উপন্যাস : তোমাকে চাই 

লেখিকা : নুসরাত জাহান মিথিলা 

পর্ব:২২


তার মুখে হালকা লজ্জা—নতুন বউয়ের লাজুক আভা।

গাঢ় লাল রঙের শাড়ি, মাথায় হালকা ঘোমটা—একেবারে দীপ্তিময় রূপ।

রিহান অন্য সময়ের মতো একেবারেই বিন্দাস মুডে পাশে দাঁড়িয়ে।

ভাইকে এতটা উচ্ছ্বসিত দেখে তূর্য ঠোঁট বাঁকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো—

—"কি ব্যাপার! দেখে তো মনে হচ্ছে রাতে ছক্কা মেরেছিস!"


রিহান হাসতে হাসতে উত্তর দিল—

—"ছক্কা কেন ভাই? পুরো সেনচুরি করেছি!"

এই কথা শুনে ছেলেরা হেসে খুন, আর মেয়েরা নুসরাতের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

তাদের চোখে স্পষ্ট ঈর্ষা মেশানো কৌতূহল।

প্রিয়া তখন হেসে বললো—

—"আরো সকাল সকাল উঠে পড়েছিস? এসো, এসো, চা নিয়ে যাও দু’জনের জন্য।"

নুসরাত লজ্জা মাখা কণ্ঠে বললো—

—"মা, আমি নিজেই বানিয়ে দিই?"

প্রিয়া তৎক্ষণাৎ হাত নেড়ে মানা করলো—

—"না রে! কালকেই তো আমাদের বাড়িতে এসেছিস। এখন থেকে কিছু করার দরকার নেই। আমরা তো আছি এখনো। যাও, শুধু রিহানকে চা দিয়ে এসো।"

হালকা লাজুক হাসি হেসে নুসরাত চা হাতে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল রিহানের দিকে।

নুসরাত চা এগিয়ে দিল রিহানের হাতে।

রিহান গম্ভীর ভঙ্গিতে কাপ হাতে নিলেও চোখ একদম সরালো না নুসরাতের মুখ থেকে।

নতুন বউয়ের লাজুক হাসিটাই যেন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ।

রিহান ধীরে ধীরে চুমুক দিলো, তারপর দুষ্টুমি ভরা স্বরে ফিসফিস করে বললো—

—"চায়ের থেকেও মিষ্টি লাগছে তোমায়।"

নুসরাত হঠাৎ লজ্জায় কাপড়ে মুখ ঢাকল। পাশে বসা ছেলেরা শিস দিয়ে উঠলো—

—"ওহহ্ হো! রোমান্স চলছে সকাল সকাল!"

—"বউ-ভাইয়ারা কিন্তু আজ খুব খুশি!"

নুসরাত একেবারে লাল হয়ে গেলো, আর রিহান হাসতে হাসতে গম্ভীর সেজে বললো—

—"চুপ কর না হলে তোমাদের সবার কান মুচড়ে দেবো!"

সবাই আবার হেসে উঠলো।

ঠিক তখনই ওপরের দিক থেকে কারও আসার শব্দ হলো।

সবাই হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো।

সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে লিসি।

চোখে এখনো ঘুমের ছাপ, চুলের খোঁপা এলোমেলো, মুখে একেবারে তাজা শিশিরভেজা আভা।

 অদ্ভুত এক সৌন্দর্য যেন চারপাশকে থমকে দিয়েছে।

লিজা হেসে বলে উঠলো—

—"এই যে! অবশেষে ঘুমকাতুরে রাজকুমারীর ঘুম ভাঙলো!"

তিশা যোগ দিলো—

—"চলো, তোমার জন্যে নাস্তা নিচে রাখা আছে। আমরা ভেবেছিলাম আজকেই সারাদিন ঘুমাবে!"

সবাই মজা করে হাসাহাসি করতে লাগলো।

লিসি অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামলো।

নিচে নেমে সবার সাথে বসে, এমন সময় আবার উপর থেকে কিরিস ও নিচে নামে একে বারে নীরবতা নিয়ে,, 

কেউ কিছু না বললেও পরিবেশে হালকা এক চাপা নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

সবার চোখে একরকম হাসি, আবার কৌতূহলও—এমন মুহূর্ত তো এ বাড়িতে সচরাচর দেখা যায় না।

সুরভী মুখ ঢেকে চাপা হাসি চেপে রাখতে পারলো না—

—"আহা, কি রোমাঞ্চকর সকাল শুরু হলো আজকে!"

ইয়াবি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো—

—"হ্যাঁ, আজ সকাল থেকে যা দেখছি "

কথাটা শুনে লিসি লজ্জায় মাথা নিচু করলো।

কিরিস একবার ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকাতেই ইয়াবি হো হো করে হাসতে হাসতে চুপ হয়ে গেল।

প্রিয়া তখন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে সবার দিকে তাকিয়ে বললো—

—"আচ্ছা, সকালের নাস্তা রেডি। সবাই একসাথে খেতে আসো।"

বড় বড় থালায় সাজানো হল পরোটা, সবজি আর গরম দুধ চা।

লম্বা ডাইনিং টেবিলের চারপাশে সবাই গাদাগাদি করে বসলো।

বাড়িটা যেন আবার উৎসবমুখর হয়ে উঠলো।

আনারুল বাগান থেকে এসে আসন নিলেন।

তিনি হাসিমুখে চারপাশে তাকিয়ে বললেন—

—"এই যে, এত হৈচৈ দেখে মনে হচ্ছে আসলেই বিয়ে শেষ হয়নি, বরং নতুন উৎসব শুরু হয়েছে।"

মির্জা বেগম সম্মতি জানিয়ে বললেন—

—"আমাদের রায় চৌধুরী বাড়ি তো এমনিতেই সবসময় মেলা বসে থাকা জায়গা। নতুন বউ আসায় এবার আরও আলো বেড়ে গেছে।"

নুসরাত তখন লাজুকভাবে রিহানের পাশে বসে আছে।

রিহান তার থালা থেকে এক টুকরো পরোটা কেটে নুসরাতের মুখের সামনে ধরতেই চারপাশ থেকে শিস পড়ে গেল—

—"উফফ! ভালোবাসার খাওয়া শুরু হয়ে গেছে!"

নুসরাতের গাল লাল হয়ে গেলো, আর রিহান হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো—

—"বউকে না খাওয়ালে কি চলে?"

সবাই আবারো হেসে উঠলো।

এমন হাসাহাসির মাঝেই কিরিস চুপচাপ নিজের থালায় খাবার তুলছে।সবার পরোটা খেলেও কিরিসের প্লেটে আছে পাউরুটি, বাটার,ডিম আর পাশে রাখা এক গ্লাস কমলা লেবুর জুস,, 

কোনো শব্দ করছে না, তবে চোখ একবারও লিসির দিক থেকে সরছে না।

লিসি সেটা টের পাচ্ছে—কিন্তু কিছু বলছে না, শুধু চুপচাপ নাস্তা খেতে খেতে বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি সামলাচ্ছে।

খেতে যখন সবাই ব্যস্ত, তখন কিরিস ধীরে জুসের গ্লাস ঠোঁটে তোলে। এক ঢোক নিয়ে গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে হঠাৎ শান্ত অথচ ভারি গলায় বলে—

কিরিস — "আজ থেকে সবাই কাজে ফিরছো…"

একটু থেমে চারপাশে তাকায়, তারপর যেন হালকা কোডে কথা বলার ভঙ্গি—

কিরিস — "খবরের কাগজের চারটা পৃষ্ঠার মতো সব সাজানো আছে… শুধু চোখ বুলিয়ে পড়লেই চলবে। আজ-কাল কাজের বিশন চাপ, তাই সবাইকে অনেক খাটতে হবে।"

ভিতরের আসল কথাটা সবাই বুঝে ফেলে—

 “আজ থেকে তোমাদের সবাইকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাজে হাত লাগাতে হবে। আমি সব গোছানো রেখেছি।”

এই ঘোষণা শুনে টেবিলে হালকা নীরবতা নেমে আসে। ছেলেগুলোর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়, কারো চোখে আর সাহস নেই কিছু বলার। কারণ এতদিন যাবত সব অনুষ্ঠানে, সব কাজে কিরিস একাই সামলে এসেছে—আজ হঠাৎ সবাইকে সরাসরি ডেকে তোলার মানে ভয়ঙ্কর।

হালকা চাপা পরিবেশে প্রথম গলা ছাড়ল ইয়াবি। একটু জোর করে স্বাভাবিক ভঙ্গি আনার চেষ্টা করলেও কণ্ঠস্বরের ভিতরে দমচাপা অস্বস্তি স্পষ্ট—

ইয়াবি — "মামা, আমার মনে হয় আমরা কালই চলে যাবো…"

ইয়াবির এই কথায় চারপাশে মুহূর্তে মন খারাপের ছায়া পড়ে।

আনোয়ার — "কেনো, আর ক'টা দিন থেকে গেলে হয় না?"

ইয়াবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে—

"না মামা, বুঝতে তো পারছেন… আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল। রিহানের বিয়ের জন্য কয়েকদিন ছুটি নিয়েছি, কিন্তু এর বেশি আর সম্ভব নয়।"

ইয়াবির সঙ্গে সঙ্গে ইশানও গলা মেলায়—

ইশান — "মামা, আমাকেও ফিরতেই হবে। হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছে…"

আনারুল একটু গম্ভীরভাবে বলে—

আনারুল — "যাওয়া তো যেতেই হবে, সে বুঝলাম। তবে আজই না গিয়ে কালকে যেও। কি বলো ভাইজান?"

আনোয়ার মাথা নাড়ে—

আনোয়ার — "হুম, কালই যাও। আর তোদের মা… মানে আমাদের বোন, ওকেও কয়দিনের জন্য পাঠিয়ে দিও।"

ইয়াবি — "ঠিক আছে…"

চারপাশে আবারও ভারী নীরবতা নেমে আসে। কিরিস গম্ভীর চোখে একেকজনকে লক্ষ্য করে, তার ঠোঁটের কোনে অদৃশ্য এক চাপা হাসি—যেন সবকিছু তার হিসেবমতোই এগোচ্ছে।

কিরিস গম্ভীর মুখে আবার বলল—

কিরিস — "রিহান, কাবির—তোরা কাল থেকে অফিস জয়েন করবি। আজকে তোদের জিমেইলে কিছু কাজ পাঠিয়েছি, দেখে নিবি।"

কাবির বিনয়ের সাথে মাথা নেড়ে উত্তর দিল—

কাবির — "হুম ভাইয়া, আমরা কাল থেকে থাকবো।"

কিরিসের দৃষ্টি একটু নরম হলো, কিন্তু গলায় রয়ে গেল সেই শীতল কর্তৃত্ব—

কিরিস — "হুম বাবা। চাচ্চু, সন্ধ্যায় তোমাদের সাথে কিছু দরকারি কথা আছে। আর আমি আজ ঢাকার বাইরে যাচ্ছি… মিটিং আছে, আগেই বলেছিলাম।"

আনোয়ার মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। টেবিলের চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা। যেন সবার মনেই এই উৎসবের দিনগুলোর সমাপ্তি টেনে দিয়েছে কিরিসের এই কয়েকটা কথা।

অনুষ্ঠানের আমেজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকে আবার ফিরতে শুরু করল নিজের নিয়মিত জীবনের ছন্দে।

ইয়াবি—অল্প বয়সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল। ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়ে, ক্লাস-সেমিনারে তার দিন কেটে যায়। ছোটবেলা থেকে শিক্ষক হওয়ার যে স্বপ্ন ছিল, সেটাই যেন আজ পূর্ণ রূপ পেয়েছে। তার জীবনের প্রতিটা দিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় ভরা—যা অন্য কোনো পেশায় সহজে পাওয়া যায় না।

ইশান—ঢাকা মেডিকেলের নামকরা ডাক্তার। চারপাশের মানুষ বলে, তার চোখের দিকে তাকিয়েই নাকি বোঝা যায় রোগী বাঁচবে কি না। সারাদিন ব্যস্ততা, অপারেশনের চাপ, আর রোগীর লম্বা লাইন। তার মা-বাবা শুধু আছে দেশে, বাকিরা ফ্রান্সে। একা থেকেও সে নিজের জায়গাটা শক্ত করে নিয়েছে।

রিহান আর কাবির—ফ্যামিলি বিজনেসের প্রধান ভরসা। কিরিস দেশের বাইরে বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে কোম্পানির সব দায়িত্ব তাদের কাঁধেই পড়ে। একজন ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আরেকজন দক্ষ ম্যানেজার। দুজনেই কাজ সামলাতে পারদর্শী, গুছিয়ে নিতে ওদের জুড়ি নেই।

কিন্তু কিরিসের দুনিয়া আরও বিস্তৃত। শুধু বাংলাদেশ নয়—তার ব্যবসা ছড়িয়ে আছে বহু দেশে। শত শত কোম্পানির মালিক সে। যেখানে নাম ওঠে, সেখানে মাথা উঁচু করেই ওঠে—"বিজনেস কিং " হিসেবে তার পরিচয় সবার জানা।

তূর্য আপাতত ছুটিতে। কাজকর্মে নেই, এই ক’দিন কিরিসের পরিবারেই সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাড়ির মেয়েদের পড়াশোনাও প্রায় শেষের দিকে।

সুরভী আর আরোবি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, এখন গৃহস্থালির কাজেই ব্যস্ত।

হিয়া আর লিজা—ওদের আর মাত্র এক বছর বাকি, এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ। চাকরির প্রতি তাদের বিশেষ টান নেই, ভবিষ্যতের জন্য ঠিক করবে তখনই।

আর লিসি—সদ্য ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছে। ফলাফল এখনো আসেনি। সামনে ভার্সিটিতে ভর্তি হবে—নতুন জীবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে সে।

সকালের খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। বাড়ির মেয়েরা ঘরে বসে গল্পে মেতে ছিল। এমন সময় সুপ্রিয়া হাতে ট্রে নিয়ে ঢুকল—

ঠান্ডা ঠান্ডা পুডিং।

ট্রের ঢাকনা উঠতেই যেন ঘর ভরে গেল মিষ্টি সুগন্ধে। সবার মুখে হাসি ফুটল।

তিশা মজা করে বলে উঠল—

তিশা — "মামী, দেখে মনে হচ্ছে নুসরাত বানিয়েছে, তাই না?"

সুপ্রিয়া হেসে মাথা নাড়ল।

সুপ্রিয়া — "হ্যাঁ, নুসরাতই বানিয়েছে। ওর হাতের পুডিং সবসময় আলাদা হয়।"

সবার হাতে পুডিং তুলে দেওয়া হল। চামচের টুকটাক শব্দে মিশে গেল হাসাহাসি আর গল্পের স্রোত।

আড্ডার মাঝেই ঠিক হল—

 আজ সন্ধ্যায় গার্ডেনে বারবিকিউ পার্টি হবে।

“যেহেতু কাল সকালেই সবাই ছড়িয়ে যাবে, আজকের রাতটা যেন লাস্ট নাইট হয় একসঙ্গে।”

মেয়েরা সাজসজ্জার পরিকল্পনায় ব্যস্ত হয়ে গেল। কে কোন ড্রেস পরবে, কে কোন গান গাইবে—নানান আলাপ চলতে লাগল।

কিন্তু ছেলেদের খোঁজ নেই। সকাল থেকে বাইরে গেছে, দুপুর পেরিয়েও ফেরেনি। কেউ বলছে অফিসের কাজ, কেউ বলছে অন্য কিছু।

কিন্তু আসল সত্যিটা অন্যরকম।

ওদের কাজ এত সহজ নয়।

 কোনো মানুষকে হত্যা করা কি এত সোজা? কারো জীবন নিয়ে খোঁজখবর খোঁজা কি এতোই সহজ!  কিংবা কাউকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা—এগুলোও তো ওদের প্রতিদিনের কাজ।

দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে এলো। রোদ হালকা কমতেই বাড়ির ভেতরের সেই গমগমে হৈচৈ যেন হঠাৎ থেমে গেছে, তবুও চারপাশে লুকোনো এক অদ্ভুত খুশি দোল খাচ্ছে। সবাই জানে—রাতেই পার্টি, তাই প্রস্তুতির ব্যস্ততায় যার যার মতো গুছিয়ে নিচ্ছে সবাই।

বিকেলের আড্ডা, চায়ের কাপে চুমুক আর হাসি-ঠাট্টার ফাঁকে ফাঁকেই সময় গলে গেল। কেউ টেরই পেল না, কবে সন্ধ্যা নেমে এলো।

ছেলেরা একে একে বাড়ি ফিরল, মেয়েরা গার্ডেনের দিকে ছড়িয়ে পড়ল। সাজগোজ বেশি নয়—সবার মধ্যে যেন এক ধরনের হালকা আভিজাত্য। গার্ডেনের নিভু-নিভু আলোতে মায়াবী আবহ। ফেরারি লাইট ঝুলছে গাছের ডালে, চারপাশে হালকা আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাতাসে ভেসে আসছে ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ।

ধীরে ধীরে বড়রাও মিশে গেলেন আড্ডায়। সকলে বুঝতে পারছে—এই সন্ধ্যাটা বাঁচিয়ে রাখতে হবে, কারণ ভোর হলেই আবার আলাদা হতে হবে।

কসম ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে অবাক—চারপাশে যেন এক ইলাহী আয়োজন! সুপ্রিয়া আর প্রিয়া মিলে নানরুটি, পিঠার রুটি বানাচ্ছেন। পাশেই রাজহাঁসের মাংসের ঝোল, মুরগির কাবাব, বারবিকিউর ধোঁয়া ভেসে আসছে। সন্ধ্যা যেন এক উৎসবে রূপ নিল।

সবাই খুশিতে ডুবে—

ইশান নিঃশ্বাস ফেলে বলে,

—"ওফ! কতদিন পর আবার আমরা একসাথে হলাম, আবার কতো দ্রুত চলে যাব…"

ইয়াবি তৎক্ষণাৎ হেসে বলে,

—"সময় সত্যিই অদ্ভুত, কত দ্রুত কেটে যায়! তবে আজকের রাতটা কিন্তু জমে উঠবে।"

আরোবি খুনসুটি করে,

—"এইবার লাইনে আয়, কি সব স্যাড স্টোরি শুনাচ্ছিস! চলে যাব চলে যাব বলছিস, আবার তো আসবিই। নাকি ইচ্ছে করছে আর আসবি না?"

সুরভী হেসে বলে,

—"ঠিক বলেছিস।"

এদিকে নুসরাত রেহানের জন্য আলাদা রুটি বানাচ্ছে। শাশুড়ি বারণ করলেও সে সাহায্য করতেই চায়—“আমি তো এই বাড়ির বউ, দায়িত্ব আমারও আছে”—এই ভাবনা তার চোখেমুখে স্পষ্ট।

ঠিক তখনই লিসি হাতে ঠান্ডা শরবতের ট্রে নিয়ে এগিয়ে আসে। 

তাকে দেখে আরোবি হেসে ওঠে—

—"ওয়াও! তোর গায়ে তো একদম ফিট করেছে!"

লিসি হালকা অবাক হয়ে বলে,

—"আমিও তাই ভেবে চমকে গেছি।"

সে একে একে সবার হাতে গ্লাস তুলে দেয়, তারপর নিজেও এক গ্লাস নিয়ে পাশে দাঁড়ায়।

লিসির গায়ে নেবি ব্লু রঙের গাউন, যেন তার গড়নকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। আরোবি প্রশংসা করতে ভোলে না—

—"এটা আম্মু আমাকে দিয়েছিল, কিন্তু আমি একদিনও পরিনি। অথচ তোর গায়ে এটা অসম্ভব সুন্দর লাগছে!"

সবাই একমত, আজকের সন্ধ্যা সত্যিই অন্যরকম।

আনোয়ার আবেগভরা কণ্ঠে বলে—

—"আহা! কতদিন পরে আবার এরকম একটা সন্ধ্যায় পার্টি হচ্ছে। কি বলিস আনারুল?"

আনারুল গলা মিলিয়ে বলে—

—"তা তো বটেই! তবে এইসব কৃতিত্ব কিন্তু ছেলেদের। ওরা না থাকলে আজকের সন্ধ্যা এতটা প্রাণবন্ত হত না।"

গার্ডেনের আলো, হাসি-ঠাট্টা, খাবারের গন্ধ আর মিষ্টি আবহ—সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটা যেন মনে রাখার মতো হয়ে উঠল।

ছেলেরা এমন প্রশংসা শুনে বুক ফুলিয়ে হাঁটছে। কারো মনে হচ্ছে বুক যেন ৩৬ ইঞ্চি হয়ে গেছে, গর্বে টগবগ করছে—

—“দেখ, আমাদের জন্যই এমন জমজমাট পার্টি!”

মেয়েরাও অবশ্য জবাবে মুখ ফিরিয়ে হাসি দিয়ে খুনসুটি করছে। ঠাট্টা-মশকরা, মিষ্টি কথা আর রঙিন হাসিতে ভরে উঠেছে চারদিক।

গার্ডেনটা যেন এক টুকরো স্বর্গীয় আঙিনা—ফুলের গন্ধ, রঙিন লাইটের মায়া, টেবিলে সাজানো সুস্বাদু সব পদ।

সুপ্রিয়া, প্রিয়া আর নুসরাত ব্যস্ত নানা রকম পিঠা সাজাতে। কেউ খাচ্ছে গুড় দিয়ে, কেউ আবার কাবাবের সাথে মেখে নিচ্ছে। পাশে হাঁসের গোশ, গরুর ঝোল, ছাগলের মাংস, আর বারবিকিউর ধোঁয়া মিলেমিশে এক স্বর্গীয় ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে।

সকলের হাসি-ঠাট্টার মধ্যে, হঠাৎ করেই বাড়ির গেট খুলে এক গাড়ি ঢুকল। গাড়ির শব্দে মুহূর্তের জন্য যেন চারদিক নিস্তব্ধ হলো।

কিরিস ফিরেছে।

বাড়ির ভেতরে ঢুকেই সে কাউকে কোনো দৃষ্টি না দিয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল।

ক্লান্ত শরীর, চোখেমুখে দিনের ভার। কারও সঙ্গে কথা বলল না, শুধু ঘরে ঢুকেই কোট খুলে রাখল, হাতের ঘড়ি নামিয়ে টেবিলে ছুঁড়ে রাখল।

শাওয়ারের দরজা বন্ধ হতেই পানির ঝরনা ঝরঝর করে নেমে এলো। কিরিস দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে মাথার উপর পানি নিতে লাগল।

দু’চোখে সারাদিনের কঠিন লড়াই, ক্লান্তি, আর এক অদ্ভুত ভার জমে আছে। পানি যেন সব ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ভেতরের ভারটা কেমন যেন আরও জমাট বেঁধে যাচ্ছে।

ঘরের এক পাশে ভারী দরজাটা খোলা। ওটা ওয়াশরুম নয়—কিরিসের বিলাসবহুল চেঞ্জিং রুম। যেন পৃথিবীর সব মূল্যবান জিনিস এখানে একত্রিত হয়ে আছে। নিখুঁত শৃঙ্খলা, রাজকীয় গাম্ভীর্য, আর নিঃশব্দ আবহ।

কিরিস ধীর পায়ে সোজা সামনে এগোল। কেবিনেট খুলে, ভেতরের একটি ছোট্ট ড্রয়ার টেনে বের করল। সেখান থেকে সে হাত বাড়িয়ে আনল একটি পুরনো কাঠের বক্স।

বাহ্যিকভাবে বক্সটি অতি সাধারণ, কিন্তু স্পর্শে বোঝা যায় কতটা যত্নে এতদিন ধরে রাখা হয়েছে।

বক্স খুলতেই ভেতরে জ্বলজ্বল করছে এক জোড়া নুপুর।

অসাধারণ কারুকাজে গড়া, প্রতিটি কাঠনির খোঁচায় যেন সুরের তার। মাঝখানে ছোট্ট ঘুঙুর, যার পাশে খচিত ময়ূরের নকশা। এমনভাবে ঝলমল করছে যে মনে হয়—এখনই যেন নুপুর থেকে ঝনঝন শব্দ উঠবে, আর এক অপার্থিব নাচে কেঁপে উঠবে চারদিক।

নুপুর দুটো হাতে নিতেই কিরিসের বুক কেঁপে ওঠে।

মুহূর্তেই স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে দাদার মুখ—

জিহাদ একদিন ওকে এই নুপুর দিয়ে বলেছিলেন—

"এই নুপুর যার প্রাপ্য, তাকে দেবে কেবল। আর একটা কথা মনে রেখো—ভুল মানুষের হাতে এটা যেন কোনোদিন না যায়।"

কিরিস তখন ছিল ছোট্ট, কিন্তু ওর স্মৃতিশক্তি ছিল তীক্ষ্ণ। যেটা একবার মনে গেঁথে যায়, সারাজীবন অমোচনীয়। দাদার সেই কথা আজও তার অন্তরে অটুট।

গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে কিরিস চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। তারপর নুপুর দুটো মুঠোয় ধরে রাখল, যেন শক্তি সঞ্চয় করছে। নিজেকে চেঞ্জ করে নিল ধীরেসুস্থে।

এরপর পকেটে নুপুর রেখে সোজা গার্ডেনের দিকে এগিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে নুপুরের ঝুমঝুম শব্দ ভেসে আসছে, কিরিস নিজেই অনুভব করছে তার বুকের ভেতর জমে থাকা আবেগ।

গার্ডেনে পা রাখা মাত্র পরিবেশ বদলে গেল। আলো ঝলমলে গার্ডেন, হাসি-ঠাট্টায় ভরা উঠোন, সুস্বাদু খাবারের টেবিল—সব মিলিয়ে যেন এক উৎসব।

সুপ্রিয়া অনেক আগে থেকেই বুঝেছিল ছেলে আসবে। তাই আগেভাগে বেছে রেখেছে তার জন্য কিছু খাবার।

কারণ সে জানে—কিরিস ভীষণ খুঁতখুঁতে। বাঙালি হয়েও বাঙালি ঝালমশলাদার খাবার খেতে পারে না। ঝাল তো একেবারেই না, আর মসলা হালকা না হলে মুখে তোলে না। তাই সুপ্রিয়া সযত্নে আলাদা করে সাজিয়েছে ছেলের পছন্দের পদ।

এমন দৃশ্য দেখে কাবির ঠোঁটের কোণে একটুখানি হিংসা মিশে যায়। মায়ের দিকে তাকিয়ে অর্ধেক রসিকতা, অর্ধেক অভিমান করে বলে—

—“মাঝে মাঝে মনে হয় আমি তোমার সৎ ছেলে। ওই যে তোমার নিজের ছেলে—তাকে যত্ন করো এভাবে! আরে আমি তো তোমার ছোট ছেলে, আমায় বেশি যত্ন করবে না?”

মুহূর্তেই চারপাশে হালকা হাসির ঢেউ বয়ে গেল। সুপ্রিয়া চোখ ঘুরিয়ে কাবির দিকে তাকালেন, কিন্তু তার দৃষ্টি গিয়েই থেমে রইল কিরিসের ওপর।

কিরিস এখনো গম্ভীর, নিঃশব্দে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পকেটের ভেতর নুপুর দুটো তার আঙুলে নীরব ঝুমঝুম বাজাচ্ছে।কাবিরের কথা শেষ হতেই আবার হাসাহাসি শুরু হলো। মেয়েরা খুনসুটি করছে, ছেলেরা একে অপরকে উত্যক্ত করছে। এরই মধ্যে কিরিস নিঃশব্দে এসে একপাশে বসে পড়ল।

চোখেমুখে কোনো আবেগ নেই, কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যেন সবকিছু গিলে নিচ্ছে—কে কি করছে, কে কোথায় বসে আছে, কে কাকে লক্ষ্য করছে—কিছুই তার চোখ এড়াচ্ছে না।

এই সময় লিসি ধীরে বলে উঠল—

—“আমি একটু উপরে যাচ্ছি।”

তিশা চমকে জিজ্ঞেস করল,

—“কি করতে?”

লিসি মৃদু হেসে উত্তর দিল,

—“ঔষধ খেতে। এত তেল ছাড়া খাবার খাচ্ছি, নিশ্চিতভাবেই গ্যাস হবে। তাই আগে থেকে গ্যাসের ঔষধ খেয়ে নেয়া ভালো। আমি যাচ্ছি, তোমরা এখানে থাকো।”

কথাটা বলেই লিসি তার গাউনটা হালকা তুলে ধরে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। গার্ডেনের আলো চারপাশে রঙ ছড়াচ্ছে বটে, কিন্তু বাড়ির দরজার দিকে যাওয়ার পথে আলো কম। নিভু–নিভু অন্ধকার, মাঝে মাঝে ফেরারি লাইটের ম্লান ঝলক।

বাড়ির দরজার কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ তার হাত চেপে ধরা হলো। এত শক্ত করে টানা, যেন বুক কেঁপে উঠল।

লিসি দ্রুত ঘুরে তাকাতেই—

দুটি চোখ।

তীক্ষ্ণ, ধারালো, হৃদয় ভেদ করা দৃষ্টি।

লিসির নিশ্বাস আটকে গেল।

এই হাত, এই চোখ—ভুল হওয়ার উপায় নেই।

কিরিস।

এক মুহূর্তে সে লিসিকে টেনে নিল দরজার দিক থেকে, সরিয়ে নিয়ে গেল গার্ডেনের অন্ধকার কোণে। চারপাশে হালকা আলো পড়ছে শুধু জানালা থেকে, আর আকাশের পূর্ণিমার চাঁদ মিশ্রিত ছায়া ফেলে রেখেছে। দৃশ্যটা স্পষ্ট, অথচ ভৌতিক আবহে মোড়া।

লিসির বুক ধকধক করছে। অন্ধকারে চারপাশ ভয়ের মতো মনে হচ্ছে। পুরনো দিনের স্মৃতিগুলো হঠাৎ জেগে উঠল মনে।

যে মুহূর্তগুলোতে কিরিস তাকে অস্থির করে তুলেছিল, ভয় পাইয়ে দিয়েছিল—সেসব যেন বারবার কুরে কুরে খাচ্ছে।

"সে কি আবার সেই একই কাজ করতে চলেছে?

না… এটা হতে দেয়া যাবে না…”

মনটা ভয়ে, আতঙ্কে কাঁপতে লাগল লিসির।

আর কিরিস?

সে একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, নীরব, শুধু শ্বাসের উত্তাপে লিসিকে আরও কাঁপিয়ে তুলছে।

অবশেষে দীর্ঘ নীরবতা ভাঙল কিরিস।

তার গলার ভারী স্বর লিসির বুক কাঁপিয়ে দিল—

—“তো… আমার প্রশ্নের উত্তর কি? তুমি কি আমাকে মেনে নিচ্ছ… পার্মানেন্টলি?”

চোখ কুঁচকে, অর্ধেক রাগ আর অর্ধেক অবিশ্বাস নিয়ে লিসি তাকিয়ে রইল।

—“মানে মেনে নেবো মানে?”

কিরিসের ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি।

—“আমাকে তোমার বয়ফ্রেন্ড হিসেবে। আমি তো মেনে নিয়েছি… এখন তোমার মেনে নেওয়াটা জরুরি, তাই না?”

লিসির চোখ গোল হয়ে গেল।

—“বাবা! আপনি আবার কবে থেকে লোকের মতামত জানতে চাচ্ছেন?”

কিরিস নিঃশব্দে তার দিকে ঝুঁকে এলো।

—“যেদিন থেকে তুমি এসেছ।”

লিসি বিরক্ত হয়ে ফিসফিস করল,

—“ফালতু কথা বন্ধ করুন। আমাকে ছেড়ে দিন, আমি উপরে যাচ্ছি।”

কিরিসের দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

—“এত সহজে? না না… আগে বলো। মেনে নিয়েছো কি না।”

লিসি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে উঠল,

—“উফ! বাবা, আপনি বুঝছেন না কেন?”

কিরিস এক চিলতে হাসি চেপে রাখল না।

—“মানে… মেনে নিয়েছো।”

লিসি চোখ বড় বড় করে উঠল।

—“আমি কখন বললাম?”

কিরিস গম্ভীর গলায় জবাব দিল,

—“তাহলে কি বললে তুমি?”

লিসি বিরক্তিতে প্রায় কেঁদে ফেলবে এমন মুখে ফিসফিস করল,

—“আপনি কথা ঘোরাবেন না! পাগল হয়ে যাব… আমি সত্যি পাগল হয়ে যাব।”

কিরিস হঠাৎ নরম স্বরে, অথচ কর্তৃত্ব নিয়ে বলল—

—“এতো সহজে পাগল হলে চলে? পাগল আমি হব… তুমি নয়। তুমি হবে পাগলী।”

লিসি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।

—“কি? এখন এই রাতের অন্ধকারে আমাকে জেন্ডার শিখাচ্ছেন নাকি?”

কিরিস তার দিকে আরও এক পা এগিয়ে এল।

চোখেমুখে কোনো মজা নেই, গলা ভারী।

—“তা কেন করব? আগে তুমি বলো… রাজি কি না।”

লিসির কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

—“আপনি জানেন না…”

কিরিস মৃদু হাসল, যেন নিশ্চিত—

—“তার মানে রাজি।”

লিসি ঝাঁঝিয়ে উঠল,

—“কখন বললাম?”

কিরিস এবার একদম কাছে, শ্বাস ফেলার ফাঁকেই গলা নামিয়ে দিল তার কানের কাছে—

—“লিসি… নিজের মুখে বলো—‘আমি রাজি’।

নাহলে গাছের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে এখানে রেখে যাব অন্ধকারে "…”

সে থেমে গেল।

পূর্ণিমার আলোতে কিরিসের চোখ জ্বলছে তীব্র আগুনে।

লিসি চোখ ভরা অবাক ভাব নিয়ে কিরিসের দিকে তাকিয়ে বলল—

লিসি: "তাহলে আমার মতামত জানতে চাচ্ছেন কেন? যখন ব্ল্যাকমেল করে হ্যাঁ শুনতে চাচ্ছেন!"

কিরিস হালকা হেসে মাথা কাত করে বলল—

কিরিস: "আসলে সেটা চাই করে হোক। যখন কেউ নিজের মুখ থেকে বলে, তখন সেটা শোনার মজা আলাদা। এবার তুমি বলবে নাকি আমি..."

লিসি রেগে হাত মুঠি করে জোরে শ্বাস ফেলল—

লিসি: "আমি আপনাকে মেনে নিচ্ছি!"

কিরিস চোখ চকচক করে হাসল—

কিরিস: "আহ… Congratulations, Lisi Sharma। আজ থেকে আমরা অফিসিয়ালি প্রেমিক-প্রেমিকা।"

লিসি অস্বস্তি নিয়ে পিছু হটল—

লিসি: "আর কতবার শুনব? এবার আমি যাচ্ছি…"

কিরিস হালকা কপাল ভাঁজ করে বলল—

কিরিস: "কি করে যাবে? এতো বড় একটা চ্যান্স পাচ্ছ, তুমি একবার আমাকে হাগও করতে পারো।"

লিসি মুখ বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল—

লিসি: "আপনাকে জরিয়ে ধরার থেকে আমি আমার দাদুর গরুকে জরিয়ে ধরব, অন্তত আপনার থেকে ভালো!"

এই কথায় কিরিস হেসে লিসির হাত ধরে শক্ত করে জরিয়ে ধরল। লিসি কিছুটা অবাক হয়ে কিছু বলতে পারছিল না।

অন্যদিকে তূর্য, ইয়াবি’র পাশে চোখ চকচক করে ফিসফিস করে বলল—

তূর্য: "পাখি কি গাছের ডালে বসে মধু খাচ্ছে নাকি?"

ইয়াবি: "হ্যাঁ, হতে পারে। আর এটাও দেখার বিষয়, শুনতে হবে, ভাবতে হবে—না, না, ভাবিনি কখনো।"

দুজন হেসে উঠল। পাশেই থাকা হিয়া কৌতূহল ভরা চোখে বলল—

হিয়া: "আচ্ছা, কিরিস ভাইকে তো দেখলাম, এখন পাচ্ছি না কেন? আর লিসিও উধাও—তার মানে…?"

ইয়াবি ও তূর্য একসাথে হেসে বলল—

ইয়াবি & তূর্য: "ছোট মানুষ এত বকবক কেন? আর কি বলতে চাচ্ছ তুমি, ওরকম কিছুই না। কিরিস ঘরে গিয়েছে রিপোর্ট দিতে, লিসি তো নিচে আছে, ওষুধ খেতে গেছে।  বোকা মেয়ে!"

দুজন চুপচাপ একে অপরের দিকে তাকাল। কথাগুলো যেন প্র্যাকটিস ছিল—তাদের চোখে মৃদু লজ্জা, মুখে লুকানো হাসি। হিয়া পাশে থেকে দাঁড়িয়ে তাদের এই অদ্ভুত রিয়াকশন দেখে কণ্ঠে ফিসফিস করল, “কি বলব… বুঝতে পারছি না।”

চুপচাপ ওখান থেকে চলে যাওয়ার সময় হিয়ার মনে মনে ভাবল, “এদের মনে হয় মাথা কেটে গেছে… ছোট বানিয়ে দিল।”

ওদিকে লিসি কাচুমাচু করতে ব্যস্ত। এই দেখে কিরিস হঠাৎ লিসিকে ছেড়ে দিল।

লিসি: "আপনি এমন কেনো?"

কিরিস: "কেমন?"

লিসি: "জানি না… আমি চললাম এবার। আর প্লিজ, কিছু করবেন না।"

কিরিস হালকা হেসে বলল—

কিরিস: "ঠিক আছে… কিন্তু শেষবার। আই মিন, এটাই শেষ।"

লিসির হৃদয় কেঁপে উঠল। যেন আগের সব কথা তার মনে ফিরে এসেছে। নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে সে বলল—

লিসি: "শেষ মনে… আপনি কিন্তু ওই সব করতে পারবেন না, নাহলে আমি এবার সত্যি সত্যি সবাইকে বলে দেব।"

কিরিস কিছু না বলে মুচকি হাসল। হাতে পকেটে ঢোকাতে গিয়ে হঠাৎ ঝান ঝান করে লিসির বুকের ভেতরটাও অদ্ভুতভাবে নড়ে উঠল।

হাঁটু গেড়ে বসে কিরিস এক পা উঁচু করে লিসির দিকে তাকাল। পায়ের সঙ্গে হাত দিয়ে ইশারা করল যেন লিসি তার পায়ের উপরে পা রাখুক।