তোমাকে চাই

 নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :২৪


ইয়াবি বাঁধা হাত ধরে রাখলো।

আর ইশান—ডাক্তার হওয়ার সুবিধা নিয়ে—কিরিসের বুকের উপর চাপা পা রেখে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে পড়লো।


তাদের সবার শরীরে আতঙ্ক আর রোমাঞ্চ একসাথে কাজ করছে।

কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে—

কিরিস একবার ছুটে উঠলে কারো রক্ষা নেই।

তাই যা করার এখনই করতে হবে।

ঘরটা নিস্তব্ধ, বাতাস ভারী।

সিগারেটের আধপোড়া টুকরো থেকে ধোঁয়া উঠছে, আর সেই ধোঁয়ার ভেতর চার ভাইয়ের নিঃশ্বাস মিলেমিশে এক অদ্ভুত থ্রিলার মুহূর্ত তৈরি করছে।

তাদের লক্ষ্য একটাই—

কিরিসের গলার খামছানোটা দেখা।

ছেলেরা নিজেদের কাজে ডুবে আছে। নিচে বসে মেয়েরা গল্পে মেতে উঠেছে। হঠাৎ সুরভী ফিসফিসিয়ে বলে—

—"এই চল না, দেখে আসি ওরা কি করছে!"

তিশা সঙ্গে সঙ্গেই রাজি,

—"হুম, চল।"

এদিকে রান্নাঘরে সুপ রেডি। এক বাটি সুপ হাতে নিয়ে সুপ্রিয়া ঢুকতেই দেখে, প্রিয়া কাটাকুটি করছে। সুপ্রিয়া এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেল যেন মনে হচ্ছে বাটি বাড়িয়ে দিয়ে আরবীর হাতে দিতে চাচ্ছে।

আরবী বুঝে ফেলেই হাসতে হাসতে বলে—

—"আমার দিকে এভাবে তাকিও না, আমি কিন্তু নিতে পারছি না। আর তাছাড়া ঘরে তো নতুন বউ এসেছে, তাকে বলো না!"

নুসরাত সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে—

—"সেটা ঠিক, কিন্তু তোকে বলেছে, তাই তোকে যেতেই হবে।"

সুপ্রিয়া একটু বিরক্ত স্বরে—

—"আহ! আমি কি কিছু বলেছি? এমনিতেই মনটা ভালো নেই। কেন যে অযথা প্যাঁচাল করতে গেলাম! যাই হোক, ও যা রাগ করেছে তা আমি জানি আজ দুপুরে খাবার খেতে নামবে না। সুপটা দিয়ে আয়, সন্ধ্যা ছাড়া তো নিচে নামছেই না।"

আরবী দুষ্টু হেসে বলে—

—"তাহলে কিরিসের সরকারি চাকরকে বলো না!"

সবাই একসঙ্গে থমকে যায়। কোনো বাড়িতে দুই-তিনজন চাকর থাকলেও কিরিসের ঘরের ধারে-কাছেও তারা ভিড়তে সাহস পায় না। সেখানে আরবীর এ কথা শুনে সবাই অবাক!

সুরভী চোখ বড় করে—

—"কে সে?"

আরবী চোখ টিপে বলে—

—"আমাদের সোনা-মনির হীরা লিসি!"

ঠিক তখনই লিসি বসে নিরিবিলি পানি খাচ্ছিল। হঠাৎ কথা শুনে তার মুখ-নাক দিয়ে পানি প্রায় বেরিয়ে আসার উপক্রম! তাড়াহুড়া করে সামনে হাত দিয়ে সামলে নিয়ে বলে—

—"আমি কেন? আমি তো কিছু বলিনি! আমায় কি চাকর মনে হয় নাকি?"

আরবী নির্লজ্জ ভঙ্গিতে বলে—

—"চাকর বলেছি নাকি? আমি তো বলেছি, তুই ভাইয়ার পার্সোনাল চাকর!"

সুরভী গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ে—

—"সত্যি বলতে, আমারও মনে হয় লিসি গেলে কিরিস কিছু বলবে না।"

লিসি রাগে-লজ্জায়—

—"কেনো? আমি মানুষ না নাকি!"

জারা একদম সোজাসাপ্টা—

—"না।"

লিসি চমকে ওঠে—

—"কি?"

আরবী হাসতে হাসতে যোগ করে—

—"কারণ, you তো হুরপরী!"

এত কিছুর পর সবাই মিলে জোর করে লিসির হাতেই সুপের বাটি তুলে দেয়। বেচারি লিসি কিছু বলতেও পারছে না, কিছু করতেও পারছে না!

মেয়েরা ধীরে ধীরে উপরে ওঠে। নিচে আনোয়ার-আনারুল নিজেদের মধ্যে গল্পে ব্যস্ত।

আনোয়ার—"এই তূর্যকে তো দেখছি না!"

আনারুল—"ছিলো, কিন্তু কালকে হঠাৎ ইমার্জেন্সি ফোন আসায় চলে গেলো। থাকতে চেয়েছিল অনেকদিন, কিন্তু হলো না।"

উপরে গিয়ে মেয়েরা দেখে, কিরিসের দরজার সামনে বাড়ির কাজের লোক কমলা দাঁড়িয়ে হা করে তাকিয়ে আছে। ওদের দেখে তাড়াহুড়া করে সরে গিয়ে গজগজ করতে করতে বলে—

—"ও মা গো! তোমাদের বাড়ির ছেলেদের লক্ষণ কিন্তু ভালো না!"

বলে গটগট করে নেমে যায়।

ওরা এগিয়ে দেখে ভেতরে ইশান, অনেক কষ্টের পর কিরিসের গলায় হাত দিয়েছে, যেন কিছু বের করতে যাচ্ছে। হঠাৎ মেয়েরা দৃশ্যটা দেখে চিৎকার করে ওঠে!

চিৎকার শুনে ইশান হতভম্ব হয়ে যায়—

—"আহ! কেরে?"

সুরভী রাগে—

—"এই, তোরা কি সব করছিস?"

তিশা—"এসব কি কাবির?"

ইয়াবি গম্ভীর হয়ে বলে—

—"Ladies, তোমরা যেটা ভাবছো সেটা কিন্তু একদমই না!"

ওর কথা শুনে আরবী ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—

—"উমম! মনে হচ্ছে নিশিদা পাতা নিমপাতাকে বলছে—আমি কি তিতা!"

জারা ঠাট্টা করে—

—"আমাদের চোখ নেই নাকি!"

আরবী ব্যঙ্গ করে বলে—

—"আমার তো এবার সন্দেহ হচ্ছে, তোরা আদৌ ছেলে তো?"

ওর কথায় রিহান তাড়াতাড়ি জবাব দেয়—

—"ওটা না হয় তোর বোনের কাছে জিজ্ঞেস করিস!"

সুরভী —"আজ বুঝলাম তোরা ৫ টা একসাথে থাকিস কেন "

এতক্ষণ ধরে সব শুনতে থাকা কিরিস হঠাৎ বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠলো—

—"Just stop, "

এক ঝটকায় সামনে থাকা সবকিছু ঝারা মেরে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

তারপর সামনের ডিভানটাকে ভয়ঙ্কর এক লাথি মেরে সরিয়ে দেয়।

ঘরের বাতাস যেন জমে যায়।

কিরিসকে এমন করে রেগে যেতে দেখে সবার গলার পানি শুকিয়ে যায়।

কে যেন হাহাকার করে বলে ওঠে—

—"ও বাবা গো পালা!"

এক মুহূর্তও দেরি না করে যে যার মতো দৌড় দিয়ে সরে পড়ে, ধাক্কাধাক্কিতে চারদিক এলোমেলো।

কারণ সবাই জানে, এখন যদি তারা কিরিসের সামনে দাঁড়ায় তাহলে তাদের কপালে ভীষণ দুঃখ আছে।

হাজার চেষ্টা করেও লিসি কিন্তু নড়তে পারছে না।

তার হাতে ধরা ট্রেতে রাখা ধোঁয়া ওঠা গরম সুপ।

একটুও নড়লেই নিজেই পুড়ে যাবে।

দরজার সামনে ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে থাকা লিসিকে দেখে কিরিস ভুরু কুঁচকে উচ্চস্বরে বলে—

—"What… কি করতে দাঁড়িয়ে আছো?"

থতমত খাওয়া লিসি কাঁপা কণ্ঠে—

—"চুপ… না, সুপ দিতে… "

কিরিস ঠাণ্ডা গলায়—

—"খাবো না।"

লিসি—

—"আপনাকে খেতে বলেছে।"

কিরিস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ স্বর নিচু করে বলে—

—"শোনো… এদিকে আসো।"

লিসি একটু ভয় পেয়ে—

—"কেনো?"

কিরিস চোখ সরিয়ে কথাটা ঘুরিয়ে নেয়—

—"না, আসলে… সুপটা দেবে কিভাবে?"

লিসি ঠোঁট কামড়ে ভাবে, কথাটা ঠিকই বলেছে।

—"তা ঠিক… দাঁড়ান, আসছি।"

লিসি ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ ধাপ! শব্দ করে দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

পেছনে তাকিয়ে দেখে, ইয়াবি বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।

এ দৃশ্য দেখে লিসির চোখ ভয়ে বড় হয়ে যায়, হাতের ট্রেটা যেন ভারে ৫৬ ইঞ্চি হয়ে গেছে।

ধোঁয়া ওঠা সুপের গন্ধে মিশে যায় আতঙ্কের ঘ্রাণ।

বাঁকা দৃষ্টিতে কিরিসের দিকে তাকায় সে।

অপরদিকে কিরিস একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শুধু তার দিকে।

ভয়ঙ্কর নীরবতা ভেঙে কিরিস ধীর স্বরে বলে—

—"সুপটা পাশে রেখে হাত খোলো।"

লিসি ওদিকে মন না দিয়ে কাঁপা গলায়—

—"আহ… দরজা খুলো।"

কিরিস এবার গর্জন করে ওঠে—

—"চুপ! যা বলছি তা না করে ছাগলের মতো ম্যা ম্যা করছো কেনো?"

লিসির চোখ কপালে—

—"কি… আমি ছাগল?"

কিরিস দাঁত চেপে—

—"আমি বলেছি আগে খুলো, নাহলে দেখে নিও আমি কি করি।"

লিসি—

—"মানে…"

কিরিস চোখ বড় বড় করে তাকাতেই লিসির বুক ধড়ফড় করতে থাকে।

সে কিছু না বলে এক পা এগিয়ে আসে।

কিরিসের বাঁধা হাত খুলতে খুলতে কাঁপা স্বরে বলে—

—"একটা বলবো আপনার…"

কিরিস মৃদু স্বরে—

—"হুম…"

লিসি দ্বিধায় গলা নামিয়ে আনে—

—"রাগ করবে না তো?"

কিরিস চোখ স্থির রেখে—

—"না সোনা, রাগ করবো না।"

কথাটা শুনে লিসির বুক ধক করে ওঠে।

লজ্জায় কাঁপা ঠোঁটে বলে—

—"কি সব বলছেন… সে যাই হোক… আপনি কি সত্যি ছেলে?"

কিরিস ভুরু কুঁচকে চোখ গাঢ় করে তোলে—

—"কেনো?"

লিসি দ্বিধায় মাথা নিচু করে—

—"না মানে… ওই এখন যা দেখলাম…"

এক মুহূর্ত নীরব থেকে কিরিস হঠাৎ তার বাঁধা হাতটা লিসির গলায় পরিয়ে টেনে আনে নিজের কাছে।

চোখে এক অদ্ভুত নেশা, কণ্ঠে কাঁপন—

—"কেন? প্রমাণ করতে হবে নাকি?

চলো, ঠিক আছে… আমি এখনই প্রমাণ করছি আমি ছেলে নাকি অন্য কিছু… তাও আবার practical ভাবে।

তো, তৈরি তো?

By the way, আমি করলে কিন্তু উঠে দাঁড়াতে পারবে না…

তাহলে চলো শুরু করি— আমার জামা খোলো।"

কিরিসের এমন লাগামহীন কথাগুলো শুনে লিসির গাল টমেটোর মতো লাল হয়ে যায়।

মনে হয় কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

লিসি ভয়ে-লজ্জায় হাঁপাতে হাঁপাতে—

—"আহ, কি করছেন! আমায় ছাড়ুন… আহ…"

কিরিস মুচকি হেসে ফিসফিস করে—

—"সত্যি বলতে সব দোষ তোমার। তুমি আমার গলায় না খামছালে এইসব হতো না।"

বলে কিরিস আরও কাছে আসতেই লিসি তড়িঘড়ি বলে ওঠে—

—"আহ, এমন করবেন না! আমি মানি… মানি আপনি একজন ছেলে।

আর সব দোষ আমার… কিন্তু প্লিজ আমায় ছাড়ুন!"

কিরিস চোখ সরু করে—

—"আহ, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তুমি আগে হাত খোলো।"

লিসি দ্বিধা নিয়ে—

—"মানে…"

কিরিস ঠোঁট বাঁকায়—

—"আরে, কিছু করছি না। হাত খোলো। দাড়াও… তার মানে তুমি চাইছো…"

লিসির বুক কেঁপে ওঠে।

—"আহ না না না, কখনো না! আমি খুলে দিচ্ছি…"

কিরিস লিসির গলার ফিতা থেকে হাত ছাড়াতে গিয়েই আটকে যায়। গিঁটের টানে মুহূর্তেই তার মুখ এসে থেমে যায় লিসির গলার একেবারে কাছে।

গরম নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যায় লিসির কোমল গলা, কেঁপে ওঠে সারা শরীর।

লিসির ঠোঁট কাঁপতে থাকে, চোখে ভয় মেশানো অদ্ভুত আলো।

কিরিস হাত বের করে নিয়ে হঠাৎ গভীর গলায় বলে—

কিরিস — "তোমার গলা এত মোটা কেনো?"

লিসি হতভম্ব হয়ে যায়, তারপর লজ্জায়-ক্ষোভে গলা কাঁপিয়ে বলে—

লিসি — "কি… এটা আপনি বললেন? আপনি জানেন এই গলার জন্য কতজন দেওয়ানা?"

কিরিসের চোখ মুহূর্তেই ধারালো হয়ে ওঠে। ভেতরে যেন আগুন জ্বলে উঠলো।

কিরিস — "না… আমার জানা লাগবে না। তবে শোনো, একবার আমি যদি কোনো কিছুর দেওয়ানা হই, তার দেওয়ানা আর কেউ হতে পারবে না। আমি হতে দেবো না।"

লিসির বুক ধক ধক করে ওঠে। চোখে অবুঝ আতঙ্ক—এ মানুষটা কেমন কথা বলছে!

হঠাৎ কিরিস একটু ঝুঁকে ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে বলে—

কিরিস — "চলো আমিও তোমার ঘাড়ে একবার খামচে দিই, যেমনটা তুমি দিয়েছিলে।"

লিসি — "আহ না… কি সব বলছেন?"

কিরিস — "চুপ… এবার তুমি দেখো কেমন লাগে।"

এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে কিরিস তার হাত শক্ত করে ধরে টেনে বের করে আনে ঘরের বাইরে। দরজা ঠাস করে বন্ধ।

লিসি স্তব্ধ হয়ে হা করে তাকিয়ে থাকে।

লিসি (নিজের মনে) — "এই মানুষটার মাথার তার একেবারেই ছেঁড়া…"

হঠাৎ পিছন থেকে গম্ভীর আওয়াজ—

ইয়াবি — "এই!"

লিসি চমকে ঘুরে দাঁড়ায়—

লিসি — "আহ! আমি তো ভেবেছিলাম ভূত নাকি…"

ইয়াবি ভুরু নাচিয়ে দুষ্টু হাসি দেয়—

ইয়াবি — "কিরিসের সাথে একা একা কি করছিলে বলো তো?"

লিসি লজ্জায় গলা শুকিয়ে আসে—

লিসি — "ছি… কিসব বলেন! আমি কিছু করি নাই। সরুন, আমি নিচে যাচ্ছি।"

ইয়াবি হাত গুটিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে যায়, হাসতে হাসতে বলে—

ইয়াবি — "না না, এখন ছাড়বো না। দুনিয়ার সাহস! কিরিসের গলায় খামচেছিস? ওরে বাবা, তুই তো দারুন সাহসী মেয়ে!"

লিসির চোখ গোল হয়ে যায়, ঠোঁট কাঁপে।

লিসি — "কি? কে বললো? আমি… আমি তো কিছু করিনি!"

ইয়াবি আবার মুচকি হেসে গোপন স্বরে বলে—

ইয়াবি — "হুম, যাক… এখনো লুকাচ্ছিস। কিন্তু মনে রাখিস, কিরিসকে খামচে দিয়ে কেউ বেঁচে যায় না… হয়তো তুই-ই প্রথম!"

লিসি ভয়ে-লজ্জায় একদম দিশাহারা হয়ে যায়।

লিসি — "আহ, যা পারেন করেন… আমাকে এখন যেতে দিন।"

ইয়াবি হেসেই যায়, যেন মজা পেয়ে গিয়েছে।ইয়াবি লিসির চলে যাওয়া পর্যন্ত গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কিছুটা সময় থেমে থেকে ধীর পায়ে কিরিসের রুমের দিকে এগিয়ে যায়।

কিরিস তখন স্যুটের বোতাম গুঁজছিলো, আয়নায় নিজের টাই ঠিক করতে করতে ইয়াবিকে আসতে দেখে থেমে তাকালো।

ইয়াবি — "ওভাবে তাকাস না,,"

কিরিস (ভ্রু তুলে, হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে) — "Really!"

ইয়াবি — "আচ্ছা বল, এই কি সেই তোমার অলকানন্দা? … আর এইসব কবে থেকে হলো?"

কিরিস (চোখ নামিয়ে, ধীরে মাথা নাড়ে) — "হুম…"

দু’জনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ নীরব অথচ গভীর আলাপ চললো। কথা শেষ করে ইয়াবি নিচে নেমে আসে, আর কিরিস অফিসের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

নিচে নেমেই ইয়াবি দেখে ইশান আগেই পুরো তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াবির শুধু ব্যাগটা হাতে নেওয়া বাকি।

ইয়াবি — "তিশা, ব্যাগটা এনে দে… আর তোরা সবাই দ্রুত চলে আসবি, বিকেলে।"

তিশা ব্যাগটা এগিয়ে দেয়। সবাইকে বিদায় জানিয়ে ইয়াবি বেরিয়ে যায়।

একটু আগেও যেই বাড়ি হাসি-ঠাট্টায় জমজমাট ছিল, হঠাৎ করেই আবার স্বাভাবিক নিস্তব্ধতায় ভরে ওঠে।

আনোয়ার, আনারুল, রিহান, কাবির সকালের হালকা নাস্তা শেষ করে একে একে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

কিরিস সুপের বাটিটা প্রায় জোর করে শেষ করে নেয়, তারপর গাড়ির চাবি হাতে বেরিয়ে পড়ে। এতদিন জমে থাকা কাজ সে সামলালেও আরও অনেক দায়িত্ব তার অপেক্ষায়।

এদিকে বাড়ির ভেতর মেয়েরা কাজে ব্যস্ত। সুপ্রিয়ার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সংসারের বড় বউমা হওয়া মানে দিনের পর দিন এক পাহাড় সমান দায়িত্ব বয়ে বেড়ানো।

প্রিয়াও কোনো অংশে কম নয়, সুপ্রিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে কাজ সামলে শরীর ভেঙে পড়েছে তারও।

সুপ্রিয়া (হালকা ক্লান্ত স্বরে) — "নুসরাত, মা একটা কাজ করো… আজ তুমি রান্না করো। কোনো সাহায্য দরকার হলে লিসিকে নিয়ে নিও।"

প্রিয়া — "হ্যাঁ, লিসি ভালো রান্না করতে পারে।"

লিসি (নরম গলায়) — "ঠিক আছে মামি। আর নুসরাত আপু, চলো…"

আরোবি (চোখ টিপে হাসতে হাসতে) — "এই নতুন বউমা আমাদের জন্য এক কাপ চা বানিয়ে দাও না!"

নুসরাত (হালকা খুনসুটির ভঙ্গিতে) — "যা আদেশ করবেন ননদী মহাশয়…"

নুসরাতের উত্তর শুনে সবাই একসাথে হেসে ওঠে।

তিশা — "এই চল, আমি চা বানিয়ে দিচ্ছি। নুসরাত তুমি দুপুরের রান্নার জন্য সব গুছিয়ে নাও।"

জারা (ভ্রু কুঁচকে, নাটকীয় ভঙ্গিতে) — "My God! এই না হলে তিশা— এখনো বউ হতে না হতেই পুরো বউয়ের কাজ করে ফেলছে!"

সবাই আবার হেসে ফেলে।

এই হাসির মাঝেই মির্জা বেগম ধীরে ধীরে এসে বসে পড়েন। তার মুখে শান্ত অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ হাসি।

মির্জা বেগম — "নুসরাত শোনো, রান্না শুরুর আগে আগে গোসল করে নিও। আর লিসি, তুই নুসরাতকে সাহায্য করিস।"

মির্জা বেগমের কথায় নুসরাত মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে নিজের ঘরে চলে যায় গোসলের প্রস্তুতিতে। আর লিসি ও তিশা সরাসরি রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়।

লিসি শাকসবজি কাটতে বসে যায়, তিশা তখন চায়ের ট্রে গুছিয়ে সবার জন্য চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

রান্নাঘরের ভেতর এক অদ্ভুত উষ্ণতা। বড় টেবিলে শাকসবজি, মশলার ডিব্বা, আর বাসনের শব্দে পুরো জায়গাটা যেন অন্যরকম প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

লিসি সযত্নে সবজি কাটছে, তার আঙুলের নড়াচড়া দেখে মনে হয় সে কাজটা অনেক যত্ন নিয়েই করছে। অন্যদিকে তিশা কেতলিতে দুধ ঢেলে চায়ের পাতি দিচ্ছে, মুখে হালকা গুনগুন।

তিশা — "এই লিসি, তোমার হাত দেখে মনে হয় তুমি নিয়মিত রান্না করো।"

লিসি (হেসে) — "না, নিয়মিত না… তবে শিখে রাখতেই হয়। নানু সবসময় বলে, মেয়ে হয়ে জন্মালে রান্না না জানলে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।"

এমন সময় গোসল সেরে নুসরাত রান্নাঘরে এসে দাঁড়ালো। ভেজা চুল গুছিয়ে আঁচলে মুছতে মুছতে সে লিসির পাশে বসল।

নুসরাত — "চল, এখন দুজনে মিলে করি। এভাবে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে।"

দুজনে একসাথে রান্না শুরু করতেই রান্নাঘরের বাতাস যেন আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। লিসি মশলার হাঁড়ি থেকে গরম গরম ফোড়ন দিচ্ছে, নুসরাত তার পাশে দাঁড়িয়ে ডাল নেড়ে দিচ্ছে।

ওপাশে তিশা চা বানাতে ব্যস্ত। ট্রেতে সাজানো কাপগুলোতে ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে।

তিশা (মুখ বাঁকিয়ে) — "হায় আল্লাহ! এই রান্নাঘরের গরমে আমি একেবারে ভেজা বেড়ালের মতো হয়ে যাচ্ছি।"

লিসি (হেসে) — "তুই না থাকলে কি করতাম আমরা?"

তিশা — "হুম, সেটা বুঝবি একদিন।"

চা প্রস্তুত হয়ে গেলে তিশা কাপগুলো ট্রেতে সাজিয়ে বাইরে নিয়ে যায়। বসার ঘরে সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছিলো।

চা নিয়ে যেতেই আবার শুরু হলো খুনসুটি।

আরোবি (চায়ের কাপ হাতে তুলে) — "আহা! এই চায়ের স্বাদে প্রেম আছে।"

জারা (ঠোঁট বাঁকিয়ে) — "শুধু প্রেম না, এর মধ্যে তিশার বউ হওয়ার practice আছে।"

সবাই হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। তিশা লজ্জায় মাথা নিচু করলেও মুখে চাপা হাসি লুকাতে পারলো না।

এদিকে রান্নাঘরে লিসি-নুসরাতের teamwork দেখে প্রিয়া আর সুপ্রিয়া খুব খুশি।

প্রিয়া (দূর থেকে তাকিয়ে) — "দেখো, কেমন মিলে-মিশে করছে।"

সুপ্রিয়া (হালকা ক্লান্ত হাসি দিয়ে) — "হুম, সত্যি বলতে কি… নতুনদের মধ্যেও অনেক দায়িত্ববোধ আছে।"

রান্নার সুগন্ধে পুরো বাড়ি ভরে উঠলো। দুপুরের আয়োজন জমকালো হবে—এটা সবাই বুঝতে পারছিলো।

 অফিসের কাজ শেষে সবাই বাড়ি আসলো শুধু কিরিস বাদে। দুপুরের ঠিক আগে বাড়িটা আবার জমে উঠলো। রান্নাঘর থেকে আসা সুগন্ধে যেন সবাই ক্ষুধার্ত হয়ে উঠছে। একে একে সবাই ডাইনিং হলে জড়ো হলো। লম্বা টেবিলে সাদা ঝকঝকে টেবিলক্লথ, মাঝখানে ফুলদানিতে টাটকা ফুল সাজানো, চারদিকে রুপালি কাঁটাচামচ আর ঝকমকে বাসনপত্র।

লিসি আর নুসরাত হাঁড়ি থেকে ভাত তুলে গরম ধোঁয়া উঠা ডিশে রাখছে, সাথে মাংস, ভাজি আর ডাল সাজিয়ে রাখছে। দুজনের চোখেমুখে কাজের ক্লান্তি থাকলেও ভেতরে একটা তৃপ্তি।

সুপ্রিয়া (চেয়ারে বসে হাসি দিয়ে) — "ওরে বাবা, আজকের দুপুরের আয়োজনে যেন বিয়েবাড়ির মতো গন্ধ পাচ্ছি!"

প্রিয়া (ভ্রু তুলে লিসিকে দেখে) — "তুই সত্যি খুব ভালো রান্না করিস মা… আর নুসরাত তো আগেই রান্নায় নামকরা।"

সবাই একসাথে বসে পড়লো। তিশা একে একে পানির গ্লাস বিলিয়ে দিলো।

আরোবি (চামচ হাতে তুলে) — "চলো তবে, আজকের রান্নার কৃতিত্ব আমাদের দুই রাঁধুনীর—নুসরাত আর লিসির নামে যাক।"

জারা (হাসতে হাসতে) — "না না, আগে তুই খেয়ে দেখিস, যদি নুন কম হয় তাহলে কৃতিত্ব উল্টো হবে।"

সবাই হেসে উঠলো। খাবার মুখে দিতেই সবার মুখে প্রশংসা ফুটে উঠলো।

কাবির(মুখ ভরে খেতে খেতে) — "মজাই লাগছে! এতোদিন পর বাসায় এসে মনে হলো আসলেই পরিবারের রান্না খাচ্ছি।"

রিহান — "হ্যাঁ, একেবারে perfect balance!"

এই হাসি-ঠাট্টার মাঝেই দরজার বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেলো। সবাই অবাক হয়ে তাকালো।

কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো কিরিস। অফিসে যাবার জন্য বের হলেও হঠাৎ একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং বাতিল হয়ে যাওয়ায় সে ফিরে এসেছে।

কালো স্যুটে রোদে হালকা ঝিলিক, চোখে সানগ্লাস নামিয়ে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই পুরো ডাইনিং হল যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।

তার সেই রাজসিক উপস্থিতি মুহূর্তেই পরিবেশকে অন্যরকম গম্ভীর করে দিলো।

সুপ্রিয়া (চমকে উঠে) — "এই যে, তুমি তো অফিসে গেলে না?"

কিরিস (গম্ভীর ভঙ্গিতে, চেয়ার টেনে বসে) — "মিটিং ক্যানসেল হয়েছে। "

সুপ্রিয়া—" তাহলে খেতে আয়, আজ লিসি আর নুসরাত রান্না করেছে,, 

কিরিস কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো যেন কিছু একটা ভেবে নিতে থাকে,, এরপর কি মনে করে এসে বসলো, 

—" যা দিবে অল্প দিবে আর এতো অইলি খাবার আমি খাইনা, "

বলে কিরিস লিসির দিকে তাকায় লিসির চোখ হঠাৎ কিরিসের চোখের সাথে মিশে গেলো। মুহূর্তটা যেন থমকে দাঁড়ালো। লিসি দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে হাঁড়ির ঢাকনা লাগাতে ব্যস্ত হয়ে গেলো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে শিহরণটা স্পষ্ট।

নুসরাত তার সামনে ভাত পরিবেশন করে দিলো।

কিরিস (চোখ না সরিয়ে, শান্ত অথচ গভীর স্বরে) — "আজকের রান্না কে করেছে?"

নুসরাত (হেসে) — "আমরা দুজন—আমি আর লিসি।"

কিরিস চামচ দিয়ে প্রথম কণা মুখে দিলো। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ থাকলো। সবাই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

তারপর ধীরে বলে উঠলো—

কিরিস — "Not bad… "

সবাই হাসলো, কিন্তু লিসির গাল লাল হয়ে উঠলো। তার মনে হলো, কিরিসের এই কথার ভেতরে অন্যরকম ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে।

পুরো দুপুরের খাওয়াটা royal family-এর মতো জমজমাট হয়ে উঠলো—হাসি, ঠাট্টা, প্রশংসা, আর সেই সাথে কিরিসের অদৃশ্য উপস্থিতির প্রভাব যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই বাড়ি যেন একেবারে অলস হয়ে পড়েছে। ছেলেরা— কাবির আর রিহান— যে যার মতো ঘরে বসে আছে। কিরিস তো দুপুরেই জরুরী মিটিংয়ে বেরিয়ে গেছে, ফিরবে গভীর রাতে, সেটাও রাত করে।

অন্যদিকে মেয়েরা আজকে বিকেলে বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও সিদ্ধান্ত পাল্টে গেছে। তারা ঠিক করেছে কাল সকালে যাবে। তাই বিকেলটা একেবারেই আড্ডা আর গল্পে ভরে উঠেছে। যেন একদিনেই সব গল্প শুষে নিতে চায় সবাই।

হঠাৎ সুরভীর মাথায় একটা মজার চিন্তা এলো, আর সে বলে ফেলল—

—"আচ্ছা, তোরা যেহেতু কালকেই যাচ্ছিস একটা কাজ করি না! আজ সবাই মিলে শাড়ি পরি। বিকেলে রোদটাও কমেছে, ছাদে গিয়ে সবাই একসাথে পোজ দিই। কত সুন্দর লাগবে বল!"

সুরভীর কথা শুনে ঘরেই যেন খিলখিল হাসি ফেটে পড়ল।

জারা মুখ কুঁচকে বলল—

—"আমি পরবো না। এই গেঞ্জি খুলতেই ইচ্ছে করছে না আমার।"

আরোবি মজা করে হেসে উঠল—

—"তা হলে ঠিক আছে! আমরা সবাই শাড়ি পরব, তুই শুধু আমাদের সুন্দর করে ফটোশুট করে দিবি।"

জারা ভান করে গম্ভীর হলো, তারপর হেসে মাথা নাড়ল—

—"অবশ্যই, কেন নয়!"

তিশা উচ্ছ্বসিত গলায় বলল—

—"বিশ্বাস কর, সুরভীর আইডিয়াটা দারুণ। আমি নুসরাত থেকে বলছি, তোরা গোছানো শুরু কর।"

হিয়া হেসে উঠে বলল—

—"ঠিক আছে, আমি যাই নানি আর মামিদের ডাকতে।"

লিজা তখন লিসিকে খোঁচা দিল—

—"এই লিসি, চুপচাপ বসে আছিস কেন? আচ্ছা বাদ দে, চল শাড়ি পরে নে।"

লিসি একটু অপ্রস্তুত গলায় বলল—

—"এখন না পরলেই হয় না? মানে...!"

আরোবি চোখ বড় বড় করে উঠল—

—"এই তোর নাটক বন্ধ কর! পড়বি মানে পড়বি।"

লিসি ভান করে ভ্রু কুঁচকালো, তারপর মিষ্টি গলায় বলল—

—"আচ্ছা আচ্ছা, বলার সুযোগই তো দিস না। আমি কি বলেছি আমি পড়বো না? পড়ব, ঠিক আছে।"

লিসির এমন কথায় সবাই হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল।

এদিকে তিশা নুসরাতকেও দলে টেনে নিয়েছে। সবাই শাড়ি পরে আজ একটু সাজগোছ করে ছবি তুলবে বলে ঠিক হলো।

ওদিকে হিয়া মামিদের এই কথা বলতেই তারা ছেলেমেয়েদের জন্য হালকা নাস্তা বানাতে ব্যস্ত হয়ে গেল।

রিহান আগেই ছাদে গিয়ে বসে ছিল, একেবারে নিরিবিলি বিকেলের বাতাসে মগ্ন। আর কাবির ভাইয়ের দেওয়া কাজ শেষ করে ঠিক তখনই ছাদে এসে হাজির হলো।

বিকেলের কোমল আলো ছড়িয়ে পড়েছে রায়চৌধুরী বাড়ির ছাদে। হালকা বাতাস বইছে, আকাশে রঙিন মেঘের খেলা। ঠিক এই সময় বাড়ির মেয়েরা সবাই ঠিক করলো আজ শাড়ি পরে একটা ফটোশুট হবে।

এক এক করে সবাই সাজগোজ শুরু করলো। কারও শাড়ি গাঢ় লাল, কারও গোলাপি, কারও আকাশি, আবার কারও সোনালি ঝালর দেওয়া। গয়না, টিপ, খোঁপায় ফুল—সব মিলিয়ে যেন উৎসবের সাজ।

তিশা (আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুঁজতে গুঁজতে) — "আজ তো আমরা একেবারে হিট হবো! ফেসবুকে আপলোড দিলেই সবাই বলবে—রায়চৌধুরী বাড়ির মেয়ে মানেই স্টাইল।"

আরোবি — "আরে তোর জন্য কে লাইক দিবে, আমার ছবিতেই বেশি রিয়্যাকশন আসবে।"

জারা (ভ্রু কুঁচকে) — "এই! আগে দেখি কার ছবি ভালো আসে, তারপর বাজি ধরবো।"

সবাই হেসে গড়াগড়ি খেলো।

অবশেষে সবাই ছাদে উঠলো। নরম রোদে শাড়ির রং যেন আরও ঝলমল করছে। ছাদের এক কোণে ফুলের টব সাজানো, অন্য কোণে রেলিং থেকে পুরো শহরের দৃশ্য দেখা যায়।

নুসরাত (হাসতে হাসতে) — "চল সবাই মিলে একটা গ্রুপ সেলফি তুলি।"

সবাই ভিড় করে দাঁড়ালো। রঙিন শাড়িগুলো একসাথে ছবির মতো ফুটে উঠলো।

তিশা মোবাইল সামনে ধরে ক্যামেরা অন করলো।

তিশা — "ওকে সবাই হাসো… three, two, one…"

ক্লিক!

ছবিটা দেখে সবাই হেসে উঠলো।

আরোবি — "আরে আমার চুলে বাতাসে উড়ে গিয়ে কি অবস্থা হয়েছে!"

জারা — "তাই নাকি? তবে সবার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর আমি এসেছি।"

এক এক করে আবার জোড়ায়, গ্রুপে, একা একা ছবি তোলা শুরু হলো। কেউ রেলিং ধরে পোজ দিলো, কেউ ফুলের টবের পাশে দাঁড়ালো, কেউবা হাসতে হাসতে ক্যামেরার দিকে তাকালো।

লিসি হালকা নীল শাড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলো একপাশে। বাতাসে খোলা চুল উড়ে যাচ্ছিলো, মুখে সরল হাসি। নুসরাত তাকে ডেকে বললো—

নুসরাত — "এই লিসি, তুই একা দাঁড়া, তোকে নিয়ে একটা সুন্দর ছবি তুলি।"

লিসি লজ্জা পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো, সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো।

তিশা — "দেখবি, আজকের ফটোশুটে লিসিই হবে star model!"

হাসি-আড্ডা, ক্লিক ক্লিক ক্যামেরার শব্দ আর বিকেলের সোনালি আলোয় পুরো ছাদ যেন উৎসবে ভরে উঠলো। কয়েক ঘন্টা ফটোশুটের পর ক্লান্ত হয়ে মেয়েরা বসে আছে ছাঁদে আর কাবির আর রিহান খেলতে ব্যস্ত

 বাতাসে দোল খাচ্ছে কাশফুল, উঠোনজুড়ে ছায়া-আলো খেলা করছে। মেয়েরা সবাই ছাদ আর বারান্দায় বসে গল্প করছে, ছেলেরা উঠোনে ব্যাডমিন্টন খেলছে।

তিশা (চিৎকার করে) — "এই কাবির,, একটু আস্তে মারো তো! আমরা এখানে বসে আছি, শাটল এসে লাগলে মাথা ফেটে যাবে!"

কাবির(হেসে) — "তুমি দূরে গিয়ে দাঁড়াও, তাহলে লাগবে না।"

ওপাশে আরোবি বসে সবাইকে খেপাচ্ছে।

আরোবি — "আরে এভাবে খেললে তো কোনোদিনই জিততে পারবি না! আমার হলে দেখিয়ে দিতাম…"

জারা (চোখ রাঙিয়ে) — "তুই চুপ কর! খেলার কোনো ট্যালেন্ট তোর থেকে ভাইয়াদের বেশি আছে, তাই না?"

এই কথায় সবাই হেসে গড়াগড়ি খেয়ে পড়ে।

ছাদের একপাশে দিকে বসে ছিলো সুপ্রিয়া আর প্রিয়া। দুজনেই বিকেলের নরম আলোয় চা হাতে গল্প করছিলো।

সুপ্রিয়া (ক্লান্ত হাসি দিয়ে) — "এই বাড়ির মেয়েগুলো না থাকলে ঘরটা এমন প্রাণবন্ত লাগতো?"

প্রিয়া — "হুম, এদের হাসি না থাকলে রায়চৌধুরী বাড়ি অর্ধেক মরে যেতো।"

এমন সময় লিসি এসে ছাঁদের দিকে তাকালো। হালকা নীল শাড়ি পরে চুল বাঁধা, হাতে একটা থালা—মাঝে বিস্কুট আর ঝালমুড়ি সাজানো। তার দৃশ্যটা যেন বিকেলের আলোকে আরও উজ্জ্বল করে তুললো।

তিশা (দৌড়ে গিয়ে) — "আরে বাহ! আজকে আবার নতুন অতিথি আইটেম আসছে?"

লিসি (হেসে) — "তোমরা এতক্ষণ খেলছো, কিছু না খেলে কেমন লাগে?"

রিহান (শাটল থামিয়ে) — "এবার সত্যি বলি, লিসি আসার পর বাড়িটা যেন অন্য রকম হয়ে গেছে।"

সবাই আবার খুনসুটি শুরু করলো, হাসি আর খেলায় ভরে উঠলো বিকেল।