তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :27

লিসি তখনো মাথা নিচু করে বসে আছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে যাচ্ছে।
কিরিসের সেই রাগের আড়ালে থাকা অদ্ভুত যত্নশীল দিকটা সে এড়িয়ে যেতে পারলো না।
দুপুরের খাবার শেষ হওয়ার পর ঘরে হালকা নীরবতা নেমে এলো।
সবাই তার নিজের রুমে চলে গেছে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য।
মেয়ে–ছেলে, বড়-বৃদ্ধ, সবাই যেন ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলে আর ক্লান্তি সামলাচ্ছে।
লিসি উঠলো উপরের বেলকনিতে।
নীরব বাতাস, দুপুরের রোদ আর চারপাশের টিউলিপের রঙিন পাপড়ি—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি।
সে ফুলগুলো দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো—
“এতো সুন্দর… এত যত্নে কিরিস এগুলো দেখাশোনা করে। সত্যিই কি এত ভালোবাসা আর যত্ন মানুষ দিতে পারে?”
লিসির চোখে যেন উচ্ছ্বাস আর নরম অনুভূতির খেলা।
হঠাৎ পেছন থেকে ধীর পায়ে কেউ এগোচ্ছে।
লিসি না ঘুরেই বুঝতে পারলো—সেই ব্যক্তিই যে, যাকে দেখে তার হৃদয় ভেতরে ভেতরে উষ্ণ হয়ে ওঠে।
কিরিস ধীরে ধীরে লিসির কাছে এলো।
হাতে রঙিন রঙিন টিউলিপের ফুলের ছোট্ট বালতি।
তার চোখে সেই দৃষ্টি—গভীর, শান্ত, আর ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত যত্নময়।
—“এইগুলো তোমার জন্য।”
কিরিস হালকা হাসি নিয়ে এগুলো লিসির হাতে ধরিয়ে দিল।
লিসি অবাক হয়ে চোখ বড় করলো।
—“আপনি…?”
কিরিস মাথা নাড়িয়ে হালকা বললো—
—“হ্যাঁ, দেখে মনে হলো আজ তুমি উপরের বেলকনিতে বসে আছো। তাই মনে করলাম, এই ফুলগুলো তোমার জন্য নিলে ভালো হবে। চাইলে একটুখানি গন্ধও নিতে পারো।”
লিসির হাত নড়েচড়ে উঠলো।
ছোট্ট আনন্দে মুখে হালকা লজ্জার রঙ।
ফুলগুলো হাতের মধ্যে নিখুঁতভাবে সাজানো, রঙিন পাপড়িগুলো যেন নিজেই তার সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে।
—“আপনি… ফুলগুলো অনেক সুন্দর…”
লিসি কণ্ঠে হালকা কণ্ঠস্বর, চোখে উজ্জ্বলতা।
কিরিস হালকা হেসে বললো—
—“আমি জানি, যদি আমি এখন না এনে দি তাহলে আমি আর আমার বাগানে ফুল খুঁজে পাবো না ।”
লিসি একটু চোখ ছোট করে তাকিয়ে থাকে কিরিসের দিকে তারপর ফিসফিস করে বললো—
—“ধন্যবাদ…”
কাব্যিক মুহূর্ত।
বেলকনির বাতাসে ফুলের ঘ্রাণ, রঙিন পাপড়ি, আর দু’জনের চোখে–চোখ মিলনের শান্তি।
ফুল হাতে নিয়ে লিসি আর কিরিস দু’জনই কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে থাকলো।
দুপুরের সেই ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তে উড়ে গেল।
ভেতরে ভেতরে উষ্ণতা, শান্তি আর দুষ্টু খুনসুটি মিশে আছে, যা কেবল দু’জনই বুঝতে পারছে।
লিসি ধীরে ধীরে টিউলিপের ফুলগুলোকে কাছের দিকে তুললো।
হালকা বাতাসে ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে এলো।
সে চোখ বন্ধ করে শান্তির সঙ্গে ফুলের গন্ধ নিল—মনের ভেতর অদ্ভুত আনন্দ, এক ধরনের কোমল উত্তেজনা।
কিরিস তখন পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে।
ভিতরে ভেতরে হাসি আর মৃদু খুনসুটি মিশে আছে।
হালকা গলায় বললো—
—“ভালভাবে দেখা তো হলো… কিন্তু এখন নিচে নেমে বাগানে গিয়ে হাত দিয়ে টানতে চেয়েছিলে না তো?”
লিসি হঠাৎ চমকে চোখ খুললো।
—“আমি… আমি শুধু ঘ্রাণ নিচ্ছিলাম।”
কিরিস ধীরে ধীরে ফুলের দিকে আঙুল স্পর্শ করলো,
—“হুম… শুধু ঘ্রাণ নেবে, কিন্তু আমি তো জানি তোমার দুষ্টু দিকও আছে।”
লিসি লজ্জা পেয়ে চোখ নামালো, হালকা অভিমানী ভঙ্গি।
—“কিছুই না… আমি ওরকম নই।”
কিরিস হালকা হেসে বললো—
—“ওহ, না? তাহলে এই টিউলিপগুলোও কি চুরি করে নেয়ার পরিকল্পনা ছিল?”
লিসি গাল লাল হয়ে চুপ হয়ে গেল।
কিরিস হাত বাড়িয়ে হালকা টিউলিপগুলো তার হাতে ধরিয়ে দিল।
—“ঠিক আছে, এবার থেকে শুধু দেখা আর ঘ্রাণ, ছিঁড়বে না। তবে মনে রেখো—যদি আবার দুষ্টুমি করতে চাও, আমি দেখছি আর যদি ফুলগুলো নিতে চাও তাহলে আমাকে বলবে।”
লিসি হালকা হাসি দিল, চোখে উজ্জ্বলতা।
ফুলগুলো হাতের মধ্যে নরম, রঙিন পাপড়িগুলো যেন তার খুশি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কিরিস পাশ কাটিয়ে হেঁটে গেল, কিন্তু চোখের দৃষ্টি লিসির দিকে রেখে হালকা খুনসুটি মুডে বললো—
—“ভাল লাগছে তো, সবকিছু ঠিকঠাক?”
লিসি নিঃশব্দে মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
—“হ্যাঁ… সব ঠিক আছে।”
বেলকনির বাতাসে টিউলিপের ঘ্রাণ, রঙিন পাপড়ি, আর দু’জনের ছোট্ট খুনসুটি–মুহূর্ত মিলেমিশে নিঃশব্দে শান্তি ছড়িয়ে দিল।
দু’জনই জানতো—এই শান্তি আর মজা একেবারে স্বতন্ত্র, শুধুই তাদের জন্য।
লিসি কিছুক্ষণ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ফুলের সৌন্দর্য আর ঘ্রাণে মগ্ন থাকলো।
হাতে রঙিন টিউলিপ, চোখে হালকা উজ্জ্বলতা।
বাতাসে ভেসে আসা ফুলের ঘ্রাণ যেন তার ক্লান্তি মুছে দিচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরের দিকে হাটতে লাগলো।
ফুলগুলো হাতে ধরে, মনে মনে ভাবছে—“আজকের এই মুহূর্ত… কত অদ্ভুত সুন্দর।”
পেছনে একটু দূরে দাঁড়িয়ে কিরিস চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
সে দেখছে লিসির ছোট ছোট মুভমেন্ট, হালকা হাসি আর অভিমানী ভঙ্গি।
ভেতরে ভেতরে মনটা উষ্ণ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মুখে কোনো প্রকাশ নেই।
শুধু তার চোখের গভীরে একটা অদ্ভুত শান্তি আর খুনসুটি–আবেশ ফুটে উঠেছে।
লিসি ঘরে ঢুকে, ফুলগুলো নিরাপদ স্থানে রাখল।
কিরিস ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে গেল, নীরবভাবে লিসিকে লক্ষ্য করে।
কিছুক্ষণ নিঃশব্দে সব শান্ত, যেন দু’জনের মধ্যে শুধু এই ক্ষুদ্র খুনসুটি ও সৌন্দর্যের মুহূর্তই রয়ে গেল।
বেলকনির বাতাস, রঙিন টিউলিপ আর ঘরের শান্তি—সব মিলেমিশে এক নিখুঁত দুপুরের মুহূর্ত গড়ে তুললো, যা শুধুই তাদের দু’জনের জন্যই।
বিকেল গড়িয়ে আসতেই কিরিস আর কাবির আবারও অফিসে ফিরে গেল। আজকের মিটিং আর ডকুমেন্ট কাজ সামলাতে হবে বলে তারা কিছুটা ব্যস্ত। তবে দু’জনের মুখে সেই নিশ্চয়তা—“সন্ধ্যার পর আর কোনো কাজ নেই, সোজা বাড়িতেই ফিরব।”
সন্ধ্যা নামতেই দু’জনেই ফিরে এলো বাড়িতে।
বড়সড় হলরুমে তখন আলো জ্বলে উঠেছে।
বাতাসে টাটকা চায়ের গন্ধ, টিভিতে বাজছে হালকা মিউজিক আর মেয়েরা মজা করে হাসাহাসি করছে।
সুরভী, আরোবি, জারা সবাই সোফায় গাদাগাদি করে বসে আছে, হাতে পপকর্ন, চাট, ফুচকা।
লিসিও তাদের সঙ্গে বসে আছে, তবে একটু নীরব, মাঝে মাঝে হেসে উঠছে।
ছেলেরা ফ্রেশ হয়ে এক এক করে এসে বসলো।
কিরিস সোফার কোণে বসল, কাবির এল অন্য পাশে।
তাদের উপস্থিতিতেই যেন পরিবেশটা আরো জমে উঠলো।
আনোয়ার সাহেব তখন নিজের কফি হাতে নিয়ে এগিয়ে এসে বললেন—
—“তো, কিরিস… প্রজেক্টের খোঁজ কী হলো? শুনলাম ফ্রান্সে যেতে হবে?”
কিরিস মাথা হেলিয়ে শান্ত গলায় বললো—
—“জি, বাবা। এটা ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের কাজ। এখনো ডিটেলস বলছি না, তবে সময়মতো সব জানাবো। আপনার সাপোর্ট থাকলেই আমি নিশ্চিত সফল হব।”
আনোয়ার সাহেব হালকা হাসলেন, চোখে ভরসা আর গর্বের আভা।
—“তোর উপর আমার সবসময় আস্থা ছিল, আছে, থাকবে।”
এদিকে মেয়েরা কিন্তু গম্ভীর আলোচনার মাঝেও নিজেদের খুনসুটি থামায় না।
জারা হেসে বলে উঠলো—
—“ওহো, এবার তো কিরিস ভাই ফ্রান্সের রাজা হবে!”
আরোবি সঙ্গে সঙ্গে যোগ দিলো—
—“হ্যাঁ, তখন আমরা যাবো ফ্রান্স ট্যুরে, ফুলের মাঠে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবো!”
সুরভী খিলখিল করে হেসে লিসির দিকে তাকিয়ে বললো—
—“আর লিসি তখন কী করবে? টিউলিপের বাগানে বসে থাকবে?”
লিসি লজ্জায় কিছু বলতে পারলো না, শুধু চোখ নামিয়ে ফেলল।
কিরিস একপলক তাকাল, তবে মুখে কোনো কথা বললো না।
তার নীরবতা যেন আরো ভারী করে দিল পরিবেশটা।
হলরুম ভরে উঠলো হাসি, গল্প আর চায়ের গন্ধে।
কাজের চাপ, বাইরের দুনিয়ার ব্যস্ততা—সব ভুলে সবাই এই মুহূর্তে একসাথে, নিজের আপনজনদের সঙ্গে।
হলরুমে গল্প, হাসি আর আলাপ জমে উঠেছিল। তবে ধীরে ধীরে চারপাশে একটা শান্ত স্নিগ্ধতা নেমে এলো। সবাই টিভির সামনে একসাথে বসলো, কেউ সোফায় হেলান দিয়ে, কেউ মেঝেতে কুশন ফেলে।
টিভিতে চলছিল পুরোনো একটা ক্লাসিক সিনেমা। সুরভী, আরোবি, জারা প্রথমে খিলখিল করে হেসেছিল, কিন্তু গল্পের ভেতর ঢুকে পড়তেই তারাও চুপ হয়ে গেল।
প্রিয়া আর সুপ্রিয়া একপাশে বসে হাতের কাজ করতে করতে চোখ রাখলো পর্দায়। আনোয়ার সাহেব চুপচাপ নিজের কফি হাতে নিয়ে সিনেমার প্লটে ডুবে আছেন।
কিরিস বসেছিল সামনের সোফায়, পাশে কাবির। তার দৃষ্টি পর্দার দিকে, কিন্তু মাঝে মাঝে চোখ পড়ে লিসির উপর। লিসি বসে আছে একদম শান্ত, দু’হাত ভাঁজ করে। তার চোখও টিভির দিকে, তবে ভেতরে কোথাও যেন অদ্ভুত নীরবতা জমে আছে।
ঘরের বাতাসে শুধু সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর মৃদু আলো। বাইরে থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস পর্দা উড়িয়ে দিচ্ছে, আর সেই হাওয়ায় ফুলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে হলরুমের কোণে।
কেউ কিছু বলছে না। কেউ হাসছে না। যেন একসাথে সবাই এক মুহূর্তের জন্য একই ছন্দে নিঃশ্বাস নিচ্ছে—শান্ত, স্বস্তির, আর একেবারে ঘরোয়া।
সিনেমাটা শেষ হতে হতে ঘরে একেবারে শান্ত পরিবেশ নেমে এলো। টিভির আলো কমে আসতেই আনোয়ার সাহেব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি কাবির আর কিরিসকে ইশারা করলেন—
—“চলো, অফিস রুমে একটু বসি। কয়েকটা কথা আছে।”
তিনজনে একসাথে বাড়ির অফিস রুমের দিকে গেল। ভেতরে ঢুকেই গম্ভীর আলোচনার আবহ তৈরি হলো। বড় টেবিলে ফাইল খোলা হলো, আনোয়ার সাহেব কাজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বিদেশের প্রজেক্ট, বিশেষ করে ফ্রান্সের ট্যুর নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে লাগলেন। কিরিস মন দিয়ে শুনছে, মাঝে মাঝে তার কণ্ঠে ছোট্ট মতামত যোগ হচ্ছে। কাবির নোট নিচ্ছে, যেন কিছু বাদ না পড়ে।
প্রায় আধা ঘণ্টা আলাপ শেষে আনোয়ার সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। —“বাকি আলোচনা পরে করব। তোমরা একটু বিশ্রাম নাও।”
কাবির তখন ক্লান্ত। সরাসরি নিজের রুমে চলে গেল ঘুমানোর জন্য। আনোয়ার সাহেবও ধীর পায়ে উপরে চলে গেলেন।
কিন্তু কিরিস?
সে অফিস রুম থেকে বের না হয়ে বরং নিজের ল্যাপটপ টেনে নিল টেবিলের উপর। একে একে গোপন কিছু ফাইল খুলে ফেললো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো নাম–ঠিকানা, কয়েকটা শহরের মানচিত্র, আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের হিসাব–নিকাশ।
তার চোখে তখন অন্য এক দৃষ্টি—গভীর, হিসেবি, আর খানিকটা অন্ধকার। বাইরের সিনেমার নীরবতা যেন মিলিয়ে গেল। ল্যাপটপের আলোয় শুধু কিরিসের মুখ উজ্জ্বল হচ্ছিল, আর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল এক অদ্ভুত রহস্যময় গাম্ভীর্য।
অফিস রুমটা ফাঁকা। বাইরের হলরুমে তখন নীরবতা, শুধু টিভির হালকা আলো। ভেতরে একমাত্র আলো কিরিসের ল্যাপটপ স্ক্রিন থেকে আসছে।
কিরিস কফির মগ টেনে নিল, চুমুক দিয়ে আবার সামনে ঝুঁকল। ল্যাপটপে একটা বিশেষ সিকিউর সফটওয়্যার ওপেন হলো।
কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে কোড ভেসে উঠছে। একটার পর একটা ফাইল খুলছে—সব আন্ডারওয়ার্ল্ডের তথ্য।
স্ক্রিনে ভেসে উঠলো কিছু নাম, ছবি আর লোকেশনের মানচিত্র।
ঢাকার অন্ধকার গলি থেকে শুরু করে বিদেশের কয়েকটা শহরের রুট—সবই নকশার মতো সাজানো।
একটা ফোল্ডার ওপেন করতেই চোখে পড়লো কিছুর ছবি। কেউ রক্তে ভিজে পড়ে আছে, মুখ চেনার মতো নেই। তার পাশে তারিখ আর সময় লেখা।
কিরিসের চোখ একেবারে ঠান্ডা। কোনো আবেগ নেই। যেন এগুলো তার কাছে কেবল সংখ্যা, কেবল হিসাব।
হঠাৎ স্ক্রিনে লাল রঙের একটা নোটিফিকেশন উঠলো।
> “Shipment delayed. Possible betrayal. Need confirmation.”
কিরিস ঠান্ডা গলায় ফিসফিস করলো,
—“তোরা ভেবেছিস আমাকে ফাঁকি দিবি?”
সে কিবোর্ডে কয়েকটা কী চাপতেই এক ভিডিও কল কানেক্ট হলো। অপর প্রান্তে মুখ ঢাকা দু’জন লোক। অন্ধকার ঘরে বসে আছে।
কণ্ঠ ভারি গম্ভীর—
—“Boss… problem হয়েছে। একটা চালান আটকানো গেছে।”
কিরিস হেলান দিয়ে বসল। চোখে আগুন, কিন্তু গলায় বরফের মতো শীতলতা।
—“কোথায়?”
—“চট্টগ্রাম পোর্টে… আমরা খোঁজ নিচ্ছি, কিন্তু ভেতরে কারও লিক আছে।”
কিরিস কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ঠান্ডা হেসে বললো—
—“লিক আছে মানে? আমার সিস্টেমে লিক থাকার সাহস কার হলো?”
ওপাশের লোক দুজন কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়লো। কিরিসের চোখে তখন নিষ্ঠুর ঝলক।
—“শোন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি নাম না পাই, তবে আমি নিজেই নাম লিখে দেবো। আর তোর নামটাই সবার আগে লিখব।”
কল কেটে গেল। ল্যাপটপের আলো নিভে গেলেও ঘরটা যেন আরও অন্ধকার হয়ে গেল।
কিরিস গভীর শ্বাস নিল। ঠোঁটে একফোঁটা হাসি ফুটলো—শীতল, প্রাণঘাতী হাসি।
তার ভেতরের সেই অন্য মানুষটা জেগে উঠেছে—যে মানুষটা পরিবারের সামনে নিখুঁত ছেলে, কিন্তু অন্ধকারের ভেতরে এক শাসক, এক ছায়া-সম্রাট।
রাত তখন অনেকটা গভীর। বাড়িটা একেবারে নিশ্চুপ, শুধু বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। সবাই ঘুমিয়ে আছে।
লিসির হালকা পিপাসা পেল। সে চুপচাপ নিজের রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নামলো পানি খেতে।পরনে কুর্তি প্লাজো , মাথার চুল এলোমেলো। তার চোখে তখনো ঘুমের ছাপ।
সে রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল।
অফিস রুমের জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা আলো বেরোচ্ছে। লিসি অবাক হলো—এত রাতে কে জেগে আছে?
সে চুপচাপ পাশ দিয়ে যেতে চাইলো, কিন্তু হঠাৎ ভেতর থেকে দরজা খোলার আওয়াজ হলো।
চুপচাপ একটা ছায়ার মতো উপর থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামছে কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়,কিন্তু এগোতেই নজরে পরে এক রাতজাগা পরি, মায়াবী ডাগর ডাগো চাউনিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে হাতে গ্লাসে পানিটা যেন মুখ পর্যন্ত যাচ্ছে না, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এ অন্ধকারের রাজার দিকে লিসি কিছু বলার আগেই সামনে দাঁড়িয়ে কিরিস। মুখ গম্ভীর, চোখে সেই ঠান্ডা দৃষ্টি, যেটা লিসি আগে কখনো দেখেনি।
লিসি কেঁপে উঠলো। এক মুহূর্তে তার গলা শুকিয়ে গেল।
—“আপনি… এখনো জেগে আছেন?”
কিরিস এক পা এগিয়ে এলো। কিছু না বলে সোজা লিসির দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে যেন হাজারো গোপনতা রহস্য আর এক অদ্ভুত চাওনি মিশ্রিত।কোনো কথা বললো না সে শুধু তাকিয়ে রইলো
হঠাৎ সে লিসির হাত টেনে নিল। লিসি চমকে উঠলো—
—“ক… কী করছেন?”
কিরিস কোনো উত্তর দিল না। এক টানে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলো।
লিসি প্রথমে প্রতিবাদ করতে চাইলো, কিন্তু কিরিসের বাহুর শক্তি এমন, যেন পুরো পৃথিবী থেকে আলাদা একটা জায়গায় টেনে নিয়েছে।
তার কণ্ঠ নিচু, গভীর, আর প্রায় ফিসফিস—
—“চুপ… শুধু এক মিনিট…।”
লিসি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর ধপধপ করছে, কিন্তু শরীর নড়ছে না। কিরিসের নিঃশ্বাস গরম বাতাসের মতো তার কানে লাগছে।কিরিসের বুকের সঙ্গে লেপ্টে লেগে আছে লিসি, কিরিস যেন লিসিকে জরিয়ে নিজের শক্তি দাঁড়াচ্ছে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিচ্ছি লিসির উপরে, মুহূর্তটা নিরাপত্তা থাকলেও দৃশ্যটা যেন চিৎকার করে বলছে দেখো “আলো তুমি—আমি তো ছায়ার অশান্ত উন্মেষ,
তবু তোমার একটিমাত্র হাসি—আমার অন্তঃস্থ কালো গ্রন্থি ভেঙে দেয় নিঃশেষ।
অস্থির এই হৃদয় তাই আজ চিৎকারে ফেটে বলে—
দেখো, আমি অন্ধকার; অথচ তোমার আলোর কাছে এসে নিঃশেষে জীবন সমর্পণ করে দিই নির্ভয়ে।
তুমি বুঝো কি, এ প্রেমে আমার অস্তিত্ব ঝলসে যায়, ছাইয়ে মিশে ভেঙে পড়ে?
তবু আমি রুখি না—কারণ তোমার দ্যুতিতে হারিয়ে গেলেও, আমার সব হাহাকার মুক্তির রূপ ধরে।
ওহে আলো, আমার এই আঁধার—তোমার প্রেমেই বন্দি,
আজ স্বীকার করি—আমি ধ্বংস হয়েছি, অথচ সেই ধ্বংসেই আমি প্রথমবার সত্যিকারের জীবিত। “
«“তোমার অধরে লুকোনো নীরবতা আমার অন্তিম স্তোত্র।”»
লিসিও বোকার মতো কিরিসের বুকে চুপ করে আছে যেন এটাই তার জায়গা,, কিছুক্ষণ পর কিরিস ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল, যেন হঠাৎ নিজেকে সামলে নিল।
—“পানি খেতে যাচ্ছিলে তো? যাও।”
কিরিস সরে গেল, আর লিসি অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
লিসি কোনো মতে নিজেকে সামলে বলল—
"আমি পানি খেতে এসেছি… সেটা আপনি কিভাবে জানলেন?"
কিরিস হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
"কেউ যদি কিচেনে গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সে গ্লাস দিয়ে গোসল করবে নাকি পানি খাবে—সেটা তো চোখেই বোঝা যায়, মিস শর্মা।"
কিরিসের কথা শুনে লিসির ভেতরে গাধা গাধা একটা রাগ জমে উঠল।
"আপনি… আমি যা ইচ্ছে করবো, তাতে আপনার সমস্যা কোথায়?"
কিরিস একচোট হেসে বলল—
"কিচেনে মানুষ সাধারণত খেতে বা রান্না করতেই আসে। তাছাড়া ক্ষুধা পেয়েছে, তাই ভাবলাম কিছু খাব। তুমি খাবে নাকি, লিসি শর্মা?"
"না, আমার ক্ষুধা নেই। আপনি খান।" —বলে লিসি চলে যেতে ফিরল।
পেছন থেকে কিরিস ডেকে উঠল—
"উম… চলে যেও না। রান্না করবে কে তখন?"
ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখ সরু করে লিসি বলল—
"রান্না করবে মানে! ক্ষুধা পেয়েছে, নিজেই রান্না করে খান।"
কিরিস কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে বলল—
"হুম, সেটা পারি। কিন্তু ভেবেছিলাম যদি একা একা খাই, তোমার লোভ লাগতে পারে। আর তুমি যদি আমার খাবারে নজর দাও—ওহ মাই গড! তাহলে তো সারাদিন বাথরুম থেকেই বেরোতে পারব না মনে হয়।"
কিরিসের এমন উদ্ভট কথায় লিসি পুরোই অবাক হয়ে গেল।
"আপনি আসলে কী চান, মিস্টার? পরিষ্কার করে বলুন। আপনার এই ঘুরিয়ে–পেঁচানো কথা আমার মাথার ওপর দিয়ে যায়।"
কিরিস এবার গম্ভীর হয়ে সোজা দাঁড়াল—
"হুম… তাহলে শোনো। আমার খুব খিদে পেয়েছে। ফ্রিজে কিছু রাখা আছে আমার জন্য—সেগুলো বের করে গরম করবে, আর সরাসরি আমার রুমে নিয়ে আসবে। নিজের জন্যও নিয়ে এসো, নাহলে কিন্তু তোমাকে আমার সঙ্গেই খেতে হবে।"
লিসি বিরক্ত হয়ে বলল—
"মগের মুল্লুক পেয়েছেন নাকি! আমি এত কিছু করতে পারব না। আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি ঘুমোতে যাচ্ছি। যার পেটের ভেতর আগুন জ্বলছে, সে নিজেই রান্না করুক।"
দুপা সামনে এগিয়ে এসে কিরিস নিচু গলায় বলল—
"হুম, সেটাও ঠিক। কিন্তু আমি চাই তুমি নিয়েই আসো। আর না আনলে আমি কী করতে পারি, সেটা তুমি ভালো করেই জানো, লিসি শর্মা।"
কিরিসের গলায় সেই হুমকি–মেশানো সুর শুনে লিসির শরীরে হালকা ভয়ের শিহরণ বয়ে গেল।
কিরিস আবার বলল—
"এরপরেও যদি না আনো, তাহলে আজ পর্যন্ত আমাদের মাঝে যা যা হয়েছে সবটা আমি সবাইকে বলে দেব। সিনেমার মতো ডিটেইলসসহ! আর তাছাড়া তুমি যদি আমার রুমে খাবার না আনো, আমি তোমাকে সোজা আরোবির রুম থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের কাছে শুইয়ে ঘুম পাড়াবো।"
এই শেষ কথাটা শুনে লিসির ভেতর অদ্ভুত এক অস্তরতা তৈরি হলো। সে কাঁপা গলায় বলল—
"আপনি কেন বারবার আমাকে এভাবে ব্ল্যাকমেইল করেন? বলুন তো! প্রথম থেকে আমি কি আপনার কাছে এসেছি? আপনি-ই আমাকে টেনেছেন নিজের কাছে। আর এখন উল্টে দোষ চাপাচ্ছেন আমার ঘাড়ে… বেয়াদব, বেটা লোক!"
কিরিস ঠোঁট চেপে ধরে বলল—
"আমি কিছু জানি না। আমি উপরে যাচ্ছি। আর তুমি—লিসি শর্মা, খাবার নিয়ে আসো।"
বলতে বলতেই কিরিস যেন কিছু অদৃশ্য আনন্দে গডগড করে, মনে হয় পুরো বিষয়টাই তার পছন্দের খেলনার মতো; নিশ্চিত যে লিসি খাবার নিয়ে আসবেই।
লিসি নিচে দাঁড়িয়ে রাগে ফোঁসফোঁস করতে লাগল—
"আহ… আমি কি পাগল? কেন অযথা তর্কে জড়ালাম! পানি খেয়ে তোদের মারবো… এখন ঘরে গেলে কী করব, না নিয়ে গেলেও তো উপায় নেই…"