খাবার খাই না,
ঘুরে বেড়াই না, পোশাক পরি না —
আমি একটা খাঁটি বাঙালি মেয়ে, বোকা লোক!”
কিরিস এবার আর কিছু বলে না।
তার মুখে হালকা হাসি, চোখে গভীর প্রশান্তি।
গাড়ির ভেতর নীরবতা — শুধু গানের শেষ সুর বাজে।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটা এসে থামে শহরের এক বিশাল শপিং মলের সামনে।
ওদের নামার সাথে সাথেই আশপাশের লোকজন তাকিয়ে থাকে —
যেন কোনো সিনেমার কাপল হেঁটে নামছে পর্দা থেকে বাস্তবে।
নেভি ব্লু আর সাদা ছোঁয়ায় দু’জনের পোশাকের রঙ মিশে গেছে নিখুঁতভাবে—
যেন ভাগ্যই ওদের রঙগুলো মেলাতে বসে আছে নিঃশব্দে।মলের ভেতরে পা রাখতেই আলো-ছায়ার খেলা—
ঝলমলে লাইটিংয়ে চকচকে মেঝেতে তাদের দুজনের ছায়া পাশাপাশি পড়ে।
লিসি ধীরে হাঁটছে, আর কিরিস ঠিক পেছনে—
এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরাচ্ছে না ওর থেকে।
ওরা যে দোকানে এসেছে, সেখানে আগেই অনুর ড্রেসটা তৈরি রাখা।
দোকানের ম্যানেজার দূর থেকে ওদের দেখেই এগিয়ে আসে,
মুখে মিষ্টি হাসি —
—“Sir, madam, you two look perfect together... couple outfit almost!”
কিরিসের ঠোঁটের কোণে টুক করে একটা হাসি ফুটে ওঠে।
লিসির মুখ লাল হয়ে যায় —
চোখ বড় বড় করে বলে ফেলে,
—“না না, আমরা তেমন কিছু না... মানে…”
কিরিস শান্তভাবে, সেই স্বভাবসুলভ গভীর স্বরে বলে —
— “যতই বলো না, এখন কেউ বিশ্বাস করবে না।”
লিসি কপালে ভাঁজ ফেলে বলে —
—“কেন... কেন করবে না?”
কিরিস ধীরে এক পা এগিয়ে এসে, দৃষ্টি আটকে রেখে বলে —
— “কারণ সত্যি কথা বললে মানুষ বিশ্বাস করে না,
আর আমি আজকাল শুধু সত্যিটাই বলি...
সেটা আবার সবসময় তোমাকে ঘিরে।”
লিসির মুখে একরাশ লজ্জা মেশানো হাসি,
চুপ করে শুধু বলে —
— “হুম, বুঝি।”
কিরিস এবার হালকা হাসি টেনে ম্যানেজারের দিকে ঘুরে বলে —
“এখানে Mr.অভি নামে একজন ড্রেস ঠিক করতে দিয়ে গিয়েছিল।”
ম্যানেজার মাথা নাড়ে —
—“জি স্যার, এখনই এনে দিচ্ছি।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই ম্যানেজার ড্রেসটা হাতে এনে দেয়।
কিরিস নিজে শপিং ব্যাগটা নেয়, বিল দেয়, আর বেরিয়ে আসে লিসিকে সঙ্গে নিয়ে।
বেরোতে বেরোতে হালকা ঠাট্টার সুরে বলে —
—“তুমি জানো লিসি, তুমি কিন্তু আমার কপি করেছো।
তাই সবাই ভাবছে আমরা স্বামী-স্ত্রী।”
লিসি অবাক হয়ে তাকায় —

— “আমি? আপনি কপি করছেন, আমি না!
আমি কি করে জানবো আপনিও এই রঙের জামা পরবেন? আর এখন কি বাইরে এত ঠান্ডা যে লং কোট পরেছেন?”