তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :28

বিরক্তি আর থমথমে মেজাজ নিয়ে সে ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে এগোল। ফ্রিজের মাথাটা টেনে খুলতেই হাজার খানিক অসহায় বিরক্তি তার চাহনিতে উঠল—
হাজার খানিক বিরক্তি নিয়ে লিসি ফ্রিজের দরজাটা টেনে খুলল। ভেতরে চোখ বোলাতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল একটা বাটিতে রাখা চিজ পাস্তাতে।
"হুঁ… এটুকুই যথেষ্ট, বেশি ঝামেলাও নেই।" — নিজের সঙ্গে নিজের বিরক্ত গলায় বলল সে।
বাটি হাতে তুলে ওভেনে ঢুকিয়ে দিল। গরম হাওয়া ছড়াতে শুরু করতেই লিসির কপাল আরও ভাঁজ পড়ল। দাঁত চেপে ভাবল—
"এমন বেয়াদব লোক! তবুও না জানি কেন আমি বারবার ওর কথায় জড়িয়ে যাই…"
ওভেনের টুং শব্দে চমকে উঠে বাটি বের করল। চিজ গলে গিয়ে হালকা সুবাস ছড়িয়ে পড়তেই লিসি গম্ভীর মুখে ট্রেতে খাবার সাজিয়ে নিল।
ধীরে ধীরে পা টিপে উপরের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ধুকপুকানি শুরু হলো।
ধীরে ধীরে ট্রেটা হাতে নিয়ে লিসি কিরিসের রুমের সামনে দাঁড়াল। দরজাটা আধখোলা, ভেতর থেকে হালকা আলো ছড়িয়ে আসছে। বুক ধকধক করছিল, তবুও ঠোঁট কামড়ে সাহস জোগাল সে।
একটু ঠেলা দিতেই দরজাটা কট করে খুলে গেল।
ভেতরে ঢুকেই প্রথমেই চোখে পড়ল—কিরিস জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলছে, যেন লিসি আসবেই সেটা আগে থেকেই জানত।
কিরিস না ঘুরেই বলল—
"জানতাম, তুমি আনবে।"
লিসি চুপচাপ ট্রেটা টেবিলে রাখল। মুখ ভার করে বলল—
"আপনার খাবার। এবার খেয়ে নিন, আমাকে আর বিরক্ত করবেন না।"
কিরিস ধীরে ধীরে ঘুরে তার দিকে তাকাল। চোখে এক অদ্ভুত দুষ্টু ঝিলিক। ধোঁয়ার রিং ছেড়ে হেসে বলল—
"তাহলে তুমি সত্যিই রাগ করতে করতে আমার কথা শোনো, লিসি শর্মা।"
লিসি চোখ ঘুরিয়ে বলল—
"আপনার আজব যুক্তি নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না।"
কিরিস টেবিলের কাছে এসে প্লেটটা হাতে নিল। তারপর হালকা ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—
"হুম… তবুও শেষ পর্যন্ত আমার খাওয়াটা তোমার হাতেই নির্ভর করছে, বুঝলে?"
কিরিসের চোখের সেই অস্বস্তিকর দৃঢ় দৃষ্টি এড়িয়ে দ্রুত সরে গেল লিসি, কিন্তু বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি থামল না। বেশি কথা বাড়ালো না কিরিসের সামনের টেবিলে ট্রে রেখে চলে যেতে ফিরল। কিন্তু হঠাৎ কিরিস হাত বাড়িয়ে তার কব্জি চেপে ধরল।
"থামো।"
চমকে ঘুরে তাকাতেই সে টেনে নিয়ে এসে বসিয়ে দিল নিজের পাশে।লিসি উঠতে গেলে কিরিসের তাকানোর ভাব দেখে বুঝতে পেছে সে লিসিকে এখান থেকে যেতে বারণ করছে, কিরিসের চোখের দৃষ্টি লিসিকে আর নড়তে দিচ্ছে না, লিসি আর কিছু বললো না বসে আছে,
কিরিস প্লেট টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে খেতে শুরু করল। লিসি চুপচাপ বসে, চোখ এড়িয়ে তাকিয়ে আছে এদিক-ওদিক।
কিছুক্ষণ খাওয়ার পর কিরিস হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল—
"ভালো লাগছে না।"
লিসি চোখ পাকিয়ে বলল—
"তাহলে আমাকে কেন বসিয়ে রেখেছেন?"
কিরিস চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ লিসি হাত বাড়িয়ে একটা চামচ ভরে দিল—
"এই যে, খেতে থাকুন… এইদিকে দেখুন তো, একা একা খাচ্ছেন।"
কিরিস ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল—
"তাহলে তুমি খাও।"
লিসি গম্ভীর গলায় মাথা নাড়ল—
"না, আমি খাব না।"
কিরিস আরেকটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল—
"তাহলে জোর করেই খাওয়াবো।"
বলেই এক টানে চামচটা তার ঠোঁটে ঠেসে দিল। চিজি পাস্তা মুখে যেতেই লিসি হাঁফ ছাড়ল, আর গালের পাশে পুরোটা লেগে গেল।
"আঃ… এটা কি করার ছিল?" — বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে উঠল লিসির। সে হাত দিয়ে কোনোমতে মুছতে যাবে, তার আগেই হঠাৎ কিরিস লিসির কাছে এসে ঝুঁকে পরে কিরিসের হাত এসে থেমে গেল তার গালে।
লিসি বুঝে ওঠার আগেই কিরিস মুখটা এগিয়ে এনে ঠোঁটের পাশে লেগে থাকা সেই চিজ নিজের জিহ্বা দিয়ে চেটে নিল।
লিসির চোখ বড় বড় হয়ে গেল অবাকে, গায়ের লোম সোজা হয়ে গেল । কিন্তু কিরিস থামল না—
চোখের পলক ফেলবার আগেই তার ঠোঁট লিসির ঠোঁটে লেগে গেল।
হঠাৎই ঠোঁটের স্বাদ মিলেমিশে গিয়ে কিরিসের গালেও ছড়িয়ে পড়ল সেই খাবারের গন্ধ আর স্বাদ।
লিসি একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল, যেন শরীরের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তার মনে হলো এ যেন একেবারে জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা—নিঃশ্বাস, ভয় আর অজানা অনুভূতি সব একসাথে গুলিয়ে গেল।
কিরিস নিজের তৃপ্তি মিটিয়ে লিসি ঠোঁটের স্বাদ নিতে থাকে, লিসির গালের অধিকাংশ খাবার কিরিসের গালে চলে গেছে,
খানিক পরে কিরিস লিসির ঠোঁট ছেড়ে দিলো,
কিরিসের ঠোঁট ছেড়ে যখন লিসি কোনো মতে নিজেকে সরিয়ে নিল, তখন দু’জনেই কিছুক্ষণের জন্য চুপ। ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো, শুধু দুজনের দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
লিসির চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা—তার বুক কাঁপছে, ঠোঁট কাঁপছে, মনে হচ্ছে কথাই যেন বেরোচ্ছে না। কিছুক্ষণ কিরিসের দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিল সে।
হঠাৎ লিসি মুখ চেপে ধরে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল, যেন বমি চলে আসবে।
"আঃ…"— ঠোঁটের কোণে ফিসফিস শব্দ বেরোল, চোখ বুজে নিঃশ্বাস সামলাতে চেষ্টা করল সে।
কিরিস হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইল, কিন্তু একটাও কথা বলল না।
এরপর মুখ নাড়িয়ে পাস্তা খেতে বলে —
" হুম এবার মজা লাগছে "
কিরিস কথায় লিসি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বেশন রাগ হচ্ছে তার এখন কিন্তু কিছু চেয়েও করতে পারছে।
কিরিস ঠিক কি লেভেলের বেয়াদব তাই নভাবছে লিসি, তার গালে খাবার দিয়ে নিজে আবার তার গাল থেকে খাবার নিয়ে নেওয়া কোন ধরনের মোহাব্বত তাই ভেবে বেসামাল লিসির মস্তিষ্ক, কিছুক্ষণ নিজের মধ্যে এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকে, এরপর কোনো মতে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াল। টেবিলে রাখা ট্রেটা হাতে নিল, আর কিছু না বলে দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
পেছন থেকে কিরিস ডাকতে যাচ্ছিল, কিন্তু মুখ খুলেও শব্দ বের করল না।
দরজার আড়ালে মিলিয়ে গেল লিসির পায়ের শব্দ, ঘরে রইল শুধু গলানো চিজের হালকা গন্ধ আর এক অদ্ভুত অস্বস্তিকর নীরবতা।
ট্রেটা হাতে নিয়ে লিসি তাড়াহুড়ো করে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। হাঁপাতে হাঁপাতে ট্রেটা এক পাশে রেখে বিছানায় বসে পড়ল। বুকটা যেন ধড়ফড় করছে, ঠোঁট কাঁপছে, চোখের ভেতর পানি জমে উঠছে।
হাত দিয়ে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দেখল, মনে হলো এখনো কিরিসের গরম নিঃশ্বাস আটকে আছে সেখানে।
"আল্লাহ… আমি কেন কিছু বলতে পারলাম না? কেন থামাতে পারলাম না?" —মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল লিসি।
মাথা ঘুরে আসছিল, যেন সত্যিই বমি করে দেবে। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিতে লাগল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেই মুহূর্তটা আবার বারবার ফিরে আসছিল—চিজের স্বাদ, কিরিসের চোখের দৃষ্টি, আর তার ঠোঁটের জোর।
অসহায়ভাবে চাদর টেনে মুখ ঢেকে নিল লিসি।
"না… এটা আমি কাউকে বলব না। কিছুই বলব না। যেন কিছুই হয়নি।"
কিন্তু বুকের গভীরে সে জানত, আজকের রাতটার পর কিছুই আর আগের মতো থাকবে না।
ভোরের নরম আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল রায়চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি কোণে। উঠোনে টগবগে রোদ এসে পড়েছে, হালকা বাতাসে গাছের পাতা ঝিরঝির করছে। পাখির কিচিরমিচিরের সঙ্গে ভেসে আসছে।
লিসি ঘরে বসে আয়নার সামনে চুল আঁচড়াচ্ছিল। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, রাতভর সে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। মাঝে মাঝে নিজের ঠোঁটে হাত বোলাচ্ছিল, তারপরই আবার অস্থির হয়ে চুলে মন দিচ্ছিল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
“না, আমি এসব কিছু ভাবব না। সব ভুলে যাব।”
কিন্তু যতই এড়িয়ে যেতে চাইছিল, ততই গত রাতের সেই মুহূর্তটা যেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে ফিরে আসছিল।
ঠিক তখনই বারান্দায় পায়ের শব্দ। ভারী, দৃঢ়—একেবারে চেনা। লিসির বুক কেঁপে উঠল। চোখ তুলতেই দেখল, কিরিস ধীরে ধীরে হাঁটছে হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ নিয়ে। হালকা ধূসর শার্ট, গলায় খোলা বোতাম, এলোমেলো চুল—সকালের আলোয় তাকে আরও ভয়ংকর রকম সুন্দর লাগছিল।
দু’জনের চোখ হঠাৎই একসঙ্গে আটকে গেল। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা—একদিকে লিসির কাঁপা বুক, অন্যদিকে কিরিসের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি।
কিরিস মগটা ঠোঁটে ঠেকিয়ে হালকা গলায় বলল—
“গুড মর্নিং, লিসি শর্মা।”
লিসি গলায় শব্দ আটকে এলো। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল, ঠোঁট কেঁপে উঠে শুধু বলল—
“মর্নিং…”
তারপর ব্যস্ত ভান করে আবার চুল আঁচড়াতে শুরু করল।কিরিস হেসে মগ থেকে এক চুমুক খেল, কিছু না বলে সিঁড়ির দিকে এগোল। তবে চলে যাওয়ার আগে একবার ঘুরে তাকাল, চোখে সেই অদ্ভুত দৃষ্টি—যেন রাতে যা ঘটেছে, সেটা তার মনে এখনো টাটকা।
ডাইনিং রুমে বসেছে সকলে। লম্বা টেবিলজুড়ে সারি সারি প্লেট, গরম গরম লুচি, পরোটা, ডাল, সব্জি সাজানো। হালকা কোলাহল চলছে—হাসি, গল্প, সকালের আলাপ।
লিসি এসে একপাশে চুপচাপ বসল। মনের মধ্যে এখনো টান, সে চেয়েছিল কারো নজরে না পড়তে। কিন্তু ঠিক বিপরীতে বসেই কিরিস। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি নিয়ে চুপচাপ কফি নাড়ছে।
পরিবারের বাকিরা গল্পে মশগুল, কেউ খেয়ালই করছে না লিসি আর কিরিসের চোখাচোখি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা। কিরিস মাঝেমধ্যেই চোখ তুলে তাকাচ্ছিল, আর লিসি তড়িঘড়ি চামচে নেড়েচেড়ে খেতে শুরু করছিল, যেন ব্যস্ত।
ঠিক এমন সময় এক কাজের মহিলা এসে বলল—
“ছোট সাহেব, দুধটা দেব?”
কিরিস এক ঝলক লিসির দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল—
“হুম… ও দিকেই রাখো।”
লিসির হাত হঠাৎ থেমে গেল। মনে হলো, কথাগুলো যেন শুধু কাজের মহিলার উদ্দেশ্যে নয়, তার জন্যও। বুকের ভেতর আবার অদ্ভুত এক ধকধকানি শুরু হলো।
কিরিস কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলে-
" মা কালকে পাস্তা কিভাবে রান্না করেছিলে বেশন মজা লেগেছিলো,, "
কিরিস কথা শুনে লিসির পানি খেতে গিয়ে বিসুম লাগে সুপ্রিয় একটু বেশ অবাক হয়ে তাকায় কারণ সচার আচার কিরিস খাবারের প্রশংসা করে না, লিসি কে আরোবি সামলে নিয়ে বলে —
" তুমকো কেয়া হোয়া মামুনি "
লিসি —" কিছু না, "
সবার মাঝে হঠাৎই কিরিস চুপচাপ সালাদের টুকরো মুখে দিয়ে হালকা ভঙ্গিতে বলে উঠলো—
"লিসি, তোমাকে ধন্যবাদ রাতে খাবার দেওয়ার জন্য।"
কথাটা এত হঠাৎ যে, পুরো টেবিল আবার থমকে গেলো। যে যার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সবাই একসাথে শক খেলো।
লিসির মুখে স্পষ্ট অস্থিরতা ফুটে উঠলো। ঠোঁট কামড়ে, চোখ নামিয়ে রাখার চেষ্টা করলো, কিন্তু তবুও ভেতরের অস্বস্তি লুকোতে পারলো না।
কিরিস সেই মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে নরম গলায় বললো—
"বেশি ভাবতে হবে না, লিসি। পানি খেতে উঠেছিলো, আর আমি-ও খেতে এসেছিলাম। তাই একটু খাবার গরম করে দিতে বলেছিলাম… সেটা-ই দিয়েছিলো।"
কিরিসের গলায় স্বাভাবিকতা থাকায় টেবিলের সবাই ধীরে ধীরে হালকা হলো। যেটুকু অবাক আর সন্দেহ জমেছিলো, মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলো হাসি-ঠাট্টার আড্ডার ভেতর।
তবে লিসির বুকের ভেতরের ধুকপুকানি এখনো কমলো না—তার মুখের সেই অস্থিরতার রেখা কেবল কিরিসই পরিষ্কার দেখতে পেলো।
কিন্তু লিসি কিছু না বলে মাথা নিচু করে খেতে লাগল।
আজকের সকালটা যেন আগের সব সকাল থেকে আলাদা—ঘরের ভিড়েও অদ্ভুত নীরবতা লেগে আছে কেবল তার আর কিরিসের মাঝে।
খাওয়াদাওয়া শেষ। সবাই একসাথে বসেছে ড্রয়িংরুমে। সকালের আলোয় পরিবেশটা বেশ হালকা। হাসি–ঠাট্টা, গল্প–আড্ডায় ভরপুর মুহূর্ত—কাবির আর রিহান কোনো একটা মজার ঘটনা শেয়ার করছে, বাকিরা তাতে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে হঠাৎ গাড়ির শব্দ। কারো খেয়াল ছিলো না, তাই মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি ঘুরলো সেদিকে।
দরজাটা খোলার সাথে সাথে ভেতরে পা রাখলেন একজন নারী—পাপড়ি। সবার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো। যেন কেউ বিশ্বাস করতে পারছিলো না, তিনি হঠাৎ এভাবে চলে আসবেন।
সুপ্রিয়া চমকে উঠে দাঁড়ালো—
সুপ্রিয়া—"পাপড়ি!? তুই… এসময়…!"
পাপড়ি হেসে বললো—
পাপড়ি— "কি হলো, অবাক হচ্ছিস কেন? আমি কি এ বাড়িতে আসতে পারি না?"
সুপ্রিয়া—" কেনো পারবি না, আয় ভিতরে আয় কতদিন বাদে এলি "
পাপড়ি ভিতরে ঢুকে মির্জা বেগম কে দেখে সম্মানের সঙ্গে বলেন —" ভালো আছে মা,,, "
মির্জা বেগম মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন,
কাবির দৌড়ে গিয়ে এগিয়ে এলো, মুখে বিস্ময় আর আনন্দ একসাথে—
কাবির— "খালামণি! আপনি…! আমাদের কিছুই জানালেন না কেন?"
পাপড়ি এসে বসে পরলো সবার মাঝে, সবাই তাকে দেখে খুশি,। কিরিস যদিও খুব বেশি কথা বললো না, তবে তার চোখে এক মুহূর্তের জন্যও বিস্ময়টা লুকোলো না। চুপচাপ তাকিয়ে রইলো পাপড়ির দিকে, তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে মাথা নুইয়ে সন্মান জানালো।
হালকা ঠাট্টা সরে আনোয়ার খবরের কাজ ভাজ করে বলে —" কি ব্যপার শালিকা হঠাৎ আমাদের বাসায় আসলো,, তা কি মনে করে আসলেন "
আনোয়ারের কথায় মৃদু হাসি দিয়ে পাপড়ি বলে —" আরে দুলাভাই রাগ করবে না, রিহান বাবার বিয়েতে আসতে পারি কারণ অনুর আব্বু অসুস্থ হয়ে গেয়েছিলো "
প্রিয়া—" তা হয় ঠিক আছে কিন্তু আপনার ছেলে কেন এলো না সবাই ওকে খুঁজ ছিলো "
আনারুল —"হুম প্রিয়া কিন্তু কথাটা ঠিক বলেছে, "
সুপ্রিয়া—" পাপড়ি আসার আগে একবার বলতে পারতিস আর একা এসেছিস ,,,,,,, "
পাপড়ি —"না, আমার সাথে আমার ছেলে এসেছে আমি ওর মোটরসাইকেল এসেছি "
বড়রা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, ঘরের ভেতরকার পরিবেশ মুহূর্তেই অন্য রঙে রাঙা হলো। অপ্রত্যাশিত অতিথির আগমন যেন সকালের আড্ডায় নতুন উত্তেজনা যোগ করলো।
উপরে ঘরে বসে ছিলো লিসি আর আরোবি। নিচে সবার আড্ডার মধ্যে হঠাৎ এক নতুন গলার আওয়াজ কানে এলো। দু’জনেই কৌতূহলী হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলো।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে এক মোটরসাইকেলের শব্দ ভেসে এলো। মুহূর্ত পরে ভেতরে প্রবেশ করলো এক যুবক—অভি। দরজার ভেতর ঢুকতেই তার চোখ সোজা গিয়ে পড়লো সিঁড়ি দিয়ে নামা লিসির ওপর।
এক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো অভি। তারপর পরমুহূর্তেই আর দেরি না করে, সবার বিস্ময় উপেক্ষা করে সোজা এগিয়ে গিয়ে সিঁড়ির মাঝখানেই লিসিকে জড়িয়ে ধরলো।
ঘরের সবাই হা করে তাকিয়ে রইলো। যেন কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না চোখের সামনে যা ঘটছে।
সবার ভেতর সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত হলো কিরিস। তার দৃষ্টি এমন তীব্র হয়ে উঠলো যে মনে হচ্ছিলো এক্ষুনি আগ্নেয়গিরির মত বিস্ফোরিত হবে। চোখের রাগে আগুন জ্বলছে—যেন মুহূর্তেই ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে অভিকে।
লিসি নিজেও অবাক হয়ে থমকে গেলো। তার পাশে থাকা আরোবি গাল হা করে একবার কিরিসের দিকে আর একবার অভির দিকে তাকিয়ে রইলো—কি হচ্ছে কিছুই যেন বুঝতে পারছে না।
অভি স্বাভাবিক, আনন্দভরা কণ্ঠে বলে উঠলো—
অভি— "লিসি জানু, তুই এখানে কী করে? কতদিন তোকে দেখি না! … আরে আমি অভি, ভুলে গেলি নাকি?"
এই শোনামাত্র লিসির মুখের বিস্ময় খুশিতে বদলে গেলো। চোখে আনন্দের ঝিলিক ছড়িয়ে বললো—
লিসি— "আরে তুই! আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম!"
আরোবি এবার একেবারে হতভম্ব হয়ে বললো—
আরোবি— "এই… তোরা চিনিস একে অপরকে?"
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই অস্বাভাবিক ভারী হয়ে গেলো—সবার চোখে কেবল বিস্ময়, আর কিরিসের চোখে সেই ভয়ঙ্কর দহন, যা যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে।
সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। ঘরে মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এসেছে। সবার সেই দৃষ্টির চাপ লিসির গায়ে লাগতেই সে দ্রুত সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলো।
লিসি (তাড়াহুড়ো করে):
"আরে, ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড… একসাথে পড়তাম। ও… নানু, প্লিজ কিছু বলো না এদেরকে।"
মির্জা বেগম একপলক লিসির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেললেন। তার চোখে স্পষ্ট ছিলো—তিনি সবটাই জানেন। তাই স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,
মির্জা বেগম:
"আগে বলে দিলে তো এই সুন্দর দৃশ্যটা মিস করতাম, মা।"
তার কথা শুনে পরিবেশটা কিছুটা হালকা হলো। সবাই একটু স্বাভাবিক হলো, বোঝা গেলো ব্যাপারটা আসলে কী।
কিন্তু ঠিক তখনই কিরিস দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষুব্ধ গলায় বলে উঠলো—
কিরিস (চোখ রাঙিয়ে):
"…What nonsense this! কখনো কোনো ফ্রেন্ড, বিশেষ করে ছেলে ফ্রেন্ড—তার মেয়ে ফ্রেন্ডকে জড়িয়ে ধরে না… তাও আবার পরিবারের সবার সামনে! বুঝতে পেরেছিস, পরেরবার থেকে লিমিটের মধ্যে থাকবি,,,,, অভি'?"
শেষ শব্দটা উচ্চারণের ভঙ্গি এমন ছিলো যে, অভির নামটা যেন বিষ হয়ে ছিটকে এলো কিরিসের মুখ থেকে।
অভির মুখের খুশি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলো। সেও কিরিসের দিকে চোখ রাঙালো—কারণ, অভি কোনোদিনই কিরিসকে পছন্দ করেনি। আর কিরিসও অভিকে সহ্য করতে পারে না।
তাদের সম্পর্ক ছিলো খালাতো ভাই, কিন্তু শত্রুতা অনেক পুরোনো। ছোটবেলা থেকেই।
সবাইয়ের নয়নের মণি ছিলো কিরিস—অসংখ্য সাধনা আর দোয়া-দরুদে পাওয়া সন্তান। জন্ম থেকেই আলাদা গুরুত্ব, আলাদা ভালোবাসা। আর সেখানে অভি ছিলো একেবারে স্বাভাবিক, সাধারণ। এই "বিশেষ না হওয়া"ই অভির মনে শেকড় গাড়ে ঈর্ষা আর তিক্ততা।
ছোট থেকেই সেই দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা, একে অপরকে সহ্য না করার ইতিহাস—আজ আবার যেন নতুন করে মাথা তুললো।
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে উঠলো—শুধু কিরিস আর অভির দৃষ্টির লড়াই ঘরটাকে ভারী করে তুলছিলো।
কিন্তু দু’জনের মধ্যে কেউই আরেক ধাপ এগোলো না—কারণ চারপাশে সবাই বসে আছে।
সবাই জানে, এই দুই খালাতো ভাইয়ের খুব একটা বনাবনা নেই। তবে সেটা কখনো প্রকাশ্যে টেবিলে বা আড্ডায় বের করে আনে না তারা।
বরং ভদ্রতার মুখোশ ধরে রাখে, যেন সবার সামনে সম্মানের অভাব না ঘটে।
আজও তাই হলো। কিরিস তার রাগ গিলে ফেললো, শুধু চোখের আগুনটা এক মুহূর্তের জন্যও নিভলো না।
অভি-ও ঠোঁট চেপে রইলো, ভেতরে তীব্র জ্বালা থাকলেও বাইরে মুচকি হাসি টেনে নিজের আসন গ্রহণ করলো।
পরিবারের বাকিরা পরিস্থিতি বুঝলেও কেউ কিছু বললো না। সবাই এমন ভান করলো যেন কিছু হয়নি—
কিন্তু বোঝা যাচ্ছিলো, আসল গল্পটা ভেতরে ভেতরে অনেক গভীর।
আরোবি লিসির পাশে বসে ফিসফিস করে বললো—
আরোবি— "ওরে বাবা, এরা বাইরে যতটা স্বাভাবিক… ভেতরে ঠিক উল্টোটাই।"
লিসি কিছু বললো না, শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচে তাকিয়ে রইলো। তার বুকের ভেতরে এক অজানা অস্থিরতা জন্ম নিলো।
সবাই যখন গল্প করতে ব্যস্ত, আড্ডার পরিবেশ একটু হালকা হতেই অভি সরাসরি লিসির দিকে তাকিয়ে বললো—
অভি (খুশি গলায়)—"তুই কিন্তু একদম বদলাসনি রে, লিসি। ঠিক সেই আগের মতো… শুধু একটু বেশি সুন্দরী লাগছে।"
লিসি একটু হেসে বললো—
লিসি—"তুই-ই বা কম কিসে? আগের মতোই একইরকম পাগলু। তবে হ্যাঁ, বাইকটা বেশ দারুণ হয়েছে তোর!"
অভি হেসে উঠলো—
অভি— "আরে মনে আছে, কলেজ থেকে বেরোবার সময় আমি তোকে বলতাম একদিন তোকে বাইকে বসিয়ে ঘুরাবো… সেটা তো এখনও বাকি রয়ে গেলো!"
অভির কথা শুনে লিসি খিলখিল করে হেসে উঠলো। আরোবি একেবারে চোখ গোল করে তাকিয়ে আছে—
আরোবি— "মানে তোমরা একসাথে কলেজে পড়েছো? এইটা তো আগে শুনিই নাই!"
লিসি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে হেসে বললো—
লিসি— "হুম, আমরা অনেক আগে থেকে চিনি একে অপরকে। অভি আমার খুব কাছের বন্ধু ছিলো।"
কথাটা এত সহজভাবে বললেও, ঘরের এক কোণে বসে থাকা কিরিসের বুকটা গরম কয়লার মতো জ্বলতে লাগলো। তার দৃষ্টি ভারী হয়ে শুধু লিসির ওপর আটকে রইলো। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরেছে, যেন নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটা নিয়ন্ত্রণ করছে।
বাকিরা হাসি-ঠাট্টায় মেতে গেলেও, কিরিসের সেই দৃষ্টির ভার লিসি স্পষ্ট টের পেলো। তার হাসিটা মুহূর্তেই থমকে গেলো, বুকের ভেতরে আবার অস্থিরতা জন্ম নিলো।
অভি আর লিসির আলাপ চলছিলো—হাসাহাসি, পুরনো দিনের গল্প। বাকিরাও শুনে মজা পাচ্ছে। হঠাৎ টেবিলে থমথমে একটা বিরতি নামলো।
কিরিস হেলান দিয়ে বসে একদম গম্ভীর মুখে পাপড়ির দিকে তাকিয়ে বললো—
কিরিস:
"খালামনি… আপনি কি করতে এসেছিলেন সেটা যদি একটু বলতে, তাহলে হয়তো এই বন্ধুত্বের আলাপ থেকে আমি একটু বাঁচতে পারতাম।"
কথাটা এতটা হঠাৎ আর কষাঘাতের মতো এলো যে, চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। লিসির হাসি মুহূর্তে ম্লান হয়ে গেলো, গাল হালকা লাল হয়ে উঠলো। অভির চোখে কিরিসের দৃষ্টির চাপটা পড়তেই সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।
পাপড়ি কিরিসের কথায় ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে নিলো। সে জানতো, কিরিস কখনো সরাসরি না বললেও তার ভেতরে ঝড় বয়ে যায়। এবারো ব্যতিক্রম হলো না।
পাপড়ি (শান্ত গলায়):
"আসলে আমি শুধু একটু দেখা করতে আসিনি…, এখানে আসার বিশেষ কারণ হচ্ছে অনুর এংগেজমেন্ট ঠিক হয়ে গেছে, তাই বলতে এসেছি,সবাইকে কার্ডে বলা যায় কিন্তু তোদের কি যায়! বোন হোস না আমার "
আনোয়ার একটু নড়েচড়ে বসে কণ্ঠে কটাক্ষ মেশা কৌতুক করে বলল—
"তা, ছেলে কী?" "তুমি তো আমাদের অনুকে বিয়ে দিয়ে দেবে মনে হয়,"—ভদ্র তামাশা করে।
পাপড়ি সুকৌশলে মাথা নাড়লেন—
পাপড়ি: "সেটা না, দুলাভাই। ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার, অফিসে চাকরি করে।"
মির্জা-বেগম কণ্ঠে সন্তোষ রেখে বললেন—
"বাহ! তাহলে তো ভালো। ছেলের আশপাশ কেমন সব দেখে নিয়েছো তো?"
পাপড়ি অল্প হেসে বললেন—
"আর বলবেন না—এই আশপাশ দেখতে গিয়েই তো অভির বাবাকে একটু অসুস্থ হয়ে পড়তে হয়েছিল। সব খোঁজখবর নিয়েছে, ছেলেরা ঠিকঠাকই।"
সুপ্রিয়া কৌতুকিয়া মুখ করে জিজ্ঞেস করলেন—
"কবে ঠিক করলি এসব?"
পাপড়ি উত্তর দিলেন—
"এই তো—আসছে রবিবার।"
আনারুল একটু সন্দেহ করে উচ্চস্বরে বলল—
"একটু দ্রুত হয়ে যাচ্ছে না?"
পাপড়ি মনোযোগের সঙ্গে বোলে—
"ভাই, ছেলে শুক্রবার বিদেশে চলে যাচ্ছে কাজ নিয়ে। তাই একটু দ্রুত ঠিক করতে হয়েছে।"
"হুম, বুঝতে পারছি। আমার বোনজিকে বিয়ে দিয়ে দেবে…তা এই অভি, তুই কবে বিয়ে করবি? কেউ আছে নাকি?"
সুপ্রিয়ার কথা শুনে অভির গলা হালকা লজ্জায় ওঠে; লিসির দিকে একটু তাকিয়ে বলে—
"বর্তমানে কেউ নেই। কিন্তু একটা কিছু করলে তখন দেখা যাবে।"
ঘরে মুহূর্তের নীরবতা নেমে এলো—সবাই অল্প হেসে উঠল, কেউ কেউ চোখ খেপে ফেলল। লিসি ভালো লাগা আর লাজ থাকা মিশে দুমনে হেসে ফেলল, আর অভি অপ্রস্তুত হলেও মুখে একটা লাজুক হাসি ফিরিয়ে দিল।
কিরিস অভির কথার ধরণ আর তাকানো দেখে বেশ আন্দাজ করে নেয় কিচ্ছু—ওর মনের ভিতর কি চলছে। সবাই নিজ-নিজ কথায় ব্যস্ত হয়ে যায়; কিছুক্ষণ পর পাপড়ি চলে যাওয়ার কথা বলে—
"আপা, তাহলে থাক; আমরা বাসায় যাই।"
সুপ্রিয়া —
"পাগল তুই! এই অভি কোথাও যাবে না—আজ থাকবি আমাদের বাসায়, আমি দুলাভাইকে বলে দেবো।"
অভি —
"না খালা, আম্মু—আজ না; অন্য দিন আসবো। আর লিসি যখন আছে, তখনই আপনার বাড়িতে আসাই হবে।"
পাপড়ি লিসির মুখপানে চেয়ে একটু মুচকি হেসে বলে—
"তাহলে এই ঐ লিসি? ফোনে তো তোমাকে অনেক দেখেছি—কেমন চেনা-চেনা লাগতো। আর এখন দেখো, তুমি আমাদের আত্মীয়দের মধ্যে পড়ে গেলে… যাই বলো না কেন—ফোনের ছবির থেকেও বাস্তবে তুমি আরো সুন্দরী। আর অভি তো তোমার কথা আমার সাথে সারাদিন বলে থাকে।"
মায়ের কথায় অভি মুচকি হাসছে। বাড়ির সবাইও হাসির ঠাট্টার মধ্যে আছে, কিন্তু অস্বাভাবিক দৃষ্টি চাউনি রয়ে গেছে কিরিসের। ভেতরে ভেতরে জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে সে। রাগে চোখ দুটো লাল হয়ে উঠছে, হাত মুঠো করে রেখেছে—শুধু এই কারণে যে নিজেকে কোনো মতে কন্ট্রোল করতে পারছে।
বোনের সঙ্গে বেশ কিছু কথাকাটাকাটির পরে অবশেষে সুপ্রিয়া পাপড়িকে যেতে দেয়।
অভি তখন লিসির দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বলে—
"লিসি, তুই আজকে আমাদের সাথে চল। পরে তো আসতেই পারবি। আরে, আমাদের সঙ্গে গেলে ওরাও থাকবে।"
কথাটা শেষ হতে না হতেই কিরিস হঠাৎই উঠে দাঁড়ায়। চোখে রক্তচক্ষু, সারা শরীর থেকে যেন আগুন বেরোচ্ছে।
দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ গলায় বলে—
"না, যাবে না ও! তোর ফ্রেন্ড হওয়ার আগে ও আমাদের বোন। obviously ও আমাদের সঙ্গেই যাবে। তাই বাড়তি কথা না বলে তুই বাড়ি যা—পাকা ধানে মই দেওয়ার দরকার নেই।"
অভি কিছু বলার আগেই পরিস্থিতি সামলাতে লিসি বলে ওঠে—
"আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি বাকিদের সঙ্গেই যাব। তাছাড়া আমরা কালকেই তো তোদের বাড়ি যাচ্ছি, তাই এখন না গেলে হবে,আর আমার এখন কিছু গোছানো নেই, তাই কাল ভাইয়ার সঙ্গে যাবো "
কথা শেষ করে লিসি কিরিসের দিকে তাকায়। চোখের ভারে বুঝতে পারে—সে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। যদি আজ অভির সঙ্গে যেত, তাহলে তার কপালে কি থাকতো, সে নিজেও জানে না।
কিরিস আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। গর্জন করতে করতে উপরে উঠে যায়। কেউ ওকে আটকায় না।
এরপর পাপড়ি বিদায় নেয়ার আগে শেষবারের মতো বোনের সঙ্গে কিছু কথা বলে নেয়। অভিও সাথে যায়। বাড়িটা আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
সকালে সবাই খাওয়া-দাওয়া সেরে বসে আছে ক্লান্ত ভঙ্গিতে। দুপুরে রান্না বসানো হবে বলে বউরা রান্নাঘরে চলে যায়, কি রান্না করা যায় সেটা নিয়ে আলোচনা করতে। এদিকে ছোটরা সবাই বসে আছে, রিহানকে নিয়ে গল্প করছে—কবে তারা বাড়ি ফিরবে তাই নিয়ে।
আনারুল বলে ওঠে—
"ওরা কালকেই আসছে।"
শান্ত, নিরিবিলি এক পরিবেশ নেমে আসে। বাড়ির হাসি-ঠাট্টা আর স্বাভাবিক গল্পগুজব যেন ক’ক্ষণ আগের ঝড়কে একেবারে ভুলিয়ে দেয়।