তোমাকে চাই
চোখ খোলার আগেই দ্রুত টেবিলের উপর থেকে ট্রে নিয়ে সরে যায় দরজার দিকে।
কিরিস চোখ খুলে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর নিজের গালে হাত ছুঁয়ে মৃদু হেসে ফেলে—
এমন হাসি, যা হয়তো কেউ কোনোদিন দেখে নি।
কিরিস (মনে মনে ফিসফিস করে) —
"চুপিচুপি মিষ্টি চুরি করে দিলে, লিসি শার্মা…"
লিসি তড়িঘড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, মুখে লজ্জার লালাভ আভা।
কিরিস ফ্রেশ হতে উঠে দাঁড়ায়, হাসি এখনো মুখে লেগে আছে।
ঝড় থেমে আসছে, আর এই ঝড়ের রাত যেন তার ভেতর থেকে সব ক্লান্তি ধুয়ে দিলো।
কিরিস এবার হালকা করে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে সে এবার ঘুম দেবে।
অন্যদিকে লিসি নিচে নেমে ট্রেটা রান্নাঘরে রেখে আসে। তারপর হলরুমে যাদের ঘুমে টলোমলো অবস্থা তাদের একে একে ডেকে তোলে। সবাই আধো ঘুম চোখে যে যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
এবার লিসিও আরোবির পাশে শুয়ে আছে। চোখে প্রচণ্ড ঘুম, তবুও জানি না কেন লিসির ঘুম আসছে না। বারবার মনে পড়ছে একটা ঘটনার কথা। মনে পড়তেই বুকের ভেতর হালকা কাঁপন আর ভীষণ লজ্জায় ভরে উঠছে পুরো শরীরটা।
আজ লিসি জীবনে প্রথমবার সজ্ঞানে কোনো পুরুষ মানুষের গালে কিস করেছে।
হ্যাঁ—সে নিজে থেকে করেছে।
যদিও এর আগে কিরিস তাকে লিপ কিস করেছে, কিন্তু সেই মুহূর্তগুলোতে লিসির কোনো মতামত, কোনো ইচ্ছা, কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। সবটা হয়েছিল কিরিসের জেদে, কিরিসের নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু আজ—
আজ সে নিজ ইচ্ছেতে এগিয়ে গিয়ে করেছে।
এখন বারবার সেই মুহূর্তটা মনে পড়ছে আর লিসি পাগল হয়ে যাচ্ছে লজ্জায়। বালিশে মুখ গুঁজে রাখছে, তবুও মনে হচ্ছে বুকটা যেন ধড়ফড় করে ফেটে যাবে।
ভোরের প্রথম আলোয় জানালার পর্দা হালকা দুলে উঠছে।
মোলায়েম রোদ্দুর ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়তেই সাদা দেওয়ালে সোনালি আভা লেগে গেছে। জানালার ধারে রাখা টবের ফুলগুলো যেন সূর্যের দিকে মুখ তুলে হাসছে।
চারদিকে একেবারে পরিষ্কার, ধুলোমুক্ত, সাদা ঝকঝকে একটা সকাল।
পাখির ডাক, হালকা বাতাসে দুলতে থাকা গাছের পাতা, আর দূরে কারো কারো উঠোনে ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ—সব মিলিয়ে পরিবেশটা হয়ে উঠেছে অদ্ভুত প্রশান্ত।
বাড়ির ভেতরও যেন একটা আলাদা নীরবতা।
রান্নাঘর থেকে মৃদু ভাতের গন্ধ ভেসে আসছে, কোথাও আবার দুধ ফোটার টুকটাক শব্দ।
বারান্দায় রাখা কাপড়গুলো ভোরের শিশিরে হালকা ভিজে আছে, সোনালি আলোয় সেগুলো চকচক করছে।
এমন সকাল যেন মনে করিয়ে দেয়—
এখানে কোনো দুঃশ্চিন্তা নেই, কোনো কোলাহল নেই।
শুধু একেবারে নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ।
পাখির ডাক আর হালকা বাতাসে গাছের পাতার মৃদু নড়াচড়া—একেবারে শান্ত সকাল।
এক এক করে সবাই ঘুম থেকে উঠে আসতে শুরু করলো।
কারও চুল এলোমেলো, কারও মুখে হালকা ঘুমের ছাপ, কিন্তু পরিবেশটা অদ্ভুত সুন্দর আর প্রশান্ত।
হলরুমে টেবিলের উপর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ সাজানো।
সুপ্রিয়া এক হাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিচ্ছে, অন্য হাতে হালকা হাসি।
প্রিয়া পাশের সোফায় বসে মজে মজে চা খাচ্ছে।
কেউ আরাম করে সোফায় হেলান দিয়ে খবরের কাগজ খুলে পড়ছে—পাতা উল্টানোর শব্দে সকালের প্রশান্তি আরো গভীর হয়ে উঠছে।
আবার কেউ চুপচাপ চা হাতে নিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে, বাইরে রোদ্দুরে ঝলমল করা বাগান দেখতে দেখতে চুমুক দিচ্ছে।
হাসি-আড্ডা নেই, হট্টগোলও নেই—
শুধু একেবারে ঝকঝকে সাদা-সিধে একটা সকাল, যেখানে প্রতিটা মুহূর্ত নতুন দিনের শুরু মনে করিয়ে দিচ্ছে।
কিছুক্ষণ পরেই একে একে সবাই ঘুমজড়ানো চোখে নিচে নামলো।
কেউ হাই তুলছে, কেউ আবার আধো ঘুমে চোখ ডলছে। সকালের আলো তখনও পুরোপুরি উজ্জ্বল হয়নি, অথচ বাড়ির ভেতরটা যেন আগের রাতের হাসি-ঠাট্টার রেশ টেনে নিয়ে চলছে।
রিহান মাত্রই নিচে এসেছে।
অন্যদিকে, কাবির সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে অফিসে। কাবির যে এত ভোরে উঠবে, সেটা কেবল তখনই হয় যখন কিরিস তাকে ডেকে তোলে। দুই ভাইয়ের সেই গম্ভীর সকালের রুটিন—নাস্তা করে একসাথে অফিসে যাওয়া—আজও ঠিক তাই হলো।
কিরিস প্রতিদিনের মতো আজও ভোরবেলা জিম সেরে ফ্রেশ হয়ে গিয়েছে।
এমনকি যেন কিছুই ঘটেনি—ওর সময়, ওর রুটিন সবকিছু অপরিবর্তিত।
বাড়িতে এখন কেবল রিহান আছে। আজ দশবধনে তার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার দিন।
একইসাথে নুসরাত, হিয়া আজকে নিজেদের বাড়ি ফিরবে।
তিশা আর লিজাও যাবে তাদের বাড়িতে।
শেষবারের মতো সকালের এই সময়টাকে সবাই হালকা মজায় কাটাচ্ছিল।
কথায় কথায় খুনসুটি, ঠাট্টা, চাপানউতোর—মুহূর্তগুলো যেন চোখে লেগে থাকে।
মনে হচ্ছিল, হয়তো আর কোনোদিন সবাই একসাথে এমনভাবে মিলতে পারবে না।
রায়চৌধুরী বাড়িতে প্রায়ই অনুষ্ঠান হয়, উৎসব লেগেই থাকে—কখনো পিকনিক , কখনো ছোট খাটো পার্টি ।
তবুও এই সকালের হাসিখুশি পরিবেশ, একসাথে থাকার উষ্ণতা—এটা হয়তো আর ফিরবে না।
চা-বিস্কুটের হালকা আড্ডা শেষে সকালের নাস্তার টেবিলে সবাই বসলো।
কথোপকথনের মাঝে বারবার উঠে আসছিলো চলে যাওয়ার প্রসঙ্গ।
শেষ টুকরো নাস্তা শেষ হতেই একে একে সবাই ব্যাগ-গোছানো শুরু করলো।
তারপর একে একে বিদায়।
কেউ গাড়িতে উঠছে, কেউ দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছে।
বাড়িটার ভেতরটা মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে এলো—সেদিন বিয়ের আগের ভিড়ভাট্টার দিনটার মতোই, তবে এবার উল্টো দিকে। সেদিন সবাই এসেছিলো, আর আজ সবাই চলে যাচ্ছে।
রিহান মায়ের কাছে গিয়ে দোয়া নিলো।
পরিবারের অন্য সবার কাছ থেকেও শুভকামনা নিয়ে সে রওনা হলো।
আজ তার প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাওয়া—বিয়ের পরের আনুষ্ঠানিক জামাই-আপ্যায়ন।
যতটা না দায়িত্ব, তার থেকেও বেশি কৌতূহল, আনন্দ আর এক অদ্ভুত উত্তেজনা নিয়ে রিহান বেরিয়ে গেলো।
প্রায় ৯টা—বাড়িটা এখন বেশ ফাঁকাফাঁকা, নির্জন।
মির্জা বেগম, আনোয়ার আর আনারুল—এই তিনজনে গার্ডেনের গাছের ছায়ায় বসলো, হালকা গল্প করছে, আড্ডা চলছে। পাশেই সুপ্রিয়া আর প্রিয়া—মাঝে মাঝে অন্যদের কথায় মদ দিচ্ছে, আবার নিজেরা নিজেদের গল্পে ডুবে যাচ্ছে।
মেয়েরা ফুলবাগানের দিকে বসে আছেন—কদম ফুলের ছায়ার তলে সবাই শান্ত। বাড়িটা যেন আগের রাতের উৎসবের কোনো ছাপ না রেখে আলগা হয়ে পড়েছে; চারপাশে ফুলের ঘ্রাণ মোমোর মতো ছড়িয়ে আছে, বাতাসে সে সুবাস মিশে মেজাজকে নরম করে দিচ্ছে।
লিসি চুপচাপ বসে এই সবটা দেখছে—চোখে স্নিগ্ধতা, ভেতরে এক অজানা শিথিলতা। অজানা কিছু ফুলের নাম সে জিজ্ঞেস করে — কৌতূহল শিশুর মতো উঁকি দেয়। বাগানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটা হলো কিরিসের ঘরের ব্যালকনির বরাবর লাগানো টিউলিপের বাগান। রঙে রঙে অসংখ্য টিউলিপ; লাল, হলুদ, গাঢ় বেগুনি—প্রতিটি যেন আলাদা নাচছে।
কাউকে বললেই জানে না ঠিক কিরিস কত টাকা খরচ করেছে—কথা আছে, এখানকার মাটিতে এই ফুল ভালো হয় না বলেই বিদেশ থেকে মাটি আর স্পেশাল টিউলিপ বাল্ব আনা হয়েছে। নিজ হাতে বাগানের জন্য মাটি তৈরি করিয়েছে—বালি, জৈব সার, মাটি একদম মিশ্রণ করে, যেন ইউরোপের মাটির মতো হয়।
বাগানের ওপর আলাদা কাঠামো বানিয়েছে যাতে সূর্যের তাপ সরাসরি না লাগে, বরং হালকা আলো এসে ফুলে পড়ে।
টিউলিপ ফুটবার আগে প্রতিদিন সকালে কিরিস নিজের চোখে পানি দেওয়া, মাটি নরম করা, সব কিছু চেক করতো।
কিরিসের এমন ব্যবহার হাস্যকর যেমন মনে হতে পারে, তেমনি বোধ হয় কিরিসের জন্য এটা ছিল অনায়াসই করার মতো—ফুলের পেছনে যতটা যত্ন, ততটাই তার পরিচয়। এই বাগান নিজে থেকেই গুছিয়ে রাখে না; কিরিস রায়চৌধুরী নিজে অনুশীলনে রাখে, দেখে—তাই তো সবকিছু নিখুঁত, খুঁত বের করা মুশকিল।
আরোবির মুখে টিউলিপের ইতিহাস, রং, কিরিসের যত্নের গল্প শুনে লিসির মনে হঠাৎ দুষ্টু একটা ভাব খেলালো। কিরিস যে সবার জন্য সেই বাগানে যাওয়া নিষেধ করেছে—এমন বিধান যে লিসি শুনেছিল—তারই বিরুদ্ধে একটু লঙ্ঘন করার উত্সুকতা জাগল। সে ভাবলো, কেন এই ফুলগুলো এত স্পেশাল? কেন এত যত্ন?
লিসির চোখে টিউলিপ ছিলো সবসময়ই প্রথম পছন্দ—তবে টিউলিপ যেন বাংলাদেশে স্বচরাতে পাওয়া যায় না; ফোনে সংকেত দেখে সে কল্পনা করেছিল, আর এখন সামনাসামনে সে কল্পনাকে ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য পাচ্ছে—এত কাছ থেকে, এত ঘ্রাণে, এত রঙে। এ উপলব্ধি লিসিকে এক অদ্ভুত নাড়ি দিল—একপলকে বাস্তব আর বাসনার মাঝখানে কৌতূহল জ্বলে উঠল।
আজ লিসির মনে এক অদ্ভুত জেদ চেপেছে।
ভাবলো—আজ যদি কিরিস এই বাগানে যাওয়ার জন্য বাড়িতে ঝড়ও তোলে, তবু আমার কিছু আসে যায় না। আমি আজ ওই বাগানে যাবই… শুধু যাব না, ওই টিউলিপ ফুল তুলে তারপর বের হবো।
এই দুষ্টু বুদ্ধির কথা যখন সে আরোবি, সুরভী আর জারাকে বললো, তখন তিনজনের চোখ হঠাৎ বড় বড় হয়ে গেল।
তাদের দৃষ্টিতে বিস্ময়, অবিশ্বাস, আবার খানিকটা মজা।
সুরভী বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে তাকালো লিসির দিকে।
ওর চেহারায় এমন এক অভিব্যক্তি, যেন বলছে—“মেয়ে, তুই কি বোকা নাকি? না আসলেই পাগল হয়ে গেছিস?”
সে বুঝতে পারছিলো না, হাসবে নাকি লিসির এমন দুঃসাহস দেখে কেঁদে ফেলবে।
আরোবি তো একেবারেই উল্টো। মুহূর্তের মধ্যেই লিসির সাথে একমত হয়ে মাথা ঝাঁকালো।
এতদিনে তারা শুধু বোন না, ভালো বন্ধু, বরং বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেছে। লিসির এমন দুষ্টু ভাবনা তাকে ভেতর থেকে খুশি করে দিল।
আরোবি বরং চোখ টিপে হেসে ফেললো।
সে তো এমনিতেই লিসির সঙ্গী হয়ে গেছে, বোন ছাড়াও এখন সে লিসির বেস্ট ফ্রেন্ড।
হাসতে হাসতে বললো,
—“হুম, ঠিকই তো! এতোদিনে কারো হিম্মত হয়নি ওই বাগানে ঢোকার। তুই যদি ঢুকিস, আমি কিন্তু তোর সাথে যাবো।”
এই কথায় লিসির আত্মবিশ্বাস যেন আরও বেড়ে গেল।
কিন্তু জারার অবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা।
সে একেবারে হেসে লুটোপুটি খেতে লাগলো।
ঘাসের ওপর গড়াগড়ি খেতে খেতে বললো—
—“I am damn sure, ভাইয়া বাড়ি এসে যখন দেখবে লিসি টিউলিপ ফুল তুলেছে, তখন রাগে নিউক্লিয়ার বোমার মতো ফেটে যাবে!”
তারপর হেসে চোখে জল চলে এলো জারার।
আরোবি আবার মজা করলো,
—“আরে ভুল বললি! আমার তো মনে হয়, রাগে কিডনি অ্যাটাক না করলে হচ্ছে!”
সবাই তখন হেসে ফেটে পড়লো।
সুরভী বই বন্ধ করে বললো,
—“তোরা দুইজন তো একেবারেই মাথা খারাপ করে দিলি। জানিস তো ভাইয়া কেমন—যেটা নিষেধ করেছে, সেটা কেউ করলে সহ্য করে না।”
কিন্তু লিসির মুখে সেই দুষ্টু হাসি লেগেই রইলো।
সে মৃদু স্বরে বললো,
—“যা-ই হোক, আমি ওই ফুল দেখবই… টিউলিপ আমার সবচেয়ে প্রিয় ফুল। এতদিন শুধু ছবিতে দেখেছি, আজ যদি সামনে এত সুন্দর করে ফুটে থাকে, তবে আমি নিজেকে আটকাতে পারবো না।”
এই দৃঢ়তায় সবাই আবার একে অপরের দিকে তাকালো।
সুরভী চুপচাপ দীর্ঘশ্বাস ফেললো,
আরোবি মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো,
আর জারা আবার নতুন করে হেসে উঠলো।
ফুলবাগানের চারপাশে তখন কেবল পাখির ডাক, হালকা বাতাস আর মাটির গন্ধ।
কিন্তু এই নির্জনতার ভেতর লিসির মনে কেবলই বাজতে থাকলো—
“আমি যেতেই হবে… নিষেধ ভাঙতেই হবে।”
গার্ডেন তখনও শান্ত, ফুলের ঘ্রাণে ভরে আছে চারপাশ।
লিসি, আরোবি, সুরভী আর জারা হাসি-ঠাট্টার পরও চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু লিসির মনে সেই একই জেদ ঘুরছে—
“আজ আমি ওই বাগানে ঢুকবই… টিউলিপ ছিঁড়বই।”
ওরা এখনো কথাবার্তা করছে, হঠাৎ বাড়ির ভেতরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল।
কেউ ভাবেনি এত তাড়াতাড়ি কিরিস আর কাবির ফিরবে।
আসলে আজ সকালেই তারা দু’জন অফিসে গিয়েছিল।
গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং ছিল, সেটাও সেরে ফেলেছে সকাল সকাল।
সাধারণত কিরিস সারাদিন অফিসে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু আজ ব্যতিক্রম।
কারণ জানতো—বাড়িতে আজ সবাই ছুটে যাচ্ছে, বাড়ি ফাঁকা হয়ে পড়বে।
তাই ইচ্ছে করেই তারা দু’জন মিটিং শেষ করে সকাল সকাল ফিরে এসেছে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবে বলে।
গাড়ি দাঁড়াতেই ঘরের ভেতর দারোয়ান দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললো।
কিরিস আর কাবির ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকছে—দুটো স্যুট পরা, ফ্রেশ, চোখেমুখে এখনো অফিসের সেই গাম্ভীর্য।
আর এদিকে…
ফুলের বাগানে লিসি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো।
চোখে সেই দুষ্টু ঝিলিক, ঠোঁটে দুষ্টু হাসি।
সে আরোবির হাত ধরে ফিসফিস করে বললো—
—“চল, আজ না হলে আর কোনোদিন হবে না। ভাইয়া আসুক বা না আসুক, আমি টিউলিপের বাগানে ঢুকবই।”
আরোবি কেঁপে উঠলো—
—“তুই পাগল! এখন যদি ভাইয়া দেখে ফেলে?”
জারা হেসে কুটিকুটি হয়ে বললো—
—“ওরে বাবা! এখন যদি ভাইয়া দেখে, তাহলে তো সোজা নিউক্লিয়ার বোমা।”
সুরভী বইটা আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বললো—
—“প্লিজ লিসি, থাম এখনো সময় আছে…”
কিন্তু লিসি কারো কথা শুনলো না।
ধীরে ধীরে টিউলিপের বাগানের দিকে এগিয়ে গেলো।
বাতাসে টিউলিপের রঙিন পাপড়িগুলো দুলছে, রোদের আলোয় যেন রত্নের মতো ঝলমল করছে।
লিসির হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে লাগলো—এক অদ্ভুত উত্তেজনায় সে হাত বাড়ালো, একটা ফুল ছিঁড়বে বলেই…
ঠিক সেই মুহূর্তে—
পেছন থেকে ভারী বুটের শব্দ।
সবার শরীর হিম হয়ে গেল।
আরোবি, সুরভী, জারা তিনজন একসাথে চুপ মেরে গেল।
ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখা গেল—কিরিস দাঁড়িয়ে আছে!
চোখে কঠিন দৃষ্টি, ঠোঁট শক্ত হয়ে আছে।
এক হাতে অফিস ফাইল, অন্য হাতে স্যুটের বোতাম খোলা—
মনে হচ্ছে যেন অফিস থেকে ফেরেনি, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেছে।
তার দৃষ্টি সোজা লিসির দিকে—
আর লিসির হাতে তখন টিউলিপের কোমল ডাঁটা…
টিউলিপের ডাঁটায় লিসির আঙুল ছুঁই ছুঁই করছে।
চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো।
আরোবি, সুরভী, জারা—তিনজনই নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে।
পেছন থেকে হঠাৎ গম্ভীর স্বরে ভেসে এলো—
—“Nice try…”
লিসির শরীর জমে গেল।
ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলো—কিরিস দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ দুটো তীক্ষ্ণ, ঠোঁটে হালকা এক চাপা হাসি, যেন রাগ আর মজা মিলেমিশে আছে।
কাবির পাশে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেও হেসে মাথা নাড়ছে।
কিরিস এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো।
সবার দিকে না তাকিয়ে সরাসরি লিসির সামনে এসে দাঁড়ালো।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা—চারপাশের পাখির ডাক, বাতাস, ফুলের গন্ধ যেন একেবারে থেমে গেল।
তারপর নিচু গলায় বললো—
—“এটা তো নিশ্চয় শুনেছ বা জানো , এই বাগানে ঢোকা মানা। তবুও কেন?”
লিসি চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বললো—
—“আমি শুধু… টিউলিপটা কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিলাম।”
কিরিসের ভ্রু কুঁচকে গেল, কিন্তু চোখে রাগের চেয়ে বিস্ময় আর মৃদু স্নেহ বেশি।
—“দেখার জন্য ফুল ছিঁড়তে হয় না, লিসি। এসব শুধু ফুল না… এগুলো আমার নিজের হাতে বানানো একটা স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন ভাঙতে বসেছিলে?”
আরোবি ভয়ে ভয়ে বললো—
—“ভাইয়া, আসলে আমি …”
কিরিস হাত তুলে থামিয়ে দিল।
চোখ সরালো না লিসির দিক থেকে।
হঠাৎ হালকা হেসে বললো—
—“একটা জিনিস জানো? এই পৃথিবীতে আমি সবকিছু নিখুঁতভাবে গুছিয়ে রাখতে পারি… কিন্তু তোমার মতো একটাকে গুছিয়ে রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব।”
এই কথায় সুরভী আর জারা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো।
কাবির চুপচাপ মুচকি হেসে দূরে দাঁড়িয়ে রইলো।
লিসির মুখ গরম হয়ে উঠলো, গাল লাল হয়ে গেল।
সে নিচু গলায় বললো—
—“আমি তো শুধু…”
কিরিস তার কথা কেটে দিয়ে নরম স্বরে বললো—
—“Just don’t do it again, okay?”
তারপর হাত বাড়িয়ে টিউলিপের গাছটা হালকা ছুঁয়ে দিলো।
চোখে যেন এক মায়া খেলা করছিল—রাগ নয়, বরং যত্নের ভারী চাপা অনুভূতি।
লিসি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
আর বাকিরা—আরোবি, জারা, সুরভী—তিনজনই মনে মনে ভাবলো, আজ বোধহয় বোমা ফাটেনি, কিন্তু বিস্ফোরণের গরম হাওয়া সবাই ছুঁয়ে গেছে।
কিরিসের কড়া দৃষ্টির চাপটা আস্তে আস্তে হালকা হলো।
ঠোঁটে এক কোণে দুষ্টু হাসি খেললো।
লিসি তখনও চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন স্কুলের হেডমাস্টারের সামনে অপরাধী ছাত্র।
কিরিস একবার ফুলের দিকে তাকালো, তারপর লিসির দিকে।
নিচু গলায় বললো—
—“হুম… তাহলে টিউলিপ ছিঁড়ে আমার মাথার ওপর বোমা ফাটানোর প্ল্যান করছিলি?”
জারা সাথে সাথে হেসে উঠলো,
—“আমি তো বলেছিলাম—নিউক্লিয়ার বোমা ফাটবে!”
আরোবি আবার যোগ দিলো,
—“আমি বলেছিলাম কিডনি অ্যাটাক!”
কিরিস চোখ সরু করে ওদের দিকে তাকালো।
—“ভালোই চলছে… তোরা সবাই মিলে কনস্পিরেসি করছিলি, তাই না?”
সুরভী তাড়াতাড়ি বইটা মুখে লাগিয়ে হেসে ফেললো।
লিসি লজ্জায় চুপ, মুখ একেবারে লাল।
কিরিস আবার ধীরে ধীরে লিসির কাছে ঝুঁকল।
ফিসফিস করে বললো—
—“জানো তো, আমার একটাই খারাপ অভ্যাস—যেটা আমার, সেটা অন্য কেউ ছুঁলে সহ্য করতে পারি না। ফুল হোক, বা…”
কথাটা শেষ না করে দাঁড়িয়ে গেল।
দৃষ্টিটা সরাসরি লিসির চোখে আটকালো।
লিসির বুকের ভেতর তখন ধুকপুকানি শুরু।
বাকিরা চুপ করে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে।
হঠাৎ কিরিস হেসে উঠলো।
—“আচ্ছা, একটা কথা বলো তো লিসি, যদি টিউলিপ ফুলটাই এত পছন্দ… তাহলে তোমার জন্য আলাদা একটা বাগান বানিয়ে দেবো। কেমন?”
লিসি তাড়াতাড়ি মাথা নাড়লো—
—“না, দরকার নেই…”
কিরিস চোখ টিপে হেসে বললো,
—“ওহ, বুঝেছি… মানা করার জিনিসটাই তোমাকে বেশি টানে। তাহলে সাবধান, পরের বার যদি দেখি, শাস্তি কিন্তু এই ফুল ছিঁড়ার চেয়েও কঠিন হবে।”
আরোবি, জারা আর সুরভী তখন আর ধরে রাখতে পারলো না—হাসিতে ফেটে পড়লো।
লিসি দাঁত কামড়ে চোখ নামিয়ে চুপ করে রইলো।
কিরিস পাশ কাটিয়ে হেঁটে চলে গেল, তবে মুখের দুষ্টু হাসিটা লুকাতে পারলো না।
অফিস থেকে ফিরাই দুজনে একটু হলেও ক্লান্ত তাই
কিরিস আর কাবির একসাথে ঘরে চলে গেল।
সকাল থেকে মিটিং-অফিসের টেনশন, তাই দু’জনেই ভাবলো আগে ফ্রেশ হয়ে নেওয়া যাক।
কিছুক্ষণ পরে.........
দু’জনেই ড্রেস চেঞ্জ করে ঘরের আরামদায়ক পোশাকে বের হলো।
ড্রইংরুমে গিয়ে বসতেই আনোয়ার উদ্দীপ্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো—
—“তাহলে বলো, কেমন চলছে অফিসের অবস্থা? নতুন প্রজেক্টের খবর কী?”
কিরিস হালকা ভঙ্গিতে বললো—
—“সব চলছে ঠিকঠাক, তবে কিছু চাপ তো আছেই। নতুন কনট্রাক্ট নিয়ে ক’দিন খুব টেনশন ছিল, কিন্তু এখন সব সেট হয়ে গেছে।”
কাবিরও যোগ দিলো—
—“হ্যাঁ, আর ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টও ভালো অবস্থায় আছে। বিদেশ থেকে যে টিম আসছিল, তাদের সাথেও মিটিং শেষ।”
আনোয়ার আগ্রহ নিয়ে শুনে যাচ্ছিলেন, মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছেন, পরামর্শ দিচ্ছেন।
ঘরে এক ধরণের কাজের আবহ তৈরি হলো, তবে সেটা একদম হালকা, পারিবারিক টোনে।
এদিকে সুপ্রিয়া আর প্রিয়া রান্নাঘরে চলে গেল দুপুরের রান্নার কাজে।
মশলার গন্ধে ঘর ভরে উঠলো।
মির্জা বেগম হালকা ব্যথার কারণে নিজের ঘরে গিয়ে পা’য় তেল মালিশ করে একটু বিশ্রাম নিলেন।
আর বাকি মেয়েরা?
ওরা তো পুরো ড্রইংরুম জুড়ে বসে লিসির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
আরোবি, জারা, সুরভী—সবাই মিলে একসাথে একটানা খোঁচা মারছে।
কেউ গুতাচ্ছে, কেউ খিলখিল করে হাসছে, কেউ আবার ইশারা করছে।
লিসি প্রথমে প্রতিবাদ করলো,
—“আরে তোমরা থামো তো! কতবার বললাম এসব করিস না।”
কিন্তু তাতে কে শোনে!
জারা সঙ্গে সঙ্গে বললো—
—“এই চেহারাটা তো একদম লাল টিউলিপের মতো হয়ে গেছে।”
সুরভী আবার টেনে বললো—
—“এই লাজুক চাহনি দেখে মনে হচ্ছে কেউ কিছু বললেই কেঁদে দেবে।”
সবাই আবার হেসে উঠলো।
লিসি রাগে গলা উঁচু করে বললো—
—“চুপ করো তোমরা! আমি কিন্তু একটুও মজা পাচ্ছি না।”
কিন্তু কথাটা শেষ হতেই সে নিজেই অভিমানী ভঙ্গিতে মুখ ঘুরিয়ে চুপ করে গেল।
গালে লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে, তবুও কিছু বলতে পারছে না।
মেয়েরা আবারও একসাথে খিলখিল করে হেসে উঠলো।
ড্রইংরুমটা যেন একেবারে উচ্ছ্বাসে ভরে গেল।
কিরিস আর কাবির বাবার পাশ থেকে উঠে মেয়েদের পাশের দিকে আসতে থাকে।
ওদের পাশে যেতেই হেসেখেলে ভরা পরিবেশটা চোখে পড়লো।
মেয়েরা সবাই লিসিকে ঘিরে ধরেছে, যেন ছোট্ট একটা শিকারকে নিয়ে খেলা করছে।
লিসি তখন ঠোঁট ফুলিয়ে বসে আছে, কারও সাথে চোখও মিলাচ্ছে না।
কখনো হালকা প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু শেষে চুপ করে গেছে—অভিমান জমে গিয়েছে মুখে।
কাবির হাসিমুখে দৃশ্যটা দেখলো, হালকা মজা করে বললো—
—“আরে, এখানে আবার কী চলছে?”
সবাই হেসে উঠলো, কিন্তু কিরিসের চোখ শুধু এক জায়গায় আটকে গেল—লিসির অভিমানী মুখে।
তার ভ্রু হালকা কুঁচকে গেল, চোখে সেই বিশেষ দৃষ্টি—যা সবাইকে গম্ভীর করে দিতে পারে।
সুরভী হেসে বললো—
—“ভাইয়া, আমরা তো কিছুই করিনি, শুধু একটু খোঁচা মারছিলাম।”
কিরিস হালকা গলা নামিয়ে বললো—
—“খোঁচা মারে যে, তার মুখটা লাল হয়ে অভিমান জমে আছে, সেটা কি তোমরা দেখতে পাচ্ছ না?”
সবাই থমকে গেল।
হাসি মুহূর্তের জন্য থেমে গেল, যেন ঘরের মধ্যে চাপা নীরবতা নেমে এলো।
কিরিস ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে সোফার হেডে দাঁড়িয়ে পড়লো।
দৃষ্টি একেবারে লিসির উপর স্থির—
—“তোমরা মজা করতে পারো, কিন্তু একটা সীমার ভেতর। কাউকে নিয়ে বেশি খোঁচা মারা ভালো অভ্যাস নয় ।”
লিসি ভয়ে নয়, বরং লজ্জা আর অস্বস্তিতে মাথা নিচু করলো।
মুখের পাশের চুল গাল বেয়ে নেমে এসেছে, কপালে হালকা ঘাম জমেছে।
কাবির হেসে পরিস্থিতি হালকা করলো—
—“আরে ভাই, এতোটা সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। মজা করছে ওরা।”
কিরিস গভীরভাবে লিসির দিকে একবার তাকিয়ে হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, তারপর সবার দিকে তাকিয়ে কড়া অথচ ঠান্ডা গলায় বললো—
—“ঠিক আছে, তবে মনে রেখো… কাউকে কখনো এমন ভাবে কথা বলবে না যাতে সে কষ্ট পায়, মুখের কথা আর ঢিল একবার ছুড়ে মারলে দ্বিতীয়বার ফেরত পাওয়া যায় না,,,,,,,, সে যাই হোক পরের বার থেকে সাবধান আর কথাটা যাতে মনে থাকে।”
কাবির —” আরে কি বলছিস! আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, মরার পরেও মনে রাখবে দেখতে হবে না এই বাণী কে বলেছে”
সবাই আবারও হেসে উঠলো, তবে এবার সেই হাসির মধ্যে কিরিসের রাগের ভয় মিশে গেল।

0 Comments