তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :30

প্রথমে লিসি কোনোভাবেই যেতে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু কিরিস একবার বলাই লিসি চুপ। আর মার্ক সবকিছু এরেঞ্জ করে দিয়ে গেছে—গাড়ি থেকে শুরু করে যাবার সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। কাবিরের গাড়ি আগে থেকেই রওনা হয়েছে।
নুসরাত কৌতূহল মিশিয়ে জিজ্ঞেস করল—
—"রিহান, আমি মনে করি, কাবিরের খালার বাড়ি আমরা যাইনি, তাই না?"
কাবির হেসে বলল—
—"হুম, নুসরাত, তুই তো যাসনি। মনে হয় মনে রাখার কথা মনে নেই।"
রিহান নুসরাতের হাত ধরে কোমলভাবে বলল—
—"তো কি হলো, আমার সোনা? এখন আমাদের সাথে যাবে। ওকে জান,ওখানে গিয়ে অনেক মজা হবে।"
এতক্ষণ প্রেমের কথাগুলো শুনে আরোবি মুখে হাসি লেপে বলল—
—"আরে বাবা! এবার তোরা থাম। এই গাড়িতেই আমরা বসে বসে তোমাদের প্রেমপ্রীতি দেখব? আমরা এই সিঙ্গেল মানুষরা কষ্টে আছি!"
কাবির চপলমনা হাসি দিয়ে বলল—
—"ইস! কি ভালো, তাই না? ভাবছিস, আমার তিশাটাও থাকতো, বাবাকে বলতাম, দ্রুত বিয়েটা দিতে হবে, না হলে আমি ফাঁকা হয়ে যাচ্ছি !' "
সুরভী কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল—
—"কেন? আপনার কি সহ্য হচ্ছে না?"
কাবির গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে হেসে বলল—
—"না, বোন, হয় না। বিশ্বাস কর। ওই যে, আমার সামনে বড় ভাই দাঁড়িয়ে আছে। শালা নিজেও বিয়ে করবে না, আর আমাকে বিয়ে করতে দিচ্ছে না। কবে সে বিয়ে করবে, আর আমি আমার ভাবির মুখ দেখবো কিন্তু দেখা গেলো তার আগে —আই এম গো টু কবরস্থান! আর তুই হাসচিস? হা হা, আমি ঠিক করলাম, বিয়ে না হলে জীবন আর চলবে না, আর এবার বাবাকে বলতেই হবে! "
সবাই কাবিরের কথায় হেসে উঠল।
এদিকে লিসি হালকা হলদে রঙের থ্রি-পিস পরেছে, একদম এলিগেন্ট। সে গাড়িতে ওঠার কোনও ইচ্ছাই ছিল না, সামনের গাড়িতে আরোবির সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু আনারুল এসে তাকে চুপচাপ গাড়িতে উঠতে বাধ্য করল। এছাড়া, কিরিসও আগে থেকেই তাকে সতর্ক করে রেখেছে।
গাড়িতে বসেই লিসি চুপচাপ একপাশে নিজেকে সেট করে নিল। কিরিস ড্রাইভিং সিটে বসে আছে। সামনের গাড়ি গেট পেরিয়ে রওনা দিবে।
একটু পরে কাবিরের গাড়ি গেট ছাড়ল, আর কিরিসও ব্ল্যাক কালারের নতুন গাড়ি চালাতে শুরু করল, যা সম্ভবত শোরুম থেকে নতুন আনা। বিন্দাস মনে করে গাড়ি চালাচ্ছে কিরিস।
গাড়ি গিয়ে থামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। কিরিস গ্লাস নামাতেই ইয়াবি এগিয়ে এসে হালকা দুষ্টু হাসি দিয়ে উঠে বসলো গাড়িতে।
আনারুল — "ভালোই হইছে তুই আইছিস। ছুটি নিছস নাকি?"
ইয়াবি — "না মামা, আজ তো শনিবার। আসছিলাম কিছু কাজে, যতই হোক প্রফেসর মানুষ, কিছু কাজ থাকেই। বারন করছিলাম কিরিসকে কিন্তু শোনে কে! আর কাল রবিবারেও আসতে হবে কিছু ডকুমেন্ট চেক করতে, তারপর অনুষ্ঠান এটেন্ড করব।"
আনারুলের ঠোঁটে মুচকি হাসি। হাসিটা এমন, যেন বোঝাচ্ছে—“ছেলে বড় হয়ে গেছে, এ বয়সেই ভার্সিটির দায়িত্ব টেনে নিচ্ছে।”
আনারুল — "হুম, ঠিক আছে, তাই কর।"
পাশ থেকে লিসি কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলে —
লিসি — "এটা বুঝি তোমার জায়গা?"
ইয়াবি প্রশ্নটা ঠিক শুনতেই না শুনে গম্ভীর সুরে উত্তর দিলো —
ইয়াবি — "হুম না... মানে... এ কী বললা?"
লিসি — "মানে চাকরি করো এখানে তাই বললাম ভাইয়া।"
ইয়াবি — "হুম, কিন্তু প্লিজ, আরোবির মতো ঘুরাইয়া কথা বলিস না। আমার মাথার উপর দিয়ে গেলে মেনে নিতে পারব না। বুঝছিস, ভা...ভা..."
বলতে বলতে ইয়াবি নিজের মুখ হাত দিয়ে চাপলো, চোখ গেল কিরিসের দিকে। কিরিস তখনো নীরব, কিন্তু চোখে সেই অদ্ভুত ঠান্ডা ঝিলিক।
আনারুল আর লিসি তাকিয়ে আছে ইয়াবির দিকে, তখনই ইয়াবি হেসে কথাটা কাটিয়ে দিলো —
ইয়াবি — "ভা...ভাইজিই বলতে চাইছিলাম। ভাবছিলাম কবে আমার ভাইজি হবে!"
আনারুল — "তোর ভাইজি আবার কেমনে হইব? কী সব উল্টাপাল্টা বলছিস তুই?"
ইয়াবি — "আরে মামা, কিরিস বিয়া করলে তো বাচ্চা হইব। সেই মেয়ে হইলেই তো আমার ভাইজি হইব, না? তাই ভাবতেছিলাম!"
এক মুহূর্তের জন্য গাড়ির ভেতর নীরবতা নেমে এলো। হঠাৎই কিরিস জোরে ব্রেক চাপলো। গাড়ি হালকা ঝাঁকুনি খেলো। ইয়াবি চুপ হয়ে গেল, লিসির বুকের ভেতর ধক করে উঠলো, আনারুলও অবাক।
স্টিয়ারিং ধরে ঠান্ডা গলায় কিরিস বললো —
কিরিস — "দিন জেগে স্বপ্ন দেখিস।"
আনারুল কিছু বলেনি, কারণ সে খুব ভালো জানে কিরিস কেমন মানুষ। তবে লিসির কথাটা কেমন যেন খারাপ লাগলো তার। মনে মনে ভাবলো—“কিরিস কি তবে কোনোদিন বিয়ে করবে না নাকি?”
গাড়ি চলতে থাকলো। আশুলিয়ার পথ ধরে এগোতে থাকলো তারা। সবার গন্তব্য—Ashulia Lake View Resort, সেখানেই অনুর এনগেজমেন্ট হবে।
গাড়ি আশুলিয়ার মাঝ বরাবর এসে পৌঁছাতেই লিসি হালকা ইতস্তত করে, তারপর মায়া ভরা কণ্ঠে আনারুলকে উদ্দেশ্য করে বললো—
লিসি — "মামা... গাড়িটা একটু থামাতে বলবেন?"
আনারুল কিছু বলার আগেই কিরিস নিজেই গাড়ি থামিয়ে দিল। চোখের কোণায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ঠান্ডা গলায় বললো—
কিরিস — "কেন? কিছু হচ্ছে নাকি? গা পাকাচ্ছে?"
লিসি সংকোচে পড়ে গেল। কিছুক্ষণের নীরবতা... তারপর একটু সাহস জোগাড় করে বললো—
লিসি — "আসলে মামা... অভি সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মোটরসাইকেলে যাচ্ছি ওর সাথে... কিছু কিনতে হবে এজন্য।"
কিরিসের কানে লিসির কথাটা যেতেই মুহূর্তে বদলে গেল পরিবেশ। হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠলো, মাথার শিরা কেমন যেন টান টান হয়ে উঠলো। দাঁত চেপে ধরে আছে, ঠোঁটের কোনা শক্ত হয়ে উঠছে। তার চোখে আগুনের ঝিলিক—যেন পরের মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হবে।
ঠিক তখনই আনারুল হেসে উঠে বললো—
আনারুল — "ও তাইলে কিরিস, গাড়ি থামাই রাখ। লিসি নামুক। বন্ধুদের সাথে একটু মজা করুক। আর অভিও তো আসতেছে, ? তোরা চাইলে একটু পরে একসাথে রিসোর্টে চলে আসিস লিসি কেমন। যাও, যাও।"
লিসি একটুও ভেবে দেখলো না। গাড়ি থামতেই দ্রুত নেমে গেল, মুখে হালকা হাসি। যেন মুক্তি পেল কোনো বাঁধন থেকে।
কিরিস ঠোঁট চেপে ধরলো, এক মুহূর্ত দেরি করলেই হয়তো লিসিকে নামতেই দিত না।
চোখের সামনে লিসি গাড়ি থেকে নেমে অভির দিকে এগিয়ে গেল। কিরিস হাতের মুঠো শক্ত করে স্টিয়ারিংয়ে আঘাত করলো—ধুপ! শব্দটা পুরো গাড়ির ভেতর কেঁপে উঠলো। নিজের রাগ কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে সে বুঝতে পারছে না।
তাকিয়ে দেখলো—অভি মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লিসি খুশিমনে গিয়ে পেছনে বসলো। দু’জনের হাসি, মজা… কিরিসের কাছে সব দৃশ্য স্পষ্ট হলেও কথাগুলো শোনা যাচ্ছে না।
অভি হালকা টান দিল, মোটরসাইকেল এগোতেই লিসি হেলে পড়লো অভির কাঁধের দিকে। মুহূর্তের জন্য যেন আঁকড়ে ধরলো তাকে, তারপর সামলে নিয়ে সোজা হয়ে বসল। অভিও হেসে কিছু বললো। দু’জনকে একসাথে দেখে কিরিসের বুকের ভেতর আগুন ধিকিধিকি জ্বলে উঠলো।
কিছু না বলে সে গাড়ি এগিয়ে নিল। মুখে কোনো শব্দ নেই, চোখ লালচে, দৃষ্টি ভেদ করে যাচ্ছে সামনে।
আশুলিয়ার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ গাড়ি থামালো কিরিস।
আনারুল — "কিছু হয়েছে নাকি?"
কিরিস — "না চাচু। একটা কাজ মনে পড়েছে হঠাৎ। আপনি এখানেই নামুন। আমি মার্ককে বলে দিয়েছি, সে এসে আপনাকে আর ইয়াবিকে নিয়ে যাবে।"
আনারুল — "হুম, ঠিক আছে। ইয়াবি নামো।"
কিন্তু ইয়াবি নড়লো না। সে একদৃষ্টে কিরিসের দিকে তাকিয়ে আছে। এতদিনের চেনা মুখ আজ অচেনা লাগছে—চোখ দুটো রক্তাভ, ঠোঁট শক্ত, ভেতরের রাগ স্পষ্ট।
একটু থেমে ইয়াবি গলা পরিষ্কার করে বললো—
ইয়াবি — "এই গাড়িটা… কি নতুন নাকি?"
কিরিস — (ঠান্ডা স্বরে) "হুম… সম্ভবত।"
কিরিস চোখের পলক না ফেলে গাড়ি ব্যাক করল, এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে সেখান থেকে ছুটে গেল। গাড়ি যেন মাটিতে লেগে উড়ছে—স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে রেখেছে, দাঁতে দাঁত চেপে।
ইয়াবি জানলার বাইরে তাকিয়ে হালকা হেসে মনে মনে বলল,
— "আহ রে গাড়িটার কপাল খারাপ! আজই কিনলো, আজই শেষ! ভাই যদি কেলো করে ফেলে…না খুঁজতে হবে ওকে। কিরিস রেগে আছে, রেগে…"
কয়েক মিনিট পর ইয়াবি আর আনারুল পৌঁছাল রিসোর্টে। সবাই আগে থেকেই পৌঁছে গেছে—লিসি আর অভিও। ইয়াবি কোনোমতে গাড়ি থামিয়ে রিহান আর কাবিরকে ধরল। সব খুলে বলল।
কাবির একবারে মাথায় হাত দিয়ে বলল,
— "আমার ভাই আবার একটা গাড়ি শেষ করবি? চল, ইয়াবি—দ্রুত!"
তিনজন কাউকে কিছু না বলে মার্ককে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত রওনা দিল।
নুসরাত কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "এভাবে সবাই কোথায় চলে গেলো কিছু কি হয়েছে ?"
আরোবি কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে বলল,
— "আরে যা হয় হোক, তুই চল তো!"
এইদিকে মেয়েদের ব্যস্ততা আলাদা। হাসি-ঠাট্টা, কনগ্র্যাচুলেশন—রুম ভাগাভাগি করে নিল লিসি, আরোবি, জারা আর সুরভী।কিন্তু ওইদিকে কিরিস… গাড়ি চালাচ্ছে পাগলের মতো। তার মাথা গরম, চোখ লাল। পেছনে পুলিশের সাইরেন বাজছে—তাদের গাড়ি পিছু নিয়েছে। কিরিস থামার মানুষ না, আরও স্পিড তুলল।রিহান কিরিসের ফোন ট্র্যাক করে লোকেশন ধরল।
— "পেয়েছি! তাড়াও, দেরি হলে বিপদ হবে!"
কিরিস রাগ সামলাতে না পেরে স্টিয়ারিং এ ঘুষি মারতে মারতে গাড়ির উপর পুরো স্পিরিটে চালাচ্ছে। হঠাৎ—
ধাম! গাড়ি সোজা গিয়ে ধাক্কা খেলো রোডের ধারে বিশাল গাছে। মুহূর্তেই শকওয়েভ ছড়িয়ে পড়ল।কিরিসের মাথা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। ডান হাত কেটে গেছে। তবু সে দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে, স্টিয়ারিংয়ে আবার ঘুষি মারছে—রাগে, বেদনায় ফুঁসছে।পুলিশরা দৌড়ে এল, চেষ্টা করছে তাকে গাড়ি থেকে টেনে বের করতে। কিন্তু গাড়ি থেকে তেলের গন্ধ ছড়াচ্ছে—যে কোনো সময় বিস্ফোরণ হতে পারে…
পুলিশদের রাগী গলায় কটূক্তি আর চিৎকার —"শালার হারাম জাদা বের হয় তারপর তোর হিরো গিরি দেখাচ্ছি,"
পুলিশেরা কিরিসকে বের করার চেষ্টা করছে কিন্তু কিরিস বের হচ্ছে না। কিরিসের চোখ দেখলে মনে হয় কান্না করে দেবে, কিন্তু চোখ বেয়ে পানি পড়ছে না।
ইতিমধ্যে ইয়াবি, রিহান আর কাবির চলে এসেছে। কিরিসকে এই অবস্থায় দেখে তারা চিন্তায় পড়ে গেছে। কিরিসকে সেই অবস্থায় দেখে তাদের কণ্ঠে ভয়-উদ্বেগ মিশে গেল। গাড়ির চারপাশ থেকে তেলের তীব্র গন্ধ উঠছে—প্রতিটি মুহূর্তে ভাঙনের শব্দ আর কোন চিহ্নে আগুন ধরে যেতে। ভয়ে আছে পুলিশরা। কিরিসকে আজেবাজে কথা শোনাচ্ছে।
ইয়াবি এবার পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলে —"যার সঙ্গে কথা বলছেন তাকে চেনে?"
পুলিশ —"চিনে কি করবে আমি, বের হতে বল ওকে, ওর হিরো সাজা আমি ঘুচিয়ে দেবো, শালার জন্য ডিউটি ছেড়ে পিছন পিছন এতদূর আইছি।"
ইয়াবি —"ওনি কিরিস রায় চৌধুরী।"
নাম শোনা মাত্রই পুলিশদের গলার স্বর বদলে গেল।
পুলিশ —"কিরিস মানে ওই..."
রিহান—"আরে বাবা হ্যাঁ ওই কিরিস, এইটা যার নাম শুনলে প্যান্টে মুতু হয়ে যায়।"
পুলিশ —"না মানে, ওই… আর কি, ওনাকে বের হতে বলুন গাড়ি থেকে, তেল লিক হচ্ছে।"
ইয়াবি ওই দিকে নজর না দিয়ে কিরিসকে বের করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিরিস ঠাঁই মেরে বসে আছে সিটে।
ইয়াবি— "আরে বের হয়ে আয় আমার ভাই, না আসলে কি করে পাবি ওকে বলে বের হয়ে আয়।"
কাবির—"আমার সত্যি কারের ভাইয়া বের হয়ে আয়… আমি এখনো তোর বিয়ে ও খায়নি।"
রিহান —"বাইরে আয়, দেখ না হলে বড় আম্মুর কি হবে, তুই, বের হয়ে আয়।"
তাদের হাজারও জোরাজুরিতে অবশেষে কিরিসকে গাড়ি থেকে বের করতে সক্ষম হলো তারা। কিরিস দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত চেহারায়—মাথা ও হাত দিয়ে রক্ত ঝরছে, ব্যথা পেয়েছে, কিন্তু মুখ থেকে কোনো আওয়াজ নেই। যেন তার সমস্ত যন্ত্রণা গিয়ে লেগেছে এক পাথরের মতো শক্ত মনের ভেতর।
কিরিসকে বাইরে এনে নিরাপদ জায়গায় দাঁড় করাতেই, মুহূর্তের মধ্যে বুমম! করে গাড়িটা সবার চোখের সামনে বিস্ফোরিত হলো। আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়তেই চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেল।
গাড়িটাকে এভাবে ছাই হতে দেখে কাবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল—
—"এটা কত নাম্বার গাড়ি?"
রিহান মাথা নাড়ল —"জানি না।"
(মানে বোঝাই যাচ্ছে, কিরিস রেগে গেলে সে জোরে গাড়ি চালায়, আর তার ফল সবসময় এ রকমই হয়।)
ইয়াবি তাড়াহুড়ো করে বলল —"চল আগে হাসপাতালে।"
কিন্তু কিরিস ঠান্ডা গলায়, চোখেমুখে ভয়ানক দৃঢ়তা নিয়ে উত্তর দিল —
—"Don’t touch me. আমার গায়ে হাত দিবি না। এভাবে চল।"
কিরিসের কথার পর আর কেউ কিছু বলতে সাহস পেল না। পুলিশদের দিকটা সামলাবে মার্ক—এই বোঝাপড়াতেই ওরা নিশ্চুপ রইল।
চারজন তখন রিসোর্টের দিকে রওনা হলো। এদিকে কাবির, সুযোগ বুঝে, তার খালামনিকে বলে দিলো—
"কিরিসের ঘর আলাদা করে দিও।"
কারণ, কিরিস সবসময় একা থাকতে পছন্দ করে, কারো সঙ্গে রুম শেয়ার করা তার স্বভাবের মধ্যে নেই।
রিসোর্টের গেট পেরিয়ে তারা যখন নামল, মুহূর্তেই সবাই কিরিসের দিকে তাকিয়ে রইল—হচ্ছে কি বোঝার চেষ্টা আর কৌতূহল মিলিয়ে। কিরিসের রক্তের ভেজা জামা, মাথা থেকে নেমে আসা রক্ত, তার চোয়াল চেপে ধরা—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লিসি মৃদু কাঁপছে; কপালে ঠাণ্ডা ঘাম। ভয়, দুশ্চিন্তা আর অপরাধবোধ—সব কিছু এক সঙ্গে মিশে তার বুক ধুকধুক করতে লাগলো। ঠিক তখন কিরিস তার দিকে তাকাল। সেই চেয়ে দেখা—কিরিসের চোখে যে তরঙ্গটা ছিল, তাতে কিছু জানার আগেই লিসির ভিতরে এক ঝাঁক জ্বলে উঠল—এটাই তার কারণে সবকিছু করা; সেই রাগ, সেই প্রতিরোধ, সেই অদ্ভুত কড়াভাব—লিসি বুঝে গেল।
হঠাৎ করে সমস্ত শরীর জুড়ে মাথা ফাঁকা হয়ে গেল। পৃথিবীটা যেন নড়াচড়া বন্ধ করে দিল—লিসির চোখে অন্ধকার ভরাতে লাগলো, থুতনিতে শীতল বাতাস ছাড়া আর কিছুই লাগল না। ভয়ের ও অনিশ্চয়ের সমন্বয়ে তার পা ঢিলে হয়ে পড়লো—চোখ বড় করে কিরিসের দিকে একবার তাকিয়ে নিঃশব্দে পড়ে গেল সে।
সবার অবাক দৃষ্টির সামনে লিসি মাটিতে পড়ে গিয়ে অচৈতন্য হল; মুহূর্তেই। কিরিসের দিকে তাকানোই ছিল শেষ নিঃশ্বাস—তার মুখে অদ্ভুতভাবে কিছু অনাবিল করুণা মিশে থাকলেও, সেই চাহনি লিসির ভয়ে মেরুদণ্ড কেঁপে ওঠায় পরিণত হল। সবার চিৎকার-চাঞ্চল্যের মধ্যে কিরিস লিসির দিকে এগিয়ে এলো চিন্তিত মুখে যদিও লিসির প্রতি এখন ভীষণ রাগ। কিন্তু তারপরেও কিরিস কখনো সহ্য করতে পারবেনা লিসির কিছু হলে।
লিসি মাটিতে পড়ে যেতেই চারপাশে এক অস্থির চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল। অভি তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলো তাকে ধরতে, কিন্তু মুহূর্তের ভেতরে কিরিস এক হাতে তার হাত সরিয়ে দিয়ে নিজেই লিসিকে কোলে তুলে নিল। অভি রাগ করলেও এত মানুষের মাঝে সেটা প্রকাশ করল না।
রক্তে ভিজে আছে তার কপাল, হাত কেটে গেছে, শরীর ক্লান্ত আর দুর্বল—তবুও যেন অদ্ভুত শক্তিতে কিরিস লিসিকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাঁটতে শুরু করল। সবার চোখে স্পষ্ট অবাক দৃষ্টি—এমন আঘাত পেয়েও কীভাবে সে এতটা শক্তি নিয়ে লিসিকে কোলে নিয়েছে!
কেউ কিছু বলার সাহস পেল না। শুধু নিঃশব্দে চোখ মেলে দেখছিল—কিরিসের হাঁটার প্রতিটি ধাপ যেন এক এক টুকরো বজ্রপাত। রুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় আস্তে শুইয়ে দিল লিসিকে। মুহূর্তের জন্য একবার গভীরভাবে তার মুখের দিকে তাকালো, তারপর কিছু না বলে ঘুরে দাঁড়াল। কোনো সেবা নেই, কোনো ডাক্তার ডাকা নেই, ক্ষতস্থানে ওষুধও নয়—কিরিস সোজা তার নিজের রুমে চলে গেল। দরজা বন্ধ করলো, আর চুপচাপ অন্ধকারে বসে রইল—যেভাবে ছিল, সেভাবেই, রক্তে ভিজে থেকেও যেন কোনো কষ্ট প্রকাশ করলো না।
অল্প সময়ের মধ্যেই লিসির চোখে ধীরে ধীরে আলো ফিরল। মাথা ভারী, বুক কাঁপছে। চারপাশে তাকাতেই দেখল পাশে শুধু আরোবি বসে আছে। সে হাত ধরে আছে, ফিসফিস করে বলছে—
—"অবশেষে! কি হয়েছে রে তোর অজ্ঞান হয়ে গেলি কেন!"
লিসি চোখ পিটপিট করে একবার শ্বাস ফেলল, কিছু বলতে চাইলেও কণ্ঠে কোনো শব্দ বের হলো না। লিসি চোখ খুলে দেখে পাশে শুধু আরোবি। উঠে বসলো লিসি।লিসি ঠোঁট কামড়ে ধীরে ধীরে বলে ওঠে—
—"আরোবি… একটা কথা বলবো তোকে?"
আরোবি হালকা হাসির চেষ্টা করে,
—"এই অবস্থায় আবার কী কথা বলবি? আগে একটু বিশ্রাম নে, পরে সব বলিস।"
লিসি মাথা নাড়ল, চোখে কেমন যেন ভয় আর সাহস মেশানো দৃষ্টি।
—"না… এখনই বলতে হবে। আর কাউকে না… তোকে শুধু বলছি… আমি আর ভাইয়া… আমরা প্রেম করছি।"
কথাটা যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করল আরোবির বুকে। তার শ্বাস আটকে গেল। হাতের ভাঁজে মাথা নামিয়ে ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়ল। যেন এক মুহূর্তে বুকটা ফেটে যাবে। কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
—"কি বললি তুই? কিরিস ভাইয়া আর তুই… প্রেম?!"
লিসি চোখ নামিয়ে চুপ করে থাকল, কিন্তু গাল বেয়ে অজান্তেই লাল আভা ছড়িয়ে গেল।
আরোবি বুক চেপে শ্বাস নিল, যেন এক্ষুনি হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে তার। চোখ কপালে উঠে গেছে, ঠোঁট শুকিয়ে আসছে। একবার লিসির দিকে তাকাচ্ছে, আবার শূন্যে।
—"না… এটা কি করে সম্ভব… কিরিস ভাইয়া… আর তুই… আমি বিশ্বাস করতে পারছি না…"
তারপর মাথা হাতের ভেতর ঢুকিয়ে নিঃশব্দে বসে রইল মেঝেতে।লিসির বুক ধড়ফড় করছে, ভয়ও পাচ্ছে, আবার লুকানো প্রেমের গোপনটা বলে দেওয়ার পর মনে হচ্ছে বুকটা হালকা হলো।লিসি আমতা-আমতা করে আবারও বললো—
“সত্যি… আর এটা কেউ জানে না। আমি এখন শুধু তোকে বলেছি… তুই কাউকে বলিস না।”
আরোবি হেসে উঠলো, কাঁধে হাত রেখে বললো—
“দাড়াঁ আগে নিশ্বাস নিতে দে, বাবা গো! লিসি… তুই শেষমেশ আমার বড় ভাবি হলে!”
“ভাবি” শব্দটা কানে যেতেই লিসির গাল লাল হয়ে গেল। মাথা নিচু করে আলতোভাবে বললো—
“সে দেখা যাবে পরে… আমি তোমাকে এটা কেন বললাম, তুমি বুঝতে পারছো তো?”
আরোবি বিস্মিত—
“না, কেন বললি? আর কতদিন ধরে ডেট করছিস আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে?”
লিসি লাজুক মুখে কিন্তু হালকা রাগ মিশিয়ে বললো—
“পেছনে তো লেগেছিল সেদিন, যেদিন প্রথম ঘরে কফি নিয়ে গেছিলাম। আর আমি… আমি কি প্রেম করতে চেয়েছিলাম নাকি! আমাকে জোর করে ধরে বেঁধে করিয়েছে… যাই হোক, এখন করছি তো! আর এটা আমার ফার্স্ট টাইম… এখন তো ভাইয়া বয়ফ্রেন্ড হয়ে গেলো!”
লিসির কথায় আরোবি মুখ বুজে হেসে ফেললো, কি করবে আর!
লিসি আবারও একটু কাছে ঝুঁকে নিচু গলায় বললো—
“ভাই আমার উপর রাগ করে আছে… আর এখন যে কান্ড ঘটেছে! তাও আমার জন্য… তুই তখন দেখলি না কিভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল? আমি তো ভয়েই এই অবস্থা… আমি অজ্ঞান হয়ে গেছি… তাহলে বোঝ আমি ঠিক কতটা ভয়ে আছি…”
আরোবি — “তুই বলতে চাইছিস, ভাইয়া এসব করেছে তোর জন্য… কিন্তু রাগ করল কি কারণে?”
লিসি — “সম্ভবত অভিকে নিয়ে। কিন্তু আমি তো কিছু করিনি… শুধু অভির সঙ্গে এসেছিলাম কিছু দরকার ছিল। আন্টি আমাকে বলেছিল জিনিসগুলো কিনতে, আমি তাই গিয়েছিলাম ওর সঙ্গে… না-জানি ভাইয়া কি ভেবেছে!”
আরোবি — “তাহলে আর কি বলবো! অবশ্যই রাগ করবে তো।”
লিসি (হতভম্ব হয়ে) — “কেনো?”
আরোবি — “কোন বয়ফ্রেন্ডই চাইবে না তার গার্লফ্রেন্ড অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে ঘুরে বেড়াক… বিশেষ করে আবার সে যদি ছেলে ফ্রেন্ড হয় তাহলে তো! আর তুই তো অভির সঙ্গে বেশ ক্লোজ। এজন্যই বলছি— ভবিষ্যতে একটু দূরত্ব বজায় রাখবি ওর কাছ থেকে। ফ্রেন্ড হিসেবে ট্রিট করবি, কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করিস না।”
লিসি (মুখ গম্ভীর করে, আলতো ঠোঁট কামড়ে) — “হুম… ঠিক আছে। আসলে আমি অভিকে আগেই বলে দিয়েছি যেন আমাকে ‘জানু’ বলে না ডাকে। আর আমি ওর সঙ্গে বেশি কথা বলবো না। কিন্তু এখন তুমি বলো, আমি কিভাবে ভাইয়ার রাগ ভাঙাবো? আমার মনে হচ্ছে তোমার অভিজ্ঞতা আছে…”
আরোবি (চোখ কুঁচকে, মজা করে) — “আমার অভিজ্ঞতা আছে, তুই কী করে বুঝলি?”
লিসি (হালকা হাসি, চোখ টিপে) — “বুঝি বুঝি… সবই বুঝি। বলো তো, তুমি কি কখনো কারো সঙ্গে প্রেম করেছিলে?”
কথাটা একেবারে সহজ-সরল ভঙ্গিতে বলে ফেললেও আরোবির মুখ হঠাৎই থমকে গেল। একটু আগেও খুনসুটি করছিল, তার ঠোঁটের হাসিটা যেন উবে গেল। চোখের ভেতর কোথাও অদ্ভুত একটা আঁধার নেমে এলো।
আরোবি (মুখ ঘুরিয়ে, কষ্ট চাপা দিয়ে) — “হুম… একটা প্রেম করেছিলাম। আর সেখান থেকেই তোকে টিপস দিচ্ছি।”
লিসি (চোখ বড় বড় করে, মজা করে) — “সত্যি! তাহলে দুলাভাইকে দেখাও না!”
আরোবি এবার এক গাল কষ্টমাখা হাসি দিলো, জোর করে হালকা হেসে বললো—
“আরে… ব্রেকআপ হয়ে গেছে অনেক বছর আগে। বুঝলি? ওসব কথা বাদ দে তুই।”
কথাটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল আরোবি। মুখে বারবার হাসি, কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই যেন কিছু একটা লুকিয়ে আছে। লিসির চোখে পড়ে গেল সেই চেষ্টা।
লিসি — “ওও… ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা বলবো, তুমি কাউকে বলো না প্লিজ… আমার আর ভাইয়ার ব্যাপারটা।”
আরোবি (হেসে) — “পাগল নাকি তুই! আমি কি কখনো কাউকে বলবো নাকি? আর তুই আমাকে তুমি করে বলছিস কেন,আমি বারণ করেছি না। তাহলে তুমি করছিস কেন?”
লিসি — “ঠিক আছে…”
আরোবি একটু গম্ভীর হয়ে হেলান দিয়ে বললো—
“শোন, আমার ভাই ভীষণ পজেসিভ একজন মানুষ। ওর জিনিসের ভাগ সে কাউকে দিতে চায় না, কিছুতেই না। যেটা ওর পছন্দ… সেটা শুধু ওরই। আর তুই তো সেখানে ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড, আমার হবু ভাবী… তোকে কিভাবে অন্য কারো সাথে শেয়ার করবে বল?”
লিসি চুপ হয়ে গেল। ভেতরে ভেতরে সেও জানে কিরিস ঠিক এমনই।
আরোবি হেসে আবার হালকা করে বললো—
“আচ্ছা শোন, ভাইয়া যখন খুব রাগ করবে… তুই ভাইকে একটু আদর করিস।”
লিসি (চোখ কুঁচকে) — “আদর মানে! উনি কি বাচ্চা নাকি? আমি ওইসব পারবো না।”
আরোবি হেসে লিসির মাথায় আলতো চাটি মেরে বললো—
“গাধা! আমি ওই আদরের কথা বলছি না। যখন রাগ করবে তখন একটু জড়িয়ে ধরবি… একটু বলবি, তুই ভুল করিস নি, কিংবা তুই যদি ভুল করে থাকিস তাও স্বীকার করে নিবি। আর যদি পারিস…”
লিসি (কৌতুহল নিয়ে) — “যদি পারি তাহলে?”
আরোবি (চোখ টিপে) — “তাহলে একটুখানি কিস… বিশ্বাস কর, ভাইয়া একদম খুশি হয়ে যাবে। তুই তো এখন ওনার গার্লফ্রেন্ড।”
লিসি (চোখ বড় করে) — “এ্যাঁ… এখন এইসব করতে হবে নাকি?”
আরোবি (গম্ভীর-হাসি মিশিয়ে) — “শোন, আমি বলেছি—করতেই হবে, তা না। কিন্তু প্রেম মানেই কেবল এইসব না, ”প্রেম আসলে ভীষণ পবিত্র একটা জিনিস। যদিও কিছু মানুষের জন্য প্রেমটা অপবিত্র হয়ে যায়… আসলেই পবিত্রতা ধরে রাখাটাই কঠিন। যারাই সেই পবিত্রতা বাঁচিয়ে রাখতে পারে, শেষমেশ তারাই পূর্ণতা পায়।”
একটু থেমে সে হালকা আঙুল নাড়লো—
“উদাহরণ চাইলে দেখ—আমার ভাই রিহান আর নুসরাতকে, কিংবা কাবির আর তিশাকে। সত্যিকারের প্রেম মানে এইটা।”
লিসি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলো। নিজের ভেতরের অনুভূতিটাকে বুঝতে চেষ্টা করছে। এতোটুকু সে নিশ্চিত – কিরিসের জন্য তার অনুভূতি খুবই গভীর। কিরিসের ছোঁয়ায় যে উষ্ণতা আছে, সেটা অন্য কারো কাছে খুঁজে পায় না সে। অদ্ভুত লাগে… মনে হয় এই কয়েক মাস নয়, হাজার বছর ধরে সে কিরিসকে চেনে।
যখন কিরিস তার খুব কাছে থাকে তাকে ছোঁয় , লিসির একটুও ঘেন্না হয় না – অথচ এই ফিজিকাল টার্চ বিষয়টা তার পছন্দ নয়। বুকের উপর হাত রেখে সে বুঝতে পারে –” হ্যাঁ, সে ভালোবেসে ফেলেছে ওই বেপরোয়া, রাগী, গম্ভীর, খিটখিটে বদমেজাজি মানুষটাকে… যার হৃদয় একদম শীতল বরফের মতো।” আর সেই বরফ গলানোর দায়িত্ব যেন তার ওপরেই পড়েছে।
আরোবির সামনে মনের কথা বলতে পেরে বড্ড হালকা লাগছে এখন লিসির। এরকম একটা বেস্ট ফ্রেন্ড সবাই রিজার্ভ করে – যে হাসাবে, ছোট ছোট কথাগুলো শুনবে, কেয়ার করবে। আরোবি শুধু বেস্ট ফ্রেন্ডই নয়, যেন নিজের বোন।
দুজনে বসে হালকা গল্প করছিল, এমন সময় হঠাৎই ইয়াবি দুশ্চিন্তাভরা মুখ নিয়ে দ্রুত এগিয়ে এলো।
ইয়াবি (হাপাতে হাপাতে) — “লিসি… দেখ, কিরিস দরজা খুলছে না। ও কোনো ওষুধও নেয়নি, ফার্স্ট এইড করিনি। ওইভাবে বসে আছে… রক্তে ভিজে আছে!”
লিসি ইয়াবির কথা শুনে একটু ঘাবড়ে গেল।
আরোবি — “তুই কি পাগল নাকি? ওইভাবে বসিয়ে রেখে দিয়েছিস ভাইয়াকে? কিছু হয়ে যাবে তো… অনেক দেরি হয়ে গেলে?”
ইয়াবি — “সেই জন্যই তো বলছি! লিসি, তুই যা। অন্য কেউ গেলে কিরিস জীবনেও দরজা খুলবে না। আমি কতবার বলেছি, তাও খুললো না। যা, প্লিজ বোন আমার!”
লিসি একটু ইতস্তত করছিল, কিন্তু আরোবি পাশ থেকে ধমক দিলো—
আরোবি — “হ্যাঁ, যাচ্ছে লিসি। তুই যা!”
ইয়াবি — “হুম, তাই যা দ্রুত।”
লিসি আরোবির দিকে তাকালো।
আরোবি (নরম স্বরে, মিষ্টি হেসে) — “যা দ্রুত। আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছিস কেন? আর যা বলেছি সেটা করবি। ভাইয়া যদি বেশি রাগ করে থাকে, ভালোবেসে বোঝানোর চেষ্টা করবি… বুঝেছিস?”
লিসি (হাসতে হাসতে) — “হুম ম্যাডাম… বুঝতে পেরেছি।”
বলে লিসি উঠে দাঁড়ালো। ইয়াবি যাওয়ার আগে বলে দিয়েছে কিরিস কোন রুমে আছে। কিরিসের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো লিসি। ভেতরটা কেমন যেন ভয়-ভয় করছে তার। নিজের বুকে হাত দিলো, হার্টবিট দ্রুত চলছে।
জোরে একটা শ্বাস নিয়ে হালকা করে দরজায় টোকা দিলো। মৃদু কণ্ঠে বললো—
লিসি — “ভাইয়া… আমি লিসি। দরজা খোলেন প্লিজ… আমার কথা শুনুন একবার…”