তোমাকে চাই
পর্ব :31
কয়েকবার টোকা দেওয়ার পর হঠাৎ ঝটাং করে দরজা খোলার শব্দ হলো।
লিসি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কিরিস এক হাত বাড়িয়ে লিসির কব্জা শক্ত করে ধরে হ্যাচকা টান মেরে ঘরের ভেতরে নিয়ে এলো।
ঘরটা পুরো অন্ধকার। শুধু জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা সামান্য আলো, আর সেই আলোয় ফুটে উঠছে কিরিসের রক্তে ভেজা ক্ষতচিহ্ন। শুকিয়ে যাওয়া রক্ত তার গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। চোখে রাগ, অথচ লিসির দিকে তাকানোর ভঙ্গিতে সেই রাগের আড়ালে লুকিয়ে আছে যন্ত্রণা।
লিসির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। এমন অবস্থায় কিরিসকে দেখে তার নিজেরই কষ্ট হচ্ছে।
কিরিস গর্জে উঠলো —
“কি করতে এসেছো? আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে শান্তি হয়নি? এখন বুঝি মেরেই ফেলতে এসেছ?”
লিসি স্তব্ধ। ঠোঁট কাঁপছে, কথা বেরোচ্ছে না।
কিরিস আবারও বললো, কণ্ঠ ভাঙছে রাগ আর কষ্টে —
“আমি তোমাকে বারণ করিনি অভির সঙ্গে বেশি বেড়াবে না ? আর প্রথম দিনেই ওর সঙ্গে চিপকে চিপকে এসেছো গাড়িতে, তাই না?”
একটু থেমে, গলা যেন কাঁপছে রাগে আর কষ্টে —
“ও লিসি শর্মা, তুমি বোঝ না আমি তোমাকে পাগলের মতো চাই। আমি তোমার একটুও কাউকে দিতে চাই না। আমি তোমাকে একান্তভাবে চাই… তুমি শুধু আমার। এই পৃথিবীতে তুমি শুধু আমার জন্য এসেছো – এটা মনে রেখো। আমি শুধু “ তোমাকে চাই ”। যদি তুমি আমার না হও… আমি সবকিছু ধ্বংস করে দেব!”
কথাগুলো লিসির বুক বিদ্ধ করলো। সে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো, তারপর এক ঝলক এগিয়ে গেল হালকা পা উঁচু করে দু’হাত তুলে কিরিসের গলা জড়িয়ে ধরলো।হঠাৎ এমনটা হবে ভাবতেই পারেনি কিরিস। সে নিথর দাঁড়িয়ে রইলো।লিসি এবার আরও শক্ত করে তাকে আঁকড়ে ধরলো, মুখটা নিয়ে গেলো কিরিসের মুখের কাছাকাছি—
“ভুল বুঝবেন না আমায়। হ্যাঁ, গাড়িতে উঠেছিলাম কিন্তু হঠাৎ টান খাওয়ায় আমি বেসামাল হয়েছিলাম, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম। আমি মোটরসাইকেলে দূরত্ব রেখেই বসেছিলাম, কখনও অভিকে ছুঁইনি। আন্টি আমাকে অনু আপুর জন্য ফুল কিনতে বলেছিলেন, অভি ফুলেই বিষয় বোঝে না। শুধু তাই, অন্য কিছু নয়। আমি ভেবেছিলাম আপনাকে পরে বলব… কিন্তু আপনি যে এমনটা ভাববেন, কখোনো ভাবিনি।”
কিরিস নির্বাক। শুধু তার রাগী ভাবটা কিছু কমলো।লিসি আবারও কিরিসের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো—
“আমি বলেছি না, আপনি যা বলবেন আমি তাই শুনব। আমি অভিকে বারণ করে দিয়েছি। দয়া করে আর রাগ করবেন না। আপনার ক্ষতে কোনো ব্যান্ডেজ হয়নি কেন? আপনাকে এমন দেখে আমার কষ্ট হচ্ছে… ঠিক হয়ে যান প্লিজ।”
কিরিস প্রথমবার একটু নরম স্বরে বললো—
“কষ্ট হচ্ছে তোমার?”
লিসির চোখে পানি জমে উঠলো।
“হুম…খুব কষ্ট হচ্ছে। আপনাকে দেখে আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম জানেন? আপনি আমার দিকে ওইভাবে তাকিয়ে ছিলেন বলেই আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। বাজে লোক,, ওই ভাবে কেউ তাকায় যদি আমি মরে যেতাম তখন।”
“মরে যেতাম” শব্দটা শুনে কিরিসের মুখ হঠাৎ শক্ত হয়ে গেলো। সে লিসির মাজা দুহাত দিয়ে শক্ত করে ধরে টেনে নিলো নিজের বুকের সঙ্গে।কিরিস লিসির চেয়ে লম্বা। তাই লিসি ঠিকভাবে তাকে জড়িয়ে ধরতে পারছিল না। কিরিস তখন লিসির কোমর ধরে উঁচু করে তোলে, নিজের বুকের সঙ্গে একেবারে মিশিয়ে নেয়। তাদের মধ্যে আর কোনো দূরত্ব নেই।এক মুহূর্তের জন্য যেন সমস্ত রাগ গলে গেল কিরিসের চোখের আর মনের। তার বুকের ভেতর শান্তি নেমে এলো।লিসিও কিছু বললো না। সেও এবার কিরিসকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।ঘরের অন্ধকারে, জানালার ফাঁক দিয়ে আসা আলোয় দুজনের ছায়া যেন এক হয়ে গেলো।কিরিস ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি খেললো।
—“তো… আমি এবার অন্য কিছু চাইতে পারি? মানে, আমার এখন অন্য কিছু করতে মন চাইছে।”
কথাটা বলে হঠাৎ লিসিকে আস্তে করে নিচে নামিয়ে দিলো সে।কিরিসের চোখে যেন এক অদ্ভুত নেশা—চাহনিতে বোঝা যাচ্ছিল, আসলে সে কি চাইছে।
লিসি হকচকিয়ে গেলেও সাহস করে সোজা তাকালো তার চোখে।
“যেটা চাচ্ছেন সেটা দেবো… কিন্তু একটা শর্তে।”
কিরিস ভ্রু কুঁচকে তাকালো। লিসির এই নতুন দৃঢ় রূপে সে একটু অবাক হলো, তবে ভিতরে ভিতরে খুশি—
অবশেষে তার “অলকান্দা ” যেন তাকে সত্যিই বুঝতে শিখছে।
—“কি শর্ত?” কিরিস গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
লিসি মৃদু কণ্ঠে বললো—
“আগে ড্রেস চেঞ্জ করে আসুন। শরীরে এখনো রক্ত লেগে আছে। তারপর এসে বসুন, আমি আপনাকে ফার্স্ট এইড করে দেবো।”
কিরিসের চোখে দুষ্টু হাসি নাচলো—
“এগুলো করলে দেবে তো আমি যা চাইছি?”
লিসি ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে ছোট্ট স্বরে বললো—
“হুম… দেবো। এবার যান।”
কিরিস খিলখিল করে হেসে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলো।
ভেতরে গিয়ে জামাকাপড় বদলে নিলো, শুকনো রক্ত ধুয়ে ফেললো। ঠান্ডা পানিতে মুখ ভিজিয়ে ফ্রেশ হয়ে আবার বেরিয়ে এলো। এবার তার শরীরে রক্ত নেই, তবে চোখের আগুন এখনো অদম্য।সে দাঁড়িয়ে রইলো লিসির সামনে।
লিসি বেডের উপর বসে আছে, পাশে রাখা ফার্স্ট এইড বক্স।হালকা নার্ভাস হলেও হাত কাঁপতে কাঁপতে সে সব ওষুধ বের করছে।কিরিস স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে, আর তার ঠোঁটে এখনও সেই বাঁকা হাসি…
যেন ফার্স্ট এইডটা কেবল একটা অজুহাত, এর পরেই শুরু হবে আসল খেলা।
কিরিস এসে বেডের উপর বসল। লিসি ফার্স্ট এইড বক্স খুলে তুলো আর ওষুধ বের করলো।
তারপর ধীরে ধীরে কিরিসের মাথার কাছে হাত তুললো, ক্ষতে ওষুধ লাগাবে—
ঠিক সেই মুহূর্তেই কিরিস হঠাৎ লিসির হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিলো।লিসি সামলে উঠার আগেই কিরিস তাকে নিজের কোলে বসিয়ে ফেললো। অবাক হয়ে দু’চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো লিসি। মুখ দিয়ে একটা “আ…আরে…” বের হলেও আর কিছু বলতে পারলো না।
কিরিস মৃদু গলায় হেসে বললো—
“এভাবেই বসে থাকবে। তুমি তো বলেছিলে, আমি যা চাইবো তাই দেবে… তাই না?”
লিসির মুখ লাল হয়ে গেলো, গাল জ্বলে উঠলো আগুনের মতো।কিন্তু তবুও সে কোনমতে সাহস জুগিয়ে কিরিসের মাথার ক্ষতে ওষুধ লাগাতে লাগলো।
প্রতিবার তুলো দিয়ে ছোঁয়া মাত্রই লিসির শরীর কেঁপে উঠছিল, কারণ সে বুঝতে পারছিল কিরিস কতটা গভীরভাবে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে।
তার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড যেন দুমদাম করে বাজছিল।
ওষুধ লাগানো শেষ হতেই লিসি দ্রুত উঠে আসতে চাইলো।
ঠিক তখনই কিরিস আবার হাত ধরে টেনে কাছে টেনে নিলো।তার দৃষ্টি এবার সরাসরি লিসির ঠোঁটে।
কণ্ঠ নরম হলেও গম্ভীরতায় ভরা—
“এবার আমি আমারটা চাই… লিসি। একটা কিস।”
লিসি থমকে গেলো।কিরিসের ঠোঁটে চোখ আটকে গেলেও চোখ সরিয়ে নিলো দ্রুত। মুখের ভেতর শুকিয়ে গেছে, শব্দ বেরোচ্ছে না।
লিসি তোতলাতে তোতলাতে বললো—
“না… না… আমি পারবো না…!”
কিরিস মাথা একটু কাত করে, চোখে সেই অদ্ভুত নেশা নিয়ে ফিসফিস করলো—
“তুমি বলেছিলে না, আমি যা চাইবো তাই দেবে? এখন পিছিয়ে যাচ্ছো?”
লিসির বুক ধুকপুক করছে অস্বাভাবিকভাবে। হাত দুটো সে বুকের কাছে গুটিয়ে রাখলো, কিন্তু কিরিস হাল ছাড়লো না।
সে আলতো করে লিসির চিবুক ধরে মুখটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে টেনে আনলো।লিসি চোখ বন্ধ করে ফেললো।
কিরিস ঠোঁটের কাছাকাছি এসে থেমে গেলো কিছুক্ষণের জন্য। তার গরম নিশ্বাস লিসির মুখে লাগতেই লিসির সারা শরীর কেঁপে উঠলো। মুহূর্তটায় কিরিস ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে ছুঁয়ে দিলো নিজের ঠোঁট।
প্রথমে খুব নরম, অল্প সময়ের জন্য।
লিসি শ্বাস আটকে ফেললো, চোখ শক্ত করে বন্ধ করে রাখলো।কিন্তু কিরিস আস্তে আস্তে আবার চাপ দিলো ঠোঁটে, এবার কিছুটা গভীরভাবে।
এক ঝলকে লিসির বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেলো।
মনে হলো সে যেন পৃথিবী ভুলে গেছে, সবকিছু থেমে আছে শুধু এই মুহূর্তটার জন্য।
কিছু সেকেন্ড পরে কিরিস ধীরে ধীরে সরে এলো।
চোখের গভীরতা দিয়ে তাকিয়ে বললো—
“এইবার আর রাগ নেই… তুমি শুধু আমার, লিসি।”
লিসি চোখ নামিয়ে রাখলো, গাল লাল হয়ে গেছে পুরো।
মৃদু কণ্ঠে বললো—
“হুম… আমি শুধু আপনারই…”
চুমুর পর লিসির বুকের ভেতরটা এখনো কাঁপছে।
সে কিছু বলতে পারছিল না, শুধু নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল।
হঠাৎ কিরিস ধীরে ধীরে বসে পড়লো বেডের ধারে।
তারপর লিসি হাত ধরে নিজের কাছে আনে, কোনোরকম আগাম কিছু না বলে হালকা ঝুঁকে নিজের মুখ লুকিয়ে দিলো লিসির বুকে।
লিসি হতভম্ব!
দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বুকের কাছে হঠাৎ এমনভাবে মুখ লুকিয়ে নিলে, তার সারা শরীর কেঁপে উঠলো।
অস্থিরতায় হাত-পা গুলিয়ে গেলো, বুক ধড়ফড় করছে ভীষণ।সে তো ভেবেই উঠতে পারছিল না কী করবে, ঠেলে সরাবে নাকি ওভাবে থাকতে দেবে।
কিন্তু পরক্ষণে কিরিসের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করলো, মনে হলো সে অনেকটা শান্তি খুঁজে পেয়েছে এভাবে।
কিরিস ধীরে ধীরে ফিসফিস করলো—
“একটু এভাবেই থাকতে দাও, লিসি… তোমার বুকে লুকালে মনে হয় আমি পৃথিবীর সব যুদ্ধ জিতে গেছি।”
কথাটা শুনে লিসির বুকের ভেতর আরও কাঁপলো।
কিন্তু সে সহ্য করে দাঁড়িয়ে রইলো, যদিও ভেতরে ভেতরে লজ্জায় পুড়ছিলো।কিছুক্ষণ পর কিরিস ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো।ঠোঁটের কোণে হালকা মুচকি হাসি ফুটে উঠেছে।ঠিক সেই মুহূর্তেই লিসি লজ্জায় মুখ নিচু করে ফেললো।সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না, দ্রুত বেড থেকে সরে দরজার দিকে পা বাড়ালো।
কিরিসের সেই একটুখানি মুচকি হাসির জন্য সে এত বড় অস্থিরতা সহ্য করলো।
কিন্তু বেরিয়ে আসতেই মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর আগুন লেগে গেছে লজ্জায়।শরীর এখনও কাঁপছে, বুকের ভেতর অস্থিরতা, লজ্জার গরম আর হৃৎপিণ্ডের দ্রুত ধুকপুক।
দরজা খোলার পর সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো, কিন্তু প্রতিটি ধাপেই মনে হচ্ছিল, এখনো কিরিসের কাছের সেই মুহূর্ত তার চোখের সামনে ঘুরছে।
দূরে, ঘরের কোণে ইয়াবি দু’চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে।
“ওহ মা! লিসি, কি হলো?” ফিসফিস করে হেসে উঠলো সে।
আরোবি পাশ থেকে তাকিয়ে বললো—
“হুম… আমি বলেছিলাম না, কিরিসের রাগের ঔষধ লিসি,আরে কই যাস,লজ্জা করছে নাকি!”
লিসি মুখ লুকিয়ে শুধু মাথা নেড়ে দিয়ে সিঁড়ি থেকে নিচে নামতে থাকলো।
তাকে ঘিরে থাকা লজ্জা এত বেশি যে, মনে হচ্ছিল কিরিসের একটুখানি মুচকি হাসিই তাকে ধ্বংস করেছে।
কিন্তু ভেতরে মনে হলো, এ অনুভূতি… এই অদ্ভুত উত্তেজনা, কিরিসের কাছের নিরাপত্তা আর একই সাথে ভয়—
সবকিছু মিলিয়ে যেন তার হৃদয় আরও গভীরভাবে কিরিসের জন্য বাঁধা পড়েছে।
ইয়াবি আর আরোবি দূরে দাঁড়িয়ে হেসে ফিসফিস করছিলো, কিন্তু লিসি তা মোটেও শোনার মতো অবস্থায় নেই।
সে কেবল দ্রুত নিজের রুমে চলে গেলো, দরজা বন্ধ করে বুকের ভেতর থাকা অনুভূতিগুলো শান্ত করার চেষ্টা করলো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, আর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা।
আঙিনায় সবাই বসে গল্প করছে, চারদিকে হাসি-আনন্দের আবহ। অনুও সবার মাঝে প্রাণখোলা হাসিতে মেতে আছে।
এমন সময় অভি মুচকি হেসে লিসির দিকে একটা চকলেট বাড়িয়ে দিয়ে বললো—
অভি — "এই নে, চকলেট খাবি নাকি?"
লিসি তৎক্ষণাৎ চকলেটটা হাত থেকে নিয়ে নিলো। আশেপাশে কিরিস নেই, সম্ভবত নিজের ঘরে কাজে ব্যস্ত।
কাবির আর রিহান খানিক দূরে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে উঠে গেছে।
ইয়াবি দায়িত্বশীল ভঙ্গিতে লিসির পাশে দাঁড়িয়ে লিসিকে দেখছিল—কারণ কিরিস নিজে তাকে দায়িত্ব দিয়েছে লিসির উপর নজর রাখতে। কিছুক্ষণ পর সেও চলে গেল। মেয়েরা নিজেদের গল্পে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
ওদিকে কিরিস ঘরে বসে আছে, ল্যাপটপে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাজ নিয়ে।
তার চারপাশে কাবির, রিহান, আর ইয়াবি বসে গল্প করছে।
রিহান — "অনেকদিন পরে একসাথে হয়ে কত ভালো লাগছে, তাই না কাবির?"
কাবির — "হুম, আর একটা জিনিস দেখেছিস? লিসি আর অভির কী সুন্দর সম্পর্ক!"
কাবিরের কথা শুনে ইয়াবি হকচকিয়ে কিরিসের দিকে তাকালো।
কিরিস দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে—চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে বিস্ফোরণ গুনছে।
ইয়াবি — "এইসব বলিস না! ওরা তো শুধু বন্ধু… এইভাবে বলা ঠিক না।"
কাবির — "আমি মিথ্যে বললাম নাকি সত্যি—"
ওই মুহূর্তে কাবিরের কথা শেষ হওয়ার আগেই, কিরিস টেবিলে রাখা গরম কফির মগটা—যেটা লিসি একটু আগেই এনে দিয়েছিল, আর এখনো থেকে থেকে ধোঁয়া উঠছিল—ঝটকা মেরে তুলে কাবিরের মুখে ঢেলে দিলো।
কাবির চেঁচিয়ে উঠলো—
কাবির — "আরে ও মা রে! পোড়ায়ে দিচ্ছিস কেন!"
রিহান ভয়ে আর অবাক হয়ে চিৎকার করে উঠলো—
রিহান — "আরে bro, কি করলি! ও তো শুধু বলছিল লিসি আর অভির কথা!"
কিরিস হঠাৎ দাঁড়িয়ে রিহানের কলার ধরে জোরে টান দিলো, টানতে টানতে রিহানের শার্ট ছিঁড়ে গেল।
রিহান হকচকিয়ে তাকিয়ে আছে।
কিরিস এবার ইয়াবির দিকে ফিরলো।
ইয়াবি তোতলাতে তোতলাতে বললো—
ইয়াবি — "আ… আ… আমি তো কিছু বলিনি! আমি শুধু বলেছি, লিসির সাথে শুধু তোমারই মানায়… আমি কিচ্ছু বলিনি, ভাই!"
কিরিস ঠোঁট কেটে একটা চাপা হাসি দিয়ে ইয়াবির মাথায় হালকা চাটি মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
পেছনে রিহান আর কাবির হা করে তাকিয়ে রইলো।
কাবির — "স্বার্থপরের বেটা! আমি তোদের ছোট ভাই হই—এখনো বিয়ে করিনি, তার আগেই আমার ফেস নষ্ট করে দিচ্ছিস! যদি কফিটা একদম ফুটন্ত গরম হতো তো সরাসরি ICU-তে চলে যেতাম!"
রিহান — "ভাইরে, আমার শার্টটা দেখ—ছিঁড়ে দিলি! আমি তো গরিব মানুষ, নতুন কিনেছিলাম! তোর মতো বড়লোক না যে রোজ শার্ট কিনতে পারি!"
ইয়াবি হেসে গড়িয়ে পড়লো—
ইয়াবি — "চুপ কর নাটুকেপনা বাদ দে! তোরা আমাদের বাড়ির ছেলে হয়ে আবার গরিব সাজার চেষ্টা করিস কেন, হাহ!"
রাত ১০;৩০ সবাই রাতের খাবারের জন্য বসে আছে,
টেবিল ভরতি খাবার—পোলাও, মাংস, সালাদ, ফ্রাইড চিকেন, সঙ্গে মিষ্টি দই। সবাই গোল হয়ে বসেছে, হাসি-আড্ডা চলছেই।
অনু সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে।
অনু — "আজ সবাই একসাথে বসে খাচ্ছি, অনেকদিন পর যেন এমন জমলো!"
রিহান গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলে —
"হুম, শুধু একজন ছাড়া।"
লিসি চুপ করে বসে আছে, জানে রিহান কাকে বলছে। কারও চোখের সাথে চোখ মেলাচ্ছে না।
কাবির মুখে এক চিলতে হাসি এনে বলে —
"এই অনু তুই তো দেখছি বেশ খুশি,, "
অনু লাজুক একটা হাসি দিলো কাবিরের কথায়।
রিহান—" মনে হয় অফিসের কাজ করছে "
ইয়াবি হেসে বলে —
"আরে ভাই, মানুষটা অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেই পারে। সব সময় তো আর টেবিলে বসা হয় না!"
অভি ভ্রু কুঁচকে বলে —
"অফিসের কাজ? না কি... অন্য কিছু?"
সবাই এক মুহূর্তে থমকে গেল।
লিসির বুকের ভেতর ধক করে উঠলো, কাঁটাচামচ থেমে গেল তার হাতে।
অনু হেসে পরিবেশ সামলাতে বললো —
"আরে থাক, ও তো এমনিই একটু একলা টাইপ।, এসব বাদ দাও।"
ধীরে ধীরে সবাই রাতের খাবার শেষ করলো।
সবার খাওয়া শেষ হয়ে এলো। একে একে উঠে গেলো সবাই। টেবিলে বসা লিসির চোখ বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছে—যেদিকে কিরিসের রুম।
অনু থালা গুছাতে গুছাতে বলে —
"খাওয়া শেষ, লিসি? উঠ এবার।"
লিসি ছোট্ট করে মাথা নাড়লো —
"হুম... আমি আসছি, তোমরা আগে যাও।"
সবাই চলে গেলে, লিসি আস্তে করে একটা থালা সাজালো—পোলাও, মাংস, সালাদ আর এক গ্লাস পানি। থালার ঢাকনা দিয়ে ঢাকা দিলো, যেন কেউ না দেখে।
সে ধীরে ধীরে কিরিসের রুমের দিকে হাঁটতে লাগলো। করিডোরটা নীরব, শুধু লিসির পদধ্বনি আর তার নুপূরের টুংটাং শব্দ বাজছে।
কিন্তু…
অভি সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সবটা লক্ষ্য করছিল। লিসির হাতে খাবার ভর্তি থালা দেখে তার ভেতরটা হঠাৎ জ্বলে উঠলো। চোখে বিরক্তি আর ঈর্ষা জমে উঠলো।
লিসিকে আসতে দেখে, আরোবি সিঁড়ির ওখানে দাড়ায় আরোবি ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করে বললো —
"ভাবি… খাবারও এখন শুধু তার জন্য? এত কেয়ার…"
লিসি কিছু বললো না শুধু মুচকি হেসে চুপচাপ চলে গেলো কিরিসের ঘরের দিকে। আর আরোবিও ঘরে চলে গেলো।
কিরিসের ঘরের সামনে গিয়ে লিসি দরজায় হালকা নক করলো। ভেতর থেকে কোনো উত্তর নেই। সাহস করে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো।
কিরিস টেবিলে বসে ফাইল ঘাঁটছে, মুখে অদ্ভুত রাগ জমে আছে।
লিসি থালা রেখে নরম গলায় বললো —
"খাবার খেয়ে নিন… সারাদিন কিছু খাননি।"
কিরিস একবার তাকালো, ঠোঁটের কোণে হালকা মুচকি হাসি খেললো, কিন্তু কিছু বললো না।
লিসির বুক ধকধক করছে, কিন্তু তবুও থালা এগিয়ে দিলো।কিরিস তাকালো, তারপর আস্তে বলল —
"খাবো না... খেতে ইচ্ছে করছে না।"
লিসি একটু কপাল কুঁচকে বলে —
"কেন? আপনি তো দুপুরে খেয়েছেন তারপর কিছু খাননি। এখন কেন খাবেন না?"
কিরিস একবার মুচকি হেসে নিচের দিকে তাকালো, তারপর ধীরে বলল —
"আচ্ছা... খাবো। তাহলে তুমি খাওয়াও আমাকে।"
লিসি এক পা পিছিয়ে গেল —
"কেন? আপনার হাত নেই নাকি?"
কিরিস একটুখানি হাসলো, তারপর হাতটা তুলে ধরলো —
"হুম, আছে তো... দেখো।"
লিসি বিস্ময়ে দেখে—তার ডান হাতে কেটে গেছে, শুকনো রক্ত এখনো স্পষ্ট।
একটু চুপ করে থেকে বলে —
"আমি চামচ এনে দিচ্ছি।"
কিরিস ঠোঁটে হালকা ঠাট্টা মেশানো হাসি এনে বলল —
"হায়, যার জন্য হাত কাটলাম, সেই আবার লবণ ছিটিয়ে যন্ত্রণা বাড়াচ্ছে..."
লিসি হতভম্ব —
"মানে কী বলছেন আপনি?"
কিরিস চোখ নিচু করে গম্ভীর গলায় বলে —
"মানে, আল্লাহ যেমন আমাকে খাওয়ার জন্য হাত দিয়েছেন, তেমনি হাত কাটার কারণ হিসেবে তোমাকে ও দিয়েছেন।"
লিসি বিরক্ত গলায় বলে —
"আপনি আমাকে দোষ দিচ্ছেন? আমি কি বলেছিলাম করতে? এখন খান, এই নিন খাবার!"
কিরিস শান্ত গলায় বলে —
"আমি ভাত হাত দিয়ে খাই না..."
লিসির মনে পড়ে যায় — বাড়িতে যখনই কিরিস ভাত খেত, সুপ্রিয়া মামীই তাকে খাইয়ে দিত।
একটু হেসে বলে —
"আমি তো শুনেছি আপনি মামীর হাতে ছাড়া খান না। আমার হাতে খেতে পারবেন তো?"
কিরিস এবার সরাসরি লিসির চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলে —
"কি যে বলো... তুমি হলে আমার মায়ের পর সেই দ্বিতীয় নারী, যার হাত থেকে আমি সাদরে বিষও গ্রহণ করতে পারি। কারণ তোমার হাতের ছোঁয়াই আমার কাছে অমৃতের মতো লাগে।"
লিসির গাল লাল হয়ে যায়। আর কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে প্লেটটা নিয়ে বসে পড়ে, ছোট ছোট করে ভাত তুলে খাওয়াতে শুরু করে কিরিসকে।
কিরিস চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে —
চোখে এক অনির্বচনীয় শান্তি, এক গভীর প্রেম, যা শব্দ ছাড়াই বলে দেয়—
"এই মেয়েটাই তার সবকিছু।"
কিরিস চোখ বন্ধ করে খেতে খেতে বললো —
"এটাই চাইছিলাম… তুমি যদি পাশে থাকো, আমি আর কিছু চাই না।"
লিসির বুকটা কেঁপে উঠলো।
সে চুপ করে শুধু খাওয়াতে লাগলো, আর ভেতরে ভেতরে বোঝার চেষ্টা করলো—এই মানুষটাকে সত্যিই এড়িয়ে যাওয়া যায় কি না।
লিসি যখন কিরিসকে গালে তুলে খাওয়াচ্ছে, ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতায় শুধু লিসির মৃদু কণ্ঠস্বর।
কিরিস ঠাণ্ডা মুখে বসে খাচ্ছে, কিন্তু চোখে সেই অদ্ভুত শান্তি—যেন তার পৃথিবী এখন কেবল এই মেয়েটাই।
ঠিক তখন দরজার ফাঁক দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অভি।
অন্ধকারে চোখে পড়ছে স্পষ্ট দৃশ্যটা—লিসি গালে তুলে খাওয়াচ্ছে কিরিসকে, আর কিরিস যেন সবটুকু উপভোগ করছে।
অভির গলা শুকিয়ে গেলো।
তার চোখে তীব্র ঈর্ষা, রাগ।
মনে মনে যেন গর্জে উঠলো —
"না… লিসি আমার ছিলো… আমারই থাকার কথা ছিলো।"
চোখে আগুন জ্বলে উঠছে, হাতের মুঠো শক্ত করে ধরে আছে সে। দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে আছে যেন কিরিসকে গিলে ফেলবে।
কিন্তু কিছু বলতে পারছে না।
শুধু দাঁড়িয়ে রইলো দরজার পাশে, বুকের ভেতর হাহাকার নিয়ে।
অভি দাঁড়িয়ে ছিলো অনেকক্ষণ।
কিরিসের প্রশান্তির হাসির, আর লিসি গালে তুলে খাওয়াচ্ছে—দৃশ্যটা তার চোখে যেন হাজার সূঁচ হয়ে বিঁধছে।
মনে হলো বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে।
চোখ সরালো না অভি, দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ঠোঁট কামড়ে নিলো।
"লিসি… তুই আমাকে এভাবে ভুলে গেলি? আর এই কিরিস… সবসময় আমার সামনে দাঁড়িয়ে যাবে?"
একটুখানি থেমে, গলা শুকিয়ে গেলেও মনে মনে শপথ করলো—
"কাল… কাল আমি এমন কিছু করব যাতে সবাই বুঝতে পারবে লিসি আসলে কার।"
পায়ের শব্দও না করে আস্তে আস্তে নিচে নেমে গেল অভি।
সবার সঙ্গে গল্পের ভান করলো, কিন্তু চোখে-মুখে কেমন এক অদ্ভুত কঠিন ছায়া লেগে রইল। রাতে বেশি হলে সবাই ঘুমিয়ে পরলো।
সকালের আলো পড়ে ঝলমল করছে রিসোর্টটা। চারপাশে সাজসজ্জার কাজ, ফুলের গন্ধ, আর মানুষের হাঁকডাক—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
শাওন ভাই এনগেজমেন্ট পার্টির শেষ মুহূর্তের কাজগুলো নিয়ে ব্যস্ত। যদিও এখানে লোক আছে সব সামলানোর, তবুও নিজের লোকের কাজের স্পর্শ না থাকলে যেন আয়োজনের প্রাণই মরে যায়।
সকালবেলার হালকা নাস্তা শেষ করে সবাই গল্পগুজবে মেতে আছে। হাসি, আড্ডা আর চায়ের কাপ ঘিরে একরাশ উচ্ছ্বাস।
এদিকে লিসি আর আরোবি এখনো উপরে। নিচে বসে আছে জারা আর সুরভী।
জারা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে —
"এই আপু, আরোবি কই? ওকে তো দেখা যাচ্ছে না!"
সুরভী হেসে বলে —
"ও হয়তো এখনো ঘুমাচ্ছে!"
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আরোবি বলে ওঠে —
"এই, কার কথা বলছো তোমরা? আমি নিচে নামছি, ঘুমাইনি আমি!"
সুরভী মজা করে বলে —
"অনেকদিন বাঁচবি তুই! তোরই নাম নিচ্ছিলাম আমরা। এই অনু কি ড্রেস পরবে ঠিক করেছিস তো? যেন সাজার সময় বেশি খুঁতখুঁত করিস না!"
হেসে বলে —
"ঠিক করার কিছু নেই, ওরা আগেই ড্রেস পাঠিয়ে দিয়েছে। ওটাই পরতে হবে।"
আরোবি চোখ টিপে বলে —
"আহা, কি আনন্দ! আচ্ছা এখন এনগেজমেন্ট হচ্ছে, বিয়ে কবে করবি?"
অনু হেসে উত্তর দেয় —
"আম্মুরা বলছিল, হয়তো দুই-তিন মাস পর। উনি কাজ শেষ করে ফিরলেই।"
তিনজন একসাথে বলে ওঠে —
"ওরে বাবা, উনি!"
তারপর হাসির রোল পড়ে যায় চারপাশে।
জারা হাততালি দিয়ে বলে —
"এই, চল না আমরা ছাদে যাই! শুনেছি ওখানে একদম সুন্দর পরিবেশ, কেউ ডিস্টার্ব করবে না। এখানে বড্ড লোকজন!"
সুরভী মাথা নেড়ে বলে —
"ঠিক আছে, অনু চল আমরা যাই। এই আরোবি, লিসি কই? ওকে তো দেখছি না!"
আরোবি হেসে বলে —
"ওকে এখন ডিস্টার্ব করিস না। বেচারী সারারাত ঘুমাতে পারেনি। নতুন জায়গায় নাকি ঘুম আসে না ওর। সকালের দিকে একটু চোখ লেগেছে মাত্র। আমরা আগে ঘুরে আসি, পরে ওকে ডেকে আনব।"
জারা —
"তাহলে ও ঘুমাক, আমরা যাই!"
চারজনই ছাদে চলে গেলো।
ওদিকে নিচে নামার সময় অভি তাদের যেতে দেখল, কিন্তু তেমন খেয়াল করল না কারা যাচ্ছে।
নিচে নেমে মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করল —
"মা, লিসি কোথায়?"
পাপড়ি হেসে বললেন —
"ও তো এখনো ঘুমাচ্ছে মনে হয়।"
অভি মাথা নেড়ে সোফায় বসে ফোনে চোখ রাখল
ওদিকে লিসি তখনো ঘরে গভীর ঘুমে।
এপাশ-ওপাশ করছে বারবার, পর্দার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে মুখে।
ঘুম ঘুম চোখে হঠাৎ পাশে তাকাল —
মনে হলো যেন কেউ শুয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরেই।
প্রথমে ভেবেছিল হয়তো ভুল দেখছে, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল। ঘুম ঘুম চোখে তাকালে লিসিএ একটু ভয় পায়,তারপর
চোখ বড় বড় করে তাকাতেই দেখল —
কিরিস!
একই খাটে, একদম মুখের সামনে, শান্তভাবে শুয়ে আছে সে।
লিসির চোখের ঘুম এক মুহূর্তেই উড়ে গেল!
চিৎকার করতে যাবে—
ঠিক তখনই কিরিস দ্রুত হাত বাড়িয়ে ওর মুখ চেপে ধরল।
কিরিস — “আরেহ! এভাবে চিৎকার করলে তো সবাই এই ঘরে চলে আসবে, তখন আমি ব্যাখ্যা দেবো কিভাবে?”
লিসি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে কিরিসের হাত সরিয়ে ফিসফিস করে বলে —
“আপনি এখানে কি করছেন? নামুন খাট থেকে, বেয়াদব! বাজে লোক কোথাকার!”
কিরিস ঠোঁটে হালকা মুচকি হাসি টেনে কিছু না বলে হঠাৎ লিসির উপর উঠে বসে দু’হাত ধরে এক ঝটকায় খাটে চাপা দিল।
নিজে উপরে ঝুঁকে লিসির মুখের একদম কাছে এসে থামল।
কিরিস — “কেন লিসি শর্মা… তুমি তো জানো আমি ভীষণ বেয়াদব, বড্ড বাজে লোক… কিন্তু সেটা শুধু তোমার জন্যই। আর তাছাড়া…”
ঠোঁটে একটুখানি হাসি নিয়ে বলে
—“এটা কিন্তু একদম স্বাভাবিক ব্যাপার।”
লিসি অবাক হয়ে বলে —
“কি করছেন আপনি! আর কোন অ্যাঙ্গেলে এই ব্যাপারটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে বলুন তো!”
কিরিস — “আমার অ্যাঙ্গেল থেকে দেখলে একদম স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।”
লিসি বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয় —
“বাদ দিন সব! আপনি আসলে কি করতে চান, বলুন! ঘুমটা নষ্ট করে দিলেন একেবারে। সরুন না হলে আমি চিৎকার করব!”
কিরিস ঠোঁট কামড়ে হালকা হাসে —
“করো না, আমি তো বারণ করিনি। তবে একটা কথা মনে রেখো, তুমি যদি এখন চিৎকার করো, সবাই চলে আসবে। তারপর এই অবস্থায় আমাদের দেখে ওরা কি ভাববে… সেটা তুমি নিজেই ভালো জানো।”
লিসির মুখ লাল হয়ে যায় রাগে–লজ্জায় মিশে,
“এই! আপনি সব সময় আমাকে আমার মান-সম্মান দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করেন কেন?”
কিরিস হেসে মৃদু স্বরে বলে —
“জানি না… আর হ্যাঁ, যেটার জন্য আমি সকাল সকাল তোমার ঘরে এসেছি…”
ওর কণ্ঠস্বর নিচু হয়ে আসে, চোখে মায়ার ছোঁয়া মেশে।
লিসি অবাক হয়ে তাকায় —
“কেন? কি দরকার ছিল এত সকালে আসার?”
কিরিস গভীরভাবে লিসির চোখের দিকে তাকিয়ে বলে —
“তোমাকে একবার দেখা দরকার ছিল… কারণ সারারাত ঘুমাতে পারিনি। তোমার মুখটা না দেখলে সকাল শুরু করতে পারি না এখন।”
লিসি এক গাল শুকনো ঢোঁক গিলে ফেলল — তার বুকের ভেতরটা যেন শুকিয়ে আসছে।
সামনে থাকা মানুষটার চোখে একটুও অসুবিধার ছাপ নেই, বরং যেন বেশ আরামেই আছে কিরিস। স্বাভাবিক লাগছে না তার চোখের চাওনি। লিসি অবিশ্বাস আর ভয়ে তাকিয়ে আছে, মনে মনে ভাবছে —
“এই মানুষটার কোনো গ্যারান্টি নেই, কি আজেবাজে কিছু না করে বসে আবার!”
গলার স্বর কাঁপছে, তবু তুতলিয়ে বলল —
— “কি... কি করতে এসেছেন?”

0 Comments