উপন্যাস : তোমাকে চাই 

লেখিকা : নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব :২৩


লিসি কাছে এল… অদ্ভুত এক অনুভূতি ছুঁয়ে গেল। তার হৃদয় গোপনে গরম হয়ে উঠল, চোখে লজ্জা, মুখে কৌতূহল—সব মিশে অদ্ভুত এক ভারসাম্য তৈরি হলো।

লিসি: "এই কি করছেন, ভাইয়া? এটা না মানে… ঠিক না…"

কিরিস: "পা দিতে বলেছি না।"

লিসি: "আপনি তো বড়… আপনার গায়ে আমি কীভাবে পা দেবো?"


কিরিস: "পা দেবে নাকি? কাল সন্ধ্যায় যা করেছিলাম, তাই রিপিট করব। আর মনে আছে তো? কি বলেছিলাম—‘বাচ্চা না নেওয়া পর্যন্ত তো ছাড়বো না।’"

লিসি চুপচাপ, নিজের অজান্তে, ধীরে ধীরে পা এগিয়ে দেয়। চোখ দুটো অজান্তে খিচকে বন্ধ হয়ে যায়। কিরিস তার দিকে তাকিয়ে থাকে, হাতে থাকা নুপুর ধরে ধীরে ধীরে লিসির পায়ের চারপাশে ফেলে দেয়। ঝনঝন শব্দে বাতাস যেন মৃদু নড়ে, লিসি চোখ খুলে তাকায়—কিরিস তার পায়ে নুপুর পরাচ্ছে, কিন্তু এত শান্ত ও যত্নসহকারে যে লিসি আরও ভেতরে এক অদ্ভুত তৃষ্ণা অনুভব করতে থাকে।

এক পা শেষ হলে কিরিস ধীর হাতে ইশারা করে, লিসি নির্দ্বিধায় দ্বিতীয় পা এগিয়ে দেয়। কিরিস আরেকটি নুপুর ধীরে ধীরে পরিয়ে দেয়। নুপুরের ঝনঝন শব্দ বাতাসে ঘুরে ঘুরে লিসির কানে পৌঁছে।

কিরিস উঠে দাঁড়ায়, ধীরে ধীরে লিসির চোখে চোখ রেখে বলল—

কিরিস: "তো কেমন লাগল? আর এটা তোমার আমার দেয়া প্রথম জিনিস—আমাদের সম্পর্কের ছোট্ট একটি শুরু হওয়ার উপহার।"

লিসির চোখ লাল হয়ে যায়। মনে হতে থাকে, সত্যিই কি সে এখন তার নিজের মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে প্রেম করছে—সেই কিরিস, যার জন্য সবাই ভয় পায়, যাকে কেউ সহ্য করতে পারে না। লিসি নিজের হৃদয়কে সামলাতে চেষ্টা করে, তবে ভেতরে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা বয়ে যাচ্ছে।

লিসি: "আপনার হলে… এবার আমি যাই।"

কিরিস মৃদু হেসে বলল—

কিরিস: "হুম, যাও।"

লিসি দৌড় শুরু করার আগে হেসে বলল—

লিসি: "ধন্যবাদ, এত সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার জন্য। আমার পছন্দ হয়েছে।"

লিসি গাউন-এর ঘের হালকা তুলে দৌড় দেয়। বাতাসে তার চুল ছড়িয়ে পড়ে, গাউনের ঘের হালকা দোলে ওঠে। তার পায়ে থাকা নুপুর ঝনঝন করে বাজতে থাকে—প্রত্যেক পদক্ষেপে, যেন একটি মৃদু সুর সৃষ্ট হয়।

কিরিস তা দেখল, অজান্তেই মুখে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। মনে মনে ভাবল, "এই শব্দ, এই দৃশ্য—সবার চাইতে বেশি সুন্দর।"

লিসি যেন পূর্ণিমার আলোয় এক অপরূপ পরী, পা দুটো দুলিয়ে হাঁটছে, দৌড়াচ্ছে। নুপুরের ঝনঝন শব্দ কিরিসের কানে পৌঁছে মনের ভিতর এক ঝড় বয়ে দেয়। তার হৃদয় উদ্দীপিত, মনে হচ্ছে সময় যেন থেমে গেছে, শুধু লিসি আর তার নুপুরের সুর।

প্রতি পদক্ষেপে লিসির গাউনের ঘের মৃদু দোলে ওঠে, বাতাসে তার চুল খসে পড়ে, আর কিরিস লক্ষ্য করে, তার মন ধীরে ধীরে লিসির প্রতি আরও আবদ্ধ হচ্ছে। লিসি যেন তার চোখের সামনে নাচছে 

কিরিস অজান্তেই ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে, লিসির পিছনে তার চোখ রাখে, যেন প্রতিটি মুহূর্ত ধরে রাখতে চায়। ভেতরের উত্তেজনা, লিসির লজ্জা, আর নুপুরের সুর—সব মিলিয়ে যেন দুই হৃদয়ের মধ্যে এক অদ্ভুত আকর্ষণ সৃষ্টি করছে।

কিরিস মুখের মৃদু হাসিটা অন্ধকার পর্যন্ত বজায় রাখে। কিন্তু আলোর ছোঁয়া পেতেই মুখটা হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে ওঠে, চোখ দুটো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যেন বিদ্ধ করে দেয় চারপাশকে। এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে যে বোঝাই যায় না—কিছুক্ষণ আগে এই মানুষটা মুচকি হেসেছিল, কিন্তু এখন তার চোখেমুখে সেই হাসির ছিটেফোঁটাও নেই।

লিসি উপরে গিয়ে ঔষধ খেয়ে শান্ত হয়ে বসে আছে। তার চোখ আটকে আছে পায়ে থাকা নুপুরের দিকে। ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়—এই কাটনি মানে ডিজাইন অনেক পুরোনো, কিন্তু অদ্ভুত রকমের সুন্দর এই নুপুর। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকার পর লিসি নিচে নামে। ঝুমঝুম শব্দে প্রতিটি পদক্ষেপ যেন সবার কানে বাজতে থাকে। কারণ এই নুপুরের আওয়াজ সাধারণ নুপুরের থেকে অনেক বেশি জোরে।

লিজা অবাক হয়ে বলে—

—"তুই নুপুর কোথায় পেলি, দেখি?"

লিসির পায়ের নুপুর দেখে আরোবি বলে ওঠে—

—"আরে কি সুন্দর! কোথা থেকে পেলে?"

সুরভী হেসে বলে—

—"কেউ গিফট করেছে নাকি!"

লিসি এবার একটু থতমত খেয়ে যায়। কণ্ঠে ভয়, চোখে দ্বিধা। কোনো মতে হুরো তারায় বলে ওঠে—

—"কে দিতে যাবে! কেনো? এটা আমার ছিল কাছেই, শুধু পরা হয়নি। এখন ঔষধ নিতে গিয়ে দেখলাম, তাই পরে নিলাম।"

লিসির ঠোঁটে মিথ্যা কথার কাঁপুনি দেখে কিরিস মুচকি হাসতে শুরু করে।

ইয়াবি মুখ টিপে হেসে বলে—

—"মনে হয় যা ভেবেছি…"

তূর্য যোগ দেয়—

—"হুম… এই আমি এখানে থাকছি তোর সাথেই, কিন্তু মাঝে মাঝে দেখা করতে যাবো।"

ইয়াবি হেসে মাথা নাড়ে—

—"হুম, কেনো না।"

এদিকে ইশান হঠাৎ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। ঠিক তখনই ফোন বেজে ওঠে। ফোনটা হাসপাতাল থেকে। ইশান ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে গম্ভীর গলা—

—"স্যার, পেশেন্টের অবস্থা খুব খারাপ। ইমারজেন্সি অপারেশন করতে হবে।"

ইশান চমকে উঠে বলে—

—"ওকে, ওকে… তুমি OT প্রস্তুত করো, আমি আসছি।"

বলেই ইশান দ্রুত বেরোতে থাকে। তাকে এভাবে যেতে দেখে আনোয়ার জিজ্ঞেস করে—

—"কি হয়েছে ইশান? এখন তুমি কোথায় যাচ্ছো?"

ইশান গম্ভীর গলায় বলে—

—"মামা, ইমারজেন্সি অপারেশন আছে। আমাকে দ্রুত যেতে হবে।"

তার মুখের কঠোরতা দেখে সবাই তাকিয়ে থাকে। ডাক্তার হওয়ার যে কতটা দায়িত্ব, সেটা এই মুহূর্তে ইশানকেই দেখে বোঝা যায়।

এসময় প্রিয়া বলে ওঠে—

—"জারা, তুই না কোল্ড ড্রিংক আনতে যাবি বলেছিলি?"

জারা মাথা নাড়ে—

—"হুম, তাই।"

প্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে—

—"তাহলে বাইকে যখন যাবি, ইশানকে হাসপাতালে দিয়ে আয়। ওর সময়টা অন্তত কম লাগবে।"

কথার মাঝে ইশান হঠাৎ কড়া গলায় বলে ওঠে—

—"থাক মামি, এখন আমি কথা বলতে পারবো না। আর জারাকে অনেক তেলাতে হবে—যার সময় আমার নেই। আমি গেলাম।"

জারা এবার রেগে যায়। যদিও সবসময় সে ইশানকে ছোট-বড় বলে তিরস্কার করে, তবুও আজকের মুহূর্তে তার মনোভাব একেবারেই অন্যরকম ছিলো। সে ঠোঁট কামড়ে বলে—

—"এই! আমি বলেছি আমাকে তেলাতে? না আমি বলেছি তোকে নিয়ে যাবো না? এখানে এক মিনিট দাঁড়া, আমি উপর থেকে চাবি আনি।"

জারার হঠাৎ নরম স্বরে এমন কথা শুনে সবাই মুচকি হাসে। ইশানও অবাক হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে মনে একরাশ ভালো লাগার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। প্রিয় মানুষ যখন এমন করে বলে, তখন কারই বা ভালো লাগে না!

রিহান হাসিমুখে ইশানকে বলে—

—"বুঝেছেন হবু দুলাভাই? আমার ছোট বোন অতোটাও রাগী আর খারাপ না, যতটা আপনি ভেবেছেন।"

রিহানের কথায় চারদিক হেসে ওঠে। কারণ আজ প্রথমবার রিহান ইশানকে “দুলাভাই” বলে ডাকলো।

এরমধ্যে জারা চলে আসে।

—"হুম, এবার চল।"

সুরভী হেসে বলে—

—"একটা কোর্ট নিতে পারলি না!"

জারা হেসে মাথা নাড়ে—

—"না, ঠান্ডা লাগবে না।"

জারা সবসময় ক্যাজুয়াল পোশাকে থাকে। আজও তাই। একজোড়া জিন্সের প্যান্ট, গায়ে সাদা গেঞ্জি আর তার উপর কফি রঙের লেদারসুট।

জারা আর ইশান বেরোতে উদ্যত হলে এতক্ষণ নীরবে সব পর্যবেক্ষণ করা কিরিস হঠাৎ জুসের গ্লাস নামিয়ে রেখে বলে ওঠে—

—"জারা, এই নে চাবি। নতুন গাড়িটা চালা, যেটা চেয়েছিলি।"

কথাটা শুনেই সবাই কিরিসের দিকে তাকিয়ে থাকে।

জারা খুশিতে উচ্ছ্বাসে বলে ওঠে—

—"মানে, হুন্ডাটাই? যেটা আমি বলেছিলাম!"

কিরিস আর কোনো কথা না বলে শুধু চাবিটা ছুঁড়ে দেয় জারার দিকে।

জারা তো মহা খুশি। বাইকের জন্য কিরিসকে বলেছিলো কিনে দিতে। কিরিসও জানে—মার্কেটে যখনই নতুন মডেলের বাইক আসে, জারার জন্য এনে দিতে হবে। তাছাড়া কিরিস নিজেও মাঝে মাঝে বাইক চালাতে পছন্দ করে।

সবাই কিরিসের এমন আচরণে নির্বাক হয়ে যায়।

আনারুল বলে ওঠে—

—"জারা, দেখো ২ নম্বর গ্যারেজে আছে। আর হ্যাঁ, একা ফিরতে হবে না। ইশানকে নিয়েই ফিরো, ওর কাজ হয়ে গেলে।"

জারা খুশিতে উড়তে উড়তে বেরিয়ে যায়। তার পিছন পিছন ইশানও।

গেটের সামনে দাঁড়াতেই জারা কালো রঙের বাইক নিয়ে হাজির হয়। ইশান চুপচাপ পিছনে বসতে গিয়ে বলে—

—"আমি চালাই, তুই পিছনে বস।"

জারা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—

—"না, এটা আমি একদিনও চালাইনি। পরে চালাস। আর চুপচাপ বস, না হলে কিন্তু ফেলে দেবো।"

বাইক মেন রোডে গতি বাড়ায়। জারার কথা শুনে ইশান হঠাৎ ঝুঁকে তাকে পিছন থেকে আস্তে আস্তে জড়িয়ে ধরে।

জারা বেসামাল হয়ে বলে ওঠে—

—"আহ! কি করছিস? ছাড় না হলে কিন্তু…"

ইশান মৃদু গলায় ফিসফিস করে—

—"না হলে কি? মুখ বন্ধ করে চালা। আমার দ্রুত যেতে হবে।"

জারা বিরক্তি মিশ্রিত স্নেহে বলে—

—"হ্যাঁ, তুই হাসপাতালে গিয়ে ওই রোগীকে ধন্যবাদ দিস। কারণ ওর জন্যই তোর এই ব্যবহারে আমি কিছু বলছি না।"

ইশান কোনো উত্তর দেয় না, শুধু হেসে ওঠে।

এদিকে বাড়িতে সবাই খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত, আনন্দে মশগুল।

কিন্তু জারা আর ইশানের সম্পর্কের শুরু অনেক আগের। সেটা হয়তো আজ কেউ বুঝছে, আবার কেউ বোঝেনি। জারার ইচ্ছা থাক বা না থাক—সবাই জানে, জারার বিয়ে ইশানের সাথেই হবে।

একুশ বছরের এক যুবক যখন কোনো বাবার পা ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে— “সে তার মেয়েকে চাই”— তখন সেই মুহূর্তটা কেমন হয় ভেবে দেখো! ইশান একদিন আনারুলের পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলেছিলো—

—"আমি মামা, জারাকে পছন্দ করি। ওকে বিয়ে করতে চাই। ওর উপর কোনো চাপ থাকবে না। যেদিন ও চাইবে, সেদিনই আমাদের বিয়ে হবে। প্লিজ মামা… আমি মরে যাবো!"

ছেলের এমন পাগলামি দেখে আনারুল যেমন হতবাক হয়েছিলেন, তেমনই ইশানের মা-ও তার পাশে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করেছিলেন। তারপর আর কি! সবাই মেনে নেয় তাদের সম্পর্ক।

একসময় এই প্রেম-ভালোবাসার ঘোর শত্রু ছিলেন মির্জা বেগম। কিন্তু সেই ভালোবাসা না মেনে নেওয়ার রাগের মাশুল তাকে অনেক বড় করে দিতে হয়েছিলো। হয়তো সেদিন যদি তিনি মেনে নিতেন, তাহলে আজ লিসিও হয়তো তার মা-বাবার সাথে স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারতো।

নিজের ভুল শুধরানোর তীব্র যন্ত্রণায় আজ তিনি ভালোবাসার কাছে পরাজিত, মেনে নিয়েছেন— যাকে চাই, তাকে পেতেই হবে। সেই কারণেই তো রায় চৌধুরী পরিবারের বিয়ে নিজেদের মধ্যেই হয়, এবং হবে।

এদিকে ইশান আর জারা হাসপাতালে পৌঁছাতেই ইশান তাড়াহুড়ো করে নেমে বলে—

—"এই নে, আমার কেবিনের চাবি। গিয়ে বসে থাক। আমি গেলাম।"

জারা চাবি নিয়ে বাইক পার্ক করে হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে বসে পড়ে।

হাসপাতালের করিডোর ভেদ করে ইশান দ্রুত OT’র দিকে এগিয়ে যায়। সাদা এপ্রন গায়ে, কপালে হালকা ঘাম, কিন্তু চোখে সেই অটল দৃঢ়তা। নার্সরা তাকে দেখে দ্রুত পেশেন্টের রিপোর্ট ধরিয়ে দেয়। ইশান এক ঝলক দেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে—

—"স্ক্যান রিপোর্ট সঙ্গে দাও। রক্ত প্রস্তুত আছে তো?… ওকে, দ্রুত অ্যানেসথেসিয়া দাও।"

তার ভেতরে দৌড়াচ্ছে অ্যাড্রেনালিন, কিন্তু হাত কাঁপছে না একটুও। অপারেশন থিয়েটারের বিশাল আলো জ্বলে উঠতেই চারপাশে এক নিস্তব্ধতা নেমে আসে। ছুরি হাতে নেওয়ার মুহূর্তে তার ঠোঁটে ফিসফিস—

—"তুমি লড়াই করো, আমি আছি।"

সময় যেন থেমে যায়। বাইরের কাচের ওপাশ থেকে জারা নার্ভাস মুখে তাকিয়ে থাকে। হাত মুঠো করে বুকের কাছে রাখে। তার মনে হয় যেন প্রতিটি কাট ইশান নিজের শরীরে করছে।

প্রায় তিন ঘণ্টা পর, দরজা খোলে। মুখে ক্লান্তি, তবুও গর্বের ছাপ নিয়ে ইশান বেরিয়ে আসে। ইশান কেবল মাথা ঝাঁকিয়ে জানিয়ে দেয়—

—"অপারেশন সফল।"

জারা তখনো কিছু বলতে পারে না, শুধু ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। সেই হাসি ইশানের সব পরিশ্রমকে স্বর্ণের মুকুট দিয়ে দেয়।

এদিকে রায় চৌধুরী বাড়ি। রাতের অন্দরমহল ভরে আছে আলো আর হাসিতে। লম্বা ডাইনিং টেবিলে সারি সারি পদ। সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করছে। আনোয়ার মামা গল্প শোনাচ্ছে, প্রিয়া আর সুপ্রিয়া খুনসুটি করছে। লিজা, আরোবি, সুরভীরা নিজেদের মধ্যে হইচই করছে।

আলোর ঝলকানিতে সবার হাসি যেন আরো উজ্জ্বল। উঠোনে হালকা বাতাস বইছে, দূরে কোথাও শিউলি গাছের গন্ধ ভেসে আসছে। এ যেন এক অপূর্ব রাত, যেখানে প্রত্যেকের প্রাণ ভরে আছে আনন্দে।

কিন্তু এই সব কোলাহলের মাঝেও কিরিস একেবারে আলাদা। কোণের সোফায় বসে আছে। গম্ভীর মুখ, হাতে জুসের গ্লাস, কিন্তু চোখ যেন চারপাশের সব ভেদ করে শুধু একজনকেই খুঁজে নিচ্ছে।

লিসি সবার সঙ্গে হাসছে, মজা করছে। কিন্তু হঠাৎই তার চোখ আটকে যায় কিরিসের চোখে। দুজনের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ডের জন্য বন্দী হয়ে থাকে।

অন্য দিকে হাসপাতালে অপারেশন শেষে সাফল্যের হাসি হাসচ্ছে, সবার চোখে মুখে হালকা ক্লান্তি এত বড় একটা অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্লান্তি টা ইশানের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে, সবার এই ক্লান্তির মাঝে হালকা একটু সাহস জমিয়ে 

জারা এবার মুখ ফুটে বলে—

জারা — "তাহলে বাড়ি ফিরছি কখন?"

ইশান সেই মুহূর্তে চারপাশে অনেক নার্স আর ডাক্তারদের মাঝেই দাঁড়িয়ে, 

ক্লান্ত অথচ একরকম সহজ ভঙ্গিতে বলে—

ইশান — "আরেকটু সোনা ফ্রেশ হয়ে নেই আমি…"

জারা তো হা করে তাকিয়ে থাকে। চারপাশের সবাই তাকিয়ে আছে জারার দিকেই। মনে হচ্ছে যেন এই মেয়েটিই ডাক্তার স্যারের সবচেয়ে কাছের কেউ! নার্স আর জুনিয়র ডাক্তারদের চোখেমুখে একরকম কৌতূহল মিশ্রিত বিস্ময়।

জারার বুকটা ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে জ্বলে ওঠে— ‘এর বদলা আমি ঠিকই নেবো, তবে তার আগে এই জায়গা থেকে বের হতে দাও…’

জারা এগোতেই হঠাৎ এক নার্স মুচকি হেসে ফাইলটা এগিয়ে দেয়—

নার্স — "ম্যাডাম, স্যারকে এই ফাইলটা দিবেন? আর সত্যি বলতে কি, আপনাদের দু’জনকে একসাথে দারুণ মানায়…"

জারা কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত ফাইলটা হাতে নেয় আর প্রায় দৌড়ে ইশানের কেবিনের দিকে ছুটে যায়। ভেতরে গিয়ে আর কিছু বলে না, কারণ ইশান এমনিতেই ভীষণ ক্লান্ত।

রাত প্রায় ১২-১টার দিকে তারা অবশেষে বাড়ি ফিরে। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতেই শুরু হয় আরেক কাণ্ড। সুপ্রিয়া আর প্রিয়া তো অপেক্ষায় বসেই ছিল। গরম গরম খাওয়া সামনে এনে রাখলো ওদের জন্য।

রাতটা যেন শেষ হতে চায় না—

বারবিকিউ পার্টি, হৈ-হুল্লোড়, হাসাহাসি…

শেষমেশ সবাই রাগ, ক্লান্তি আর খুশির মিশ্রণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

পরের সকাল

সূর্যের আলো ধীরে ধীরে আকাশে উঠতেই বাড়ির ভেতর নতুন দিনের গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়।

সুপ্রিয়া রান্নাঘরে গিয়ে সুপ তৈরি করছে, প্রিয়া বসেছে মির্জা বেগমের সাথে—হালকা গল্প, মজার স্মৃতি, পরের পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ। কাজিনরা এক পাশে বসে গল্পে মশগুল।

এই ফাঁকেই আনোয়ার সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে—

আনোয়ার — "তাহলে তোমরা কখন যাচ্ছো?"

ইয়াবি সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলে—

ইয়াবি — "মামা, আমি আর ইশান একটু পরে বের হবো। আর মেয়ে কয়টা বিকালে আসছে।"

আনারুল হালকা নিশ্বাস ছেড়ে বলে—

আনারুল — "কি করে যে দিন চলে গেল, টেরই পেলাম না!"

এমন সময় লিসি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়। আর সিড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামে কিরিস।

আজকের সকালটা যেন একেবারেই আলাদা।

কিরিসের ফ্যাশন সেন্স এমনিই সবার চোখে পড়ার মতো। সহজে তার পছন্দ হয় না কিছুই—রঙ, পোশাক, কাট, সবকিছুতেই তার আলাদা খুঁতখুঁতে পছন্দ।

আজ তার গায়ে মেরুন রঙের একটি নিখুঁত ফিটিং টি-শার্ট, আর সঙ্গে ক্রিম কালারের প্যান্ট—একদম ‘old money’ স্টাইলের অভিজাত গাম্ভীর্য!

কিরিস নিচে নামতেই চারপাশ যেন মুহূর্তে থমকে যায়। সবার চোখ একবার তার দিকে চলে যায় অজান্তেই।

হালকা গম্ভীর চেহারা, রাজকীয় ভঙ্গি, আর সেই চোখে এক অদ্ভুত কর্তৃত্ব…

সকালের এই মিষ্টি গুঞ্জনের ভেতরেও সবাই অনুভব করে, কিছুক্ষণ পর হয়তো এই জমজমাট পরিবেশ শেষ হয়ে যাবে। সবাই ফিরে যাবে তাদের গন্তব্যে। তাই যতটুকু সময় হাতে আছে, মন খুলে উপভোগ করতেই যেন ব্যস্ত সবাই।

কিরিস কোথাও না তাকিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে যায়

কিরিস মাঝে মাঝে রান্নাঘরে গিয়ে নিজের পছন্দের জিনিসগুলো নিয়ে খেতে থাকে। কেউ কোনোদিন কিছু বলে না। কারণ সবাই জানে—খাবারের ব্যাপারে সে ভীষণ খুঁতখুঁতে। যে খাবার তার ভালো লাগে, সেটা সবসময় বাড়িতে এনে রাখা হয়। রায় চৌধুরী বাড়ির প্রথম সন্তান—অসংখ্য আশার পরে সুপ্রিয়ার কোল আলো করে এসেছিল সে। ফলে বাকি সবার চেয়ে তার প্রতি আদরটা একটু বেশিই।

কিরিস একবার লিসির দিকে চোখ বুলিয়ে আবার তাকাল রান্নাঘরের সামনে রাখা শাকসবজির ডালার দিকে। বেছে বেছে একটা খিরাই তুলে নিল।

কিরিস — "মা, কেটে দাও।"

সুপ্রিয়া হাঁড়ি থেকে হাত সরিয়ে বলে—

সুপ্রিয়া — "লিসি, সুপটা একটু নাড়তে থাকো তো।"

গ্লাসে পানি ঢালতে থাকা লিসি থেমে গিয়ে সুপ নাড়তে শুরু করলো। সুপ্রিয়া ছেলের কাছে গিয়ে খিরাইটা ছুলে কেটে দিচ্ছিল। কিরিস চুপচাপ দাঁড়িয়ে, মাঝে মাঝেই আবার লিসির দিকে তাকাচ্ছে। লিসি বুঝতে পারছে, তবু এড়িয়ে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই—

সুপ্রিয়ার হাত থেকে হঠাৎ ছুরিটা ঝনঝন শব্দে পড়ে গেল মাটিতে।

চারপাশ হঠাৎ থমকে যায়।

লিভিং রুমে বসে থাকা সবাই চমকে উঠে তাকালো রান্নাঘরের দিকে।

সবাই — "কি হয়েছে?"

ভেবেই নিল সবাই—সুপ্রিয়ার হাত কেটে গেছে বুঝি!

কিরিস — "কি হয়েছে মা? ঠিক আছো তো?"

সুপ্রিয়া এক মুহূর্ত চুপ রইল। তারপর হঠাৎ দৃঢ় স্বরে বলে উঠল—

সুপ্রিয়া — "একটা কথা জিজ্ঞেস করবো, একদম ঠিক উত্তর দিবি।"

কিরিস — "কি?"

সুপ্রিয়া এবার এমনভাবে বলল, যেন পুরো বাড়ি শুনতে পায়—

সুপ্রিয়া — "তুই কি প্রেম করিস?"

ব্যাস!

এক মুহূর্তে পরিবেশে বজ্রপাত!

কাবির তো প্রায় লাফিয়ে উঠে বলে—

কাবির — "ও মা, তুমি এসব কি বলছো!"

আরোবি চোখ গোল করে—

আরোবি — "বর আম্মু, এ কথা কইলে তুমি!"

সুরভী তো হেসে ফেলে—

সুরভী — "কখনো শুনেছো রাতে সূর্য উঠে?"

সবাই হকচকিয়ে তাকিয়ে আছে কিরিসের দিকে।

সুপ্রিয়া এবার মায়ের আসল অধিকার নিয়ে বলে উঠলো

সুপ্রিয়া — "তোর গলায় কে খামচেছে? তাও আবার এভাবে! দেখে তো মনে হচ্ছে না পুরোনো দাগ… একেবারে একদম নতুন। কে করেছে এটা?"

লিসির শরীর হঠাৎ জমে গেল।

সুপ নাড়তে থাকা হাত কাঁপতে শুরু করলো। ভুলে লবণ নিতে গিয়ে গরম সুপ এক ঢোঁক গিলে ফেললো। গলা যেন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে! শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে কষ্টে শ্বাস নিচ্ছে। ভয় মেশানো চোখে হালকা করে তাকাল কিরিসের দিকে।

কিরিস কিন্তু ঠান্ডা। তার চিরচেনা স্থির দৃষ্টিতে একটু ভেবে উত্তর দিল—

কিরিস — "আমি করেছি। গলায় চুলকাচ্ছিল, তাই আঁচড় দিয়েছিলাম। এরকম হয় মাঝে মাঝে, রাগ উঠে যায়, তখন জোরে টানি। তাই কেটে গেছে।"

সুপ্রিয়ার চোখ সরু হয়ে গেল।

সুপ্রিয়া — "আমাকে শেখাতে আসিস না। আমি বুঝি কোনটা ছেলেদের খামচানো, আর কোনটা মেয়েদের। ওই ক্লাস আমি আগেই পাস করে এসেছি। ভালোয় ভালোয় বল—মেয়েটা কে!"

কিরিস ঠোঁটে হালকা ব্যঙ্গের হাসি টেনে ঠান্ডা স্বরে বলে—

কিরিস — "মেয়ে খামছালো কে বলেছে? আর নাম বললেই কি তাকে তুলে এনে বউ বানিয়ে দেবে?"

 পুরো ঘরে আবারো বজ্রপাত।

লিসির বুক কাঁপছে, চোখ বড় বড় হয়ে আটকে গেছে কিরিসের দিকে।

তার মনে হচ্ছে—মাটি যেন ফেটে যাক আর সে তাতে ডুবে যাক…

সুপ্রিয়া—

"দিতেও তো পারি, আর ভালোও তো হয়… যদি ওইভাবে পারতিস, কি বলো মা?"

প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেওয়া মাত্র সবার চোখ ঘুরে গেল মির্জা বেগমের দিকে। তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দিলেন না, শুধু ঠোঁটের কোণে একফালি হাসি টেনে নিলেন—

যেন সেই নীরব হাসি দিয়েই স্বীকৃতি জানালেন, তিনিও রাজি থাকতেন।

সুপ্রিয়া এবার সরাসরি তাকালেন কিরিসের চোখে—

"মিথ্যা বলবি না কিরিস… সত্যি করে বল, কে?"

চারপাশে হালকা চাপা হাসাহাসি, ঠাট্টা আর মুচকি ইঙ্গিত চলতে লাগলো।

যেন সবাই মিলে এক অদ্ভুত খেলায় নামিয়েছে তাকে।

কিরিসের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে, ভেতরে আগুন জ্বলছে।

কিন্তু বাইরে থেকে সে নিজেকে শান্ত রাখার মরিয়া চেষ্টা করছে।

তবুও বিরক্তির সুর চেপে রাখতে পারলো না—

"মা, আমায় রাগাবে না… বলে দিলাম।"

সুপ্রিয়া এবারও থামলেন না, চোখে দুষ্টু তৃপ্তি, ঠোঁটে কৌতুক—

"কে রাগাচ্ছে তোকে? আর দেখি কিভাবে ঘামছে দিয়েছে!"

লিসি একপাশে দাঁড়িয়ে কাচুমাচু করছে, যেন এই পুরো অস্বস্তি তার বুকের উপর এসে পড়েছে।

এদিকে খানিকটা দূরে বসে থাকা আনোয়ার আর আনারুল দুই ভাই মজা করে পরিস্থিতি মেপে নিচ্ছে।

আনোয়ার আঙুল মেলে গুনতে শুরু করলো—

"এক… দুই… তিন… এবার কান আটকা, আনারুল।"

আনারুল হেসে হাত তুললো কানে, যেন আগেই জানে কী হতে চলেছে।

দুজনের ঠোঁটে খেলা করছে অদ্ভুত এক গোপন আনন্দ।

এটা সেই নিস্তব্ধতা, যে নিস্তব্ধতার আগে ঝড় নেমে আসে।

হঠাৎ কিরিসের গলায় বজ্রপাতের মতো গর্জন—

"Oh Shut up!"

ব্যাস—এক নিমিষে পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।

হাসি, ফিসফাস, ঠাট্টা—সব হারিয়ে গেলো।

শুধু তার ভয়ংকর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি চারদিকে বাজতে লাগলো।

সে দাঁড়িয়ে, চোখে অগ্নি, বুক ভরা অভিমান নিয়ে চিৎকার করলো—

"এখানে হাসার কি আছে! আমাকে নিয়ে তোমাদের যদি কোনো সমস্যা থাকে… তাহলে সরাসরি বলতে পারো।

তাহলে আমি এখনই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো!"

রাগে-ক্ষোভে কিরিস সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো।

ঘরে ঢুকেই সে নিজের শার্টের বোতাম দুই-একটা খুলে দিলো, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।

আবেগে ভরা দৃষ্টি, রাগ কমানোর জন্য টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিগারেট বের করলো।

লাইটারের আগুনের ক্ষুদ্র শিখা তার চোখের তীক্ষ্ণ দ্যুতিতে মিলেমিশে গেলো।

প্রথম ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘরটাকে আবছা করে দিলো।

নিচে, ড্রইংরুমে সবাই অস্বস্তি কাটানোর চেষ্টা করছে।

অরোবি মুচকি হেসে বললো—

"ও বড় আম্মু, তোমার পোলা তো রেগে গেলো।"

অরোবির কথায় চাপা অস্বস্তির মধ্যে হালকা হাসাহাসি ফিরে এলো।

লিভিং রুম আবার ফিসফিসে গুঞ্জনে ভরে উঠলো।

ইশান ভ্রু কুঁচকে রিহানকে ফিসফিস করে বললো—

"কাবির, চলতো চেষ্টা করে আসি।"

তিশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো—

"কি করবে!"

এরমধ্যেই আনোয়ার গম্ভীর স্বরে সুপ্রিয়াকে বললো—

"আমি জানতাম, এমন কিছু একটা হবেই। তোমায় বলি… একটু ভেবে কিছু বলবেন, বেয়াড়া ছেলের সামনে।"

সুপ্রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বীকার করলেন—

"তা হয়তো ঠিক। ওকে রাগানো উচিত ছিলো না।"

এই কথার পরই ছেলেরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।

তাদের সিঁড়ির দিকে যেতে দেখে নুসরাত বিস্মিত কণ্ঠে বললো—

"কোথায় যাও সবাই?"

রিহান একচোখ টিপে উত্তর দিলো—

"আমাদের কিছু কাজ আছে, চলতো।"

ইয়াবি সাথে সাথেই অজুহাত তৈরি করলো—

"এই তো যাচ্ছি, মা ফোন করেছে, কথা বলে আসছি।"

ওরা তিনজন ধীরে ধীরে কিরিসের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো।

ঘরের দরজা আধখোলা।

ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে কিরিস।

একহাতে সিগারেট, অন্যহাতে গ্লাসে ভরা হুইস্কি।

ধোঁয়া আর অ্যালকোহলের গন্ধে ঘরটা যেন ভারী হয়ে আছে।

রিহান একপা এগিয়ে গিয়ে বললো—

"বলছি ভাইয়া, আসবো?"

‘ভাইয়া’ শব্দটা শুনেই ইশান ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হেসে ফিসফিস করে বললো—

"গুতোই পরলে ছুছু ও নামাজ পড়ে।"

কাবির তৎক্ষণাৎ ধমক দিলো—

"চুপ কর।"

কিরিস তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বললো—

"Come in. কি বলবি?"

ভেতরে ঢুকে কাবির ধীরস্বরে বললো—

"চাচা… মানে চামিচা-মুখ খুলছে।"

ইশান নিঃশব্দে যোগ করলো—

"সব নেওয়া শেষ।"

রিহান এবার আরও গোপন কণ্ঠে বললো—

"I am… মানে 100 M দিতে চেয়েছে।"

কিরিস গভীরভাবে ধোঁয়া টেনে নিলো।

তার চোখের কোণে একটুকরো ব্যঙ্গ-হাসি খেলে গেলো।

সে ধীরে ধীরে বসে পড়লো, তারপর সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে দিলো।

তাদের কোড-ভাষার প্রতিটি শব্দ তার কানে স্পষ্ট বাজলো।

এই ঘরের ভেতর, সবার চোখেমুখে ভয় আর গোপন উত্তেজনা।

এটা শুধু এক রাগী ভাইয়ের সামনে দাঁড়ানো নয়, বরং সেই মানুষটির সামনে দাঁড়ানো—

যে রাজনীতির মতোই অন্ধকার জগতে প্রতিটি কথা, প্রতিটি সংখ্যা, প্রতিটি কোড ভেঙে ফেলতে পারে।

 কিরিস ঠান্ডা গলায় বললো—

"Hmm… Everything is ok. But where is 2006?"

ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঢুকলো ইয়াবি।

"Boss, I am here. আর ওইটা next week… then start."

কিরিস ভ্রু কুঁচকে সবার দিকে তাকালো, তারপর ঠান্ডা অথচ হুমকিমাখা কণ্ঠে বললো—

"Oh… so everyone out."

কিন্তু ইশান হঠাৎ দাঁত বের করে ব্যঙ্গ করলো—

"আমি একজন ডাক্তার, তাহলে তোর গলায় যে ঘামছালো দেখা যাচ্ছে… যদি আমি ওইখান থেকে একটুকরো sample কালেক্ট করতে পারি, তাহলে ডিএনএ টেস্ট করে জেনে যাবো—এই মেয়ে কে। নাকি… তুই নিজেই কিছু লুকাচ্ছিস?"

কিরিস চোখ ছোট করে তাকালো—

"মানে?"

কাবির এবার সোজাসুজি বললো—

"সরি ভাইয়া, কিন্তু আমাদের জানতে দে… কে সেই মেয়ে?"

রিহান কপালে ভাঁজ ফেলে গম্ভীর গলায় যোগ করলো—

"Overwork করতে রাজি, কিন্তু জানতে দে।"

ইশান পাশ ফিরেই চেঁচিয়ে উঠলো—

"ইয়াবি! তুই হা করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"

ইয়াবি কাঁচুমাচু হেসে মাথা নেড়ে বললো—

"ও… আমিও… ok."

কিরিস গর্জে উঠলো—

"আমি জানি তোরা কি করতে যাচ্ছিস! তাই ওখানেই থাম। Just stop!"

কিন্তু তখন আর কেউ শুনলো না।

রিহান আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে কিরিসকে বেডে ফেলে দিলো।

একসাথে সবাই যেন একসাথে চক্রান্ত করে রেখেছিল।

ইয়াবি দ্রুত এগিয়ে এসে কিরিসের টাই টেনে খুলে তার হাত শক্ত করে বেঁধে ফেললো।

কাবির আর রিহান মিলে পা চেপে ধরলো।