তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :25

ছাদে হাসাহাসি, শাড়ি পড়ে রঙিন ফটোশুট শেষ হলো। মেয়েরা একেকজন একেক ভঙ্গিতে ছবি তুলে ব্যস্ত। কেউ ফুল হাতে, কেউ রেলিং ধরে, কেউবা বাতাসে ওড়ানো আঁচল ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাসি-ঠাট্টার মধ্যে ক্লিক ক্লিক শব্দ ভেসে আসছে।
আরোবি — "আমার এই ছবিটা দেখ, একদম model look!"
তিশা (হেসে) — "তোর চোখ বন্ধ হয়ে গেছে, এইটাকে বলে model নাকি!"
সবাই একসাথে হেসে উঠলো।
নীচে বসার ঘরে সুপ্রিয়া, প্রিয়া, মির্জা আড্ডা দিচ্ছিলেন।সুপ্রিয়া — "দেখো না, আজকালকার মেয়েরা একটু সাজগোজ করলেই ছবি তোলে, আর সাথে সাথে আপলোড করে দেয়।"
প্রিয়া (হাসতে হাসতে) — "আমাদের সময়ে এসব ছিলো না, তবুও কেমন সুন্দর লাগতো সেজে উঠতে।"
মির্জা — "সত্যিই, আজকে ওদের হাসি-খুশি দেখে মনটাই ভালো হয়ে গেলো। বাড়ি যেন উৎসবের মতো লাগছে।"
বড়রা মুচকি হেসে মেয়েদের কাণ্ডকারখানা শুনে আনন্দ পেলো।
সন্ধ্যা নামতেই সবাই ড্রইংরুমে একসাথে বসলো। টেবিলে সাজানো হলো সামুচা, সিঙ্গারা, চা আর ফলের প্লেট।
তিশা, জারা, আরোবি ছবি তুলতে তুলতেই খেতে ব্যস্ত।
তিশা — "চা না হলে তো আসলেই সন্ধ্যাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।"
জারা — "ঠিক বলেছিস, কিন্তু আমি আগে সিঙ্গারা খেয়ে নিই।"
সবাই খেতে খেতে আবার ছবিও তুললো। বড়রাও পাশে বসে গল্প করছিলেন।
দেখতে দেখতে রাত হয়ে গেলো আনোয়ার আর আনারুল আগে থেকে খেয়ে ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পরেছে আর মির্জা বেগম রাতে খুব কম সময় খাওয়া দাওয়া করেন তাই তিনি আজ রাতে না খেয়ে শুয়ে পরেছে,
বাকিরা এখনো খায়নি,
রাতের খাবারের টেবিল সাজানো হলো ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি দিয়ে। সবার প্রিয় আইটেমও রাখা হলো।
মেয়েরা এখনও শাড়ি খুললো না, সেই রঙিন সাজেই সবাই খেতে বসলো।
খাওয়ার টেবিলে হাসাহাসি চলতে থাকলো—
আরোবি — "আজ তো একদম royal dinner, মনে হচ্ছে বিয়ের ঘর!"
প্রিয়া (হেসে) — "তাহলে রান্নার জন্য একটা আলাদা ধন্যবাদ চাই, ঠিক আছে?"
সুপ্রিয়া — "হুম, এইবার কে কে রান্নাঘরে সাহায্য করেছে, সবাই হাত তুলে বলো!"
সবাই একসাথে হেসে উঠলো।পুরো বাড়িটা ভরে উঠলো উচ্ছ্বাসে, সাজে আর পরিবারের মিষ্টি পরিবেশে।
সবাই পেটপুরে খেয়ে নিলো। বাসন ধোয়া আর রান্নাঘর গুছিয়ে শেষ হলে মেয়েরা আবার ছাদে চলে গেলো। নিচে বড়রা নিজেদের মতো করে আড্ডা দিতে লাগলেন।
রাতের হাওয়া বেশ ঠাণ্ডা। চারপাশে নিরবতা, দূরে দূরে শহরের আলো, আকাশে ঝলমলে তারা। মেয়েরা শাড়ির আঁচল সামলে ছাদে একসাথে গোল হয়ে বসল।
তিশা — "আজকে যে ফটোশুট হলো না, সেই ছবিগুলো কাল পোস্ট করলে দারুণ রেসপন্স আসবে!"
আরোবি — "আমি কিন্তু ক্যাপশন লিখে ফেলবো আগে থেকে।"
জারা — "আরে! তুই ক্যাপশন দিবি, নাকি কবিতা লিখবি?"
হাসাহাসিতে ছাদ ভরে যায়।
লিসি হালকা মুচকি হেসে চুপচাপ বসেছিল।
নুসরাত বললো — "লিসি, তুই এত চুপ কেন? ছবি তুলেছিস তো?"
লিসি (হেসে) — "তোমাদের মতো আমি তত expert না, তাই চুপচাপ বসে আছি।"
তিশা — "এই দেখ, modesty দেখ! কিন্তু ছবিতে একদম হিরোইন লেভেলের লাগছে!"
সবাই হাততালি দিয়ে হেসে উঠলো। দূরে কারো গান ভেসে এলো।
শান্ত রাত, আর মেয়েরা ছাদের বাতাসে গল্প করতে করতে গান ধরলো—
কেউ হালকা সুরে গুনগুন করলো, কেউ হাততালি দিলো, আবার কেউ মজা করে নাচের ভঙ্গি করে দেখালো।
অন্য দিকে............
কনফারেন্স রুমের মোটা কাঁচের দরজা ধীরে ধীরে খুলে যায়। ভেতরে সবাই বসে রিপোর্ট শেষ করছে। টেবিলের মাথায় হেলান দিয়ে বসে আছে কিরিস। গাঢ় কালো শার্ট, হাতার বোতাম খোলা, চোখ দুটো তীক্ষ্ণ আর ঠাণ্ডা।
কেউ হালকা গলা খাঁকারি দিলো, আবার কেউ রিপোর্টের কাগজ ঘাঁটছে, কিন্তু তার সামনে সরাসরি তাকানোর সাহস কারো নেই।
একজন এক্সিকিউটিভ — "Boss… investment plan ready হয়ে গেছে, শুধু আপনার final signature লাগবে।"
কিরিস ধীর চোখে তাকালো, কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ থেকে বললো—
— "Fine. কিন্তু মনে রাখবে, আমার loss সহ্য করার অভ্যাস নেই। যদি এক টাকাও ডুবে যায়, price দিতে হবে।"
ওর কণ্ঠে এত calm অথচ ভয়ঙ্কর শক্তি যে মুহূর্তে রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
কিরিস চেয়ার থেকে উঠতেই সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে গেলো। কেউ কথা বললো না, শুধু মাথা নত করে সম্মান জানালো।
পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলো কিরিস, ঠাণ্ডা ভঙ্গিতে। কেবল তার পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল পুরো করিডরে।
যেন একটা rule— Boss বেরোনোর সময় কেউ কথা বলবে না।
বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। দরজা খুলে কিরিস ঢুকতেই সিকিউরিটি দল চোখ নামিয়ে স্যালুট দিলো। গাড়ি ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলো।
ফোনে একটা মেসেজ এলো।
“Location ready. সব লোক অপেক্ষায় আছে।”
কিরিস একঝলক স্ক্রিনে তাকিয়ে ঠাণ্ডা ভঙ্গিতে উত্তর দিলো—
— "I’m on the way."
গাড়ি এবার ছুটলো শহরের অন্ধকার গলির দিকে।
পুরোনো গুদামঘর। লাইট কম, চারপাশে টেনশন। কিরিস ভেতরে ঢুকতেই সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করলো। কারো সাহস নেই সরাসরি চোখে তাকানোর।
— "Delivery কোথায়?"
একজন কাঁপতে কাঁপতে বাক্স খুলে দেখালো। টাকা, সিলমোহর, আর নথি সব নিখুঁত।
কিরিস নিজের হাতে চেক করে বললো—
— "Good. এবার যদি এক সেকেন্ডও late হয়, আমি নিজেই এসে হিসাব নেব।"
সবার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো।
কাজ শেষ হতে রাত অনেক হয়ে গেলো।
গাড়ির ভেতরে বসে জানালার বাইরে তাকালো কিরিস। শহরের আলো পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছে, তার চোখে ঝলক দিচ্ছে ক্লান্তিহীন এক শিকারীর মতো দৃঢ়তা।
মোবাইলে শেষবারের মতো একটা বার্তা এলো—
“Boss, সব safe. কাজ শেষ।”
কিরিস একটুকরো হাসি দিলো।
রাত অনেকটা গড়িয়েছে।
ঘরের ভেতর টিভির মৃদু আলোয় হালকা ঝলকানি, পর্দায় চলা সিনেমার শব্দ মিলেমিশে এক ধরনের অদ্ভুত নীরবতা তৈরি করেছে।
সোফার সামনে রাখা বড় কার্পেটে এদিক-ওদিক ছড়ানো অবস্থায় ঘুমিয়ে আছে সুরভী, তিশা, হিয়া, লিজা আর আরোবি। মুখে ক্লান্তির ছাপ, হাতপা এলোমেলো, যেন ছোট বাচ্চাদের মতো টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
জারার চোখও ভারী হয়ে আসছে। এক-একবার চোখ খুলছে আবার বন্ধ হচ্ছে। তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে গভীর ঘুমের দিকে নামছে।
কেবল একজন—লিসি।
সে যেন রাতজাগা কোনো পাখি, স্থির হয়ে বসে আছে, কিন্তু চোখের ঘুম এখনো ধরা দেয়নি। তার মুখে কোনো শব্দ নেই, চোখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
আজকের এই রাতজাগার আসল কারণ—কিরিস।
কিছুক্ষণ আগে আনোয়ার এসে গিয়েছিল নিচে। প্রথমে মেয়েদের এইভাবে টিভি সামনে জেগে থাকতে দেখে খানিকটা রাগ হলেও কিছু বলেনি। শুধু লিসিকে ডেকে বলল—
—"লিসি, সুপ্রিয়া বললো… কিরিস মানে তোমার বড় ভাইয়া আসবে। একটু খাবার গরম করে খেতে দিও। সুপ্রিয়ার মাথাটা খুব ধরেছে, বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। সেই জন্য আমি এলাম তোমাকে বলতে। কিরিস বলেছে, শুধু খাবারটা দিও না, খাওয়াও। না হলে সে খাবে না। বারবার করে বলে দিয়েছে। আমি উপরে যাচ্ছি।"
আনোয়ার চলে গেলে লিসি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে পড়ল প্রতিদিনের সেই চেনা দৃশ্যটা—
যত রাতই হোক না কেন, সুপ্রিয়া সবসময় অপেক্ষা করতেন কিরিসের জন্য। ছেলে যদি না খেয়ে ঘুমায়, তাহলে মায়ের চোখে কীভাবে ঘুম আসে? তাই সুপ্রিয়া চেষ্টা করতেন ছেলেকে নিজের হাতে খাবার খাওয়াতে।
কিরিসও মায়ের কথায় কখনো না বলত না। চুপচাপ বসে যেত আর ভালো ছেলের মতো খেয়ে নিত।
কিন্তু আজ…
আজ সুপ্রিয়া অসুস্থ।
তাই এই দায়িত্বটা এসে পড়েছে লিসির উপর।
সে তো একা একা রাত জাগতে পারবে না। তাই ঠিক হয়েছিল সবাই মিলে জেগে থাকবে, মুভি দেখবে, গল্প করবে—কিরিস আসা পর্যন্ত। কিন্তু কিসের কী! সবাই একে একে ঘুমিয়ে পড়েছে।
শুধু লিসি বসে আছে।
টিভির আলোয় তার চোখে এক ধরনের শূন্যতা। বুকের ভেতর অকারণ এক ধুকপুকানি। বাইরের বাতাসে রাতের গভীরতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠছে।
ঘরের ভেতর তখনো টিভির হালকা শব্দ, কিন্তু বাইরের পরিবেশ যেন হঠাৎ বদলে গেল।
বাতাসে অদ্ভুত এক শব্দ শোনা গেল—শুঁ… শুঁ… করে হাওয়া বইছে।
লিসি খেয়াল করল জানালার পর্দাটা দুলে উঠছে।
একটু আগেও নিস্তব্ধ রাত, এখন যেন হাওয়ার ঝাপটায় জানালার কাচ কেঁপে উঠছে।
হঠাৎ—ঝাপ!
একটা জানালা আধখোলা ছিল, ঝড়ো হাওয়ায় সেটা সজোরে ধাক্কা খেল দেয়ালে।
ঘুমন্ত মেয়েরা কেউ নড়ল না, শুধু জারা আধঘুমে গুঙিয়ে উঠল, আবার শুয়ে পড়ল।
লিসি একা চমকে উঠে তাকাল বাইরের দিকে।
আকাশে কালো মেঘ জমে গেছে, যেন মুহূর্তে রাতটা আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
গাছের ডালে ডালে দোল খেয়ে পাতা ঝরে পড়ছে। বাতাসের সঙ্গে সেই শব্দগুলো মিশে গিয়ে এক ধরনের ভয় ধরানো নিস্তব্ধতা তৈরি করেছে।
একটা সময় মনে হলো, যেন ঝড়ের সঙ্গে সারা বাড়িটাই কেঁপে উঠছে।
লিসি নিঃশব্দে উঠে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করতে চাইল, কিন্তু হাওয়ার চাপ এতটাই বেশি যে পর্দা উড়ে এসে তার মুখে আছড়ে পড়ল।
তার বুকটা কেঁপে উঠল অজানা এক শীতলতায়।
ঝড়টা একসময় আরও বেড়ে গেল।
বাইরের গাছগুলো দুলছে দুলকি নাচের মতো, জানালার কাচ টনটন শব্দ করছে। লিসি যখন জানালাটা বন্ধ করার চেষ্টা করছিল, তখনই হঠাৎ—
ধাড়াম!
বাড়ির প্রধান দরজাটা যেন ঝড়ের ঝাপটায় অথবা কারো প্রচণ্ড জোরে ঠেলাতে একেবারে কেঁপে উঠল।
লিসি চমকে উঠে তাকাল।
হৃদস্পন্দন মুহূর্তেই বেড়ে গেল।
নিস্তব্ধ ঘরের মধ্যে দরজার ফাঁক দিয়ে হাওয়ার সঙ্গে এক অদ্ভুত ঠান্ডা কাঁপন ঢুকে পড়ল। কয়েক বার কলিং বেল বেজে উঠলো,
সে সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোল। হাত বাড়িয়ে দরজাটা খোলামাত্রই—
সামনে দাঁড়িয়ে আছে কিরিস।
এলোমেলো অবস্থায়, চুল ভিজে ঝড়ের হাওয়ায় কপালে আটকে আছে।
তার চোখে আগুন জ্বলা রাগ—যেন কয়েক মুহূর্ত আগেই কাউকে ছিন্নভিন্ন করে এসেছে।
আর সবচেয়ে ভয়ের দৃশ্য—
দুটো হাত ভিজে টপটপ করে রক্ত ঝরছে।
ফোঁটা ফোঁটা রক্ত মেঝেতে পড়তে পড়তে ছোট্ট লাল দাগ রেখে যাচ্ছে।
লিসির নিঃশ্বাস আটকে গেল।
তার চোখে-মুখে স্পষ্ট হলো—কিরিস এখনো রাগে ফুঁসছে, চোয়াল শক্ত করে চেপে রেখেছে।
সে এমনভাবে ভেতরে ঢুকল যেন ঝড়কেও থামিয়ে দিতে পারে।
মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু তার শরীরের ভাষাই বলে দিচ্ছে—কিছুক্ষণ আগে যা ঘটেছে সেটা ভয়ঙ্কর।
যাকে কিরিস মেরেছে—সে এখন বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে কেউ বলতে পারছে না।
কারণ কিরিস যখন রেগে যায়, তখন কাউকে সে ছাড়ে না।
ঝড়ের গর্জন, ভেতরের নিস্তব্ধতা আর কিরিসের সেই রক্তমাখা এন্ট্রি—লিসির চোখে যেন দুনিয়া থমকে দাঁড়াল।
লিসি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখ স্থির হয়ে আছে কিরিসের হাতে ঝরতে থাকা রক্তের দিকে। একেকটা ফোঁটা টপ… টপ… করে নিচে পড়ছে, যেন প্রতিটা ফোঁটায় ভয় আর রাগ মিলেমিশে ছড়িয়ে পড়ছে।
হাওয়ার ঝাপটা ভেতরে ঢুকতেই লিসির গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল।
তবুও সাহস করে বলল—
—“ভাইয়া… এই কী…? আপনার হাত…!”
কিরিস কোনো উত্তর দিল না।
চোখ দুটো এমন লাল হয়ে আছে যেন সে এখনো কাউকে ছিঁড়ে ফেলবে।
সে কেবল জুতার ফোঁসফোঁস শব্দ তুলে ভেতরে ঢুকল, আর দরজা ঠাস করে বন্ধ হয়ে গেল।
লিসি ভয়ে আর অস্থিরতায় গলা শুকিয়ে গেলেও আবার বলল—
—“খাবারটা গরম করে দিচ্ছি … মামি অসুস্থ, আমাকে বলেছেন আপনাকে খাওয়ার দিতে… আমি এখনই আনছি।”
কিরিস ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
চোখে এমন দৃষ্টি যেন প্রতিটা কথা ভেদ করে যাচ্ছে বুকের ভেতর।
এক মুহূর্ত থেমে গম্ভীর স্বরে বলল—
—“চুপচাপ থাকো, লিসি। অযথা প্রশ্ন কোরো না। আমি যদি খেতে চাই, খাব। না চাইলে কিছুতেই খেতে পারব না।”
লিসি কেঁপে উঠল। কিন্তু বড় মামার কথা মনে পড়তেই সাহস করে একটু জেদি কণ্ঠে বলল—
—“না, খেতে হবে। আপনি না খেলে… মামি ঘুমোতে পারবেন না।”
কিরিসের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
সে কয়েক সেকেন্ড লিসির দিকে তাকিয়ে থাকল—তার চোখের ভেতর ভয় আর সাহস দুটোই স্পষ্ট।
তারপর হঠাৎ কিরিস মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, যেন নিজের ভেতরের রাগ সামলে নিচ্ছে।
—“তুমি খুব জেদি হয়ে যাচ্ছো…. ?”
তার কণ্ঠে হুমকির মতো গম্ভীরতা, আবার কোথাও যেন অদ্ভুত মায়াও লুকানো।
লিসি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
রক্ত এখনো টপটপ করে ঝরছে,
লিসি একটু সাহস সঞ্চয় করে নিচু স্বরে বলল—
—"আপনিও খুব বাজে হয়ে যাচ্ছেন।"
কিরিস মুহূর্তেই ভুরু কুঁচকে তাকাল তার দিকে। চোখে ছিল একধরনের গভীর কঠোরতা, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো কথা ঝরল না তার ঠোঁট থেকে। ডান হাতের ফালি ফালি কাটা অংশ থেকে টপটপ করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে, অথচ যেন তার কোনো হুশ নেই। বোঝাই যাচ্ছে, আঘাত বেশ গভীর—ডান হাত মারাত্মকভাবে কেটে গেছে, বাম হাতেও রক্ত ঝরছে, যদিও তুলনামূলক কম।
সে দাঁড়িয়ে আছে স্থির, অবিচল, যেন ব্যথার কোনো অনুভূতিই তার শরীরে নেই। লিসির দিকে চোখ রেখে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল। তারপর হঠাৎ থেমে থাকা কণ্ঠে ভাঙা অথচ অদ্ভুত শান্ত সুরে বলল—
—"তার মানে তুমি আমার জন্য এত রাত জেগে বসে আছো... একা একা?"
কিরিসের এই সুর লিসিকে হকচকিয়ে দিল। স্বাভাবিক কিরিসের কঠিন, শীতল কথার ভঙ্গির সঙ্গে একদমই মেলে না—আজ তার কণ্ঠে অন্যরকম গভীরতা, কেমন যেন নরম অথচ ভীতিকর এক আবহ।
লিসি কেঁপে উঠে সামলে নিলো নিজেকে। ঠোঁট শুকিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল, তারপর অস্বস্তি ঢাকতে বলল—
—"আমি কি একা নাকি? ওইদিকে তাকিয়ে দেখেন... আপনার বোনেরাও তো জেগে ছিলো।"
কিরিস ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। আসলেই দেখল, ডিভান আর সোফায় গা এলিয়ে থাকা তার বোনেরা আধো ঘুমে ঝিমাচ্ছে। ঘরের আলোয় তাদের নিস্তেজ মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
কিরিস এবার কিছু বলল না। শুধু স্থির দাঁড়িয়ে রইল, চোখে সেই অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে—যেন লিসির ভেতরটা নাড়িয়ে দিতে চাইছে।
কিরিস কিছু না বলে নিঃশব্দে সিঁড়ির দিকে এগোতে থাকে। সবার ঘুমন্ত অবস্থার মাঝে টিভির ক্ষীণ আলোয় শুধু লিসি দাঁড়িয়ে আছে।
লিসি (নরম কণ্ঠে) —
"উপরে যান… আমি আপনার জন্য খাবার গরম করে আনছি।"
তার কণ্ঠে ভয় নেই, শুধু যত্ন মেশানো দৃঢ়তা।
কিরিস কোনো উত্তর দেয় না। পা বাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠে। কিন্তু বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত এক তৃপ্তি খেলে যায়।
সিঁড়ির মাঝখান থেকে একবার পিছনে ফিরে তাকায়—
সেই মুহূর্তে লিসি দাঁড়িয়ে আছে হালকা আলোয়, গাঢ় নীল শাড়ি পরে, খোলা চুল কাঁধে ছড়িয়ে আছে। চোখে হালকা ঘুম ঘুম ভাব, হাত দুটো জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে এমন ভঙ্গিতে, যেন অজান্তেই সময় থেমে গেছে তার জন্য।
কিরিসের দৃষ্টিতে লিসি
ঠিক যেন অপরূপা কোনো শিল্পকর্ম—শান্ত অথচ মায়াবী।
মনের ভেতর নিজেই অবাক হয়ে যায় কিরিস। কিরিসের মনে হতে থাকে
… যেন তার নিজের নতুন বিয়ে করা বউ নিচে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু তার জন্য অপেক্ষা করছে।”
মুখে কিছু বলে না সে। কিন্তু ঠোঁটের কোণে অজান্তে একটা মুচকি হাসি ফুটে ওঠে।
কিরিস ধীরে ধীরে উপরে উঠে যায়, আর লিসি রান্নাঘরে ঢুকে খাবার গরম করতে থাকে তার জন্য।
ঝড়ের শব্দ বাইরে এখনো চলছেই, কিন্তু ভেতরে তৈরি হচ্ছে এক অদ্ভুত উষ্ণতা।
ঘরের অন্ধকারে শুধু জানালা দিয়ে আসা বিদ্যুতের ঝলকানি।
ঘরে গিয়ে হালকা ভিজে জামা কাপড়টা বদলে নাই একটু ফ্রেশ হয়ে এসে ডিভানে বসে, একটু পরে উঠে এগিয়ে যায় খোলা জানলাটার দিকে ঝড়ের কারণে পর্দা টা এলোমেলোভাবে উড়ছে, হালকা ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে ঘরে।কিরিস জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে চুল এলোমেলো, চোখে সেই চেনা রাগ আর গভীরতা, তবে ভেতরে কোথাও এক নিঃশব্দ ক্লান্তি।
টক… টক… দরজায় আলতো নক করে ভেতরে ঢোকে লিসি।
হাতে ট্রে—ভাত, গরম গরম মাংস, সাথে স্যুপ।
লিসি (নরম কণ্ঠে, প্রায় ফিসফিসিয়ে) —
"খাবারটা গরম করে এনেছি… খেয়ে নিন।"
কিরিস ঘাড় না ঘুরিয়েই জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। কয়েক সেকেন্ড যেন শুনছেই না।
তারপর ধীরে ধীরে পেছন ঘুরে তাকায়—
গাঢ় নীল শাড়ি, খোলা চুল, চোখে লাজুক অথচ দৃঢ় দৃষ্টি।
সে দাঁড়িয়ে আছে যেন সত্যিই তার ঘরের রানী।
ঝড়ের হাওয়া জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। কিরিস জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, চোখে গভীরতা আর ঠাণ্ডা রাগ, চুল এলোমেলো, হাতের ব্যান্ডেজে রক্তের দাগ এখনও ভেসে আছে।
লিসি বেশ কিছুক্ষণ ওই ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কিরিসের কোনো নড়চড় নেই যেটা দেখে একটু বিরক্ত সরে লিসি বলে উঠে —" ওখানে খাম্বার মতন দাঁড়িয়ে না থেকে এখানে এসে খেয়ে নিন না হলে খাবার আবার ঠান্ডা হয়ে যাবে, "
লিসির কথায় কিরিস তার দিকে তাকায়, কিন্তু কোনো কথা বলে না
কিরিস এসে বিছানায় বসে কিন্তু চামচ তুলে নিলো না। চোখে কিছুই নেই—বাচ্চাদের মতো খেতে চায় না সে।
কিরিস (ঠাণ্ডা স্বরে) —
"আমি… এখন খেতে চাই না।"
লিসি কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে কিরিসের সামনে বসে ট্রেতে ভাত তুলে ধরে—
লিসি (হালকা দৃঢ় কণ্ঠে) —
"না, আপনি খেতে চাইছেন বা না চাইছেন—আমি খাবার দেব। খেতে হবে।"
কিরিস চুপ। তার চোখে অদ্ভুত অস্থিরতা।
লিসি—" খেয়ে নিন তো, আমার ঘুম পাচ্ছে আমি আপনাকে খাওয়ার পরে ঘুমোতে যাব দ্রুত নিন "
কিরিস —" তুমি কি অন্ধ আর তাছাড়া আমার খেতে ইচ্ছে করছে না, "
লিসি—" কোন আক্কেলে বলছেন আমি অন্ধ আর খেতে ইচ্ছে করছে না তো আমি কি করবো। আপনি খাবেন তার পরে যাব আপনাকে খেতেই হবে ইচ্ছা না করলেও খেতে হবে ইচ্ছা করলেও খেতে হবে "
কিরিস —" হুম,, তাহলে ঠিক আছে খাওয়ায়ে দাও, "
কিরিসের এমন ঠান্ডা কথা শুনে লিসি গায়ের ভিতরে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল,
—" আপনার হাত নেই নাকি, না আল্লাহ আপনার হাত দেয় নি "
কিরিস —" হুম দেছে তো দেখো "
কিরিস লিসিকে তার হাত দেখালে দেখে ব্যান্ডেজ করা একটু আগের ঘটনাটা হঠাৎ করে মনে পড়ে যায় ঠিক কি অবস্থায় দেখেছিল সে কিরিস কে,,সবকিছু জেনেও হঠাৎ এমন কথা বলাই নিজের কাছে লজ্জা লাগছে লিসির,
পরিস্থিতির সামাল দিতে দ্রুত বলে ওঠে —" আপনার না হয় হাত কেটেছে, তাহলে চামচ দিয়ে খেয়ে নিন, আপনি তো আবার চামচ দিয়ে খান এই নিন আমি চামচ ও নিয়ে এসেছি, "
লিসি যখন চামচ এগিয়ে দিতে গেল, কিরিস হালকা গম্ভীর সুরে থামিয়ে দিলো—
—"বললাম না, খাবো না। যদি খাওয়াতে পারো তাহলে খাবো... আর চামচ ধরলে ব্যথা পাবো হাতে।"
লিসি বিরক্ত হয়ে নিশ্বাস ছাড়লো।
—"বড় অদ্ভুত মানুষ তো আপনি... আমি চাচ্ছি আপনার কাছ থেকে দ্রুত সরে যেতে, আর আপনি উল্টে আরও বেশি করে টানছেন।"
কিরিস ভ্রু তুলে মৃদু হেসে বলল—
—"সত্যিই আমি করছি কউ...?"
তার এই হালকা মজার ভঙ্গি লিসিকে আরও অস্থির করে তুলল। সে আর কথা বাড়ায় না। কে জানে, যা-ই বলুক না কেন, শেষমেশ কিরিস তার হাত থেকেই খাবে—এটা যেন একপ্রকার নিয়ম হয়ে গেছে।
রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে প্লেটটা হাতে তুলে নিলো লিসি। তার ভেতরের অস্বস্তি, বিরক্তি যেন খাবারের উপর ঝড়ে পড়ছে। মাংসের টুকরো কেটে ভাতের সঙ্গে মেশানোর ভঙ্গিটা এতটাই রূঢ়, মনে হচ্ছে সমস্ত রাগ সেই ভাতেই ঢেলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে কিরিসের চোখে কেবল খেলা করছে একধরনের শান্ত হাসি। যেন এই মুহূর্তটা উপভোগ করছে সে—লিসির বিরক্তি, রাগ, বাধ্যতা সবকিছুকে একসাথে।
লিসি প্রথম কণা ভাত কিরিসের দিকে এগিয়ে দিলো। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই—একদম যান্ত্রিক ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে যেন।
কিরিস কোনো কথা বললো না। শুধু স্থির হয়ে চোখ নামিয়ে খাবারটা নিলো আর ধীরস্থিরভাবে খেতে শুরু করল।
লিসির ভেতরে তখনও রাগ ফুটছে, অথচ বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
কিরিস চুপচাপ ভাত মুখে নেয়, কিন্তু চেষ্টা করে যেন বাচ্চাদের মতো না খেতে।
লিসি বুঝতে পারে, তাই আবার আরও একটুকরো ভাত তুলে ধরে, এবার একদম জোর করে মুখের দিকে নেয়।
কিরিস অচেতনভাবে কিছু বলতে চায় না। কিন্তু লিসির যত্ন আর দৃঢ়তা তাকে ধীরে ধীরে ভেতরে তৃপ্তি দেয়।
হালকা ঝড়ের শব্দ, জানালার নীল আলো, রক্তের দাগ—সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে দুজনের মধ্যেকার অদ্ভুত নীরবতা, তীব্রতা এবং যত্ন একসাথে ফুটে উঠছে।
লিসি আবার ভাত তুলে দেয়, এবার কিরিস চুপচাপ খেতে শুরু করে।
হঠাৎ মনে হয়—সে আসলে লাজুকভাবে সন্তুষ্ট হচ্ছে, যদিও মুখে কিছু দেখাচ্ছে না।খাওয়ানো শেষ
লিসি তাড়াহুড়ো করে ট্রেটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগোতেই হঠাৎ পিছন থেকে কিরিসের গম্ভীর কণ্ঠ কেটে গেল নীরবতা—
—"থামো।"
পা হঠাৎ থেমে গেল লিসির। বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় মেরে উঠল, যেন শ্বাস আটকে আসছে। ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখে কিরিস অর্ধেক হেলান দিয়ে বসে আছে, চোখদুটো তার দিকে স্থির হয়ে আছে। সেই দৃষ্টি ভারী, গাঢ়, যেন ভেদ করে ফেলছে তার বুকের ভেতর।
কিরিস মৃদু সুরে বলল—
—"এমন করে পালাচ্ছো কেন?"
লিসি ঠোঁট কামড়ে কষ্টেসৃষ্টে নিজেকে সামলে নিল।
—"পালাচ্ছি না... আমি কাজ শেষ করেছি। এখন যাই।"
কিরিস ঠোঁটের কোনায় এক টুকরো ব্যঙ্গমিশ্রিত হাসি ফুটিয়ে বলল—
—"মিথ্যে বলছো। তোমার চোখে ভয় লেখা আছে। ভেবেছো আমি কিছু করবো তোমায়?"
লিসি গলা শুকিয়ে গেলেও কণ্ঠে জোর আনার চেষ্টা করল—
—"আমি কেন ভয় পাবো? আপনি তো আমার বড়..."
কিরিস এবার সামান্য সামনে ঝুঁকল, গলার স্বর নীচু করে আরও তীক্ষ্ণভাবে বলল—
—"হুম্... কিন্তু ভুলে যেও না, বড়রা মাঝে মাঝে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।"
এক মুহূর্তে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। লিসির শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল, বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে চোখ নামিয়ে নিল, যেন কোনোভাবেই সেই দৃষ্টিটা সহ্য করতে পারছে না।
হঠাৎ কিরিসের কণ্ঠস্বর বদলে গেল—গভীর থেকে একেবারে নরম হয়ে এলো।
—"ভয় পেয়ো না, লিসি... আমি কাউকে আঘাত করতে চাই না। অন্তত তোমাকে তো একেবারেই না।"
শেষ কথাগুলো বিদ্যুতের মতো আঘাত করল লিসির মনে। এক শিহরণ বয়ে গেল শরীরের ভেতর দিয়ে। সে কোনো উত্তর দিল না, শুধু ব্যস্তভাবে ট্রে তে জিনিসগুলো সাজাতে থাকে যেন সে পালাতে চায়।
কিরিস আর কিছু বলল না। শুধু সেই চোখদুটো রেখে দিল তার পেছনে—অদ্ভুত এক দৃষ্টি, যার ভেতরে ভয়ও আছে, আবার এমন এক টানও আছে যা অস্বীকার করা যায় না।
ঝড়ের হাওয়া বাইরে তীব্র, জানালার কাঁচ বারবার কেঁপে উঠছে।
কিরিস বিছানায় বসে, কিন্তু চোখ সবসময় লিসির দিকে। খাবার খাওয়ানো শেষ হতেই লিসি ট্রে তুলে দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
ঠিক তখনই—
কিরিস হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যায়, এক ঝটকাই হাতে থাকা ট্রেটা কেড়ে নেয় পাশে টেবিলে রেখে দেয় আর এক হাত দিয়ে লিসিকে হ্যাচকা টান মেরে দরজার কাছে দেয়ালে চেপে ধরে লিসিকে।
দু’হাত দু’পাশে রেখে পুরো শরীর দিয়ে দেয়াল ঘিরে ফেলে তাকে।
কিরিস (গভীর, খুনসুটি ভরা স্বরে) —
"লিসি শার্মা… এত রাতে বয়ফ্রেন্ডকে খাওয়াতে এসেছো? ডিনার তো করালে… কিন্তু মিষ্টিটা বাদ দিলে কেন? একটা দেবে না?"
তার কণ্ঠে মিশে আছে দাপট, মজা আর অদ্ভুত এক নেশা।
লিসি (লজ্জায় কাঁপা কণ্ঠে) —
"কি… কি বলছেন আপনি? ছাড়ুন আমাকে…"
সে দরজার হ্যান্ডেল ধরতে চায়, কিন্তু কিরিস কাছে আরও ঝুঁকে আসে।
মুখ থেকে গরম নিশ্বাস লিসির গালে লাগছে। লিসির বুক ধুকপুক করছে, মাথা ঘুরে যাচ্ছে লজ্জায়।
কিরিস (ফিসফিসিয়ে, একদম মুখের কাছে) —
"শুধু একবার… আমি চাচ্ছি। তোমার থেকে।"
কিরিসের কথায় লিসি বারবার বিরক্তি আর ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল। সে চাচ্ছিল, কোনোভাবে এখান থেকে পালিয়ে যাক—এইসব ভেজাল কথার চাপ থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু কিরিস তো কোনো সাধারণ মানুষ নয়, ছারার মতো নয়। লিসি যতই নড়াচড়া করছে কিরিস ততই ঘেঁসে তার দিকে এগোচ্ছে, তার দৃষ্টি, তার উপস্থিতি—সবকিছু যেন লিসির ভেতরে ভয় আর লজ্জার ঢেউ তোলে।
নিজেকে ছাড়া দেওয়ার সব চেষ্টা যখন ব্যর্থ হলো, তখন লিসি চোখ বন্ধ করে গভীর নিশ্বাস নিল। জীবনে প্রথম সে এমন কিছু করতে যাচ্ছে—ভয়, লজ্জা, এবং অজানা উত্তেজনা একসঙ্গে শ্বাস নেওয়াটাকেও কষ্টকর করে তুলেছে।
ভিতরে সমুদ্রের মতো উত্থান-পতন করছে তার অনুভূতি, কিন্তু লিসি চেষ্টা করল সামলে রাখতে। লাজুক চোখে সে কিরিসের দিকে তাকাল। মনে মনে জানে—যদি সে এই মুহূর্তে হাল ছাড়ে, কমের উপর দিয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে।কিন্তু কিরিস যদি একেবার কাছে আসে, তাহলে তার মান–সম্মান কি অক্ষুণ্ণ থাকবে?
এটি একটি মেয়ের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—সম্মান। আর সেটি কেউ হারাতে চায় না, বিশেষ করে লিসির মতো এক রক্ষণশীল, লাজুক মেয়ের জন্য। নিজে নিজে সান্ত্বনা দেয় লিসি, ভিতরে তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে
লিসি চোখ বন্ধ করে ফেলে। মনে হয় হার মেনে যাবে—
কিন্তু হঠাৎ ভেতরের সাহস জাগে।
লিসি (চোখ নামিয়ে, লাজুক দৃঢ়তায়) —
"চোখ বন্ধ করুন…"
কিরিস অবাক হয়ে তাকায়, তারপর হালকা মুচকি হেসে চোখ বন্ধ করে।
সেই মুহূর্তে লিসি দ্রুত মুখটা এগিয়ে দিয়ে একটা ছোট্ট, উষ্ণ কিস দেয় গালে—